হজরত মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইসলামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘শায়খুল আকবর’ নামে সুপরিচিত। তাঁর জীবন তাসাউফ, ইলম ও ইলাহি প্রেমের এক অনন্য সমন্বয়, যা কুরআন-সুন্নাহর গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি শুধু একজন সুফি-সাধক নন; বরং এমন এক চিন্তাবিদ, যিনি মানব আত্মা ও আল্লাহর সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর রচনাবলি ও আধ্যাত্মিক দর্শন যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে প্রভাবিত করে আসছে।
জন্ম ও প্রাথমিক পরিচিতি:
প্রখ্যাত ইমাম, অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, হাফিজুল হাদিস এবং বিচারপতি (কাজি) ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত। পূর্ণ নাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল আরাবি আল-আন্দালুসি আল-ইশবিলি আল-মালিকি। তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থের রচয়িতা। ইবনে বাশকুয়াল তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার জন্ম ৪৬৮ হিজরিতে।”[1]
জ্ঞানার্জন:
শৈশবে তিনি তাঁর মামা হাসান ইবনে উমর আল-হাওযানি এবং আন্দালুসের একদল বিশিষ্ট আলেমের নিকট ইলম অর্জন করেন। অতঃপর তাঁর পিতার সঙ্গে ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সফরে বের হন। এ জ্ঞানসন্ধানী ভ্রমণে তাঁরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ নগরীতে খ্যাতিমান আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাদের নিকট থেকে হাদিস ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞান আহরণ করেন।
বাগদাদে তিনি তিরাদ ইবনে মুহাম্মদ আজ-জাইনাবি, আবু আবদুল্লাহ আন-নিআলি, আবু খাত্তাব ইবনুল বাতির, জাফর আস-সাররাজ, ইবনে তুয়ুরি প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিসের নিকট হাদিস শ্রবণ করেন। এভাবে দামেস্কে ফকিহ নাসর ইবনে ইব্রাহিম আল-মাকদিসি ও আবুল ফজল ইবনুল ফুরাতসহ একদল আলেমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বাইতুল মুকাদ্দাসে মাক্কি ইবনে আবদুস সালাম আজ-জামিলির নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। মক্কা মোয়াজ্জমায় পবিত্র হারামে ফকিহ হুসাইন ইবনে আলী আত-তাবারির কাছে ইলম শিক্ষা লাভ করেন। মিশরে কাজি আবুল হাসান আল-খুলায়ি এবং মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে দাউদ আল-ফারিসি প্রমুখ আলেমের নিকট থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। অর্থাৎ, তাঁর এই সফর কেবল ভ্রমণই ছিল না; বরং জ্ঞান, সাধনা ও আত্মগঠনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি ফিকহশাস্ত্রে দীক্ষা লাভ করেন ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.), ফকিহ আবু বকর আশ-শাশী এবং প্রখ্যাত আলেম ও সাহিত্যিক আবু জাকারিয়া আত-তাবরিজিসহ আরও একদল বিদ্বানের নিকট।
ইবনে আসাকির উল্লেখ করেন যে, তিনি দামেস্কে অবস্থানকালে আবু বারাকাত ইবনে তাউস ও আশ-শরিফ আন-নাসীবের কাছ থেকেও হাদিস শ্রবণ করেন। তাঁর নিকট থেকে আবদুর রহমান ইবনে সাবির ও তাঁর ভাই, আহমদ ইবনে সালামা আল-আব্বার প্রমুখ হাদিস বর্ণনা করেছেন। অতঃপর ৪৯১ হিজরিতে আন্দালুসে প্রত্যাবর্তন করেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাঁর সফরকালেই পিতার ইন্তিকালের পর (সম্ভবত বায়তুল মুকাদ্দাসে) দাফন সম্পন্ন করে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে তিনি রচনা, সংকলন ও জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাষী, বাগ্মী ও প্রভাবশালী বক্তা।[2]
উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ:
তাঁর নিকট থেকে বহু আলেম হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর ছায়াতলে থেকে অনেক বড়ো বড়ো ইমাম তৈরি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— হাফিজ আব্দুল খালিক ইবনে আহমদ আল-ইউসুফি, ইশবিলিয়্যার কাজি আহমদ ইবনে খালাফ, হাফিজ আবু কাসিম আস-সুহাইলি (বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ ‘আর-রওদুল উনুফ’-এর লেখক), মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ ইবনে সাআদাহ, আলী ইবনে আহমদ ইবনে লাব্বাল আশ-শারিশি ইত্যাদি।
আন্দালুসে তাঁর নিকট থেকে সরাসরি (ইজাজতের মাধ্যমে) হাদিস বর্ণনাকারী সর্বশেষ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আবুল হাসান আলী ইবনে আহমদ আল-শাকুরি এবং বণিক আহমদ ইবনে উমর আল-খাজরাজি, যারা ৬১৬ হিজরি পর্যন্ত তাঁর বর্ণিত হাদিস শুনিয়েছেন। ইবনুল আরাবি মূলত আন্দালুসে উচ্চমানের ‘ইসনাদ’ (হাদিসের উচ্চতর সূত্র) এবং অগাধ ইলমের এক বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে এসেছিলেন।[3]
রচনাবলি ও অনন্য বৈশিষ্ট্য:
হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাফসির, হাদিস, সিরাত, সাহিত্য, তাসাউফ, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং কাব্যসহ বহুবিধ জ্ঞানের শাখায় অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন। তাঁর জ্ঞান-প্রতিভা যেমন বিস্তৃত ছিল, তেমনি তাঁর কলমও ছিল অত্যন্ত উর্বর।
আল্লামা আব্দুর রহমান জামী (রহ.) তাঁর রচনাসংখ্যা সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, বাগদাদের এক প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর প্রশংসায় একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং সেখানে বলেন, শায়খের রচনার সংখ্যা পাঁচ’শরও অধিক। অন্যদিকে, শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) নিজেই তাঁর ইন্তেকালের কয়েক বছর পূর্বে বন্ধুদের অনুরোধে একটি রিসালায় নিজের রচনাবলির তালিকা প্রদান করেন, যেখানে ২৫০টিরও বেশি কিতাবের নাম পাওয়া যায়। এদের অধিকাংশ তাসাউফ বিষয়ক, আর কিছু অন্যান্য শাস্ত্রের অন্তর্গত।
এ-ছাড়া শায়খ আবুল হাসান আলী ইবনে ইব্রাহিম কারী বাগদাদি (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আদ-দুররাতুস সামিন ফি মানাকিবিশ শায়খ মুহিউদ্দীন”-এ শায়খ আকবরের নামে ৫০০’রও বেশি কিতাবের উল্লেখ করেছেন। উস্তাদ কুরকিস আওয়াদ তাঁর “আয-যাখায়েরুশ শারকিয়্যাহ” গ্রন্থে এই সংখ্যা ৫২৭টি বলে নির্ধারণ করেছেন।
অপরদিকে, আধুনিক যুগের গবেষক ডক্টর উসমান ইয়াহইয়া গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি (রহ.)’র সাথে সম্পর্কিত ৯৯১টি কিতাব ও রিসালার সন্ধান পেয়েছেন। তাঁর এই গবেষণা পরবর্তীতে আরবিতে “মুয়াল্লাফাতু ইবনে আরাবি: তারিখুহা ওয়া তাসনিফুহা” নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়, যা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শায়খুল আজহার ড. আহমদ মুহাম্মদ আত-তাইয়্যেব-এর অনুবাদে সমৃদ্ধ।
এত বিপুল পরিমাণ গ্রন্থ রচনার কারণ সম্পর্কে শায়খ আকবর (রহ.) নিজেই বলেন, “আমি অন্যান্য লেখকদের মতো শুধু গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যে লিখিনি; বরং অনেক সময় আমার অন্তরে এমন সব বিস্ময়কর সত্য ও গূঢ় রহস্য উদ্ভাসিত হতো যে, যদি আমি তা লিখে না রাখতাম, তবে সেই অন্তর্দাহ আমাকে ব্যাকুল করে তুলত। তাই বাধ্য হয়েই আমি সেগুলোকে লেখার রূপ দিয়েছি। আবার কখনো স্বপ্নে বা কাশফের অবস্থায় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে লেখার নির্দেশ পেতাম, আর আমি কেবল সেই নির্দেশই পালন করেছি।”
এই বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয়, তাঁর রচনাবলি নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ফল নয়; বরং তা ছিল গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, ইলহাম ও কাশফের ফসল।
শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) হাকিকত, মারিফত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের এমন উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে। এজন্য তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর ১১৭টি কিতাব ও রিসালা এমন রয়েছে, “যেগুলোর রচনার নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা আমাকে দিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করার অনুমতি দেননি।”
এই শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের মধ্যে রয়েছে কিতাবুল আহাদিয়্যাহ, কিতাবুল আইন, কিতাবুল বিলায়াহ এবং ফুসুসুল হিকাম ইত্যাদি।
শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে—
১. তাফসিরে ইবনে আরাবি
২. আল-মুসাল্লাছাতুল ওয়ারিদাতু ফিল কুরআন
৩. আল-মুসাব্বাআতুল ওয়ারিদাতু ফিল কুরআন
৪. আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ ফি শারহি কালামিল হাল্লাজ
৫. আল-ইহতিফাল ফি মা কানা আলাইহি রসুলুল্লাহ ﷺ মিন সুনানিল আহওয়াল
৬. আত-তাদবীরাতুল ইলাহিয়্যাহ ফি ইসলাহিল মামলাকাতিল ইনসানিয়্যাহ
৭. কাশফুল মা‘না আন সিররি আসমাইল্লাহিল হুসনা
৮. জালাউল কুলুব
৯. আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ
১০. ফুসুসুল হিকাম
১১. আল-জাম‘উ ওয়াত-তাফসিল ফি আসরারি মাআনিত তানজীল
১২. আল-জাযওয়াতুল মুকতাসাবাহ ওয়াল খাতরাতুল মুখতালাসাহ
১৩. মিফতাহুস সা‘আদাহ ফি মারিফাতিল মাদখাল ইলা তারিকিল ইরাদাহ
১৪. মুবাইয়াআতুল কুতুব বি-হাদরাতিল কুরব
১৫. আল-মুহকাম ফিল মাওয়াঈয ওয়াল হিকাম ওয়া আদাবি রসুলিল্লাহ ﷺ
১৬. আল-মিজান ফি সিফাতিল ইনসান
১৭. আদ-দালীল ফি ইদাহিস সাবীল
১৮. আল-মুনতাখাব ফি সাইরিল কুরব
১৯. নাতায়িজুল আযকার ওয়া হাদায়েকুল আযহার
২০. হিলইয়াতুল আবদাল ওয়া মা ইয়াজহারু মিনহাল মাআরিফ ওয়াল আহওয়াল।
এইভাবে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর রচনাবলি শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়; বরং বিষয়বৈচিত্র্য, গভীরতা ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকেও অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত, যা ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ ও মহিমান্বিত করেছে।[4]
দেশে দেশে মুসাফির বেশে:
১২০১/১২০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রাচ্যের দেশসমূহে দীর্ঘ বারো বছরের এক সফরে রওনা হন। এই সফর ছিল জ্ঞান-সন্ধান, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং সৎ সঙ্গ লাভের অনন্য যাত্রা। এ সময় তিনি বিভিন্ন দেশের আলেম-উলামা ও মাশায়েখদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পাশাপাশি তাঁর মূল্যবান গ্রন্থসমূহ রচনার কাজও অব্যাহত রাখেন।
এই সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল, তিনি এমন এক সঙ্গী লাভ করেন, যিনি প্রায় বিশ বছরেরও অধিক তাঁর সাহচর্যে ছিলেন। তিনি হলেন আনাতোলিয়ার প্রখ্যাত শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক ইবনে ইউসুফ। দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর মালতিয়ার অধিবাসী এই মহাপুরুষ কেবল একজন উচ্চপদস্থ সেলজুক কর্মকর্তা-ই ছিলেন না; বরং ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি-সাধক। সমকালীন বাদশাহগণ তাঁর ওপর গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
শায়খ মজিদ উদ্দিন দীর্ঘ সময় বাগদাদে অবস্থান করেছিলেন। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করলে সর্বপ্রথম শায়খ আকবর ইবনুল আরাবি (রহ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এই সাক্ষাৎ ধীরে ধীরে গভীর বন্ধুত্ব ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয়।
পরবর্তীতে, ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) প্রাচ্যের ইসলামি অঞ্চলসমূহ তথা ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক ও আনাতোলিয়া সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন শায়খ মজিদ উদ্দিন তাঁকে ঐসব দেশের শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
শায়খ মজিদ উদ্দিনের এক পুত্রসন্তান ছিল, যার নাম সদরুদ্দিন কুনাভি। পরবর্তীতে তিনি শায়খুল আকবরের প্রধান খলিফা হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন এবং তাসাউফের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন।
শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসে স্বল্পকাল অবস্থান করেন। সেখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ’র অংশবিশেষসহ আরও কিছু ছোটো কিতাব রচনা করেন।
এরপর ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে তিনি বাগদাদে আগমন করেন। সে সময় সেলজুক শাসক কায়খসরু আউয়াল শায়খ মজিদ উদ্দিনকে বাগদাদে তাঁর রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফলে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর মাধ্যমেই আব্বাসীয় খলিফা আন-নাসিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।
বাগদাদ অবস্থানকালে তিনি হজরত শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাঁর খলিফাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে আবুল সাউদ ইবনে শিবলী অন্যতম, যার কথা শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ করেছেন।
এভাবে বাগদাদ সফর শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর জীবনে শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না; বরং এটি ছিল জ্ঞান, সাধনা ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের এক মহিমান্বিত অধ্যায়, যা তাঁর চিন্তাধারা ও রচনাবলিকে আরও গভীর ও সমৃদ্ধ করেছে।
মসুল সফর: এপ্রিল মাসে হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) মসুল নগরীতে (ইরাকের একটি শহর) আগমন করেন এবং সেখানে পবিত্র রমজান মাসের সম্পূর্ণ সময় ইবাদত, মুজাহাদা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় অতিবাহিত করেন। এই বরকতময় অবস্থানকালে তিনি ‘তানজিলাতুল মোসেলিয়া’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি ‘কিতাবুল জালাল ওয়াল জামাল’ এবং মুরিদদের হিদায়াত ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে আরও একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
মসুলে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে আলী ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জামে (রহ.)-এঁর সঙ্গে। তিনি ছিলেন সে যুগের অন্যতম খ্যাতনামা সুফি ও আরিফ, যিনি গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মারিফতে সমৃদ্ধ ছিলেন। হজরত খিজির (আ.)-এঁর সঙ্গে তাঁর বিশেষ রুহানি সম্পর্ক ছিল বলেও প্রসিদ্ধি রয়েছে। শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর সান্নিধ্যে এসে ইলম ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অসামান্য ফয়েজ লাভ করেন।
আলী ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) মসুল শহরের উপকণ্ঠে তাঁর নিজ বাগানে শায়খুল আকবরকে সেই বরকতময় খিরকা পরিয়ে দেন, যা তিনি নিজ হাতে হজরত খিজির (আ.) থেকে লাভ করেছিলেন।
তবে উল্লেখযোগ্য যে, এই ঘটনারও বহু পূর্বে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাকিউদ্দীন আবদুর রহমান ইবনে আলী ইবনে মাইমুন ইবনে আবু উযরী (রহ.)-এঁর মাধ্যমে ‘খিরকা-এ-খিজির’-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। এই মসুল সফর শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর আধ্যাত্মিক জীবনে এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে ইলম, আমল ও রুহানিয়ত অপূর্ব সমন্বয়ে বিকশিত হয়েছে।
কুনিয়ায় অবস্থান: মসুল থেকে হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর প্রিয় বন্ধু ও অন্তরঙ্গ সঙ্গী শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক এবং বদর আল-হাবাশিকে সঙ্গে নিয়ে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে মালতিয়া (তুরস্কের একটি শহর) নগরীতে আগমন করেন, যা ছিল মজিদ উদ্দিনের জন্মস্থান।
এরপর সুলতান প্রথম কায়কাউসের আন্তরিক আমন্ত্রণে শায়খ মজিদ উদ্দিন ও শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) কুনিয়া নগরীতে গমন করেন। সেখানে তাঁদেরকে অত্যন্ত সম্মান ও রাজকীয় সংবর্ধনায় বরণ করে নেওয়া হয়। সুলতান পূর্ব থেকেই শায়খের আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও অসাধারণ গুণাবলি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই তিনি অনুরোধ করেন, যেন শায়খ কুনিয়ায় অবস্থান করেন এবং তাঁর জন্য এক লক্ষ দিরহাম মূল্যের এক বিশাল প্রাসাদ বরাদ্দ করার নির্দেশ প্রদান করেন।
শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) দীর্ঘদিন সেই প্রাসাদে অবস্থান করেন। কিন্তু তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত হলো— একদিন কয়েকজন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি সাহায্যের আবেদন করলে তিনি বলেন, “আমার কাছে এই বাড়িটি ছাড়া আর কিছুই নেই।” অতঃপর তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পুরো বাড়িটিই তাঁদের দান করে দেন!
কুনিয়ায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর ইলমি ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। এ সময় তিনি ‘মুশাহাদাতুল আসরার’ ও ‘রিসালাতুল আনোয়ার’ নামক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন। পাশাপাশি সুফি-সাধক ও আরিফদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, মুরিদ ও ছাত্রদের শিক্ষা প্রদান এবং আত্মিক প্রশিক্ষণের কাজও সমানভাবে চালিয়ে যান।
কুনিয়াতেই ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর সঙ্গে মহান আরিফ ও সুফি আওহাদুদ্দিন হামেদ কিরমানি (রহ.)-এঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এই সাক্ষাৎ ধীরে ধীরে গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়। উল্লেখ্য, এই সাক্ষাতটি ‘কিতাবুল আমরুল মুহকাম’ গ্রন্থ সমাপ্তির সময় সংঘটিত হয়।
শায়খের কুনিয়ায় অবস্থানকাল ছিল প্রায় নয় মাস। এরপর তিনি পুনরায় মালতিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। ইউসুফ আগার একটি পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী, তিনি ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে মালতিয়ায় পৌঁছান।
পরবর্তীতে সুলতান কায়খসরুর পুত্র কায়কাউস মালতিয়ার সুলতান নিযুক্ত হন এবং শায়খ মজিদ উদ্দিনকে তাঁর বিশেষ শিক্ষক (আতালিক) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইসাথে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) নিজেও তরুণ সুলতানের উস্তাদ ছিলেন। উস্তাদ ও শাগরেদের এই সম্পর্ক দীর্ঘ তেরো বছর পর্যন্ত অটুট ছিল, যা কেবল রাজনৈতিক নয়; বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষার অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সিরিয়া ও মিশর সফর এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা: ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) বায়তুল মুকাদ্দাস ও মক্কা শরিফ সফরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম সফর, যার মাধ্যমে তিনি সিরিয়া, আলেপ্পো এবং দামেস্ক অতিক্রম করেন। যার মধ্যে পরবর্তীতে দামেস্কই তাঁর স্থায়ী আবাসস্থলে পরিণত হয়।
বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানকালে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। যেমন, ‘কিতাবুল ইত্তিবা’, ‘ইশারাতুল কুরআন’ এবং ‘তানজিলাতুল মাওসেলিয়া’-সহ আরও কিছু রিসালা। এরপর মে মাসে তিনি হেবরন গমন করেন। সেখানে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পবিত্র মাজারের নিকট বসে তিনি ‘কিতাবুল আনফাস’ রচনা করেন এবং তাঁর মুরিদ ও খলিফাদের ‘রুহুল কুদুস’-এর পাঠ দান করেন। অতঃপর ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন বা জুলাই মাসে তিনি হজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাত্রা করেন।
কায়রোতে অবস্থান ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা:
১২০৭ খ্রিষ্টাব্দে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর আন্দালুসীয় বন্ধু আবুল আব্বাস হারিরি, তাঁর ভাই মুহাম্মদ আল-খাইয়্যাত এবং আবদুল্লাহ আল-মাওরোবির সঙ্গে কায়রোতে অবস্থান করেন। কায়রোতে অবস্থানকালে তিনি এক গভীর ও বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দেখেন, যা ‘মুহাজিরাতুল আবরার’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষেপে তার মর্মার্থ হলো, এক রাতে তিনি নেককারদের একটি দলের সঙ্গে একটি অন্ধকার কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সেখানে বাহ্যিক কোনো আলো না থাকলেও তাঁদের অন্তরের নুর দ্বারা পুরো পরিবেশ আলোকিত হয়ে ওঠে।
এ সময় সুন্দর চেহারার ও মধুর কণ্ঠের এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলেন, “আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি।” শায়খ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “জেনে রাখো, সমস্ত কল্যাণ অস্তিত্বের মধ্যে এবং সমস্ত অকল্যাণ অনস্তিত্বের মধ্যে নিহিত। আল্লাহ মানুষকে তাঁর রহমত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে এমন এক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যার বাহ্যিক অস্তিত্ব আল্লাহর অস্তিত্ব থেকে ভিন্ন মনে হলেও তার মধ্যে আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি) প্রকাশিত। যখন পরম সত্তার (জাত) প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়, তখন গুণাবলির দিকে মনোযোগ বিলুপ্ত হয়ে যায়; তখন তিনি তাঁর নিজের সত্তা দ্বারা সত্তাকে প্রত্যক্ষ করেন। বহুত্ব তখন একত্বে বিলীন হয়ে যায়। অবশেষে না থাকে ‘সত্তা’, না থাকে ‘তুমি’।” এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীতে ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ তত্ত্ব হিসেবে হাজির হয়।
কায়রোতে রচনা ও বিরোধিতা: কায়রোতে অবস্থানকালে তিনি ‘রুহুল কুদুস’র পাঠদান ছাড়াও ‘কিতাবুল ইলহাম’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সে সময় শায়খ আধ্যাত্মিক রহস্য ও মারিফাতের গভীর বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করছিলেন। ফলে সমকালীন কিছু ফকিহ তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। তাঁরা তাঁকে বিদআতি বলে আখ্যায়িত করেন, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে কুফরির ফতোয়া প্রদান করে তাঁকে বন্দি বা হত্যা করার দাবি পর্যন্ত তোলেন।
তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও সহানুভূতিশীল বন্ধু শায়খ আবুল হাসান আস-সাফাই (রহ.)-এঁর দৃঢ় প্রচেষ্টায় তিনি মুক্তি লাভ করেন। ‘নাফহুত তিব’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, “মিশরের লোকেরা তাঁর বিরোধিতা করেছিল এবং তাঁর রক্তের পিপাসু হয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা শায়খ আবুল হাসান আস-সাফাইয়ের মাধ্যমে তাঁকে মুক্ত করেন। তিনি তাঁর মুক্তির জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালান এবং তাঁর বক্তব্যের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। মুক্তির পর তিনি বলেন, “তাকে কীভাবে বন্দি করা যায়, যার মানবসত্তার গভীরে ঐশ্বরিক জ্যোতি প্রবাহিত?”
এইভাবে কায়রো সফর শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর জীবনে একদিকে যেমন গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অধ্যায়, তেমনি অন্যদিকে কঠিন পরীক্ষার ও বিরোধিতার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান লাভ করে।
মক্কা, সিরিয়া ও ইরাক সফর এবং দামেস্কে স্থায়ী বসবাস: ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দে হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) পুনরায় মক্কা শরীফে গমন করেন। তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল হজ আদায়, নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগি, লেখালিখি, অধ্যয়ন এবং আরিফ ও নেককার ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আধ্যাত্মিক আলোচনা। সেখানে তিনি আবু শুজা ইবনে রুস্তমের বাসভবনে অবস্থান করেন।
পরবর্তীতে উত্তরের দিকে সফর করে দামেস্কে আগমন করেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর প্রায় সাত-আট বছর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, মারিফত প্রচার এবং তাসাউফের জ্ঞান বিস্তারে নিবেদিত থাকেন। এই সময় তিনি আনাতোলিয়া, আলেপ্পো, দামেস্ক, বাগদাদ এবং কায়রোর মধ্যে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করেন, যা তাঁর জীবনের এক বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আনাতোলিয়া তথা তুরস্কের মালতিয়া তাঁর নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক (রহ.)-এঁর অবস্থান ছিল সেখানেই। সফরের আগ্রহ ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের তাড়নায় তিনি কুনিয়া থেকে যাত্রা করে কাইসারিয়া, মালতিয়া ও সিভাস (এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন শহর) হয়ে ইরান সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চলে পৌঁছান।
এরপর তিনি আরমেনিয়ার এরজুরুম অতিক্রম করে ইরাকের হাররান এবং দিয়ার বকর অঞ্চলের দিনিসার নামক স্থানে অবস্থান করেন। সফরের এক পর্যায়ে তিনি এমন এক স্থানে পৌঁছান, যেখানে প্রচণ্ড শীতে ফোরাত নদীর পানি সম্পূর্ণভাবে জমে বরফে পরিণত হয়েছিল। এমনকি কাফেলাগুলো সেই বরফের ওপর দিয়েই নদী পার হচ্ছিল। এই কঠিন সফরপথে তিনি যে-সব শহর অতিক্রম করেন, সেখানকার বহু সুফি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
পুনরায় বাগদাদ সফর: ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে (৬০৮ হিজরি) তিনি পুনরায় বাগদাদে গমন করেন। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই সফরে শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক (রহ.)-ও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি তখন আনাতোলিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে বাগদাদে গিয়ে আব্বাসীয় খলিফা আল-নাসিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে শায়খের পরিবার উত্তরাঞ্চলীয় কাফেলার সঙ্গে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। বাগদাদে এই স্বল্পকালীন অবস্থানকালে দুইজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুদ দুবাইছি এবং ইবনুন নাজ্জার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ইবনুদ দুবাইছি তাঁর সাক্ষাতের বর্ণনায় বলেন, “মাগরিবে জন্মগ্রহণকারী আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনুল আরাবি ৬০৮ হিজরিতে বাগদাদে আগমন করেন। তিনি সুফিবাদি জ্ঞানে গভীর পারদর্শী ছিলেন এবং তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা সত্যের অনুসন্ধান, দুনিয়াবিমুখতা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি দামেস্ক, সিরিয়া ও হিজাজের বহু সুফিকে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে দেখেছি। তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও মুরিদ রয়েছে। তাঁর কিছু রচনা আমি অধ্যয়ন করেছি, যা স্বপ্ন ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা, যেখানে নবী করিম ﷺ স্বপ্নে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়। আমাদের সাক্ষাতে আমরা এ ধরনের বহু বিষয় পরস্পর আলোচনা ও লিপিবদ্ধ করি।”
এই সময় বাগদাদে (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী মক্কায়) প্রখ্যাত সুফি শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু হাফস ওমর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এঁর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ছিলেন বাগদাদের বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং আব্বাসীয় খলিফা আল-নাসিরের ব্যক্তিগত শিক্ষক।
আলেপ্পোতে কিছুকাল অবস্থান: পরবর্তী তিন বছরের শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জানা যায়, তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র ও সঙ্গী ইবনে সুদকিনের জন্মস্থান আলেপ্পোতে কিছু সময় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইবনে সুদকিনের রচিত “শারহে তাজাল্লিয়াত” গ্রন্থের ওপর একটি মূল্যবান ভূমিকা রচনা করেন, যা তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘তরজুমানুল আশওয়াক’ রচনা ও সমালোচনার জবাব: ১২১৩ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১১ হিজরির রজব, শাবান ও রমজান মাসে হজরত শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মক্কা শরীফে গমন করেন। সেখানে অবস্থানকাল ছিল মাত্র তিনমাস। উল্লেখ্য, তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও উস্তাদ শায়খ আবু শুজা মাকিনুদ্দিন রুস্তম (রহ.) দুই বছর পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন। তখন শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর বয়স ছিল প্রায় ৫০ বছর।
মক্কায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ ‘তরজুমানুল আশওয়াক’ সংকলন করেন। এই গ্রন্থ রচনার পরপরই তিনি পুনরায় আলেপ্পো গমন করেন। কিন্তু সেখানে এই কাব্যগ্রন্থকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা, সন্দেহ এবং অপবাদের সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বদর আল-হাবাশি এবং আধ্যাত্মিক পুত্র ইবনে সুদকিনের অনুরোধে তিনি উক্ত কাব্যগ্রন্থের একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম দেন ‘যাখায়েরুল আ‘লাক’।
শায়খ তাঁর ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহতে এই ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, “এই কবিতাগুলোর ব্যাখ্যা লেখার কারণ হলো আমার আধ্যাত্মিক পুত্র বদর আল-হাবাশি এবং ইসমাইল ইবনে সুদকিন অনুরোধ করেছিলেন যে, আমি যেন সমালোচকদের জবাব প্রদান করি। তারা শুনেছিল যে, আলেপ্পোর কিছু ফকিহ দাবি করেছেন, এই কবিতাগুলো কোনো আধ্যাত্মিক রহস্য নয়; বরং পার্থিব প্রেমের প্রকাশ। তারা বলেছিল, ইবনুল আরাবি যেহেতু একজন পরহেজগার ও দ্বীনদার ব্যক্তি, তাই তিনি পার্থিব প্রেমকে আড়াল করার জন্য আধ্যাত্মিকতার ভাষা ব্যবহার করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “অতঃপর আমি কবিতাগুলোর ব্যাখ্যা রচনা করলাম। কাজি ইবনে নাদিম সেই ব্যাখ্যার কিছু অংশ ফকিহদের এক সমাবেশে পাঠ করেন। তা শোনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুতপ্ত হন এবং আমার প্রতি আপত্তি করা থেকে বিরত থাকেন।”
শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) আরও বলেন, “আমি আল্লাহর নিকট ইস্তিখারা করে এই কবিতাগুলোর ব্যাখ্যা রচনা করেছি, যেগুলো আমি মক্কায় রজব, শাবান ও রমজান মাসে লিখেছিলাম। এসব কবিতায় আমি ইলাহি মারিফাত, নুরে ইলাহি, আধ্যাত্মিক রহস্য এবং আকলি ও শরয়ি জ্ঞানের গভীর ইঙ্গিত প্রদান করেছি। আমি এগুলোকে প্রেমের ভাষায় প্রকাশ করেছি, কারণ মানুষ সাধারণত এই ভাষার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় এবং মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করে। প্রেমের ভাষা মূলত সূক্ষ্ম হৃদয় ও রুচিশীল সুফিদের ভাষা।”
তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, “যদি আমি কবিতায় বলি, ভাগ্য আমাকে নজদ বা অন্য কোনো স্থানে নিয়ে গেছে; কিংবা বলি মেঘ কেঁদেছে আর ফুল হেসেছে; অথবা পূর্ণিমার চাঁদ হারিয়ে গেছে, সূর্য উদিত হয়েছে, বাতাস বয়েছে, বজ্রপাত হয়েছে, এসব কেবল বাহ্যিক চিত্র নয়। বরং এগুলোর মাধ্যমে আমি গভীর হাকিকত ও আধ্যাত্মিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছি। আমি চাই পাঠক যেন বাহ্যিক অর্থে আটকে না থেকে অন্তর্নিহিত অর্থ ও নুরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা এই সূক্ষ্ম ইলহাম আমার হৃদয়ে অবতীর্ণ করেছেন।”
আনাতোলিয়া বিজয়, জালালুদ্দিন রুমির সাথে সাক্ষাৎ এবং বিয়োগান্তক ঘটনাপ্রবাহ: ১২১৩ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১২ হিজরির রমজান মাসে তিনি সিওয়াসে গমন করেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি সুলতান কায়কাউসের আনতালিয়া বিজয় সম্পর্কে এক স্বপ্ন লাভ করেন। সিওয়াস থেকে তিনি মালতিয়া চলে আসেন এবং সেখান থেকে সুলতানের উদ্দেশ্যে এক কাব্যময় পত্র প্রেরণ করেন, যেখানে তিনি স্বপ্নে প্রাপ্ত বিজয়ের সুসংবাদ বর্ণনা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, এই স্বপ্নের প্রায় বিশ দিন পর, ঈদুল ফিতরের দিন সুলতান বাস্তবেই আনাতোলিয়া বিজয় করেন।
এরপর ১২১৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আলেপ্পো গমন করেন এবং সেখানে সুলতান মালিকুজ জাহিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যিনি সেই বছরই ইন্তেকাল করেন। সুলতান তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজন ও আবেদন তাঁর মাধ্যমে সুলতানের নিকট পেশ করত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা গ্রহণ করা হতো।
একবার তিনি সুলতানের নিকট জনসাধারণের ১১৮টি আবেদন উপস্থাপন করেন। সুলতান সেগুলো এক বৈঠকেই অনুমোদন করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সুপারিশে এক রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতক দরবারির প্রাণভিক্ষাও মঞ্জুর করা হয়, যিনি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করেছিলেন।
১২১৬–১২১৭ খ্রিষ্টাব্দে কুনিয়া বা মালতিয়ায় তাঁর সাথে জালালুদ্দিন রুমি (রহ.)-এঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ (রহ.)-এঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তখন জালালুদ্দিন রুমি (রহ.)-এঁর বয়স ছিল মাত্র আট-নয় বছর এবং তিনি তাঁর পিতার সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন। বিদায়ের সময় শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তরুণ রুমিকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেন, “কী বিস্ময়কর দৃষ্টি! যেন এক অতল সমুদ্র (বাহরুল মুহীত)!”
মাওলানা রুমির জীবনীতে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর সাথে আরও একটি সাক্ষাতের বর্ণনাও পাওয়া যায়। এ-ছাড়া রুমি ও তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য সদরুদ্দিন কুনাভি (রহ.)-এঁর গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১২২১ সালের বেদনা ও বিচ্ছেদ:
১২২১ খ্রিষ্টাব্দ ছিল শায়খের জীবনের এক গভীর দুঃখের বছর। এ বছর তাঁর দীর্ঘদিনের সফরসঙ্গী ও অন্তরঙ্গ বন্ধু শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক (রহ.) ইন্তেকাল করেন। শায়খ মজিদ উদ্দিন ইসহাক (রহ.)-এঁর পুত্র সদরুদ্দিন কুনাভি (রহ.)-এঁর বয়স তখন মাত্র সাত-আট বছর ছিল। শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁর লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং পরবর্তীতে মজিদ উদ্দিনের বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেন। একই বছর তাঁর আরেক বিশ্বস্ত সঙ্গী বদর আল-হাবাশি (রহ.)-ও ইন্তেকাল করেন, যিনি প্রায় ২৩ বছর ধরে তাঁর একনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। একই সময়ে সুলতান কায়কাউসের ইন্তেকাল ঘটে। পরবর্তীতে তাঁর ভাই কায়কোবাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর সাথে পূর্বের সেই ঘনিষ্ঠ ও উষ্ণ সম্পর্ক আর বজায় থাকেনি। এভাবেই মালতিয়া ও সমগ্র সেলজুক সালতানাতের সাথে শায়খুল আকবর (রহ.)-এঁর দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
দামেস্কে অবস্থান: দীর্ঘকাল দেশ-বিদেশ ভ্রমণ, সুফি-মাশায়েখ, ফকিহ ও শাসকশ্রেণির সাথে সাক্ষাৎ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রচনার পর, ১২২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ষাট বছর বয়সে তিনি দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই শহরেই অবস্থান করেন। তবে ১২৩৭ খ্রিষ্টাব্দে একবার আলেপ্পো সফর করেন। এটি ছিল সেখানে তাঁর তৃতীয় সফর।
আলেপ্পোতে অবস্থানকালে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি প্রসিদ্ধ কবি ইবনুশ শা‘আর’র কাব্যসংকলন প্রস্তুত করছিলেন। তিনি শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) সম্পর্কে লিখেছেন, “ইবনুল আরাবি শুধু আধ্যাত্মিক সাধনাতেই পরিপূর্ণ নন; বরং একজন মহান সুফি আলেম। তিনি তাঁর অনুসারী ও খলিফাদের জন্য পথপ্রদর্শক ও মুর্শিদ। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি রোম অঞ্চলে অবস্থান করেছেন এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সফর করেছেন। তিনি বাগদাদেও গমন করেছেন এবং পরবর্তীতে দামেস্কে স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেছেন। তিনি কবিতার মাধ্যমে জাহেরি ও বাতেনি জ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয়ে গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আল্লাহ তাঁকে এক বিশেষ তীক্ষ্ণ ও জ্বলন্ত চিন্তাশক্তি দ্বারা ধন্য করেছেন। আমি তাঁকে ১২৩৭ সালের ২৭ অক্টোবর আলেপ্পোতে দেখেছি।”
দামেস্কে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর প্রতি আলিম, কাজি এবং শাসকগণের সম্মান ও শ্রদ্ধা অন্যান্য সকল স্থান অপেক্ষা অধিক ছিল। যেমন শাফেয়ি মাজহাবের প্রধান বিচারপতি কাজিউল কুজাত আহমদ ইবনে খলিল খুয়্যি (রহ.) তাঁর সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন শায়খের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং ৩০ দিরহাম হাদিয়া প্রদান করতেন।
একইভাবে মালেকি মাজহাবের প্রধান বিচারপতি শায়খ জয়নুদ্দিন যাওয়াদি (রহ.) নিজে পদত্যাগ করে তাঁর মুরিদ হন এবং পূর্ণ সময় তাঁর খিদমতে নিয়োজিত হন। এমনকি তিনি নিজের এক কন্যাকেও শায়খের সাথে বিবাহ দেন।
দামেস্কের শাসকদের মধ্যেও মালিক মুজাফফর গাজি ইবনে আবি বকর তাঁর মুরিদ ছিলেন। শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) তাঁকে হাদিস বর্ণনা ও নিজের গ্রন্থসমূহ পাঠের ইজাজত (অনুমতি) প্রদান করেন।
শামস তাবরিজির সাথে সাক্ষাৎ: শামস তাবরিজি (রহ.) এবং আওহাদুদ্দিন কিরমানি (রহ.) উভয়েই বাগদাদের প্রখ্যাত শায়খ রুকনুদ্দিন আবুল গানায়িমের খলিফাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। শামস তাবরিজি পরবর্তীতে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রহ.)-এঁর মুর্শিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আওহাদুদ্দিন কিরমানির মাধ্যমে দামেস্কে শামস তাবরিজির সাথে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর সাক্ষাৎ ঘটে। শায়খ তাঁকে নিজের খলিফাদের মতোই স্নেহ ও সম্মানের দৃষ্টিতে গ্রহণ করেন।
শামস তাবরিজির ‘মাকালাত’-এ এই সাক্ষাতের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়, একবার আমরা এমন একটি আলোচনায় মগ্ন ছিলাম যে, “যে বিষয় হাদিস-কুরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিকেই সহিহ তথা গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়।” আলোচনার এক পর্যায়ে শায়খ ইবনুল আরাবি (রহ.) একটি হাদিস বর্ণনা করে জিজ্ঞাসা করলেন, এর সাথে কুরআনের কোন আয়াত সামঞ্জস্যপূর্ণ? ঠিক সেই মুহূর্তে দেখা গেল তিনি গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থায় (ওজদ) আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। আমি তাঁকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলাম এবং বললাম, আপনার আলোচনার বিষয় নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে ‘আলেমগণ রুহের মতো’ এই অর্থের সাথে কুরআনের কোন আয়াতের মিল রয়েছে? তিনি মনে করলেন, আমি তাঁকে প্রশ্ন করছি, তাই সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে বললেন, “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই।”
“তোমাদের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি আত্মার মতোই।” এরপর তিনি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন এবং বুঝতে পারেন যে, আমি প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করিনি; বরং তাঁর মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলাম। তিনি তখন বললেন, “হে বৎস, তুমি তো শব্দের চাবুক চালালে!”
শুরুতে তিনি আমাকে ‘বৎস’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, এবং শেষেও একই স্নেহপূর্ণ ভাষা বজায় রেখেছিলেন। ইবনুল আরাবি মৃদু হাসছিলেন যে, শামস তাঁর সাথে কী এক শিশুসুলভ আধ্যাত্মিক কায়দা অবলম্বন করল![5]
বিপুল খ্যাতি ও দানশীলতা:
বর্ণিত আছে, তিনি যখন দামেস্কে অবস্থান করেন, তখন সেখানে তাঁর কাছে প্রচুর সম্পদ আসে। কিন্তু তিনি সেগুলোর কোনো কিছুই সঞ্চয় করেননি। এভাবে হিম্স নগরের শাসক তাঁকে প্রতিদিন একশত দিরহাম প্রদান করতেন এবং বিচারক ইবনু আয-যাকি প্রতিদিন ত্রিশ দিরহাম দিতেন। কিন্তু তিনি সবই দান করে দিতেন। তিনি বলতেন, “আমি আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ জানি এবং আমি ‘কেমিয়া’ ও ‘সিমিয়া’ বিদ্যাও জানি, তবে তা উপার্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নয়; বরং আত্মিক উন্নতির মাধ্যম।”[6]
ব্যক্তিত্ব ও বিচারপতির দায়িত্ব:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী, মিষ্টভাষী এবং উত্তম গুণাবলিতে গুণান্বিত। নেতৃত্বে ও সামাজিক মর্যাদায় তিনি পূর্ণতার শিখরে ছিলেন। তিনি ইশবিলিয়্যাহ (বর্তমান স্পেনের একটি শহর) শহরের প্রধান বিচারপতির (কাজি) দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর শাসন পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে ন্যায়ের পথে তিনি অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন ছিলেন বলে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়। এরপর তিনি নিজেকে পুরোপুরি ইলম প্রচার এবং গ্রন্থ রচনার কাজে উৎসর্গ করেন।[7]
হজরত খিজির (আ.)-এঁর সাথে সৌভাগ্যময় সাক্ষাৎ:
তিনি তাসাউফ ও সুলুকের পথে এক উচ্চ ও অনন্য মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক মহিমা অনুধাবনের জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, তাসাউফে তাঁর খিরকা (আধ্যাত্মিক বস্ত্র)-এঁর সিলসিলা মাত্র একটি মাধ্যমের মাধ্যমে হুজুর গাউসে আযম শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অপরদিকে তাঁর আরেকটি আধ্যাত্মিক সম্পর্ক মাত্র একটি মাধ্যমের মাধ্যমে হজরত সাইয়্যিদুনা খিজির আলাইহিস সালাম’র সাথেও যুক্ত। এই মাধ্যম ছিলেন শায়খ আবুল হাসান আলী ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জামি (রহ.)। বর্ণিত আছে, শায়খ ইবনে জামি যে স্থানে শায়খ ইবনে আরাবি (রহ.)-কে খিরকা পরিয়ে দেন, ঠিক সেই স্থানেই হজরত খিজির (আ.) নিজ হাত মুবারক দ্বারা তাঁকে সেই খিরকা পরিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, শায়খুল আকবর (রহ.) সরাসরি হজরত খিজির (আ.)-এঁর সান্নিধ্য ও সাক্ষাতের সৌভাগ্যও অর্জন করেন। এই মহান সৌভাগ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি হজরত খিজির (আ.)-এঁর বরকতময় সঙ্গ লাভ করেছি। তাঁর নিকট থেকে আমি তরিকতের আদব শিখেছি। তিনি আমাকে উপদেশ দিয়েছেন যে, মাশায়েখদের মর্যাদা ও মাকামকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত।” তিনি আরও বলেন, “আমি হজরত খিজির (আ.)-এঁর মধ্যে তিনটি অলৌকিক বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি।
১. তিনি সমুদ্রের উপর দিয়ে চলাফেরা করতেন।
২. তিনি অনেক দূরত্ব অতি স্বল্প সময়ে অতিক্রম করতেন।
৩. তিনি আকাশে অবস্থান করে নামাজ আদায় করতেন।”[8]
খাতমুল বিলায়াত:
শায়খুল আকবর ইবনে আরাবি (রহ.)-কে ‘খাতামুল বিলায়াত’ তথা বিলায়াতের সিলমোহরধারী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বলে মনে করা হয়। তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে এ মহান মর্যাদার সুসংবাদ লাভ করেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “৫৯৯ হিজরিতে, মক্কা মুকাররমায় আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম, কাবা শরিফ সোনা ও রূপার ইট দিয়ে নির্মিত। তার সৌন্দর্য দেখে আমার দৃষ্টি বিমোহিত হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, রুকনে ইয়ামেনি ও রুকনে শামীর মাঝখানে দেয়ালে দুইটি ইটের জায়গা খালি রয়েছে। একটি সোনার এবং একটি রূপার। উপরের সারিতে সোনার ইটের ঘাটতি ছিল, আর নিচের সারিতে রূপার ইটের। পনক্ষণেই আমি দেখলাম, সেই শূন্য স্থানটি আমার সত্তা দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেল; যেন আমি নিজেই সেই দুইটি ইটে পরিণত হলাম। ফলে দেয়ালটি পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেল, এবং কাবা শরিফে আর কোনো ঘাটতি রইল না।
আমি (মাকামে মারিফাতের দৃষ্টিতে) বুঝে নিলাম, ঐ ইটগুলো আমারই প্রতীক এবং আমিই তাদের বাস্তব রূপ। এরপর আমার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না। যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হলাম, তখন আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করলাম। এবং এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমি এভাবে করলাম যে, আমি আওলিয়ায়ে কেরামের মধ্যে ঠিক সেই মর্যাদায় থাকব, যেভাবে নবীগণের মধ্যে রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর সত্তা মোবারক রয়েছে। এবং সম্ভবত এটি আমার জন্য ‘খাতমুল বিলায়ত’-এঁর সুসংবাদ।”[9]
কাশফ ও মুশাহাদা:
শায়খ মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর কাশফ ও মুশাহাদার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত উচ্চ ও পরিপূর্ণ পর্যায়ের। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দান হিসেবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের অবস্থা উপলব্ধি করতে সক্ষম হতেন এবং সঠিকভাবে তা বর্ণনা করতেন। তাঁর বিশেষ খলিফা শায়খ সাদরুদ্দীন কুনাভী (রহ.) এ প্রসঙ্গে শায়খ ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর কাশফের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, “যখন আমাদের এই মুরশিদ (শায়খ ইবনে আরাবি) কোনো বিষয়ের প্রকৃত সত্য জানতে চাইতেন, তখন তিনি গভীরভাবে সেটির দিকে দৃষ্টিপাত করতেন এবং এরপর তার ভবিষ্যৎ পর্যন্ত, এমনকি শেষ পরিণতি সম্পর্কেও সংবাদ দিতেন। তিনি মানুষের শুধু বর্তমান অবস্থা নয়; বরং অতীতের গোপন ঘটনাবলি ও বাস্তবতাও অবগত হতে পারতেন।”[10]
তাসাউফের শিক্ষা:
তাঁর তাসাউফ সংক্রান্ত শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে শরিয়তে ইসলামিয়ার প্রতিফলন। তিনি হাকিকত ও মারিফাতের সূক্ষ্ম রহস্য অন্বেষণকারী সালিক ও সাধারণ মানুষকে সর্বদা শরিয়ত আঁকড়ে ধরার উপদেশ দিতেন। শরিয়তের অনুসরণ ও তাসাউফের শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী হলো—
১. তোমরা কখনোই বাহ্যিক শরিয়তের মাপকাঠি হাতছাড়া করবে না; বরং শরিয়তের যে নির্দেশ থাকবে, তা অবিলম্বে পালন করবে। আর যদি সাধারণ উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের বিপরীতে তোমার মনে এমন কোনো ধারণা আসে, যা তোমাকে শরিয়তের বাহ্যিক বিধান পালন থেকে বিরত রাখে, তবে সেই ধারণার উপর নির্ভর করবে না। কারণ, তা মারিফত নয়; বরং এমন এক ধোঁকা, যার সম্পর্কে তুমি অবগত নও।
২. নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, শরিয়তের ঝরনাই হাকিকতের ঝরনা। কারণ, শরিয়তের দুইটি দিক রয়েছে। একটি উপরের এবং একটি নিচের। উপরের দিকটি আহলে কাশফ তথা আধ্যাত্মিক বিষয়ে অবগতদের জন্য, আর নিচের দিকটি আহলে ফিকর তথা যুক্তিবাদি চিন্তাবিদদের জন্য।
আহলে ফিকর যখন আহলে কাশফের বক্তব্য অনুসন্ধান করে এবং নিজেদের চিন্তার পরিসরে তা খুঁজে পায় না, তখন তারা বলে, এটি শরিয়তের বাইরে। এই কারণেই আহলে ফিকর আহলে কাশফের উপর আপত্তি তোলে। অথচ আহলে কাশফ আহলে ফিকরের বিষয়ে অস্বীকার করে না।
যে ব্যক্তি কাশফ ও ফিকর উভয়ই ধারণ করে, সে-ই তার যুগের প্রকৃত হাকিম (প্রজ্ঞাবান)। যেমন আহলে ফিকরের জ্ঞান শরিয়তেরই অংশ, তেমনি আহলে কাশফের জ্ঞানও শরিয়তের অংশ। উভয়ই পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু যেহেতু উভয় দিকের সমন্বয়কারী ব্যক্তি বিরল, তাই অনেকেই শরিয়ত ও হাকিকতকে পৃথক মনে করে ফেলে।
৩. জেনে রাখো, আউলিয়ায়ে কেরাম ও মাশায়েখগণ কখনোই শরিয়তের মাপকাঠি থেকে বিচ্যুত হন না; বরং তারা শরিয়তের বিরোধিতা থেকে সংরক্ষিত থাকেন।
৪. জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যে শরিয়তের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন, তা হলো সেই শরিয়ত, যা ওলামায়ে শরিয়তের হাতে রয়েছে। অতএব কোনো অলি যদি সুস্থ বিবেক থাকা সত্ত্বেও এই শরিয়তের মাপকাঠির বাইরে চলে যায়, তবে এমন ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা ও তার অনুসরণ না করা অপরিহার্য।[11]
স্ত্রী ও সন্তান:
হজরত শায়খ ইবনে আরাবি (রহ.) ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক বিবাহ করেন। তবে তাঁদের সম্পর্কে খুব অল্পই উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর এক সম্মানিতা স্ত্রী মরিয়ম বিনতে মুহাম্মদ ইবনে আবদুন ইবনে আবদুর রহমান বাজানীর কথা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফুতূহাতুল মাক্কিয়া’য় তিনি অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন এক পরহেজগার, পবিত্র ও নেককার নারী।
এছাড়াও ফাতিমা বিনতে ইউনুস ইবনে ইউসুফকেও তাঁর স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
তাঁর দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন, যাঁরা উক্ত সম্মানিতা স্ত্রীদের গর্ভ থেকে জন্ম নেন। তাঁরা হলেন—
১.শায়খ সা’দ উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আরাবি (রহ.)
২.শায়খ ইমাদ উদ্দিন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আরাবি (রহ.)
৩. জয়নব বিনতে ইবনে আরাবি (রহ.)
এছাড়া, শায়খ সাদরুদ্দীন কুনাভী (রহ.)-এঁর পিতা যখন তাঁর শৈশবেই ইন্তেকাল করেন, তখন শায়খ ইবনে আরাবি (রহ.) তাঁর মাতা মহোদয়ার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি শায়খ সাদরুদ্দীন কুনাভী (রহ.)-কে অত্যন্ত যত্ন, স্নেহ ও ভালোবাসার সাথে লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করেন।[12]
কারামত:
ফুতুহাতে মাক্কিয়াহ: ‘আল-কামুস’ গ্রন্থণেতা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি যখন ‘আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ’ গ্রন্থ রচনা সম্পন্ন করেন, তখন তিনি তা কোনো আবরণ বা সুরক্ষা ছাড়া খণ্ড খণ্ড কাগজ আকারে কাবা শরিফের ছাদের উপর রেখে দেন। সেখানে তা প্রায় এক বছর পর্যন্ত ঐ অবস্থায় থাকে। এরপর তিনি যখন তা নামিয়ে আনেন, তখন দেখা যায়, যেমন অবস্থায় রাখা হয়েছিল, ঠিক তেমনই আছে; একটি পাতাও নষ্ট হয়নি বা হারায়নি। অথচ সেখানে প্রচণ্ড বাতাস ও বৃষ্টি হতো, কিন্তু না বৃষ্টি সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, না বাতাস একটি পাতাও উড়িয়ে নিতে পেরেছে।
এটি তাঁর অন্যতম বড়ো কারামত এবং মহান নিদর্শনসমূহের একটি। এটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, তিনি তাঁর এই গ্রন্থ রচনায় একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁর প্রতি যে অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল, তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত।
এছাড়াও, বলা হয় যে, এই ঘটনার পরই তিনি মানুষকে তাঁর এই গ্রন্থ লেখা ও পাঠ করার অনুমতি প্রদান করেন।[13]
গালি শুনে চুপ থাকা: শায়খ আবদুল গাফফার আল-কাওসী তাঁর ‘আল-ওয়াহিদ ফি আখবার আহলিত তাওহিদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, শায়খ আবদুল আজিজ আল-মুনুফী তাঁর নিকট থেকে, তিনি আবার শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.)-এর খাদিম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদিন শায়খ পথ দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন একজন ব্যক্তি তাঁকে গালি দিচ্ছিল। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিচ্ছিলেন না। আমি তাঁকে বললাম, ‘হে আমার সাইয়্যিদ, আপনি কি দেখছেন না যে, এই ব্যক্তি আপনাকে গালি দিচ্ছে?’
তিনি বললেন, ‘সে কাকে গালি দিচ্ছে?’
আমি বললাম, ‘সে আপনাকেই গালি দিচ্ছে।’
তিনি বললেন, ‘সে আমাকে গালি দিচ্ছে না।’
আমি বললাম, ‘কীভাবে?’
তিনি বললেন, ‘আমি তার সামনে কিছু দোষের রূপ কল্পনা করেছি, আর সে সেই দোষগুলোকেই গালি দিচ্ছে। কিন্তু আমি তো সেই দোষে দুষ্ট নই।” এই কথাটি তাঁর এক উচ্চ মর্যাদা ও পরিপূর্ণ আত্মশুদ্ধির প্রমাণ বহন করে। এটি সেই হাদিসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা কি আশ্চর্য হচ্ছো না যে, কুরাইশরা আমাকে কীভাবে গালি ও অভিশাপ দিয়ে আমার দিক থেকে রক্ষা পাচ্ছে? কারণ, তারা ‘মুজাম্মাম’ (নিন্দিত নাম)-কে গালি ও অভিশাপ দিচ্ছে; অথচ আমি মুহাম্মদ।”[14]
আলেম ও বুজুর্গদের দৃষ্টিভঙ্গি:
হজরত শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.) কেবল একজন বিশিষ্ট আলেমই নন; বরং তিনি ছিলেন এক মহান সুফি, কাশফ ও মারিফতের অধিকারী একজন মহান বুজুর্গ। তিনি তাওহিদ, হাকিকত ও মারিফতের গভীর রহস্য ও সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ সম্পর্কে এমনভাবে অবগত ছিলেন যে, তাঁর সমতুল্য খুব কমই পাওয়া যায়। এ কারণেই উম্মতের বড়ো বড়ো আলেমগণ তাঁর ইলম, ফজিলত, কাশফ ও মুশাহাদার প্রতি গভীর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। নিচে তাঁর সম্পর্কে কয়েকজন আলেম ও বুজুর্গের বক্তব্য উল্লেখ করা হলো।
১. গাউসে পাক শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.): বর্ণিত আছে যে, হজরত শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.)-এর জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা শায়খ আলী ইবনে মুহাম্মদকে বলেছিলেন, “এই সন্তান (অর্থাৎ ইবনু আরাবি) অলিদের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।” যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে হজরত গাউসুল আজম শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এঁর দরবারে হাজির হন। গাউসে পাক তাঁর দিকে দয়ার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন, “এ আমার সন্তান। ইনশাআল্লাহ, সে যুগের কুতুব হবে। তাওহিদের এমন গোপন রহস্য ও জ্ঞান, যা আজ পর্যন্ত কোনো তাওহিদপন্থী ব্যাখ্যা করতে পারেননি, এই শিশু তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে।”
২. শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.): একবার শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.)’র সাথে শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.)’র সাক্ষাৎ হয়। উভয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা অবলম্বন করেন এবং কোনো কথা না বলেই আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে যান। এরপর শায়খ ইবনু আরাবি (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে কেমন পেয়েছেন? তিনি উত্তর দিলেন, “তিনি সম্পূর্ণভাবে সুন্নতে নববীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিলেন।” এরপর শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-কেও জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি সম্পর্কে কী বলেন? তিনি বললেন, “তিনি হাকিকতের এক বিশাল সমুদ্র।”
৩. কাজি শামসুদ্দীন শাফেয়ি (রহ.): কাজি শামসুদ্দীন শাফেয়ি (রহ.) শায়খ ইবনু আরাবি (রহ.)-এঁর দরবারে খেদমত করতেন এবং তাঁর সামনে অত্যন্ত বিনয় ও আদবের সাথে উপস্থিত হতেন। তিনি প্রতিদিন শায়খের কাছে আসার পূর্বে ৩০ দিরহাম সদকা হিসেবে প্রদান করতেন।
৪. শায়খ সিবত ইবনুল জাওযী (রহ.): শায়খ সিবত ইবনুল জাওযী (রহ.) লিখেছেন, “শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.) ছিলেন পরিপূর্ণ ফাদ্বিল (প্রজ্ঞাময়) ও তাঁর যুগের শায়খ। তিনি তাঁর সময়ের অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।” তিনি আরও বলেন, “শরিয়ত ও হাকিকত, উভয় প্রকার জ্ঞানে এবং অন্যান্য সমস্ত ইলম ও সাহিত্যজ্ঞানে তাঁর কোনো সমকক্ষ ছিল না। তাঁর অসংখ্য রচনা রয়েছে, যেগুলোর মতো শৈলী অন্য কারো রচনায় পাওয়া যায় না। তাঁর নিকট ‘ইসমে আজম’ সংরক্ষিত ছিল। তাঁর সম্পর্কে মানুষের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। আমার অবস্থান হলো, নীরব থাকা (সকুত অবলম্বন করা)। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।”
৫. ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনু সাঈদ আদ-দুবাইতি (রহ.): শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনু আরাবি (রহ.) যখন বাগদাদে আগমন করেন, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করি। আমি তাঁকে তাঁর বর্ণিত গুণাবলির চেয়েও অনেক উচ্চতর অবস্থায় পেয়েছি। বরং তাঁর মর্যাদা ও অবস্থান বর্ণনা করাই অসম্ভব।”[15]
ইন্তেকাল:
আন্দালুসের মুরসিয়া শহরে উদিত তাসাউফ ও মারিফতের সেই আধ্যাত্মিক সূর্য অবশেষে দামেস্কের ভূমিতে অস্তমিত হলো। তবে তাঁর জ্ঞান ও নুরের আলো আজও অম্লান, অবিনশ্বর। ইন্তেকালের সময় বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর, ২২ রবিউস সানি ৬৩৮ হিজরি। আল-মাকারি তাঁর বর্ণনায় ২৮ রবিউস সানি, জুমআর রাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে দাফনে উপস্থিত সমসাময়িক ঐতিহাসিক আবু শামা (মৃত্যু: ১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)–এর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর ইন্তেকালের সঠিক তারিখ হলো ২২ রবিউস সানি।
আবুল কাসিম ইবনে বাশকুয়াল উল্লেখ করেছেন যে, ইবনুল আরাবি ৫৪৩ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে মরক্কোর ফেজ শহরে ইন্তেকাল করেন। হাফেজ আবু আল-হাসান ইবনুল মুফাজ্জল এবং ইবনে খাল্লিকানও তাঁর ইন্তেকাল সন হিসেবে একই বছর উল্লেখ করেছেন।[16]
আর. ডব্লিউ. জে. অস্টিন তাঁর “Sufis of Andalusia” গ্রন্থে তাঁর ইন্তেকালের তারিখ ১২ নভেম্বর ১২৪০ এবং বয়স ৭৬ বছর বলে উল্লেখ করেছেন। তবে অধিকতর নির্ভরযোগ্য মত হিসেবে সমসাময়িক আবু শামা (রহ.)-এর বর্ণনাই গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
দাফন ও শেষ বিদায়:
ইন্তেকালের সময় তাঁর আত্মীয়-স্বজন, মুরিদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উপস্থিত ছিলেন। কাজি মুহিউদ্দিন ইবনে জাকির এবং জামালুদ্দিন ইবনে আবদুল খালিক (রহ.) তাঁকে গোসল প্রদান করেন এবং ইমাদুদ্দিন ইবনে নাখাস পানি ঢেলে সহযোগিতা করেন। পরবর্তীতে তাঁকে দামেস্ক শহরের উত্তর-পশ্চিমে কাসিউন পাহাড়ের পাদদেশে, ‘কারিয়ায়ে সালিহা’ নামক স্থানে দাফন করা হয়।
এভাবেই এক মহাজ্ঞানী, আধ্যাত্মিক সাধক ও মারিফতের দিশারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও রুহানি প্রভাব আজও ইসলামি জ্ঞান ও তাসাউফের জগতে দীপ্তিমান হয়ে আছে।[17]