ভারতবর্ষের ইতিহাসে ইসলামি রেনেসাঁ এবং সুফি দর্শনের প্রসারে যে মনীষীর গুরুত্ব পর্বতসম, তিনি হলেন আতা-এ-রসুল, বান্দা-এ-নেওয়াজ, সুলতানুল হিন্দ হজরত খাজা সৈয়্যদ মঈনুদ্দিন হাসান চিশতি (রহ.)। তিনি আধ্যাত্মিক জগতের এক দীপ্যমান নক্ষত্র, যাঁর প্রেমের পরশ ভারতের বিচিত্র ভূমিতেও বইয়ে দিয়েছিল প্রশান্তির ফল্গুধারা। কোনো প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ বা পেশিশক্তির জোরে নয়; বরং কেবল চারিত্রিক উৎকর্ষ আর ‘ইশক-এ-ইলাহি’ বা স্রষ্টার প্রতি প্রেমের মোহে তিনি জয় করেছিলেন এ দেশের মানুষের হৃদয়।
পারস্যের পুণ্যভূমি সিজিস্তান থেকে শুরু হওয়া তাঁর আধ্যাত্মিক সফরের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ভারতের আজমির শরিফ। তৎকালীন ঘোর অন্ধকার, জাতপাতের কঠোর বিভেদ আর সামাজিক অস্থিরতার মাঝে তিনি নিয়ে এসেছিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক কালজয়ী দর্শন। তাঁর খানকাহ হয়ে উঠেছিল আর্তমানবতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ ছিল না; ছিল কেবল স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য আর সৃষ্টির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবসেবার কারণেই তিনি বিশ্বজুড়ে ‘গরিব নাওয়াজ’ বা ‘দরিদ্রের বন্ধু’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
জন্ম ও প্রাথমিক পরিচিতি:
হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা গরিব নাওয়াজ মইনুদ্দীন হাসান সানজারি চিশতি আজমেরী (রহ.) ৫৩৭ হিজরি, অর্থাৎ ১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে সিজিস্তান বা সিস্তানের ‘সানজার’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।[1] তাঁর আসল নাম ছিল ‘হাসান’। তিনি মাতা-পিতা উভয় দিক থেকেই রসুল ﷺ এঁর সম্মানিত বংশধর তথা হাসানি ও হুসাইনি সাইয়্যিদ। তাঁর বহু উপাধি থাকলেও প্রসিদ্ধ উপাধিগুলোর মধ্যে রয়েছে—মঈনুদ্দিন, খাজা গরিব নাওয়াজ, সুলতানুল হিন্দ, ওয়ারিসে নবী এবং আতায়ে রসুল প্রভৃতি।
পিতৃসূত্রে বংশপরিচয়:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ, খাজা মইনুদ্দিন হাসান চিশতি (রহ.)-এর পিতৃসূত্রে বংশপরম্পরা নিম্নরূপ—
খাজা মইনুদ্দিন হাসান ইবনে খাজা গিয়াসউদ্দিন ইবনে খাজা নাজমুদ্দিন তাহির ইবনে সাইয়্যিদ আবদুল আজিজ ইবনে সাইয়্যিদ ইব্রাহিম ইবনে সাইয়্যিদ ইদরিস ইবনে সাইয়্যিদ ইমাম মূসা কাযিম ইবনে ইমাম জাফর সাদিক ইবনে ইমাম মুহাম্মদ বাকির ইবনে ইমাম জয়নুল আবেদীন ইবনে ইমাম হুসাইন ইবনে হজরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহুম।
মাতৃসূত্রে বংশপরিচয়:
হজরত খাজা গরিব নওয়াজ (রহ.)-এর আম্মাজান বিবি উম্মুল ওয়ারা (রহ.)—যিনি বিবি মাহ নূর ও বিবি খাসুল মুল্ক নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন সাইয়্যিদ দাউদ-এর কন্যা। তাঁর বংশপরম্পরা হলো— বিবি উম্মুল ওয়ারা বিনতে সাইয়্যিদ দাউদ ইবনে হজরত আবদুল্লাহ হাম্বলী ইবনে সাইয়্যিদ জাহিদ ইবনে সাইয়্যিদ মাওরিস ইবনে সাইয়্যিদ দাউদ ইবনে সাইয়্যিদ নামূসি জুন ইবনে সাইয়্যিদুনা আবদুল্লাহ মাখফি ইবনে সাইয়্যিদুনা হাসান মুসান্না ইবনে সাইয়্যিদুনা ইমাম হাসান ইবনে হজরত আলি রাদ্বিআল্লাহু আনহুম।[2]
শৈশব থেকে তিনি ছিলেন গরিব নাওয়াজ:
যখন খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর বয়স মাত্র পনেরো বছরে পৌঁছায়, তখন তাঁর পিতার ইন্তেকাল ঘটে। পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে একটি বাগান ও একটি পানির চাকা (চালিত কল) ছিল। তিনি এটিকেই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। নিজেই বাগানের দেখাশোনা করতেন এবং গাছপালায় পানি দিতেন।[3]
একবার ঈদের দিন হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ সুন্দর পোশাক পরিধান করে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি একটি ছেলের ওপর পড়ল। ছেলেটি ছিল অন্ধ এবং তার পরনে ছিল ছেঁড়া কাপড়। সে ছেলেটিকে দেখে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। তাঁর চরিত্রের মাঝে যে ‘দরিদ্রের প্রতি দয়া’ গুণটি সুপ্ত ছিল, তা হঠাৎ প্রকাশ পেল। তিনি নিজের পোশাক খুলে সেই দরিদ্র ও অন্ধ ছেলেটিকে দিয়ে দিলেন এবং তাকে নিজের সাথে করে ঈদগাহে নিয়ে গেলেন।[4]
এক আল্লাহর অলির দৃষ্টিতে জীবনের মোড় পরিবর্তন:
একদিন হজরত গরিব নাওয়াজ সাইয়্যিদুনা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি আজমেরী (রহ.) বাগানে গাছপালায় পানি দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক মজযুব বুজুর্গ তথা হজরত সাইয়্যিদুনা ইবরাহিম কন্দুজী (রহ.) সেখানে আগমন করলেন। খাজা মঈনুদ্দিন (রহ.)-এর দৃষ্টি যখন আল্লাহর এই প্রিয় বান্দার ওপর পড়ল, তখনই তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন, সালাম করলেন এবং গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর হাত চুম্বন করলেন। অতঃপর অত্যন্ত ভক্তি ও সম্মানের সাথে তাঁকে গাছের ছায়ায় বসালেন।
এরপর বিনয়ভরে তাঁর খেদমতে তাজা আঙুরের একটি থোকা পেশ করলেন এবং নিজে আদবের সাথে দু’হাত গুটিয়ে সামনে বসে পড়লেন। সেই আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ এই তরুণ বাগানির আচরণে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। খুশি হয়ে তিনি তাঁর চিবানো শুকনো রুটি থেকে একটি অংশ খাজা সাহেব (রহ.)-এর মুখে তুলে দিলেন।
এই টুকরাটি খাওয়ার সাথেসাথেই তাঁর অন্তরের অবস্থা আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেল। দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ হঠাৎ করেই দূর হয়ে গেল এবং হৃদয় সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর প্রেমে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। এরপর তিনি নিজের বাগান, পানির চাকা (চালিত কল) এবং সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে তার অর্থ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। অতঃপর দ্বীনি ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পথে একনিষ্ঠ মুসাফির হয়ে বেরিয়ে পড়েন।[5]
জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে সফর:
হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) মাত্র পনেরো বছর বয়সে ইলমে দ্বীন অর্জনের উদ্দেশ্যে সফর শুরু করেন। তিনি সমরকন্দে গিয়ে হজরত সাইয়্যিদুনা মাওলানা শরফুদ্দীন (রহ.)-এর দরবারে উপস্থিত হন এবং তাঁর নিকটেই নিয়মিতভাবে দ্বীনি শিক্ষার সূচনা করেন। প্রথমে তিনি পবিত্র কুরআন মাজিদ হিফজ সম্পন্ন করেন, এরপর তাঁর কাছ থেকেই অন্যান্য ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন।
কিন্তু যতই তিনি ইলম অর্জন করতে থাকেন, ততই তাঁর জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ও তৃষ্ণা বাড়তে থাকে। এই জ্ঞানের পিপাসা নিবারণের জন্য তিনি বুখারার দিকে রওনা হন। সেখানে তিনি বিখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা হিসামুদ্দীন বুখারী (রহ.)-এর কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর স্নেহময় তত্ত্বাবধানে অল্প সময়ের মধ্যেই সকল দ্বীনি জ্ঞানের পরিপূর্ণতা লাভ করেন। এভাবে তিনি মোটামুটি প্রায় পাঁচ বছর সমরকন্দ ও বুখারায় অবস্থান করে ইলমে দ্বীন অর্জন করেন।[6]
আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ:
হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ইতিমধ্যেই জাহিরি জ্ঞানের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। তবে যে তৃষ্ণার কারণে তিনি পরিবার ও ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছিলেন, তার তৃপ্তি তখনো অর্জিত হয়নি। তাই তিনি এমন একজন পারদর্শী চিকিৎসকের সন্ধানে রওনা হলেন, যিনি হৃদয়ের ব্যথা নিরাময় করতে সক্ষম। অতএব, পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক খুঁজতে তিনি বুখারা থেকে হিজাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথে নীশাপুরের পার্শ্ববর্তী ‘হারুন’ এলাকায় পৌঁছে জানতে পারলেন, সেই অঞ্চলে মহামর্যাদাবান কুতুব হজরত সাইয়্যিদুনা উসমান হারুনি চিশতি (রহ.) আছেন। তা শুনে তিনি অবিলম্বে উপস্থিত হয়ে তাঁর হাতে বায়াত নেন এবং চিশতিয়া সিলসিলায় অন্তর্ভুক্ত হন।
হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা মঈনুদ্দিন (রহ.) বহু বছর তাঁর পীর ও মুর্শিদ হজরত সাইয়্যিদুনা উসমান হারুনি চিশতি (রহ.)-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি আত্মজ্ঞান ও বাতিনি জ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছান। যেখানে যেখানে হজরত সাইয়্যিদুনা উসমান হারুনি চিশতি (রহ.) যাতায়াত করতেন, খাজা (রহ.) তাঁর সকল প্রয়োজনীয় সামগ্রী কাঁধে বহন করতেন। এ-ছাড়াও তিনি বহুবার তাঁর মুর্শিদের সঙ্গে হজের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
তিনি তাঁর মুর্শিদের দরবারে এতটাই মকবুল ছিলেন যে, একদা খোদ মুর্শিদে করিম হজরত খাজা ওসমান হারুনি (রহ.) স্বয়ং ইরশাদ করেছিলেন, “আমাদের মঈনুদ্দিন আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত প্রিয়; আমি আমার মুরিদকে নিয়ে গর্ব করি।”[7]
একবার হজের সময় হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা ওসমান হারুনি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) কাবা শরিফের ‘মিজাবে রহমত’-এর নিচে খাজা গরিব নাওয়াজের হাত ধরে মহান আল্লাহর দরবারে এই বলে দোয়া করলেন, “হে মাবুদ, আমার মঈনুদ্দিন হাসানকে তোমার দরবারে কবুল করে নাও।” তখন গায়েব (অদৃশ্য) থেকে আওয়াজ এলো “মঈনুদ্দিন আমাদের বন্ধু, আমরা তাকে কবুল করে নিয়েছি।”[8]
তরিকতের শাজরা:
তাঁর বায়াতের শাজরা বা আধ্যাত্মিক ধারা ১৫ জন ঊর্ধ্বতন শায়েখের মধ্য দিয়ে ইমামুল আউলিয়া হজরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যথা—
১. হজরত খাজা মঈনুদ্দিন হাসান সাঞ্জারি (রহ.)
২. হজরত খাজা উসমান হারুনি চিশতি (রহ.)
৩. হজরত হাজী শরিফ জিন্দানি চিশতি (রহ.)
৪. হজরত কুতুবুদ্দিন মওদুদ চিশতি (রহ.)
৫. হজরত খাজা নাসিরুদ্দিন আবু ইউসুফ চিশতি (রহ.)
৬. হজরত খাজা আবু মুহাম্মদ চিশতি (রহ.)
৭. হজরত খাজা আবু আহমদ আবদাল চিশতি (রহ.)
৮. হজরত খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি (রহ.)
৯. হজরত খাজা মামশাদ উলু দিনাওয়ারী (রহ.)
১০. হজরত শেখ হুবায়রা বসরী (রহ.)
১১. হজরত শেখ হুজাইফা মারআশী (রহ.)
১২. হজরত সুলতান ইব্রাহিম আদহাম (রহ.)
১৩. হজরত খাজা ফুজাইল বিন ইয়াজ (রহ.)
১৪. হজরত খাজা আব্দুল ওয়াহিদ বিন জায়েদ (রহ.)
১৫. হজরত হাসান বসরী (রহ.)
১৬. ইমামুল আউলিয়া সাইয়্যেদুনা হজরত আলি (রা.)।[9]
তাঁর আধ্যাত্মিক মাকাম:
বর্ণিত আছে যে, একদিন হজরত খাজা উসমান হারুনি (কুদ্দিসা সিররুহু) একটি বিশেষ মজলিসে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (কুদ্দিসা সিররুহু)-কে ডেকে পাঠালেন। সে সময় সেখানে অনেক বড় বড় মাশায়েখগণ উপস্থিত ছিলেন। খাজা গরিব নাওয়াজ সেখানে উপস্থিত হলে তিনি ইরশাদ করলেন, “হে মুইনুদ্দিন, অজু করো এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করো।” তিনি পীরের আদেশ পালন করলেন এবং কিবলামুখী হয়ে বসলেন। নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমে সুরা বাকারা পাঠ করলেন এবং এরপর ২১ বার দরুদ শরিফ পড়লেন।
অতঃপর হজরত খাজা উসমান হারুনি (রহ.) তাঁর হাত ধরলেন এবং আকাশের দিকে মুখ করে বললেন, “হে মুইনুদ্দিন, আমি তোমাকে আল্লাহ তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম এবং বারগাহে কিবরিয়ার মকবুল বান্দা বানিয়ে দিলাম।” এরপর তিনি খাজা সাহেবের মাথার চুল মুণ্ডন করে দিলেন এবং চার ভাঁজ বিশিষ্ট টুপি পরিয়ে দিলেন। সেই সাথে পীর মাশায়েখদের পক্ষ থেকে সিনা-বসিনা চলে আসা ‘ইসমে আজম’ এবং মুবারক খিরকা দান করলেন।
এরপর পীর সাহেব নির্দেশ দিলেন, “এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করো।” পাঠ শেষ হলে বললেন, “মাথা উঁচু করে ওপরের দিকে তাকাও।” খাজা গরিব নাওয়াজ যখন মাথা তুললেন, তখন আরশে মুয়াল্লা থেকে জমিনের গভীর পর্যন্ত সবকিছু তাঁর নজরে ভেসে উঠল।
পীর সাহেব আবার বললেন, “আরও এক হাজার বার সূরা ইখলাস পড়ে দেখো।” পাঠ শেষে হজরত হারুনি (রহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন কী দেখতে পাচ্ছ?” তিনি আরজ করলেন, “আমি মহান রবের মহিমার পর্দা (হিজাবে আজমত) দেখতে পাচ্ছি।” পীর সাহেব বললেন, “হে মুইনুদ্দিন, শুকরিয়া আদায় করো, তুমি তোমার মাকসাদে পৌঁছে গেছ।” অতঃপর তিনি বললেন, “সামনে যে ইটটি পড়ে আছে সেটি নিয়ে এসো।” খাজা গরিব নাওয়াজ ইটটি হাতে নিতেই তা সোনায় পরিণত হলো। পীর সাহেব বললেন, “এটি অভাবী ও মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দাও।” তিনি তখনই তা বণ্টন করে দিলেন। খাজা গরিব নাওয়াজ টানা বিশ বছর তাঁর মুরশিদের খিদমতে ছিলেন। যখনই সফরে যেতেন, পীর সাহেবের আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিজের মাথায় করে সাথে নিয়ে যেতেন।[10]
দরবারে রিসালত থেকে হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্য লাভ:
একবার হজ পালন শেষ করে হজরত খাজা ওসমান হারুনি (রহ.) এবং হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছালেন এবং সরাসরি সাইয়্যিদুল মুরসালিন ﷺ এর রওজা শরিফে হাজির হলেন। সেখানে তাঁর ‘মুর্শিদে কামেল’ তাঁর সত্যনিষ্ঠ মুরিদকে আদেশ করলেন, “হে মঈনুদ্দিন, দুই জাহানের সর্দার, প্রিয় নবি ﷺ এর দরবারে সালাম পেশ কর।” হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) অত্যন্ত ভক্তি ও আনুগত্যের সঙ্গে আরজ করলেন, “আসসালাতু ওয়াস-সালামু আলাইকা ইয়া সাইয়্যিদুল মুরসালিন ওয়া খাতামান নাবিয়্যিন।”
সাথে সাথে পবিত্র রওজা শরিফ থেকে প্রতিধ্বনি এলো, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম ইয়া কুতুবুল মাশায়েখ!” এরপর হজরত খাজা ওসমান হারুনি (রহ.) খাজা গরিব নাওয়াজকে দুরুদ শরিফ পাঠের নির্দেশ দিলেন। তিনি এশা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে দুরুদ পাঠে মগ্ন থাকলেন। নামাজের পর, তন্দ্রার ভেতর, প্রিয় নবি ﷺ-এর জিয়ারত লাভ হলো। নবীজি ﷺ ইরশাদ করলেন, “হে মঈনুদ্দিন, আল্লাহর নির্দেশে আমি তোমাকে ‘সুলতানুল হিন্দ’ নিযুক্ত করেছি। এখন তুমি তোমার মুর্শিদের কাছ থেকে হিন্দুস্তান যাওয়ার অনুমতি গ্রহণ কর।”
পরদিন সকালেই তিনি তাঁর প্রিয় মুর্শিদকে স্বপ্নের ঘটনার বর্ণনা দিলেন। হজরত খাজা ওসমান হারুনি (রহ.) নবি ﷺ এর দরবারে তাঁর প্রিয় মুরিদের এই গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের খবর শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি বললেন, “তুমি তো হিন্দুস্তান দেখোনি, চোখ বন্ধ করো, আমি তোমাকে সেই অচেনা দেশ ঘুরিয়ে দেখাব।” হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুর্শিদ মাত্র কয়েক মুহূর্তেই আধ্যাত্মিক শক্তিতে তাঁকে পুরো হিন্দুস্তান পরিভ্রমণ করালেন।
অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী, হজ শেষে যখন তিনি মুর্শিদের সঙ্গে রওজা শরিফে উপস্থিত হন, তখনই প্রিয়নবী ﷺ স্বপ্নে তাঁকে হিন্দুস্তানে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ দেন এবং সেই স্বপ্নের জগতে তাঁকে পুরো দেশ ঘুরিয়ে দেখান। বিদায়ের সময় নবীজি ﷺ তাঁকে একটি ডালিম ফল উপহার দিয়ে দোয়া করেন।[11]
সুলতানুল হিন্দের ভারত সফর:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে সেই মহান সুসংবাদ লাভের পর খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) হিন্দুস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এই দীর্ঘ সফরে তিনি সমরকন্দ, বুখারা, ইলমের শহর বাগদাদ শরিফ, নিশাপুর, তাবরিজ, ওশ, ইসফাহান, সবজওয়ার, খোরাসান, খারকান, আশতারাবাদ, পাঞ্জ এবং গজনি প্রভৃতি অঞ্চল অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ভারতের আজমির শরিফে পদার্পণ করেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি শত শত আউলিয়া এবং উম্মতের শীর্ষস্থানীয় বুজুর্গদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
তিনি বাগদাদে আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হজরত সাইয়্যিদুনা গাউসুল আজম মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী (কুদ্দিসা সিররুহুন নূরানী)-এর পবিত্র সান্নিধ্যে হাজির হন এবং দীর্ঘ পাঁচ মাস পর্যন্ত ‘বারগাহে গাউসিয়া’ থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ ও বরকত হাসিল করেন। এরপর তাবরিজে শেখ বদরুদ্দিন আবু সাঈদ তাবরিজি (রহ.)-এর দরবার থেকে ইলমের উত্তরাধিকার লাভ করেন। ইসফাহানে শেখ মাহমুদ ইসফাহানি (রহ.)-এর খিদমতে উপস্থিত হন এবং খারকানে শেখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের ও খাজা আবুল হাসান খারকানি (রহ.)-এর মাজার শরিফ জিয়ারত করেন। আশতারাবাদে হজরত আল্লামা শেখ নাসিরুদ্দিন আশতারাবাদী (রহ.)-এর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। হেরাতে শায়খুল ইসলাম ইমাম আব্দুল্লাহ আনসারী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং বলখ শহরে শায়খ আহমদ খিদ্বরিয়া (রহ.)-এর খানকাতে অবস্থান করেন।[12]
সাবজওয়ারের শাসকের তওবা:
ভারতবর্ষে সফরের পথে যখন হজরত সাইয়্যিদুনা খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) ইরানের খোরাসান প্রদেশের সাবজওয়ার এলাকা অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি সেখানে একটি বাগানে অবস্থান নেন। সেই বাগানের মাঝখানে একটি মনোরম জলাধার ছিল। বাগানটি ছিল সাবজওয়ারের তৎকালীন শাসকের, যে ছিল অত্যন্ত দাপুটে, অত্যাচারী এবং পথভ্রষ্ট প্রকৃতির লোক। তার অভ্যাস ছিল যে, সে যখনই বাগানে আসতো, মদ পান করতো এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ভীষণ শোরগোল ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করতো।
খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) সেই জলাধার থেকে অজু করলেন এবং নফল নামাজ আদায় করতে লাগলেন। উপস্থিত লোকজন খাজা গরিব নাওয়াজকে শাসকের কঠোরতা ও বদমেজাজের কথা খুলে বললেন এবং অনুরোধ করলেন যেন তিনি সেখান থেকে চলে যান, পাছে শাসক তাঁর কোনো ক্ষতি করে না বসে। খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) উত্তরে বললেন, “আল্লাহ তায়ালাই আমার একমাত্র রক্ষক ও সাহায্যকারী।”
এমন সময় সেই শাসক বাগানে প্রবেশ করল এবং সরাসরি জলাধারের দিকে এগিয়ে এলো। তার আমোদ-প্রমোদের জায়গায় একজন অচেনা দরবেশকে দেখে সে রাগে অগ্নীশর্মা হয়ে গেল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর নুরানি দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকালেন এবং মুহূর্তেই তার ভেতরের জগত ও ভাগ্য বদলে গেল। খাজা গরিব নাওয়াজের সেই জালালি দৃষ্টির প্রভাব শাসক সহ্য করতে পারল না। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
খাদেমরা তার মুখে পানির ঝাপটা দিলো। জ্ঞান ফেরার সাথেসাথেই সে খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর কদম মোবারকে লুটিয়ে পড়ল এবং নিজের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও গুনাহ থেকে তওবা করে তাঁর পবিত্র হাতে বায়আত গ্রহণ করল। পীর ও মুর্শিদ হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টায় সে জুলুম করে দখল করা সমস্ত ধন-সম্পদ প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিলো এবং খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর সান্নিধ্য অবলম্বন করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাকে বাতেনি ফয়েজ ও বরকতে ধন্য করে খেলাফত প্রদান করেন এবং সেখান থেকে বিদায় নেন।[13]
হজরত দাতা গঞ্জে বখশের দরবারে:
এই সফরেই হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) হজরত দাতা গঞ্জ বখশ সৈয়্যদ আলী হুজভেরি লাহোরি (রহ.)-এঁর পবিত্র মাজার শরিফ জিয়ারত করেন। সেখানে তিনি কেবল উপস্থিতই হননি; বরং দীর্ঘ সময় মোরাকাবায় নিমগ্ন থাকেন এবং হজরত দাতা গঞ্জ বখশ (রহ.)-এর বিশেষ আধ্যাত্মিক কৃপা ও ফয়েজ লাভ করেন। পবিত্র মাজার থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি দাতা গঞ্জ বখশ (রহ.)-এঁর মহান মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক দানশীলতা বর্ণনা করে এই কালজয়ী ফারসি শেরটি পাঠ করেন—
گنج بخش فیضِ عالم مظہرِ نورِ خدا
ناقصاں را پیرِ کامل، کاملاں را رہنما
গঞ্জ বখশ ফয়জে আলম মাজহারে নুরে খোদা,
নাকেসাঁ রা পীরে কামিল, কামিলাঁ রা রহনুমা।
অর্থাৎ, দাতা আলী হুজভেরি (রহ.) হলেন নিখিল বিশ্বের জন্য আধ্যাত্মিক কৃপার ভাণ্ডার এবং আল্লাহর নুরের মূর্ত প্রকাশ। আধ্যাত্মিক পথে যারা এখনো অপূর্ণ বা প্রাথমিক স্তরে আছে, তাদের জন্য তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ পীর; আর যারা নিজেরা পূর্ণতা লাভ করেছেন বা কামিল স্তরে আছেন, তাদের জন্যও তিনি মহান দিকনির্দেশক।[14]
আজমির শরিফে আগমন:
হজরত দাতা গঞ্জ বখশ (রহ.) থেকে বাতেনি ফয়েজ ও বরকত হাসিল করার পর তিনি লাহোর থেকে দিল্লিতে যান। সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করার পর আজমির শরিফের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যখন তিনি ‘কানা পাঠালা’ নামক জায়গায় পৌঁছলেন, তখন স্থানীয় রাজা ‘রায় পিথোরা’র লোকেরা খাজা গরিব নাওয়াজকে ঠিক সেই আকৃতিতে দেখতে পেল যা বাদশাহর মা (গণনা করে) আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন। ফলে তাঁকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে শত্রুরা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে সেখানে অবস্থান করার অনুরোধ জানালো। কিন্তু তিনি তাঁর বাতেনি প্রজ্ঞায় তাদের প্রতারণা ও ধূর্ততা বুঝতে পারলেন এবং তাদের কথা এড়িয়ে গেলেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর খাদেমদের নিয়ে সামনে এগিয়ে চললেন। অবশেষে ১০ই মহররম আজমির শহরে পদার্পণ করেন এবং একটি পিপল গাছের নিচে অবস্থান নেন, যেখানে বাদশাহর উটগুলো বাঁধা হতো। বলাবাহুল্য, আজমির তখন রাজা ‘পৃথ্বীরাজ’ কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল।
উটের রাখালরা সেখানে আসার পর হজরত গরিব নাওয়াজকে সেখানে বসা অবস্থায় দেখে বলতে লাগল, ‘এখান থেকে উঠুন, এখানে রাজার উটগুলো বসে।’ কিন্তু তিনি তাদের কথার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। যখন রাখালরা খুব বেশি জেদ করতে লাগল, তখন তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি, তোমাদের উট এখানেই বসবে।’ এই বলে তিনি সেখান থেকে উঠে ‘আনা সাগর’ হ্রদের তীরে গিয়ে অবস্থান নিলেন।
অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মনোরম একটি স্থান, যা তাঁর খুব পছন্দ হলো। তিনি সেখানে বসে ইবাদতে মশগুল হলেন। অপরদিকে রাজার উটগুলো যখন নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বসল, তখন সেগুলো এমনভাবে আটকে গেল যে, আর উঠতে পারছিল না। উটের রাখালরা এই অলৌকিক ঘটনার কথা রাজার কাছে গিয়ে বর্ণনা করল। রাজা বলল, ‘সেই দরবেশের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
রাখালরা যখন তাঁর কাছে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল, তখন তিনি বললেন, ‘যাও, তোমাদের উটগুলো উঠে দাঁড়িয়েছে।’ তারা সেখানে গিয়ে দেখল যে সত্যি উটগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তারা রাজার কাছে গিয়ে এই ঘটনা বর্ণনা করলে রাজা অত্যন্ত ভীত ও স্তম্ভিত হয়ে গেল।[15]
একটি পাত্রে আনা সাগর:
একদা হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর একজন খাদেম অজুর পানি আনতে ‘আনা সাগর’ হ্রদে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে রাজার সৈন্যরা পাহারায় নিয়োজিত। খাদেম যখন কলসিতে পানি ভরতে চাইলেন, তখন সৈন্যরা তাঁকে কঠোরভাবে বাধা দিলো এবং বলল, ‘তোমরা এটি আর স্পর্শ করতে পারবে না, হ্রদের পানি নোংরা করো না।’ খাদেম বললেন, ‘পানি তো পশুপাখিদের জন্যও বন্ধ করা হয় না, আর আমরা তো মানুষ!’ এতে সৈন্যরা উপহাস করে বলল, ‘তোমরা পশুদের চেয়েও অধম।’ খাদেম ফিরে এসে যখন হুজুরকে সব কথা জানালেন, তখন তিনি বললেন, ‘সৈন্যদের গিয়ে বলো যে, এবারের মতো শুধু এক কলসি পানি নিতে দাও, এরপর আমরা আমাদের অন্য কোনো ব্যবস্থা করে নেব।’
হুজুরের নির্দেশে খাদেম যখন পুনরায় হ্রদে গেলেন, তখন সৈন্যরা বিদ্রুপ করে বলল, ‘আজকের মতো কলসি ভরে নাও, এরপর তোমাদের আর এখান থেকে পানি নিতে দেওয়া হবে না।’ অতঃপর খাদেম হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী কলসি ভরে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য ও মুসলমান খাদেম উভয়ই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁরা অবাক হয়ে দেখলেন যে, বিশাল হ্রদের সমস্ত পানি একটি ছোটো পাত্রের ভেতরে চলে এসেছে! যে হ্রদের পানি নিয়ে সৈন্যরা অহংকার করছিল, তা মুহূর্তেই পানিশূন্য হয়ে গেল।
রাজসৈন্যদের কাছে এটি ছিল এক বিশাল জাদুকরী প্রদর্শনী। এই দৃশ্য দেখে রাজসৈন্যরা ভীত হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। খাদেমও হুজুরের দরবারে ফিরে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। পুরো আজমির নগরে হুলুস্থুল পড়ে গেল; আনা সাগর শুকিয়ে যাওয়ার খবর সবার জন্য ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। পৃথ্বীরাজ যে-কোনো মূল্যে মুসলমানদের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে চাইলো। উপদেষ্টারা তাকে পরামর্শ দিল যে, এই মুসলমান ফকিরের মোকাবেলা কেবল হিন্দু তান্ত্রিকরাই করতে পারবে।
কিন্তু তার আগেই আজমির শহরের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি আনা সাগরের পানি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আকুতি নিয়ে হুজুরের দরবারে হাজির হলেন। তাঁরা আরজ করলেন যে, হ্রদের পানি এভাবে শুকিয়ে থাকলে অনেক মানুষ তৃষ্ণায় মারা যাবে। তখন তিনি ইসলামের উদারতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে বললেন, “এটি তো সত্যের নাফরমানদের জন্য কেবল একটি সামান্য ঝলক, অন্যথায় আমাদের ধর্ম তো একটি কুকুরকেও তৃষ্ণায় ছটফট করতে দেখতে পারে না।” অতঃপর তিনি তাঁর খাদেমকে নির্দেশ দিলেন যেন পাত্রের পানি পুনরায় হ্রদে ঢেলে দেওয়া হয়।
হুজুরের নির্দেশে কলসির পানি যখন হ্রদে ঢালা হলো, তখন মানুষ অবাক হয়ে দেখল যে, হ্রদের পানি পুনরায় কানায় কানায় ভরে উঠেছে।
মূর্তিপূজারি ও পৃথ্বীরাজের জন্য হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর পক্ষ থেকে এটি ছিল এক বিশাল বার্তা। কিন্তু তা বোঝার এবং তার ওপর আমল করার পরিবর্তে সে অবাধ্যতায় মেতে উঠল এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করল। এমনকি হজরত গরিব নাওয়াজ এবং তাঁর খিদমতে থাকা দরবেশদের ওপর সে নানাভাবে জুলুম চালাতে লাগল।[16]
হিন্দুস্তানে মুসলিম বাহিনীর আগমনের অনুমতি:
পৃথ্বীরাজ যখন তার বিদ্বেষ ও শত্রুতা থেকে বিরত হলো না এবং জুলুম চরমে নিয়ে গেল, তখন হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে সেই স্বৈরাচারী শাসনের তখত উল্টে দিলেন। তিনি হিন্দুস্তানের জমিনে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে শাসনের লাগাম সুলতান মুইজুদ্দিন ওরফে শাহাবুদ্দিন ঘুরির হাতে তুলে দিলেন এবং জনগণকে পৃথ্বীরাজের বর্বরতা থেকে মুক্তি দিলেন।
শায়খুল মুহাক্কিক হজরত আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি (খাজা সাহেব) পৃথ্বীরাজের শাসনকালে আজমিরে তশরিফ আনেন এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। পৃথ্বীরাজ সে সময় আজমিরেই অবস্থান করছিল। একদিন সে কোনো এক কারণে তাঁর এক মুরিদকে কষ্ট দিল। তিনি তাকে খবর পাঠালেন, ‘কষ্ট দিও না।’ কিন্তু তার মাথা অহংকার ও দম্ভে পূর্ণ ছিল; সে বিরত হলো না; বরং সে মুরিদ সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করল। তখন তিনি বললেন, “আমি পৃথ্বীরাজকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করে ইসলামের বাহিনীর হাতে তুলে দিলাম।”
ঠিক সেই দিনগুলোতেই শাহাবুদ্দিন ঘুরি গজনী থেকে বিশাল বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্তান আক্রমণ করেন। পৃথ্বীরাজ মোকাবেলা করতে এলেও আল্লাহর হুকুমে সে জীবিত অবস্থায় বন্দি হয়।[17]
পৃথ্বীরাজ ও কাফেরদের জাদুর মোকাবেলা:
শত্রুরা যখন তাদের সব চেষ্টায় ব্যর্থ হলো, তখন তারা মন্দিরে গিয়ে প্রধান ব্রাহ্মণের কাছে সব ঘটনা খুলে বলে তার সাহায্য চাইলো। ব্রাহ্মণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “বন্ধুরা, এই দরবেশ তাঁর ধর্মে অনেক বড়ো বুজুর্গ এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর মোকাবেলায় জাদুবিদ্যা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় জানা নেই।” এরপর সে সবাইকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বলল, “এটি পড়তে থাকো, সম্ভবত এর প্রভাবে এই দরবেশ এখানে টিকতে পারবে না।” কাফেররা সেই মন্ত্র পড়তে শুরু করল এবং ব্রাহ্মণ তাদের নিয়ে এগিয়ে চলল।
যখন তারা হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর কাছাকাছি পৌঁছল, তখন একজন মুরিদ বুঝতে পারলেন যে এরা জাদু করছে। তিনি গিয়ে হুজুরকে খবর দিলেন। হুজুর বললেন, “তাদের জাদু আমাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না; বরং জাদুকর নিজেই সরাসরি সঠিক পথে চলে আসবে।” এই বলে তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে হয়ে গেলেন।
যখন কাফেররা হজরত খাজা গরিব নাওয়াজের নিকট এলো, তখন তারা কথা বলতে এবং চলতে অক্ষম হয়ে পড়ল। তারা যে যেখানে ছিল, সেখানেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তিনি নামাজ শেষ করে যখন কাফেরদের দিকে ফিরে তাকালেন, তখন তাদের সেই নেতা হজরত খাজা গরিব নাওয়াজের নুরানি চেহারা দেখা মাত্রই ইসলাম গ্রহণ করে নিল। বাকি কাফেররা তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো সে তাদের কথায় রাগান্বিত হয়ে হাতে লাঠি নিয়ে তাদের মারতে শুরু করল এবং অনেককে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিল। বাকিরা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেল।
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) সেই নেতার প্রতি অনেক দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করলেন এবং নিজে এক পেয়ালা পানি ভরে তাকে পান করতে দিলেন। সেই পানি পান করা মাত্রই তার অন্তরের অন্ধকার দূর হয়ে মারেফতের নূরে তার কলব আলোকিত হয়ে উঠল। সে খাজা গরিব নাওয়াজের কদম মুবারকে মাথা রেখে আরজ করল, “হুজুরের এই রূপ ও গুণ দেখে আমি বিভোর হয়ে পড়েছি।” হুজুর বললেন, “আমি তোমার নাম রাখলাম ‘শাদি’।”
যখন এই খবর রাজার কাছে পৌঁছল, তখন সে আগের চেয়েও বেশি অবাক হয়ে এক বড়ো জাদুকরের শরণাপন্ন হলো। আজমিরের কাছেই ‘জয়পাল’ নামে এক জাদুকর বাস করত। পুরো হিন্দুস্তানে জাদুবিদ্যায় তার কোনো জুড়ি ছিল না। রাজাও ছিল তার বিরাট ভক্ত। তার প্রায় দেড় হাজার শিষ্য ছিল, যাদের মধ্যে সাত’শ জন ছিল পুরোদস্তুর জাদুকর আর বাকিরা নিজ নিজ কৌশলে অত্যন্ত ধূর্ত। রাজা সেই যোগীর কাছে সব ঘটনা খুলে বলল। জয়পাল যোগী তার সব শিষ্য এবং আশপাশের লোকজনকে জড়ো করল এবং রাজাসহ হজরত খাজা গরিব নাওয়াজের মোকাবেলায় রওনা হলো। তার অবস্থা এমন ছিল যে, সে একটি হরিণের চামড়ায় ফুঁ দিয়ে সেটিকে শূন্যে ভাসিয়ে দিল এবং নিজে তার ওপর সওয়ার হয়ে উট, ঘোড়া ও হাতির বিশাল লস্কর নিয়ে খাজা গরিব নাওয়াজের দরবারের দিকে এগোতে লাগল। এই বিশাল বাহিনীর আগমনে সারা শহরে শোরগোল পড়ে গেল।
হজরত গরিব নাওয়াজ যখন তাদের আসার খবর পেলেন, তখন অজু করে নিজের চারপাশে একটি বৃত্ত টেনে দিলেন। সঙ্গীদের বললেন, “হিম্মত রাখো।” তারা যখন কাছে পৌঁছল, তখন তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, “তোমরা কেন আমাদের কষ্ট দিচ্ছ? তোমরা কি চাও যে, সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে?”
তারা বলল, “আমরা চাই আপনারা যেন আনা সাগর হ্রদ থেকে অজু বা গোসল না করেন, কারণ এতে পানি নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আমাদের আসল উদ্দেশ্য হলো আপনারা এখান থেকে চলে যান, এটাই আপনাদের জন্য ভালো হবে। নতুবা জাদুর জোরে আমরা আপনাদের এখান থেকে বের করে দেব।”
ইতোমধ্যে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ সত্য প্রমাণের জন্য নিজের কারামতির মাধ্যমে আনা সাগরের সব পানি একটি লোটার ভেতর ভরে নিলেন। এটি দেখে জয় পাল জাদুকর স্তম্ভিত হয়ে গেল। এরপর হ্রদের ভেতরে যত মাছ ও জলজ প্রাণী ছিল সব মরতে শুরু করল। এটি দেখে জয়পাল বলল, “এ কেমন ফকির, যে এতগুলো প্রাণীর জীবন নিচ্ছে?” খাজা গরিব নাওয়াজ তাকে বললেন, “যদি শক্তি থাকে তবে এসো এবং এই লোটাটি তুলে হ্রদের পানি আবার হ্রদে ঢেলে দাও।”
জয় পাল শত চেষ্টা করেও লোটাটি তুলতে পারল না, এমনকি জায়গা থেকে নড়াতেও পারল না। সে চরম লজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ বললেন, “তোমার জাদু এখানে কিছুই করতে পারবে না।” অতঃপর তিনি নিজেই লোটাটি তুলে পানি হ্রদে ঢেলে দিলেন এবং হ্রদটি আগের মতোই পানিতে ভরে উঠল।
কাফেররা যখন এই কারামত দেখল, তখন তারা তাদের জাদু কাজে লাগাতে শুরু করল। চারপাশ থেকে হাজার হাজার সাপ ফণা তুলে তেড়ে আসতে লাগল। কিন্তু সাপগুলো যখন খাজা গরিব নাওয়াজের টানা বৃত্তের কাছে পৌঁছল, তখন সেগুলো বৃত্তের সীমানায় মাথা নুইয়ে দিলো।
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর সাথিদের বললেন, “এই সাপগুলোকে তুলে পাহাড়ে ফেলে দাও।” অতঃপর তাঁরা সব সাপ তুলে দূরে ফেলে দিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে স্থানেই সাপ পড়তে লাগল, সেখানেই একটি করে চারাগাছ গজিয়ে উঠতে শুরু করল এবং তা বিশাল ছায়াদার বৃক্ষে পরিণত হতো। এরপর কাফেররা চারপাশ থেকে আগুনের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করল, কিন্তু সেই সুরক্ষা বৃত্তের ভেতরে একটি আগুনের ফুলকিও প্রবেশ করতে পারল না। এভাবে তারা যে জাদুই প্রয়োগ করল, তা সব তাদের নিজেদের ওপরই ফিরে গেল এবং তাদের বিপর্যস্ত করে দিলো। জয়পাল জাদুকর ও সমস্ত কাফেররা একেবারেই নিরুপায় ও অসহায় হয়ে পড়ল।
অবশেষে রাজা পৃথ্বীরাজের কাছে লজ্জিত হওয়ার ভয়ে জয়পাল জাদুকর সামনে এগিয়ে বলতে লাগল, “হে খোদার বান্দা, যদিও আপনি আমাদের অসহায় করে দিয়েছেন, কিন্তু আপনার সফল হওয়া অসম্ভব। তাই জেনে-বুঝে নিজেকে বিপদে ফেলবেন না, অন্যথায় আমি আকাশে উড়ে আপনাদের ওপর এমন এক বিপদ বর্ষণ করব, যা সারাজীবন মনে রাখবেন।”
খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) তার কথা শুনে মৃদু হাসলেন এবং এই ফারসি কাব্যটি পড়লেন “তু কারে জমিন রা নেকু সাখতি; কেহ বা আসমান নিজ পারদাখতি!” অর্থাৎ, জমিনে তুমি কী এমন কাজ করে ফেলেছ যে এখন আসমানে ওড়ার শখ করছ! এটি শুনে জয়পাল আগের চেয়েও বেশি লজ্জিত হলো। তবুও সে হরিণের চামড়াটি হাওয়ায় ভাসিয়ে তার ওপর সওয়ার হয়ে আকাশে উড়তে শুরু করল, এমনকি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। তখন খাজা সাহেব নিজের জুতোকে আদেশ দিলেন, “উপরে যাও এবং ওকে মেরে মেরে নিচে নামিয়ে আনো!”
বলার সাথেসাথেই জুতোটি উপরে উড়ে গেল এবং জয়পালের কাছে পৌঁছে তার মুখে ও মাথায় সজোরে আঘাত করে করে নিচে নামিয়ে আনল। মাটিতে নামা মাত্রই জয়পাল চরম লজ্জায় হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর কদমে লুটিয়ে পড়ল। তিনি একটি পেয়ালায় সামান্য পানি নিয়ে তাকে পান করতে দিলেন। পানি পান করা মাত্রই তার অন্তর থেকে কুফর ও শিরকের সমস্ত জং পরিষ্কার হয়ে গেল এবং সে কায়মনোবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করল। মুসলমান হওয়ার পর গরিব নাওয়াজ (রহ.) তার নাম রাখলেন ‘আব্দুল্লাহ’।
রাজা পৃথ্বীরাজ যখন ‘শাদি’ এবং ‘জয়পাল’ উভয়ের দিক থেকেই নিরাশ হয়ে গেল, তখন সে হতাশ হয়ে ভাবল যে, যে-কোনো উপায়ে খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর খাদেমদের ক্ষতি করবে। কিন্তু যখনই তার মনে এমন কুচিন্তা আসত, তখনই সে হঠাৎ অন্ধ হয়ে যেত; আবার যখনই তওবা করত, তখন তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেত। কিন্তু এতসব কারামত দেখার পরও তার হৃদয়ের কুফর ও অন্ধকারের পর্দা দূর হলো না।[18]
অমুসলিমদের ওপর মহান চরিত্রের প্রভাব:
খাজায়ে খাজগান হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) অত্যন্ত সুন্দর ও সুনিপুণভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। তাঁর সত্যবাদিতা ও পবিত্রতা দেখে হিন্দুস্থানের মানুষ সত্যনিষ্ঠ ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। কেবল দিল্লি থেকে আজমির সফরের পথেই তাঁর হাতে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হন।
একবার এক ব্যক্তি মুরিদ হওয়ার ভান করে বগলের নিচে ছুরি লুকিয়ে তাঁর দরবারে হাজির হলো। তার উদ্দেশ্য ছিল হুজুরকে আঘাত করা। তিনি লোকটির কুমতলব বুঝে ফেললেন এবং মুচকি হেসে বললেন, “হে দরবেশ, মানুষ দরবেশদের কাছে আসে অন্তর পরিষ্কার করার জন্য, জুলুম করার জন্য নয়। তুমি যে নিয়ত নিয়ে এসেছ, সেই কাজ পূরণ করে নাও।” এ কথা শোনা মাত্রই লোকটি দ্রুত তার আস্তিন থেকে অস্ত্র বের করে ছুড়ে ফেলে দিলো এবং তওবা করে তাঁর একনিষ্ঠ মুরিদ ও মুসলমান হয়ে গেল। ঐ সময় এই কেরামত দেখে আরও অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।[19]
বিবাহ ও সন্তানাদি:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী বৈবাহিক জীবন গ্রহণ করতে হয়। এক রাতে খাজা গরিব নাওয়াজ স্বপ্নে রসুলে পাক (ﷺ)-এর জিয়ারত লাভে ধন্য হন। আল্লাহর রসুল (ﷺ) এরশাদ করেন,
“হে মঈনুদ্দিন, তুমি আমাদের দ্বীনের সাহায্যকারী, তোমার দিক থেকে আমার সুন্নাত ত্যাগ করা উচিত নয়।”
মালিক খাত্তাব নামক দুর্গের জনৈক শাসক প্রথম জিহাদের সময় এক রাজার কন্যাকে বন্দি করে সেই রাতেই নিয়ে আসেন। খাজা গরিব নাওয়াজ সেই মেয়েটির নাম রাখেন ‘আমাতুল্লাহ’ এবং তাঁকে শরিয়তসম্মতভাবে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। এভাবে ৫৯০ হিজরি মোতাবেক ১১৯৪ খ্রিষ্টাব্দে খাজা গরিব নাওয়াজের প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবি আমাতুল্লাহর গর্ভে খাজা ফখরুদ্দিন, খাজা হুসামুদ্দিন এবং বিবি হাফিজা জামাল জন্মগ্রহণ করেন।
জনৈক সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিন মাশহাদী সবসময় তাঁর কন্যা ইসমতউল্লাহর বিয়ে নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। কন্যা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলেন, কিন্তু বিয়ে দেওয়ার মতো যোগ্য কোনো বুজুর্গ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এক রাতে তিনি স্বপ্নে হজরত ইমাম জাফর (রহ.)-কে দেখেন। তিনি তাঁকে বলেন, “হে রসুল ﷺ এর সন্তান, আল্লাহর নির্দেশ হলো এই কন্যার বিয়ে শায়খ মঈনুদ্দিনের সাথে সম্পন্ন করো।”
শায়খ ওয়াজিউদ্দিন এই স্বপ্নের কথা খাজা গরিব নাওয়াজকে জানালে তিনি বললেন, “যদিও আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, তবুও নবীর (ﷺ) নির্দেশ অনুযায়ী আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করছি।” ৬২০ হিজরি মোতাবেক ১২২৩ খ্রিষ্টাব্দে বিবি ইসমতউল্লাহর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। তাঁর গর্ভে শায়খ আবু সাঈদ জন্মগ্রহণ করেন।[20]
তিলাওয়াতে কুরআন ও রাত্রিজাগরণ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর নিয়মিত সারারাত আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। এমনকি তিনি এশার অজু দিয়েই ফজরের নামাজ আদায় করতেন। কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁর এত গভীর অনুরাগ ছিল যে, তিনি দিনে দুইবার সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। সফর অবস্থাতেও তাঁর কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত থাকত।[21]
স্বল্প আহার ও সংযমী জীবনযাপন:
অন্যান্য বুজুর্গানে দ্বীন ও পরিপূর্ণ অলিয়ায়ে কেরামের মতোই খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) অধিক পরিমাণে ইবাদত করার জন্য অত্যন্ত অল্প আহার করতেন। কারণ, অতিরিক্ত আহার যেন অলসতা, নিদ্রা বা তন্দ্রার সৃষ্টি করে ইবাদতের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়— এই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। বর্ণিত আছে, তিনি সাত দিন পরপর প্রায় দুই থেকে আড়াই তোলা পরিমাণ রুটি পানিতে ভিজিয়ে আহার করতেন।[22]
বদান্যতা ও উদারতা:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর দান-সদকা এবং বদান্যতা এমন পর্যায়ের ছিল যে, কোনো লোক কখনো তাঁর দুয়ার থেকে বঞ্চিত হয়ে ফিরে যেত না। হজরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.) বর্ণনা করেন, “আমি দীর্ঘ সময় তাঁর খিদমতে উপস্থিত ছিলাম; এই সময়ের মধ্যে কোনো ফকিরকে তাঁর দরবার থেকে খালি হাতে ফিরে যেতে দেখিনি।” তাঁর লঙ্গরখানায় প্রতিদিন এত পরিমাণ খাবার তৈরি করা হতো যে, শহরের সমস্ত অভাবী ও দুস্থ মানুষ পেট ভরে তৃপ্তির সাথে খেত। লঙ্গরখানার খাদেম যখন দরবারে উপস্থিত হয়ে দৈনন্দিন খরচের দাবি জানাতেন, তখন তিনি জায়নামাজের এক কোণ তুলে ধরে বলতেন, “আজকের খরচের জন্য যতটুকু প্রয়োজন নিয়ে নাও।” খাদেম প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ সেখান থেকে নিয়ে নিতেন এবং নিয়ম অনুযায়ী খাবার রান্না করিয়ে গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। এ-ছাড়া হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর দরবার থেকে দরবেশদের জন্য নিয়মিত ভাতাও নির্ধারিত ছিল।[23]
পোশাক ও সরলতা:
আল্লাহওয়ালাদের বৈশিষ্ট্যই হলো তারা বাহ্যিক চাকচিক্যের পরিবর্তে অন্তরের পবিত্রতার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন। খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর পোশাকেও ছিল চরম সরলতার প্রতিফলন। তাঁর পোশাক সাধারণত দুটি চাদরেই সীমাবদ্ধ থাকত, আর তাতেও অনেক জায়গায় সেলাই করা থাকত।
এমন মনে হতো, তাঁর এই পোশাকের মধ্য দিয়েও রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর সুন্নাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠছে।[24]
অন্য বর্ণনায় এনেছে, তাঁর পোশাকের ধরন ছিল সাধারণ ও সাদামাটা। একটি জোড়া কাপড়, যা সেলাই করা ছিল। যখন হজরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.) তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং তিনি তাঁকে খিলাফত প্রদান করেন, তখন এই মুবারক পোশাকটি তিনি তাঁর হাতে অর্পণ করেন। পরবর্তীতে সেই একই পোশাক হজরত কুতুবুল আকতাব (রহ.) হজরত বাবা ফারিদ গঞ্জে শকর (রহ.)-কে দেন। এরপর হজরত বাবা ফারিদ (রহ.) তা হজরত শায়খুল মাশায়েখ নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-কে অর্পণ করেন এবং তিনি তা হজরত নাসিরুদ্দীন চিরাগে দেহলভি (রহ.)-এঁর হাতে তুলে দেন।
তাঁর পোশাকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল যখনই কোথাও কাপড় ছিঁড়ে যেত, তখনই যে কোনো পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বিনা দ্বিধায় তা সেলাই করে নিতেন। ফলে তাঁর পোশাক অধিকাংশ সময়ই সেলাই করা থাকত, যা তাঁর ফকিরি, বিনয় ও সরলতার অনন্য নিদর্শন ছিল।[25]
প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর প্রতিবেশীদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তিনি নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতেন। যদি কোনো প্রতিবেশীর ইন্তেকাল হতো, তিনি অবশ্যই তার জানাযায় অংশগ্রহণ করতেন। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর সবাই যখন ফিরে যেত, তখন তিনি একাকী সেই কবরের পাশে বসে মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও নাজাতের দোয়া করতেন। এছাড়া, তিনি মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের ধৈর্যের উপদেশ দিতেন এবং তাদের সান্ত্বনা প্রদান করতেন।[26]
আল্লাহভীতি:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর অন্তরে আল্লাহভীতি এতটাই প্রবল ছিল যে, তিনি সর্বদা আল্লাহর ভয় ও ভক্তিতে কাঁপতেন এবং অশ্রুসিক্ত হয়ে থাকতেন। তিনি মানুষকে বারবার আল্লাহভীতির দিকে আহ্বান করতেন এবং উপদেশ দিতেন, “হে মানুষ, যদি তোমরা কবরের নিচে শায়িত মানুষের অবস্থা সামান্যও জানতে, তবে ভয় ও আতঙ্কে দাঁড়িয়েই গলে যেতে, লবণের মতো পানিতে বিলীন হয়ে যেতে!”[27]
নবীপ্রেম:
বজমে সুফিয়া গ্রন্থে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর রসুলপ্রেমের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে যে, তিনি সারা জীবন আল্লাহর প্রেমে মগ্ন ও আত্মহারা থাকার পাশাপাশি রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর ভালোবাসার নেশায়ও পরিপূর্ণভাবে নিমগ্ন ছিলেন। তিনি তাঁর মলফুজাতে রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর স্মরণ অত্যন্ত আবেগময় ভঙ্গিতে করতেন। প্রায়-ই হাদিস শরিফ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়তেন। এক স্থানে তিনি বলেছেন, “আফসোস সেই ব্যক্তির জন্য, যে কিয়ামতের দিন প্রিয়নবী (ﷺ)-এঁর দরবারে লজ্জিত হবে! যে রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর বারগাহে লজ্জিত হবে, তার স্থান কোথায় হবে? সে কোথায় যাবে?” এই কথা বলার পর তিনি ‘হায় হায়’ বলে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন।
রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এত গভীর ছিল যে, যখনই তিনি নবী করিম (ﷺ)-এঁর কথা বলতেন বা শুনতেন, তখনই তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠত।[28]
মুর্শিদে কামিলের পবিত্র মাজারের প্রতি সম্মান:
একবার তিনি তাঁর মুরিদদের তারবিয়ত (আত্মশুদ্ধির শিক্ষা) দিচ্ছিলেন। বক্তব্য চলাকালীন যখনই তাঁর দৃষ্টি ডানদিকে পড়ছে, তিনি সাথে সাথে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে যেতে লাগলেন। মুরিদরা বিষয়টি দেখে বিস্মিত হচ্ছিলেন। কিন্তু কারো সাহস হলো না কিছু জিজ্ঞেস করার। অবশেষে সবাই চলে যাওয়ার পর, একজন প্রিয় মুরিদ বিনয়ের সাথে আরজ করলেন, “হুজুর, আমাদের তারবিয়তের সময় আপনি বারবার দাঁড়াচ্ছিলেন, এর পেছনে কী হেকমত রয়েছে?” তিনি ইরশাদ করলেন, “এই দিকেই আমার মুর্শিদ শায়খ উসমান হারুনি (রহ.)-এঁর পবিত্র মাজার অবস্থিত। যখনই আমার দৃষ্টি সে দিকে পড়ছিল, আমি সম্মানের জন্য দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলাম। সুতরাং, আমি আমার মুর্শিদের রওজা মোবারকের সম্মানে দাঁড়াচ্ছিলাম।”[29]
মুরিদদের প্রতি দরদ:
একবার খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) মক্কা মুকাররমায় মুরাকাবায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময় অদৃশ্য থেকে আহ্বান এলো, “তুমি যা চাইবে, চাও; আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট; তুমি যা প্রার্থনা করবে, তা-ই পাবে।” তিনি আরজ করলেন, “হে আল্লাহ, আমার সকল মুরিদকে ক্ষমা করে দিন।” উত্তর এলো, “আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।” তখন তিনি আবার নিবেদন করলেন, “হে প্রভু, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সব মুরিদ জান্নাতে প্রবেশ না করবে, ততক্ষণ আমি নিজেও জান্নাতে প্রবেশ করব না।”[30]
এক সময়, যখন হজরত বাবা ফারিদুদ্দীন গঞ্জে শকর মাসউদ (রহ.) তাঁর যৌবনের প্রারম্ভে কঠোর সাধনা ও রিয়াজতে নিয়োজিত ছিলেন, তখন হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) এবং হজরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.) এই দুই মহান বুজুর্গ তাঁর কক্ষে আগমন করেন। হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর ইবাদত ও সাধনায় গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং তাঁকে বহু নিয়ামত ও করামতে ভূষিত করেন। পাশাপাশি, তাঁর প্রতি বিশেষ আধ্যাত্মিক দৃষ্টি প্রদান করে তাঁকে পূর্ণতার উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।[31]
সামা’র প্রতি অনুরাগ:
চিশতিয়া তরিকায় ‘সামা’ বা আধ্যাত্মিক সংগীত অন্যতম অনুসঙ্গ। খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) এর সামা’র প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল। তৎকালীন উলামায়ে কেরামও তাঁর সামা মাহফিলের প্রতি কোনো আপত্তি জানাননি। হজরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) সামা মাহফিলে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের একটি তালিকা দিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— হজরত শেখ মুহাম্মদ কিরমানি, শেখ মুহাম্মদ আসফাহানি, শেখ শাহাবুদ্দিন চিশতি, মাওলানা বাহাউদ্দিন বুখারী, মাওলানা মুহাম্মদ বাগদাদি, শেখ আহমদ উদ্দিন কিরমানি, শেখ আহমদ ওয়াহিদ, খাজা সুলাইমান, শেখ জালালুদ্দিন তাবরিজি (রহ.) প্রমুখ।
সামা মাহফিলগুলো ছিল বিশেষায়িত অনুষ্ঠান। সাধারণ মানুষের প্রবেশ অনুমতি ছিল না; মূলত এতে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল শুধু আধ্যাত্মিকভাবে নিমগ্ন দরবেশগণের। ঐতিহ্যগত সামা মাহফিলগুলোতে দফ (খঞ্জনি বা এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে বিভিন্ন প্রকার আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হতে দেখা যায়। যার ফলে অনেকে এটিকে বিতর্কিত মনে করেন।[32]
দরবেশদের সঙ্গে হৃদ্যতা:
হজরত বাবা ফারিদুদ্দীন গঞ্জে শকর (রহ.) তাঁর পীর ও মুরশিদ হজরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর সঙ্গে কয়েক বছর অবস্থান করেছি। একবার আমরা এমন এক জঙ্গলে পৌঁছলাম, যেখানে কোনো পাখিও ডানা মেলতে সাহস পায় না। আমরা টানা তিনদিন সেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম। আমি শুনেছিলাম, ওই জঙ্গলের পাশে একটি পাহাড়ে এক বুজুর্গ বাস করেন। তখন হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) তাঁর মুসাল্লার নিচ থেকে দুটি রুটি বের করে আমাকে দিলেন এবং বললেন, “এই বুজুর্গের খিদমতে এগুলো পৌঁছে দাও এবং আমার সালাম জানিয়ে দিও।” আমি রুটিগুলো সেই বুজুর্গের সামনে রাখলাম। তিনি একটি রুটি আমাকে দান করলেন এবং অন্যটি ইফতারের জন্য রেখে দিলেন। এরপর তিনি তাঁর মুসাল্লার নিচ থেকে চারটি খেজুর বের করে আমাকে দিয়ে বললেন, “এগুলো মুঈনুদ্দীনকে দিয়ে দিও।”
আমি যখন খেজুর নিয়ে ফিরে এলাম, হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) আমাকে দেখে খুব আনন্দিত হলেন এবং বললেন, “হে দরবেশ, পীরের নির্দেশ রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর নির্দেশেরই সমতুল্য। অতএব, যে ব্যক্তি পীরের আদেশ পালন করে, সে যেন রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর আদেশই পালন করল।”[33]
শরিয়তের উপর অটল থাকার উপদেশ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর মলফুজাত অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়, তাঁর দৃষ্টিতে একজন সালিক (আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর ব্যক্তি)-এর জন্য বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের সুন্দর গুণাবলিতে সজ্জিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ, তাঁর মতে তাসাউফ কেবল জ্ঞান বা নামমাত্র কোনো বিষয় নয়; বরং এটি হলো বুজুর্গদের বিশেষ চরিত্র ও নৈতিকতার সমষ্টি, যা সবদিক থেকেই পরিপূর্ণ হওয়া আবশ্যক।
বাহ্যিক দিক থেকে এই গুণাবলির পরিপূর্ণতা হলো একজন সালিক তার প্রতিটি কাজ ও আচরণে শরিয়তের কঠোর অনুসারী হবে। যখন তার কাছ থেকে কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ প্রকাশ পাবে না, তখনই সে পরবর্তী স্তরে উপনীত হবে, যার নাম ‘তরিকত’। এরপর সে যদি এতে অবিচল থাকতে পারে, তবে সে ‘মারিফাত’-এর মর্যাদা অর্জন করবে। আর যখন সে এতে পূর্ণতা লাভ করবে, তখন ‘হাকিকত’-এর উচ্চ স্তরে পৌঁছাবে। এরপর সে যা কামনা করবে, তাই অর্জন করতে সক্ষম হবে।[34]
আহকামে ইসলামের উপর আমল করার তাগিদ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) শরিয়তের সব বিধান ও সূক্ষ্ম দিকসমূহের প্রতি গভীর গুরুত্বারোপ করতেন, বিশেষত নামাজের প্রতি তিনি অত্যন্ত জোর দিতেন। তিনি বলতেন, “নামাজ হলো দ্বীনের স্তম্ভ। যদি স্তম্ভ অটল থাকে, তবে ঘরও অটল থাকবে; আর যখন স্তম্ভ ভেঙে পড়বে, তখন ঘরও টিকে থাকবে না। যে ব্যক্তি নামাজে অবহেলা করে, সে তার দ্বীন ও ইমানকে ধ্বংস করে।” নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “একবার আমি শামের নিকটবর্তী একটি শহরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। শহরের বাইরে একটি গুহায় এক বুজুর্গ বাস করতেন। আল্লাহর ভয় ও খুশিয়তে তাঁর দেহের মাংস-চামড়া প্রায় গলে গিয়েছিল; শুধু হাড়গুলো অবশিষ্ট ছিল। তিনি একটি মুসাল্লার উপর বসে ছিলেন। আমি আদবের সঙ্গে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথা থেকে এসেছ?’ আমি বললাম, ‘বাগদাদ থেকে এসেছি।’ তিনি বললেন, ‘ভালো হয়েছে, তবে দরবেশদের খেদমত করতে থাকো, তবেই দরবেশির আসল স্বাদ পাবে। আমি বহু বছর ধরে এই গুহায় অবস্থান করছি, দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে নির্জনে আছি। কিন্তু একটি বিষয়ের ভয়ে দিন-রাত কাঁদতে থাকি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেটা কী?’ তিনি বললেন, ‘নামাজ! যখন আমি নামাজ আদায় করি, তখন ভয় হয়, কোথাও কোনো শর্ত পূরণে ত্রুটি রয়ে গেল কি না। যেন আমার সব পরিশ্রম বিফল না হয়ে যায়, আর এই নামাজই যেন আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।’”
যেমন হাদিস শরিফে নামাজকে মুমিনের মেরাজ বলা হয়েছে, তেমনি এ প্রসঙ্গে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) বলেছেন, “মুমিন যখন নামাজ আদায় করে, তখন এমনভাবে আদায় করবে যেন সে আল্লাহর নুর ও তাজাল্লির দর্শন লাভ করছে।” হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) শুধু নামাজই নয়; বরং রোজা ও হজের প্রতিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি নিজে সর্বদা রোজা পালন করতেন এবং বহুবার বাইতুল্লাহর জিয়ারত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।[35]
রচনাবলি:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর রচিত উল্লেখযোগ্য কিতাবসমূহ হলো—
১. আনিসুল আরওয়াহ। হজরত খাজা উসমান হারুনি (রহ.)-এঁর মালফুজাত (বাণীসমূহ) সংকলন।
২. কাশফুল আসরার। তাসাউফের গভীর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিয়ে এক অপূর্ব সংকলন।
৩. গঞ্জুল আসরার। সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ-এর জন্য শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা হিসেবে রচিত।
৪. রিসালায়ে আফাক ও আনফুস। তাসাউফের সূক্ষ্ম বিষয় ও অন্তর্দর্শন নিয়ে রচিত একটি গ্রন্থ।
৫. রিসালায়ে তাসাউফ (মনযূম)। কাব্যিক ভঙ্গিতে তাসাউফের আলোচনা।
৬. হাদিসুল মা’রিফ। মারিফাত সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
৭. রিসালায়ে মাওজুদিয়া। তাসাউফের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনভিত্তিক একটি রচনা।
খলিফাগণ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর খলিফাগণের মধ্যে সবচেয়ে নিকট ও প্রিয় ছিলেন হজরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.)। খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর ওফাতের পর তিনি সাজ্জাদানশীন হন। এর বাইরে অন্যান্য খলিফাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
১. হজরত কাজি হামিদুদ্দীন নাগৌরি (রহ.)
২. সুলতানুত তারেকিন হজরত শায়খ হামিদুদ্দীন সুফি (রহ.)
৩. হজরত শায়খ আবদুল্লাহ বায়াবানি (রহ.)।[36]
কারামত:
১. খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর একজন মুরিদ তৎকালীন রাজা পৃথ্বীরাজের অধীনে চাকরি করতেন। রাজা যখন তাঁর সেই কর্মচারীর ইসলাম গ্রহণের খবর পেলেন, তখন তিনি তাঁর ওপর জুলুম করতে শুরু করলেন। খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) যখন এই সংবাদ পেলেন, তখন তিনি রাজাকে জুলুম থেকে বিরত থাকার আদেশ পাঠালেন। কিন্তু সেই জালেম ও স্বৈরাচারী রাজা ক্ষমতার নেশায় মত্ত ছিল। সে অবজ্ঞাভরে বলল, “এ ব্যক্তি কে, যে এখানে বসে আমার ওপর হুকুম চালাচ্ছে?”
খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) যখন রাজার এই কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন, “আমরা তাকে বন্দি করে ইসলামের বাহিনীর হাতে তুলে দিলাম।” এর মাত্র কয়েক দিন পরই সুলতান মুইজুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি সেই শহর আক্রমণ করেন। রাজা তার বিশাল বাহিনী নিয়ে মোকাবেলা করতে এলেও ইসলামের বীর যোদ্ধাদের সাহসিকতার সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। অবশেষে সে অস্ত্র ত্যাগ করে এক চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। সৈন্যরা তাকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করে অত্যন্ত লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় সুলতান ঘুরির সামনে হাজির করে।[37]
২. প্রতি রাতে কাবা শরিফ তাওয়াফ:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর কোনো মুরিদ বা ভক্ত যখন হজ অথবা উমরার সৌভাগ্য লাভ করে কাবা শরিফ তওয়াফ করতে যেতেন, তখন দেখতেন যে খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) নিজেই তাওয়াফে মশগুল রয়েছেন। অথচ অন্যদিকে তাঁর পরিবারের সদস্য এবং অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করতেন যে, তিনি তাঁর হুজরা শরিফেই অবস্থান করছেন। অবশেষে একদিন এই রহস্য উন্মোচিত হলো যে, তিনি প্রতি রাতে বায়তুল্লাহ শরিফে উপস্থিত হয়ে সারা রাত তাওয়াফে মশগুল থাকতেন এবং ভোরে আজমির শরিফে ফিরে এসে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।[38]
৩.এক মুঠো ধুলোর কারামত:
একদা ইসলামবিরোধীদের হৃদয়ে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল এবং তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করতে এগিয়ে এল। সেই মুহূর্তে হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) নামাজে মশগুল ছিলেন। নামাজ শেষ করার পর খাদেমরা যখন তাঁকে বিষয়টি জানালেন, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং এক মুঠো ধুলো হাতে নিয়ে তাতে ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়ে ফুঁ দিলেন এবং কাফেরদের দিকে ছুড়ে মারলেন।
সেই মাটি যার গায়েই লাগল, তার শরীর অবশ হয়ে গেল এবং সে নিথর হয়ে পড়ে রইল। এই দৃশ্য দেখে বাকি সবাই সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, হজরত গরিব নাওয়াজের বেলায়েত ছিল ‘বেলায়েতে মুহাম্মদী’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এরই প্রতিফলন। কেননা হিজরতের রাতে নবীজিও এভাবে ছুঁড়েছিলেন। পরিশেষে, শত্রুরা যখন দেখল যে খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর মোকাবেলা করা অসম্ভব, তখন তারা লড়াই করা ছেড়ে দিলো।[39]
আহলে তরিকতের জন্য দশটি শর্ত:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেন, আহলে তরিকতের জন্য দশটি বিষয় অপরিহার্য।
১. হক (আল্লাহ)-এর অনুসন্ধান।
২. পীর (মুরশিদ)-এর অনুসন্ধান।
৩. আদব (শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচার)।
৪. রেজা (আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা)।
৫. মহব্বত ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন।
৬. তাকওয়া (পরহেজগারি)।
৭. শরিয়তের উপর দৃঢ়তা।
৮. কম খাওয়া ও কম ঘুমানো।
৯. মানুষের থেকে নির্জনতা অবলম্বন করা।
১০. রোজা ও নামাজে নিয়মিত থাকা[40]
আহলে হাকিকতের জন্য দশটি শর্ত:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.) বলেছেন, আহলে হাকিকতের জন্যও দশটি শর্ত অপরিহার্য।
১. মারিফাতের পূর্ণতা: আল্লাহর সঙ্গে পূর্ণ সখ্যতা অর্জন করা।
২. আন্তরিকতা ও শান্তি: কখনো নিজেকে কষ্ট দেওয়া না এবং অন্যকে কষ্ট না দেওয়া; কারও প্রতি কষ্টদায়ক মনোভাব পোষণ না করা।
৩. সৎ উপদেশ: মানুষকে আল্লাহর পথ প্রদর্শন করা এবং এমন কথা বলা, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য উপকারি।
৪. নম্রতা।
৫. নির্জনতা। লোকের মাঝে থাকলেও আল্লাহর দিকেই মনোযোগ নিবিষ্ট রাখা।
৬. সম্মান ও ভক্তি: প্রত্যেককে সম্মান জানানো এবং নিজেকে সর্বদা ছোটো মনে করা।
৭. স্বীকারোক্তি ও সন্তুষ্টি। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা এবং তার ফয়সালায় সর্বদা সম্মত থাকা।
৮. সর্বদা ধৈর্য ও সহনশীলতা।
৯. অবনতি ও প্রার্থনায় পুঙ্খানুপুঙ্খতা: অন্তরকে আল্লাহর ভয়ে নরম রাখা, কান্না-আর্তনাদসহ দোয়া করা।
১০. তৃপ্তি ও সংযম।[41]
তাঁর শিক্ষা ও বাণী:
হজরত খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনের সত্য আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং পথভ্রষ্ট মানুষদের সঠিক পথের দিকে আহ্বান করা। তিনি তালিবানে মারিফাত (আধ্যাত্মিক জ্ঞান অন্বেষণকারী)-দের সুলুক ও তাসাউফের বিভিন্ন স্তর অতিক্রমে দিকনির্দেশনা দিতেন, অন্তরের কলুষতা দূর করতেন এবং আত্মশুদ্ধির (তাযকিয়ায়ে নফস) প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর মজলিসগুলো ছিল হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষা-দীক্ষা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং আত্মার পরিশুদ্ধির পাঠ দেওয়া হতো। বিশেষ বিশেষ সময়ে হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) যে সব উপদেশ ও নির্দেশনা প্রদান করতেন, সেগুলোর কিছু অংশ তাঁর খলিফা হজরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.) দলিলুল আরেফিন গ্রন্থে সংকলন করেছেন। এই গ্রন্থ আজও হেদায়েত ও পথনির্দেশনার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত।
এই সংকলনে বিভিন্ন দ্বীনি বিষয় এবং সুফিতত্ত্বের গভীর দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন: পবিত্রতা, নামাজ, রোজা, হজ, সদকা, শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত, আল্লাহর প্রেম ও ইশক, মারিফাত, কবরের আজাব, বড় গুনাহ, ইবাদত, আহলে সুলুকের পথ, দোজখ, কুরআনের সুরাগুলোর ফজিলত, কাশফ ও কারামত, সৎ ও অসৎ সঙ্গ, তাওয়াক্কুল, তাওবা ও তাজরিদ ইত্যাদি বিষয়ে অত্যন্ত গভীর ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ রয়েছে।
“সুলতানুল হিন্দ খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)” নামক গ্রন্থে দলিলুল আরেফিন-এর সূত্রে তাঁর মলফুজাত ও শিক্ষাবাণী বর্ণিত হয়েছে। সেখান থেকে কিছু মূল্যবান উপদেশ এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।
১. যে কিছু অর্জন করেছে, সে সেবার মাধ্যমেই অর্জন করেছে। তাই মুরিদের জন্য অপরিহার্য হলো পীরের নির্দেশ থেকে বিন্দুমাত্রও অতিক্রম না করা। নামাজ, তাসবিহ এবং অন্যান্য আমল সম্পর্কে পীর যা নির্দেশ দেন, তা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং যথাযথভাবে পালন করা, যাতে সে কোনো উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে। কারণ, পীরই মুরিদকে গড়ে তোলেন; পীর যা কিছু বলেন, তা মুরিদের পরিপূর্ণতার জন্যই বলেন।”
২. আরিফগণ মহান মর্যাদার অধিকারী এবং তারা আল্লাহর ভালোবাসায় নিমগ্ন। যখন কোনো ব্যক্তি রাতে অজু অবস্থায় থাকে (অজু করে ঘুমায়), তখন নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ফেরেশতারা তার সঙ্গে থাকুক। তারা সকাল পর্যন্ত আল্লাহর কাছে এ দোয়া করতে থাকে, “হে আল্লাহ, এই বান্দাকে ক্ষমা করে দিন, কারণ সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছে।”
৩. ‘আরিফ’ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যিনি আল্লাহ তায়ালার পরিচয় লাভ করেছেন, তাঁর সাথে অন্তরের গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং সর্বদা তাঁর স্মরণ ও ভালোবাসায় নিমগ্ন থাকেন।
৪. যে সমগ্র জগতের আধ্যাত্মিক জ্ঞান রাখে, নিজের বুদ্ধি থেকে অসংখ্য অর্থ উদ্ভাবন ও বর্ণনা করতে পারে, প্রেমের সূক্ষ্মতম রহস্যের উত্তর দিতে সক্ষম হয় এবং সর্বদা এমন এক সমুদ্রের মাঝে সাঁতার কাটতে থাকে, যাতে সে আল্লাহর রহস্য ও নুরের মুক্তা আহরণ করে তা প্রজ্ঞাবান জহুরীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে, সে-ই আরিফ।
৫. নামাজ মুমিনের মেরাজ, যেমন হাদিস শরীফে এসেছে, ‘আস-সালাতু মি‘রাজুল মু’মিনীন।’ এরপর তিনি বলেন, নামাজ এক গোপন কথা, যা বান্দা তার প্রভুর সাথে বলে। হাদিসে এসেছে, ‘আল-মুসাল্লি ইউনাজি রাব্বাহু।’ অর্থাৎ, নামাজ আদায়কারী তার প্রভুর সাথে গোপনে কথা বলে। নামাজ বান্দাদের জন্য আল্লাহর এক আমানত। সুতরাং, বান্দাদের উচিত এই আমানতের হক এমনভাবে আদায় করা, যাতে এতে কোনো প্রকার খিয়ানত না হয়।”
৬. নামাজ হলো দ্বীনের মূল স্তম্ভ। যখন এই স্তম্ভ অটল থাকে, তখন পুরো দ্বীনও অটল থাকে।
৭. যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে আহার করায়, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার এবং জাহান্নামের মাঝে সাতটি পর্দা স্থাপন করে দেবেন।
৮. যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খায়, সে যেন নিজের পরিবারকেই ধ্বংস করে ফেলে; তার জীবন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়।
৯. ভালোবাসায় সত্যবাদী সেই ব্যক্তি, যার উপর ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রাধান্য পায় যে, তার মাথায় যদি লক্ষ লক্ষ তরবারির আঘাতও করা হয়, তবুও সে তা অনুভব করে না।
১০. আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্বে সত্যবাদী সে ব্যক্তি, যার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, তবুও সে কোনো অভিযোগ করে না।
১১. অকারণে কোনো মুসলমান ভাইকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে বড়ো গুনাহ আর নেই। এতে আল্লাহ ও তাঁর রসুল উভয়ই অসন্তুষ্ট হন।
১২. গুনাহ তোমার যতটা ক্ষতি করতে পারে, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয় যখন তুমি কোনো মুসলমান ভাইকে অপমান ও লাঞ্ছিত করো।
১৩. যখন কেউ আল্লাহ তায়ালার নাম শুনে বা তাঁর কালাম (কুরআন) শ্রবণ করে, আর তার অন্তর নম্র না হয়, আল্লাহভীতি বৃদ্ধি না পায় এবং ইমান মজবুত না হয়, তবে তা বড়ো গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
১৪. পাঁচটি জিনিসের দিকে তাকানোও ইবাদত। ১. মা-বাবার চেহারার দিকে তাকানো। হাদিসে এসেছে, যে সন্তান ভালোবাসার সঙ্গে তার পিতা-মাতার মুখের দিকে তাকায়, তার আমলনামায় একটি হজের সওয়াব লেখা হয়। ২. কুরআন শরিফের দিকে তাকানো। আল্লাহর কালামের প্রতি দৃষ্টি দেওয়াও ইবাদত। ৩. কোনো আলেম বা বুজুর্গের চেহারার দিকে সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকানো। ৪. খানায়ে কাবার দরজার জিয়ারত করা এবং কাবা শরিফ দেখা। ৫. নিজ মুরশিদের চেহারার দিকে তাকানো এবং তাঁর খিদমতে নিয়োজিত থাকা।
১৫. আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তাই একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে কোনো প্রকার অবহেলা না করা। তখন সে যা কামনা করবে, তাই লাভ করতে সক্ষম হবে।
১৬. সুরা ফাতিহা সব ধরনের ব্যথা ও রোগের জন্য শিফা (আরোগ্য)। যে রোগ কোনো চিকিৎসায় ভালো হয় না, সে ব্যক্তি যদি ফজরের সুন্নত ও ফরজের মাঝে ‘বিসমিল্লাহ’সহ ৪১ বার সুরা ফাতিহা পাঠ করে এবং দম করে, তবে তা দূর হয়ে যায়।
১৭. রাতকে তিন ভাগে বিভক্ত করো। প্রথম অংশ নামাজে ব্যয় করো। দ্বিতীয় অংশ তাহাজ্জুদে কাটাও। যা চার রাকাতে (চার সালামে) আদায় করবে এবং যতটুকু কুরআন মুখস্থ আছে তা পড়বে। এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। পুনরায় উঠে নতুন অজু করে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকবে।
১৮. যে আল্লাহকে চিনে ফেলেছে, অথচ সৃষ্টি থেকে দূরে সরে যায় না, তবে বুঝে নাও, তার মধ্যে কোনো নিয়ামত নেই।
১৯. আরিফ সে ব্যক্তি, যে তার অন্তরের সবকিছু বের করে দেয়, যাতে তা আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছুর প্রতি আসক্তি না থাকে। তখন আল্লাহ তায়ালা তার কাছ থেকে কোনোকিছুই গোপন রাখেন না এবং সে উভয় জগত থেকেই নির্লিপ্ত হয়ে যায়।
২০. আরিফ দুনিয়ার শত্রু এবং প্রভুর বন্ধু। সে দুনিয়া থেকে বিমুখ থাকে এবং অতিরিক্ত ভালোবাসা বা হিংসা-বিদ্বেষের মধ্যে জড়ায় না।
২১. আমি আমার পীর হজরত খাজা উসমান হারুনি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে শুনেছি, যদি কারো মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, তবে বুঝবে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ভালোবাসেন। তা হলো— সাখাওয়াত (দানশীলতা), শফকত (মমতা) এবং তাওয়াজু (নম্রতা)। দানশীলতা হবে নদীর মতো, মমতা হবে সূর্যের মতো, আর নম্রতা হবে মাটির মতো।
২২. নেককারদের সঙ্গ, নেক কাজের চেয়েও উত্তম; আর খারাপ লোকদের সঙ্গ, খারাপ কাজের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর।
২৩. দুনিয়ায় সর্বোত্তম তিন ব্যক্তি হলো, সে আলেম, যিনি নিজের জ্ঞান অনুযায়ী কথা বলেন। সে ব্যক্তি, যার মধ্যে লোভ নেই। সে আরিফ, যিনি সর্বদা তাঁর প্রভুর প্রশংসা ও গুণগান করেন।
২৪. ভালোবাসায় সত্যবাদী সে ব্যক্তি, যে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। প্রকৃত প্রেমিক সে, যে আল্লাহর বাণীর নির্দেশ অনুসরণ করে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সত্যনিষ্ঠ থাকে।
২৫. সত্যিকারের আরিফ সে ব্যক্তি, যার নিজের কোনোকিছুর মালিকানা নেই এবং সে নিজেও কারো মালিকানাধীন নয়।
২৬. আরিফদের তাওয়াক্কুল হলো, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর নির্ভর করে না এবং কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ দেয় না।
২৭. তাওবায়ে নসুহার মধ্যে তিনটি বিষয় রয়েছে। রোজার জন্য কম খাওয়া, ইবাদতের জন্য কম ঘুমানো, দোয়ার জন্য কম কথা বলা। প্রথমটি থেকে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি থেকে আল্লাহর ভালোবাসা জন্ম নেয়।
২৮. আরিফগণ সূর্যের ন্যায়, যারা পৃথিবীতে আলো ছড়ায় এবং তাদের নুর দ্বারা সমগ্র জগৎ আলোকিত হয়।
২৯. আরিফ সূর্যের মতো, যার আলোতে কোনো কিছুই বঞ্চিত থাকে না।
৩০. একবার খাজা গরিব নাওয়াজকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘মুরিদ কখন স্থিরচিত্ত হয়?’ তিনি বললেন, “যখন তাঁর আমলনামায় কোনো গুনাহ লিখার জন্য ফেরেশতা এক বছর ধরে অপেক্ষা করে গুনাহ লিখতে না পারে।”
৩১. আহলে মহব্বতের লক্ষণ হলো আল্লাহর আদেশে পূর্ণতা-সহ অনুগত থাকা এবং সবসময় ভয় পেতে থাকা যেন নিজের কর্ম দ্বারা তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে না যায়।
৩২. অশুভর লক্ষণ হলো গুনাহ করা এবং মনে করা যে, তুমি তবু গ্রহণযোগ্য থাকবে।
৩৩. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় গুণাবলি হলো দুঃখী ও কষ্টপ্রাপ্তদের আহাজারি শোনা, দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণ করা, ক্ষুধার্তদের খাদ্য প্রদান করা।[42]
ওফাত মোবারক:
হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.)‑এর অবিরাম প্রচেষ্টা ও অটল ধৈর্যের বরকতে কুফর ও শিরকের অন্ধকার জনপদ তৌহিদ ও রিসালতের আলো দ্বারা আলোকিত হয়ে উঠেছিল। তিনি সমস্ত সৃষ্টির প্রতি মমতা, করুণা ও প্রেমের ফুল বর্ষণ করেছিলেন এবং জীবনভর আল্লাহ ও তাঁর রসুল (ﷺ)-এঁর প্রতি গভীর প্রেমের শিক্ষা দিয়ে গেছেন। যখন তাঁর পরকালীন সফরের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন কয়েকজন আউলিয়া কেরাম স্বপ্নে রসুল (ﷺ)-কে দেখেন। প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করছিলেন, “আল্লাহর বন্ধু মঈনুদ্দিন চিশতি আসছেন, আমি তাঁকে স্বাগত জানাতে এসেছি।”
তিনি ৬ই রজব ৬২৭ হিজরি, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দ, সোমবার ওফাত বরণ করেন। ওফাতের সময় হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) এঁর কপালে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল “হাবিবুল্লাহি মাতা ফী হুব্বিল্লাহ।” অর্থাৎ, “আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু আল্লাহর প্রেমে ইন্তেকাল করেছেন।”
তাঁকে আজমির শরিফের তাঁর নুরানি মাজার শরিফে দাফন করা হয়। ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষ আজও তাঁর পবিত্র সত্তা থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ ও বরকত লাভ করে থাকেন।[43]