৫৫৫ হিজরি সনের কথা। সেই বছর আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধু সৈয়দ আহমদ রেফায়ী (রা.)-এর ভাগ্যে হজ লিখে দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা এসে পৌঁছাল পবিত্র মদিনায়। শায়খের সাথে ছিলেন তাঁর প্রিয় সঙ্গী আবুল ফারাজ আল-ফারুসী এবং আরও অনেক ভক্ত-মুরিদ। মসজিদে নববীতে প্রবেশ করতেই শায়খের পা যেন ভারী হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড় বইতে লাগল।

ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে গেলেন নবীজির রওজা মোবারকের দিকে। সেদিন মসজিদে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ দোয়া করছেন, কেউ চোখের পানি মুছছেন।

শায়খ রওজার সামনে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ ভরে উঠল। বুক কেঁপে উঠল। তারপর তিনি উচ্চস্বরে বললেন—

আসসালামু আলাইকা ইয়া জাদ্দি! — সালাম আপনার ওপর, হে আমার নানাজান!

মসজিদ যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ রওজার ভেতর থেকে ভেসে এলো এক নুরানি কণ্ঠস্বর—

ওয়া আলাইকাস সালামু ইয়া ওয়ালাদি! — তোমার ওপরও সালাম, হে আমার সন্তান!

উপস্থিত প্রত্যেকে সেই আওয়াজ নিজ কানে শুনলেন। মসজিদজুড়ে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এলো। অনেকের চোখ ছলছল করে উঠল, অনেকে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

আর শায়খ আহমদ রেফায়ী? তিনি তখন আর নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। আধ্যাত্মিক প্রেমের তীব্র স্রোতে তিনি ভেসে যাচ্ছিলেন। তাঁর চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করল। সারা শরীর কাঁপতে লাগল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাটিতে। তারপর কোনোমতে উঠে দাঁড়ালেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বললেন—

হে প্রিয়নবী, বিরহকালে আমি আমার রুহকে পাঠিয়ে দিতাম,

সে আমার প্রতিনিধি হয়ে আপনার রওজার মাটি চুম্বন করত।

আর আজ সশরীরে আপনার দরবারে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে;

অতএব আপনার নুরানি হাত বাড়িয়ে দিন, যেন আমার ঠোঁট তা চুম্বন করে ধন্য হতে পারে।

কবিতার শেষ লাইন উচ্চারণ হতে না হতেই ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। পবিত্র রওজা মোবারক থেকে বেরিয়ে এলো একটি সুগন্ধিময় নুরানি হাত।

নব্বই হাজার মানুষের চোখের সামনে শায়খ আহমদ রেফায়ী সেই পবিত্র হাত মুবারক আঁকড়ে ধরলেন এবং ভক্তিভরে চুম্বন করলেন।

সেদিন উপস্থিত ছিলেন বাগদাদের মহান অলি শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.), শায়খ হায়াত বিন কায়েস আল-হাররানী, শায়খ আদি বিন মুসাফিরসহ আরও অনেক বুজুর্গ। তাঁরা সকলেই এই অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী হলেন।

শায়খ হায়াত বিন কায়েস সেদিনই শায়খ রেফায়ীর হাতে বাইআত গ্রহণ করলেন এবং তাঁর তরিকায় দীক্ষিত হলেন।

সেই পবিত্র মুহূর্তের কথা যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে রইল — একজন প্রেমিক সাধকের গভীর ভালোবাসার এক চিরস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে।