উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই হৃদয়ে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অপূর্ব অনুভূতি জাগ্রত হয়। তাঁদেরই একজন হজরত দাতা গঞ্জে বখশ (রহ.)। যে যুগে মুসলিম সমাজ নানা বিভ্রান্তি, আত্মিক শূন্যতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সম্মুখীন হচ্ছিল, সে সময় তিনি মানুষকে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক তাসাউফের সুমহান শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব শুধু একটি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সমগ্র উপমহাদেশে ইসলামের সৌন্দর্য, প্রেম, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির বাণী ছড়িয়ে পড়ে। লাহোরের মাটিতে তাঁর আগমন যেন এক নতুন আত্মিক জাগরণের সূচনা করেছিল।

নাম ও জন্ম:

তাঁর কুনিয়ত ছিল আবুল হাসান, নাম আলি এবং উপাধি ছিল দাতা গঞ্জে বখশ। বংশধারা— হজরত আলি ইবনে সৈয়্যদ উসমান ইবনে সৈয়্যদ আবদুর রহমান ইবনে সৈয়্যদ আবদুল্লাহ (শুজা শাহ) ইবনে সৈয়্যদ আবুল হাসান আলি ইবনে সৈয়্যদ হাসান ইবনে সৈয়্যদ জায়েদ ইবনে হজরত ইমাম হাসান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইবনে আলি কাররামাল্লাহু তায়ালা ওয়াজহাহুল কারিম।[1]

তাঁর অন্যতম পরিচয় হজরত সৈয়্যদুনা ‘দাতা আলি হুজভিরি (রহ.)’ নামে। আনুমানিক ৩০০ হিজরিতে গজনিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার গজনির ‘জুল্লাব’ ও ‘হুজভির’ নামক দুটি মহল্লায় বসবাস করতেন। এ কারণেই তাঁকে ‘হুজভিরি, জুল্লাবি’ বলা হয়।[2]

‘গঞ্জ বখশ’ বলার কারণ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন ফয়েজ, বরকত ও মারিফতের এক মহান কেন্দ্র। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব শুধু তাঁর যুগেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও আউলিয়ায়ে কেরাম তাঁর দরবার থেকে ফয়েজ লাভ করেছেন।

শাহজাদা দারাশিকোহ তাঁর সফিনাতুল আউলিয়া-তে উল্লেখ করেন যে, যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে চল্লিশ জুমআর রাত তাঁর মাজারে উপস্থিত থাকেন, আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেন। এই ধারাবাহিক ফয়েজপ্রবাহই তাঁর দরবারকে সাধারণ ও বিশেষ; সব মানুষের জন্য আশ্রয়স্থল করে তোলে।

হজরত মুঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হজরত বাবা ফরিদ গঞ্জে শকর রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হজরত মিয়াঁ মীর কাদরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, এমনকি পরবর্তীকালে বহু বড়ো আউলিয়া তাঁর দরবারে হাজির হয়ে ফয়েজ লাভ করেছেন— এ বিষয়টি তাঁর আধ্যাত্মিক ‘খাজানা’র বিশালতার প্রমাণ।

এই কারণে মানুষ বিশ্বাস করতো যে, তাঁর দরবার থেকে ‘ফয়েজের ভান্ডার’ বিতরণ হয়। কেউ খালি হাতে ফেরে না। এখান থেকেই তাঁকে ‘গঞ্জে বখশ’ তথা ফয়েজের ভান্ডার দানকারী বলা হয়।

এর আরেকটি দিক হলো, তিনি শুধু আধ্যাত্মিক নয়; বরং ইলম, হিদায়াত ও দ্বীনি জ্ঞানের মাধ্যমেও মানুষকে সমৃদ্ধ করেছেন। অসংখ্য মানুষ তাঁর মাধ্যমে সঠিক পথ পেয়েছে, বহুজন ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তাঁর দাওয়াতে সমাজে দ্বীনের আলো বিস্তার লাভ করেছে।

এ-ছাড়া একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় বলা হয়, হজরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর দরবারে দীর্ঘ চিল্লার পর যে আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত ও ফয়েজ লাভ করেন, তার সাথে ‘গঞ্জ বখশ’ শব্দটি জনমানসে আরও প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে ফয়েজের অবিরাম প্রবাহ, আউলিয়ায়ে কেরামের আগমন, এবং দ্বীনি জ্ঞান ও হিদায়াতের অঢেল দান— এই তিন কারণে তিনি ইতিহাসে ‘হজরত দাতা গঞ্জে বখশ’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।[3]

দৈহিক আকৃতি:

হজরত সাইয়্যেদুনা দাতা আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর উচ্চতা ছিল মধ্যম ধরনের। তাঁর দেহ ছিল সুঠাম, সুষম ও সুন্দর গঠনের, তথা দৃঢ় ও মজবুত। শরীরের অস্থিগুলো শক্ত ও বড়ো আকৃতির। বুক ছিল প্রশস্ত এবং হাত-পা ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চেহারা গোলাকার, অতিরিক্ত লম্বা নয়। গায়ের রং লাল-সাদা মিশ্রিত উজ্জ্বল বর্ণের। কপাল ছিল প্রশস্ত এবং চুল ছিল কালো ও ঘন। বড়ো ও সুন্দর চোখের ওপর ছিল বাঁকানো ঘন ভ্রু। নাক সুঠাম ও উঁচু, ঠোঁট ছিল মধ্যম ধরনের এবং গাল ছিল ভরাট। প্রশস্ত ও শক্তিশালী কাঁধের ওপর ছিল সুউচ্চ ঘাড়। মুবারক দাড়ি ছিল ঘন। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ব্যক্তিত্বময়।[4]

পোশাক:

তিনি পোশাকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আড়ম্বর বা কৃত্রিমতা অবলম্বন করতেন না। তিনি সর্বদা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন। যে পোশাক সহজলভ্য হতো, তা-ই ধৈর্য ও শোকরের সঙ্গে পরিধান করতেন।

অর্থাৎ তাঁর পোশাক কখনোই লোক দেখানো বা জাঁকজমকের জন্য ছিল না; বরং তা কেবল শরীর আবৃত রাখা ও সরলতা বজায় রাখার জন্য।[5]

ইলম অর্জন:

তাঁর শিক্ষা ও আত্মগঠনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল এক পুণ্যময় পারিবারিক পরিবেশে। তিনি এমন এক নেককার ও পরহেজগার মাতার স্নেহছায়ায় লালিত-পালিত হন, যাঁর জবান সদা আল্লাহর জিকিরে সজীব থাকত এবং হৃদয় ছিল ইলাহি তাজাল্লির নূরে উদ্ভাসিত। মাতৃস্নেহের সেই পবিত্র আবহ এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ তাঁর কোমল হৃদয়ে শৈশব থেকেই তাকওয়া, সংযম ও আল্লাহভীতির বীজ বপন করেছিল।

শৈশবকাল থেকেই তাঁর মধ্যে ইবাদত-বন্দেগির প্রতি গভীর অনুরাগ ও আন্তরিক আকর্ষণ লক্ষ করা যেত। নেককার পিতা-মাতার সুশিক্ষা ও উত্তম তরবিয়ত তাঁর চরিত্রকে পবিত্রতা, শিষ্টাচার ও নৈতিক সৌন্দর্যের অনন্য আদর্শে গড়ে তোলে।

যখন তাঁর মধ্যে বোধ-বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, তখন তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য মক্তবে ভর্তি করা হয়। অত্যন্ত মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পবিত্র কুরআন মাজিদের তিলাওয়াত সম্পন্ন করার সৌভাগ্য লাভ করেন।

তিনি শৈশব থেকেই অসাধারণ অধ্যবসায় ও আত্মনিবেদনের সঙ্গে দ্বীনি ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ এতটাই প্রবল ছিল যে, কখনো কখনো তিনি খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন এবং চারপাশের জগত সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়তেন।

বর্ণিত আছে, প্রায় বারো-তেরো বছর বয়সে তিনি সুলতান মাহমুদ গজনভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রতিষ্ঠিত এক মাদরাসায় অধ্যয়ন করতেন। ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে তিনি পাঠে এমনভাবে নিমগ্ন থাকতেন যে, কখন সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত, তা টেরই পেতেন না; এমনকি অনেক সময় পানি পান করারও অবসর হতো না।

একদিন সুলতান মাহমুদ গজনভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই মাদরাসার পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে সেখানে প্রবেশ করেন। সুলতানের আগমনের সংবাদে সকল ছাত্র তাঁকে দেখার জন্য ছুটে আসে। কিন্তু হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তখন অধ্যয়নে এমনভাবে নিমগ্ন ছিলেন যে, সুলতানের আগমনের খবরও তাঁর জানা হয়নি।

এ সময় তাঁর উস্তাদ তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, ‘আলি, দেখো, কে এসেছে?’

তখন এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হলো। একদিকে ছিলেন জগদ্বিখ্যাত সম্রাট সুলতান মাহমুদ গজনভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আর অন্যদিকে ইলমের সাধনায় মগ্ন এক কিশোর ছাত্র। সুলতান তাঁর দিকে দৃষ্টি মেললেন; কিন্তু সেই নিষ্পাপ চেহারায় প্রকাশিত নুরানিয়ত, একাগ্রতা ও আল্লাহমুখী ভাবের প্রভাব অনুভব করে সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি অবনত করলেন। অতঃপর তিনি শিক্ষককে উদ্দেশ করে বললেন, “আল্লাহর কসম, এই বালক সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার দিকে আকৃষ্ট। এ ধরনের ছাত্ররাই একটি মাদরাসার প্রকৃত শোভা ও সৌন্দর্য।”[6]

এ-ছাড়াও হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি গজনির বিভিন্ন মাদরাসায় শরিয়তের ইলম অর্জন করেন। পাশাপাশি তিনি সে যুগের প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ফারসি ভাষায়ও দক্ষতা লাভ করেন। পরবর্তীতে ইলমে হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক ও ফালসাফার উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে অল্প বয়সেই ইলমি পরিপক্বতা অর্জন করেন।

যৌবনে উপনীত হওয়ার আগেই তিনি শরিয়তের বিভিন্ন শাস্ত্রে গভীর পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। তাঁর রচনাবলি, বিশেষত কাশফুল মাহজুব, তাঁর প্রজ্ঞা, গবেষণামনস্কতা এবং বিস্তৃত জ্ঞানের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।

ইলমের তৃষ্ণা নিবারণ এবং জ্ঞানের গভীরে পৌঁছার জন্য তিনি সে যুগের বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ফকিহ ও সুফি শায়খের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে শায়খ আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আশকানি, শায়খ আবুল কাসিম গুরগানি, আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ কাসসাব, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আলি আদ-দালস্তানি, আবু সাঈদ ফাদ্বলু্ল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ, আবু আহমদ আল মুযাফফর ইবনে আহমদ ইবনে তেহরান এবং আবুল কাসিম আবদুল করিম ইবনে হাওয়াযিন আল-কুশাইরি রহমাতুল্লাহি আলাইহিমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে তাঁর প্রথম ও প্রধান উস্তাদ ছিলেন শায়খ আবুল কাসিম গুরগানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর কাছ থেকেই তিনি বিভিন্ন ইলমের দরস গ্রহণ করেন এবং ইলম ও আধ্যাত্মিকতার পথে বিশেষ উপকৃত হন। তাঁর সোহবত হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির জ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[7]

বারো বছর বয়সে প্রথম গ্রন্থ রচনা:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গ্রন্থ কাশফুল আসরার-এ নিজ জন্মভূমিতে সংঘটিত কিছু বিস্ময়কর ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সেগুলো বিস্তারিতভাবে লিখলে মানুষের হৃদয় কান্নায় ভরে যেত।

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। গজনিতে এক প্রবীণ ও আলোকিত পীর ছিলেন, যাঁর নাম ছিল শায়খে বুজুর্গ। একদিন তিনি হজরত আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে উদ্দেশ করে বলেন, “হে আলি, এমন একটি গ্রন্থ রচনা করো, যা তোমার জীবনের স্মারক হয়ে থাকবে।”

তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। স্বাভাবিকভাবেই এত অল্প বয়সে এমন দায়িত্বের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হন এবং বলেন, “আমি এখনো ইলমে পূর্ণতা অর্জন করিনি, এ কাজ কীভাবে সম্ভব?”

তবুও শায়খের বারবার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি একটি সংক্ষিপ্ত রচনা প্রস্তুত করে তাঁর সামনে উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটি দেখে শায়খ বলেন, “তুমি দ্বীনের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে।”

এই প্রারম্ভিক রচনার নাম সম্পর্কে কিছু পাণ্ডুলিপিতে ‘বাকা ও ফানা’ উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয় এবং হজরত নিজেও এর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।[8]

রচনাবলি:

তাঁর রচনাসমূহের বিবরণ তাঁর গ্রন্থ কাশফুল মাহজুব থেকে জানা যায়। সেগুলো হলো—

১. দিওয়ান, যা সুফিয়ানা ও আরিফানা কবিতা দ্বারা পরিপূর্ণ।

২. মিনহাজুদ দ্বীন

৩. আল-বয়ান লি-আহলিল আইয়ান

৪. আসরারুল খারক ওয়াল মাওনুইয়াত

৫. কাশফুল আসরার

৬. আল-রিআয়াতু বিহুকুকিল্লাহ

৭. কাশফুল মাহজুব।[9]

মাজহাব:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি শরিয়তের ক্ষেত্রে ফিকহে হানাফির অনুসারী ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কাশফুল মাহজুব-এর বিভিন্ন স্থানে তিনি এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছেন এবং তাঁর মর্যাদার উপযোগী নানা উপাধিতে তাঁকে অভিহিত করেছেন।

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির দৃষ্টিতে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল ফিকহ ও শরিয়তের ইমামই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন তাসাউফ ও রুহানিয়তের পথপ্রদর্শকও। তিনি তাঁকে ইমামুত তরিকত, ইমামুল আইম্মাহ, মুক্তাদায়ে আহলুস সুন্নাহ, ইযযুল উলামা এবং শারাফুল ফুকাহা প্রভৃতি সম্মানসূচক উপাধিতে স্মরণ করেছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফয়েজ ও সোহবত থেকে উপকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হজরত দাউদ তায়ি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হজরত ফুযাইল ইবনে ইয়ায রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হজরত বিশর হাফি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীগণও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার শাম দেশে হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাজারের নিকটে নিদ্রামগ্ন অবস্থায় তিনি রসুলে করিম (ﷺ)-এর জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি দেখেন, হুজুর নবী করিম (ﷺ) বাবুশ শাইবার দিক দিয়ে প্রবেশ করছেন এবং তাঁর মুবারক বক্ষে এক সম্মানিত বুজুর্গকে শিশুর ন্যায় স্নেহভরে জড়িয়ে রেখেছেন।

তিনি বিস্মিত হয়ে সেই বুজুর্গ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে হুজুর (ﷺ) ইরশাদ করেন, “ইনি তোমার এবং তোমাদের অঞ্চলের লোকদের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা।”

এই স্বপ্নের পর তাঁর অন্তরে এ সত্য আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, যদিও ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বাহ্যিকভাবে দুনিয়া থেকে পর্দা করেছেন, তথাপি তাঁর প্রণীত ফিকহি মূলনীতি, ইজতিহাদ এবং ইলমি উত্তরাধিকার যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে পথনির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন এবং নিজেকে তাঁর মাজহাবের অনুসারী হিসেবে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিতেন।[10]

বায়াত ও আধ্যাত্মিক সিলসিলা:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাসাউফের প্রসিদ্ধ জুনাইদি তরিকার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ তরিকার সূচনা হয়েছিল সাইয়্যিদুত তায়িফা হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাধ্যমে। আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর পীরে তরিকত ছিলেন হজরত আবুল ফযল মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-খুত্তালি কুদ্দিসা সিররুহু। তাঁর হাতেই হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বায়াত গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ সাধনা, মুজাহাদা ও রুহানি তরবিয়তের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পূর্ণতার উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।

তাঁর আধ্যাত্মিক সিলসিলা এক উজ্জ্বল ও বরকতময় শৃঙ্খলের মাধ্যমে শেরে খোদা হজরত আলি আল-মুরতাদা কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই সিলসিলার প্রতিটি স্তরেই রয়েছেন তাসাউফ ও মারিফতের আকাশে দীপ্তিমান মহান মনীষীগণ, যাঁদের জীবন ছিল ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত।

তাঁর সিলসিলার ধারাবাহিকতা হলো— হজরত আলি হুজভীরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, তাঁর শায়খ খাজা আবুল ফযল মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-খুত্তালি; তিনি হাসান খুত্তালি-এর মুরিদ; তিনি শায়খ আলি হাযরি-এর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত; তিনি হজরত আবু বকর শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহির খিদমতে ছিলেন; তিনি হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহির শিষ্য; তিনি হজরত সাররি সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহির উত্তরসূরি; তিনি হজরত মারুফ কারখি রহমাতুল্লাহি আলাইহির শিষ্য; তিনি হজরত দাউদ তায়ি রহমাতুল্লাহি আলাইহির সোহবতপ্রাপ্ত; তিনি হজরত হাবিব আজমি রহমাতুল্লাহি আলাইহির শিষ্য; তিনি হজরত হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির সান্নিধ্য লাভ করেন; আর হজরত হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন শেরে খোদা হজরত আলি আল-মুরতাদা কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর নিবেদিত অনুসারী ও খিদমতগার।

এভাবেই হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ইসলামের প্রথম যুগের সেই পবিত্র উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, যেখান থেকে তাসাউফ, ইহসান ও আল্লাহপ্রেমের নির্মল ধারা প্রবাহিত হয়েছিল।[11]

আধ্যাত্মিক সফর:

বুজুর্গানে দ্বীন, সুফিয়ায়ে কেরাম ও ওলামায়ে হক্কানির সফর কখনোই দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে অযথা ভ্রমণ ছিল না। তাঁদের সফরের মূল উদ্দেশ্য থাকত ইলম অর্জন, দ্বীনের দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর পথে মানুষকে পরিচালিত করা। উদ্দেশ্য পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা স্থির হতেন না।

হজরত আলি হুজভিরি গজনির বুজুর্গদের কাছ থেকে অনেক কিছু অর্জন করেছিলেন, কিন্তু গজনিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। ঘরের দোকানে ঘুরপাক খাওয়ার মতো অবস্থায় থাকতে তিনি রাজি ছিলেন না। তিনি রিয়াজত, কষ্টসাধনা, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ইলম লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর পীর-মুরশিদের সঙ্গেও বহু দেশে সফর করেছেন, আবার একাকীও বহু স্থানে গিয়েছেন এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে ইলমের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এ-ছাড়া তিনি ভারত আগমনের পূর্বে খোরাসান, মা-ওয়ারাউন নাহর, মার্ভ এবং আজারবাইজান পর্যন্ত সফর করেছেন। তাঁর এই সফরের কিছু বিবরণ কাশফুল মাহজুব থেকে জানা যায়।

কাশফুল মাহজুব-এ তিনি খোরাসান সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি আলি ইবনে উসমান, খোরাসানের একটি গ্রাম কুন্দুরে এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যাকে আদিব কুন্দী বলা হতো। এই মহান ব্যক্তি ত্রিশ বছর পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং নামাজ ছাড়া কখনো বসতেন না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, এখনো আমি এমন মর্যাদা লাভ করিনি যে, আল্লাহর মুশাহাদার মধ্যে বসার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি।”

কাশফুল মাহজুব-এর বাবুল আশআর-এ তিনি বলেন, একবার একজন বড়ো ইমাম, যিনি খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন, আমাকে বললেন যে, তিনি সামা’র বৈধতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন। আমি বললাম, এটি বড়ো বিপদ সৃষ্টি করবে যে, আপনি একজন ইমাম হয়ে খেল-তামাশাকে, যা সকল গুনাহের মূল, হালাল করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, যদি আপনি এটাকে হালাল মনে না করেন, তাহলে আপনি কেন সামা করেন? আমি বললাম, প্রত্যেক ব্যক্তি সামা’র উপযুক্ত নয়; যদি অন্তরে হালালের প্রভাব থাকে তবে সামা হালাল, আর যদি হারামের প্রভাব থাকে তবে হারাম, আর যদি মুবাহের প্রভাব থাকে তবে মুবাহ। যে বস্তুর বাহ্যিক হুকুম গুনাহের মতো, তা কখনো কখনো অন্তরের অবস্থার কারণে ভিন্ন হতে পারে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আজারবাইজানের পাহাড়ে এক দরবেশকে কবিতা আবৃত্তির পর এমন আত্মমগ্ন অবস্থায় দেখতে পান যে, তিনি পাথরের ওপর বসে অচেতন হয়ে পড়েন এবং সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল ঘটে।

ভারত উপমহাদেশে আগমনের পূর্বে তিনি অন্যান্য দেশেও সফর করেছেন। এভাবেই হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সফর ছিল কেবল ভ্রমণ নয়; বরং ইলম, হাল, মুশাহাদা ও আত্মশুদ্ধির এক ধারাবাহিক সাধনা, যা তাঁকে আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার সর্বোচ্চ স্তরের দিকে নিয়ে যায়।[12]

ইবাদত ও রিয়াজত:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি ইবনে উসমান আল হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল গভীর রিয়াজত, ইবাদত ও জিকরে ইলাহি। তাঁর মতে আল্লাহর নৈকট্য ও মারিফাত অর্জনের প্রধান পথ হলো অন্তরের জিকির ও আত্মশুদ্ধি। এজন্য প্রত্যেক অলির জন্য এ পথ অতিক্রম করা অপরিহার্য।

তিনি নিজ জীবনে অসংখ্য রিয়াজত ও কঠোর সাধনা করেছেন। এর ফলে তাঁর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের দৃঢ়তা সৃষ্টি হয় এবং রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি মহব্বত ও প্রেম তাঁর হৃদয়কে আরও পরিশুদ্ধ করে তোলে। তরিকতের কঠিন সাধনা সত্ত্বেও তাঁর বাহ্যিক আমল কখনো শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেনি; বরং তাঁর সমগ্র জীবন সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণে অতিবাহিত হয়েছে।

তাঁর মুরশিদ ছিলেন একজন শরিয়তনিষ্ঠ বুজুর্গ, যিনি নামাজ, রোজা ও ইবাদতের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে কম খাওয়া, কম ঘুমানো, কম কথা বলা এবং সার্বক্ষণিক জিকিরে মশগুল থাকার নির্দেশ দেন। হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই নির্দেশ পূর্ণভাবে অনুসরণ করেন এবং আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হন।

তিনি নামাজকে অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক মাকাম অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নামাজে তিনি পূর্ণ খুশু-খুজু সহকারে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত জামাতের সাথে আদায় করতেন। নফল ইবাদতের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

তিনি বলেন, নামাজ এমন এক ইবাদত যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সালিক আল্লাহর পথে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অবস্থার অনুভব লাভ করে। এই কারণে নামাজের প্রতিটি রুকন তাঁর নিকট আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করত।

পবিত্রতা: মুরশিদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক।

কিবলা: সঠিক দিকনির্দেশনার চিহ্ন।

কিরাত: আল্লাহর কালামের সাথে সংযোগ।

রুকু: আত্মজ্ঞান ও বিনয়।

সিজদা: পরিপূর্ণ দাসত্ব ও নিবেদন।

তাশাহহুদ: আল্লাহর নৈকট্যের অনুভব।

সালাম: দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন।

কাশফুল মাহজুব-এ তিনি উল্লেখ করেন যে, একবার তিনি প্রায় চার মাস দীর্ঘ সফরে ছিলেন, কিন্তু এই সময়েও তাঁর জামাতের নামাজ কখনো ছুটে যায়নি। সফরের মাঝেও তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতেন। জুমার সময় হলে তিনি আগেই কোনো জনপদে পৌঁছে জুমার নামাজ আদায় করতেন।

তিনি রোজাকে নফস নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য অর্জন এবং আল্লাহর নিয়ামতের কদর বোঝার মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। ফরজ রোজার পাশাপাশি তিনি মাঝে মাঝে নফল রোজাও পালন করতেন।[13]

মুজাহাদা:

মানবীক কামনা-বাসনাকে শরিয়তের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মুজাহাদা-ই-নফস (নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম) তাসাউফের একটি মৌলিক ভিত্তি। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো চিল্লা-কশি বা নির্জন ইবাদত, যার মাধ্যমে সালিক নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করে।

এই সাধনার পথেই তাঁকে বহুবার চিল্লা-কশি ও নির্জন ইবাদতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। তাঁর চিল্লার সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো পূর্ণ বিবরণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে কাশফুল মাহজুব-এ তিনি নিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, একবার আমি এক গভীর আধ্যাত্মিক সমস্যার (বাতিনী রহস্য) সম্মুখীন হই, যার সমাধান আমার জন্য স্পষ্ট হচ্ছিল না। বহু রিয়াজত ও সাধনা করেও এর সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না।

এর পূর্বে এমন আরেকটি অবস্থায় তিনি হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজারে চিল্লা করেছিলেন, যার মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছিল। এবারও তিনি সেখানে গিয়ে ইতিকাফ অবস্থায় তিন মাস অতিবাহিত করেন। এই সময়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন। দিনে তিনবার গোসল করতেন এবং বারবার পবিত্রতা অর্জন করতেন। কিন্তু তবুও সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না।

অবশেষে তিনি খোরাসানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে একটি গ্রামে কিছু সুফি-সদৃশ লোকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, যারা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল। তারা তাঁকে সাধারণ পোশাকে দেখে নিজেদের থেকে আলাদা মনে করে নিচু স্থানে বসতে দেয়, আর নিজেরা উচ্চস্থানে অবস্থান করে। তারা ভালো খাবার গ্রহণ করত, আর তাঁকে সাধারণ শুকনো রুটি দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর সাথে অবমাননামূলক আচরণও করা হয়। কখনো তরমুজ খেয়ে তার খোসা তাঁর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হতো।

এই কষ্ট ও অপমানের মধ্যেও তিনি অন্তরে এক বিশেষ প্রশান্তি অনুভব করেন এবং আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন। তখন তাঁর অন্তরে একটি গভীর উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, সত্যিকারের বুজুর্গগণ মানুষের কষ্ট ও অপমান ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন; এটি নবী ও অলিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক আদর্শ।

এর মাধ্যমে তাঁর কাছে স্পষ্ট হয় যে, অপমান ও কষ্ট সহ্য করাও আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এতে অন্তরের অহংকার ভেঙে যায় এবং বান্দা আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হয়।[14]

খিরকা-ই-খিলাফত লাভ:

তিনি যখন দীর্ঘ রিয়াজত, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সুলুকের বিভিন্ন মাকাম অতিক্রম করে পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছে যান, তখন তাঁর অন্তর আল্লাহ তায়ালার মহব্বতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মুরশিদের প্রতি গভীর আনুগত্য এবং হুজুর নবী করিম (ﷺ)-এর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা তাঁর চরিত্র ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করে।

এভাবে তিনি তাসাউফের পথের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে একজন পূর্ণাঙ্গ অলি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এরপর তাঁর মুরশিদ শায়খ খাজা আবুল ফযল মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-খুত্তালি (রহ.) তাঁকে খিরকা-ই-খিলাফত দান করেন এবং দ্বীন ও তরিকতের খেদমতের দায়িত্ব অর্পণ করেন।[15]

লাহোরে আগমনের নির্দেশ:

যখন হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির পীর-মুরশিদ উপলব্ধি করলেন যে, তাঁর মুরিদ আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার উচ্চস্তরে উপনীত হয়েছেন এবং এখন তাঁর ইলম, ফয়েজ ও রুহানি বরকত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, তখন তিনি একদিন তাঁকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি লাহোরে যাও। সেখানে তোমার খুব প্রয়োজন রয়েছে। এমন একদল মানুষ তোমার প্রতীক্ষায় আছে, যারা তোমার হিদায়াত, নসিহত, চরিত্র, ইলম ও তাসাউফের মাধ্যমে উপকৃত হবে।”

এ কথা শুনে হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিনয়ের সঙ্গে আরজ করলেন, “হুজুর, সেখানে তো আপনারই পরিপূর্ণ মুরিদ ও আমার পীরভাই হজরত হুসাইন জানজানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপস্থিত আছেন, যিনি কুতুবুল আউলিয়া। তাঁর উপস্থিতিতে আমার কী প্রয়োজন? আর আমার মাধ্যমে মানুষ কী উপকার লাভ করবে?”

তখন তাঁর পীর হজরত আবুল ফযল মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-খুত্তালি রহমাতুল্লাহি আলাইহি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “তোমার এসব প্রশ্ন ও যুক্তির প্রয়োজন নেই। বিলম্ব না করে রওনা হয়ে যাও।”

মুর্শিদের নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি আর কোনো প্রশ্ন করেননি। অথচ গজনি থেকে লাহোরের পথ ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, দুর্গম ও কষ্টসাধ্য। ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা ও পরিবেশ, সবকিছুই ছিল ভিন্ন। এমন একটি সফরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও তাঁর কাছে ছিল না। কিন্তু সত্যিকারের মুরিদের মতো তিনি কোনো প্রকার দ্বিধা বা বিলম্ব ছাড়াই যাত্রা শুরু করলেন।

তিনি এমন এক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন, যার পথ তাঁর অজানা ছিল; এমন এক জনপদের দিকে, যার মানুষদেরও তিনি চিনতেন না। তবুও তাঁর অন্তরে ছিল মুর্শিদের আদেশের প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

এ অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর উদ্ধৃত এই ফারসি পঙ্ক্তিতে—

ما ندانیم کہ منزل گہِ مقصود کجا است

ایں قدر ہست کہ بانگِ جرسے می‌آید

আমরা জানি না কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কোথায়;

তবে এতটুকু জানি যে, একটি আহ্বান আমাদেরকে অবিরাম ডেকে নিয়ে চলেছে।

বস্তুত, পীর ও মুরিদের সম্পর্কের পূর্ণতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন মুর্শিদের নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছা, যুক্তি ও হিসাব-নিকাশকে বিসর্জন দেওয়া হয়। হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবন এ আদর্শের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরেকটি ফারসি শের উদ্ধৃত করেন—

رشتہ در گردنم افگندہ دوست

می برد ہر جا کہ خاطرِ خواہ اوست

প্রিয়তম মুর্শিদ আমার গলায় আনুগত্যের রশি বেঁধে দিয়েছেন;

তিনি যেদিকে ইচ্ছা আমাকে নিয়ে যান, আমিও সেদিকেই চলি।[16]

লাহোর আগমন:

ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন তাঁর মুর্শিদে কামিল হজরত আবুল ফজল তাঁকে লাহোরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “সেখানে তো আমার পীরভাই হজরত শাহ হুসাইন জানজানী আছেন। আমার যাওয়ার কী প্রয়োজন?”

অবশেষে যখন তিনি পীরের নির্দেশে লাহোরে পৌঁছলেন, তখন দেখলেন লোকেরা হজরত শাহ হুসাইন জানজানী (রহ.)-এর জানাজা বহন করে নিয়ে আসছে। তিনি তাঁর জানাজার সঙ্গে সেই স্থানে গেলেন, যা বর্তমানে ‘খোই মিরাঁ আবাদ’ নামে পরিচিত এলাকা অবস্থিত। পাঞ্জাবি ভাষার একটি পাণ্ডুলিপি গ্রন্থের নিম্নোক্ত শেরও এ ঘটনার সত্যতা সমর্থন করে।

جنازہ پڑھ کے انہاں نوں مشرق طرف لجا

پنڈ میراں دی کھوئی دے پھر دتا دفتاء

তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করে পূর্ব দিকে নিয়ে যাওয়া হলো;

অতঃপর মিরাঁদের খোই নামক জনপদে তাঁকে দাফন করা হলো।[17]

লাহোরে মসজিদ নির্মাণ:

লাহোরে আগমনের পর হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সর্বপ্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করেন, তা হলো একটি মসজিদ নির্মাণ। বর্তমানে যে মসজিদটি তাঁর দরবারসংলগ্ন স্থানে বিদ্যমান, তা পরবর্তীকালে পুনর্নির্মিত হলেও মূলত সেই ঐতিহাসিক মসজিদেরই উত্তরসূরি। তাঁর স্মৃতি, সম্মান ও অবদানের নিদর্শন হিসেবে একই স্থানে এটি পুনরায় নির্মিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি এই মসজিদ নিজ অর্থে নির্মাণ করিয়েছিলেন। শুধু অর্থ ব্যয় করেই ক্ষান্ত হননি; বরং নির্মাণকাজের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আন্তরিকতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। কল্পনা করা যায়, অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে তিনিও কত নিষ্ঠা, ইখলাস ও আগ্রহ নিয়ে এই মসজিদের কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দেয়াল গাঁথা, ছাদ নির্মাণ কিংবা মাথায় করে নির্মাণসামগ্রী বহন, সবকিছুতেই তাঁর অংশগ্রহণের চিত্র ভক্তিভরে স্মরণ করা হয়।

তাঁর আগমনের পূর্বেও হিন্দুস্তানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে মসজিদও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু লাহোরে একজন অলি-আল্লাহর উদ্যোগে, তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে এবং দ্বীনি খিদমতের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই মসজিদ বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী।

ধারণা করা হয়, হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি লাহোরে আগমনের অল্প সময়ের মধ্যেই এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং আনুমানিক ৪৩১ হিজরিতে এ মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে এই মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই নয়; বরং ইলম, তাসাউফ ও দ্বীনি শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।[18]

মসজিদের কিবলা সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর ঘটনা:

শাহজাদা দারাশিকোহ তাঁর সফিনাতুল আউলিয়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন লাহোরে তাঁর মসজিদ নির্মাণ করেন, তখন অন্যান্য মসজিদের তুলনায় এর কিবলার দিক সামান্য দক্ষিণমুখী ছিল। এ কারণে লাহোরের কিছু আলিম এ বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করেন। কিন্তু হজরত এ বিষয়ে কোনো তর্কে জড়াননি; বরং নীরব থাকেন।

মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি শহরের আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানান এবং নিজে ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করান। নামাজ শেষে তিনি উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে বললেন, “তোমরা এই মসজিদের কিবলা সম্পর্কে আপত্তি করতে। এখন দেখো, কিবলা কোন দিকে রয়েছে।”

বর্ণিত আছে, উপস্থিত ব্যক্তিরা যখন দৃষ্টি উঠিয়ে তাকালেন, তখন তাঁদের সামনে কিবলার দিক এমনভাবে উন্মোচিত হলো যে, স্বয়ং খানায়ে কাবা দেখা যাচ্ছে। তখন তারা সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন। তখন হজরত বললেন, “এখন বলো, কিবলা কোন দিকে?” এ দৃশ্য দেখে আপত্তিকারীরা লজ্জিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

বর্ণনামতে, এটিই ছিল লাহোরে হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রকাশিত প্রথম প্রসিদ্ধ কারামত। এই ঘটনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর খ্যাতি সমগ্র লাহোরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীকালে তিনি উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ হন।[19]

রসুলে করিম (ﷺ)-এর জিয়ারত লাভ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এমন এক মহান বুজুর্গ, যাঁর মাধ্যমে পঞ্চম হিজরি শতাব্দীতে ভারত উপমহাদেশে সুন্নতে নববির আলো নতুনভাবে বিকশিত হয়েছিল। তাঁর ফয়েজময় সোহবত ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের ফলে অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে। এ কারণেই বুজুর্গগণ মনে করেন, তিনি বারবার রসুলে করিম (ﷺ)-এর জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

তিনি তাঁর অমর গ্রন্থ কাশফুল মাহজুব-এ একটি স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, “আমি স্বপ্নে হজরত রসুলে করিম (ﷺ)-কে দেখলাম। আরজ করলাম, ‘ইয়া রসুলাল্লাহ (ﷺ), আমাকে কিছু নসিহত করুন।’

তিনি ইরশাদ করলেন, ‘তোমার ইন্দ্রিয়সমূহকে আল্লাহর মহব্বতের মধ্যে আবদ্ধ রাখো। কেননা, ইন্দ্রিয়সমূহকে নিয়ন্ত্রণে রাখা পূর্ণাঙ্গ মুজাহাদা। আর সকল প্রকার জ্ঞান ও অনুভূতি এই পাঁচটি দরজা দিয়েই অর্জিত হয়।’”[20]

তাঁর দৃষ্টিতে তাসাউফ ও তার প্রকারভেদ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি হুজভীরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অমর গ্রন্থ কাশফুল মাহজুব-এ তাসাউফ সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর ও বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি এ আলোচনার সূচনা করেছেন পবিত্র কুরআনের এই আয়াত দ্বারা—

وَعِبَادُ الرَّحْمٰنِ الَّذِينَ يَمْشُوْنَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَّإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُوْنَ قَالُوْا سَلَامًا

রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।[21]

এরপর তিনি সুফিদের মর্যাদা সম্পর্কিত একটি বাণী উল্লেখ করে তাসাউফের প্রকৃত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘সুফি’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন এটি পশমী বস্ত্র (সুফ) থেকে এসেছে, কেউ বলেন প্রথম সারিতে (সফ) অবস্থানকারীদের প্রতি ইঙ্গিত করে, আবার কেউ একে আসহাবে সুফ্ফা’র সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন। তবে তাঁর মতে, এসব ব্যাখ্যার মূলকথা একটিই, অন্তরের পবিত্রতা ও আত্মার পরিশুদ্ধি।

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, প্রকৃত তাসাউফ হলো হৃদয়কে আল্লাহ ছাড়া সবকিছুর আসক্তি থেকে মুক্ত করা এবং দুনিয়ার মোহ ও প্রতারণা থেকে আত্মাকে রক্ষা করা। যখন মানুষের অন্তর গায়রুল্লাহর ভালোবাসা থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে আধ্যাত্মিক পবিত্রতা দান করেন। এটাই প্রকৃত সুফির পরিচয়। তিনি এ গুণাবলির সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে আমলি তরিকতের ইমাম হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি তাসাউফ-অনুসারীদের তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন।

১. সুফি: যিনি নফসের কামনা-বাসনা দমন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আত্মাকে সমর্পণ করেছেন এবং হাকিকতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

২. মুতাসাওউফ: যিনি রিয়াজত, মুজাহাদা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সুফিদের মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করেন এবং এ পথে আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

৩. মুস্তাসওউফ: যিনি দুনিয়াবি সম্মান, খ্যাতি বা স্বার্থের উদ্দেশ্যে নিজেকে সুফি হিসেবে প্রকাশ করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাসাউফের হাকিকত থেকে বঞ্চিত এবং শেষ পর্যন্ত লাঞ্ছনা ও অপমানের সম্মুখীন হন।

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি জুননুন মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, “সুফি সে, যার কথা তার অবস্থার হাকিকতকে প্রকাশ করে।”

অর্থাৎ প্রকৃত সুফি এমন কোনো দাবি করে না, যা তার চরিত্র ও আমলে প্রতিফলিত হয় না। তার নীরবতাও তার অন্তরের পবিত্রতার সাক্ষ্য বহন করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তিনি মুহাম্মদ ইবনে আলি আল-বাকির রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেন التَّصَوُّفُ خُلُقٌ، فَمَنْ زَادَ عَلَيْكَ فِي الْخُلُقِ زَادَ عَلَيْكَ فِي التَّصَوُّفِ – তাসাউফ হলো উত্তম চরিত্রের নাম। যার চরিত্র যত সুন্দর, তাসাউফে সে তত বেশি অগ্রগামী।”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, উত্তম চরিত্রের দুটি দিক রয়েছে। একটি আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যটি মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। যে ব্যক্তি উভয় ক্ষেত্রেই সৌন্দর্য ও ভারসাম্য অর্জন করে, সে-ই প্রকৃত তাসাউফের অধিকারী।

আলোচনার শেষভাগে তিনি তাসাউফের বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন, “যদি তোমরা শুধু ‘তাসাউফ’ নামটির বিরোধিতা করো, তবে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি এর প্রকৃত অর্থ—আত্মশুদ্ধি, উত্তম চরিত্র, ইখলাস ও আল্লাহর আনুগত্য অস্বীকার করো, তবে তা শরিয়তের অন্তর্নিহিত শিক্ষা এবং নববী আদর্শকে অস্বীকার করার শামিল হবে।”

অবশেষে তিনি দোয়া করেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মতো অনুগত ও বাধ্য বান্দা বানিয়ে দিন।”

এবং নসিহত করেন, “সর্বদা আল্লাহর অলিদের সম্পর্কে ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করো, তাঁদের প্রতি উত্তম আকিদা রাখো এবং সু-ধারণা অবলম্বন করো।”

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির দৃষ্টিতে তাসাউফ কোনো বিচ্ছিন্ন মতবাদ নয়; বরং এটি ইসলামের সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিক, যার মূল ভিত্তি হলো আত্মশুদ্ধি, ইখলাস, আল্লাহপ্রেম এবং উত্তম চরিত্র।[22]

বাণীসমূহ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মোবারক বাণীসমূহ এমন, যেন তা অন্তরের গভীরতা থেকে উৎসারিত জ্ঞান ও হিকমতের মুক্তা। তাঁর প্রতিটি কথা দুনিয়াদার ও দ্বীনদার উভয়ের জন্যই হিদায়াতের আলোকবর্তিকা। তিনি তাঁর রচনাবলিতে এমন এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক ভাণ্ডার রেখে গেছেন, যা সত্য অনুসন্ধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক। কাশফুল মাহজুব, কাশফুল আসরার থেকে নির্বাচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী উপস্থাপন করা হলো—

১. হাল হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরে আগত এক বিশেষ অবস্থা। এটি ইচ্ছা করে আনা যায় না, আবার ইচ্ছা করে দূরও করা যায় না।

২. নফসের বিরোধিতা করাই সকল ইবাদতের মূল এবং আত্মশুদ্ধির ভিত্তি।

৩. অধিক রিয়াজত সবসময় নৈকট্যের নিশ্চয়তা নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহই মানুষকে তাঁর নিকটবর্তী করে।

৪. নফস বিদ্রোহী স্বভাবের; এটি পরিশুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তা কলুষমুক্ত হয় না।

৫. তাসাউফ ও মারিফাতের মূল ভিত্তি হলো বেলায়ত ও তার সত্যতা।

৬. যারা অন্তরের মারিফতকে অস্বীকার করে, তাদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

৭. কারামত হলো অলির সত্যতার প্রকাশ ও নিদর্শন।

৮. নিজ সত্তা বিলীন করে হকের উপস্থিতি অনুভব করাই প্রকৃত আধ্যাত্মিক অবস্থান।

৯. রুহ আল্লাহর নির্দেশে আগমন ও প্রস্থানকারী এক সূক্ষ্ম সত্তা।

১০. আরিফ হওয়ার জন্য আলেম হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সব আলেম আরিফ নয়।

১১. আল্লাহর পরিচয় লাভ মানুষের জন্য সর্বাধিক কঠিন বিষয়।

১২. ফকিরের জন্য রাজাদের সাক্ষাৎকে সাপ ও বিষধর প্রাণীর সাক্ষাতের মতো মনে করা উচিত, যদি তা নফসের স্বার্থে হয়।

১৩. চাইলে কাফিরদের টুপি মাথায় রাখো, কিন্তু সত্যিকারের দরবেশ হও;

দরবেশ হওয়াই আসল, টুপি বা পোশাক নয়।

১৪. চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত করো এবং আনন্দকে সংযত করো।

১৫. যে হাদিয়া, দান বা উপহার স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, তা ফিরিয়ে দিও না।

১৬. কোনো মাজারের পাশ দিয়ে গেলে কিছু পড়ে দোয়া করো, যাতে মাজারবাসী খুশি হন এবং তোমার জন্যও দোয়া করেন।

১৭. কারও একটি খেজুরের বিচির ঋণ থাকলেও তা থেকে নিজেকে মুক্ত করো।

১৮. মা-বাবাকে কিবলার মতো সম্মান করা উচিত, যেমনটি কুরআনের ব্যাখ্যায়ও এসেছে।

১৯. তুমি যদি হাজার-গুণ শক্তিশালীও হও, তবুও তুমি শেষ পর্যন্ত এক মুঠো মাটিই থাকবে।

২০. সত্য জেনে রাখো, তুমি এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি হওয়া মানুষ। তাহলে এই অহংকার ও গর্বের কী অর্থ আছে?

২১. অন্যদের অধিকার নিজের কাছে আটকে রেখো না।

২২. সম্পদের ভালোবাসাকে শাস্তির মতো মনে করো এবং অভাবী ও গরিবদের মাঝে তা বিতরণ করো, কবরের কীট তোমাকে খেয়ে ফেলার আগেই এটি করে ফেলো।

২৩. দুনিয়ার সাথি হাত, পা, চোখ ইত্যাদি, যারা বাহ্যিকভাবে বন্ধু মনে হয়, আসলে তারা তোমার প্রকৃত শত্রু।

২৪. মুর্শিদের হক কখনো নষ্ট করো না।

২৫. হারাম রিজিক বা খাবার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকো।

২৬. যেখানে অপমান ও অসম্মান রয়েছে, সেখানে যেও না।

২৭. দশটি জিনিস অন্য দশটি জিনিসকে ধ্বংস করে দেয়।

১. গুনাহকে ধ্বংস করে তওবা, ২. রিজিককে ধ্বংস করে মিথ্যা, ৩. নেক আমলকে ধ্বংস করে গিবত, ৪. বয়সকে ধ্বংস করে দুশ্চিন্তা ও গাফিলতি, ৫. বিপদকে দূর করে সদকা, ৬. বুদ্ধিকে ধ্বংস করে রাগ, ৭. দানশীলতাকে নষ্ট করে অনুতাপ, ৮. ইলমকে ধ্বংস করে অহংকার, ৯. মন্দকে ধ্বংস করে ভালো কাজ, ১০. জুলুমকে ধ্বংস করে ইনসাফ।

২৮. পীর তিনি, যিনি মারিফাতের সমুদ্রের গভীর জ্ঞানী; তীরবর্তী দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি প্রকৃত পীর নয়।

মুরিদকে বায়াত গ্রহণের আগে নিজের ইবাদত ও সাধনার শক্তি যাচাই করে নেওয়া উচিত, নইলে তার দুনিয়া ও আখিরাত দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

২৯. ন্যায়পরায়ণ ও দ্বীন রক্ষাকারী বাদশাহ, যে জুলুম নির্মূল করে এবং জনগণের কল্যাণ-অকল্যাণ বোঝে, তার প্রশংসা করা ফকিরের জন্য যথোপযুক্ত।

৩০. আল্লাহর অলিদের কথা মানুষের অন্তরকে নরম করে, রহমত ও ভয়ের অনুভূতি জাগায় এবং নববী শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটায়।[23]

৩১. যখন দেখবে মানুষ দ্বীনি কাজে ছাড় (রুখসত) খুঁজছে, তখন বুঝবে তারা হক পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

৩২. সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যার অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া সবকিছু মৃত হয়ে গেছে এবং সে আল্লাহর সঙ্গে জীবিত থাকে।

৩৩. হৃদয় আল্লাহর মারিফাতের স্থান। কাবার চেয়েও হৃদয়ের মর্যাদা উচ্চ। কারণ কাবার দিকে মানুষ ইবাদতের সময় মুখ ফেরায়, আর হৃদয়ের দৃষ্টি সর্বদা আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ থাকে।

৩৪. পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের অবনতি তিন শ্রেণির মানুষের অবনতির ওপর নির্ভর করে। ১. শাসকরা যখন অজ্ঞ হয়, ২. আলেমরা যখন আমলবিহীন হয়, ৩. ফকিররা যখন তাওয়াক্কুল হারায়।

৩৫. মানুষের মুক্তি আছে দ্বীন ও শরিয়তের অনুসরণে, আর ধ্বংস আছে শরিয়তের বিরোধিতায়।

৩৬. যে কাজে নফসের উদ্দেশ্য প্রবেশ করে, সে কাজ থেকে বরকত উঠে যায়।

৩৭. ইলম অনেক, আর মানুষের জীবন অল্প। তাই সব জ্ঞান অর্জন করা ফরজ নয়; বরং সেই পরিমাণ ইলম অর্জন করা ফরজ, যা আমলকে সঠিক করে।

৩৮. নফসের উদাহরণ শয়তানের মতো; আর তার বিরোধিতা করা ইবাদতের পূর্ণতা।

৩৯. সুফি সে, যার এক হাতে থাকে কুরআন আর অন্য হাতে থাকে রাসুল (ﷺ)-এর সুন্নাহ।

৪০. আলেমদের কাজ হলো চিন্তা-গবেষণা করা, আর অজ্ঞদের কাজ হলো কেবল শোনা কথা প্রচার করা।

৪১. প্রত্যেক জিনিসের জাকাত রয়েছে, আর ঘরের জাকাত হলো অতিথির জন্য ব্যবস্থা রাখা।

৪২. অলস ফকির, গাফেল ধনী এবং জাহেল দরবেশের সঙ্গ থেকে দূরে থাকো।

৪৩. বেলায়াতের প্রথম শর্ত হলো মিথ্যা না বলা। মিথ্যাবাদীর হাতে কারামত প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব।[24]

মূর্তি যখন খাবার খায়:

বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার শহরের সেই অঞ্চলে গমন করেন, যেখানে তখন হিন্দুদের মন্দির অবস্থিত ছিল। বর্তমানে এটি রংমহল এলাকার নিকটবর্তী ‘পানিওয়ালা অঞ্চল’ নামে পরিচিত। সে যুগে সেখানে ‘রাবি’ নামক একটি মন্দির ছিল, যেখানে বহু হিন্দু মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন, একজন হিন্দু মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার হাতে গমের রুটি দিয়ে তৈরি একটি খাবার রয়েছে।

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি মূর্তিকে সম্বোধন করে বলেন, আল্লাহর হুকুমে এই খাবার গ্রহণ করো। মূর্তিটি তখন তা গ্রহণ করতে শুরু করে।

সেখানে উপস্থিত হিন্দুদের মধ্যে একজন পুরোহিতও ছিল। সে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই হিন্দু ব্যক্তিকে সমাজচ্যুত করে দেয়, যারে হাতে খাবার ছিল এবং বলে যে, এই ঘটনার কারণে দেবতা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, ফলে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো।

পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে এসে অভিযোগ করে যে, তার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না এবং সমাজ তাকে বর্জন করেছে।

তখন তিনি তাকে নির্দেশ দেন যে, সে যেন তার আত্মীয়-স্বজন ও লোকজনকে একত্র করে, যাতে আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ ঘটে। লোকেরা একত্র হলে তিনি পুনরায় মূর্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এই খাবারটি গ্রহণ করো। বর্ণনা অনুযায়ী, তখন মূর্তিটি তা গ্রহণ করে।

এই ঘটনা দেখে উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে পড়ে। তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান; অতএব তোমরা নির্জীব মূর্তির উপাসনা ত্যাগ করে সত্য দ্বীনের দিকে ফিরে আসো।

তাঁর দাওয়াত ও আধ্যাত্মিক প্রভাবে বহু মানুষ তখন কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করে এবং সত্য দ্বীনের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।[25]

ওফাত:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি ইবনে উসমান আল হুজভিরি আল জুল্লাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের সন সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কিছু বর্ণনায় ৪৫৬ হিজরি, কিছুতে ৪৬৪ হিজরি এবং অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য সূত্রে ৪৬৫ হিজরির উল্লেখ পাওয়া যায়। নুযহাতুল খাওয়াতির ও অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থে ৪৬৫ হিজরিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে ধরা হয়েছে।

এ-ছাড়া তাঁর মাজার শরিফের শিলালিপিতেও ৪৬৫ হিজরি উল্লেখ রয়েছে।[26]

মাজার নির্মাণ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র মাজার শরিফ সুলতান ইব্রাহিম গজনভি কর্তৃক নির্মিত হয়। সুলতান ইব্রাহিম গজনভি যখন লাহোরে আগমন করেন, তখন তিনি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মাজারে হাজির হন এবং নির্দেশ দেন যে, যেহেতু এ মহান বুজুর্গ ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, তাই তাঁর মাজারও তদনুরূপ মহিমান্বিত ও মর্যাদাসম্পন্নভাবে নির্মাণ করা উচিত। এভাবে তাঁর নির্দেশে মাজারটি নির্মাণ করা হয়।

মাজারের গম্বুজ ১৮৬১ সালে হাজি আহমদ সাদো কাশ্মিরি কর্তৃক নির্মিত হয়। পরবর্তীতে হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মাজারের সংস্কার ও ছাদের মেরামত রণজিৎ সিং কর্তৃক সম্পন্ন করা হয়। তাঁর সময়েই মাজারের চারপাশে অষ্টভুজাকার কাঠের বেষ্টনীও নির্মিত হয়।

১৯৪৩ সালে মওলভি ফিরোজ উদ্দীন পুরোনো কাঠের জালির পরিবর্তে মার্বেলের দৃষ্টিনন্দন জালি স্থাপন করেন এবং গম্বুজে মূল্যবান ও উজ্জ্বল চীনা টাইলস লাগানো হয়।

মাজারের শিরহানার পাশে একটি হাউজ রয়েছে, যার পানি জিয়ারতকারীরা পান করে এবং তাবারুক হিসেবে নিজেদের চোখ ও শরীরে ব্যবহার করে। এই হাউজ সম্পর্কে প্রসিদ্ধি আছে যে, এটি দারাশিকোহ নির্মাণ করেছিলেন।

দারাশিকোহ একবার হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মাজারে উপস্থিত হয়ে দেখেন যে, সেখানে একটি গাছ রয়েছে, যাকে মানুষ শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছে। তিনি এ বিষয়ে হজরত মিয়া মীর কাদরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে উল্লেখ করেন।

হজরত মিয়া মীর কাদরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুরাকাবা করেন, তখন হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহি নির্দেশ দেন যে, ওই গাছটি কেটে ফেলে সেখানে একটি ছোট হাউজ নির্মাণ করা হোক। অতঃপর এই কাজটি হাজি আলাউদ্দিনের দায়িত্বে দেওয়া হয় এবং তিনি গাছটি অপসারণ করে সেখানে হাউজ নির্মাণ করেন।[27]

তাঁর পবিত্র মাজার শরিফ থেকে বুজুর্গানে দ্বীনের ফয়েজ লাভ:

হজরত দাতা গঞ্জে বখশ আলি ইবনে উসমান আল হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির পবিত্র মাজার শরিফ উপমহাদেশের আউলিয়ায়ে কেরামের নিকট সর্বদা ফয়েজ, বরকত ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার এক মহাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

হজরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ভারতে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজারে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে গভীর আদব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং চল্লিশ দিন চিল্লা করেন। বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়েও তিনি জিয়ারতের পূর্ণতা অনুভব করতে পারেননি।

চল্লিশতম দিনে তিনি গভীর অনুভূতির সঙ্গে দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির শানে প্রসিদ্ধ কবিতা পাঠ করেন—

گنج بخش فیضِ عالم، مظہرِ نورِ خدا

ناقصاں را پیرِ کامل، کاملان را رہنما

গঞ্জে বখশ সমগ্র জগতের ফয়েজদাতা, তিনি আল্লাহর নুরের প্রকাশ;

অযোগ্যদের জন্য তিনি কামিল পীর, আর কামিলদের জন্য পথপ্রদর্শক।”

বর্ণনা অনুযায়ী, এই ইখলাস ও আকিদার পর সেই রাতেই হজরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি রুহানি জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেন। এরপর তাঁর অন্তরে হিন্দুস্তানে দ্বীনের দাওয়াত ও খিদমতের দায়িত্ব আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি আজমির শরিফে অবস্থানের নির্দেশ লাভ করেন।

পরবর্তীতে হজরত বাবা ফরিদুদ্দিন গঞ্জে শকর রহমাতুল্লাহি আলাইহিও হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার জিয়ারতের জন্য অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সঙ্গে আগমন করতেন। তিনি অনেক সময় খালি পায়ে হেঁটে সফর করতেন এবং লাহোর জেলা কোর্টের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান করতেন। এরপর মাজার শরিফ থেকে অনুমতি প্রাপ্তির পর তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে, কখনো হাঁটু গেড়ে, জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতেন। তাঁর এই অবস্থানস্থল আজও বিদ্যমান, যা ‘বাবা ফরিদের আস্তানা’ নামে পরিচিত এবং ভক্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জিয়ারতস্থল।[28]

এছাড়াও হজরত বু-আলি কালন্দর পানিপথি রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায়ই দরবারে উপস্থিত হতেন।

হজরত শায়খ হাসান আলাভী সোহরাওয়ার্দি, যিনি হাসান তিলী নামে প্রসিদ্ধ, তিনি প্রায়ই হাজিরা দিতেন।

হজরত খাজা বাকী বিল্লাহ নকশবন্দী দেহলভীও এই আস্থানায় আগমন করেছেন।

হজরত শায়খ মুজাদ্দিদ আলফে সানি সারহিন্দি কুদ্দিসা সিররুহু বহুবার লাহোরে আগমন করেন। তিনি লাহোরকে ইরশাদের কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা হজরত দাতা গঞ্জ বখশের ফয়েজ ও বরকতেরই ফল।

হজরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী তাঁর পীর ও মুরশিদ আবুল মা’আলি কাদেরি লাহোরির সঙ্গে বহুবার লাহোরে আগমন করেন এবং নিঃসন্দেহে এই মহান মাজারে উপস্থিত হয়েছেন।

হজরত শাহ ইনায়াত কাদেরি, যিনি হজরত বুল্লে শাহের পীর ছিলেন, তিনি লাহোরে অবস্থানকালীন সময়ে বহুবার এখানে আসতেন।

হজরত সৈয়্যদ বুল্লে শাহ কাদেরী কসুরি নিয়মিতভাবে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে এখানে হাজিরা দিতেন এবং উপস্থিতির সময় আধ্যাত্মিক উন্মাদনায় কবিতা পাঠ করতেন।[29]

আল্লামা ইকবাল ও হজরত দাতা গঞ্জে বখশ (রহ.):

উপমহাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক-কবি মুহাম্মদ ইকবাল-এর হৃদয়ে হজরত দাতা গঞ্জে বখশ, সৈয়্যদ আলি ইবনে উসমান হুজভিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুরাগ। তিনি রুহানি ফয়েজ ও অন্তর্দীপ্তি লাভের উদ্দেশ্যে প্রায়ই হজরতের মাজার শরিফে হাজির হতেন এবং তাঁকে উপমহাদেশে ইসলামের আধ্যাত্মিক জাগরণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতেন।

আল্লামা ইকবাল যখন তাঁর বিখ্যাত ফারসি কাব্যগ্রন্থ আসরারে খুদি প্রকাশ করেন, তখন সেখানে ‘এক যুবকের কাহিনি, যে শত্রুদের অত্যাচারে পীড়িত হয়ে হজরত সৈয়্যদ মখদূম আলী হুজভীরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির দরবারে এসে ফরিয়াদ করেছিল’ শিরোনামে একটি কাব্যাংশ সংযোজন করেন। এই কবিতায় তিনি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহির আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও উপমহাদেশে তাঁর অসামান্য অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

তিনি লিখেছেন—

سید ہجویر مخدومِ اُمم

مرقدِ او پیرِ سنجر را حرم

সৈয়্যদ হুজভিরি সমগ্র উম্মতের পথপ্রদর্শক;

তাঁর মাজার পীরে সঞ্জর তথা হজরত মুঈনুদ্দিন চিশতি-এর জন্যও হারামের ন্যায় পবিত্র স্থান।

خاکِ پنجاب از دمِ او زندہ گشت

صبحِ ما از مہرِ او تابندہ گشت

তাঁর আধ্যাত্মিক নিঃশ্বাসে পাঞ্জাবের মৃতপ্রায় ভূমি প্রাণ ফিরে পেয়েছে;

তাঁর সূর্যসম প্রভাবে আমাদের প্রভাত আলোকোজ্জ্বল হয়েছে।

عہدِ فاروق از جمالش تازہ شد

حق ز حرفِ او بلند آوازہ شد

তাঁর প্রভাবে ফারুকি যুগের আদর্শ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে;

তাঁর বাণীর মাধ্যমে সত্য দ্বীনের সুনাম ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়েছে।

আল্লামা ইকবালের এই কবিতাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে কেবল একজন সুফি-সাধক হিসেবে নয়; বরং উপমহাদেশে ইসলামের আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের মহান স্থপতি, উম্মতের পথপ্রদর্শক এবং ফয়েজ-বিতরণকারী এক বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে হজরতের ফয়েজ ও বরকতেই পাঞ্জাবের ভূমি ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং সত্য দ্বীনের আহ্বান সুদূরপ্রসারী খ্যাতি লাভ করেছিল।[30]