সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা তাসাউফের ইতিহাসে একটি প্রখ্যাত ও সুপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ধারার নাম, যা বিশিষ্ট সুফি-সাধক শায়খ আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আমুওয়াইহ আল-কুরাশি আল-তামিমি আল-বাকরি সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর নামের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি তাসাউফের জগতে ‘শিহাব উদ্দিন’ উপাধিতে সমধিক পরিচিত ছিলেন এবং শরিয়ত ও তরিকার সুসমন্বয়ে এক পরিমিত সুফি মানহাজ উপস্থাপন করেন।
শেখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) ১২৩৪ খ্রিষ্টাব্দে (৬৩২ হিজরি) ইন্তেকাল করেন। তিনি সুফিবাদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’ (عوارف المعارف)-এর প্রণেতা; যেটি সুফি-সাধকদের পথ, পদ্ধতি ও আধ্যাত্মিক শিষ্টাচার বর্ণনায় এক অনন্য ও প্রামাণ্য আকর গ্রন্থ হিসেবে সুপরিচিত।
এই তরিকা কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক তাসাউফ, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষের পাশাপাশি সমাজ ও মানবসেবার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। মধ্যপন্থা, শরিয়ত অনুসরণ ও আধ্যাত্মিক ভারসাম্য—এই তিনের সমন্বয়ই সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য, যা ইসলামি আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক সম্মানজনক অবস্থান অধিকার করে আছে।
সোহরাওয়ার্দী তরিকার উৎপত্তি ও বিকাশ:
সোহরাওয়ার্দী তরিকার উৎপত্তি এক প্রাচীন ও মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারিক আধ্যাত্মিক ধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই তরিকার শিকড় প্রোথিত রয়েছে পারস্যের (বর্তমান ইরান) সোহরাওয়ার্দ অঞ্চলে; যেখানে এক প্রসিদ্ধ সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মহান সাধক শিহাব উদ্দিন আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আমুওয়াইহ আল-কুরাশি আল-তামিমি আল-বাকরি সোহরাওয়ার্দী (রহ.)।
এই বংশের প্রথম প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ, যিনি আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী নামেও পরিচিত। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সুফি-সাধক আবু আব্বাস দিনাওয়ারি (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরির পর)-এর প্রধান শিষ্যদের অন্যতম এবং সোহরাওয়ার্দ অঞ্চলে ইলম ও তাসাউফের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি। তাঁর হাত ধরেই এই বংশে তাসাউফের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়।
পরবর্তীতে এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করেন তাঁর পুত্র ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ; যিনি সমকালীন সুফি-সাধকদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
তিনি নিজ পিতার কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও তাসাউফের শিক্ষা লাভ করেন এবং সেই ধারাকে আরও সুসংহত করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর এই ধারার নেতৃত্ব লাভ করেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব আব্দুল কাহির সোহরাওয়ার্দী (মৃত্যু: ৫৬৩ হিজরি/১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দ, বাগদাদ)।
আবু নাজিব সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন ইসলামি জগতে ‘শায়খুশ শুয়ুখ’ (শায়খদের শায়খ) উপাধিতে খ্যাত ছিলেন। তাঁর হাতেই আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ তাসাউফি প্রশিক্ষণ লাভ করেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শিহাব উদ্দিন আবু হাফস ওমর সোহরাওয়ার্দী, যিনি পরবর্তীতে এই ধারাকে একটি সুসংহত তরিকা-রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নামানুসারেই এই সুফি ধারা সোহরাওয়ার্দী তরিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ইসলামি তাসাউফের শাস্ত্রীয় রূপায়ণ ও সোহরাওয়ার্দী ঘরানার অনন্যতা:
সোহরাওয়ার্দী ঘরানার প্রধান অবদান হলো ইসলামি তাসাউফকে একটি সুসংবদ্ধ শাস্ত্রীয় কাঠামো প্রদান এবং আধ্যাত্মিক পথের স্তর (মাকামাত), অবস্থা (হাল) ও আদবকে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। এর মাধ্যমে সুফিদের বিশেষ আধ্যাত্মিক জীবনধারাকে সাহাবায়ে কেরাম ও সাধারণ ইবাদতগুজারদের অবস্থা থেকে পৃথক করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।
এই ঘরানার মনীষীরা তাসাউফের জন্য স্বতন্ত্র পরিভাষা ও শিষ্টাচার গড়ে তোলেন, যা অভিজ্ঞ সাধকদের মাধ্যমেই অনুধাবনযোগ্য। আদাবুল মুরিদিন এবং আওয়ারিফুল মাআরিফ এর মতো গ্রন্থসমূহ তাসাউফের শাস্ত্রীয় বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেমনটি ফিকহ ও কালাম শাস্ত্রে সমসাময়িক পণ্ডিতদের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
সোহরাওয়ার্দী তরিকা একটি জ্ঞানভিত্তিক আধ্যাত্মিক ধারা হলেও তা কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং ইলম ও আমল, তত্ত্ব ও সাধনার সমন্বয়ে গঠিত। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সোহরাওয়ার্দী ঘরানা ইসলামি তাসাউফের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করে।
সোহরাওয়ার্দী তরিকার আমলি বা ব্যবহারিক দিক:
সোহরাওয়ার্দী তরিকার ব্যবহারিক রূপ গঠনে পারস্যের জাহিদ এবং ইরাক–সিরিয়ার সুফিদের সাহচর্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই তরিকায় ইলম ও আমলের সমন্বয়কে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁদের মূলনীতি হলো— ইলম ছাড়া আমল ত্রুটিপূর্ণ এবং আমল ছাড়া ইলম নিষ্ফল।
এই তরিকার আমলি ভিত্তি হলো নির্জনে (খলওয়াত) নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অন্তরের একাগ্রতাসহ ইসমে আজমের জিকির। পাশাপাশি সাহচর্যের মজলিসে সশব্দ (জহরি) জিকিরের প্রচলন রয়েছে। অনুসারীরা আওয়ারিফুল মাআরিফ-এ বর্ণিত ওরাদ ও ওজিফাসমূহ নিয়মিত আদায় করেন এবং দরবেশি পোশাক ‘মুরক্কায়া’ পরিধান করেন।
সোহরাওয়ার্দী তরিকা একটি পূর্ণাঙ্গ তরবিয়তি পদ্ধতি— যেখানে ইবাদত, মুজাহাদা, খিরকা ও খলওয়াতের মাধ্যমে জ্ঞান ও সাধনার বাস্তব প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বংশধারা ও আধ্যাত্মিক সাধনা:
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ ও পূর্বসূরিদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খিরকা (আধ্যাত্মিক পোশাক) পরিধান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই কারণে ঐতিহাসিকভাবে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকাকে একটি খিরকাভিত্তিক তরিকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে খিরকার গুরুত্ব থাকলেও সরাসরি দীক্ষা বা তালকিনের ধারাকেও এই তরিকায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার সিলসিলা সুস্পষ্ট ও প্রামাণ্য। ইমাম শিহাব উদ্দিন আবু হাফস সোহরাওয়ার্দী (রহ.) তাঁর চাচা জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব সোহরাওয়ার্দী (মৃত্যু ৫৬৩ হিজরি)-এর সাহচর্যে আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও পরিপূর্ণতা লাভ করেন। এই সিলসিলা নিম্নরূপে বর্ণিত—
জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব ← তাঁর চাচা ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস ← তাঁর পিতা মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ ← তাঁর শায়খ আবু আব্বাস দিনাওয়ারি।
অন্যদিকে, আবু আব্বাস দিনাওয়ারি ছিলেন মুহাম্মদ আল-জুরিরি’র শিষ্য, যিনি সুফিবাদের ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর প্রধান উত্তরসূরিদের অন্যতম।
এই আধ্যাত্মিক শৃঙ্খল পরিশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়।[1]
পারস্য থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তার:
উপরোক্ত ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সোহরাওয়ার্দী তরিকা ইরাক ও সিরিয়ায় বিস্তৃত হওয়ার পূর্বে মূলত পারস্য অঞ্চলেই বিকশিত হয়েছিল। তাসাউফের ইতিহাসের এক প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এই তরিকার উদ্ভব ঘটে, যা পরবর্তীকালে তাসাউফের মৌলিক নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলা বিন্যাসে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
হিজরি চতুর্থ শতাব্দী থেকেই সোহরাওয়ার্দী বংশের আধ্যাত্মিক সাধকদের মাধ্যমে যে জ্ঞান ও সাধনার বীজ রোপিত হয়েছিল, তা ধাপে ধাপে পূর্ণতা লাভ করে। মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ ও ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস এর হাতে রোপিত সেই বীজ, আবু নাজিব আব্দুল কাহির সোহরাওয়ার্দীর তত্ত্বাবধানে পরিপুষ্ট হয় এবং শেষপর্যন্ত ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’-এর রচয়িতা শিহাব উদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ, শরিয়ত-নির্ভর ও সুসংগঠিত সুফি তরিকায় রূপ লাভ করে।
এইভাবেই সোহরাওয়ার্দী তরিকা পারস্যের একটি আঞ্চলিক আধ্যাত্মিক ধারার সীমা অতিক্রম করে ইরাক, সিরিয়া, ভারত উপমহাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে ইসলামি তাসাউফের ইতিহাসে এক সুদৃঢ় ও সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করে।[2]
মরক্কোতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার:
সোহরাওয়ার্দী সুফিবাদ মূলত সেই সব মরক্কোবাসীর মাধ্যমে দেশটিতে প্রবেশ করে, যারা জ্ঞান অন্বেষণ বা হজের উদ্দেশ্যে প্রাচ্যের দেশসমূহ তথা ইরাক, পারস্য ও হেজাজে সফর করেছিলেন। এই আধ্যাত্মিক ধারাটি তাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
মরক্কোতে এই তরিকা প্রসারে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন প্রখ্যাত সুফি-সাধক শায়খ আবু মুহাম্মদ সালেহ বিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হারজিহাম আল-ফাসি। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘সিদি হারাজেম’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী ফ্যাজ (Fez) শহরের ‘বাবুল ফুতুহ’ তোরণের বাইরে তাঁর মাজার অবস্থিত; যা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সিদি আলী বিন হারজিহামের রওজার পাশেই।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মরক্কোতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রচলন ও প্রসারে তাঁর ভূমিকা এতটাই একক ও অনন্য ছিল যে, অনেক সময় তাঁকে মরক্কোর বুকে এই তরিকার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই ঘরানার আধ্যাত্মিক দর্শনকে মরক্কোর সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।[3]
ভারতীয় উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার:
ভারতীয় উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সূচনা হয় মুলতান ও উচ—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে ঘিরে। তরিকার প্রধান সংগঠক শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর আস-সোহরাওয়ার্দী (রহ.) তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (রহ.)-কে বর্তমান পাকিস্তানের মুলতানকে দাওয়াত ও তরিকাগত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন।
একই সময়ে তাঁর অপর শিষ্য সৈয়দ জালালুদ্দীন সুরখ বুখারি (রহ.) উচ নগরীতে তাঁর দাওয়াতি ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র স্থাপন করেন। ফলে মুলতান ও উচ— এই দুই শহর সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
দিল্লির সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ মুলতান বিজয়ের পর বাহাউদ্দীন জাকারিয়াকে ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মঙ্গোল আক্রমণের সংকটকালে তিনি মঙ্গোল বাহিনী ও মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অপরদিকে মাখদুম জাহানিয়ান জাহাঁগাস্ত নামে প্রসিদ্ধ জালালুদ্দীন সুরখ বুখারি ছিলেন একনিষ্ঠ শুদ্ধতাবাদী সুফি। তিনি মুসলিম সমাজে হিন্দু সামাজিক রীতিনীতির অনুপ্রবেশের কঠোর বিরোধিতা করেন এবং শরিয়াহ-ভিত্তিক ইসলামি অনুশীলনের উপর জোর দেন।
উত্তরাধিকার ও ভৌগোলিক বিস্তার:
বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার ইন্তিকালের পর তাঁর পুত্র শায়খ সদরুদ্দীন আরিফ সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শিষ্য আমীর হুসাইন, বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাদুল মুসাফিরিন’-এর রচয়িতা। তিনি সুফি দর্শনের ওয়াহদাতুল ওজুদ (সত্তার একত্ব) বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রচনা লিখেন।
শায়খ সদরুদ্দীন আরিফ এর পুত্র রুকনুদ্দীন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি থেকে মুহাম্মদ বিন তুঘলক পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে শাসকদের নিকট বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেন।
রুকনুদ্দীনের মৃত্যুর পর মুলতানে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেলেও এ তরিকা উচ, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশমির ও দিল্লিসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
বাংলা ও বিহারে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা:
বাংলা ও বিহার অঞ্চলে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার ঘটে ‘মানের শরিফ’-এ সুফিদের আগমনের মাধ্যমে। মানের শরিফ হলো ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা জেলার একটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র সুফি তীর্থস্থান। এটি পাটনা থেকে ২৪ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত। মানের শরিফ ধীরে ধীরে এই তরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— মাখদুম ইসরাইল মানেরী, মাখদুম ইসমাইল মানেরী, মাখদুম ইয়াহইয়া মানেরী, মাখদুম শাহাবুদ্দীন পীর জগজোট, মাখদুম সালাহ দরবেশ মানেরী, মাখদুম তাকিউদ্দীন মাহসাওয়ী, মাখদুম আহমদ চিরামপোশ প্রমুখ
বর্তমানেও মানের শরিফ সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশে সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার আবির্ভাব ও খিদমত:
বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই তরিকার প্রথম যে মহান সাধক বাংলাদেশে পদার্পণ করেন, তিনি হলেন শায়খ জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.)। তিনি শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর সরাসরি শিষ্য ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তেরো শতকের শুরুর দিকে রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তিনি মুলতান ও দিল্লি হয়ে বাংলায় আগমন করেন। তার এই আগমন বঙ্গবিজয়ের অব্যবহিত পর বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
ইসলাম প্রচার ও সামাজিক প্রভাব:
তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থা ছিল জাতিভেদ ও বর্ণবাদের কঠোরতায় জর্জরিত। বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধরা তৎকালীন সমাজপতিদের দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত ও নিপীড়িত ছিল। এমন এক ক্রান্তিকালে শায়খ জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.) ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং মানবিক আদর্শ নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছান। তার চারিত্রিক মাধুর্য এবং ইসলামের উদার নীতিতে মুগ্ধ হয়ে নির্যাতিত মানুষগুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বাংলাদেশে তার অনুসারী ও শিষ্যগণ ‘জলিলিয়া’ বা ‘জালালিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
খানকা ও মানবসেবা:
ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে তিনি বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের পাণ্ডুয়ার নিকটবর্তী দেওতলায় নিজের আস্তানা বা খানকা স্থাপন করেন। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি তিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তার আস্তানার পাশেই ছিল একটি লঙ্গরখানা, যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষ অন্ন পেত। তার নামানুসারে এই পুরো অঞ্চলটি পরবর্তীকালে ‘তাবরিজাবাদ’ নামে পরিচিতি পায়। আজও দেওতলায় তার স্মৃতিবিজড়িত মাজার, মসজিদ ও খানকা বিদ্যমান রয়েছে; যা সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘকাল ধরে ওয়াকফ সম্পত্তি বরাদ্দ রয়েছে।[4]
উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক: হজরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.)
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এঁর তরিকা নিয়ে দুটি মত প্রচলিত। ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থমতে তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী, তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতো পণ্ডিতরা ‘সোহেলে ইয়ামেনি’র বর্ণনাকে সমর্থন করেন, যেখানে তাঁকে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বলা হয়েছে। তাঁর পীর ও মাতুল সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি (রহ.) ছিলেন এই তরিকার বিশেষ ব্যক্তিত্ব, যাঁর মাধ্যমে মক্কায় সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিকাশ ঘটেছিল। শৈশব থেকেই তাঁর তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠে শাহজালাল (রহ.) কোরআন, হাদিস, ফিকহের পাশাপাশি ইলমে মারফত বা আধ্যাত্মিক বিদ্যা অর্জন করেন।[5]
তাঁর নামের সাথে যুক্ত ‘মুজাররদ’ শব্দটি তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার সর্বোচ্চ স্তরের পরিচায়ক। সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল গ্রন্থ ‘আওয়ারিফুল মায়ারিফ’ অনুযায়ী মুজাররদ তিনিই, যিনি বাহ্যিকভাবে দুনিয়াবি যাবতীয় মোহ থেকে এবং অভ্যন্তরীণভাবে ইহকাল-পরকালের প্রতিদানের আশা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহমুখী হয়ে যান।[6] এই উচ্চতম আধ্যাত্মিক স্তরে উপনীত হওয়ার কারণেই তিনি আজীবন বিবাহ পরিহার করেছেন, একনাগাড়ে চল্লিশ বছর রোজা রেখেছেন, প্রতি দশদিনে একবার আহার করেছেন এবং রাতজেগে ইবাদতে মগ্ন থেকেছেন।
আধ্যাত্মিক প্রভাব ও কারামত:
তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির নজির সুদূর ইয়ামেন থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। ইয়ামেনের সামন্ত রাজার দেওয়া বিষমিশ্রিত শরবত বিসমিল্লাহ বলে পান করেও তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং রাজা নিজেই মৃত্যুবরণ করেন। দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এঁর পাঠানো খাদিমের হাতে জ্বলন্ত কয়লা তুলার উপর জ্বলতে থাকলেও তুলার একটি অংশও দগ্ধ হয়নি— এ ঘটনা তাঁর আধ্যাত্মিক পরিপক্কতার এক অনন্য নিদর্শন। ইবনে বতুতার বর্ণনায় আরও জানা যায়, শাহজালাল (রহ.) আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় প্রতিদিন ফজরের নামাজ কাবা শরিফে আদায় করতেন এবং প্রতি বছর হজ সম্পাদন করতেন। এই বিশ্বপর্যটক কেবল শাহজালালের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যেই বাংলায় এসেছিলেন, যা তাঁর আধ্যাত্মিক আধিপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ।[7]
খলিফাদের মাধ্যমে বিরাট খেদমত:
তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিখ্যাত ৩৬০ আউলিয়া, যাঁরা তাঁর সাথে বাংলায় এসেছিলেন এবং সশস্ত্র যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। সিলেট বিজয়ের পর এই খলিফারা টিলায় টিলায়, পথেপ্রান্তরে অবস্থান নিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলাম প্রচারে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (রহ.), যিনি একাধারে সফল সেনাপতি ও শাহজালালের সুযোগ্য খলিফা। তরফ বিজয়ের পর শাহজালালের পরামর্শেই তিনি তরফের সিংহাসনে আরোহণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাঁর বিশেষ বারোজন অনুসারী আউলিয়া ঐ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন।[8]
শাহজালাল (রহ.) কাছাড় অঞ্চলে নরবলি প্রথা বন্ধ করার পর বদরপুর, লঙাই, মোবারকপুর, বুন্দাশীল, দেওড়াইল ও মনাঙ্গনসহ বিভিন্ন স্থানে বিশ্বস্ত খলিফাদের শাসনভার দিয়ে আসেন। এভাবে তিনি সিলেটকে কেন্দ্রে রেখে গোটা অঞ্চলে একটি সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। যেন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ। তাঁর এই প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, ব্রিটিশ আমলের প্রারম্ভ পর্যন্ত সিলেটের প্রতিটি নতুন শাসক কার্যভার গ্রহণের আগে তাঁর দরগাহ জিয়ারত করে খানকার শেখের হাতে অভিষিক্ত না হলে জনসাধারণ তাঁকে বৈধ শাসক হিসেবেই মানতো না।[9]
সবশেষে বলা যায়, শাহজালাল (রহ.) কেবল একজন সুফি-দরবেশ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মুজাররদ সাধক, যাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি এবং খলিফাদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিশাল নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলের ইসলামি ইতিহাসকে চিরতরে পাল্টে দিয়েছে।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা তাসাউফের ইতিহাসে একটি সুসংহত, শরিয়তনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক আধ্যাত্মিক ধারা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং তাঁর রচিত ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’ গ্রন্থ তাসাউফের শাস্ত্রীয় বিন্যাসে বিশেষ অবদান রাখে।
পারস্যে সূচনা হলেও ইরাক, সিরিয়া, মরক্কো, ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এ তরিকা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (রহ.) এবং জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.)-এর মতো মনীষীদের মাধ্যমে এটি দাওয়াহ, মানবসেবা ও নৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইলম ও আমলের সমন্বয়, খিরকা ও সিলসিলাভিত্তিক আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা, এবং সমাজকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য। এই ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী মানহাজই একে ইসলামি আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক স্থায়ী ও সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।