ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ আল-গাজ্জালি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইসলামি জ্ঞান-সাধনার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর নাম শ্রদ্ধা ও মহিমার সঙ্গে উচ্চারিত হয় ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ উপাধিতে। তাঁর জীবন ও কর্ম কেবল একটি ব্যক্তিগত সাধনার কাহিনি নয়; বরং তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অনন্য দিকনির্দেশনা, যেখানে জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এমন এক যুগে আবির্ভূত হন, যখন ইসলামি সমাজে বাহ্যিক জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি পেলেও আধ্যাত্মিকতার গভীরতা অনেকাংশে ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ, বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা এবং আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা মানুষের ইমান ও আমলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। ঠিক এই সময়ে তিনি জ্ঞানের ময়দানে প্রবেশ করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে দেন এবং ইসলামের মৌলিক চেতনাকে পুনর্জাগরিত করেন।
প্রাথমিক পরিচয় ও উপাধি:
শায়খ, ইমাম, হুজ্জাতুল ইসলাম, জ্ঞান-সমুদ্র, যুগের বিস্ময়, দ্বীনের শোভা, বহু গ্রন্থের প্রণেতা— আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আত-তূসী আশ-শাফেয়ি আল-গাজ্জালি।[1] তিনি ৪৫০ হিজরিতে (মতান্তরে ৪৫১ হিজরিতে) তাবেরান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।[2]
তাঁর পিতা দরিদ্র ছিলেন; কিন্তু অত্যন্ত সৎ ও নেককার মানুষ। তিনি নিজের উপার্জন ছাড়া কিছুই খেতেন না। জীবিকার জন্য তিনি উল কেটে সুতা তৈরি করতেন এবং নিজের তূসের দোকানে তা বিক্রি করতেন।
অবসর সময়ে তিনি আলেমদের সান্নিধ্যে যেতেন, তাঁদের সঙ্গে বসতেন, তাঁদের খেদমত করতেন এবং তাঁদের উপকার করতে সর্বদা আগ্রহী থাকতেন। যতটুকু সম্ভব, তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টাও করতেন। আলেমদের কথা শুনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন, কাঁদতেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন— যেন তিনি এমন সন্তান দান করেন, যারা হবে ফকিহ ও সুবক্তা।
অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দুই পুত্র সন্তান দান করেন। আবু হামিদ (ইমাম গাজ্জালি) এবং তাঁর ভাই আহমদ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস— তিনি এর অল্পদিন পরেই মারা যান। আবু হামিদ তখনও ছোট, প্রাপ্তবয়স্ক হননি, এ অবস্থায়ই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন।
অপরদিকে, তাঁর মাতা দীর্ঘজীবী হন এবং নিজ চোখে দেখেন— কীভাবে তাঁর সন্তান খ্যাতি ও মর্যাদার আকাশে উন্নীত হন এবং সে যুগের সর্বোচ্চ জ্ঞানকেন্দ্রে আসীন হন।[3]
‘গাজ্জালি’ নামের রহস্য:
তাঁর নামের শেষে ‘গাজ্জালি’ (الغزالي) শব্দের ব্যবহারের বিষয়ে দুটি মত প্রচলিত রয়েছে—
১. জন্মস্থানের নামানুসারে: কিছু আলেমের মতে, ‘গাজ্জালি’ শব্দটি ‘গাযালা’ (غزالة) শব্দের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে ‘যা’ বর্ণে তাশদিদ নেই। এটি তাঁর জন্মস্থানের নাম। ভাষাগত দিক থেকে এ ব্যাখ্যাটি ঠিক।
২. পারিবারিক পেশার নামানুসারে: অন্য একদল আলেমের মতে, ‘গাজ্জালি’ শব্দটি ‘গাজ্জাল’ (الغزّال) থেকে এসেছে, যেখানে ‘যা’ বর্ণে তাশদিদ রয়েছে। এর অর্থ সুতা কাটা বা পশম বিক্রেতা। এটি ছিল তাঁর পিতার পেশা, যার মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। এ ব্যাখ্যাটিও ভাষাগতভাবে ঠিক।[4]
শিক্ষাজীবন:
তাঁর পিতা মৃত্যুর আগে তাঁকে ও তাঁর ভাইকে এক সৎ ও পরহেজগার সুফি বন্ধুর জিম্মায় দিয়ে যান। তিনি তাকে বলেছিলেন, “আমি নিজে লেখাপড়া শিখতে না পারার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত। আমি চাই, আমার এই দুই সন্তান যেন সে অভাব পূরণ করে। তুমি তাদের শিক্ষা দাও, আর এ কাজে আমি যে সামান্য সম্পদ রেখে যাচ্ছি, তা ব্যয় করতে দ্বিধা করো না।”
পিতার মৃত্যুর পর সেই সুফি ব্যক্তি তাদের শিক্ষার দায়িত্ব নেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পিতার রেখে যাওয়া সামান্য সম্পদ শেষ হয়ে যায়, ফলে তাঁর পক্ষে তাদের ব্যায়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তিনি তাদের বললেন, “জেনে রাখো, তোমাদের জন্য যা ছিল, আমি তা ব্যয় করেছি। আমি নিজেও দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষ, তোমাদের সহায়তা করার মতো আর কিছু আমার কাছে নেই। তাই আমি মনে করি, তোমাদের উচিত কোনো মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া। সেখানে তোমরা ছাত্র হিসেবে কিছু ভাতা পাবে, যা তোমাদের জীবিকা নির্বাহে সহায়ক হবে।”
তারা তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। এটাই ছিল তাদের সৌভাগ্য ও উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছার প্রধান ওসিলা।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) নিজেই এ ঘটনা স্মরণ করে বলতেন, “আমরা প্রথমে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জ্ঞান অর্জন করিনি; কিন্তু (শেষ পর্যন্ত) জ্ঞান আমাদেরকে আল্লাহর দিকেই নিয়ে গেছে।”[5]
শিক্ষা জীবনের শুরুতে তিনি তুস নগরীতে আহমদ আল-রাজকানির কাছে পড়াশোনা করেন।[6] এ-ছাড়া নিজ শহরেই ফিকহ শাস্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর একদল ছাত্রের সাথে পদযাত্রা করেন নিশাপুরের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি ইমামুল হারামাইন আবুল মাআলি আল-জুয়াইনির সাহচর্য গ্রহণ করেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ফিকহশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। কালাম শাস্ত্র (তত্ত্ববিদ্যা) ও যুক্তিশাস্ত্রেও তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন, এমনকি তিনি হয়ে ওঠেন বিতার্কিকদের মধ্যমণি। তিনি ছাত্রদের পাঠদান শুরু করেন এবং কিতাব রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর এই দ্রুত উন্নতি দেখে তাঁর উস্তাদ আবুল মাআলি বিস্মিত হতেন, এবং শিষ্যের এই সাফল্যে গর্ববোধ করতেন।
এ-ছাড়াও তিনি কাজি আবুল ফাতাহ আল-হাকিমি আত-তূসীর নিকট থেকে ‘সুনানে আবু দাউদ’ এবং মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-খাওয়ারী’র নিকট থেকে ইবনে আবি আসিমের ‘আল-মাওলিদ’ গ্রন্থও অধ্যয়ন করেন।[7]
জ্ঞানার্জনে কঠোর সাধনা:
নিজ শহরে ফিকহ শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জনের পর ইমাম গাজ্জালি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে জুরজান অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি তাঁর উস্তাদ আবু নাসের আল-ইসমাইলি’র সাক্ষাৎ পান। শিক্ষাগ্রহণের প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি উস্তাদের কাছ থেকে যা শুনতেন, তা লিখে নিতেন। যাকে ‘তালিকাহ’ বা নোট বলা হতো।
শিক্ষা শেষে তিনি যখন জুরজান থেকে পুনরায় তুস-এ ফিরছিলেন, পথে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল যা তাঁর জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিকেই বদলে দিল। ইমাম গাজ্জালি নিজেই সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন, একদল ডাকাত আমাদের পথ রোধ করল এবং আমার কাছে যা কিছু ছিল তার সবকিছুই ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছিল। আমি তাদের পিছু পিছু ছুটলাম। তখন ডাকাত দলের সর্দার আমার দিকে ফিরে বলল, ‘হতভাগা, ফিরে যা! নইলে প্রাণ হারাবি।’
আমি তাকে বললাম, ‘যাঁর কাছে আপনি নিজের নিরাপত্তা আশা করেন, তাঁর দোহাই দিয়ে বলছি, দয়া করে শুধু আমার তালিকাহ (শিক্ষার নোটগুলো) ফেরত দিন। এগুলো আপনাদের কোনো কাজেই আসবে না।’
ডাকাত সর্দার জিজ্ঞেস করল, ‘কী এই তালিকাহ?’
আমি বললাম, ‘এই থলের ভেতরে কিছু পাণ্ডুলিপি আছে, যা শোনার জন্য, লেখার জন্য এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আমি দেশ ত্যাগ করে হিজরত করেছিলাম।’
এ কথা শুনে ডাকাত সর্দার অট্টহাসি দিয়ে বলল, ‘তুই কীভাবে দাবি করিস যে তুই জ্ঞান অর্জন করেছিস? অথচ আমরা তোর কাছ থেকে কাগজগুলো ছিনিয়ে নেওয়া মাত্রই তুই জ্ঞানহীন হয়ে পড়লি!’
এরপর সে তার এক সঙ্গীকে নির্দেশ দিল নোটের থলেটি ফেরত দেওয়ার জন্য।
ইমাম গাজ্জালি বলেন, “ডাকাত সর্দারের সেই কথাটি ছিল মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দিকনির্দেশনা, যা তিনি আমার জীবনকে সঠিক পথে চালিত করার জন্য তাকে দিয়ে বলিয়েছেন। তুস-এ পৌঁছানোর পর আমি টানা তিন বছর কঠোর পরিশ্রমে নিমগ্ন হলাম। জুরজানে যা কিছু লিখেছিলাম, তার সবকিছু মুখস্থ করে ফেললাম। এখন অবস্থা এমন হলো যে, যদি ডাকাতরা আবার আমার পথ রোধ করে সব কেড়েও নেয়, তবুও আমি জ্ঞানহীন হয়ে পড়ব না।”[8]
ইমামুল হারামাইনের সান্নিধ্য ও সাহচর্য:
ইমাম গাজ্জালি নিশাপুরে আগমন করেন, যা ছিল তৎকালীন সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং বাগদাদের পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্ঞানকেন্দ্র। সেখানে তিনি ইমামুল হারামাইন এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে থাকতে শুরু করেন। ইমামুল হারামাইন ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলেমদের একজন, যাঁর ইলম ও পাঠদানের শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজনবিদিত।
ইমাম গাজ্জালি সেখানে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শাফেয়ি মাজহাব (ফিকহ), ইখতিলাফ (পণ্ডিতদের মতপার্থক্য), জাদাল (বিতর্কবিদ্যা) এবং উসুল (আইনতত্ত্ব) ইত্যাদিতে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অর্থের গভীরে পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার দেখে ইমামুল হারামাইন রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি গাজ্জালি সম্পর্কে বলতেন, “গাজ্জালি অতল সমুদ্র।”
তিনি তাঁর সমসাময়িক প্রায় ৪০০ মেধাবী শিক্ষার্থীকে ছাড়িয়ে যান এবং এক পর্যায়ে তাঁর শিক্ষকের প্রধান সহকারী ও স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নিয়োগ পান। বলা হয় যে, ইমাম গাজ্জালি যখন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মানখুল’ (المنخول) রচনা করেন, তখন তাঁর শিক্ষক আবু আল-মাআলি ইমামুল হারামাইন বইটি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “তুমি তো আমাকে জীবিত থাকতেই দাফন করে দিলে! কেন একটু সবর করলে না? তোমার এই কিতাব তো আমার কিতাবকে (জনপ্রিয়তায়) ঢেকে ফেলেছে!”[9]
বাগদাদ গমন ও খ্যাতি অর্জন:
পরবর্তীতে নিশাপুর ছেড়ে আবু হামিদ রাজকীয় শিবিরের দিকে যাত্রা করেন এবং সেখানে উজির নিজামুল মুলক তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। উজির তাঁর উপস্থিতিতে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং রাজদরবারে বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের সাথে ইমাম গাজ্জালির বিতর্কের আয়োজন করেন। তাঁর যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যায় সবাই বিমোহিত হয়ে যান এবং চারদিকে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নিজামুল মুলক তাঁকে বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন করেন। ৪৮০ হিজরির কিছুকাল পরে যখন তিনি বাগদাদে আসেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ত্রিশের কোঠায়। সেখানে তিনি উসুল, ফিকহ, কালাম ও দর্শন শাস্ত্রের কিতাব রচনা শুরু করেন। তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা তাঁকে কালাম শাস্ত্রের জটিল ও সূক্ষ্ম আলোচনায় প্রবেশ করিয়েছিল, যেখানে অনেক সময় বিভ্রান্তির সম্ভাবনাও ছিল। আল্লাহর সৃষ্টিতে এ এক বিশেষ রহস্য।[10]
আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ও নির্জনতা:
তাঁর মর্যাদা ও প্রতিপত্তি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তিনি রাজকীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন এবং উচ্চপদস্থ নেতাদের সমপর্যায়ে গণ্য হন। কিন্তু জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর অনুশীলন তাঁকে দুনিয়াবি পদ-মর্যাদা ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে আখিরাতমুখী হন, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে অগ্রসর হন।
এরপর তিনি হজ পালন করেন, বায়তুল মুকাদ্দাস জিয়ারত করেন এবং দামেশকে ফকিহ নাসর ইবন ইবরাহীমের সান্নিধ্যে কিছু সময় অবস্থান করেন। এই সময়ে তিনি ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, আল-আরবাঈন, আল-কিস্তাস এবং মিহাক্কুন নযর’ প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন।
তিনি নিজের নফসকে কঠোর সাধনার মাধ্যমে সংযত রাখেন, পরিশুদ্ধ করেন, অহংকার ও অবিবেচনার শয়তানকে পরাস্ত করেন এবং মুত্তাকিদের জীবনধারা অবলম্বন করেন। এর কয়েক বছর পর তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন। নিজ আদর্শে অবিচল থেকে, সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করে এবং জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থেকে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন।[11]
সুফিপথের পান্থশালায়:
নিজামুল মুলকের পর ফখরুল মুলক যখন উজিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন, তখন তিনি আবু হামিদকে (ইমাম গাজ্জালি রহ.) উপস্থিত করালেন এবং তাঁর কাছে অনুরোধ করলেন— তিনি যেন তাঁর জীবন ও নিঃশ্বাসকে নিষ্ফল না রাখেন (অর্থাৎ পুনরায় শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন)। তিনি শায়খের কাছে বারবার অনুরোধ করতে থাকলেন, অবশেষে তিনি নরম হলেন এবং নীশাপুরে ফিরে যেতে সম্মত হলেন। সেখানে তিনি নিজামিয়া মাদ্রাসায় পুনরায় পাঠদান শুরু করেন।
এ ঘটনা এবং এর অনুরূপ আরও অনেক কিছু আবদুল গাফির তাঁর ‘আস-সিয়াক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি তাঁর সঙ্গে বহুবার সাক্ষাৎ করেছি। অথচ আগে তাঁর সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল যে, তিনি কিছুটা কঠোর স্বভাবের, মানুষের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকান, নিজের প্রখর বাগ্মিতা, তীক্ষ্ণ মেধা এবং উচ্চ মর্যাদার আকাঙ্ক্ষার কারণে অহংকার ও আত্মগরিমায় ভরপুর; তা আর দেখতে পেলাম না। বরং তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেছেন; সেই সব কলুষতা থেকে সম্পূর্ণরূপে পরিশুদ্ধ হয়ে উঠেছেন।
প্রথমে আমি মনে করতাম, হয়তো তিনি কৃত্রিমভাবে এই নতুন রূপ ধারণ করেছেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের পর আমি নিশ্চিত হলাম যে, বিষয়টি আমার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাস্তবতা হলো তিনি যেন এক ধরনের ‘উন্মত্ততা’ (আত্মগর্ব ও দুনিয়াবি মোহ) থেকে সজাগ হয়ে উঠেছেন।
কিছু রাতে তার সাথে অতিবাহিত করার ফলে তাঁর জীবনের অবস্থা জানার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি জানিয়েছিলেন, কীভাবে তাঁর সামনে আধ্যাত্মিকতার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল, কীভাবে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে গভীর নিমগ্নতা এবং নিজের তর্ক-বিতর্কে সবার ওপর প্রাধান্য লাভের পর তাঁর অন্তরে এক বিশেষ পরিবর্তন আসে। আল্লাহ তাঁকে যে অসাধারণ মেধা ও বিভিন্ন জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা দান করেছিলেন, তা থাকা সত্ত্বেও তিনি এমন জ্ঞানচর্চা থেকে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, যা আমল ও আত্মশুদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কহীন।
এরপর তিনি পরিণামের কথা চিন্তা করতে থাকেন— আখিরাতে কী থাকবে, কী উপকারে আসবে। তখন তিনি শায়খ আবু আলী আল-ফারামাযীর সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর কাছ থেকে তাসাউফের পথের প্রাথমিক দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী মুক্তির আশায় ইবাদত, নফল আমল, জিকির এবং কঠোর সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এভাবে তিনি সেই কঠিন ধাপগুলো অতিক্রম করেন, অনেক কষ্ট সহ্য করেন; কিন্তু (প্রথম পর্যায়ে) তিনি তখনো সেই লক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে অর্জন করতে পারেননি, যা তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন।”[12]
চূড়ান্ত উপলব্ধি:
আবদুল গাফির ফারিসী বর্ণনা করেন, তিনি পুনরায় জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করেন, সূক্ষ্ম ও গভীর বিদ্যাশাখাগুলোর মধ্যে প্রবেশ করেন এবং সেইসব বিদ্যার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে থাকেন। এমনকি ধীরে ধীরে এসব জ্ঞানের দ্বার তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কিছু সময় তিনি বিভিন্ন মতভেদ ও দলিল-প্রমাণের সমতা (অর্থাৎ কোনটি সত্য তা নির্ণয়ে জটিলতা) নিয়ে চিন্তায় নিমগ্ন থাকেন।
এ অবস্থায় তাঁর অন্তরে এক বিশেষ ভয়ের অনুভূতি জাগ্রত হয়, যা তাঁকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং অন্য সব বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে এই অবস্থা তাঁর জন্য সহজ হয়ে ওঠে। অবশেষে তিনি আত্মশুদ্ধিতে অভ্যস্ত হন, তাঁর সামনে সত্যের বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। আমরা আগে তাঁর মধ্যে যা কৃত্রিম আচরণ বা অর্জিত গুণ মনে করতাম, তা আসলে তাঁর স্বভাব ও প্রকৃত অবস্থায় পরিণত হয়েছিল। আর এ সবই ছিল তাঁর জন্য নির্ধারিত সৌভাগ্যের ফল।
এরপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে তিনি নিজের ঘর থেকে বের হয়ে পুনরায় মানুষের মাঝে ফিরে এসে দাওয়াত ও শিক্ষাদানের কাজে আগ্রহী হলেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, “আমার দৃষ্টিতে দ্বীনের দিক থেকে এটা বৈধ ছিল না যে, আমি দাওয়াত ও জ্ঞানপিপাসুদের উপকার করা থেকে বিরত থাকি। আমার জন্য সত্য প্রকাশ করা, তা উচ্চারণ করা এবং মানুষকে তার দিকে আহ্বান করা সহজ হয়ে গিয়েছিল।” [13]
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)’র মতে এই শিক্ষাদানে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য, ভিন্ন নিয়ত এবং নতুন পদ্ধতিতে। পূর্বের শিক্ষাদানের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না। তিনি বলেন, “আমি জানি, আমি যদিও আবার জ্ঞান প্রচারে ফিরে এসেছি, প্রকৃতপক্ষে আমি ফিরে আসিনি। কারণ ফিরে আসা মানে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া। অথচ অতীতে আমি এমন জ্ঞান প্রচার করতাম, যার মাধ্যমে মর্যাদা ও সম্মান অর্জিত হয়। আমি কথা ও কাজের মাধ্যমে মানুষের সামনে সেই জ্ঞানকেই তুলে ধরতাম। সেটাই ছিল আমার উদ্দেশ্য ও নিয়ত।
কিন্তু এখন আমি এমন জ্ঞানের দিকে আহ্বান করছি, যার মাধ্যমে মর্যাদা ও খ্যাতি ত্যাগ করা যায় এবং দুনিয়াবি সম্মানের তুচ্ছতা উপলব্ধি করা যায়। এখন এটাই আমার নিয়ত, আমার উদ্দেশ্য এবং আমার আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ জানেন, আমি আমার নিজের সংশোধন চাই এবং অন্যদেরও সংশোধন করতে চাই।
আমি দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধির সঙ্গে এ কথা মানি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই। আমি নিজে চলিনি, তিনি আমাকে চালিয়েছেন। আমি নিজে কাজ করিনি, তিনি আমাকে কাজে লাগিয়েছেন। আমি তাঁর কাছে প্রার্থনা করি— তিনি যেন প্রথমে আমাকে সংশোধন করেন, তারপর আমার মাধ্যমে অন্যদের সংশোধন করেন; আমাকে হিদায়াত দেন, তারপর আমার মাধ্যমে অন্যদের হিদায়াত দেন; তিনি যেন আমাকে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখান এবং তা অনুসরণের তাওফিক দেন; আর অসত্যকে অসত্য হিসেবে দেখান এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করেন।”[14]
আকিদা ও মাজহাব:
তিনি আকিদাগতভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত ‘আশআরী’ মতধারার অনুসারী ছিলেন এবং ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মাজহাবের অনুসারী ছিলেন।[15]
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর ছাত্রবৃন্দ ও দরসে অংশগ্রহণকারী আলেমগণ:
তিনি প্রায় চার বছর নিজামিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর ইলমি মজলিস ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী। তাঁর নিকট থেকে অসংখ্য ছাত্র জ্ঞান অর্জন করেন, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে ফিকহ, হাদিস, তাফসির ও ইলমে কালামের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ আলেম হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন—
- কাজি আবু নাসর আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ মুকরী,
- আবু ফাতহ আহমদ ইবনে আলী হানবলী,
- আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আত্তারী তুসী,
- আবু সাঈদ মুহাম্মদ ইবনে সা‘দ কাওকানী,
- আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ তুমরত,
- আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল মালিক জুজকানী আসফারায়িনী,
- আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আলী ইরাকী বাগদাদী,
- আবু সাঈদ মুহাম্মদ ইবনে আলী জাওয়ানী,
- ইমাম আবু সাঈদ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া নিশাপুরী,
- আবু তাহের ইব্রাহিম ইবনে মতহার শাইবানী,
- আবু ফাতহ নাসর ইবনে মুহাম্মদ মারাগী (সুফী),
- আবু আবদুল্লাহ হুসাইন ইবনে নাসর মওসিলী,
- আবু আল-হাসান সা‘দুল খাইর ইবনে মুহাম্মদ আনসারী,
- আবু আবদুল্লাহ শাফি‘ ইবনে আবদুর রশীদ জাইলী,
- আবু আমের দাগশ ইবনে আলী নাঈমী,
- আবু তালিব আবদুল করিম ইবনে আলী রাযী (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন-এর হাফেজ),
- আবু মনসুর সাঈদ ইবনে মুহাম্মদ রাজাজ,
- আবু আল-হাসান আলী ইবনে মুহাম্মদ জুওয়াইনী (সুফী),
- আবু মুহাম্মদ সালিহ ইবনে মুহাম্মদ,
- আবু আল-হাসান আলী ইবনে মতহার দীনাওরী,
- মুরওয়ান ইবনে আলী তানযী,
- জালালুল ইসলাম আবু আল-হাসান আলী ইবনে মুসলিম মুসলিমী (রহিমাহুমুল্লাহ)।
অন্যদিকে, তাঁর দরস ও ইলমি মজলিস ছিল এমন মর্যাদাপূর্ণ যে, সময়ের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণও সেখানে অংশগ্রহণ করতেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন— ইমামুল হানাবিলা আবু আল-খাত্তাব মাহফুজ ইবনে আহমদ, শাইখুল হানাবিলা ও ইরাকের বিখ্যাত আলেম আলী ইবনে আকীল বাগদাদী।
এই মহান আলেমগণ তাঁর দরসে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন এবং তাঁর বক্তব্য ও ব্যাখ্যার গভীরতা দেখে বিস্মিত হতেন।
ইবনুল জাওযী (রহ.) বর্ণনা করেন, এই বিশিষ্ট আলেমগণ ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর বক্তব্য ও শিক্ষাকে নিজেদের গ্রন্থে উদ্ধৃত ও সংরক্ষণ করতেন, যা তাঁর ইলমি মর্যাদা ও প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ।[16]
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহের তালিকা:
প্রথম পর্যায় (৪৬৫ হি. — ৪৭৮ হি.)
অর্থাৎ তাঁর শিক্ষক ইমাম আবুল মাআলী জুয়াইনি (রহ.)-এর মৃত্যুর পূর্বকাল পর্যন্ত।
১. আত্-তা‘লীকাহ ফি ফুরু‘ইল মাজহাব — এটি ডাকাতরা তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, পরে আবার ফিরিয়ে দেয়।
২. আল-মানখূল ফি উসূলিল ফিকহ।
দ্বিতীয় পর্যায় (৪৭৮ — ৪৮৮ হি.)
১. আল-বাসীত ফি ফুরু‘ইল মাজহাব — ইবনে খাল্লিকান বলেন, ইসলামে এর মতো গ্রন্থ রচিত হয়নি।
২. আল-ওয়াসীত (আল-বাসীত-এর সংক্ষিপ্তসার)
৩. আল-ওয়াজীয
৪. খুলাসাতুল মুখতাসার ওয়া নাকাওয়াতুল মু‘তাসার (বা ‘খুলাসা’ — শাফেয়ি ফিকহ বিষয়ক)
৫. আল-মুনতাহাল ফি ইলমিল জাদাল (বিতর্ক ও মতভেদ বিষয়ক)
৬. মা’আখিযুল খিলাফ
৭. তাহসীনুল মা’আখিয ফি ইলমিল খিলাফ
৮. আল-মাবাদী ওয়াল গায়াত ফি উসূলিল ফিকহ
৯. শিফাউল গালিল (কিয়াস ও ইল্লত বিষয়ে)
১০. ইবনে তাশফিনের জন্য ফতোয়া (গাজ্জালির ফতোয়ার অন্তর্ভুক্ত)
১১. আল-ফাতওয়া আল-ইয়াজিদিয়্যাহ (ইয়াজিদ ইবনে মু‘আবিয়াকে কাফের বলার বিধান সম্পর্কে)
১২. মাকাসিদুল ফালাসিফা (দর্শনের মূলনীতি ব্যাখ্যা)
১৩. তাহাফুতুল ফালাসিফা
১৪. মিয়ারুল ইলম (তাহাফুত লেখার পরে এবং দামেস্কে সফরের পূর্বে রচিত)
১৫. মিয়ারুল উকূল
১৬. মিহাক্কুন নজর ফিল মানতিক — ইমাম যাহাবি উল্লেখ করেছেন, এটি তিনি দামেস্কে রচনা করেন
১৭. মিযানুল আকল
১৮. আল-মুস্তাযহিরি (বাতেনিয়া মতবাদের প্রতিবাদে)
১৯. হুজ্জাতুল হক (বাতেনিয়া মতবাদের অসারতা প্রমাণে)
২০. কাওয়াসিমুল বাতেনিয়া (তাদের সন্দেহের জবাব)
২১. আল-ইকতিসাদ ফিল ই‘তিকাদ
২২. আর-রিসালাতুল কুদসিয়্যা ফিল আকায়িদ
২৩. আল-মা’আরিফুল আকলিয়্যা ওয়াল আসরারুল ইলাহিয়্যা
এই পর্যায়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ এগুলো।
তৃতীয় পর্যায় (৪৮৮ — ৪৯৯ হি.)
এই পর্যায়ে তাঁর বহু গ্রন্থ রচিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
১. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন
চতুর্থ পর্যায় (৪৯৯ — ৫০৩ হি.)
এই পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ—
১. আল-মুনকিয মিনাদ্দালাল
২. আল-মুস্তাসফা ফি উসূলিল ফিকহ
শেষ পর্যায় (৫০৩ — ৫০৫ হি.)
১. মিনহাজুল আবিদিন (জুহদ, আখলাক ও ইবাদত বিষয়ক)
২. ইলজামুল আওয়াম ‘আন ইলমিল কালাম — এটি তাঁর শেষ রচনা (৫০৫ হি.)[17]
শিয়া বাতেনিয়াদের প্রতি ইমাম গাজ্জালি (রহ.)’র অবস্থান:
নিজামিয়া মাদরাসাগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সুন্নি আশআরী মতবাদের বিস্তার এবং শিয়া বাতেনিয়া চিন্তাধারার প্রভাব হ্রাস করা। এই ক্ষেত্রে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিশেষভাবে ইসমাঈলিয়া বাতেনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং এ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো ‘ফাদায়িহুল বাতেনিয়া’, যা তিনি ৪৮৭ হিজরিতে খলিফা মুস্তাযহির বিল্লাহর নির্দেশে রচনা করেন।
তিনি এমন সময়ে এই কাজ করেন, যখন বাতেনিদের প্রভাব পারস্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। তাদের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিত্ব।
‘ফাদায়িহুল বাতেনিয়া’ গ্রন্থটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে বাতেনিদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় অংশে খলিফা মুস্তাযহির বিল্লাহর খেলাফতের বৈধতা প্রমাণ করা হয়েছে। এতে তাদের উৎপত্তি, বিশ্বাস, উদ্দেশ্য এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।[18]
গাজ্জালির রচনায় রাজনৈতিক মাত্রা:
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-কে সুন্নি সেলজুক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না; বরং সেলজুকদের সঙ্গে ফাতেমীয় ইসমাঈলিয়া বাতেনিয়াদের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। নির্জন জীবন গ্রহণের পূর্বে তিনি কার্যত রাষ্ট্রের আদর্শিক দার্শনিক হিসেবে কাজ করেন এবং অল্প বয়সেই সেলজুক উজির নিজামুল মুলকের নিকটবর্তী হয়ে ওঠেন।
সেলজুক রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল হাসান ইবনে সাব্বাহর নেতৃত্বাধীন ইসমাঈলিয়া বাতেনিয়া গোষ্ঠী। তারা রাজনৈতিকভাবে ‘ইমাম’ বা ‘শিক্ষক’ এর অপরিহার্যতার ধারণা প্রচার করত।
ইসমাঈলিয়া মতবাদ ছিল ধর্মীয়, দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। তাই তাদের খণ্ডন করতে গিয়ে গাজ্জালি (রহ.) দর্শনেরও সমালোচনা করেন। বিশেষ করে তিনি নব-প্লেটোনিক দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, যা সে সময় বাতেনিদের তাত্ত্বিক ভিত্তি জুগিয়েছিল।
এই কারণেই গাজ্জালি (রহ.) দর্শনের বিরুদ্ধে ‘তাহাফুতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাতেনিদের অনেক মতবাদ; বিশেষ করে আখিরাত ও পুনরুত্থান সংক্রান্ত ধারণা—দার্শনিকদের মতবাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে দার্শনিকরা বাতেনিদের শক্তিশালী বৌদ্ধিক সমর্থক হয়ে উঠেছিল। এভাবে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বাতেনিয়া মতবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিভিত্তিক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন।[19]
দর্শন সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এঁর অবস্থান:
দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর পূর্ববর্তী সকল আলেম থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর পূর্বে যারা দর্শনের মোকাবিলা করেছেন, তারা মূলত ইসলামের আকিদা ও বিশ্বাস রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতেন। দর্শন যখন ইসলামের ওপর আক্রমণ চালাত, তখন তারা ইসলামের পক্ষে সাফাই গাইতেন, উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডন করতেন এবং ইসলামি বিশ্বাস ও তত্ত্বসমূহকে ব্যাখ্যা ও যুক্তির মাধ্যমে সমর্থন করার চেষ্টা করতেন।
এভাবে ‘ইলমুল কালাম’ একটি ঢালের মতো কাজ করত; যা দর্শনের আক্রমণ প্রতিহত করত এবং ইসলামি আকিদাকে সুরক্ষিত রাখত। কিন্তু কালামবিদদের মধ্যে কেউ-ই দর্শনের গভীরে প্রবেশ করে তার নিজস্ব অঙ্গনে দাঁড়িয়ে সরাসরি আক্রমণ করার সাহস করেননি। কারণ, তারা দর্শনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় তেমন গভীরভাবে দক্ষ ছিলেন না এবং দর্শনের মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞানে উন্নীত ছিলেন না। ফলে তাদের অবস্থান ছিল কেবল আত্মরক্ষামূলক। আর আত্মরক্ষামূলক অবস্থান সবসময় তুলনামূলক দুর্বল হয়ে থাকে।
কিন্তু ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। তিনি দর্শনকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন, তা বিশ্লেষণ করেন এবং গবেষণার ভিত্তিতে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি শক্তিশালী যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দর্শনের ওপর তীব্র আক্রমণ চালান। যে যুক্তি ছিল দর্শনের মতোই শক্তিশালী এবং যার পেছনে ছিল দার্শনিকদের মতো গভীর চিন্তাশক্তি।
এর ফলে দর্শনকে আত্মপক্ষ সমর্থনের অবস্থানে দাঁড়াতে হয় এবং দার্শনিকদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য হতে হয়। ধর্ম ও দর্শনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর মাধ্যমে ইসলামি আকিদার এক বড়ো বিজয় অর্জিত হয়; মুসলমানদের অন্তরে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে এবং দর্শনের প্রতি যে ভীতি ও বুদ্ধিভিত্তিক আধিপত্য ছিল—তা অনেকাংশে দূর হয়ে যায়।[20]
ইমাম গাজ্জালি ও তাসাউফ:
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, তাসাউফ ইসলামের উদ্ভূত শরয়ি বিদ্যাগুলোর একটি। এর মূল ভিত্তি হলো— ইবাদতে নিমগ্ন থাকা, আল্লাহ তায়ালার দিকে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করা, দুনিয়ার চাকচিক্য ও অলংকার থেকে বিমুখ হওয়া এবং মানুষের কোলাহল থেকে নির্জনে আল্লাহমুখী জীবন গড়ে তোলা।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো মূলত সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনদের মধ্যেই ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দী থেকে যখন মানুষের মধ্যে দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন যারা ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক মনোনিবেশ করতেন, তারা বিশেষভাবে ‘সুফি বা ‘মুতাসাওয়িফা’ নামে পরিচিত হতে শুরু করেন।
সম্ভবত এই পরিভাষাটি বাস্তবতার প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল, যখন ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা আলাদা পরিচয় লাভ করতে শুরু করে। আগে ‘ফিকহ’ শব্দটি তাসাউফসহ সব ধরনের জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করত। কিন্তু পরবর্তীতে ফিকহের ধারণা সীমাবদ্ধ হয়ে বাহ্যিক ইবাদত ও লেনদেন বিষয়ক বিধানে সীমিত হয়ে গেলে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন অনুভব করে। তখনই ‘তাসাউফ’ নামে এই শাখার আত্মপ্রকাশ ঘটে।
এই তাসাউফের মূল উপাদানগুলো হলো—
১. উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা।
২. দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি (যা আক্ষরিক দারিদ্র্য বোঝায় না)।
৩. অধিক ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা।
৪. ইলমের সঙ্গে ইখলাস ও আমলের সমন্বয়।[21]
আধ্যাত্মিকতার পথের যাত্রী:
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর জীবনে যে গভীর আত্মিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তার মাধ্যমে তিনি নফসের রোগ, যেমন খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা, পদমর্যাদা, নেতৃত্ব ও দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা— এসব থেকে মুক্তি লাভ করেন। আল্লাহর সাহায্যে তিনি এগুলো অতিক্রম করার পর তাসাউফের পথ গ্রহণ করেন। তবে এ পথ ছিল দীর্ঘ সাধনা ও গভীর চিন্তার ফল।
তিনি নিজেই তাঁর এই পথচলার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “আমি তাদের গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন শুরু করি। যেমন আবু তালিব মাক্কী (রহ.)-এর কুতুল কুলুব, হারিস মুহাসিবী (রহ.)-এর রচনাসমূহ এবং জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-সহ প্রমুখ মনীষীদের বিচ্ছিন্ন বাণীসমূহ। তখন আমি নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করলাম যে, তাঁরা শুধু কথার মানুষ নন; বরং আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে যা লাভ করা সম্ভব ছিল, তা আমি অর্জন করেছিলাম; এখন যা অবশিষ্ট আছে তা কেবল শুনে বা পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়; বরং তা অর্জিত হয় আত্মিক অভিজ্ঞতা ও সাধনার মাধ্যমে।
আমার কাছে তখন স্পষ্ট হয়ে উঠল— আখিরাতের সৌভাগ্য লাভের একমাত্র উপায় হলো তাকওয়া অবলম্বন করা এবং নফসের কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে সংযত রাখা। আর এর মূল হলো—দুনিয়ার সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করা, প্রতারণার এই ভুবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, স্থায়ী জীবনের আবাসের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং সম্পূর্ণ মনোযোগ আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ করা। আর এটি সম্ভব নয়— যতক্ষণ পর্যন্ত সম্মান, সম্পদ ও পার্থিব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত না করা যায়।
এরপর আমি নিজের অবস্থা পর্যালোচনা করলাম। দেখলাম আমি নানান পার্থিব বন্ধনে আবদ্ধ। চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে রেখেছে দুনিয়ার আকর্ষণ। আমার কাজগুলো পর্যবেক্ষণ করলাম। এর মধ্যে সর্বোত্তম ছিল শিক্ষাদান। কিন্তু দেখলাম, সেখানে আমি এমন সব জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত আছি, যা আখিরাতের পথে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বা উপকারী নয়।
এরপর আমি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমার নিয়ত পর্যালোচনা করলাম। দেখলাম তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং মর্যাদা অর্জন ও খ্যাতি বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এর মূল প্রেরণা। তখন আমি নিশ্চিত হলাম, আমি যেন ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি; আমি আগুনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। যদি আমি নিজের অবস্থা সংশোধনে মনোযোগী না হই, তবে আমার পরিণতি ভয়াবহ হবে।
এই চিন্তা আমাকে দীর্ঘদিন ব্যতিব্যস্ত করে রাখল। তখনও আমার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল। কখনো আমি বাগদাদ ত্যাগের দৃঢ় সংকল্প করতাম, আবার কখনো তা ভেঙে ফেলতাম। এক পা এগিয়ে যেতাম, আবার এক পা পিছিয়ে আসতাম। সকালে আখিরাতের পথে চলার প্রবল ইচ্ছা জাগত, আর সন্ধ্যানাগাদ দুনিয়ার কামনা-বাসনা এসে সেই ইচ্ছাকে দুর্বল করে দিত।
দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাকে শৃঙ্খলের মতো বেঁধে রাখতে চাইত, আর ইমানের আহ্বান আমাকে ডাক দিত— ‘চলে যাও, চলে যাও!’ তখন মনে হলো— জীবনের সময় আর বেশি নেই, সামনে দীর্ঘ সফর অপেক্ষা করছে। তোমার জ্ঞান ও আমল সবই যেন লোকদেখানো ও ভ্রম মাত্র। এখন যদি আখিরাতের প্রস্তুতি না নাও, তবে কবে নেবে? এখন যদি এসব প্রতিবন্ধকতা দূর না করো, তবে কবে করবে?
এই অবস্থায় আমার অন্তরে দৃঢ় সংকল্প জাগল সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তখন শয়তান ফিরে এসে বলতে লাগল— এ অবস্থা সাময়িক, সাবধান! এর অনুসরণ করো না। কারণ তুমি যদি এ মর্যাদা, খ্যাতি, নিরাপদ অবস্থান ও সম্মান ত্যাগ করো, তবে পরে হয়তো আর ফিরে আসতে পারবে না। আমি প্রায় ছয় মাস ধরে দুনিয়ার কামনা-বাসনা এবং আখিরাতের আহ্বানের মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলাম। এর সূচনা হয়েছিল ৪৮৮ হিজরির রজব মাসে। এই মাসে এসে বিষয়টি আমার ইচ্ছার সীমা ছাড়িয়ে এক ধরনের বাধ্যতায় পরিণত হলো। আল্লাহ তায়ালা আমার জিহ্বাকে বন্ধ করে দিলেন, ফলে আমি পাঠদান থেকে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়লাম।
আমি চেষ্টা করতাম অন্তত একদিন পাঠদান করতে, যাতে আমার কাছে আসা ছাত্রদের মন রক্ষা করা যায়। কিন্তু আমার জিহ্বা একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারত না; কোনোভাবেই আমি কথা বলতে সক্ষম হতাম না।
অবশেষে যখন আমি নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করলাম এবং আমার নিজের ইচ্ছাশক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল, তখন আমি নিরুপায় মানুষের মতো আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় গ্রহণ করলাম, যার আর কোনো উপায় থাকে না। তখন সেই মহান সত্তা আমার দোয়া কবুল করলেন, যিনি নিরুপায় মানুষের ডাকে সাড়া দেন। তিনি আমার অন্তরকে সহজ করে দিলেন। মর্যাদা, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও বন্ধু-বান্ধব সবকিছু থেকে বিমুখ হওয়ার জন্য।”[22]
পীরের সোপান:
রুহানি প্রশান্তি ও আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য একজন দূরদর্শী ও পরিপূর্ণ শায়খের সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি হজরত সাইয়্যিদ আবু আলী ফারমদী রহমতুল্লাহি আলাইহির সোহবত গ্রহণ করেন।
হজরত সাইয়্যিদ আবু আলী ফারমদী রহমতুল্লাহি আলাইহির আনুগত্যে প্রবেশ করার পর ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজের মর্যাদা ও উচ্চ অবস্থানকে পিছনে রেখে একনিষ্ঠ মুরিদের মতো আত্মসমর্পণ করেন এবং মুরিদ হিসেবে পূর্ণতার অধিকার আদায় করেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা তাজউদ্দিন আবদুল ওয়াহাব ইবনে আলী সুবকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহিকে তাঁর সম্মানিত শায়খ যেসব আওরাদ-ওয়াজিফা, নফল ইবাদত, রিয়াজত ও মুজাহাদার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি আখিরাতের সফলতা অর্জনের লক্ষ্যে সেগুলোর উপর দৃঢ়তার সাথে নিয়মিত আমল করতে থাকেন। অবশেষে সেই রিয়াজত ও মুজাহাদার যে উদ্দেশ্য ছিল, তা তিনি অর্জন করতে সক্ষম হন।[23]
এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, আমি আমার পরিবার-পরিজনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু সম্পদ রেখে শাম দেশে চলে যাই। সেখানে আমি প্রায় দুই বছর অবস্থান করি। তাসাউফের গ্রন্থসমূহে আমি যা পড়েছিলাম, তার আলোকে নির্জনবাস, রিয়াজত, মুজাহাদা, নফসের পরিশুদ্ধি, চরিত্র সংশোধন এবং আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে অন্তরের পবিত্রতা অর্জন— এসব ছাড়া সেখানে আমার আর কোনো কাজ ছিল না।
এই উদ্দেশ্যে আমি দীর্ঘ সময় দামেশকের জামে মসজিদে অবস্থান করি। ভোরবেলা মসজিদের মিনারে প্রবেশ করতাম এবং দরজা বন্ধ করে দিতাম; এরপর জিকির ও গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে যেতাম। অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওনা হই। সেখানে গিয়েও আমার এই অভ্যাস অব্যাহত থাকে। আমি ‘সাখরা’র (মসজিদুল আকসার পাশে অবস্থিত সোনালি গম্বুজবিশিষ্ট স্থান) ভেতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিতাম এবং ইবাদত ও মুজাহাদায় নিমগ্ন হয়ে যেতাম। [24]
মুজাহাদা থেকে কী অর্জিত হয়?
তিনি বলেন, “যখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, আমি সুফিয়ায়ে কেরামের কাতারে শামিল হব এবং তারা যে মারিফতের পেয়ালা পান করেন, আমিও সেখান থেকে কিছু পান করব, তখন আমি নিজের নফসের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, তার উপর বহু পর্দা জমে আছে এবং আমার কোনো শায়খও নেই। তখন আমি নির্জনবাস গ্রহণ করলাম এবং চল্লিশ দিন রিয়াজত ও মুজাহাদায় লিপ্ত থাকলাম।
অবশেষে আমার উপর এমন এক জ্ঞান উন্মোচিত হলো, যা আগে আমার কাছে ছিল না। আমি যত জ্ঞান জানতাম, তার তুলনায় এ জ্ঞান ছিল অধিক সূক্ষ্ম ও পবিত্র। যখন আমি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলাম, তখন বুঝলাম— এটি আসলে ফিকহি শক্তি (কুওয়তে ফিকহিয়া)।
এরপর আমি আবার নির্জনবাস গ্রহণ করলাম এবং আরও চল্লিশ দিন রিয়াজত ও মুজাহাদা করলাম। তখন আমার উপর আরেকটি জ্ঞান প্রকাশ পেল, যা অন্যান্য সব জ্ঞানের তুলনায় আরও উৎকৃষ্ট ছিল। প্রথমে আমি এতে খুব আনন্দিত হলাম; কিন্তু যখন গভীরভাবে চিন্তা করলাম, তখন বুঝলাম— এটি মূলত চিন্তা ও বিশ্লেষণের শক্তি (নজর ও ফিকরের ক্ষমতা)।
এরপর আমি আবার নির্জনবাসে চলে গেলাম এবং চল্লিশ দিন রিয়াজত ও মুজাহাদায় নিমগ্ন থাকলাম। তখন আমার উপর আরেকটি জ্ঞান প্রকাশ পেল, যা পূর্বের সব জ্ঞানের তুলনায় আরও পবিত্র ও উজ্জ্বল ছিল। যখন আমি এতে গভীরভাবে চিন্তা করলাম, তখন বুঝলাম— এটি সেই শক্তি, যা চূড়ান্ত জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। তবে আমি তখনও ‘ইলমে লাদুন্নি’র অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারিনি।
তখন আমি উপলব্ধি করলাম, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মার পবিত্রতা সম্পর্কে আলোচনা করা চাঁদের কালো দাগ নিয়ে লেখার মতো নয়; বরং অন্তরের রোগ ও আধ্যাত্মিক দুর্বলতাগুলো নিয়ে আলোচনা করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।[25]
তাঁর জুহদ:
কাজি আবু বকর ইবনে আরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি এক অঞ্চলে হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দেখলাম। তিনি একটি কম্বল জড়িয়ে ছিলেন, হাতে একটি লাঠি এবং কাঁধে পানির পাত্র ছিল। অথচ আমি তাঁকে বাগদাদে এমন অবস্থায় দেখেছিলাম যে, তাঁর দরসের মজলিসে প্রায় চারশত আলেম ও মাশায়েখ উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন।
আমি তাঁর নিকটে গিয়ে সালাম জানালাম এবং বললাম— হে ইমাম, বাগদাদে আপনার শিক্ষা-দান কি এই অবস্থার চেয়ে উত্তম ছিল না? তিনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন এবং কবিতা আকারে নিজের অবস্থা ব্যক্ত করলেন, যার সারমর্ম হলো—
“যখন আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য কল্যাণের ইচ্ছা করলেন,
তখন আমি আমার নফসের চাহিদাগুলো পরিত্যাগ করলাম।
আমার জ্ঞানের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ছাত্রদের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে ছিল,
তাই আমি শিক্ষাদানও ছেড়ে দিলাম।
আমি উপলব্ধি করলাম যে, আমার সৌভাগ্য ও লক্ষ্য অর্জনের পথ হলো
দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি এবং নির্জনবাস।
অতএব, আমি দুনিয়া থেকে বিমুখতা ও নির্জনতা অবলম্বন করলাম।”[26]
জুহদ অবলম্বনের পর পোশাকের অবস্থা:
হজরত সাইয়্যিদুনা আবু মানসুর রাযজাজ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, যখন প্রথমবার হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি আলেমদের মর্যাদা ও জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় বাগদাদে প্রবেশ করেন, তখন আমরা তাঁর পোশাক ও বাহনের মূল্য যাচাই করে দেখি, তার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় পাঁচশো দিনার।
পরবর্তীতে যখন তিনি জুহদ ও তাকওয়া অবলম্বন করলেন, বাগদাদ ত্যাগ করলেন এবং বিভিন্ন স্থানে সফর করতে থাকলেন, এরপর পুনরায় যখন তিনি বাগদাদে ফিরে আসলেন, তখন আমরা তাঁর পোশাকের মূল্য যাচাই করি। এবার তার মূল্য দাঁড়ায় মাত্র পনের কিরাত। [27]
বুজুর্গের সোহবতে আল্লাহর দিদার লাভ:
হজরত সাইয়্যিদুনা কুতবুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আজদাবিলী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি সালেহিনদের আধ্যাত্মিক অবস্থা এবং আরিফগণের মাকাম সম্পর্কে সংশয় পোষণ করতাম। এমনকি কখনো কখনো তা অস্বীকারও করতাম। অবশেষে আমি খোরাসানে অবস্থানরত শায়খ হজরত সাইয়্যিদুনা ইউসুফ নাজ্জাজ রহমতুল্লাহি আলাইহির সোহবত গ্রহণ করি।
তিনি মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে আমার অন্তর পরিশুদ্ধ শুরু করেন। ফলে আমার উপরও ধীরে ধীরে রুহানি তাজাল্লিয়াত (আধ্যাত্মিক জ্যোতি) প্রকাশ পেতে থাকে।
একবার আমি স্বপ্নে আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সম্বোধন করে বলেন— ‘হে আবু হামিদ!’
আমি বললাম, ‘আমার সাথে কি আমার রব কথা বলছেন, না শয়তান?’
আল্লাহ তায়ালা বললেন, ‘আমি তোমারই আল্লাহ, যিনি তোমার ছয় দিককে পরিবেষ্টন করে আছেন। হে আবু হামিদ, তোমার কলমের কারুকাজ ছেড়ে দাও এবং সেই সম্প্রদায়ের সোহবত গ্রহণ করো, যাদের আমি দুনিয়ায় আমার রহমতের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছি। তারা আমার ভালোবাসার বিনিময়ে উভয় জগতের কল্যাণ লাভ করেছে।’
আমি বললাম, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তাদের ব্যাপারে আমার অন্তরে সুদৃঢ় সু-ধারণা সৃষ্টি না করবেন, ততক্ষণ আমি তা করতে পারবো না।’
আল্লাহ তায়ালা বললেন, ‘আমি তা দান করেছি। মনে রেখো, দুনিয়ার প্রতি তোমার ভালোবাসা এবং ব্যস্ততা তোমার ও তাদের মাঝে বাধা হয়ে আছে। অতএব দুনিয়াবি বিষয়গুলো থেকে তোমাকে অপমানিত করে বের করে দেবার আগে স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করো। আমি আমার পবিত্র সান্নিধ্য থেকে তোমার উপর নুরের বর্ষণ করেছি, সেই নুর গ্রহণ করো এবং সফল হও।’
ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এরপর আমি আনন্দ ও প্রশান্ত অবস্থায় জেগে উঠলাম এবং শায়খ ইউসুফ নাজ্জাজ রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে গিয়ে পুরো স্বপ্নটি বর্ণনা করলাম।
তিনি মৃদু হাসলেন এবং বললেন, “হে আবু হামিদ, এগুলো আমাদের সেই প্রাথমিক স্তর, যেগুলো আমরা অনেক আগেই অতিক্রম করেছি; বরং তুমি যদি আরও কিছুদিন আমার সোহবতে থাকো, তাহলে আমি আহমদি তায়ীদের সহায়তায় তোমার চোখে এমন বাছিরাতের সুরমা লাগিয়ে দেব যে, তুমি আরশ এবং তার আশেপাশের জগতও দেখতে পাবে। তারপরও তুমি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি সেই সত্তার সাক্ষাৎ লাভ করবে, যাকে দৃষ্টি ধারণ করতে পারে না।
তখন তোমার স্বভাব সব কলুষতা থেকে পবিত্র হয়ে যাবে, তোমার বুদ্ধি তূর পাহাড়ের উচ্চতাকে স্পর্শ করবে এবং তুমি আল্লাহ তায়ালার সম্বোধন শুনতে শুরু করবে— যেমন মুসা আলাইহিস সালাম শুনেছিলেন— إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ – নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, সমগ্র জগতের প্রতিপালক।[28]
ইলমে তাসাউফে ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর প্রভাব:
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.) তাসাউফের ওপর গভীর ও স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন, যা আজও বিদ্যমান। তিনি তাসাউফকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেন এবং এর জন্য এমন মানদণ্ড নির্ধারণ করেন, যা ভ্রান্তি ও অসত্যকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে এবং আত্মশুদ্ধির পথকে সহজ ও সুস্পষ্ট করে তোলে।
১. শরয়ি জ্ঞানের অপরিহার্যতা: গাজ্জালি (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেন— আখিরাতের পথিকের জন্য শরয়ি জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য। অথচ কিছু সুফির মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে, জ্ঞান নিজেই একটি পর্দা বা বাধা। এর বিপরীতে তিনি ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থের প্রথম অংশেই ‘ইলম’ অধ্যায়কে স্থান দেন এবং বলেন— প্রথম বাধাই হলো জ্ঞান, যা অতিক্রম করতে হবে।
তিনি মিনহাজুল আবেদিন গ্রন্থেও একই কথা বলেন। সফলতা কেবল জ্ঞান ও আমলের সমন্বয়েই অর্জিত হয়। আর আইয়্যুহাল ওয়ালাদ গ্রন্থে তিনি বলেন— জ্ঞান ছাড়া আমল বিভ্রান্তি, আর আমল ছাড়া জ্ঞান অর্থহীন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আলেমের দৃষ্টি সুফির চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম ও সঠিক হয়। তাঁর মতে, আলোর মতো জ্ঞান যখন হৃদয়ে প্রকাশ পায়, তখন তা সব বিভ্রান্তি দূর করে এবং মতভেদ দূর করে দেয়।
২. বাতেনি ব্যাখ্যার প্রত্যাখ্যান: ইমাম গাজ্জালি (রহ.) শরিয়তের নস (কুরআন ও হাদিস)-কে বাহ্যিক অর্থ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে গোপন ব্যাখ্যার মাধ্যমে অর্থ পরিবর্তন করার প্রবণতার কঠোর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন—যদি শরিয়তের স্পষ্ট অর্থকে কোনো দলিল, প্রমাণ বা প্রয়োজন ছাড়া বদলে ফেলা হয়, তাহলে তা কুরআন-হাদিসের প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেয়। কারণ, তখন শব্দের কোনো নির্ভরযোগ্যতা থাকে না এবং শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যও ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. তাসাউফকে নৈতিক ও বাস্তব জ্ঞানে রূপান্তর: তিনি তাসাউফকে কেবল আবেগ, আত্মিক উচ্ছ্বাস, বা অতিরঞ্জিত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে এনে একটি নৈতিক ও বাস্তব জ্ঞানের শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এটিকে এমন একটি বিদ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা হৃদয়ের রোগসমূহ নিরাময় করে, নফসের খারাপ গুণাবলি দূর করে এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থের কাঠামো লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর মূল উদ্দেশ্য দ্বিতীয়ার্ধে নিহিত। এটি দুই ভাগে বিভক্ত। মুহলিকাত তথা ধ্বংসকারী গুণাবলি, মুনজিয়াত তথা মুক্তিদানকারী গুণাবলি।
প্রতিটি ভাগে দশটি করে বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
‘মুহলিকাত’ অংশে এমন সব নিন্দনীয় চরিত্র আলোচনা করা হয়েছে, কুরআন যেগুলোকে পরিত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছে এবং যেগুলো থেকে আত্মাকে পবিত্র করা আবশ্যক। আর ‘মুনজিয়াত’ অংশে এমন সব প্রশংসনীয় গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো নেককার ও সিদ্দিকদের বৈশিষ্ট্য এবং যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।
গাজ্জালি (রহ.) সুফিদের কিছু অনির্দিষ্ট ও আবেগনির্ভর বর্ণনাকে সমালোচনা করেন এবং তাদের আধ্যাত্মিক অবস্থাগুলোকে শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেন। তিনি তাদের বক্তব্য ও আচরণকে ব্যাখ্যা, নিয়ন্ত্রণ ও সংযত করে একটি গ্রহণযোগ্য রূপ দেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সফল হন।
৪. জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) ধারণার সংশোধন: ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, জুহদ তাসাউফের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলেও এর অর্থ দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা নয়; বরং এর সঠিক ধারণা হলো শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত থাকা। তাঁর মতে কিছু সুফি এ ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করেছেন; এমনকি দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতায় শয়তান তাদের বিভ্রান্ত করেছে।
গাজ্জালি (রহ.) একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, প্রকৃত মুক্তিপ্রাপ্ত দল তারাই, যারা রসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবাদের পথ অনুসরণ করে। তাদের পদ্ধতি ছিল দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ না করা, শারীরিক কামনাকে একেবারে ধ্বংস না করা; বরং দুনিয়া থেকে শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করা এবং প্রবৃত্তিকে শরিয়ত ও বুদ্ধির সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি বলেন, মানুষ দুনিয়া থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করবে, শক্তি অর্জনের জন্য খাদ্য গ্রহণ, নিরাপত্তার জন্য বাসস্থান গ্রহণ, আবহাওয়ার কষ্ট থেকে বাঁচতে পোশাক গ্রহণ ইত্যাদি করবে।
এর উদ্দেশ্য হলো শরীরের প্রয়োজন পূরণ করে হৃদয়কে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করা। যখন অন্তর দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়, তখন মানুষ পূর্ণ মনোযোগে আল্লাহর স্মরণ ও চিন্তায় নিমগ্ন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণ দমনও করা যাবে না, আবার সম্পূর্ণ অনুসরণও করা যাবে না; বরং মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। মানুষ সর্বদা তার প্রবৃত্তির উপর নজর রাখবে এবং তাকওয়া ও পরহেজগারির সীমা অতিক্রম না করার চেষ্টা করবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ পথই ছিল সাহাবায়ে কেরামের জীবনধারা। তারা দুনিয়া ব্যবহার করতেন, কিন্তু দুনিয়ার জন্য নয়; বরং দ্বীনের জন্য। তারা না তো দুনিয়াকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিলেন, না তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। বরং তাদের জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। না অতিরঞ্জন, না অবহেলা; মধ্যপন্থাই ছিল তাদের আদর্শ। এটাই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য পথ।[29]
হজ আদায়:
ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি দীর্ঘ সময় শাম দেশে অবস্থান করার পর হজ করার নিয়ত করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন— এরপর আমার অন্তরে এই চিন্তা জাগ্রত হলো যে, এখন ফরয হজ আদায় করা উচিত। হজরত ইবরাহিম খলিলুল্লাহ (আলাইহিস সালাম)-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানসমূহ এবং মক্কা মুকাররমা জিয়ারত করার পর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে রুহানি ফয়েজ ও সাহায্য অর্জন করা প্রয়োজন। অতঃপর আমি হিজাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। [30]
বারেগাহে রিসালাতে মকবুলিয়ত:
হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম শাযেলি রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি ‘হিযবুল বাহর’-এর প্রণেতা এবং একজন মহান আরিফ বিল্লাহ, তিনি বর্ণনা করেন, আমি একবার ‘মসজিদুল আকসা’য় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, মসজিদের প্রাঙ্গণে একটি মহান মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে এবং অনেক মানুষ দলে দলে সেখানে প্রবেশ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা কারা?’ উত্তর দেওয়া হলো, ‘এরা হলেন নবী-রসুলগণ (আলাইহিমুস সালাম), যারা হজরত হুসাইন ইবনে মনসুর হাল্লাজের একটি বক্তব্যের ব্যাপারে তাঁর পক্ষে সুপারিশ করতে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়েছেন।’
আমি তাকিয়ে দেখলাম, সেই মঞ্চে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম সমাসীন রয়েছেন। আর সামনে বসে আছেন মহান নবীগণ—হজরত ইবরাহিম, হজরত মুসা, হজরত ঈসা এবং হজরত নুহ আলাইহিমুস সালাম। আমি তাঁদের জিয়ারত করতে লাগলাম এবং তাঁদের আলোচনা শুনছিলাম। এ সময় হজরত মুসা আলাইহিস সালাম আরজ করলেন, ‘আপনার হাদিস আছে, ‘আমার উম্মতের আলিমগণ বনী ইসরাঈলের নবীদের মতো।’ সুতরাং আমাকে এমন কাউকে দেখান।” তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করে দেখালেন হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালির দিকে।
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁকে একটি প্রশ্ন করলেন। ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি দশটি উত্তর দিলেন। তখন মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, ‘প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর হওয়া উচিত ছিল; একটি প্রশ্নের জন্য এত দীর্ঘ উত্তর কেন?’ তখন ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি আরজ করলেন, ‘যখন আল্লাহ তায়ালা আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে মুসা, তোমার ডান হাতে কী আছে?’ তখন শুধু বলাই যথেষ্ট ছিল ‘এটি আমার লাঠি’। কিন্তু আপনি তো তার বহু গুণ বর্ণনা করেছিলেন!’
আলিমগণ বলেন, এ যেন ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির পক্ষ থেকে হজরত মুসা আলাইহিস সালামের সাথে এক ধরনের আদবপূর্ণ ইশারা ছিল যে, গভীর মুহাব্বত ও আধ্যাত্মিক আলোচনার ক্ষেত্রে কথার বিস্তার নিন্দনীয় নয়; বরং তা ভালোবাসার প্রকাশও হতে পারে।[31]
তাঁর কারামাত:
১. বাদশাহ’র অবস্থার অবনতি: সুলতান আলী ইবনে ইউসুফ ইবনে তাশফিন ছিলেন একজন জ্ঞানী এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহির অনুসারী ছিলেন।
যখন ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির রচিত গ্রন্থসমূহ মাগরিব অঞ্চলে পৌঁছয়, তখন সুলতান ভুলভাবে ধারণা করেন যে, এসব গ্রন্থ শুধু দর্শনভিত্তিক (ফালসাফা) জ্ঞানে পরিপূর্ণ। যেহেতু তিনি কিছু দার্শনিক মতবাদ অপছন্দ করতেন, তাই তিনি ইমাম গাজ্জালির গ্রন্থসমূহ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন— যার কাছে এই গ্রন্থ থাকবে তাকে হত্যা করা হবে।
কিন্তু ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির কিতাবের প্রতি এমন আচরণ তার জন্য শুভ ফল বয়ে আনেনি। ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তার রাজ্যে অস্থিরতা ও ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশের বাহিনী তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। অবশেষে যখন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করেন, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন, “হে আল্লাহ, মুসলমানদের জন্য এমন একজন শক্তিশালী শাসক দান করুন, যিনি তাদের বিষয়সমূহ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন।”
পরবর্তীতে আবদুল মুমিন ইবনে আলী তার উপর বিজয় লাভ করেন এবং সুলতান আলী ইবনে ইউসুফ এই অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
২. তাঁর শানে বেয়াদবির পরিণতি: ইমাম তাজউদ্দিন সুবকী বলেন, মিশরের এক ফকিহ ইমাম গাজ্জালির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে স্বপ্নে ইমাম গাজ্জালিকে দেখেন। ইমাম গাজ্জালি তাকে বলেন, ‘চিন্তা করো না, সে আগামীকাল মারা যাবে।’ পরের দিন সেই ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় মজলিসে উপস্থিত ছিল, কিন্তু সভা থেকে ফেরার পথে ঘোড়া থেকে পড়ে যায় এবং মারা যায়।
৩. রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে ইমাম গাজ্জালির মর্যাদা: ইমাম ফখরুদ্দীন আবু বকর আশ-শাশি বলেন, আমাদের যুগে এক ব্যক্তি ইমাম গাজ্জালিকে গালাগালি করত ও তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করত। সে স্বপ্নে দেখল নবী করীম ﷺ হজরত আবু বকর সিদ্দিক এবং হজরত উমর ইবনে খাত্তাব এক জায়গায় উপস্থিত, আর ইমাম গাজ্জালি তাঁদের সামনে বসে আছেন। ইমাম গাজ্জালি ঐ লোক সম্পর্কে অভিযোগ করলে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘চাবুক নিয়ে আসো।’ অতঃপর তাকে ইমাম গাজ্জালির সম্মানে প্রহার করা হলো। ঘুম থেকে জাগার পর তার পিঠে চাবুকের চিহ্ন রয়ে যায় এবং সে অনুতপ্ত হয়ে মানুষের কাছে ঘটনাটি বলতে থাকে।[32]
৪. আবদুল্লাহ ইবনে আসআদ ইয়াফেয়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন যে, প্রসিদ্ধ মরক্কোর ফকিহ আবুল হাসান আলী ইবনে হিরযিম রহমতুল্লাহি আলাইহি শুরুতে ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন-এর কঠোর সমালোচনা করতেন। একবার তিনি বইটির কয়েকটি কপি সংগ্রহ করে জুমার দিন জামে মসজিদে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলার ইচ্ছা করেন।
কিন্তু সেই জুমার রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি জামে মসজিদে প্রবেশ করেছেন। হজরত মুহাম্মদ ﷺ মসজিদে তশরিফ রেখেছেন এবং তাঁর পাশে উপস্থিত আছেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক ও হজরত উমর ফারুক রাদ্বিআল্লাহু আনহুমা। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি। ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি তখন রসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে আরজ করলেন, “ইয়া রসুলাল্লাহ ﷺ এই ব্যক্তি আমার বিরোধিতা করছে। যদি তার ধারণা সঠিক হয়, তবে আমি আল্লাহর দরবারে তাওবা করছি। আর যদি আমার অবস্থান আপনার বরকত ও সুন্নতের অনুসরণের ফলে সঠিক হয়, তবে আমার অধিকার আমাকে পাইয়ে দিন।”
এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন হাতে নিয়ে একে একে পুরো বইটি পর্যালোচনা করলেন। তারপর ইরশাদ করলেন, “আল্লাহর কসম, এটি অত্যন্ত উত্তম গ্রন্থ।” এরপর হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিআল্লাহু আনহু বইটি দেখে বললেন, “সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই এটি অত্যন্ত উত্তম।” পরে হজরত উমর ফারুক রাদ্বিআল্লাহু আনহুও একই কথা বললেন। এরপর রসুলুল্লাহ ﷺ ফকিহ আলী ইবনে হিরযিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। যখন পাঁচ চাবুক মারা হলো, তখন হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিআল্লাহু আনহু সুপারিশ করে বললেন, “ইয়া রসুলাল্লাহ ﷺ সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন যে এই বই আপনার সুন্নতের বিরুদ্ধে; তাই ভুল করেছেন।” তখন ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি এতে সন্তুষ্ট হলেন এবং সুপারিশ গ্রহণ করা হলো।
আলী ইবনে হিরযিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন ঘুম থেকে জাগলেন, দেখলেন তাঁর পিঠে চাবুকের চিহ্ন বিদ্যমান। তিনি এই স্বপ্ন তাঁর সঙ্গীদের বললেন, আল্লাহর দরবারে তাওবা করলেন এবং নিজের এই কাজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় এক মাস পর্যন্ত তিনি সেই ব্যথা অনুভব করতে থাকেন।
এই সময় তিনি বিনীতভাবে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে থাকেন এবং রসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করেন। অবশেষে আবার স্বপ্নে রসুলুল্লাহ ﷺ এর জিয়ারত লাভ করেন। তখন রসুলুল্লাহ ﷺ হাত মুবারক তাঁর পিঠে বুলিয়ে দিলেন। সাথে সাথে ব্যথা দূর হয়ে গেল এবং তিনি আল্লাহর হুকুমে ক্ষমা ও শাফায়াত লাভ করলেন।
এরপর থেকে তিনি ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন পড়াকে নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দরজা খুলে দেন, তিনি আল্লাহর মারেফাতের প্রাচুর্য লাভ করেন, বড় বড় মাশায়েখদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হন এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার জ্ঞানের অধিকারী হয়ে ওঠেন।[33]
৫. ওফাতের পর এক কারামত: হজরত সাইয়্যিদুনা ইবনে আরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গ্রন্থ ‘রুহুল কুদুস ফি মুনাসাহাতিন নুফুস’-এ হজরত আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাইন ইয়াবুরি ইশবিলি রহমতুল্লাহি আলাইহির অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি আল্লাহর অলিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এক রাতে তিনি ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির বিরুদ্ধে আবুল কাসিম ইবনে হামদিনের লেখা একটি বই পড়ছিলেন। সেই সময় হঠাৎ তাঁর দৃষ্টিশক্তি চলে যায়।
তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে কান্নাকাটি করেন এবং শপথ করেন যে, এরপর আর কখনো তিনি সেই বই পড়বেন না এবং তা নিজের কাছ থেকেও দূরে রাখবেন। এরপরই অলৌকিকভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি পুনরায় ফিরে আসে। এটিকে ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির একটি কারামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁর ইন্তেকালের পর হজরত আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাইন ইয়াবুরি ইশবিলির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।[34]
অতুলনীয় শান ও আজমত:
হজরত আবুল ফাতাহ আমির ইবনে নাজা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন—
আমি ৫৪৫ হিজরির ১৪ শাওয়াল, রবিবার মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলাম। সেখানে আমার তন্দ্রা এলো। এই অবস্থায় আমি হজরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জিয়ারত লাভ করলাম। আমি দেখলাম, রসুলুল্লাহ ﷺ সুন্দর জুব্বা ও পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় আছেন। এরপর দেখলাম ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল— এই চার ইমাম একে একে তাঁদের মাজহাব পেশ করলেন। রসুলুল্লাহ ﷺ প্রত্যেকটির সত্যতা স্বীকার করলেন।
এরপর এক ভ্রান্ত মতাবলম্বী নেতা ওই পবিত্র মজলিসে প্রবেশ করতে চাইলে রসুলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশে তাকে অপমানের সাথে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আমি আরজ করলাম, ইয়া রসুলাল্লাহ ﷺ আমার কাছে ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ নামক কিতাব আছে, যাতে আমার ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা বর্ণিত হয়েছে। অনুমতি দিলে আমি পড়ে শুনাই।
অনুমতি পেয়ে আমি পড়া শুরু করলাম— بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ. كِتَابُ قَوَاعِدِ الْعَقَائِدِ وَفِيهِ أَرْبَعَةُ فُصُولٍ الْفَصْلُ الْأَوَّلُ فِي تَرْجَمَةِ عَقِيدَةِ أَهْلِ السُّنَّةِ – আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময় অসীম দয়ালু । আকিদার মৌলিক নীতিমালার কিতাব, এতে চারটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়: আহলুস সুন্নাহর আকিদার বর্ণনা।
এরপর আমি পড়লাম— وَأَنَّهُ تَعَالَى بَعَثَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الْقُرَشِيَّ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى كَافَّةِ الْعَرَبِ وَالْعَجَمِ، وَالْجِنِّ وَالْإِنْسِ – আল্লাহ তায়ালা উম্মী কুরাইশি নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে সমগ্র আরব ও অনারব, জিন ও মানবজাতির কাছে প্রেরণ করেছেন। এখানে পৌঁছলে আমি রসুলুল্লাহ ﷺ এর চেহারায় আনন্দের লক্ষণ দেখতে পেলাম।
এরপর রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, গাজ্জালি কোথায়?
তখন ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি উপস্থিত হয়ে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ ﷺ গাজ্জালি হাজির।
তিনি সালাম পেশ করলেন। রসুলুল্লাহ ﷺ সালামের জবাব দিয়ে নিজের মুবারক হাত বাড়িয়ে দিলেন। তখন ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই হাত মুবারক চুম্বন করলেন এবং বরকত লাভ করলেন।
বর্ণনাকারী বলেন, “আমি সেদিন রসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে অত্যন্ত আনন্দিত দেখেছি। আমার তন্দ্রা শেষ হলে আনন্দে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল।” তিনি আরও বলেন, চার ইমামের মাজহাবের সত্যতা এবং ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির আকিদাকে গ্রহণ করা— এটি আল্লাহর এক মহান নিয়ামত। আমরা আল্লাহর কাছে সুন্নাহভিত্তিক জীবন ও ঈমানের সাথে মৃত্যুর দোয়া করি।[35]
হজরত সাইয়্যিদ আরিফে কাবীর, কুতবে রব্বানী আহমদ সাইয়্যাদ ইয়ামানী (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আকাশের দরজাগুলো খুলে গেছে। আকাশ থেকে একদল ফেরেশতা অবতরণ করলেন। তাঁদের পরনে ছিল সবুজ বর্ণের জান্নাতি পোশাক এবং সঙ্গে ছিল বাহন। তাঁরা একটি কবরের পাশে এসে দাঁড়ালেন। এরপর সেই কবরবাসীকে বের করে তাঁকে জান্নাতি পোশাক পরানো হলো এবং বাহনে আরোহন করানো হলো।
এরপর তাঁরা তাঁকে নিয়ে একের পর এক আসমান অতিক্রম করতে লাগলেন। এভাবে তিনি সবগুলো আসমান পেরিয়ে অবশেষে ৭০টি হিজাব (পর্দা) অতিক্রম করলেন। আমি সেই হিজাবগুলো এবং তার শেষ কোথায়, তা বুঝতে পারলাম না। অবশেষে আমি যখন জানতে চাইলাম, তখন আমাকে বলা হলো, “তিনি হলেন ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি (রহ.)।” এই স্বপ্ন থেকে বোঝা যায়, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) আল্লাহ তায়ালার দরবারে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা ও বিশেষ নৈকট্যের অধিকারী ছিলেন।[36]
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সম্পর্কে তাঁর উস্তাদ, সমসাময়িক ও পরবর্তী যুগের আলেমদের মূল্যায়ন ও প্রশংসা:
ইমাম ইবনে সুবকী (রহ.) বর্ণনা করেন যে, আধ্যাত্মিক জগতের মহান সাধক ও নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ অলি শায়খ আবুল হাসান আশ-শাজিলী (রহ.) স্বপ্নে রসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখেন। তিনি দেখতে পান, রসসুলুল্লাহ ﷺ হজরত মুসা (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)-এর সামনে ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে গর্ব করছেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করছেন, “তোমাদের উম্মতের মধ্যে কি এমন কোনো মহান আলেম আছে?”
উভয় নবী (আ.) উত্তরে বলেন, “না।”
নিজ যুগের খ্যাতিমান আধ্যাত্মিক সাধক আবুল আব্বাস আল-মুরসী (রহ.)-কে যখন ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন, “আমি তাঁর জন্য সর্বোচ্চ সত্যনিষ্ঠতা ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সাক্ষ্য দিচ্ছি।”
আধ্যাত্মিক জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব শায়খ মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবী (রহ.)-ও তাঁর মর্যাদার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে সূক্ষ্ম ‘সামঞ্জস্য ও সম্পর্ক’ উপলব্ধি করতেন। একবার বায়তুল মুকাদ্দাসে একটি ঘুঘু ও একটি কাককে পাশাপাশি অবস্থায় দেখে তিনি বলেন, “তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ সামঞ্জস্য বিদ্যমান।”
এরপর ইশারা করলে দেখা যায়, উভয় প্রাণীই শারীরিকভাবে অক্ষম (খোঁড়া) ছিল। তিনি বলেন, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সম্পর্কের এই সূক্ষ্মতা কেবল আধ্যাত্মিক উন্মোচন (কাশফ) ও মালাকূতি জগতের দর্শনের মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়।
কিছু আধ্যাত্মিক মনীষীর মতে, তাসাওউফ ও আধ্যাত্মিকতার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো—
১. জ্ঞানের কুতুব: হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (রহ.)
২. আহওয়াল বা আধ্যাত্মিক অবস্থার কুতুব: আবু ইয়াজিদ বিস্তামী (রহ.)
৩. মাকামাতের কুতুব: শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)
শায়খ আব্দুল্লাহ বাহদাদ (রহ.)-এর এক বাণীতে বলা হয়েছে— “এই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পোশাক বুনেছেন ইমাম গাজ্জালি (রহ.), তা পরিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ করেছেন শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বা ইমাম শা‘রানী (রহ.), আর আমরা কেবল তা সেলাই ও অলঙ্কৃত করেছি। কিন্তু আজ তা পরিধান করার যোগ্য মানুষ কোথায়?”
এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ও অন্যান্য মহান সাধকগণ লাদুন্নি জ্ঞানের এমন উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন, যা সমসাময়িকদের অতিক্রম করেছিল।
ইবনে সুবকী (রহ.) বলেন, “মানুষ তাঁর সম্পর্কে কী-ই বা বলবে, তাঁর নাম ও খ্যাতি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু যারা তাঁর রচনাবলি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন, তারা জানেন তাঁর প্রকৃত মর্যাদা তাঁর প্রসিদ্ধির চেয়েও অনেক মহান। উচ্চতর ব্যক্তিত্বের মর্যাদা বুঝতে হলে পর্যবেক্ষকেরও উচ্চস্তরের বুদ্ধি ও জ্ঞান প্রয়োজন। যেহেতু ইমাম গাজ্জালির জ্ঞান চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিল, তাই তাঁর প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন শাফেয়ী (রহ.)-এর মর্যাদা মুযানী (রহ.) তাঁর নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী বুঝেছিলেন, তেমনি প্রত্যেকেই গাজ্জালি (রহ.)-কে কেবল নিজের জ্ঞানের সীমা অনুযায়ীই উপলব্ধি করতে পারে।”
তাঁর ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া নিশাপুরী (রহ.) বলেন, “ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর প্রকৃত মর্যাদা কেবল সেই ব্যক্তি অনুধাবন করতে পারে, যার বুদ্ধি ও জ্ঞান পূর্ণতার নিকট পৌঁছেছে।”
ইমামুল হারামাইন আল-জুয়াইনী (রহ.) তাঁর ছাত্র সম্পর্কে বলেন, “গাজ্জালি এক অতল সমুদ্র, যার গভীরতায় প্রবেশকারী ডুবে যায়।”
হাফিজ আবু তাহির সিলাফি (রহ.) বর্ণনা করেন যে, ইমাম জুয়াইনী (রহ.) বলতেন, গভীর গবেষণায় শ্রেষ্ঠ ‘খাওয়াফি’ (আবু বকর আল-খাওয়াফি, যিনি গভীর গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিষয়ে অনন্য ছিলেন।), বিতর্ক ও যুক্তিতে শ্রেষ্ঠ ‘গাজ্জালি’ এবং বর্ণনার সৌন্দর্যে শ্রেষ্ঠ ‘বাক্কা’ (আবু বকর আল-বাক্কা, যিনি সুন্দর বর্ণনা বা বাচনিক শৈলীতে শ্রেষ্ঠ ছিলেন)।
ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানজগতের মহামনীষীদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) কেবল একজন দার্শনিক বা আলেম ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এমন এক সমুদ্র, যার গভীরতা অনুধাবন করতে হলে নিজেকেও জ্ঞানের শিখরে পৌঁছাতে হয়।[37]
মুর্শিদে কামেলের ২৫টি গুণাবলি:
হুজ্জাতুল ইসলাম হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) মুর্শিদে কামেল তথা পূর্ণাঙ্গ মুর্শিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন— রসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে যাকে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বানানো হবে, তার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত থাকা আবশ্যক। শুধু জ্ঞানী হলেই কেউ মুর্শিদ হতে পারে না; বরং এমন ব্যক্তি হওয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে বিশেষ কিছু গুণ একত্রে বিদ্যমান থাকে। এখানে সংক্ষেপে সেই গুণগুলো উল্লেখ করা হলো, যাতে কেউ অযোগ্য অবস্থায় নিজেকে মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক দাবি করতে না পারে।
১. দুনিয়ার ভালোবাসা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়েছেন।
২. এমন পূর্ণাঙ্গ মুর্শিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছেন, যার সিলসিলা রসুলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত পৌঁছে।
৩. আত্মশুদ্ধির সাধনা ও রিয়াজতে অভ্যস্ত হয়েছেন।
৪. আল্লাহ ও তাঁর রসুল ﷺ-এর নির্দেশ পালনে দৃঢ় এবং সুন্নাহ অনুসরণে অগ্রণী।
৫. অল্প আহার করেন।
৬. অল্প ঘুমান।
৭. অধিক নফল নামাজ আদায় করেন।
৮. অধিক নফল রোজা পালন করেন।
৯. অধিক দান-সদকা করেন।
১০. তাঁর স্বভাব-চরিত্রে সব উত্তম গুণাবলি বিদ্যমান থাকে।
১১. ধৈর্যশীল হন।
১২. কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হন।
১৩. আল্লাহর ওপর ভরসাশীল হন।
১৪. দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকিন) রাখেন।
১৫. দানশীল হন।
১৬. অল্পে সন্তুষ্ট (কানাআত) থাকেন।
১৭. আমানতদার হন।
১৮. জ্ঞানী হন।
১৯. লজ্জাশীল হন।
২০. হৃদয়ে প্রশান্তি ও স্থিরতা থাকে।
২১. সত্যবাদী হন।
২২. বিনয়ী ও নম্র হন।
২৩. গাম্ভীর্য ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন হন।
২৪. আল্লাহ ও রসুল ﷺ-এর আনুগত্যে দৃঢ় থাকেন।
২৫. এ ধরনের আরও বহু আধ্যাত্মিক গুণ তাঁর চরিত্র ও জীবনের অংশ হয়ে থাকে।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, এ ধরনের ব্যক্তি এমন নুর ও আধ্যাত্মিক আলো দ্বারা আলোকিত হন, যার অনুসরণ করা যায় এবং যিনি সত্যিকারের পথপ্রদর্শক হওয়ার যোগ্য হন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন পূর্ণাঙ্গ মুর্শিদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। আর যদি কেউ এই সৌভাগ্য লাভ করে যে, সে এমন মুর্শিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছে, তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো সেই মুর্শিদের প্রতি প্রকাশ্য ও অন্তরগত সর্বোচ্চ আদব ও সম্মান বজায় রাখা।[38]
বাণীর ঝরনাধারা:
১. দুনিয়া ও আখেরাত: গাজ্জালি (রহ.) এভাবে লিখেছেন, দুনিয়া হলো আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। এটি হেদায়েতের পথে একটি ধাপমাত্র। একে ‘দুনিয়া’ বলা হয়েছে, কারণ এটি আখেরাতের তুলনায় অতি নিকটবর্তী ও নিকৃষ্ট।
২. ইবাদতে আত্মপ্রশংসা: কখনো মানুষ ইবাদতের মাঝে নিজের অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করে এবং মনে করে, তার কারণে অন্যরাও উপকৃত হচ্ছে। অথচ সে জানে না, এই আত্মগর্বই যদি আল্লাহর নিকট অপছন্দ হয়, তবে সে ধ্বংসের যোগ্য হয়ে পড়ে।
৩. ইলমের আলো ও অন্তরের অন্ধকার: ইলমের আলো কোনো অভাবের কারণে অন্তর থেকে উঠে যায় না; বরং অন্তরের গুনাহ, অশুদ্ধতা ও দুনিয়ার আসক্তির কারণে তা ঢেকে যায়। অন্তর হলো পাত্রের মতো, যদি তা অন্য কিছুতে পূর্ণ থাকে, তবে সেখানে আল্লাহর নুর প্রবেশ করতে পারে না।
৪. সর্বোত্তম জ্ঞান: আল্লাহ তায়ালা, তাঁর গুণাবলি এবং তাঁর কার্যাবলি সম্পর্কে জ্ঞানই হলো সর্বোত্তম জ্ঞান। এই জ্ঞানের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত পূর্ণতা ও চূড়ান্ত সৌভাগ্য নিহিত।
৫. যিকর ও আধ্যাত্মিক উন্মোচন: জিকির অন্তর ও দৃষ্টিকে আলোকিত করে। এটি মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য। তাকওয়া হলো জিকিরের পথ, জিকির হলো কাশফের পথ, আর কাশফ হলো মহা সাফল্যের দরজা।
৬. আকল ও শরিয়তের সম্পর্ক: যারা মনে করে আকল (যুক্তি) ও শরিয়ত পরস্পর বিরোধী, তারা ভুলের মধ্যে আছে। প্রকৃতপক্ষে উভয়ই সত্যের ভিন্ন প্রকাশমাত্র। একটিকে বাদ দিলে অপরটি পূর্ণতা পায় না।
৭. প্রকৃত তাকওয়া: পরহেজগারী চেহারার কঠোরতা বা বাহ্যিক ভঙ্গিমায় নয়; বরং অন্তরের পবিত্রতায়। যে ব্যক্তি ইলম নিয়ে অহংকার করে, সে প্রকৃত মুত্তাকি নয়।
৮. ইলমে লাদুন্নি: ইলমে লাদুন্নি এমন এক জ্ঞান, যা কোনো বাহ্যিক মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা সরাসরি বান্দার অন্তরে দান করেন।
৯. আলেমদের হিংসা: যখন আলেমদের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তখন বুঝতে হবে তারা আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়াকে বেছে নিয়েছে।
১০. আমলের অনুসরণ: যে ব্যক্তি কোনো ইমামের অনুসারী বলে দাবি করে, কিন্তু তার আমল ও আদর্শ অনুসরণ করে না, কিয়ামতের দিন সেই ইমাম তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
১১. আত্মগর্বের অজ্ঞতা: সবচেয়ে বড় অজ্ঞ ব্যক্তি সে, যে নিজের বুদ্ধি ও জ্ঞান নিয়ে অহংকার করে। আর সবচেয়ে জ্ঞানী সে, যে সর্বদা নিজের নফসকে সন্দেহের চোখে দেখে।
১২. কুধারণার লক্ষণ: যে ব্যক্তি মানুষের দোষ অনুসন্ধান করে এবং সবার প্রতি কুধারণা পোষণ করে, তার অন্তরই মূলত কলুষিত। কারণ, মুমিনের হৃদয় সবসময় সবার প্রতি সৎ ও পরিষ্কার ধারণায় পূর্ণ থাকে।
১৩. নফস নিয়ন্ত্রণ: সুখের ভিত্তি হলো নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর চূড়ান্ত বিপর্যয় হলো নফসের দাসে পরিণত হওয়া।
১৪. শয়তানের ধোঁকা: যে ব্যক্তি শয়তানের কৌশল ও নফসের প্রতারণা সম্পর্কে অজ্ঞ, তার অধিকাংশ ইবাদতই ব্যর্থতায় পরিণত হয়। সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই হারায়।[39]
রিজিক ও অভাবমুক্তির জন্য ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর একটি বিশেষ দোয়া:
আধ্যাত্মিক সাধকগণ কঠিন অভাব-অনটনের সময় এই দোয়া পাঠ করে উপকৃত হয়েছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। দোয়াটি হলো— اللَّهُمَّ يَا غَنِيُّ يَا حَمِيدُ يَا مُبْدِئُ يَا مُعِيدُ يَا رَحِيمُ يَا وَدُودُ، أَغْنِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَبِطَاعَتِكَ عَنْ مَعْصِيَتِكَ، وَبِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ.
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইয়া গনিয়্যু, ইয়া হামীদু, ইয়া মুবদি‘উ, ইয়া মু‘ঈদু, ইয়া রাহীমু, ইয়া ওয়াদূদু, আগ্নিনী বিহালালিকা ‘আন হারামিকা, ওয়া বিত্বা‘তিকা ‘আন মা‘সিয়াতিক, ওয়া বিফাদ্বলিকা ‘আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: হে আল্লাহ, হে সর্বস্ব থেকে অমুখাপেক্ষী, হে প্রশংসার যোগ্য, হে সূচনাকারী, হে পুনরাবর্তনকারী, হে পরম দয়ালু, হে মহাবান্ধব, আপনি আমাকে আপনার হালাল রিজিকের মাধ্যমে হারাম থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিন, আপনার আনুগত্যের মাধ্যমে পাপ থেকে দূরে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহের মাধ্যমে আপন ছাড়া সকলের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত করুন।
ফজিলত: যে ব্যক্তি প্রতি জুমার নামাজের পর নিয়মিত এই দোয়া পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে মানুষের মুখাপেক্ষীতা থেকে মুক্ত রাখবেন এবং এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।[40]
হাদিস চর্চা ও জীবনের শেষ দিনগুলো:
আবদুল গাফির ফারিসী বলেন, ইমাম গাজ্জালির জীবনের শেষ সময়ের বিশেষত্ব ছিল— হাদিস শাস্ত্রের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ, হাদিস বিশারদদের মজলিসে নিয়মিত উপস্থিতি এবং সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে অতি অল্প দিনেই এই শাস্ত্রেও তিনি সকলকে ছাড়িয়ে যেতেন। তবে তাঁর পক্ষে হাদিস বর্ণনা (রেওয়ায়েত) করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি কেবল কন্যা সন্তান রেখে গেছেন। তাঁর পৈতৃক সম্পদ ও নিজস্ব উপার্জন মিলিয়ে যা ছিল, তাতেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যে চলে যেত। এমনকি তাঁকে অনেক সম্পদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।[41]
ইমাম গাজ্জালির শেষ উপদেশ:
হুজ্জাতুল ইসলাম হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির উপর যখন মৃত্যুযন্ত্রণা নেমে আসে, তখন তাঁর ছাত্ররাও উপস্থিত ছিলেন। শেষ উপদেশ দেওয়ার জন্য তারা আবেদন জানালে তিনি বারবার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ এই নসিহত প্রদান করেন— عَلَيْكَ بِالْإِخْلَاصِ — তোমরা ইখলাস (নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতা) অবলম্বন করো।
সেই সময় সহিহ বুখারি শরিফ তাঁর বক্ষের উপর রাখা ছিল। এই কথাগুলো বলার পরই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর পবিত্র আত্মা মহান রবের সান্নিধ্যে উড়ে যায়।[42]
ইন্তেকাল:
তিনি ৫০৫ হিজরির ১৪-ই জমাদিউস সানি, সোমবার তাবেরানে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাবেরানের বহির্ভাগে দাফন করা হয়, যা তুস অঞ্চলের প্রধান শহর।[43]
হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম ইবনুল জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি “الثبات عند الممات” গ্রন্থে হজরত সাইয়্যিদুনা আহমদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনা থেকে ইমাম গাজ্জালির ইন্তেকালের ঘটনা উল্লেখ করেন। যা ছিল এমন— সোমবার সকালে হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি ঘুম থেকে উঠে অজু করে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি নিজের কাফন আনতে বলেন এবং তা নিজের চোখে লাগিয়ে অত্যন্ত বিনয় ও আত্মসমর্পণের সাথে বলেন, “আমার রবের নির্দেশ আমার মাথার উপর।”
এই কথা বলার পর তিনি কিবলামুখী হয়ে পা প্রসারিত করে শুয়ে পড়েন। উপস্থিত লোকজন দেখতে পান তাঁর পবিত্র রুহ ইতোমধ্যেই আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে ফিরে গেছে।[44]
জানাজা:
হজরত সাইয়্যিদুনা আল্লামা যাবিদি রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, যখন হজরত সাইয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের সময় নিকটবর্তী হলো, তখন তিনি কিছু নেককার ও আস্থাভাজন ব্যক্তিকে অসিয়ত করেন যে, তাঁর কবর যেন তাঁর নিজ গৃহে প্রস্তুত করা হয় এবং আশপাশের লোকদের জানাজার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপর তিনি নির্দেশ দেন যে, অন্য কোনো ব্যবস্থা না করে অপেক্ষা করা হবে; কারণ মরুভূমি থেকে তিনজন ব্যক্তি আসবেন, যাদের ইরাকের কেউ চিনবে না।
তাদের মধ্যে দুইজন তাঁকে গোসল করাবেন এবং তৃতীয়জন জানাজার নামাজ পড়াবেন। এটি কোনো মানুষের পরামর্শ বা নির্দেশ ছাড়াই সংঘটিত হবে।
যখন তাঁর ইন্তেকাল হলো, তখন খিদমতগারগণ তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী সবকিছু সম্পন্ন করলেন। কিছুক্ষণ পর সত্যিই মরুভূমি থেকে তিনজন অচেনা বুজুর্গ আগমন করেন। তাদের মধ্যে দুইজন সামনে এগিয়ে এসে গোসল ও কাফন সম্পন্ন করেন। আর তৃতীয়জন কিছুটা আড়ালে ছিলেন। পরে যখন জানাজার জন্য লাশ কবরের পাশে নেওয়া হলো, তখন সেই তৃতীয় ব্যক্তি প্রকাশিত হন। তিনি একটি কালো পতাকা বহন করছিলেন এবং মাথায় উলের পাগড়ি পরিহিত ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে জানাজার নামাজ পড়ান।
নামাজ শেষে তারা সালাম দিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। উপস্থিত ইরাকি আলিমগণ তাঁদের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য স্মরণে রাখেন, কিন্তু কেউই তাঁদের চিনতে পারেননি। পরবর্তীতে কিছু আলেম রাতে গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান যে, যিনি জানাজা পড়িয়েছিলেন তিনি ছিলেন শায়খ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আমগার রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগমন করেছিলেন। আর যারা গোসল করিয়েছিলেন তারা ছিলেন তাঁর দুই সঙ্গী আবু শুয়াইব আইয়ুব ইবনে সাঈদ ইবনে দাজমুর রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আবু ঈসা ওয়াজবিহ রহমতুল্লাহি আলাইহি।
এরপর ইরাকের বহু আলিম তাঁদের কাছে গিয়ে দোয়া ও বরকতের জন্য অনুরোধ করেন। [45]