ইসলামের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে হজরত সৈয়দ আহমদ রেফায়ী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) অনন্য নাম; যাঁর জীবন ছিল বিনয়, খিদমত ও আল্লাহপ্রেমের জীবন্ত দৃষ্টান্ত। নবী করীম ﷺ–এর বংশধর হয়েও তিনি ফকিরি ও আত্মবিস্মৃত দাসত্বকেই নিজের পরিচয় করে নিয়েছিলেন।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আত্মশুদ্ধি, নফস দমন এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই ছিল তাঁর তাসাউফের মূল শিক্ষা।
তিনি প্রমাণ করে গেছেন— আধ্যাত্মিকতা অলৌকিকতার প্রদর্শনী নয়; বরং তা মানুষের কষ্ট লাঘব, অন্তরের পরিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নীরব সাধনা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রেফায়ি তরিকা যুগে যুগে অসংখ্য সাধকের হৃদয়ে ইখলাস ও খিদমতের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তিনি ছিলেন ইমাম, অনুসরণযোগ্য আদর্শ, ইবাদতগুজার, জুহদ অবলম্বনকারী এবং আরিফদের শায়খ। পূর্ণ নাম- হজরত আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবিল হাসান আলী ইবনে আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হাজিম ইবনে আলী ইবনে রিফা‘আহ আর-রিফা‘ঈ রহমাতুল্লাহি আলাইহ।
প্রথমে তিনি মাগরিবি (উত্তর আফ্রিকান) নামে পরিচিত ছিলেন, পরে বাতায়িহ অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় তাঁকে বাতায়িহি বলা হতো।
তাঁর পিতা মরক্কো থেকে এসে ইরাকের বাতায়িহ অঞ্চলের ‘উম্মু আবিদাহ’ গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি প্রখ্যাত সুফি মানসুর আল-জাহিদের বোনকে বিবাহ করেন। তাঁদের ঘরেই শায়খ আহমাদ ও তাঁর ভাইদের জন্ম হয়।
তাঁর পিতা আবুল হাসান ছিলেন একজন কারি এবং তিনি শায়খ মানসুরের উপস্থিতিতে ইমামতি করতেন। শায়খ আহমাদ যখন গর্ভে ছিলেন, তখনই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে তাঁর মামা শায়খ মানসুর তাঁকে লালন-পালন করেন। বলা হয় যে, তাঁর জন্ম হয়েছিল হিজরি ৫০০ সালের শুরুর দিকে।[1]
বংশগত শাজরা:
তিনি ছিলেন হোসাইনী ধারায় আওলাদে রসুল ﷺ। তাঁর বংশধারা হচ্ছে— আহমাদ ইবনে আবুল হাসান আলী ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হাযেম ইবনে আলী ইবনে সাবিত ইবনে আলী ইবনে হাসান আল-আসগার ইবনে আল-মাহদী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-হাসান ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইব্রাহিম ইবনে ইমাম মুসা আল-কাযিম ইবনে ইমাম জাফর আস-সাদিক ইবনে ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির ইবনে ইমাম আলী যয়নুল আবেদিন ইবনে ইমাম শহীদ হুসাইন ইবনু আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু।[2]
তরিকতের সিলসিলা:
তাঁর তরিকাগত সম্পর্ক এভাবে সংযুক্ত— তিনি তাঁর মামা শায়খ মানসুর (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেন। শায়খ মানসুর (রহ.) শায়খ আলী আল-কারী আল-ওয়াসিতী (রহ.)-এর সোহবতে ছিলেন। তিনি শায়খ আবুল ফজল ইবনু কামাখ (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেন। তিনি শায়খ আলী ইবনে তুরকান (রহ.)-এর সোহবতে ছিলেন। তিনি শায়খ আবু আলী আর-রূযবাওয়ী (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেন। তিনি শায়খ আলী আল-আজামী (রহ.)-এর সোহবতে ছিলেন। তিনি শায়খ আবু বকর আশ-শিবলী (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেন। তিনি শায়খ আবুল কাসিম আল-জুনাইদ (রহ.)-এর সোহবতে ছিলেন। আর শায়খ জুনাইদ (রহ.) শায়খ সাররি আস-সাকত্বি (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেন।
এই সনদের বাকি অংশ সুপরিচিত ও প্রসিদ্ধ।[3]
ইবাদত:
ইয়াকুব (রহ.) থেকে বর্ণিত, তাঁকে সৈয়দ আহমদ রেফায়ীর ‘অজিফা’ বা নিয়মিত ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তিনি চার রাকাত নামাজ পড়তেন যাতে এক হাজার বার ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস) পাঠ করতেন। প্রতিদিন এক হাজার বার ইস্তিগফার করতেন। তাঁর ইস্তিগফার ছিল এরূপ— “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমীন।”
আমি মন্দ কাজ করেছি, নিজের ওপর জুলুম করেছি এবং আমার কাজে সীমালঙ্ঘন করেছি। আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন; নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু। হে চিরঞ্জীব, হে মহাবিশ্বের ধারক, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”[4]
বিনয় ও নম্রতা:
কথিত আছে যে, তিনি তাঁর অনুসারীদের (মুরিদদের) কসম দিয়ে বলেছিলেন— যদি তাঁর মধ্যে কোনো দোষ থাকে, তবে যেন তারা তাঁকে সেটি জানিয়ে দেয়। তখন শায়খ উমর আল-ফারুসি বললেন, ‘হে আমার সায়্যিদ, আমি আপনার মাঝে একটি দোষ জানি।’
শায়খ আহমাদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেটি কী?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘হে সায়্যিদ, আপনার দোষ হলো— আমরা আপনার সঙ্গী (অর্থাৎ আমরা আপনার মুরিদ হওয়ার যোগ্য নই; তবুও আপনি দয়া করে আমাদের সাথে রেখেছেন)।’
একথা শুনে শায়খ আহমাদ এবং উপস্থিত সব ফকির (আধ্যাত্মিক সাধক) কেঁদে ফেললেন। উমর (রহ.) আরও বললেন, ‘নৌকা যদি বিপদ থেকে বেঁচে যায়, তবে নৌকার আরোহীরাও বেঁচে যাবে।’
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আমার সায়্যিদ, আপনি আসলে কে?’
তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘হে ফকির, এখানে ‘আমি’ বলতে কে আছে? আগে নিজের বংশীয় পরিচয় (আল্লাহর গোলাম হিসেবে) প্রমাণ করো, তারপর উত্তরাধিকার দাবি করো (অর্থাৎ আল্লাহর দাস হওয়াই জীবনের আসল পরিচয়)।’[5]
ইমাম রেফায়ি (রহ.)-এর জীবনধারা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:
১. চরম বিনয় ও তুচ্ছতা বোধ: কথিত আছে যে, একবার তাঁর সামনে এক থালা খেজুর আনা হলো। তিনি নিজের জন্য বেছে বেছে নিম্নমানের শুকনো ও নষ্ট খেজুরগুলো খেতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, “আমিই এই নিম্নমানের খেজুরের যোগ্য, কারণ আমি নিজেও তো এর মতোই তুচ্ছ।”
২. অনাড়ম্বর জীবন ও সাধনা: তিনি কখনো একসাথে দুটি জামা পরতেন না। সাধারণত দুই বা তিনদিন অন্তর মাত্র একবার আহার করতেন। নিজের কাপড় ধোয়ার প্রয়োজন হলে তিনি কাপড় পরা অবস্থাতেই নদীতে নামতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা পরিষ্কার করতেন; এরপর রোদে দাঁড়িয়ে থাকতেন যতক্ষণ না তা গায়েই শুকিয়ে যেত। যখন কোনো মেহমান আসত, তিনি তাঁর মুরিদ ও সঙ্গীদের ঘরে ঘরে ঘুরে নিজের চাদরে খাবার সংগ্রহ করে এনে মেহমানদারি করতেন।
৩. আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা ও মুখাপেক্ষিতা: তাঁর সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, “একজন দৃঢ়পদ আধ্যাত্মিক সাধক যখনই কারও কাছে কোনো প্রয়োজনের কথা বলে এবং তা পূর্ণ হয়, তখনই তার আধ্যাত্মিক মাকাম বা উচ্চমর্যাদা এক ধাপ নিচে নেমে যায়। অর্থাৎ, সে আল্লাহর ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।
৪. প্রভাবশালীদের থেকে দূরত্ব: তিনি কখনো শাসনকর্তা বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্মানে দাঁড়াতেন না। তিনি বলতেন, “তাদের মুখের দিকে তাকানো হৃদয়কে কঠোর করে দেয়।”
৫. চারিত্রিক গুণাবলি: তিনি ছিলেন অধিক তওবা ও ইস্তেগফারকারী, সুউচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী এবং পরম নিষ্ঠাবান।[6]
আহমদ রেফায়ী (রা.)-এর কিতাব ও রচনাবলি:
সৈয়দ ইমাম আহমদ রেফায়ী (রা.)-এর অসংখ্য রচনাবলি ছিল, যার বেশিরভাগই তাতারদের (মঙ্গোলীয়) আক্রমণের সময় ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁর কিতাবসমূহের মধ্যে যেগুলো সম্পর্কে জানা যায় সেগুলো হলো—
১. হালাতু আহলিল হাকিকা মা’আল্লাহ (حالة أهل الحقيقة مع الله)
২. আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম (الصراط المستقيم)
৩. কিতাবুল হিকাম শারহুত তানবিহ (كتاب الحكم شرح التنبيه) – এটি শাফেয়ী ফিকহ শাস্ত্রের গ্রন্থ।
৪. আল-বুরহান আল-মুয়াইয়্যাদ (البرهان المؤيد) – এটি তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক গ্রন্থ।
৫. মা’আনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (معاني بسم الله الرحمـٰن الرحيم)
৬. তাফসিরু সুরাতিল কদর (تفسير سورة القدر)
৭. আল-বাহজাহ (البهجة)
৮. আন-নিযাম আল-খাস লি-আহলিল ইখতিসাস (النظام الخاص لأهل الاختصاص)
৯. আল-মাজালিস আল-আহমাদিয়া (المجالس الأحمدية)
১০. আত-তারিক ইলাল্লাহ (الطريق إلى الله)
ইমাম আহমদ রেফায়ী (রা.)-এর কিতাবগুলোর মধ্যে ‘আল-বুরহান আল-মুয়াইয়্যাদ’ গ্রন্থটি আধ্যাত্মিক জগতের পথপ্রদর্শক হিসেবে সারা বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত। এতে তিনি শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বয় এবং আত্মশুদ্ধি নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন।
আধ্যাত্মিকতার মূল পথ:
তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে নিকটতম পথ হলো— নিজের আমিত্ববোধ চূর্ণ করা, বিনয় ও হীনতা প্রকাশ এবং তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়া। এর পদ্ধতি হলো, আল্লাহর আদেশকে পরম সম্মান করা, তাঁর সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ রাখা এবং রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণ করা।”[7]
তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি:
একবার তাঁকে তাসাউফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি প্রশ্নকারীকে বললেন, “তুমি কি আমাদের (কামেলদের) তাসাউফ সম্পর্কে জানতে চাও নাকি তোমাদের (সাধারণের) তাসাউফ সম্পর্কে?” প্রশ্নকারী বললেন, “হে সায়্যিদ, ছিল একটি প্রশ্ন, এখন তো দুটি হয়ে গেল! আপনি দুটিই ব্যাখ্যা করুন।”
তিনি বললেন, “তোমাদের তাসাউফ হলো— অন্তরকে পবিত্র করা, নিজের আমল ও আচরণকে সুন্দর করা, পরাক্রমশালী আল্লাহর আনুগত্য করা, রাত জেগে ইবাদত করা এবং দিনে রোজা রাখা।”
আর প্রকৃত সাধকদের তাসাউফ সম্পর্কে তিনি কবিতার ছলে বললেন—
ليس التصوف بالخرق … من قال هذا قد مرق
إن التصوف يا فتى … حرق يمازجها قلق
তাসাউফ মানে শুধু তালি দেওয়া ত্যানা তথা ছেঁড়া পোশাক পরা নয়,
যে এমনটি মনে করে সে তো ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়;
হে যুবক, তাসাউফ হলো দহন ও ব্যাকুলতা—
যার ভেতরে মিশে থাকে অস্থিরতা আর অস্থিরতা।[8]
সৃষ্টির প্রতি দয়া:
১. বলা হয় যে, একবার একটি বিড়াল শায়খ আহমাদের জামার আস্তিনের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় নামাজের সময় হলে তিনি বিড়ালটিকে বিরক্ত না করে জামার আস্তিনটি কেটে ফেললেন। নামাজ শেষে ফিরে এসে দেখেন বিড়ালটি চলে গেছে, তখন তিনি সেই কাটা অংশটি আবার জোড়া লাগিয়ে দিলেন এবং বললেন, “আসলে কিছুই পরিবর্তন হয়নি (জামা আগের মতোই আছে, কিন্তু বিড়ালটিরও কষ্ট হয়নি)।”
২. একবার তিনি অজু করছিলেন, তখন তাঁর হাতের ওপর একটি মশা এসে বসে। তিনি হাত স্থির করে দাঁড়িয়ে থাকলেন, যতক্ষণ না মশাটি নিজে থেকে উড়ে গেল।
৩. তিনি একবার এক ফকিরকে (সাধক) একটি উকুন মারতে দেখলেন। তিনি তাকে বললেন, “আল্লাহ যেন তোমাকে পাকড়াও না করেন! তুমি কি ক্ষুদ্র প্রাণীকে মেরে নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করলে?”[9]
৪. ইয়াকুব (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সৈয়দ আহমদ একটি খাদ্য গুদামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন কতগুলো কুকুর ঝুড়ি থেকে খেজুর খাচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করছে। তখন তিনি সেই গুদামের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে লাগলেন, যাতে কেউ ভেতরে ঢুকে কুকুরগুলোকে কষ্ট দিতে না পারে।[10]
সরলতা ও জনসেবা:
বর্ণিত আছে যে, তিনি শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন এবং ফিকহ শাস্ত্রে দক্ষ ছিলেন। এত বড় উচ্চমার্গের সাধক হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ হাতে লাকড়ি সংগ্রহ করতেন এবং তা বয়ে এনে বিধবা ও অসহায়দের ঘরে পৌঁছে দিতেন। এমনকি তিনি কলস ভরে তাদের ঘরে পানি এনে দিতেন।[11]
আল্লাহর দরবারে ইচ্ছা বিসর্জন ও পরম সমর্পণ:
বর্ণিত আছে— একবার লোকেরা সমবেত হলে প্রত্যেকে আল্লাহর কাছে নিজ নিজ চাওয়া প্রকাশ করল। তখন এই নিরহংকারী আহমদ (রহ.) বললেন, “হে আমার রব, আপনার জ্ঞান আমাকে ও আমার চাওয়াকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে; তাই এ কথা বারবার আমার অন্তরে প্রতিধ্বনিত হলো।”
অতঃপর আমি বললাম, “হে আমার প্রভু, আমি চাই— যেন আমি আর কিছুই না চাই; আমি নির্বাচন করি— যেন আমার কোনো নির্বাচনই না থাকে।” তখন আমার দোয়া কবুল হলো, আর আমার পক্ষে ও আমার বিপক্ষে সব বিষয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত হলো।[12]
প্রশংসা ও নিন্দায় অবিচলতা:
শায়খ আহমদ রেফায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যদি আমার ডান পাশে একদল মানুষ আমাকে দামি সুগন্ধি ও চন্দন দিয়ে বাতাস করে এবং তারা আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হয়; আর আমার বাম পাশে সমসংখ্যক মানুষ কাঁচি দিয়ে আমার শরীরের মাংস কাটতে থাকে এবং তারা আমার সবচেয়ে অপ্রিয় মানুষ হয়; তবে তাদের কারোরই এই আচরণ আমার কাছে একজনের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবে না বা অন্যজনের মর্যাদা কমিয়ে দেবে না।” অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেন, “যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য দুঃখিত না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য উল্লাসিত না হও।” সুরা আল-হাদীদ: ২৩।[13]
ওয়াজ-নসিহত:
তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে এবং জোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে মানুষকে নসিহত করতেন। তাঁর মজলিশে দূরে অবস্থানকারী ব্যক্তিও তাঁর কণ্ঠস্বর ঠিক তেমনই শুনতে পেত যেমনটা কাছের মানুষ শুনতে পেত। এমনকি তাঁর মজলিশে এমন বধির ব্যক্তিও উপস্থিত হতো যে কানে কিছুই শুনত না; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর বরকতময় কথার কারণে সেই বধিরের শ্রবণশক্তি খুলে দিতেন, ফলে সে তাঁর কথাগুলো শুনে উপকৃত হতো। তিনি প্রায়শই এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন—
والله لو علمت روحي بما نطقت … قامت على رأسها فضلا عن القدم
আল্লাহর কসম, আমার আত্মা যদি জানতে পারত সে কী (গভীর কথা) উচ্চারণ করছে,
তবে সে পায়ের বদলে মাথার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যেত।[14]
তাঁর অনুগামীদের আধ্যাত্মিক অবস্থা:
তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কিছু বিস্ময়কর অবস্থা দেখা যেত। যেমন— তারা জীবন্ত সাপ খেয়ে ফেলত, জ্বলন্ত আগুনে নামলে আগুন নিভে যেত, তারা সিংহের পিঠে সওয়ার হতো এবং এই জাতীয় আরও অনেক কিছু করতে পারতো। তাঁদের এমন কিছু ধর্মীয় উৎসব বা সমাবেশ হতো যেখানে অগণিত মানুষ উপস্থিত হতো এবং তাঁরা সবার খাবারের দায়িত্ব একাই নিতেন। এমন সামর্থ্য অন্যদের মধ্যে দেখা যেত না; বরং আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব (বিলায়াত) যেন তাঁদের জন্যই নির্ধারিত ছিল। তাঁদের বংশধরেরা উত্তরাধিকারসূত্রে সেই অঞ্চলে আজও শায়খ বা আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ও বেলায়তের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।[15]
তাঁর কবিতা:
তাঁর কবিতাও ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী। তাঁর কবিতার মধ্যে একটি হলো—
إذا جن ليلى هام قلبي بذكركم … أنوح كما ناح الحمام المطوق
وفوقي سحاب يمطر الهم والأسى … وتحتي بحار للهوى تتدفق
سلوا أم عمرو كيف بات أسيرها … تفم الأساري دونه وهو موثق
فلا هو مقتول، ففي القتل راحة … ولا هو ممنون عليه فيطلق
রাত নামলে তোমার স্মরণে আমার হৃদয় উতলা হয়, কণ্ঠবেষ্টিত ঘুঘুর মতো বিরহে কাঁদি একা।
মাথার উপর মেঘ— বর্ষায় শোক ও বেদনা ঝরে, পায়ের নিচে প্রেমের সমুদ্র— ঢেউয়ে ঢেউয়ে উছলায়।
উম্মে আমরকে জিজ্ঞেস করো— তার বন্দি কেমন রাত কাটায়? অন্য বন্দিরা মুক্তির পথ পায়, সে শুধু শৃঙ্খলেই আবদ্ধ।
হত্যাও হয় না— হত্যায় তবু একটা শান্তি থাকে, মুক্তিও মেলে না— এই মাঝামাঝি যন্ত্রণাতেই জীবন কাটে।[16]
সৈয়দ আহমদ রেফায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক রসুল ﷺ এর পবিত্র হাত মুবারক চুম্বন:
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) এই প্রসিদ্ধ ঘটনাটি তাঁর একটি বিশেষ রিসালায় বর্ণনা করেছেন, যা তিনি সৈয়দ আহমদ রেফায়ী (রা.)-এর প্রশংসায় লিখেছিলেন।
ইমাম সুয়ূতী (রহ.) যে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন, তা হলো— “আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন শায়খুল ইসলাম কামালুদ্দিন, তিনি বর্ণনা করেছেন আল্লামা শামসুদ্দিন আল-জাযারী থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন তাঁর উস্তাদ যাইনুদ্দিন আল-মারাগী থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ, ফকিহ ও মুফাসসির ইমাম আযযুদ্দিন আহমদ আল-ফারুসী থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন আল্লামা আবু ইসহাক ইব্রাহিম আল-ফারুসী থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণের ইমাম এবং সূফি-আলেমদের প্রধান শায়খ আযযুদ্দিন উমর আবুল ফারাজ আল-ফারুসী আল-ওয়াসিতী রহমাতুল্লাহি আলাইহিম থেকে।
তিনি (আবুল ফারাজ) বলেন, ‘আমি ৫৫৫ হিজরি সনে আমাদের আশ্রয়স্থল ও মুর্শিদ কুতুব, গাউস, আহমদ রেফায়ী আল-হুসাইনী (রা.)-এর সাথে ছিলাম। সেই বছর আল্লাহ তাঁর ভাগ্যে হজ নির্ধারণ করেছিলেন। যখন তিনি মদিনা শরিফে পৌঁছালেন, তখন নবীজির রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়ালেন এবং জনসমক্ষে উচ্চস্বরে বললেন— আসসালামু আলাইকা ইয়া জাদ্দি — সালাম আপনার ওপর, হে আমার নানাজান! তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতর থেকে উত্তর দিলেন— ওয়া আলাইকাস সালামু ইয়া ওয়ালাদি — তোমার ওপরও সালাম, হে আমার সন্তান।
মসজিদে নববীতে উপস্থিত সবাই সেই আওয়াজ শুনতে পেলেন। সৈয়দ আহমদ রেফায়ী এই নেয়ামত লাভ করে আধ্যাত্মিক প্রেমে বিগলিত হলেন, ভয়ে কাঁপতে লাগলেন এবং তাঁর চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করল। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, অতঃপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে এই কবিতাটি পাঠ করলেন—
في حالة البعد روحي كنت أرسلها
تُقَبِّلُ الأرض عني وهي نائبتي
وهذه دولة الأشباح قد حضرت
فامدد يمينك كي تحظى بها شفتي
হে প্রিয়নবী, বিরহকালে আমি আমার রুহকে পাঠিয়ে দিতাম,
সে আমার প্রতিনিধি হয়ে আপনার রওজার মাটি চুম্বন করত।
আর আজ সশরীরে আপনার দরবারে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে;
অতএব আপনার নুরানি হাত বাড়িয়ে দিন, যেন আমার ঠোঁট তা চুম্বন করে ধন্য হতে পারে।
তখন রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর পবিত্র রওজা থেকে নিজের সুগন্ধিময় হাত মুবারক বের করে দিলেন এবং সৈয়দ আহমদ তা চুম্বন করলেন। সেই সময় সেখানে প্রায় নব্বই হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল এবং সবাই সেই নুরানি হাত মুবারক স্বচক্ষে দেখছিলেন।
উপস্থিত হাজিদের মধ্যে— শায়খ হায়াত বিন কায়েস আল-হাররানী, বাগদাদের শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী, শায়খ খামিস এবং সিরিয়ার শায়খ আদি বিন মুসাফির (রা.) ছিলেন। আল্লাহ আমাদের তাঁদের ইলম দ্বারা উপকৃত করুন এবং সেই নবীজির হাত দেখার বরকতে আমাদের ধন্য করুন। সেই দিনই শায়খ হায়াত বিন কায়েস আল-হাররানী সাইয়েদ আহমদ রেফায়ীর খেলাফত (তরিকতের পোশাক) পরিধান করেন এবং তাঁর মুরিদদের অন্তর্ভুক্ত হন।
ইমাম সুয়ূতী (রহ.) এই ঘটনার আরও অনেকগুলো বর্ণনা সূত্র (সনদ) উল্লেখ করার পর বলেন, এটি অত্যন্ত সুপরিচিত যে, এই মুবারক মর্যাদাটি (কারামত) মুসলমানদের মধ্যে ‘মুতাওয়াতির’ (সন্দেহাতীত ও ব্যাপকভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সনদগুলো অত্যন্ত উঁচু মানের এবং বর্ণনাকারীগণ এ ব্যাপারে একমত। তাই এটি অস্বীকার করা নিফাক বা কপটতার লক্ষণ।
এরপর তিনি একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন— “যেহেতু ইমাম রেফায়ী এবং উপস্থিত জিয়ারতকারীগণ নবীজির হাত সরাসরি দেখেছেন, তবে কি তাঁরা ‘সাহাবি’র মর্যাদা পাবেন?” জবাবে ইমাম সুয়ূতী বলেন, সঠিক উত্তর হলো—না, তাঁরা সাহাবি হিসেবে গণ্য হবেন না। ইমাম সাখাভি (রহ.) ও অন্যান্যরা এটাই বলেছেন। কারণ, নবীজির বর্তমান জীবন হলো ‘আখিরাতের জীবন’, যা দুনিয়াবী জীবনের মতো নয়। দুনিয়াবী জীবনের মতো বিধিবিধান এখানে প্রযোজ্য হবে না। যেমন সাহাবি হওয়ার জন্য নবী করিম (ﷺ)-কে পার্থিব জীবনে দেখা শর্ত। যেমন মেরাজের রাতে বাইতুল মোকাদ্দাসে অনেক নবী নবীজির পেছনে নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা সাহাবি হিসেবে গণ্য হন না।’[17]
এছাড়াও শায়খ আব্দুল করিম ইবনু মুহাম্মদ আল-রেফায়ী বলেন, আমাদের শায়খ, ইমাম হুজ্জাতুল কুদওয়াহ আবুল ফারাজ উমর আল-ফারুসী আল-ওয়াসিতী আমাকে জানিয়েছেন, “আমাদের পীর ও মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ রিফায়ী ৫৫৫ হিজরিতে হজ পালন করেন। যখন তিনি মদিনায় পৌঁছালেন এবং তাঁর নানা (রসুলুল্লাহ ﷺ)-এর জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করলেন, তিনি নবীজির রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়ালেন। আমরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া জাদ্দি’। তখন রাওজা মোবারকের ভেতর থেকে উত্তর এলো— ‘ওয়া আলাইকাস সালাম ইয়া ওয়ালাদি’।
এই মহান নেয়ামত লাভ করে তিনি আত্মহারা হয়ে পড়লেন এবং কাঁপতে কাঁপতে উপর্যুক্ত পঙক্তিগুলো পাঠ করলেন। অতঃপর রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর পবিত্র রওজা মোবারক থেকে নিজের নুরানি হাত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন এবং সৈয়দ আহমদ রেফায়ী (রা.) সেই হাতে চুমু খেলেন।
সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত প্রায় নব্বই হাজার মানুষ এই দৃশ্য সরাসরি দেখছিলেন এবং তাঁরা নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র বাণী (সালামের উত্তর) নিজ কানে শুনতে পাচ্ছিলেন। সেই মহান মজলিসে উপস্থিত থেকে এই বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন— শায়খ হায়ওয়াত বিন কায়েস আল-হাররানী, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী এবং শায়খ আদি আশ-শামী (রহমাতুল্লাহি আলাইহিম)। তাঁরা-সহ আরও অনেক মহান বুজুর্গ এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।[18]
আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও মুরিদদের কল্যাণ:
তিনি বলতেন, “প্রকৃত শায়খ বা পীর তো তিনিই, যিনি তাঁর মুরিদের নাম দুর্ভাগাদের তালিকা থেকে মুছে দিতে পারেন!”
জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে উপস্থিত হলো, যার কপালে দুর্ভাগ্যের চিহ্ন বা লেখা পরিলক্ষিত হচ্ছিল; কিন্তু শায়খ রিফায়ী (রহ.)-এর বরকতে তা মুছে গেল।
তাঁকে একদা একজন ‘মুতামাক্কিন’ (সুপ্রতিষ্ঠিত বা দৃঢ়পদ) আধ্যাত্মিক সাধকের গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “তিনি হলেন সেই ব্যক্তি, যাঁর জন্য যদি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় একটি সূক্ষ্ম চুল বা আঁশ খাড়া করে রাখা হয় এবং প্রবল দক্ষিণা বাতাস প্রবাহিত হয়, তবুও তাঁর একটি চুলও নড়চড় হবে না। অর্থাৎ, কোনো জাগতিক বিপর্যয় তাঁকে বিচলিত করতে পারবে না।”
তিনি ইন্তেকালের পূর্বে বলেছিলেন, “যার কোনো শায়খ (আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক) নেই, আমি তার শায়খ; আমি নিঃসঙ্গ-নিঃস্বদের শায়খ।”[19]
শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর সাথে তাঁর আধ্যাত্মিক সাক্ষাৎ ও মূল্যায়ন:
আবুল আব্বাস খিজির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হাসানি আল-মাউসিলি বর্ণনা করেন, “একদিন আমি শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর সামনে বসা ছিলাম। হঠাৎ আমার মনে শায়খ আহমাদ রিফায়ীর কথা উদয় হলো। শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ‘তুমি কি তাঁকে দেখতে চাও?’
আমি বললাম, ‘জি হ্যাঁ!’
তখন তিনি মাথা নিচু করে ধ্যানমগ্ন হলেন এবং বললেন, ‘তিনি উপস্থিত হয়েছেন!’
আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম করলাম।
শায়খ রিফায়ি (রহ.) আমাকে বললেন, ‘হে খিজির, যে ব্যক্তি অলিদের সর্দার শায়খ আব্দুল কাদিরের মতো ব্যক্তিত্বকে দেখছে, সে আমার মতো নগণ্যকে দেখার তামান্না কেন করে? আমি তো তাঁর প্রজাদের (অনুসারীদের) একজন ছাড়া আর কেউ নই।’ এরপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
শায়খ আব্দুল কাদিরের ইন্তেকালের পর আমি যখন শায়খ রিফায়ীর জিয়ারতে গেলাম, তখন তিনি আমাকে দেখে বললেন, ‘হে খিজির, প্রথমবার দেখাই কি তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল না?’
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ আল-বাতায়িহী বর্ণনা করেন, “শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবদ্দশায় আমি একবার উম্মু আবিদাহ গ্রামে (শায়খ রিফায়ীর দরবারে) গেলাম। শায়খ আহমাদ আমাকে বললেন, ‘আমাকে শায়খ আব্দুল কাদিরের কিছু গুণাবলি ও মর্যাদা (মানাকিব) সম্পর্কে শোনাও।’ আমি তাঁর কিছু গুণ বর্ণনা করতে শুরু করলাম। আমার বর্ণনার মাঝখানে এক ব্যক্তি বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘থামো, আমাদের সামনে এঁর গুণগান করবে না!’
শায়খ রিফায়ী (রহ.) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তার দিকে তাকালেন, আর সাথে সাথে লোকটি তাঁর সামনে মৃত অবস্থায় পড়ে রইল। অতঃপর শায়খ রিফায়ী বললেন, ‘কার সাধ্য আছে তাঁর (গাউসে পাকের) গুণের বর্ণনা করার? কে তাঁর মকামে পৌঁছাতে পারে? তিনি এমন এক পুরুষ যাঁর ডান পাশে শরিয়তের সমুদ্র আর বাম পাশে হাকিকতের (আধ্যাত্মিক রহস্যের) সমুদ্র বহমান; তিনি যখন যা খুশি সেখান থেকে গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ নেই।”
তিনি (ইমাম রিফায়ী) তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং তাঁর প্রধান অনুসারীদের অসিয়ত করলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে বিদায় নিতে এলো। কারণ, সে বাগদাদে সফর করছিল। তখন শায়খ তাকে বললেন, “যখন তোমরা বাগদাদে প্রবেশ করবে, তখন শায়খ (আব্দুল কাদির জিলানী)-এর জিয়ারতের ওপর অন্য কাউকে অগ্রগণ্য করবে না। চাই তিনি জীবিত থাকুন বা মৃত।
তাঁর ব্যাপারে এই অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে যে, আমার অনুসারীদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি বাগদাদে প্রবেশ করল; অথচ তাঁর জিয়ারত করল না, তার আধ্যাত্মিক অবস্থা (হাল) ছিনিয়ে নেওয়া হবে। এমনকি তা যদি তার মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তেও হয়। শায়খ আব্দুল কাদির সম্পর্কে এটুকুই বলব—যে ব্যক্তি তাঁকে দেখেনি, তার জন্য আফসোস ও আক্ষেপের সীমা নেই!”[20]
তাঁর কারামত:
১. একবার তিনি নদীর তীরে বসে বললেন, “আমার পোড়া মাছ খেতে ইচ্ছে করছে।” তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই নদীর তীর মাছে ভরে গেল। সেদিন সেখানে মাছের এমন প্রাচুর্য দেখা গেল, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
তিনি বললেন, “এই মাছগুলো আল্লাহর দোহাই দিয়ে আমাকে বলছে যেন আমি তাদের থেকে আহার করি।” অতঃপর লোকজন সেই মাছ রান্না করে খেল। পাতিলে মাছের কিছু মাথা, লেজ ও অবশিষ্টাংশ থেকে গিয়েছিল।
তখন এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “হুজুর, মুতামাক্কিন (আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত) ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “যাঁকে সমস্ত সৃষ্টির ওপর আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব (তাসরীফে আম) দান করা হয়েছে। আর এর চিহ্ন হলো— তিনি যদি এই মাছের অবশিষ্টাংশকে বলেন, ‘দাঁড়াও এবং চলো’, তবে সেগুলো প্রাণ পেয়ে চলতে শুরু করবে।” এরপর শায়খ সেগুলোর দিকে ইশারা করতেই মাছের হাড়গুলো জ্যান্ত হয়ে চলতে শুরু করল।
২. তাঁর ভাগ্নে আবদুর রহিম আবুল ফারাজ বর্ণনা করেন, তিনি শায়খের কাছে এক ব্যক্তিকে আসতে করতে দেখলেন। শায়খ তাকে বললেন, “স্বাগতম হে পূর্বাঞ্চলীয় আওতাদ!” আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, “আমি বিশদিন ধরে কিছু পানাহার করিনি। আমি চাচ্ছি আকাশের ওই রাজহাঁসগুলোকে নির্দেশ দিতে যেন একটি ভুনা হয়ে নিচে নেমে আসে।”
তিনি নির্দেশ দেওয়া মাত্রই একটি রাজহাঁস ভুনা অবস্থায় নিচে নেমে এলো। এরপর তিনি পাশ থেকে দুটি পাথর নিলেন, যা রুটিতে পরিণত হলো। অতঃপর শূন্যে হাত বাড়িয়ে একটি পানির পাত্র ধরলেন। তিনি আহার ও পান শেষ করে পুনরায় আকাশে উড়ে গেলেন।
শায়খ রিফায়ী (রহ.) তখন হাঁসের সেই হাড়গুলোকে বললেন, “আল্লাহর নামে চলে যাও!” হাড়গুলো তৎক্ষণাৎ জোড়া লেগে পাখি হয়ে উড়ে গেল।[21]
তাঁর বাণী:
১. যে ব্যক্তি এমন বিষয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, যা তার জন্য জরুরি নয়; সে অবশ্যই সেই জরুরি বিষয় থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
২. মানুষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে।
৩. আদব হলো ফকিরদের সুন্নত এবং ধনীদের উত্তরাধিকার।
৪. তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ কী?”
তিনি উত্তর দিলেন, “হালাল উপার্জনের অভাবের কারণে!”
৪. তাঁকে ফুতুওয়াত (নৈতিক বীরত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “ভাইদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়াই ফুতুওয়াত। আর নিজের জন্য অন্যের উপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব কল্পনা না করা।”
৫. যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন, তখন তাঁর এক সঙ্গী বললেন, ‘আমাদের কিছু উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি জীবনে কল্যাণকর কাজ করেছে সে তার সুফল পাবে, আর যে মন্দ কাজ করেছে সে লজ্জিত হবে।”[22]
ওফাত ও ওফাতকালীন অবস্থা:
তাঁর শেষ অসুস্থতা ছিল ডায়রিয়া, যা এক মাসেরও বেশি স্থায়ী হয়েছিল। দিন ও রাত মিলিয়ে দৈনিক ত্রিশ বারেরও বেশি তাঁকে হাজত সারতে হতো; কিন্তু প্রতিটি বারই তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে অজু করতেন এবং নামাজ আদায় করতেন।
তিনি বলেছিলেন যে, মহান রব তাঁর সাথে ওয়াদা করেছেন, পার্থিব কোনো মাংসের বোঝা নিয়ে তিনি এই জগত অতিক্রম করবেন না। ফলে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগেই তাঁর শরীরের সমস্ত মাংস বিলীন হয়ে গিয়েছিল। লাগাতার ডায়রিয়ার ফলে তিনি অত্যন্ত রোগা হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি এই অবস্থায় ধৈর্যধারণ করে হিজরি ৫৭৮ সালের ১২ই জমাদিউল আউয়াল, বৃহস্পতিবার ইন্তেকাল করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল সত্তর বছরের কাছাকাছি এবং স্থানটি ছিল ইরাকের ‘উম্মু আবীদাহ’। তবে শাতনুফি (রহ.) তাঁর ‘মানাকিবে সায়্যিদি আব্দুল কাদির জিলানী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর বয়স আশি বছরের কাছাকাছি হয়েছিল।[23]
ইমাম যাহাবী বলেন, “মহান আল্লাহর এই প্রিয় অলি হিজরি ৫৭৮ সালের জমাদিউল আউয়াল মাসে ইন্তেকাল করেন।[24]