(ট্রায়াল প্রবন্ধ, অসম্পাদিত)
রুমির কবিতায় প্রেম ও আত্মজাগরণ: এক আধ্যাত্মিক নন্দনের অনুসন্ধান
পারস্যের মহান সুফি কবি জালালুদ্দিন রুমি (১২০৭–১২৭৩) মানবসভ্যতার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন এক উচ্চতর শিখর, যেখানে প্রেম, সত্য, এবং আত্মজাগরণের ধারা একত্রে মিলিত হয়েছে। রুমির কবিতা আজ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি অনূদিত ও পঠিত আধ্যাত্মিক সাহিত্যের মধ্যে অন্যতম; তাঁকে “বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি” বলেও আখ্যায়িত করা হয়।[1] তাঁর কাব্যবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ‘প্রেম’—কিন্তু এ প্রেম কেবল ব্যক্তিগত রোমান্টিক অনুভব নয়; বরং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আকুল অনুসন্ধান, সত্যের জন্য আত্মত্যাগ এবং আত্মাকে জাগ্রত করার এক অন্তর্লৌকিক প্রক্রিয়া।
রুমির প্রধান দুটি গ্রন্থ—ছয় খণ্ডের মহাকাব্যিক মসনবি-ই মানভি এবং গীতিময় দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি—প্রেম ও আত্মজাগরণের গভীরতর আলোচনায় পূর্ণ।[2] এই প্রবন্ধে রুমির কবিতায় প্রেমের রূপ, তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং আত্মজাগরণের প্রকরণ বিশ্লেষণ করা হবে, বিশেষভাবে আধুনিক মানুষ ও সমকালীন বাংলাভাষী পাঠকের প্রেক্ষাপটে।
রুমির জীবনপ্রেক্ষাপট ও আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা
রুমির কাব্যকে বোঝার জন্য তার জীবনের আধ্যাত্মিক পটভূমি বিবেচনা করা জরুরি। রুমি প্রথমে একজন প্রখ্যাত আলেম, ফকিহ ও মুফতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন; তাঁর পরিবার মধ্য এশিয়ার বালখ অঞ্চল থেকে সেলজুক আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) চলে আসে এবং শেষ পর্যন্ত কোনিয়ায় বসতি স্থাপন করে।[3] কিন্তু তাঁর জীবন ও চিন্তার মৌলিক রূপান্তর ঘটে শামস-ই তাবরিজ নামক এক রহস্যময় দরবেশের সাক্ষাতে (১২৪৪ সালে)।
শামসের সাথে এই আধ্যাত্মিক সংলাপ রুমির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘প্রেম’ ও ‘আত্মজাগরণ’-এর সম্ভাবনাকে বিকশিত করে। প্রথাগত ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে তিনি প্রেমকে ধর্মের কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গ এবং আত্মার জাগরণকে আধ্যাত্মিক জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রেমের এই রূপান্তরমুখী শক্তিই তাঁর সমগ্র কাব্যকে চালিত করে।[4]
সুফি দর্শনে প্রেমের ধারণা ও রুমি
ইসলামি সুফিবাদে প্রেম (ইশ্ক)কে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলির এক প্রত্যক্ষ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইবনে আরাবি, আল-গাজ্জালি, হাফিজ, সানাই, আত্তারের মতো সুফি মনীষীরা প্রেমকে জগত ও মানবের অস্তিত্বব্যাখ্যার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।[2] রুমির মৌলিকত্ব এই যে, তিনি গভীর ও জটিল মেটাফিজিক্যাল ধারণাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়গ্রাহী উপমা, কাহিনি ও উপালম্বের মাধ্যমে কাব্যিক করে তুলেছেন।
রুমির কাছে প্রেম হলো—একাধারে সৃষ্টির উৎস, মানুষ ও আল্লাহর সম্পর্কের সেতু, এবং আত্মপরিচয়ের আয়না। তিনি বলেন, প্রেমই মানুষকে নিজের সীমা ভেঙে অসীমের দিকে ধাবিত করে, আর এই ধাবমানতাই প্রকৃত আত্মজাগরণ।
রুমির কবিতায় প্রেমের ধরনগুলো
ইশ্ক-ই মজাজি থেকে ইশ্ক-ই হাকিকি
সুফি পরিভাষায় প্রেমের দুটি ধারা—ইশ্ক-ই মজাজি (রূপক/মানব–মানব প্রেম) এবং ইশ্ক-ই হাকিকি (প্রকৃত বা ঈশ্বরীয় প্রেম) বহুল আলোচিত। রুমি এই দুই স্তরকে একটি ধারাবাহিক পথ হিসেবে দেখেছেন। মানবিক প্রেম, সৌন্দর্য বা আকর্ষণ—সবই তাঁকে সত্যিকারের ঈশ্বরীয় প্রেমের এক প্রতীকী প্রতিফলন বলে মনে হয়।[3]
তিনি বিভিন্ন কবিতায় মানবপ্রেমের বিচ্ছেদ, আকুলতা ও মিলনের বর্ণনা দিলেও তার অন্তর্লীন অর্থ থাকে—মানুষের আত্মা ও পরমসত্তার সম্পর্ক। এইভাবে রুমির কবিতায় প্রেম এক ধরনের প্রতীকী সেতু, যা ইন্দ্রিয়মানব থেকে পরমমানবের দিকে উত্তরণের দিশা দেয়।
শামসের প্রতি প্রেম: মানবরূপে ঈশ্বরীয় আলোর আবিষ্কার
রুমির কবিতায় শামস-ই তাবরিজকে কেন্দ্র করে যে গভীর প্রেমের প্রকাশ দেখা যায়, তা ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা গুরু-শিষ্য সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে। শামস তাঁর কাছে হয়ে ওঠেন ঈশ্বরীয় আলোর জীবন্ত প্রতিমূর্তি—এক ‘আয়না’, যেখানে রুমি নিজের আত্মাকে প্রত্যক্ষ করেন।[1]
অনেক গবেষকের মতে, দিওয়ান-ই শামস-এর অধিকাংশ গজল প্রকৃতপক্ষে শামসের নয়, বরং আল্লাহর প্রতি রুমির প্রেমের কবিতাস্বরূপ—শামস সেখানে শুধুই প্রতীক, এক মাধ্যম।[4] এই প্রতীকী প্রেমই পরিণামে আত্মজাগরণের এক অন্তহীন পথে রুমিকে চালিত করে।
প্রেমের বেদনা ও আকুলতা
রুমির বিখ্যাত ‘নাই-নামা’—মসনবি-র সূচনা অংশ—প্রেমের এই বিচ্ছিন্নতাবোধের এক অসামান্য রূপক। বাঁশির মধ্যে যে সুর বেজে ওঠে, তা আসলে কাটা গাছের কান্না; সে আপন উৎস থেকে বিচ্ছেদের জ্বালায় কাঁদে।[5] মানবআত্মাও তেমনি নিজের পরম উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই জগতে নিক্ষিপ্ত, আর সেই বিচ্ছেদের দুঃখই আমাদের সমস্ত খোঁজ, ভালোবাসা ও ব্যথার মূল উৎস।
এখানে প্রেম বেদনার বিপরীত নয়; বরং বেদনাই প্রেমের প্রমাণ এবং আত্মজাগরণের চালিকাশক্তি। যত বেশি আত্মা তার বিচ্ছেদকে অনুভব করে, তত বেশি সে নিজের সত্যিকার গৃহে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়—এটাই রুমির আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব।
প্রেম ও আত্মজাগরণ: রুমির কাব্যদর্শন
আত্মার পরিশুদ্ধি: অহং ভাঙার প্রক্রিয়া
রুমির কাছে আত্মজাগরণ মানে কেবল জ্ঞান অর্জন বা তথাকথিত ‘আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা’ নয়; বরং সম্পূর্ণ সত্তার রূপান্তর। এই রূপান্তরের মূল শর্ত হচ্ছে নফস বা অহংকারের ভাঙন। তিনি নফসকে দেখেন এক ধরনের অন্ধকার কুয়াশা হিসেবে, যা আত্মাকে তার প্রকৃত উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।[2]
প্রেম এখানে আসে অগ্নিশিখার ন্যায়—যা অহংরূপী পর্দা জ্বালিয়ে আত্মাকে স্বচ্ছ করে। রুমি বারবার আগুন, গলন, গলিত সোনা, স্রোতধারার মতো চিত্রকল্প ব্যবহার করেন, যেখানে প্রেমের উত্তাপে অশুচি তত্ত্ব পুড়ে গিয়ে বিশুদ্ধ আত্মাস্বর্ণ উদ্ভাসিত হয়।
ফানা ও বাকা: আত্মবিলয় থেকে স্থিতি
সুফি পরিভাষায় ফানা (নাশ) এবং বাকা (স্থিতি)–দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ফানার মর্মার্থ হলো নিজের সত্তাকে আল্লাহর সত্তায় বিলীন করা, আর বাকা হলো সেই বিলয়ে এক ধরণের স্থায়ী স্থিতি লাভ। রুমি তাঁর কবিতায় প্রেমকে ফানার প্রধান মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেন—প্রেম মানুষকে ‘আমি’ থেকে ‘তিনি’-র দিকে নিয়ে যায়, আর আল্লাহর প্রেমে আত্মনিবেদনের ভেতর দিয়েই আত্মজাগরণের পরম পরিণতি ঘটে।[4]
এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি অস্তিত্ববাদী; এখানে কোনো তাত্ত্বিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়—ব্যক্তিকে বাস্তব জীবনে অহং, স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষা, বর্জন, এবং নৈতিক সীমালঙ্ঘনের ভেতর দিয়ে এক ধরণের অনুশীলিত আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটতে হয়।
আত্মজাগরণ ও নৈতিক রূপান্তর
রুমির প্রেমময় আত্মজাগরণ কোনো নিছক ব্যক্তিগত মিস্টিক অভিজ্ঞতা নয়; তা নৈতিক রূপান্তরের সাথেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। একজন প্রেমময় মানুষ তার ভেতরে করুণা, বিনয়, উদারতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধের বিকাশ ঘটায়। রুমি সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে নন; বরং ব্যাখ্যা করেন, আধ্যাত্মিকতা মানে জীবনের সব পরিসরে প্রেম ও ন্যায়কে কেন্দ্র করে নতুন দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা।[3]
এইভাবে প্রেম ও আত্মজাগরণ একত্রে একটি নৈতিক ও সামাজিক প্রজেক্টে পরিণত হয়, যা মানুষের দৈনন্দিন আচরণে অনুশীলিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রধান রূপক ও প্রতীক: প্রেমের আধ্যাত্মিক ব্যাকরণ
বাঁশি, মদ ও নাচ
রুমির কাব্যে বাঁশি, মদ (খামর), নাচ (সেমা) ইত্যাদি প্রতীকগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাঁশি হলো বিচ্ছিন্ন আত্মার কান্না, মদ হলো ঈশ্বরীয় প্রেমের মাতাল করা সুধা, আর নাচ হলো সেই প্রেমের অভ্যন্তরীণ কম্পন, যা দেহ ও আত্মাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কেন্দ্রের দিকে ফিরিয়ে আনে।[5]
বিশ্বখ্যাত ‘মেভলভি ঘূর্ণননৃত্য’—যেখানে দরবেশেরা সাদা পোশাক পরে অবিরাম বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকেন—রুমির আধ্যাত্মিক নন্দনের কাব্যিক রূপ। এই নাচের প্রতিটি ভঙ্গি আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, অহংবিসর্জন এবং বিশ্বময় প্রেমের সঞ্চারণকে প্রতিফলিত করে।[6]
আলো ও অন্ধকার
রুমির আত্মজাগরণের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প হলো আলো–অন্ধকারের দ্বৈততা। অন্ধকার এখানে শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং অহং, সংকীর্ণতা, ঘৃণা, ভয় ইত্যাদির সমষ্টি। প্রেম হলো সূর্যালোক, যা অন্ধকারকে উন্মোচন করে; আত্মজাগরণ মানে এই আলোয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্নান করা, নিজেকে আলোয় সঁপে দেওয়া।[2]
যাত্রা ও গৃহে ফেরা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ‘যাত্রা’—রুমি বারবার মানুষকে ‘মুসাফির’ বা পথিক হিসেবে উল্লেখ করেন। আমাদের পৃথিবীজীবন এক অস্থায়ী বিশ্রামগৃহ, আর প্রকৃত গন্তব্য হল আল্লাহর সান্নিধ্য। প্রেম এই যাত্রাপথের মানচিত্র ও চালিকাশক্তি; আর আত্মজাগরণ হলো যাত্রাপথে ক্রমাগত নিজেকে চেনা, ভুলে যাওয়া পরিচয় পুনরুদ্ধার করা।[5]
রুমির প্রেমদর্শনের সার্বজনীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাখ্যা
রুমির কবিতা ইসলামি সুফি ঐতিহ্যের গভীর ভেতরে স্থিত হলেও, তাঁর প্রেমদর্শন আজ বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও দর্শনের পাঠকের কাছে সমান অর্থবহ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা গবেষক ও পাঠকরা রুমিকে প্রায়শই ‘ধর্মনিরপেক্ষ আধ্যাত্মিকতা’র এক আইকন হিসেবে উপস্থাপন করেন—যেখানে প্রেমকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে সার্বজনীন মানবিক সত্য হিসেবে দেখা হয়।[1]
অবশ্য, সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, রুমির ইসলামি প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে কেবল ‘নির্বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরু’ হিসেবে পাঠ করা তাঁর মূল বক্তব্যকে খণ্ডিত করে ফেলে।[4] সত্য হলো—রুমির প্রেমদর্শন গভীরভাবে কোরআনিক ভাষ্য, নবী মুহাম্মদের জীবনদৃষ্টি, এবং সুফি তরিকাহের নৈতিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটেই তিনি প্রেমকে এমন ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যা ধর্মসীমা অতিক্রম করে মানবিকতা ও আত্মজাগরণের এক বিশ্বজনীন অভিঘাতে রূপ নেয়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও আত্মজাগরণের সাথে রুমির সংলাপ
আধুনিক মনোবিজ্ঞান বিশেষত ট্রান্সপার্সোনাল সাইকোলজি, একজিস্টেনশিয়াল থেরাপি ও মাইন্ডফুলনেস–ভিত্তিক হস্তক্ষেপে আত্মজাগরণ, স্ব-সচেতনতা, এবং আত্মোত্তরণ প্রসঙ্গে যে আলোচনা গড়ে উঠেছে, তা রুমির অনেক ধারণার সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য বহন করে।[7]
যেমন—রুমি যে অহং–অতিক্রম, অনাসক্তি, বর্তমান মুহূর্তে অবস্থান, মমতা–অভ্যাস, এবং অন্তর্মুখী পর্যবেক্ষণের কথা বলেন, তা আধুনিক থেরাপিউটিক পদ্ধতিগুলোর সাথেও প্রতিধ্বনিত হয়। এই সংলাপ দেখায় যে, রুমির প্রেম–কেন্দ্রিক আত্মজাগরণ কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা এক ধরণের পূর্ণাঙ্গ সাইকো-স্পিরিচুয়াল ট্রান্সফরমেশন মডেল হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলা সাহিত্য ও দর্শনে রুমির প্রভাব
বাংলা সাহিত্যেও রুমির প্রভাব নানাভাবে লক্ষণীয়। নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদসহ একাধিক মুসলিম কবি সুফি প্রেমদর্শন ও আত্মজাগরণের ধারায় প্রভাবিত হয়ে প্রেমকে ঈশ্বরানুসন্ধানের পরম মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। উপমহাদেশের ফারসি–উর্দু–বাংলা সাহিত্যে রুমি বহু শতাব্দী ধরে আধ্যাত্মিক রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে বর্তমান।[3]
আজকের বাংলা ভাষাভাষী তরুণ প্রজন্মও অনুবাদ, অনলাইন রিসোর্স ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার মাধ্যমে রুমির কবিতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক অশান্তি, অস্তিত্বগত একাকিত্ব, অর্থহীনতার বোধ—এই সব আধুনিক সংকটের মধ্যে রুমির প্রেম ও আত্মজাগরণের বাণী এক ধরনের অর্থময় সান্ত্বনা এবং গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান হিসেবে কাজ করতে পারে।
ডিজিটাল যুগে রুমি-পাঠ: সম্ভাবনা ও বিপর্যয়
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুমির কবিতা বিশ্বজুড়ে নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ, কোটেশন, গ্রাফিক্স, ভিডিও–এসবের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ তাঁর প্রেম ও আত্মজাগরণের বাণীর সাথে পরিচিত হচ্ছে।[7] এর ইতিবাচক দিক হলো—রুমির বার্তা বহুভাষিক ও আন্তঃধর্মীয় পরিসরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে বিপর্যয়ও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রসঙ্গহীন, বিকৃত, বা অতিরঞ্জিত অনুবাদ রুমির বক্তব্যকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রোমান্টিকতা বা স্ব-সন্তুষ্ট ‘পজিটিভিটি’-তে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। মূল ফারসি টেক্সট, সুফি প্রেক্ষাপট ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন এ ধরনের পঠনে প্রেম ও আত্মজাগরণ কেবল স্বাচ্ছন্দ্যের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, আত্মসমালোচনা বা নৈতিক রূপান্তরের আহ্বান আর থাকে না।[4]
অতএব, সমকালীন পাঠকের দায়িত্ব হলো—রুমিকে কেবল ‘কোটেশন-মেশিন’ হিসেবে না দেখে, তাঁর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রকল্পকে সমগ্রতায় বুঝে নেওয়া।
রুমির প্রেম ও আত্মজাগরণ: সমকালীন পাঠকের জন্য তাৎপর্য
আজকের ভোগবাদী, প্রতিযোগিতামুখী ও রাজনৈতিক–সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত বিশ্বে রুমির প্রেম–কেন্দ্রিক আত্মজাগরণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
(ক) প্রেমকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা। অন্যের প্রতি মমতা, ন্যায়বোধ ও সহমর্মিতা প্রেমেরই বিস্তৃত পরিসর।
(খ) আত্মজাগরণকে মানসিক আরাম বা ‘সেলফ–হেল্প’-ধর্মী স্বার্থপর প্রকল্প নয়; বরং অহং–অতিক্রম ও নৈতিক রূপান্তরের কঠিন পথ হিসেবে বোঝা।
(গ) সীমাবদ্ধ পরিচয়—জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, শ্রেণি ইত্যাদির বাইরে গিয়ে মানুষের মৌলিক আধ্যাত্মিক একাত্মতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা।
(ঘ) জ্ঞান ও প্রেমকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখা—নির্জীব জ্ঞান যেমন আত্মাকে জাগাতে পারে না, তেমনি অন্ধ আবেগও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রুমির কবিতায় প্রেম ও আত্মজাগরণ তাই নিছক কাব্যিক রোমান্টিকতা নয়; বরং আজকের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি বিকল্প জীবনদর্শন—যেখানে মানুষ নিজেকে, অন্যকে এবং পরমকে নতুন আলোতে দেখতে শেখে।
উপসংহার
রুমির কবিতা আমাদের শেখায়—প্রেম হলো সত্তার গভীরতম গতি, আর আত্মজাগরণ হলো সেই গতি সম্পর্কে ক্রমান্বয়ে সচেতন হয়ে উঠা। এই প্রেম কেবল কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ঘটনার প্রতি আকর্ষণ নয়; বরং এমন এক অন্তর্গত আগুন, যা আমাদের সব মুখোশ, অহং, ভয় ও মিথ্যা পরিচয় পোড়াতে পোড়াতে প্রকৃত সত্তার কাছে পৌঁছে দেয়।
বর্তমান সময়ে, যখন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের নামে মানবিক বিভাজন ক্রমেই তীক্ষ্ণ হচ্ছে, রুমির প্রেম–দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অস্তিত্বের কেন্দ্রে রয়েছে এক অদ্বিতীয় সত্য, যাকে নানা ভাষা, রূপ ও ধর্মে ডাকা হলেও তার মৌলিক সুর একটিই। আর সেই সুর শোনার জন্য প্রয়োজন ‘জাগ্রত আত্মা’—যে আত্মা প্রেমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজের সীমা ছাড়িয়ে অন্যের মধ্যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে এবং শেষপর্যন্ত পরমসত্তার মধ্যে নিজেকে প্রতিফলিত দেখতে শেখে।
রুমির কবিতায় প্রেম ও আত্মজাগরণ তাই কেবল সুফি ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং আমাদের প্রত্যেকের অন্তর্দর্শনের আয়না—যেখানে তাকালে আমরা হয়তো নিজের অচেনা মুখটিকেই দেখতে পাই।
তথ্যসূত্র
- Franklin D. Lewis, Rumi: Past and Present, East and West, Oxford: Oneworld Publications, 2000.
↑ back to top - Annemarie Schimmel, The Triumphal Sun: A Study of the Works of Jalaloddin Rumi, Albany: State University of New York Press, 1993.
↑ back to top - William C. Chittick, The Sufi Path of Love: The Spiritual Teachings of Rumi, Albany: SUNY Press, 1983.
↑ back to top - Jawid Mojaddedi, The Masnavi: Book One, Oxford World’s Classics, Oxford University Press, 2004.
↑ back to top - Reynold A. Nicholson, The Mathnawi of Jalalu’ddin Rumi, 8 vols., London: E.J.W. Gibb Memorial, 1925–1940.
↑ back to top - UNESCO, “Mevlevi Sema Ceremony,” UNESCO Intangible Cultural Heritage, 2008. Available at: https://ich.unesco.org/en/RL/mevlevi-sema-ceremony-00100
↑ back to top - Coleman Barks, The Essential Rumi, San Francisco: HarperOne, 1995.
↑ back to top - Safi, Omid, “The Land of Rumi: Between Love and Justice,” in Radical Love: Teachings from the Islamic Mystical Tradition, Yale University Press, 2018.
↑ back to top