সিতর ও তাজাল্লি দুটি গভীর অবস্থার নাম। তাজাল্লি মানে আল্লাহর জ্যোতির প্রকাশ। যখন বান্দার হৃদয়ে আল্লাহর নুর সরাসরি প্রকাশিত হয়। আর সিতর মানে আবরণ। যখন আল্লাহ সেই প্রবল জ্যোতি থেকে বান্দাকে আড়াল করে রাখেন, কারণ মানুষ তার পূর্ণ প্রকাশ সহ্য করতে পারে না। সাধারণ মানুষ সিতরের আবরণে থাকে, আর বিশেষ বান্দারা তাজাল্লির ধারাবাহিকতায় থাকেন। কিন্তু এই সিতর কোনো শাস্তি নয়; বরং রহমত। যেমন তীব্র আলো থেকে চোখকে বাঁচাতে পর্দা দরকার, তেমনি হাকিকতের প্রবল প্রকাশ থেকেও বান্দাকে আড়াল দরকার। ইমাম কুশাইরি, ইমাম সোহরাওয়ার্দি এবং ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্যে সিতর ও তাজাল্লির এই রহস্য উন্মোচন করা যাক।

ইমাম কুশিাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইমাম কুশাইরি বলেছেন, সাহিবুস-সিতর নিজের মুশাহাদার বৈশিষ্ট্যে স্থির থাকে, আর সাহিবুত-তাজাল্লি সবসময় বিনয় ও আত্মসমর্পণে থাকে। সিতর সাধারণ মানুষের জন্য শাস্তি, কিন্তু বিশেষ বান্দাদের জন্য রহমত। কারণ পূর্ণ তাজাল্লি প্রকাশ পেলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। আরবের যুবকের অজ্ঞান হয়ে পড়ার ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সিতর কখনো রহমতও হতে পারে। নবীজির দৈনিক সত্তরবার ইস্তিগফারের হাদিস উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ইস্তিগফার মূলত সিতর প্রার্থনা করাই।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সিতরের আবরণে থাকে, আর খাস বান্দারা তাজাল্লির স্থায়ী ধারাবাহিকতায় থাকে। হাদিসে এসেছে, إِنَّ اللهَ تَعَالَى إِذَا تَجَلَّى لِشَيْءٍ خَشَعَ لَهُ – নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা যখন কোনোকিছুর ওপর তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তখন তা তাঁর সামনে অবনত হয়ে যায়।[1]

সুতরাং, সাহিবুস-সিতর তথা সিতরের অধিকারী ব্যক্তি সবসময় নিজের মুশাহাদার বৈশিষ্ট্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা তাকে যে অবস্থায় রেখেছেন, সে সেই অবস্থার হাকিকতে স্থির থাকে। আর সাহিবুত-তাজাল্লি তথা তাজাল্লির অধিকারী ব্যক্তি সবসময় নিজের খুশুর বৈশিষ্ট্যে থাকে। অর্থাৎ, সে সবসময় বিনয়, ভীতি ও আত্মসমর্পণের অবস্থায় থাকে।

সিতর আওয়ামের জন্য শাস্তি, আর খাসদের জন্য রহমত। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাদের সামনে যে মুকাশাফা তথা অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন প্রকাশ করেন, যদি তিনি তা তাদের থেকে আড়াল না করতেন, তাহলে তারা হাকিকতের সুলতান তথা আল্লাহর সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। কিন্তু তিনি যেমন তাদের সামনে প্রকাশ করেন, তেমনি আবার তাদের ওপর আড়ালও করেন।

কারণ, হাকিকতের অদৃশ্য আহ্বান যখন কোনো বান্দার সামনে প্রকাশ পায়, তখন সে তার সামনে বিনীত হয়ে যায়, নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং নিজের সত্তা ও নিজের যা কিছু আছে, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আমি মনসুর মাগরিবিকে বলতে শুনেছি, এক ফকির আরবের এক গোত্রে এসে পৌঁছালেন। সেখানে এক যুবক তাকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল। যুবকটি যখন এই ফকিরের খেদমতে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ সে অচেতন হয়ে পড়ে গেল। তখন ফকির তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, তার এক চাচাতো বোন আছে। সে তার প্রেমে আসক্ত। একদিন মেয়েটি নিজের তাঁবুর ভেতর দিয়ে হাঁটছিল। যুবকটি শুধু তার আঁচলের ধুলো দেখতে পেল, আর তাতেই সে অচেতন হয়ে পড়ে গেল!

এরপর ফকির সেই তাঁবুর সামনে গিয়ে বললেন, “তোমাদের কাছে আগন্তুকের সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার আছে। আমি এই যুবকের ব্যাপারে তোমার কাছে সুপারিশকারী হয়ে এসেছি। তোমার প্রেমে সে যে অবস্থায় পড়েছে, তার প্রতি তুমি একটু কোমল হও।”

তখন সেই নারী বলল, “সুবহানাল্লাহ, আপনি তো সরল হৃদয়ের মানুষ। সে আমার আঁচলের ধুলো দেখাও সহ্য করতে পারে না; তাহলে আমার সঙ্গ কীভাবে সহ্য করবে?”

এই ঘটনায় ইঙ্গিত আছে যে, সিতর কখনো রহমতও হতে পারে; বিশেষত তার জন্য, যে তাজাল্লির নুরের প্রখরতা সহ্য করতে সক্ষম নয়।[2]

এই পথের আওয়ামের জীবন তাজাল্লির মধ্যে, আর তাদের বিপদ সিতরের মধ্যে। আর খাস বান্দাদের অবস্থা হলো— তারা আত্মহারা, অস্থিরতা এবং স্বস্তির মাঝামাঝি থাকে। যখন তাদের জন্য তাজাল্লি ঘটে, তারা আত্মহারা হয়ে যায়; আর যখন তাদের ওপর সিতর করা হয়, তখন তাদের স্বাভাবিক অংশ ও মানবীয় অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে তারা জীবনধারণ করতে পারে।

হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে যে বলা হয়েছিল, وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَى – হে মুসা, তোমার ডান হাতে ওটা কী?[3]

এর কারণ ছিল, হঠাৎ সেই সম্বোধন শ্রবণের ফলে মুকাশাফার যে প্রভাব তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, তার কিছুটা প্রশমনের জন্য তাঁকে এমন একটি বিষয়ে ব্যস্ত রাখা, যা তাঁকে সাময়িকভাবে আড়াল দেবে।[4] রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي، حَتَّى أَسْتَغْفِرُ اللهَ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةً – নিশ্চয় আমার হৃদয়ের ওপর এক ধরনের সূক্ষ্ম আবরণ এসে যায়; তাই আমি দিনে সত্তরবার আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করি।[5]

ইস্তিগফার হলো সিতর প্রার্থনা করা। কারণ গফর শব্দের অর্থই সিতর। এ থেকেই বলা হয়: গফরুস-সাওব, অর্থাৎ নতুন কাপড়ের ওপর যে ময়লা বা অনুরূপ আবরণ পড়ে। আর মিগফার বলা হয় মাথার মাপ অনুযায়ী বানানো বর্মের জালি, যা মাথার নিচে পরা হয়।

আল-লুমায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয়ে যে আবরণ উপস্থিত হতো এবং যেখান থেকে তিনি তাওবা করতেন, তার দৃষ্টান্ত হলো আয়নার মতো। দর্শক যখন আয়নার ওপর নিশ্বাস ফেলে, তখন তার আলো কিছুটা কমে যায়; পরে আবার তা আগের উজ্জ্বল অবস্থায় ফিরে আসে। তবে একদল বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে এটি অসম্ভব; কারণ তাঁর হৃদয়ে মাখলুকের কোনো প্রভাবজনিত কাহর পৌঁছে না। তিনি রুইয়তের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত এবং তাঁর সঙ্গেই হকের নিদর্শন।[6]

অতএব, যেন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি হাকিকতের প্রবল অভিঘাতের সময় নিজের হৃদয়ের ওপর সিতর প্রার্থনা করেন। কারণ হক সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অস্তিত্বের সামনে মাখলুকের কোনো স্থায়িত্ব থাকে না।

আর হাদিসে এসেছে, لَوْ كُشِفَ عَنْ وَجْهِهِ لَأَحْرَقَتْ سُبُحَاتُ وَجْهِهِ مَا أَدْرَكَ بَصَرُهُ – যদি তাঁর চেহারার আবরণ সরিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে তাঁর চেহারার দীপ্তিসমূহ তাঁর দৃষ্টি যতদূর পৌঁছায়, সবকিছু জ্বালিয়ে দিত।[7]

ইমাম শিহাব উদ্দিন সেহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইমাম সোহরাওয়ার্দি ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিনের সাথে এই তিন স্তরের তুলনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তাজাল্লি কখনো কর্মের পথে, কখনো গুণাবলির পথে, আবার কখনো সত্তার পথে ঘটে। হাল্লাজের একটি গভীর উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, যে ব্যক্তি এই অবস্থাকে শুধু ভাষা বা বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চায়, সে এখনো প্রকৃত মুশাহাদায় পৌঁছায়নি। তাজাল্লি হলো বাশারিয়তের পর্দা উঠে যাওয়া, আর ইস্তিতার হলো বাশারিয়ত ও গায়েবের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকা।

তিনি বলেন, হজরত জুনাইদ বলেছেন, “এটি মূলত তাদিব তথা আদব শেখানো, তাহজিব তথা পরিশুদ্ধ করা এবং তাজবিব তথা গলিয়ে বিলীন করে দেওয়া। তাদিবের ক্ষেত্র হলো ইস্তিতার, আর তা আওয়ামের জন্য। তাহজিব খাওয়াসের জন্য, আর সেটিই তাজাল্লি। আর তাজবিব আওলিয়ার জন্য, আর সেটিই মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ দর্শন।”

এই তিনটি স্তর ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিনের মতো; আবার মারিফত, মুকাশাফা ও মুশাহাদার মতো।

ইস্তিতার ও তাজাল্লি বিষয়ে ইশারাসমূহের সারকথা হলো— এ-সব নফসের সিফাত তথা গুণের প্রকাশের দিকে ফিরে যায়।
ইস্তিতার এর দ্বারা ইশারা করা হয়— কলবের সিফাতের পূর্ণ শক্তির কারণে নফসের সিফাত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
তাজাল্লি কখনো কর্মের পথে হয়, কখনো সিফাত তথা গুণাবলির পথে হয়, আবার কখনো জাত তথা সত্তার পথে হয়।

আর হক তায়ালা খাস বান্দাদের ওপর আবরণের স্থান অবশিষ্ট রেখেছেন; তাদের জন্য এবং অন্যদের জন্য নিজের রহমতস্বরূপ। তাদের জন্য এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা নফসের প্রয়োজনীয় বিষয়ের দিকে ফিরে আসে। আর অন্যদের জন্য এ কারণে যে, যদি ইস্তিতারের স্থানসমূহ না থাকত, তাহলে মানুষ তাদের দ্বারা উপকৃত হতে পারত না; কারণ তারা জমউল-জম তথা পূর্ণ একাত্ম-অবস্থায় ডুবে থাকত এবং আল্লাহ, সেই একক পরাক্রমশালী সত্তার দিকে সম্পূর্ণভাবে নেমে যেত।

কেউ বলেছেন, “হকের তাজাল্লি যখন অন্তরের গভীরে প্রকাশ পায়, তখন বান্দার সির তথা রহস্য এমন এক হাকিকতের দিকে মুখ করে, যা পরিবর্তনের অধীন নয় এবং বুদ্ধির সীমায় বন্দি নয়। তাই যে ব্যক্তি এই অবস্থাকে ভাষা দ্বারা বুঝতে চায়, অথবা নিজের চিন্তার মাপে বুঝে নিতে চায়, সে এখনো যুক্তির স্তরে আছে; সে ইলাহি মহিমার প্রত্যক্ষ মুশাহাদায় পৌঁছেনি।”

এই উক্তিটি কালাবাদি আত-তা‘আররুফ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং তা কোনো কোনো বড় বুজুর্গের দিকে সম্বন্ধ করেছেন। সম্ভবত এর দ্বারা হাল্লাজ হুসাইন ইবনে মনসুরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এখানে “ইস্তিদলালি খাতিরের অধিকারী” বলতে বোঝানো হয়েছে, সে এমন বিষয় প্রত্যক্ষ করে না, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ সে শুধু তার ধারণা ও নিজ উপলব্ধির হাকিকত প্রত্যক্ষ করে; ফলে তার সেই প্রত্যক্ষতা বর্তমান হালের মুশাহাদা থেকে তাকে বিচ্যুত করে রাখে।[8]

আর কেউ বলেছেন, “তাজাল্লি হলো বাশারিয়তের পর্দা উঠে যাওয়া। কারণ তখন হকের মহান সত্তার দর্শন ঘটে। আর ইস্তিতার হলো, বাশারিয়ত তোমার ও গায়েব প্রত্যক্ষ করার মাঝখানে অন্তরায় হয়ে থাকা।”[9]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইবনে আরাবি সবচেয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন নুরের বিভিন্ন প্রকার নিয়ে। সময়ের নুর, ডান-বাম দিকের নুর, ওপর-নিচের নুর, আসমার নুর, রুহের নুর, প্রকৃতির নুর। প্রতিটি নুর মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে। তিনি কায়রোতে নিজের এক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেখানে সামনে-পেছনের ধারণাই তাঁর কাছ থেকে সরে গিয়েছিল। সিতর সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটি গাইরত ও রহমত দুটি কারণেই প্রয়োজন। কারণ সৃষ্টি আল্লাহর মুখমণ্ডলের দীপ্তি সহ্য করতে পারে না।

প্রিয়তমের তাজাল্লির অবস্থায়:

لِلْغَيْبِ نُورٌ عَلَى الْبَصَائِرِ       يُظْهِرُ مَا كَانَ فِي السَّرَائِرِ

গায়েবের নুর অন্তরচোখে জ্বলে উঠলে হৃদয়ের সব গোপন কথা প্রকাশ পেয়ে যায়।

لِكُلِّ قَلْبٍ مِنْ كُلِّ شَخْصٍ       أَخْبَرَهُ الْحَقُّ فِي الْمَخَاضِرِ

প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হক তায়ালা জানিয়ে দেন, সে এখন কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

فَشَاهِدِ الْأَمْرَ كَيْفَ يَجْرِي      وَعَايِنِ الْحُكْمَ فِي الْمَقَادِرِ

তাই দেখো, বিষয়গুলো কীভাবে ঘটছে; আর তাকদিরে হুকুম কীভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

فَعِنْدَهُ أَوَّلٌ وَظَاهِرٌ      وَعِنْدَنَا بَاطِنٌ وَآخِرُ

তাঁর দিক থেকে শুরু ও প্রকাশ; আর আমাদের দিক থেকে অন্তরাল ও পরিণতি।

قَسْمُهُ كَالصَّلَاةِ فِينَا      عَيْنُنَا لِعَيْنٍ فَاشْكُرْ وَبَادِرْ

আমাদের মধ্যে তাঁর বণ্টন সালাতের মতো; তাই নিজের সত্তার সত্য বুঝে কৃতজ্ঞ হও এবং এগিয়ে যাও।

مَا بَيْنَ عَبْدٍ حَبِيسِ عَجْزٍ     وَبَيْنَ رَبٍّ عَلَيْهِ قَادِرْ

একদিকে অক্ষমতায় বন্দি বান্দা, অন্যদিকে তার ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান রব।

بِفَضْلِهِ قَدْ سَرَى إِلَيْنَا     مَا يَحْمَدُ اللهَ فِي الضَّمَائِرْ

তাঁর অনুগ্রহেই আমাদের অন্তরে এমন কিছু প্রবাহিত হয়েছে, যার জন্য অন্তরগুলো আল্লাহর প্রশংসা করে।

জেনে রাখো, সুফি-সাধকদের ভাষায় তাজাল্লি হলো, গায়েবি নুরের এমন উন্মোচন, যা হৃদয়ের সামনে প্রকাশ পায়। এই প্রকাশ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না; প্রত্যেকের মাকাম তথা আধ্যাত্মিক অবস্থান অনুযায়ী তা ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ঘটে।

কখনো এই তাজাল্লি এমন নুরের মাধ্যমে ঘটে, যা বস্তুজগতের উপাদান, রূপ ও আকৃতি থেকে মুক্ত। এটি মাআনি তথা অন্তর্গত অর্থ, মারিফত তথা আল্লাহ-সম্পর্কিত গভীর জ্ঞান এবং আসরার তথা গোপন রহস্যের জগতের নুর। অর্থাৎ এটি চোখে দেখা কোনো বস্তু নয়; হৃদয়ের উপলব্ধিতে ধরা পড়া এক ধরনের হাকিকত।

কখনো তাজাল্লি আসে নুরসমূহের নুর থেকে। কখনো আসে রুহসমূহের নুর থেকে; এখানে রুহসমূহ বলতে ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে। কখনো তা বাতাসের নুরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, কখনো প্রকৃতির নুরের সঙ্গে, কখনো আসমা তথা ইলাহি নামসমূহের নুরের সঙ্গে। আবার কখনো তা জন্ম নেওয়া সৃষ্টিসমূহ, তাদের মূল উৎস, কারণসমূহ এবং মাধ্যমসমূহের নুরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। প্রত্যেকটি তার নিজ নিজ স্তর অনুযায়ী প্রকাশ পায়।

এই নুরগুলোর কোনো একটি যখন কোনো দিগন্ত থেকে উদিত হয় এবং অন্তরচোখ তার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সেটি নিজের ক্ষেত্রের বিষয়গুলো খুলে দেয়। তবে শর্ত হলো— অন্তরচোখকে অন্ধত্ব, পর্দা, ধোঁয়াশা, রোগ এবং দৃষ্টির অন্যান্য ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

তখন যে নুর তার সামনে বিস্তৃত হয়, সে সেই নুরের আলোয় মাআনির বাস্তব রূপগুলোকে যেমন আছে তেমনই দেখতে পায়। শব্দ, বাক্য ও ইশারার সঙ্গে সেই অর্থগুলোর যে সম্পর্ক আছে, সেটিও তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে সে শুধু শব্দ দেখে না; শব্দের পেছনে যে হাকিকত রয়েছে, সেটিও মুশাহাদার মাধ্যমে জানতে পারে। এখানে অনুমান নেই, কল্পনা নেই, মিশ্রণ নেই; বিষয়টি তার সামনে নিজ বাস্তব অবস্থায় ধরা পড়ে।

এই নুরগুলোর মধ্যে কিছু আছে, যার আলোয় আমরা চলি। কিছু আছে, যার দিকে আমরা চলি। কিছু আছে, যেখান থেকে আমরা চলি। কিছু নুর আমাদের সামনে থাকে। কিছু নুর আমাদের পেছনে থাকে; যারা আমাদের অনুসরণ করে, তারা সেই নুরে পথ পায়। কিছু নুর আমাদের ডান পাশে থাকে; সেগুলো আমাদের শক্তি দেয়। কিছু নুর বাম পাশে থাকে; সেগুলো আমাদের রক্ষা করে। কিছু নুর ওপর থেকে নামে; সেগুলো আমাদের উপকারের জন্য আসে। কিছু নুর আমাদের নিচে থাকে; আমরা সেগুলোর ওপর আধ্যাত্মিক চলাচল করতে পারি। আর কিছু নুর এমন, যা আমাদের ত্বক, দৃষ্টি, চুল এবং অনুভূতির মধ্যেই থাকে। এটাই এ বিষয়ের চূড়ান্ত সীমা।

এবার বস্তুজগতের উপাদান থেকে মুক্ত মাআনি নুরের কথা বলা যাক। এর দ্বারা এমন জ্ঞান বোঝানো হচ্ছে, যার সম্পর্ক কোনো দেহের সঙ্গে নয়, দেহজাত কোনো কিছুর সঙ্গেও নয়; কল্পনার সঙ্গেও নয়, দৃশ্যমান কোনো রূপের সঙ্গেও নয়। আমরা তাকে ছবি, আকৃতি বা কল্পনার মাধ্যমে জানি না। বরং তার নিজ হাকিকত অনুযায়ী তাকে বুঝি। তবে আমাদের বোঝা হয় আমাদের নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী।

এই জ্ঞান তখনই ধরা পড়ে, যখন মানুষ নিজেই নুরের অবস্থায় পৌঁছে। আমি যদি সেই অবস্থায় না পৌঁছি, তবে এ জ্ঞানের কিছুই ধরতে পারি না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়ায় এ কথাই এসেছে, وَاجْعَلْنِي نُورًا – আর আমাকে নুর বানিয়ে দিন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ – আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নুর।[10]

তাই কোনোকিছুই তাঁর নুর ছাড়া আলোকিত হয় না। আল্লাহ আরও বলেন, وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا – আর জমিন তার রবের নুরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।[11] এখানে জমিন বলতে হাশরের জমিন বোঝানো হয়েছে। কারণ সেদিন সেখানে সূর্য থাকবে না। আর নুর না থাকলে অন্ধকার ছাড়া কিছু থাকে না। কিন্তু সেদিন প্রত্যক্ষ দেখা ও হিসাবের দিন; তাই সেখানে নুর অবশ্যই থাকবে।

সেদিন আল্লাহ ফয়সালা ও বিচার করার জন্য আসবেন। তাঁর আগমন হবে তাঁর ‘নুর’ নামের প্রকাশে। তখন জমিন তার রবের নুরে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। প্রত্যেক নফস সেই নুরের মাধ্যমে জানতে পারবে, সে আগে কী পাঠিয়েছে এবং পেছনে কী রেখে এসেছে। কারণ সে নিজের সব কাজ সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে। সেই নুরই তার জন্য সবকিছু খুলে দেবে।

নফসের মধ্যেও নুর আছে। সেই নুর না থাকলে মুশাহাদা সঠিক হতো না। কারণ দুই নুরের মিলন ছাড়া দেখা পূর্ণ হয় না। যার মধ্যে নুরের কোনো অংশ আছে, সে কীভাবে চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্যের অধিকারী হবে? নুর তো দুর্ভাগ্যের জগতের বস্তু নয়।

প্রত্যেক নফসেরই একটি নুর আছে। সেই নুরের মাধ্যমে সে নিজের আমল দেখতে পায়। ভালো কাজ দেখে সে আনন্দিত হয়। আর মন্দ কাজ দেখে সে কামনা করে— ইশ, যদি তার ও সেই কাজের মাঝখানে অনেক দূরত্ব থাকত!

এ কারণেই আল্লাহ আয়াতের শেষে বলেছেন, وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ – আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু।[12] কারণ আল্লাহ বান্দাদের জন্য এমন নুর রেখেছেন, যার মাধ্যমে তারা উপলব্ধি করতে পারে। তারা জানে, নুরের সঙ্গে চিরদুর্ভাগ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি এমন এক পরিণতির দিকে যায়, যেখানে উদ্দেশ্য পূরণ হয়। আর এটাকেই সৌভাগ্য বলা হয়।

আল্লাহ বলেছেন, كُلُّ نَفْسٍ – প্রত্যেক নফস। এখানে তিনি কোনো নফসকে আলাদা করে বাদ দেননি। তিনি ভালো ও মন্দ দুটোর কথাই বলেছেন। সুতরাং অস্তিত্ব হলো নুর, আর অনস্তিত্ব হলো অন্ধকার। তাই সিতর বা গোপনীয়তা অনস্তিত্বের দিক থেকে; আর আমরা যেহেতু অস্তিত্বের মধ্যে আছি, তাই আমরা কল্যাণের মধ্যেই আছি। আর যদি আমরা অসুস্থও হই, তবু আমাদের শেষ গন্তব্য সুস্থতা। কারণ মূল সত্তা শক্তিশালী ও ক্ষতিপূরণকারী; আর সেই মূল সত্তাই নুর। প্রতিটি নুরের স্বভাবও এমন— যার ওপর তা উদিত হয়, তাকে প্রকাশ করে দেয়। তাই তুমি কোনো জিনিসকে বুঝতে পারো শুধু তোমার নিজের নুর এবং সেই জিনিসের নুরের মাধ্যমে।

অতএব, কোনো ফলাফল তখনই পূর্ণ হয়, যখন দুটি মূল একত্র হয়। একটি হলো ইলাহি কুদরত; অন্যটি হলো মুমকিন তথা সম্ভাব্য সৃষ্টির গ্রহণক্ষমতা। এই দুই হাকিকতের কোনো একটিও কমে গেলে জগতের কোনো আয়ন তথা অস্তিত্ব প্রকাশ পেত না।

এভাবে তোমাকে এসব নুর সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা দেওয়া হলো। এখন এর দীর্ঘ ব্যাখ্যায় যাওয়ার দরকার নেই; কারণ হালসমূহের আলোচনা বেশি বিস্তার সহ্য করে না। এখন আমরা শুধু এসব নুরের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বলব। আগে যে-সব জ্ঞাত বিষয়ের নুরের কথা এসেছে, সেখান থেকে একটি নুরের কথা বলাই যথেষ্ট করেছি, যাতে তা বাকি নীরব রাখা বিষয়গুলোর জন্য ইঙ্গিত ও নমুনা হয়ে থাকে।

আমাদের সামনে যে নুর চলে, সেটি সময়ের নুর। তুমি যে সময়ে যে অবস্থায় আছ, সেই সময়ের নুরই তোমার সামনে থাকে। সুতরাং তুমি নিজের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকাও। যেই অবস্থা তোমার ওপর কার্যকর, যেটি তোমার সামনে উপস্থিত এবং তোমাকে ধরে রেখেছে, সেটিই তোমার বর্তমানের নুর। আর সেটিই সেই ইলাহি নামের অস্তিত্ব, যার মাধ্যমে তুমি এখনকার হালে প্রতিষ্ঠিত। অতীত বা ভবিষ্যতে তার কোনো হুকুম চলে না।

আর তোমার ডান দিকের নুর হলো তোমার সাহায্যকারী ও শক্তিদাতা। তোমার সত্তা থেকে যা চাওয়া হয়, সে বিষয়ে এটি তোমাকে সাহায্য করে। নামাজে তুমি আল্লাহর কাছে যে সাহায্য চাও, সেটিও এই নুরের সঙ্গে যুক্ত। তুমি বলো, إِيَّاكَ نَسْتَعِينُ – আপনার কাছেই আমরা সাহায্য চাই। নামাজ নিজেও নুর। আর তোমার ডান পাশে যে নুর, সেটিই তোমার শক্তির নুর। তাই যখন তুমি বলো, “আপনার কাছেই আমরা সাহায্য চাই”, তখন তুমি তোমার ডান পাশের নুর দিয়েই সাহায্য চাইছ। কারণ ডান দিক শক্তির দিক। কবি বলেছেন—

إِذَا مَا رَايَةٌ رُفِعَتْ لِمَجْدٍ              تَلَقَّاهَا عَرَابَةُ بِالْيَمِينِ

মর্যাদার পতাকা যখনই উঁচু করা হয়, আরাবা তা সম্মানের সঙ্গে ডান হাতে গ্রহণ করে।

তোমার বাম পাশের নুর হলো রক্ষা ও প্রতিরক্ষার নুর। এটি নফসের ভেতর প্রভাব বিস্তারকারী অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি, সন্দেহ, অস্পষ্টতা এবং ভুল ধারণা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে নিজের বিশ্বাস এবং নিজের ব্যাপারে নিজের উপলব্ধি যাচাই করতে চায়, তার সামনে এই নুর কাজ করে।

এই নুর দুই ধরনের। ইমানের নুর এবং দলিলের নুর। দলিলের নুরও আবার দুই রকম। চিন্তা-ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক নুর এবং কাশফ-ভিত্তিক প্রত্যক্ষ উপলব্ধির নুর। বাম দিক থেকে আসা এই নুরের উপকার হলো, এর মাধ্যমে বিষয়টি নিজের প্রকৃত অবস্থায় জানা যায়।

আর আমাদের পেছনে যে নুর থাকে, সেটি আসলে তাদের সামনে চলে, যারা আমাদের অনুসরণ করে। তারা আমাদের অনুসরণ করে এবং আমাদের স্তরের ওপর ভর করে এগোয়। তাই সেই নুর তাদের সামনে থাকে, কিন্তু আমাদের পেছনে থাকে। এই নুরের কারণেই তারা বাসিরতের ওপর থাকে এবং অন্ধ অনুসরণের স্তর থেকে বেরিয়ে আসে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, أَدْعُو إِلَى اللهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي -আমি আল্লাহর দিকে আহ্বান করি বাসিরতের ওপর; আমি এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে।[13]

অতএব, আহ্বানকারী নিজের সামনে থাকা নুরের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন; এমন অন্তর্দৃষ্টির ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে পথটি তাঁর কাছে স্পষ্ট। আর অনুসরণকারী সেই আহ্বানকারীর পেছনের নুরের মাধ্যমে তার ডাক শোনে। ফলে যে বিষয়ে তাকে ডাকা হচ্ছে, সে বিষয়েও সে তার অনুসৃত ব্যক্তির মতো বাসিরতের ওপর থাকে। ওই নুরের মাধ্যমে অনুসরণকারী পেছন থেকে তেমনই দেখে, যেমন অনুসৃত ব্যক্তি সামনে থেকে দেখে।

এটি আমার নিজের মাকাম। কায়রো নগরে ৫৯৩ হিজরি সনে আসরের নামাজে আমার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছিল। আমি তখন আজহার মসজিদে আইনুল-জাবাল পাশে জামাতে নামাজ পড়ছিলাম। হঠাৎ আমার সামনে এমন এক নুর প্রকাশ পেল, যার ফলে আমার পেছনের ব্যক্তি প্রায় আমার সামনের ব্যক্তির চেয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আমি যখন এটি দেখলাম, তখন আমার ওপর থেকে ‘পেছন’ ধারণার হুকুম সরে গেল। তখন আমার কাছে সামনে বা পেছনের কোনো আলাদা দিক রইল না। সে মুশাহাদায় আমার দিকগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। বরং আমি যেন গোলকের মতো হয়ে গেলাম; নিজের জন্য অস্তিত্ব ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট দিক বুঝতে পারছিলাম না। বিষয়টি ঠিক যেভাবে দেখেছি, সেভাবেই ছিল। এর আগে আমার হৃদয়ের রক্ষকের সামনে বস্তুসমূহের কাশফ ঘটেছিল; কিন্তু এই কাশফ সেই কাশফের মতো ছিল না।

আর ওপর থেকে যে নুর আসে, সেটি পবিত্র ইলাহি নুর। এটি এমন এক গায়েবি জ্ঞান নিয়ে নেমে আসে, যার আগে কোনো সংবাদ আসে না এবং যা চিন্তা-ভাবনা দিয়েও পাওয়া যায় না। এই নুর আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন ইলম দেয়, যা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল কখনো অস্বীকার করতে পারে; যদি সেখানে ইমান না থাকে। আর যদি আগে থেকেই নুরানি ইমান থাকে, তবে সে তাবিলের মাধ্যমে দুই দিককে মিলিয়ে নেয়।

আর আমাদের নিচে যে নুর থাকে, সেটি এমন নুর, যা আমাদের হুকুমে অধীনে থাকে, আমরা তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে কাজে লাগাতে পারি। এর সঙ্গে আমাদের ভেতরে এমন কোনো ইলাহি নির্দেশ যুক্ত থাকে না, যার সামনে আমাদের থেমে যেতে হয়। তাই আমরা তাকে ব্যবহার করি শুধু তারই ভেতরে।

আর যেসব নুরের মাধ্যমে আমরা চলি, সেগুলো হলো হকের দিক থেকে মায়িয়্যাতের নুর; অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে-থাকার নুর। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ – তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।[14]

আমরা বলেছি, এটি হকের দিক থেকে। কারণ এই ‘সঙ্গে থাকা’ আল্লাহর কোনো এক সৃষ্টির জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট নয়; বরং সব সৃষ্টিই এর অন্তর্ভুক্ত। এই নুরের সঙ্গে আল্লাহর আল-হাফিজ তথা সংরক্ষণকারী এবং আল-মুহিত তথা পরিবেষ্টনকারী নামের সম্পর্ক আছে।

তবে আল্লাহর কিছু বান্দার সঙ্গে তাঁর বিশেষ মায়িয়্যাতও (আল্লাহর এমন সঙ্গ, যেখানে তিনি বান্দাকে জানেন, দেখেন, শোনেন, রক্ষা করেন, সাহায্য করেন এবং তার অবস্থার ওপর ইলাহি তত্ত্বাবধান রাখেন) থাকে। যেমন হজরত মুসা ও হজরত হারুন আলাইহিমাস সালামের সঙ্গে তাঁর বিশেষ মায়িয়্যাত সম্পর্কে তিনি বলেছেন, إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى – নিশ্চয় আমি তোমাদের দুজনের সঙ্গে আছি; আমি শুনি এবং দেখি।[15]

এটি তাঁদের দুজনের জন্য আশ্বাস ছিল, যাতে তাঁরা ভয় না পান। কারণ তাঁরা বলেছিলেন, إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى – আমরা আশঙ্কা করছি, সে আমাদের ওপর ত্বরিত আক্রমণ করবে অথবা সীমালঙ্ঘন করবে।[16] অর্থাৎ, ফিরআউন যুক্তি ও ক্ষমতার জোরে তাঁদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে— এই ভয় তাঁদের ছিল। কারণ তার হাতে ছিল রাজত্ব ও কর্তৃত্ব। আল্লাহ তাঁদের সেই ভয় থেকে নিরাপদ করলেন।

এখান থেকে তুমি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা এবং অন্যান্য রসুলদের ওপর তাঁর উচ্চতা বুঝতে পারবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমন অবস্থার কথা জানিয়েছেন, যখন সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের ব্যাপারে এবং নবীজির ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলেন। তখন নবীজি তাঁর সঙ্গীকে নিরাপদ করলেন এবং তাঁর ভয় দূর করলেন। সে সময় তাঁরা দুজন গুহায় ছিলেন, আর হকের সুরক্ষা তাঁদের ওপর ছিল। নবীজি বলেছিলেন, لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا – চিন্তিত হবেন না; নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।[17]

এই সংবাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত মুসা ও হারুন আলাইহিমুস সালামের সঙ্গে হকের মায়িয়্যাতের মাকামে দাঁড়ালেন; বরং তিনি যেন সেই মাকামের প্রতিনিধি হয়ে উঠলেন। ইলাহি যত্ন এভাবেই প্রকাশ পায়।

সুতরাং এটিই সেই নুর, যার মাধ্যমে আমরা চলি। এই নুর কখনো সাময়িক নয়; এটি সবসময় সঙ্গে থাকে। তাই হক এই নুরের সঙ্গে সবসময় সংরক্ষণকারী ও সাহায্যকারী হিসেবে থাকেন; অপমানকারী বা পরিত্যাগকারী হিসেবে নন।

এই কারণেই আল্লাহ তাঁর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবানে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা যখন নফল আমলের মাধ্যমে তাঁর দিকে এগিয়ে যাই, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন না। বরং তিনি আমাদের ভালোবাসেন। তখন তিনি আমাদের সেই শ্রবণ হয়ে যান, যার মাধ্যমে আমরা শুনি; এবং সেই পা হয়ে যান, যার মাধ্যমে আমরা চলি। এভাবে আমাদের সব শক্তি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাঁর দানের অধীন হয়ে যায়।

নফল আমল যদি আমাদের মধ্যে হকের পক্ষ থেকে এমন দান এনে দেয়, তাহলে ফরজ আমল কী দান করে, তা তুমি নিজেই ভেবে দেখো। সুতরাং বাধ্যতামূলক বন্দেগি ও পছন্দনির্ভর বন্দেগির মধ্যে পার্থক্য বুঝে নাও। পছন্দনির্ভর বন্দেগিতে বান্দার সঙ্গে হকের এক ধরনের অংশগ্রহণের কথা আসে। যেমন, কিছু হাদিসে আল্লাহ বান্দাকে সম্বোধন করে বলেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, আমি অসুস্থ ছিলাম, এ ধরনের কথা। কিন্তু বাধ্যতামূলক বন্দেগিতে এ রকম অংশগ্রহণ নেই; সেটি খাঁটিভাবে বান্দার জন্য।

যাকে এই মাকামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তার ওপরে আর কোনো মাকাম নেই। আল্লাহ বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.)-কে বলেছিলেন, “আমার দিকে এমন জিনিস দিয়ে নৈকট্য অর্জন করো, যা আমার নেই; তা হলো লাঞ্ছনা ও অভাব।” তাই এখানে নৈকট্যের আয়নই (একই হাকিকতের প্রকাশমান দিক) মাকাম থেকে দূরত্বের আয়ন। অতএব বুঝে নাও।

আর যে নুর থেকে আমরা চলি, সেটি হাকিকতের নুর। মানুষ তা জানুক বা না জানুক, এই নুরই তাকে চালায়। এই নুরের মাধ্যমে হাকিকত উন্মোচিত হয়। একই সঙ্গে এটাও প্রকাশ পায় যে, তার চলা এই নুর থেকেই। এরপর তার সামনে সেই নুরও উন্মোচিত হয়, যার দিকে সে চলছে; আর সেটিই শরিয়তের নুর।

এই মাকামের অধিকারী ব্যক্তি মাসুম তথা সংরক্ষিত, মাহফুজ তথা হেফাজতপ্রাপ্ত, ইনায়াতপ্রাপ্ত এবং জ্ঞানী; সে অজ্ঞ নয়। কারণ সে এমন ইলমে গুণান্বিত, যার মধ্যে কোনো অজ্ঞতা নেই।

কিছু বান্দা আছে, যারা শরিয়তের নুর থেকে হাকিকতের নুরের দিকে চলে। তাদের ব্যাপারে আশঙ্কা থাকে। আর যারা হাকিকতের নুরের কাশফ নিয়ে শরিয়তের নুরের দিকে চলে, তারা আল্লাহর গোপন পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকে। কারণ তারা নিজেদের অবস্থাকে স্পষ্ট অন্তর্দৃষ্টিতে চিনে নেয়।

প্রথম দলটি বড় বিপদের মধ্যে থাকে। তারা সংরক্ষিতও হতে পারে, আবার অপমানিত অবস্থায় ছেড়েও দেওয়া হতে পারে। এটি ভালোভাবে জেনে রাখো।

আর মুওয়াল্লাদাত তথা জন্মগ্রহণকারী সৃষ্টিসমূহের নুর এমন নুর, যা নিজের মধ্যেই আল্লাহ-সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান দেয়। এই নুরের মাধ্যমে হকের নিসবত এবং খনিজ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর রূপে তাঁর প্রকাশ উন্মোচিত হয়, যদিও তারা নিজেরা তা জানে না। মানুষ তাদের ওপর অতিরিক্ত মর্যাদা পেয়েছে শুধু এই কারণে যে, তার কাছে বিষয়টি উন্মোচিত।

এই মাকামে মুওয়াল্লাদাতের অবস্থা আল্লাহর এই কথার মতো, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ – তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। আর এই মাকামে মানুষের অবস্থা আল্লাহর এই কথার মতো, لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا – চিন্তিত হবেন না; নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। আর এই কথার মতো, إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى – নিশ্চয় আমি তোমাদের দুজনের সঙ্গে আছি; আমি শুনি এবং দেখি।

কারণ, মানুষ প্রকৃত অর্থে সবকিছুর রূপ ধারণকারী এক সামগ্রিক সত্তা। তাই যে ব্যক্তি এই নুরের মাধ্যমে মানুষকে চিনে এবং তার কাছে মানুষের রহস্য উন্মোচিত হয়, সে বিশেষ মর্যাদার অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত। সে তখন জিনিসগুলোর আয়নকে তাদের সত্য রূপে দেখে।

এই বিষয়ে এমন এক ব্যক্তি আমাকে খবর দিয়েছেন, যার বর্ণনার ওপর আমার আস্থা আছে। তিনি বলেছেন, দামেস্কে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যার এই মাকাম ছিল। তার মাথা সবসময় দুই হাঁটুর মাঝখানে নত থাকত। যখনই সে মাথা তুলে কোনোকিছুর দিকে তাকাত, সঙ্গে সঙ্গে বলতে থাকত, “ধরো, ধরে রাখো!” মানুষ তার কথা বুঝত না; তারা তাকে পাগল বলতো। আর আমি নিজে এ বিষয়টি আস্বাদন করেছি; তাই আল্লাহর জন্যই সব প্রশংসা।

‘আসমার নুর’ বলতে এমন নুর, যার মাধ্যমে জিনিসগুলোর আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। এখানে ‘নাম’ বলতে মানুষের দেওয়া প্রচলিত নাম বোঝানো হয়নি; বরং সেই ইলাহি নাম বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ কোনো সত্তাকে তার নিজস্ব পরিচয়, কাজ ও অবস্থান দিয়েছেন।

এই আসমার কিছু আল্লাহর দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন তাঁর জাত, সিফাত ও আফআল তথা আল্লাহ কে, তাঁর গুণাবলি কী, তাঁর কাজ কীভাবে প্রকাশিত হয়; এসব দিক এই আসমার মাধ্যমে বোঝা যায়। আবার কিছু আসমা সৃষ্টিজগতের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলোর মাধ্যমে মুমকিন সত্তাগুলো তথা যে-সব সৃষ্টি অস্তিত্ব পেতে পারে, তাদের বিভিন্ন শ্রেণি, ধরন এবং প্রত্যেক ব্যক্তিসত্তার নিজস্ব পরিচয় প্রকাশ পায়। এগুলো সেই নাম, যা আল্লাহ নিজেই সত্তাগুলোর জন্য নির্ধারণ করেছেন এবং রসুলরা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই এখানে মানুষের বানানো পরিভাষা বা সামাজিক নাম উদ্দেশ্য নয়।

এই নুরগুলোই আদম আলাইহিস সালামের ছিল। কারণ তিনি সব আসমা শিখেছিলেন আল্লাহর নির্ধারণের মাধ্যমে, মানুষের পারিভাষিক চুক্তির মাধ্যমে নয়। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহর এমন আসমা আছে, যার মাধ্যমে তিনি ফেরেশতা ও পুরো জগতকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। আবার তাঁর এমন আসমাও আছে, যার মাধ্যমে তিনি এমন এক সত্তাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, যার মধ্যে ইলাহি উপস্থিতির সব হাকিকত একত্র হয়েছে। সেই সত্তা হলো পূর্ণ মানব। এই বিষয়টি আদম আলাইহিস সালামের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে; আর অন্যদের মধ্যে তা গোপন রাখা হয়েছে।

তাই ফেরেশতাদের বলা হয়, আদমের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে। এই মাকামে আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে নামকৃত বিষয়গুলো— অর্থাৎ তাদের বাস্তব আয়নসমূহ উপস্থিত করলেন। তারপর বললেন, أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ – তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাকে এদের নামগুলো জানাও।[18]

ফেরেশতারা সেই নামগুলো জওক তথা অন্তরের প্রত্যক্ষ আস্বাদনের মাধ্যমে জানতে পারল না। কারণ বড়দের জ্ঞান জওকের মাধ্যমে আসে; আর জওক আসে ইলাহি তাজাল্লি থেকে। তখন আল্লাহ বললেন, يَا آدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ – হে আদম, তুমি তাদেরকে এদের নামগুলো জানিয়ে দাও।[19] তখন আদম আলাইহিস সালাম তাদেরকে তাদের ইলাহি আসমা জানিয়ে দিলেন; অর্থাৎ সেই আসমা, যার মাধ্যমে তারা অস্তিত্ব পেয়েছে এবং যার ওপর তাদের আয়নের অস্তিত্ব নির্ভর করে।

এখানে মহাজাগতিক বা পারিভাষিক নাম উদ্দেশ্য নয়। এ ধরনের নামের উপকার শুধু দূরবর্তী এক দিক থেকে হতে পারে। তাই যখন আমরা বুঝলাম, সেটি উদ্দেশ্য নয়, তখন তার আলোচনা ছেড়ে দিলাম। কারণ আমরা এমন বিষয় নিয়েই কথা বলি এবং অনুবাদ করি, যা বাস্তবে ঘটে; এমন বিষয় নিয়ে নয়, যা কেবল বুদ্ধির বিচারে সম্ভব হতে পারে।

এখানেই কাশফের আহল ও বুদ্ধিনির্ভর দৃষ্টির আহলের পার্থক্য। কাশফের আহল যা জানায়, তা প্রত্যক্ষ উন্মোচন থেকে জানায়। আর বুদ্ধিনির্ভর লোকেরা সম্ভাবনার কথা বলে। অথচ আসল উপকার সেই জ্ঞানেই, যা বাস্তবে ঘটে; শুধু সম্ভব বলে ধরে নেওয়া জ্ঞানে নয়। কারণ এমন জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নয়। বাস্তবে যা ঘটে, সেটিই নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান।

আর প্রকৃতির নুর হলো এমন নুর, যার মাধ্যমে তার অধিকারী জানতে পারে— প্রকৃতি হাবা তথা সূক্ষ্ম আদিম উপাদানের মধ্যে কী ধরনের রূপ দেয়, আর সামগ্রিক রূপের মধ্যে কী দেয়; যে সামগ্রিক রূপ হলো সম্পূর্ণ দেহের রূপ। এই নুরগুলো যখন পূর্ণতা পায়, তখন তার অধিকারীর জ্ঞান এমন বিষয়ে যুক্ত হয়, যার শেষ নেই।

আমাদের কাছে এই বিষয়টি বাস্তবে ঘটার দিক থেকে অত্যন্ত দুর্লভ। আর আমাদের বাইরে অন্যদের কাছে এটি বুদ্ধির বিচারে অসম্ভব মনে হয়। এমনকি ইলাহিয়াতের ক্ষেত্রেও এ নিয়ে তাদের মতভেদ আছে। আমরা এমন কাউকে দেখিনি, যার এই পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা শুনিওনি, আর আমাদের জন্যও তা অর্জিত হয়নি। কোনো মানুষ যদি তা দাবি করে, তবে সেটি এমন দাবি, যার ওপর আদৌ কোনো দলিল দাঁড়ায় না; যদিও তার অর্জন মূলত সম্ভব।

প্রকৃতির নুরসমূহ হক ছাড়া সবকিছুর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। প্রকৃতি হলো নফসুর-রহমান তথা রহমময় শ্বাস। এর মাধ্যমেই আল্লাহ নিজ থেকে ইলাহি আসমা প্রকাশ করেছেন। আর আল্লাহ একে আফলাক তথা আকাশমণ্ডলী, আরকান তথা মৌল উপাদান এবং অসংখ্য ব্যক্তিসত্তার জন্ম-প্রবাহের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছেন; যার কোনো শেষ নেই।

আর বাতাসের নুর হলো উপাদানজাত নুর। এগুলোর প্রকাশ এত প্রবল যে, প্রবল প্রকাশের কারণেই সেগুলো গোপন হয়ে যায়। ফলে চোখ তা ধরতে পারে না। আমরা এগুলোকে শুধু বারজাখি উপস্থিতিতে দেখেছি। তবে আল্লাহ আমাদের কর্ডোবা নগরে একদিন এগুলোকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন। এটি আমাদের জন্য বিশেষ দান ছিল। আর এতে আমরা মুহাম্মদি নবুওয়তের উত্তরাধিকার পেয়েছি।

আল্লাহর আহল ছাড়া সব আদমসন্তানের ওপর এই বাতাসি নুরের ক্ষমতা ও প্রভাব আছে । কারণ আল্লাহর আহলের ক্ষেত্রে এসব নুর তাদের নিজেদের নুরের ভেতরে মিশে যায়, যেমন নক্ষত্রের আলো সূর্যের আলোয় মিশে যায়। এটি দৃষ্টির নুর দুর্বল হওয়ার কারণে ঘটে। আর আল্লাহ সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যাদের ওপর এই নুর আচ্ছন্ন করেন, তাদের কাছে তা অন্ধকার মেঘের মতো ঢেকে যায়। কিন্তু আল্লাহর আহলকে যখন তা আচ্ছন্ন করে, তখন তা তাদের ঢেকে ফেলে না; বরং নিজের রূপেই নুর হয়ে থাকে।

আর রুহসমূহের নুরের কথা বলতে গেলে— আমাদের মধ্যে কেউ এগুলোকে আকলের নুর মনে করেন, আবার কেউ এগুলোকে রসুলদের নুর বলেন। এগুলোর শক্তি, ক্ষমতা ও প্রভাব জগতে এত প্রবল যে, কোনোকিছুই এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তবে এগুলোরও কিছু সীমা আছে; সেই সীমায় পৌঁছালে এগুলো থেমে যায়, তা অতিক্রম করে না।

বান্দা যখন এই নুরগুলো প্রত্যক্ষ করে, তখন এগুলোর মাধ্যমে এমন সব গোপন ইলম তার সামনে খুলে যায়, যা এগুলোর আহল ছাড়া অন্যদের অজানা। এগুলো সুব্বুহি ও কুদ্দুসি নুর; হকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে। এরপর এর রশ্মি পূর্ণ মুশাহাদার অধিকারী আরিফদের হৃদয়ে পড়ে। তাদের হৃদয়ই এই নুরের রশ্মি পতনের স্থান। মানবজাতির মধ্যে ইলমের দিক থেকে এ শ্রেণির মানুষের চেয়ে পূর্ণতর কেউ নেই।

এই নুরগুলোর সামনে কোনো পর্দা দাঁড়াতে পারে না; শুধু আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছা ছাড়া। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষের হৃদয়েই এই নুরের রশ্মি কাশফের আকারে পড়ে। তারা আল্লাহর সত্যবাদী বান্দাদের বিশেষ এক শ্রেণি।

আর আনওয়ারুল আনওয়ার তথা নুরসমূহের নুর হলো সেই সুবুহাত; যদি আল্লাহ আমাদের ও তাঁর মাঝের পর্দা সরিয়ে দেন, তবে তা আমাদের জ্বালিয়ে দেবে। এগুলো তাঁর জাতি রশ্মি। যখন এগুলো বিস্তৃত হয়, তখন মুমকিন সত্তাগুলোর আয়ন প্রকাশ পায়। তাই মুমকিন সত্তাগুলোই আমাদের ও তাঁর মাঝের পর্দা। এটাই সর্ববৃহৎ নুর; এর চেয়ে বড় নুর আর নেই। আহলে কিতাবের জন্য শরিয়তসম্মত আমল সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা যে কথা বলেছেন, তাতে এই নুরের দিকেই ইশারা আছে, وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا التَّوْرَاةَ – আর যদি তারা তাওরাত প্রতিষ্ঠা করত। وَالْإِنْجِيلَ – এবং ইনজিল। وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ مِنْ رَبِّهِمْ – আর তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে। لَأَكَلُوا مِنْ فَوْقِهِمْ – তাহলে তারা অবশ্যই তাদের ওপর থেকে আহার লাভ করত। وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ – এবং এমনকি তাদের পায়ের নিচ থেকেও।[20]

এগুলো এমন ইলম, যা মানুষের অর্জন-চেষ্টার বাইরে। আর কোনো ইলম যদি অর্জনের অধীনে আসে, তাহলে তা ওপরের দিকের বা নিচের দিকের ইলমের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই বৈশিষ্ট্যে যখন কোনো নুর থাকে, তখন সেটি আমাদের নিচের নুর নয়; বরং সেটিই আমাদের পরিচালনা করে। আর যে নুর আমাদের নিচে থাকে, সেটির ওপর আমরা হুকুম চালাই। “পায়ের নিচে আহার” কথায় সেই নুরের দিকেই ইশারা করা হয়েছে।

আর যে নুর আমাদের নিজ সত্তা থেকে প্রকাশিত হয়, সেটিই সেই নুর, যার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছিলেন, وَاجْعَلْنِي نُورًا – আর আমাকে নুর বানিয়ে দিন। আরেক বর্ণনায় এসেছে, وَاجْعَلْ لِي نُورًا – আর আমার জন্য নুর করে দিন। আমরা যে- সব নুরের কথা বলেছি, এই নুর সেগুলোর সমষ্টি।

“আমাকে নুর বানিয়ে দিন”—এর অর্থ হলো নিজের সত্তার নুরকে মুশাহাদা করা। কারণ নিজের সত্তাকে নিজের সত্তা ছাড়া আর কিছু প্রত্যক্ষ করতে পারে না। এই ছয় দিক থেকে আসা নুরগুলোকে সত্তা গ্রহণ করে শুধু এ কারণে যে, সে তখনো নিজের সত্তার নুর নিজে উপলব্ধি করতে পারেনি।

এই অর্থেই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ عَرَفَ رَبَّهُ – যে নিজের নফসকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ – আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নুর।[21]

তুমি তাঁরই মতো, তবে তাঁর সৃষ্টি হিসেবে। আবার তুমি নিজেই দৃষ্টান্ত, এবং তুমিই দৃষ্টান্তদাতা। তাই তুমি এই নুরগুলোকে নিজের ভেতর থেকে বিকিরিত হতে দেখো। তোমার আসমান ও জমিনের জগৎ এমন কোনো অচেনা নুরের প্রয়োজন অনুভব করে না, যার আলো ধার করে তোমাকে চলতে হবে। তুমি নিজেই প্রদীপ, সলতে, প্রদীপাধার ও কাচ। যখন তুমি এটি বুঝতে পারবে, তখন তুমি জাইত তথা ইলাহি মদদ বুঝবে এবং সেই বৃক্ষকেও বুঝবে। আর কাচ যখন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো হয়; এখানে কাচই সূর্য; তখন ভেবো না যে, প্রদীপ আলাদা কিছু; প্রদীপ আসলে তোমার নিজের আয়নই।

তাই হে আমার ভাই, তোমার শেষ দোয়া যেন এ ছাড়া আর কিছু না হয়— আল্লাহ যেন তোমাকে নুর বানিয়ে দেন। এখানে এক আশ্চর্য রহস্য আছে। আমি শুধু ইঙ্গিত করলাম, ব্যাখ্যা করলাম না; কারণ এটি ব্যাখ্যা সহ্য করে না।

রহস্যটি হলো, আল্লাহ নিজের জন্য দৃষ্টান্ত দেন, কিন্তু আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় না। তিনি জিনিসকে জিনিসের সঙ্গে তুলনা করেন, কিন্তু জিনিসগুলো তাঁকে তুলনা করে না। তাই বলা যাবে না, “সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর দৃষ্টান্ত হলো— যেমন রাজা তার রাজ্যে।” বরং বলা হবে, “রাজার দৃষ্টান্ত তার রাজ্যে যেমন, আল্লাহর দৃষ্টান্ত তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তেমন।” কারণ তিনি প্রকাশিত বিষয়ের আয়ন; কিন্তু প্রকাশিত বিষয় তাঁর আয়ন নয়। প্রকাশের অবস্থায় যেমন তিনি জাহির, তেমনি তিনি বাতিনও।

এ কারণেই আমরা বলেছি, তিনি জিনিসগুলোর মতো; কিন্তু জিনিসগুলো তাঁর মতো নয়। কারণ জিনিসগুলো তাঁর আয়ন, কিন্তু তিনি জিনিসগুলোর আয়ন নন।

এটি এমন এক অচেনা ইলম, যা নিজের দেশ, পরিবার ও পরিচিত পরিসর থেকে দূরে পড়ে আছে। তাই বুদ্ধি একে অস্বীকার করে। কারণ, এটি বোধগম্য হলেও শরিয়তের প্রকাশ্য ভাষায় সরাসরি বলা হয়নি। আর এটিও আনওয়ারুল আনওয়ারের তাজাল্লির একটি নমুনা।

আর বস্তুগত উপাদান থেকে মুক্ত মাআনির নুরসমূহের কথা হলো— এগুলোর মধ্যে স্থানান্তর নেই। যদি এগুলো বস্তুগত উপাদানের মধ্যে স্থানান্তরিত হতো, তাহলে সেগুলো বস্তুগত ভাষা ও প্রকাশের স্তরে নেমে আসত। অথচ আমরা আগেই বলেছি, এগুলো নিজ সত্তায় বস্তুগত উপাদান থেকে মুক্ত। এর অর্থ এই নয় যে, এগুলো আগে বস্তুগত ছিল, পরে মুক্ত হয়েছে। কারণ যদি এমন হতো, তাহলে আমরা চাইলে সেগুলোকে আবার বস্তুগত রূপ দিতে পারতাম, আর সেগুলো তাতে বাধা দিত না। কিন্তু এগুলোর মধ্যে এমন এক বিশেষ জ্ঞান আছে, যা স্থানান্তরিত হয় না, ভাষায় পুরোপুরি বলা যায় না, বাহ্যিক হুকুমে বাঁধা পড়ে না, এবং কোনো তুলনা বা উপমাও গ্রহণ করে না।

রুহসমূহের নুর বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই সমন্বয়কারী পবিত্র রুহের নুর। এই রুহসমূহের মধ্য থেকে যাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়, তাকে মালাক তথা ফেরেশতা বলা হয়। আর যাকে পাঠানো হয় না, সে ‘রুহ’ নামেই থাকে। তবে তার একটি নিজস্ব পরিচায়ক নাম থাকে, যার মাধ্যমে প্রেরিত ও অপ্রেরিত দুই ধরনের রুহের মধ্যেই তাকে আলাদা করে চেনা যায়।

এটি খাঁটি রুহ। যে বিষয় তাকে নিজের সীমা থেকে বাইরে প্রকাশ করে, তার সঙ্গে এর কোনো সাদৃশ্য নেই। এটি এমন রুহ, যার নিজস্ব রুহানিয়ত আছে। এখানে মূলত উচ্চতর রুহসমূহই উদ্দেশ্য। আর আমাদের ব্যক্তিগত রুহগুলোর সঙ্গে এগুলোর কিছুটা সাদৃশ্য আছে। তাই রুহসমূহের নুরে তাজাল্লি ঘটে কেবল আফরাদ তথা বিশেষ একক বান্দাদের জন্য।

এ কারণেই হজরত খিজির হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন, وَكَيْفَ تَصْبِرُ عَلَى مَا لَمْ تُحِطْ بِهِ خُبْرًا – আর যে বিষয়ের অন্তর্নিহিত রহস্য আপনি পুরোপুরি জানেন না, সে বিষয়ে আপনি কীভাবে ধৈর্য ধরবেন?[22]

কারণ খিজির আফরাদের অন্তর্ভুক্ত। আর নবীদের ক্ষেত্রে তাজাল্লি ঘটে ফেরেশতাদের রুহসমূহের নুরে। এই তাজাল্লি আফরাদের জন্য নয়; বরং নবী ও রসুলদের জন্য বিশেষ। খিজিরের কথায়ও এই ইঙ্গিত আছে। তিনি যেন বলছেন, আপনি এমন এক জ্ঞানের ওপর আছেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিখিয়েছেন; আমি তা জানি না। কারণ তাঁর কাছে ওই মালাকি তাজাল্লি ছিল না। এরপর তিনি এ কথাও স্পষ্ট করলেন যে, তিনি যা করেছেন, নিজের সিদ্ধান্তে করেননি। কারণ যার নিজস্ব নির্দেশ নেই, সে আহলুল আমরের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি মাকামসমূহের মধ্যে এক বিস্ময়কর মাকাম।

যদি আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টির সামনে এই রহস্য খুলে বলার অনুমতি দিতেন, তাহলে এমন এক জ্ঞান প্রকাশ পেত, যা সৃষ্টিজগত বহন করতে পারত না। এর প্রভাব থেকে তিনটি বিষয় প্রকাশ পায়। প্রথমত, আল্লাহ তাঁর নবীর ন্যায়পরায়ণতা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, খিজির তাঁর অনুসারী হয়ে গেলেন। তৃতীয়ত, তিনি যা শুনেছিলেন, সেই শর্তের অধীনে নিজেকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন।

তিনি হজরত মুসা কালিমুল্লাহর মতো এক মহান সত্তার সঙ্গে ছিলেন। এখন দেখো, মুসা আলাইহিস সালামের রবের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আর খিজিরের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন; দুই জায়গায় তাজাল্লির ধরন কত ভিন্ন। তবু খিজির এই পার্থক্য দেখতে পেলেন না। কারণ তিনি শুরুতেই শর্ত দিয়ে নিয়েছিলেন; আর মুসা আলাইহিস সালাম যখন আপত্তি করলেন, তখন তিনি সেই শর্ত আগে থেকে সামনে আনেননি।

নবীর শান হলো অনুসরণ করা। তিনি অনুসৃত হোন বা অনুসরণকারী। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ – আমি তো শুধু সেই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহি করা হয়।[23] অর্থাৎ নবী নিজের পক্ষ থেকে কিছু করেন না, কিছু বলেন না; তিনি যা প্রত্যক্ষ করেন বা যা তাঁর প্রতি ওহি করা হয়, সেটিই অনুসরণ করেন। এভাবেই প্রত্যেক মাকামের নিজস্ব বক্তব্য ও নিজস্ব ভাষা থাকে।

আর বাতাসের নুরসমূহ হলো দূরবর্তী ইসমের তাজাল্লি। এগুলো এমন তাজাল্লি, যার নাম প্রকাশ করা উচিত নয়। এগুলো কেবল ইলহামের আহলের জন্য ঘটে। ফেরেশতাদের নুরে তাজাল্লির সঙ্গে এর এক ধরনের সম্পর্ক আছে; তবে সেটি ভেতরের দিক থেকে, বাহ্যিক দিক থেকে নয়।

বাহ্যিক দিক থেকে এগুলো বিশেষ ধরনের নুর। এগুলোর সম্পর্ক লাম্মাত তথা অন্তরে হঠাৎ আগত নেক ইশারা এবং ইলহামের ফেরেশতাদের সঙ্গে। এই তাজাল্লি নফসের ওপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে এবং কিছু সময় স্থায়ী হয়। এখান থেকেই খাওয়াতির তথা মনে উদিত ভাবনার জন্ম হয়। খাওয়াতির বাতাসের মতো— আসে, অতিক্রম করে, স্থির থাকে না। তাই কেউ যদি বলে এগুলো স্থায়ী, তাহলে তা আর রিহ বা চলমান বাতাস নয়। এ কারণেই এগুলোকে খাতির বলা হয়; কারণ তা মনে এসে চলে যায়। আর রায়িহ বলা হয় চলমান সুবাসকে; স্থির জিনিসকে রায়িহ বলা যায় না।

আর প্রকৃতির নুরে তাজাল্লি হলো রূপসমূহের যৌগিক তাজাল্লি। কোনো রূপে যতটুকু প্রকাশ ঘটে, এই তাজাল্লি সেই অনুযায়ী মারিফত দান করে। এর বিস্তার আকাশমণ্ডল থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম পোকামাকড় পর্যন্ত। এটিই আসমান ও আলমের ভেতর তাজাল্লি।

এই তাজাল্লির মাধ্যমে মাআনি, ভাষা, প্রত্যেক রূপের সালাত এবং প্রত্যেক সৃষ্টির তাসবিহ জানা যায়। এটি মহামূল্যবান, উপকারী ও শক্তিদানকারী কাশফ। এতে মুকাশিফ দেখে, জগতের সবকিছু এক গভীর সামঞ্জস্যে আছে; তারপর সে দেখে, বাহ্যিক বৈপরীত্যও আছে, কিন্তু সেটিও হাকিকতের বাইরে নয়। এখান থেকেই সে প্রত্যেক জিনিসকে তার নিজস্ব প্রশংসাসহ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করতে দেখে।

এই মাকামের অধিকারী নিজের আমলগুলোকেও মুশাহাদার জগতে রূপ ধারণ করতে দেখে। তার আমলগুলো আল্লাহর তাসবিহ পাঠকারী জীবন্ত রুহানি সত্তায় পরিণত হয়। সে এই মাকামে নিজের আমল থেকে উপকার পায়।

বাহ্যিক জগতে কোনো আমল যদি বিরোধিতা ও গুনাহর রূপেও দেখা যায়, তবু এই মাকামের মুশাহাদায় তা এক জীবন্ত, কথা বলা সত্তা হিসেবে প্রকাশ পায়, যা তার অধিকারীর জন্য ইস্তিগফার করে। কারণ সে তার সৃষ্টিগত রূপকে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে এনেছে। আল্লাহ নিজের প্রশংসা করেছেন এই বলে, خَلَقَ فَسَوَّى – তিনি সৃষ্টি করেছেন, তারপর সুবিন্যস্ত করেছেন।[24]

আর যে ব্যক্তি কোনো আমলের সৃষ্টিগত বিন্যাসকে ঠিকঠাক রাখে, সে কেবল তার সৃষ্টি-রূপকে ঠিক রাখে; কিন্তু এতে সে আমল গুনাহ হওয়া থেকে বের হয়ে যায় না। যদি সে আমলকে গুনাহ হওয়া থেকে বের করে দিত, তাহলে তা আর গুনাহ থাকত না, তার কর্তার জন্য দুর্ভাগ্যের কারণও হতো না। কিন্তু যখন কোনো হারাম কাজকে বৈধ মনে করা হয়, তখন সেই গুনাহের তাসবিহও তার কর্তার ওপর লানত হয়ে ফিরে আসে। কারণ সে আল্লাহর হারাম করা বিষয়কে হালাল মনে করেছে। ফলে সে ইমান থেকে বের হয়ে যায়। এরপর নতুন করে ইসলাম গ্রহণ ও তাওবা না করা পর্যন্ত ইসলামে তার কোনো অংশ থাকে না।

এটি একটি সতর্কতা; কিন্তু এই মাকামের অনেক সঙ্গী এখনো তা বুঝতে পারেনি। তারা নিজেদের দুর্বলতার কারণে তার প্রতি ঈর্ষা করে। অথচ তাকে সতর্ক করাই বেশি জরুরি। কারণ এটি আল্লাহর জন্য, তাঁর রসুলের জন্য, মুসলমানদের ইমামদের জন্য এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য নসিহত।

সুতরাং জেনে রাখো, মুমিনের ক্ষেত্রে কোনো গুনাহ কখনো সৃষ্টিগত বিন্যাসের বাইরে থাকে না। যে ব্যক্তি কোনোকিছুকে তার সৃষ্টিগত হক দেয়, সে ইলাহি সুন্নাহ অনুযায়ী চলে। কারণ আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসকে তার নিজস্ব সৃষ্টি-রূপ দিয়েছেন। তাই গুনাহেরও একটি সৃষ্টি-রূপ আছে, আনুগত্যেরও একটি সৃষ্টি-রূপ আছে। মুমিনের সিফাত হওয়া উচিত— সে প্রত্যেক জিনিসকে তার যথাযথ স্থানে চিনবে।

আর আসমার নুরসমূহের কথা হলো— এগুলো জ্ঞাত বিষয়গুলোর নাম নির্ধারণ করে। তাই এগুলো এমন নুর, যা জ্ঞাত বিষয় ও বিদ্যমান সত্তাগুলোর ওপর বিস্তৃত হয়। এই বিস্তারের কোনো শেষ নেই। আয়নও সেই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়। ফলে এই মাকামের অধিকারীর আয়নের নুরও বিস্তৃত হতে থাকে। তখন সে এমন জিনিস জানে, যার শেষ নেই। যেমন সংখ্যা দ্বিগুণ হতে হতে শেষ হয় না। এটি হকের দৃষ্টিতে দেখার একটি আলামত।

সব ‘আসমা’ই বিদ্যমান। কিন্তু যে-সব বিষয়ের নাম দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে কিছু এমন আছে, যার নিজস্ব কোনো আয়ন নেই; অর্থাৎ তার নিজের দিক থেকে তা অনস্তিত্বশীল। আবার কিছু এমন আছে, যা নিজের দিক থেকে অনস্তিত্বে আগে থাকে, তারপর অস্তিত্ব গ্রহণ করে। আর গালসমূহ এমন— নামের প্রয়োগ থাকলেও সেগুলো নিজে আলাদা অস্তিত্ব গ্রহণ করে না।

এ কারণে আসমা হলো ইহাতা তথা পরিবেষ্টনের বিষয়। আর পূর্ণ ইহাতা শুধু আল্লাহর জন্য, অন্য কারও জন্য নয়। ইলাহি আসমার মর্যাদা এখানেই: আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠ করেছেন আসমার ইহাতা দান করার মাধ্যমে। কারণ আসমা না থাকলে আমরা আল্লাহর কোনো উল্লেখ করতে পারতাম না, কোনো জিনিসের কথাও বলতে পারতাম না। আমরা আল্লাহকে কেবল আসমার মাধ্যমেই স্মরণ করি; কোনোকিছুকেও আসমার মাধ্যমেই স্মরণ করি। আমরা তাঁর হামদও আসমার মাধ্যমেই করি।

ইহাতার ক্ষেত্রে ইলমের সিফাতকে সবচেয়ে বেশি জায়গা দেয় কথা। আর প্রত্যেকটি শব্দই একেকটি নাম। নাম ছাড়া কোনো কথা হয় না। আসমা হলো চিহ্ন ও নির্দেশনা; তার নিচে থাকে অর্থসমূহ। যার সামনে আসমার নুর প্রকাশিত হয়, তার সামনে এমন কিছু প্রকাশিত হয়, যা ভাষায় বলা সম্ভব নয়।

যদি হক তায়ালা আদম আলাইহিস সালামের সিফাত বর্ণনা করতে গিয়ে সবকিছুর জন্য ‘আসমা’ শব্দ ব্যবহার না করতেন, (وَعَلَّمَ آدَمَ আর তিনি আদমকে শিক্ষা দিলেন) তাহলে আমাদের পক্ষে বলা অসম্ভব হতো যে, নামকৃত সত্তাগুলোর ওপর আসমার নুর বিস্তৃত হয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর এই কথার মাধ্যমে তা বুঝেছি। এরপর তিনি সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করে বললেন, أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ – তোমরা আমাকে এদের নামগুলো জানাও।[25]

এখানে আল্লাহ আমাদের ইঙ্গিত দিলেন, আদম আলাইহিস সালাম আদবের দাবি অনুযায়ী কীভাবে আচরণ করেছিলেন। আর এই সম্মানের মধ্যে ‘সব’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ কী উদ্দেশ্য করেছেন, সেটিও তিনি ইঙ্গিতের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন।

আর জন্মগ্রহণকারী সৃষ্টি, মূল উৎস, ইল্লত এবং আসবাবের নুরসমূহ হলো ইলাহি তাজাল্লি। কারণ যখন কোনোকিছু প্রভাব বিস্তার করে, এটিও ইলাহি তাজাল্লি। কেউ সাহায্য চাইলে সাড়া দেওয়া, কেউ ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করা, কেউ চাইলে দান করা; এসবও তাজাল্লির প্রকাশ। এই তাজাল্লির মাধ্যমেই এই নুরগুলো জানা যায়।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ – নিশ্চয় যারা আপনার বায়াত গ্রহণ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বায়াতই গ্রহণ করে।[26] আল্লাহ আরও বলেছেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ – যে রসুলের আনুগত্য করে, সে নিশ্চয় আল্লাহরই আনুগত্য করল।[27] আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّ الصَّدَقَةَ تَقَعُ بِيَدِ الرَّحْمَنِ – নিশ্চয় সদকা রহমানের হাতে পড়ে। তিনি আরও বলেছেন, وَأَقْرِضُوا اللهَ قَرْضًا حَسَنًا – আর তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও।[28]

নবী আলাইহিস সালাম বলেছেন, إِنَّ اللهَ يَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ – নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় আনন্দিত হন। অতএব হাকিকত এই আলোচনা থেকেই বুঝে নাও।[29]

 

সিতর: যা তোমাকে সেই বিষয় থেকে আড়াল করে, যা তোমাকে বিলীন করে দিত

وَاللهِ مَا تُسْدَلُ الأَسْتَارُ وَالكُلَلُ     إِلَّا مِنْ أَجْلِ الَّذِي تُحَظَّى بِهِ الْمُقَلُ

আল্লাহর কসম, পর্দা ও আবরণ নামানো হয় শুধু সেই বিষয়ের কারণে, যার দিকে চোখ আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

وَقَدْ يَكُونُ حِذَارًا مِنْ تَأَمُّلِهَا      أَوْ لِلَّذِي يَقْتَضِيهِ الطَّبْعُ وَالْمَلَلُ

কখনো এ পর্দা দেওয়া হয় গভীর দৃষ্টির ক্ষতি থেকে বাঁচাতে, আবার কখনো মানুষের স্বভাব ও ক্লান্তির দাবি মেনে।

إِذَا نَظَرْتَ الَّذِي يَحْوِيهِ مِنْ عِبَرٍ      أَسَاسُهَا قَامَتِ الأَعْرَاضُ وَالْمِلَلُ

যদি তুমি এর ভেতরের শিক্ষা ভালো করে দেখো, দেখবে— নানা অবস্থা ও নানা পথের ভিত্তি এর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

لَوْلَا السُّتُورُ الَّتِي تُخْفِي ضَنَائِنَهَا      لَمْ يُدْرَ مَا كَانَ لِي غَرَضٌ وَلَا أَمَلُ

যে-সব পর্দা তার গভীর গোপন বিষয়গুলো আড়াল করে রাখে, সেগুলো না থাকলে আমার উদ্দেশ্য ও আশা কোন দিকে, তা বোঝাই যেত না।

وَاللهِ مَا تُرْسَلُ الأَسْتَارُ وَالكُلَلُ     إِلَّا لِأَمْرٍ عَظِيمٍ خَطْبُهُ جَلَلُ

আল্লাহর কসম, পর্দা ও আবরণ নামানো হয় শুধু এক মহৎ বিষয়ের জন্য, যার গুরুত্ব অত্যন্ত বড়।

এই অংশটা সহজ করে এভাবে লেখা ভালো হবে:

সিতর হলো আল্লাহ বান্দাকে এমন এক আড়ালে রাখেন, যাতে সে হাকিকতের প্রবল প্রকাশ সরাসরি সহ্য করতে না হয়। মানুষ সাধারণত সৃষ্টিজগত, অভ্যাস, কারণ-উপকরণ এবং আমলের ফলাফলের স্তরেই থাকে। এগুলোই তার জন্য এক ধরনের পর্দা।

আগেই বলা হয়েছে, আসবাব তথা বাহ্যিক কারণ-উপকরণও আল্লাহর দেওয়া পর্দা। মানুষ এসব কারণের মাধ্যমেই চলে, কাজ করে, ফল পায় এবং জগতকে বুঝে। তাই এই পর্দাগুলো হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বরং সিতর উঠলেও তা সিতরের ভেতর দিয়েই ওঠে। অর্থাৎ বান্দা একেবারে সব পর্দা ভেঙে হাকিকতের সামনে দাঁড়িয়ে যায় না; বরং আল্লাহ ধীরে ধীরে, তার সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী তাকে উন্মুক্ত করেন।

সাধারণ মানুষের জন্য সিতর আল্লাহর রহমত। কারণ আল্লাহ জানেন, তাদের মধ্যে আদেশ অমান্য করার প্রবণতা আছে। তাই তাদের সতর্ক করা দরকার, জাগিয়ে দেওয়া দরকার, ভয় দেখানো দরকার এবং বিধি-নিষেধের মাধ্যমে বেঁধে রাখা দরকার। যদি তাদের ওপর থেকে সব পর্দা সরিয়ে দেওয়া হতো, তারা কাশফ ও তাজাল্লির ভার সহ্য করতে পারত না। তাই তাদের জন্য সিতর অপরিহার্য।

কিন্তু যারা ইলমি তাজাল্লির আহল, অর্থাৎ যাদের সামনে আল্লাহ বিশেষ জ্ঞানের আলো খুলে দিয়েছেন, তাদের অবস্থা ভিন্ন। তাদের কাছে নিষেধের অর্থ সাধারণ মানুষের মতো থাকে না। কারণ তারা নিষেধের বাইরের রূপে আটকে থাকে না; তারা জানে কোন কাজ কোন হাকিকত থেকে প্রকাশ পাচ্ছে। তাঁদের অবস্থায় তাঁদের মাধ্যমে যে কাজ প্রকাশ পায়, তা সাধারণ মানুষের ইচ্ছাকৃত কাজের মতো নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া বিশেষ জ্ঞান ও অবস্থার অধীনে ঘটে। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে সেই কাজের হুকুম সাধারণ মানুষের মতো হয় না।

এই অর্থের কাছাকাছি একটি সহিহ বর্ণনায় এসেছে, এক বান্দা গুনাহ করল। তারপর সে বুঝল তার এমন এক রব আছেন, যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং চাইলে গুনাহের কারণে পাকড়াওও করেন। তখন আল্লাহ তাকে বলেন, اعْمَلْ مَا شِئْتَ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكَ – তুমি যা ইচ্ছা করো; আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

এখানে উদ্দেশ্য এই নয় যে, গুনাহকে সাধারণভাবে বৈধ করে দেওয়া হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, যে বান্দা আল্লাহর ক্ষমা, পাকড়াও, নিজের দুর্বলতা এবং রবের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক সত্যভাবে চিনে নিয়েছে, তার অবস্থা সাধারণ গাফেল মানুষের মতো নয়। তার ওপর আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার একটি বিশেষ তাজাল্লি প্রকাশ পেয়েছে।

এটি এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যার সিফাত এই অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। তাই তার জন্য এমন কিছু বৈধ হয়, যা অন্যের জন্য নিষিদ্ধ থাকে। আর যেটি তার ওপর নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে, সেটি করতে তাকে আদেশ করা অসম্ভব। কারণ আল্লাহ অশ্লীলতার আদেশ করেন না। সুতরাং নিষেধের আহলদের জন্য সিতরের পর্দা নামানো হলো। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এর হুকুম এটাই।

আর খাসদের ক্ষেত্রে কবির কথা হলো—

فَأَنْتَ حِجَابُ الْقَلْبِ عَنْ سِرِّ غَيْبِهِ     وَلَوْلَاكَ لَمْ يُطْبَعْ عَلَيْهِ خِتَامُهُ

তুমিই হৃদয়ের সামনে তার গায়েবি রহস্যের পর্দা; তুমি না থাকলে তার ওপর সিলমোহর বসত না।

অতএব আল্লাহ তোমার নিজের সত্তাকেই তোমার ওপর তাঁর সিতরের রূপ করে দিয়েছেন। এই সিতর না থাকলে তুমি তাঁর সম্পর্কে আরও ইলম চাইতে না। তুমি নিজেই বক্তা, আবার নিজেই সম্বোধিত। তবে তা ঘটে সেই রূপের পর্দার আড়াল থেকে, যে রূপের মাধ্যমে তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলেন।

তাই নিজের মানবসত্তার দিকে তাকাও। দেখবে, সেটিই তোমার সিতরের আয়ন। এর আড়াল থেকেই তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলেছেন। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ – কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন ওহির মাধ্যমে ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল থেকে।[30]

তিনি কখনো তোমার ভেতর থেকেই তোমার সঙ্গে কথা বলেন। তখন তুমি নিজেই নিজের জন্য পর্দা, আর তোমার ওপর তাঁর সিতর। তোমার পক্ষে নিজের মানব-অবস্থা থেকে বের হয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ তুমি নিজ সত্তায় মানুষ। কোনো হালে তুমি নিজের থেকে অনুপস্থিত হয়ে গেলে, অথবা ফানা হয়ে গেলে, তবু তোমার মানবসত্তার আয়ন স্থির থাকে।

তাই সিতরের পর্দা সবসময় নামানো থাকে। চোখ কখনো সিতর ছাড়া কিছু দেখে না; কারণ চোখ কোনো রূপ ছাড়া অন্য কিছুর ওপর পড়ে না। এর কারণ হলো, উলুহিয়্যাতের দাবি— গাইরতও, রহমতও।

গাইরত এই কারণে যে, আল্লাহ চান না কেউ তাঁকে এমনভাবে উপলব্ধি করুক, যেন সে তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। কারণ যে কোনোকিছুকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করে, সে যেন তাকে নিজের বোধের পরিধির মধ্যে এনে ফেলে। অথচ আল্লাহ বলেছেন, بِكُلِّ شَيْءٍ مُحِيطٌ – তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। যিনি নিজেই পরিবেষ্টনকারী, তাঁকে কেউ পরিবেষ্টন করতে পারে না।

আর রহমতের দিক হলো, আল্লাহ জানেন, সৃষ্ট বস্তুসমূহ তাঁর মুখমণ্ডলের সুবুহাতের সামনে টিকে থাকতে পারে না; বরং তাতে পুড়ে যায়। তাই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি রহমতস্বরূপ তাদের ওপর সিতর দিয়েছেন।

এরপর আল্লাহ জগতবাসীর জন্য তাদের আমলের ফলাফলের পর্দাও নামিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে এমন আমল করবে, তার জন্য এমন ফল হবে। এতে আমলকারী ফলাফলের জায়গায় এসে থেমে যায়। তবে যদি সে খাসদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে ফলাফলের প্রতি তার কোনো আসক্তি থাকে না। সে ফলাফল দেখতে চায় শুধু এ জন্য, যাতে তার আমল শুদ্ধ হয়েছে কি না বুঝতে পারে এবং তার প্রভু যে কাজ তার ওপর অর্পণ করেছেন, সেটিকে প্রত্যক্ষ করতে পারে।

এভাবে সহজ করলে সাধারণ পাঠক ভালো বুঝবে:

কিন্তু সাধারণ মানুষ আমলের ফলাফলের দিকেই বেশি তাকায়। তারা ভাবে, এই আমল করলে কী পুরস্কার পাব, কী ফল পাব। ফলে তাদের মন ফলাফলে আটকে যায়। আর খাস বান্দাদের দৃষ্টি ফলাফলে আটকে থাকে না। তারা আমলের মধ্যে কিছু আলামত দেখতে চান আমলটি আল্লাহর কাছে শুদ্ধ হলো কি না, তারা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে আদায় করলেন কি না। কারণ তাঁদের মূল লক্ষ্য পুরস্কার নয়; তাঁদের লক্ষ্য হলো আল্লাহ যে দায়িত্ব তাঁদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সেটি যথাযথভাবে পালন করা। আর সেই দায়িত্বই হলো তাঁদের ওপর অর্পিত আমল।

কখনো আল্লাহ সিতর নামিয়ে দেন বান্দাকে রক্ষা করার জন্য। যেমন তীব্র আলো থেকে চোখকে বাঁচাতে পর্দা দরকার হয়, তেমনি হাকিকতের প্রবল প্রকাশ থেকেও বান্দাকে আড়াল দরকার হয়। আল্লাহর মুখমণ্ডলের দাহনকারী দীপ্তি যদি সরাসরি প্রকাশ পায়, তাহলে মুমকিন সত্তাগুলো তা সহ্য করতে পারবে না; তাদের অস্তিত্বই জ্বলে যাবে। তাই সিতর এখানে শাস্তি নয়, বরং রহমত ও সুরক্ষা।

আর কিছু মানুষ আছে, যাদের আল্লাহ-সম্পর্কিত ইলমে দৃঢ় পদক্ষেপ নেই। তারা জানে না, আল্লাহ প্রতি নিঃশ্বাসে নতুন তাজাল্লি করেন; কোনো তাজাল্লিই প্রথম তাজাল্লির একই রূপে থাকে না। যখন এই উপলব্ধি তাদের থেকে আড়াল হয়ে যায়, তখন তারা কোনো একটি তাজাল্লির সঙ্গে লেগে থাকে। তার মুশাহাদা দীর্ঘ হয়; তারা সেটিকে আঁকড়ে ধরে এবং তার পূর্ণ হাকিকত চাইতে থাকে। তখন তাদের মধ্যে ক্লান্তি ও বিরক্তি আসে।

এই মাকামে বিরক্তি হলো ইলাহি দরবারের আদবহীনতা। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, بَلْ هُمْ فِي لَبْسٍ مِنْ خَلْقٍ جَدِيدٍ – বরং তারা নতুন সৃষ্টির ব্যাপারে সংশয়ে আছে।[31]

প্রতি নিঃশ্বাসে নতুন সৃষ্টি ঘটছে, অথচ তারা মনে করে বিষয়টি বদলায় না। তাই এই বিরক্তির কারণে (যা শেষ পর্যন্ত আদবহীনতার দিকে নিয়ে যায়) আল্লাহ তাদের ওপর সিতর নামিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি তাদেরকে এই ইলম থেকে বঞ্চিত রেখেছেন।

তারা ভাবে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে তারা একই আছে। বাস্তবে তারা তাদের জাওহারের দিক থেকে একই, কিন্তু যে-সব অবস্থায় তারা গুণান্বিত হয়, সে দিক থেকে একই নয়। তুমি বলো না, বিষয়টি এমন নয়। কারণ এটি ইলাহি রহস্যসমূহের একটি। আল্লাহ বহু আহলুল্লাহকেও, যাঁরা কাশফের ফুতুহাতের অধিকারী, এই রহস্য উপলব্ধি করা থেকে আড়াল করে রেখেছেন। তাহলে অন্যদের অবস্থা কেমন হবে?

সুতরাং সিতর অবশ্যই দরকার; কারণ তোমার থাকা-ও অবশ্যই দরকার। তাই বুঝে নাও। আল্লাহই সত্য বলেন, আর তিনিই পথ দেখান।[32]

সবমিলিয়ে বলা যায়, সিতর ও তাজাল্লি একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া অপরটি অর্থহীন। তাজাল্লি ছাড়া সিতর হতো শুধু বঞ্চনা, আর সিতর ছাড়া তাজাল্লি হতো বিনাশ। ইমাম কুশাইরি দেখিয়েছেন সিতর কীভাবে রহমতে রূপ নেয়। সোহরাওয়ার্দি তিনটি স্তরের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে আদব থেকে মুশাহাদা পর্যন্ত যাত্রা হয়। আর ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরভাবে দেখিয়েছেন, নুরের অসংখ্য রূপ কীভাবে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে এবং সিতর কীভাবে গাইরত ও রহমতের যুগ্ম প্রকাশ। বলা যায়, সিতর ও তাজাল্লি সুফি সাধনার সেই ভারসাম্য, যেখানে আল্লাহ বান্দাকে কখনো প্রকাশ করেন, কখনো আড়াল করেন। উভয়ই তাঁর গভীর রহমতের প্রকাশ। বান্দার কাজ হলো এই দুই অবস্থার মাঝেই নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করা।