সুফি সাধনার পথে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে বোঝানোর জন্য তিনটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়— জওক, শুর্ব ও রিই। এই তিনটি শব্দ মূলত একটি যাত্রার তিনটি ধাপ। জওক মানে আধ্যাত্মিক আস্বাদন। যখন প্রথমবারের মতো আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতি অন্তরকে স্পর্শ করে। শুর্ব মানে পান করা। যখন সেই আস্বাদন আর মুহূর্তের জন্য নয়; বরং সাধক তাতে ডুবতে শুরু করেন। আর রিই মানে তৃপ্তি। যদিও এই প্রশ্নটি নিয়েই সুফিদের মাঝে সবচেয়ে গভীর বিতর্ক।
বায়েজিদ বোস্তামি বলেছেন, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ যদি প্রেমের শরাব হয়ে যায় এবং কেউ তার পুরোটা পান করে, তবুও সে তৃষ্ণার্তই থাকবে। আর ইয়াহইয়া ইবনে মুয়াজ মনে করতেন একটি পেয়ালাতেই তৃপ্তি সম্ভব। এই দুই মতের মাঝে নিহিত আছে আধ্যাত্মিক সাধনার এক গভীর সত্য। যুগে যুগে মনীষীরা এই তিনটি অবস্থার রহস্য উন্মোচন করেছেন।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি বলেছেন, জওক হলো আধ্যাত্মিক সাধনার প্রথম ধাপ, শুর্ব দ্বিতীয় এবং রিই চূড়ান্ত ধাপ। নফসের বিশুদ্ধতা জওকের যোগ্যতা তৈরি করে, আধ্যাত্মিক মঞ্জিলে পূর্ণতা শুর্বের দরজা খোলে, আর নিরবচ্ছিন্ন সাধনা রিই-এর দাবি রাখে। জওক ও শুর্বের অধিকারী সাধক মত্ততায় থাকেন, রিই-এর অধিকারী পরম সচেতন থাকেন। বায়েজিদ-ইয়াহইয়ার পত্রালাপের ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত সাধকের তৃষ্ণা কখনো মেটে না, সমগ্র সৃষ্টিজগৎ শরাব হলেও তিনি আরও চান।
সুফি সাধকদের আলোচনায় ‘জওক’ তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদন ও ‘শুর্ব’ তথা পান করা শব্দ দুটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তারা এই শব্দগুলো দিয়ে মূলত তাদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিভিন্ন ধাপকে তুলে ধরেন। তাদের সাধনায় প্রাপ্ত ঐশ্বরিক আলোকচ্ছটা (তাজাল্লি), আধ্যাত্মিক উন্মোচন (কাশফ) এবং হৃদয়ে উদিত ঐশ্বরিক ইঙ্গিত (ওয়ারিদাত)-এর সমষ্টি থেকেই এই অভিজ্ঞতার জন্ম হয়। আধ্যাত্মিক সাধনার প্রথম ধাপ হলো জওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদন, দ্বিতীয় ধাপ শুর্ব তথা পান করা এবং চূড়ান্ত ধাপ হলো রিই তথা তৃপ্তি।
সাধকদের নফসের বিশুদ্ধতা তাদের মধ্যে জওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদনের যোগ্যতা তৈরি করে। এরপর আধ্যাত্মিক মঞ্জিলগুলোতে তারা যখন পূর্ণতা লাভ করেন, তখন তাদের মধ্যে শুর্ব তথা পান করার অবস্থা তৈরি হয়। আর এই সাধনার ধারা যখন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তখন তা রিই তথা তৃপ্তির দাবি রাখে। তাই জওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদন ও শুর্ব তথা পান করার অধিকারী সাধক আধ্যাত্মিক নেশায় বিভোর থাকেন, আর রিই তথা তৃপ্তির অধিকারী সাধক পরম সচেতন অবস্থায় থাকেন।
যার ভালোবাসা প্রবল, তার শুর্ব তথা পান করার অভিজ্ঞতাও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই অবস্থা যখন সাধকের মধ্যে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা তাকে আর মাতাল করতে পারে না। বরং সে সত্যের সাথে এমনভাবে যুক্ত হয় যে, সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে এবং বাহ্যিক কোনোকিছুই তাকে আর প্রভাবিত করতে পারে না, তার অবস্থার কোনো পরিবর্তনও ঘটে না।
যার রহস্য বা অন্তর বিশুদ্ধ হয়ে যায়, তার জন্য শুর্ব তথা পান করা ভারী মনে হয় না। শুর্ব যখন তার জীবনের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যে পরিণত হয়, তখন সে তা থেকে কখনো বিচ্যুত হয় না। সাধকরা এভাবেই তাদের আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রকাশ করতে গিয়ে আবৃত্তি করতেন—
إِنَّمَا الْكَأْسُ رَضَاعٌ بَيْنَنَا
فَإِذَا مَا لَمْ نَذُقْهَا لَمْ نَعِشْ
“পেয়ালাটি কেবল আমাদের মধ্যে শিশু কর্তৃক মায়েল দুধ পানের মতো,
তাই আমরা যদি তা আস্বাদন না করি তবে আমরা বাঁচতে পারব না।”
তারা আরও আবৃত্তি করতেন—
شَرِبْتُ الْحُبَّ كَأْساً بَعْدَ كَأْسٍ
فَمَا نَفِدَ الشَّرَابُ وَلَا رَوِيتُ
“আমি ভালোবাসা পান করেছি পেয়ালার পর পেয়ালা,
কিন্তু পানীয় ফুরিয়ে যায়নি আর আমিও তৃপ্ত হইনি।”
বর্ণিত আছে যে, ইয়াহইয়া ইবনে মুয়াজ আর-রাজি হজরত বায়েজিদ বোস্তামির কাছে পত্র লিখেছিলেন— এখানে সেই ব্যক্তির ফয়সালা কী, যে এমন পেয়ালা পান করেছে যার পর সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।
এ প্রসঙ্গে বায়েজিদ বোস্তামি উত্তর লিখেছিলেন, “আমি তার দুর্বলতা দেখে বিস্মিত! এখানে এমন ব্যক্তিও আছে, যে সৃষ্টিজগতের মহাসমুদ্র পান করেও আরও বেশি তৃষ্ণা অনুভব করে।”
জেনে রাখুন, নৈকট্যের পেয়ালাগুলো অদৃশ্যের জগত থেকে প্রকাশিত হয়, আর তা কেবল সেই সব পবিত্র রহস্যের ওপরই পরিবেশন করা হয় যা দাসত্ব থেকে মুক্ত, এবং সেই আত্মাগুলোর জন্য, যা বিষয়বস্তুর দাসত্ব থেকে স্বাধীন।[1]
দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
দাতা গঞ্জে বখশ শুর্ব ও জওকের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য করেছেন। শুর্ব কেবল শান্তি ও স্বস্তির অনুভূতির নাম, কিন্তু জওক কষ্ট ও আনন্দ উভয় অবস্থায়ই ব্যবহৃত হয়। শুর্ব ছাড়া মুরিদের পথ চলা কঠিন, আর আরিফের মারেফতের স্বাদ তাঁকে আরও উপরে নিয়ে যায়। কোরআনের আয়াত দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, শুর্ব আনন্দের ক্ষেত্রে আর জওক কখনো কখনো জাহান্নামের শাস্তির ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে, তাই জওকের পরিধি শুর্বের চেয়ে বিস্তৃত।
শুর্ব: ইবাদত ও আনুগত্যের মিষ্টতা, আজমত তথা মহত্ত্ব ও বুজুর্গির স্বাদ এবং উনস তথা আল্লাহর প্রতি নিবিড় আত্মিক ভালোবাসা ও মহব্বতের খুশি লাভ করার নামই হলো ‘শুর্ব’। শুর্ব-এর স্বাদ ছাড়া মানুষ কোনো কাজই করতে পারে না। যেভাবে শরীরের জন্য পানি ও খাদ্যের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি রুহের জন্য জিকির ও ইবাদতের প্রয়োজন। তবে শরীর ও রুহ উভয়ই কেবল তখনই কাজ করে, যখন তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত স্বাদ লাভ করতে পারে। আমার শায়খ বলতেন যে, মুরিদ ও আরিফ ব্যক্তি শুর্ব তথা আধ্যাত্মিক সুধাপান ছাড়া মা’রিফাত তথা খোদায়ি জ্ঞান এবং ইরাদাত তথা আধ্যাত্মিক সংকল্প থেকে উদাসীন বা বেগানা হয়ে যান। কারণ, মুরিদের জন্য শুর্ব-এর স্বাদ লাভ করার মাধ্যমেই ইরাদাত এবং আল্লাহর অন্বেষার পথ সুগম ও মসৃণ হয়। আর আরিফ ব্যক্তিও যখন আল্লাহর মা’রিফাত তথা আধ্যাত্মিক পরিচয়ের স্বাদ লাভ করেন, তখন তিনি এমন এক পরম শান্তি ও সুকুন অনুভব করেন, যা তাঁর আত্মিক উন্নতি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
জওক: ‘জওক’-ও মূলত শুর্ব-এর মতোই একটি অবস্থা। তবে বিশেষ পার্থক্য হলো, শুর্ব কেবল শান্তি ও স্বস্তির ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে, জওক শব্দটি রঞ্জ তথা কষ্ট এবং রাহাত তথা স্বস্তি উভয় অবস্থাতেই সমানভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমনটি একজন আরিফ ব্যক্তি বলেছেন, “আমি মিষ্টতার স্বাদও আস্বাদন করেছি, আবার মুসিবতের স্বাদও আস্বাদন করেছি এবং শান্তির স্বাদও আস্বাদন করেছি।” এই কথাটি পুরোপুরি যথার্থ। এরপর তারা শুর্ব-এর ব্যাপারে সম্পর্কযুক্ত করে বলেন যে, “মিলনের পেয়ালা দ্বারা এবং মহব্বতের পেয়ালা দ্বারা পান করেছি।” এই ধরনের আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। যেমন পবিত্র কুরআনের বাণীতে এর প্রমাণ মেলে।
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا – তোমরা তৃপ্তিসহকারে খাও এবং পান করো।[2] আর যখন জওক শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে, তখন ইরশাদ হয়েছে ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ – স্বাদ আস্বাদন করো! নিশ্চয়ই তুমি তো সেই সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।”[3] একইভাবে আল্লাহ তায়ালা অন্য স্থানে ইরশাদ করেছেন ذُوقُوا مَسَّ سَقَرَ – তোমরা জাহান্নামের আগুনের স্পর্শের স্বাদ আস্বাদন করো।[4]
ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম সোহরাওয়ার্দি অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু গভীরভাবে বলেছেন, জওক হলো ইমান, শুর্ব হলো ইলম, আর রিই হলো হাল। জওক পায় যারা প্রাথমিক আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত লাভ করে, শুর্ব পায় যারা আধ্যাত্মিক জ্যোতির বিভিন্ন স্তর প্রত্যক্ষ করে, আর রিই পায় যারা স্থায়ী আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, হাল তখনই হাল, যখন তা স্থায়ী হয়, স্থায়িত্ব না এলে তা কেবল ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলকানি মাত্র, হাল নয়।
তিনি বলেন, জওক হলো ইমান, শুর্ব হলো ইলম, আর রিই হলো হাল।
অতএব, জওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদন তাদের জন্য, যারা বাওয়াদি তথা প্রাথমিক আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত লাভ করে। শুর্ব তথা পান করা তাদের জন্য, যারা তওয়ালি তথা উদীয়মান আলোকচ্ছটা, লাওয়ামি তথা চমকপ্রদ জ্যোতি এবং লাওয়া-ইহ্ তথা স্পষ্ট সংকেতসমূহ প্রত্যক্ষ করে। আর রিই তথা তৃপ্তি হলো আরবাবে আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থাসমূহের অধিকারীদের জন্য। এই আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থাসমূহ হলো এমন, যা স্থির থাকে; সুতরাং যা স্থির থাকে না তা হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা নয়, বরং তা হলো লাওয়ামি তথা চমকপ্রদ জ্যোতি এবং তওয়ালি তথা উদীয়মান আলোকচ্ছটা।
বলা হয়েছে, হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা কখনো স্থির থাকে না, কারণ তা পরিবর্তনশীল; আর যখন তা স্থির হয়, তখন তা মাকাম তথা আধ্যাত্মিক স্তরে পরিণত হয়।[5]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি সবচেয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে জওক হলো তাজাল্লির প্রারম্ভিক স্তর, দুই বা ততোধিক দম স্থায়ী হলে শুর্ব, আর রিই নিয়ে সুফিদের মধ্যে মতভেদ আছে। শুর্বকে তিনি চার প্রকার পানীয়ের সাথে তুলনা করেছেন। পানি, দুধ, মধু ও শরাব; যা চার প্রকার ইলমের প্রতীক। রিই সম্পর্কে তাঁর মত হলো, প্রকৃত তৃপ্তি সম্ভব নয়; কারণ আল্লাহর ইলম অসীম, আর অসীমের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই তৃষ্ণা চিরকালীন। নবীজির দোয়া “রাব্বি জিদনি ইলমা” এই তৃষ্ণার চিরন্তন প্রমাণ।
لكلِّ مبدإٍ متجلّى في تجلّيهِ
ذوقٌ يُنبئُ عن معنى تخلّيهِ
প্রত্যেক প্রারম্ভিক স্তরের জন্য তার তাজাল্লির মাঝে একটি প্রকাশস্থল রয়েছে, তা মূলত জওক; যা তার যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার তাৎপর্য জানিয়ে দেয়।
إنّ التجلّي بالأسماء يحكمها
وذلك الحكمُ من أعلى تولّيهِ
নিশ্চয় আসমা তথা খোদায়ি নামসমূহের মাধ্যমে যে তাজাল্লি ঘটে, তা সবকিছুর ওপর হুকুম জারি করে; আর সেই হুকুম বা কর্তৃত্ব হলো তাঁর সর্বোচ্চ অভিভাবকত্বের অনন্য নিদর্শন।
إذا تدلّى إلى أمرٍ يُبعثُ له
كان الدنوُّ إلينا في تدلّيهِ
যখন তিনি তাঁর কোনো বিশেষ অভিপ্রায়ের দিকে অবতীর্ণ হন যা তাঁর সমীপে প্রকাশ পায়, তখন তাঁর সেই অবতীর্ণ হওয়ার মাঝেই আমাদের প্রতি তাঁর পরম নৈকট্য প্রকাশ পায়।
لمّا تلقّاه قلبي في منازلهِ
كان الترقّي به إلى تجلّيهِ
যখনই আমার অন্তর তাঁর সেই দানকে তার আধ্যাত্মিক মনজিলসমূহে গ্রহণ করেছে, তখনই এর মাধ্যমে তাঁর তাজাল্লির দিকে অন্তরের সুউচ্চ আত্মিক উন্নতি ঘটেছে।”
জেনে রাখুন, সুফিদের মতে, ‘জওক’ হলো তাজাল্লির প্রারম্ভিক স্তরসমূহের প্রথম স্তর, যা বান্দার অন্তরে আকস্মিকভাবে অবতীর্ণ এক আধ্যাত্মিক অবস্থা। অতঃপর যদি বান্দা এই অবস্থায় দুই বা ততোধিক দম পর্যন্ত অবস্থান করে, তবে তা ‘শুর্ব’ নামে অভিহিত হয়। আর এই শুর্ব-এর পর ‘রিই’ বা পূর্ণ তৃপ্তি আসে কি না, তা নিয়ে সুফিদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
সুফিদের কারো কারো পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (কোনো এক সুফি) সুধাপান করেছেন এবং তৃপ্ত বা পরিচ্ছন্ন হয়েছেন, যার ফলে তাঁর থেকে এই আধ্যাত্মিক তৃপ্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। আবার হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রিই তথা পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করা অসম্ভব। আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ আধ্যাত্মিক অবস্থা অনুযায়ী কথা বলেছেন। এই পথের পথিক আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক মতের প্রবক্তাদের কথাই আমাদের নিকট স্ব-স্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক। এই মাসআলার বিস্তারিত বিবরণ আল্লাহ তায়ালা চাহেন তো সামনে শুর্ব-এর অধ্যায়ে কিংবা রিই-এর অধ্যায়ে অথবা রিই না থাকার অধ্যায়ে আসবে, যদি আল্লাহ তায়ালা তা আলোচনা করার তৌফিক দেন। সুতরাং, এই কিতাবের শেষদিকের অধ্যায়গুলোতে আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও আলোচনা করব।
জেনে রাখুন, সুফিদের এই বাণী— “তাজাল্লির প্রারম্ভিক স্তরসমূহের প্রথম স্তর”-এর অর্থ হলো, প্রতিটি তাজাল্লির জন্যই একটি প্রারম্ভিক সূচনা রয়েছে, আর তা-ই হলো সেই তাজাল্লির জওক। আর এটি কেবল তখনই ঘটে, যখন সেই খোদায়ি প্রকাশটি কোনো আকৃতি বা সুরতের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে কিংবা আসমায়ে ইলাহিয়্যাহ তথা খোদায়ি নামসমূহের মাঝে অথবা আসমায়ে কাওনিয়্যাহ তথা মহাজাগতিক নামসমূহের মাঝে প্রকাশ পায়, এর বাইরে নয়।
সুতরাং তাজাল্লি যদি কোনো বিশেষ অর্থে বা তত্ত্বে ঘটে, তবে মানুষ সেই তত্ত্বের প্রারম্ভিক স্তর থেকে ধীরে ধীরে একটি হুকুম বা জ্ঞানগত ফায়দা লাভ করে। যেভাবে সে সেই সুরতের অর্থসমূহ থেকে ফায়দা লাভ করে থাকে, যা তার মাঝে তাজাল্লি লাভ করে, কিংবা যেভাবে সে খোদায়ি নামসমূহের অর্থাবলি থেকে ফায়দা লাভ করে থাকে। অতঃপর সে সেই প্রারম্ভিক স্তরে এমন কিছু দেখতে পায় না, যা সেই নামের পরে প্রকাশ পাওয়ার কথা।
আর যিনি কেবল মূল অর্থের অধিকারী, তাঁর কাছে প্রতিটি বিষয়ের প্রারম্ভিক স্তরই প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, ফলে তিনি এর পরে আর কোনো নতুন পূর্ণাঙ্গ ফায়দা বা ‘ইফাদাতুল কুল্লিয়্যাহ’ লাভ করেন না। আর তাঁর সেই অবস্থা প্রকাশের ক্ষেত্রেই এই কিতাবের শুরুতে বর্ণিত আমাদের এই বক্তব্যটি প্রযোজ্য হবে—
حَتَّى بَدَتْ لِلْعَيْنِ سُبْحَةُ وَجْهِهِ وَإِلَى هَلُمَّ لَمْ تَكُنْ إِلاَّ هِيَ
অবশেষে চর্মচক্ষের সামনে তাঁর সত্তার পরম পবিত্র আলোকরশ্মি উদ্ভাসিত হলো, আর এখন পর্যন্ত সেই পরম সত্তা ছাড়া আর কোনোকিছুরই অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই।
ফলে প্রতিটি বিষয়ের প্রারম্ভিক স্তরটিই ছিল স্বয়ং সেই মূল সত্তা। আর এর পরে আমরা যা কিছু নিয়ে আসব, তা মূলত আমাদের সমস্ত বক্তব্যের মাঝেই সেই একক সত্তার বিস্তারিত বিবরণ মাত্র। আর এটিই হলো সেই সামগ্রিক বা কুল্লি বিষয়; যা এই একক সত্তার ভেতরেই অন্তর্নিহিত রয়েছে। এই কারণেই অধিকাংশ মানুষ এই সত্যের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। আর এই সূক্ষ্ম রহস্যের কারণেই তাদের কথাবার্তার মাঝে কোনো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বা সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ যিনি প্রকৃত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তিনি এমন এক মূল উৎসের সন্ধান করেন যেখানে গিয়ে তাঁদের সমস্ত বক্তব্য একবিন্দুতে মিলিত হয়। ফলে তিনি আর বিভ্রান্ত হন না।
আমাদের সমস্ত কথা ও বক্তব্য একটি অপরটির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত, কারণ এর মূল উৎস এক ও অভিন্ন। আর এটি সেই ব্যক্তির বিস্তারিত বিবরণ মাত্র, যিনি আমাদের এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে পারবেন, তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের বিন্যাস ও সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতার মধ্যকার চমৎকার যোগসূত্র অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। তিনি দুটি আয়াতের মধ্যকার সামগ্রিক যোগসূত্র খুব সহজেই ধরতে পারবেন, যদিও আপাতদৃষ্টিতে বাহ্যিক অবয়বে তাদের মধ্যে কোনো মিল দেখা যায় না। তবে এই সত্য অনুধাবনের জন্য অবশ্যই খোদায়ি নামসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক মিল বা الجامع بين الاسمين খুঁজে বের করা আবশ্যক। আর এই বিশেষ জ্ঞানই পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াতকে তার পার্শ্ববর্তী আয়াতসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ অবদান রাখে। কারণ পুরো কুরআনই খোদায়ি সুনিপুণ বিন্যাসের অনন্য নিদর্শন।
আমি আজ পর্যন্ত কেবল ব্যাকরণবিদ রুমানি ছাড়া অন্য কোনো মানুষকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করতে দেখিনি। তিনি কুরআনের তাফসির করতে গিয়ে এই বিশেষ পদ্ধতিটি অবলম্বন করেছেন বলে আমাকে জানানো হয়েছে, যদিও আমি নিজে তাঁর সেই কিতাবটি দেখার সুযোগ পাইনি। তবে আমি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মরক্কোর মারাক্কেশ শহরের বাসিন্দা আবু আব্বাস আল-সাবতি (রহ.)-কে দেখেছি, যিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই বিশেষ আধ্যাত্মিক পথটি অনুসরণ করতেন এবং তিনি ছিলেন মিজান তথা আধ্যাত্মিক ভারসাম্যের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
অতঃপর জেনে রাখুন: রূপ বা সুরতের পার্থক্যের কারণে জওক বা আধ্যাত্মিক আস্বাদনও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কেননা খোদায়ি প্রকাশ বা তাজাল্লি যদি বাহ্যিক সুরতসমূহের মাঝে ঘটে, তবে সেই জওক হয় খেয়ালি বা কল্পনানির্ভর। আর তা যদি আসমায়ে ইলাহিয়্যাহ তথা খোদায়ি নামসমূহ এবং আসমায়ে কাওনিয়্যাহ তথা মহাজাগতিক নামসমূহের মাঝে ঘটে, তবে সেই জওক হয় আকিল বা বুদ্ধিভিত্তিক। সুতরাং খেয়ালি জওক মানুষের নফসের ওপর নিজের গভীর প্রভাব বিস্তার করে, আর বুদ্ধিভিত্তিক জওক নিজের প্রভাব বিস্তার করে অন্তরের ওপর।
নফসের এই জওকই মূলত মানুষের ওপর শারীরিক মুজাহাদাসমূহের হুকুম বা ফল দান করে থাকে, যা ক্ষুধা, পিপাসা, রাত্রি জাগরণ বা কিয়ামুল লাইল, জিকর বা জিহ্বার স্মরণ, কুরআন তিলাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ এবং আল্লাহর পথে জিহাদের মাধ্যমে অর্জিত হয়। মানুষের হাতের সমস্ত ধনসম্পদ বিলিয়ে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। যদি সে নিঃসঙ্গ হয় এবং তার কোনো পরিবার না থাকে, আর তার কোনো পথপ্রদর্শক বা শায়খও না থাকে, তবে সে নফসের এই জাওকের অধীনেই পরিচালিত হয়। কিন্তু যদি সে এমন কোনো মর্যাদাবান ও নীতিমান শায়খের অধীনে থাকে যিনি তাকে আধ্যাত্মিক তরবিয়ত বা দীক্ষা দান করেন, তবে সে তার নিজের হাতের সমস্ত সম্পদ সেই শায়খের সামনে সমর্পণ করবে। এর ফলে সে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকেই পুরোপুরি নিজের মালিকানামুক্ত হয়ে যাবে এবং তার নিজের বলতে আর কোনোকিছুর মালিকানা অবশিষ্ট থাকবে না।
এমন সম্পদ ত্যাগের সময় যদি তার অন্তরের ভেতরের অংশ নফসের দুর্বলতার কারণে তা অপছন্দও করে, কিংবা সে যদি এই ত্যাগের মাঝে কোনো প্রকার কষ্ট বা সংকটের সম্মুখীন হয়, তবুও সে নফসের দূরদর্শিতার কারণে একে নিজের হাত থেকে বের করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না। বরং যখনই সে একে কোনো কষ্ট বা অনিচ্ছার মধ্য দিয়ে নিজের থেকে দূর করে দেবে, তখন সে নিজের জ্ঞান বা বুদ্ধির জোরেই তা সম্পন্ন করবে। নফসের এমন ত্যাগের পর তার মাঝে আর কোনো অনুশোচনা বা আক্ষেপের উদয় হওয়া সম্ভব নয়, যা সাধারণত নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃতভাবে কাজ সম্পাদনকারীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। কারণ যখন সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও খোদায়ি কৃপা বা এনায়েতের সুনিপুণ ছায়াতলে নিজের সম্পদ ত্যাগ করে, তখন সেই পূর্বের অনিচ্ছার ভাবটি দূর হয়ে আধ্যাত্মিক আনন্দের অনন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। আর আধ্যাত্মিক মনজিল বা মাকামের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি সুদৃঢ় ও মজবুত অবস্থানের অধিকারী।
অনুরূপভাবে আমাদের নিজেদের হাতের যাবতীয় সম্পদ থেকে আমাদের বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও সুনির্দিষ্ট নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যদি আমাদের পরিচালনা করার মতো কোনো শায়খ আমাদের সামনে উপস্থিত না থাকেন, যিনি আমাদের এই বিষয়ে হুকুম দেবেন, এবং আমরা আমাদের হাতের সম্পদ কাউকে সমর্পণ না করি, তবে আমরা আমাদের এই সামগ্রিক বিষয়টি অন্য কারো ওপর সোপর্দ করব না। কারণ আমরা নিজেরা কোনো শায়খের অধীনে অবস্থান করছি না, আবার পথের মাঝে আমরা কোনো শায়খকেও দেখতে পাচ্ছি না। বরং এই আধ্যাত্মিক ত্যাগের পথটি এমন যে, তা কোনো মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবার ও ধনসম্পদ ছেড়ে চিরতরে চলে যাওয়ার পর যেভাবে তার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, ঠিক সেভাবে মানুষকে জাগতিক সর্বস্ব থেকে মুক্ত করে দেয়।
যখন আমাদের মরহুম পিতা আমাদের সাথে এই আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন, তখন আমরা আমাদের হাতের সমস্ত সম্পদ যেভাবে ছিল সেভাবেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমরা সেই ত্যাগের বিষয়ে অন্য কাউকে আমাদের ওপর হুকুমকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করিনি। আর আমাদের পিতা এরপর সে সম্পদ দিয়ে কী কাজ করেছিলেন, সে বিষয়েও আমি আজ পর্যন্ত তাঁকে কোনো প্রশ্ন করিনি। নফসের জওকের হুকুম মূলত এমনই হয়ে থাকে, যা প্রত্যেক আধ্যাত্মিক সত্যানুসন্ধানী বা তালিবে মওলার জন্য একান্ত অপরিহার্য।
নফসের এই চরম ত্যাগের মূল ভিত্তি ও অকাট্য দলিল মূলত হজরত আবু বকর সিদ্দিকের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মাঝে নিহিত রয়েছে, যখন তিনি নিজের মালিকানাধীন সমস্ত ধনসম্পদ নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে, তোমার কাছে যা কিছু আছে তা আমার নিকট নিয়ে এসো। অতঃপর হজরত ওমর ফারুকও তাঁর নিজের মোট সম্পদের অর্ধেক অংশ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের এই ত্যাগের পরিমাণের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেননি। যদি তিনি তাঁদের ওপর কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা বা হদ্দ আরোপ করতেন, তবে সাহাবিদের কেউ-ই সেই নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে পারতেন না।
আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূলত সাহাবিদের মাঝে আধ্যাত্মিক স্তর ও মর্যাদার পার্থক্য বা মরাতিবুল কওম ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এই কারণে তিনি হজরত আবু বকর সিদ্দিককে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তুমি তোমার পরিবারের জন্য ঘরে কী রেখে এসেছ। তখন তিনি চরম আধ্যাত্মিক আদব রক্ষা করে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন যে, আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে রেখে এসেছি। আর এটিই হলো আদবের সর্বোচ্চ স্তর। কারণ তিনি যদি বলতেন যে, আমি তাদের জন্য কোনোকিছুই রেখে আসিনি, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করে জাগতিক কোনোকিছুর দিকে ফিরে যাওয়ার একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা থেকে যেত। কিন্তু তিনি যখন বললেন যে, আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে রেখে এসেছি, তখন এই বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেল। যখন আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এই গভীর আধ্যাত্মিক হাল বা অবস্থা এবং জওকের গভীরতা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হলেন, তখন তিনি তাঁর এই উৎসর্গীকৃত সম্পদ থেকে বিন্দুমাত্র অংশও ফিরিয়ে দেননি।
আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাঁর নিয়ে আসা সম্পদের কোনো অংশ তাঁর পরিবারের জন্য পূর্বেই ফিরিয়ে দিতেন, তবে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই হুকুমের সামনে তাঁর পরিবারের জন্য কোনোকিছু রেখে আসার নিয়মটিই সবার জন্য অবধারিত হয়ে যেত। সুতরাং সম্পদের প্রকৃত মালিকের পক্ষ থেকে কাউকে প্রতিনিধি বা নায়েব নিযুক্ত করা ছাড়া এই ক্ষেত্রে অন্য কোনো হুকুম কার্যকর হতে পারে না। আপনি গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করুন যে, এই খোদায়ি বিন্যাস কতখানি সুনিপুণ ও হিকমতপূর্ণ। এর মাধ্যমে হজরত আবু বকর সিদ্দিকের আধ্যাত্মিক মাকাম ও মর্যাদার গভীরতা কত চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে, যিনি নিজের জীবনের সমস্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ দূরদর্শিতার অধিকারী ছিলেন।
হজরত ওমর ফারুক সেই দিন মনে মনে ভেবেছিলেন যে, আজ তিনি ত্যাগের ক্ষেত্রে হজরত আবু বকর সিদ্দিককে ছাড়িয়ে যাবেন, কারণ তিনি আজ তাঁর অর্জিত বিপুল সম্পদের এক বিশাল অংশ নিয়ে আসতে পেরেছেন। অতঃপর তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে উপস্থিত হলেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ। তিনি উত্তরে বললেন যে, আমি আমার মোট সম্পদের অর্ধেক অংশ রেখে এসেছি। তখন মহান আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দুজনের এই উত্তরের চমৎকার যোগসূত্র স্পষ্ট করে বললেন যে, তোমাদের দুজনের আধ্যাত্মিক মাকামের পার্থক্য তোমাদের এই দুই বক্তব্যের মাঝেই নিহিত রয়েছে।
হজরত ওমর ফারুক বলেন যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণী শোনার পর আমি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলাম যে, আমি আধ্যাত্মিক মাকাম ও ত্যাগের ক্ষেত্রে কখনো হজরত আবু বকর সিদ্দিককে অতিক্রম করতে পারব না। মানুষের উচিত সবসময় এমন সুউচ্চ আধ্যাত্মিক হিম্মত বা আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে পোষণ করা, যা তাকে আল্লাহর দরবারে সর্বোচ্চ মর্যাদার স্তরে উন্নীত করে এবং প্রতিটি স্তরের প্রকৃত হক ও মর্যাদা পুরোপুরি আদায় করতে সাহায্য করে। এই কারণেই আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু বকর সিদ্দিকের নিয়ে আসা সম্পদ থেকে কোনো কিছুই ফিরিয়ে দেননি। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই আচরণের মাঝে উপস্থিত সকলের জন্য একটি বিশেষ সতর্কতা ও শিক্ষা নিহিত ছিল, যেন সবাই হজরত আবু বকর সিদ্দিকের ইমানি সততা ও সিদকের গভীরতা অনুধাবন করতে পারে। এর মাধ্যমে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোমলতা ও রহমতের প্রকাশ ঘটেছে। যদি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নিয়ে আসা সম্পদের কোনো অংশ ফিরিয়ে দিতেন, তবে তা হজরত আবু বকর সিদ্দিকের সুউচ্চ মাকামের পরিপন্থী হতো, যা আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কখনোই কাম্য ছিল না। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বিশেষ কোমলতা ও অনুগ্রহ মূলত হজরত আবু বকর সিদ্দিকের পরিবারের প্রতিও খোদায়ি অনন্য উপহার ছিল।
অনুরূপভাবে হজরত আবদুর রহমান বিন আউফ যখন তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ নিয়ে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সেই সম্পদ গ্রহণ না করে তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে, তুমি তোমার এই সমস্ত সম্পদ নিজের কাছেই রেখে দাও। মহান আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এই সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার মূল কারণ হলো, তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা ও মাকাম সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাঁর সেই সম্পদ গ্রহণ করতেন, তবে তা হজরত আবু বকর সিদ্দিকের মাকামের সমকক্ষ হতো না, যা পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে।
আর বুদ্ধিভিত্তিক জওক মানুষের ওপর রিয়াজাতে নাফসিয়্যাহ তথা আত্মিক সাধনা ও তাহজিবে আখলাক তথা চরিত্র সংশোধনের হুকুম বা ফল দান করে থাকে। সুতরাং এই আত্মিক সাধনা নিজের ভেতরে শারীরিক মুজাহাদাসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। কিন্তু শারীরিক মুজাহাদা তথা কঠোর সাধনা নিজের মাঝে আত্মিক সাধনা ও চরিত্র সংশোধনকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। এই কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হয়েছেন উত্তম ও মহান চারিত্রিক গুণাবলিকে পূর্ণতা দান করার জন্য। অতএব, যাঁকে এই চারিত্রিক গুণাবলির ওপর স্বভাবগতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, তিনি হলেন পবিত্র সত্তার আলোয় আলোকিত। আর যাঁকে এর ওপর স্বভাবগতভাবে সৃষ্টি করা হয়নি, আত্মিক সাধনা তাকে এই গুণাবলির সাথে যুক্ত করে দেয় এবং এই সাধনা ও অভ্যাস তার জন্য কঠিন বিষয়সমূহকে সহজ ও অনুগত করে তোলে। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের নফসকে অনুগত করল, সে মূলত তার অবাধ্যতাকে দূর করে দিল। কারণ নফস স্বভাবগতভাবেই নেতৃত্ব পছন্দ করে এবং সমসাময়িকদের ওপর অগ্রগামী হতে চায়।
আর আত্মিক সাধনা নফসকে এই ক্ষতিকর খেয়াল ও আধিপত্য বিস্তারের লিপ্সা থেকে কঠোরভাবে বিরত রাখে। নফস যেন অন্য সবার ওপর নিজের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা গৌরব দেখতে না পায়, কারণ দাসত্ব বা ইবাদতের ক্ষেত্রে সে অন্য সবার মতোই সমান অংশীদার। তা-ছাড়া সমস্ত সৃষ্টির ওপর আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কুদরত রয়েছে। সুতরাং নফস যদি কখনো কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব লাভও করে, তবে তা কেবল আল্লাহর নির্দেশ পালনের নিমিত্তেই হওয়া উচিত, যেন সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্বোধিত একজন অনুগত বান্দা হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করে। প্রতিটি সৃষ্টির উচিত আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হওয়া মাত্রই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তা পালনে সচেষ্ট হওয়া, যেন সে তার প্রভুর নির্দেশকে নিজের ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য দেয়। নফসের মাঝে কখনো অন্য কোনো নফসের ওপর অগ্রগামী হওয়ার বা শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার খেয়াল আসাও উচিত নয়। এর মাধ্যমে সে অন্য সবার ওপর এমন এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করবে, যা মূলত এই সাধনার উচ্চ মাকামের সাথে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ প্রকৃত আত্মিক সাধনা হলো কোনো প্রকার শর্ত বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নফসের যাবতীয় জাগতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে যাওয়ার নাম।
আর যে জওক বা আধ্যাত্মিক আস্বাদনের প্রারম্ভিক উৎস স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা, আমরা পূর্বে যেভাবে উল্লেখ করেছি, সেই জওকের জন্য কোনো প্রকার আত্মিক সাধনা বা কঠোর মুজাহাদার প্রয়োজন হয় না। কারণ সাধনা কেবল সেই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় যেখানে অবাধ্যতা বা একগুঁয়েমি বিদ্যমান থাকে, কিংবা যেখানে নফসকে অবাধ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আর মুজাহাদা হলো মূলত কষ্ট ও সংকটের অনুভূতি মাত্র। পক্ষান্তরে, আমরা পূর্বে যে মূল উৎসের কথা উল্লেখ করেছি, তা যখন নফসের ওপর রাজত্ব করে, তখন মানুষের নফসের যাবতীয় সাধনা তার অনুগত হয়ে যায়। ফলে সেই মূল সত্তার প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে নফস এক নিমেষেই পরম শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করে।
আর শারীরিক কষ্ট ও মুজাহাদার মাধ্যমে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তা মূলত স্বভাবের সৌন্দর্য বা খুশ তবিয়তের বহিঃপ্রকাশ; তা নফসের প্রকৃত সৌন্দর্য নয়। সুতরাং এমন ব্যক্তি প্রতিটি কষ্টের মাঝেও এক ধরনের আধ্যাত্মিক স্বাদ অনুভব করে, কারণ আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যে হুকুম বা দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সে তা অত্যন্ত আনন্দের সাথে পালন করে। তার এই অবস্থা মূলত শরিয়তের সেই অকাট্য বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা সত্যের স্পষ্টভাষী রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, إِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقًّا حَقَّهُ – নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার নিজের নফসের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার সাক্ষাৎপ্রার্থীর হক রয়েছে এবং তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য হক আদায় করে দাও। অতএব, এই অকাট্য বিধানের রহস্য যিনি আস্বাদন করতে পেরেছেন, তাঁর কাছে শরিয়তের এই হুকুমের বাইরে অন্য কোনো সাধনা বা আমল অবশিষ্ট থাকে না। আর তিনি এই শরিয়তের পথ গ্রহণে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন না। আর আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র সত্য কথা বলেন এবং তিনিই মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
আর এই জওক বা আধ্যাত্মিক আস্বাদনই পরবর্তীতে আপনাকে ইলম তথা প্রকৃত আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান করবে। আর সেই জ্ঞানের আলোকেই আপনি তাজাল্লির স্তরসমূহ প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। আর এই স্তরের মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের আধ্যাত্মিক পরিমাপ ও মাকাম সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে সে প্রতিটি বিষয়ের গভীর তত্ত্ব ও রহস্য অত্যন্ত আদবের সাথে পর্যবেক্ষণ করে, যা তার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিশেষ স্তরটির সাথে অন্য কোনো বিষয়ের তুলনা হয় না। আর এই আধ্যাত্মিক জওকই মানুষের অন্তরে পিপাসা বা তীব্র আকুলতার জন্ম দেয়।
আপনি যদি প্রকৃত মুমিন হন, তবে এই আত্মিক ইমানই আপনাকে খোদায়ি পিপাসা দান করবে। আপনার ইমানের গভীরতা ও পরিমাপ যতখানি বৃদ্ধি পাবে, আপনার অন্তরের সেই তৃষ্ণাও ততখানি তীব্র ও গভীর হবে। আর যাঁর অন্তরে এই বিশেষ তৃষ্ণা বা আকুলতা নেই, তিনি মূলত প্রকৃত মুমিন নন। সুতরাং তাঁর কাছে তাজাল্লির সুধা পানের জন্য কোনো তীব্র আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট থাকে না।
যদি কোনো ব্যক্তি জ্ঞান বা চিন্তাগত গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে এই খোদায়ি তৃষ্ণা অনুভব করেন, তবে তা ভিন্ন বিষয়। তবে তাজাল্লি থেকে অর্জিত প্রকৃত আধ্যাত্মিক জ্ঞানসমূহ কেবল গভীর ইমানের মাধ্যমেই লাভ করা সম্ভব। সুতরাং ইমান ও আত্মিক তৃষ্ণা ছাড়া এই সুউচ্চ জ্ঞান কখনোই অর্জিত হয় না। আর এই তৃষ্ণা মানুষের জওক বা আধ্যাত্মিক আস্বাদনকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অতএব, আপনি এই সূক্ষ্ম বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন।
শুর্ব:
الشُّرْبُ بَيْنَ مَقَامِ الذَّوْقِ وَالرِّيِّ مِثْلُ القَضِيَّةِ بَيْنَ النَّشْرِ وَالطَّيِّ
শুরব হলো জওক ও রিই-এর মাঝামাঝি, যেমন কোনো বিষয় প্রকাশ ও গুটিয়ে নেওয়ার মাঝখানে থাকে।
إِنَّ الحُقُوقَ الَّتِي لِلْحَقِّ قَائِمَةٌ عَلَيْكَ فَاحْذَرْ إِذَا مَا كُنْتَ فِي الحَيِّ
নিশ্চয় অল্লাহর যে হকসমূহ আছে, সেগুলো তোমার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই সতর্ক হও, যদি তুমি জীবিতদের মধ্যে থাকো।
أَنْتَ الغَنِيُّ بِهِ إِذْ كَانَ عَيْنَكُمُ فَلَا سَبِيلَ إِلَى مَطْلٍ وَلَا لَيِّ
তুমি তাঁর দ্বারাই অভাবমুক্ত; কেননা তিনি তোমাদের আয়ন তথা প্রকৃত সত্তা। তাই সেখানে টালবাহানা বা এড়ানোর কোনো পথ নেই।
غَيْلَانُ لَمْ يَكُ مِثْلِي فِي مَحَبَّتِهِ إِذَا تَنَاظَرَتِ العُشَّاقُ فِي مُنَى
গাইলানও (বিখ্যাত আরব কবি) তার প্রেমে আমার মতো নয়, যখন প্রেমিকেরা আকাঙ্ক্ষার ময়দানে একে অপরের সঙ্গে তুলনায় নামে।
وَصْلُ الوَفَاءِ وَهَجْرُ المَطْلِ مِنْ شِيَمِي فَإِنِّي حَاتِمِيُّ الأَصْلِ مِنْ طَيِّ
অঙ্গীকার পূরণে মিলন দান করা এবং টালবাহানা পরিত্যাগ করা আমার স্বভাব; কেননা আমি মূলে হাতিমি, তায়ি গোত্রের বংশজাত।
আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করুন, তুমি জেনে রাখো যে, শুর্ব তথা আধ্যাত্মিক পানীয় গ্রহণ হলো এমন এক বিষয়, যা তুমি প্রথম আস্বাদনের ক্ষণে যা অর্জন করেছিলে তার সাথে অতিরিক্ত হিসেবে দ্বিতীয় ক্ষণে নিজের নফসের ভেতরে লাভ করো, আর তা চরম সীমায় পৌঁছায়; চাই তা রিই তথা আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি দেখার মতাবলম্বীদের নিকট হোক কিংবা যারা তা দেখে না তাদের নিকট হোক।
তুমি আরও জেনে রাখো যে, শুর্ব তথা পানীয় গ্রহণ কখনো কখনো পিপাসা থেকে সৃষ্টি হয়, আবার কখনো কোনো পিপাসা ছাড়াই কেবল আনন্দ আস্বাদনের জন্য হতে পারে; যেমন জান্নাতিদের হাউজ থেকে পান করার পরবর্তী পানীয় গ্রহণ, যা তাদের জন্য জওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদনের স্থলাভিষিক্ত হয়। হাউজ থেকে তাদের প্রথমবার পান করাটা ছিল পিপাসার কারণে, যার পর তারা আর কখনোই পিপাসার্ত হবে না। কারণ জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে কখনো পিপাসার্ত হয় না এবং তারা সেখানে যে পানীয় পান করবে তা কেবল কামনা ও আনন্দ আস্বাদনের জন্য, কোনো পিপাসা নিবারণ কিংবা তার কষ্ট দূর করার জন্য নয়।
জেনে রাখো যে, মাশরুব তথা পানকারীর ভিন্নতার কারণে শুর্ব তথা পানীয় গ্রহণের ধরনও ভিন্ন হয়ে থাকে। যদি পানীয়টি একই প্রকারের হয়, তবুও তা পানকারীদের মেজাজ তথা স্বভাব এবং আধ্যাত্মিক যোগ্যতার ভিন্নতার কারণে ভিন্ন রূপ নেয়। মানুষের মধ্যে কারও পানীয় হয়ে থাকে পানি, কারও পানীয় হয়ে থাকে দুধ, কারও পানীয় হয়ে থাকে শরাব তথা মদ, আবার কারও পানীয় হয়ে থাকে মধু; আর তা নির্ধারিত হয় সেই সুরত তথা রূপের ওপর ভিত্তি করে যার মাঝে সেই ইলম প্রকাশিত হয়। নিশ্চয় এই প্রকারগুলো হলো বিভিন্ন জ্ঞানের বাহ্যিক রূপ, যা আমরা আমাদের একটি পুস্তিকায় উল্লেখ করেছি, যার নাম দিয়েছি মারাতিবু উলুমিল ওয়াহব তথা দানকৃত জ্ঞানসমূহের স্তরবিন্যাস।
আমরা যা বলেছি তার স্বপক্ষে আমাদের দলিল হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রুইয়া তথা স্বপ্নের ইলম, কেননা তিনি বলেছেন, أُرِيتُ كَأَنِّي أُتِيتُ بِقَدَحِ لَبَنٍ فَشَرِبْتُ مِنْهُ حَتَّى رَأَيْتُ الرِّيَّ يَخْرُجُ مِنْ أَظْفَارِي ثُمَّ أَعْطَيْتُ فَضْلِي عُمَرَ قَالُوا: فَمَا أَوَّلْتَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الْعِلْمَ
আমাকে স্বপ্নে দেখানো হলো যেন আমার নিকট একটি দুধের পেয়ালা আনা হয়েছে। অতঃপর আমি তা থেকে পান করলাম, এমনকি আমি দেখতে পেলাম যে, রিই তথা পরিতৃপ্তি আমার নখগুলো দিয়ে বের হচ্ছে। এরপর আমার অবশিষ্ট অংশ আমি উমরকে দান করলাম।
সাহাবিগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসুল, আপনি এর কী ব্যাখ্যা করেছেন? তিনি বললেন, ‘ইলম’।
এটি এমন এক ইলম, যা দুধের সুরতে প্রকাশিত হয়েছে; ঠিক এভাবেই ইলম বা জ্ঞানসমূহ বিভিন্ন পানীয়ের সুরতে আত্মপ্রকাশ করে থাকে।
আর যেহেতু জান্নাত হলো রুইয়াত এবং তাজাল্লি তথা দর্শন এবং ঐশী জ্ঞান প্রকাশের আলয়, এবং আল্লাহ তায়ালা সেখানে চার প্রকারের নদী ব্যতীত অন্যকিছুর কথা উল্লেখ করেননি, যেমন, أَنْهَارٌ مِّن مَّاءٍ غَيْرِ آسِنٍ – অবিকৃত পানির নদীসমূহ। وَأَنْهَارٌ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ – যে দুধের স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি তার নদীসমূহ। وَأَنْهَارٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِّلشَّارِبِينَ – পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের নদীসমূহ। وَأَنْهَارٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّى – পরিশোধিত মধুর নদীসমূহ।[6]
তাই আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছি যে, ইলমি তাজাল্লি কেবল এই চার সুরত বা রূপেই ঘটে থাকে। পানি, দুধ, শরাব এবং মধু। আর প্রতিটি তাজাল্লির জন্য এক এক শ্রেণির বিশেষ মানুষ এবং একই ব্যক্তির জন্য বিশেষ বিশেষ হাল নির্দিষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকাশ হলো মিম্বারের অধিপতিদের জন্য, তাঁরা হলেন রসুলগণ; কিছু প্রকাশ হলো খাটিয়ার অধিপতিদের জন্য, তাঁরা হলেন নবীগণ; কিছু প্রকাশ হলো চেয়ারের অধিপতিদের জন্য, তাঁরা হলেন ওয়ারিস তথা উত্তরাধিকারী আউলিয়া ও আরিফ তথা আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞানীগণ; আর কিছু প্রকাশ হলো বিভিন্ন স্তরের অধিপতিদের জন্য, তাঁরা হলেন সাধারণ মুমিনগণ, সেখানে পঞ্চম কোনো শ্রেণি নেই। আর প্রতিটি শ্রেণির কতিপয় অংশ অন্য অংশের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে, যেমনটি আল্লাহ তায়ালা এই প্রসঙ্গে বলেছেন, تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ – রসুলগণের মাঝে আমি তাদের কিছু কিছু রসুলকে অন্যদের উপর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।[7]
নিশ্চয় এখানে তাকলিফ তথা শরিয়তের বিধান মানার সময়ে আমলসমূহ চার দিকে বিভক্ত ছিল, আর এই কারণেই ইবলিস যখন এই দিকগুলোর ব্যাপারে জানতে পেরেছিল, তখন সে বলেছিল—
ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ
অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের নিকট আসব— তাদের সম্মুখ থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে।[8]
সে বাকি দিকগুলোর কথা উল্লেখ করেনি, কারণ সেগুলোর সাথে কোনো আমল যুক্ত নয়, কেননা তা মূলত তানাজ্জুল তথা ঐশী অবতরণ এবং রব্বানি ও রহমানি আধ্যাত্মিক দানের জন্য নির্দিষ্ট; যা মহিমান্বিত, সুরক্ষিত এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং, ইলম সংখ্যায় যত অধিকই হোক না কেন, এই চার প্রকারের পানীয়ই তা একত্রিত করে এবং এগুলো রহমানি সুরতে রব্বানি মঞ্চসমূহের মাঝে ঐশী গুণের ক্ষেত্রস্বরূপ।
আর এগুলো এক দল সুফির হকের ক্ষেত্রে সর্বদা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথেই বিদ্যমান থাকে, তাঁরা হলেন সেইসব লোক যাঁরা রিই তথা আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তির কথা বলেন না। আর অন্য এক দলের হকের ক্ষেত্রে তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকে, যা আল্লাহ তায়ালা ইয়াওমুয যূর তথা জান্নাতি মহাসমাবেশ ও দর্শনের দিন তাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এই বলে যে, তোমরা তাদেরকে তাদের প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাও; তাঁরা হলেন সেইসব লোক যাঁরা এই সকল পানীয়ের ক্ষেত্রে রিই তথা আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তির কথা স্বীকার করেন। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে যিনি বৈচিত্র্যময় আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী, তাঁর শুর্ব আমরা যা উল্লেখ করেছি তার মধ্য থেকে একটিই হয়ে থাকে, যা থেকে তিনি কখনোই বিচ্যুত হন না।
মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি বিভিন্ন পানীয়ের স্বাদ বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করেন এবং তিনিই হলেন সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ স্তরের অধিকারী, আর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পানির মিশ্রণ পছন্দ করতেন। দুধের সাথে মধু মিশিয়ে পান করা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শরিয়ত তথা ইসলামি আইনে এটি বৈধ। কারণ দুনিয়া জান্নাত নয় যে, সেখানে পানীয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। যেহেতু রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হয়নি, তাই আমরা তার কর্মকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করি। যেমন, রসুলুল্লাহ (ﷺ) পানি দিয়ে দুধ পান করেছিলেন এবং দুধের সাথে মধু মিশিয়ে পান করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন দুধ পান করতেন, তখন বলতেন اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيهِ وَزِدْنَا مِنْهُ – হে আল্লাহ, আমাদের জন্য এতে বরকত দিন এবং আমাদের আরও বাড়িয়ে দিন।
তিনি এটি বলতেন, কারণ, এর মাধ্যমে ইলম অর্জনের চিত্র ফুটে ওঠে। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ইলম অর্জনের জন্য প্রার্থনা করতেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا – এবং বলুন, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।[9]
দুধের ক্ষেত্রে তিনি অধিকতর বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতেন এবং অন্যান্য খাবারের ক্ষেত্রে বলতেনاللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيهِ وَأَطْعِمْنَا خَيْرًا مِنْهُ – হে আল্লাহ, আমাদের জন্য এতে বরকত দিন এবং এর চেয়ে উত্তম খাবার আমাদের দান করুন।
তিনি আরও বলতেন, যখন তোমরা জমজম পানি পান করবে, তখন বলবে “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিহি ওয়া আতইমনা খাইরাম মিনহু।”
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো হলো পানীয়ের বিভিন্ন ধরন। আল্লাহ তায়ালা এগুলোকে আরেফিন তথা পরিচিতদের জন্য দৃশ্যমান জগতের আধ্যাত্মিক সত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। পানীয়গুলোর মধ্যে মদকে তিনি দুনিয়াতে পানকারীদের জন্য আনন্দ ও সুখের উৎস হিসেবে বিশেষায়িত করেছেন। কারণ মদ্যপান ব্যক্তিকে পূর্ণ আনন্দ ও প্রফুল্লতা দেয়। মদপানকারী ছাড়া অন্যদের মধ্যে এই আনন্দ পাওয়া যায় না। মদপানকারীর শরীরের ভেতরে আনন্দের শিহরণ খেলে যায় এবং তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শক্তির ওপর মদ প্রভাব বিস্তার করে। পানীয়গুলোর মধ্যে মদের মতো আর কোনো জিনিসের ওপর এমন প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ, এই জ্ঞান তথা ইলমুল জাওকি বা আধ্যাত্মিক স্বাদ; যাকে বিবেক বা বুদ্ধি ঘৃণা করে, তা ইমান ছাড়া কবুল হয় না। ঠিক যেমন আলেমদের ক্ষেত্রে এই ইলমুল তরিক বা আধ্যাত্মিক পথের জ্ঞানটি অন্য সকল প্রকার জ্ঞান থেকে অধিক প্রভাবশালী। কারণ অন্যকিছুর ওপর এর কোনো প্রভাব নেই, আর এই জ্ঞানের প্রভাব বিবেকের ওপর প্রবল। বুদ্ধি বা বিবেকের ওপর এই প্রভাবটি অন্য সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী। ঠিক তেমনি মদও বুদ্ধির ওপর প্রবল রাজত্ব কায়েম করে। মদ্যপান ছাড়া অন্য কোনো পানীয়ের এমন ক্ষমতা নেই। কারণ মদ্যপানের মতো আর কোনো পানীয় বুদ্ধির ওপর এমন রাজত্ব কায়েম করতে পারে না।
একজন মদ্যপায়ী কি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় না? বুদ্ধির ওপর খামর তথা মদের প্রভাব সম্পর্কে বিচার-বিবেচনা করতে হয়। এই শরিয়ত তথা ইসলামি আইনে যদি এটি বৈধ হতো, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উম্মতকে কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন এবং ফুতুহাত তথা আধ্যাত্মিক বিজয় দান করা হতো। কিন্তু মদ পান করার মাধ্যমে শরিয়ত তথা ইসলামি আইনের অনেক বিধান বাতিল হয়ে যেত। যেহেতু দুধের মাধ্যমে দুধের জ্ঞান তথা ইলমুল লাবান নির্ধারিত হয়েছে, তাই মদের মাধ্যমে এই আধ্যাত্মিক প্রকাশ দুনিয়াতে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি কেবল তাদের জন্যই যারা আল্লাহর কাছে অনুগত তথা আম্বিয়া, আউলিয়া ও মুকাররাবিন তথা নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। আল্লাহ তায়ালা তাদের কিছু শরীরের ওপর মদের নেশা কবুল করেন না। কারণ আল্লাহ তাদের এই রব্বানি তথা ঐশ্বরিক নেয়ামত বা জ্ঞান দান করেছেন, যা তারা গোপন রাখে এবং প্রকাশ করে না।
জেনে রাখুন, আল্লাহ তায়ালা যাকে জ্ঞান বা অর্থ দান করেছেন যা কেবল সম্বোধন বা নস তথা মূল টেক্সট থেকে আসে, তাতে কোনো প্রাকৃতিক বিষয় বা স্বভাবের সম্পর্ক থাকে না। আর আল্লাহ তায়ালা যাকে শরিয়ত তথা ইসলামি আইনের গোপন রহস্য ও প্রজ্ঞার জ্ঞান দান করেছেন, তার প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ – আমি প্রত্যেক রসুলকেই তাদের জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি।[10]
তিনি শরিয়ত তথা ইসলামি আইনের বিধান অনুযায়ী সময় ও অবস্থার জ্ঞান অর্জন করেছেন, তাই অন্য শরিয়ত তথা ইসলামি আইনে যা বৈধ তা এখানে হারাম হতে পারে। এটি দুধের রূপে দুধের জ্ঞান, অর্থাৎ সেই দুধ যার স্বাদ, বন্ধন বা প্রস্তুত প্রণালি পরিবর্তিত হয়নি। আর আল্লাহ তায়ালা যাকে পূর্ণতা, অবস্থা ও সৌন্দর্যের জ্ঞান দান করেছেন, তার জন্য এটি মদের রূপে মূলত জ্ঞান। আর আল্লাহ তায়ালা যাকে ওহি তথা প্রত্যাদেশ, ইমান ও ইলহাম তথা ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণার মাধ্যমে জ্ঞান দান করেছেন, তার কাছে প্রতিটি জিনিসের জ্ঞান পৌঁছেছে। এটি এমন জ্ঞান যে, সে জানে কোনটি বৈধ নয়। আর এটি না জানা মানেই তার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা। এটি মধু তথা মধুর রূপের জ্ঞান। যখন পানীয়গুলোর কোনো একটি তার কাছে কোনোকিছুর সমষ্টি হিসেবে উপস্থিত হয়; যেমন যখন রসুলুল্লাহ (ﷺ) পান করেছিলেন, তখন তিনি প্রথম ও শেষ সবকিছুর জ্ঞানই পেয়েছিলেন, যদিও তিনি তার বিশেষ কোনো দিকের কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু এই স্তরটি তিনি কারো জন্য বন্ধ করে রাখেননি। যে কেউ এই স্তরে প্রবেশ করতে চায়, সে তা করতে পারে। কারণ মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর এই অনুগ্রহ তথা ঐশ্বরিক দান গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালাই সত্য কথা বলেন এবং তিনি সঠিক পথ দেখান।
রিই তথা তৃপ্তি:
الرَّيُّ قَالَ بِهِ قَوْمٌ وَلَيْسَ لَهُمْ … عِلْمٌ بِأَنَّ وُجُودَ الرَّيِّ مَعْدُومُ
রিই তথা তৃপ্তি সম্পর্কে একদল লোক কথা বলেছে, অথচ তাদের কোনো জ্ঞান নেই যে, এই রিই তথা তৃপ্তির অস্তিত্বই নেই।
َوْ كَانَ رَيٌّ تَنَاهَى الْأَمْرُ وَانْقَطَعَتْ … أَمْدَادُهُ وَزِيَادَاتٌ وَتَعْلِيمُ
যদি রিই তথা তৃপ্তি থাকতো, তবে বিষয়টি শেষ হয়ে যেত এবং তার রসদ, বৃদ্ধি ও শিক্ষা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
فَالْأَمْرُ لَيْسَ لَهُ حَدٌّ يُحِيطُ بِهِ … لَكِنَّهُ الرِّزْقُ فِي الْأَشْخَاصِ مَقْسُومُ
এই বিষয়ের কোনো সীমা নেই, যা একে পরিবেষ্টন করতে পারে, বরং এটি রিজক, যা ব্যক্তিদের মাঝে বণ্টিত।
রিই তথা তৃপ্তি অর্জন করা সম্ভব নয় এবং এটি অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার ধারণাকে সংকীর্ণ করে দেয়। জেনে রাখুন, রিই তথা তৃপ্তি সম্পর্কে কেবল তারাই কথা বলে, যারা মনে করে যে, এই দুনিয়া ও জীবনের একটি শেষ ও গন্তব্য আছে। তারা হলো কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচনের অধিকারী, যাদের কাছে দুনিয়ার জীবন ও তার সময়ের শেষ সীমা উন্মোচিত। তারা লওহে মাহফুজ তথা সংরক্ষিত ফলকে বিষয়গুলো দেখার ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা যার কাছে অস্তিত্বের গোপন রহস্য উন্মোচিত হয়েছে, সে প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্বের শেষ সীমা দেখতে পায়। আখেরাতের কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচনের অধিকারীর জন্য এটি নয়। যারা এই রিই-কে শেষ লক্ষ্য মনে করে, তারা তাদের একাগ্রতাকে এই লক্ষ্যেই আবদ্ধ করেছে। আমাদের শায়খ আবু মদিন তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তারা আল্লাহর সেই সব বান্দা, যারা শেষের দিকেও শুরুর কথা স্মরণ করে। কারণ আল্লাহ তাদের কাছে বিষয়ের আসল রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছেন, যা দিনের বেলা সূর্যের ফিরে আসা বা দিনের শেষে পুনরাবৃত্তির মতো। যারা রিই তথা তৃপ্তির কথা বলে, তারা হলো দাউর তথা ঘূর্ণি বিশ্বাসী। তারা মনে করে যে, জুমআ ও মাসগুলো বারবার ফিরে আসার মতোই সবকিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটে। তারা মনে করে, সময় ও রাতের কোনো শুরু বা শেষ নেই। তাদের মতে সবকিছুরই পুনরাবৃত্তি ঘটে। বিষয়টি এমন নয়; বরং এর কোনো শুরু নেই এবং কোনো শেষও নেই। তবে এর লক্ষ্যগুলো তাদের হিম্মত তথা একাগ্রতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাদের মধ্যে এমন কিছু বান্দা আছে, যাদের কাছে ইলম নতুনভাবে প্রতীয়মান হয়, যা তাদের এই বিষয়ে অনেক জ্ঞান ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু তারা ইলমুল ইলাহি তথা ঐশ্বরিক জ্ঞানের বিশালতা থেকে বঞ্চিত হয় না; বরং প্রকৃতির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়। আর এই দুনিয়া ও আখেরাতে রিই তথা তৃপ্তির অভাব তাদের আটকে রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ – এবং তার দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।[11]
তিনি এটিকে প্রত্যাবর্তন তথা রুজু হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ তারা এই বিষয়ে ব্যস্ত ছিল।
এভাবে তারা তাদের নিজস্ব সত্তার দিকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হৃদয়ের দিকে তাকিয়েছিল। তারা যখন পৃথিবীর কোনোকিছুতে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিল, তখন তারা তাদের হৃদয় থেকেই সেদিকে ফিরে গিয়েছিল। তারা জানতো না যে, ঐশ্বরিক সত্যতা (যার দিকে তারা ফিরে গিয়েছিল) সবসময় অনন্ত। তারা আসলে অন্য কোনো দিকে তাকায়নি; বরং তারা তাদের নিজস্ব সত্তার দিকেই ফিরেছিল, কারণ তারা তাদের নিজেদের অন্তরে ঐশ্বরিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাদের পক্ষে আল্লাহর সীমানার বাইরে কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রকৃত রিই তথা তৃপ্তি অর্জন না হওয়ার কারণ হলো, সে সত্যের বাইরে অন্যকিছু গ্রহণ করতে পারে না। আর তার যোগ্যতা যা তাকে দেয়, তার অতিরিক্ত কিছু সে গ্রহণ করতে পারে না। এতে কোনো বাধা নেই, কারণ সে যা পেয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট। এই স্বাদ বা রিই তথা তৃপ্তি অর্জনকারী ব্যক্তি যখন বলে, ‘আমি তৃপ্ত হয়েছি’, তখন সে কেবল তার সময় ও নিজের যোগ্যতার দিকেই তাকিয়ে থাকে। আল্লাহই সত্য কথা বলেন এবং তিনি সঠিক পথ দেখান।
রি তথা তৃপ্তির অভাব:
عَدَمُ الرَّيِّ دَلِيلٌ وَاضِحٌ … أَنَّ أَحْكَامَ التَّنَاهِي لَا تَكُونُ
তৃপ্তির অভাব একটি স্পষ্ট প্রমাণ যে, শেষ বা সমাপ্তির বিধান বলে কিছু নেই।
قَالَ بِالرَّيِّ رِجَالٌ غَلِطُوا … وَرَأَوْا أَنَّ الَّذِي قِيلَ يَهُونُ
কিছু মানুষ তৃপ্তির কথা বলেছে, যারা ভুল করেছে এবং মনে করেছে যা বলা হয়েছে তা সহজ।
وَهُمْ لَوْ عَرَفُوا مِقْدَارَهُ … وَرَأَوْا مَا يَقْتَضِي كُنْ فَيَكُونُ
যদি তারা এর পরিমাপ জানত এবং দেখত যা ‘কুন ফায়াকুন’ তথা ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়-এর দাবি রাখে।
لَمْ يَقُولُوا مِثْلَ هَذَا وَأَتَوْا … لِلَّذِي انْكَسَرَهُ يَغْتَذِرُونَ
তবে তারা এমন কথা বলত না এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য ক্ষমা চাইত।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেনرَبِّ زِدْنِي عِلْمًا – হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।
যে ব্যক্তি ইলমের বৃদ্ধি চায়, সে কখনো তৃপ্ত হয় না, না নির্দিষ্ট সময়ে, না কোনো সীমার মধ্যে। বরং তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে ইলমের বৃদ্ধির কথা বলেছেন। নবী হজরত মুহাম্মদ (ﷺ) কিয়ামতের দিনে শাফায়াত তথা সুপারিশ চাওয়ার সময় বলেছেন, “ফাহামাদুহু তথা আমি তাঁর প্রশংসা করলাম… আমি জানি না যা আপনি জানেন।” আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তায়ালা অসীম, আমাদের জ্ঞানও অসীম। মানুষ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রমাণ চায়। আল্লাহর কথা ফুরিয়ে যায় না, আর তাঁর সৃষ্টিসমূহ বিদ্যমান। তাই জ্ঞান অন্বেষণকারী কখনো তৃপ্ত হয় না, তার জন্য কোনো রিই তথা তৃপ্তি নেই। কারণ, যে জ্ঞান সে চায়, তা অর্জিত হলে সে তার যোগ্যতার চেয়ে নতুন অন্য কোনো জ্ঞান বা ঐশ্বরিক জ্ঞান অর্জন করে। যখন সে তা অর্জন করে, তখন সে আবার নতুন কিছুর অন্বেষণ করে, যা সে আগে জানত না। তাই ইলম অন্বেষণকারী সমুদ্রের পানির পিপাসুর মতো, যত পান করে, তত তার পিপাসা বাড়ে। জ্ঞান কখনো শেষ হয় না, তথ্য কখনো শেষ হয় না। তাহলে রিই তথা তৃপ্তি কোথায়? যা কিছু সবসময় অজানার মধ্যে তৈরি হয়, তা অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যার নিজের সম্পর্কে জ্ঞান নেই, তার রবের সম্পর্কেও জ্ঞান নেই।
কিছু আরেফিন বলেছেন, নফস তথা অন্তঃপ্রবৃত্তি একটি অসীম সমুদ্র, অস্তিত্বের প্রতিটি বিষয়ই অসীম। যা অস্তিত্বে প্রবেশ করে না, তা অসীম নয়। যা অস্তিত্বে প্রবেশ করে না, তার কোনো শেষ নেই। তবে এটি কেবল মুমকিনাত তথা সম্ভাব্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে। তাই জানা যায় যে, যা অস্তিত্বে নেই তা নতুন সৃষ্টি, আর যা সৃষ্টি হয়েছে তা আল্লাহ থেকে। তবে তা আপনার মধ্যে বা ঐশ্বরিক প্রেরণা বা কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচনের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। আর এটি এমন একটি জ্ঞান, যা সব নতুন সৃষ্টির জ্ঞানের সমান। এর অর্থ হলো, মুমকিনাত তথা সম্ভাব্য বিষয়গুলোর কোনো শেষ নেই।
যা কিছু অস্তিত্বে প্রবেশ করে না, তার কোনো শেষ নেই। তবে এটি কেবল মুমকিনাত তথা সম্ভাব্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে। অস্তিত্বের প্রতিটি বিষয় একসাথে আসে না, বরং ধীরে ধীরে আসে। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আর আল্লাহ ছাড়া কেউ এই নতুন অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,مَا يَأْتِيهِم مِّن ذِكْرٍ مِّن رَّبِّهِم مُّحْدَثٍ – তাদের কাছে তাদের রবের পক্ষ থেকে যখনই কোনো নতুন উপদেশ আসে।[12]
তিনি তাঁর কথা এবং তাদের মধ্যে যা নতুন সৃষ্টি হয়েছে তার কথা বলেছেন। তাদের জ্ঞান কেবল নতুন সৃষ্টি তথা মুহাদ্দাস বিষয়গুলোর সাথেই সম্পর্কিত। যা তাদের কল্পনায় আসে, তা তাদের জ্ঞান নয়। কারণ আল্লাহর জ্ঞান থাকা ছাড়া এর কোনো বাস্তবতা নেই। কেউ যদি মনে করে সে আল্লাহ সম্পর্কে জানে, তবে তা অসম্ভব। কারণ সে কেবল তার নিজের গুণাবলি বা নাফসিয়া সাবুসিয়া তথা নফসের নিজস্ব গুণাবলি দিয়েই জানে। এই জ্ঞান দিয়ে আল্লাহকে জানা অসম্ভব। সুবহানাল্লাহ! সে জানে যে, সে কিছুই জানে না। সুতরাং, যে আল্লাহকে জানে, সে তার নিজের মর্যাদা অতিক্রম করে না। সে জানে যে, সে যা জানে না, তা কেবল আল্লাহই জানেন। আল্লাহ যাকে চান সঠিক পথে পরিচালিত করেন।[13]
চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে বোঝা যায়, জওক থেকে শুর্ব হয়ে রিই; এই যাত্রাটি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির ধাপ নয়, এটি আসলে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের গভীরতার পরিমাপ। ইমাম কুশাইরি দেখিয়েছেন এই তিনটি ধাপের ক্রমধারা এবং তাদের আলামত। দাতা গঞ্জে বখশ জওক ও শুর্বের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্দেশ করে দেখিয়েছেন কীভাবে আধ্যাত্মিক স্বাদ সাধনার পথকে সহজ করে। সোহরাওয়ার্দি এই তিনটিকে ইমান, ইলম ও হালের সাথে যুক্ত করে এক অনন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরে গিয়ে বলেছেন, রিই আসলে সম্ভব নয়; কারণ আল্লাহর ইলম অসীম।
সবশেষে বলা যায়, জওক, শুর্ব ও রিই হলো সুফি সাধনার সেই অভিজ্ঞতা, যা ভাষায় পুরোপুরি বলা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। বায়েজিদ বোস্তামির ভাষায়— যত পান করি, তত তৃষ্ণা বাড়ে। এই তৃষ্ণাই প্রকৃত সাধকের পরিচয়।