ইমাম আবুল কাসিম কুশাইরি (রহ.) ছিলেন হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি মনীষী, মুহাদ্দিস ও ফকিহ, যিনি তাসাউফের এক সুশৃঙ্খল রূপ প্রদান করেন। তিনি ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এঁর মাজহাবের অনুসারী, তাঁর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব ভারসাম্য। সার্বিকভাবে, ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর জীবন ছিল জ্ঞান, সাধনা ও সংস্কারের অনন্য সমন্বয়।

নাম ও পরিচয়:

নাম ‘আবদুল করিম’, কুনিয়াত ‘আবুল কাসিম’ এবং উপাধি ‘জয়নুল ইসলাম’। তাঁর সমসাময়িক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ খতিব বাগদাদি (রহ.) তাঁর বংশপরিচয় এভাবে বর্ণনা করেছেন— আবদুল করিম ইবনে হাওয়াজিন ইবনে আবদুল মালিক ইবনে তালহা ইবনে মুহাম্মদ, আবুল কাসিম আল-কুশাইরি আন-নিশাপুরি।[1]

ইমাম যাহাবি (রহ.) তাঁকে নিশাপুরের প্রসিদ্ধ আলেম, শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী, সুফি-সাধক, মুফাসসির এবং বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিসালা’-এঁর রচয়িতা, জাহিদ (দুনিয়াবিমুখ সাধক) ও উস্তাদ পর্যায়ের এক মহান ব্যক্তিত্ব, এসব সম্মানসূচক উপাধিতে অভিহিত করেছেন।[2]

ইমাম সুবকি (রহ.) তাঁর পরিচয় এভাবে উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন নিরঙ্কুশভাবে ‘ইমাম’। একজন সর্বজনস্বীকৃত নেতা। তাঁর রচিত ‘আল-রিসালা’ গ্রন্থটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রসিদ্ধি লাভ করে, আর তাঁর বীরত্ব, যোগ্যতা ও স্বকীয়তা তাঁর সৌভাগ্যের নক্ষত্রকে উদ্ভাসিত করে তোলে। তাঁর মৌলিকতা ও গভীরতা এমন স্তরে উন্নীত হয়েছিল যে, তা উচ্চতার শিখর অতিক্রম করে যায়।

তিনি জ্ঞান ও আমল উভয় ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম ছিলেন; কথা ও কাজে ছিলেন দ্বীনের দৃঢ় স্তম্ভ। তাঁকে ‘ইমামুল আয়িম্মা’ (ইমামদের ইমাম) বলা হতো। তিনি অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির ঘন অন্ধকার দূর করে সত্যের আলো উদ্ভাসিত করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মহান ব্যক্তি, যাঁর অনুসরণ করা হতো সুন্নাহর পথে, এবং তাঁর বক্তব্য মানুষের সামনে জান্নাত ও জাহান্নামের পথকে সুস্পষ্ট করে তুলত।

এক কথায় তিনি ছিলেন ‘শায়খুল মাশায়িখ’ (মাশায়েখদের শায়খ), ‘উস্তাদুল জামা‘আহ’ (সমাজের শিক্ষক), এবং ‘মুকাদ্দামুত তায়িফাহ’ (তরিকার অগ্রগামী শায়খ); যিনি বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন জ্ঞানের শাখাকে একত্রিত করেছিলেন।[3]

জন্ম ও বংশ পরিচয়:

তাঁর পূর্বপুরুষগণ আরব দেশ থেকে হিজরত করে খোরাসানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।

সে সময় খোরাসানের রাজধানী ছিল নিশাপুর। নিশাপুরের নিকটবর্তী ‘উস্তুওয়া’ নামক এক বৃহৎ জনপদে ৩৭৬ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর জন্ম হয়।[4] পিতৃকুলের দিক থেকে তিনি কুশাইরি এবং মাতৃকুলের দিক থেকে ‘সুলাইমি’ বংশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।[5]

শৈশব ও জীবনের মোড় পরিবর্তন:

তিনি শৈশবে অত্যন্ত অল্প বয়সেই পিতৃহারা হন। পিতার ইন্তেকালের পর তাঁকে সাহিত্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল কাসেম আল-ইয়ামানির তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়। তাঁর নিকটেই তিনি আদব তথা নৈতিক ও সাহিত্যিক জ্ঞান অর্জন করেন।

উস্তুয়া নামক স্থানে কুশাইরির একটি ভূসম্পত্তি ছিল, যা অত্যধিক খারাজ বা করের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। সেই সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান বা গণিতের কিছু জ্ঞান অর্জন করেন এবং কিছু সময় প্রশাসনিক দপ্তরে (দিওয়ান) কাজও করেন।

পরবর্তীতে তিনি নিজ জন্মস্থান থেকে নিশাপুর শহরে আগমন করেন। সেখানে আকস্মিকভাবে তিনি বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-এঁর মজলিসে উপস্থিত হন। তাঁর সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও সান্নিধ্য তাঁর অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি তাঁর আকর্ষণ ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েন।

এই মজলিসেই তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়ে যায়। পার্থিব উচ্চাভিলাষ ধীরে ধীরে তাঁর অন্তর থেকে মুছে যেতে থাকে। তিনি যখন বাহ্যিকভাবে দামি পোশাক (কাবা) অনুসন্ধান করছিলেন, তখন বাস্তবে তিনি আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের প্রতীক সাধারণ চটের পোশাকের পথেই ধাবিত হন।

আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.) তাঁর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তাঁকে জ্ঞান অন্বেষণ ও ইলম অর্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন। এখান থেকেই তাঁর জীবনের এক নতুন আধ্যাত্মিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।[6]

জ্ঞানার্জন:

শৈশব ও যৌবনের প্রারম্ভে তিনি অশ্বচালনা ও অস্ত্রবিদ্যায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং এ ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি আরবি ভাষা ও লেখালেখি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং সেখানে অসাধারণ পারদর্শিতা লাভ করেন।

এঁরপর তিনি হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদিস শ্রবণ ও শিক্ষাগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-খাফফাফ (রহ.), আবু নুআইম আবদুল মালিক ইবনে হাসান আল-ইসফারায়েনি (রহ.), আবুল হাসান আল-আলাভী (রহ.), আবদুর রহমান ইবনে ইবরাহিম আল-মুযাক্কী (রহ.), আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ (রহ.), আবু বকর ইবনে ফওরাক (রহ.), আবু নুআইম আহমদ ইবনে মুহাম্মদ (রহ.), আবু বকর ইবনে আবদুস (রহ.), ইমাম সুলামী (রহ.), ইবনে বাকুয়াইহ (রহ.) সহ আরও অনেক আলেম।

ইমাম আবুল কাসিম কুশাইরি (রহ.) ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর আত-তুসি (রহ.), উস্তাদ আবু ইসহাক আল-ইসফারায়েনী (রহ.) এবং ইবনে ফওরাক (রহ.)-এঁর নিকট। তাঁদের নিকট থেকে তিনি ফিকহের শাখা (ফুরু‘) ও মূলনীতি (উসূল)-এ গভীর দক্ষতা অর্জন করেন এবং এ বিষয়ে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে যান।[7]

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরি (রহ.)-এঁর ইলমি মর্যাদা ও গুণাবলি:

কাজি ইবনু খাল্লিকান বলেন, আবুল কাসিম (রহ.) ছিলেন ফিকহ, তাফসির, হাদিস, উসুল, সাহিত্য, কবিতা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে এক বিরল ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেম। তিনি ‘তাফসিরুল কাবির’ রচনা করেন, যা উৎকৃষ্টতম তাফসিরসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ-ছাড়াও তিনি ‘আর-রিসালাহ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা সুফিদের পরিচয় ও অবস্থা সম্পর্কিত।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আবুল হাসান আল-বাখারযী তাঁর ‘দুমিয়াতুল কাসর’ গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলেন, “তাঁর উপদেশের প্রভাব এত গভীর ছিল যে, যদি পাথরও তাঁর সতর্কবাণীর চাবুক দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হতো, তবে তা গলে যেত। আর যদি ইবলিশও তাঁর মজলিসে আবদ্ধ থাকত, তবে সেখানেই তওবা করে ফিরে আসত।”[8]

খতিব বাগদাদী (রহ.) আরো উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, নাহু ও ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, দক্ষ লেখক এবং কবি। তাঁর হস্তাক্ষর ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তিনি ছিলেন সাহসী ও বীরপুরুষ; ঘোড়সওয়ারি ও অস্ত্র ব্যবহারে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল, যার বহু উজ্জ্বল নিদর্শন পাওয়া যায়। তাঁর যুগের সকল আলেম একমত ছিলেন যে, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, যুগের আদর্শ এবং সে সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিরাট বরকত।[9]

উত্তরসূরি:

তাঁর নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁর যোগ্য ও সুযোগ্য সন্তানগণ, যথা: আবদুল্লাহ, আবদুল ওয়াহিদ, আবু নসর আবদুর রাহিম এবং আবদুল মুন‘ইম। এ-ছাড়াও তাঁর থেকে বর্ণনা গ্রহণ করেছেন বহু বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত মনীষী, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— যাহির আশ-শাহামী, তাঁর ভাই ওয়াজীহ, মুহাম্মদ ইবনুল ফজল আল-ফারাবী, আবদুল ওয়াহহাব ইবনে শাহ, আবদুল জব্বার ইবনে মুহাম্মদ আল-খুয়ারী, আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ আল-বাহীরী এবং তাঁর পৌত্র আবু আল-আস‘আদ হিবাতুর রহমান (রহ.)।

এছাড়া আরও বহু আলেম, মুহাদ্দিস ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব তাঁর নিকট থেকে ইলম ও হাদিস গ্রহণ করে পরবর্তী প্রজন্মে তা পৌঁছে দিয়েছেন।[10]

হাদিস শিক্ষাদান:

৪৩৭ হিজরিতে তিনি হাদিসের ‘ইমলা’ (শিক্ষাদানমূলক বর্ণনা) মজলিস শুরু করেন এবং ৪৬৫ হিজরি পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। তিনি তাঁর ইমলাগুলো মাঝে মাঝে নিজস্ব রচিত কবিতার মাধ্যমে অলংকৃত করতেন। কখনো কখনো হাদিস ব্যাখ্যার সময় সূক্ষ্ম ইশারা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের মাধ্যমে তা বিশ্লেষণ করতেন।[11]

কুশায়রি (রহ.)-এঁর রচনাবলি

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশায়রী (রহ.)-এঁর রচনাবলি ইসলামি জ্ঞান, তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাঁর গ্রন্থসমূহ গভীর অর্থবোধ, প্রাঞ্জল ভাষা এবং আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মতার জন্য প্রসিদ্ধ। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. আত-তাফসির আল-কাবির: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাঞ্জল তাফসিরগ্রন্থ, যা সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত ও গভীর ব্যাখ্যার জন্য প্রসিদ্ধ।

২. আর-রিসালাহ আল-কুশায়রিয়্যাহ: এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ও বরকতময় গ্রন্থ। বলা হয়ে থাকে, যে ঘরে এই কিতাব থাকে, সে ঘর বিপদ ও অভাব থেকে নিরাপদ থাকে। এটি বরকত ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

৩. আল-তাহবির ফিত-তাযকির:

৪. আদাবুস সুফিয়্যাহ (সুফিদের শিষ্টাচার)

৫. লাতায়েফুল ইশারাত

৬. কিতাবুল জাওয়াহির

৭. উয়ূনুল আজওয়িবা ফি ফুনূনিল আসইলাহ

৮. কিতাবুল মুনাজাত

৯. কিতাবুন নুকাত উলি আন-নুহা

১০. নাহওয়ুল কুলুব আল-কাবির

১১. নাহওয়ুল কুলুব আস-সাগির

১২. আহকামুস সামা

১৩. কিতাবুল আরবাঈন ফিল হাদিস।

এছাড়াও তাঁর আরও বহু অপ্রকাশিত ও বিক্ষিপ্ত রচনা রয়েছে, যা তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের বিস্তৃতি ও বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ বহন করে।[12]

আকিদা ও মাজহাব:

তিনি আকিদায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আশ‘আরী অনুসারী, এবং ফিকহি দিক থেকে  শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী।[13]

বায়াত ও সোহবত:

তিনি শায়খ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-এঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন এবং আরও অনেক বিশিষ্ট আলেম ও সাধকের সোহবত গ্রহণ করেন।[14] আব্দুল গাফির (রহ.) বর্ণনা করেন যে, ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরি (রহ.) তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তাঁর উস্তাদ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-এঁর নিকট থেকে।

আবার আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.) তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন আবুল কাসিম আন-নাসরাবাদী (রহ.)-এঁর নিকট থেকে। তিনি তা গ্রহণ করেন শিবলী (রহ.)-এঁর কাছ থেকে, শিবলী (রহ.) গ্রহণ করেন ইমাম জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে, জুনাইদ (রহ.) শিক্ষা লাভ করেন সাররি আস-সাকতি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে, সাররি (রহ.) গ্রহণ করেন মারুফ কারখি (রহ.)-এঁর কাছ থেকে, মারুফ কারখি (রহ.) গ্রহণ করেন দাউদ আত-তায়ি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে। আর দাউদ আত-তায়ি (রহ.) তাবেয়িদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।

এভাবেই তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক পথের ধারাবাহিক সিলসিলা বর্ণনা করতেন, যা সরাসরি সালাফদের বরকতময় ও বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক ধারার সাথে সংযুক্ত।[15]

বিবাহ, পরিবার ও সন্তানাদি:

শায়খ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.) তাঁর বহু আত্মীয়-স্বজন থাকা সত্ত্বেও নিজ কন্যাকে তাঁর সঙ্গে বিবাহ দেন।[16] তিনি ছয়জন পুত্রসন্তানের জনক ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর প্রত্যেক পুত্রের নামই ছিল ‘আবদুল্লাহ’, তবে তাদের পরিচয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপনাম ব্যবহার করা হতো। এই সকল সন্তানই তাঁর স্ত্রী সায়্যিদা ফাতিমা (রহ.)-এঁর গর্ভজাত, যিনি ছিলেন তাঁর উস্তাদ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-এঁর কন্যা। এইভাবে ইমাম কুশায়রি (রহ.)-এঁর পরিবার ইলম, তাসাউফ ও বরকতের ধারক হিসেবে ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।[17]

তাঁর পুত্র আবু নাসর আব্দুর রহিম (রহ.) ছিলেন একজন মহান ইমাম। তিনি জ্ঞান ও মজলিসে তাঁর পিতার অনুরূপ ছিলেন। তিনি ইমামুল হারামাইন আবুল মা‘আলী আল-জুয়াইনী (রহ.)-এঁর কাছে নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জন করেন।[18]

হজ পালন:

তিনি হজ পালন করেন এমন এক কাফেলার সঙ্গে, যাতে ইমামুল হারামাইন আল-জুয়াইনি (রহ.)-এঁর পিতা, ইমাম আল-বাইহাকি (রহ.) প্রমুখ বিশিষ্ট আলেমগণ উপস্থিত ছিলেন।[19]

ওয়াজ-নসিহত:

নসিহত ও উপদেশমূলক বক্তব্য, বিশেষত জিকিরের মজলিসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা ও হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনা ছিল অসাধারণ। বাগদাদে তাঁর জন্য একটি বিশেষ ওয়াজ-নসিহতের মজলিসের আয়োজন করা হয়। প্রথম মজলিসেই তিনি সুপরিচিত হাদিসটি বর্ণনা করেন— السفر قطعة من العذاب – অর্থাৎ, “সফর কষ্টের একটি অংশ।”

এ সময় উপস্থিত এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, এটিকে ‘কষ্ট’ বলা হয়েছে কেন? তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উত্তরে বললেন, “কারণ, এটি প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছেদের কারণ।”

এই হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা শ্রোতাদের অন্তরে গভীর আলোড়ন তোলে। উপস্থিত মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে, মজলিসে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবেশ ও উৎকণ্ঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এতটাই প্রভাবিত হয়ে ওঠে যে, তিনি আর বক্তব্য অব্যাহত রাখতে সক্ষম হননি; শেষ পর্যন্ত মজলিস স্থগিত করে মঞ্চ থেকে নেমে আসেন।[20]

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরি (রহ.)-এঁর মর্যাদা:

ইবনুস সাম‘আনি (রহ.) বলেন, আমি আবু বশর মুস‘আব ইবন আবদুর রজ্জাক আল-মুস‘আবি (রহ.)-কে মার্ভে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, একবার ইমাম আবুল কাসিম (রহ.) মার্ভ শহরের এক প্রখ্যাত বিচারকের মজলিসে উপস্থিত হন। তখন তিনি শহরের বিচারপতি ছিলেন। আমার ধারণা, তিনি ছিলেন কাজি আলী আদ-দিহকান। তাঁর আগমনের সময় বিচারক তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যান, এমনকি নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়ান এবং যে বালিশে তিনি হেলান দিতেন তা নিয়ে নির্দেশ দেন যেন তা ইমাম কুশাইরি (রহ.)-কে দেওয়া হয়, যাতে তিনি সেখানে বসেন।

এঁরপর বিচারক বলেন, “হে লোকসকল, আমি একবার হজে গিয়েছিলাম। সেই বছর ঘটনাক্রমে এই মহান ইমামও হজে উপস্থিত ছিলেন।” তিনি ইশারা করে তাঁর দিকে দেখালেন। সেই বছরটি ‘ক্বুযাতের বছর’ নামে পরিচিত ছিল, কারণ সে বছর প্রায় চারশো বিচারক ও ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আলেম ও নেতৃবৃন্দ হজে সমবেত হয়েছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকে কাবা শরিফের কাছে বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সকলে মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে, শুধু ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরি (রহ.)-ই সেখানে বক্তব্য প্রদান করবেন এবং তাঁর কথার ওপর সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেন।[21]

সংগ্রাম, দেশত্যাগ ও সম্মানিত প্রত্যাবর্তন:

তাঁর জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল দ্বীন ও আকিদার কারণে কঠিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সহ্য করা। ৪৪০ থেকে ৪৫৫ হিজরির মধ্যে দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ধর্মীয় মতবিরোধ ও গোঁড়ামি ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় কিছু শাসক ও বিচারক প্রবৃত্তির অনুসরণে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এঁর ফলে নিয়মিত দ্বীনি মজলিসগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাঁর সঙ্গী-সাথিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং হিংসা-বিদ্বেষের কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত তাঁকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠলে তিনি নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রবাস জীবনে বাগদাদে গমন করেন। সেখানে খলিফা আল-কায়িম বি-আমরিল্লাহ (রহ.) তাঁকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে গ্রহণ করেন। খলিফার বিশেষ প্রাসাদে তাঁর জন্য পৃথক মজলিসের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে খলিফা নিজে উপস্থিত থেকে তাঁর নসিহত শ্রবণ করতেন। পরবর্তীতে খলিফার পক্ষ থেকে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার আনুষ্ঠানিক ফরমানও জারি করা হয়।

এঁরপর তিনি পুনরায় নিশাপুরে ফিরে আসেন এবং তূস শহরে পরিবারসহ যাতায়াত করতে থাকেন। অবশেষে ৪৫৫ হিজরিতে সুলতান আলপ আরসালানের বরকতময় শাসনকাল শুরু হলে তাঁর জীবনের কষ্ট ও অস্থিরতার অধ্যায় শেষ হয়। জীবনের শেষ দশ বছর তিনি শান্তি, সম্মান এবং সর্বজনের শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে অতিবাহিত করেন।[22]

ইমাম কুশায়রী (রহ.)-এঁর কাব্যে খোদা প্রীতি:

১.

ثمَّ قَطَعْتُ اللَّيْلَ فِي مَهْمَةٍ

لَا أَسَدًا أَخْشَى وَلَا ذِئْبًا

আমি রাত অতিক্রম করি এক কঠিন সাধনায়,

না কোনো সিংহকে ভয় করি, না নেকড়ে বাঘকে।

২.

يَغْلِبُنِي شَوْقِي فَأَطْوِي السُّرَى

وَلَمْ يَزَلْ ذُو الشَّوْقِ مَغْلُوبًا

আমার আকাঙ্ক্ষা আমাকে কাবু করে ফেলে,

তাই আমি রাতজাগার পথে চলি;

আর প্রেমিক সর্বদাই তার ভালোবাসার কাছে পরাজিত থাকে।

৩.

يَا مَنْ تَقَاصَرَ شُكْرِي عَنْ أَيَادِيهِ

وَكُلُّ كَلِّ لِسَانٍ عَنْ مَعَالِيهِ

হে সেই সত্তা, যার অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আমার ভাষা অক্ষম,

আর সকল জিহ্বা তাঁর মহান মর্যাদা বর্ণনায় অপারগ।

৪.

وُجُودُهُ لَمْ يَزَلْ فَرْدًا بِلا شَبَهٍ

عَلا عَنِ الْوَقْتِ مَاضِيهِ وَآتِيهِ

তাঁর অস্তিত্ব চিরন্তন ও একক, কোনো সাদৃশ্য নেই,

তিনি সময়ের অতীত ও ভবিষ্যতের ঊর্ধ্বে।

৫.

لَا دَهْرَ يَخْلُقُهُ لَا قَهْرَ يَلْحَقُهُ

لَا كَشْفَ يُظْهِرُهُ لَا سِتْرَ يُخْفِيهِ

কোনো যুগ তাঁকে সৃষ্টি করেনি, কোনো শক্তি তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না,

না কোনো প্রকাশ তাঁকে প্রকাশ করে, না কোনো পর্দা তাঁকে গোপন করে।

৬.

لَا عَدَّ يَجْمَعُهُ لَا ضِدَّ يَمْنَعُهُ

لَا حَدَّ يَقْطَعُهُ لَا قَطْرَ يَحْوِيهِ

না কোনো সংখ্যা তাঁকে সীমাবদ্ধ করে, না কোনো বিরোধ তাঁকে বাধা দেয়,

না কোনো সীমা তাঁকে শেষ করে, না কোনো স্থান তাঁকে ধারণ করতে পারে।

৭.

لَا كَوْنَ يَحْصُرُهُ لَا عَوْنَ يَنْصُرُهُ

وَلَيْسَ فِي الْوَهْمِ مَعْلُومٌ يُضَاهِيهِ

না কোনো সৃষ্টিজগৎ তাঁকে ঘিরে রাখতে পারে, না কোনো সহায়তা তাঁর প্রয়োজন,

কল্পনার জগতে তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।

৮.

جَلَالُهُ أَزَلِيٌّ لَا زَوَالَ لَهُ

وَمُلْكُهُ دَائِمٌ لَا شَيْءَ يُفْنِيهِ

তাঁর মহিমা চিরন্তন, তাঁর কোনো ধ্বংস নেই,

তাঁর রাজত্ব স্থায়ী; কোনো কিছুই তাঁকে বিনাশ করতে পারে না।[23]

মুরিদের বৈশিষ্ট্য:

ইমাম কুশায়রী (রহ.)-এঁর পুত্র আবদুল মুনইম বলেন, আমার পিতা বলতেন, “মুরিদ কখনো রাত-দিন ইবাদত থেকে বিরত থাকে না। বাহ্যিকভাবে সে সাধনার পথে সংগ্রামরত, আর অন্তরে সে আত্মসংযম ও মুজাহাদার মধ্যে থাকে। সে বিছানা ত্যাগ করে, কঠিন জীবন গ্রহণ করে, চরিত্র সংশোধন করে এবং কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়।”[24]

তাঁর কারামত:

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরি (রহ.)-এঁর এক সন্তান একবার গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, এমন পর্যায়ে পৌঁছে যান যে, আরোগ্যের আশা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এতে ইমাম অত্যন্ত ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তিনি স্বপ্নে মহান আল্লাহ তায়ালাকে দেখেন এবং তাঁর কাছে নিজের দুঃখ প্রকাশ করেন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নির্দেশ দেন, “তুমি কুরআনের ‘শিফার আয়াতসমূহ’ একত্র করো, তা পাঠ করো, লিখে একটি পাত্রে রাখো, তাতে পানি বা পানীয় তৈরি করো এবং তা তোমার রোগীকে পান করাও।” ইমাম সেই নির্দেশ অনুযায়ী আমল করেন। ফলস্বরূপ আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে তাঁর সন্তান সুস্থতা লাভ করেন।

কুরআনে বর্ণিত ‘শিফার আয়াতসমূহ’ হলো—

১. وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ – আর তিনি মুমিনদের অন্তরসমূহকে সুস্থ করেন।

২. وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ – এটি অন্তরের রোগসমূহের জন্য আরোগ্য।

৩. فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ – এঁর মধ্যে মানুষের জন্য আরোগ্য রয়েছে।

৪. وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ – আমি কুরআন থেকে এমন বিষয় অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।

৫. وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ – আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।

৬. قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ – বলুন, এটি মুমিনদের জন্য হিদায়ত ও আরোগ্য।

ইতিহাসে বহু মাশায়েখ থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা এসব আয়াত রোগীর জন্য লিখে পানিতে ধৌত করে তা পান করাতেন, আল্লাহর কাছ থেকে শিফার উদ্দেশ্যে।[25]

ইন্তেকাল ও শেষ সময়:

ইতিহাসবিদগণ বর্ণনা করেন যে, ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশায়রি (রহ.) জীবনের শেষ অসুস্থ অবস্থাতেও ইবাদতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল ছিলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর একটি রাকাত নামাজও বসে আদায় হয়নি; বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন।

অবশেষে তিনি ৪৬৫ হিজরির ১৬ই রবিউস সানি, রবিবার সকালে আল্লাহর রহমতের কোলে চিরনিদ্রায় শায়িত হন (ইন্তেকাল করেন)। তাঁকে তাঁর মহান উস্তাদ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-এঁর মাদ্রাসার পাশেই দাফন করা হয়, যেন উস্তাদ-শাগরেদের সেই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক মৃত্যুর পরও একত্রিত থাকে।[26]