যাদের জীবন শুধু একটি অধ্যায় নয়; বরং মানব আত্মার জাগরণের জন্য সম্পূর্ণ দিশার মতো, সেই মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় একজন হজরত আবু আলি আর-রুজবারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন সুফিয়ায়ে কেরামের মাঝে ‘শায়খুস সুফিয়া’ নামে সমাদৃত; যিনি শরিয়তের গভীর জ্ঞান এবং তাসাউফের নিখুঁত বাস্তবতা; দুইয়ের সমন্বিত রূপ ছিলেন।
নাম ও পরিচয়:
আবু আলি রুযবারী (রহ.) ছিলেন সুফিদের অন্যতম শায়খ। কারো মতে তাঁর নাম আহমদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনুল কাসিম ইবনে মানসুর। অন্যদের মতে, তাঁর নাম হাসান ইবনু হারুন। তিনি মিশরে বসবাস করতেন। ১
প্রাথমিক জীবনে তিনি বাগদাদের বাসিন্দা ছিলেন। ওজির, রাজকর্মচারী ও লেখকবর্গের পরিবারের সন্তানদের সাথে নিয়মিত উঠাবসা ছিল। তার বংশপরিচয় কিসরা আনোশিরওয়ান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরবর্তিতে তিনি মিশরে অবস্থান করেন এবং সেখানকার প্রধান শায়খ হয়ে ওঠেন। ২
ইলম অর্জন:
তিনি হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.), আবুল হুসাইন নুরি (রহ.), আবু হামজা আল-বাগদাদি (রহ.), ইবনুল জল্লা (রহ.)— এদের মতো মহাপুরুষদের সাহচর্য অর্জন করেছেন। ৩
তিনি মাসউদ আর-রামলী ও অন্যান্যদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতেন, “ফিকহে আমার ওস্তাদ ইবনু সুরাইজ; আদবে ওস্তাদ ছালাব; হাদিসে ওস্তাদ ইব্রাহিম আল-হারবী।”৪
অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন, “তাসাউফে আমার শিক্ষক ছিলেন জুনাইদ বাগদাদি, ফিকহ শাস্ত্রে আবুল আব্বাস ইবনে সুরাইজ, সাহিত্যে ছা’লাব এবং হাদিস শাস্ত্রে ইব্রাহিম আল-হারবী।”৫
তাঁর শিষ্য:
তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তাঁর ভাগ্নে মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ আর-রাযী, আহমদ ইবনু আলি আল-ওয়াজীহী, মারুফ আজ-জানজানি এবং আরও অনেকে। ৬
ইলমি গভীরতা:
আবু আলি আল-কাতিব বলেন, “শরিয়ত ও তাসাউফ— উভয় জ্ঞানের সমন্বয় যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখেছি, তিনি হলেন আবু আলি রুজবারি।”
আহমদ ইবন আতা’র (রহ.) বক্তব্য হচ্ছে, “আমার খালু আবু আলি সুন্নাহ অনুযায়ী ফাতোয়া দিতেন।” ৭
জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
আবু আলি আর-রুজবারি বলেন, “দুনিয়া অর্জনের মধ্যে রয়েছে নফসের লাঞ্ছনা, আর আখেরাত অর্জনের মধ্যে রয়েছে তার সম্মান। ৮
দয়ার্দ্রতা:
হজরত জিয়াবী বলেন, “আমি আবদান নগরীতে সফর করলাম। তাঁর মসজিদে প্রবেশ করে একটি শায়খকে পেলাম। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে দুই শতাধিক হাদিস স্মরণ করিয়ে দিলেন। পথে ডাকাতি হওয়ায় আমার সমস্ত জিনিসপত্র হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি তাঁর গায়ের পোশাক খুলে আমাকে দিলেন। পরবর্তীতে যখন আবদান মসজিদে প্রবেশ করলেন, লোকেরা তাঁকে জড়িয়ে ধরল এবং অত্যন্ত সম্মান দেখাল। তখন আমি লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উনি কে?’ তারা বলল, ‘এ হলেন আবু আলি আর-রুজবারি।’ ৯
আবু মনসুর ইবনু আহমদ আল-ইসফাহানী বলেন, আমার কাছে এমন বর্ণনা পৌঁছেছে যে, আবু আলি রুজবারি বলেছেন, “আমি ফকিরদের পথে যে সম্পদ ব্যয় করেছি, তা অনেক। কিন্তু আমি কখনো কোনো ফকিরের হাতে হাত বাড়িয়ে দেইনি; বরং যা দিতাম তা আমার হাতেই রাখতাম, আর ফকিররা আমার হাত থেকে তা গ্রহণ করত; যেন আমার হাত তাদের হাতের নিচে থাকে, কোনো ফকিরের হাত কখনোই আমার হাতের নিচে না যায়।” ১০
তাসাউফ ও সুফি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি:
মানসুর ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, আমি শুনেছি আবু আলি আর-রুজবারিকে যখন তাসাউফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “এটি সম্পূর্ণ গম্ভীর তত্ত্ব; তাই এটিকে কোনো হাসি-তামাশা বা ব্যঙ্গাত্মক কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত করো না।” ১১
হজরত আবু আলি আর-রুজবারি বলেন, সুফি সেই ব্যক্তি, যে সাফা’র (পবিত্রতার) উপর সুফ (পশমী বস্ত্র) পরিধান করে, যে প্রিয়নবি মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ অনুসরণ করে, যে নফসের কামনাকে বিরক্তির স্বাদ আস্বাদন করায় এবং যার কাছে দুনিয়া পিঠের পেছনে (তুচ্ছ) হয়ে থাকে।” ১২
তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা:
আহমদ ইবনে আলি ইবনে জাফরের মাধ্যমে বর্ণিত, তিনি ইব্রাহিম ইবনে ফাতিক থেকে আবু আলি আর-রুজবারির এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন—
روحي إِلَيْك بكلها قد أَجمعت … لَو أَن فِيك هلاكها مَا أقلعت
تبْكي إِلَيْك بكلها عَن كلهَا … حَتَّى يُقَال من الْبكاء تقطعت
فَانْظُر إِلَيْهَا نظرة بتعطف … فلطالما متعتها فتمتعت
আমার রুহ তার সর্বস্ব দিয়ে কেবল তোমাকেই পাওয়ার সংকল্প করেছে,
যদি তোমার পথে তার ধ্বংসও থাকে, তবুও সে ফিরে যাবে না।
সে তার সকল সত্তা দিয়ে, সম্পূর্ণরূপে তোমার দিকে কেঁদে চলেছে,
যাতে বলা হয় যে, কান্নার তীব্রতায় সে যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
সুতরাং, কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকাও,
কারণ তুমি তাকে দীর্ঘকাল ধরে উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছ, আর সেও তা উপভোগ করেছে।
আলি ইবনে সাঈদ বলেন, আমি আবদুস সালাম আল-মাখরামিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আবু আলি আর-রুজবারি নিজের জন্য এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন—
بك كتمان وجده بك عَنهُ … لَك مِنْهُ وَعنهُ مَا لَك مِنْهُ
من إِذا لَاحَ لائح لمشوق … هام وجدا إِن لم تكنه
وَإِذا أفل الأفول ببين … بَان عَنهُ فَبَان إِن لم تبنه
يَا فَتى الْحبّ بل يَا فَتى الْحق سري … عَنْك مستودع لديك فصنه
ভাবানুবাদ
তোমার মাধ্যমেই সে তার হৃদয়ের যন্ত্রণা গোপন রাখে,
আবার তোমার কাছ থেকেই নিজেকে লুকিয়ে রাখে—
তোমার কাছে যা আছে তার, সবই তোমার কাছেই রয়ে যায়।
যে প্রেমিক কোনো আলোর ঝলক দেখলে প্রেমের তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে,
সে প্রেমিক কি তুমি নও? তুমি না হলে আর কে?
আর যখন সেই আলো অস্ত যায়, বিচ্ছেদ নেমে আসে, প্রিয়জন দূরে সরে যায়,
সে বিচ্ছেদের বেদনা কি তুমি অনুভব করোনি? তুমি না অনুভব করলে আর কে করবে?
হে প্রেমের সাধক, নাহ, বলা ভালো, হে সত্যের সাধক!
আমার অন্তরের এক গভীর রহস্য তোমার কাছেই গচ্ছিত রেখে গেলাম,
তুমি তা যত্নের সাথে আগলে রেখো। ১৩
ইশারা কী?
আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ আদ-দিমাশকী বলেন, আমি আবু আলি আর-রুজবারিকে বলতে শুনেছি, তাঁকে যখন ‘ইশারা’ (সুফি পরিভাষায় আধ্যাত্মিক সংকেত) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “ইশারা হলো অন্তরের অন্তর্দৃষ্টি ও অবস্থার যে বাস্তব বিষয়গুলো থাকে, সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ পরিষ্কার ব্যাখ্যা। অন্য কিছু নয়। আর প্রকৃত সত্যে ইশারার সঙ্গে কিছু ‘কারণ’ যুক্ত থাকে; আর এই কারণগুলো হাকিকতের প্রকৃত সত্তা থেকে দূরে।” ১৪
মুরিদ ও মুরাদ কী?
মানসুর ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, আমি শুনেছি আবু আলি আর-রুজবারিকে, তাকে যখন ‘মুরিদ’ ও ‘মুরাদ’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “মুরিদ হলো সেই ব্যক্তি যে নিজের জন্য কিছুই চায় না; বরং চায় যা আল্লাহ তার জন্য ইচ্ছা করেছেন। আর মুরাদ হলো যে, সে এই দুই জগৎ থেকে আল্লাহর অজানা কোনোকিছু চায় না।” ১৫
এ কথায় ব্যাখ্যা করলে যা দাঁড়ায়—
মুরিদ হলো সেই সাধক, যে নিজের খেয়াল-খুশি ও ইচ্ছামতো কিছু চায় না। সে নিজের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ, সে বলে না “আমি এটা চাই, ওটা চাই” বরং বলে “আল্লাহ আমার জন্য যা চেয়েছেন, আমি কেবল তাই চাই।” এটি ইচ্ছার দিক থেকে আত্মসমর্পণের স্তর।
মুরাদ হলো আরও উঁচু স্তর। এই ব্যক্তিকে আল্লাহ নিজেই বেছে নিয়েছেন এবং তার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। সে দুনিয়া বা আখেরাত কোনোকিছুই আল্লাহর অজান্তে বা আল্লাহকে বাদ দিয়ে চায় না। অর্থাৎ তার চাওয়া-পাওয়ার পুরো জগৎটাই আল্লাহকে ঘিরে।
তওবার পরিচয়:
আবুল-আব্বাস আন-নাসাওয়ি বলেন, তিনি আহমদ ইবনে আতাকে বলতে শুনেছেন, তিনি মুহাম্মদ আজ-জাক্কাক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবু আলি আর-রুজবারিকে তওবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বললেন, “তাওবার মূল হলো স্বীকারোক্তি, অনুতাপ এবং (পাপ কাজ) সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।” ১৬
আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্তরসমূহ:
আবু আলি আর-রুজবারি বলেন, “মুশাহাদাত (সরাসরি দর্শন/উপলব্ধি) হলো হৃদয়ের জন্য, মুকাশাফাত (উন্মোচন) হলো অন্তরের গুপ্ত রহস্যের জন্য, মুআয়ানাত (স্বচক্ষে দেখা) হলো অন্তর্দৃষ্টির জন্য, আর মুরাআত (পর্যবেক্ষণ) হলো বাহ্যিক দৃষ্টির (চক্ষুর) জন্য।” ১৭
আধ্যাত্মিকতার দাবি ও বাস্তবতা:
আবু আলি আর-রুজবারি বলেন, “কেউ কখনো কোনো (আধ্যাত্মিক) দাবি করেনি, যদি না তার মধ্যে হাকিকত (বাস্তবতা) অনুপস্থিত থাকে। যদি সে কোনো বিষয়ে সত্যই উপলব্ধি অর্জন করত, তবে সেই হাকিকত নিজেই তার পক্ষ থেকে কথা বলত এবং তাকে সকল দাবি-দাওয়া থেকে অমুখাপেক্ষী করত।” ১৮
এর ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে—
তাঁর মতে দাবি আসে অভাব থেকে। যখন কারো মধ্যে প্রকৃত উপলব্ধি নেই, তখন সে নিজের অবস্থানকে প্রমাণ করতে চায়। তাই সে দাবি তোলে— “আমি এমন, আমি এতদূর পৌঁছেছি” ইত্যাদি।
হাকিকত নিজেই সাক্ষ্য দেয়। যদি কেউ সত্যিই কোনো আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করে, তবে সেই সত্য তার জীবন, আচরণ ও চরিত্রে প্রকাশ পায়। তখন তাকে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না; তার অস্তিত্বই প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত জ্ঞানী বা আরিফ মানুষ নিজের দাবি দিয়ে নয়; বরং তার আচার-আচরণ, বিনয় এবং অন্তরের শান্তি দিয়ে অন্যদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে।
সুফিরা ইন্তেকালের পরেও জীবিত:
তিনি বলেন, “এক ঈদের দিন এক ফকির আমাদের কাছে এলেন জীর্ণ পোশাকে। এসে বললেন, ‘আপনার কাছে কি এমন কোনো পরিষ্কার জায়গা আছে, যেখানে কোনো পরদেশি গরিব মানুষ মরতে পারে?’ আমি কিছুটা অবহেলা ভরে বলেছিলাম, “ভেতরে যাও, যেখানে ইচ্ছা সেখানে মরো।” ফকিরটি ভেতরে প্রবেশ করল; অজু করল, দুই রাকাত নামাজ পড়ল; তারপর শুয়ে পড়ল এবং সেখানেই তার মৃত্যু হলো!
আমি তার গোসল, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করলাম। কবর দেওয়ার সময় মুখের আবরণ সরালাম—এ আশায় যে, আল্লাহ তার অনাথ-অপরিচিত অবস্থার ওপর রহম বর্ষণ করবেন। আর ঠিক তখনই সে চোখ খুলে বলল, “হে আবু আলি, যে রব নিজে আমাকে মর্যাদা দেন, তার সামনে আমাকে তুমি কি অপমান করতে চাও?”
আমি বিস্ময়ে বললাম, “হে আমার সায়্যিদ, মৃত্যুর পরও কি জীবন থাকে?”
তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমি জীবিত, আর আল্লাহর সব প্রেমিকই জীবিত। হে রুজবারি, আগামীকাল আমি আল্লাহর দরবারে আমার মর্যাদা দিয়ে তোমার জন্য সুপারিশ করব।” ১৯
তাওহিদ ও সৃষ্টির সম্পর্ক:
তিনি বলেন, “বস্তুরা কীভাবে তাঁকে প্রত্যক্ষ করবে, যখন তাঁর দ্বারাই তারা স্বীয় সত্তা থেকে ফানা (বিলীন) হয়ে গেছে? অথবা কীভাবে বস্তুরা তাঁর থেকে অনুপস্থিত থাকতে পারে, যখন তাঁর দ্বারা ও তাঁর গুণাবলি দ্বারা তারা প্রকাশিত হয়েছে? পবিত্র তিনি, যাকে কোনোকিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারে না; অথচ তাঁর কাছ থেকে কোনোকিছুই অনুপস্থিত থাকে না!”
তিনি আরো বলেন, “হৃদয়ে আল্লাহর সত্তার প্রত্যক্ষ দর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগল। তখন তাদের কাছে সেই নামসমূহ (আল-আসমাউল হুসনা) নিক্ষিপ্ত হলো, আর তারা তার ওপরই নির্ভর করল। আর সত্তা প্রচ্ছন্ন রইল তাজাল্লির (বিশেষ প্রকাশের) সময় পর্যন্ত।
আর এটাই মহান আল্লাহর বাণী— “আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব সুন্দর নাম। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেই নামেই ডাকো। সুরা আরাফ : ১৮০।
অর্থাৎ, তোমরা হাকিকত (পরম বাস্তবতা) অনুধাবন থেকে বিরত থেকে শুধু এই নামগুলোর সাথেই অবস্থান করো।” তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ নামগুলো প্রকাশ করেছেন এবং সৃষ্টির জন্য তা উন্মোচন করেছেন, যাতে এর দ্বারা তাঁর প্রতি প্রেমিকের আকুলতা শান্ত হয় এবং আরিফদের হৃদয়ে এর মাধ্যমে তাঁর সাথে প্রীতি ও অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি হয়।” ২০
আল্লাহর প্রেমিকদের ‘ওরুদ’ — মুহূর্তের মাধুর্য:
“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর প্রতি গভীর আকুলতা রাখে, তারা ‘ওরুদ’— তথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত আধ্যাত্মিক মুহূর্তে এমন এক মিষ্টতা অনুভব করে, যা আল্লাহ তাদের জন্য নৈকট্যে পৌঁছার নুরের পর্দা আংশিক তুলে ধরার ফলে সৃষ্টি হয়। এ মাধুর্য মধুর চেয়েও অধিক মিষ্ট!” ২১
ভ্রান্ত ধারণার (আল-ইগতিরার) লক্ষণ:
মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন (রহ.) বলেন, আমি মানসুর ইবনে আবদুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু আলি আর-রুজবারিকে বলতে শুনেছি, “আল-ইগতিরার (ভ্রান্ত ধারণা বা মিথ্যা নিরাপত্তা) লক্ষণ হলো— তুমি খারাপ কাজ করলে, কিন্তু আল্লাহ তোমার প্রতি ভালো কিছু করলেন, ফলে তুমি এই ভ্রান্ত ধারণায় অনুশোচনা (ইনাবাহ) ও তওবা করা ছেড়ে দিলে যে, ছোটোখাটো ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হচ্ছে, এবং তুমি মনে করো যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার প্রতি অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।” ২২
বিপদ থেকে বাঁচার উপায়:
তিনি বলেন, “যাকে তিনটি জিনিস দান করা হয়েছে, সে নিশ্চিতভাবেই বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত।
১. বিনয়ী হৃদয়ের সাথে ক্ষুধার্ত পেট।
২. সর্বদা উপস্থিত জুহদের সাথে স্থায়ী দারিদ্র্য।
৩. স্থায়ী সন্তুষ্টির সাথে পরিপূর্ণ ধৈর্য।” ২৩
তাঁর বাণী ও নসিহত:
১. সবচেয়ে উপকারী ইয়াকিন (নিশ্চয়তা) হলো— যেটি আল্লাহকে তোমার দৃষ্টিতে মহান করে তোলে, তিনি ছাড়া বাকি সবকিছুকে তুচ্ছ করে রাখে, আর তোমার অন্তরে ভয় ও আশা দুটোকেই দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে।” ২৪
২. প্রতারিত হওয়ার একটি বড় রূপ হলো— তুমি অন্যায় কর, কিন্তু তোমার প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শিত হয়; আর তুমি তওবা-ইস্তিগফার ছাড়ো এই ভেবে যে, ছোটো ভুলগুলোতে তোমাকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং তুমি মনে কর— এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার প্রতি দয়া বিস্তারের লক্ষণ!” ২৫
৩. যে তোমার নিচে আছে, তার প্রতি করুণা প্রকাশ করা দুর্বলতার চিহ্ন; আর যে তোমার উপরে আছে, তার প্রতি দৃঢ়তা প্রদর্শন করা অহঙ্কারের চিহ্ন।”
৪. কাজের চেয়ে কথার আধিক্য হলো ত্রুটি বা হীনতা। আর কথার চেয়ে কাজের আধিক্য হলো মর্যাদা বা সম্মান।
৫. যে ধৈর্যধারণ করে না তার কোনো সন্তুষ্টি (রিদা) নেই, আর যে কৃতজ্ঞতা আদায় করে না তার কোনো পূর্ণতা নেই। আল্লাহর সাহায্যেই আরিফগণ (আল্লাহর পরিচয় লাভকারীরা) তাঁর ভালোবাসা পর্যন্ত পৌঁছেছেন এবং তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেছেন।
৬. যদি তাওহিদ-পন্থীরা ‘তাজরিদ’ এর ভাষায় (সবকিছু থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবল আল্লাহর সত্তায় নিমগ্ন হওয়ার ভাষায়) কথা বলতেন, তবে কোনো সত্যপন্থী ব্যক্তিই (তা সহ্য করে) জীবিত থাকতে পারতেন না, বরং (তীব্রতায়) মৃত্যুবরণ করতেন।
৭. যে ব্যক্তি একবারও নিজের সত্তার দিকে (গর্ব সহকারে) তাকায়, সে জগতের কোনোকিছুর দিকেই শিক্ষণীয় দৃষ্টিতে তাকানো থেকে অন্ধ হয়ে যায়। ২৬
তাঁর ওফাত:
তিনি মিশরে ৩২২ হিজরিতে ওফাত লাভ করেন। ২৭
আবু আলি আর-রুজবারির বোন ফাতেমা বলেন, “যখন আমার ভাইয়ের ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন তাঁর মাথা আমার কোলে ছিল। তিনি চোখ খুললেন এবং বললেন, ‘আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, জান্নাতগুলো সজ্জিত করা হয়েছে, আর একজন ঘোষণাকারী বলছেন, ‘হে আবু আলি, তোমাকে আমরা সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছি, যদিও তুমি তা চাওনি এবং তোমাকে আমরা মহানদের স্তর দান করেছি, যদিও তুমি তা কামনা করোনি।”
এরপর তিনি আবৃত্তি করলেন—
وحقك لا نظرت إلى سواكا … بعين مودة حتى أراكا
أراك معذبي بفتور لحظ … وبالخد المورد من جناكا
তোমার শপথ, আমি ভালোবাসার চোখ দিয়ে তোমাকে ছাড়া
অন্য কারও দিকে তাকাবো না, যতক্ষণ না তোমাকে দেখি।
আমি তোমাকে দেখি, তুমিই আমাকে কষ্ট দিচ্ছো তোমার ম্লান চাহনি দ্বারা,
আর তোমার গালের রক্তিম আভা দ্বারা, যা তোমার কাছ থেকে এসেছে।
তারপর তিনি বললেন, “হে ফাতেমা, প্রথমটি (আকাশ ও জান্নাতের কথা) স্পষ্ট, আর দ্বিতীয়টি (কবিতা) দ্ব্যর্থবোধক (বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ)।”২৮