ইতিহাসের পাতায় ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এর নাম আজ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে নেওয়া হলেও, তাঁর জীবনের শুরুর দিকটি ছিল অন্ধকার ও আতঙ্কে ঘেরা। তিনি তখন ছিলেন এক ভয়ংকর ডাকাত। আবীবর্দ ও সারখাস নামের দুটি জায়গার মাঝখানের জনহীন মরু পথে তিনি এবং তাঁর দল ডাকাতি করতেন। পথিকেরা তাঁর নাম শুনলে ভয়ে কাঁপত, কাফেলাগুলো সবসময় তাঁর আতঙ্কে থাকত।
কিন্তু মহান আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। ফুজাইল ইবনে ইয়াজের এই পাপের জীবনে পরিবর্তনের শুরু হয় এক দাসীকে কেন্দ্র করে। সেই দাসীর প্রতি তাঁর মনে গভীর টান ছিল। এক রাতে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তিনি তাঁর সেই প্রিয় মানুষের কাছে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি যখন সাবধানে একটি দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে এক মিষ্টি সুর তাঁর কানে এল।
কেউ একজন খুব দরদ দিয়ে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সেই তিলাওয়াত করা আয়াতটি ছিল— “হে মুমিনগণ, এখনও কি সেই সময় আসেনি যে, তোমাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে নরম হবে?” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ১৬)।
আগুনের ফুলকি যেমন শুকনো ঘাসকে জ্বালিয়ে দেয়, কুরআনের এই একটি আয়াত ফুজাইলের পাথর হওয়া হৃদয়ে ঠিক তেমনি আঘাত করল। দেয়ালের ওপর থমকে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁর মনে হলো, স্বয়ং আল্লাহ যেন তাঁকে সরাসরি এই প্রশ্নটি করছেন। এক নিমিষেই তাঁর ভেতরের সব খারাপ ইচ্ছা আর ডাকাত হওয়ার অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি বিচলিত হয়ে মনে মনে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, হে আমার রব! সময় সত্যিই এসেছে। এখনই সেই সময়।’
দেয়াল থেকে নেমে তিনি এক ঘোরের মধ্যে হাঁটতে শুরু করলেন। অনুশোচনা আর তওবার আগুনে তাঁর ভেতরটা তখন পুড়ছিল। হাঁটতে হাঁটতে তিনি এক ধ্বংসস্তূপের কাছে গিয়ে পৌঁছালেন। সেখানে একদল মুসাফির কাফেলা বিশ্রামের জন্য অবস্থান করছিল। আড়াল থেকে ফুজাইল শুনতে পেলেন তাঁদের কথা।
কাফেলার একজন বললেন, “রাত তো অনেক হলো, চলুন আমরা এখন রওনা হই।” কিন্তু অন্য পথিকের কণ্ঠ থেকে আতঙ্কে জড়ানো উত্তর এল, “না, ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো। কারণ এই পথেই ভয়ংকর ডাকাত ফুজাইল থাকে। এখন বের হওয়া মানেই তাঁর হাতে ধরা পড়া।”
ধ্বংসস্তূপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ফুজাইল নিজের নাম শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন— “আমি রাতজুড়ে আল্লাহর নাফরমানি আর পাপের কাজে লিপ্ত থাকি, আর ওদিকে একদল নিরপরাধ মুসলিম আমার ভয়ে ভীত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছে! আজ আল্লাহ আমাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন যেন আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি এবং সংযত হই।”
লজ্জা আর অনুতাপে তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। তিনি তৎক্ষণাৎ আল্লাহর দরবারে লুটিয়ে পড়লেন এবং মনেপ্রাণে সত্যিকারের তওবা করলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, আর কোনোদিন তিনি পাপের পথে পা বাড়াবেন না।
এভাবেই এক রাতের একটি আয়াত আর একদল মুসাফিরের আতঙ্কিত কথাগুলো এক ভয়ংকর ডাকাতকে আল্লাহর প্রিয় মানুষে বদলে দিল। তাঁর জীবন এক নতুন দিকে ঘুরল, যা আজও মানুষের মনে আশার আলো জাগায়।