খায়রুত তাবেয়িন: হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর মহাকাব্যিক জীবন

ইতিহাসের কালপরিক্রমায় কিছু জীবন মহাকাব্যের মতো স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, যা শুধু তথ্য নয়, অনুভব দিয়েও স্পর্শ করা যায়। ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ আল-কারনি (রহ.) ছিলেন তেমনই এক মহাকাব্যিক চরিত্র, যাঁর জীবন ছিল নবীপ্রেম, মাতৃভক্তি আর দুনিয়াবিমুখতার এক জীবন্ত উদাহরণ। তিনি সশরীরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্পর্শ পাননি; কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতা ও আত্মনিবেদন এমনই ছিল যে, তাঁকে ‘খায়রুত তাবেয়িন’ (তাবেয়িনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর জীবন যেন নিভৃতে জ্বলা এক প্রদীপ, যার আলো দূর থেকে দিকনির্দেশনা দেয়। তাঁর জীবনগাঁথা শাশ্বত মানবতার এক অনন্য দলিল, যা আজও কোটি হৃদয়ে ইমান ও আধ্যাত্মিকতার দীপশিখা জ্বেলে চলেছে।

তাঁর নাম ও পরিচয়:

আধ্যাত্মিকতার এই নক্ষত্রটি ইয়েমেনের মরুভূমিতে উদিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর যুগের তাবেয়িনদের সর্দার। তাঁর পুরো নাম আবু আমর ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ ইবনে মালিক আল-কারনি আল-মুরাদি আল-ইয়ামানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ‘করন’ ছিল ইয়েমেনের মুরাদ গোত্রের একটি সম্মানিত শাখা, যে পবিত্র বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।[1] হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.)-এর জন্মসন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি ইসলামের প্রথম যুগের শুরুতে, সম্ভবত ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষার্ধে (আনুমানিক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর হাদিস চর্চা:

তিনি নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতেই পছন্দ করতেন, তাই তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা সীমিত। হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.) এক সময় হজরত ওমর (রা.)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর ও হজরত আলী (রা.)-এর নিকট থেকেও সামান্য কিছু হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন— হজরত উসাইর ইবনে আমর, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা, আবু আব্দুর রব আদ-দিমাশকী এবং আরও কিছু বরণীয় তাবেয়ি। এগুলো ছিল মূলত সংক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ও কাহিনি; তিনি কোনো সনদবদ্ধ দীর্ঘ হাদিস (মুসনাদ) বর্ণনা করেননি। তাই তাঁকে দুর্বল রাবি হিসেবে মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকটবর্তী মুত্তাকি অলি এবং মুখলিস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।[2]

হজরত ওমর (রা.)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ:

পর্দার আড়ালে থাকা এই মহাপুরুষকে খুঁজে বের করার জন্য স্বয়ং আমিরুল মুমিনীন ব্যাকুল ছিলেন। আফফান (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনু সালামা; তিনি আল-জুরাইরি থেকে, তিনি আবু নদরাহ থেকে এবং তিনি উসাইর ইবনু জাবির থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন ইয়েমেনের লোকেরা মদিনায় আগমন করত, তখন হজরত ওমর (রা.) প্রতিটি কাফেলাকে জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্যে কি করন গোত্রের কেউ আছে?”

একদিন এমন হলো যে, হজরত ওমর (রা.)-এর উটের লাগাম অথবা হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.)-এর উটের লাগাম—দুটির একটি অপরজনের হাতে এসে পড়ল; অথবা তাঁদের কেউ একজন লাগাম অপরজনকে এগিয়ে দিলেন। তখনই হজরত ওমর (রা.) তাঁকে চিনে ফেললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন—

“আপনার নাম কী?”

তিনি বললেন, “আমি ওয়াইস।”

“আপনার কি মা বেঁচে আছেন?”

তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আছেন।”

“আপনার শরীরে কি সাদা দাগ ছিল?”

তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ছিল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি এবং আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছেন। শুধু নাভির কাছে দিরহামের মতো একটি দাগ রেখেছেন, যাতে আমি তা দেখে আমার রবকে স্মরণ করতে পারি।”

এ কথা শুনে ওমর (রা.) বললেন, “আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.) বিনীতভাবে বললেন, “আপনিই বরং আমার জন্য ক্ষমা চাইবেন, কারণ আপনি তো রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবি!” তখন হজরত ওমর (রা.) বললেন, “নিশ্চয়ই আমি রসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি—‘তাবেয়িদের মধ্যে সর্বোত্তম একজন ব্যক্তি, যার নাম ওয়াইস। তাঁর মা রয়েছেন। তাঁর শরীরে সাদা দাগ ছিল; তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, আল্লাহ তা দূর করে দিলেন, শুধু নাভির কাছে এক দিরহামের মতো একটি দাগ রেখে দিলেন। তাঁর কাছে যে ক্ষমা প্রার্থনা চাইবে, তিনি তাঁর জন্য ইস্তিগফার করবেন’।”

এরপর তিনি (ওয়াইস কারনি) মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন এবং আমরা আর বুঝতে পারলাম না তিনি কোথায় গেলেন। উসাইর ইবনে জাবির বলেন, পরে তিনি কুফায় উপস্থিত হলেন। আমরা এক বৃত্তে বসে আল্লাহর স্মরণ করতাম আর তিনি এসে আমাদের সঙ্গে বসতেন। কিন্তু যখন তিনি কথা বলতেন, তখন আমাদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রভাব ফেলত যে অন্য কারও কথা ততটা প্রভাব ফেলতে পারত না।[3]

রসুলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষ থেকে জুব্বা মুবারক হাদিয়া:

নবীজির প্রতি তাঁর যে অদৃশ্য ভালোবাসা ছিল, তার প্রতিদান তিনি পার্থিব জীবনেই পেয়েছিলেন। যখন নবী ﷺ-এর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলো, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে জানতে চাইলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আপনার চীরকা (মোটা পশমের পোশাক) কাকে দেব?” উত্তরে নবী করিম ﷺ বললেন, “ওয়াইস আল-কারনিকে।” পরবর্তীতে ওমর (রা.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে নবী ﷺ-এর নির্দেশিত তাঁর পবিত্র জুব্বা হজরত ওয়াইস আল-কারনির হাতে তুলে দেন। তিনি এই চীরকা গ্রহণ করে আনন্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেজদা করেন এবং আল্লাহর কাছে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।[4]

জীবন পরিক্রমা:

ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর জীবন ছিল ধৈর্য ও অমায়িক ব্যবহারের এক জীবন্ত ছবি। তিনি কুফার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর শরীরে একসময় শ্বেত রোগ হয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন তা দূর করে দেন। আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করলেন। তখন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, আমার শরীরের কিছু অংশ রেখে দিন, যার মাধ্যমে আমি আপনার প্রদত্ত নিয়ামত স্মরণ করতে পারি।” ফলে আল্লাহ তাঁর শরীরে সামান্য দাগ রেখে দিলেন।

ওয়াইস (রহ.) কিছু সাথি নিয়ে মসজিদে অবস্থান করতেন। তাঁর একজন চাচাতো ভাই ছিল, যে শাসকের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিল এবং ওয়াইস (রহ.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। যদি সে ওয়াইসকে ধনী লোকদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে শুধু তাদের থেকে খেয়ে বেড়ায়।” আর যদি গরিবদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে তাদের ধোঁকা দিচ্ছে।” কিন্তু ওয়াইস (রহ.) তাঁর সম্পর্কে কেবল ভালো কথাই বলতেন। তবে যখন সে পাশ দিয়ে যেত, তখন তিনি আড়াল হতেন এই ভয়ে যে তাঁর কারণে সে যেন কোনো পাপে (গিবত) লিপ্ত না হয়।

ওমর (রা.) যখন কুফার প্রতিনিধি দলের কাছে খোঁজ নিতেন, তখন জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমরা কি ওয়াইস ইবনে আমির আল-কারনিকে চেনো?’ তারা বলত, ‘না।’ এরপর কুফার একটি দল এল, যার মধ্যে সেই বিদ্বেষী চাচাতো ভাইটিও ছিল। ওমর (রা.) জিজ্ঞাসা করলে চাচাতো ভাই বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, সে আমার চাচাতো ভাই। সে একজন নিকৃষ্ট ও নষ্ট প্রকৃতির লোক, আপনার চেনার মতো অবস্থানে সে পৌঁছায়নি।’ ওমর (রা.) বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হোক! যখন তুমি কুফায় পৌঁছাবে, তখন তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবে এবং আমার নির্দেশ পৌঁছে দেবে যেন সে আমার কাছে আসে।’

সে কুফায় পৌঁছে সফরের পোশাক না খুলেই মসজিদে গেল। সেখানে সে ওয়াইসকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, হে আমার চাচাতো ভাই।” ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।” সে বলল, “আমিরুল মুমিনীন আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং তাঁর কাছে যেতে বলেছেন।” ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আমিরুল মুমিনীনের কথা আমার জন্য শোনা ও মানা ওয়াজিব।”

অতঃপর তিনি ওমর (রা.)-এর কাছে এলেন। ওমর (রা.) তাঁর রোগের দাগের কথা জিজ্ঞেস করলে ওয়াইস (রহ.) অবাক হয়ে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি কীভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম, কোনো মানুষই এ বিষয়ে জানে না।’ ওমর (রা.) বললেন, ‘আমাদের রসুলুল্লাহ ﷺ খবর দিয়েছেন যে তাবেয়িদের মধ্যে করন গোত্রের একজন লোক আসবে যাকে ওয়াইস বলা হবে। তাঁর শ্বেত রোগ হবে এবং তিনি দোয়া করলে আল্লাহ তা দূর করে দেবেন।’ এরপর যখন লোকেরা শুনল যে ওমর (রা.) নবী ﷺ-এর পক্ষ থেকে এ কথা বলছেন, তখন সবাই তাঁর কাছে দোয়ার আবেদন করতে লাগল। জনসমাগম বেড়ে গেলে তিনি নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে পড়লেন এবং চলে গেলেন। এরপর তাঁকে আর দেখা যায়নি।[5]

রসুল ﷺ ও সাহাবায়ে কিরামগণের নিকট তাঁর মর্যাদা:

নবীজি ﷺ-এর নিকট তাঁর মর্যাদা ছিল আকাশচুম্বী। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার রসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের এক মজলিসে বললেন, “আগামীকাল তোমাদের সাথে জান্নাতবাসীদের মধ্যেকার একজন লোক সালাত আদায় করবে।” আমি সেই ব্যক্তি হওয়ার লোভ অনুভব করলাম। পরদিন মসজিদে শুধু আমি এবং নবী ﷺ বাকি থাকা অবস্থায় এক কালো লোক এগিয়ে এলেন। তিনি একটি ছেঁড়া কাপড় ও তালিযুক্ত বস্ত্র পরিহিত ছিলেন। তিনি নবী ﷺ-এর হাতে হাত রেখে দোয়ার আবেদন করলে নবী ﷺ তাঁর জন্য শাহাদাতের দোয়া করলেন। আমরা তাঁর শরীর থেকে কস্তুরীর সুগন্ধি পাচ্ছিলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রসুল, ইনিই কি সেই ব্যক্তি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে অমুক গোত্রের একজন দাস।’ নবী ﷺ আরও বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাদের ভালোবাসেন, তারা হলেন আল-আসফিয়া (বিশুদ্ধচিত্ত) ও আল-আখফিয়া (লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা), যাদের চেহারা ধূলিধূসরিত ও পেট খালি; তবে তা কেবল হালাল উপার্জনে। যারা কোনো মজলিসে অনুমতি পায় না বা যাদের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় না। তারা অসুস্থ হলে কেউ দেখতে যায় না, মারা গেলে জানাজায় যায় না।’ সাহাবিরা তাঁর বৈশিষ্ট্য জানতে চাইলে নবী ﷺ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘তিনি কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং নিজের জন্য কাঁদেন। পৃথিবীর মানুষের কাছে অজানা কিন্তু আসমানের অধিবাসীদের কাছে সুপরিচিত। কিয়ামতের দিন তাঁকে রাবীয়াহ এবং মুদার গোত্রের সমান সংখ্যক লোকের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে।’

নবী ﷺ আরও নির্দেশ দিলেন, ‘হে ওমর এবং হে আলী, যখন তোমরা তাঁর সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাঁকে অনুরোধ করবে যেন তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।’ আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ওমর ও আলী (রা.) দশ বছর তাঁর সন্ধান করলেন। অবশেষে ওমর (রা.)-এর ইন্তেকালের বছর আরাফাতের আরাক এলাকায় তাঁকে সালাত আদায়রত অবস্থায় পেলেন। নবী ﷺ-এর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর কাঁধের সাদা দাগ দেখে তাঁরা তাঁকে নিশ্চিতভাবে চিনে নিলেন এবং চুমু দিলেন। তাঁরা দোয়ার আবেদন করলে ওয়াইস আল-কারনি বললেন, ‘আমি দোয়াতে কেবল নিজেকে নয়, বরং জগতের সকল মুমিন নর-নারীকে অন্তর্ভুক্ত করি।’ ওমর (রা.) তাঁর জন্য খরচাপাতি ও কাপড় দিতে চাইলে তিনি বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমার পশমের চাদরই যথেষ্ট। আমাদের সামনে কঠিন পথ রয়েছে; হালকা দেহবিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা অতিক্রম করতে পারবে না।’[6]

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

দুনিয়ার প্রতি তাঁর নির্লিপ্ততা ছিল বিস্ময়কর। বর্ণিত আছে যে তাঁর কাছে মাত্র একটি চাদর ছিল, যা পরিধান করে বসলে শরীর মাটির সাথে লেগে যেত। তিনি দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ওজর পেশ করছি—একটি ক্ষুধার্ত পেটের পক্ষ থেকে এবং এক অনাবৃত দেহের পক্ষ থেকে। আমার কাছে যা আছে, তা কেবল পিঠের কাপড় আর সামান্য আহার।”[7]

আলকামা বিন মারসাদ বলেন, আটজন ব্যক্তির ওপর দুনিয়াবিমুখতা পূর্ণতা পেয়েছিল, যাদের অন্যতম ওয়াইস আল-কারনি। তাঁর পরিবারের লোকরা তাঁকে পাগল মনে করত এবং ঘরের পাশে ছোট একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছিল। তাঁর খাবার ছিল কুড়িয়ে পাওয়া খুরমার আঁটি। সন্ধ্যা হলে সেগুলো বিক্রি করে তিনি ইফতারের খাবার কিনতেন।[8] আশ-শা’বী থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সময় আপনার উপর কেমন প্রভাব ফেলছে?’ তিনি বললেন, ‘সময় সেই ব্যক্তির উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, যে সকালে উঠলে ভাবে সন্ধ্যায় আর বাঁচবে না? মৃত্যু ও আল্লাহর অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান কোনো মুমিনের জন্য পার্থিব আনন্দ অবশিষ্ট রাখেনি।’[9]

ইবাদত ও দানশীলতা:

নিজে রিক্ত থাকলেও তাঁর হৃদয় ছিল দানে সমৃদ্ধ। তিনি মাঝেমধ্যে নিজের পরিধেয় বস্ত্র দান করে দিয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় ঘরে বসে থাকতেন, এমনকি জুমার নামাজে যাওয়ার মতো কাপড়ও থাকত না। আসবাহ বিন যায়েদ বলেন, একমাত্র মায়ের সেবার কারণেই তিনি নবী ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। ওয়াইস (রহ.) বলতেন, ‘আজকের রাতটি সিজদার রাত’ এবং ভোর পর্যন্ত সিজদায় কাটিয়ে দিতেন। তিনি ঘরে অতিরিক্ত যা থাকত দান করে দিতেন এবং আল্লাহর কাছে দায়মুক্তি চাইতেন যেন কেউ ক্ষুধার্ত বা বস্ত্রহীন অবস্থায় মারা গেলে তাঁকে পাকড়াও করা না হয়।[10]

অভাব ও লোকলজ্জা:

দুনিয়ার মানুষের বিদ্রুপ তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ওসাইর বিন জাবির বলেন, কুফায় ওয়াইস (রহ.) যখন কথা বলতেন, তা হৃদয়ে গেঁথে যেত। একদিন তাঁকে মজলিসে না দেখে তাঁর কুটিরে গিয়ে জানা গেল যে তাঁর পরার মতো পর্যাপ্ত কাপড় নেই। ওসাইর তাঁকে একটি চাদর দিতে চাইলে তিনি লোকলজ্জার ভয়ে তা নিতে চাইলেন না। অনেক অনুরোধে নেওয়ার পর দুষ্ট লোকেরা বিদ্রুপ করে বলতে লাগল, ‘দেখো, কার কাছ থেকে সে এটি হাতিয়ে নিয়েছে?’ তিনি চাদরটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখলেন তো কেন নিতে চাইনি?’ ওসাইর তখন সেই লোকদের কড়া ভাষায় শাসন করেন।[11]

হারম ইবনে হাইয়্যানের সাথে সাক্ষাৎ:

হারম ইবনে হাইয়্যান অনেক খুঁজে তাঁকে ফুরাত নদীর তীরে পেলেন। সালাম ও মুসাফাহার পর হারম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কীভাবে জানলেন?’ ওয়াইস (রহ.) বললেন, ‘মুমিনরা আল্লাহর রুহের মাধ্যমে একে অপরকে চিনতে পারে।’ হারম হাদিস শুনতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমি বিচারক বা মুফতি হওয়ার দরজা খুলতে চাই না, আমি নিজস্ব ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই।’ এরপর তিনি সুরা দুখানের ৪০-৪২ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং হারমকে বললেন, ‘তোমার পিতা মারা গেছেন, শীঘ্রই তুমিও মারা যাবে। নিজের মৃত্যুকে সর্বদা হৃদয়ে জাগ্রত রাখো।’ তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন এবং এরপর হারম তাঁকে আর কখনও পাননি।[12]

বাণী ও নসিহত:

হারম ইবনে হাইয়্যানকে তিনি তিনটি কালজয়ী উপদেশ দিয়েছিলেন:

১. ঘুমানোর সময় মৃত্যুকে বালিশ বানিয়ে ঘুমান এবং তাকে সর্বদা চোখের সামনে রাখুন।

২. ঘুম থেকে উঠে নিজের অন্তর ও নিয়ত সংশোধনের দোয়া করুন, কারণ এর চেয়ে কঠিন চিকিৎসা আর নেই।

৩. পাপ কত ছোট তা দেখবেন না; বরং দেখুন কার নাফরমানি করছেন—তিনি কত মহান।[13]

ওফাত:

তাঁর ওফাত সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সালামাহর বর্ণনা অনুযায়ী, ওমর (রা.)-এর যুগে আযারবাইজান অভিযান থেকে ফেরার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। অলৌকিকভাবে সেখানে আগে থেকেই খননকৃত কবর ও কাফন প্রস্তুত পাওয়া যায়। দাফনের পর সাহাবিরা কবরটি চিহ্নিত করতে ফিরে গিয়ে দেখেন সেখানে কোনো কবরের চিহ্ন নেই।[14] অন্যদিকে হিশাম আল-কালবীর মতে, তিনি আলী (রা.)-এর পক্ষে সিফফিনের যুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহীদ হন।[15] ইমাম ইবনে জাওযী এই দ্বিতীয় মতটিকে অধিক বিশুদ্ধ বলেছেন।[16]