ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন, জ্ঞান ও চরিত্রের দীপ্তি কালের প্রবাহে কখনো ম্লান হয় না। তাফসির, হাদিস, জুহদ ও তাকওয়ার জগতে যাঁরা উজ্জ্বল নক্ষত্র, তাঁদের মধ্যে হজরত হাসান বসরি (রহ.) এক অনন্য নাম। তিনি তাবেয়িদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠদের একজন ছিলেন। জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও আখলাকের এমন অপূর্ব সমন্বয় তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যা তাঁকে যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগের কেন্দ্রবিন্দুতে। হজরত হাসান বসরি (রহ.)-এর পূর্ণ নাম হাসান ইবনু আবুল হাসান ইয়াসার; কুনিয়াত আবু সাঈদ। তিনি আনসারি সাহাবি হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত (রা.)-এর মুক্তদাস (মাওলা) ছিলেন—এ মতও পাওয়া যায়। আবার বলা হয়, তিনি আবুল ইয়াসার কা‘ব ইবনু আমর আস-সুলামী (রা.)-এর মাওলা ছিলেন। এই মতটি আবদুস সালাম আবু মুতাহহার, গাদিরাহ ইবনু কুরহাদ আল-আউফি-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হাসান বসরি (রহ.)-এর মা ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন হজরত উম্মে সালামা আল-মাখযূমিয়্যা (রা.)-এর দাসী। আবার এটাও বলা হয়, তিনি জামিল ইবনু কুতবা-এর মাওলা ছিলেন। তাঁর পিতা ইয়াসার ছিলেন মায়সান এলাকার যুদ্ধবন্দিদের অন্তর্ভুক্ত। পরে তিনি মদিনায় বসবাস করেন এবং মুক্তি লাভ করেন। এরপর তিনি হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মদিনাতেই বিবাহ করেন। সেই বিবাহ থেকে হাসান (রহ.)-এর জন্ম হয় উমর (রা.)-এর খিলাফতের শেষ দুই বছরের কোনো এক সময়। তাঁর মায়ের নাম ছিল খায়রাহ। পরবর্তীতে হাসান বসরি (রহ.) ওয়াদিল কুরা এলাকায় লালিত-পালিত হন। তিনি হজরত উসমান (রা.)-এর সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং তাঁর খুতবা শুনেছেন। তিনি ‘ইয়াওমুদ-দার’ (উসমান রা.-এর অবরোধ ও শাহাদাতের দিন)-এও উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। [1]
শৈশব:
শৈশবেই তিনি জ্ঞান ও তাকওয়ার গর্ভভূমি মদিনায় বেড়ে ওঠেন। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে উম্মে সালামা (রা.) হয়ে ওঠেন তাঁর অভিভাবিকা; তাঁর ছায়ায় এবং সাহাবায়ে কিরামের সান্নিধ্যে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকেন। এ সুবর্ণ সুযোগে তিনি প্রায় ১৩০ জন সাহাবির সাহচর্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে হজরত আলী (রা.), হজরত উসমান (রা.), হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এবং হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতো বরেণ্য সাহাবিগণও ছিলেন।
মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম বলেন, আমাদের কাছে আবু আমর আশ-শা‘আবী তাঁর সনদসহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উম্মে সালামা (রা.) হাসানের মাকে যখন কোনো কাজে পাঠাতেন, তখন শিশু হাসান কাঁদত। উম্মে সালামা তাঁকে দুধ দিয়ে শান্ত করতেন। এরপর ছোটো অবস্থাতেই তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিদের কাছে নিয়ে যেতেন। তাঁর মা উম্মে সালামার কাছেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন; ফলে সাহাবিগণ হাসানের জন্য দোয়া করতেন। একবার তাঁকে হজরত উমর (রা.)-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে দিন।” [2]
ইলম অর্জন:
জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে তিনি সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ উৎসগুলোর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। হজরত হাসান বসরি (রহ.) বহু সাহাবি ও তাবেয়িদের সোহবতে ইলম অর্জন করেছেন। তিনি ইমরান ইবনু হুসাইন, মুগীরা ইবনু শু‘বা, আবদুর রহমান ইবনু সামুরা, সামুরা ইবনু জুনদুব, আবু বকরাহ আস-সাকাফী, নু‘মান ইবনু বশীর, জাবির, জুনদুব আল-বাজালী, ইবনু আব্বাস, আমরু ইবনু তাগলিব, মা‘কিল ইবনু ইয়াসার, আসওয়াদ ইবনু সারী, আনাস (রাদিআল্লাহু আনহুম)—সহ আরও বহু সাহাবির নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি হিত্তান ইবনু আবদুল্লাহ আর-রাকাশী (রহ.)-এর কাছে কুরআন পাঠ শিখেছেন এবং বহু তাবেয়ির কাছ থেকেও বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। [3]
শাগরিদ (ছাত্রবৃন্দ):
তাঁর জ্ঞানের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল এক বিশাল ছাত্রসমাজ। হজরত হাসান বসরি (রহ.) থেকে যাঁরা ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন— আইয়ুব, শাইবান আন-নাহবী, ইউনুস ইবনু উবাইদ, ইবনু আউন, হুমাইদ আত-তাওয়ীল, সাবিত আল-বুনানী, মালিক ইবনু দিনার, হিশাম ইবনু হাসসান, জারীর ইবনু হাজিম, রাবী‘ ইবনু সুবাইহ, ইয়াজীদ ইবনু ইবরাহীম আত-তুস্তারী, মুবারক ইবনু ফাদালা, আবান ইবনু ইয়াজীদ আল-আত্তার, কুররাহ ইবনু খালিদ, হাজম আল-কুতাঈ, সালাম ইবনু মিসকীন, শুমাইত ইবনু আজলান, সালিহ আবু ‘আমির আল-খাজ্জাজ, আব্বাদ ইবনু রাশিদ, আবু হারীজ আবদুল্লাহ ইবনু হুসাইন (সিজিস্তানের কাজি), মু‘আভিয়া ইবনু আবদুল করিম আদ-দাল্ল, ওয়াসিল আবু হুররা আর-রাকাশী, হিশাম ইবনু জিয়াদ, শুবাইব ইবনু শাইবা, আশ‘আস ইবনু বারাজ, আশ‘আস ইবনু জাবির আল-হুদ্দানী, আশ‘আস ইবনু আবদুল মালিক আল-হুমরানী, আশ‘আস ইবনু সাওয়ার, আবু আল-আশহাব। এছাড়াও আরও অনেকে। [4]
তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি:
তিনি কেবল আত্মিক নয়, শারীরিক সৌন্দর্যেও ছিলেন অনন্য। তিনি ছিলেন সুঠামদেহী, সুন্দর অবয়ব ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি প্রখ্যাত বীরদের মধ্যেও অন্যতম। মুহাম্মদ ইবনু সাদ বলেন, হাসান (রহ.) ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত, বিজ্ঞ আলেম, সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, ফকিহ, নির্ভরযোগ্য (সিকাহ), অকাট্য দলিল (হুজ্জাত), বিশ্বস্ত, ইবাদতগুজার, নিবেদিতপ্রাণ সাধক, অগাধ ইলমের অধিকারী, সুবক্তা ও অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ।
আল-আসমাঈ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি হাসান আল-বসরির হাতের কবজির চেয়ে প্রশস্ত কবজি আর কারও দেখিনি; তাঁর কবজি এক বিঘত প্রশস্ত ছিল।” আবু বুরদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান আল-বসরির চেয়ে অন্য কাউকে মুহাম্মদ ﷺ-এর সাহাবিদের সাথে এতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ (চালচলন ও স্বভাবে) দেখিনি।” মুজালিদ আশ-শা’বী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “হাসানের চেয়ে প্রভাবশালী বা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর কাউকে আমি দেখিনি।” আমাতুল হাকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান যখন হাত্তান আর-রাকাশীর কাছে আসতেন, তখন আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর চেহারার কোনো যুবক দেখিনি।” [5]
তাঁর স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:
তাঁর জীবন ছিল কথা ও কাজের এক নিখুঁত সংমিশ্রণ। খালিদ বিন সাফওয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হীরা (ইরাকের একটি প্রাচীন শহর) নামক স্থানে আমার সাথে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, “হে খালিদ, আমাকে বসরার অধিবাসী হাসান সম্পর্কে কিছু বলো।”
আমি বললাম, “আল্লাহ আমিরের কল্যাণ করুন। আমি পূর্ণ জ্ঞান ও নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁর সম্পর্কে বলছি। কারণ আমি তাঁর প্রতিবেশী এবং তাঁর মজলিসে তাঁর পাশেই বসি। তাঁর সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তিনি এমন ব্যক্তি, যার গোপন জীবন ও প্রকাশ্য জীবন অভিন্ন; কথা ও কাজে কোনো অমিল নেই। তিনি কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিলে তা সম্পন্ন করেই ওঠেন; আর কোনো কিছুর ওপর দাঁড়ালে তা পালন করেই বসেন। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দেন, তখন নিজেই হন সেই কাজের সবচেয়ে বড় আমলকারী; আর যখন কোনো কাজ থেকে নিষেধ করেন, তখন নিজেই হন বর্জনকারীদের মধ্যে সবার প্রথম। আমি তাঁকে মানুষের থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী (নির্লোভ) দেখেছি; অথচ দেখেছি—মানুষ সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী (জ্ঞানের প্রয়োজনে)।” তখন মাসলামা (রহ.) বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে, হে খালিদ। এমন একজন মানুষ যে জাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, সে জাতি কীভাবে পথভ্রষ্ট হতে পারে?” [6]
পোশাক-পরিচ্ছদ:
পরিচ্ছন্নতা ও গাম্ভীর্য ছিল তাঁর পোশাকের ভূষণ। মুসলিম ইবনু ইব্রাহিম বর্ণনা করেন, সাল্লাম ইবনু মিসকীন বলেছেন, “আমি হাসানকে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল রঙের একটি ক্বাবা (এক ধরনের দীর্ঘ বহিঃপোশাক) পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।” ইবনু উলাইয়্যাহ ইউনুস থেকে বর্ণনা করেন, “হাসান শীতকালে ‘হিবারাহ’ (কারুকার্যখচিত ইয়ামেনি চাদর) ক্বাবা, কুর্দিশ তৈলাসান (মাথার চাদর) এবং কালো পাগড়ি পরতেন। আর গ্রীষ্মকালে পরতেন শণ বা লিনেন কাপড়ের লুঙ্গি, কামিজ এবং হিবারাহ চাদর।” হাওশাব হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “মুমিন ব্যক্তি উত্তম পোশাকের মাধ্যমে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করে (অথবা মর্যাদা রক্ষা করে)।” [7]
মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব:
তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষীদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন এক পরম সম্পদ। আবু হিলাল বলেন, আমি কাতাদার কাছে ছিলাম; এমন সময় হাসান আল-বসরির মৃত্যুসংবাদ এলো। আমি বললাম, “তিনি তো ইলমের সাগরে নিমজ্জিত ছিলেন।” কাতাদা বললেন, “বরং তিনি ইলমের ভেতরেই বেড়ে উঠেছেন, একে ধারণ করেছেন এবং নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহর কসম, কেবল ‘হারুরি’ (খারেজি) ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে ঘৃণা করে না।” মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম আল-জুমাহি হাম্মাম থেকে এবং তিনি কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “বলা হয়ে থাকে পৃথিবী কখনোই সাতজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির দল থেকে শূন্য থাকে না; যাদের ওসিলায় মানুষ বৃষ্টি পায় এবং যাদের ওসিলায় বিপদ-আপদ দূর করা হয়। আমি আশা করি, হাসান সেই সাতজনের একজন ছিলেন।”
কাতাদা আরও বলেন, “পৌরুষ ও শিষ্টাচারের দিক থেকে হাসানের চেয়ে পরিপূর্ণ আর কেউ ছিল না।” হুমাইদ ও ইউনুস বলেন, “আমরা হাসানের চেয়ে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ পৌরুষ ও চরিত্রের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।” আলী ইবন জায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়াহ, কাসিমসহ আরও অনেক বড় তাবেয়ির কথা শুনেছি; কিন্তু হাসানের মতো আর কাউকে দেখিনি। তিনি যদি সাহাবিদের সমসাময়িক হতেন এবং তাঁদের সমান বয়সের হতেন, তবে তাঁরা (জ্ঞানের দৌড়ে) তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন না।” [8]
ইবাদত-রিয়াজত:
ইবাদতের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পথিক। সারিয়্যাহ ইবন ইয়াহইয়া বলেন, হাসান (রহ.) আইয়ামে বিয (প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ), আশহুরে হুরুম (চারটি পবিত্র মাস), এবং প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। [9]
তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সাধনা তাঁকে এক ভিন্ন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী বলেন, “আমি হাসানের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখবোধসম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি। আমি যখনই তাঁকে দেখতাম, মনে হতো তিনি এইমাত্র কোনো বড়ো বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন।” [10]
তাকওয়া:
আল্লাহভীতি তাঁর হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে ছিল যে, তা তাঁর চোখে অশ্রু হয়ে ঝরত। হজরত ইউনূস (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, “আমরা হাসাহাসি করি; অথচ হতে পারে আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টিপাত করে বলেছেন— আমি তোমাদের থেকে কিছুই কবুল করব না।” হাকিম বিন জাফর (রহ.) বলেন, মাসমা আমাকে বলেছেন, “তুমি যদি হাসানকে দেখতে, তবে মনে করতে দুনিয়ার সব সৃষ্টিজীবের দুঃখ-বেদনা যেন তাঁর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ অশ্রুপাত এবং কান্নার শব্দের আধিক্য দেখে এমনটাই মনে হতো।” মুহাম্মদ বিন সাদ (রহ.) বলেন, ইয়াজিদ বিন হাওশাব বলেছেন, “আমি হাসান বসরি এবং ওমর বিন আব্দুল আজিজের চেয়ে বেশি ভীতসন্ত্রস্ত আর কাউকে দেখিনি। তাঁদের অবস্থা দেখে মনে হতো— জাহান্নাম যেন কেবল তাঁদের দুজনের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।”
হাফস বিন ওমর (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার কাঁদলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কেন কাঁদছেন?” তিনি বললেন, “আমি ভয় করি, কাল (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন; এবং তিনি এর কোনো পরোয়া করবেন না।” হুমাইদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার মসজিদে থাকা অবস্থায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং এমনভাবে কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, “যদি অন্তরে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরে সততা থাকত, তবে সেই রাতটির কথা ভেবে তোমরা কান্নায় ভেঙে পড়তে—যার ভোর হবে কিয়ামত দিয়ে। নিশ্চয়ই কিয়ামতের সকালের সেই রাতে মানুষ এমন কিছু শুনবে, যা আগে কখনো শুনেনি; সেদিন মানুষের গোপন লজ্জাসমূহ প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং চোখের পানি ঝরবে।” [11]
জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
দুনিয়ার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। হিশাম ইবনু হাসান বলেন, আমি হাসানকে আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি দিরহামকে (টাকা-পয়সাকে) সম্মান করবে (অতিরিক্ত মর্যাদা দেবে), আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন।” হাযম ইবনু আবি হাযম বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি, “দিনার ও দিরহাম কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার উপকারে আসে না, যতক্ষণ না তারা তোমাকে ছেড়ে চলে যায় (অর্থাৎ খরচ করা না পর্যন্ত কাজে আসে না)।” সাল্লাম ইবনু মিসকিন হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করো (এর মোহ ত্যাগ করো)। আল্লাহর কসম, তুমি একে যতটা তুচ্ছ মনে করবে, এটি তোমার কাছে ততটাই সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক হবে।”
ইবন শাওজাব মাতার থেকে বর্ণনা করেন, “আমরা হাসানকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, তাঁর ঘরে (আসবাবপত্র বলতে) কিছুই নেই, কোনো বিছানা নেই, গালিচা নেই, বালিশ নেই; এমনকি কোনো চাটাইও নেই। শুধু দড়ি দিয়ে বোনা একটি সাধারণ খাট ছিল, যার ওপর তিনি শুয়ে ছিলেন।” [12] ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী (রহ.) বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি যখন দুনিয়ার অনুসারীদের কথা উল্লেখ করতেন, তখন বলতেন, “আল্লাহর কসম, না দুনিয়া তার জন্য অবশিষ্ট থাকে, না সে নিজে দুনিয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকে। সে দুনিয়ার দায়, অকল্যাণ ও হিসাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। অবশেষে তাকে দুনিয়া থেকে বের করে দেওয়া হয়। কেবল কয়েক টুকরো কাফনের কাপড়ে জড়ানো অবস্থায়।” [13]
আখেরাত ভাবনা:
আখেরাতের চিন্তা ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি। আহমদ বিন জাফর বিন হামদান (রহ.) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুমাইদ (রহ.) বলেছেন, “রজব মাসের একদিন হাসান বসরি (রহ.) মসজিদে ছিলেন। তিনি পানি দিয়ে কুলি করছিলেন; এমন সময় তিনি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর তিনি এতটাই কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ থরথর করে কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, ‘যদি অন্তরগুলোতে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরগুলোতে সততা ও শুভবুদ্ধি থাকত, তবে আমি সেই রাতটির কথা বলে তোমাদের কাঁদিয়ে দিতাম, যার ভোর হবে কিয়ামতের দিন দিয়ে।” তিনি আরও বলেন, “আগামীকাল কেবল সেই বিষয়েই প্রত্যেক মানুষ ব্যস্ত থাকবে, যা তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছিল। মানুষ যে বিষয়ে বেশি চিন্তা করে, সেটাই তার আলোচনার কেন্দ্র হয়ে যায়। যার কোনো আখিরাত নেই, তার কোনো দুনিয়াও নেই। আর যে ব্যক্তি তার আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, তার না দুনিয়া থাকে, না আখিরাত।” [14]
বিনয় ও গাম্ভীর্য:
বিনয় ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। ইউসুফ বিন আসবাত (রহ.) বলেন, “হাসান বসরি টানা ত্রিশ বছর হাসেননি এবং চল্লিশ বছর কোনো কৌতুক করেননি।” তিনি আরও বলেন, হাসান বসরি বলতেন, “আমি এমন এক প্রজন্মের (সাহাবায়ে কেরাম) দেখা পেয়েছি, যাঁদের তুলনায় আমি নিজেকে একজন চোর ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।” [15]
তাসাউফ চর্চার মজলিস:
আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য তিনি বিশেষ মজলিসের আয়োজন করতেন। আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি তাঁর ‘তাবাকাতুন নুসসাক’ গ্রন্থে বলেন, আমরা যে সমস্ত ইবাদতগুজার ও সাধক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছি, তাঁদের অধিকাংশই হাসান আল-বসরির কাছে যেতেন, তাঁর কথা শুনতেন এবং বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা ও ফিকহকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। আমর ইবনে উবাইদ এবং আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন।
হজরত হাসানের নিজ ঘরে একটি বিশেষ মজলিস ছিল, যেখানে তিনি জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা), ইবাদত (নুসুক) এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান (উলুমে বাতিন) ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতেন না। সেখানে কেউ অন্য কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিরক্ত হতেন এবং বলতেন, “আমরা এখানে আমাদের ভাইদের সাথে নিভৃতে আল্লাহর স্মরণে ও জ্ঞানচর্চায় বসেছি; এটি অন্য প্রসঙ্গের স্থান নয়।” অন্যদিকে, মসজিদে তাঁর যে সাধারণ মজলিস বা হালাকা বসতো, সেখানে হাদিস, ফিকহ, কুরআন-সংক্রান্ত জ্ঞান, ভাষা ও ব্যাকরণসহ নানান বিষয়ের আলোচনা হতো। কখনো কখনো তাসাউফ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। তাঁর ছাত্রদের কেউ কেবল হাদিস শোনার জন্য, কেউ কুরআন ও ব্যাখ্যা শেখার জন্য, কেউ বালাগাত শেখার জন্য, আবার কেউ ইখলাস ও বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন। তাঁদের মধ্যে আমর ইবনে উবাইদ, আবু জাহির, আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ, সালিহ আল-মুররি, শুমাইত এবং আবু উবাইদাহ আন-নাজি প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকেই ইবাদত-বন্দেগির উচ্চ স্তরের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। [16]
খলিফা উমর ইবনুল আবদুল আজিজের প্রতি তাঁর চিঠি:
শাসককেও তিনি পরম মমতায় উপদেশ দিতেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “জেনে রাখুন, চিন্তা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে এবং তা পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আর মন্দ কাজের জন্য অনুশোচনা মানুষকে মন্দ ত্যাগের দিকে টেনে আনে। যা ধ্বংস হয়ে যাবে, তা পরিমাণে যতই বেশি হোক, যা চিরস্থায়ী, তার সমান হতে পারে না; যদিও তা অর্জন করা কঠিন। সাময়িক কষ্ট, যার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, তা সেই সাময়িক আরামের চেয়ে উত্তম, যার পরিণতিতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি দুর্গতি।
অতএব, এই প্রতারক ও ধূর্ত আবাসস্থল— দুনিয়া থেকে সাবধান থাকুন। সে তার ছলাকলায় নিজেকে সাজিয়ে তোলে, মিথ্যা আশায় বাসিন্দাদের মোহিত করে এবং নিজের মোহ দিয়ে তাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সে নিজেকে নববধূর মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করে; যার দিকে চোখ অপলক তাকিয়ে থাকে, নফস যার প্রেমে পড়ে যায় এবং হৃদয় পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। অথচ দুনিয়া তার সকল বসবাসকারীর জন্যই খুনি। যারা বেঁচে আছে, তারা পূর্বে গত হওয়া লোকদের থেকে শিক্ষা নেয় না; আর পরের জন আগের জনের পরিণতি দেখে সতর্ক হয় না। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি অভিজ্ঞতার সুফল গ্রহণ করে না; আর আল্লাহ যখন দুনিয়ার অসারতা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তখনও কোনো আল্লাহভীরু ব্যক্তি তা স্মরণ করে না। এই দুনিয়ার প্রতি হৃদয়ের ভালোবাসা এবং নফসের আসক্তি যেন কাটতেই চায় না।
সুতরাং, দুনিয়া থেকে পুরোপুরি সতর্ক থাকুন। এটি স্পর্শে নরম সাপের মতো, কিন্তু এর বিষ প্রাণঘাতী। এর চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন; কারণ এখান থেকে সামান্যই আপনার সাথে যাবে। এর দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন; কারণ আপনি এর বিচ্ছেদ সম্পর্কে নিশ্চিত। দুনিয়াতে যখন আপনি খুব বেশি আনন্দিত থাকেন, তখনই এর থেকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকুন। কারণ, দুনিয়াদার যখনই এখানে স্বস্তি পায়, দুনিয়া তাকে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে আঘাত করে। এর সুখ ধোঁকা; এর উপকার ক্ষতিতে রূপান্তর হয়। এর স্বচ্ছতা আবিলতায় ভরে যায়; আর জীবনের পরিণতি হয় দুর্বলতা ও জীর্ণতা।
অতএব দুনিয়ার দিকে তাকান— একজন বিরাগী ও বিদায়ীর দৃষ্টিতে; প্রেমিকের দৃষ্টিতে নয়। দুনিয়া মূলত তিন দিনের সমষ্টি। গতকাল; যা চলে গেছে। আজ; আপনার বিদায়ী বন্ধু। আগামীকাল; আপনি জানেন না— সেই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন কি না। আপনার আয়ুর যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তার কোনো মূল্য নেই। পুরো দুনিয়া জমা করলেও তা জীবনের একটি অবশিষ্ট দিনের সমান হবে না। কবরে শায়িত ব্যক্তি যদি সুযোগ পেত, তবে দুনিয়ার সব রাজত্বের বদলে সে কেবল একটি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার সুযোগ বা একটি নেক আমলের মুহূর্ত বেছে নিত। অতএব, আজই নিজের জন্য প্রস্তুতি নিন। প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিন এবং মৃত্যুযন্ত্রণার সময়কার আফসোস থেকে সতর্ক থাকুন। আল্লাহ আমাদের এই নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।” [17]
খলিফার নির্দেশের সামনে তাঁর অটল অবস্থান:
তিনি রাজভয় তুচ্ছ জ্ঞান করে সত্য উচ্চারণে অটল থাকতেন। আলকামা ইবনে মারছাদ থেকে বর্ণিত, যখন ওমর বিন হুবাইরা ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি ইমাম হাসান বসরি ও ইমাম শা’বী-কে ডেকে পাঠালেন। গভর্নর তাঁদের কাছে তাঁর পরকাল ধ্বংসের আশঙ্কার কথা জানালেন এবং খলিফার অন্যায্য আদেশে তাঁর মুক্তির পথ জানতে চাইলেন। ইমাম শা’বী কিছুটা নমনীয় পথ দেখানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “হে ওমর বিন হুবাইরা, খুব শীঘ্রই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠোর ও কর্কশ ফেরেশতা (মৃত্যুদূত) তোমার কাছে আসবেন, যিনি আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করেন না। তিনি তোমাকে তোমার এই প্রশস্ত প্রাসাদ থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতায় নিয়ে যাবেন।
হে ওমর বিন হুবাইরা, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিকের হাত থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক তোমাকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তুমি যদি আল্লাহর আনুগত্যে থাকো, তবে ইয়াজিদের পক্ষ থেকে আসা বিপদ থেকে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি তুমি ইয়াজিদের সাথে থেকে আল্লাহর অবাধ্যতা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদের হাতেই সঁপে দেবেন।” এই কথা শুনে ওমর বিন হুবাইরা কেঁদে ফেললেন। পরদিন ইমাম শা’বী মসজিদে গিয়ে মানুষকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে লোকসকল, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সৃষ্টির ওপর স্রষ্টাকে (আল্লাহকে) প্রাধান্য দিতে পারে, সে যেন তাই করে। হাসান বসরি যা জানতেন আমিও তা জানতাম; কিন্তু আমি ইবনে হুবাইরার সন্তুষ্টি চেয়েছিলাম, ফলে আল্লাহ আমাকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন (মর্যাদা কমিয়ে দিলেন)।” [18]
বিবাহের ঘটনা:
তাকওয়ার মানদণ্ডে তিনি ছিলেন আপসহীন। হুমাইদ আত-তাওয়িল (রহ.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরি (রহ.)-এর কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল। লোকটির প্রশংসা করতে গিয়ে হুমাইদ জানালেন তার কাছে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম সম্পদ আছে। হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “তার পঞ্চাশ হাজার দিরহাম আছে? এত টাকা কখনও হালাল পথে জমা হতে পারে না! যদি সে হালাল পথেই তা জমা করে থাকে, তবে নিশ্চয়ই সে আল্লাহর নির্ধারিত হক (দান-সদকা) আদায়ে কৃপণতা করেছে। না, আল্লাহর কসম, আমাদের আর তার মাঝে কখনও আত্মীয়তার সম্পর্ক (বিয়ে) হবে না।” [19]
শাসকের দেওয়া অন্যায্য সুযোগ বর্জন:
অন্যায্য পথে আসা কোনো সুযোগই তিনি গ্রহণ করতেন না। ইবনে শাওযাব (রহ.) থেকে বর্ণিত, যখন খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক অনাবাদি জমিগুলো জনগণের মাঝে ভাগ করে দিতে লাগলেন, তখন হাসান বসরির ছেলে তাঁকে জমি নেওয়ার অনুরোধ করলেন। হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “চুপ করো, এই দুই ব্রিজের মাঝখানের সবটুকু জায়গাও যদি আমাকে এক ঝুড়ি মাটির বিনিময়ে দেওয়া হয় তবুও আমি খুশি হবো না (যদি তা নেওয়া তাকওয়ার পরিপন্থী হয়)।” [20]
অন্তরের যত্ন:
তিনি সর্বদা অন্তরকে সজিব রাখার পরামর্শ দিতেন। আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, “তোমরা নসিহতের মাধ্যমে এই অন্তরগুলোকে সজিব করো, কারণ এতে দ্রুত মরিচা ধরে যায়। আর নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, কারণ, নফস প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে চায় এবং মন্দের দিকে তার ঝোঁক প্রবল। তোমরা তো একটি কাফেলার মতো, যারা সাময়িক যাত্রাবিরতি করছে। শীঘ্রই তোমাদের ডাকা হবে। সুতরাং তোমাদের কাছে থাকা সর্বোত্তম পাথেয় নিয়ে ফিরে যাও।” [21]
আলেমদের অবমাননার কারণ:
আলেমদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় তিনি ছিলেন সোচ্চার। ফুদাইল বিন জাফর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি (রহ.) যখন গভর্নরের কাছ থেকে বের হলেন, দরজার বাইরে কিছু আলেমকে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখলেন। তিনি তাঁদের ভর্ৎসনা করে বললেন, “তোমরা কারিদের ও আলেমদের মান-সম্মান ডুবিয়েছ। আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তাদের কাছে থাকা ধন-সম্পদ থেকে নির্লোভ হতে, তবে তারা তোমাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে উপকৃত হতে আগ্রহী হতো। কিন্তু তোমরা তাদের সম্পদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছ। ফলে তারাও তোমাদের জ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে গেছে।” [22]
মুমিন ও মুনাফিকের পরিচয়:
চরিত্রের মাধ্যমেই তিনি মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্য ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি বলেন, “মুমিন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ যা বলেছেন তা ঠিক তেমনই বিশ্বাস করে। মুমিন আমলের দিক থেকে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আবার আল্লাহভীতির দিক থেকেও সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভীত। অন্যদিকে মুনাফিক বলে, ‘আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, আমার কোনো সমস্যা নেই।’ সে মন্দ কাজ চালিয়েই যায়, অথচ আল্লাহর কাছে (ক্ষমার) বৃথা আশা পোষণ করে।” [23]
মুমিনের গুণাবলি:
আত্মসমালোচনা ছিল তাঁর দর্শনের অন্যতম দিক। হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই একজন মুমিন নিজের ওপর সদা-সচেতন প্রহরীর মতো থাকে। কিয়ামতের দিনে যাদের হিসাব সহজ হবে, তারা হলো সেইসব লোক, যারা দুনিয়াতেই নিজেদের হিসাব করে নিয়েছে। মুমিন এই দুনিয়ায় এক বন্দির মতো; সে সদা নিজের গলার শিকল মুক্ত করার চেষ্টা করে। সে জানে— তার কান, চোখ, জিহ্বা এবং সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।” [24]
আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের বৈশিষ্ট্য:
তিনি ইমানদারদের সেই উচ্চ স্তরের কথা বলতেন, যেখানে আখেরাতই মুখ্য। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছেন, যারা (ইমানের নুরে) জান্নাতবাসীদের জান্নাতে চিরস্থায়ী অবস্থান করতে দেখেন এবং জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে শাস্তি পেতে দেখেন। তাঁদের অন্তর আখিরাতের চিন্তায় ব্যথিত। তাঁদের অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ। রাতে তাঁরা কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজে দাঁড়ান। দিনে তাঁরা বিচরণ করেন ধৈর্যশীল, প্রজ্ঞাবান, নেককার ও মুত্তাকি হয়ে।” [25]
দুনিয়াতে আমলের গুরুত্ব:
প্রতিটি আমলকে তিনি পরম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি বলেন, “হে আদম সন্তান, কোনো ভালো কাজকে ছোটো মনে করে ছেড়ে দিও না; কারণ আমলনামায় যখন তা দেখবে, তা তোমাকে আনন্দ দেবে। আফসোস! দুনিয়া তার জৌলুস নিয়ে চলে গেছে আর তোমাদের কর্মগুলো তোমাদের গলায় হারের মতো ঝুলে আছে। হে আদম সন্তান, যদি তুমি তোমার আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াকে বিক্রি করে দাও, তবে তুমি উভয়টিতেই লাভবান হবে। সাবধান, দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত বিক্রি করো না।” [26]
জাহান্নাম ও শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার চারটি গুণ:
তিনি জীবনের মোক্ষ লাভের চারটি সূত্রের কথা বলতেন— ১. আকাঙ্ক্ষা বা লোভের সময়, ২. ভয়ের সময়, ৩. প্রবৃত্তি ও লালসার সময় এবং ৪. রাগের সময়—যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেবেন। [27]
সাথিদের প্রতি তাঁর নসিহত:
তিনি তাঁর সঙ্গীদের দুনিয়ার অসারতা সম্পর্কে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, “দুনিয়া আমলের ক্ষেত্র। হে আদম সন্তান, দুনিয়ার দুশ্চিন্তা গুটিয়ে নাও; নতুবা দুনিয়ার মায়া তোমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যই ভুলে যাবে। মৃত্যুর আগে দ্রুত নেক আমল করো; কাল করব, পরশু করব বলে দেরি করো না; কারণ তুমি জানো না কখন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।” পরিশেষে তিনি বলেন, “প্রকৃত মৃত তো সে-ই, যে জীবিতদের মাঝে থেকেও অন্তরের দিক থেকে মৃত।” [28]
মুসলিমদের প্রতি তাঁর নসিহত
আবু উবাইদা (রহ.) বলেন, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ সেই মানুষটির প্রতি রহম করুন, যে সত্যকে চিনেছে, তারপর ধৈর্য ধরেছে; যে দেখেছে, তারপর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে। কিন্তু কিছু লোক সত্য চিনেছিল; তারপর অস্থিরতা ও হতাশা তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে তারা না পেরেছে লক্ষ্যে পৌঁছাতে, না পেরেছে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে।”
তিনি আরও বলেন, “ওই বিভ্রান্তিকর প্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যা আল্লাহ থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়; যার সারকথা পথভ্রষ্টতা এবং যার পরিণতি জাহান্নাম। এতে কঠিন পরীক্ষা আছে। যে এতে পতিত হয়, তা তাকে বিভ্রান্ত করে; আর যে এতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ে, তা তাকে ধ্বংস করে। হে আদম সন্তান, তুমি তোমার দিনকে আঁকড়ে ধরো। দিনই তোমার মাংস ও রক্তের মতো। দিন নিরাপদ থাকলে মাংস ও রক্তও নিরাপদ থাকবে। আর বিপরীত হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই—তা এমন এক আগুন, যা নিভবে না; এমন এক ক্ষত, যা সারবে না; এমন এক শাস্তি, যা শেষ হবে না এবং এমন এক আত্মা, যা মরবে না।”
“নিশ্চয়ই তোমাকে তোমার প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তোমাকে তোমার আমলের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হবে। সুতরাং, এখন যা তোমার হাতে আছে, তা থেকেই সঞ্চয় করে নাও— সেই দিনের জন্য, যা সামনে অপেক্ষা করছে। মৃত্যুর সময় সংবাদ এসে পৌঁছবে; তখন জিজ্ঞেস করা হবে, কিন্তু তুমি উত্তর খুঁজে পাবে না। বান্দা ততদিন কল্যাণের উপর থাকে, যতদিন তার নফসই তার উপদেশদাতা থাকে এবং আত্মসমালোচনাই তার প্রধান চিন্তা হয়।”
আবু উবাইদাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছ, পাত্রে সম্পদ জমা করছ, থলের মুখ শক্ত করে বাঁধছ; আরামদায়ক বাহনে চড়ছ, নরম পোশাক পরছ। এরপর একদিন বলা হবে—‘সে মারা গেছে।’ আল্লাহর কসম, এরপর সে আখিরাতের দিকে যাত্রা করবে। মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে অল্প কয়েকদিন আমল করে। আল্লাহর কসম, দুনিয়ার নিয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করার কারণে সে আখিরাতে অনুতপ্ত হবে না। বরং দুনিয়া যখন তার সামনে সজ্জিত হয়ে আসত, সে আখিরাতের আশায় একে তুচ্ছ মনে করত। সে এখান থেকে কেবল পাথেয় সংগ্রহ করেছে; দুনিয়াকে স্থায়ী ঘর বানায়নি। দুনিয়ার নিয়ামতের প্রতি লালায়িত হয়নি; প্রাচুর্যে উল্লসিত হয়নি। বিপদ এলেও সে তা বড় করে দেখত না; আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করত। সে দুনিয়ার প্রাপ্তিকে বড় মনে করেনি, যতক্ষণ না আল্লাহর প্রতি আগ্রহ ও ভয় নিয়ে বিদায় নিয়েছে। সুসংবাদ তার জন্য, আল্লাহ তার কিয়ামতের ভয় দূর করবেন, ভুল ঢেকে দেবেন এবং হিসাব সহজ করবেন।”
তিনি আরও বলেন, “মুসলিমদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ছিলেন, তারা বলতেন, ‘জীবন তো কেবল সকাল-সন্ধ্যা, আর রাতের শেষভাগের কিছু ইবাদত ও দিনের ওপর অবিচল থাকা।’ হে আদম সন্তান, কল্যাণ পেতে তোমার বেশি দেরি হবে না। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাত দান করবেন, তখনই সে সফল। মনে রেখো, আল্লাহকে তাঁর জান্নাতের ব্যাপারে ধোঁকা দেওয়া যায় না; আর অলীক কামনা (আশা-তামান্না) দিয়ে জান্নাতও পাওয়া যায় না। অথচ এখন কৃপণতা বেড়েছে, অলীক বাসনা ছড়িয়েছে, আর আকাঙ্ক্ষাকারী ব্যক্তি ধোঁকার ঘোরেই ডুবে আছে।” [29]
বাণীসমগ্র
১. হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “হে আদম সন্তান, আল্লাহর কসম, তুমি যদি কুরআন পাঠ করো এবং তার ওপর যথার্থ বিশ্বাস স্থাপন করো, তবে দুনিয়ায় তোমার দুঃখবোধ দীর্ঘ হবে, তোমার ভয় প্রবল হবে এবং তোমার কান্না বেড়ে যাবে।”
২. হাসান (রহ.) প্রায়ই বলতেন, “আমরা হাসি; অথচ জানি না, হয়তো আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টি দিয়ে বলে দিয়েছেন, ‘আমি তোমাদের কোনো আমলই কবুল করব না’।”
৩. “হায় আদম সন্তান, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার মতো শক্তি কি তোমার আছে?”
৪. “আমি এমন মহৎ লোকদের (সাহাবিদের) দেখেছি, যাঁদের কাছে এই দুনিয়া পায়ের নিচের মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। আবার এমন লোকও দেখেছি, যাদের কাছে রাতের খাবারের জন্য সামান্য খাদ্য ছাড়া আর কিছুই থাকত না; তবুও তারা বলত— ‘আমি সবটুকু পেটে পুরব না।’ এরপর ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও তার একাংশ সদকা করে দিত, যদিও গ্রহীতার চেয়ে দাতার ক্ষুধা হয়তো বেশি ছিল।”
৫. সালিহ আল-মুররি হাসান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল কয়েকটি দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।”
৬. মুবারক ইবন ফাদালাহ বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি, “মৃত্যু দুনিয়ার আসল রূপ উন্মোচিত করে একে লাঞ্ছিত করেছে; কোনো বুদ্ধিমান মানুষের জন্য দুনিয়াতে আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট রাখেনি।”
৭. সাবিত তাঁর থেকে বর্ণনা করেন, হাসান (রহ.) বলতেন, “মুমিনের অট্টহাসি তার অন্তরের গাফলতির পরিচয়।” [30]
৮. আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ইমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না মানুষের সেই দোষ ধরা ছেড়ে দেবে, যে দোষ তোমার মধ্যেও আছে। প্রকৃত ইমান হলো আগে নিজের দোষ সংশোধন করা। তুমি যখনই নিজের একটি দোষ সংশোধন করবে, তখনই নিজের ভেতরে আরেকটি দোষ পাবে, যা সংশোধন করা বাকি। এভাবে তুমি নিজের ভুল সংশোধনেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর আল্লাহর কাছে সেই বান্দাই সবচেয়ে প্রিয়, যে নিজের সংশোধনে মগ্ন থাকে।” [31]
৯. ইমরান বিন খালিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “একজন মুমিন সকালেও দুঃখিত অবস্থায় থাকে এবং সন্ধ্যাতেও দুঃখিত থাকে। এর বাইরে তার উপায় নেই। কারণ, সে সর্বদা দুটি ভয়ের মধ্যে থাকে। ক. অতীত গুনাহের ভয়—আল্লাহ সে বিষয়ে কী ফয়সালা করবেন, সে জানে না। খ. অবশিষ্ট সময়ের ভয়—এই সময়ের মধ্যে সে কী ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়বে, সে জানে না।”
১০. “হে আদম সন্তান, তুমি তো কিছু দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।”
১১. “সবচেয়ে পাপিষ্ঠ সে ব্যক্তি, যে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, দম্ভভরে কাপড় টেনে চলে এবং বলে— ‘আমার কোনো সমস্যা নেই।’ অচিরেই সে জানবে— আল্লাহ কখনও দুনিয়াতেই দ্রুত শাস্তি দেন, আবার কখনও তা বিচারের দিনের জন্য জমা রাখেন।”
১২. হিশাম থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ তার ওপর রহম করুন, যে জীর্ণ পোশাক পরে, রুটির শুকনো টুকরো খায়, মাটির সাথে মিশে থাকে (অত্যন্ত বিনয়ী হয়), গুনাহের জন্য কাঁদে এবং ইবাদতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে।”
১৩. হাওশাব ইবনে মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কসম, তাদের (পাপিষ্ঠদের) পায়ের নিচে যদি দামি ঘোড়া শব্দ করে চলে এবং মানুষ সম্মান করে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে; তবুও পাপের গ্লানি ও লাঞ্ছনা তাদের অন্তরে লেগেই থাকে। আল্লাহ তায়ালা স্থির করে দিয়েছেন— বান্দা যখন তাঁর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেনই।”
১৪. মুবারক বিন ফাদালাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “মৃত্যু দুনিয়ার সমস্ত সম্মান ও চাকচিক্যকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে; ফলে বুদ্ধিমানের জন্য আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।”
১৫. হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, “হে আদম সন্তান, তোমার অবস্থা সেই ভেড়ার মতো, যে ভেড়াকে জবেহ করার জন্য ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, রান্নার জন্য চুলা জ্বালানো হচ্ছে; অথচ ভেড়া জাবর কাটছে!” (অর্থাৎ মৃত্যু নিকটে, অথচ মানুষ গাফেল।)
১৬. “হে আদম সন্তান, তুমি তো দুটি সওয়ারি। রাত ও দিনের ওপর সওয়ার। তারা তোমাকে নিয়ে থামে না; অবশেষে তারা তোমাকে আখিরাতে পৌঁছে দেবে। এরপর হয় জান্নাত, নয় জাহান্নাম। তোমার চেয়ে বড় ঝুঁকিতে আর কে আছে?”
১৭. আবু মুসা বর্ণনা করেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “জানো, ইসলাম কী? ইসলাম হলো তোমার গোপন ও প্রকাশ্য অবস্থা এক হবে, তোমার অন্তর আল্লাহর কাছে সমর্পিত হবে, আর তোমার হাত ও জবান থেকে প্রতিটি মুসলিম ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নিরাপদ থাকবে।”
১৮. “আল্লাহর কসম, যে বান্দার রিজিক প্রতিদিন (তাকদির অনুযায়ী) বণ্টন করে দেওয়া হয়, অথচ সে যদি না ভাবে— এটাই তার জন্য সর্বোত্তম ছিল (অর্থাৎ সে অসন্তুষ্ট থাকে), তবে সে হয় অক্ষম, নয়তো চরম নির্বোধ।” [32]
মৃত্যুশয্যায় শেষ তিনটি উপদেশ
ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এলো, তখন তাঁর কয়েকজন সঙ্গী তাঁর কাছে প্রবেশ করে বললেন, “হে আবু সাঈদ, আমাদের জন্য কিছু পাথেয় (উপদেশ) দিন, যা দিয়ে আমরা উপকৃত হতে পারি।” তিনি বললেন, “আমি তোমাদের তিনটি কথা বলছি। এরপর তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাবে এবং আমাকে আমার গন্তব্যের (আখেরাতের) জন্য একা ছেড়ে দেবে: ১. তোমরা মানুষকে যে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো, নিজেরা তা বর্জন করার ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী হও। ২. তোমরা মানুষকে যে ভালো কাজের আদেশ দাও, নিজেরা তা পালনে সবার চেয়ে বেশি আমলকারী হও। ৩. জেনে রেখো, তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দুই অবস্থা থেকে মুক্ত না। হয় তা তোমাদের পক্ষে (সওয়াব) যাবে, না হয় তোমাদের বিপক্ষে (গুনাহ) যাবে। সুতরাং লক্ষ্য করো, সকালে কোথায় যাচ্ছ এবং সন্ধ্যায় কোথায় ফিরে আসছ; অর্থাৎ সারা দিনের প্রতিটি কাজ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকো।” [33]
ওফাত
খালিদ ইবনে খিদাশ বর্ণনা করেন; সালিহ আল-মুররি ইউনুস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, হাসান আল-বসরির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বারবার “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পাঠ করতে থাকেন। তখন তাঁর ছেলে কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “হে বাবা, আপনি তো আমাদের চিন্তায় ফেলে দিলেন। আপনি কি বিশেষ কিছু দেখছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “এটি আমার প্রাণ; যা বের হয়ে যাচ্ছে। এর আগে এমন বিপদে আমি কখনো পড়িনি।”
তিনি পহেলা রজবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় মানুষের বিশাল সমাগম হয়েছিল। বসরার জামে মসজিদে জুমার নামাজের পরপরই তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং জানাজায় শরিক হওয়ার তীব্র আকুলতার কারণে সেদিন বসরার ওই প্রধান মসজিদে আসরের জামাতও কায়েম করা সম্ভব হয়নি; সবাই জানাজার জন্য ময়দানে চলে গিয়েছিল।
হিশাম ইবনে হাসান বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার বিকেলে মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন)-এর কাছে ছিলাম। আসরের পর এক ব্যক্তি এসে সংবাদ দিল— “হাসান ইন্তেকাল করেছেন।” মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন) তাঁর জন্য রহমতের দোয়া করলেন। শোকের তীব্রতায় তাঁর গায়ের রং পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং তিনি কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও বলেননি। তাঁর এই গভীর শোক দেখে মজলিসে উপস্থিত অন্যরাও কথা বলতে সংকোচ বোধ করল।
ইবনে উলাইয়্যাহ বলেন, হাসান বসরি (রহ.) ১১০ হিজরি সালের রজব মাসে ইন্তেকাল করেন। আবদুল্লাহ ইবনে হাসান বলেন, তাঁর পিতা (হাসান আল-বসরি) প্রায় ৮৮ বছর বয়স পেয়েছিলেন। [34]