জ্ঞান অর্জনের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ কেবল কিতাব পড়ার মাধ্যমেই শেষ হয় না, বরং চরিত্রের দৃঢ়তা আর নৈতিকতার শক্তিতেই একজন মানুষ সত্যিকারের ‘ইলম’ হাসিল করেন। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যেন সেই নৈতিকতার এক অজেয় দলিল। ইবনুন নাজ্জার তাঁর সনদে বর্ণনা করেছেন যে, আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিন আবুল হুসাইন আল-হায়ানি তাঁকে লিখেছিলেন এবং তিনি সেটি তাঁর হস্তাক্ষর থেকে নকল করেছেন। স্বয়ং শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী সেই বিস্ময়কর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমাদের বলেন:
“আমার মা আমাকে বলেছিলেন, ‘বাগদাদে যাও এবং ইলম অর্জন করো।’ তখন আমার বয়স ছিল সতেরো বা আঠারো বছর।” মায়ের সেই আদেশ শিরোধার্য করে কিশোর আব্দুল কাদের এক শহর থেকে অন্য শহর পার হয়ে বাগদাদে পৌঁছালেন এবং কঠোর পরিশ্রমে জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করলেন।
একদা মুহাম্মদ বিন কায়েদ আল-আওয়ানি শায়খকে গভীর কৌতূহলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার জীবনের ভিত্তি কিসের ওপর?’ শায়খ উত্তরে বলেছিলেন, ‘সত্যের ওপর। আমি জীবনে কখনও মিথ্যা বলিনি। এমনকি যখন আমি মক্তবে পড়তাম, তখনও না।’
শৈশবের এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে শায়খ আরও বলেন, “শৈশবে আমাদের এলাকায় থাকাকালীন একদিন আরাফাতের দিন আমি গবাদি পশুর পেছনে পেছনে মাঠে গেলাম। আমি একটি লাঙল টানা গরুর অনুসরণ করছিলাম। হঠাৎ গরুটি আমার দিকে ফিরে তাকাল এবং (আল্লাহর হুকুমে) বলল, ‘হে আব্দুল কাদের, তুমি তো এই কাজের জন্য সৃষ্টি হওনি এবং তোমাকে এই আদেশও দেওয়া হয়নি!’ আমি আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম এবং ঘরের ছাদে উঠলাম। সেখান থেকে দেখলাম মানুষ আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার মায়ের কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘আমাকে আল্লাহর পথে সঁপে দিন। আমি বাগদাদে গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাই এবং নেককারদের সান্নিধ্য পেতে চাই।’”
মা যখন এর কারণ জানতে চাইলেন, আব্দুল কাদের পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন। সন্তানের ব্যাকুলতা দেখে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে আশিটি দিনার আছে, যা আমি তোমার পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এর অর্ধেক (৪০ দিনার) তোমার ভাইয়ের জন্য রাখলাম, আর বাকি ৪০ দিনার তোমার জামার বগলের নিচে সেলাই করে দিচ্ছি।’
যাত্রার আগে মা তাঁর সন্তানের কাছ থেকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য বলার এক কঠিন অঙ্গীকার নিলেন। বিদায়লগ্নে তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘হে আমার কলিজার টুকরা সন্তান, যাও, তোমাকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিলাম। তোমার এই চেহারা হয়তো কিয়ামতের আগে আর দেখতে পাব না।’
মায়ের দোয়া ও অঙ্গীকার নিয়ে আব্দুল কাদের বাগদাদগামী একটি ছোট্ট কাফেলার সাথে যাত্রা শুরু করলেন। কাফেলাটি যখন হামাদান এলাকা পার হয়ে এক জনমানবহীন নির্জন প্রান্তরে পৌঁছাল, তখন অতর্কিতে ষাটজন ঘোড়সওয়ার ডাকাত তাদের ওপর আক্রমণ চালাল। তারা নির্মমভাবে পুরো কাফেলা লুট করল, কিন্তু ছোট বালক আব্দুল কাদেরকে সাধারণ ভেবে কেউ কিছু বলল না।
হঠাৎ একজন ডাকাত তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তুচ্ছজ্ঞান করে জিজ্ঞেস করল, ‘ওহে ফকির, তোমার কাছে কি কিছু আছে?’ তিনি দৃঢ়ভাবে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, ৪০টি দিনার আছে।’ ডাকাত অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘সেগুলো কোথায়?’ তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘আমার জামার বগলের নিচে সেলাই করা আছে।’ সে ভাবল কিশোরটি হয়তো তার সাথে রসিকতা বা উপহাস করছে, তাই সে তাঁকে অবজ্ঞা করে চলে গেল। এরপর দ্বিতীয় আরেকজন ডাকাত এসে একই প্রশ্ন করল এবং তিনিও নির্দ্বিধায় একই উত্তর দিলেন। ডাকাতটি অবাক হয়ে বিষয়টি তাদের সর্দারকে জানাল। সর্দার তখন একটি উঁচু টিলার ওপর বসে লুণ্ঠিত মালামাল ভাগাভাগি করছিল। কৌতূহলী হয়ে সর্দার তাঁকে ডেকে পাঠাল।
সর্দার কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কাছে কী আছে?’ আব্দুল কাদের আবারো বললেন, ‘৪০টি দিনার।’ সর্দার জানতে চাইল, ‘কোথায় সেগুলো?’ তিনি দেখিয়ে দিলেন, ‘আমার জামার বগলের নিচে সেলাই করা।’ সর্দারের আদেশে তাঁর জামাটি ছিঁড়ে ফেলা হলো এবং সেখানে বিস্ময়করভাবে ঠিক ৪০টি দিনারই পাওয়া গেল। সর্দার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে এই সত্য কথা বলতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?’ (সে বুঝাতে চাইল, চাইলে তো তুমি লুকাতেও পারতে)।
আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) তখন তাঁর সেই অমর বাণীটি উচ্চারণ করলেন:
‘আমার মা আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যেন আমি সর্বদা সত্য কথা বলি। আমি আমার মায়ের সাথে করা অঙ্গীকারের খেয়ানত করতে চাইনি।’
এক কিশোরের মুখে এই নিষ্ঠার কথা শুনে দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বিলাপ করে বলতে লাগল, ‘তুমি তোমার মায়ের সাথে করা অঙ্গীকার ভাঙলে না, অথচ আমি দীর্ঘ এত বছর ধরে আমার রবের সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আসছি!’
তৎক্ষণাৎ সেই সর্দার তাঁর হাতে হাত রেখে তওবা করল। তার অনুসারীরা তখন বলল, ‘আপনি যখন ডাকাতি বা পথিমধ্যে লুণ্ঠনের সময় আমাদের সর্দার ছিলেন, এখন তওবার ক্ষেত্রেও আপনিই আমাদের সর্দার।’ এরপর তারা সবাই তাঁর কাছে তওবা করল এবং কাফেলার কাছ থেকে যা লুট করেছিল সব ফিরিয়ে দিলো।