১. আমি সুস্থতা ও প্রশান্তি খুঁজেছি, তা পেয়েছি নির্জনতায়। আর নিরাপত্তা খুঁজেছি, তা পেয়েছি নীরবতায়।

২. একজন আলেম যখন সকাল করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য থাকে জ্ঞান বৃদ্ধি করা; একজন জাহিদ তথা দুনিয়াত্যাগী যখন সকাল করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য থাকে জুহদ বৃদ্ধি করা। আর আবুল হাসান যখন সকাল করেন, তখন তাঁর সংকল্প থাকে কোনো একজন মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ পৌঁছে দেওয়া।

৩. আমি কখনো নিজেকে আলেম বা জাহিদ (পরহেজগার) বলি না; বরং আমি বলি— হে আল্লাহ, আপনি একক, আর আমি কেবল আপনার সৃষ্টি হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম।

৪. একদিন আমি ফরজ নামাজের তাকবির দিতে চেয়েছি, অমনি আমার সামনে রিদওয়ান ফেরেশতাসহ সজ্জিত জান্নাত এবং মালেক ফেরেশতাসহ প্রজ্জ্বলিত জাহান্নাম পেশ করা হলো। আমি জান্নাতের দিকে ফিরেও তাকালাম না এবং জাহান্নাম দেখেও ভীত হলাম না; বরং আমার দৃষ্টি ছিল সেই সত্তার দিকে যেখানে জান্নাত বা জাহান্নাম কিছুই দৃশ্যমান নয়; অর্থাৎ কেবল আল্লাহর দিকে।

৫. আল্লাহর পথে অবিচল থাকাই হলো প্রকৃত বীরত্ব (ফুতুওয়াত)।

৬. মানুষের বেশে আল্লাহর এমন কিছু অলি আছেন, যাঁদের কেউ যদি আল্লাহর কাছে কিছু চান, তবে আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা তাঁদের দোয়ার প্রভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

৭. যার মনে এমন কোনো চিন্তার উদ্রেক হয় যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন, সেই ব্যক্তির উচিত তার জন্য কান্না করা, অর্থাৎ কৃত অপরাধের অনুশোচনায় ব্যথিত হওয়া।

৮. নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে অলি-আল্লাহদের আধ্যাত্মিক রহস্যসমূহ গোপন রাখেন।

৯. আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধের প্রতি অত্যধিক সম্মান প্রদর্শন করা— অধিক জ্ঞানার্জন, জুহদ এবং অনেক ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।

১০. জমিনের বুকে সর্বদা আল্লাহর এমন বান্দা থাকেন, তিনি যখন আল্লাহর জিকির করেন, তখন তাঁর ভয়ে সিংহরা মূত্রত্যাগ করে, সমুদ্রের মাছসমূহ এবং আসমান-জমিনের ফেরেশতারা নিথর হয়ে যায় এবং তাঁর জিকিরের নুরে সারা বিশ্ব আলোকিত হয়ে ওঠে।

১১. তিনটি স্থানে ফেরেশতারা আউলিয়াদের দেখে প্রভাবান্বিত ও ভীত হন। ক. মৃত্যুর সময় মালাকুল মউত; খ. আমলনামা লেখার সময় কেরামান-কাতেবিন; গ. কবরে সওয়াল-জওয়াবের সময় মুনকার ও নাকির।

১২. যখন আমি দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হলাম যে, আমার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে, তখন আমি তালাশ করা ছেড়ে দিলাম। আর যখন আমি মানুষের অক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী হলাম।

১৩. বান্দার অবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেন গুনাহ না থাকার কারণে ফেরেশতা তার কাছ থেকে ফিরে যায় এবং আমলনামায় মন্দ কিছু লেখার সুযোগ না পায়; অথবা তার আধ্যাত্মিক মাকাম এমন হওয়া উচিত, যেন সে ফেরেশতার কাছ থেকে নিজের আমলনামা নিয়ে নেয় এবং সেখান থেকে যা খুশি মুছে ফেলে আর যা খুশি রেখে দেয়। অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর নেক আমল এত বেশি হয়; যা সব মন্দকে মিটিয়ে দেয়।

১৪. তোমরা মহান আল্লাহর সাহচর্য অবলম্বন করো, সৃষ্টির সাহচর্য নয়। কারণ একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই এমন সত্তা যাঁর অন্বেষণ করা উচিত, যাঁকে নিয়ে এবং যাঁর সাথে কথা বলা উচিত, যাঁর কালাম (কুরআন) শ্রবণ করা উচিত, যাঁর দিকে পথনির্দেশ করা উচিত এবং কেবল যাঁর নিকটই অভিযোগ ও ফরিয়াদ পেশ করা উচিত।

১৫. প্রত্যেকেই নিজ বিদ্যা নিয়ে অহংকারে মগ্ন। কিন্তু যখন কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সে বুঝতে পারে যে, আসলে সে কিছুই জানে না, তখন সে জ্ঞান ও মারেফতের দাবি করতে লজ্জা পায়। আর ঠিক তখনই তার মারেফত বা জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে।

১৬. মানুষ যতক্ষণ দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, ততক্ষণ দুনিয়া তার ওপর শাসন চালায়। আর যখনই সে দুনিয়া ত্যাগ করে, তখন সে নিজেই দুনিয়ার ওপর শাসকে পরিণত হয়।

১৭. আল্লাহ যেভাবে সময়ের আগে তোমার কাছে নামাজ দাবি করেন না, ঠিক তেমনি তুমিও সময়ের আগে আল্লাহর কাছে রিজিকের জন্য হাহাকার করো না।

১৮. প্রকৃত পুরুষত্ব হলো একটি সমুদ্র, যেখান থেকে তিনটি ঝরনা প্রবাহিত হয়: প্রথমটি হলো দানশীলতা, দ্বিতীয়টি সৃষ্টির প্রতি মমতা, আর তৃতীয়টি হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া এবং আল্লাহর মাধ্যমে সৃষ্টির পরোয়া না করা।

১৯. আমরা এক কাফেলার যাত্রী; যার অগ্রভাগে রয়েছেন মুহাম্মদ মুস্তফা (ﷺ), তাঁর পেছনে রয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম, আর আমরা রয়েছি তাঁদের পেছনে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যে এই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে।

২০. যে হৃদয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো স্থান রয়েছে, হোক তা ইবাদতের গৌরব; সেই হৃদয় মৃত।

২১. আল্লাহ এবং সৃষ্টির মাঝে ‘নফস’ বা প্রবৃত্তি ছাড়া আর কোনো পর্দা নেই। স্বয়ং অলি-আল্লাহগণ এই নফসের ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন, এমনকি নবীগণও (আ.) এর ফিতনা থেকে পানাহ চেয়েছেন।

২২. দ্বীনের মধ্যে শয়তানের পক্ষ থেকে তেমন বড়ো কোনো ফিতনা নেই; বরং দ্বীনের জন্য বড়ো ফিতনা বা বিপর্যয় আসে দুই ধরনের লোকের মাধ্যমে। এক. সেই আলেম যে দুনিয়ার প্রতি লোভী। দুই. সেই জাহিদ (সাধক) যার কাছে পর্যাপ্ত দ্বীনি জ্ঞান নেই।

২৩. সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহ তায়ালার জিকির, তাকওয়া, দানশীলতা এবং নেককার বা সালেহিনদের সাহচর্য।

২৪. উপকারী ইলম বা জ্ঞান হলো তা; যা অনুযায়ী আমল করা হয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ ইবাদতসমূহ।

২৫. মোজাহাদা তিন প্রকার। নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে আনুগত্য করা, জিহ্বায় জিকির করা এবং হৃদয়ে আল্লাহর ধ্যান বা ফিকির করা।

২৬. সমস্ত সৃষ্টি এমন আমল করার চেষ্টা করে, যা কেয়ামতের দিন তাদের উপকারে আসবে; অথচ আল্লাহর কাছে বান্দার পক্ষ থেকে নিজের অক্ষমতা ও দৈন্য প্রকাশের চেয়ে অধিক উপকারী আর কোনো আমল নেই।

২৭. আল্লাহ তায়ালা যাকে ভালোবাসেন, তার জন্য নিজের দিকে আসার পথ প্রশস্ত করে দেন এবং সেই পথকে তার জন্য সংক্ষিপ্ত করে দেন।

২৮. কামেল পুরুষদের খাদ্য এবং পানীয় হলো মহান আল্লাহর মহব্বত বা ভালোবাসা।

২৯. তোমার জিহ্বাকে এমনভাবে মোহরবদ্ধ করো, যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জিকির না আসে; তোমার হৃদয়কে এমনভাবে আগলে রাখো যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালো না বাসে। ঠিক তেমনি মুখ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও সংযত করো, যাতে হালাল ছাড়া কিছু না খাও এবং ইখলাস ছাড়া কোনো আমল না করো।

৩০. প্রকৃত সুফি হলো সে, যার দেহ কামনা-বাসনায় মৃত, হৃদয় আল্লাহর প্রেমে বিলীন এবং নফস বা প্রবৃত্তি রিয়াজতের আগুনে দগ্ধ।

৩১. যে কাজ তুমি আল্লাহর জন্য করো, তা-ই ইখলাস; আর যা সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য করো তা-ই রিয়া বা লোকদেখানো আমল।

৩২. বান্দার এমন হওয়া উচিত, যেন সফরের ক্লান্তিতে তার পা ফুলে যায়, নীরবতার সাধনায় তার শরীর নিস্তেজ হয় এবং চিন্তার গভীরে তার অন্তর ব্যাকুল থাকে।

৩৩. আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হলো প্রেমিকদের জন্য, আর তাঁর সাধারণ রহমত হলো পাপীদের জন্য।

৩৪. যে ব্যক্তি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মুমিনকে কষ্ট দেয় না, সে যেন স্বয়ং নবী করীম ﷺ-এর সাহচর্য লাভ করল। আর যদি কেউ কোনো মুমিনকে কষ্ট দেয়, তবে সেই দিনের কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।

৩৫. আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে যা কিছু দান করেছেন, তার মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন অন্তর এবং একটি সত্যবাদী জিহ্বার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই।

৩৬. তিন শ্রেণীর লোক আল্লাহর পথের যাত্রী। এক. জ্ঞানান্বেষী (আলেম), যার সাথে কলম ও কালির দোয়াত থাকে; দুই. সাধক, যার সাথে তালি দেওয়া পোশাক ও জায়নামাজ থাকে; তিন. সেই মেহনতি মানুষ, যে নিজ হাতে কাজ করে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণ চালায়। মনে রেখো, অলস বসে থাকা এবং কোনো কাজে লিপ্ত না হওয়া নফসের জন্য ধ্বংসাত্মক।

৩৭. আমার কোনো মুরিদ বা ছাত্র নেই; কারণে আমি পীর বা পথপ্রদর্শক হওয়ার দাবি করি না। আমি কেবল বলি— আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট।

৩৮. যদি তুমি সারা জীবনে একবারও আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি করো, তবে তোমার উচিত সারা জীবন সেই গুনাহের জন্য ক্রন্দন করা। এমনকি আল্লাহ যদি তোমাকে ক্ষমাও করে দেন, তবুও তাঁর দরবারে তোমার সেই বাড়াবাড়ি বা অবহেলার জন্য যে আক্ষেপ বা দীর্ঘশ্বাস, তা তোমার হৃদয়ে অনন্তকাল থেকে যাওয়া উচিত।

৩৯. সৃষ্টির ইবাদত বা আনুগত্য তিনটি জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে। নফস, অন্তর এবং জিহ্বা দ্বারা সর্বদা আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকা। যে ব্যক্তি এই তিনটির মাধ্যমে আল্লাহর কাজে মগ্ন থাকে, সে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

৪০. আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো ফয়সালা করেন এবং বান্দা তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তখন সেই সন্তুষ্টি বান্দার জন্য এমন লক্ষ লক্ষ আমলের চেয়েও উত্তম, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নেই।

৪১. দুনিয়াতে কারো সাথে শত্রুতা বা বিবাদ থাকার চেয়ে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু নেই।

৪২. যে ব্যক্তি সারা রাত ঘুমানোর এবং সারা দিন খাওয়ার ইচ্ছা রাখে, সে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবে কবে?”

৪৩. আলেম তার ইলম নিয়ে ব্যস্ত, জাহেল তার মূর্খতা নিয়ে, জাহিদ তার সংসারবিরাগ নিয়ে এবং আবেদ তার ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আরেফ (আল্লাহকে যিনি চিনেন) ব্যস্ত থাকেন নিজের নফসের পবিত্রতা নিয়ে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য পায়। কারণ, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্রতাকেই পছন্দ করেন।

৪৪. যখন তুমি তোমার মানবীয় আমিত্ব বা নফসের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসবে, তখনই তোমার প্রকৃত জীবন আল্লাহর সাথে শুরু হবে।

৪৫. আলেমগণ কুরআনের তাফসির নিয়ে মগ্ন থাকেন, আর আরেফগণ (আধ্যাত্মিক জ্ঞানী) মগ্ন থাকেন নিজের নফস ও নিজ আধ্যাত্মিক অবস্থার ব্যাখ্যা ও সংশোধনে।

৪৬. সমস্ত নবী ও অলিগণ এই দুনিয়ায় আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন আল্লাহকে তাঁর যথাযথ হক অনুযায়ী চেনার জন্য, কিন্তু কেউ-ই তাঁর সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে জানার দাবি করতে পারেননি। মহান সেই সত্তা, যিনি তাঁর পরিচয় লাভের একমাত্র পথ রেখেছেন তাঁর পরিচয় লাভে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করার মধ্যে।

৪৭. তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘উবুদিয়্যাত বা দাসত্ব কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়া।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তাওয়াক্কুল কী?’ তিনি বললেন, ‘হিংস্র বাঘ, বিষধর সাপ, লেলিহান আগুন কিংবা উত্তাল সমুদ্র— কোনো কিছুকেই ভয় না পাওয়া (অর্থাৎ কেবল আল্লাহকেই ভয় করা)।’