কল্পনা করুন একটি মিহরাবসজ্জিত প্রশস্ত হলরুম, যেখানে সাদা পোশাক পরা দরবেশরা ধীরে ধীরে ঘুরছে, তাদের ঝুল বিশাল বৃত্তাকার পথ তৈরি করছে। একপাশে বাজছে নে (বাঁশি), অন্যপাশে কুদুম (ড্রাম)। গায়করা গাইছে মাওলানা রুমির কবিতা। দর্শকরা নীরবে বসে আছে, কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে আছে, কেউ কাঁদছে। এই দৃশ্যটি হাজার বছরের পুরনো – সুফি সামা অনুষ্ঠান।
সামা (سَمَاع) শব্দটির অর্থ “শোনা” বা “শ্রবণ”। কিন্তু সুফিদের কাছে সামা শুধু শোনা নয় – এটি অনুভব করা, উপলব্ধি করা এবং আল্লাহের প্রেমে বিলীন হওয়া। এটি সংগীত, কবিতা, নৃত্য এবং আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাসের এক অনন্য সমন্বয় যা ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে।[১]
পারস্যের ঘূর্ণায়মান দরবেশ থেকে পাকিস্তান-ভারতের কাওয়ালি, আরবের হাদরা থেকে মরক্কোর লিলা – প্রতিটি অঞ্চলে সামা তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক রঙে রঞ্জিত হয়েছে। কিন্তু সবার মূলে রয়েছে একই আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা – আল্লাহর সাথে মিলনের আকাঙ্ক্ষা।
সামা কী এবং কেন?
সামা হলো সুফিদের একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অনুশীলন যেখানে সংগীত, কবিতা এবং কখনো কখনো নৃত্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেম ও স্মরণে মগ্ন হওয়া হয়। এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং একটি গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা যার লক্ষ্য হলো “ওয়াজদ” (আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস) অর্জন করা।
ইমাম আল-গাজালি (১০৫৮-১১১১) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “ইহইয়া উলুমিদ্দিন”-এ সামার একটি সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন: “সামা হলো এমন একটি মাধ্যম যা হৃদয়কে আল্লাহর প্রেমে জাগ্রত করে। যখন কেউ আল্লাহর প্রশংসা বা প্রেমের কবিতা শোনে, তখন তার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা জাগ্রত হয়।”[২]
সামার মূল উপাদান তিনটি: সংগীত (বাদ্যযন্ত্র এবং গান), কবিতা (সাধারণত ঐশী প্রেম ও আল্লাহর স্মরণ সম্পর্কিত), এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়া (দোলানো, নাচ, কখনো কখনো কান্না বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া)। এই তিনটি উপাদান একসাথে মিলে একটি সমগ্র অভিজ্ঞতা তৈরি করে যা অংশগ্রহণকারীদের সাধারণ চেতনা থেকে একটি উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যায়।[৩]
সামার ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক
সামা নিয়ে ইসলামি ইতিহাসে সবসময় বিতর্ক ছিল। কিছু আলেম সংগীতকে হারাম বলেছেন, বিশেষত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। কিন্তু সুফিরা সামাকে একটি বৈধ আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
প্রথম দিকের সুফিরা সামা নিয়ে সতর্ক ছিলেন। জুনায়েদ আল-বাগদাদি (৮৩০-৯১০) বলেছিলেন: “সামা শুধু তাদের জন্য যারা আল্লাহর সাথে নিজেদের সম্পর্ক দৃঢ় করেছে। নতুবা এটি বিপথে নিয়ে যেতে পারে।”[৪] তাঁর মতে, সামা একটি উন্নত আধ্যাত্মিক অনুশীলন, শুরুর জন্য নয়।
আবু হামিদ আল-গাজালি সামার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন যে সংগীত নিজে হালাল বা হারাম নয়, বরং এর ব্যবহার এবং উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। যদি সংগীত আল্লাহর স্মরণের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি এটি পাপ বা বিলাসিতায় উৎসাহিত করে, তাহলে এটি নিষিদ্ধ।[৫]
তিনি “ইহইয়া উলুমিদ্দিন”-এ সামার জন্য আটটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন:
- সংগীত শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করবে না
- শ্রোতার নিয়ত হবে খালেস (আল্লাহর জন্য)
- অশ্লীল বা প্রেমিক-প্রেমিকার গান হবে না
- নারী-পুরুষের মিশ্রণ হবে না
- নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে হবে
- নিয়মিত ফরজ ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবে না
- লোক দেখানো বা অহংকার থাকবে না
- অভিজ্ঞ শায়খের তত্ত্বাবধানে হবে[৬]
তবে ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮) এবং তাঁর অনুসারীরা সামার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে এটি বিদআত (নতুন সংযোজন) এবং সাহাবাদের যুগে এর কোনো উদাহরণ নেই।[৭] তবে সুফিরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে নবী (সা.) এর যুগে আবিসিনিয়ার লোকেরা মসজিদে নৃত্য করেছিল এবং তিনি তা নিষেধ করেননি।
পারস্যে সামার বিকাশ: রুমি এবং ঘূর্ণায়মান দরবেশ
সামার সবচেয়ে বিখ্যাত রূপ হলো পারস্যের (বর্তমান ইরান ও তুর্কি) মাওলাভি বা মেভলেভি সামা। এই ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩), যিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সুফি কবি।
রুমির জীবনে একটি ঘটনা সামার ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট। ১২৪৪ সালে, তিনি শামস তাবরিজি নামে এক রহস্যময় দরবেশের সাক্ষাৎ পান। শামসের সাথে সাক্ষাৎ রুমিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয় – একজন গম্ভীর আলেম থেকে তিনি পরিণত হন প্রেমে উন্মত্ত এক কবিতে।[৮]
একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি অনুসারে, শামসের অন্তর্ধানের পর শোকে মুহ্যমান রুমি বাজারের স্বর্ণকারদের হাতুড়ির শব্দ শুনে হঠাৎ ঘুরতে শুরু করেন। সেই ঘূর্ণনই পরবর্তীতে মাওলাভি সামার মূল উপাদান হয়ে ওঠে।[৯]
মাওলাভি সামার প্রতীকবাদ
মাওলাভি সামায় প্রতিটি উপাদানের গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীকী অর্থ রয়েছে:
সিক্কা (উঁচু টুপি): এটি আত্মার সমাধিপাথরের প্রতীক। দরবেশ তার আহংকার মৃত্যু ঘোষণা করছে।
সাদা পোশাক: কাফনের প্রতীক। দরবেশ তার পার্থিব আসক্তি থেকে মুক্ত হচ্ছে।
কালো জুব্বা: কবরের প্রতীক। নাচ শুরুর সময় দরবেশ এটি খুলে ফেলে, যার অর্থ পুনর্জন্ম।
ঘূর্ণন: সৃষ্টির গতির প্রতীক। পরমাণু থেকে গ্রহ – সবকিছুই ঘুরছে। দরবেশ এই মহাজাগতিক নৃত্যে অংশ নিচ্ছে।
ডান হাত উপরে, বাম হাত নিচে: আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত রহমত (ডান হাতে) পৃথিবীতে বিতরণ করছে (বাম হাতে)।[১০]
মাওলাভি সামার পর্যায়
একটি সম্পূর্ণ মাওলাভি সামা অনুষ্ঠান সাতটি পর্যায়ে বিভক্ত:
১. নাত-ই শরীফ: নবী মুহাম্মদ (সা.) এর প্রশংসায় গান। এটি দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
২. তাকসিম: নে (বাঁশি) বাদক একক সুর বাজায়, যা আল্লাহর প্রথম সৃষ্টির শ্বাসের প্রতীক।
৩. সুলতান ভেলেদ দেভরি: দরবেশরা তিনবার হলরুম প্রদক্ষিণ করে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার তিন স্তরের প্রতীক।
৪-৭. চার সেলাম (ঘূর্ণন পর্যায়): প্রতিটি সেলাম আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে – শরিয়ত (আইন), তরিকত (পথ), হাকিকত (সত্য), এবং মারিফত (জ্ঞান)।[১১]
পুরো অনুষ্ঠান প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোনো হট্টগোল বা বিশৃঙ্খলা নেই – সবকিছু নিয়ন্ত্রিত এবং ধ্যানমগ্ন।
তুর্কি সাম্রাজ্যে সামার স্বর্ণযুগ
উসমানীয় সাম্রাজ্যে (১২৯৯-১৯২২) সামা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। সুলতানরা নিজেরা প্রায়ই মাওলাভি সামা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। গালাতা মেভলেভিহানে (মাওলাভি খানকাহ) নিয়মিত সামা অনুষ্ঠান হতো, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুলতান পর্যন্ত সবাই আসতেন।[১২]
তুর্কি সংগীত ঐতিহ্য সামাকে সমৃদ্ধ করেছে। নে (বাঁশি), কুদুম (ছোট ড্রাম), তানবুর (লম্বা গলার লুট), এবং রেবাব (তারযন্ত্র) – এই বাদ্যযন্ত্রগুলো মাওলাভি সামার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষত নে-এর শব্দ রুমির একটি বিখ্যাত কবিতার সাথে যুক্ত:
“শোনো নে-এর অভিযোগ,
বিচ্ছেদের গল্প বলছে:
‘যেদিন থেকে আমাকে বাঁশবন থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে,
আমার কান্না পুরুষ ও নারীকে কাঁদিয়েছে।'”[১৩]
১৯২৫ সালে তুর্কির ধর্মনিরপেক্ষ সরকার সকল সুফি তরিকা নিষিদ্ধ করে এবং সামা অনুষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর, ১৯৫৩ সালে, মাওলাভি সামা “সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে আবার অনুমতি পায়, তবে শুধুমাত্র পর্যটকদের জন্য। বর্তমানে কোনিয়ায় (যেখানে রুমির মাজার আছে) প্রতি বছর ডিসেম্বরে রুমির উরস উপলক্ষে বিশাল সামা উৎসব হয়, যেখানে বিশ্বজুড়ে থেকে হাজারো মানুষ আসে।[১৪]
পারস্য ও মধ্য এশিয়ার অন্যান্য সামা ধারা
মাওলাভি সামা সবচেয়ে বিখ্যাত হলেও পারস্য ও মধ্য এশিয়ায় আরও অনেক ধরনের সামা ঐতিহ্য রয়েছে।
খোরাসানের সামা
ইরানের খোরাসান অঞ্চল (বর্তমান উত্তর-পূর্ব ইরান ও আফগানিস্তান) সুফিবাদের প্রাচীন কেন্দ্র। এখানে সামা অনুষ্ঠান আরও সরল এবং ঘূর্ণনের পরিবর্তে দোলানোর উপর জোর দেওয়া হয়। তাওয়াশিহ (আরবি কবিতা) এবং গজল (পারসি প্রেমের কবিতা) গাওয়া হয়, সাথে দাফ (ফ্রেম ড্রাম) বাজানো হয়।[১৫]
নকশবন্দিয়া সামা
নকশবন্দিয়া তরিকা, যা মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী, সাধারণত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে না। তাদের সামা মূলত কবিতা পাঠ এবং ধর্মীয় গান নিয়ে গঠিত। তবে কিছু নকশবন্দিয়া শাখা, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায়, সীমিত সংগীত ব্যবহার করে।
কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের জিকির-সামা
মধ্য এশিয়ার তুর্কি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের সামা প্রচলিত যেখানে জিকির (আল্লাহর স্মরণ) এবং সংগীত একসাথে মিশে যায়। বাক্সি (ঐতিহ্যবাহী সুফি গায়ক) দম্বুরা (দুই তারের লুট) বাজিয়ে সুফি কবিদের কবিতা গায়।[১৬]
আরব বিশ্বে সামা: হাদরা ঐতিহ্য
আরব দেশগুলোতে সামাকে প্রায়ই হাদরা (উপস্থিতি) বলা হয়। এটি পারস্যের সামা থেকে ভিন্ন – এখানে নৃত্যের পরিবর্তে ছন্দবদ্ধ শারীরিক নড়াচড়া এবং উচ্চস্বরে জিকির এর উপর জোর দেওয়া হয়।
মিশরের হাদরা
মিশরে, বিশেষত কায়রোতে, হাদরা অনুষ্ঠান অত্যন্ত জনপ্রিয়। বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাতে বিভিন্ন মসজিদ ও সুফি কেন্দ্রে হাদরা হয়। সাধারণত একটি হাদরা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এবং কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত:
১. মুনাজাত: আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এবং নবীর প্রশংসা।
২. জিকির-উল্লাহ: ছন্দবদ্ধভাবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বা “আল্লাহ হু” উচ্চারণ।
৩. ইনশাদ: সুফি কবিতা গাওয়া, বিশেষত ইবনুল ফারিদ (১১৮১-১২৩৫) এবং বুসিরির কবিতা।
৪. ওয়াজদ: আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাসের পর্যায়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা দোলানো, লাফানো, এমনকি কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে যায়।[১৭]
মিশরের হাদরায় মিজমার (এক ধরনের বাঁশি), দাফ (ফ্রেম ড্রাম) এবং মাজরুহা (ছোট ড্রাম) ব্যবহার করা হয়।
সিরিয়া ও লেবাননের সামা
সিরিয়া ও লেবাননে সামা আরও সংযত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। দামেস্কে, বিশেষত উমাইয়া মসজিদের কাছের সুফি কেন্দ্রগুলোতে, উচ্চমানের সংগীত পরিবেশনা হয়। মুওয়াশশাহ (ক্লাসিক্যাল আরবি কবিতা ফর্ম) এবং কাসিদা (দীর্ঘ কবিতা) গাওয়া হয় অত্যন্ত পরিশীলিত সুরে।[১৮]
ইয়েমেনের হাদরামি সামা
ইয়েমেনের হাদরামাওত অঞ্চলে একটি অনন্য সামা ঐতিহ্য রয়েছে যেখানে আফ্রিকান প্রভাব স্পষ্ট। ড্রামের ব্যবহার বেশি এবং ছন্দ আরও জটিল। হাবশি (আফ্রিকান বংশোদ্ভূত) সম্প্রদায়ের সুফিরা বিশেষ ধরনের সামা অনুশীলন করে যেখানে জাম্বিয়া (বাঁকা ছুরি) নিয়ে নৃত্য করা হয়।[১৯]
দক্ষিণ এশিয়ার কাওয়ালি: সামার এক জীবন্ত ঐতিহ্য
দক্ষিণ এশিয়ায় (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) সামার সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ হলো কাওয়ালি। এই ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫), যিনি দিল্লির সুফি সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য ছিলেন।
কাওয়ালির উৎপত্তি
কাওয়ালি শব্দটি আরবি “কওল” (কথা বলা) থেকে এসেছে। আমির খসরু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, পারসি কবিতা এবং সুফি আধ্যাত্মিকতাকে একসাথে মিশিয়ে কাওয়ালি তৈরি করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারতীয়দের কাছে সুফিবাদের বার্তা পৌঁছাতে হলে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষায় কথা বলতে হবে।[২০]
কাওয়ালির গঠন
একটি কাওয়ালি পরিবেশনায় কয়েকজন গায়ক থাকে, যাদের কাওয়াল বলা হয়। মূল গায়ক সামনে বসে, তার পেছনে কোরাস গায়করা। বাদ্যযন্ত্র সাধারণত সীমিত:
- হারমোনিয়াম: মূল সুর প্রদানকারী
- তবলা: ছন্দ
- ডোলক: বেস ড্রাম
- হাততালি: সবাই একসাথে হাততালি দেয়[২১]
কাওয়ালির একটি বিশেষত্ব হলো “আওজ” বা আবেগের চরম মুহূর্ত। যখন গায়ক একটি বিশেষ লাইন গায়, শ্রোতারা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, কেউ দাঁড়িয়ে যায়, কেউ দোলায়, কেউ কাঁদে। গায়ক সেই লাইনটি বারবার পুনরাবৃত্তি করে, প্রতিবার একটু ভিন্ন সুরে, যতক্ষণ না শ্রোতারা সম্পূর্ণভাবে সেই আবেগে নিমজ্জিত হয়।
নুসরাত ফতেহ আলী খান: কাওয়ালির কিংবদন্তি
নুসরাত ফতেহ আলী খান (১৯৪৮-১৯৯৭) কাওয়ালিকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যান। তাঁর শক্তিশালী কণ্ঠ এবং অসাধারণ সুর নিয়ন্ত্রণ কাওয়ালিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তিনি পশ্চিমে কাওয়ালি জনপ্রিয় করেন এবং বহু অমুসলিম শ্রোতাকে সুফি সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করেন।[২২]
তাঁর বিখ্যাত কাওয়ালিগুলোর মধ্যে রয়েছে “আল্লাহ হু”, “দম মাস্ত কলন্দর”, “আফরীন আফরীন” এবং “মুস্ত মুস্ত”। তাঁর পর তাঁর ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান এবং পাকিস্তানের আবিদা পারভীন, আজিজ মিয়াঁ, সাবরি ব্রাদার্স কাওয়ালি ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছেন।
চিশতিয়া তরিকা এবং কাওয়ালি
চিশতিয়া তরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় কাওয়ালির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। প্রায় সব বড় চিশতিয়া মাজারে – আজমির শরিফ (খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি), দিল্লি (নিজামউদ্দিন আউলিয়া), আজোধ্যা (মাখদুম শাহ) – নিয়মিত কাওয়ালি অনুষ্ঠান হয়।
বিশেষত উরস (সাধকের মৃত্যুবার্ষিকী) উপলক্ষে সারারাত কাওয়ালি চলে। হাজারো ভক্ত জড়ো হয় মাজারে, কাওয়ালের গান শোনে এবং আধ্যাত্মিক আবেগে নিমজ্জিত হয়।[২৩]
উত্তর আফ্রিকার সামা: মরক্কো ও আলজেরিয়া
উত্তর আফ্রিকার সুফি সামা আরব ও আফ্রিকান সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ।
মরক্কোর লিলা
মরক্কোতে সামা অনুষ্ঠানকে লিলা (রাত) বলা হয়। এটি সাধারণত মাগরিবের নামাজের পর শুরু হয় এবং ফজর পর্যন্ত চলে। মরক্কোর বিভিন্ন তরিকার নিজস্ব লিলা আছে – ইসাওইয়া, হামদুশিয়া, গানাওয়া।
মরক্কোর সামায় আফ্রিকান ড্রাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেন্দির (বড় ফ্রেম ড্রাম), তারিজা (ছোট ড্রাম), এবং গানব্রি (তিন তারের বেস লুট) ব্যবহার করা হয়। ড্রামের তীব্র ছন্দে অংশগ্রহণকারীরা একধরনের ট্রান্স অবস্থায় প্রবেশ করে।[২৪]
গানাওয়া: আফ্রিকান-ইসলামিক সংমিশ্রণ
গানাওয়া একটি বিশেষ ধরনের সামা যা পশ্চিম আফ্রিকান দাসদের বংশধরদের মধ্যে বিকশিত হয়েছে। এতে ইসলামি সুফিবাদ এবং আফ্রিকান আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে গেছে। গানাওয়া অনুষ্ঠানে মালেম (মাস্টার সংগীতজ্ঞ) গানব্রি বাজায় এবং দোখা (সংগীতজ্ঞ দল) কোরাস এবং ক্রাক্রেব (ধাতব কাস্টানেট) বাজায়।
গানাওয়া সংগীত এতটাই শক্তিশালী যে ইউনেস্কো ২০১৯ সালে একে “মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।[২৫]
সামার আধ্যাত্মিক মনোবিজ্ঞান
সামা কীভাবে কাজ করে? কেন সংগীত এবং নৃত্য মানুষকে এতটা প্রভাবিত করে? সুফি মনীষীরা এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ইমাম আল-গাজালির ব্যাখ্যা
আল-গাজালি বলেন যে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি স্বাভাবিক ভালোবাসা রয়েছে, কিন্তু পার্থিব জীবনের ব্যস্ততায় সেই ভালোবাসা ঢাকা পড়ে যায়। সামা হলো সেই ঢাকা সরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম। যখন কেউ আল্লাহর প্রেমের কবিতা শোনে, তার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা জাগ্রত হয়।[২৬]
তিনি একটি উদাহরণ দেন: একটি শিশু যে তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বছরের পর বছর পর যখন সে তার মায়ের নাম শোনে, তার মনে সব স্মৃতি জাগ্রত হয় এবং সে কাঁদতে শুরু করে। ঠিক তেমনি, আমরা আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন। সামা আমাদের সেই বিচ্ছেদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এবং আমরা আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে চাই।
সামার প্রকৃত শিক্ষা
সামা নিয়ে সব বিতর্ক, সব ভিন্নতা সত্ত্বেও, এর মূল বার্তা অপরিবর্তিত রয়েছে। রুমি যেমন বলেছেন:
“আমরা যারা আলাদা ভাষায় কথা বলি
একটি গান গাইতে পারি,
এবং একে অপরকে বুঝতে পারি।”[৩১]
সামা আমাদের শেখায় যে আল্লাহর প্রেমের প্রকাশের অনেক পথ আছে। কেউ ঘুরে, কেউ গেয়ে, কেউ নীরবে কেঁদে – কিন্তু সবার গন্তব্য এক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধর্ম শুধু নিয়ম-কানুন নয়, এটি প্রেম, সৌন্দর্য এবং আবেগও।
সামা আমাদের শেখায় যে শিল্প এবং আধ্যাত্মিকতা পরস্পর বিরোধী নয়। সুন্দর সংগীত, সুন্দর কবিতা – এগুলো আল্লাহর দান এবং তাঁর স্মরণের মাধ্যম হতে পারে। যেমন আল-গাজালি বলেছেন: “আল্লাহ সুন্দর এবং সুন্দরকে ভালোবাসেন।”[৩২]
সামা আমাদের শেখায় যে ধর্ম এবং সংস্কৃতি একসাথে বিকশিত হতে পারে। প্রতিটি অঞ্চলে সামা তার নিজস্ব রূপ পেয়েছে – পারস্যের ঘূর্ণন, আরবের হাদরা, দক্ষিণ এশিয়ার কাওয়ালি – কিন্তু সবার আত্মা এক। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি একক, অনমনীয় কাঠামো নয়, বরং একটি জীবন্ত, নমনীয় ঐতিহ্য যা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শিকড় গাড়তে পারে।
পারস্য থেকে তুর্কি, মিশর থেকে মরক্কো, ভারত থেকে পাকিস্তান – হাজার বছর ধরে লাখো মানুষ সামার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য খুঁজেছে এবং পেয়েছে। আজও, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, প্রতি রাতে কোথাও না কোথাও সামা হচ্ছে। কোথাও দরবেশ ঘুরছে, কোথাও কাওয়াল গাইছে, কোথাও মুরিদরা হাততালি দিচ্ছে।
এবং সেই সামায় যারা অংশ নিচ্ছে, তারা হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য, পার্থিব জীবন ভুলে গিয়ে, শুধু আল্লাহর প্রেমে ডুবে যাচ্ছে। এটাই সামার প্রকৃত উদ্দেশ্য। এটাই সামার অমূল্য উপহার।