তরিকায়ে চিশতিয়া ইসলামি তাসাউফ বা সুফিবাদের এমন এক উজ্জ্বল পথ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের প্রসার, নৈতিক সংস্কার এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কালজয়ী ভূমিকা পালন করেছে। আফগানিস্তানের ‘চিশত’ শরিফে এই ধারার উন্মেষ ঘটলেও, এর প্রকৃত বিস্তৃতি ঘটে সুলতান-উল-হিন্দ হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি’র (রহ.) হাত ধরে। তিনি আজমিরকে কেন্দ্র করে প্রেম, দয়া ও সহনশীলতার যে সুমহান আদর্শ প্রচার করেন, তা মানুষকে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

চিশতিয়া শায়খগণ ক্ষমতার মোহ ও শাসকগোষ্ঠী থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সাধারণ মানুষের অতি সন্নিকটে অবস্থান করতেন। তাঁদের শিক্ষা ছিল মূলত জিকির, তাজকিয়া (আত্মশুদ্ধি) এবং পার্থিব মোহমুক্ত এক আধ্যাত্মিক জীবন। এই ধারারই সার্থক উত্তরসূরি হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) দিল্লিতে খানকাহভিত্তিক মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ আশ্রয় ও খাদ্য পেত। মূলত চিশতিয়া তরিকা কেবল একটি আধ্যাত্মিক পথ নয়; বরং এটি সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানের এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে, যা আজও মানবতার জন্য পরম অনুপ্রেরণা।

তরিকায়ে চিশতিয়ার শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য:

তরিকায়ে চিশতিয়া হজরত আলী আল-মুরতাদা রাদ্বিআল্লাহু আনহুর মাধ্যমে মহানবী ﷺ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উপমহাদেশে এ তরিকার প্রধান পুরোধা হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.)। বিভিন্ন দিক থেকে চিশতিয়া তরিকা অন্যান্য তরিকাসমূহের উপর বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। অনুসারী ও ভক্তের সংখ্যার দিক থেকেও এটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও গ্রহণযোগ্য একটি সিলসিলা। এই তরিকার শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য হলো—

১. ইলাহি প্রেমের ভিত্তি: চিশতিয়া তরিকার মূল ভিত্তি আল্লাহর প্রেম। ইবাদত, আনুগত্য, রিয়াজত ও মুজাহাদার উদ্দেশ্য হলো অন্তরে ইলাহি প্রেম জাগ্রত করা।
২. নফসের বিরোধিতা: এ তরিকায় নফসের বিরোধিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিশতি মাশায়েখদের মতে নফসই সবচেয়ে বড় বাধা। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) উল্লেখ করেন, নফসের বিরোধিতা ইবাদতের আসল রূপ।
৩. মুজাহাদা ও রিয়াজত: নফসকে দমন ও আত্মশুদ্ধির জন্য কঠোর সাধনা ও মুজাহাদার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো অন্তরের পরিশুদ্ধি ও চরিত্রের পরিমার্জন।
৪. দুই মূলনীতি: নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন, চিশত পরিবারের দুটি মূলনীতি। ক. হাওয়া তথা নফসের বিরোধিতা। খ. অন্যের উপকার সাধন (ইসাল-এ-মনফাআত লিলগাইর)।
৫. নৈতিক সংস্কার: নৈতিক শিক্ষার দুটি দিক—
ক. তাখলিয়া: হিংসা, অহংকার, রাগ, গিবত প্রভৃতি দোষ থেকে আত্মাকে মুক্ত করা।
খ. তাহলিয়া: দানশীলতা, ক্ষমা, ধৈর্য, সহনশীলতা, ইসার, তাওয়াক্কুল ও কানাআতের মতো গুণাবলি অর্জন করা।
৬. বিনয় ও মানবপ্রেম: চিশতি মাশায়েখ কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না; বরং বিনয় ও নম্রতাকে প্রাধান্য দেন। সৃষ্টির সাথে তাদের আচরণ প্রেম, দয়া ও ক্ষমার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।
৭. শরিয়ত ও জ্ঞানের ভারসাম্য: এ সিলসিলায় বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ জ্ঞানের সমন্বয় এবং শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ বিদ্যমান। কুরআন হিফজ ও এর প্রতি গভীর অনুরাগ চিশতি সুফিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৮. সামা‘র প্রতি অনুরাগ: চিশতি সুফিগণ সামা‘কে ইলাহি প্রেম জাগ্রত করার একটি মাধ্যম মনে করেন; তবে তা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ ও রীতিসিদ্ধ নিয়মে।
৯. দিন-রাতব্যাপী মুজাহাদা: চিশতিয়া তরিকায় নিয়মিত সাধনা ও আধ্যাত্মিক মুশাহাদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এ ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন।
১০. সাধনা ও উপলব্ধির স্তর: জিকিরে ইলাহি বা আল্লাহর স্মরণে সর্বদা মগ্ন থাকা, মুজাহাদা (সাধনা), মুহাসাবা (আত্ম-সমালোচনা), মোরাকাবা (ধ্যান) এবং মুশাহাদার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগত প্রত্যক্ষ করার স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। এখানে লক্ষ্য হলো—
ইলমুল ইয়াকিন (লব্ধ জ্ঞান) থেকে হক্কুল ইয়াকিনে (নিশ্চিত সত্যে) পৌঁছানো।
মারেফাতে ইজমালি (সংক্ষিপ্ত পরিচিতি) থেকে মারেফাতে তাফাসিলি (বিস্তারিত আধ্যাত্মিক জ্ঞান) লাভ করা।
১১. ফানা ও বাকা (আত্মবিলোপ ও স্থায়িত্ব): নিজের আমিত্ব বা নফসকে বিলীন করার মাধ্যমে ‘ফানা’ এবং আল্লাহর সত্তায় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে ‘বাকা’ অর্জনের চেষ্টা করা হয়। এজন্য উচ্চস্বরে জিকির (জিকরে জাহিরি) এবং সবসময় মনে মনে জিকির (জিকরে সিররি)-এর নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ‘চিল্লা’ বা নির্দিষ্ট সময় নির্জনে ইবাদতে মগ্ন থাকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১২. একজন মুরিদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি: চিশতিয়া সিলসিলায় একজন সালিক বা মুরিদকে নিজের মধ্যে তিনটি বিশেষ গুণ সৃষ্টি করতে বলা হয়েছে।
ক. সূর্যের মতো হওয়া: সূর্যের আলো যেমন মুমিন-কাফের নির্বিশেষে সবার জন্য সমান, তেমনি সুফি সাধকের দয়া সবার জন্য অবারিত থাকবে।
খ. মিষ্টি ঝরনার মতো হওয়া: যা জগতের সকল তিক্ততা ও আবর্জনা গ্রহণ করেও নিজে পবিত্র ও মিষ্ট থাকে।
গ. জমিনের (মাটির) মতো হওয়া: যাকে সবাই পদদলিত করে, কিন্তু সে মুখ ফুটে কোনো অভিযোগ করে না।

১৩. আনুগত্য ও অনুসরণ: সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা (ইহসান), রসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান পোষণ করা, সুন্নতে নববী ও সাহাবায়ে কেরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করা এই তরিকার প্রাণ। এখানে শরিয়ত, তরিকত ও হকিকতের ওপর পূর্ণ আমল করার শিক্ষা দেওয়া হয়।[1]

উপরের সবগুলো বিষয়ের সার হলো—

১. তওবা তথা অনুশোচনা:  চিশতিয়া তরিকার প্রথম ধাপ হলো তওবা। একে একটি নতুন আধ্যাত্মিক জীবনের শুরু হিসেবে দেখা হয়। শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর মতে, তওবা দুই প্রকার। প্রথমত, অতীতের তওবা; যা গত হয়ে যাওয়া পাপের জন্য লজ্জিত হওয়া এবং অনুশোচনা করাকে বোঝায়। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের তওবা; যা ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করাকে বোঝায়।

চিশতিয়াদের মতে, প্রকৃত তওবা কেবল মুখে কিছু শব্দ পড়া নয়; বরং মানুষের অধিকার (হক্কুল ইবাদ) ফিরিয়ে দেওয়া। যদি কেউ কারো ক্ষতি করে থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করা তওবার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২. জিকির: জিকির হলো মহান আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখার একটি আধ্যাত্মিক মাধ্যম। চিশতিয়াগণ সাধারণত ‘জিকিরে জলি’ বা উচ্চৈঃস্বরে জিকির করার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তাদের মতে, ছন্দময়ভাবে আল্লাহর নাম জপ করার মাধ্যমে হৃদয়ে ঐশ্বরিক উপস্থিতি অনুভব করা যায় এবং মানুষের পুরো সত্তা আল্লাহর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে।

৩. পাস-ই-আনফাস তথা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ: শায়খ নাসিরুদ্দিনের মতে, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ বা ‘পাস-ই-আনফাস’ হলো সুফি সাধনার মূল নির্যাস। এটি মূলত ধ্যানের সময় অনুশীলন করা হয়। সুফিরা মনে করেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রিত থাকলে মানুষের চিন্তা বিক্ষিপ্ত হয় না এবং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর স্মরণে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

৪. সামা তথা আধ্যাত্মিক সংগীত: চিশতিয়া তরিকার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘সামা’ বা আধ্যাত্মিক শ্রবণ। তাসাউফের পরিভাষায় সামা বলতে আধ্যাত্মিক ভাবাবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে সংগীত বা ছন্দময় কালাম শোনাকে বোঝায়। যদিও সমসাময়িক ওলামায়ে কেরাম এই প্রথার সমালোচনা করতেন, তবুও চিশতিয়া বুজুর্গরা একে ঐশ্বরিক প্রেম ও একাগ্রতা সৃষ্টির সহায়ক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন।[2]

চিশতিয়া তরিকার উৎপত্তি ও প্রসার:

মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে বহু সুফি তরিকা গড়ে ওঠে। গবেষকরা ধারণা করেন, সেই সময়ের সুফি তরিকার সংখ্যা ১৭৩টিরও বেশি ছিল। তবে প্রাচীন প্রধান তিনটি তরিকা ছিল— খাওয়াজগান, কুবরাভিয়া এবং কাদেরিয়া, যা ভারতে কিছুটা পরে পৌঁছায়।

খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে চারটি প্রধান সুফি তরিকা প্রবেশ করে। এর মধ্যে চিশতিয়া তরিকা হজরত খাজা শায়খ মঈনুদ্দিন চিশতির সঙ্গে সম্পর্কিত, সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা শেখ শিহাবুদ্দিন উমর সোহরাওয়ার্দীর (মৃত্যু: ৬৩২ হিজরি) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়, খাওয়াজগান সিলসিলা পূর্বে থেকেই সক্রিয় থাকে, এবং নকশবন্দিয়া তরিকা মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দের (মৃত্যু: ৭৯১ হিজরি / ১৩৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার পায়।[3]

ভারতে এই তরিকাগুলো পৌঁছানোর সময় মূল উৎস এক হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো বিস্তৃত হয়ে বিভিন্ন উপ-শাখায় বিভক্ত হয়। চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার সময় সুসংগঠিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দ্রুত ভারতের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। উভয় তরিকা নিজস্ব খানকাহ (সুফি কেন্দ্র) এবং জাওয়িয়া (মাদরাসার মতো) তৈরি করে সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে পর্যটক শাহাবুদ্দিন আদ-দিমাশকি উল্লেখ করেছেন, কেবল দিল্লি ও এর আশপাশে দুই হাজারেরও বেশি খানকাহ, জাওয়িয়া, রিবাত (আশ্রয়স্থল) এবং জামাত-খানা বিদ্যমান ছিল, যা তখনকার সুফি সম্প্রদায়ের বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর প্রমাণ।

আফগানিস্তানের হরিরুদ অঞ্চলে ফিরোজকোহ, চিশত ও জাম শহরগুলো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ফিরোজকোহ ছিল রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র, যেখানে দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন ঘুরি জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। চিশতে শায়খ আবু ইসহাক শামী (রহ.) চিশতিয়া আধ্যাত্মিক ধারার ভিত্তি স্থাপন করেন এবং জাম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়।

ভারতে চিশতিয়া তরিকার মূল প্রচারক ছিলেন হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি আজমীরি (রহ.)। তিনি দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর আজমীরে স্থায়ী হন এবং আধ্যাত্মিক সংস্কার ও তরিকার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সরল ও সংযমী জীবনযাপন করতেন এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিরা, যেমন খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.), শেখ হামিদুদ্দিন সুফি সাওয়ালি (রহ.), বাবা ফরিদ গঞ্জেশকর (রহ.), হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) এবং শেখ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী (রহ.), চিশতিয়া আদর্শকে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে দেন। তারা নতুন খানকাহ স্থাপন ও যোগ্য সুফি প্রজন্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে তরিকাটিকে সুসংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন।

ভারতে চিশতিয়া তরিকার প্রসারের কারণ ও প্রভাব:

এখানে একটি প্রশ্ন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মনে জাগে— এই সুফি সাধকগণ কীভাবে সংস্কার, দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণে এতটা সফল হলেন? বিশেষ করে যখন তাঁদের অধিকাংশই বিশুদ্ধ হিন্দু সমাজের কেন্দ্রে এবং মুসলিম জনপদ থেকে দূরে অবস্থান করতেন। কোন কারণে সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ তাঁদের নসিহত কবুল করতে এবং তাঁদের খানকায় এসে একীভূত হতে উৎসাহিত হলো?

উত্তর হলো— সুফিগণ যখন ভারতে আসেন, তখন তাঁরা এখানে এক বিশাল ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতা দেখতে পান। তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রবল ধর্মীয় সংঘাত এবং জাতিভেদ প্রথা (বর্ণপ্রথা) বিদ্যমান ছিল। আগন্তুক সুফিদের জন্য এটি একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে দেখা দেয়। তাঁরা ইসলামের অত্যন্ত সহজ-সরল ও স্পষ্ট শিক্ষা উপস্থাপন করেন, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাম্য এবং সামাজিক স্বাধীনতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এটি হিন্দু জনগণের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সমাজের ‘অস্পৃশ্য’ বা অন্তজ শ্রেণির মানুষ তাঁদের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, যাদের শহরে ঢোকার অনুমতি ছিল কেবল দিনের বেলা কাজের জন্য এবং সূর্যাস্তের আগেই শহর ছেড়ে যেতে হতো।

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এবং তাঁর শিষ্যরা এই সামাজিক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছিলেন। ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থের লেখক খাজা আজমীরি (রহ.) এর অবদান সম্পর্কে লিখেছেন— “হজরত মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ভারতে এক প্রদীপ্ত সূর্যের মতো উদিত হয়েছিলেন। এমন এক সময়ে তিনি আসেন যখন সমাজ কুফর, শিরক এবং মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ইমান, ইসলাম এবং নৈতিকতার বাতাস বইতে শুরু করে, যা কুফর ও অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূরীভূত করে ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে।”[4]

খাজা আজমীরি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দর্শন:

সৈয়দ মুহাম্মদ মুবারক কিরমানি (ওরফে আমীর খুরদ) তাঁর কিতাবে খাজা গারিব নাওয়াজ কিছু উক্তি সংকলন করেছেন, যা থেকে তাঁর উদার ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর দর্শন মূলত তিনটি মূলস্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

১. অস্তিত্বের ঐক্য (ওয়াহদাতুল ওজুদ): খাজা গারিব নাওয়াজ বলতেন— যখন আমরা বাহ্যিক জগত অতিক্রম করে গভীরে দেখি, তখন দেখতে পাই যে প্রেমিক, প্রেমাস্পদ এবং স্বয়ং প্রেম— সবই এক।

২. সেবাই পরম ইবাদত: তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন—আর্তমানবতার দুঃখ মোচন করা, অভাবীদের প্রয়োজন মেটানো এবং ক্ষুধার্তকে অন্নদান করা। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মকে নিছক আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ‘মানবসেবা’কে এর মূল নির্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

৩. তিনটি গুণ: তিনি জোর দিয়ে বলতেন যে, মানুষকে আল্লাহর প্রিয় হতে হলে তিনটি গুণের অধিকারী হতে হবে। সাগরের মতো দানশীলতা, সূর্যের মতো উদারতা এবং জমিনের মতো সহনশীলতা।[5]

চিশতিয়া মাশায়েখদের ৯টি মূলনীতি:

চিশতিয়া সুফিগণ তাঁদের সারা জীবন যে ৯টি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অতিবাহিত করেছেন।

১. পীর বা মুর্শিদের প্রতি মুরিদ বা শিষ্যের পূর্ণ আনুগত্য।
২. দুনিয়ার মোহ ত্যাগ এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল)।
৩. রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকা।
৪. আধ্যাত্মিক ভাব জাগাতে ‘সামা’ বা সুফি সংগীতের বৈধতা।
৫. নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পালনে গভীর নিষ্ঠা।
৬. কৃষিকাজ অথবা মানুষের দেওয়া উপহার থেকে জীবিকা নির্বাহ।
৭. অলৌকিক ক্ষমতা বা কারামত প্রদর্শনে অনীহা।
৮. অতিরিক্ত সম্পদ ও খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবা এবং চারিত্রিক সংশোধন।
৯. অমুসলিমদের প্রতি পরম সহনশীলতা এবং তাদের ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা।

চিশতিয়া তরিকার এই উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত ভারতে ইসলামের শেকড়কে মজবুত করেছে এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।[6]

চিশতি সুফি ও সুলতানদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অবস্থান:

চিশতিয়া তরিকার আদি যুগের বড় বড় সুফি-সাধকগণ সুলতান এবং আমির-ওমরাদের সাথে মেলামেশা বা ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে, তাঁদের মূল দায়িত্ব হলো মানুষকে ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিকভাবে সংশোধন করা এবং ইসলামি সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো। তাঁরা মনে করতেন, সুলতানদের মজলিশে যাতায়াত, তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন কিংবা সরকারি কোনো দায়িত্বে লিপ্ত হওয়া আধ্যাত্মিক সাধনা (তাজকিয়া ও সুলুক) এবং রুহানিয়তের জন্য ক্ষতিকর। ভারতে আসার আগে থেকেই যে সুফি ঐতিহ্যে তাঁরা বেড়ে উঠেছিলেন, সেখান থেকেই তাঁরা এই শিক্ষা পেয়েছিলেন। এই কারণেই কোনো অবস্থাতেই তাঁরা রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হওয়া পছন্দ করতেন না।

শায়খ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) ও সুলতান ইলতুতমিশ:

হজরত শেখ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ (১২১০-১২৩৬ খ্রি.)-এর সমসাময়িক ছিলেন। সুলতান ইলতুতমিশ অভিবাসী আলেম ও মাশায়েখদের জন্য ভারতের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং তাঁদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রমতে, কোনো সুফি-সাধকের আগমনের খবর পেলে সুলতান তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে কয়েক মাইল পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে যেতেন এবং তাঁদের রাজপ্রাসাদে থাকার জন্য জোরাজুরি করতেন।

যখন শেখ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) দিল্লিতে পৌঁছলেন, সুলতান তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু শেখ রাজ দরবারের সাথে কোনো প্রকার সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি রাজপ্রাসাদ থেকে দূরে নির্জনে বসবাস করাকে বেছে নেন এবং বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা সাধারণ সময়— কখনোই রাজপ্রাসাদে যাতায়াত করতেন না। সুলতান ইলতুতমিশ জানতেন যে, শেখ তাঁকে এড়িয়ে চলেন এবং দেখা করতে আগ্রহী নন, তা সত্ত্বেও সুলতান গভীর ভক্তি নিয়ে সর্বদা শেখের খানকায় গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন।

শেখ ও সুলতানের এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ও ভক্তি এতটাই গভীর ছিল যে, সুলতান তাঁর আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক মিনারটির নামকরণ করেছিলেন শায়খের নামানুসারে— ‘কুতুব মিনার’। এমনকি দিল্লির বিখ্যাত ‘হাওয-ই-শামসী’ (একটি বিশাল জলাধার) খনন ও নির্মাণের ক্ষেত্রেও সুলতান শায়খের পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন।

শেখ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) ও সুলতান ইলতুতমিশের মধ্যকার এই গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক একদল দুনিয়ালোভী ‘ওলামায়ে সূ’ বা অসৎ আলেমের হৃদয়ে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারা সুলতান ও শায়খের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরাতে এবং শায়খকে দিল্লি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর পীর হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি বখতিয়ার কাকীকে সাথে করে আজমির নিয়ে যাবেন।

যখন দিল্লির মানুষ জানতে পারল যে, শায়খ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তারা শোকে ভেঙে পড়ল এবং দলে দলে তাঁর পিছু নিল। স্বয়ং সুলতান ঘোড়ায় চড়ে শায়খের কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করলেন এবং তাঁকে দিল্লিতে ফিরে আসার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু শায়খ তাতে রাজি হচ্ছিলেন না। অবশেষে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং বখতিয়ার কাকীকে দিল্লিতেই অবস্থান করে আধ্যাত্মিক সংস্কার ও দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

সুলতান তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতেন। শায়খ রাজপ্রাসাদে যেতে অস্বীকৃতি জানালেও প্রতি সপ্তাহে দুইবার সুলতান নিজে শায়খের মজলিশে ওয়াজ শুনতে আসতেন। একবার শায়খ সুলতানকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “হে সুলতান, তোমার উচিত অভাবী ও দরিদ্রদের সাথে সদয় আচরণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের হকের (অধিকার) প্রতি খেয়াল রাখা। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের অধিকার রক্ষা করে এবং প্রজাদের সুখ-শান্তির জন্য জানপ্রাণ বিলিয়ে দেয়, আল্লাহ তাকে সমস্ত অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন এবং শত্রুদেরও তার বন্ধু বানিয়ে দেন।”

১৪ই রবিউল আউয়াল ৬৩৩ হিজরিতে (১২৩৫ খ্রি.) শায়খ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) ইন্তেকাল করেন। জানাজার সময় হজরত খাজা আবু সাঈদ (রহ.) ঘোষণা করলেন, “মরহুম শায়খ অসিয়ত করে গেছেন যে, আমার জানাজায় কেবল সেই ব্যক্তি ইমামতি করবে, যে অত্যন্ত মুত্তাকি ও পরহেজগার, যার জীবনে কখনো আসরের সুন্নাত কাজা হয়নি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রথম তকবির (তকবিরে উলা) কখনো ছোটেনি।”

জানাজায় উপস্থিত সুলতান ইলতুতমিশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন দেখার জন্য যে, কেউ সামনে এগিয়ে আসে কি না। যখন কেউ এলো না, তখন সুলতান কাতার থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “আমি আমার ইবাদত জাহির করতে চাইনি, কিন্তু শায়খের অসিয়ত রক্ষা করার জন্য আমাকে আজ বাধ্য হয়ে সামনে আসতে হলো।” এরপর সুলতান নিজে জানাজা পড়ালেন এবং নিজ কাঁধে শায়খের খাটিয়া বহন করে কবরে নিয়ে গেলেন।[7]

বাবা ফরিদ (রহ.) ও সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবন:

বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর প্রধান খলিফা ছিলেন বাবা ফরিদ গঞ্জেশকার (রহ.)। সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবন তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। সুলতান হওয়ার আগে বলবন যখন ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, তখন তিনি প্রচুর অর্থসম্পদ এবং চারটি গ্রামের মালিকানার ফরমান নিয়ে বাবা ফরিদের খানকাহতে হাজির হন। বাবা ফরিদ মুচকি হেসে বললেন, “এই অর্থগুলো রেখে যাও, আমরা তা দরিদ্র ও দরবেশদের মাঝে বিলিয়ে দেব। কিন্তু জমির ফরমানগুলো তুমি ফেরত নিয়ে যাও, এগুলো আমাদের প্রয়োজন নেই; হয়তো এমন কেউ আছে যার আমাদের চেয়ে এগুলোর প্রয়োজন বেশি।”[8]

পরবর্তীতে বলবন যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখনও বাবা ফরিদ চিশতিয়া ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করে সুলতান থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। পার্থিব ক্ষমতার সামনে তিনি আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন। একবার তাঁর এক মুরিদ সুলতান বলবনের কাছে একটি সুপারিশপত্র চাইলেন। বাবা ফরিদ কেবল এই বাক্যটি লিখে দিলেন, “আমি তার বিষয়টি প্রথমে আল্লাহর দরবারে এবং তারপর তোমার কাছে পেশ করলাম। তুমি যদি তাকে কিছু দাও, তবে দাতা স্বয়ং আল্লাহ এবং তোমার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা। আর যদি তুমি তাকে কিছু না দাও, তবে বাধা দানকারী স্বয়ং আল্লাহ এবং তুমি ক্ষমাপ্রাপ্ত।”

হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) ও সুলতানদের সম্পর্ক:

হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি, আলাউদ্দিন খিলজি এবং গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন সুলতান জালালুদ্দিন খিলজির শাসনামলে। সুলতান সর্বদা শায়খের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইতেন, কিন্তু তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা কখনোই পূরণ হয়নি।

সে সময় শায়খ দিল্লির গিয়াসপুরে একটি খানকাহ স্থাপন করে চিশতিয়া আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার পুনর্জাগরণে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর ও তাঁর মুরিদ-শিষ্যদের জীবন তখন অত্যন্ত কষ্টে কাটছিল। খানকাহতে তখন তেমন কোনো ‘ফুতুহ’ (মানুষের দেওয়া উপহার বা দান) আসত না। এমনও হয়েছে যে, ফলের পুরো মৌসুম পার হয়ে গেছে অথচ শেখ একটি ফলও চেখে দেখার সুযোগ পাননি। শায়খ এবং তাঁর শিষ্যরা প্রায়ই একাদিক্রমে রোজা রাখতেন এবং অত্যন্ত কষ্টে অতি সামান্য খাবার সংগ্রহ করতেন।

যখন সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি শায়খের এই অভাবের কথা জানতে পারলেন, তিনি কিছু উপহার পাঠালেন এবং সাথে একটি চিঠিতে খানকাহর খরচ চালানোর জন্য একটি গ্রাম এবং তার চারভাগের একভাগ জমির মালিকানা (ওয়াকফ) গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। শায়খ সুলতানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং চিঠির উত্তরে লিখলেন, “আমাদের তোমার ধন-সম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।”[9]

এই ঘটনার পর শায়খের প্রতি সুলতানের ভক্তি আরও বেড়ে গেল। তিনি বারবার শায়খের সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরিশেষে সুলতান একটি গোপন পরিকল্পনা করলেন যে, তিনি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ শায়খের দরবারে হাজির হবেন। সুলতান তাঁর এই পরিকল্পনার কথা উজির আমীর খসরুকে জানিয়েছিলেন।

আমীর খসরু ছিলেন হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর অত্যন্ত প্রিয় মুরিদ। তাই সুলতানের এই গোপন অভিসন্ধির কথা পীরকে না জানানো তাঁর কাছে সমীচীন মনে হলো না। তিনি তৎক্ষণাৎ শায়খকে সুলতানের আগমনের কথা জানিয়ে দিলেন। খবর পাওয়া মাত্রই শায়খ এই সাক্ষাৎ এড়াতে দিল্লি থেকে অযোধ্যার (বর্তমান পাকপত্তন) দিকে রওনা হলেন।

যখন সুলতান জানতে পারলেন যে শায়খ চলে গেছেন, তিনি আমীর খসরুকে তিরস্কার করে বললেন, “তুমি আমার গোপন কথা ফাঁস করে দিয়ে আমাকে শায়খের সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করলে।” উত্তরে আমীর খসরু (রহ.) এক ঐতিহাসিক ও সাহসী উক্তি করলেন, “হে সুলতান, আপনার ক্রোধের কারণে আমি আমার জীবনের ভয় করি, কিন্তু আমার পীরের ক্রোধের কারণে আমি আমার ঈমানের ভয় করি। আল্লাহর কসম, আমার কাছে জীবনের চেয়ে ইমানের মূল্য অনেক বেশি।”[10]

সুলতান আমীর খসরুর এই বলিষ্ঠ ও যুক্তিপূর্ণ জবাবে মুগ্ধ হলেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন।

সুলতান কুতুবুদ্দিন মোবারক খিলজি শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর রাজ দরবারে না আসা এবং তাঁর সাথে দূরত্ব বজায় রাখাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্মান, মর্যাদা ও রাজকীয় প্রতাপের এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অন্যান্য আলেম ও শায়খদের মতো শায়খকেও রাজ দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু শায়খকে বশ্যতা স্বীকার করাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। এই ঘটনাটি তৎকালীন ভারতীয় সমাজে শায়খের অনন্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, খ্যাতি এবং সুগভীর প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

এখানে সুলতানদের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সাধারণভাবে সুফি এবং বিশেষভাবে শায়খদের প্রতি গভীর ভক্তি পোষণ করতেন। তাঁরা শায়খদের যেকোনো ছোট-বড় সেবা করতে উন্মুখ থাকতেন। সুলতান কুতুবুদ্দিন খিলজি এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলক— এই দুজনকে ব্যতিক্রম ধরলে দেখা যায় যে, অধিকাংশ সুলতানই শায়খদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবন কিংবা খানকাহর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতেন। বরং তাঁরা শায়খদের নিজস্ব পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতেন এবং তাঁদের যে-কোনো প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতেন। মূলত সুলতানদের এই শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণের কারণেই সাধারণ ও বিশিষ্ট— উভয় শ্রেণির মানুষের কাছে সুফিদের সম্মান, মর্যাদা ও খ্যাতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সুলতানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেক আমির-ওমরাহ এবং ধনী ব্যক্তিও শায়খদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং ভক্তি প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তবে ঐতিহাসিক কোনো সূত্র থেকে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, আদি চিশতিয়া শায়খদের কেউ তাঁদের মুরিদ হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর যুগে এই পরিস্থিতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। তিনি কেবল আমির ও ধনীদের সাথে সৌজন্যমূলক সম্পর্কই বজায় রাখেননি, বরং তাঁদের চিশতিয়া তরিকার মুরিদ হওয়ারও অনুমতি প্রদান করেন। চিশতিয়া সিলসিলার মূলনীতিতে এই পরিবর্তনটি ছিল একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা কেন্দ্রীয় সন্ধিক্ষণ; যা চিশতিয়া তরিকার ভবিষ্যৎ ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনে। এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে চিশতিয়া তরিকার সংস্কারমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে যেমন ব্যাপকতা আসে, তেমনি এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব ও কঠিন পরিণতিরও সৃষ্টি হয়।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির (১২৯৬-১৩১৬ খ্রি.) রাজত্বকালে চিশতিয়া তরিকার ইতিহাসে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। চিশতিয়া তরিকা— যা আগে মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক সাধনায় বিশ্বাসী ছিল, শায়খ নিজামুদ্দিনের যুগে তা একটি সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

আগে চিশতিয়া সুফিগণ নির্জনে ইতেকাফ, কঠোর রিয়াজত, মুজাহাদা এবং আত্মশুদ্ধিতে মগ্ন থাকতেন এবং পার্থিব জগত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন রাখতে সচেষ্ট থাকতেন। কিন্তু শায়খ নিজামুদ্দিনের সময়ে সেই সুফি একজন সমাজ-সচেতন ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি মুরিদ, অনুসারী এবং সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গরিব হোক বা ধনী, প্রজা হোক বা শাসক, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে তাঁর সংযোগ স্থাপিত হয়। তিনি তাঁর পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া শুরু করেন; কখনও পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হন, আবার কখনও নিজের আধ্যাত্মিক প্রভাব দিয়ে পরিবেশকে প্রভাবিত করেন।

চিশতিয়া শায়খ ও তুঘলক রাজবংশের সম্পর্ক:

চিশতিয়া তরিকা যখন বৈরী স্রোত বা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো, তখন দেখা গেল যে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাঁদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। এর প্রধান কারণ ছিল দীর্ঘকাল ধরে শায়খদের ব্যক্তিগত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না করা এবং তাঁদের প্রতি শাসকদের অগাধ শ্রদ্ধা ও পৃষ্ঠপোষকতা। এই দীর্ঘকালীন পৃষ্ঠপোষকতা শায়খদের চিন্তাধারায় এক চরম বৈপরীত্য (Contradiction) সৃষ্টি করেছিল।

তাত্ত্বিকভাবে, চিশতিয়া শায়খগণ প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক রাখা বা সুলতানদের সাথে মেলামেশা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতেন; তাঁরা একে আধ্যাত্মিক সাধকের (সালিক) জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর মনে করতেন। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। খানকাহ পরিচালনা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত ও মানসিক সংস্থান নিশ্চিত করার তাগিদে তাঁরা পরোক্ষভাবে প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। একদিকে শায়খগণ সুলতানদের খানকাহতে আসার অনুমতি দিতেন না এবং রাজদরবার থেকে কঠোর দূরত্ব বজায় রাখতেন; অন্যদিকে, এই খানকাহগুলোতেই বিপুল সংখ্যক আমির-ওমরাহ, প্রভাবশালী ধনী এবং রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়মিত যাতায়াত ও শায়খদের সাথে গভীর যোগাযোগ ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বজায় ছিল, ততক্ষণ এই বৈপরীত্য প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু যখনই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো এবং অনুকূল পরিবেশ সরে যেতে শুরু করল, তখনই নতুন সমস্যার উদ্ভব হলো।

সুলতান গিয়াসুদ্দিন ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের যুগ:

এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলো চরম আকার ধারণ করে সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক এবং তাঁর পুত্র সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে। মুহাম্মদ বিন তুঘলক (মৃত্যু: ১৩৫১ খ্রি.) ছিলেন ভারতের ইতিহাসে অনন্য চরিত্র। তিনি বীরত্ব, দানশীলতা, বিনয় এবং ন্যায়বিচারের জন্য দেশ-বিদেশে প্রবাদপ্রতিম ছিলেন। ঐতিহাসিক সূত্রমতে, তিনি দ্বীনের বিধিবিধান পালনে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। বিশেষ করে নামাজ এবং নামাজের জামাত ত্যাগের শাস্তির ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি নিজে নফল ইবাদত, রোজা এবং জিকির-আজকারে মগ্ন থাকতেন এবং মদ্যপানসহ যাবতীয় পাপাচার ও গর্হিত কাজ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক শরিয়ত বহির্ভূত সকল কর রদ করেন এবং কেবল জাকাত ও ওশর সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তিনি নিজে সপ্তাহে দুই দিন (সোমবার ও বৃহস্পতিবার) মজলুমদের অভিযোগ শোনার জন্য বসতেন এবং এর জন্য একটি বিশেষ বিভাগ (দেওয়ান-ই-মাজালিম) প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় ইসলামি ইতিহাসে এটিই ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রথম গম্ভীর প্রচেষ্টা।

সংঘাতের মূল কারণ: চিশতিয়া তরিকার চিরাচরিত মূলনীতিগুলোর সাথে সুলতানের রাজনৈতিক দর্শনের সরাসরি সংঘাত বাধে। চিশতিয়া শায়খগণ যেখানে রাজনীতি থেকে বিযুক্ত থাকাকেই আদর্শ মনে করতেন, সুলতান সেখানে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদেরও রাষ্ট্রীয় ও শরয়ি শৃঙ্খলা সংস্কারে অংশীদার করতে চেয়েছিলেন। এই আদর্শিক ভিন্নতাই সুলতানের দীর্ঘ শাসনামলে উভয় পক্ষের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ও তিক্ত সংগ্রামের জন্ম দেয়।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সমসাময়িক চিশতিয়া শায়খদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হজরত শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর সুযোগ্য শিষ্যগণ; যেমন— শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী, শায়খ ফখরউদ্দিন জারাদি, শায়খ কুতুবুদ্দিন মুনাওয়ার প্রমুখ। তাঁরা এমন কোনো কাজ করতে রাজি ছিলেন না, যা তাঁদের বিবেকবিরোধী, মর্যাদাহানিকর বা তাঁদের খ্যাতির পরিপন্থী। ফলে সুলতান যখন তাঁদের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেন, তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁরা তাঁদের আদর্শ রক্ষায় এবং সরকারের সাথে অসহযোগিতা করতে গিয়ে সারাজীবন ব্যতিব্যস্ত থাকলেন, যার ফলে তাঁদের ধর্মীয় ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হলো।

অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের যে-সকল চিশতিয়া শায়খ সুলতানের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় খানকাহর সংস্কারমূলক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁরা রাষ্ট্রের জন্যও বিশেষ কোনো উপকারে আসতে পারেননি, বরং তাঁদের ধর্মীয় যোগ্যতাগুলোই নষ্ট হলো। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বাবা ফরিদ গঞ্জেশকার (রহ.)-এর বংশধর ও অনুসারীদের একটি বড় অংশ প্রশাসনে যুক্ত হয়েছিলেন; যাঁদের মধ্যে খাজা করিমুদ্দিন সমরকান্দি, সৈয়দ কুতুবুদ্দিন কিরমানি, সৈয়দ কামালুদ্দিন, শায়খ মজহারুদ্দিন, শায়খ মুইজুদ্দিন এবং শায়খ আলিমুদ্দিন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এই দীর্ঘ সংঘাত এবং মৌলিক পরিবর্তনের ফলে চিশতিয়া তরিকার ‘প্রথম যুগের’ (The First Golden Phase) অবসান ঘটে।[11]

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ও চিশতিয়া শায়খদের সম্পর্ক:

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (মৃত্যু: ৭৮৯ হিজরি / ১৩৮৮ খ্রি.) ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই মুহাম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরসূরি। তিনি সমকালীন আলেম, শায়খ এবং সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণ তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি তাঁকে দিল্লি সালতানাতের শ্রেষ্ঠ সুলতানদের একজন হিসেবে গণ্য করেছেন এবং লিখেছেন যে, ফিরোজ শাহের মতো ধর্মপ্রাণ, পবিত্র চরিত্র ও ন্যায়পরায়ণ সুলতান ইতিহাসে বিরল, যিনি তাঁর শাসনামলে ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন।[12]

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে চিশতিয়া শায়খদের সাথে যে দীর্ঘ সংঘাত চলেছিল, তা খানকাহ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছিল। ফিরোজ শাহ যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। মুহাম্মদ বিন তুঘলক রাজধানী থেকে দূরে সিন্ধু প্রদেশে থাকাকালীন ইন্তেকাল করায় সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং রাজধানীতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এমতাবস্থায় ফিরোজ শাহের জন্য আলেম, শায়খ ও আমিরদের সমর্থন বা ‘বৈধতা’ (Legitimacy) পাওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। দিল্লিতে পৌঁছানোর আগেই তিনি শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভীর দরবারে উপস্থিত হন। শায়খও এই সুযোগে প্রশাসনের সহায়তায় চিশতিয়া খানকাহ ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ চেয়েছিলেন। শায়খের সাথে সাক্ষাতের সময় সুলতান তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলে শায়খ তাঁর কাছ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন, “তুমি কি জনগণের সাথে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের আচরণ করবে? অন্যথায় আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব যেন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম, সবচেয়ে আমানতদার এবং যোগ্য কাউকে শাসক হিসেবে পাঠান।” ফিরোজ শাহ প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং শায়খ তাঁর জন্য দোয়া করলেন।

ক্ষমতায় বসার পর সুলতান ফিরোজ শাহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি চিশতিয়া খানকাহগুলোর পুনর্জাগরণে বিশেষ মনোনিবেশ করেন। তিনি বাবা ফরিদ গঞ্জেশকার, শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, শায়খ রুকনুদ্দিন আবুল ফাতহ, শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া এবং শায়খ জামালুদ্দিনের (রহ.) বংশধর ও খানকাহগুলোর জন্য প্রচুর গ্রাম, জমি ও প্রশাসনিক পদ বরাদ্দ করেন। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি অঢেল অর্থ ব্যয় করেন। ফলে গ্রাম ও শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত খানকাহগুলো পুনরায় সচল হয় এবং সেখানে মুসাফির ও দরবেশদের জন্য খাবার ও আবাসন নিশ্চিত হয়।

শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী ও সুলতান ফিরোজ শাহের সম্পর্ক:

শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী (মৃত্যু: ১৩৫৬ খ্রি.) ছিলেন সুলতানুল মাশায়েখ হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলিফা। পীরের ইন্তেকালের পর তিনি চিশতিয়া খানকাহগুলোর শৃঙ্খলা রক্ষা এবং এর ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

কিছু ঐতিহাসিক উৎস শায়খ এবং সুলতান ফিরোজ শাহের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করলেও আধুনিক কালের কিছু গবেষক তা অস্বীকার করেন। তবে সমসাময়িক অধিকাংশ তথ্যসূত্র নিশ্চিত করে যে, সিন্ধু প্রদেশের ‘ঠাট্টা’ (Thatta) অঞ্চলে ফিরোজ শাহের সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে শায়খ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তৎকালীন সুফি-সাহিত্যগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, সুলতান ফিরোজ শাহ সুফি জীবনধারা পুনরুজ্জীবিত করতে এবং খানকাহগুলোর অবস্থা উন্নয়নে অঢেল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এমতাবস্থায় শায়খ কেন সুলতানের সাথে যোগাযোগ রাখবেন না বা তাঁকে সঠিক পথপ্রদর্শনে ভূমিকা রাখবেন না?

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন প্রশাসনের প্রতি শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না। বিশেষ করে চিশতিয়া বা সোহরাওয়ার্দিয়া খানকাহগুলোতে আশ্রিত দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রশাসনের শিথিলতা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। শায়খ সমকালীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অভাবীদের প্রতি প্রশাসনের অবহেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতেন।

তিনি তাঁর বিভিন্ন ‘মালফুজাত’ বা বাণী সংকলনে আক্ষেপ করে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সোনালি যুগের স্মৃতিচারণ করতেন। তিনি বলতেন, “সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির আমলে কোনো ফকির বা দরিদ্র মানুষ লেপ-কম্বল ছাড়া ঘুমায়নি; বরং অনেকের কাছে একাধিক কম্বল থাকত। সে সময় জীবনযাত্রার মান এত উন্নত এবং দ্রব্যমূল্য এত সস্তা ছিল যে, মানুষ মাত্র এক ‘তঙ্কা’ (তৎকালীন মুদ্রা) খরচ করেই বড় বড় অনুষ্ঠান ও ভোজের আয়োজন করতে পারত।”[13]

ভারতে চিশতিয়া তরিকার প্রচার প্রসারে বিভিন্ন দরবার ও খানকাহর ভূমিকা:

ভারত ও ভারতীয় উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে বহু দরবার ও খানকাহর অবদান অনস্বীকার্য। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—

১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) — মেহেরৌলি, দিল্লি।
২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাহবুব-এ-ইলাহি নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) — দিল্লি।
৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত খাজা শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-এ-দেহলভী (রহ.) — দিল্লি।
৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শাহ কলিমুল্লাহ জাহানাবাদী (রহ.) — দিল্লি।
৫. আস্তানায়ে আলিয়া সুলতানুত তারিকিন হজরত সুফি হামিদুদ্দিন নাগোরি (রহ.) — রাজস্থান।
৬. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম আলাউদ্দিন সাবের কলিয়ারি (রহ.) — কলিয়ার শরিফ, উত্তরাখণ্ড।
৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত বু আলী শাহ কালান্দার পানিপথী (রহ.) — পানিপথ, হরিয়ানা।
৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ জামালুদ্দিন হাসভি (রহ.) — হাসি, হরিয়ানা।
৯. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়দ মুহাম্মদ বিন জাফর আল-হুসাইনি আল-মাক্কি (রহ.) — সিরহিন্দ, পাঞ্জাব।
১০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত খাজা সৈয়দ ইসমাইল চিশতি (রহ.) — মির্জাপুর, উত্তরপ্রদেশ।
১১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ সৈয়দ মুহাম্মদ সোগরা (রহ.) — বিলগ্রাম, জেলা হারদই, উত্তরপ্রদেশ।
১২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম শাহ মুহাম্মদ মীনা (রহ.) — লক্ষ্ণৌ, উত্তরপ্রদেশ।
১৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়্যদ মাখদুম শায়খ আহমদ আবদুল হক রুদাউলি — উত্তরপ্রদেশ (ইউপি)।
১৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গুহী — সাহারানপুর, উত্তরপ্রদেশ।
১৫. আস্তানায়ে আলিয়া সৈয়দ মাখদুম আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানি — কাছোছা শরিফ, উত্তরপ্রদেশ।
১৬. আস্তানায়ে আলিয়া শামসুল আরেফিন হজরত শাহ জামাল — আলীগড়, উত্তরপ্রদেশ।
১৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ নিজামুদ্দিন আবুল মুয়াইদ — আলীগড়, উত্তরপ্রদেশ।
১৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ সেলিম চিশতি — ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা, উত্তরপ্রদেশ।
১৯. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ শামসুল হক মুহাম্মদ রশিদ উসমানি — জৌনপুর, উত্তরপ্রদেশ।
২০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ হুসামুদ্দিন মানিকপুরী — উত্তরপ্রদেশ।
২১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শাহ নিয়াজ আহমদ বেরলভী — উত্তরপ্রদেশ।
২২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শাহ হাফেজ মুহাম্মদ আলী খায়রাবাদী — উত্তরপ্রদেশ।
২৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত আল্লামা ফজলুল হক চিশতি খায়রাবাদী — উত্তরপ্রদেশ।
২৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত হাজি ওয়ারিস আলী শাহ — দেওয়া শরিফ, বারাবাঁকি, উত্তরপ্রদেশ।
২৫. আস্তানায়ে আলিয়া আয়না-এ-হিন্দ শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান বদায়ুনী — গৌড়/পাণ্ডুয়া, বাংলা।
২৬. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ আলাউল হক ওয়াদিন — পাণ্ডুয়া, বাংলা।
২৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ নূর কুতুব-এ-আলম — পাণ্ডুয়া, বাংলা।
২৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ সৈয়দ আবদুল্লাহ চিশতি, মওদুদ — বিহার।
২৯. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম সৈয়দ তৈয়বুল্লাহ সফেদবাজ — পাটনা, বিহার।
৩০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম শাহ দরবেশ চিশতি — বিথো, গয়া, বিহার।
৩১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ সৈয়দ ইব্রাহিম জিন্দা দিল — কাকো, জাহানাবাদ, বিহার।
৩২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ সৈয়্যদ মুহাম্মদ শাহবাজ — ভাগলপুর, বিহার।
৩৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়্যদ শাহ মুহাম্মদ কায়েম কাতিল দানাপুরী — বিহার।
৩৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম সৈয়্যদ ফরিদউদ্দিন তবিলা বখশ চিশতি বিহারি — বিহার।
৩৫. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ মুহাম্মদ বিন ফজলুল্লাহ নায়েবে রসুলুল্লাহ — বুরহানপুর, মধ্যপ্রদেশ।
৩৬. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ বুরহানউদ্দিন গরিব হাসভি — খুলদাবাদ, মহারাষ্ট্র।
৩৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ জয়নুদ্দিন দাউদ শিরাজি — মহারাষ্ট্র।
৩৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ নিজামুদ্দিন আওরঙ্গাবাদী — মহারাষ্ট্র।
৩৯. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়দ নিজামুদ্দিন আওলিয়া হোসাইনি — আওরঙ্গাবাদ, মহারাষ্ট্র।
৪০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ ভিখারি চিশতি — বুরহানপুর, মধ্যপ্রদেশ।
৪১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত বাবা তাজউদ্দিন নাগপুরী — নাগপুর, মহারাষ্ট্র।
৪২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মীর সৈয়দ আহমদ বান্দা নেওয়াজ গেসুদারাজ — গুলবার্গা, কর্ণাটক।
৪৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়্যদ শাহ শামস আলম হোসাইনি — রাইচুর, কর্ণাটক।
৪৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শাহমন বাদশাহ চিশতি — বিজাপুর, কর্ণাটক।
৪৫. আস্তানায়ে আলিয়া শাহ আমিনুদ্দিন আলী আলা চিশতি হোসাইনি — বিজাপুর, কর্ণাটক।
৪৬. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ ওয়াজিহুদ্দিন আহমদ আলভী — গুজরাট।
৪৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ বারাকাতুল্লাহ চিশতি — গুজরাট।
৪৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ হুসামুদ্দিন মুলতানি — গুজরাট।
৪৯. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মাখদুম শায়খ কবিরুদ্দিন — গুজরাট।
৫০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ ইয়াহইয়া চিশতি ফারুকী — গুজরাট।
৫১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ শাহুল হামিদ চিশতি কাদির ওয়ালী — নাগোর/তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু।
৫২. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ আলী সুলতান — ভেলোর, তামিলনাড়ু।
৫৩. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়দ শাহ হামিদ আউলিয়া বাদশাহ — কাঞ্চিপুরাম, তামিলনাড়ু।
৫৪. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মীরাঞ্জী হোসেন চিশতি — হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা।
৫৫. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মির্জা সরদার বেগ চিশতি — হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা।
৫৬. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত মুরাদ শাহ ধুতি চিশতি — হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা।
৫৭. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত সৈয়দ সোহরাব উদ্দিন চিশতি — হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা।
৫৮. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ ওয়াজিহুদ্দিন ইউসুফ — মালওয়া, মধ্যপ্রদেশ।
৫৯. আস্তানায়ে আলিয়া শায়খ কামালুদ্দিন — মালওয়া, মধ্যপ্রদেশ।
৬০. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ মুসা মন্দপুরী — উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ।
৬১. আস্তানায়ে আলিয়া হজরত শায়খ আহমদপুর নেয়ামত উল্লাহ — মালওয়া, মধ্যপ্রদেশ।[14]

বাংলাদেশে চিশতিয়া তরিকার বিকাশ:

খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) এর সময়ে ওনার একনিষ্ঠ শিষ্য শেখ আখি সিরাজ উদ্দিন (রহ.) বাংলাদেশে ইসলাম এবং চিশতিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে অবদান রাখেন।[15]

বাংলাদেশের ঢাকায় চিশতিয়া তরিকার প্রচারে হজরত শরফুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম বিশেষভাবে পাওয়া যায়।

এছাড়াও বহু দরবার ও পীর মাশায়েখ চিশতিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছেন। তন্মধ্যে কিছু হলো—

১. হজরত আবদুল খালেক শাহ জুলফিকার সুফি (রহ.), শুকছড়ি চিশতীয়া দরবার, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
২. হজরত খাজা শাহ্ আবু নাছের মোহাম্মদ নাজিবুদ্দিন চিশতি (রহ.) জুরাইন, ঢাকা।
৩. খাজা শাহ আবু সাঈদ মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান চিশতি (রহ.), পীর কাশেমপুর চিশতিয়া দরবার, মুরাদনগর, কুমিল্লা।
৪. খাজা শাহ সুফি মনছুর আলী চিশতী নিজামী (রহ.), উদিবাড়ী দায়রা পাক, কুষ্টিয়া।
৫. সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসায়নী চিশতী শ্যামপুরী (রহ.), নড়িয়া, শরিয়তপুর।
৬. হজরত সালাল শাহ চিশতী (রহ.), দোহার, ঢাকা।
৭. হজরত শাহ নুরুল ইসলাম ইসলাম নুরী বাবা (রহ.), আহলা দরবার শরিফ, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম। সহ আরো বহু পীর মাশায়েখ।

সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি ইতিহাসে চিশতিয়া তরিকা অত্যন্ত প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক আন্দোলন। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মাধ্যমে আজমিরে এর সূচনা হয়ে পরে বাবা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার (রহ.) ও নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর হাতে তা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। মানবিকতা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ছিল এ তরিকার মূল ভিত্তি।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবা, লঙ্গরখানার মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের যুগেও তাঁরা আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা অটুট রাখেন। স্থানীয় ভাষায় দাওয়াত, কাওয়ালি ও খানকাহকেন্দ্রিক শিক্ষা-সংস্কারের মাধ্যমে চিশতিয়া তরিকা উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে স্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।