হজরত আবুল কাসিম আন-নাসরাবাদি (রহ.) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ ও সুফি শায়খ, যাঁর জীবন ছিল ইবাদত, জ্ঞানচর্চা ও আত্মশুদ্ধির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর উপদেশ মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি ও আখিরাত-চেতনা জাগ্রত করত। কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক তাসাউফের ধারাকে তিনি নিজ আমল ও চরিত্রের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

প্রাথমিক পরিচিতি:

পূর্ণ নাম আবুল কাসিম ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মাহমাওয়াইহ আল-খুরাসানী আন-নাসরাবাদি আন-নিশাপুরী। তিনি ছিলেন গভীর তাকওয়া ও জুহদের অধিকারী এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ‘নাসরাবাদ’ ছিল নিশাপুর শহরের একটি মহল্লার নাম, বর্তমান ইরানের সমৃদ্ধ একটি নগরী। আর সেখানকার অধিবাসী হওয়ার কারণেই তিনি ‘নাসরাবাদি’ নামে পরিচিত হন।[1]

জ্ঞানার্জন:

তিনি জ্ঞানার্জন ও হাদিস শিক্ষার জন্য বহু খ্যাতিমান আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল আব্বাস আস-সাররাজ, ইবনে খুযাইমাহ, আহমদ ইবনে আবদুল ওয়ারিস আল-আসসাল, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, মাখহূল আল-বাইরুতী, ইবন জাওসা প্রমুখ। এছাড়াও তিনি খুরাসান, শাম, ইরাক, হিজাজ ও মিশরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য আলেম ও মুহাদ্দিসের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করেন।[2]

ছাত্রবৃন্দ:

তাঁর কাছ থেকে জ্ঞানার্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন ইমাম হাকিম, আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী, আবু হাজিম আল-আব্দূয়ী, আবুল আলা মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-ওয়াসিতী, আবু আলী আদ-দাক্কাক এবং আরও বহু মনীষী।[3]

ইলমের প্রতি তাঁর অনুরাগ:

আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী বলেন, “শায়খ আবুল কাসিম সর্বদা সঙ্গে দোয়াত ও কাগজ বহন করতেন। আমরা যখনই কোনো শহরে প্রবেশ করতাম, তিনি আমাকে বলতেন, ‘চল, আমরা শুনি (অর্থাৎ জ্ঞান আহরণ করি)।’

একবার আমরা বাগদাদে ‘আল-কাতি’ই-এর নিকট গেলাম। তাঁর একজন কাতিব ছিল, কিন্তু সে বারবার ভুল করছিল। আবুল কাসিম তা সংশোধন করছিলেন। তৃতীয়বার ভুল হলে তিনি বললেন, ‘হে ব্যক্তি, যদি তুমি ঠিকভাবে পড়তে পারো তবে সামনে এগিয়ে যাও।’

তখন সে নিজেই বসে পড়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পাঠ করল, যা দেখে আল-কাতি’ই ও উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়ে গেল।

পরে সেই লেখক জিজ্ঞেস করল, ‘ইনি কে?’

আমি বললাম, ‘ইনি খোরাসানের মহান উস্তাদ আবুল কাসিম আন-নাসরাবাদি।’

তখন সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে লোকজন, ইনি হলেন খোরাসানের শায়খ।’[4]

গুণাবলি:

আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী বলেন, “তিনি ছিলেন নিশাপুরের সুফিদের প্রধান শায়খ। তাঁর ইশারাময় আধ্যাত্মিক ভাষা ছিল কুরআন ও সুন্নাহর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। হাদিস মুখস্থ রাখা ও তার গভীর অর্থ অনুধাবন, ইতিহাসবিদ্যা, আচার-আচরণ ও আত্মশুদ্ধির জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক ইশারার নানা শাস্ত্রে তাঁর ছিল অসাধারণ পারদর্শিতা। তিনি আশ-শিবলী ও আবু আলী আর-রুযবারী’র সাক্ষাৎ লাভ করেন।”

ইমাম হাকিম বলেন, “তিনি ছিলেন তাঁর যুগে হাকিকতের জ্ঞানীদের মুখপাত্র এবং বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী একজন মহান সাধক। তিনি ছিলেন হাদিস সংগ্রহে নিরলস সফরকারী আলেমদের অন্যতম। প্রথম জীবনে তিনি কিতাব নকল ও লিখনের কাজ করতেন। পরে তিনি নিসাপুর থেকে প্রায় বিশ বছরেরও অধিক সময় অন্তরালে ছিলেন। এ সময় তিনি মানুষকে উপদেশ দিতেন, নসিহত করতেন এবং আল্লাহর স্মরণে উদ্বুদ্ধ করতেন।”[5]

তাঁর মধ্যে যে-সব উত্তম চরিত্র ও সাধনামূলক বৈশিষ্ট্য ছিল, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— মানুষের অজুহাত গ্রহণ করা, নিয়মিত অজিফা পালন করা এবং শরিয়তের রুখসত (সহজ বিধান) পরিহার করে কঠোরভাবে ইবাদতে অটল থাকা।[6]

তাসাউফের মূলনীতি:

তাঁর মতে তাসাউফের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, প্রবৃত্তি ও বিদআত পরিত্যাগ করা, শায়খদের মর্যাদা রক্ষা করা, মানুষের অজুহাত গ্রহণ করা, সাথিদের সাথে সুন্দর আচরণ করা, তাদের সেবা করা, সুন্দর চরিত্র গঠন করা, নিয়মিত অজিফা ও জিকির পালন করা, শরিয়তের রুখসত ও অপব্যাখ্যা পরিহার করা।

যে কেউ এই পথে বিকৃতভাবে প্রবেশ করে, সে শেষ পর্যন্ত ভ্রষ্ট হয়ে যায়, কারণ শুরুতেই তার ভিত্তি নষ্ট ছিল, আর ভিত্তি নষ্ট হলে শেষও নষ্ট হয়ে যায়।[7]

হাকিকতের অবস্থায় করণীয়:

তিনি বলেন, “যখন তোমার সামনে হাকিকতের কোনো অবস্থা প্রকাশ পায়, তখন তার সাথে জান্নাতের আশাও করো না, জাহান্নামের ভয়ও করো না, এমনকি তাদের কথা মনেও এনো না। আর যখন তুমি সেই অবস্থান থেকে ফিরে আসো, তখন আল্লাহ যা মহিমান্বিত করেছেন, তুমি সেটাকেও মহিমান্বিত করো।”[8]

ধাপে ধাপে আত্মশুদ্ধির উন্নতি:

তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি নফসের আদব (আত্মশুদ্ধি ও শিষ্টাচার) অর্জন করতে পারেনি, সে কখনো অন্তরের আদব (আদাবুল ক্বলব) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। আর যে অন্তরের আদব থেকে বঞ্চিত, সে রহস্যের আদব (আদাবুস সির) লাভ করতে পারে না। আর যে রহস্যের আদব হারায়, সে রুহের আদবও পায় না। আর যে রুহের আদব থেকে বঞ্চিত, সে আল্লাহর নৈকট্যের (মাকামে কুরব) দিকে পৌঁছাতে পারে না। বরং প্রকৃত নৈকট্যের অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব নয়, যতক্ষণ না ব্যক্তি সমস্ত প্রকার আদব শিখে না নেয় এবং সে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর কাছে আমানতদার না হয়।”[9]

ইবাদত ও প্রতিদানের স্তর:

তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি আমল করে প্রতিদানের আশায়, তার আমল গণনা ও সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর যে ব্যক্তি মুশাহাদা (আল্লাহর উপস্থিতি-চেতনা) নিয়ে আমল করে, তাকে গণনা ভুলিয়ে দেয়। যে গণনা অনুযায়ী কাজ করে, তার প্রতিদানও সংখ্যায় সীমিত।”

এর প্রমাণে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا

“যে কেউ একটি সৎকর্ম নিয়ে আসবে, তার জন্য তার দশগুণ প্রতিদান রয়েছে।” সুরা আন‘আম, আয়াত: ১৬০।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান তাদেরকে অগণিতভাবে (হিসাব ছাড়া) প্রদান করা হবে।” সুরা যুমার, আয়াত: ১০।

অর্থাৎ, সাধারণ আমল করলে প্রতিদান নির্দিষ্ট ও গণনাযোগ্য হয়, আর আল্লাহর দিকে পূর্ণ মনোযোগ ও মুশাহাদার অবস্থায় আমল করলে প্রতিদান হয় অগণিত।[10]

উবুদিয়্যাত ও মানবীয় দুর্বলতা:

তিনি বলেন, “তুমি দুই সম্পর্কের মাঝে অবস্থান করো। একটি হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, আরেকটি হলো আদম (মানব) এর সাথে সম্পর্ক। যখন তুমি আল্লাহর দিকে নিজেকে যুক্ত করো, তখন তুমি কাশফ, প্রমাণ ও মহিমার স্তরে প্রবেশ করো। এটাই প্রকৃত উবুদিয়্যাত (দাসত্ব)।

আল্লাহ বলেন وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

“রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনয়সহকারে চলে।” সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩।

إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ

“নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই।” সুরা হিজর, আয়াত: ৪২।

فَوَجَدَا عَبْدًا مِّنْ عِبَادِنَا آتَيْنَاهُ رَحْمَةً

“তারা আমাদের বান্দাদের একজনকে পেল, যাকে আমরা রহমত ও জ্ঞান দান করেছি।” সুরা কাহফ, আয়াত: ৬৫।

আর যখন তুমি মানব (আদমি) সম্পর্কের দিকে ফিরে যাও, তখন তুমি জুলুম ও অজ্ঞতার স্তরে প্রবেশ করো।

আল্লাহ বলেন وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا

“মানুষ তো এটি (কুরআন) বহন করল; সে ছিল অত্যন্ত জালিম ও (পরিণামের ব্যাপারে) অজ্ঞ।” সুরা আহযাব, আয়াত: ৭২।[11]

ফিতনার সময় সতর্কতা:

শায়খ আবুল কাসিম আন-নাসরাবাদিকে বলা হলো, “কিছু লোক নারীদের সাথে বসে বলে, আমি দৃষ্টিতে নিরাপদ।”

তিনি বললেন, “যতক্ষণ দেহ (শরীরী জগৎ) বিদ্যমান, ততক্ষণ আদেশ ও নিষেধ বিদ্যমান। হালাল ও হারাম উভয়ই তার ওপর প্রযোজ্য। শুধু সেই ব্যক্তি সন্দেহে পড়ে, যে হারামে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে নিজেকে ফেলে।”[12]

কারামত:

ইমাম সুলামী বলেন, “একবার তিনি আমাদের নিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ আদায় করতে বের হলেন। তিনি প্রচুর খাবার প্রস্তুত করে গরিবদের খাওয়ালেন। এরপর এমন প্রবল বৃষ্টি হলো, যেন মশকের মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে।

আমরা দু’জন চলতে অক্ষম হয়ে পড়লাম। পরে আমরা একটি মসজিদে আশ্রয় নিলাম। তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি কি চাও আমি তোমার জন্য কোথাও থেকে কিছু খাবার আনতে বলি?’

আমি বললাম, ‘আল্লাহর পানাহ চাই।’

তখন তিনি আবেগময় কণ্ঠে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন—

خَرَجُوا لِيَسْتَسْقُوا فَقُلْتُ لَهُمْ قِفُوا

دَمْعِي يَنُوبُ لَكُمْ عَنِ الْأَنْوَاءِ

قَالُوا صَدَقْتَ فَفِي دُمُوعِكَ مَقْنَعٌ

لَكِنَّهَا مَمْزُوجَةٌ بِدِمَاءِ

তারা বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য বের হলো, আমি বললাম, থামো!

আমার অশ্রুই তোমাদের জন্য বৃষ্টির বিকল্প।

তারা বলল, তুমি সত্য বলেছ, তোমার অশ্রুতেই যথেষ্ট আশ্রয় আছে,

কিন্তু তা তো রক্তের সাথে মিশ্রিত![13]

মূল্যবান বাণী:

১. আউলিয়াগণের চূড়ান্ত স্তরই হলো নবীগণের প্রারম্ভিক স্তর।

২. আল্লাহ যখন তোমাদের কিছু দান করেন, তখন তিনি তোমাদের আপন অনুগ্রহে ভূষিত করেন; আর যখন বঞ্চিত করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তোমাদের রক্ষা করেন। কারণ তিনি যখন দান করেন, তখন তা তোমাকে ব্যস্ত করে ফেলে; আর যখন বঞ্চিত করেন, তখন তিনি নিজেই তোমাকে বহন করেন।

৩. তাসাউফের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং প্রবৃত্তি ও বিদআত পরিত্যাগ করা।[14]

৪. আরাম হলো তিরস্কারে পূর্ণ একটি পাত্র।

৫. যে ব্যক্তি দানের (দুনিয়াবী অনুগ্রহের) দিকে ঝোঁকে, তার কোনো সীমা থাকে না; আর যে দাতার (আল্লাহর) দিকে ঝোঁকে, সে-ই প্রকৃত সম্মানিত হয়ে যায়।

৬. ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ক্ষমা ও মার্জনা চাওয়া; প্রতিদান বা বিনিময় নয়।[15]

৮. সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হলো জাগ্রত অন্তরের অন্যতম লক্ষণ।[16]

৯. যা হৃদয় লাভ করে, তার বরকত শরীরে প্রকাশ পায়। আর যা আত্মা লাভ করে, তার বরকত হৃদয়ে প্রকাশিত হয়।

১০. আশা মানুষকে আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায়, ভয় মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, আর মুরাকাবা (আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি) মানুষকে হকের পথে পরিচালিত করে।[17]

তাঁর ওফাত:

ইমাম হাকেম বলেন, ৩৬৫ হিজরিতে তিনি মক্কা মুয়াজ্জমায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করেন। অবশেষে ৩৬৭ হিজরির জিলহজ মাসে সেখানেই ইন্তিকাল করেন এবং তাঁকে ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহ.)-এর নিকটে দাফন করা হয়।[18]

তাঁর ওফাতের পর তাঁর সাথে এক ব্যক্তির স্বপ্নে সাক্ষাত হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, “আল্লাহ আপনার সাথে কী করেছেন?”

তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করেননি, যেমন জালিমরা করে। বরং তিনি আমাকে ডাকলেন, ‘হে আবুল কাসিম, মিলনের পর কি বিচ্ছেদ থাকতে পারে?’

আমি বললাম, ‘না, হে মহিমাময় আল্লাহ।’

অতঃপর আমাকে যখন কবরের মধ্যে রাখা হলো, আমি একত্বের (আহাদ) সান্নিধ্যে পৌঁছে গেলাম।”[19]