১. মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন, “মানুষ দুনিয়া থেকে চলে গেছে অথচ দুনিয়ার সবচেয়ে মিষ্টি জিনিসটি তারা আস্বাদনই করেনি।”লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, “হে আবু ইয়াহইয়া, সেটি কী?” তিনি বললেন, “আল্লাহর পরিচয় লাভ।”

২. “কোনো সুখ-ভোগই আল্লাহর জিকিরের মতো নয়।”

৩. “যেমন অসুস্থ শরীরে কোনো খাবার, পানীয়, ঘুম বা বিশ্রাম কাজে আসে না; তেমনি হৃদয় যদি দুনিয়ার প্রেমে আসক্ত হয়, তবে উপদেশ-নসিহত তাতে কোনো প্রভাব ফেলে না।”

৪. ইন্তেকালের আগে তিনি বলেছেন,“আমি ইচ্ছে করছি আমার মৃত্যুর পর আমাকে আমার রবের কাছে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হোক, দাস পালিয়ে গেলে যেমন প্রভুর কাছে ফেরত পাঠানো হয়, তেমন অবস্থায় যেন আমি তার কাছে যাই।”

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,“হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি দুনিয়াতে কখনো পেট বা যৌনতার জন্য থাকতে ভালোবাসিনি।”

৫. “যে সঙ্গ থেকে কল্যাণ পাওয়া যায় না, তাকে এড়িয়ে চল। আর যে জ্ঞান কর্মের উদ্দেশ্যে অর্জন করা হয়, তা শিখিয়ে দেয় বিনয়; কিন্তু যে জ্ঞান কর্মহীন উদ্দেশ্যে শিখে, তা বাড়ায় অহংকার।”

৬. “মুমিন ও মুনাফিক কখনো মেলামেশা করবে না, যতক্ষণ না নেকড়ে ও মেষশাবক একত্র হয়।”

৭. “মুমিনের উদাহরণ হলো মুক্তার মতো। যেখানে থাকে, তার সৌন্দর্য সেখানেই থাকে।”

৮. “সৎকর্মশীলরা একে অপরকে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিত— জিহ্বাকে বন্দি রাখা, প্রচুর ইস্তিগফার, এবং নিভৃতচারিতা।”

৯. “প্রত্যেক খতিবের বক্তব্য তার আমলের উপর উপস্থাপন করা হয়। যদি সে সত্যবাদী হয়, তার বক্তব্যও সত্য হয়। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হয়; বারবার কাটা হলে আবার জন্মায়।”

১০. “কোনো ব্যক্তি যদি হারাম থেকে একটি দিরহাম ফেরত দেয়, তবে তা তার জন্য এক লক্ষ দিরহাম দান করার চেয়ে উত্তম।”

১১. “যদি দেখো হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে, শরীর দুর্বল, আর রিজিক কমে গেছে, তবে বুঝে নাও তুমি অপ্রয়োজনীয় কথা বলেছ।”

১২. “আল্লাহর বান্দা হৃদয়ের কঠোরতার চেয়ে বড়ো কোনো শাস্তি পায় না।”

১৩. তিনি কবিতা পাঠ করতেন—

কোথায় সেই বড়ো মানুষ আর তুচ্ছ মানুষ?

কোথায় সেই গর্বিত, শক্তিশালী আর ক্ষমতাবান?

আমি কবরের কাছে গিয়ে ডাক দিলাম —

কোথায় সেই হাজির ডাক শোনার মানুষ?

কোথায় রাজকীয় শাসক?

এক অদৃশ্য কণ্ঠ উত্তর দিল—

সবাই বিলীন হয়ে গেছে, কেউ খবরদাতা নেই।

মাটির কন্যারা (কবর) তাদের ঢেকে রেখেছে।

হে জিজ্ঞাসু, তারা সবাই চলে গেছে, খবরও মরে গেছে।

সেই রূপগুলো বিলীন হয়ে গেছে।

তুমি কি এতে শিক্ষা নেবে না?”

এরপর তিনি বললেন—

ধিক এই দুনিয়া ও তার চাওয়াকে!”

১৪. ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, মালেক ইবনে দিনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন,“মানুষের জন্য এতটুকুই গোনাহ যথেষ্ট যে, সে বিশ্বাসঘাতকদের আমানতদার হয়। আর মানুষের জন্য এতটুকুই মন্দ যথেষ্ট যে, সে নিজে নেককার না হয়েও নেককারদের সমালোচনা করে।”

১৫. “তুমি যদি সত্যবাদী না হও, তবে বৃথা কষ্ট কোরো না।”

১৬. আবু নু’আইম বর্ণনা করেছেন, মালেক ইবনে দিনার বলতেন—“তোমরা দুনিয়া থেকে সাবধান থাকো। কেননা এ দুনিয়া হলো এক জাদুকরী বস্তু, যা আলিমদের হৃদয়কেও মুগ্ধ করে ফেলে।”

১৭. “আলিম যদি নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল না করে, তবে তার উপদেশ মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে না, যেমন শিশিরফোঁটা মসৃণ পাথর থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়।”

১৮. “এক নারীর সন্তানকে বাঘে ধরে নিয়ে গেল। তখন সে একটি লুকমা সদকা করল। ফলে বাঘ তার সন্তানকে ছেড়ে দিল। আর আকাশ থেকে আওয়াজ এলো— ‘এক লুকমার বিনিময়ে এক লুকমা।”২

১৯. “একজন মানুষ সুন্দরী ধনী নারীকে বিয়ে করে, তারপর তার লোভ-চাহিদা পূরণে মগ্ন হয়। অথচ সে যদি কোনো এতিমা-দরিদ্রাকে বিয়ে করত, তাকে পোশাক দিত, তেল মাখাত, তবে তার প্রতিটি কাজে সওয়াব পেত।”

২০. মুসলিম (রহ.) বলেন, মালেক ইবনে দিনার বলতেন—“যখন থেকে আমি মানুষকে চিনেছি, তখন থেকে তাদের প্রশংসায় আমি খুশি হইনি, আবার তাদের নিন্দাতেও কষ্ট পাইনি।”লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “কেন?” তিনি বললেন, “কারণ প্রশংসাকারী অতিরঞ্জিত করে, আবার নিন্দাকারীও অতিরঞ্জিত করে।”

২১. মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আজিজ ইবনে সালমান বলেন, আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, তিনি মালেক ইবনে দিনারকে বলতে শুনেছেন—“আশ্চর্য, যে জানে মৃত্যু তার চূড়ান্ত গন্তব্য, কবর তার আবাসস্থল, সে কীভাবে দুনিয়ায় নিশ্চিন্ত থাকতে পারে? কীভাবে এ দুনিয়ায় তার জীবন মিষ্ট হতে পারে?” এরপর মালেক বিন দিনার এত কেঁদেছিলেন যে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

২২. আবু সামীর (রহ.) থেকে বর্ণিত, মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন—“প্রত্যেক কিছুর একটি বীজ আছে। আর নেক আমলের বীজ হলো দুঃখ। কেউ এ পথে ধৈর্য ধরতে পারে না, যতক্ষণ না আখিরাতের দুঃখ তাকে ঘিরে ধরে। আল্লাহর কসম, কখনো কোনো বান্দার অন্তরে আখিরাতের দুঃখ ও দুনিয়ার আনন্দ একসাথে থাকতে পারে না। এদের একজন অবশ্যই অন্যজনকে বিতাড়িত করে।”

২৩. “আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাঁর দুনিয়ার জিনিসপত্র কমিয়ে দেন, তাঁর দায়-দায়িত্ব হালকা করে দেন এবং বলেন, ‘আমার সামনে থেকে যেয়ো না।’ তখন সে পুরোপুরি তার রবের ইবাদতে মগ্ন অবস্থায় রয়ে যায়। আর যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন তাঁর দিকে দুনিয়ার ভোগবিলাস ঠেলে দেন এবং বলেন, ‘আমার সামনে থেকে দূরে যাও, আমি চাই না তোমাকে আমার সামনে দেখতে।’ তখন তার হৃদয় দুনিয়ার কোনো ভূমি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে ঝুলে থাকে।”

২৪. জাফর (রহ.) বলেন, আমি মালিক ইবনে দিনারকে বলতে শুনেছি,“হৃদয়ে যদি দুঃখ না থাকে তবে তা ধ্বংস হয়ে যায়; যেমন একটি ঘর মানুষহীন হলে ভেঙে পড়ে।”

২৫. “যাদুকরী নারীদের (অলঙ্কারময় কথার) থেকে বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো, কারণ তারা আলেমদের হৃদয়কে মুগ্ধ করে দেয়।”

২৬. যদি জানতাম আমার হৃদয় শহরের আবর্জনার স্তূপে বসলে ঠিক হয়ে যাবে, তবে সেখানেই বসতাম।”

২৭. “আমি চাই যে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাঁর সামনে একটি মাত্র সিজদা করি, তারপর তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন, এবং বলেন, হে মালিক, মাটি হয়ে যা।”

২৮. “তুমি যদি জ্ঞান অর্জন কর আমলের জন্য, তবে জ্ঞান তোমাকে বিনয়ী করবে। কিন্তু যদি জ্ঞান চাও আমল ছাড়া, তবে তা তোমার অহংকার ছাড়া আর কিছু বাড়াবে না।”

২৯. “যদি কারো ইচ্ছে করার অধিকার থাকত, তবে আমি চাইতাম আখিরাতে আমার জন্য খেজুর কাঠের একটি ছোটো ঘর থাকুক, সেখানে আমি পানি পান করব, আর জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাব।”

৩০. তিনি তাঁর জামাতা মুগিরাহ ইবনে হাবিবকে বলতেন,“হে মুগিরাহ, যে বন্ধু বা সঙ্গী থেকে তোমার দ্বীনের কোনো উপকার নেই, তাকে ছেড়ে দাও।”

৩১. “হে আমার ভাইয়েরা, একটা সত্য কথা বলি— যদি প্রস্রাবের প্রয়োজন না থাকত, তবে আমি মসজিদ থেকে বের হতাম না।”

৩২. “আসল আলেম সেই ব্যক্তি, যার ঘরে গেলে যদি তাঁকে নাও পাও, তবুও ঘরের কিছু অবস্থা দেখে তার আখিরাতের প্রস্তুতি বোঝা যায়, যে ঘরে থাকে এক কোণে নামাজের মাদুর, একটি কোরআন আর অজুর পাত্র।”

৩৩. “সৎ লোকদের হৃদয় নেক কাজের উত্তাপে উথলে উঠে আর অসৎ লোকদের হৃদয় পাপের উত্তাপে উথলে উঠে। আল্লাহ তোমাদের দুশ্চিন্তা দেখেন, তাই ভেবে দেখো তোমাদের চিন্তা কী?” ৩