হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রহ.) নকশবন্দিয়া তরিকার প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর জীবন ছিল কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি দৃঢ় আনুগত্য, অন্তরের পবিত্রতা এবং আল্লাহর অবিরাম স্মরণে নিবেদিত। মানুষের সাথে সম্পৃক্ত থেকেও অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত রাখার যে অনন্য সাধনার পথ তিনি দেখিয়েছেন, তা তাসাউফের জগতে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।

এই মহান সাধকের জীবন, কর্ম ও শিক্ষা মুসলিম সমাজে আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করেছে এবং যুগে যুগে অসংখ্য মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই তাঁর জীবনী কেবল ইতিহাসের অংশ নয়; বরং তা মুসলমানদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।

নাম ও উপাধি:

নাম মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-বুখারি। তাঁকে ‘নকশবন্দি’ বলার কারণ সম্পর্কে ‘রিসালা-এ-বাহাইয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এবং তাঁর পিতা উভয়েই দামি কাপড়ে নকশা তৈরির (বুনন শিল্প) কাজে নিয়োজিত থাকতেন। কাপড়ের নকশাকার থেকে শব্দটি এলেও আধ্যাত্মিক অর্থে, তিনি মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর নামের ‘নকশা’ এঁকে দিতেন বলেই তাঁকে নকশবন্দ বলা হয়।[1]

জন্ম ও বংশ:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) ছিলেন সায়্যিদ বংশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর বংশলতিকা হজরত ইমাম হাসান আসকারী (রা.)-এর মাধ্যমে হজরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে।[2]

তাঁর জন্ম হয় ৭১৮ হিজরির মহররম মাসে, যখন হজরত আজিজান খাজা আলী রামিতানী (রহ.) জীবিত ছিলেন। কিছু বর্ণনাকারীর মতে, খাজা আলী রামিতানী (রহ.)-এর ইন্তিকাল হয় ৭২১ হিজরির কোনো এক মাসে।

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) এর জন্মস্থান ছিল কাসর-এ আরিফান, যা বুখারা থেকে প্রায় ৩ মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি গ্রাম। [3]

শৈশব:

শৈশবকাল থেকেই তাঁর চেহারায় বেলায়াতের নিদর্শন স্পষ্ট ছিল এবং তাঁর ললাট থেকে কারামত ও হেদায়তের নুর প্রকাশিত হতো। তাঁর মায়ের সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমার ছেলে বাহাউদ্দিন যখন চার বছর বয়সি, তখন সে আমাদের একটি গরুর দিকে ইশারা করে বলেছিল, ‘আমাদের এই গরুটি এমন একটি বাছুর জন্ম দেবে, যার কপাল উজ্জ্বল হবে।’ কয়েক মাস পর গরুটি সত্যিই ঠিক সেই বর্ণনার মতো একটি বাছুর প্রসব করেছিল।”[4]

শিক্ষা লাভ:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) যখন শিশু ছিলেন, তখনই হজরত খাজা মুহাম্মদ বাবা সামাসি (রহ.)-এর নেক নজর তাঁর ওপর পড়েছিল এবং তিনি তাঁকে আধ্যাত্মিক সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দৃশ্যত বা জাহেরিভাবে তিনি আমীর কুলাল (রহ.)-এর নিকট তরিকার আদব শিক্ষা লাভ করেন।

তবে হাকিকত বা প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন ‘ওয়াইসি’ (সরাসরি রুহানি ফয়েজপ্রাপ্ত)। তিনি হজরত খাজা আব্দুল খালেক গাজদাওয়ানি (রহ.)-এর রুহানিয়তের মাধ্যমে লালিত ও শিক্ষিত হয়েছিলেন।[5]

খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ.) মাত্র আঠারো বছর বয়সেই তাঁর প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং শরিয়তের বিভিন্ন শাস্ত্রে উল্লেখযোগ্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এ সময়ের মধ্যেই তিনি পবিত্র কুরআনুল করিম হিফজ সম্পন্ন করেছিলেন। শিক্ষা সমাপন শেষে তিনি পুনরায় তাঁর মুর্শিদ শায়খ মুহাম্মদ বাবা সাম্মাসি (রহ.)-এর দরবারে ফিরে যান এবং তাঁর সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।

এই সাক্ষাতের স্মৃতি তিনি নিজেই এভাবে বর্ণনা করেছেন— “আমার বয়স তখন আঠারো বছর। আমি শায়খ আস-সাম্মাসি (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে তাঁর আবাসে উপস্থিত হলাম এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলাম। সারাদিন আমি তাঁর সঙ্গেই কাটালাম। তাঁর বরকতে নিজের ভেতরে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন অনুভব করলাম। রাতে তাঁর খানকাহতেও অবস্থান করলাম।

শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে অজু করে মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে দু’রাকাত নামাজ আদায় করে দীর্ঘ সেজদায় লুটিয়ে পড়লাম এবং আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত বিনয় ও আকুতির সাথে তাঁর রহমত ও হিদায়েত প্রার্থনা করলাম।

কিছুক্ষণ পর শায়খ ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে আগমন করলেন। নামাজ শেষে তিনি আমার দিকে ফিরে বসলেন এবং আল্লাহর দরবারে কীভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া করতে হয়, তা আমাকে শিক্ষা দিলেন।

এরপর দস্তরখান বিছানো হলো। সবাই আহার শেষ করলে তিনি আমাকে একটি রুটি দিয়ে বললেন, ‘এটি সঙ্গে রেখে দাও, পরে তোমার কাজে লাগবে।’ আমি কিছুটা ইতস্তত করছিলাম, কারণ দস্তরখানের রুটি সবার জন্যই ছিল। কিন্তু শায়খ জোর দিয়ে বলায় আমি রুটিটি সঙ্গে রাখলাম।

অল্পক্ষণ পর শায়খ মসজিদ থেকে বের হয়ে একটি গাধার পিঠে আরোহন করলেন এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে রওনা হলেন। আমি তাঁর পেছনে পেছনে পায়ে হেঁটে চলতে লাগলাম। পথ চলার সময় আমি সর্বোচ্চ একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যখনই আমার মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাচ্ছিল, তখনই শায়খ আমার দিকে ফিরে তাকাতেন এবং মনের খেয়াল-খুশিকে সংযত রাখার উপদেশ দিতেন। এতে আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম— আমার অন্তরের ভাবনাও যেন তাঁর দৃষ্টির আড়ালে ছিল না।

কয়েক ঘণ্টা পথ অতিক্রম করার পর আমরা এক স্থানে থামলাম। শায়খ তাঁর এক মুরিদের ঘরে প্রবেশ করলেন। শায়খকে দেখে মুরিদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। শায়খ কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘বাড়িতে আপনাকে আপ্যায়ন করার মতো দুধ ছাড়া আর কিছু নেই।’ তখন শায়খ আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমি যে রুটিটা তোমাকে দিয়েছিলাম, সেটি বের করো; এখন সেটিই আমাদের কাজে লাগবে।’

শায়খের সান্নিধ্যে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটত। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার অন্তরে মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার বন্ধন ক্রমেই গভীরতর হয়ে উঠেছিল।”[6]

আধ্যাত্মিক ফয়েজের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) বাহ্যিক যোগাযোগ এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান অর্জন থেকেও গাফেল ছিলেন না। এ কারণে তিনি বিভিন্ন আধ্যাত্মিক দরবারে হাজির হতেন। বিনয় ও নম্রতাই হলো তাসাউফের সর্বোচ্চ শিখর, যা তিনি প্রতিটি মুহূর্তে প্রকাশ করেছেন। যদিও হজরত আমির কুলাল (রহ.) তাঁর মুর্শিদের অসিয়ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন এবং পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাঁর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তবুও তিনি খাজা বাহাউদ্দিনকে অন্যান্য দরবারে যাতায়াত করতে বাধা দেননি; কারণ এটি অহংবোধের বিষয় ছিল না।

এমনকি তিনি এ বিষয়ে খাজা নকশবন্দকে নসিহতও করেছিলেন। হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) এ ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করেননি। যেখানেই ইলমের প্রদীপ জ্বলতে দেখেছেন, সেখানেই পতঙ্গের মতো ছুটে গেছেন; আর যেখানেই আত্মার স্পন্দন অনুভব করেছেন, সেই দরবারেই হাজির হয়েছেন। এভাবে তিনি বহু বছর ইলম ও মারেফত  অন্বেষণে ব্যস্ত ছিলেন। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়অ হলো—

১. হজরত শেখ আরিফ দিক-গেরানি (রহ.): তিনি হজরত সায়্যিদ আমির কুলালের খলিফা ছিলেন এবং তাঁর অন্যতম প্রধান উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য হতেন। খাজা বাহাউদ্দিন তাঁর খিদমতে দীর্ঘ সাত বছর অতিবাহিত করেন এবং এই সময়ে আধ্যাত্মিক উন্নতির বহু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন।

২. হজরত শেখ কাসিম (রহ.): তিনি ছিলেন হজরত খাজা আহমদ ইয়াসবী (রহ.)-এর বংশধারার এক মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। খাজা বাহাউদ্দিন তাঁর সান্নিধ্যে কয়েক মাস অতিবাহিত করেন।

৩. হজরত সুলতান খলিল আতা (রহ.): তিনি একজন প্রখ্যাত বুজুর্গ এবং মাওয়ারান নহর অঞ্চলের শাসক ছিলেন। শাসক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দরবেশিতে কোনো কমতি ছিল না। হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) প্রায় বারো বছর তাঁর সান্নিধ্যে কাটান। প্রথমে তিনি সেই দরবারের একজন দরবেশ হিসেবে ছিলেন এবং পরে যখন সুলতান সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর উপদেষ্টা হিসেবে রাজকার্যে সহায়তা করার পাশাপাশি নির্জন মজলিসেরও সঙ্গী ছিলেন।[7]

ধর্মীয় আদর্শ ও মাজহাব:

তিনি পবিত্র শরিয়তের কঠোর অনুসারী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হানাফি মাজহাবের অনুসারী এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর একনিষ্ঠ মুকাল্লিদ ছিলেন। তাঁর পরবর্তী প্রায় সকল উত্তরসূরিই হানাফি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন।[8]

খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক অভিষেক:

যৌবনের শুরুর দিনগুলোতে তাঁর স্বভাব নির্জনতা ও আধ্যাত্মিক সাধনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাতের নিস্তব্ধ মুহূর্তে আউলিয়াদের মাজার জিয়ারতে তিনি গভীর প্রশান্তি খুঁজে পেতেন। একবার এক রাতে তিনি তিনটি মাজার জিয়ারতের সংকল্প করেন। মাজারগুলো ছিল দুনিয়াবিমুখ সাধক হজরত খাজা মুহাম্মদ ওয়াসি (রহ.), নকশবন্দিয়া সিলসিলার অন্যতম স্তম্ভ হজরত খাজা মাহমুদ আনজীর ফাগনবী (রহ.) এবং খাজা মুজদাইন (রহ.)-এর।

প্রতিটি মাজারে তিনি একটি করে প্রদীপ জ্বলতে দেখলেন, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল— প্রদীপে তেল ও সলতে থাকা সত্ত্বেও আলো ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) সেগুলোর সলতে বাড়িয়ে দিলেন এবং কিবলামুখী হয়ে বসে পড়লেন। এমন সময় তিনি দেখলেন যে, একটি সবুজ পর্দা ঝুলছে এবং তার পেছনে একটি সিংহাসন পাতা রয়েছে। সেই সিংহাসনের চারপাশে একদল পুণ্যবান ব্যক্তি উপবিষ্ট। তাদের মধ্যে তিনি নিজের প্রথম পথপ্রদর্শক বাবা সামাসীকে (রহ.) চিনে ফেললেন।

সেখানে উপস্থিত একজন দাঁড়িয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। তিনি বললেন, “ইনি আহমদ সিদ্দিক (রহ.), ইনি খাজা আলী রামিতানি (রহ.) এবং ইনি খাজা বাবা সামাসী (রহ.)।” খাজা বাহাউদ্দিন বুঝতে পারলেন যে বড় বড় বুজুর্গরা এক জায়গায় সমবেত হয়েছেন। এরপর সিংহাসনে বসা প্রধান ব্যক্তির পরিচয় দেওয়া হলো যে, তিনি হলেন হজরত খাজা আব্দুল খালিক গাজদাওয়ানি (রহ.), যিনি সবার সরদার। এটিও পরিষ্কার হলো যে, এই মহান মজলিস খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দকে সামগ্রিক আধ্যাত্মিক ফয়েজ দানের বিশেষ উদ্দেশ্যেই বসেছে।

এমন সময় ঘোষণা হলো যে, হজরত খাজা আব্দুল খালিক গাজদাওয়ানি (রহ.) কিছু উপদেশ দেবেন। এটি ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ তালিবের জন্য এক পরম সৌভাগ্য। পর্দা উঠলে সালেক খাজা বাহাউদ্দিন সামনে গিয়ে সালাম পেশ করলেন।

হজরত গাজদাওয়ানি (রহ.) বললেন, “তুমি যে প্রদীপগুলো জ্বলতে দেখলে, এগুলোর ক্ষীণ শিখাকে উঁচুতে তুলে ধরার দায়িত্ব এখন তোমার, কারণ তোমার সেই যোগ্যতা আছে।”

তবে তিনি বিশেষভাবে নসিহত করলেন যে, “সকল অবস্থায় শরিয়তের পথে অবিচল থাকতে হবে, সুন্নতের ওপর আমল করতে হবে এবং বিদআত থেকে বেঁচে থাকতে হবে। সর্বদা রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের পদাঙ্ক অনুসরণে সচেষ্ট থাকতে হবে।”

এই নির্দেশনার সাথে তিনি আদেশ দিলেন যে, হজরত সায়্যিদ আমির কুলালের নির্দেশনায় আধ্যাত্মিকতার সকল স্তর অতিক্রম করতে হবে। অন্য কথায়, তাঁকে সায়্যিদ আমির কুলালের আশ্রয়ে সোপর্দ করা হলো।[9]

খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) এর নীরব জিকির ও আধ্যাত্মিক উচ্চতা:

সিলসিলা-এ-খাজাগান এর একদল মহান মাশায়েখ দীর্ঘকাল ধরে ‘জিকিরে খফি’ (নীরব জিকির) এবং ‘জিকিরে জাহরি’ (উচ্চস্বরে জিকির)—এই উভয় পদ্ধতিরই সমন্বয় করেছিলেন। খাজা মাহমুদ আনজির ফাগনাভি (রহ.) থেকে শুরু করে আমীর কুলাল (রহ.)-এর সময় পর্যন্ত এই ধারাটি প্রচলিত ছিল। তৎকালীন যাঁরা উচ্চস্বরে জিকির করতেন, তাঁদেরকে এই সিলসিলায় ‘আলানিয়ুন’ (প্রকাশ্য জিকিরকারী) বলা হতো।

যখন এই তরিকার সূর্য হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর আবির্ভাব ঘটল, তখন তিনি আধ্যাত্মিক জগতের মহান পুরুষ খাজা আব্দুল খালেক গাজদাওয়ানি (রহ.)-এর রুহানিয়তের পক্ষ থেকে আমলের ক্ষেত্রে ‘আজিমত’ বা সর্বোচ্চ দৃঢ়তা অবলম্বনের নির্দেশপ্রাপ্ত হলেন। এই আধ্যাত্মিক নির্দেশনার আলোকেই তিনি উচ্চস্বরে জিকির বর্জন করে কেবল ‘জিকিরে খফি’ বা নীরব জিকিরকেই নিজের পথ হিসেবে বেছে নিলেন।

যখনই তাঁর পীর আমির কুলাল (রহ.)-এর অন্যান্য মুরিদ ও শাগরেদগণ একত্রিত হয়ে উচ্চস্বরে জিকির শুরু করতেন, খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) সেই মজলিস থেকে উঠে বাইরে চলে যেতেন। তাঁর এই নির্লিপ্ততা অন্য মুরিদদের মনে ক্ষোভ ও কষ্টের সৃষ্টি করত। যদিও খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাদের এই সমালোচনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করতেন না; তবুও তিনি তাঁর পীর আমির কুলাল (রহ.)-এর খিদমত ও সান্নিধ্যে এক মুহূর্তের জন্যও অবহেলা করতেন না। পীরের প্রতি তাঁর আনুগত্য ও আত্মনিবেদন ছিল প্রশ্নাতীত।

খাজা বাহাউদ্দিনের প্রতি পীরের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া ভালোবাসা দেখে অন্য মুরিদগণ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা পীরের কাছে খাজার নামে সমালোচনা শুরু করলেন এবং তাঁর আমলকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘অসম্পূর্ণ’ বলে আখ্যা দিলেন।

একদা ‘সুখার’ গ্রামে মসজিদ ও খানকাহ নির্মাণের কাজে প্রায় পাঁচশ মুরিদ একত্রিত হলেন। নির্মাণকাজ শেষে সমবেত মুরিদদের সামনে আমীর কুলাল (রহ.) সমালোচকদের কঠোরভাবে সর্তক করে দিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, “তোমরা আমার সন্তান বাহাউদ্দিনের ব্যাপারে ভুল ধারণা পোষণ করেছ এবং তাঁর মর্যাদাকে খাটো করে বড় ভুল করেছ। তোমরা তাঁর আসল মর্তবা ও আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কে কিছুই জানো না। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের নজর সর্বদা তাঁর ওপর নিবদ্ধ থাকে। আর আল্লাহর খাস বান্দাদের নজরও আল্লাহর সন্তুষ্টিরই অনুগামী হয়। বাহাউদ্দিনের প্রতি আমার এই অগাধ ভালোবাসা ও বিশেষ মনোযোগের পেছনে আমার নিজের কোনো হাত নেই, এটি সম্পূর্ণ খোদায়ি ফয়সালা।”

সেই সময় হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ ইট বহনের শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। তখন আমির কুলাল (রহ.) তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং সমবেত সবার সামনে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে আমার সন্তান বাহাউদ্দিন, আমি তোমার ব্যাপারে আমার পীর মুহাম্মদ বাবা সামাসি (রহ.)-এর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যেভাবে তোমার লালন-পালনে শ্রম দিয়েছি, তুমিও আমার সন্তান বাহাউদ্দিনের লালন-পালনে কোনো ত্রুটি করো না।’ আমি তাঁর দেওয়া সেই নির্দেশ পালন করেছি।”

অতঃপর আমির কুলাল (রহ.) নিজের সিনা বা বক্ষের দিকে ইশারা করে বললেন, “আমি তোমার জন্য আধ্যাত্মিক মারেফতের স্তন্য খালি করে দিয়েছি (অর্থাৎ আমার সমস্ত জ্ঞান ও ফয়েজ তোমাকে দান করেছি)। ফলে তোমার রুহানিয়তের পাখিটি মানবীয় সীমাবদ্ধতার ডিম ভেঙে মুক্ত হয়েছে। তবে তোমার হিম্মতের বাজপাখিটি অনেক উঁচুতে উড়তে চায়; তাই আমি তোমাকে এখন দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণের অনুমতি দিচ্ছি। তুর্কি হোক বা তাজিক— যেখানেই তোমার নাকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ঘ্রাণ পৌঁছবে, সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করবে। তোমার সুউচ্চ হিম্মত অনুযায়ী জ্ঞান সন্ধানে কোনো ত্রুটি করবে না।”

হজরত খাজা (রহ.) বলেন, “আমির কুলাল (রহ.)-এর এই কথাটিই আমার জন্য এক মহা পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াল। কারণ, আমি যদি পীরের সাধারণ মুরিদ হয়ে থাকতাম, তবে সেই দায়িত্বের পরীক্ষা থেকে বেঁচে থাকতাম এবং শান্তিতে থাকতাম (কিন্তু এখন বড় দায়িত্ব আমার কাঁধে)।”[10]

গাউসুল আজম (রহ.)-এর দরবারে খাজা নকশবন্দ (রহ.): ‘নকশবন্দ’ উপাধি প্রাপ্তি:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) তাঁর জীবনের এক অবিস্মরণীয় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “একদা আমি এক নির্জন মরুভূমির মধ্য দিয়ে পথ চলছিলাম। হঠাৎ পথিমধ্যে আমার সাথে হজরত খিজির (আ.)-এর সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট গাউসুল আজম হজরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর পবিত্র মজলিসে নিয়ে গেলেন।

সেই সময় আমি সাধারণ একজন সাধক ছিলাম এবং ‘নকশবন্দ’ হিসেবে তখনও পরিচিত হইনি। গাউসুল আজম (রহ.) পরম মমতায় আমার বক্ষের ওপর তাঁর হাত রাখলেন এবং আমাকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে জগতের সৌন্দর্যের ধারক, আমার আধ্যাত্মিক অলংকার (জৌলুস) ধারণ করো, যাতে আজ থেকে বিশ্ববাসী তোমাকে ‘নকশবন্দ’ (হৃদয়ে আল্লাহর নকশা অঙ্কনকারী) বলে ডাকতে পারে।’ সেই মোবারক মুহূর্তের পর থেকেই আমি চারদিকে ‘নকশবন্দ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করি।”

এই মহান আধ্যাত্মিক সাক্ষাতের পর, হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) অত্যন্ত ভক্তিভরে গাউসুল আজম (রহ.)-এর শানে একটি বিখ্যাত ফারসি কবিতা রচনা করেন।

بادشاہِ ہر دو عالم شاہ عبد القادر است

سرورِ اولادِ آدم شاہ عبد القادر است

آفتاب و ماہتاب و عرش و کرسی و قلم

نورِ قلب از نورِ اعظم شاہ عبد القادر است

উভয় জাহানের অধিপতি হলেন শাহ আব্দুল কাদের,

আদম-সন্তানদের শিরোমণি হলেন শাহ আব্দুল কাদের।

সূর্য, চন্দ্র, আরশ, কুরসি আর ওই যে লওহ-কলম—

সবার হৃদয়ের জ্যোতি সেই মহান নুর শাহ আব্দুল কাদের।[11]

আপন পীরের স্থলাভিষিক্ত:

হজরত আমির কুলাল (রহ.) তাঁর অন্তিম অসুস্থতার সময় মুরিদ ও সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন যেন তাঁর ইন্তেকালের পর সবাই খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর অনুসরণ করে, তখন মুরিদরা আরজ করলেন, “তিনি তো উচ্চস্বরে জিকির (জিকিরে আলানিয়া) করার ক্ষেত্রে আপনার পদ্ধতি অনুসরণ করেননি, এমতাবস্থায় আমরা কীভাবে তাঁর অনুসরণ করব?”

উত্তরে আমির কুলাল (রহ.) বললেন, “তাঁর প্রতিটি কাজই খোদায়ি হিকমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে তাঁর নিজের কোনো ব্যক্তিগত এখতিয়ার নেই।” অতঃপর তিনি এই ফারসি শেরটি পাঠ করলেন— ای همه تو من کنم چنانکه تو دانی

অর্থাৎ, হে আমার মাওলা, আমি আমার প্রতিটি কাজ সেভাবেই করি, যেভাবে আপনি জানেন (অর্থাৎ আপনারই ইচ্ছায় ও ইশারায় সব সম্পন্ন হয়)।[12]

খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি রহমাতুল্লাহি আলাইহির তরিকতের শাজরা:

১. হজরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা ﷺ

২. আমিরুল মুমিনিন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৩. হজরত সালমান ফারসি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৪. হজরত কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৫. হজরত ইমাম জাফর সাদিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৬. হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৭. হজরত আবুল হাসান আল-খারকানি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৮. হজরত আবুল কাসিম গুরগানি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

৯. হজরত আবু আলী ফারমাদি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১০. হজরত আবু ইয়াকুব ইউসুফ হামদানি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১১. হজরত আব্দুল খালেক গুযদুয়ানি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১২. হজরত আরিফ রিওগারি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১৩. হজরত মাহমুদ আঞ্জির ফাগনাবি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১৪. হজরত খাজা আজিজান আলী রামীতানি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১৫. হজরত খাজা মুহাম্মদ আস-সাম্মাসি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১৬. হজরত খাজা আমীর কুলাল (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

১৭. হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

আধ্যাত্মিক অবদান:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জগতের সেই প্রস্ফুটিত পুষ্প, যাঁর সুবাসে নকশবন্দিয়া তরিকার পুরো বাগান আমোদিত হয়েছে। তাঁর বরকতময় অস্তিত্ব তাজিকিস্তানের সেই সব আধ্যাত্মিক জটিল রহস্যের জট খুলেছে, যা একসময় কেবল উচ্চস্তরের সাধকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ মুসলমানরা সেগুলোকে নিজেদের বোধশক্তির বাইরে মনে করত। এরপর এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হলো; তাসাউফ প্রতিটি মজলিসে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল এবং এর বরকত সর্বত্র দৃশ্যমান হতে লাগল।

এই আধ্যাত্মিকতার ব্যাপক প্রসারের ফলে প্রতিটি অনুরাগী হৃদয় ইলম ও মারেফতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেল। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সত্ত্বেও এর গাম্ভীর্য ও মর্যাদা আগের চেয়ে আরও বৃদ্ধি পেল। তাঁর দিকনির্দেশনা তাসাউফকে দ্বীনি শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। ফলে একসময় যে খানকাহগুলোকে কেবল নির্জনবাস বা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার স্থান মনে করা হতো, সেগুলো দ্বীনি ইলম বা শাস্ত্রীয় জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরিত হলো।

তাঁর খোদা-প্রদত্ত ব্যক্তিত্বের প্রভাব এতই বহুমুখী ও গভীর ছিল যে, পুরো সিলসিলা বা আধ্যাত্মিক ধারাটিই তাঁর সত্তার পরিচয়ে পরিচিত হতে লাগল। নকশবন্দিয়া তরিকার এই অনন্য প্রভাব মূলত তাঁরই দান, যা সময়ের পরিক্রমায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, শরিয়তের ছায়ায় লালিত সুফিদের এই জামাত চিরকালের জন্য ‘নকশবন্দি’ হিসেবে সাব্যস্ত হলো। এখন প্রতিটি আধ্যাত্মিক অভিযাত্রী তাঁর দানে সিক্ত হওয়ার আশায় হাজির হয়ে এই আরজি জানায়—

اے نقشبندِ عالم، نقشِ مرا ببنید

نقشم چنان ببند کہ گویند نقشبند

আয় নকশবন্দ-এ-আলম, নকশ-এ-মেরা বেবিনিদ

নকশাম চুনান বেবান্দ কেহ গুয়ান্দ নকশবন্দ

অর্থাৎ, হে জগতের নকশবন্দ (হৃদয়ে আল্লাহর নাম খোদাইকারী), আমার হৃদয়ের অবস্থার দিকে দৃষ্টি দিন; আমার অন্তরে (আল্লাহর মহব্বতের) নকশা এমনভাবে খোদাই করে দিন, যেন লোকে আমাকে দেখে ‘নকশবন্দি’ বলে ডাকতে পারে।[13]

কাসরুল আরিফানে নকশবন্দিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা:

খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ.) দীর্ঘকাল মারভ ও বুখারা নগরে অবস্থান করে দ্বীনি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় সময় অতিবাহিত করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর জন্মস্থান কাসরুল আরিফান-এ ফিরে আসেন এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন।

এই সময় তাঁর খ্যাতি ও আধ্যাত্মিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ তাঁর দরবারে সমবেত হতো। কেউ দীক্ষা গ্রহণের জন্য, কেউ আত্মিক পরামর্শ লাভের উদ্দেশ্যে, আবার কেউ বা কেবল তাঁর সান্নিধ্যের বরকত অর্জনের আশায়।

মানুষের দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজন উপলব্ধি করে তিনি কাসরুল আরিফানে একটি বৃহৎ মাদরাসা এবং একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই মাদরাসা জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। তাঁর জীবদ্দশাতেই এখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে। বর্ণনা করা হয় যে, কোনো কোনো সময় মাদরাসা প্রাঙ্গণে একসঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ অবস্থান করতে পারত।

এই ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাত শতাব্দী ধরে টিকে ছিল। পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকে মাদরাসাটি পুনরায় সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ফলে বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য ধারণ করে এটি আজও সেই আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাগত উত্তরাধিকারের স্মারক হিসেবে বিদ্যমান।[14]

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর হজ সফর:

হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) জীবনে দুইবার হজ পালন করেন। এই হজের সফরগুলো যেমন ছিল ফরজ ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে, তেমনি তাঁর লক্ষ্য ছিল পুণ্যবান ব্যক্তিদের (মর্দান-এ-বা সাফা) সাথে সাক্ষাৎ করা।

প্রথম হজ থেকে ফেরার পথে হিরাতের শাসনকর্তা আমির হোসাইনের এক দূত তাঁর সাথে দেখা করেন এবং আরজ করেন যে, আমির তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক। হজরত খাজা মনে মনে ভাবলেন, আল্লাহর নির্দেশ হলো— وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ – আর সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিও না। সুরা আদ-দুহা: ১০।

অর্থাৎ, যেহেতু কেউ তাঁর কাছে সাক্ষাতের আবেদন করেছে, তাই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই ভেবে তিনি হিরাতে গেলেন।

বাদশাহ তাঁর জ্ঞানের পরিধি জানার জন্য কিছু প্রশ্ন করলেন। যেমন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—

  • ‘এই বুজুর্গি বা আধ্যাত্মিক মর্যাদা কি আপনি আপনার পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন?’
  • জবাবে তিনি বললেন, ‘না।’
  • ‘আপনি কি সামা (আধ্যাত্মিক গান) শোনা এবং সজোরে জিকির (জিকির বিল জাহির) করার পক্ষে?’
  • ‘না।’
  • ‘যদি আপনাদের এখানে (জিকির-এ-জাহির বা সামার মাধ্যমে) এমন জজবা বা আধ্যাত্মিক উন্মাদনার মজলিস না হয়, তবে আপনাদের তরিকায় কী হয়?’
  • ‘আমাদের তরিকা হলো— জাহিরান বা খালক্ব, বাতিনান বা হক (অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে মানুষের সাথে সম্পৃক্ত থাকা, কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে সর্বদা আল্লাহর সাথে যুক্ত থাকা)।’
  • ‘এটা কি আদৌ সম্ভব?’
  • ‘এর স্বপক্ষে তো পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট দলিল বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ – এমন কিছু লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করতে পারে না। (সুরা আন-নুর: ৩৭)। নির্জনবাসে (খালওয়াত) লোকচক্ষুর সামনে আসার বা খ্যাতির ভয় থাকে, আর খ্যাতি বা পরিচিতি হলো একটি আপদ। এই কারণেই আমাদের আকাবিরগণ পথচলার কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন।’ এরপর তিনি সেই এগারোটি মূলনীতি (যেমন: হোশ দর দম, নজর বর কদম ইত্যাদি) উল্লেখ করেন, যা নকশবন্দিয়া তরিকার পরিভাষা হিসেবে সুপরিচিত।

এরপর তিনি অত্যন্ত হিকমতপূর্ণ একটি বর্ণনা দিয়ে বললেন— ‘উচ্চৈঃস্বরে জিকির বা সামা (আধ্যাত্মিক গান) থেকে যে উপস্থিতি বা আধ্যাত্মিক ভাব তৈরি হয়, তার স্থায়িত্ব কম; কিন্তু ওয়ুকুফে কলবি (সর্বদা অন্তরের দিকে খেয়াল রাখা) এর ওপর অভ্যস্ত হলে যে জজবা তৈরি হয়, তা দিয়ে প্রকৃত মকসুদ বা লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। বাদশাহ যখন তাঁর এই সকল যুক্তিপূর্ণ ও সন্তোষজনক উত্তর পেলেন, তখন তিনি পুরোপুরি আশ্বস্ত ও তৃপ্ত হলেন।

এত চমৎকার আলোচনার পরও হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) সতর্কতার এমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যে, তিনি বাদশাহর খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন। কারণ, সেই খাবার সম্পূর্ণ হালাল কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। বর্তমান সময়ের সেই সব তরিকার অনুসারীদের জন্য এটি একটি বিশাল শিক্ষা, যারা রাজদরবারের দাওয়াত বা বিলাসিতার মোহে পড়ে থাকেন।

হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) যখন দ্বিতীয়বার হজ পালন করতে গেলেন, তখন ফেরার পথে মাওলানা জয়নুদ্দিন (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে হিরাতে অবস্থান করেন। মাওলানা জয়নুদ্দিন (রহ.) ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভাধর আলেম এবং তৎকালীন অত্যন্ত সম্মানের পাত্র। তিনি হজরত খাজা শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর সিলসিলার সাথে যুক্ত ছিলেন, ফলে বাহ্যিক ইলমের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানেও তিনি ছিলেন সমৃদ্ধ।

হিরাতে খাজা নকশবন্দ (রহ.) তিনদিন অবস্থান করেন। একদিন ফজর নামাজের পর তাঁদের মধ্যে কথোপকথন হয়। মাওলানা জয়নুদ্দিন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আরজ করলেন— بَراۓ ما ہَم اے خواجہ نقشبَند – বরায়ে মাহাম আয় খাজা নকশবন্দ। অর্থাৎ: হে খাজা, আমাদের হৃদয়েও আল্লাহর নামের নকশা খোদাই করে দিন।

জবাবে খাজা নকশবন্দ (রহ.) পরম বিনয় ভরে বললেন—  آمَدیم تا نقش بَریم – আমাদেম তা নকশ বারেম। অর্থাৎ: আমরা তো নিজেই নকশা হওয়ার জন্য বা ফয়েজ নেওয়ার জন্য এসেছি। বলা হয়ে থাকে, এটিই ছিল তাঁর ‘নকশবন্দ’ হওয়ার প্রকৃত ঘোষণা। এমন গভীর আধ্যাত্মিক আলোচনার পর তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন।[15]

আধ্যাত্মিক মাকামের পূর্ণতা:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি রহমাতুল্লাহি আলাইহির এই রুহানি বা আধ্যাত্মিক ভ্রমণের সিলসিলা অবিরত চলতে থাকে। এই পথে অনেক নাযুক বা সংবেদনশীল মাকামও এসেছে। তিনি আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হজরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ.), হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.), হজরত আবু বকর শিবলী (রহ.) এবং হজরত মনসুর হাল্লাজ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক মাকামগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে তিনি সেই উচ্চস্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হন, যেখানে মস্তক অবনত করে হাজির হওয়া প্রতিটি আরিফ বা তত্ত্বজ্ঞানীর চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা থাকে। এই মাকামের দাবিই হলো আদব বা শিষ্টাচার রক্ষা করা। তিনি বলেন, সেখানে আমি আত্মসমর্পণের মস্তক অবনত করেছি এবং সেই শিষ্টাচার অবলম্বন করেছি, যা ওই স্থানের হক ছিল।

এই আধ্যাত্মিক ভ্রমণে দুইবার তিনি হজরত মনসুর হাল্লাজ (রহ.)-এর মাকাম পর্যন্তও পৌঁছেছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন যে, সেখানে তাঁর হৃদয়েও ঠিক তেমনি সব কালাম বা বাক্যের উদয় হয়েছিল, যা হজরত মনসুর হাল্লাজ (রহ.)-এর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল। কিন্তু এই বাক্যগুলো সামনে আসা মাত্রই তাঁর ওপর এক ধরনের ‘মুনতাবি’ বা দায়িত্ববোধের সতর্কতা কাজ করে যে, এটি তো শূলি বা ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ার মাকাম। ফলে আল্লাহর অশেষ করুণায় তিনি সেই ধরনের বাক্য উচ্চারণ করা থেকে বেঁচে যান। এ বিষয়ে হজরত মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.)-এর মন্তব্য প্রকৃত সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। হজরত ইমাম রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) বলেন— হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) যখন পূর্ববর্তী খাজা বা মাশায়েখদের কাছ থেকে ফয়েজ হাসিল করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সংকল্প করলেন, তখন তিনি ‘ফানাফিল্লাহ’ (আল্লাহতে বিলীন হওয়া) এবং ‘বাকাবিল্লাহ’ (আল্লাহর সাথে স্থায়িত্ব লাভ) এর সম্মানে ভূষিত হলেন। বেলায়েতের এই স্তর থেকে তিনি ‘মাকামে শাহাদাত’ পর্যন্ত গেলেন এবং সেখান থেকে আরও উন্নীত হয়ে ‘মাকামে সিদ্দিকিয়াত’ (সত্যনিষ্ঠার সর্বোচ্চ স্তর) লাভ করলেন। তাঁর এই গভীর তন্ময়তা (মাহবিয়াত) এবং সুউচ্চ আধ্যাত্মিক মাকাম ছিল মূলত সেই আমল বা অভ্যাসের ফল, যা তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের জীবনের মূলনীতি বানিয়ে নিয়েছিলেন। [16]

তাঁর ইবাদত

তাঁর দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল ইবাদতের আলোয় উদ্ভাসিত। নিয়মিত কিছু আমল তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে পালন করতেন।

১. তাহাজ্জুদ: তিনি প্রতিদিন বারো রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন, যা দীর্ঘ সেজদার মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। গভীর খুশু ও খুজুর সাথে এই নামাজ তাঁর নিত্যকার আমল ছিল।

২. দোয়া ও মোনাজাত: তাঁর জিহ্বা সদা দোয়া ও জিকিরে সজীব থাকত। এমনকি ফজরের নামাজ আদায় করে যখন তিনি ফিরে আসতেন, তখনও তাঁর দোয়া ও মোনাজাতের ধারা অব্যাহত থাকত।

৩. ইশরাক: তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব ও যত্নের সাথে ইশরাকের নামাজ আদায় করতেন।

৪. চাশত: চাশতের নামাজও তিনি পূর্ণ নিয়মানুবর্তিতা ও গভীর একাগ্রতার সাথে আদায় করতেন।

৫. আওয়াবিন: মাগরিবের পর ছয় রাকাত আওয়াবিন নামাজ আদায় করা তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

সারকথা, তাঁর প্রতিটি জাগ্রত মুহূর্তই ইবাদতের চেতনায় নিমগ্ন ছিল। এমনকি বিশ্রামের সময়ও তিনি শোয়ার ও জাগরণের সুন্নত দোয়াগুলো পাঠ করতেন। ফলে তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল।

ইবাদতের এই প্রাচুর্য তাঁর কাছে ‘আবদিয়াত’ তথা আল্লাহর দাসত্বের প্রকৃত মর্যাদা স্পষ্ট করে তুলেছিল। আর যখন বান্দা নিজের দাসত্বের অনুভূতিকে সুদৃঢ় করে, তখন তার জন্য মাবুদের পরিচয় (মা‘রিফাত) লাভের পথ সহজ হয়ে যায়। তাঁর জীবনেও তাই ঘটেছিল। এই গভীর আত্মবোধ তাঁকে এমন এক আধ্যাত্মিক মারেফতের স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি শ্বাস যেন ইবাদতের মুক্তোমালায় গাঁথা হয়ে উঠেছিল।[17]

তাঁর ইলম ও অন্তর্দৃষ্টির দৃষ্টান্ত:

খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর খলিফা মুহাম্মদ পারসা (রহ.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন— যখন বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শামসুদ্দীন আল-জাযারি সমরকন্দে আগমন করেন, তখন সেখানে শাসক ছিলেন মির্জা উলুঘ বেগ। কিছু ঈর্ষান্বিত আলেম বাদশাহর কাছে অভিযোগ করেন যে, আমি এমন কিছু হাদিস বর্ণনা করি, যার সনদ নাকি অজানা। ফলে বাদশাহ আমাকে দরবারে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আমি বিষয়টি আমার শায়খকে জানালে তিনি বললেন, “চিন্তা করো না, আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

আমরা দরবারে পৌঁছালে দেখলাম বুখারার মুফতি হুসামুদ্দীন আন-নাহওয়ি এবং আরও অনেক আলেম সেখানে উপস্থিত আছেন। মুফতি সাহবে আমাকে পূর্বে বর্ণিত একটি হাদিসের সনদ জিজ্ঞেস করলেন। আমি সনদ বললে তারা তা ভুল বলে দাবি করল। এরপর আরেকটি হাদিসের সনদ জানতে চাইলো; সেটিও তারা অস্বীকার করল। তখন শায়খ বুঝতে পারলেন যে, তারা যাই বলি না কেন তা অস্বীকার করবে।

তখন তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, মুফতিকে জিজ্ঞেস করুন, “আপনি তো শায়খ ও মুফতি; অমুক বর্ণনাকারী সম্পর্কে আপনার কী মতামত?”

মুফতি সাহেব বললেন, “তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবি; তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।”

তখন শায়খ বললেন, “যাকে আপনি নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকার করছেন, সেই হাদিস বিশারদই তো একটি হাদিসগ্রন্থ রচনা করেছেন। সেই বইটি আপনার ঘরেই রয়েছে। এতে প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠা রয়েছে এবং এর রং এমন। আপনি যে হাদিসগুলো অস্বীকার করেছেন, সেগুলো ওই গ্রন্থের অমুক অমুক পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে।”

মুফতি প্রথমে এমন কোনো বই নিজের ঘরে থাকার কথা অস্বীকার করলেন। তখন বাদশাহ একজন লোককে তাঁর বাড়িতে পাঠালেন। কিছুক্ষণ পর সেই ব্যক্তি বইটি খুঁজে পেয়ে দরবারে নিয়ে এলো। বইটি খুলে দেখা গেল শায়খ যেসব পৃষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছিলেন, ঠিক সেসব পৃষ্ঠাতেই সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো লেখা রয়েছে! এতে উপস্থিত সবাই তাঁর জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির গভীরতায় বিস্মিত হয়ে পড়েন।[18]

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শিষ্টাচার:

হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সামাজিক দায়িত্বের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতেন। বিশেষ করে জীবনের শেষ দিনগুলো যখন ‘কসরে আরিফান’-এ অতিবাহিত হচ্ছিল, তখন তিনি আরও বেশি সতর্ক হয়ে ওঠেন। নিজের নফসের ওপর শরিয়তের বিধান কার্যকর করার বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

১. হালাল রিজিক ও সতর্কতা: তিনি হালাল রিজিকের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন এবং সামান্য সন্দেহযুক্ত খাবার থেকেও দূরে থাকতেন। তিনি মনে করতেন, হালাল রিজিকও এমনভাবে গ্রহণ করা উচিত, যেন প্রতিটি লোকমা গ্রহণের সময় অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি থাকে।

২. সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি ও খাদ্যের বরকত: তাঁর অন্তর্দৃষ্টি তথা বাতিনি নজর এতই প্রখর ছিল যে, খাবার সময় যদি কোনো মেহমান বা দরবেশ পূর্ণ বিনয়ের সাথে না খেতেন, তবে তিনি তা বুঝে ফেলতেন এবং অত্যন্ত হিকমতের সাথে তাকে নসিহত করতেন। খাবারের ক্ষেত্রে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার অনুভূতির প্রতি তিনি এতটাই সংবেদনশীল ছিলেন যে, যদি কোনো বাবুর্চি বা খাবার প্রস্তুতকারী অসন্তুষ্ট মনে বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও খাবার রান্না করত, তবে তিনি সেই খাবার খেতেন না। তিনি বলতেন— অনিচ্ছায় বা বিরক্ত মনে রান্না করা খাবারে কোনো বরকত থাকে না। এ থেকে বোঝা যায় যে, খাবার তৈরির সময় কতটা আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতার মিশেল থাকা প্রয়োজন।

৩. হাদিয়া ও মেহমানদারি: হাদিয়া বা উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি সুন্নতের অনুসরণ করতেন; কিন্তু মনে কখনোই উপহার বা নজরানা পাওয়ার বিন্দুমাত্র কামনা থাকত না। যখনই কেউ কোনো উপহার পেশ করত, তিনি তা কবুল করার পাশাপাশি তার বিনিময়ে অন্যকিছু তাকে দান করা জরুরি মনে করতেন; যাতে দাতার মনে কোনো কষ্ট না হয়; বরং সে খুশি হয়। তিনি মেহমানকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাঁর আরামের বিষয়ে খুব খেয়াল রাখতেন। খাবার কম হলে তা মেহমানের সামনে পেশ করে দিতেন। শীতের সময় কাপড়ের স্বল্পতা থাকলে নিজের পোশাকটিই মেহমানের হাতে তুলে দিতেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত কসর-এ আরিফান ছিল মূলত মারেফত ও তত্ত্বজ্ঞান প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে যে-ই আগমন করত, হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) নিজেই তার সেবাযত্ন করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল— আতিথেয়তা, আন্তরিকতা ও স্বাচ্ছন্দ্য আগন্তুকের হৃদয়কে নেক কাজের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাই সাধারণ মানুষের সেবা করাকে তিনি নিজের ওপর এক প্রকার আবশ্যক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

৪. কৃষির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ: তাঁর পেশা ছিল কৃষিকাজ। চাষাবাদের ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত সতর্কতা ও মানবিকতার পরিচয় দিতেন; এমনকি পশুপাখির প্রতিও কোনো কষ্ট না দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকতেন। এই কৃষিকর্ম থেকেই তাঁর জীবিকার ব্যবস্থা হতো। সেই আয়ের মাধ্যমেই তিনি নিজের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং আগত মেহমানদের সেবা করতেন। ফলে কসর-এ আরিফানে একদিকে যেমন ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা, অন্যদিকে তেমনি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সংযমী জীবনব্যবস্থা।[19]

তাঁর জুহদ:

তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও নিরাসক্তি ছিল বিস্ময়কর। ঘরে কোনো খাদেম বা সেবক ছিল না; এমনকি তাঁর নিজস্ব কোনো বাড়িও ছিল না। খাটে শোয়ার বিলাসিতাও তিনি গ্রহণ করেননি; বরং মেঝেতেই বিশ্রাম নিতেন। বিছানা বলতে ছিল কেবল একটি সাধারণ মাদুর (বোরিয়া)। কখনো কেউ যখন বিস্ময়ভরে জিজ্ঞেস করত— কেন তিনি এত সাধন ও দরবেশি জীবন বেছে নিয়েছেন, তখন তিনি হাসিমুখে বলতেন, “বন্দেগি (দাসত্ব) এবং খাজাগি (প্রভুত্ব বা বিলাসিতা) একসাথে চলতে পারে না।” তাঁর এই জীবনধারা কোনো বাধ্যবাধকতার ফল ছিল না; বরং তা ছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেছে নেওয়া পথ। কারণ তাঁর স্বভাবই ছিল সরলতা, সংযম ও দাসত্বের চেতনায় পরিপূর্ণ।[20]

সামা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি:

হজরত খাজা মুসাফির খাওয়ারিজমি (রহ.) নামে একজন প্রসিদ্ধ বুজুর্গ প্রায়ই হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর দরবারে আসতেন। তাঁর স্বভাব ছিল সামা বা আধ্যাত্মিক সংগীতের প্রতি অনুরাগী। একদিন তিনি তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন— হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর সামনে সামার একটি ব্যবহারিক প্রদর্শনী করবেন।

সেই অনুযায়ী তিনি কয়েকজন কাওয়ালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং হজরতের মজলিসে ‘দফ’ (এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সামা শুরু করেন। হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) তখন মজলিসে উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু তিনি তাদের বাধা দেননি বা কোনো আপত্তিও তোলেননি। মজলিস শেষ হওয়ার পর যখন এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি উত্তর দেন—

نَہ اِیں کَار مِی کُنَم، نَہ اِنکَار مِی کُنَم

নাহ ইঁ কার মি কুনাম, নাহ ইনকার মি কুনাম।

আমি নিজেও এই কাজ (সামা) করি না, আবার এর অস্বীকারও করি না।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। অর্থাৎ, তিনি নিজে সামার অনুশীলন করতেন না; তবে যারা করত তাদের প্রতিও বিরোধিতা প্রকাশ করতেন না। তাঁর এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়—আধ্যাত্মিক সাধনায় ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির প্রতি তিনি সহনশীল ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন।[21]

তাঁর কারামাত:

খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি রহমাতুল্লাহি আলাইহির অসংখ্য কারামত রয়েছে। যা বর্ণনা করে সহজে শেষ করা যাবে না। তাই আমরা এখানে তাঁর প্রসিদ্ধ কিছু কারামাত উল্লেখ করছি—

১. একদিন হজরত খাজা আলাউদ্দিন (রহ.) হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। সে সময় খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জোহরের নামাজের সময় কি হয়েছে?’

তিনি বিনয়ের সাথে আরজ করলেন, ‘এখনো হয়নি।’

এ কথা শুনে খাজা সাহেব বললেন, ‘একটু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো তো।’

নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। তখন তিনি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখলেন— অসংখ্য ফেরেশতা জোহরের নামাজে মশগুল হয়ে আছেন! এই দৃশ্য দেখার পর খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) মুচকি হেসে বললেন, ‘তুমি তো বলছিলে, এখনো সময় হয়নি।’[22]

২. হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর এক মুরিদ বর্ণনা করেন— সেই সময়ের কথা, যখন দশত-ই-কিপচাক থেকে আসা একটি বিশাল বাহিনী বোখারা আক্রমণ করে ব্যাপক রক্তপাত ঘটায় এবং অসংখ্য মানুষকে বন্দি করে নিয়ে যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার আপন ভাইও সেই বন্দিদের মধ্যে ছিল। ভাইয়ের শোকে আমার বৃদ্ধ বাবা একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, “বাবা, তুমি যদি আমার দোয়া আর সন্তুষ্টি চাও, তবে দশত-ই-কিপচাকের দিকে যাও এবং তোমার ভাইকে খুঁজে বের করে আনো।”

আমি যে-কোনো কঠিন সমস্যায় আমার মুর্শিদ হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর পরামর্শ নিতাম। তাই আমি তাঁর দরবারে হাজির হয়ে সবকিছু নিবেদন করলাম। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, “এখনই রওনা হও এবং তোমার পিতার সন্তুষ্টি অর্জন করো।”

আমি পরম শ্রদ্ধায় এক দিরহাম নজরানা হিসেবে তাঁর কাছে পেশ করলাম। তিনি তা গ্রহণ করলেন ঠিকই; কিন্তু পরক্ষণেই আবার আমাকে ফেরত দিয়ে বললেন, “এটি নিজের কাছেই রাখো, এর ওসিলায় অনেক বরকত হবে। আর সফরের পথে যখনই কোনো বিপদে পড়বে, আমার দিকে মনোনিবেশ করো।”

আমি তাঁর নির্দেশ মেনে পথে বেরিয়ে পড়লাম। লক্ষ্য করলাম, যাত্রাপথে সামান্য ব্যবসা করেই আমি অভাবনীয় লাভ করলাম এবং কোনো বড় বিঘ্ন ছাড়াই খাওরিজমে আমার ভাইকে খুঁজে পেলাম। এরপর আমরা একদল মুক্ত হওয়া বন্দিদের সঙ্গে নৌকায় চড়ে বোখারার দিকে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম। নৌকায় অনেক মানুষ ছিল। হঠাৎ মাঝনদীতে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া শুরু হলো এবং নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো। চারদিকে হাহাকার আর আর্তনাদ পড়ে গেল।

সেই চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে হঠাৎ আমার কানে কার যেন কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যে খাজা নকশবন্দ (রহ.)-কে স্মরণ করছিল। সাথে সাথে আমার মনে পড়ে গেল হজরতের সেই বিশেষ উপদেশ— “বিপদে পড়লে আমার দিকে মনোনিবেশ কোরো।”

আমি তৎক্ষণাৎ একাগ্রচিত্তে হজরতকে স্মরণ করলাম। আশ্চর্যের বিষয়, সাথেসাথেই আমি হজরতকে সশরীরে আমার সামনে দেখতে পেলাম! আমি তাঁকে সালাম জানালাম। তাঁর বরকতে মুহূর্তের মধ্যেই ঝড় থেমে গেল এবং নদীর উত্তাল ঢেউ শান্ত হয়ে এল। আমরা নিরাপদে তীরে পৌঁছলাম।

কিছুদিন পর আমি ও আমার ভাই বোখারায় পৌঁছে হজরতের খেদমতে হাজির হলাম এবং পরম ভক্তিভরে তাঁর কদমবুসি করলাম। আমাদের দেখে হজরত মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “তুমি যখন মাঝনদীতে বিপদে পড়ে আমাকে সালাম দিয়েছিলে, আমি তখনই তোমার সালামের জবাব দিয়েছিলাম; কিন্তু তুমি তা শুনতে পাওনি।”

৩. হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর এক ভক্ত বর্ণনা করেন— একবার আমার পঁচিশ দিনার হারিয়ে যায়। বিষয়টি হজরতের কাছে আরজ করা হলে তিনি বললেন, “এই দিনারগুলো ঐ বাড়ির দাসী নিয়েছে।”

এরপর তিনি সেই দাসীকে ডেকে দিনারগুলো ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তখন সেই দাসী চুরির কথা স্বীকার করল এবং জানাল যে, সে সেগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে।

সবাই যখন সেগুলো উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) আগেভাগেই বলে দিলেন, “বর্তমানে মাটির নিচে কেবল তিনটি দিনারই পুঁতে রাখা আছে।”

উপস্থিত সবাই হজরতের এই কথায় অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। এরপর যখন মাটি খুঁড়ে দেখা হলো, তখন দেখা গেল সত্যিই সেখানে ঠিক তিনটি দিনারই অবশিষ্ট রয়েছে।

৪. একদিনের ঘটনা, হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) তাঁর এক মুরিদকে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে কোথাও পাঠালেন। বিদায় দেওয়ার সময় তিনি পরম মমতায় সেই দরবেশকে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁর ওপর এক বিশেষ আধ্যাত্মিক দৃষ্টি (নজরে ইনায়াত) দান করলেন।

হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান শিষ্য কাজি মোহাম্মদ দরাতি সেই দরবেশের সামনে আগে আগে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ যেতেই দেখা গেল, সেই দরবেশ হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং তাঁর দেহ থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।

কাজি মোহাম্মদ এই অবস্থা দেখে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং দ্রুত হজরতের দরবারে ফিরে গিয়ে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। সংবাদ পাওয়া মাত্রই হজরত সেই দরবেশের মরদেহের কাছে ছুটে গেলেন। তিনি পরম করুণায় তাঁর পবিত্র কদম সেই মৃতপ্রায় দরবেশের বুকের ওপর রাখলেন। সাথেসাথেই দরবেশের শরীর নড়ে উঠল এবং তাঁর রুহ্ পুনরায় দেহে ফিরে এল।

পরবর্তীতে হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) এই রহস্যের পর্দা সরিয়ে বললেন, “আমি তাঁর রুহ্ চতুর্থ আসমানে খুঁজে পেয়েছিলাম এবং সেখান থেকেই তাকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছি।”

৫. এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় সৈয়্যদ, যিনি হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর একজন একনিষ্ঠ মুরিদ ছিলেন, তিনি এই অলৌকিক ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।

একবার হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন। হজের দিনগুলোতে যখন হাজিরা পশু কুরবানি দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তিনি বললেন, “আমরাও আজ কুরবানি দেব। আমার একটি ছেলে আছে, আমি তাকেই আল্লাহর পথে কুরবানি করে দিলাম।”

সফরে হজরতের সঙ্গে থাকা দরবেশরা এই কথাটি শুনে অবাক হলেন এবং হজের সেই নির্দিষ্ট দিন ও তারিখটি ডায়েরিতে লিখে রাখলেন। সফর শেষে যখন তাঁরা বোখারায় ফিরে এলেন, তখন এক বিস্ময়কর সত্য সবার সামনে উন্মোচিত হলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল— ঠিক যে দিনটিতে কাবা শরিফে অবস্থানকালে হজরতের পবিত্র জবান থেকে সেই কথাগুলো বেরিয়েছিল, ঠিক সেই দিনেই বোখারায় তাঁর সেই প্রিয় পুত্রটি ইন্তেকাল করেছিলেন।

৬. হজরত সৈয়্যদ আমির কুলাল (রহ.) এর জ্যেষ্ঠ পুত্র আমির বুরহান উদ্দিন এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন— একদিন হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) আমাদের ‘সোখার’ নামক স্থানের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সে সময় আমি তাঁর কাছে বিনয়ের সাথে আরজ করলাম, “হজরত মাওলানা আরিফের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার মন খুব ব্যাকুল হয়ে আছে। কিন্তু তিনি তো এখন অনেক দূরে ‘নাসাফ’ শহরে অবস্থান করছেন। আপনি যদি একটু তাওয়াজ্জুহ করেন, তবে তিনি দ্রুত এখানে চলে আসতেন।”

হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) আমার অনুরোধ শুনে বললেন, “ঠিক আছে, আমরা এখনই তাঁকে ডেকে নিচ্ছি।”

এরপর তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে খানকাহ’র ছাদে উঠলেন এবং সেখান থেকে উচ্চস্বরে তিনবার ‘মাওলানা আরিফ’কে ডাক দিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ছাদ থেকে নেমে এসে বললেন, “মাওলানা আরিফ আমাদের ডাক শুনতে পেয়েছেন এবং তিনি এই দিকেই রওনা দিয়েছেন।”

সত্যিই কিছুদিন পর মাওলানা আরিফ নাসাফ থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সোখার-এ এসে উপস্থিত হলেন। তখন তাঁকে হজরতের সেই অলৌকিক আহ্বানের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বিস্ময়ভরে বললেন, “ঠিক অমুক দিন এবং অমুক সময়ে আমি আমার বন্ধুদের সাথে বসে কথা বলছিলাম। হঠাৎ আমি পরিষ্কার শুনতে পেলাম হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) আমাকে ডাকছেন এবং বলছেন— ‘চলে এসো।’ সেই ডাক শোনার পর আমি আর এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারিনি; তৎক্ষণাৎ নাসাফ থেকে বোখারার দিকে রওনা হয়ে যাই।”

৭. এক ব্যক্তি সারা রাত তার প্রেমিকার সাথে অবৈধ আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত ছিল। পরদিন সকালে সে হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) এর দরবারে হাজির হয়ে এমন ভান করল, যেন সে দরবেশ ও নেককারদের সঙ্গ পাওয়ার জন্য খুব আগ্রহী।

হজরত তাকে দেখামাত্রই তার অন্তরের অবস্থা বুঝে ফেললেন এবং বললেন, “রাতে তো তুমি অমুক অমুক কাজে লিপ্ত ছিলে, আর দিনের বেলা আমাদের কাছে এসে এমন সাধু সাজছ!” হজরতের মুখে নিজের গোপন পাপের কথা শুনে সেই ব্যক্তি চরম লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলো।[23]

৮. খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর এক মুরিদ মুহাম্মদ জাহিদ একটি ঘটনা বর্ণনা করেন— “আমি মুরিদ হওয়ার কয়েক মাস পরের কথা। একদিন বসন্তকালে আমি শায়খের সামনে বসেছিলাম। হঠাৎ আমার মনে তরমুজ খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগল। এই চিন্তাটি বারবার মনে আসছিল।

তখন শায়খ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন— ‘হে মুহাম্মদ জাহিদ, আমাদের বাড়ির পাশের ঝরনার কাছে যাও এবং সেখানে যা দেখতে পাবে তা নিয়ে এসো; আমরা তা খাব।’

আমি ঝরনার কাছে গিয়ে দেখলাম পানির স্রোতের উপর একটি তাজা তরমুজ ভেসে তীরের কাছে এসে থেমে আছে। আমি সহজেই সেটি তুলে নিয়ে শায়খের কাছে ফিরে এলাম। পরে তরমুজটি কেটে উপস্থিত সবাইকে পরিবেশন করা হলো।”[24]

হাকিকতের জ্ঞান অর্জনের তিনটি পথ:

খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ.) হকিকতের জ্ঞান লাভের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পথের কথা উল্লেখ করেছেন—

মুরাকাবা (مراقبة) — ধ্যান বা গভীর মনোসংযোগ

মুশাহাদা (مشاهدة) — আধ্যাত্মিক দর্শন

মুহাসাবা (محاسبة) — আত্মসমালোচনা বা আত্মপর্যালোচনা

তিনি বলেন, “মুরাকাবার অবস্থায় সাধক সমগ্র সৃষ্টিজগতের কথা ভুলে যায় এবং কেবল সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার স্মরণে নিমগ্ন থাকে। মুশাহাদা-র অবস্থায় অদৃশ্য জগতের অনুপ্রেরণা সাধকের অন্তরে প্রবেশ করে। এ সময় দুই ধরনের আধ্যাত্মিক অবস্থা অনুভূত হয়—

১. এতে আল্লাহর জালাল বা মহিমার প্রতিফলন উপলব্ধি হয়।

২. এতে আল্লাহর সৌন্দর্য ও তাজাল্লিয়তের দীপ্তি প্রকাশ পায়।

মুহাসাবা-র অবস্থায় সাধক প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যায়ন করে দেখে— সে সময়টি আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত হয়েছে, নাকি দুনিয়াবি চিন্তায়।

তিনি আরও বলেন, সাধকের জন্য মূল নীতি হলো— শয়তানের কুমন্ত্রণা ও নফসের প্ররোচনা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করা। সম্ভব হলে তা হৃদয়ে প্রবেশের আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। অন্ততপক্ষে যখন তা মনে আসে, তখনই তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত। কারণ, একবার যদি এগুলো হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন সেগুলো হৃদয় থেকে অপসারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে “[25]

বাণী-চিরন্তনী:

১. অন্তরে আল্লাহর সাথে পরিচিত হও আর বাহ্যিকভাবে (দুনিয়ার মোহ থেকে) বিচ্ছিন্ন থাকো; পৃথিবীতে এমন সুন্দর চলার পথ আর খুব কমই আছে।

২. সব সময়, সব স্থানে এবং সব মানুষের সাথে পার্থিব কাজে ব্যস্ত থাকো; কিন্তু তোমার চোখ ও মনকে গোপনে সেই প্রিয়তমের (আল্লাহর) দিকে নিবদ্ধ রাখো।[26]

৩. একবার হজরত খাজা নকশবন্দ (রহ.)-এর কাছে কেউ কারামত দেখার দাবি করলে তিনি উত্তর দিলেন, “আমাদের কারামত তো সবার সামনেই প্রকাশ্য যে, এত গুনাহ করা সত্ত্বেও আমরা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি, মাটির নিচে ধসে যাচ্ছি না।”

৪. যদি কোনো অলি কোনো বাগানে যান এবং প্রতিটি গাছ ও পাতা থেকে ‘ইয়া অলি’ ধ্বনি শোনা যায়, তবুও তার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়; বরং সর্বক্ষণ বন্দেগি ও বিনয়ে মগ্ন থাকা উচিত।

৫. মুরিদের মধ্যে আধ্যাত্মিক অবস্থার পরিবর্তন হওয়াটাই পীরের প্রকৃত কারামত।[27]

তাঁর ইন্তেকাল:

সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ মাওলানা মুহাম্মদ মিসকিন (রহ.) বর্ণনা করেন, যখন বোখারায় শেখ নুরুদ্দিন খালওয়াতি (রহ.) ইন্তেকাল করেন, তখন হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) তাঁর জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উপস্থিত লোকজন উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করেন এবং অনেকে বিলাপ করছিলেন। এতে উপস্থিত অন্যদের মাঝে অস্বস্তি তৈরি হলো এবং তারা তাঁদের নিষেধ করতে লাগলেন। তখন হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) বললেন, “যখন আমার জীবনের শেষ সময় আসবে, তখন আমি দরবেশদের জানাব যে, মৃত্যু আসলে কেমন (অর্থাৎ কতটা শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ হয়)।”

মাওলানা মিসকিন বলেন, খাজা সাহেবের সেই কথাটি সবসময় আমার মনে গেঁথে ছিল। অবশেষে যখন হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাঁর ইন্তেকালের অসুস্থতায় আক্রান্ত হলেন, তখন তিনি একটি খানকাহতে অবস্থান নিলেন। অসুস্থতার পুরো সময়টা তিনি সেখানেই ছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা সবসময় তাঁর খেদমতে নিয়োজিত থাকতেন। হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাদের প্রত্যেকের প্রতি বিশেষ স্নেহ ও মনোযোগ প্রদর্শন করতেন।

ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর জীবনের শেষ নিঃশ্বাসগুলোতে হাত তুলে আসমানের দিকে মোনাজাত শুরু করলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একাগ্রচিত্তে দোয়া করলেন। এরপর তিনি তাঁর পবিত্র হাত দুটি নিজ মুখমণ্ডলে মাসাহ করলেন এবং সেই অবস্থাতেই এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে গেলেন।

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.)-এর অন্যতম খাদেম খাজা আলী দামাদ বলেন, হজরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.) তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় আমাকে তাঁর কবর খনন করার আদেশ দিলেন (যেটি বর্তমানে তাঁর আলোকিত মাজার)। কবর খনন শেষ করে যখন আমি তাঁর কাছে আসলাম, তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হলো যে, তিনি তাঁর পরে আধ্যাত্মিক পরিচালনার দায়িত্ব কার ওপর অর্পণ করবেন?

তখন তিনি তাঁর মোবারক মাথা তুললেন এবং বললেন, “আমি হজের সফরে যে কথাটি বলেছিলাম সেটিই চূড়ান্ত; (আর তা হলো) যে ব্যক্তি খাজা বাহাউদ্দিনকে দেখতে চায়, সে যেন খাজা মুহাম্মদ পারসাকে দেখে।” এই কথা বলার পরদিন তিনি মহান আল্লাহর রহমতের সান্নিধ্যে চলে গেলেন।

হজরত খাজা আলাউদ্দিন আত্তার (রহ.) বলেন, “হজরত খাজার ইন্তেকালের সময় আমি তাঁর শিয়রে বসে সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করছিলাম। যখন আমি সুরার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছালাম, তখন চারদিকে নুরের জ্যোতি প্রকাশ পেতে শুরু করল। এরপর আমি কালিমায়ে তাইয়্যেবা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠে মগ্ন হলাম এবং এর পরপরই হজরত খাজার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।”

তিনি ৭৯১ হিজরি সনের ৩রা রবিউল আউয়াল, সোমবার দিবাগত রাতে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। এ উপলক্ষে রচিত ফারসি কবিতাটি নিম্নরূপ—

رفت شاه نقشبندان خواجه دنیا و دین

آنکه بودي شاه راه دین و دولت ملتش

مسكن ومأواي أو چون بود قصر عارفان

قصر عرفان زین سبب آمد حساب رحلش

রফত শাহে নকশবন্দান খাজা-এ দুনিয়া ও দ্বীন

আঁকে বুদি শাহে রাহে দ্বীন ও দৌলত মিল্লাতাশ

মাসকান ও মাওয়ায়-এ ও চুন বুদ কসরে আরেফান

কসরে এরফান যিন সাবাব আমাদ হিসাব রেহলাশ

অনুবাদ: নকশবন্দিগণের সুলতান, দুনিয়া ও দ্বীনের খাজা বিদায় নিয়েছেন; যিনি ছিলেন দ্বীন ও মিল্লাতের রাজপথের দিশারি। যেহেতু তাঁর বাসস্থান ছিল ‘কসরে আরেফান’ গ্রামে, তাই তাঁর ইন্তেকালের সালটি ‘কসরে এরফান’ শব্দগুচ্ছ থেকেই বের হয়ে আসে (অর্থাৎ এর গাণিতিক মান ৭৯১)।

খলিফাগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর প্রধান ও পূর্ণাঙ্গ খলিফাগণ ছিলেন খাজা আলাউদ্দিন আত্তার এবং খাজা মুহাম্মদ পারসা (রহ.)। এ-ছাড়া তাঁর অসংখ্য সঙ্গী ও খাদেম ছিলেন, যাদের গণনা করা সম্ভব নয়। [28]