হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন কেবল একজন বুজুর্গের জীবন নয়; বরং একটি যুগের পুনর্জাগরণের ইতিহাস। তিনি এমন সময়ে আবির্ভূত হন, যখন মুসলিম সমাজে আধ্যাত্মিক দুর্বলতা ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি ক্রমে বেড়ে যাচ্ছিল। মানুষ বাহ্যিক আড়ম্বরের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, অথচ শরিয়ত ও সুন্নাহর প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছিল। ঠিক সেই কঠিন সময়েই তিনি ইসলামের প্রকৃত চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এগিয়ে আসেন এবং নিজের ইলম, তাসাওউফ ও দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে সমাজকে নতুন দিকনির্দেশনা দেন।
জন্ম:
ভারতের সিরহিন্দের মাটিতে ফারুকি বংশের এক স্বনামধন্য পরিবারে, শেখ আব্দুল আহাদ (রহ.)-এর ঘরে, ৯৭১ হিজরি সনের ১৪ই শাওয়াল, জুমাবার দিবাগত রাতে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। এই পরিবারের বংশলতিকা সরাসরি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.)-এঁর সাথে যুক্ত। বংশধারাটি সাতাশটি ধাপ অতিক্রম করে হজরত ফারুক-এ-আজম (রা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় ‘আহমদ’, কুনিয়াত ‘আবুল বারাকাত’ এবং লকব দেওয়া হয় ‘বদরুদ্দিন’। তবে বিশ্বজুড়ে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ‘ইমাম রব্বানি’ এবং ‘মুজাদ্দেদে আলফে সানি’ উপাধিতে।[1]
সিরহিন্দের ইতিহাস:
মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর পঞ্চম ঊর্ধ্বপুরুষ হজরত ইমাম রফিউদ্দিন ফারুকি সোহরাওয়ার্দী (রহ.) ছিলেন মাখদুম জাহানিয়া জালালুদ্দিন বুখারি (রহ.)-এঁর খলিফা। হিন্দুস্তানে আগমনের পথে ‘সরাইস’ ও ‘সামানা’-এঁর মধ্যবর্তী বিপজ্জনক জঙ্গলে একটি শহর আবাদ করার প্রয়োজন দেখা দিলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের নির্দেশে কেল্লা নির্মাণ শুরু হয়, কিন্তু প্রতিদিন রাতে তা ভেঙে পড়ত। পীরের নির্দেশে স্বয়ং ইমাম রফিউদ্দিন (রহ.) গিয়ে কেল্লার ভিত্তি স্থাপন করলে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং ‘শের-এ-হিন্দ’ নামের সেই জঙ্গল ধীরে ধীরে ‘সিরহিন্দ’ নামের জনপদে রূপ নেয়। পরিবারের আদি পুরুষ শেখ শাহাবুদ্দিন ফারাহ শাহ কাবুলি আফগানিস্তান থেকে উপমহাদেশে এসেছিলেন এবং বংশধারায় ষষ্ঠপুরুষ শেখ রফিউদ্দিন সিরহিন্দে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এই সিরহিন্দেই পরবর্তীকালে মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর পিতা শেখ আব্দুল আহাদ (রহ.) বসবাস করতেন, যিনি চিশতিয়া ও কাদেরিয়া উভয় তরিকার ফয়েজপ্রাপ্ত একজন উচ্চমর্যাদার বুজুর্গ ছিলেন এবং এই পবিত্র শহরেই মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর জন্ম হয়।[2]
মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এঁর সম্মানিত পিতা হজরত শায়খ আবদুল আহাদ ফারুকি (রহ.) ছিলেন একজন শক্তিশালী আলেম ও পরিপূর্ণ অলি, যিনি যৌবনে আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্যে শায়খ আবদুল কুদ্দুস চিশতি (রহ.)-এঁর কাছে গেলে তিনি আগে ইলম সম্পূর্ণ করতে বলেন। আদেশ অনুযায়ী ইলম অর্জন করে ফিরে এসে দেখেন শায়খ ইন্তিকাল করেছেন। অতঃপর শায়েখের পুত্র শায়খ রুকনুদ্দীন (রহ.) তাঁকে চিশতি ও কাদরি উভয় তরিকার খেলাফত দান করেন। দীর্ঘ সফর শেষে তিনি সিরহিন্দে স্থায়ী হন এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত ফিকহ, উসুল ও তাসাওউফের দরস দেন; ফুসুসুল হিকম, আওয়ারিফুল মা’আরিফ-সহ বিখ্যাত কিতাবগুলো পড়াতেন এবং ‘কুনুযুল হাকায়িক’ ও ‘আসরারুত তাশাহহুদ’ নামে গ্রন্থও রচনা করেন। ৮০ বছর বয়সে ১০০৭ হিজরিতে তাঁর ইন্তিকাল হয় এবং তাঁর মাজার সিরহিন্দের পশ্চিম পাশে অবস্থিত।[3]
শৈশবের অলৌকিক ঘটনা:
শৈশবে যখন তিনি দুগ্ধপোষ্য শিশু, তখন একবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা এতটাই গুরুতর ছিল যে, পরিবারের সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েন। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে তাঁকে হজরত শাহ কামাল কাইথালি (রহ.)-এঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। শাহ কামাল কাইথালি (রহ.) যখন শিশু আহমদ সিরহিন্দির মুখমণ্ডলের দিকে তাকালেন, তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি অনুভব করলেন। তিনি পরম মমতায় নিজের জবান মুবারক শিশু মুজাদ্দেদে আলফে সানির মুখে দিলেন। যদিও তখন তাঁর দুধ পানের বয়স ছিল, তবুও তিনি সেই বরকতময় জবানের মাহাত্ম্য বুঝতে পেরেছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ তা চুষতে থাকেন। হজরত শাহ কাইথালি (রহ.) তখন তাঁর পিতাকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, “এই শিশুর ব্যাপারে চিন্তিত হবেন না। সে দীর্ঘজীবী হবে এবং জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত মূর্তপ্রতীক হয়ে উঠবে।” ইতিহাস পরবর্তীতে এই বাণীর সত্যতা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছে।[4]
জ্ঞানার্জন:
হজরত শায়খ মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন নিজের ঘর থেকেই। অল্প সময়ে তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন, অতঃপর প্রচলিত পাঠ্যক্রমে মনোনিবেশ করেন। প্রাথমিক জ্ঞান তিনি তাঁর প্রিয় পিতার তত্ত্বাবধানে অর্জন করেন। এটি তাঁর সৌভাগ্যের বিষয় যে, তাঁর নিজ গৃহই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎসস্থল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। পিতা ছিলেন সেই যুগের একজন বিশিষ্ট আলেম। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি যেমন বাহ্যিক জ্ঞানে পারদর্শী হলেন, তেমনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানেও সমৃদ্ধ হন।
প্রাথমিক মেধা ও মৌলিক শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জনের পর, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) উচ্চতর জ্ঞান অন্বেষণে ঘর ত্যাগ করেন। তিনি সেই সকল শিক্ষাকেন্দ্রে হাজিরা দেন, যেখান থেকে জ্ঞান বৃদ্ধি ও উন্নতির আশা করা যেত।
শিয়ালকোটে অবস্থান ছিল তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে তিনি হজরত শেখ কামাল কাশমিরি (রহ.)-এঁর দরসে অংশ নেন। সেই দরসগাহ ছিল তৎকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। আল্লামা আব্দুল হাকিম শিয়ালকোটি (রহ.) এবং মুঘল সাম্রাজ্যের উজির সাদুল্লাহ খানও এখান থেকেই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) হজরত কামাল কাশমিরি (রহ.)-এঁর তত্ত্বাবধানে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের সমস্ত কিতাব অধ্যয়ন করেন।
তিনি ইলমে হাদিস শিক্ষা লাভ করেন হজরত মাওলানা ইয়াকুব কাশমিরি (রহ.)-এঁর কাছ থেকে। মাওলানা ইয়াকুব কাশমিরি ইলমে হাদিসে তাঁর সময়ের অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন; তিনি কেবল উপমহাদেশের উলামায়ে কেরামই নন; বরং আরব বিশ্বের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের কাছেও হাদিস শ্রবণ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হজরত আল্লামা ইবনে হাজার মাক্কি (রহ.)।
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) আল্লামা ইয়াকুব কাশমিরির কাছ থেকে প্রচুর জ্ঞান ও ফয়েজ লাভ করেন। এছাড়াও হজরত মাওলানা শেখ মুহাম্মদ ইয়াকুব সরফি কাশমিরি (রহ.)-এঁর নিকট হাদিস শাস্ত্রের কিতাবসমূহ পাঠ করেন এবং হাদিসের সনদ (অনুমতিপত্র) লাভ করেন। হজরত কাজী বাহলুল বদখশী (রহ.)-এঁর নিকট ‘কাসিদায়ে বুরদাহ শরিফ’, ছাড়াও তাফসির ও হাদিসের অনেক কিতাব পাঠ করেন।
এভাবে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) তৎকালীন প্রচলিত সমস্ত উচ্চতর পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন এবং নিজ জন্মভূমি সিরহিন্দে ফিরে আসেন, যাতে তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার মিশনের সহযোগী ও উত্তরসূরি হতে পারেন।[5]
পাঠদান:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে ভারতের আগ্রায় তাশরিফ আনেন এবং সেখানে পাঠদান শুরু করেন। তাঁর দরবারে সে সময়ের বহু বিশিষ্ট আলেম ও পণ্ডিত এসে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ঝরনাধারায় সিক্ত হন।[6]
হজরত সাইয়্যিদুনা মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)–এর পাঠদানের ধরন ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয়। তিনি তাফসিরে বায়যাভি, সহিহ বুখারি শরিফ, মিশকাত শরিফ, হিদায়া, শরহে মাওয়াকিফসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের দরস দিতেন। পাঠদান করার পাশাপাশি তিনি ছাত্রদের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিকের সংশোধনের সুন্দর উপদেশও দিতেন।
ইলমে দ্বীনের ফজিলত ও উপকারিতা বর্ণনা করে তিনি ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করতেন। যখন কোনো ছাত্রের মধ্যে অলসতা বা দুর্বলতা লক্ষ্য করতেন, তখন অত্যন্ত উত্তম ও কোমল পদ্ধতিতে তার সংশোধন করতেন। এ সম্পর্কে হজরত বদরুদ্দীন সিরহিন্দি (রহ.) বলেন, “যৌবনকালে কখনো কখনো আমার ওপর এমন অবস্থা এসে যেত যে, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ পেতাম না। তখন তিনি অত্যন্ত স্নেহ ও মমতার সঙ্গে বলতেন, ‘সবক নিয়ে এসো এবং পড়ো; কারণ অজ্ঞ সুফি তো শয়তানের খেলনা।”[7]
মাজহাব:
তিনি হানাফি ছিলেন। ইমামে আজম (রহ.)-এঁর প্রতি অপরিসীম ভক্তি ও ভালোবাসা পোষণ করতেন। হজরত সাইয়্যিদুনা ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)-এঁর সুউচ্চ মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বুজুর্গদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইমাম, মহিমান্বিত ইমাম এবং পরিপূর্ণ পথপ্রদর্শক ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এঁর সুউচ্চ শান ও মান সম্পর্কে আমি আর কী লিখব, তিনি সমস্ত আইম্মায়ে মুজতাহিদিন (রহ.); চাই তিনি ইমাম শাফেয়ি হোন, ইমাম মালেক হোন কিংবা ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) হোন; তাঁদের সবার চেয়ে বড়ো আলেম এবং সবচেয়ে বেশি পরহেজগার ও মুত্তাকি ছিলেন।”[8]
কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ:
তিনি এত বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, সফরকালেও তা বাদ যেত না। অনেক সময় তিনি পথে চলতে চলতেই তিন থেকে চার পারা পর্যন্ত তিলাওয়াত সম্পন্ন করে ফেলতেন। এই দীর্ঘ তিলাওয়াতের সময় যদি কোনো সিজদার আয়াত আসতো, তবে তিনি সাথে সাথে বাহন থেকে নিচে নেমে সিজদা আদায় করতেন।[9]
সুন্নতের কঠোর অনুসরণ:
সুন্নাত আদায়ের ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে শোয়া এবং জাগার সুন্নতও বাদ পড়তো না। একবার রমজানুল মোবারকের শেষ দশকে তারাবিহ নামাজের পর বিশ্রামের জন্য তিনি অন্যমনস্কভাবে বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েন। এমন সময় একজন খাদেম তাঁর পা টিপতে শুরু করল। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল যে, ডান দিকে কাত হয়ে শোয়ার যে সুন্নত রয়েছে, তা পালন করা হয়নি। তাঁর নফস তাঁকে কিছুটা প্রবঞ্চনা দিতে চাইল যে, ভুলে এমনটা হয়ে গেলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে বসলেন এবং সুন্নতি তরিকা অনুযায়ী ডান কাতে শুয়ে আরাম করতে লাগলেন।
তিনি নিজেই বর্ণনা করেন, “এই সুন্নতের ওপর আমল করা মাত্রই আমার ওপর বিশেষ অনুগ্রহ, বরকত এবং সিলসিলার নুর বা জ্যোতি প্রকাশ পেতে লাগল। এক অদৃশ্য আওয়াজ এলো— ‘সুন্নতের ওপর আমল করার কারণে আখেরাতে আপনাকে কোনো প্রকার আজাব বা শাস্তি দেওয়া হবে না এবং আপনার পা টিপে দেওয়া ওই খাদেমকেও ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।”[10]
বিনয়:
হজরত সাইয়্যিদুনা মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) ইরশাদ করেন, “একদিন আমি আমার সাথিদের নিয়ে বসে নিজের দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতা নিয়ে গভীর চিন্তা করছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে আমার বিনয়-নম্রতা প্রবল হয়ে উটল। ঠিক “مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ اللهُ – যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ পাক তাকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করেন” হাদিস শরিফের এই মর্ম অনুযায়ী। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এই গায়েবি সম্বোধন এলো غَفَرْتُ لَكَ وَلِمَنْ تَوَسَّلَ بِكَ بِوَاسِطَةٍ أَوْ بِغَيْرِ وَاسِطَةٍ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ – আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসা ওই সমস্ত মানুষকেও ক্ষমা করে দিলাম, যারা তোমার ওসিলায়; সরাসরি হোক বা কোনো মধ্যস্থতার মাধ্যমে হোক আমি পর্যন্ত পৌঁছবে। এরপর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো যেন আমি এই সুসংবাদটি সবার সামনে প্রকাশ করি।”[11]
বাতিল মতবাদের মোকাবেলা:
সে সময় ‘মাজালিসুল মুমিনিন’ নামক একটি গ্রন্থের খুব চর্চা ছিল, যাতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদার ওপর চরম আক্রমণ করা হয়েছিল। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) দেখলেন যে মুঘল দরবারের কিছু প্রভাবশালী সদস্য এই প্রচারণার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এটি তাঁর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। টগবগে যৌবন আর ধমনীর ‘ফারুকি’ রক্ত তখন মধ্যগগনে; তাই তিনি এই ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে ‘রিসালায়ে রদ্দে শিয়া’ তথা শিয়া মতবাদের খণ্ডন রচনা করেন। এর ফলে কেবল সাধারণ মহলেই নয়; বরং রাজ দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাঝেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সত্যনিষ্ঠ মহান পুরুষ, যিনি ছিলেন সত্যের আমানতদার, তিনি এসব শত্রুতাপূর্ণ আচরণে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি এবং সত্যের প্রশ্নে কোনো আপস করেননি।
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানির বিখ্যাত পুস্তিকা ‘রিসালায়ে তাহলিলিয়াহ’ এবং ‘রিসালায়ে ইসবাতুন নুবুওয়াত’ ঐ সময়েরই অমর সৃষ্টি। এই পুস্তিকাগুলো আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, দ্বীন সংস্কারের এই রাহবার শুরু থেকেই কতটা প্রজ্ঞাবান ও সচেতন ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার এই দৃঢ় ভিত্তিই সারাজীবন তাঁকে শক্তি যুগিয়েছে এবং শক্তিশালী দলিলের মাধ্যমে দ্বীনের সত্যতা প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকার সাহস জুগিয়েছে।[12]
আগ্রা সফর, ফয়েজি এবং আবুল ফজলের সাথে সাক্ষাৎ:
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) মুঘল দরবারের কিছু প্রভাবশালী সদস্যের সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন যে, কীভাবে তাদের ভ্রান্ত চিন্তাধারা সম্রাটের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি এটিও জানতে পেরেছিলেন যে, সেখানে এমন সব তথাকথিত ‘যুক্তিবাদের’ প্রদর্শনী চলছে, যা সাধারণ মুসলিম জনগণের বিশ্বাস বা আকিদাকে টলিয়ে দিচ্ছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই ফিতনাগুলোকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং সেখানকার সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সহায়তা করবেন।
সেই উদ্দেশ্যে তিনি আগ্রায় আগমন করেন। সে সময় সেখানে দুই ভাই ফয়েজি এবং আবুল ফজলের পাণ্ডিত্যের জয়জয়কার চলছিল। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) তাঁদের উভয়ের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলেন, যাতে পরিস্থিতি সংশোধনের কোনো পথ বের করা যায়। আবুল ফজল, যিনি সেই যুগের এমন এক অনন্য গদ্যশিল্পী ছিলেন, যার লেখালিখি আজও জাদুকরী বলে গণ্য করা হয়, তাঁর সাথে হজরত মুজাদ্দেদের সাক্ষাৎ হলো এবং সুসম্পর্কও গড়ে উঠল।
কিন্তু একদিন আবুল ফজল তার পাণ্ডিত্যের অহংকারে মত্ত হয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সম্পর্কে অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ ও অবমাননাকর মন্তব্য করে বসল। এতে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন এবং তৎক্ষণাৎ মজলিস ত্যাগ করলেন। বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর এই কঠোর প্রতিক্রিয়ায় আবুল ফজলের অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং সে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়েছিল।
আবুল ফজলের বড় ভাই ফয়েজি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অত্যন্ত বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর সাহিত্যের প্রতি দক্ষতার আতিশয্য এতটাই ছিল যে, তিনি পবিত্র কুরআনের একটি তাফসির লিখতে উদ্যোগী হন। নিজের অগাধ পাণ্ডিত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তিনি এমন এক অদ্ভুত শর্ত আরোপ করেন যে, তাফসিরের কোনো শব্দেই কোনো ‘নুক্তা’ বা বিন্দুওয়ালা বর্ণ (যেমন: বা, জিম, ফা ইত্যাদি) থাকবে না। অর্থাৎ, পুরো তাফসিরটি তিনি কেবল নুক্তাবিহীন বর্ণ দিয়ে লেখার সংকল্প করেন। তাঁর রচিত সেই ‘সাওয়াতিউল ইলহাম’ গ্রন্থটি আজও ফয়েজির সাহিত্য-জ্ঞানের উজ্জ্বল প্রমাণ।
শোনা যায়, তাফসিরটি লেখার সময় এক পর্যায়ে ফয়েজির কলম থমকে যায়। তিনি তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও যুক্তিশৈলী প্রয়োগ করেও সেই জট খুলতে পারছিলেন না। ঠিক সেই দিনগুলোতেই হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) আগ্রায় অবস্থান করছিলেন। নিরুপায় হয়ে ফয়েজি হজরত মুজাদ্দেদের শরণাপন্ন হন। তিনি কাঙ্ক্ষিত সেই ভাব ও অর্থগুলোকে নুক্তাবিহীন শব্দেই সাবলীলভাবে ব্যক্ত করে দিলেন। ফয়েজি এতে প্রচণ্ড অভিভূত হন এবং এর পর থেকে মাঝেমধ্যেই তাঁর কাছে জ্ঞানতাত্ত্বিক সহযোগিতা চাইতে থাকেন। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ আরবি বর্ণমালার প্রায় অর্ধেক বর্ণই নুক্তাযুক্ত; আর সেই নুক্তাযুক্ত বর্ণগুলো বাদ দিয়ে কেবল নুক্তাহীন বর্ণ দিয়ে গূঢ় অর্থ প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব এক কাজ। ফয়েজির ‘সাওয়াতিউল ইলহাম’ আজও ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনে আছে, তবে সত্য কথা হলো— এটি ভাষার ওপর দক্ষতার প্রমাণ দিলেও একে ‘তাফসির’ বলা কঠিন। কারণ, তাফসিরের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থকে সহজ করা এবং চিন্তাধারাকে পৌঁছে দেওয়া। অথচ এখানে শব্দের মারপ্যাঁচে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।[13]
বিবাহ এবং সিরহিন্দে প্রত্যাবর্তন:
আগ্রায় জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর সেখানে অবস্থান দীর্ঘায়িত হয়। এই অবস্থান যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, তখন তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা বার্ধক্য সত্ত্বেও নিজে আগ্রায় এসে তাঁকে নিয়ে ফিরতি পথ ধরেন। ফেরার পথে তাঁরা থানেশ্বর নামক স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে থানেশ্বরের প্রভাবশালী প্রধান হাজি সুলতান থানেশ্বরী তাঁদের আতিথেয়তার অনুরোধ করেন। হাজি সুলতান ছিলেন অত্যন্ত গুণী মানুষ এবং আলেম ও সুফিদের একনিষ্ঠ ভক্ত।
ঘটনাচক্রে কয়েকদিন আগে একটি স্বপ্ন হাজি সুলতানকে ব্যাকুল করে তুলেছিল। স্বপ্নে তিনি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জিয়ারত লাভ করেন। সেখানে রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি তাঁর কন্যার বিবাহ এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সাথে দেন, যার চেহারা তিনি স্বপ্নেই দেখে নিয়েছিলেন। ফলে তিনি সেই চেহারার মানুষটির অপেক্ষায় ছিলেন। যখনই তিনি হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-কে দেখলেন, তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, ইনিই সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি। কোনো দীর্ঘ ভূমিকা ছাড়াই তিনি বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলেন।
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর পিতা এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বললেন, “রসুলুল্লাহ ﷺ এঁর নির্দেশ অমান্য করার চিন্তা কার মনে আসতে পারে!” এভাবে ২৫ বছর বয়সে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। হাজি সুলতান সাহেব বেশ বিত্তবান ছিলেন, তাই তাঁর সহধর্মিণীর সাথে অনেক ধনসম্পদও প্রাপ্তি ঘটে। বিষয়টিকে তিনি আল্লাহর বিশেষ দান হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সিরহিন্দে ফিরে একটি নতুন বাসভবন ক্রয় করেন। এর পাশেই তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যাতে তাঁর অনুসারীদের আবাসন এবং ইবাদতের সুব্যবস্থা হয়।[14]
শোকে জর্জরিত, অতঃপর হজের সফর:
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর সিরহিন্দে সংস্কারমূলক কাজ যখন গতি পাচ্ছিল, তখন একই মাসে একের পর এক শোক তাঁকে ঘিরে ধরল। প্রথমে তাঁর শ্বশুর হাজি সুলতান থানেশ্বরী, যিনি ধর্মবিরোধীদের ষড়যন্ত্র ও সম্রাট আকবরের বিদ্বেষের শিকার হয়ে ১০১৭ হিজরির ২রা জমাদিউল আখিরা ফাঁসিতে শহিদ হন। মাত্র পঁচিশ দিন পর তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা শায়খ আব্দুল আহাদ (রহ.) আশি বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। পিতার বিচ্ছেদ ছিল অসহনীয়, কারণ তিনি ছিলেন মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর দ্বীনি শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। ‘মাবদা ও মা’আদ’ গ্রন্থে তিনি স্বীকার করেছেন যে ‘নিসবতে ফারদিয়াত’-এর মতো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক সম্পদ এবং নফল ইবাদতের তাওফিক তিনি পিতার মাধ্যমেই লাভ করেছেন। এই দ্বৈত শোকের আঘাত এবং দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে অবশেষে ১০০৮ হিজরিতে তিনি হারামাইন শরিফাইনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।[15]
ইজাজত ও খেলাফত:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সিলসিলায় ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. সিলসিলায়ে সোহরাওয়ার্দীয়া কুবরাবিয়া: তাঁর উস্তাদ হজরত শেখ ইয়াকুব কিাশমিরি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে এই তরিকার ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেন।
২. সিলসিলায়ে চিশতিয়া ও কাদেরিয়া: তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা হজরত শেখ আব্দুল আহাদ চিশতি কাদেরি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে এই দুই তরিকার ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেছিলেন।
৩. সিলসিলায়ে কাদেরিয়া: সিরহিন্দের নিকটবর্তী কাইথল এর প্রখ্যাত বুজুর্গ হজরত শাহ সিকান্দার কাদেরি (রহ.)-এঁর নিকট থেকেও তিনি এই তরিকার ইজাজত ও খেলাফত প্রাপ্ত হন।
৪. সিলসিলা নকশবন্দিয়া: হজরত খাজা মুহাম্মদ বাকি বিল্লাহ নকশবন্দি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে তিনি এই তরিকার ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেন।[16]
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) প্রধান তিনটি সিলসিলায় তাঁর আধ্যাত্মিক নিসবত সম্পর্কে এভাবে উল্লেখ করেছেন, “আমি বিভিন্ন মাধ্যমে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কযুক্ত। নকশবন্দিয়া সিলসিলায় ২১ জন, কাদেরিয়া সিলসিলায় ২৫ জন এবং চিশতিয়া সিলসিলায় ২৭ জন মধ্যবর্তী মহাপুরুষের মাধ্যমে (আমার সিলসিলা রসুলুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছেছে)।”[17]
গাউসে পাকের বরকতময় খিরকা অর্পণ:
হজরত গাউসু আজম আবদুল কাদের জিলানি রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাঁর পবিত্র খিরকা (খিলাফতের পোশাক) তাঁর উত্তরসূরি ও পুত্র সাইয়্যিদ তাজউদ্দীন আবদুর রাজ্জাক (রহ.)–এঁর কাছে অর্পণ করেছিলেন, যাতে তিনি তা যথাযথ ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দেন। পরবর্তীতে এই আমানত ক্রমান্বয়ে হজরত শাহ সিকান্দার কাদেরি (রহ.)–এঁর কাছে পৌঁছায়। একদিন তাঁর দাদা শাহ কামাল কাইথলী (রহ.) স্বপ্নে উপস্থিত হয়ে বললেন, “এই বরকতময় খিরকাটি শায়খ আহমদ সিরহিন্দির হাতে অর্পণ করে দাও।” তিনি কিছুটা দ্বিধা করলেন। দ্বিতীয়বার স্বপ্নে এসে তাঁকে আবারও এ বিষয়ে জোর দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হলো। তবুও তিনি বিষয়টি বিলম্ব করলেন। তৃতীয়বার স্বপ্নে কঠোরভাবে বলা হলো, “যদি তুমি নিজের কল্যাণ এবং বংশের মর্যাদা রক্ষা করতে চাও, তবে এই খিরকা তার প্রকৃত উত্তরাধিকারীর হাতে অর্পণ করো; নচেৎ তোমার বংশের মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক সম্মান সবকিছুই কেড়ে নেওয়া হবে।”
এই সতর্কবার্তা শুনে শাহ সিকান্দার (রহ.) ভীত হয়ে পবিত্র খিরকা নিয়ে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)–এঁর খেদমতে উপস্থিত হন। সকালে তিনি খিরকা শরিফ তাঁর হাতে অর্পণ করেন এবং কাদেরিয়া তরিকার খেলাফতও তাঁকে দান করেন। হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) সেই বরকতময় খিরকা পরিধান করেন এবং তাঁর উপর কাদেরিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।[18]
তরিকতের শাজরা শরিফ:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)–এঁর আধ্যাত্মিক সিলসিলা হলো—
১. সাইয়্যিদুনা রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
২. হজরত সাইয়্যিদুনা আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু
৩. হজরত সালমান ফারসী রাদিআল্লাহু আনহু
৪. হজরত কাসিম ইবনে আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু
৫. হজরত ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)
৬. হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)
৭. শায়খ আবুল হাসান খারকানী (রহ.)
৮. শায়খ আবুল কাসিম গুরগানী (রহ.)
৯. শায়খ বু আলী ফারমী (তুসী) (রহ.)
১০. খাজা ইউসুফ হামদানী (রহ.)
১১. শায়খ আবদুল খালিক গিজদুওয়ানী (রহ.)
১২. শায়খ খাজা আরিফ রেওগারী (রহ.)
১৩. খাজা মাহমুদ আঞ্জির ফাগনাভী (রহ.)
১৪. খাজা আজিজান আলী রামিতানী (রহ.)
১৫. খাজা মুহাম্মদ বাবা সামাসী (রহ.)
১৬. খাজা সাইয়্যিদ শামসুদ্দীন আমীর কুলাল (রহ.)
১৭. খাজা-এ-খাজেগান হজরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ.)
১৮. খাজা আলাউদ্দীন আত্তার (রহ.)
১৯. খাজা ইয়াকুব চারখী (রহ.)
২০. খাজা উবাইদুল্লাহ আহরার (রহ.)
২১. হজরত মাওলানা মুহাম্মদ জাহিদ (রহ.)
২২. হজরত মাওলানা দরবেশ মুহাম্মদ (রহ.)
২৩. হজরত মাওলানা খোয়াজাগী আমকানগী (রহ.)
২৪. হজরত খাজা মুহাম্মদ বাকি বিল্লাহ (রহ.)
২৫. হজরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দি মুজাদ্দেদে আলফে সানি, ইমাম রব্বানি (রহ.)[19]
নকশবন্দিয়া তরিকার সাথে সম্পৃক্ততা:
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) জীবনের শুরু থেকেই বাহ্যিক জ্ঞানের পাশাপাশি মারিফত ও আধ্যাত্মিক সাধনার (সুলুক) প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। এই সন্ধানে তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট তরিকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং যেখান থেকেই ফয়েজ বা আধ্যাত্মিক উপকারের সম্ভাবনা দেখতেন, সেখানেই উপস্থিত হতেন। তাঁর এই ভক্তির সফর বিভিন্ন আধ্যাত্মিক দরবার হয়ে অবশেষে হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
অনেক তরিকা তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও তাঁর স্বভাবজাত রুচি এবং আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার স্বাভাবিক ঝোঁক ছিল নকশবন্দিয়া তরিকার দিকে। এই ব্যাকুলতা কোনোভাবেই প্রশমিত হচ্ছিল না, কারণ সে সময় উপমহাদেশে এই তরিকার কোনো শক্তিশালী পথপ্রদর্শক তশরিফ আনেননি। যখন হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) দিল্লিতে এলেন, তখন সেই দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং অপূর্ণতা দূর হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো এবং তিনি ‘দরগাহ-এ-বাকিয়া’তে হাজির হলেন। সাক্ষাতটি ছিল অত্যন্ত তাৎপরর্যময়। প্রথম দেখাতেই তাঁদের মাঝে দীর্ঘদিনের জানাশোনার মতো এক নিবিড় বন্ধন তৈরি হলো এবং একে অপরের প্রতি গভীর মহব্বত ও আন্তরিকতা প্রকাশ পেল। হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) যেন এই পবিত্র হৃদয়ের মুরিদটির সন্ধানেই উপমহাদেশে এসেছিলেন। যদিও বা এই সফরেই হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর হজ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছিনেন, তবে খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) বললেন, “যদিও আপনি একটি অত্যন্ত মোবারক সফরের সংকল্প করেছেন, তবুও যদি অন্তত এক মাস বা কমপক্ষে দুই সপ্তাহ এই ফকিরদের সাহচর্যে কাটান, তবে ক্ষতি কী?”
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) দুই সপ্তাহের অবস্থানের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। এরপর শুরু হলো আধ্যাত্মিক মজলিসগুলোর যাত্রা। একদিকে সত্যান্বেষী মুসাফিরের ছিল অন্তহীন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সত্যদাতার ছিল অকৃপণভাবে বিলিয়ে দেওয়ার আকুলতা। নির্জনে ও জনসমক্ষে; উভয় ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর মুর্শিদের সান্নিধ্য পেতে থাকলেন। মুর্শিদে কারিমের গভীর মনোযোগ ও বিশেষ ফয়েজের বরকতে হজরত মুজাদ্দেদের হৃদয়ের অবস্থা আমূল বদলে যেতে লাগল এবং দিনদিন তিনি আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপানগুলো অতিক্রম করতে থাকলেন।
অস্বাভাবিকভাবে প্রথম সাক্ষাতেই মুর্শিদ তাঁকে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের অনন্য সম্মানে ভূষিত করলেন। একদিন খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) তাঁর নিজের পীর খাজা আমকানাগী (রহ.)-এঁর নির্দেশের কথা বর্ণনা করে বললেন যে, “আপনার নির্দেশ অনুসারেই আমি উপমহাদেশে সফর করেছি। স্বপ্নে একটি ভারতীয় তোতা এসে আমার হাতের ওপর বসেছিল, যার দ্বারা একজন মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের নিসবত বোঝানো হয়েছিল।” তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে, হজরত মুজাদ্দিদই হলেন সেই স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন। এই ইশারাগুলোর আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল না; ফলে তিনি হজরত মুজাদ্দিদকে বায়াতের সম্মানে ধন্য করলেন এবং প্রায় আড়াই মাস নিজের বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখলেন।
উপমহাদেশে দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব:
যখন হজরত মুজাদ্দেদের আধ্যাত্মিক যোগ্যতা পূর্ণতা পেল এবং মুর্শিদে কারিমের মনে এই তরিকা জারি রাখার ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা তৈরি হলো, তখন তিনি তাঁকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন এবং দ্বীন প্রচার ও কল্যাণের প্রসারের মহান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করলেন। সিরহিন্দে ফিরে এসে তিনি একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন, যাতে এই কল্যাণময় ধারাটি মসজিদের সাথে আজীবন সম্পৃক্ত থাকে। এই মসজিদটিই পরবর্তীতে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রসারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যেখানে অসংখ্য মানুষ আধ্যাত্মিক আলো ও সুবাসের মাঝে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করেছেন।
হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) তাঁর এই সুযোগ্য খলিফার মাধ্যমে ফয়েজ বা আধ্যাত্মিকতা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন; এমনকি মাঝেমধ্যে তিনি এই বেলায়েতের প্রসারের জন্য গর্বও বোধ করতেন।
যাই হোক, সিরহিন্দ শরিফে ফিরে এসে তিনি মুর্শিদে করিমের নির্দেশ অনুযায়ী হেদায়েত অন্বেষণকারীদের পথ দেখাতে শুরু করেন। চারদিকে তাঁর ফয়েজ ও বরকতের কথা ছড়িয়ে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। শুরুতে তিনি নিজেকে এত বড়ো জনসমষ্টির জন্য নিজেকে হেদায়েতের যোগ্য মনে করতেন না, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর অন্তর প্রশস্ত হতে থাকে এবং তিনি আধ্যাত্মিক উন্নতির উচ্চতর শিখরগুলো অতিক্রম করতে থাকেন।
সিরহিন্দে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর মনের ব্যাকুলতা বেড়ে গেলে তিনি আবারও দিল্লির পথ ধরেন এবং মুর্শিদের সাহচর্যে ধন্য হন। তিনি তাঁর মুর্শিদকে এতটাই ভক্তি করতেন যে, তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়াকে নিজের পরম সৌভাগ্য মনে করতেন এবং তা প্রকাশ্যে প্রকাশও করতেন। তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা ‘মাবদা ও মা’আদ’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন, “আমরা চারজন ব্যক্তি আমাদের খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এঁর খেদমতে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে অন্যদের চেয়ে আলাদা ও বিশিষ্ট ছিলাম। এই ফকির নিশ্চিতভাবে জানত যে, রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর পবিত্র যুগের পর এমন সাহচর্য এবং এমন আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ আর কোথাও দেখা যায়নি। আমি এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতাম যে, যদিও আমি সাহাবায়ে কেরামের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি, কিন্তু আমার যুগের এই মহান ব্যক্তিত্বের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হইনি।”
এই সাক্ষাতে হজরত মুজাদ্দেদের প্রতি পীরের দয়া ও অনুগ্রহের আধিক্য ছিল অনেক বেশি। তাঁর আচরণ ছিল কামেল বা পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক পুরুষের মতো। যখন অন্য মুরিদদের হৃদয়ে এই বিশেষ মনোযোগ নিয়ে প্রশ্ন জাগত অথবা মুর্শিদে করিম যখন অন্যদের হজরত মুজাদ্দেদের (রহ.)’র কাছ থেকে ফয়েজ লাভের ইঙ্গিত দিতেন, তখন কারো কারো মনে কিছুটা অস্বস্তিও তৈরি হতো। এর পরিপ্রেক্ষিতে হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) বলেছিলেন, “মিয়া, শেখ আহমদ হলেন এমন এক সূর্য, যার পাশে আমাদের মতো হাজারো তারকা বিলীন হয়ে যায়। প্রাচীন যুগের কামেল অলিদের মাঝেও তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব খুব কম দেখা গেছে।”
হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) থেকে এমন অনেক বাণী বর্ণিত হয়েছে, যেখানে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর সুউচ্চ মর্যাদার কথা উল্লেখ আছে। দিল্লি থেকে তিনি আবারও সিরহিন্দে ফিরে এলেন। সেখানে কয়েকদিন কাটানোর পর মন আবারও ব্যাকুল হয়ে উঠলে তিনি দিল্লিতে হাজির হন। হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) যখন তাঁর আগমনের খবর পেলেন, তখন খোদ মুর্শিদ নিজেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে পায়ে হেঁটে ‘কাবুলি দরজা’ পর্যন্ত চলে এলেন।
হজরত খাজা (রহ.)-এর আচরণ তাঁর এই বিশেষ মুরিদের সাথে আর ‘মুর্শিদসুলভ’ ছিল না; বরং তা ছিল একজন ‘ভক্তসুলভ’। সাক্ষাতের পর যখন তাঁরা বিদায় নিতেন, তখন খাজা সাহেব উল্টো পায়ে হেঁটে (পিছন দিকে হেঁটে) ফিরে যেতেন। এমনকি তিনি এও বলেছিলেন, “হজরত মুজাদ্দেদের সামনে আমাকে যেন বেশি সম্মান প্রদর্শন করা না হয়।” তিনি তাঁর সমস্ত অনুসারীদের মনোযোগ হজরত মুজাদ্দেদের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের (সুলুক) পুরো বিষয়টি তাঁর হাতে সঁপে দিলেন। এমনকি নিজের দুই দুগ্ধপোষ্য সন্তানকেও তিনি হজরত মুজাদ্দেদের কাছে নিয়ে এলেন এবং তাঁদের ওপর বিশেষ দৃষ্টি (তাওয়াজ্জুহ) কামনা করলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি এই আধ্যাত্মিকতার বীজ বুখারা ও সমরকন্দ থেকে নিয়ে এসেছি এবং তা ভারতের এই বরকতময় মাটিতে বপন করেছি।”
মুর্শিদের পক্ষ থেকে এই যে রাজকীয় অনুগ্রহগুলো ছিল, তাতে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) আরও বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলেন। মুর্শিদের এই অকৃপণ স্নেহ তাঁর মনে কোনো প্রকার অহংকারের জন্ম দেয়নি; বরং মুর্শিদের মনোযোগ যত বাড়ত, তাঁর বিনয় ও আত্মসমর্পণের আবেগও তত প্রবল হতো। খাজা হুসামুদ্দিন বর্ণনা করেন, “একদিন হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) আমাকে মিয়া আহমদকে (মুজাদ্দেদে আলফে সানি) ডেকে আনার জন্য পাঠালেন। আমি গিয়ে যেই বললাম যে, হজরত আপনাকে স্মরণ করেছেন। অমনি ভয়ে তাঁর চেহারার রঙ বদলে গেল এবং শরীরে কম্পন শুরু হয়ে গেল।”
লাহোর সফর ও ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ প্রসঙ্গ:
এটি ছিল হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এঁর জীবদ্দশায় হজরত মুজাদ্দেদের শেষ দিল্লি সফর। ফেরার সময় হজরত খাজা তাঁকে লাহোর যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ফলে ফিরে আসার কিছুদিন পর তিনি লাহোরে তশরিফ নিলেন। লাহোর ছিল সে সময় জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু; অসংখ্য আলেম ও নেককার মানুষ সেখানে বাস করতেন। সে দিনগুলোতে প্রতিটি মজলিসে ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ববাদ) বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলত। একজন আলেম; যিনি নিজের পাণ্ডিত্যের ওপর বেশ গর্বিত ছিলেন, হজরত মুজাদ্দেদের কাছে এসে এই বিষয়ে একটি প্রশ্ন করলেন। তিনি লোকটির কানে কানে কিছু একটা বললেন। শোনামাত্রই লোকটির চেহারার রং পাল্টে গেল; সে হজরত মুজাদ্দেদের হাঁটুতে হাত রেখে (শ্রদ্ধা জানিয়ে) বিদায় নিল। হজরত মুজাদ্দিদ বিষয়টি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করেননি, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি না হয়।
মুর্শিদের ইন্তেকাল ও পরবর্তী সময়:
তিনি যখন লাহোর অবস্থান করছিলেন, তখন ২৫শে জমাদিউল আখিরা ১০১২ হিজরিতে তাঁর পীর ও মুরশিদ হজরত খাজা মুহাম্মদ বাকি বিল্লাহ নকশবন্দি (রহ.) দিল্লিতে ওফাত লাভ করেন। এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই তিনি তৎক্ষণাৎ দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দিল্লিতে পৌঁছে তিনি নুরানি মাজার শরিফ জিয়ারত করলেন এবং ফাতিহাখানি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা প্রদান শেষে পুনরায় সিরহিন্দে ফিরে আসেন।
প্রথমে তিনি খাজা সাহেবের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর গদিতে বসার ইচ্ছা করেছিলেন, কিন্তু পরিবেশের প্রতিকূলতা এবং কিছু হিংসুক ব্যক্তির হিংসার কারণে তিনি সিরহিন্দ শরিফে ফিরে আসেন। এরপর থেকে প্রতি বছর জমাদিউল আখিরা মাসে তিনি দিল্লিতে হাজিরা দিতেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করতেন; তৃষ্ণার্তরা যখন তাঁর ফয়েজ ও বরকতে নিজেদের ঝুলি পূর্ণ করে নিত, তখন তিনি পুনরায় সিরহিন্দে ফিরে আসতেন। সারাজীবন এই নিয়মই জারি ছিল।[20]
সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে সত্যের বাণী প্রচার:
উপমহাদেশের ইতিহাসে মুঘল শাসনকাল তার বিশাল সাম্রাজ্য এবং শাসনক্ষমতার জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে আকবরের শাসনকাল সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার দিক থেকে অনন্য। প্রায় পঞ্চাশ বছরের এই দীর্ঘ শাসনকাল উপমহাদেশে সাধারণ সমৃদ্ধি এবং সচ্ছলতার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকলেও এই সময়ের সাথে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বেশকিছু বেদনাদায়ক অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে।
পিতৃহীন হওয়ার কারণে আকবর শৈশবে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাননি। যদিও তাঁর মাঝে সহজাত বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটত, তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব তাঁর চিন্তা ও কর্মে স্পষ্ট ছিল। ব্যক্তিগত আভিজাত্য লাভের নেশা থেকে তিনি অনেক ফিতনার জন্ম দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি এমন কিছু পরামর্শদাতা পেয়েছিলেন যারা সম্রাটের তোষণ করাকেই তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সার্থকতা মনে করত। সে সময় এমন সব বিতর্ক চলত, যা সম্রাটের মানসিক স্তরের ঊর্ধ্বে ছিল; কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষণীয়। স্থানীয় যুক্তিবিদ্যার প্রভাবও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে একজন আবেগী মুসলিম নিজ অহংকারের এমন শিকার হলেন যে, তিনি নিজেকে ধর্মীয় নেতা হিসেবেও কল্পনা করতে শুরু করলেন। ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ ছিল সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপের ফসল, যা মূলত ‘ভক্তি আন্দোলন’ এর একটি রাজকীয় বহিঃপ্রকাশ ছিল। এরপর কী কী ঘটেছিল, তা উপমহাদেশের ইতিহাস সাক্ষী। ইসলাম ধর্ম আকবরের জিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তাঁর কিছু মূর্খতাসুলভ সিদ্ধান্তের কারণে মুসলিম মিল্লাত তাঁর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কারো মনে সত্য প্রকাশের সাহস ছিল না। এমন পরীক্ষার মুহূর্তে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) ইসলামের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লড়াই লড়ছিলেন। এই দ্বন্দ্ব চলাকালীনই জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেই মুজাদ্দেদি মিশনের প্রতি ঘৃণা লাভ করেছিলেন, তাই শুরুতেই তিনি এই মিশনের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ষড়যন্ত্র ও রাজ-দরবারের বিরোধিতা:
সম্রাটের এই কঠোর মনোভাব তাঁর কিছু পারিষদের আচরণের কারণে আরও মজবুত হয়েছিল। একদিকে হিন্দু প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছিল, অন্যদিকে শিয়া মতবাদের সাথেও বিরোধ তীব্রতর হলো। নূর জাহান, যিনি জাহাঙ্গীরের আড়ালে প্রকৃত শাসক ছিলেন, তাঁর মানসিক ঝোঁক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাঁর ভাই আসিফ জাহ, যিনি উচ্চপদস্থ উজির ছিলেন, তিনি ষড়যন্ত্রে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
সে সময় সালতানাতের অধিকাংশ সদস্য মুজাদ্দেদি চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন, তাই হজরত মুজাদ্দেদের প্রভাব উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। ষড়যন্ত্রকারীরা কৌশল আঁটল যে, রাজ-দরবারে হজরতের সমমনা লোকদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হোক, যাতে তাদের শক্তি একীভূত না হতে পারে। জাহাঙ্গীরকে এই পরামর্শ দেওয়া হলো এবং ভয় দেখানো হলো যে, হজরত মুজাদ্দেদের এত প্রভাব বিস্তারকারী একনিষ্ঠ ভক্তরা যদি একসাথে জোটবদ্ধ হয়, তবে তারা সরকারের জন্য বড়ো হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাহাঙ্গীর এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। কারণ ক্ষমতা অন্য কোনো শক্তিকে সহ্য করতে পারে না। যখন এই সংহতি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখন হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-কে রাজ-দরবারে তলব করা হলো। জাহাঙ্গীরের মনোভাব তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-এ-জাহাঙ্গীরি’র একটি কঠোর অনুচ্ছেদ থেকেই স্পষ্ট হয়। তিনি অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ ভাষায় লিখেছিলেন, “সে দিনগুলোতে (এটি ছিল রাজত্বের চতুর্দশ বর্ষের ঘটনা এবং ১০২৮ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাস) আমার কাছে আরজ করা হলো যে, শেখ আহমদ নামক জনৈক প্রতারক সিরহিন্দে মকর ও ফেরেবের (প্রতারণার) জাল বিছিয়ে অনেক নির্বোধ ও অবুঝ মানুষকে নিজের জালে আবদ্ধ করছে। সে প্রতিটি শহর ও অঞ্চলে নিজের মুরিদদের মধ্য থেকে এমন একজনকে ‘খলিফা’ হিসেবে নিযুক্ত করে রেখেছে, যারা আধ্যাত্মিকতার নামে দোকানদারি, মারিফত বিক্রি এবং মানুষকে প্রতারণা করায় অত্যন্ত দক্ষ। সে তার মুরিদ ও ভক্তদের কাছে আজেবাজে ও ভিত্তিহীন চিঠিপত্র লিখে ‘মাকতুবাত’ নামে একটি সংকলন তৈরি করেছে। সেই সংকলনে সে এমন সব অসার ও কুরুচিপূর্ণ কথা লিখেছে, যা কুফরি ও ধর্মদ্রোহিতার পর্যায়ভুক্ত!”
এরপর হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর একটি চিঠির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁর আধ্যাত্মিক সফরের বর্ণনা ছিল। সেই চিঠির বক্তব্যকেই বিকৃত করে ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। এই উদ্ধৃতিটির প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে দেয় যে, হজরত মুজাদ্দেদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বীজ কতটা পরিকল্পিতভাবে বপন করা হয়েছিল। এটি থেকেও স্পষ্ট হয় যে, সম্রাট এবং তাঁর পারিষদবর্গ, যারা এই অপপ্রচারের মূল কারিগর ছিল, তাঁরা হজরত মুজাদ্দেদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে কতটা ভীত ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্রাট যেখানে এতটা কঠোর ও অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করছেন, সেখানে শাস্তি হিসেবে কেবল গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি রাখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সাধারণত জাহাঙ্গীরের মতো নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর শাসকরা সামান্য বিরোধিতার কারণেও যেখানে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিতেন, সেখানে হজরত মুজাদ্দিদ সম্পর্কে জাহাঙ্গীর লিখেছেন, “আমি তাঁর সংশোধনের জন্য এটিই সমীচীন মনে করলাম যে, তাঁকে কিছুদিন বন্দি করে রাখা হোক।”
জাহাঙ্গীরের এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর বিশাল অনুসারী বাহিনী সম্পর্কে বেশ সচেতন ছিলেন। তিনি এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাননি, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দরবারে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেই ‘আধ্যাত্মিক ভ্রমণ’ এর বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে। যেখানে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, তিনি নিজেকে হজরত সিদ্দিক আকবর (রা.)-এঁর চেয়েও উচ্চ মর্যাদার বলে দাবি করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অভিযোগের জাল বুনছিল তারাই, যারা নিজেরা ‘খিলাফতে রাশেদা’তেই বিশ্বাসী নয়! তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সম্রাটকে উত্তেজিত করে তোলা।
শাহজাহানের পক্ষ থেকে সমাধানের চেষ্টা:
যখন দরবারে হাজির হওয়ার নির্দেশ এলো, তখন ভক্ত ও অনুসারীরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অপ্রীতিকর কিছু না আবার ঘটে যায়, এই আশঙ্কা। বড়ো দুশ্চিন্তা ছিল যে, রাজ-দরবারে সম্রাটকে ‘সিজদা-এ-তাজিমি’ (সম্মানসূচক সিজদা) করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; এর সমাধান কী হবে? কেউ কেউ আরজ করলেন, নিরুপায় বা প্রাণনাশের শঙ্কা থাকলে সিজদা করা হারাম থাকে না।
জাহাঙ্গীরের নিজের পুত্র শাহাবুদ্দিন শাহজাহান (সম্রাট শাহজাহান) হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর প্রিয় পীরের ওপর কোনো আঘাত আসা বরদাশত করতে পারছিলেন না। শাহজাহান বড়ো বড়ো আলেমদের পরামর্শ নিলেন। আলেমরা ফতোয়া দিলেন যে, নিরুপায় অবস্থায় (প্রয়োজন সাপেক্ষে) এটি জায়েজ হতে পারে। শাহজাহান আশ্বস্ত হলেন। তিনি এই ফতোয়াটি মুফতি আব্দুর রহমান এবং আল্লামা আফজাল খানের মাধ্যমে হজরত মুজাদ্দেদের কাছে পাঠালেন, যাতে তাঁরা যুক্তিতর্ক দিয়ে তাঁকে বোঝাতে পারেন এবং আসন্ন বিপদ এড়ানো যায়।
দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত:
এই বিজ্ঞ আলেমগণ হজরত মুজাদ্দেদের দরবারে হাজির হয়ে নিজেদের সাধ্যমতো দলিল পেশ করলেন এবং ফতোয়াটি তুলে ধরলেন। কিন্তু অটল বিশ্বাসের এই সুউচ্চ পাহাড় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। তিনি জবাব দিলেন, “এই হুকুমটি হলো প্রাণ বাঁচানোর জন্য একটি সুযোগ ও কৌশল মাত্র। কিন্তু দৃঢ় সংকল্পের বিধান হলো, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করা যাবে না।” এটিই ছিল সেই ‘মুজাদ্দিদ সুলভ, চরিত্র এবং সংকল্পের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) রাজ-দরবারে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তাঁর চলন-বলন ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি একাই গেলেন, কাউকে সাথে নিলেন না। সম্রাট জাহাঙ্গীরকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি ‘সিজদা-এ-তাজিমি’ করবেন না। সম্রাটের তোষামোদকারী পারিষদবর্গ, যারা রাজকীয় সন্তুষ্টির লোভে নৈতিকতাও ভুলে যেত, তারা হজরত মুজাদ্দিদকে স্পষ্ট করে দিল যে, সিজদা করতেই হবে। কিন্তু তিনি ফারুকি দৃঢ়তার সাথে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন।
তাঁকে বলা হলো, প্রবেশ করার সময় অন্তত মাথাটা একটু নিচু করবেন, ওটাকেই সিজদা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। তিনি এতেও রাজি হলেন না। এরপর চক্রান্তকারীরা এক হীন কৌশল আঁটলো; তারা তাঁকে একটি অত্যন্ত ছোটো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলল, যাতে দরজার গঠনের কারণেই তিনি মাথা নিচু করতে বাধ্য হন। কিন্তু সত্যের আওয়াজ বুলন্দকারী মুজাদ্দিদ সেই কৌশলও ম্লান করে দিলেন। তিনি দরজার কাছে এসে যখন দেখলেন মাথা নিচু করে ঢুকতে হবে, তখন তিনি আগে পা ঢুকিয়ে দিলেন এবং মাথা পিছনের দিকে হেলিয়ে রাখলেন।
অবশেষে তিনি দরবারে উপস্থিত হলেন। সবার কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই মহান সত্তা শরিয়তের অনুসরণে শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে পারেন এবং কোনো রাজকীয় দাপট তাঁর ঘাড় নোয়াতে পারবে না। সামনে গিয়ে তিনি সুন্নতি তরিকায় উচ্চস্বরে বললেন, আসসালামু আলাইকুম। শত্রুরা এই আচরণ দেখে সম্রাটের ক্রোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করল। জাহাঙ্গীর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেন সিজদা করলেন না? জবাবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বললেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম।
সম্রাট তাঁর সামনে অটল বিশ্বাসের এমন এক পাহাড় দেখছিলেন, যা তাঁর দৃষ্টিতে ছিল অবাধ্যতা। জাহাঙ্গীর বললেন, সিজদাকে তো অগ্রাহ্য করা যেত, কিন্তু এটি এজন্য আবশ্যক যে, রাজকীয় মুখ থেকে এই আদেশ জারি হয়েছে, তাই এর আমল জরুরি। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) গর্জে উঠে বললেন, আপনার আদেশ পালনের চেয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করা অনেক বেশি জরুরি।
পুরো দরবারে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। সম্রাট রাগে ফেটে পড়ছিলেন। তিনি আদেশ দিলেন যেন প্রহরীরা এগিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক তাঁর ঘাড় নিচু করে। প্রহরীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাঁর ঘাড় ধরে সর্বশক্তি দিয়ে মাথা নোয়াতে চাইলো। কিন্তু তারা জানত না যে, সত্যে অটল থাকা ব্যক্তিদের ঘাড় কতটা শক্তিশালী হয়! তাঁর ঘাড় নোয়ানোর ছিল না, নোয়ালেনও না।
তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনার মুর্শিদ হজরত খাজা বাকি বিল্লাহর কাছে লেখা আপনার সেই চিঠিতে সাহাবায়ে কেরাম, বিশেষ করে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এঁর শানে বেয়াদবি করা হয়েছে। এর জবাব কী এবং আপনার আকিদা কী? হজরত মুজাদ্দিদ জবাব দিলেন, সেই চিঠিটি ছিল আমার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা এবং তা আমার মুর্শিদকে লেখা হয়েছিল, যাতে এ বিষয়ে তাঁর মতামত পাওয়া যায়; এটি সাধারণ মানুষের জন্য ছিল না। এরপর তিনি একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ উদাহরণ দিলেন, “যদি সম্রাট রাজসভার শেষে বসা কোনো খাদেমকে ডাক দেন, তবে কি সে আদেশের অনুসরণ করবে না? তখন তো তাকে বড়ো বড়ো মন্ত্রীদের সামনে দিয়েও অতিক্রম করতে হবে?
আর সে যদি সম্রাটের ডাকে সামনে যায়, তবে কি তার মর্যাদা উজিরদের চেয়ে বড়ো হয়ে যাবে? এই জবাবটি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, সম্রাট নিজেও সন্তুষ্ট হলেন। অতঃপর তিনি হজরত সিদ্দিকে আকবরের মর্যাদা সম্পর্কে বললেন, “আমি তো হজরত আলী (রা.)-কেও হজরত সিদ্দিক আকবর (রা)-এঁর সাথে তুলনা করি না, সেখানে আমার নিজের দাবি এমন কীভাবে হতে পারে?”
একটু লক্ষ্য করলে হজরত মুজাদ্দেদের এই বাক্যের হিকমত বা কৌশল বোঝা যায়। তিনি জানতেন এই ষড়যন্ত্রের মূলে সেই পারিষদবর্গ (আসিফ জাহ গং) আছে, যারা হজরত আলী (রা.)-কে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। তাই তিনি কেবল হজরত আলীর নামই নিলেন, যাতে সত্যও প্রকাশিত হয়, আবার ষড়যন্ত্রকারীদের অন্তঃসারশূন্যতাও ধরা পড়ে যায়।
গোয়ালিয়র দুর্গে কারাবাস:
ষড়যন্ত্রে লিপ্ত উজির-আমলাদের প্রতিটি কৌশল যখন ব্যর্থ হলো, তখন তারা সম্রাটকে পরামর্শ দিল যে, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) মুক্ত থাকলে সামাজিক অস্থিরতা, এমনকি বিদ্রোহের আশঙ্কা রয়েছে। তাই তাঁকে বন্দি করে রাখা প্রয়োজন। জাহাঙ্গীর এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং তাঁকে গোয়ালিয়র দুর্গে কারাবাসের নির্দেশ দিলেন। ফলে তাঁকে বন্দি করা হলো। কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক বা জেলার ছিলেন একজন অমুসলিম ব্যক্তি, যার নাম ছিল ‘আনি রায় সিং দলন’। সম্ভবত এটি এজন্য করা হয়েছিল যে, যাতে কারারক্ষীর মনে তাঁর প্রতি কোনো প্রকার সহমর্মিতা তৈরি না হয়। কারণ, কোনো মুসলিমকে নিয়োগ দিলে তিনি মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর আদর্শ ও ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হওয়ার ভয় ছিল। কেন তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো, তার কারণ স্বয়ং জাহাঙ্গীর এভাবে উল্লেখ করেছেন, “আমি তাঁর সংশোধনের জন্য এটিই উপযুক্ত মনে করলাম যে, তাঁকে বন্দি করে রাখা হোক; যাতে তাঁর মস্তিষ্কের অস্থিরতা ও চিন্তার বিশৃঙ্খলা দূর হয় এবং তাঁর আজেবাজে কথার কারণে জনগণের মধ্যে যে উত্তেজনা চলছে, তা বন্ধ হয়।”
মুজাদ্দিদ (রহ.) দুই বছর গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বভাবজাত গাম্ভীর্য এবং আধ্যাত্মিক রিয়াজতের অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হননি, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহতও হননি; বরং পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে তাঁর মিশন জারি রইল। কেবল তাঁর কাজের ক্ষেত্রটি বদলে গিয়েছিল। এখন তাঁর সামনে ছিল ওইসব কয়েদি, যারা বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার হয়ে সাজা খাটছিল। তিনি নিরলস প্রচেষ্টায় এই অপরাধীদের আচরণ বদলে দিলেন। এমনকি কারাগারের অমুসলিম কর্মীদের ওপরও তাঁর প্রভাব পড়ল এবং অনেক কর্মকর্তা ইসলামের শীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। জাহাঙ্গীর ভেবেছিলেন, জনগণের কাছে পৌঁছাতে না পারলে তিনি হতাশ হয়ে পড়বেন এবং এই সংস্কারমূলক আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু ফলাফল হলো উল্টো; কারাগারের ভেতরেও তাবলিগের কাজ চলতে থাকল, আগত অনুসারীদের আত্মিক সংশোধনও জারি রইল। কোনো মানসিক চাপ বা অস্থিরতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
কারামুক্তি:
দুই বছর বন্দি থাকার পর যখন মুক্তির আদেশ এলো, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) পুনরায় তাঁর মিশনে সচল হলেন। প্রশ্ন হলো, জাহাঙ্গীর কেন তাঁকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ বলে যে, তাঁকে বন্দি করা ছিল জাহাঙ্গীরের একটি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, যা তিনি মনেপ্রাণে চাননি। তিনি যখন কারাগারে ছিলেন, তখন ক্ষমতার রক্ষক ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ভক্তরা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা একে অপরের সাথে পরামর্শ করে একটি গণবিদ্রোহের কথা ভাবতে শুরু করেন। এমনকি বড়ো বড়ো সেনাপতিরাও এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে খান-ই-খানান, খান-ই-আজম, সৈয়দ সদর জাহান, মহাব্বত খান ছাড়াও আরও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শামিল ছিলেন। অন্যদিকে শাহজাদা শাহজাহানও হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর মুক্তির জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছিলেন।
এই পরিস্থিতি জাহাঙ্গীর বাধ্য হলো হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর মুক্তির ফরমান জারি করতে। তবে তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিলেন যে, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) রাজকীয় বাহিনীর সাথেই অবস্থান করবেন। এর মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা থেকে বিরত রাখা। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর কাছে বন্দিত্ব বা মুক্তি, কোনোটাই আলাদা গুরুত্ব বহন করত না। তাই তিনি মুক্তির জন্য পাল্টা কিছু শর্ত পেশ করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাহাঙ্গীর সেইসব শর্ত মেনে নিলেন। এই শর্তগুলো মূলত একজন শাসকের জন্য দ্বীনি দস্তুর বা সংবিধানের মতো ছিল, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়েছিল।
ঐতিহাসিক শর্তসমূহ এবং রাজকীয় ফরমান:
শর্তগুলো মেনে নিয়ে যে রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়, তার প্রতিটি পয়েন্ট লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, তবলিগের প্রভাব রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী মুঘল সরকার কীভাবে শরিয়তের সামনে মাথানত করেছিল। জাহাঙ্গীরের জারি করা ফরমানগুলো ছিল নিম্নরূপ।
১. রাজ-দরবারে সিজদা-এ-তাজিমি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো।
২. গো-জবাই: হিন্দুদের চাপে যা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তা পুনরায় বৈধ করা হলো। এর বাস্তবায়ন এভাবে হয়েছিল যে, দরবারের প্রত্যেক সদস্য রাজ-দরবারের সামনে একটি করে গরু জবেহ করেন এবং সেই মাংসের কাবাব বানিয়ে সবাই মিলে খান।
৩. ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদসমূহ পুনরায় নির্মাণের আদেশ জারি করা হলো।
৪. রাজ-দরবারের পাশেই একটি মসজিদ নির্মাণের ফরমান জারি করা হলো, যেখানে দরবারের সদস্যরা এমনকি জাহাঙ্গীর নিজেও নামাজ আদায় করতেন।
৫. শরিয়তি আইনের পুনর্প্রবর্তন করা হলো এবং বিচারকার্য শরিয়ত মোতাবেক পরিচালিত হতে শুরু করল।
এই ফরমানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন দরবেশের প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়েছিল। কুফরি রীতিনীতি এখন শরিয়তের পাহারাদারিতে রূপ নিল। দুই বছরের জেল এবং তিন বছর রাজকীয় বাহিনীর সাহচর্য এমন সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে আনল যে, মুঘল সালতানাত একটি ইসলামি রাষ্ট্রের কাঠামোতে চলতে শুরু করল। শাহজাহান তো আগেই মুরিদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, আর পরবর্তীতে আওরঙ্গজেব আলমগীর এই সংগ্রামের পূর্ণ সুফল হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন, যিনি হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-এঁর হাতে বায়াত হয়েছিলেন।[21]
অলিই অলিকে চেনেন:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) যখন লাহোরে অবস্থান করছিলেন, সেই সময় একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা তাঁর দরবারে উপস্থিত হলো। হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) তার সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ালেন। সে চলে যাওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হুজুর, সে তো একজন সাধারণ সবজি বিক্রেতা ছিল, তবে আপনি কেন এমন সম্মান করলেন?’
জবাবে তিনি ইরশাদ করলেন, “সে একজন ‘আবদাল’ (উচ্চস্তরের আল্লাহর অলি)। নিজেকে মানুষের আড়ালে গোপন রাখার জন্য সে এই সবজি বিক্রির পেশা অবলম্বন করেছে।”[22]
অমর রচনাবলি:
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) ছিলেন একাধারে কলম ও তলোয়ারের বীর। তাঁর লেখলিখি যেমন ছিল প্রাঞ্জল, তেমনি অত্যন্ত প্রভাবশালী। সেই যুগে আরবি ও ফারসি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রধান ভাষা। তিনি এই উভয় ভাষাতেই তাঁর চিন্তাধারা ও সংস্কারমূলক তত্ত্বগুলো প্রচার করেছেন। যদিও এই কিতাবগুলো একজন উচ্চাঙ্গের সুফির লেখা, তবুও একে কেবল রহস্যময় বা ইঙ্গিতবহ বলা যাবে না; বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মনের বিভ্রান্তি দূর করা এবং সঠিক পথ দেখানো। ভারতবর্ষের ইতিহাস সাক্ষী যে, তাঁর এই ইলমি ফয়েজ কেবল এ দেশেই নয়; বরং মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র প্রভাব ফেলেছে। এর অন্যতম কারণ হলো তাঁর রচিত কিতাবসমূহ। তিনি সমসাময়িক সমস্যাগুলো নিয়ে কলম ধরেছিলেন এবং সেগুলোর সঠিক সমাধান পেশ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু কিতাব হলো—
১. রিসালাহ তাহলিলিয়াহ: এটি মাত্র ১২ পৃষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা। এতে তিনি ‘কালিমা তায়্যিবা’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)-এর আলোকে যে মারেফাত বা আধ্যাত্মিক আলোচনা করেছেন, তার গুরুত্ব আজও অপরিসীম। মূলত এটি তৌহিদের ওপর ওঠা বিভিন্ন আপত্তির জবাব এবং আকিদাকে শিরকের কলুষতা থেকে মুক্ত করার জন্য লেখা হয়েছিল।
২. রিসালাহ ইসবাত-এ-নবুওয়ত: নবুওয়তের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের জন্য এটি লেখা হয়েছিল। সে সময় ‘ভক্তি আন্দোলন’-এর প্রভাবে ‘ধর্মের একত্ববাদ’ বা সর্বধর্ম সমন্বয়ের জোয়ার উঠেছিল। তারা নবুওয়তকে অস্বীকার করতে চাইত। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) জোর দিয়ে বলেন যে, নবুওয়তের মাধ্যম ছাড়া ইসলামের প্রকৃত খিদমত ও সঠিক প্রচার সম্ভব নয়। এই কিতাব পড়লে বোঝা যায়, জাতির আকিদাগত বিভ্রান্তির প্রতিটি বিষয়ে তাঁর গভীর দৃষ্টি ছিল।
৩. রিসালাহ দর রদ্দে শিয়া: এটি সে সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি ছিল। সম্রাট হুমায়ুন ইরানে দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটানোর ফলে রাজ-পরিবারে এবং প্রশাসনের উচ্চপদে শিয়া প্রভাব বাড়তে থাকে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় নূর জাহান এবং তাঁর ভাই আসিফ জাহ-এর প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূল কারিগরও ছিল এই আসিফ জাহ। জাতির সঠিক আকিদা রক্ষায় এই কিতাবটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
উল্লেখ্য যে, উপরের এই তিনটি কিতাব তিনি নকশবন্দিয়া তরিকায় আসার আগেই লিখেছিলেন। অর্থাৎ উম্মাহর আকিদাগত বিচ্যুতি সংশোধনের চিন্তা তাঁর মধ্যে শুরু থেকেই ছিল। এরপর তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চতর স্তরে পৌঁছে আরও কিছু কিতাব লিখেন, যা আজও জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে।
৪. মা’আরিফ-এ-লাদুনিয়া: এই কিতাবটির বিষয়বস্তু এর নাম থেকেই স্পষ্ট। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ জ্ঞান।
৫. মোকাশাফাত-এ-আইনিয়া: এটি তাঁর বিশেষ মুরিদ খাজা মুহাম্মদ হাশিম কিশমি (রহ.) সংকলন করেছিলেন।
৬. রিসালাহ মাবদা ও মা’আদ: এটি অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বের আকর।
৭. রিসালাহ দর শরহে বা’জ রুবাইয়াত: এটি তাঁর পীর হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এঁর কিছু রুবাই বা কবিতার ব্যাখ্যা। এটি হজরত মুজাদ্দেদের উন্নত সাহিত্যরুচির পরিচয় দেয়।
এছাড়াও তাঁর আরও অনেক পুস্তিকা রয়েছে। প্রায় ২০টি পুস্তিকার নাম পাওয়া যায়। তবে এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-কে অমর করে রেখেছে তাঁর জগদ্বিখ্যাত ‘মাকতুবাত শরিফ’।
৮. মাকতুবাত শরিফ: হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) অনুভব করেছিলেন যে, যদিও শাসন ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে, কিন্তু সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দুয়ানি আকিদার কবলে চলে যাচ্ছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সবার আগে সমাজের প্রভাবশালী এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সংশোধন করতে হবে। কারণ, তারা যদি সঠিক পথে ফিরে আসে, তবে পুরো সমাজেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব। এই চিন্তা থেকে তিনি সেনাপতি, আমাত্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে নসিহতপূর্ণ চিঠি লিখতে শুরু করেন। পাশাপাশি যারা ঈমানি সংকটে ভুগতেন বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা রাখতেন, তাঁদের করা প্রশ্নের উত্তরও তিনি চিঠির মাধ্যমে দিতেন। ‘মাকতুবাত-এ-ইমামে রব্বানি’ আসলে আধুনিক যুগের জন্য এক আলোকবর্তিকা।
পরিবার ও সন্তানাদি
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) সন্তান লালন-পালনকে বিশেষ ইবাদত মনে করতেন। তিনি তাদের পুণ্যময় পরিবেশে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর বিদায়ের পরও বংশধরদের মাধ্যমে মুজাদ্দেদি মিশন দীর্ঘকাল অব্যাহত থাকে। তাঁর সহধর্মিণীও ছিলেন একজন শহিদের কন্যা। সবর ও দৃঢ়তায় ইসলামের প্রাথমিক যুগের পুণ্যবতী নারীদের প্রতিচ্ছবি।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সাতজন পুত্র ও তিনজন কন্যা দান করেছিলেন।
পুত্রগণ: ১. খাজা মুহাম্মদ সাদিক (রহ.) ২. খাজা মুহাম্মদ সাঈদ (রহ.) ৩. খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.) ৪. খাজা মুহাম্মদ ফাররুখ (রহ.) ৫. খাজা মুহাম্মদ ঈসা (রহ.) ৬. খাজা মুহাম্মদ আশরাফ (রহ.) ৭. খাজা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া (রহ.)
কন্যাগণ: ১. মোহতারামা বিবি রুকাইয়া বানু (শৈশবে ইন্তেকাল) ২. মোহতারামা বিবি উম্মে কুলসুম (১৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল) ৩. মোহতারামা বিবি খাদিজা বানু (প্রাপ্তবয়স্ক হন, বিবাহিত ও সন্তানাদি ছিল)[23]
বিশিষ্ট খলিফাগণ
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) অনুসারীদের কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়ে দূর-দূরান্তে পাঠাতেন, ফলে মুজাদ্দেদি দাওয়াত আরব-আজম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বিখ্যাত খলিফারা হলেন—
১. মীর সৈয়দ মুহাম্মদ নোমান (রহ.): বদখশানের অধিবাসী। খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এঁর প্রাথমিক তরবিয়তের পর হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর কাছে আধ্যাত্মিক সাধনা সম্পন্ন করেন। দক্ষিণাত্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ইন্তেকাল: ১০৫৮ হিজরি, দাফন আকবরবাদে।
২. শেখ নূর মুহাম্মদ পাটনী (রহ.): পাটনায় দীর্ঘকাল অবস্থানের কারণে ‘পাটনী’ নামে বিখ্যাত। তাঁর নামে ছয়টি মাকতুব রয়েছে।
৩. শেখ হামিদ বাঙালি (রহ.): বাংলার অধিবাসী। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-কে একবার দেখার পরই তাঁর চরম ভক্ত হন। পাদুকা মোবারককে মনোযোগের কেন্দ্র বানিয়েছিলেন, ওফাতের পর সেটি তাঁর মাথার কাছে রাখা হয়। সম্রাট শাহজাহান তাঁর ভক্ত ছিলেন। ইন্তেকাল: ১০৫০ হিজরি।
৪. শেখ মুহাম্মদ তাহের বন্দেগী (রহ.): লাহোরের অধিবাসী, হাফেজে কুরআন। কিতাব লিখে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) তাঁকে লাহোরের ‘কুতুব’ ঘোষণা করেন। ইন্তেকাল: ১০৪০ হিজরি।
৫. শায়খ বদিউদ্দীন সাহারানপুরী (রহ.): সাহারানপুরের অধিবাসী। তাঁর নামে প্রায় ১০টি মাকতুব রয়েছে। ইন্তেকাল: ১০৪২ হিজরি।
৬. হাজী খিজির খান আফগান (রহ.): সিরহিন্দ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। মুজাদ্দেদিয়া দরবারে আজান দিতেন, সুকণ্ঠের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইন্তেকাল: ১০৩৪ হিজরি, সিরহিন্দে দাফন।
৭. মাওলানা বদরুদ্দিন সিরহিন্দি (রহ.): প্রায় ১৭ বছর হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর খেদমতে কাটান। তাঁর রচিত ‘হাজরাতুল কুদস’ সিলসিলার মাশায়েখদের জীবনী বিষয়ক একটি মৌলিক গ্রন্থ।
৮. মাওলানা মুহাম্মদ হাশিম কিশমি (রহ.): বদখশানের কিশম থেকে আগত। মাকতুবাতের তৃতীয় খণ্ড তাঁর তত্ত্বাবধানে সংকলিত। ‘জুবদাতুল মাকামাত’ ও ‘মোকাশাফাত-এ-আইনিয়া’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ইন্তেকাল: ১০৫৪ হিজরি, বুরহানপুরে।
৯. শায়খ সৈয়্যদ আদম বিনুরি (রহ.): নবী পরিবারের সন্তান। চার লক্ষ মুরিদ ও প্রায় এক হাজার খলিফা ছিলেন। সম্রাট শাহজাহানের পরামর্শে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং সেখানেই মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (১০৫৪ হি.)। জান্নাতুল বাকিতে হজরত ওসমান (রা.)-এঁর কবরের পাশে দাফন করা হয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এঁর আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম পূর্বপুরুষ।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খলিফাগণ: শেখ আব্দুল হাই হিসারি (মাকতুবাতের দ্বিতীয় খণ্ড সংকলক), শেখ আহমদ বরকি, শেখ ইয়ার মুহাম্মদ তালেকানি, শেখ করিমুদ্দিন হাসান আবদালি, শেখ আব্দুল হাদি বদায়ুনি, মাওলানা আমানুল্লাহ এবং খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এর দুই সাহেবজাদা শেখ ওবায়দুল্লাহ ও শেখ আব্দুল্লাহ (রহ.)।[24]
উল্লেখযোগ্য আমল ও অভ্যাস
তাঁর জীবন ছিল সুন্নতে নববির জীবন্ত প্রতিফলন। সফর ও গৃহে, শীত ও গ্রীষ্ম সর্বাবস্থায় মধ্যরাতের পর জেগে মাসনুন দোয়া পাঠ করে দীর্ঘ কিরাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। কিবলামুখী হয়ে একাকী অজু করতেন এবং সমস্ত সুন্নত-মুস্তাহাব যত্নসহকারে পালন করতেন। নামাজের জন্য উত্তম পোশাক পরে গাম্ভীর্যের সাথে প্রস্তুত হতেন। ফজরের সুন্নত ঘরে এবং ফরজ বিশাল জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করতেন। নামাজ শেষে মাসনুন দোয়া ও মোনাজাত করতেন। নামাজের পর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও ছাত্রদের তালিম দিতেন। জোহরের পরও জিকিরের মাহফিল ও দরস দিতেন। মাগরিবের পর ৬ রাকাত আওয়াবিন পড়তেন। চাশত ও তাহিয়্যাতুল মসজিদ নিয়মিত আদায় করতেন। বিতরের পর কিবলামুখী হয়ে সুন্নতমতো বিশ্রাম নিতেন।
অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন, মাঝেমধ্যে আল্লাহর ভয়ে অশ্রুধারা বয়ে যেত। খাবার খুব অল্প খেতেন এবং আগে-পরের দোয়া পড়তেন। দুপুরে কায়লুলা করতেন। আজান শুনে নিয়মিত জবাব দিতেন। প্রচুর দরুদ পড়তেন, বিশেষত জুমার রাতে মুরিদদের সাথে এক হাজার বার দরুদ আদায় করতেন। সোমবার বা বৃহস্পতিবার সফর করতেন। হাফেজ হওয়ায় সফরেও তিলাওয়াত জারি রাখতেন। সেজদার আয়াত এলে বাহন থেকে নেমে ‘সেজদায়ে তিলাওয়াত’ আদায় করতেন। রমজানে অন্তত তিনবার কুরআন খতম করতেন এবং সর্বাবস্থায় পূর্ণ ২০ রাকাত তারাবি আদায় করতেন। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ এবং জিলহজের প্রথম দশ দিন একান্তে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণে কুসূফ-খুসূফের নামাজ আদায় করতেন।
নতুন পোশাক, আয়না, পানি, চাঁদ দেখাসহ সকল দৈনন্দিন কাজে মাসনুন দোয়ার প্রতি যত্নশীল ছিলেন। সবসময় মাথায় আমামা রাখতেন এবং পায়জামা টাখনুর ওপরে রাখতেন। বুজুর্গ কেউ এলে সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং সালাম দেওয়ায় সবার আগে থাকতেন। আল্লামা বদরুদ্দিন সিরহিন্দি (রহ.) বলেন, “আমার জানা নেই যে, কেউ কখনো সালাম দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ওপর জয়ী হতে পেরেছে।”[25]
অবিস্মরণীয় অবদান ও কারামত:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর পুরো জীবন ছিল আকিদা সংস্কার, দ্বীনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং উম্মাহকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার নিরলস সংগ্রাম। ৬৩ বছরের জীবনে তিনি কখনো আপসের পথ বেছে নেননি; বরং যেখানে শিথিলতার সুযোগ ছিল, সেখানেও তিনি আদর্শের কঠোর পথ অনুসরণ করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই উপমহাদেশে ভক্তি আন্দোলন, বেদান্তবাদ ও দ্বীন-ই-ইলাহির প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইসলামের প্রকৃত চেতনা আবার সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কারামত সম্পর্কে তাঁর জীবন আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। কারামত কেবল অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের ফল। অলিদের মাধ্যমে রোগমুক্তি, বিপদ থেকে উদ্ধার বা মানুষের হেদায়াত এসবই কারামতের অন্তর্ভুক্ত, তবে এগুলো প্রদর্শনের বিষয় নয় এবং বেলায়তের শর্তও নয়।
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর সবচেয়ে বড় কারামত ছিল তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক কাজ। তিনি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো একটি জাতির চিন্তা ও আকিদাকে সংশোধন করেছিলেন। মানুষের অন্তর, চিন্তা ও আধ্যাত্মিক জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রকৃত কাজ।
এই কারণেই তাঁর অবদান কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর সংস্কারের প্রভাব অনুভব করে আসছে। তাঁরপরও প্রয়োজনের তাকিদে কিছু কারামত প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—
১. তৎক্ষণাৎ বৃষ্টি থেমে যাওয়া: একবার প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। তিনি আসমানের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বৃষ্টিকে লক্ষ্য করে বললেন, “অমুক সময় পর্যন্ত থেমে যাও!” অতঃপর বৃষ্টি ঠিক সেই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থেমে রইল।[26]
২. বাদশাহর ক্রোধ থেকে উদ্ধার: বাদশাহ জাহাঙ্গীর এক ধনী ব্যক্তির সন্তানের উপর অত্যন্ত রুষ্ট হলেন এবং তাকে লাহোর থেকে সিরহিন্দে তলব করলেন। সেই সাথে এই কঠোর ফরমানও জারি করলেন যে, “আসা মাত্রই তাকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মেরে ফেলা হোক।” সেই আমিরজাদা সিরহিন্দে পৌঁছে ভয়ে কম্পমান অবস্থায় হযরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এঁর খেদমতে হাজির হয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজের প্রাণরক্ষার জন্য ফরিয়াদ জানাল। তিনি কিছুক্ষণ মুরাকাবায় নিমগ্ন হলেন, অতঃপর ইরশাদ করলেন, “বাদশাহর পক্ষ থেকে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না; বরং সে তোমার প্রতি দয়ালু হবে।” আমিরজাদা আরজ করল, “হুজুর, এই কথাটি লিখে দিন, যাতে তা আমার অন্তরের প্রশান্তির কারণ হয়।” তিনি তার সান্ত্বনার জন্য লিখে দিলেন, “এই ব্যক্তি বাদশাহর ক্রোধের ভয়ে এখানে এসেছে। এই ফকির তাকে নিজের জিম্মায় নিয়ে এই বিপদ থেকে মুক্তি প্রদান করল।” অতঃপর সেই আমিরজাদা যখন বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলো, তখন হজরতের কথা হুবহু সত্য প্রমাণিত হলো। বাদশাহ তাকে দেখা মাত্রই ক্রোধের পরিবর্তে মুচকি হাসলেন, নসিহতস্বরূপ কিছু কথা বললেন এবং অত্যন্ত দয়া ও মেহেরবানির সাথে পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করে বিদায় দিলেন।[27]
৩. এক শিশু সম্পর্কে গায়েবি সংবাদ: তাঁর এক আত্মীয়র ঘরে সন্তান জন্ম নিত ঠিকই; কিন্তু শৈশবেই মারা যেত। একবার যখন পুনরায় পুত্রসন্তান জন্মাল, তখন তিনি শিশুটিকে নিয়ে হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর খিদমতে হাজির হলেন। তিনি সব ঘটনা খুলে বললেন এবং আরজ করলেন, “হুজুর, আমরা মানত করেছি যে, যদি এই সন্তানটি বেঁচে বড়ো হয়, তবে আমরা তাকে আপনার খিদমতে সঁপে দেব।” তাদের কথা শুনে তিনি ইরশাদ করলেন, “এই শিশুটির নাম ‘আবদুল হক’ রাখো। সে জীবিত থাকবে এবং দীর্ঘায়ু লাভ করবে। তবে প্রতি মাসে হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহির-এর নিয়াজ (ঈসালে সওয়াব) দিতে থাকবে।” আলহামদুলিল্লাহ, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এঁর জবানের বরকতে সেই শিশুটি দীর্ঘ হায়াত লাভ করেছিল।[28]
৪. দোয়ার বরকতে ঈমান লাভ: একদিন তিনি নির্জনে অবস্থান করছিলেন এবং এক নও-মুসলিম তাঁর খিদমতে উপস্থিত ছিল। হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) তাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করলেন, “চাও, তুমি কী চাও? যা চাইবে, তা-ই পাবে।” সেই যুবক আরজ করল, “হুজুর, আমার ভাই এবং মা তাদের কুফরের ওপর অত্যন্ত অটল ও কঠোর। আমার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তারা ইসলাম কবুল করছে না। আপনি যদি দয়া করে একটু আধ্যাত্মিক মনোযোগ (তাওয়াজ্জুহ) দিতেন, তবে তারা মুসলমান হয়ে যেত।” হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “এ ছাড়া কি তোমার অন্য কিছু প্রয়োজন?” সে আরজ করল, “হুজুর, আপনার দোয়ার বরকতে আমি সব কল্যাণই লাভ করব, তবে এই মুহূর্তে আমার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো তারা যেন ইমান আনে।” তিনি বললেন, “তারা শীঘ্রই মুসলমান হয়ে যাবে।” তাঁর এই ঘোষণার ঠিক তৃতীয় দিনে ওই যুবকের ভাই এবং মা উভয়ই সিরহিন্দ শরিফে উপস্থিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ধন্য হলেন।[29]
৫. মুরিদের প্রাণ রক্ষা: তাঁর মুরিদ সৈয়দ জামাল একদিন কোনো এক উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ, একটি বিশাল সিংহ তাঁর সামনে চলে এল! ভয়ে তাঁর পা সেখানেই আটকে গেল। তিনি মুহূর্তের মধ্যে মনে মনে নিজের মুর্শিদের দরবারে ফরিয়াদ জানালেন, ‘হুজুর, বাঁচান!’ ঠিক সেই মুহূর্তে মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) হাতে একটি লাঠি নিয়ে মুরিদকে সাহায্যের জন্য সেখানে উপস্থিত হলেন এবং সিংহটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন। সৈয়দ জামাল যখন চোখ খুললেন, তখন দেখলেন সেখানে সিংহের কোনো চিহ্ন নেই এবং হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-ও সেখান নেই।[30]
৬. স্বপ্নে বদ আকিদার চিকিৎসা: জনৈক ব্যক্তি হজরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করত। একদিন ইমামে রব্বানি মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাকতুবাত শরিফ’ পাঠকালে সে একটি উদ্ধৃতি দেখতে পায়, যেখানে বলা হয়েছিল, ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে হজরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা.)-কে মন্দ বলা হজরত আবু বকর ও হজরত ওমর (রা.)-কে মন্দ বলারই নামান্তর। এই সত্য মেনে নিতে না পেরে সে ব্যক্তি ধৃষ্টতা দেখিয়ে কিতাবটি মাটিতে ছুড়ে ফেলে।
সেই রাতেই স্বপ্নে সে মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-কে অত্যন্ত রাগান্বিত অবস্থায় দেখে। ইমামে রব্বানি তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন যে, যার ভালোবাসার দোহাই দিয়ে সে অন্য সাহাবিদের গালি দেয়, সেই হজরত আলী (রা.)-এঁর দরবারেই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। অতঃপর তিনি তাকে হজরত আলী (রা.)-এঁর উপস্থিতিতে নিয়ে যান। সেখানে ‘শেরে খোদা’ অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে তাকে নির্দেশ দেন, যেন সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এঁর কোনো সাহাবির প্রতি ঘৃণা না রাখে এবং মুজাদ্দেদে আলফে সানির লেখার বিরোধিতা না করে।
কিন্তু এই ব্যক্তির অন্তরের কুটিলতা এতই গভীর ছিল যে, স্বয়ং হজরত আলী (রা.)-এঁর নসিহতের পরেও তার মন পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। বিষয়টি উপলব্ধি করে মাওলায়ে কায়েনাত হজরত আলী (রা.) ইমামে রব্বানিকে নির্দেশ দেন ওই ব্যক্তির ঘাড়ের ওপর একটি চড় মারার জন্য। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) তাকে একটি চড় মারেন। এই আধ্যাত্মিক চপেটাঘাতের সাথেসাথেই তার অন্তরের যাবতীয় অন্ধকার ও বিদ্বেষ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। ঘুম থেকে জেগে সে অনুভব করে যে, তার অন্তর সাহাবায়ে কেরামের মহব্বতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে এবং ইমামে রব্বানির প্রতি তার শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেছে।[31]
৭. নিজের ইন্তেকালের সংবাদ আগেই দিয়ে দিলেন: হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি তাঁর ইন্তেকালের অনেক আগেই নিজ সহধর্মিণীকে বলেছিলেন, “আমার নিকট এটি প্রকাশ করা হয়েছে যে, আমার ইন্তেকাল তোমার আগেই হবে।” পরবর্তীতে ঠিক তেমনই হলো। তিনি তাঁর স্ত্রীর আগেই ইহলোক ত্যাগ করে মহান রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে চলে যান।[32]
বাণী চিরন্তন:
১. হালাল ও হারামের বিষয়ে সবসময় আমলকারী আলেমদের কাছে প্রত্যাবর্তন করা উচিত এবং তাঁদের ফাতোয়া অনুযায়ী আমল করা উচিত। কারণ, নাজাতের একমাত্র পথ হলো শরিয়ত।
২. শরিয়তের বিধানসমূহের প্রকৃত রূপ ও সত্যতা আখেরাতের আলোকেই বুঝতে হবে। আল্লাহর নেক বান্দাদের কথায় এক বিশেষ প্রভাব থাকে, তাঁদের বরকতময় বাণীর মাধ্যমেই আমল করার তাওফিক লাভ করা যায়।
৩. জীবনের প্রতিটি কাজে সেই আমলকারী আলেমদের ফাতোয়া অনুসারে চলা উচিত, যারা দৃঢ়তার পথ অবলম্বন করেন এবং রুখসত বা সহজতার পথে চলা থেকে বিরত থাকেন। এটাকেই চিরস্থায়ী ও আখেরাতের নাজাতের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
৪. আখেরাতের মুক্তি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কাজ ও কথা, উসুল ও ফুরু, সব ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের অনুসরণ করার উপর।
৫. রসুলুল্লাহ ﷺ–এর সকল সাহাবায়ে কেরামকে সবসময় সম্মান ও কল্যাণের সাথে স্মরণ করা উচিত।
৬. মিলাদ শরিফের মাহফিলে যদি সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, নাতে রসুল পড়া হয় এবং সাহাবা, আহলে বাইত ও আউলিয়ায়ে কেরামের প্রশংসা করা হয়, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই।
৭. রসুলুল্লাহ (ﷺ)–এঁর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসার লক্ষণ হলো সে ব্যক্তি রসুলুল্লাহ (ﷺ)–এঁর শত্রুদের প্রতি সম্পূর্ণ বিরাগ পোষণ করবে।
১১. খারাপ গান-বাজনা মারাত্মক বিষের মতো। তাই গান-বাজনার প্রতি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা উচিত নয় এবং তার স্বাদেও মুগ্ধ হওয়া উচিত নয়; কারণ এটি মধু মেশানো বিষের ন্যায়।[33]
সংস্কারের ক্ষেত্রসমূহ:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এঁর যুগে ভারতবর্ষ ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে। শাসনব্যবস্থা ছিল সম্রাটকেন্দ্রিক, ফলে রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শ অনেকাংশে সম্রাটের ব্যক্তিগত চিন্তার ওপর নির্ভর করত। মুঘল সম্রাটরা মূলত সুন্নি ও হানাফি হলেও সময়ের সাথে সাথে রাজনীতি, বিলাসিতা এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে সমাজে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
বিশেষ করে সম্রাট আকবরের আমলে ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ নামে একটি নতুন মতবাদের সূচনা হয়, যা ইসলামের মৌলিক আকিদার জন্য বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিছু স্বার্থান্বেষী আলেম, বেদান্তবাদে প্রভাবিত সুফি এবং ভিন্নমতের প্রভাব এই বিভ্রান্তিকে আরও গভীর করে তোলে। এর প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতেই হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) সংস্কারের কাজ শুরু করেন। তাঁর সংস্কার আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল আকিদা শুদ্ধ করা, শরিয়তের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, শাসকশ্রেণিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা এবং মুসলিম সমাজকে আবার সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করা। [34]
ইন্তেকালের পূর্বে নির্জনতা অবলম্বন:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) ১০৩৩ হিজরিতে সিরহিন্দ শরিফে এসে সম্পূর্ণ নির্জনতা অবলম্বন করেন। তাঁর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সাক্ষাতের আকুল আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দুনিয়ার মানুষের প্রতি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত করে তোলে।
এই বিশেষ নির্জন অবস্থায় খুব অল্প কয়েকজনের তাঁর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর প্রিয় দুই পুত্র খাজা মুহাম্মদ সাঈদ (রহ.) ও খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)। খলিফাদের মধ্য থেকে ছিলেন হজরত খাজা মুহাম্মদ হাশিম কিাশমিরি (রহ.) ও হজরত খাজা বদরুদ্দীন (রহ.)। এছাড়াও দুয়েকজন খাদেমের উপস্থিতি ছিল।
হজরত খাজা মুহাম্মদ হাশিম (রহ.) ওফাতের পূর্বেই নিজ এলাকায় ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু হজরত খাজা বদরুদ্দীন (রহ.) শেষ সময় পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। যখন হজরত খাজা মুহাম্মদ হাশিম (রহ.) বিদায় নিতে গেলেন, তখন মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) তাঁর জন্য দোয়া করে বললেন, “আমি দোয়া করি, আখেরাতে যেন আমরা একসঙ্গে সমবেত হতে পারি।”[35]
মিশনের পূর্ণতা ও অসুস্থতা:
হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) তাঁর মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। সিরহিন্দ, দিল্লি ও লাহোর; এই স্থানগুলোতে তিনি যাতায়াত করতেন, কারণ এখান থেকেই হিদায়াতের ঝরনাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা বাড়তে লাগল। ১০৩২ হিজরিতে তিনি আজমির শরিফ সফর করেন এবং সেখানে এমন কিছু আলামত প্রকাশ পেতে শুরু করল, যা তাঁর আখিরাতের সফরের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ফিরে আসার পর শারীরিক দুর্বলতা তাঁর দেহের প্রতিটি অংশে জেঁকে বসল। সময়ের নাজুকতা বুঝতে পেরে তিনি খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-কে তাঁর সমস্ত আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করলেন। যা ছিল মূলত তাঁর খেলাফত ও স্থলাভিষিক্ত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অসুস্থতার দিনগুলোতেও তাঁর ফরজ, ওয়াজিব এমনকি সুন্নত ও মুস্তাহাব আমলগুলো কখনো বাদ পড়েনি। চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। একবার তিনি নিজেই বলে দিলেন, “এখন তো আর মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ দিন বাকি আছে।” কোনো এক চিকিৎসক তাঁকে লবঙ্গ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি যখন এক ভক্তের কাছে লবঙ্গ চাইলেন, তখন সেই ভক্ত ছয়টি লবঙ্গ নিয়ে এল। তিনি কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “এর কি এটুকুও জানা নেই যে, আল্লাহ তায়ালা বেজোড় পছন্দ করেন?” সুন্নতের অনুসরণের এই চেতনা সারাজীবন তাঁর মাঝে ছিল, এমনকি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই প্রেরণা অম্লান ছিল।
অন্তিম ইচ্ছা ও সুন্নতের অনুসরণ:
রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হলো, তাঁর হায়াত বা জীবনকাল যেন রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর জীবনকালের (৬৩ বছর) চেয়ে বেশি না হয়, যাতে এই শেষ সুন্নতটিও আদায় হয়ে যায়। শেষ দিনগুলোতে দান-সদকার পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। প্রাত্যহিক আমলগুলো বরাবরের মতোই চলছিল। তিনি নিজের চলে যাওয়ার খবরও দিচ্ছিলেন এবং সবাইকে দ্বীনের ওপর অটল থাকার উপদেশ দিচ্ছিলেন।
অবশেষে সেই শেষ মুহূর্তটি ঘনিয়ে এলো। জীবনের শেষ রাতটি অতিবাহিত হলো জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে। বিশেষ করে সেই সব মাসনুন দোয়া, যা সিহাহ সিত্তাহর কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাহাজ্জুদ আদায় করলেন এবং বললেন, “এটাই আমার শেষ তাহাজ্জুদ।” আসলে মৃত্যুভয় তাঁদের কী স্পর্শ করবে, যাঁরা প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আগমনের প্রতীক্ষায় থাকেন? এরপর জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে ইশরাকের নামাজও শেষ করলেন।
প্রস্রাবের বেগ হলে পাত্র আনা হলো, কিন্তু খাদেম তাতে বালু দেয়নি। তিনি বললেন, “খেয়াল রেখো যেন ছিটে এসে কাপড় নাপাক না করে।” বলা হলো যে অন্য পাত্র আনা হচ্ছে, তখন তিনি বললেন, “এখন থাক, এতে অজু ভেঙে যাবে আর এখন পুনরায় অজুর সময় নেই।” তিনি মহান আল্লাহর দরবারে বে-অজু অবস্থায় যেতে চাচ্ছিলেন না। এরপর তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। শোয়ার সময়ও রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর সুন্নতের কথা মাথায় রাখলেন। ডান গালের নিচে ডান হাত রেখে শুয়ে পড়লেন। হঠাৎ তাঁর শ্বাস ধীর হয়ে এলো এবং মৃদু কণ্ঠে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ শব্দ শোনা যেতে লাগল। অবশেষে মিল্লাতে ইসলামের সেই মহান মুজাদ্দিদ ২৮শে সফর ১০৩৪ হিজরি, ইশরাকের নামাজের পর মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পাড়ি জমালেন।[36]
জানাজা, দাফন ও মাজার শরিফ:
হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)–এঁর জানাজার নামাজ তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত খাজা মুহাম্মদ সাঈদ (রহ.) আদায় করান। এরপর তাঁর বড় সাহেবজাদা মুহাম্মদ সাদিক (রহ.)-কে যেখানে তিনি নিজ হাতে দাফন করে একটি গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন, সেই গম্বুজের নিচেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। এটাই সে স্থান, যেখানে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) জীবদ্দশায় এক নুরানি দৃশ্য দেখেছিলেন এবং অসিয়ত করে বলেছিলেন, “আমার কবর আমার ছেলের কবরের সামনে তৈরি করবে; কারণ আমি সেখানে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান দেখতে পাচ্ছি।” এই গম্বুজের নিচে প্রথমে মরহুম হজরত খাজা মুহাম্মদ সাদিক (রহ.)–কে ১০২৫ হিজরিতে দাফন করা হয়। এরপর হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)–কে তাঁর পাশেই দাফন করা হয়।[37]