আবু আবদুল্লাহ আল-মুহামিলি বলেন, আমার বাবা আমাকে এক অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছিলেন। তাঁর এক ব্যবসায়ী বন্ধু ছিলেন, যিনি একসময় সুফিদের তীব্র নিন্দা করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই মানুষটিই তাদের জন্য তাঁর সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিতে লাগলেন।
বাবা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি তাদের ঘৃণা করতেন না?”
তিনি উত্তর দিলেন, “বিষয়টা তেমন নয় যেমনটা আমি মনে করতাম।”
“কীভাবে?” বাবা জানতে চাইলেন।
“সবাই জানে, আমি একসময় সুফিদের ঘোর বিরোধী ছিলাম। ব্যবসায়ী মানুষ, দুনিয়াদারি নিয়ে ব্যস্ত। সুফিদের নাম শুনলেই আমার রক্ত গরম হয়ে যেত। মনে করতাম, এরা সব ভণ্ড! কিন্তু আজ আমি তাদের জন্য আমার সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। কী হলো আমার? কীভাবে বদলে গেলাম? সেই ঘটনাটাই বলছি…
জুমার দিনের অনুসরণ
সেদিন জুমার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরোচ্ছি, হঠাৎ চোখে পড়লো বিশর আল-হাফি ৯রহ.)-কে। সেই বিখ্যাত সুফি! প্রচণ্ড তাড়াহুড়ো করে হেঁটে যাচ্ছেন। মনে মনে বললাম, “আজ দেখবই এই সংসারত্যাগী পীর সাহেবের আসল চেহারা!” যেতে যেতে বিশর থামলেন একটা দোকানে। এক দিরহাম দিয়ে রুটি কিনলেন। আমি মনে মনে বললাম, “হুম, খায় তো বেশ!”
পরের দোকানে গিয়ে আবার এক দিরহাম দিয়ে সুগন্ধি কাবাব কিনলেন। আমার রাগ আরো চড়ল। দেখলাম তো! জান্নাতের কথা বলে দুনিয়ার স্বাদ নেয় এরা! কিন্তু এরপর যা দেখলাম তাতে রাগে একেবারে গা জ্বলে গেল। বিশর আরো এক দিরহাম খরচ করে ফালুযাজ কিনলেন— সেই মিষ্টি, সুস্বাদু হালুয়া! আমি ভাবলাম, এইবার আর ছাড়ব না। আজ সবার সামনে মুখোশ খুলে দেব এর!
মরুপথে বিস্ময়কর যাত্রা
বিশর শহর ছেড়ে মরুভূমির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। আমি দূর থেকে তাকে অনুসরণ করছি। মনে মনে ভাবছি, “নিশ্চয়ই কোনো সবুজ বাগান আছে, ছায়াঘেরা ঝর্ণার ধারে বসে এই সব খাবেন!” কিন্তু পথ তো শেষ হয় না। সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ছে। আসরের সময় হয়ে এলো। এত পথ, এত হাঁটা! আমার পা ব্যথা করছে, কিন্তু কৌতূহল আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে বিশর একটি ছোট্ট গ্রামের মসজিদে ঢুকলেন। আমিও লুকিয়ে দেখতে লাগলাম।
হৃদয়বিদারক দৃশ্য
মসজিদের এক কোণে এক অসুস্থ মানুষ শুয়ে আছে। কঙ্কালসার শরীর, দুর্বল নিঃশ্বাস। বিশর তার কাছে বসলেন। আস্তে আস্তে সেই রুটি, কাবাব, মিষ্টি সব তাকে খাওয়াতে লাগলেন। নিজের মুখে একটুও তুললেন না। অসুস্থ মানুষটি দুর্বল হাতে খাবার মুখে তুলছে, আর বিশরের চোখে অপার মমতা। আমি স্তব্ধ। আমার বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল। আমি গ্রাম ঘুরে দেখলাম। ফিরে এসে অসুস্থ মানুষটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “বিশর কোথায়?”
“উনি বাগদাদ চলে গেছেন” দুর্বল স্বরে বললেন তিনি।
“কী, বাগদাদ? এখান থেকে কত দূর?”
“চল্লিশ ফারসাখ।”
আমি হতভম্ব! চল্লিশ ফারসাখ মানে প্রায় দুইশ বিশ কিলোমিটার! আমি জুমার পর থেকে হাঁটছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা, অথচ এসে গেছি এত দূর! “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” আমি বিড়বিড় করলাম। এ কেমন করে সম্ভব?
“বসুন, উনি আসবেন।” অসুস্থ মানুষটি বললেন।
এক সপ্তাহের অপেক্ষা ও আত্মদর্শন
পুরো এক সপ্তাহ কেটে গেল। আমি সেখানেই থাকলাম, অসুস্থ মানুষটির সেবা করলাম। আমার মন বদলে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে। পরের জুমাবার ঠিক একই সময় বিশর আবার এলেন। হাতে আবার খাবার। আবার সেই মমতা নিয়ে খাওয়ালেন অসুস্থ মানুষটিকে। কাজ শেষ করে যখন উঠলেন, অসুস্থ মানুষটি বললেন, “হে আবু নসর, এই ভদ্রলোক বাগদাদ থেকে এসেছেন। পুরো সপ্তাহ আমার সাথে আছেন।”
বিশর ফিরে তাকালেন। তাঁর চোখে ক্ষোভ। কিন্তু সেই ক্ষোভের পেছনে ছিল দুঃখ। তিনি বললেন, “তুমি কেন আমার পিছু নিয়েছিলে?” আমি মাথা নিচু করে বললাম, “আমি… আমি ভুল করেছি।”
অলৌকিক প্রত্যাবর্তন
“ওঠো, হাঁটো” বিশর বললেন।
আবার সেই পথচলা। কিন্তু এবার আমার হৃদয়ে অন্য অনুভূতি। লজ্জা, অনুশোচনা, বিস্ময়।
মাগরিবের সময় আমরা বাগদাদের উপকণ্ঠে। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় আবার সেই অসম্ভব দূরত্ব পার হয়ে এসেছি! আমার চোখ বিস্ফারিত। এ কী দেখলাম! এ কেমন মানুষ! বাগদাদের কাছাকাছি এসে বিশর থামলেন। তাঁর কণ্ঠ কঠিন, কিন্তু চোখে করুণা। তিনি বললেন, “তোমার মহল্লায় যাও, আর কখনো এভাবে ফিরে এসো না।”
হৃদয় পরিবর্তন
সেদিন থেকে আমি সুফিদের সম্পর্কে আমার সব ভ্রান্ত ধারণা থেকে আল্লাহর কাছে তওবা করেছি। তাদের ভালোবাসা আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। আমি বুঝেছি, তারা যা করেন তা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। তারা নীরবে মানুষের সেবা করেন। তারা নিজেদের জন্য কিছু রাখেন না। তাদের পায়ে আল্লাহর এমন শক্তি যে তারা ঘণ্টায় অসম্ভব পথ পাড়ি দেন। আজও আমি সেই পথেই আছি। তাদের জন্য আমার সবকিছু উৎসর্গ করি। কারণ আমি জানি, তারাই প্রকৃত আল্লাহর বান্দা।