সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা তাসাউফের ইতিহাসে একটি প্রখ্যাত ও সুপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ধারার নাম, যা বিশিষ্ট সুফি-সাধক শায়খ আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আমুওয়াইহ আল-কুরাশি আল-তামিমি আল-বাকরি সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর নামের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি তাসাউফের জগতে ‘শিহাব উদ্দিন’ উপাধিতে সমধিক পরিচিত ছিলেন এবং শরিয়ত ও তরিকার সুসমন্বয়ে এক পরিমিত সুফি মানহাজ উপস্থাপন করেন।
শেখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) ১২৩৪ খ্রিষ্টাব্দে (৬৩২ হিজরি) ইন্তেকাল করেন। তিনি সুফিবাদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’ (عوارف المعارف)-এর প্রণেতা; যেটি সুফি-সাধকদের পথ, পদ্ধতি ও আধ্যাত্মিক শিষ্টাচার বর্ণনায় এক অনন্য ও প্রামাণ্য আকর গ্রন্থ হিসেবে সুপরিচিত।
এই তরিকা কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক তাসাউফ, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষের পাশাপাশি সমাজ ও মানবসেবার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। মধ্যপন্থা, শরিয়ত অনুসরণ ও আধ্যাত্মিক ভারসাম্য—এই তিনের সমন্বয়ই সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য, যা ইসলামি আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক সম্মানজনক অবস্থান অধিকার করে আছে।
সোহরাওয়ার্দী তরিকার উৎপত্তি ও বিকাশ:
সোহরাওয়ার্দী তরিকার উৎপত্তি এক প্রাচীন ও মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারিক আধ্যাত্মিক ধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই তরিকার শিকড় প্রোথিত রয়েছে পারস্যের (বর্তমান ইরান) সোহরাওয়ার্দ অঞ্চলে; যেখানে এক প্রসিদ্ধ সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মহান সাধক শিহাব উদ্দিন আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আমুওয়াইহ আল-কুরাশি আল-তামিমি আল-বাকরি সোহরাওয়ার্দী (রহ.)।
এই বংশের প্রথম প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ, যিনি আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী নামেও পরিচিত। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সুফি-সাধক আবু আব্বাস দিনাওয়ারি (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরির পর)-এর প্রধান শিষ্যদের অন্যতম এবং সোহরাওয়ার্দ অঞ্চলে ইলম ও তাসাউফের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি। তাঁর হাত ধরেই এই বংশে তাসাউফের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়।
পরবর্তীতে এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করেন তাঁর পুত্র ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস ওমর বিন মুহাম্মদ; যিনি সমকালীন সুফি-সাধকদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
তিনি নিজ পিতার কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও তাসাউফের শিক্ষা লাভ করেন এবং সেই ধারাকে আরও সুসংহত করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর এই ধারার নেতৃত্ব লাভ করেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব আব্দুল কাহির সোহরাওয়ার্দী (মৃত্যু: ৫৬৩ হিজরি/১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দ, বাগদাদ)।
আবু নাজিব সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন ইসলামি জগতে ‘শায়খুশ শুয়ুখ’ (শায়খদের শায়খ) উপাধিতে খ্যাত ছিলেন। তাঁর হাতেই আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ তাসাউফি প্রশিক্ষণ লাভ করেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শিহাব উদ্দিন আবু হাফস ওমর সোহরাওয়ার্দী, যিনি পরবর্তীতে এই ধারাকে একটি সুসংহত তরিকা-রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নামানুসারেই এই সুফি ধারা সোহরাওয়ার্দী তরিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ইসলামি তাসাউফের শাস্ত্রীয় রূপায়ণ ও সোহরাওয়ার্দী ঘরানার অনন্যতা:
সোহরাওয়ার্দী ঘরানার প্রধান অবদান হলো ইসলামি তাসাউফকে একটি সুসংবদ্ধ শাস্ত্রীয় কাঠামো প্রদান এবং আধ্যাত্মিক পথের স্তর (মাকামাত), অবস্থা (হাল) ও আদবকে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। এর মাধ্যমে সুফিদের বিশেষ আধ্যাত্মিক জীবনধারাকে সাহাবায়ে কেরাম ও সাধারণ ইবাদতগুজারদের অবস্থা থেকে পৃথক করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।
এই ঘরানার মনীষীরা তাসাউফের জন্য স্বতন্ত্র পরিভাষা ও শিষ্টাচার গড়ে তোলেন, যা অভিজ্ঞ সাধকদের মাধ্যমেই অনুধাবনযোগ্য। আদাবুল মুরিদিন এবং আওয়ারিফুল মাআরিফ এর মতো গ্রন্থসমূহ তাসাউফের শাস্ত্রীয় বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেমনটি ফিকহ ও কালাম শাস্ত্রে সমসাময়িক পণ্ডিতদের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
সোহরাওয়ার্দী তরিকা একটি জ্ঞানভিত্তিক আধ্যাত্মিক ধারা হলেও তা কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং ইলম ও আমল, তত্ত্ব ও সাধনার সমন্বয়ে গঠিত। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সোহরাওয়ার্দী ঘরানা ইসলামি তাসাউফের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করে।
সোহরাওয়ার্দী তরিকার আমলি বা ব্যবহারিক দিক:
সোহরাওয়ার্দী তরিকার ব্যবহারিক রূপ গঠনে পারস্যের জাহিদ এবং ইরাক–সিরিয়ার সুফিদের সাহচর্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই তরিকায় ইলম ও আমলের সমন্বয়কে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁদের মূলনীতি হলো— ইলম ছাড়া আমল ত্রুটিপূর্ণ এবং আমল ছাড়া ইলম নিষ্ফল।
এই তরিকার আমলি ভিত্তি হলো নির্জনে (খলওয়াত) নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অন্তরের একাগ্রতাসহ ইসমে আজমের জিকির। পাশাপাশি সাহচর্যের মজলিসে সশব্দ (জহরি) জিকিরের প্রচলন রয়েছে। অনুসারীরা আওয়ারিফুল মাআরিফ-এ বর্ণিত ওরাদ ও ওজিফাসমূহ নিয়মিত আদায় করেন এবং দরবেশি পোশাক ‘মুরক্কায়া’ পরিধান করেন।
সোহরাওয়ার্দী তরিকা একটি পূর্ণাঙ্গ তরবিয়তি পদ্ধতি— যেখানে ইবাদত, মুজাহাদা, খিরকা ও খলওয়াতের মাধ্যমে জ্ঞান ও সাধনার বাস্তব প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বংশধারা ও আধ্যাত্মিক সাধনা:
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ ও পূর্বসূরিদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খিরকা (আধ্যাত্মিক পোশাক) পরিধান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই কারণে ঐতিহাসিকভাবে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকাকে একটি খিরকাভিত্তিক তরিকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে খিরকার গুরুত্ব থাকলেও সরাসরি দীক্ষা বা তালকিনের ধারাকেও এই তরিকায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার সিলসিলা সুস্পষ্ট ও প্রামাণ্য। ইমাম শিহাব উদ্দিন আবু হাফস সোহরাওয়ার্দী (রহ.) তাঁর চাচা জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব সোহরাওয়ার্দী (মৃত্যু ৫৬৩ হিজরি)-এর সাহচর্যে আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও পরিপূর্ণতা লাভ করেন। এই সিলসিলা নিম্নরূপে বর্ণিত—
জিয়াউদ্দিন আবু নাজিব ← তাঁর চাচা ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস ← তাঁর পিতা মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ ← তাঁর শায়খ আবু আব্বাস দিনাওয়ারি।
অন্যদিকে, আবু আব্বাস দিনাওয়ারি ছিলেন মুহাম্মদ আল-জুরিরি’র শিষ্য, যিনি সুফিবাদের ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর প্রধান উত্তরসূরিদের অন্যতম।
এই আধ্যাত্মিক শৃঙ্খল পরিশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়।[1]
পারস্য থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তার:
উপরোক্ত ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সোহরাওয়ার্দী তরিকা ইরাক ও সিরিয়ায় বিস্তৃত হওয়ার পূর্বে মূলত পারস্য অঞ্চলেই বিকশিত হয়েছিল। তাসাউফের ইতিহাসের এক প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এই তরিকার উদ্ভব ঘটে, যা পরবর্তীকালে তাসাউফের মৌলিক নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলা বিন্যাসে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
হিজরি চতুর্থ শতাব্দী থেকেই সোহরাওয়ার্দী বংশের আধ্যাত্মিক সাধকদের মাধ্যমে যে জ্ঞান ও সাধনার বীজ রোপিত হয়েছিল, তা ধাপে ধাপে পূর্ণতা লাভ করে। মুহাম্মদ বিন আমুওয়াইহ ও ওয়াজিউদ্দিন আবু হাফস এর হাতে রোপিত সেই বীজ, আবু নাজিব আব্দুল কাহির সোহরাওয়ার্দীর তত্ত্বাবধানে পরিপুষ্ট হয় এবং শেষপর্যন্ত ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’-এর রচয়িতা শিহাব উদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ, শরিয়ত-নির্ভর ও সুসংগঠিত সুফি তরিকায় রূপ লাভ করে।
এইভাবেই সোহরাওয়ার্দী তরিকা পারস্যের একটি আঞ্চলিক আধ্যাত্মিক ধারার সীমা অতিক্রম করে ইরাক, সিরিয়া, ভারত উপমহাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে ইসলামি তাসাউফের ইতিহাসে এক সুদৃঢ় ও সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করে।[2]
মরক্কোতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার:
সোহরাওয়ার্দী সুফিবাদ মূলত সেই সব মরক্কোবাসীর মাধ্যমে দেশটিতে প্রবেশ করে, যারা জ্ঞান অন্বেষণ বা হজের উদ্দেশ্যে প্রাচ্যের দেশসমূহ তথা ইরাক, পারস্য ও হেজাজে সফর করেছিলেন। এই আধ্যাত্মিক ধারাটি তাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
মরক্কোতে এই তরিকা প্রসারে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন প্রখ্যাত সুফি-সাধক শায়খ আবু মুহাম্মদ সালেহ বিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হারজিহাম আল-ফাসি। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘সিদি হারাজেম’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী ফ্যাজ (Fez) শহরের ‘বাবুল ফুতুহ’ তোরণের বাইরে তাঁর মাজার অবস্থিত; যা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সিদি আলী বিন হারজিহামের রওজার পাশেই।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মরক্কোতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রচলন ও প্রসারে তাঁর ভূমিকা এতটাই একক ও অনন্য ছিল যে, অনেক সময় তাঁকে মরক্কোর বুকে এই তরিকার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই ঘরানার আধ্যাত্মিক দর্শনকে মরক্কোর সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।[3]
ভারতীয় উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার:
ভারতীয় উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সূচনা হয় মুলতান ও উচ—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে ঘিরে। তরিকার প্রধান সংগঠক শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর আস-সোহরাওয়ার্দী (রহ.) তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (রহ.)-কে বর্তমান পাকিস্তানের মুলতানকে দাওয়াত ও তরিকাগত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন।
একই সময়ে তাঁর অপর শিষ্য সৈয়দ জালালুদ্দীন সুরখ বুখারি (রহ.) উচ নগরীতে তাঁর দাওয়াতি ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র স্থাপন করেন। ফলে মুলতান ও উচ— এই দুই শহর সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
দিল্লির সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ মুলতান বিজয়ের পর বাহাউদ্দীন জাকারিয়াকে ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মঙ্গোল আক্রমণের সংকটকালে তিনি মঙ্গোল বাহিনী ও মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অপরদিকে মাখদুম জাহানিয়ান জাহাঁগাস্ত নামে প্রসিদ্ধ জালালুদ্দীন সুরখ বুখারি ছিলেন একনিষ্ঠ শুদ্ধতাবাদী সুফি। তিনি মুসলিম সমাজে হিন্দু সামাজিক রীতিনীতির অনুপ্রবেশের কঠোর বিরোধিতা করেন এবং শরিয়াহ-ভিত্তিক ইসলামি অনুশীলনের উপর জোর দেন।
দিল্লির সুলতানদের সাথে সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের সম্পর্ক:
চিশতিয়া তরিকার আগমনের পরপরই সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা ভারতে প্রবেশ করে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শাইখ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) বলতেন, “ভারতে আমার অনেক খলিফা রয়েছে।” তাঁর বেশ কয়েকজন খলিফা ভারতে এসেছিলেন। যাঁদের মধ্যে শাইখ নূরুদ্দিন মুবারক গজনভী, শাইখ মজিদুদ্দিন হাজি এবং কাজী হামিদুদ্দিন নাগোরি অন্যতম। তবে ভারতে এই তরিকার মূল ভিত্তি স্থাপন করেন শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি (রহ.) (১১8২-১২৬২ খ্রি.)। তিনি মুলতান, উচ এবং সিন্ধুর বিভিন্ন স্থানে সোহরাওয়ার্দিয়া খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন।
এই তরিকার প্রচার ও প্রসারে যে সকল শায়খ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
১. শাইখ রুকনুদ্দিন আবুল ফাতহ মুলতানি (রহ.)
২. সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী (মাখদুম জাহানিয়া জাহানগাশত নামে পরিচিত)
৩. শাইখ সামাউদ্দিন (রহ.)
৪. মাওলানা জামালি (রহ.)
এই মহান সাধকগণ সোহরাওয়ার্দিয়া আদর্শ প্রচারের অগ্রদূত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মাখদুম জাহানিয়ার খলিফাগণ গুজরাটে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে এ তরিকার বিস্তার ঘটান। এ-ছাড়া শায়খ কুতুব আলম (মৃত্যু: ১৪৫৩ খ্রি.) এবং শাইখ শাহ আলম (মৃত্যু: ১৪৭৫ খ্রি.) এই ধারাকে আরও বেগবান করেন। অন্যদিকে, বাংলায় শায়খ জালালুদ্দিন তাবরিজি (রহ.) এই তরিকার আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলন করেন।
প্রাথমিকভাবে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রভাব পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি, শাইখ রুকনুদ্দিন মুলতানি এবং মাখদুম জাহানিয়ার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁদের চিন্তাধারা ভারতের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশেষ করে তুর্কিস্তানেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের সাথে সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের সম্পর্ক:
শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি (রহ.)-কে ভারতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি এই তরিকার ভিত্তি মজবুত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। চিশতিয়া তরিকার বিমুখতা বা নির্লিপ্ত নীতির বিপরীতে তিনি দিল্লির সুলতানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে কোনো দোষের মনে করতেন না। বরং তিনি সমসাময়িক পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতেন।
সে সময় মুলতান অঞ্চলে নাসিরুদ্দিন কাবাচা/কুবাচা স্বাধীনভাবে রাজত্ব করছিলেন, যেখানে শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বসবাস করতেন। কিন্তু শায়খ কাবাচার চেয়ে সুলতান ইলতুৎমিশকেই বেশি পছন্দ করতেন। একবার তিনি মুলতানের কাজী মাওলানা শরফুদ্দিনের সাথে মিলে কাবাচার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক কৌশল করেন। তিনি সুলতান ইলতুৎমিশকে একটি গোপন চিঠি লিখে কাবাচার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করতে এবং মুলতানসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোকে দিল্লি সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
দুর্ভাগ্যবশত চিঠিটি কাবাচার হাতে ধরা পড়ে। কাবাচা তাঁদের দুজনকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শায়খ নির্ভীকভাবে উত্তর দেন যে, তিনি এটি আল্লাহর নির্দেশে করেছেন। কাবাচা শায়খকে শাস্তি দেওয়ার সাহস পাননি, তবে কাজীকে হত্যা করেন। শায়খের বিশ্বজোড়া খ্যাতি এবং জনগণের কাছে তাঁর উচ্চ মর্যাদার কারণে কাবাচা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে ভয় পেয়েছিলেন। এ-ছাড়া তাঁর আশঙ্কা ছিল যে, শায়খের ওপর কোনো আঘাত আসলে সুলতানি বাহিনী সেই অজুহাতে মুলতান আক্রমণ করে বসবে।
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) এই ঘটনার সবচেয়ে প্রাচীন বর্ণনাকারী হলেও শায়খ ও কাবাচার সম্পর্ক কেন তিক্ত হয়েছিল তার কারণ উল্লেখ করেননি। কিছু গবেষক মনে করেন, কাবাচা নিজেই দিল্লির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছিলেন, যা শায়খ পছন্দ করেননি এবং তাই তিনি ইলতুৎমিশকে সতর্ক করেছিলেন। কারণ যাই হোক না কেন, শায়খের সহযোগিতায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মুলতান দিল্লি সালতানাতের অধীনে চলে আসে। শাইখ কেবল সুলতানের সাথে সম্পর্কই মজবুত করেননি; বরং তিনি সরকারি পদবী গ্রহণ করে দিল্লির ‘শাইখুল ইসলাম’ হিসেবে নিযুক্ত হন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া অনেক জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা সমাধানে একজন সফল কূটনীতিবিদের ভূমিকা পালন করেছেন। গবেষকদের মতে, যখন মালিক শামসুদ্দিন ও সালি তুয়িন মুলতান আক্রমণ করেন, তখন সুলতান জাহাঙ্গির খানের পক্ষ থেকে নিযুক্ত ওয়ালি (গভর্নর) শায়খ বাহাউদ্দিনকে মধ্যস্থতার জন্য পাঠান। শায়খ তাঁর প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে মালিক শামসুদ্দিনকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে ফিরে যেতে রাজি করাতে সক্ষম হন।
সুলতান ইলতুৎমিশ এবং কাজী হামিদুদ্দিন নাগোরি সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর সম্পর্ক:
শাইখ কাজী হামিদুদ্দিন নাগোরি ছিলেন শায়খ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর খলিফা এবং শায়খ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি তাঁর যুগের একজন বিশিষ্ট সুফি-সাধক ও আলেম ছিলেন। তিনি ‘সামা’ (আধ্যাত্মিক সংগীত) অত্যন্ত পছন্দ করতেন এবং বলা হয় যে, তিনিই দিল্লিতে সামার প্রচলন করেছিলেন। সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করতেন। তিনি যখনই রাজদরবারে আসতেন, সুলতান দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেন।
দিল্লির কিছু আলেম, যেমন কাজী সাদ এবং কাজী ইমাদ, সামার বিরোধী ছিলেন। তাঁরা কাজী হামিদুদ্দিনকে সামা থেকে বিরত রাখার জন্য সুলতানের কাছে অভিযোগ পেশ করেন। সুলতান এই বিবাদমান বিষয়টি মীমাংসার জন্য আলেমদের তলব করেন এবং সেখানে কাজী নাগোরিও উপস্থিত হন। কাজী নাগোরি আসার পর সুলতান দাঁড়িয়ে তাঁর হাত চুম্বন করেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সাথে নিজের পাশে বসান। সামার বৈধতা সম্পর্কে কাজী নাগোরি বলেন যে, এটি ‘আহলে হাল’ (আধ্যাত্মিক সাধক)-দের জন্য জায়েজ, কিন্তু ‘আহলে কাল’ (সাধারণ ফকিহ)-দের জন্য জায়েজ নয়।
এরপর তিনি বাগদাদের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যখন সুলতান ইলতুৎমিশ একজন সাধারণ ভৃত্য ছিলেন। তিনি সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সুলতানের কি মনে পড়ে, বাগদাদের সেই রাতের কথা, যখন দরবেশরা সামা মাহফিলে মগ্ন ছিলেন? আপনি আপনার মালিকের আদেশে সেই রাতে মজলিসে আগতদের খেদমত করছিলেন এবং সামা শুনে কাঁদছিলেন। তখন সুফিদের নজর আপনার ওপর পড়েছিল এবং সেই নজরের বরকতেই আজ আপনি এই সালতানাত লাভ করেছেন।”
এই কথা শুনে সুলতান সেই স্মৃতি মনে করলেন, তাঁর হৃদয় বিগলিত হলো এবং তিনি শায়খের পা জড়িয়ে ধরলেন। সামার উপকারিতা এবং সত্যতা অনুধাবন করার পর সুলতান তাঁকে সসম্মানে বিদায় দেন। কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সেই মজলিসের পর সুলতান শায়খের বাড়িতে যান, সেখানে সামা মাহফিলে অংশ নেন এবং শায়খের আয়োজিত দাওয়াতে খাবার গ্রহণ করেন। এমনকি সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর ভাগ্নেকেও শাইখের মুরিদ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সুলতান আলাউদ্দিন এবং শায়খ রুকনুদ্দিন আবুল ফাতাহ মুলতানি (রহ.)-এর সম্পর্ক:
শায়খ রুকনুদ্দিন ছিলেন শাইখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার পৌত্র এবং তাঁর সময়ের অত্যন্ত প্রখ্যাত সুফি সাধক। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, সিন্ধু অঞ্চলের মানুষের সাথে শাইখের অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক ছিল; তাঁরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শাইখের সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তাঁর মুরিদ হতে আসতেন। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিও তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন।
কিছু সূত্র অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির শাসনামলে শায়খ দুবার রাজধানী দিল্লি সফর করেছিলেন। সুলতান তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁকে শহরে নিয়ে আসেন। সুলতান তাঁকে প্রচুর ধন-সম্পদ উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন, যা শাইখ তৎক্ষণাৎ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
সুলতান কুতুবুদ্দিন মুবারক খিলজির সাথে সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের সম্পর্ক:
সুলতান কুতুবুদ্দিন মুবারক খিলজি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর প্রভাব খর্ব করার পরিকল্পনা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনে শায়খের প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি করতে। শায়খের খানকার বদলে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি একটি বড় কেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। শায়খের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় মর্যাদা কমানোর এই হীন উদ্দেশ্যে তিনি সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি মুলতান থেকে শায়খ রুকনুদ্দিন মুলতানিকে ডেকে পাঠান, যাতে তাঁর মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় এবং দুই তরিকার (চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া) মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা যায়।
শায়খ রুকনুদ্দিনের সাথে দিল্লির সুলতানদের (মুবারক শাহ খিলজিসহ অন্যদের) সুসম্পর্ক ছিল, কারণ সোহরাওয়ার্দিয়া শায়খগণ শাসকগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক রাখাকে দোষের মনে করতেন না। কিন্তু একই সাথে তাঁরা চিশতিয়া শায়খদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং যুগে যুগে তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। শায়খ রুকনুদ্দিন কোনোভাবেই সুলতানকে খুশি করার জন্য হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে রাজি ছিলেন না। তাই সুলতানের সাথে সাক্ষাতের সময় তিনি শায়খ নিজামুদ্দিন এবং চিশতিয়া তরিকা সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক মত প্রকাশ করেন, যা সুলতানের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়।
সুলতান শায়খ রুকনুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, দিল্লিতে আসার পর তিনি কার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ করেছেন? শায়খ উত্তর দিলেন, “যিনি দিল্লির পুণ্যবান ব্যক্তিদের অন্যতম এবং শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, অর্থাৎ শায়খুল মাশায়েখ নিজামুদ্দিন।” সুলতান যখন শায়খ রুকনুদ্দিনের মাধ্যমে সফল হতে পারলেন না, তখন তিনি ‘শায়খজাদা জাম’ নামক এক ব্যক্তিকে বেছে নেন, যিনি শায়খ নিজামুদ্দিন ও তাঁর খানকার বিরোধী ছিলেন। সুলতান মানুষকে শায়খের খানকাহতে যেতে নিষেধ করেন, কিন্তু তাতেও তিনি সফল হননি। উল্টো সেই সময় শায়খ এবং তাঁর খানকাহতে মানুষের ভিড় আরও বেড়ে যায়। এভাবে সুলতানের সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের সাথে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সম্পর্ক:
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার সবচেয়ে বড় খানকাহটি মুলতানে অবস্থিত ছিল, যা ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে দিল্লির সুলতানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক সোহরাওয়ার্দিয়া খানকাহর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং একে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অধীনে আনতে সক্ষম হন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি শায়খ রুকনুদ্দিন আবুল ফাতাহ-এর যুগে সম্পন্ন হয়েছিল। সুলতান তাঁকে একশতটি গ্রাম দান করেন, যার এক-চতুর্থাংশ আয় খানকাহর ব্যয়ে নির্ধারিত ছিল। যখন বাহরাম আইবা কিশলু খাঁ সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তখন শায়খ রুকনুদ্দিন এবং তাঁর ভাই ইমাদুদ্দিন সুলতানকে সাহায্য করেছিলেন; এমনকি তাঁর উক্ত ভাই যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদও হন। সমসাময়িক সূত্রগুলো জানায় যে, শায়খ গভর্নরের অনুমতি ব্যতীত কাউকে খানকাহতে আশ্রয় নিতে বা অবস্থান করতে দিতেন না। তবে শায়খ এই সিদ্ধান্তটি স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন নাকি সুলতান তাঁকে বাধ্য করেছিলেন— সে বিষয়ে সূত্রগুলোতে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। যা-ই হোক, এই কড়াকড়ি সুফিদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের স্বাধীনতার ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
শায়খ রুকনুদ্দিন তাঁর জীবদ্দশায় সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকাহ এবং খানকাহ ব্যবস্থার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সফল হলেও তাঁর মৃত্যুর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রশ্নে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুলতানের দরবারে উত্থাপন করা হয় এবং সুলতান ‘শায়খ হুদ’-এর পক্ষে রায় দেন। মরহুম শায়খ রুকনুদ্দিনের অসিয়ত অনুযায়ী সুলতান তাঁকে মাশায়েখের পদ (মাশায়িখাত) প্রদান করেন। সুলতান তাঁকে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করেন এবং আদেশ দেন যেন প্রতিটি গন্তব্যস্থলে তাঁকে রাজকীয় আতিথেয়তা দেওয়া হয় এবং স্থানীয় গভর্নর, শায়খ ও আলেমগণ যেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
ইবনে বতুতার মতে, তৎকালীন দ্বিতীয় রাজধানী দৌলতাবাদ থেকে মুলতানের দূরত্ব ছিল আশি দিনের পথ। ইবনে বতুতা বলেন, “শাইখ যখন রাজধানীতে পৌঁছলেন, তখন ফকিহ, কাজী, মাশায়েখ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বেরিয়ে এলেন; আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। আমরা তাঁকে পালকিতে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পেলাম… তিনি দরবারে প্রবেশ করার পর সুলতানের পক্ষ থেকে বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল এবং কাজী, শায়খ ও ফকিহগণ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। খাবারের পর উপস্থিত সবাইকে মর্যাদা অনুযায়ী দিরহাম (মুদ্রা) প্রদান করা হয়। এরপর সুলতান শায়খ হুদকে তাঁর নিজ এলাকায় বিদায় জানান এবং সাথে শায়খ নূরুদ্দিন শিরাজিকে পাঠান, যাতে তিনি তাঁকে তাঁর দাদার গদিতে সমাসীন করেন এবং সেখানে সুলতানের পক্ষ থেকে বড় এক ভোজের আয়োজন করেন।”
এই ঘটনাটি সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি সবকটি সুফি তরিকাকে তাঁর আনুগত্য ও প্রশাসনের অধীনে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, যদিও তাতে খুব একটা সফল হতে পারছিলেন না। তবে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা তাঁর তদারকিতে চলে আসায় তিনি নতুন আশার আলো দেখতে পান এবং তিনি নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিকে ‘মাশায়িখাত’ বা শায়খের পদে আসীন করেন। সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুলতানের উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হয়েছিল তা বলা কঠিন, তবে বাস্তবে এটি সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ফলে এই তরিকার আধ্যাত্মিক ও সংশোধনমূলক ধারাটি পরিবর্তিত হয়ে অর্থ-সম্পদ, পদমর্যাদা ও ক্ষমতার মোহের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সমসাময়িক কিছু শায়খ এই পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আজকাল আলেম ও শায়খরা সুলতান ও আমিরদের দুয়ারে ঘোরাঘুরি করে নিজেদের অপমানিত করছেন।”
যাই হোক, সুলতানি ছত্রছায়ায় শায়খ হুদকে সোহরাওয়ার্দিয়া খানকাহর দায়িত্ব অর্পণ করা হয় এবং শায়খ রুকনুদ্দিনের সমস্ত সম্পদ, স্থাবর সম্পত্তি, জমি ও গ্রাম তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তগত হয়। কিন্তু সুলতানের সাথে তাঁর এই সুসম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইবনে বতুতা বর্ণনা করেন যে, শায়খ হুদ তাঁর খানকাহতে হয়ে কিছু সহচর নিযুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সিন্ধু অঞ্চলের আমির ‘ইমাদুল মুলক’ সুলতানের কাছে এই মর্মে পত্র লেখেন যে, শায়খ এবং তাঁর পরিবার অর্থ উপার্জনে মগ্ন এবং তাঁরা বিলাসিতায় মত্ত হয়ে সম্পদ অপচয় করছেন, এমনকি খানকাহতে কাউকে খাবারও দিচ্ছেন না।
এর ফলে তাঁদের কাছ থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধারের রাজকীয় আদেশ জারি হয়। ইমাদুল মুলক তাঁদের তলব করেন এবং কাউকে কারারুদ্ধ ও কাউকে মারধর করেন। এভাবে দীর্ঘ সময় তাঁদের কাছ থেকে প্রতিদিন বিশ হাজার দিনার করে আদায় করা হতে থাকে, যতক্ষণ না তাদের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। তল্লাশিতে তাঁদের কাছে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা ও রত্নভাণ্ডার পাওয়া যায়, যার মধ্যে হীরা ও ইয়াকুত খচিত দুটি নেকলেস ছিল; যা সাত হাজার দিনারে বিক্রি করা হয়েছিল (বলা হয় যে এগুলো শায়খ হুদের মেয়ে বা দাসীর ছিল)। যখন পরিস্থিতি শায়খের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তিনি তুর্কিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ধরা পড়েন। ইমাদুল মুলক বিষয়টি সুলতানকে জানালে সুলতান তাঁকে দরবারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। শায়খ যখন সুলতানের সামনে উপস্থিত হলেন, সুলতান তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কোথায় পালিয়ে যেতে চেয়েছিলে?” শাইখ বিভিন্ন অজুহাত দিলেও সুলতান বললেন, “তুমি তুর্কিদের কাছে গিয়ে বলতে চেয়েছিলে যে তুমি শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার বংশধর এবং আমি তোমার সাথে এমন আচরণ করেছি, যাতে তুমি তাদের সাহায্য নিয়ে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারো।” এরপর সুলতানের আদেশে তৎক্ষণাৎ তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়। ভারতের সুফি ইতিহাসে উত্তরাধিকার ও ‘সাজ্জাদানশীন’ হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এটিই ছিল প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।
সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের সাথে সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের সম্পর্ক:
ইতঃপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিগণ দিল্লি সালতানাতের পুরো ইতিহাসজুড়েই সুলতানদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে তাঁরা সুলতানের দাবিগুলো মেনে নিয়েছিলেন এবং রাজধানীসহ সিন্ধু ও মুলতানের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তাঁদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর শায়খ সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী (মাখদুম জাহানিয়া) ভারতের এই পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি হিজাজ সফরে ছিলেন এবং হজ পালন শেষে ভারতে ফিরে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের দরবারে যান। দ্রুতই তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে।
শায়খ মাখদুম জাহানিয়া সুলতান ফিরোজ শাহের আমলে বহুবার দিল্লি সফর করেন। তাঁর শেষ সফরটি ছিল ৭৮৭ হিজরিতে (১৩৫৮ খ্রিষ্টাব্দ), যার এক বছর পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। সুলতান তাঁকে অত্যন্ত রাজকীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানাতেন, রাজপ্রাসাদেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা করতেন এবং নিজেই তাঁকে দেখতে যেতেন। শায়খ একা দরবারে এলেও সুলতান দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানাতেন এবং নিজের পাশে বসাতেন। শায়খ দিল্লিতে থাকাকালীন বহু অভাবী, দরিদ্র ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ তাঁর কাছে আসতো। তাঁর খাদেম তাদের অভাব-অভিযোগের তালিকা তৈরি করতেন এবং সুলতান পরিদর্শনে এলে সেই তালিকা তাঁর সামনে পেশ করা হতো; সুলতান অত্যন্ত আনন্দের সাথে সেই দাবিগুলো পূরণ করতেন।
কিছু সূত্র মতে, শায়খ একবার উচ থেকে দিল্লি সফর করেছিলেন কেবল তাঁর শায়খের এক ছেলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে, যিনি তাঁর বোনদের বিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শায়খ সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার দাপ্তরিক ‘মাশায়িখাত’ বা প্রধানের পদ গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রশাসন তাঁর খানকাহর ব্যয় নির্বাহের জন্য বিভিন্ন গ্রাম ও ভূসম্পত্তি (ওয়াকফ) বরাদ্দ করেছিল। সিন্ধু অঞ্চলে মাখদুম জাহানিয়ার প্রভাব ও কর্তৃত্ব ছিল অসীম। সুলতান তাঁর এই ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক প্রভাবকে বিভিন্ন অমীমাংসিত রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে গুজরাট ও পাঞ্জাব সীমান্তে মঙ্গোলদের সহায়তায় ‘জাম জুনা’ ও ‘বান বাহনিয়া’ যে বিদ্রোহ করেছিলেন, তা দমনে শায়খ মধ্যস্থতা করেন এবং তাঁদের দিল্লি সালতানাতের আনুগত্য মেনে নিতে রাজি করান। এ-ছাড়া জমিদার ও জায়গিরদারদের ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব থাকার কারণে সরকারি ওয়ালি বা গভর্নরগণ খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও তাঁর সাহায্য নিতেন।
এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও শায়খ মাঝে মাঝে সরকারের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতেন। এখানে একটি প্রবল বৈপরীত্য দেখা যায়—তিনি একদিকে রাজতন্ত্রকে ‘যন্ত্রণাদায়ক’ (মুলকান আদুদান) মনে করতেন, আবার অন্যদিকে সুলতান তাঁর ওপর এবং সোহরাওয়ার্দিয়া খানকাহর ওপর অঢেল ধন-সম্পদ ঢেলে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “এই যুগে সুলতানদের খাবার খাওয়া কি জায়েজ?” শায়খ উত্তরে ‘ফাতাওয়া-এ-খানিয়া’র বরাত দিয়ে বলেন যে, সুলতান ও বাদশাহদের খাবার খাওয়া জায়েজ নয়; কারণ অধিকাংশ কর ও ফসল জুলুমের মাধ্যমে আদায় করা হয়; যেমন— বাজারের ট্যাক্স, কসাই, দালাল, উৎসব ও নাচগানের অনুষ্ঠান এবং পান-ফুল বিক্রির ওপর ট্যাক্স। শায়খ তৎকালীন ২৮টিরও বেশি করের উল্লেখ তালিকা উল্লেখ করেন যা জায়েজ ছিল না। সম্ভবত তাঁর এই বক্তব্য সুলতানের কানে পৌঁছেছিল, কারণ পরবর্তীতে সুলতান যেসব কর মওকুফ করেছিলেন, তার অধিকাংশই শায়খের এই তালিকায় ছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সুলতান বাইতুল মাল ও প্রশাসনকে কিতাব ও সুন্নাহ মোতাবেক শরয়ি পদ্ধতিতে কর ব্যবস্থা পরিচালনার নির্দেশ দেন। এ-ছাড়াও সুলতান পূর্ববর্তী সোহরাওয়ার্দিয়া শায়খদের বংশধরদের সরকারি চাকুরি এবং ভূসম্পত্তি দান করে তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সুলতান শাইখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানির পৌত্র শাইখ সদরুদ্দিনকে ‘শাইখুল ইসলাম’ পদে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।[4]
বাংলা ও বিহারে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা:
বাংলা ও বিহার অঞ্চলে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিস্তার ঘটে ‘মানের শরিফ’-এ সুফিদের আগমনের মাধ্যমে। মানের শরিফ হলো ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা জেলার একটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র সুফি তীর্থস্থান। এটি পাটনা থেকে ২৪ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত। মানের শরিফ ধীরে ধীরে এই তরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— মাখদুম ইসরাইল মানেরী, মাখদুম ইসমাইল মানেরী, মাখদুম ইয়াহইয়া মানেরী, মাখদুম শাহাবুদ্দীন পীর জগজোট, মাখদুম সালাহ দরবেশ মানেরী, মাখদুম তাকিউদ্দীন মাহসাওয়ী, মাখদুম আহমদ চিরামপোশ প্রমুখ
বর্তমানেও মানের শরিফ সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশে সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার আবির্ভাব ও খিদমত:
বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই তরিকার প্রথম যে মহান সাধক বাংলাদেশে পদার্পণ করেন, তিনি হলেন শায়খ জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.)। তিনি শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর সরাসরি শিষ্য ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তেরো শতকের শুরুর দিকে রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে তিনি মুলতান ও দিল্লি হয়ে বাংলায় আগমন করেন। তার এই আগমন বঙ্গবিজয়ের অব্যবহিত পর বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
ইসলাম প্রচার ও সামাজিক প্রভাব:
তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থা ছিল জাতিভেদ ও বর্ণবাদের কঠোরতায় জর্জরিত। বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধরা তৎকালীন সমাজপতিদের দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত ও নিপীড়িত ছিল। এমন এক ক্রান্তিকালে শায়খ জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.) ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং মানবিক আদর্শ নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছান। তার চারিত্রিক মাধুর্য এবং ইসলামের উদার নীতিতে মুগ্ধ হয়ে নির্যাতিত মানুষগুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বাংলাদেশে তার অনুসারী ও শিষ্যগণ ‘জলিলিয়া’ বা ‘জালালিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
খানকা ও মানবসেবা:
ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে তিনি বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের পাণ্ডুয়ার নিকটবর্তী দেওতলায় নিজের আস্তানা বা খানকা স্থাপন করেন। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি তিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তার আস্তানার পাশেই ছিল একটি লঙ্গরখানা, যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষ অন্ন পেত। তার নামানুসারে এই পুরো অঞ্চলটি পরবর্তীকালে ‘তাবরিজাবাদ’ নামে পরিচিতি পায়। আজও দেওতলায় তার স্মৃতিবিজড়িত মাজার, মসজিদ ও খানকা বিদ্যমান রয়েছে; যা সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘকাল ধরে ওয়াকফ সম্পত্তি বরাদ্দ রয়েছে।[5]
উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক: হজরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.)
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এঁর তরিকা নিয়ে দুটি মত প্রচলিত। ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থমতে তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী, তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতো পণ্ডিতরা ‘সোহেলে ইয়ামেনি’র বর্ণনাকে সমর্থন করেন, যেখানে তাঁকে সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বলা হয়েছে। তাঁর পীর ও মাতুল সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি (রহ.) ছিলেন এই তরিকার বিশেষ ব্যক্তিত্ব, যাঁর মাধ্যমে মক্কায় সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বিকাশ ঘটেছিল। শৈশব থেকেই তাঁর তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠে শাহজালাল (রহ.) কোরআন, হাদিস, ফিকহের পাশাপাশি ইলমে মারফত বা আধ্যাত্মিক বিদ্যা অর্জন করেন।[6]
তাঁর নামের সাথে যুক্ত ‘মুজাররদ’ শব্দটি তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার সর্বোচ্চ স্তরের পরিচায়ক। সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল গ্রন্থ ‘আওয়ারিফুল মায়ারিফ’ অনুযায়ী মুজাররদ তিনিই, যিনি বাহ্যিকভাবে দুনিয়াবি যাবতীয় মোহ থেকে এবং অভ্যন্তরীণভাবে ইহকাল-পরকালের প্রতিদানের আশা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহমুখী হয়ে যান।[7] এই উচ্চতম আধ্যাত্মিক স্তরে উপনীত হওয়ার কারণেই তিনি আজীবন বিবাহ পরিহার করেছেন, একনাগাড়ে চল্লিশ বছর রোজা রেখেছেন, প্রতি দশদিনে একবার আহার করেছেন এবং রাতজেগে ইবাদতে মগ্ন থেকেছেন।
আধ্যাত্মিক প্রভাব ও কারামত:
তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির নজির সুদূর ইয়ামেন থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। ইয়ামেনের সামন্ত রাজার দেওয়া বিষমিশ্রিত শরবত বিসমিল্লাহ বলে পান করেও তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং রাজা নিজেই মৃত্যুবরণ করেন। দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এঁর পাঠানো খাদিমের হাতে জ্বলন্ত কয়লা তুলার উপর জ্বলতে থাকলেও তুলার একটি অংশও দগ্ধ হয়নি— এ ঘটনা তাঁর আধ্যাত্মিক পরিপক্কতার এক অনন্য নিদর্শন। ইবনে বতুতার বর্ণনায় আরও জানা যায়, শাহজালাল (রহ.) আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় প্রতিদিন ফজরের নামাজ কাবা শরিফে আদায় করতেন এবং প্রতি বছর হজ সম্পাদন করতেন। এই বিশ্বপর্যটক কেবল শাহজালালের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যেই বাংলায় এসেছিলেন, যা তাঁর আধ্যাত্মিক আধিপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ।[8]
খলিফাদের মাধ্যমে বিরাট খেদমত:
তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিখ্যাত ৩৬০ আউলিয়া, যাঁরা তাঁর সাথে বাংলায় এসেছিলেন এবং সশস্ত্র যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। সিলেট বিজয়ের পর এই খলিফারা টিলায় টিলায়, পথেপ্রান্তরে অবস্থান নিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলাম প্রচারে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (রহ.), যিনি একাধারে সফল সেনাপতি ও শাহজালালের সুযোগ্য খলিফা। তরফ বিজয়ের পর শাহজালালের পরামর্শেই তিনি তরফের সিংহাসনে আরোহণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাঁর বিশেষ বারোজন অনুসারী আউলিয়া ঐ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন।[9]
শাহজালাল (রহ.) কাছাড় অঞ্চলে নরবলি প্রথা বন্ধ করার পর বদরপুর, লঙাই, মোবারকপুর, বুন্দাশীল, দেওড়াইল ও মনাঙ্গনসহ বিভিন্ন স্থানে বিশ্বস্ত খলিফাদের শাসনভার দিয়ে আসেন। এভাবে তিনি সিলেটকে কেন্দ্রে রেখে গোটা অঞ্চলে একটি সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। যেন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ। তাঁর এই প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, ব্রিটিশ আমলের প্রারম্ভ পর্যন্ত সিলেটের প্রতিটি নতুন শাসক কার্যভার গ্রহণের আগে তাঁর দরগাহ জিয়ারত করে খানকার শেখের হাতে অভিষিক্ত না হলে জনসাধারণ তাঁকে বৈধ শাসক হিসেবেই মানতো না।[10]
সবশেষে বলা যায়, শাহজালাল (রহ.) কেবল একজন সুফি-দরবেশ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মুজাররদ সাধক, যাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি এবং খলিফাদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিশাল নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলের ইসলামি ইতিহাসকে চিরতরে পাল্টে দিয়েছে।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা তাসাউফের ইতিহাসে একটি সুসংহত, শরিয়তনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক আধ্যাত্মিক ধারা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং তাঁর রচিত ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’ গ্রন্থ তাসাউফের শাস্ত্রীয় বিন্যাসে বিশেষ অবদান রাখে।
পারস্যে সূচনা হলেও ইরাক, সিরিয়া, মরক্কো, ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এ তরিকা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (রহ.) এবং জালালউদ্দীন তাবরেজী (রহ.)-এর মতো মনীষীদের মাধ্যমে এটি দাওয়াহ, মানবসেবা ও নৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইলম ও আমলের সমন্বয়, খিরকা ও সিলসিলাভিত্তিক আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা, এবং সমাজকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য। এই ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী মানহাজই একে ইসলামি আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক স্থায়ী ও সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।