তরুণ গাজ্জালি জ্ঞানের জন্য পাগল। নিজের শহরে যতটুকু শেখার সুযোগ ছিল, শিখে ফেললেন। কিন্তু মন মানছে না। আরও জানতে হবে, আরও পড়তে হবে। তাই ঘর ছেড়ে রওনা দিলেন দূর শহর জুরজানে। সেখানে উস্তাদ আবু নাসেরের কাছে দিনের পর দিন পড়লেন। উস্তাদ যা বলতেন, মনোযোগ দিয়ে শুনতেন আর খাতায় লিখে রাখতেন। এই নোটগুলোকে বলা হতো তালিকাহ। এই খাতাগুলোই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
পড়াশোনা শেষে একদিন ঘরে ফেরার পথ ধরলেন। কাঁধে ঝোলানো থলেতে সেই মূল্যবান নোটগুলো। পথে হঠাৎ বিপদ। একদল ডাকাত ঝাঁপিয়ে পড়ল। সব কিছু কেড়ে নিয়ে পালাতে লাগল। গাজ্জালি পিছু ছুটলেন। ডাকাত সর্দার রেগে ঘুরে দাঁড়াল। “সরে যা! নইলে জান নিয়ে নেব!”
গাজ্জালি তবুও থামলেন না। হাত জোড় করে বললেন, “বাকি সব নিয়ে যান, কোনো আপত্তি নেই। শুধু ওই থলেটা ফেরত দিন। ওটা আপনাদের কোনো কাজে আসবে না।” সর্দার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওই থলেতে আছেটা কী?”
“কিছু লেখা নোট। এগুলোর জন্যই আমি ঘর ছেড়ে এতদূর এসেছিলাম। এগুলোই আমার জ্ঞান, এগুলোই আমার সাধনা।” সর্দার একটু থামল। তারপর হো হো করে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে বলল, “বাহ, তুই নাকি জ্ঞান অর্জন করেছিস! অথচ আমরা শুধু কয়েকটা কাগজ কেড়ে নিতেই তুই জ্ঞানহীন হয়ে গেলি! এটা কেমন জ্ঞান রে তোর?”
কোনো কথা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধু একটা ইশারা। সঙ্গী চুপচাপ থলেটা এসে গাজ্জালির হাতে দিয়ে গেল।
গাজ্জালি থলে হাতে নিয়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু পা চললেও মন আটকে রইল সেখানেই। ডাকাতের কথাগুলো বারবার কানে বাজতে লাগল। লোকটা ডাকাত, পড়াশোনা জানে না, কিতাব চেনে না। অথচ সে আজ এমন একটা কথা বলে দিল, যা কোনো উস্তাদও এতদিন বলেননি। যে জ্ঞান শুধু কাগজে থাকে, সে জ্ঞান আসল জ্ঞান নয়। আসল জ্ঞান হলো যেটা বুকের ভেতর গেঁথে যায়, যেটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
তুস-এ ফিরে গাজ্জালি আর একটি দিনও নষ্ট করলেন না। টানা তিন বছর শুধু পড়লেন আর মুখস্থ করলেন। জুরজানে যা কিছু লিখেছিলেন, একটি কথাও বাদ দিলেন না। শেষে তিনি বুক ফুলিয়ে বললেন, এখন ডাকাতরা আবার আসুক। সব কেড়ে নিক। তবুও আমার কিছু যাবে না, কারণ আমার জ্ঞান এখন আর কাগজে নেই, বুকের ভেতরে আছে “
সেদিন একজন ডাকাত না জেনেই দুনিয়ার অন্যতম সেরা আলেমকে গড়ে দিয়েছিল।