আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার মধ্যে এমন কী আছে যে হাজার বছর ধরে লাখো মানুষ এই অনুশীলনে নিজেদের নিবেদিত করেছে? কেউ উচ্চস্বরে, দলবদ্ধভাবে আল্লাহর নাম জপ করেন, কেউ আবার সম্পূর্ণ নীরবে, হৃদয়ের গভীরে তাঁকে স্মরণ করেন। এই দুই পদ্ধতি – জহরি (উচ্চস্বরে) এবং খফি (নীরবে) – নিয়ে সুফি জগতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে গভীর আলোচনা, বিতর্ক এবং অনুশীলন।
জিকির (ذِكْر) মানে স্মরণ। কিন্তু সুফিদের কাছে এটি শুধু স্মরণ নয় – এটি আত্মার খাদ্য, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।”[১] এই একটি আয়াতই সুফিবাদের পুরো ভিত্তি।
জিকির কী এবং কেন?
জিকিরের শাব্দিক অর্থ হলো স্মরণ করা, মনে রাখা। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায়, বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যে, জিকির অনেক গভীর একটি ধারণা। এটি শুধু মুখে আল্লাহর নাম বলা নয়, বরং হৃদয়, আত্মা এবং সম্পূর্ণ সত্তা দিয়ে আল্লাহকে অনুভব করা।
ইমাম আল-গাজালি (১০৫৮-১১১১), যিনি ইসলামি চিন্তাজগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, জিকিরকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন। প্রথম স্তর হলো জিহ্বার জিকির – যখন আপনি মুখে আল্লাহর নাম বলছেন। দ্বিতীয় স্তর হলো হৃদয়ের জিকির – যখন আপনার হৃদয় আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করছে। তৃতীয় এবং সর্বোচ্চ স্তর হলো আত্মার জিকির – যখন আপনার পুরো সত্তা আল্লাহর স্মরণে ডুবে যায়।[২]
কুরআনে জিকির শব্দটি এবং এর বিভিন্ন রূপ প্রায় ২৯০ বার উল্লেখিত হয়েছে।[৩] এর মধ্যে কিছু আয়াত সুফিদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।” (সূরা আল-আহজাব ৩৩:৪১-৪২)[৪]
“অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫২)[৫]
দ্বিতীয় আয়াতটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ একটি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন – তুমি যদি আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাকে স্মরণ করব। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং প্রথম প্রজন্মের জিকির
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে নিয়মিত জিকির করতেন এবং সাহাবাদের জিকিরের বিভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিস গ্রন্থগুলোতে জিকিরের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। তিনি “সুবহানাল্লাহ” (আল্লাহ পবিত্র), “আলহামদুলিল্লাহ” (সকল প্রশংসা আল্লাহর), “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), এবং “আল্লাহু আকবার” (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ) – এই চারটি কালিমার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।[৬]
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দিনে একশত বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ বলে, তার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয়।”[৭] এই হাদিসটি জিকিরের অসাধারণ শক্তির প্রমাণ।
তবে সাহাবাদের যুগে জিকির ছিল মূলত ব্যক্তিগত ইবাদত। প্রতিটি সাহাবা তার নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং নিজস্ব সময়ে জিকির করতেন। দলগত বা সংগঠিত জিকিরের কোনো প্রমাণ এই যুগে পাওয়া যায় না। হযরত আবু বকর (রা.), উমর (রা.), আলী (রা.) – সবাই নীরবে, একাকী আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতেন।[৮]
সুফিবাদের উত্থান এবং জিকিরের রূপান্তর
৮ম শতাব্দী থেকে জিকিরের ধারণা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তাবেয়িন এবং তাবে-তাবেয়িনদের যুগে, হাসান আল-বসরি (৬৪২-৭২৮), রাবিয়া আল-আদাবিয়া (৭১৩-৮০১) এবং অন্যান্য প্রাথমিক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বরা জিকিরকে আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন।
হাসান আল-বসরি বলেছিলেন: “জিকিরকারীরা এমন এক বাগানে বসে যেখানে ফেরেশতারা তাদের ঘিরে থাকে।”[৯] এই কথাটি প্রমাণ করে যে ইতিমধ্যে জিকির শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত থেকে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে।
৯ম শতাব্দীতে সুফিবাদ একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বাগদাদ, বসরা, নিশাপুর এবং খোরাসানে সুফি মাশায়েখদের (আধ্যাত্মিক গুরু) চারপাশে শিষ্যদের দল গঠিত হতে শুরু করে।[১০] এই সময়ের কয়েকজন প্রভাবশালী সুফি জিকিরের তত্ত্ব ও অনুশীলনে বিপ্লবী পরিবর্তন আনেন।
জুনায়েদ আল-বাগদাদি (৮৩০-৯১০), যিনি “সুফিদের সর্দার” হিসেবে পরিচিত, জিকিরকে ফানা (আত্মবিলোপ) অর্জনের মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা দেন। তিনি বলতেন, জিকির এমনভাবে করতে হবে যেন জিকিরকারী নিজেকে ভুলে যায় এবং শুধু আল্লাহই থাকে।[১১]
বায়েজিদ বোস্তামি (৮০৪-৮৭৪) “দাওয়াম আল-জিকির” (নিরন্তর জিকির) এর ধারণা প্রচার করেন। তাঁর মতে, একজন সত্যিকারের সুফির জিকির শুধু নির্দিষ্ট সময়ে নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি শ্বাসে অব্যাহত থাকা উচিত।[১২]
জিকিরের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: তরিকার জন্ম
১০ম এবং ১১শ শতাব্দীতে সুফি মনীষীরা জিকিরের বিস্তৃত তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেন। আবু নাসর আল-সাররাজ (মৃত্যু ৯৮৮) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “কিতাব আল-লুমা”-তে জিকিরের বিভিন্ন স্তর ও পদ্ধতি বিস্তারিত বর্ণনা করেন।[১৩] আবু তালিব আল-মাক্কি (মৃত্যু ৯৯৬) তাঁর “কুত আল-কুলুব” গ্রন্থে জিকিরের আধ্যাত্মিক প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন এবং বলেন: “জিকির হলো আত্মার খাদ্য; জিকির ছাড়া হৃদয় মৃত।”[১৪]
১১শ শতাব্দী থেকে প্রথম সংগঠিত সুফি তরিকার উত্থান ঘটে। প্রতিটি তরিকা তাদের নিজস্ব জিকির পদ্ধতি, সিলসিলা (আধ্যাত্মিক বংশধারা) এবং শিষ্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করে। এবং এখানেই শুরু হয় জহরি ও খফি জিকিরের পার্থক্য।
ইমাম আল-গাজালি এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “ইহইয়া উলুমিদ্দিন”-এ জিকিরকে সুন্নি ইসলামের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এর ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেন।[১৫] তাঁর কাজ সুফিবাদ এবং গোঁড়া ইসলামের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং জিকিরকে সাধারণ মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
জহরি জিকির: উচ্চস্বরে আল্লাহর স্মরণ
জহরি শব্দটি আরবি “জাহরা” (প্রকাশ করা) থেকে এসেছে। জহরি জিকির মানে উচ্চস্বরে, প্রকাশ্যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলী উচ্চারণ করা। এটি সাধারণত দলগতভাবে করা হয়, যেখানে একদল মুরিদ (শিষ্য) একসাথে বসে বা দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট ছন্দে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।
জহরি জিকিরের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, এটি সাধারণত নির্দিষ্ট কালিমা ব্যবহার করে – “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহ”, “হু” (তিনি)। দ্বিতীয়ত, এর একটি নির্দিষ্ট ছন্দ ও তাল থাকে। তৃতীয়ত, কিছু তরিকায় শারীরিক নড়াচড়া অন্তর্ভুক্ত থাকে – মাথা নাড়ানো, শরীর দোলানো, এমনকি নাচও।[১৬]
জহরি জিকিরের সমর্থকরা বলেন, উচ্চস্বরে জিকির করলে মন সহজে একাগ্র হয় এবং গাফলাত (অসচেতনতা) দূর হয়। যখন একদল মানুষ একসাথে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, তখন একটি আধ্যাত্মিক শক্তি সৃষ্টি হয় যা একাকী জিকিরে পাওয়া যায় না। তারা কুরআনের আয়াত এবং হাদিস দিয়ে তাদের অবস্থান সমর্থন করেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “তোমার রবকে স্মরণ করো নিজের মনে বিনয়ের সাথে এবং ভয়ের সাথে, উচ্চস্বরে নয়।” (সূরা আল-আরাফ ৭:২০৫)[১৭] জহরি জিকিরের সমর্থকরা বলেন, এখানে “উচ্চস্বরে নয়” বলতে চিৎকার করে নয়, কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণ বৈধ। আর সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে যে সাহাবারা যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় উচ্চস্বরে তাকবির বলতেন।[১৮]
খফি জিকির: নীরবতার শক্তি
খফি শব্দটি আরবি “খাফা” (গোপন করা) থেকে এসেছে। খফি জিকির হলো নীরবে, মনে মনে বা হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ করা। এটি প্রধানত একাকী করা হয় এবং এর লক্ষ্য হলো হৃদয়ে আল্লাহর নামের প্রতিধ্বনি তৈরি করা।
খফি জিকিরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি দিনরাত, সব অবস্থায় অব্যাহত রাখা সম্ভব। আপনি কাজ করছেন, হাঁটছেন, খাচ্ছেন – যেকোনো সময় হৃদয়ে আল্লাহর নাম জপ করতে পারেন। বাহ্যিক কোনো বিক্ষেপ নেই, শুধু অভ্যন্তরীণ ফোকাস।[১৯]
খফি জিকিরের সমর্থকরাও কুরআন ও হাদিস দিয়ে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “তোমার রবকে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে।” (সূরা আল-আরাফ ৭:৫৫)[২০] আর হাদিসে এসেছে: “সর্বোত্তম জিকির হলো গোপন জিকির।”[২১]
খফি জিকিরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি রিয়া (লোক দেখানো) থেকে সুরক্ষা দেয়। যখন আপনি নীরবে জিকির করেন, কেউ জানে না, কেউ দেখে না। শুধু আপনি এবং আল্লাহ। এই নির্জন সংযোগ অনেক গভীর এবং খাঁটি।
বিভিন্ন তরিকায় জিকির: একই লক্ষ্য, ভিন্ন পথ
সুফি জগতে চারটি প্রধান তরিকা রয়েছে যাদের জিকির পদ্ধতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং সোহরাওয়ার্দিয়া। প্রতিটি তরিকার নিজস্ব জিকির পদ্ধতি রয়েছে, কিন্তু সবার লক্ষ্য এক – আল্লাহর নৈকট্য লাভ।
কাদেরিয়া তরিকা: দাঁড়িয়ে জিকির
কাদেরিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল কাদির জিলানি (১০৭৭-১১৬৬), যিনি বাগদাদের একজন বিখ্যাত আলেম ও সুফি ছিলেন। এই তরিকা মূলত জহরি জিকির অনুশীলন করে এবং তাদের “হাজরা” (দাঁড়িয়ে জিকির) বিখ্যাত।
কাদেরিয়া জিকিরে মুরিদরা দাঁড়িয়ে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” প্রায় ১৬৫ বার উচ্চারণ করে। এর সাথে থাকে শারীরিক নড়াচড়া – বাম থেকে ডানে মাথা নাড়ানো এবং নির্দিষ্ট শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ। আবদুল কাদির জিলানি বলেছেন: “জিকির হলো সুফির খাদ্য; যদি সে জিকির ছেড়ে দেয়, সে মৃত্যুবরণ করে।”[২২]
চিশতিয়া তরিকা: সামার সাথে জিকির
চিশতিয়া তরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি ধারা। এর প্রতিষ্ঠাতা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (১১৪১-১২৩০) ভারতবর্ষে সুফিবাদ প্রচার করেন। চিশতিয়া তরিকা জহরি জিকির এবং সামা (আধ্যাত্মিক সংগীত) উভয়ের জন্য বিখ্যাত।
চিশতিয়া জিকিরের একটি বিশেষত্ব হলো “দম” (নিয়ন্ত্রিত শ্বাস) – শ্বাসের সাথে জিকিরের সমন্বয়। মুরিদরা ভূমিতে বসে, পদ্মাসন বা হাঁটু গেড়ে, জিকির করে। কাওয়ালি সংগীত চিশতিয়া ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে সামার মাধ্যমে মুরিদরা আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাসে প্রবেশ করে।[২৩]
চিশতিয়া তরিকায় একটি আকর্ষণীয় পর্যায়ক্রম রয়েছে। নতুন মুরিদদের জন্য জহরি জিকির শেখানো হয়, যাতে তারা মনোনিবেশ শিখতে পারে। আর উন্নত মুরিদদের জন্য খফি জিকিরের শিক্ষা দেওয়া হয়, যাতে তারা নিরন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকতে পারে।
নকশবন্দিয়া তরিকা: নীরবতার শিল্প
নকশবন্দিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (১৩১৮-১৩৮৯) বুখারায়। এই তরিকা সম্পূর্ণভাবে খফি জিকিরের উপর নির্ভরশীল এবং এটি তাদের পরিচয়ের একটি কেন্দ্রীয় অংশ।
নকশবন্দিয়া জিকির হলো “কালবি জিকির” – হৃদয়ে “আল্লাহ” শব্দের প্রতিধ্বনি। এর সাথে যুক্ত থাকে “পাস আনফাস” (শ্বাস পর্যবেক্ষণ) – প্রতিটি শ্বাসে সচেতনতা। নকশবন্দিয়া শায়খরা বলেন: “দরুদ উচ্চস্বরে, জিকির নীরবে।”[২৪]
নকশবন্দিয়া তরিকায় “লাতাইফ” (আধ্যাত্মিক কেন্দ্র) এর ধারণা রয়েছে। হৃদয়ের বিভিন্ন বিন্দুতে মনোনিবেশ করে জিকির করা হয়। এটি অত্যন্ত উন্নত এবং সূক্ষ্ম একটি অনুশীলন যা অভিজ্ঞ শায়খের তত্ত্বাবধানে করতে হয়।
সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা: ভারসাম্যের পথ
শিহাবউদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (১১৪৫-১২৩৪) এই তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন। সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা জহরি ও খফি উভয় পদ্ধতিরই সমন্বয় করে এবং শরিয়তের কঠোর পালনের উপর বিশেষ জোর দেয়।
এই তরিকায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এর জিকির করা হয় এবং প্রতিটি জিকিরের জন্য নির্ধারিত সংখ্যা রয়েছে – ১০০, ৩০০, বা ১০০০ বার। মুরাকাবা (ধ্যান) এবং তাফাক্কুর (চিন্তা-ভাবনা) এই তরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।[২৫]
জিকিরের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য: ফানা ও বাকা
সুফি ঐতিহ্যে জিকিরের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? শুধু আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা? না, এটি অনেক গভীর কিছু।
প্রথম লক্ষ্য হলো “গাফলাত” (অসচেতনতা) দূর করা। আমরা সবসময় ব্যস্ত থাকি – কাজে, পরিবারে, পার্থিব বিষয়ে। এর মধ্যে আল্লাহকে ভুলে যাই। জিকির আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে তিনি সবসময় আছেন, সব জায়গায় আছেন।
দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো “হুজুর আল-কালব” (হৃদয়ের উপস্থিতি) অর্জন করা। শুধু মুখে নয়, হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে অনুভব করা। প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সচেতনতা বজায় রাখা।
তৃতীয় এবং সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো “ফানা” (আত্মবিলোপ)। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে জিকিরকারী নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যায় এবং শুধু আল্লাহই থাকে। নিজের অস্তিত্ব, আত্মা, সবকিছু আল্লাহর মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।[২৬]
ফানার পর আসে “বাকা” (আল্লাহতে স্থায়িত্ব)। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে সুফি আল্লাহর সাথে চিরস্থায়ী সংযোগে থাকে। সে পৃথিবীতে বাস করে, কিন্তু তার আত্মা সবসময় আল্লাহর সাথে যুক্ত থাকে।
জিকিরের মনোবৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব
আধুনিক গবেষণা জিকিরের বিভিন্ন ইতিবাচক প্রভাব চিহ্নিত করেছে। মানসিক প্রশান্তি, উদ্বেগ হ্রাস, মানসিক চাপ কমানো – এসব জিকিরের প্রমাণিত উপকারিতা। যখন কেউ নিয়মিত জিকির করে, তার মন শান্ত হয়, চিন্তা স্থির হয় এবং জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।[৩০]
একাগ্রতা বৃদ্ধি জিকিরের আরেকটি উপকারিতা। আজকের বিক্ষিপ্ত যুগে, যেখানে আমরা একসাথে হাজারটা কাজ করছি, জিকির আমাদের মনকে ফোকাস করতে শেখায়। এটি শুধু আধ্যাত্মিক নয়, বরং ব্যবহারিক জীবনেও কাজে লাগে।
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন তো আছেই। জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, হৃদয় নরম হয় এবং খারাপ গুণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। একজন নিয়মিত জিকিরকারীর চরিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায় – সে আরও ধৈর্যশীল, দয়ালু এবং নম্র হয়ে ওঠে।
আধুনিক যুগে জিকির: নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সুযোগ
২১শ শতাব্দীতে সুফি জিকির অনুশীলন এখনও জীবন্ত, তবে নতুন রূপে। আধুনিক প্রযুক্তি জিকিরের প্রসারে সাহায্য করছে। মোবাইল অ্যাপ, ইউটিউব ভিডিও, অনলাইন জিকির সেশন – এসবের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একসাথে জিকির করতে পারছে।[৩১]
পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মান্তরিত মুসলিম এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকারীরা সুফি জিকিরের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। তারা জিকিরকে একটি সার্বজনীন আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে দেখছে যা মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি দেয়।[৩২]
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে দীর্ঘ জিকির সেশনের জন্য সময় নেই। চরমপন্থীদের কারণে সুফিবাদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে কিছু এলাকায়। কিছু ক্ষেত্রে জিকির বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এর আধ্যাত্মিক মূল্য কমিয়ে দেয়।
কিন্তু সুযোগও আছে। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জিকিরের মনোবৈজ্ঞানিক উপকারিতা স্বীকৃত হচ্ছে। আন্তঃধর্মীয় সংলাপে জিকির সার্বজনীন আধ্যাত্মিকতার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুফি অনুশীলন নিয়ে একাডেমিক গবেষণা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জহরি না খফি: কোনটা ভালো?
এই প্রশ্নের উত্তর আসলে আপনার নিজের উপর নির্ভর করে। উভয় পদ্ধতিরই নিজস্ব মূল্য এবং উপকারিতা রয়েছে। জহরি জিকির যাদের মন সহজে বিক্ষিপ্ত হয়, যারা একাকী মনোনিবেশ করতে পারে না, তাদের জন্য উপকারী। দলগত জিকিরের শক্তি এবং সমবেত উপাসনার আনন্দ আলাদা।
খফি জিকির যারা গভীর ব্যক্তিগত সংযোগ চান, যারা সবসময় আল্লাহর স্মরণে থাকতে চান, তাদের জন্য আদর্শ। এটি যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় করা যায় এবং রিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়।
সত্যি কথা হলো, সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো উভয়ের সমন্বয়। প্রাথমিক পর্যায়ে জহরি জিকির দিয়ে শুরু করুন, যাতে মনোনিবেশ শিখতে পারেন। তারপর ধীরে ধীরে খফি জিকিরে যান, যাতে নিরন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকতে পারেন। এটাই চিশতিয়া এবং অন্যান্য অনেক তরিকার পদ্ধতি।
মূল কথা হলো, পদ্ধতি যাই হোক না কেন, আন্তরিকতা এবং নিয়মিততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দিনে পাঁচ মিনিট হলেও নিয়মিত জিকির করুন। আস্তে আস্তে সময় বাড়ান। সম্ভব হলে কোনো জ্ঞানী শায়খের কাছে শিখুন।
১২০০ বছরের যাত্রার শিক্ষা
সুফি জিকিরের ১২০০ বছরের যাত্রা আমাদের কী শেখায়? প্রথমত, আল্লাহর স্মরণ শুধু একটি আচার নয়, এটি জীবনযাপনের পদ্ধতি। নবী (সা.) থেকে শুরু করে আজকের যুগ পর্যন্ত, লাখো মুসলিম জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছে।
দ্বিতীয়ত, ইসলামে বৈচিত্র্যের জায়গা আছে। জহরি হোক বা খফি, কাদেরিয়া হোক বা নকশবন্দিয়া – সবার লক্ষ্য এক, পথ ভিন্ন। এই বৈচিত্র্য ইসলামের সৌন্দর্য, দুর্বলতা নয়।
তৃতীয়ত, জিকির কোনো জটিল বিষয় নয়। এটি সহজ, সরল এবং সবার জন্য উপলব্ধ। আপনাকে সুফি হতে হবে না, তরিকায় যুক্ত হতে হবে না। শুধু আল্লাহর নাম বলুন, আন্তরিকভাবে, নিয়মিত।
চতুর্থত, জিকির শুধু ধর্মীয় ইবাদত নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। আজকের চাপের যুগে, যখন মানুষ উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভুগছে, জিকির একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
পঞ্চমত, জিকির শুধু মুখের উচ্চারণ নয়, বরং হৃদয়ের উপস্থিতি। আপনি হাজার বার “আল্লাহ” বলতে পারেন, কিন্তু যদি হৃদয় উপস্থিত না থাকে, তাহলে সেটা শুধু শব্দ। আর আপনি একবার “আল্লাহ” বলতে পারেন পূর্ণ হৃদয় দিয়ে, এবং সেটাই যথেষ্ট।
“যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তাকে স্মরণ করি।” – আল্লাহ, সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫২
এই একটি প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট। আমরা সীমিত, দুর্বল মানুষ। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি, তিনি – সর্বশক্তিমান, সর্বদ্রষ্টা – আমাদের স্মরণ করেন। এর চেয়ে বড় সম্মান, এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
সুফিদের ১২০০ বছরের অভিজ্ঞতা বলে, জিকির শুধু একটি অনুশীলন নয় – এটি আল্লাহর সাথে কথোপকথন, প্রেমের প্রকাশ, আত্মার খাদ্য। জহরি করুন বা খফি, একা করুন বা দলে – যেভাবেই করুন না কেন, নিয়মিত করুন, আন্তরিকভাবে করুন। এবং দেখবেন আপনার জীবনে পরিবর্তন আসছে, হৃদয়ে প্রশান্তি আসছে এবং আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করছেন।
এটাই জিকিরের আসল শক্তি। এটাই সুফিবাদের মূল বার্তা। এবং এটাই ১২০০ বছর ধরে লাখো মানুষকে আকৃষ্ট করেছে এবং আগামী প্রজন্মের জন্যও প্রাসঙ্গিক থাকবে।