শরিয়তের কঠোর অনুসরণ, নবি করিম ﷺ–এর সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুকরণ এবং অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের সাধনায় তরিকায়ে নকশবন্দিয়া বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে সমাদৃত। এর পথনির্দেশ কেবল আধ্যাত্মিক অনুভূতির উপর নির্ভরশীল নয়; বরং কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধ জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই এর প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটে।

এই তরিকার আধ্যাত্মিক সূত্র সংযুক্ত হয়েছে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সাথে। তাঁর সিদ্দিকিয়াত, গভীর ঈমান এবং রসুলুল্লাহ ﷺ–এর নিকটতম সাহচর্য নকশবন্দিয়া সিলসিলার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তীকালে চতুর্দশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার প্রখ্যাত সুফি-সাধক হজরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সংস্কার, শৃঙ্খলাবদ্ধ সাধনা-পদ্ধতি এবং আধ্যাত্মিক দীক্ষার মাধ্যমে এই তরিকা সুসংগঠিত রূপ লাভ করে ও বিস্তৃত পরিচিতি পায়।

‘নকশবন্দ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো— হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ অঙ্কন করা। আধ্যাত্মিক পরিভাষায় এর তাৎপর্য হলো— আল্লাহর নাম ও মহব্বতকে অন্তরে এমনভাবে প্রোথিত করা, যা কখনও মুছে না যায়। বাহ্যিকভাবে মানুষ দুনিয়াবি কর্মব্যস্ততার মধ্যে থাকলেও অন্তর সদা স্রষ্টার স্মরণে নিমগ্ন থাকে— এই নীরব, গভীর ও অবিচ্ছিন্ন জিকিরই তরিকায়ে নকশবন্দিয়ার মূল দর্শন।

তরিকায়ে নকশবন্দিয়ার আধ্যাত্মিক সূত্র:

এই আধ্যাত্মিক পথের সূচনা জড়িয়ে আছে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিআল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্বে। নকশবন্দিয়ার অনুসারীরা তাঁকেই এই সিলসিলার প্রথম প্রবর্তক মনে করেন। এর মাধ্যমে তারা এই সিলসিলার যোগসূত্র সরাসরি রসুলুল্লাহ ﷺ–এর সঙ্গে স্থাপন করেছেন। কারণ, তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন জ্ঞান ও হেদায়েতের পূর্ণ উত্তরাধিকারী।
রসুলুল্লাহ ﷺ–এর সেই উক্তি এ সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে—
مَا صَبَّ اللَّهُ فِي صَدْرِي شَيْئًا إِلَّا صَبَبْتُهُ فِي صَدْرِ أَبِي بَكْرٍ
“আল্লাহ আমার বক্ষপঞ্জরে যা কিছু ঢেলে দিয়েছেন, আমি তা সবটুকুই আবু বকরের বক্ষে ঢেলে দিয়েছি।”

নকশবন্দিয়া অনুসারীদের মতে, হিজরতের সময় মদিনায় যাওয়ার পথে গুহায় অবস্থানকালে রসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে হজরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে আধ্যাত্মিক জিকির বা ‘জিকিরে খফি’ শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই নিভৃত ও অন্তর্মুখী জিকিরের মাধ্যমে হৃদয়ে আল্লাহর স্মৃতি অঙ্কিত হয় এবং এভাবে আধ্যাত্মিক জীবন চিরস্থায়ী দীপ্তিতে আলোকিত হয়।[1]

নকশবন্দিয়া তরিকার ভিত্তি, নামতত্ত্ব ও বিবর্তন:

নকশবন্দিয়া তরিকা তার নিজস্ব মূলনীতি ও আদর্শের কারণে অন্যান্য সুফিধারার তুলনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এই বিশেষ স্বকীয়তা ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি মূলত চারজন মহান ব্যক্তিত্বের শিক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
১. হজরত সালমান ফারসি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু।
২. হজরত বআবু ইয়াজিদ তাইফুর আল-বিস্তামি (বায়েজিদ বোস্তামী) রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
৩. হজরত আব্দুল খালিক আল-গাজদুওয়ানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
৪. হজরত মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন আল-ওয়াইসি আল-বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, যিনি সুপরিচিত ‘শাহ নকশবন্দ’ নামে।

নকশবন্দিয়া তরিকা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে।

১. সিদ্দিকিয়া:
হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সময় থেকে হজরত আবু ইয়াজিদ বিস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি পর্যন্ত।

২. তাইফুরিয়া:
হজরত আবু ইয়াজিদ বিস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহির যুগ থেকে হজরত আব্দুল খালিক গাজদুওয়ানি রহমাতুল্লাহি আলাইহির যুগ পর্যন্ত। নামটি প্রবর্তকের নাম ‘তাইফুর’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

৩.খা-জাগানিয়া:
হজরত গাজদুওয়ানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে হজরত শাহ নকশবন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি পর্যন্ত। নামকরণ করা হয়েছিল ‘খতম-এ-খাজেগান’ জিকিরের আধিক্যের কারণে।

৪. নকশবন্দিয়া:
হজরত শাহ নকশবন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহির যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই নামের অধীনে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

‘নকশবন্দ’ শব্দের অর্থ:

‘নকশবন্দ’ শব্দটি দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত।
১. নকশ (نقش): অর্থ ছাপ বা মুদ্রণ, যেমন মোম বা অন্য কোনো পৃষ্ঠে সিলমোহরের ছাপ।
২. বন্দ (بند): অর্থ বাঁধা বা স্থায়ী হওয়া, যা কখনো মুছে যায় না।
অতএব, ‘নকশবন্দ’ শব্দের আধ্যাত্মিক অর্থ হলো— হৃদয়ের গভীরে জিকির বা আল্লাহর স্মৃতির স্থায়ী ছাপ। এটি নির্দেশ করে যে, অন্তরের গভীরে আল্লাহর স্মরণ অক্ষয়ভাবে অঙ্কিত হয় এবং আধ্যাত্মিক জীবন চিরস্থায়ী দীপ্তিতে আলোকিত হয়।[2]

নকশবন্দিয়া তরিকার বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতি:

নকশবন্দিয়া  তরিকা একজন মুরিদকে আল্লাহর একত্ববাদের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর সবচেয়ে নিকটতম ও সহজ পথ। এটি সাহাবাদের অনুসৃত আদি পথ, যেখানে কোনো নতুনত্ব সংযোজন বা মৌলিকত্বের ক্ষয় নেই। তরিকা বাহ্যিক ও অন্তর্মুখী উভয়ভাবে আল্লাহর পূর্ণ দাসত্ব (উবুদিয়াত) অর্জন এবং নবি করিম ﷺ–এর সুন্নতের আদর্শ মেনে চলার ওপর জোর দেয়।

প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য:

১. সংকল্পের দৃঢ়তা (আজিমত): প্রতিটি কাজ, বিশ্রাম ও দৈনন্দিন আচরণ ইসলামের আদর্শ ও দৃঢ় সংকল্পে পরিচালিত হয়।
২. বিচ্যুতিমুক্ত সাধনা: বিদআত, চারিত্রিক বিচ্যুতি, অযথা আধ্যাত্মিক প্রলাপ বা লোকদেখানো কার্যক্রম থেকে মুক্ত।
৩. পরিমিতিবোধ: অতিরিক্ত ক্ষুধা বা অনিদ্রা নয়; মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য বজায় থাকে।

মূলনীতি:

১. ঈমানের পূর্ণতা অর্জন। মুরিদকে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস, তাঁর রসুল ﷺ এবং রসুলের আনা সবকিছুর প্রতি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। এই বিশ্বাসের আলোকবর্তিকা মুরিদের সমস্ত কর্ম ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে প্রতিফলিত হতে হবে।

২. ইসলামের পূর্ণতা অর্জন। মুরিদকে ইসলামের সমস্ত হুকুম মেনে চলতে হবে এবং বাহ্যিক ও অন্তর্মুখীভাবে নিজের দুর্বলতা, অক্ষমতা, বিনয়, নম্রতা ও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ প্রকাশ করতে হবে। ইসলামের পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হয় যখন মুরিদ নিজস্ব প্রলুব্ধি ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, নবি করিম ﷺ–এর সুন্নত অনুসরণ করে, দৃঢ় সংকল্প পালন করে এবং সহজ পথ বা ছাড়পত্র (রুখসত) এড়িয়ে চলে।

৩. ইহসানের পূর্ণতা অর্জন। ইহসান হলো ইবাদত বা আমলকে সব ধরনের বিনিময়-আকাঙ্ক্ষা, পার্থিব উদ্দেশ্য কিংবা লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া) থেকে পবিত্র করা। এক কথায় এটিই হলো ‘ইখলাস’। অর্থাৎ, প্রতিটি কাজ হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে। নকশবন্দিয়ার মতে, ইহসান অর্জিত হয় আলোকদৃষ্টি দ্বারা সর্বসত্ত্বার দর্শন (حضرة الألوهية) উপলব্ধির মাধ্যমে। এই ইহসান দীর্ঘস্থায়ী দাসত্ব নিশ্চিত করে, যার ফলে মুরিদের হৃদয় চিরস্থায়ীভাবে আল্লাহর উপস্থিতিতে অবস্থান করে, কোনো অন্য কিছুর আকর্ষণে বিভ্রান্ত হয় না।

নকশবন্দিয়া তরিকার মৌলিক পরিভাষাসমূহ:

নকশবন্দিয়া তরিকার মূল ভিত্তি হিসেবে হজরত আব্দুল খালিক আল-গাজদুওয়ানি (রহ.) এবং শাহ নকশবন্দ (রহ.) কয়েকটি বিশেষ ফারসি পরিভাষা নির্ধারণ করেছেন। এই পরিভাষাগুলো এই আধ্যাত্মিক পথের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত।

ক. উকুফে জামানি (وقوف زماني) — সময়ের সচেতনতা

এর অর্থ হলো— মুরিদ বা আধ্যাত্মিক পথযাত্রী তার প্রতিটি মুহূর্ত বা সময়ের অতিবাহিত হওয়ার বিষয়ে পূর্ণ সচেতন থাকবেন। তিনি সর্বদা নিজের অবস্থার ওপর নজর রাখবেন। যদি সময়টি আল্লাহর স্মরণে কাটে, তবে তার জন্য তিনি শোকরগুজার হবেন। আর যদি সময়টি অবহেলা বা গাফিলতিতে কাটে, তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

শাহ নকশবন্দ (রহ.)-এর ভাষায়, “উকুফে জামানি হলো নিজের অবস্থার ওপর সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা। যদি তোমার কাজ শরিয়তসম্মত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুকূলে হয়, তবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো; অন্যথায় তওবা ও ইস্তিগফার করো।” এক কথায়, সালিক বা আধ্যাত্মিক পথযাত্রীকে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে হবে যে, মহান আল্লাহ তাকে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং তার প্রতিটি নড়াচড়া ও স্থিরতা আল্লাহর কাছে হিসাবভুক্ত হচ্ছে।

খ. উকুফে আদাদি (وقوف عددي) — সংখ্যার সচেতনতা।

জিকির করার সময় সংখ্যার প্রতি মনোযোগ বজায় রাখাকে ‘উকুফে আদাদি’ বলা হয়। এটি মূলত মুরিদের একাগ্রতা বৃদ্ধির একটি কৌশল। নকশবন্দিয়া বুজুর্গদের মতে, এটিই হলো ‘ইলমে লাদুন্নি’ বা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিশেষ জ্ঞান অর্জনের প্রথম সোপান।

গ. উকুফে কলবি (وقوف قلبي) — হৃদয়ের অভিনিবেশ।

এর অর্থ হলো— জিকিরকারীর অন্তর সর্বদা ‘মজকুর’ বা যাঁর জিকির করা হচ্ছে (আল্লাহ তায়ালা), তাঁর দিকে নিবিষ্ট রাখা। জিকির করার সময় অন্তর যেন এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহ থেকে বিচ্যুত না হয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টির (গাইরুল্লাহ) দিকে ধাবিত না হয়। এটি মূলত হৃদয়ের সার্বক্ষণিক পাহারাদারি বা মোরাকাবা।

ঘ. নজর বর কদম (نظر بر قدم) — চলনে দৃষ্টির সংযম।

এর আভিধানিক অর্থ হলো ‘পায়ে দৃষ্টি রাখা’। আধ্যাত্মিক সাধকদের মতে, পথ চলার সময় সালিক বা মুরিদের দৃষ্টি থাকবে সর্বদা নিজের পায়ের দিকে, যত্রতত্র দিগন্তের পানে নয়। এর পেছনে দুটি গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে।

১. অন্তরের একাগ্রতা: এদিক-ওদিক তাকালে হৃদয়ে অহেতুক চিন্তার পর্দা (হিজাব) পড়ে, যা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করে।

২. বিনয় অর্জন: দৃষ্টি নিচু রাখা বিনয় ও নম্রতার প্রতীক; কেননা অহঙ্কারী ও দাম্ভিকরা কখনোই নিজেদের পায়ের দিকে তাকিয়ে চলে না। এ-ছাড়া এটি হাঁটার ক্ষেত্রে রসুলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ।

ঙ. হুশ দর দম (هوش در دم) — প্রতি শ্বাসে সজাগ থাকা।

ফারসিতে ‘হুশ’ মানে বুদ্ধি বা চেতনা, ‘দর’ মানে ভেতরে এবং ‘দম’ মানে শ্বাস। অর্থাৎ, একজন বুদ্ধিমান আধ্যাত্মিক পথযাত্রীর উচিত প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় গাফিলতি বা অসচেতনতা থেকে বেঁচে থাকা।

আল্লাহর সান্নিধ্য: প্রতিটি নিশ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার সময় যেন অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি (হুজুর) বজায় থাকে। শাহ নকশবন্দ (রহ.) বলেন, “এই পথের ভিত্তিই হলো শ্বাস-প্রশ্বাস। সুতরাং, শ্বাস গ্রহণ এবং ত্যাগের সময় তোমাকে সজাগ থাকতে হবে; এমনকি দুই শ্বাসের মধ্যবর্তী সময়েও যেন সচেতনতা বজায় থাকে।”

চ. সফর দর তন (سفر در وطن) — স্বদেশে পরিভ্রমণ।

এর গূঢ় অর্থ হলো— সৃষ্টিজগত বা লোকালয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ‘হক’ বা পরম সত্য আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। নকশবন্দিয়া তরিকায় সফরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১. জাহেরি বা বাহ্যিক সফর: একজন কামেল মুরশিদ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের সন্ধানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে হিজরত করা।

২. বাতেনি বা অভ্যন্তরীণ সফর: নিজের কুপ্রবৃত্তি ও নফসের লালসা ত্যাগ করা। অর্থাৎ, নিজের হীন ও মন্দ চরিত্রগুলো বর্জন করে প্রশংসনীয় ও মহৎ গুণাবলি অর্জনের পথে যাত্রা করা।

ছ. খলওয়াত দর আঞ্জুমান (خلوة در انجمن) — জনারণ্যে নির্জনতা।

‘আঞ্জুমান’ শব্দের অর্থ জনসমাবেশ বা লোকালয়। অর্থাৎ, লোকালয়ে থেকেও নির্জনতার স্বাদ আস্বাদন করা।

জ. ইয়াদ করদ (یاد کرد) — জিকির বা স্মরণ।

‘ইয়াদ’ শব্দের অর্থ হলো স্মরণ বা জিকির। এর মাধ্যমে মুরিদ প্রতিদিন কয়েক হাজার বার ‘নফি-এসবাত’ (অর্থাৎ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) জিকির করেন। নকশবন্দিয়া তরিকার জিকিরের বিশেষ পদ্ধতি হলো—

১. শারীরিক ভঙ্গি: জিকিরকারী চোখ বন্ধ করবেন, মুখ বন্ধ রাখবেন, দাঁতের ওপর দাঁত রাখবেন এবং জিহ্বা তালুর সাথে লাগিয়ে দেবেন।
২. শ্বাস নিয়ন্ত্রণ: শ্বাস বন্ধ করে (হাবসে দম) জিহ্বার বদলে অন্তরের মাধ্যমে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির করবেন।
৩. সমাপ্তি: এরপর হৃদয়ের ভেতরেই ‘মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ বলবেন। নিজের শ্বাস ধরে রাখার ক্ষমতা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া বারবার পুনরাবৃত্তি করবেন।

ঝ. বাজগশত (بازگشت) — প্রত্যাবর্তন।

বাজ শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। জিকিরের সময় সালিক বা পথযাত্রী নিজের মনে এই বাক্যটি স্মরণ করবেন—

إِلَهِي أَنْتَ مَقْصُودِي وَرِضَاكَ مَطْلُوبِي – হে আল্লাহ, আপনিই আমার উদ্দেশ্য এবং আপনার সন্তুষ্টিই আমার একমাত্র কাম্য।

এটি মূলত বিশুদ্ধ তাওহিদের বহিঃপ্রকাশ। একজন সালিক যখন শুরুতে এটি বলেন, তখন তিনি তাঁর মুরশিদের অনুকরণে (তাকলিদ) বলেন; কিন্তু সাধনার মাধ্যমে পরবর্তীতে তিনি এর প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের ত্রুটি স্বীকার করা এবং আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করা যে, “হে পরম সত্তা, আপনার জিকির করার যে হক, তা আমি আদায় করতে পারিনি।”

ঞ. নিগাহ দশত (نگاه دشت) — অন্তরের পাহারাদারি।

নিগাহ মানে দৃষ্টি বা সংরক্ষণ। জিকির করার সময় অন্তরকে সব ধরনের কুচিন্তা বা অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা থেকে রক্ষা করাই হলো নিগাহ দশত। নকশবন্দিয়া বুজুর্গদের মতে, যে ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজের অন্তরকে বাইরের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে পারে না, সে প্রকৃত সুফি হতে পারে না। কুচিন্তা সবার অন্তরেই আসে, কিন্তু সসুফিদের অন্তরে তা স্থায়ী হতে পারে না, দ্রুত চলে যায়।

শাহ নকশবন্দ (রহ.)-এর মতে কুচিন্তা তাড়ানোর তিনটি স্তর।

১. উচ্চ স্তর: চিন্তা অন্তরে পৌঁছানোর আগেই তা টের পাওয়া এবং প্রতিহত করা।
২. মধ্যম স্তর: চিন্তা অন্তরে প্রবেশ করার পর তা স্থায়ী হওয়ার আগেই তাড়িয়ে দেওয়া।
৩. নিম্ন স্তর: চিন্তা অন্তরে গেঁথে যাওয়ার পর তা তাড়ানোর চেষ্টা করা। (এটি খুব একটা ফলপ্রসূ হয় না, তবে সালিক যদি এর উৎস ও কারণ বুঝতে পারেন, তবে কিছুটা উপকার হতে পারে।)

ট. ইয়াদ দশত (یاد داشت) — অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি।

‘ইয়াদ দশত’ হলো আধ্যাত্মিক সাধনার সেই চরম শিখর, যেখানে মুরিদ বা সালিকের হৃদয় সর্বদা ‘মজকুর’ বা মহান আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকে। এর গভীর অর্থ হলো— যাতে একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর অস্তিত্বের প্রত্যক্ষ অনুভূতি বা ‘মুশাহাদাহ’ অর্জিত হয়।[3]

নকশবন্দিয়া তরিকার সিলসিলা/শাজরা:

১. সাইয়্যেদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
২. হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)।
৪. হজরত ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)।
৫. হজরত আবু ইয়াজিদ (বায়েজিদ) বিস্তামি (রহ.)।
৬. হজরত আবুল হাসান খারকানি (রহ.)।
৭. হজরত আবু আলী ফারমাদি (রহ.)।
৮. হজরত ইউসুফ হামদানি (রহ.)।
৯. হজরত আব্দুল খালিক গাজদুওয়ানি (রহ.)।
১০. হজরত আরিফ রিউগারি (রহ.)।
১১. হজরত মাহমুদ আনজির ফাগনাভি (রহ.)।
১২. হজরত আজিজান আলী রামীতানি (রহ.)।
১৩. হজরত মুহাম্মদ বাবা সামমাসি (রহ.)।
১৪. হজরত আমির কুলাল (রহ.)।
১৫. হজরত শাহ মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)।[4]

মুসলিম বিশ্বে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রধান ব্যক্তিত্বগণ

আরব উপদ্বীপ (মক্কা ও মদিনা)

১. আহমদ বিন ইব্রাহিম বিন আল্লান সিদ্দিকী শাফেয়ী নকশবন্দি (র.)  (৯৭৫–১০৩৩ হিজরি / ১৫৬৭–১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি পবিত্র মক্কার একজন অত্যন্ত সম্মানিত আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু উভয়ই মক্কায়।

২. আহমদ বিন মুহাম্মদ মারুফ বিন আহমদ আল-হুসাইনি (র.) (‘কারকুক’ নামে পরিচিত)

তিনি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দিয়া শায়খ এবং আলেম ছিলেন।

৩. ইসমাইল বিন আব্দুল্লাহ আল-উসকুদারি নকশবন্দি হানাফি (র.)  (মৃত্যু: ১১৮২ হিজরি / ১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের উসকুদার থেকে হিজরত করে মদিনা মুনাওয়ারায় চলে যান এবং সেখানে পবিত্র রওজা শরীফের প্রতিবেশী (মুজাবির) হিসেবে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

৪. জাফর বা-আবুদ বিন সাদিক আল-আলাউয়ি (র.) (‘শায়খ সুফি নকশবন্দি’ উপাধিতে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৭০ হিজরি / ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার একজন উচ্চপদস্থ সাধক ও গবেষক ছিলেন। তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় বসবাস করতেন এবং ১১৭০ হিজরি সালে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

৫. তাজউদ্দীন বিন জাকারিয়া বিন সুলতান আল-উসমানি আল-হিন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১০৫০ হিজরি / ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত ভারতের অধিবাসী ছিলেন, তবে তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ মক্কা শরীফে অতিবাহিত হয়েছে।

৬. জাকারিয়া আল-উসমানি নকশবন্দি (র.) (‘তাজুদ্দিন’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১০০০ হিজরি / ১৫৯১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মক্কাতুল মোকাররমায় বসবাসকারী একজন বিশিষ্ট নকশবন্দী আলেম ছিলেন।

৭. মাহমুদ বিন আল-হুসাইন আল-আফজালি (র.) (‘সাদিকি আল-কিলানি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৯৭০ হিজরি / ১৫৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার একজন প্রখ্যাত আলেম এবং মুফাসসির ছিলেন। জীবনের শেষভাগে তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থান করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

৮. মুহাম্মদ আশরাফ বিন মির আবিল বারাকা আল-বুখারি (র.) (‘একনা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৭৩ হিজরি / ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার বুখারা অঞ্চলের অধিবাসী হলেও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পবিত্র মক্কায় অবস্থান করেন। তিনি তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

৯. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন মাহমুদ আল-হাফিজি আল-বুখারি (র.) (‘খাজা পারসা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৮২২ হিজরি / ১৪১৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং শাহ নকশবন্দ (র.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় খলিফা ছিলেন। হজের সফরে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত হন।

১০. আলী বিন ইব্রাহিম আল-শিরওয়ানি নকশবন্দি (র.) (‘জুহরি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১১৮ হিজরি / ১৭০৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত আজারবাইজানের শিরওয়ান অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

১১. আহমদ নকশবন্দি রুমি (র.) (‘আক ওওলি’ নামে পরিচিত)

তিনি প্রথমে জ্ঞান অর্জনের জন্য মিশর সফর করেন এবং পরবর্তীতে মক্কায় গিয়ে স্থায়ী হন।

১২. সিবগাতুল্লাহ বিন রুহুল্লাহ আল-বুরুজি আল-হুসাইনি নকশবন্দি (র.)  (জন্ম: ভারতের বুরুজ — মৃত্যু: ১০১৫ হিজরি / ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারতের গুজরাট অঞ্চলের বুরুজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১০০৫ হিজরিতে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং সেখানে আমৃত্যু দরস-তাদরিস এবং মুরিদদের আত্মিক সংশোধনে নিয়োজিত ছিলেন।

১৩. আব্দুল খালিক বিন আলী আল-মাজজাজি আজ-জাবিদি (র.)  (১১০০–১১৮১ হিজরি / ১৬৮৯–১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইয়েমেনের জাবিদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং মক্কাতুল মোকাররমায় ইন্তেকাল করেন। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত ক্বারী এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে দক্ষ আলেম ছিলেন।

১৪. ইব্রাহিম বিন হাসান আল-কুরানি শাহরাজুরি শাফেয়ী নকশবন্দি (রহ.)

তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং মদিনা শরিফের অন্যতম প্রধান আলেম। তিনি পবিত্র মদিনা নগরীতে বসতি স্থাপন করেন এবং আমৃত্যু সেখানে ‘মুজাবির’ হিসেবে অবস্থান করেন। তিনি অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন।

১৫. মুহাম্মদ আবিদ বিন আহমদ আস-সিন্ধি আল-আনসারি (র.)  (১১৯০–১২৫৭ হিজরি / ১৭৭৬–১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের সিন্ধু প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে মদিনা মুনাওয়ারায় স্থায়ীভাবে বসবাস করায় ‘মাদানি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহ ছিলেন।

সিরিয়া (দামেস্ক ও আলেপ্পো)

১. ইব্রাহিম বিন আবুল খায়ের আল-গালায়িনি নকশবন্দি খালিদি (রহ.)

তিনি ছিলেন সিরিয়ার দামেস্কের একজন প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক।

২. আবু বকর বিন আহমদ (র.)

তিনি কুর্দি বংশোদ্ভূত একজন মহান আলেম ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে সিরিয়ার দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

৩. আব্দুল জাওয়াদ বিন আহমদ আস-সারমিনি আল-হালাবি (র.)  (১১০৯–১১৯২ হিজরি / ১৬৯৭–১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার সারমিন নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি আলেপ্পোতে (হালাব) বসবাস শুরু করেন।

৪. আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ সাঈদ আল-বুরহানি আদ-দাগিস্তানি (র.)  (জন্ম: ১২৭৭ হিজরি / ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার দামেস্কে জন্মগ্রহণকারী একজন প্রখ্যাত নকশবন্দিয়া আলেম।

৫. আব্দুল মাজিদ মুহাম্মদ আল-খানি (র.)  (১২৬৩–১৩১৮ হিজরি / ১৮৪৭–১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার দামেস্কে এক ঐতিহ্যবাহী আলেম ও নকশবন্দি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

৬. আলী বিন মুহাম্মদ বিন মুরাদ আল-মুরাদি (র.)  (১১৩২–১১৮৪ হিজরি / ১৭২০–১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত বুখারার বংশোদ্ভূত হলেও দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তিনি তৎকালীন দামেস্কের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম ছিলেন।

৭. আব্দুল গনি বিন ইসমাইল আন-নাবলুসি (র.)  (১০৫১–১১৪৩ হিজরি / ১৬৪১–১৭৩১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি-সাধক, গবেষক এবং বহু শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি একাধারে নকশবন্দিয়া ও কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী ছিলেন।

৮. হাসান বিন মুস্তফা আল-বাগদাদী আল-কাদরি নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১১৮২ হিজরি / ১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত বাগদাদের অধিবাসী ছিলেন, তবে পরবর্তী জীবনে সিরিয়ার দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

৯. মুহাম্মদ আবু নাসর খালাফ আল-জুন্দি আল-হিমসি (র.)  (১২৯২–১৩৬৮ হিজরি / ১৮৭৫–১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার হিমস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সিরিয়ার নকশবন্দি তরিকার অন্যতম কান্ডারি ছিলেন।

১০. মুহাম্মদ আস’আদ সাহিব বিন মাহমুদ আস-সাহিব (র.)  (১২৭১–১৩৪৭ হিজরি / ১৮৫৫–১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত ইরাকের শাহরাজুর অঞ্চলের কুর্দি বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবে তাঁর পরিবার সিরিয়ার দামেস্কে হিজরত করে এবং সেখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

১১. মুহাম্মদ আল-হামিদ (র.)  (১৩২৮–১৩৯৯ হিজরি / ১৯১০–১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার হামাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম ও সাধনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১২. মুহাম্মদ বিন খলিল বিন আলী আল-মুরাদি (র.)  (১১৭৩–১২০৬ হিজরি / ১৭৬০–১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত মধ্য এশিয়ার বুখারা বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিরিয়ার দামেস্কে। তিনি তাঁর সময়ের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, ফকিহ এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

১৩. মুহাম্মদ সাঈদ বিন আহমদ আস-সুওয়াইদি (র.)  (মৃত্যু: ১২৪৬ হিজরি / ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ)

বাগদাদের বিখ্যাত সুওয়াইদি আলেম পরিবারের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং হাদিস শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ।

১৪. মুহাম্মদ সাঈদ বিন আব্দুর রহমান আল-বুরহানি (র.)  (১৩১১–১৩৮৬ হিজরি / ১৮৯৪–১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার দামেস্কের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম এবং নকশবন্দি তরিকার অন্যতম কান্ডারি ছিলেন।

১৫. মুহাম্মদ সেলিম বিন খালাফ আল-জুন্দি আল-হুসাইনি (র.)  (১২৩২–১৩২৪ হিজরি / ১৮১৬–১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার হিমস শহরের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং নকশবন্দি তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক ছিলেন।

১৬. মুহাম্মদ সেলিম আল-মুরাদ (র.)

তিনি সিরিয়ার হামাহ শহরের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

১৭. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন মোস্তফা আল-খানি (র.)  (১২১৩–১২৭৯ হিজরি / ১৭৯৮–১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার বিখ্যাত ‘খানি’ পরিবারের সদস্য এবং নকশবন্দি তরিকার অন্যতম প্রধান ইতিহাসবিদ।

১৮. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খানি (র.)  (১২৪৭–১৩১৬ হিজরি / ১৮৩১–১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার বিখ্যাত ‘খানি’ পরিবারের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং দামেস্কের প্রখ্যাত নকশবন্দি শায়খ ছিলেন।

১৯. মুহাম্মদ বিন মোস্তফা কামাল উদ্দিন আস-সিদ্দিকি আদ-দামেশকি (র.) (‘আল-গাজ্জি’ নামে পরিচিত)  (১১৪৩–১১৯৬ হিজরি / ১৭৩০–১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ফিলিস্তিনের গাজায় জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

২০. মুরাদ বিন আলী আল-হুসাইনি আল-বুখারি (র.)  (১০৫০–১১৩২ হিজরি / ১৬৪০–১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি দামেস্কের বিখ্যাত ‘আল-মুরাদি’ পরিবারের আদি পুরুষ। তিনি মধ্য এশিয়ার সমরকন্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার সন্ধানে বিশ্বভ্রমণ করেন।

২১. ঈসা বিন শামসুদ্দিন আল-কুর্দি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৩২ হিজরি / ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের দিয়ারবাকর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে সিরিয়ার দামেস্কে স্থায়ী হন।

২২. মুহাম্মদ জুলফিকার (র.)  (বিংশ শতাব্দীর নকশবন্দি সাধক)

তিনি মূলত কুর্দি বংশোদ্ভূত ছিলেন। দামেস্কের নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে তাঁর জন্ম এবং সেখানেই তিনি দামেস্কের প্রখ্যাত নকশবন্দি মাশায়েখদের নিকট থেকে তরিকার দীক্ষা ও খেলাফত লাভ করেন।

২৩. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর আল-হানাফি (র.) (‘ইবনে তিলু’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১২৮২ হিজরি / ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার দামেস্কের একজন প্রখ্যাত হানাফি আলেম এবং নকশবন্দি তরিকার একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।

২৪. মুহাম্মদ বিন মুরাদ বিন আলী আল-মুরাদি আল-হুসাইনি (র.)  (১০৯৪–১১৬৯ হিজরি / ১৬৮৩–১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তাঁর পূর্বপুরুষগণ বুখারার অধিবাসী ছিলেন, তবে তাঁর জন্ম কনস্টান্টিনোপলে (ইস্তাম্বুল) এবং ইন্তেকাল সিরিয়ার দামেস্কে।

২৫. মুহাম্মদ খায়ের বিন মুহাম্মদ আবু খায়ের আল-মাইদানি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৮০ হিজরি / ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি সিরিয়ার দামেস্কের একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান নকশবন্দি আলেম ও শিক্ষক ছিলেন।

তুরস্ক (আনাতোলিয়া ও ইস্তাম্বুল)

১. আহমদ হিজাবি বিন আহমদ সিয়াহি আল-কাস্তামুনি (র.)  (মৃত্যু: ১৩০৬ হিজরি / ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের কাস্তামুনু অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। হানাফি মাজহাবের অনুসারী এই সাধক ‘রুমি’ বা তুর্কি নকশবন্দিয়া ধারার একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন।

২. আহমদ আস-সাক্কাত আস-সিনুবি (র.)  (মৃত্যু: ১১৯৩ হিজরি / ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তুরস্কের সিনোপ (Sinop) অঞ্চলের এই সাধক একজন উচ্চপদস্থ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

৩. আহমদ আল-তারাবজুনী নকশবন্দি (র.) (‘আল-কাওসাজ’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৯৫ হিজরি / ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের তারাবজুন (Trabzon) অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আলেম ও সাধক ছিলেন।

৪. আহমদ বিন মুস্তফা আল-কুমুশখনাউয়ি (র.)  (১২২৭–১৩১১ হিজরি / ১৮১২–১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ছিলেন নকশবন্দিয়া তরিকার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী শায়খ, সমাজসংস্কারক এবং উচ্চপদস্থ আলেম। তিনি তুরস্কের ত্রাবজুন প্রদেশের কুমুশখনে অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইস্তাম্বুলে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

৫. আহমদ বিন মুস্তফা আল-কাদিন খানি আল-রুমি (র.)

তিনি তুরস্কের কোনিয়া অঞ্চলের নকশবন্দিয়া তরিকার অন্যতম প্রধান খলিফা ছিলেন।

৬. আহমদ বিন মুস্তফা আল-কুনোভি নকশবন্দি (র.) (‘সাদি’ নামে পরিচিত)

তিনি তুরস্কের আদরেমিদ (Edremit) অঞ্চলের মুফতি ছিলেন।

৭. আতাউল্লাহ চেলবি আল-রুমি (র.) (‘আতাঈ আল-উসকুবি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৯৩০ হিজরি / ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ার স্কোপজে (উসকুব) অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন এবং অটোমান যুগের একজন বিশিষ্ট নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

৮. ইসমাইল মুফিদ বিন আলী আল-আত্তার আল-রুমি নকশবন্দি হানাফি (র.)  (১১৩২–১২১৭ হিজরি / ১৭২০–১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি একাধারে মণীষী, সাহিত্যিক এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার বা লিপিকার ছিলেন।

৯. উসমান বিন সানাদ আল-নাজদি আল-ওয়ায়েলি আল-বাসরি (র.)  (১১৮০–১২৪২ হিজরি / ১৭৬৬–১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি আরবের উনাইজা গোত্রের সন্তান ছিলেন। নজদে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয়েছে বসরা ও বাগদাদে।

১০. উসমান সিদকি বিন উমর আল-জুরুমি আল-রুমি (র.)  (মৃত্যু: ১২৯৬ হিজরি / ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের একজন বিশিষ্ট আলেম এবং ভাষাবিদ ছিলেন।

১১. উসমান বিন আব্দুল মান্নান নকশবন্দি আস-সানদুকুলি (র.)  (মৃত্যু: ১৩০১ হিজরি / ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের ইজমির প্রদেশের সানদুকুলি অঞ্চলে পরিচিত ছিলেন, তবে পরবর্তী জীবনে ‘দাগিজলি’ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

১২. উসমান বিন আলী আল-মুদুরনাবি আল-রুমি (র.)  (মৃত্যু: ১২১১ হিজরি / ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তুরস্কের মুদুরনু অঞ্চলের এই নকশবন্দি আলেম একাধারে ফিকহ, তাফসির এবং তাসাউফে দক্ষ ছিলেন।

১৩. সাইদ আল-কুর্দি নকশবন্দি (র.) (‘শায়খ সাইদ পীরান’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১৩৪৪ হিজরি / জুন ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের কুর্দি জনগণের মধ্যে নকশবন্দী তরিকা প্রচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৪. সুলাইমান বিন হাসান আল-কুসতিনদিলি আল-রুমি (র.) (‘শায়খী’ নামে পরিচিত)  (১১৪৩–১২৩৪ হিজরি / ১৭৩০–১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের একজন অত্যন্ত উর্বর মস্তিষ্কের লেখক এবং নকশবন্দিয়া তরিকার বিশিষ্ট শায়খ ছিলেন।

১৫. সালেহ বিন আব্দুল্লাহ আল-রুমি নকশবন্দি (র.) (‘আফিফ আল-ইস্তাম্বুলি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১২২৭ হিজরি / ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণকারী একজন বহুমুখী প্রতিভাধর আলেম ছিলেন। তিনি কেবল আধ্যাত্মিকতায় নয়, বরং জাগতিক বিজ্ঞানেও পারদর্শী ছিলেন।

১৬. হামিদ বিন ইউসুফ বিন হামিদ আল-বান্দারমাউয়ি রুমি (র.)  (মৃত্যু: ১১৭২ হিজরি / ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের বান্দারমা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আলেম ও নকশবন্দিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১৭. মুহাম্মদ মুরাদ বিন আব্দুল হালিম আর-রুমি (র.)  (১২০৩–১২৬৪ হিজরি / ১৭৮৮–১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণ করেন এবং উসমানি আমলের একজন প্রতিভাবান আলেম ও নকশবন্দি শায়খ ছিলেন।

১৮. মুহাম্মদ মুরাদ বিন আলী আল-কাশ্মীরি আল-বুখারি (র.)  (১০৫৭–১১৩২ হিজরি / ১৬৪৭–১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারতের কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি দামেস্ক হয়ে ইস্তাম্বুলে গমন করেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস ও ইন্তেকাল করেন।

১৯. মুহাম্মদ আস’আদ বিন আলী আল-বানিয়াভি আল-রুমি (র.)  (মৃত্যু: ১১৪৩ হিজরি / ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ছিলেন, যিনি হিকমত (দর্শন), যুক্তিবিদ্যা এবং ভাষা বিজ্ঞানে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন।

২০. মাহমুদ বিন হুসামুদ্দিন আল-আলাসি (র.)  (মৃত্যু: ৯৩৯ হিজরি / ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি উসমানি আমলের একজন উচ্চপদস্থ নকশবন্দি আলেম এবং লেখক ছিলেন।

২১. মাহমুদ বিন আব্দুল্লাহ আল-আমিদি (র.) (‘আহিক পাশা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১০৭৭ হিজরি / ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের তুরস্কের একজন বিজ্ঞ আলেম এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন। তুরস্কের বুর্সা শহরে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক খেদমত পরিচালনা করেন।

২২. মোস্তফা বিন ইব্রাহিম আল-গ্যালিবুলি (র.)  (মৃত্যু: ১১৭৬ হিজরি / ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের গ্যালিবোলি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

২৩. মোস্তফা রুশদি আল-কুতাহিয়াবি (র.) (‘সাফি’ নামে পরিচিত)  (জীবিত ছিলেন: ১২৬৭ হিজরি / ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের কুতাহিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

২৪. মোস্তফা বিন আব্দুল্লাহ আল-খারবুতি (র.)  (মৃত্যু: ১২৮৪ হিজরি / ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের খারবুত অঞ্চল থেকে এসে ইস্তাম্বুলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত ‘ইয়াহইয়া নকশবন্দি’ খানকাহর প্রধান শায়খ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২৫. মোস্তফা আসিম মাক্কি (র.)  (মৃত্যু: ১২৬২ হিজরি / ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেম ছিলেন এবং ইস্তাম্বুলের ‘শায়খুল ইসলাম’ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

২৬. মোস্তফা বিন আলী আর-রুমি (র.) (‘খারজাদা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৫৯ হিজরি / ১৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ‘বেশিকতাস’ খানকাহর প্রধান শায়খ ছিলেন। তিনি তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের ওপর অনেকগুলো মূল্যবান কিতাব লিখেছেন।

২৭. মোস্তফা বিন মুহাম্মদ আর-রুমি (র.) (‘মুস্তাকিম’ উপাধিতে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৮৫ হিজরি / ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

২৮. মোস্তফা ওয়াহি আল-কুস্তান্তিনি (র.)  (মৃত্যু: ১২৯৫ হিজরি / ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল)-এর অধিবাসী ছিলেন। তিনি বিখ্যাত নকশবন্দি শায়খ খাজা হুসাম (র.)-এর হাতে তরিকার দীক্ষা গ্রহণ করেন।

২৯. মোস্তফা ইজ্জত বিন মোস্তফা বোস্তান (র.)  (মৃত্যু: ১২৯৪ হিজরি / ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের তুরস্কের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং ইস্তাম্বুলে বসবাস করতেন।

৩০. মোস্তফা বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল কাদের (র.) (‘কামালজাদা’ নামে পরিচিত)  (জীবিত ছিলেন: ১২৫৫ হিজরি / ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি একই সাথে কাদেরিয়া ও নকশবন্দি তরিকার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করতেন।

৩১. মোস্তফা বিন মাহমুদ আল-তুরহালি (র.)  (মৃত্যু: ১১৯৭ হিজরি / ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

৩২. মোস্তফা বিন ইসামুদ্দিন আর-রুমি (র.)  (মৃত্যু: ১১৭৯ হিজরি / ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইস্তাম্বুলের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

৩৩. মোস্তফা বিন আব্দুল্লাহ বিন সেলিম আল-হুসাইনি (র.)  (মৃত্যু: ১১৭৯ হিজরি / ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইস্তাম্বুলে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

৩৪. মোস্তফা বিন মুহাম্মদ আল-কূযুল হিসারি (র.) (‘খুলুসি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১৩১৫ হিজরি / ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের একজন বিদগ্ধ আলেম ছিলেন যিনি ফিকহ, আকিদা এবং তাসাউফে সমান পারদর্শী ছিলেন।

৩৫. মাসুদ বিন সাঈদ মুহাম্মদ আর-রুমি (র.) (‘নকশবন্দি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৯১ হিজরি / ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের একজন প্রখ্যাত তুর্কি আলেম এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

৩৬. উমর বিন মুহাম্মদ আল-উসকুবি (র.) (নকশবন্দি খালওয়াতি)  (মৃত্যু: ১০৩৩ হিজরি / ১৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত মেসিডোনিয়ার স্কোপজে অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন, পরে ইস্তাম্বুলে স্থায়ী হন। তিনি ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়া মসজিদে প্রধান ওয়ায়েজ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

৩৭. মুহাম্মদ সিদ্দিক বিন মোস্তফা রাজা উদ্দিন আল-রুমি (র.) (‘ইবনুল বুখারি’ নামে পরিচিত)  (১১৩১–১২০৮ হিজরি / ১৭১৮–১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের তুরস্কের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি শায়খ এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

৩৮. মুহাম্মদ আশ-শাশি আল-ফারকান্দি (র.)  (মৃত্যু: ৯৮০ হিজরি / ১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার তাশখন্দ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, তবে পরবর্তীতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

৩৯. মুহাম্মদ বিন মাহমুদ বিন জামাল উদ্দিন আল-আকরায়ি (র.) (‘ইবনে জামাল’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৯৯৩ হিজরি / ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের তুরস্কের একজন প্রখ্যাত বিচারক (কাজী) এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন। তিনি ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বিখ্যাত ‘আমির বুখারি’ খানকাহর প্রধান শায়খ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৪০. মুহাম্মদ বিন মুহিউদ্দিন আর-রুমি নকশবন্দি (র.) (‘আসিম’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১০৭৭ হিজরি / ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের কিউয়াহ অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। তিনি একাধারে একজন দক্ষ শিক্ষক এবং উচ্চমাপের কবি ছিলেন।

৪১. মুহাম্মদ বিন মোস্তফা বিন উসমান আল-হুসাইনি আল-খাদিমি (র.)  (১১১৩–১১৭৬ হিজরি / ১৭০১–১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি আনাতোলিয়ার কোনিয়া প্রদেশের অন্তর্গত ‘খাদিম’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও নীতিশাস্ত্রবিদ ছিলেন।

৪২. মুহাম্মদ বিন মোস্তফা আল-আলাওয়ি আল-কুনওয়ি (র.)  (মৃত্যু: ১২৩৪ হিজরি / ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের বিখ্যাত কোনিয়া শহরের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

৪৩. মুহাম্মদ তৌফিক বিন আহমদ আল-ইস্তাম্বুলি (র.)  (১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি)

তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুল অঞ্চলের একজন নিষ্ঠাবান নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

৪৪. মুহাম্মদ আলী আদ-দিরনাউয়ি (র.) (‘আরবজাদা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৩০ হিজরি / ১৭১৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের এদির্ন শহরের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নকশবন্দি আলেম ছিলেন।

৪৫. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কুস্তান্তিনি নকশবন্দি (র.) (‘রালিফ’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১৩০৯ হিজরি / ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের তুরস্কের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ও লেখক ছিলেন।

৪৬. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কায়সারি নকশবন্দি (র.) (‘সাঈদ’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১২৫০ হিজরি / ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের কায়সারী অঞ্চলের একজন বিজ্ঞ আলেম এবং নকশবন্দি তরিকার একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন।

৪৭. মুহাম্মদ জামিল আর-রিফায়ি আল-ইস্কাফি আল-মাকাবরসি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৮৪ হিজরি / ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের পরে)

তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

৪৮. মুহাম্মদ নাজিম আল-হাক্কানি (র.)  (১৩৪১–১৪৩৫ হিজরি / ১৯২২–২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত নকশবন্দি আধ্যাত্মিক সাধক। ইউরোপ ও আমেরিকায় নকশবন্দি তরিকা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

৪৯. আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-কাশিঘারি নকশবন্দি (র.) (‘নিদাঈ’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৭৪ হিজরি / ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার কাশিঘার থেকে এসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

৫০. আব্দুল হামিদ বিন কাররা মোল্লা আল-আইনতাবি (র.)  (মৃত্যু: ১২৭৭ হিজরি / ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের আইনতাব (বর্তমান গাজিয়ানটেপ) অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত হানাফি আলেম ও নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

ভারত উপমহাদেশ

১. আবু সাঈদ বিন মুহাম্মদ ঈসা (র.)

তিনি ভারতের দিল্লির নিকটবর্তী রামপুরের ‘মোস্তফাবাদ’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের নকশবন্দিয়া ধারার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

২. ইব্রাহিম আল-বাদাখশি নকশবন্দি (র.)

তিনি মধ্য এশিয়া থেকে হিজরত করে ভারতে স্থায়ী হওয়া একজন উল্লেখযোগ্য সাধক।

৩. আহমদ বিন আব্দুল আহাদ ফারুকী সিরহিন্দি (র.) (‘মুজাদ্দিদে আলফে সানি’ নামে পরিচিত)

তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় উপমহাদেশে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রাণপুরুষ।

৪. আহমদ বিন আব্দুর রহিম ফারুকী দেহলভী (র.) (‘শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী’ নামে পরিচিত)  (১১১০–১১৭৬ হিজরি / ১৬৯৯–১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ, মুহাদ্দিস, দার্শনিক এবং নকশবন্দিয়া তরিকার উচ্চপদস্থ সাধক।

৫. আহমদ সাঈদ সাহেব সিরহিন্দি নকশবন্দি (র.)  (১২১৩–১২৭৭ হিজরি / ১৭৯৮–১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানি শেখ আহমদ সিরহিন্দি (র.)-এর বংশধর ছিলেন। উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ধারায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

৬. শাহ গোলাম আলী দেহলভী (র.) (আব্দুল্লাহ দেহলভী নামেও পরিচিত)  (১১৫৮–১২৪০ হিজরি / ১৭৪৫–১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের নকশবন্দি তরিকার ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বিশ্ববিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আরব ও আজম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

৭. হাবিবুল্লাহ জান-ই-জানান (র.) (‘মাযহারে নকশবন্দি’ নামে পরিচিত)  (১১১৩–১১৯৫ হিজরি / ১৭০১–১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের নকশবন্দিয়া তরিকার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মণীষী ও আধ্যাত্মিক সাধক।

৮. সানাউল্লাহ পানিপথী নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১২২৬ হিজরি / ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম, মুফাসসির এবং ফকিহ ছিলেন। তিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (র.)-এর ছাত্র এবং মির্জা মাজহার জানে জানান (র.)-এর প্রধান খলিফা ছিলেন।

৯. ফজলুর রহমান বিন আহলুল্লাহ সিদ্দিকী নকশবন্দি (র.)  (১২০৮–১৩১৩ হিজরি / ১৭৯৪–১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তাঁর যুগের ভারত উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে গণ্য হতেন। তিনি সুদীর্ঘ ১০৫ বছর হায়াত পেয়েছিলেন।

১০. গোলাম নকশবন্দ বিন আতাউল্লাহ লাখনৌভি (র.)  (মৃত্যু: ১১৩৬ হিজরি / ১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারতের উত্তরপ্রদেশের লখনউ অঞ্চলের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী হানাফি আলেম এবং নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

১১. মুহাম্মদ বাকির আল-লাহোরি নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১০৮০ হিজরি / ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ও লেখক ছিলেন।

১২. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন মাওহাব আল-বুখারি আল-বুরহানপুরি (র.)  (১০৪১–১১১০ হিজরি / ১৬৩১–১৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের বুরহানপুর অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ছিলেন। তিনি ফিকহ, হাদিস এবং ইতিহাস শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

১৩. মুহাম্মদ মাসুম বিন আহমদ আস-সিরহিন্দি (র.)  (১০০৭–১০৭৯ হিজরি / ১৫৯৮–১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বিশ্ববিখ্যাত মুজাদ্দিদে আলফে সানি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (র.)-এর মেজ পুত্র এবং প্রধান খলিফা।

১৪. মুহাম্মদ সাইফ উদ্দিন আল-ফারুকি (র.)  (১০৫৫–১০৯৬ হিজরি / ১৬৪৫–১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত মুজাদ্দিদে আলফে সানি (র.)-এর নাতি এবং শায়খ মুহাম্মদ মাসুম (র.)-এর পঞ্চম পুত্র।

১৫. মুহাম্মদ খাজেগি আদ-দেহিদি আল-হিন্দি আল-কাসানি (র.)  (মৃত্যু: ৯৪৯ হিজরি / ১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম, আধ্যাত্মিক সাধক এবং নকশবন্দি তরিকার ‘কাসানিয়া’ শাখার প্রধান ছিলেন।

১৬. আলীমুল্লাহ বিন আব্দুর রশিদ আল-আব্বাসী আল-লাহোরি (র.)  (মৃত্যু: ১১৬৮ হিজরি / ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত হানাফি আলেম এবং নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী ছিলেন।

১৭. মঈনুদ্দিন বিন খাওয়ান্দ মাহমুদ আল-হিন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১০৮৫ হিজরি / ১৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের একজন প্রভাবশালী নকশবন্দি আলেম এবং উচ্চমাপের সুফি-সাধক ছিলেন।

১৮. নূর মুহাম্মদ বদওয়ানি (র.)  (মৃত্যু: ১১৩৫ হিজরি / ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারত উপমহাদেশের নকশবন্দি মুজাদ্দিদিয়া সিলসিলার একজন প্রখ্যাত শায়খ।

১৯. হামজা বিন হামজা আল-হিন্দি নকশবন্দি (র.) (‘খাজা মীর’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৮০৮ হিজরি / ১৪০৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ভারতের একজন প্রাচীন নকশবন্দিয়া সাধক ছিলেন। তাঁর সময়কালটি তরিকার প্রসারের শুরুর দিককার।

ইরাক ও বাগদাদ

১. আহমদ বিন দাউদ বিন সুলাইমান বিন জারজিস আল-আনি (র.)  (১২৮৬–১৩৬৭ হিজরি / ১৮৬৯–১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি আধুনিক ইরাকের ইতিহাসে একাধারে একজন প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, বাগ্মী এবং দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।

২. ইব্রাহিম বিন সিবগাতুল্লাহ আল-হায়দারি (রহ.)

তিনি ছিলেন বাগদাদের এক প্রখ্যাত আলেম এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লেখক। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু উভয়ই বাগদাদ শহরে।

৩. দাউদ বিন সুলাইমান আল-বাগদাদী নকশবন্দি (র.)  (১২৩১–১২৯৯ হিজরি / ১৮১৬–১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইরাকের বাগদাদে জন্মগ্রহণকারী একজন প্রখ্যাত নকশবন্দিয়া আলেম ও পর্যটক ছিলেন।

৪. আহমদ বিন মুহাম্মদ মারুফ বিন আহমদ আল-হুসাইনি (র.) (‘কারকুক’ নামে পরিচিত)

তিনি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত নকশবন্দিয়া শায়খ এবং আলেম ছিলেন।

৫. মুহাম্মদ আমিন আস-সুওয়াইদি আল-বাগদাদি (র.)  (মৃত্যু: ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ / ১২৫৭ হিজরির কাছাকাছি)

তিনি বাগদাদের বিখ্যাত সুওয়াইদি পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের প্রজ্ঞার জন্য ‘আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ বলা হতো।

৬. মুহাম্মদ বিন সুলাইমান আল-বাগদাদি (র.)  (মৃত্যু: ১২৩৪ হিজরি / ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বাগদাদের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং শায়খ খালিদ বাগদাদী (র.)-এর অন্যতম প্রধান খলিফা ছিলেন।

মধ্য এশিয়া (বুখারা, সমরকন্দ, তাশখন্দ)

১. আব্দুর রহিম বিন আব্দুল্লাহ আর-রযমিতনি আল-বুখারী (র.)  (মৃত্যু: ১১০৩ হিজরি / ১৬৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার বুখারা অঞ্চলের অন্তর্গত ‘রযমিতান’ এলাকার একজন প্রখ্যাত নকশবন্দিয়া শায়খ ছিলেন।

২. আলী রামীতানি (র.) (‘আজিজান’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৭২১ হিজরি / ১৩২১ খ্রিষ্টাব্দ)

নকশবন্দিয়া তরিকার ‘খাজাগান’ সিলসিলার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি বুখারার নিকটবর্তী ‘রামীতান’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

৩. উবায়দুল্লাহ বিন মাহমুদ বিন আহমদ আশ-শাশী আস-সমরকন্দী (র.) (‘খাজা আহরার’ বা ‘হজরত ইশান’ নামে পরিচিত)  (৮০৬–৮৯৫ হিজরি / ১৪০৩–১৪৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)

নকশবন্দিয়া তরিকার ইতিহাসে তিনি এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তরিকার আধ্যাত্মিক ধারা ও সমকালীন সমাজ-রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম।

৪. ইয়াকুব চারখি (র.)  (মৃত্যু: ৮৫০ হিজরি / ১৪৪৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম এবং তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শাহ নকশবন্দ (র.)-এর একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ খলিফা।

৫. মুহাম্মদ বাবা সাম্মাসি (র.)  (মৃত্যু: ৭৪০ হিজরি / ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার ‘খাজাগান’ সিলসিলার অন্যতম প্রধান পুরুষ। বুখারার মাত্র তিন মাইল অদূরে ‘সাম্মাস’ গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

৬. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আলাউদ্দীন আল-বুখারি আল-খাওয়ারিজমি (র.) (‘আলাউদ্দীন আত্তার’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৮০২ হিজরি / ১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শাহ নকশবন্দ (র.)-এর প্রধান খলিফা এবং তাঁর জামাতা ছিলেন।

৭. মুহাম্মদ আল-জাহিদ আস-সমরকন্দি (র.)  (মৃত্যু: ৯২৬ হিজরি / ১৫২০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার সমরকন্দ অঞ্চলের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নকশবন্দি শায়খ ছিলেন।

৮. মাহমুদ আল-আনজির ফাগনাভি (র.)  (মৃত্যু: ৭১৫ হিজরি / ১৩১৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার প্রাচীন সিলসিলার (খাওয়াজকান) একজন মহান সাধক। তিনি বুখারার নিকটবর্তী ‘আনজির ফাগনা’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

৯. মুহাম্মদ আমিন ইমলা আল-বুখারি নকশবন্দি (র.) (‘আমিন’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৬৫ হিজরি / ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার বুখারা অঞ্চলের একজন উচ্চপদস্থ নকশবন্দি সাধক এবং কবি ছিলেন।

১০. আরিফ আদ-দীকরানি (র.)

তিনি বুখারার নিকটবর্তী ‘দীকরান’ নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তিনি নকশবন্দিয়া সিলসিলার প্রখ্যাত শায়খ আমীর কুলাল (র.)-এর খলিফাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছিলেন।

১১. রহমতুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ আল-বুখারী নকশবন্দী (র.) (‘নাযীমা’ কবি নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১১৬৫ হিজরি / ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত মধ্য এশিয়ার বুখারা থেকে তুরস্কে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

১২. মুহাম্মদ আত-তাশখন্দি (র.) (‘মীরক’ নামে পরিচিত)  (জীবিত ছিলেন: ১০২১ হিজরি / ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের তাশখন্দ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর সময়ের একজন বিজ্ঞ আলেম এবং ভাষাবিদ ছিলেন।

১৩. ইউসুফ বিন আইয়ুব আল-হামদানি (র.)  (৪৪০–৫৩৫ হিজরি / ১০৪৮–১১৪০ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান পুরুষ এবং সিলসিলার এক মহান ইমাম। তাঁকে ‘সায়্যিদুস সাদাত’ বলা হয়।

ইরান ও পারস্য

১. আব্দুর রহমান জামী (র.) (‘নূরুদ্দিন’ ও ‘মোল্লা জামি’ নামে পরিচিত)  (৮১৭–৮৯৮ হিজরি / ১৪১৪–১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি পারস্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং নকশবন্দিয়া তরিকার একজন শীর্ষস্থানীয় শায়খ।

২. আলী বিন জাফর আল-খারকানি (র.) (‘শায়খ আবুল হাসান খারকানি’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ৪২৫ হিজরি / ১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি পারস্যের (বর্তমান ইরান) একজন শীর্ষস্থানীয় সূফী সাধক ছিলেন। নকশবন্দিয়া তরিকার ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালি পরম্পরায় তাঁর স্থান অত্যন্ত উঁচুতে।

৩. হুসাইন বিন আলী আল-কাশিফি আল-বাইহাকী (র.)  (মৃত্যু: ৯১০ হিজরি / ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, সাহিত্য, কবিতা এমনকি জ্যোতির্বিদ্যাতেও তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল।

৪. মুহাম্মদ আস-সরুজি (র.)  (৮২০–৯০৪ হিজরি / ১৪১৭–১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বর্তমান আফগানিস্তানের হেরাত শহর থেকে প্রায় নয় ফারসাখ দূরে অবস্থিত ‘রোজ’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হেরাত অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

ককেশাস ও দাগিস্তান

১. আলী বিন ইব্রাহিম আল-বারকাশাদি আদ-দাগিস্তানি (র.)  (মৃত্যু: ১১১৫ হিজরি / ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ককেশাস অঞ্চলের দাগিস্তান থেকে আগত একজন উচ্চমর্যাদার নকশবন্দি শায়খ ছিলেন।

২. খলিল বিন ইয়াহইয়া আদ-দাগিস্তানি (র.)  (১৩০০ হিজরি / ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে জীবিত ছিলেন)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার একজন একনিষ্ঠ সাধক ও লেখক ছিলেন।

৩. গাজী মুহাম্মদ নকশবন্দি (র.) (‘কাজী মোল্লা’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১২৪৮ হিজরি / ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ককেশাস অঞ্চলের একজন কিংবদন্তি মুজাহিদ এবং নকশবন্দি শায়খ ছিলেন। দাগিস্তান অঞ্চলে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিমদের জিহাদে নেতৃত্ব দেন।

লেবানন ও ফিলিস্তিন

১. ইব্রাহিম আল-মিকাতি (রহ.)

তিনি ছিলেন লেবাননের ত্রিপোলি (ত্রাবলস) শহরের একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক সাধক।

২. আহমদ বিন আহমদ বিন খলিল আল-কারি শাফেয়ি নকশবন্দি বিকায়ি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১২৭৪ হিজরি / ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত লেবাননের বিকায়া অঞ্চলের লোক ছিলেন।

৩. আহমদ বিন সুলাইমান আল-আরওয়াদি আল-ত্রাপোলসি (র.)  (মৃত্যু: ১২৭৫ হিজরি / ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত ভূমধ্যসাগরের আরওয়াদ দ্বীপের অধিবাসী ছিলেন, তবে তাঁর কর্মজীবন ছিল সিরিয়া ও লেবাননজুড়ে।

৪. আলী বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ (র.)

তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ নকশবন্দি সাধক। তিনি সিরিয়ার কালআতুল মারকাব থেকে লেবাননের ত্রিপোলিতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

৫. আবদুল্লাহ আদ-দাবহা আল-হালাবি (র.)

তিনি সিরিয়ার হালাব (আলেপ্পো) অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন, তবে লেবাননের ত্রিপোলি শহরে নকশবন্দি তরিকা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

৬. হুসাইন বিন মুহাম্মদ বিন মুসা আল-কুদ্সি আল-খালিদি নকশবন্দি (র.)  (১১৫১–১২০০ হিজরি / ১৭৩৮–১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি জেরুজালেমের (আল-কুদ্স) এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী নকশবন্দিয়া তরিকার একজন বিশিষ্ট আলেম ও কবি ছিলেন।

৭. জাহির বিন আলী আজ-যাইদানি আস-সাফাদি নকশবন্দি (র.)  (১২১৫ হিজরি / ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে পাণ্ডুলিপি সম্পন্ন)

তিনি ফিলিস্তিনের সাফাদ অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন, তবে পরবর্তী জীবনে ইস্তাম্বুলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

কুর্দিস্তান অঞ্চল

১. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-জালি আশ-শাহরাজুরি (র.)  (মৃত্যু: ১২৪৭ হিজরি / ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট আলেম এবং শিক্ষক ছিলেন।

২. খালিদ বিন হুসাইন আশ-শাহরাজুরি আল-উসমানি (র.) (‘যুল জানাহাইন’ বা ‘দুই ডানার অধিকারী’ নামে পরিচিত)  (১১৯৩–১২৪২ হিজরি / ১৭৭৯–১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার ইতিহাসে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁকে তরিকার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ মনে করা হয়।

৩. মুহাম্মদ আল-ফারাকি আল-আইয়ুবি আল-কুর্দি (র.)  (১৯শ শতাব্দী)

তিনি কুর্দি বংশোদ্ভূত একজন মহান সাধক এবং শায়খ খালিদ বাগদাদী (র.)-এর অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী ও খলিফা ছিলেন।

৪. মুহাম্মদ সাঈদ আল-জাযারি নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৮৪ হিজরি / ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের পরে)

তিনি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তুরস্ক ও সিরিয়া সীমান্তের ‘জাযিরা’ অঞ্চলে নকশবন্দি তরিকার একজন প্রভাবশালী শায়খ ছিলেন।

মিশর

১. মুহাম্মদ আবু নাসর তাজউদ্দিন নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১২৮২ হিজরি / ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মিশরের কায়রোতে বসবাসকারী একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি শায়খ ছিলেন।

২. মুহাম্মদ বিন আহমদ আল-হান্নাতি আল-মিসরি (র.)  (মৃত্যু: ১০৫১ হিজরি / ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি অটোমান আমলের মিশরের একজন প্রখ্যাত আলেম ও বিচারক ছিলেন। তিনি একাধারে নকশবন্দি ও খালওয়াতি তরিকার অনুসারী ছিলেন।

৩. মুহাম্মদ আমিন বিন ফাতহুল্লাহ আল-কুর্দি আল-আরবিলি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৩২ হিজরি / ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বর্তমান ইরাকের ইরবিল অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবন অতিবাহিত হয় মিশরে।

৪. উমর বিন জাফর আশ-শিরাউয়ি আশ-শাফেয়ী (র.)  (মৃত্যু: ১৩০৩ হিজরি / ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মিশরের মুনুফিয়া প্রদেশের ‘শিরি’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞানের সন্ধানে তিনি কায়রো গমন করেন এবং বিখ্যাত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন।

৫. মুহাম্মদ সুলাইমান আল-বাসুমি নকশবন্দি (র.)  (১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি)

তিনি দ্বাদশ হিজরি শতাব্দীর একজন নিষ্ঠাবান নকশবন্দি সাধক ছিলেন। তাঁর জীবন ও সাধনা মূলত মিশর কেন্দ্রিক ছিল।

৬. মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খালিদি নকশবন্দি (র.) (‘কূজুক আশিক’ নামে পরিচিত)  (মৃত্যু: ১৩০০ হিজরি / ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মিশরের কায়রোতে অবস্থিত নকশবন্দি তরিকার প্রধান খানকাহর শায়খ ছিলেন।

৭. মুহাম্মদ বিন মোস্তফা আল-হুসাইনি আল-আযহারি (র.)  (মৃত্যু: ১১৬৭ হিজরি / ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দের পরে)

তিনি মিশরের আল-আযহারের একজন প্রখ্যাত আলেম এবং নকশবন্দি তরিকার একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন।

ইয়েমেন

১. তৈয়ব বিন আবি বকর আল-আরাবি আল-হাদরামি নকশবন্দি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১১৩৫ হিজরি / ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দ)

ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলের এই নকশবন্দি আলেম ফিকহ ও তাসাউফের সমন্বয়ে কাজ করেছেন।

২. আব্দুর রহমান বিন মুস্তফা আল-আইদারুসি (র.)  (মৃত্যু: ১১৯২ হিজরি / ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি বংশগতভাবে ইয়েমেনের তারিম অঞ্চলের আল-আইদারুস পরিবারের সন্তান ছিলেন, যারা ইলম ও তাসাউফের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।

৩. উমর বিন আব্দুল গনি আর-রাফেয়ী আল-ফারুকী (র.)  (জন্ম: ১২৯৯ হিজরি / ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইয়েমেনের সান’আ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সেখানে আপিল আদালতের প্রধান ছিলেন।

আজারবাইজান ও ককেশাস (অন্যান্য)

১. ইব্রাহিম আশ-শাবাস্তারি নকশবন্দি (রহ.)  (মৃত্যু: ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দ / ৯১৫ হিজরি)

তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আলেম এবং কবি ছিলেন। ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে আজারবাইজানে শাহাদাত বরণ করেন।

বিভিন্ন অঞ্চল (মিশ্র বা অনির্ধারিত)

১. আবু বকর বিন আলী আল-তরাবিহ্ (র.) (‘রাতিব রুমি’ নামে পরিচিত)

তিনি ছিলেন হানাফি মাজহাবের একজন অনুসারী এবং নকশবন্দিয়া তরিকার বিশিষ্ট সাধক।

২. আহমদ বিন আহমদ বিন আব্দুল কাদির (র.) (‘সিদ্দিকি’ নামে পরিচিত)  (১২৬০–১৩৪৩ হিজরি / ১৮৪৪–১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে অনেকগুলো মূল্যবান কিতাব রচনা করেছেন।

৩. হুসামুদ্দিন মুহাম্মদ (র.)

তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক মাকামাত নিয়ে কাজ করেছেন।

৪. হাসান বিন মুহাম্মদ আল-রুমি নকশবন্দি (র.) (‘হুসামুদ্দিন’ নামেও পরিচিত)  (মৃত্যু: ১২৮২ হিজরি / ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের (রুম) একজন বরেণ্য নকশবন্দিয়া আলেম ও গবেষক ছিলেন।

৫. সেলিম বিন নাজীব সাফী (র.)  (জন্ম: ১২৩১ হিজরি / ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ছিলেন নবীজি (ﷺ)-এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর বংশধর।

৬. মুহাম্মদ আদিব বিন আল-জাররাহ আল-হানাফি (র.)  (মৃত্যু: ১৩৩৬ হিজরি / ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি একাধারে একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং একজন প্রখ্যাত নকশবন্দি আলেম ছিলেন।

৭. মুহাম্মদ আমিন বিন উমর (ইমাম ইবনে আবিদিন শামি) (র.)  (১১৯৮–১২৫২ হিজরি / ১৭৮৪–১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ইসলামের ইতিহাসে ‘ইবনে আবিদিন শামি’ নামে জগদ্বিখ্যাত। তিনি তাঁর যুগের হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠ ফকিহ এবং সিরিয়ার ইমাম ছিলেন।

৮. মুহাম্মদ জামিল আল-খতিব (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১৩৭৬ হিজরি / ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি নিজের পরিচয় দিতেন: ‘বিশ্বাসে আশ’আরী, মাযহাবে শাফেয়ী, তরিকায় নকশবন্দি এবং জন্ম ও নিবাসে তয়েশমানি।’

৯. মুহাম্মদ আমিন বিন দরবেশ আল-রুমি নকশবন্দি (র.)  (মৃত্যু: ১১৫৮ হিজরি / ১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি তুরস্কের ‘তোফাদ’ নামক স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন এবং সেখানেই আমৃত্যু দ্বীনের খেদমত করেন।

১০. মুহাম্মদ নূর আল-আরবি আল-হুসাইনি (র.)  (মৃত্যু: ১৩০৫ হিজরি / ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন শীর্ষস্থানীয় নকশবন্দি আলেম এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন।

১১. মুহাম্মদ বিন খাজা আহমদ আস-সাদিক আত-তহুরি আল-ফারুকি (র.)  (১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ)

তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর এবং নকশবন্দি তরিকার একজন বিশিষ্ট শায়খ ছিলেন।

১২. মুহাম্মদ আল-আদহামি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১১৭৭ হিজরি / ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি ১৮শ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক সাধক ও লেখক ছিলেন।

১৩. মুহাম্মদ আল-আলুসি নকশবন্দি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১৩০১ হিজরি / ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে)

বিখ্যাত আলুসি পরিবারের এই সদস্য একাধারে একজন নকশবন্দি সাধক এবং উচ্চমাপের ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক ছিলেন।

১৪. মুহাম্মদ আমিন আরিফ আল-কুরাশি নকশবন্দি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১২৭৬ হিজরি / ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি মূলত কুর্দি বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিল মিশরে।

১৫. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-বাহনাসি আল-আকিলি (র.)  (মৃত্যু: ১০০১ হিজরি / ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি দশম হিজরি শতাব্দীর একজন উঁচু মাপের নকশবন্দি আলেম এবং বহুগ্রন্থ প্রণেতা ছিলেন।

১৬. মুহাম্মদ মোস্তফা আল-হুসাইন আস-সাদিকি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ৯৯২ হিজরি / ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি দশম হিজরি শতাব্দীর একজন উচ্চপদস্থ নকশবন্দি সাধক ছিলেন।

১৭. মুহাম্মদ মাহমুদ আল-উসমানি (র.) (‘আস-সাহিব’ নামে পরিচিত)  (১৯শ শতাব্দী)

তিনি বিশ্ববিখ্যাত মুজাদ্দিদ শায়খ খালিদ বাগদাদী (র.)-এর সহোদর ভাই এবং তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত খলিফা ছিলেন।

১৮. আলী বিন আহমদ বিন মুহাম্মদ মাসুম আল-হাসানি (র.) (‘ইবনে মাসুম’ নামে পরিচিত)  (১০৫২–১১১৯ হিজরি / ১৬৪২–১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি শায়খ সাইয়্যেদ বংশের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, কবি এবং জীবনীকার ছিলেন। তাঁর মূল শিকড় পারস্যের শিরাজ হলেও তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় ভারতে (হায়দ্রাবাদ) অতিবাহিত করেন।

১৯. হুসাইন আল-খতিব আল-হামাউয়ি (র.)  (১৮৯২ – ১৯০০ এর পরবর্তী সময়)

তিনি সিরিয়ার হামা শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানকার বড় বড় আলেমদের কাছে শরীয়তি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

২০. মুহাম্মদ আতাউল্লাহ নকশবন্দি (র.)  (জীবিত ছিলেন: ১২২২ হিজরি / ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ)

তিনি নকশবন্দি তরিকার একজন প্রচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

২১. মুহাম্মদ আমিন (র.)  (মৃত্যু: ১২৩১ হিজরি / ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দ)

তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত ফকিহ এবং নাহুবিদ ছিলেন। তিনি মিশরের ‘আল-মাহাল্লা’ অঞ্চলে দীর্ঘ বছর প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২২. আব্দুর রহিম বিন ইয়াহইয়া সা’দুদ্দিন নকশবন্দি (র.) (‘বাহাই জাদাহ’ নামে পরিচিত)

তিনি একজন বিশিষ্ট নকশবন্দি আলেম ছিলেন, যিনি আকিদাহ ও ইলমে কালামের ওপর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।[5]

বাংলাদেশে নকশবন্দিয়া তরিকা:

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নকশবন্দিয়া তরিকার বহু খানকা ও দরবার রয়েছে। অনেক পীর মাশায়েখ এই তরিকার প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পীর মাশায়েখ হলেন—
১. হজরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহ.), সিরাজগঞ্জ।
২. সৈয়্যদ রাহাতুল্লাহ নকশবন্দি (রহ.), রাহাতিয়া দরবার রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
৩. সৈয়্যদ নুরুচ্ছাফা নঈমি নকশবন্দি (রহ.), রাহাতিয়া দরবার রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
৪. মাওলানা মোহাম্মদ ইসলাম শাহ চাটগামী (রহ.), ধর্মপুর দরবার, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
৫. হজরত আবদুল আযিয খুলনবী (রহ.), গুনরকাটি, সাতক্ষীরা।
৬. সৈয়্যদ আবেদ শাহ আল মাদানী (রহ.), চাঁদপুর।
৭. খাজা আহমদ শাহ চাঁদপুরী নকশবন্দি (রহ.), গাছতলা দরবার, চাঁদপুর।
৮. শাহ সুফি খাজা হাশমত উল্লাহ (রহ.), আটরশি, ফরিদপুর।
৯. শায়খুল হাদিস আল্লামা ফজলুল করিম নকশবন্দী (রহ.) , রায়পুর, লক্ষীপুর।

এ-ছাড়াও এ দেশে আরো বহু পীর মাশায়েখ ওলামায়ে কেরাম নকশবন্দি সিলসিলার প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছেন।

নকশবন্দি তরিকা হলো ইসলামের অন্যতম প্রধান একটি আধ্যাত্মিক ধারা, যার মূল ভিত্তি হচ্ছে পবিত্র সুন্নাহর কঠোর অনুসরণ এবং ‘জিকর-এ-খফি’ বা গুপ্ত জিকিরের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন। এই তরিকার বিশেষত্ব হলো এটি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর আধ্যাত্মিক সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত এবং ইমাম শাহ নকশবন্দ (রহ.)-এর মাধ্যমে এটি পূর্ণতা ও বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। নকশবন্দি দর্শনের মূল নির্যাস হলো ‘খলওয়াত দর আঞ্জুমান’— অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে মানুষের ভিড়ে থেকেও অভ্যন্তরীণভাবে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকা। মধ্য এশিয়া, তুরস্ক ও আরব বিশ্ব থেকে শুরু করে ভারত উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের মাটিতে এই তরিকার মহান মাশায়েখগণ ইলম ও আধ্যাত্মিকতার যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তা যুগ যুগ ধরে মানুষকে শরিয়তের পাবন্দি, চারিত্রিক উৎকর্ষ এবং নফসের পবিত্রতা অর্জনে এক অনন্য ও নির্ভুল পথনির্দেশনা দিয়ে আসছে।