১. সত্যিকার আরিফ (আল্লাহর জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তি) কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় আবদ্ধ থাকেন না; বরং তিনি প্রতিটি অবস্থায় তাঁর প্রভুর আদেশের অনুগত থাকেন।১

২. সৎকর্মশীলদের সাথে থাকলে জীবন সুখকর হয় এবং উত্তম সাথির মধ্যে কল্যাণ নিহিত থাকে; যদি তুমি ভুলে যাও, সে তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে, আর যদি তুমি স্মরণ করো, সে তোমাকে সাহায্য করবে।

৩. ইউসুফ বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জুননুনকে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, কী এমন জিনিস যা বান্দাদের ক্লান্ত ও দুর্বল করে দিয়েছে? তিনি তাকে বললেন, গন্তব্যের (পরকালের) চিন্তা, পাথেয় (নেক আমল) কম থাকা, এবং হিসাবের ভয়। আর আমলকারীদের শরীর কেন গলবে না এবং তাদের বুদ্ধি কেন লোপ পাবে না, যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো, অবস্থায় তাদের আমলনামা পড়া হবে এবং ফেরেশতারা বিচারকের (আল্লাহর) সামনে দাঁড়িয়ে নেককার ও বদকারদের বিষয়ে তাঁর আদেশের অপেক্ষা করছেন? তারপর তিনি বললেন, তারা যেন এই বিষয়গুলো তাদের অন্তরে মূর্ত করে তোলে এবং তাদের চোখের সামনে রাখে। তিনি আরো বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জুননুনকে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম, কখন মানুষের জন্য নির্জনতা (আযলাতুল খালক) সঠিক হয়?  তিনি বললেন, যখন তুমি নিজের নফসের (প্রবৃত্তির) কাছ থেকে নির্জনতা অবলম্বন করার শক্তি লাভ করবে।

৪. ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুনকে বিদায়ের সময় বলেছিলাম, আমি কার সাথে উঠাবসা করব? তিনি বললেন, তোমাকে এমন ব্যক্তির সাহচর্য নিতে হবে, যার দর্শন তোমাকে আল্লাহ-কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যার ভয় তোমার অন্তরে প্রভাব ফেলে, যার কথা তোমার আমলে বৃদ্ধি ঘটায়, যার কাজ তোমাকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করে তোলে এবং যার সান্নিধ্যে তুমি আল্লাহ্‌র অবাধ্য হবে না, যে তার কাজের ভাষা দিয়ে তোমাকে উপদেশ দেবে, কথার ভাষা দিয়ে নয়।

৫. শরীরের অসুস্থতা হলো ব্যাধি, আর অন্তরের অসুস্থতা হলো পাপ। যেমন অসুস্থতার সময় শরীর খাবারের স্বাদ পায় না, তেমনি পাপের সাথে অন্তর ইবাদতের মিষ্টতা অনুভব করে না। আমি তাকে বলতে শুনেছি, যে নেয়ামতের মূল্য জানে না, সে না জেনে তা থেকে বঞ্চিত হয়।

৬. আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে কারো উপর আকলের (বুদ্ধির) চেয়ে উত্তম কোনো পোশাক দেননি, আর ইলমের (জ্ঞানের) চেয়ে সুন্দর কোনো হার পরিয়ে দেননি, আর হিলমের (ধৈর্য ও সহনশীলতার) চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো সাজে সাজাননি, আর এই সবকিছুর পূর্ণতা হলো তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।

৭. সতর্ক থেকো যেন তুমি তাঁর (আল্লাহর) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যাও, তাহলে তুমি প্রতারিত হবে। আমি বললাম, সেটা কীভাবে? তিনি বললেন, কারণ প্রতারিত সে, যে তাঁর দানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সেগুলোর দিকে তাকানোর কারণে তাঁকে দেখা (তাঁর দিকে মনোনিবেশ করার) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মানুষ যেভাবে পার্থিব উপকরণাদির সাথে যুক্ত থাকে, সিাদ্দকগণ (সত্যবাদী ও উচ্চস্তরের সাধকগণ) সেভাবে উপকরণের মালিকের (আল্লাহর) সাথে যুক্ত থাকেন। এরপর তিনি বললেন, দানগুলোর প্রতি তাদের হৃদয়ের আসক্তির লক্ষণ হলো তারা তাঁর কাছে দানগুলোই চায়। আর সিদ্দিকের হৃদয়ের, দানের মালিকের প্রতি আসক্তির লক্ষণ হলো— তাঁর উপর দান বর্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেগুলোর চেয়ে তাঁকে (আল্লাহকে) নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

আল্লাহর উপর তোমার নির্ভরতা যেন বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে হয়, অবস্থার সাথে আল্লাহকে মিলিয়ে নয়। এরপর তিনি বললেন, বুঝতে চেষ্টা করো, কারণ এটি তাওহিদের গুণাগুণ।

৮. যখন আমি বিদায়ের সময় তাঁর কাছে উপদেশ চেয়েছিলাম, তখন তিনি বললেন, মানুষের দোষত্রুটি যেন তোমাকে নিজের দোষ দেখা থেকে বিরত না রাখে; তুমি তাদের উপর পর্যবেক্ষক নও। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সে, যে তাঁকে সবচেয়ে বেশি বোঝে। আর মানুষের বুদ্ধিমত্তার পূর্ণতা এবং বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তার বিনয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় কতগুলো আচরণের মাধ্যমে।

ক. যখন কেউ কথা বলে, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শুনে, যদিও সে নিজে ওই বিষয়ে জানে।

খ. দ্রুততার সাথে সত্যকে গ্রহণ করে, যদিও সত্য বহনকারী তার চেয়ে নিম্নস্তরের হয়।

গ. নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করে।

৯. যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে তাঁর আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ভুলে যায়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ভুলে যায়, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সবকিছু রক্ষা করেন এবং তিনি তার জন্য সবকিছুর বিনিময় হয়ে যান।

১০. বাহ্যিকভাবে যারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ইঙ্গিত করে (বা আলোচনা করে), তারা আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে। হে আমার ইলাহ, যদি আপনার আনুগত্যের পাশে আমার আমল ছোটো হয়েও থাকে, তবে আপনার আশার পাশে আমার আশা অনেক বড়ো।

১১. যে ব্যক্তি আশা হারানোর তরবারি দিয়ে লোভের কণ্ঠনালী জবাই করে, এবং লোভের পরিখা ভরাট করে দেয়; সে খেদমতের কিমিয়া লাভ করে। যে ব্যক্তি মারুফ (সৎকর্ম)-এর বালতি দিয়ে জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা)-এর রশি ব্যবহার করে পানি তোলে; সে হিকমত (জ্ঞান)-এর কূপ থেকে পানি তোলে। যে ব্যক্তি কষ্টের উপত্যকা অতিক্রম করে, সে অনন্ত জীবন লাভ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহভীতির কাস্তে দিয়ে গুনাহের ঘাস কাটে, তার জন্য ইস্তিকামাতের (দৃঢ়তার) বাগান আলোকিত হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি নীরবতার ছুরি দিয়ে তার জিহ্বা কর্তন করে, সে আরামের মিষ্টতা খুঁজে পায়। যে ব্যক্তি সত্যবাদিতার বর্ম পরিধান করে, সে বাতিলের (মিথ্যার) সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শক্তি পায়। আর যে ব্যক্তি অজ্ঞের প্রশংসায় আনন্দিত হয়, শয়তান তাকে নির্বুদ্ধিতার পোশাক পরিয়ে দেয়।

১২. যে নত হয়, সে তাজা ফল সংগ্রহ করে, আর যে অহংকার করে, সে ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।

১৩. এমন ব্যক্তির ভালোবাসার উপর কখনোই নির্ভর করো না, যে তোমাকে শুধু মাসুম (নিষ্কলুষ বা নিষ্পাপ) থাকলেই ভালোবাসে।

১৪. যে ব্যক্তি তোমার সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তুমি যা পছন্দ করো তাতে তোমার সাথে একমত হয়, কিন্তু তুমি যা অপছন্দ করো তাতে তোমার বিরোধিতা করে; সে তো মূলত তার নিজের প্রবৃত্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখে। আর যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখে, সে তো কেবল দুনিয়ার আরামই তালাশকারী।

১৫. প্রত্যেক অনুগত ব্যক্তিই ঘনিষ্ঠতা (আনুগত্যের সুখ) অনুভব করে। প্রত্যেক পাপীই একাকিত্ব (শূন্যতা) অনুভব করে। প্রত্যেক প্রেমিকই বিনীত। প্রত্যেক ভীত ব্যক্তিই পলায়নকারী। প্রত্যেক আশাবাদী ব্যক্তিই তালাশকারী। আবু উসমান, সাঈদ ইবনে উসমান আল-খাইয়্যাত বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, আমি একাকিত্বের মতো ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অর্জনের জন্য বেশি প্রেরণা সৃষ্টিকারী আর কিছু দেখিনি। কারণ, যখন সে নির্জনে থাকে, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দেখে না। আর যখন সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দেখে না, তখন আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কিছু তাকে চালিত করে না। আর যে ব্যক্তি নির্জনতা ভালোবাসে, সে ইখলাসের খুঁটি আঁকড়ে ধরেছে।২

১৬. সাবধান! যেন তুমি মারিফাতের নামের দাবিদার না হও, বা জুহদের (দুনিয়াবিমুখতা) মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের পথ না বানাও কিংবা ইবাদতের সাথে স্বার্থ বা নির্ভরতার সম্পর্ক স্থাপন না করো।

১৭. নিজেকে দেখা ও নিজের পরিকল্পনা করা— এ দু’টোই সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও কঠিন পর্দা।’

১৮. যে বিনয় অর্জন করতে চায়, সে যেন নিজের মনকে আল্লাহর মহত্ত্বের দিকে মনোযোগী করে। কারণ, তখন তার আত্মা গলে যাবে ও পরিশুদ্ধ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পরম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দিকে দৃষ্টি দেয়, তার নিজের অহংকার ও প্রভুত্ব বিলীন হয়ে যায়। কেননা সমস্ত আত্মা তাঁর মহান মহিমার সামনে নিঃস্ব ও অসহায়।”

১৯. আমি এমন কোনো অজ্ঞ ডাক্তার দেখি না, যে মাতাল অবস্থায় মদ্যপকে চিকিৎসা করতে চায়। কারণ, মাতালের চিকিৎসা হয় না যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়ে ওঠে। তেমনি, পাপাচারীরও চিকিৎসা নেই যতক্ষণ না সে তওবা করে।

২০. আমি এমন কোনো কিছু দেখিনি, যা ইখলাস (নির্মল নিয়ত ও একান্ততা)-এর অনুপ্রেরণা জাগায়, একাকিত্ব এর চেয়ে বেশি। কারণ, যখন মানুষ একাকী হয়, তখন সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেখে না। আর যখন সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে দেখে না, তখন তার সমস্ত নড়াচড়া কেবল আল্লাহর হুকুমেই হয়। সুতরাং, যে ব্যক্তি নির্জনতা ভালোবাসে, সে যেন ইখলাসের স্তম্ভকে আঁকড়ে ধরে, এবং সত্যবাদিতার অন্যতম মহান স্তম্ভে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে।

২১. আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার লক্ষণ হলো— আল্লাহর প্রিয়জন (হজরত মুহাম্মদ ﷺ)-এর অনুসরণ করা, তাঁর চরিত্রে, আচরণে, আদেশে ও সুন্নতে।

২২. যখন অন্তরে ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) সত্য ও পরিপূর্ণ হয়, তখনই অন্তরে প্রকৃত ভয় (খাশিয়ত) জন্ম নেয়।

২৩. যে মানুষ সৃষ্টির সাথে অতিরিক্ত সখ্য স্থাপন করে, সে যেন ফিরআউনের আসনে বসেছে (অর্থাৎ, অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার আসনে)। আর যে ব্যক্তি নিজেকে পর্যবেক্ষণ থেকে গায়েব হয়ে যায় (অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে ভুলে শুধু আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়), সে নিখাদ ইখলাস অর্জন করে। আর যার সমস্ত মনোযোগ কেবল আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ থাকে, তার কাছে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানো বা না-পাওয়া কোনো অর্থ বহন করে না।

২৪. সত্য হচ্ছে আল্লাহর তরবারি, পৃথিবীতে যেখানেই এটা নেমে আসে, সেটা মিথ্যা ও কপটতার পর্দা কেটে ফেলে।

২৫. যে ব্যক্তি তার আমল (ইবাদত) দিয়ে নিজেকে সাজায় (লোক দেখানোর জন্য কাজ করে), তার সৎকর্মগুলোই পরিণত হয় পাপরূপে।

২৬. ভয় হলো আমলের প্রহরী, আর আশা হলো বিপদের সময়ে শাফাআতকারী (সান্ত্বনাদাতা)।”

২৭. তোমার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাইবে দারিদ্র্যের ভাষায় ,প্রজ্ঞার ভাষায় নয়। অর্থাৎ, অহংকার বা যুক্তি দিয়ে নয়; ভিক্ষুকের মতো বিনম্র হৃদয়ে চাও।

২৮. ইবাদতের চাবিকাঠি হলো চিন্তা-মনন, প্রবৃত্তির নিদর্শন হলো কামনার অনুসরণ, আর তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর উপর ভরসা) লক্ষণ হলো লোভের সম্পূর্ণ ছেদন।৩