আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের তিনটি ক্রমবর্ধমান স্তর হলো মুহাদারা, মুকাশাফা ও মুশাহাদা। মুহাদারা মানে অন্তরের উপস্থিতি। দলিল-প্রমাণ বা জিকিরের প্রভাবে অন্তর সজাগ থাকা। মুকাশাফা মানে উন্মোচন। যখন অন্তরের সামনে সত্য স্পষ্ট হয়ে যায়, আর দলিলের প্রয়োজন থাকে না। আর মুশাহাদা মানে প্রত্যক্ষ দর্শন। যখন হকের অস্তিত্ব এমনভাবে উপলব্ধি হয় যে, কোনো সন্দেহ বাকি থাকে না।
এই তিনটি স্তর একটি ক্রমধারা। প্রথমে মুহাদারা, তারপর মুকাশাফা, সবশেষে মুশাহাদা। জুনায়েদ বাগদাদির ভাষায়, মুশাহাদা হলো নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে হকের অস্তিত্ব প্রকাশ পাওয়া। শিবলির আকুল প্রার্থনা “হে হায়রানদের পথপ্রদর্শক, আমার হায়রত আরও বাড়িয়ে দিন” এই উক্তিটি দেখায়, এই পথের শেষ মাথায় বিস্ময়ই একমাত্র সঙ্গী।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি (রহ.) বলেছেন, মুহাদারার অধিকারী আল্লাহর আয়াতের সাথে যুক্ত থাকে, মুকাশাফার অধিকারী সিফাতের বিস্তারে থাকে, আর মুশাহাদার অধিকারী জাতের গুণাবলির সাথে বিলীন হয়ে যায়। আমর ইবন উসমান মাক্কির বিদ্যুতের উপমা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, তাজাল্লির আলো অবিরাম চলতে থাকলে রাত-দিনের পার্থক্যই ঘুচে যায়। নুরির ভাষায়, যতক্ষণ নিজের অস্তিত্বের কোনো শিরা দাঁড়িয়ে থাকে, ততক্ষণ মুশাহাদা শুদ্ধ হয় না।
তিনি বলেন, প্রথমে আসে মুহাদারা, তার পরে মুকাশাফা, তারপর মুশাহাদা।
মুহাদারা হলো অন্তরের উপস্থিতি। এটি কখনো ধারাবাহিক দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে অর্জিত হয়, আবার কখনো পর্দার আড়াল থেকেও হয়; যখন বান্দার অন্তর জিকিরের প্রভাব ও জিকিরের প্রবল শক্তি উপস্থিত থাকে।
মুহাদারা শব্দের আরেক অর্থ হলো নৈকট্য; অর্থাৎ কাছাকাছি থাকা ও সন্নিকটে অবস্থান করা। কোরআনে এই অর্থে এসেছে, وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ – আর তাদেরকে সেই জনপদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন, যা সমুদ্রের কাছে অবস্থিত ছিল।[1]
এরপর আসে মুকাশাফা। মুকাশাফা এমন এক অবস্থা, যেখানে অন্তরের সামনে সত্য স্পষ্টভাবে খুলে যায়। তখন আর দলিল নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন থাকে না। পথের দিশা খুঁজতে হয় না। সন্দেহের কোনো কারণ তাকে অস্থির করতে পারে না। গায়বের পরিচয়ও তার সামনে পর্দার আড়ালে থাকে না।
তারপর আসে মুশাহাদা। মুশাহাদা হলো হকের অস্তিত্ব এমনভাবে উপলব্ধি করা, যার সঙ্গে কোনো সন্দেহ বাকি থাকে না। যখন অন্তরের গোপন আকাশ সন্দেহের মেঘ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন প্রত্যক্ষ উপলব্ধির সূর্য সম্মানের আকাশ থেকে উদিত হয়ে আলো ছড়ায়।
মুশাহাদার বাস্তবতা সম্পর্কে জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) বলেছেন, وجود الحق مع فقدانك – তোমার নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে হকের অস্তিত্ব প্রকাশ পাওয়া।[2]
মুহাদারার অধিকারী আল্লাহর আয়াতসমূহের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। মুকাশাফার অধিকারী আল্লাহর সিফাতসমূহের বিস্তারে থাকে। আর মুশাহাদার অধিকারী আল্লাহর জাতের গুণাবলির সঙ্গে যুক্ত থাকে।
মুহাদারার অধিকারীকে তার বুদ্ধি পথ দেখায়। মুকাশাফার অধিকারীকে তার ইলম নৈকট্যে নিয়ে যায়। আর মুশাহাদার অধিকারীকে তার মারিফত নিজের মধ্যে বিলীন করে দেয়।
মুশাহাদার বাস্তবতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমর ইবন উসমান মাক্কি যা বলেছেন, তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে কেউ বলেননি। তাঁর মুশাহাদা বিষয়ে একটি গ্রন্থও আছে। তিনি বলেছেন, “তাজাল্লির নুরগুলো তার অন্তরে একের পর এক আসতে থাকে। এর মাঝে কোনো পর্দা পড়ে না, কোনো বিচ্ছেদও ঘটে না। যেমন বিদ্যুৎ যদি বিরতিহীনভাবে একের পর এক চমকাতে থাকে, তাহলে ঘন অন্ধকার রাতও দিনের আলোর মতো হয়ে যায়। তেমনি অন্তরে যদি তাজাল্লির আলো স্থায়ীভাবে চলতে থাকে, তাহলে তার দিনের আলো এমন উজ্জ্বল হয় যে, আর কোনো রাত থাকে না।[3]
এ বিষয়ে সুফিরা কবিতায় বলেছেন—
ليلي بوجهك مشرق وظلامه في الناس ساري
তোমার মুখের আলোয় আমার রাত উজ্জ্বল; অথচ সেই রাতের অন্ধকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
والناس في سدف الظلام ونحن في ضوء النهار
মানুষ রাতের অন্ধকারে আছে, আর আমরা দিনের আলোয় আছি।
নুরি বলেছেন—
لا يصح لعبد المشاهدة وقد بقي له عرق قائم
বান্দার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের কোনো শিরা এখনো দাঁড়িয়ে থাকলে তার জন্য মুশাহাদা শুদ্ধ হয় না।
সুফিরা আরো বলেছেন—
إذا طلع الصباح استغنى عن المصباح
সকাল হয়ে গেলে প্রদীপের প্রয়োজন থাকে না।[4]
এ বিষয়ে সুফিরা আরো বলেছেন—
فلما استبان الصبح أدرج ضوءه بأنواره أنوار ضوء الكواكب
যখন সকাল স্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন তার আলো নিজের নুর দ্বারা তারকারাজির আলোকে ঢেকে ফেলল ও অদৃশ্য করে দিল।
يجرعهم كأسا لو أبليت لظى بتجريعه طارت كأسر ذاهب
তাদের এমন এক পেয়ালা পান করানো হয়; যদি সেই পেয়ালা জাহান্নামের আগুনকেও পান করানো হতো, তবে তার প্রভাবে জাহান্নামের আগুনও উড়ে ছাই হয়ে যেত।
কী পেয়ালা! কেমন সে পেয়ালা! এমন পেয়ালা, যা তাদেরকে নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাদের বিলীন করে দেয় এবং তাদেরকে নিজেদের কাছ থেকেই ছিনিয়ে নেয়। তাদেরকে আর অবশিষ্ট রাখে না। এটি এমন পেয়ালা, যা কিছুই বাকি রাখে না, কিছুই ছাড়ে না; সম্পূর্ণভাবে মুছে দেয় এবং মানবিক চিহ্নের সামান্য কণাও অবশিষ্ট রাখে না।
যেমন তাদের একজন বলেছেন—
ساروا فلم يبق لا رسم ولا أثر
তারা চলে গেলেন; ফলে আর কোনো চিহ্ন রইল না, কোনো প্রভাবও বাকি থাকল না।
শায়খুল ইসলাম জাকারিয়া আনসারি বলেন, জেনে রাখো, এসব শব্দের অর্থ বুদ্ধির সাধারণ সীমার বাইরে। আল্লাহর বিশেষ দয়া যাদের ওপর আছে, তারা ছাড়া এগুলোর অর্থ কেউ বুঝতে পারে না। কারণ এগুলো আল্লাহর তাওহিদের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর আল্লাহ তায়ালার যে তাওহিদ তাঁর জাত ও সিফাতের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা সবার বুদ্ধিগত উপলব্ধির বিষয় হওয়া সম্ভব নয়।[5]
দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
দাতা গঞ্জে বখশ (রহ.) বলেছেন, মুহাদারা আসে আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা থেকে, আর মুকাশাফা আসে আল্লাহর মহিমার প্রভাবে অন্তর বিস্ময়ে অভিভূত হওয়া থেকে। নবীজির মিরাজের ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মুকাশাফায় পৌঁছেও মিলনের দাবি করা যায় না; কারণ সেখানেও থাকে হায়রত, বিনয় ও অক্ষমতার অনুভব। শিবলির আকুল প্রার্থনাই এই পথের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা।
তিনি বলেন, জেনে রাখা উচিত, মুহাদারা শব্দটি ব্যবহার করা হয় অন্তরের উপস্থিতি বোঝাতে। আর মুকাশাফা শব্দটি ব্যবহার করা হয় যখন অন্তরের সামনে সত্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
অর্থাৎ, কোরআনের আয়াত ও নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে যে উপলব্ধি জন্মায়, তাকে মুহাদারা বলা হয়। আর অন্তরের অবস্থা ও প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে যে সত্য প্রকাশ পায়, তাকে মুকাশাফা বলা হয়।
মুহাদারার আলামত হলো, আয়াত ও নিদর্শন নিয়ে গভীর চিন্তা-ফিকির জাগ্রত থাকা। আর মুকাশাফার আলামত হলো, আল্লাহর মহিমার প্রভাবে অন্তর বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাওয়া।
যে ব্যক্তি কখনো চিন্তা-ফিকিরে ডুবে থাকে, আবার কখনো আধ্যাত্মিক অবস্থার গভীরে বিস্মিত হয়ে যায়, তার অবস্থার মধ্যেই এ দুই স্তরের পার্থক্য বোঝা যায়। একটির সম্পর্ক খিলাফত তথা প্রতিনিধিত্বের দিকের সঙ্গে; আর অন্যটির সম্পর্ক মহব্বত তথা প্রেমের দিকের সঙ্গে।
হজরত শিবলি (রহ.) যখন আসমানের নীরবতার দিকে তাকালেন, তখন তিনি নিজের অস্তিত্বের গভীরে থাকা জিকিরের বাস্তবতা অনুভব করলেন। এরপর তিনি মুহাদারা ও অন্তরের উপস্থিতির অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার স্বাদ পেলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর অন্তরের উপস্থিতিই তাঁর কাছে সত্যের দলিল হয়ে দাঁড়াল। তখন তাঁর অবস্থা যেন এই আয়াতের অর্থ প্রকাশ করছিল, إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا – নিশ্চয় আমি একনিষ্ঠ হয়ে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়েছি, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।[6]
হজরত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন আসমানসমূহের মালাকুতি জগত ভ্রমণ করানো হলো, তখন তিনি সমগ্র জগত দেখার দিক থেকে চোখ বন্ধ রাখলেন। তিনি সৃষ্টিজগতের দিকে তাকালেন না; এমনকি নিজের দিকেও তাকালেন না। তিনি শুধু খালিকের মুকাশাফায় অবস্থান করলেন।
এ অবস্থায় কাশফের মধ্যে নৈকট্যের শওক জেগে উঠল। অস্থিরতার ওপর অস্থিরতা বাড়ল। জাগ্রত থাকা দাবি করল; কিন্তু আনন্দ-উল্লাসের দর্শন হলো না। নৈকট্য চাওয়া হলো, কিন্তু নৈকট্য অর্জন সম্ভব হলো না। মিলনের ইচ্ছা করা হলো, কিন্তু মিলনের রূপ প্রকাশ পেল না। অন্তর অস্থিরতার ওপর স্থির থাকতে পারল না। যত বেশি প্রকাশের দরজা খুলছিল, শওকের অস্থিরতাও তত বেশি বাড়ছিল।
সেখানে আর নতুন কোনো নুর যোগ হওয়ার পথ ছিল না। আবার মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ, তিনি এমন অবস্থায় ছিলেন, যেখানে আল্লাহর মারিফত থেকে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার সেই মারিফতকে পুরোপুরি নিজের আয়ত্তে এনে ফেলা বা পুরোপুরি বুঝে নেওয়াও সম্ভব ছিল না। কারণ বিষয়টি দুই দিক থেকে গভীর ছিল। একদিকে সৃষ্টি-জগতের দিকে তাকালে তিনি দেখছিলেন, সৃষ্টির কোনো স্বাধীন শক্তি নেই। সবকিছু আল্লাহর সামনে অক্ষম। এতে অন্তর বিস্ময়ে ডুবে যাচ্ছিল। অন্যদিকে মহব্বতের দিকে তাকালে তিনি দেখছিলেন, আল্লাহর সঙ্গে মিলনের দাবি করাও নিরাপদ নয়। কারণ “আমি আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হলাম”—এমন ধারণার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের দাবি থেকে যেতে পারে। আর সেখানে নিজের অস্তিত্বের দাবি থাকলে তা তাওহিদের পূর্ণতার সঙ্গে মানায় না। তাই তাঁর সামনে একমাত্র অবস্থা হয়ে দাঁড়াল হায়রত—অর্থাৎ আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে গভীর বিস্ময়, বিনয় ও অক্ষমতার অনুভব। এই পথের আসল সারও সেটাই: বান্দা যত এগোয়, তত বুঝতে পারে— আল্লাহকে ঘিরে তার জ্ঞান সীমিত, ভাষা সীমিত, উপলব্ধিও সীমিত।
এ কারণে যারা হাকিকত উপলব্ধি করেছেন, তাঁদের অবস্থায় হায়রত থাকে। তাঁদের প্রতিটি জিকিরের সঙ্গে মহব্বতের মধ্যে হায়রতের এক বিশেষ অবস্থা থাকে। এটাই তাওয়াজ্জুহ তথা অন্তরের পূর্ণ মনোযোগের মাকাম।
এই কারণেই হজরত শিবলি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, يا دليل المتحيرين زدني تحيرا – হে হায়রানদের পথপ্রদর্শক! আমার হায়রত আরও বাড়িয়ে দিন।
কারণ মুশাহাদার মধ্যে হায়রত হলো রিয়াজতের এক মহান স্তর। হজরত আবু জাফর রাজি রহমতুল্লাহি আলাইহি হজরত ইবরাহিম খাওয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহির সঙ্গে দরিয়ার কিনারে আল্লাহর এক বান্দাকে দেখলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কোন জিনিস দিয়ে খাবার গ্রহণ করো?” তিনি বললেন, “আমি পানির রুটি বানাই। কখনো নিজের জন্য রাখি, আর কখনো অন্যদের দিই। যে জিনিস আমার কাছে আসে, আল্লাহর দেওয়া রিজিক হিসেবেই আসে। তাই আমি সেটিকে কবুল করি। এই অবস্থাতেই আমার জীবন চলছে।” আল্লাহই অধিক জানেন।[7]
ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম সোহরাওয়ার্দি (রহ.) অত্যন্ত সংক্ষেপে বলেছেন, মুহাদারা তলবিনের (পরিবর্তনশীল অবস্থার অধিকারীদের) জন্য, মুশাহাদা তামকিনের (স্থিরতাপ্রাপ্তদের) জন্য, আর মুকাশাফা এই দুইয়ের মাঝামাঝি স্তর। তিনি আরও বলেছেন, মুহাদারা ইলমওয়ালাদের জন্য, মুকাশাফা অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখার অধিকারীদের জন্য, আর মুশাহাদা হক্কুল ইয়াকিনের অধিকারীদের জন্য।
তিনি বলেন, মুহাদারা হলো তলবিনের অধিকারীদের জন্য। অর্থাৎ যাদের অবস্থা বদলাতে থাকে, কখনো এক অবস্থায় থাকে, আবার কখনো আরেক অবস্থায় যায়; তাদের জন্য মুহাদারা।
মুশাহাদা হলো তামকিনের অধিকারীদের জন্য। অর্থাৎ, যারা আধ্যাত্মিক অবস্থায় স্থিরতা ও দৃঢ়তা পেয়েছেন; তাদের জন্য মুশাহাদা।
আর মুকাশাফা এ দুটির মাঝামাঝি স্তর। এই অবস্থা চলতে থাকে, যতক্ষণ না মুশাহাদা স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
আরেকভাবে বলা যায়— মুহাদারা হলো ইলমওয়ালাদের জন্য। মুকাশাফা হলো আয়নের অধিকারীদের জন্য; অর্থাৎ যারা শুধু জেনে থেমে থাকে না, বরং অন্তরের চোখে সত্য দেখতে শুরু করে। আর মুশাহাদা হলো হকের অধিকারীদের জন্য; অর্থাৎ হক্কুল ইয়াকিনের অধিকারীদের জন্য।[8]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি (রহ.) মুশাহাদাকে তিন অর্থে ভাগ করেছেন। সৃষ্টির মধ্যে হককে দেখা, সৃষ্টির মাধ্যমে হকের মুশাহাদা, এবং সৃষ্টি ছাড়াই হকের মুশাহাদা। মুসা (আ.)-এঁর পাহাড়ে দিদার চাওয়ার ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পাহাড়ও তাজাল্লি সহ্য করতে পারেনি, তাহলে মানুষ কীভাবে পারবে? মুকাশাফা সম্পর্কে তিনি বলেছেন এটি মুশাহাদার চেয়েও পূর্ণতর, কারণ এটি আমানতের অর্থ বুঝিয়ে দেয়; শুধু দেখায় না, বোঝায়ও।
মুশাহাদা:
إذا أشهدت فانثبت يا غلام يصح لك المكانة والمقام
হে তরুণ, যখন তোমাকে প্রত্যক্ষ করানো হবে, তখন স্থির থাকো; তাহলেই তোমার মর্যাদা ও মাকাম স্থির হবে।
فتشهده بعقلك في حجاب ومشهده قوى لا يرام
তুমি তাকে বুদ্ধি দিয়ে দেখবে, কিন্তু পর্দার আড়ালে; আর তার প্রত্যক্ষ ক্ষেত্র এত শক্তিশালী যে, সেখানে পৌঁছানো সহজ নয়।
وتشهده به في كل شيء وليس له الوراء ولا الأمام
তুমি তাকে তার মাধ্যমেই সবকিছুর মধ্যে দেখবে; আর তাঁর জন্য সামনে-পেছনের কোনো দিক নেই।
تسوم به وتنشده وما هو بمقصود لنا وهو الإمام
তুমি তার মাধ্যমেই সন্ধান করো, তাকে খোঁজো; অথচ তিনি আমাদের খোঁজার মতো কোনো সীমাবদ্ধ বস্তু নন, তিনিই পথের ইমাম।
وتسكن عند رؤيته سكونا يكون به التحقق والسلام
তাকে প্রত্যক্ষ করলে অন্তর এমন শান্ত হয়, যার মাধ্যমে সত্যের দৃঢ় উপলব্ধি ও নিরাপত্তা অর্জিত হয়।
তাওহিদের দলিলের আলোকে সবকিছুকে দেখা; সুফিদের পরিভাষায় এটিই মুশাহাদা। অর্থাৎ, তারা জিনিসকে শুধু জিনিস হিসেবে দেখে না; বরং প্রতিটি জিনিসের ভেতরে তাওহিদের প্রমাণ দেখতে পায়। এর প্রকৃত সত্য হলো ইয়াকিন, যেখানে সন্দেহের কোনো স্থান থাকে না।
বিলকিস বলেছিলেন, كَأَنَّهُ هُوَ – মনে হচ্ছে, এটাই সেই সিংহাসন।[9] বিলকিস নিজের সিংহাসন খুঁজছিলেন। কিন্তু যে কারণ তাঁর সিংহাসন সম্পর্কে অজ্ঞতা সৃষ্টি করেছিল, সেটি দূর হতে হতে তিনি বললেন, “মনে হচ্ছে, এটিই সেটি।” কারণ সেই সিংহাসন তার স্বাভাবিক স্থান থেকে বহু দূরের পথ অতিক্রম করে তাঁর সামনে এসে পড়েছিল।
এ বক্তব্য আমার কাছে প্রমাণ করে যে, সিংহাসনটি আগে থেকেই মানুষ ও জিনের মধ্যে প্রচলিত জন্মগত পদ্ধতিতে তৈরি হয়নি। কারণ যদি সাধারণ পদ্ধতিতে তৈরি হতো, তাহলে বিলকিস তার গঠন, কাঠামো ও ভেতরের শক্তির ভিত্তিতে বুঝে ফেলতেন যে, এটি তার আগের সিংহাসনের মতোই। অথচ এখানে যা ঘটেছে, তা ছিল প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও চোখের সামনে দেখা ঘটনা। তিনি সিংহাসন দেখলেন, জানলেনও; কিন্তু বিষয়টির রহস্য ছিল আরও গভীর।
এখানে মূল বিষয় হলো, যে সিংহাসনকে দেখা হচ্ছে, তার সঙ্গে বিলকিসের নিজের সিংহাসনের সম্পর্ক স্থাপন করা। অর্থাৎ, দেখা জিনিসটি আসলেই তাঁর সিংহাসন কি না— এটাই ছিল প্রশ্ন।
যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা যখন জিবরিল আলাইহিস সালামকে দিহইয়া কালবির আকৃতিতে দেখতেন, তখন তাঁরা বলতেন, “মনে হচ্ছে, তিনি দিহইয়া।” তাঁরা বলেননি, “তিনি দিহইয়া।” কারণ বাস্তবে তিনি দিহইয়া ছিলেন না।
বিলকিসের ঘটনাও এ ধরনের। এখানে দেখা ও না-জানার বিষয় একসাথে আছে। তাঁরা যা দেখেছিলেন, সে দিক থেকে দেখার বিষয়টি সত্য ছিল। কিন্তু যাকে দেখা হচ্ছে, তার প্রকৃত পরিচয় জানার দিক থেকে পূর্ণ জ্ঞান ছিল না। কারণ তাঁরা দেহের আকৃতি ছাড়া আর কিছু জানতেন না। তাঁরা দিহইয়ার প্রকৃত সত্তাকে জানতেন না; তাঁরা শুধু সেই দেহরূপ দেখেছিলেন, যার ওপর ‘দিহইয়া’ নামটি প্রযোজ্য ছিল। বাস্তবে নাম পুরো সত্তার ওপরই প্রযোজ্য হয়। কিন্তু তাঁরা শুধু বাহ্যিক রূপ দেখেছিলেন। তাই তাঁরা ভেবেছিলেন, সেই রূপের সঙ্গে পুরো সত্তাটিও আছে। অথচ বিষয়টি এমন নয়।
কারণ চোখ কখনো বাহ্যিক সাদৃশ্যপূর্ণ দুই জিনিসের ভেতরের পার্থক্য ধরতে ব্যর্থ হয়। যদি দুজন একসাথে সামনে থাকে, তখন পার্থক্য করা যায়। কিন্তু জিনিসটি নিজে গভীর ও জটিল হলে, বিশেষ করে ইলাহি জ্ঞানের ক্ষেত্রে, বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম হয়ে যায়।
কারণ কথা বলা নফসই মানুষের রুহ। সেই রুহকে “জায়েদ” নামে ডাকা হয়। কিন্তু সেই রুহ একসঙ্গে দুটি দেহী রূপ পরিচালনা করতে পারে না, হাজার রূপ তো দূরের কথা। আর যে রূপটি জায়েদের চোখে দেখা যাচ্ছে, সেটি জায়েদ থেকে আলাদা কিছু নয়; যদিও রূপগুলো ভিন্ন হতে পারে বা একে অন্যের মতো হতে পারে।
যেমন আমরা বলি, জায়েদের শরীর একটাই। কিন্তু তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রূপ ভিন্ন— মাথা, কপাল, ভ্রু, চোখ, গাল, নাক, মুখ, গলা, ঘাড়, হাত, পা সব একরকম নয়। তবু যে অঙ্গই দেখা হোক, বলা যায়— আমি জায়েদকে দেখেছি। এ কথা সত্য।
ঠিক তেমনই, যদি এসব রূপ বিস্তৃত হয়ে বহু রূপে প্রকাশ পায়, তবু তাদের ভেতরে রুহ একটাই থাকে। তখন দেখার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কারণ হলো— রূপগুলোর পারস্পরিক সংযোগ চোখে ধরা পড়ে না। দেহের অঙ্গগুলোর সংযোগ যেমন এক দেহে স্পষ্ট দেখা যায়, এখানে তেমনভাবে দেখা যায় না।
যদি কেউ রূপগুলোর মধ্যে সেই সংযোগ প্রত্যক্ষ করত, তাহলে প্রতিটি রূপ সম্পর্কেই বলত— এটিই জায়েদ। যেমন মুকাশিফ তথা যার সামনে সত্য উন্মোচিত হয়েছে, সে যখন আকাশমণ্ডলের প্রতিটি স্তরে নিজেকে দেখতে পায়, তখনও বিষয়টি এমনই হয়। কারণ প্রতিটি আকাশে তার একটি রূপ থাকে। আর সেই সব রূপকে পরিচালনা করে একটি রুহ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেটি জায়েদের রুহ। এটাই হলো সৃষ্টির মধ্যে হককে প্রত্যক্ষ করা।
সুফিরা মুশাহাদা সম্পর্কে বলেছেন, মুশাহাদা তিন অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি হলো সৃষ্টির মধ্যে হককে দেখা। অর্থাৎ, সবকিছুকে তাওহিদের দলিলের আলোকে দেখা। এ কথা আগেই বলা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো সৃষ্টির মধ্যে হকের মুশাহাদা। অর্থাৎ, সবকিছুর মধ্যে হকের দিকটি দেখা। তৃতীয়টি হলো সৃষ্টি ছাড়াই হকের মুশাহাদা। এটিই হলো সন্দেহহীন ইয়াকিনের বাস্তবতা।
তাঁরা যখন বলেন, “সবকিছুকে তাওহিদের দলিলের আলোকে দেখা”, তখন তাঁদের উদ্দেশ্য হলো—প্রতিটি বিদ্যমান বস্তুই হকের একত্বের ওপর একটি দলিল। তাই কোনোকিছুর অস্তিত্ব নিজেই হকের একত্বের প্রমাণ বহন করে। আর যখন তাঁরা বলেন, “সবকিছুর মধ্যে হককে দেখা”, তখন এর অর্থ হলো প্রতিটি বস্তুর মধ্যে আল্লাহর জন্য একটি বিশেষ দিক আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِذَا أَرَدْنَاهُ – যখন আমি তাকে ইচ্ছা করি।[10]
অতএব সেই দিকটি হলো বস্তুর মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত দিক। এখানে কারণের প্রভাব মুছে যায়, যদিও বাহ্যত জিনিসটি সৃষ্ট কোনো কারণের মাধ্যমে পাওয়া গেছে। আর যখন তাঁরা বলেন, “সন্দেহহীন ইয়াকিনের বাস্তবতা”, তখন যদি এই মুশাহাদা কোনো রূপের উপস্থিতিতে না হয়, তাহলে তা আখিরাতে ইলাহি তাজাল্লির মতো। সেখানে যারা দুনিয়ায় তাকে অস্বীকার করেছিল, তারা যখন কোনো চিহ্নে তাঁকে চিনবে, তখন তাঁকে স্বীকার করবে। যে রূপকে তারা আগে অস্বীকার করেছিল, সেটিই ছিল পরিচিত সেই চূড়ান্ত বিষয়। কিন্তু তারা তাঁকে শুধু চিহ্নের মাধ্যমে স্বীকার করেছিল; সরাসরি তাঁকে চিনতে পারেনি। তাই তাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ রয়ে গেল, আর তারা হককে প্রকৃতভাবে জানতে পারল না।
এই কারণেই আমরা “দেখা” ও “মুশাহাদা”-এর মধ্যে পার্থক্য করেছি। মুশাহাদা হলো অন্তরে উপস্থিত সাক্ষীকে দেখা। আর সেই সাক্ষী হলো হক, যিনি কোনো চিহ্নের বাঁধনে আবদ্ধ নন। কিন্তু সাধারণ “দেখা” এমন নয়। তাই মুসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ – হে আমার রব, আমাকে দর্শন দিন, আমি আপনার দিকে তাকাই।[11]
তিনি বলেননি, “আমাকে মুশাহাদা করান।” কারণ তাঁর মুশাহাদা তাঁর কাছ থেকে অনুপস্থিত ছিল না। আর নবীদের কাছ থেকে, এমনকি আরিফ আওলিয়াদের কাছ থেকেও তা অনুপস্থিত হয় কীভাবে? তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বললেন, لَنْ تَرَانِي – তুমি আমাকে কখনো দেখতে পাবে না।[12]
আর আল্লাহ মুসার চেয়ে পাহাড়কে বেশি সম্মানিত করেননি। বরং তিনি পাহাড়ের ওপর তাজাল্লি ঘটালেন, কারণ তিনি আগেই বলেছেন, لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ – আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করা মানুষের সৃষ্টি অপেক্ষা বড়; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।[13]
এখানে পাহাড় আসমান ও জমিনের অন্তর্ভুক্ত। আর মুসা আলাইহিস সালাম মানুষের অন্তর্ভুক্ত। তাই সৃষ্টির দিক থেকে পাহাড় মানুষের চেয়ে বড়। অর্থাৎ, হকের দিকের সঙ্গে তুলনা করলে আসমান ও জমিনের অবস্থান মানুষের চেয়ে বড়। কারণ আসমান ও জমিনে অর্থও আছে, রূপও আছে। আর মানুষের মধ্যে অর্থ আছে, রূপ নেই— এই বিশেষ বিবেচনায়। যে সত্তা অর্থ ও রূপ দুই দিক একসাথে ধারণ করে, সে শুধু এক দিক ধারণকারীর চেয়ে দালালত বা ইঙ্গিতের ক্ষেত্রে শক্তিশালী।
এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ – কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের অল্পসংখ্যক সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা এ বিষয় জানে।
পাহাড় অর্থ ও রূপ দুইটি একসাথে ধারণ করেছে। তাই তা মুসার মাআনাবি পাহাড়ের চেয়ে বড়। কারণ মাআনাবি মুসা জগতের একটি নুসখা তথা পূর্ণ প্রতিরূপ। তিনি যেন প্রতিটি মানুষের মতোই সমগ্র জগতের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। সুতরাং, যখন পাহাড় অর্থ ও রূপ দুইটি একত্র করল, তখন সেটিই ছিল শক্তিশালী ও তাজাল্লি গ্রহণের বেশি উপযুক্ত। তাই তাজাল্লির সময় পাহাড় ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল।
তাহলে মুসা কীভাবে তাজাল্লি সহ্য করবেন, অথচ তাঁর পাহাড়সুলভ দিকটি অর্থ, রূপ নয়? আর দেখা কেবল তার জন্যই শুদ্ধ হয়, যার মধ্যে নিজের ভেতর ও নিজের বাইরে স্থির থাকার গুণ থাকে। পাহাড়ের ক্ষেত্রে স্থিরতা তার নিজের মধ্যেও আছে, অন্যের জন্যও আছে। কারণ পাহাড়ই পৃথিবীকে স্থির রাখে। বলা হয়, অমুক ব্যক্তি পাহাড়ের মতো; অর্থাৎ বিপদ-আপদ ও বড় বড় ঘটনায় সে স্থির থাকে।
তাই আমরা মুসাকে সেই পাহাড়ের দিকে পাঠালাম, যার গুণ হলো স্থিরতা। এরপর যখন পাহাড় স্থির থাকা সত্ত্বেও তাজাল্লি সহ্য করতে পারল না, তখন হে শ্রোতা, পাহাড়ের স্থিরতার পরও যদি তুমি তাজাল্লির সামনে দাঁড়াও, তবে তোমার অবস্থাই বা কী হবে?
فرؤية الله لا تطاق فإنها كلها محاق
আল্লাহর দর্শন সহ্য করার মতো নয়; কারণ তা সবকিছুকে মুছে ফেলে।
فلو أطاق الشهود خلق أطاقه الأرض والطباق
কোনো সৃষ্টি যদি সত্যিকারের মুশাহাদা সহ্য করতে পারত, তবে জমিন ও আসমানের স্তরসমূহও তা সহ্য করতে পারত।
فلم تكن رؤيتي شهودا وإنما ذلك انفهٰاق
তাই আমার দেখা আসলে পূর্ণ মুশাহাদা ছিল না; বরং তা ছিল এক ধরনের ভেঙে পড়া ও বিলীন হয়ে যাওয়া।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? তিনি বললেন, نور أنى أراه – তিনি তো নুর; আমি তাঁকে কীভাবে দেখব? এর কারণ হলো, সৃষ্টি-জগত অন্ধকার। আর নুর হলো স্পষ্ট হক। অন্ধকার ও নুর একসাথে জমা হয় না, যেমন রাত ও দিন একসাথে থাকে না। বরং প্রত্যেকটি তার অধিকারীকে নিজের দিকে টেনে নেয় এবং নিজেকে প্রকাশ করে।
যে ব্যক্তি দিন দেখেছে, সে রাত দেখেনি। আর যে ব্যক্তি রাত দেখেছে, সে দিন দেখেনি। তাই বিষয়টি প্রকাশ ও অপ্রকাশের ব্যাপার। তিনি প্রকাশ্যও, আবার অপ্রকাশ্যও। আর আমরা সৃষ্টি এবং সৃষ্টি-জগতের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং তুমি যদি সৃষ্টি দেখো, তাহলে হককে দেখবে না। আর যদি হককে দেখো, তাহলে সৃষ্টিকে দেখবে না। একসাথে কখনো সৃষ্টি ও হককে দেখা যায় না। তবে একটির মধ্যে আরেকটির দিক দেখা যায়। এই দেখাটিও মূলত ইলমের দেখা; কারণ এখানে কিছু আড়াল থাকে, কিছু মুছে যায়।
মুকাশাফা:
إذا الحق أعطاك أسماءه فخذها أمانة من قد فهم
যখন হক তোমাকে তাঁর নামসমূহ দান করেন, তখন বুঝদার মানুষের মতো সেগুলোকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করো।
بأن الأمانة محمولة وحاملها جاهل قد ظلم
কারণ আমানত বহন করা হয়; আর যে তা না বুঝে বহন করে, সে অজ্ঞ এবং নিজের ওপর জুলুমকারী।
فإن أنت أفهمت مقصوده فأنت المكاشف فلتلزم
যদি তোমাকে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তবে তুমি মুকাশাফার অধিকারী। তখন এই অবস্থার আদব আঁকড়ে ধরো।
بأحكامها فمتى ما دعي بها فأجب أمره واختم
তার বিধান অনুযায়ী চলবে। যখন এর মাধ্যমে ডাকা হবে, তখন তাঁর নির্দেশে সাড়া দেবে এবং নিজেকে সীমার মধ্যে রাখবে।
من أجل التصرف فيها ولم يكن ينبغي لك أن تتحكم
এসব নামের মধ্যে তসররুফ তথা কাজ করার ক্ষমতা পাওয়ার কারণে কখনো নিজেকে স্বাধীন শাসক মনে করো না। তোমার জন্য নিজের ইচ্ছায় হুকুম চালানো ঠিক নয়।
فإنك عبد وأسماؤه ربوبية عرضت فاخترم
তুমি তো বান্দা। আর তাঁর নামগুলো রবুবিয়্যাতের নাম; সেগুলো তোমার সামনে প্রকাশ করা হয়েছে। তাই আদব রক্ষা করো।
مقام الأمانة أو ردها إلى ربها أولا واعتصم
আমানতের মাকাম রক্ষা করো। অথবা প্রথমেই সেটিকে তার রবের দিকে ফিরিয়ে দাও এবং তাঁকেই আঁকড়ে ধরো।
بما زادك الحال في أمرها وحقق إشارتها واغتنم
এই অবস্থার মাধ্যমে যে অতিরিক্ত উপলব্ধি তোমাকে দেওয়া হয়েছে, তা গ্রহণ করো। এর ইশারা সত্যভাবে বুঝো এবং সুযোগকে গনিমত মনে করো।
فهذي مكاشفة ترتضي وصاحبها سيد قد عصم
এটিই এমন মুকাশাফা, যা গ্রহণযোগ্য। আর এর অধিকারী নিরাপদ, সংরক্ষিত ও সম্মানিত।
জেনে রাখো, সুফিদের কাছে ‘মুকাশাফা’ কয়েক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এক. আমানতের অর্থ বুঝে নেওয়া।
দুই. অন্তরের অবস্থায় যে বাড়তি উপলব্ধি আসে, সেটিকে সত্যভাবে বুঝে নেওয়া।
তিন. ইশারার আসল উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়া।
আরও জেনে রাখো, মুকাশাফার সম্পর্ক অর্থ ও মর্মের সঙ্গে। আর মুশাহাদার সম্পর্ক সত্তার সঙ্গে। তাই মুশাহাদা হলো যার নাম বলা হচ্ছে, তাকে দেখা। আর মুকাশাফা হলো নামসমূহের বিধান ও প্রভাব বুঝে নেওয়া।
আমাদের মতে মুকাশাফা মুশাহাদার চেয়ে পূর্ণতর। তবে যদি হকের জাতকে সরাসরি দেখা সত্য হতো, তাহলে মুশাহাদাই পূর্ণতর হতো। কিন্তু হকের জাতকে এভাবে দেখা সম্ভব নয়। তাই আমরা বলি, মুকাশাফা বেশি পূর্ণ। কারণ মুকাশাফা সূক্ষ্মতর। মুকাশাফা স্থূল বিষয়কে সূক্ষ্ম করে দেয়। আর মুশাহাদা সূক্ষ্ম বিষয়কে উন্মুক্ত করে।
আমাদের এই কথার সঙ্গে আল্লাহওয়ালাদের বড় একটি দল একমত। যেমন আবু হামিদ, ইবন ফুরাক ও মুনজিরি। তবে আরেক দল এর বিপরীত মত দিয়েছেন।
আমরা মুকাশাফাকে বেশি পূর্ণ বলেছি এ কারণে যে, তুমি যে জিনিসই দেখো না কেন, তার ওপর দেখার বাইরে আরও একটি অতিরিক্ত হুকুম বা অর্থ থাকে। সেটি শুধু মুশাহাদায় ধরা পড়ে না; সেটি কেবল কাশফের মাধ্যমে জানা যায়।
ধরা যাক, কোনো জিনিসকে তার নিজস্ব সত্তার দিক থেকে তোমার সামনে উপস্থিত করা হলো এবং তুমি সেটি দেখলে। তবু সেই দেখা জিনিসটির সঙ্গে অবশ্যই একটি অতিরিক্ত হুকুম থাকে। আর সেই অতিরিক্ত হুকুম কেবল কাশফ ছাড়া জানা যায় না। বিষয়টি সবসময় এমনই। সুতরাং মুকাশাফা হলো অর্থগত উপলব্ধি। তাই এর সম্পর্ক মর্ম ও অর্থের সঙ্গে।
এর উদাহরণ হলো, তুমি যদি কোনো চলমান জিনিস দেখো, তখন কাশফের মাধ্যমে তার চালককে খুঁজবে। কারণ কাশফের মাধ্যমে তুমি জানো যে, এর একজন চালক আছে। এ কারণে এখানে ইলম দুটি জিনিসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়: চলমান বস্তু এবং তার চালক। কিন্তু চোখের দেখা, যা মুশাহাদা, তা শুধু একটি জিনিসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ফলে কাশফের মাধ্যমে এমন জিনিস জানা যায়, যা শুধু মুশাহাদার মাধ্যমে জানা যায় না। আর কাশফ সেই বিষয়কে খুলে ব্যাখ্যা করে, যা মুশাহাদার মধ্যে সংক্ষিপ্তভাবে থাকে। তাই আমরা বলেছি, মুকাশাফা তিন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইলমের মাধ্যমে মুকাশাফা, হালের মাধ্যমে মুকাশাফা এবং ওয়াজদের মাধ্যমে মুকাশাফা।
ইলমের মুকাশাফা হলো, আমানতকে বুঝে তার হক আদায় করা। অর্থাৎ যাকে দেখা হচ্ছে, তার মধ্যে যখন কোনো বিষয় তোমার সামনে প্রকাশ পায়, তখন সেই প্রকাশ থেকে আল্লাহ তোমার কাছে কী চান, তা বুঝে নেওয়া। কারণ, আল্লাহ তোমার সামনে কোনো বিষয় প্রকাশ করেন শুধু এজন্যই, যেন তিনি তোমাকে এমন কিছু বুঝিয়ে দেন, যা আগে তোমার জানা ছিল না।
মুশাহাদা হলো ইলমে পৌঁছার পথ। আর সেই পথের শেষ ফল হলো নফসের মধ্যে ইলম তৈরি হওয়া।
যেমন কেউ যদি তোমাকে কথা বলে, তুমি তার কথা শুনতে পাও। এই শোনা হলো শ্রবণগত মুশাহাদা। কারণ ইন্দ্রিয়ের কাজ হলো দেখা, শোনা, স্পর্শ করা, স্বাদ নেওয়া বা এ ধরনের প্রত্যক্ষ অনুভব। কিন্তু কাশফ ইন্দ্রিয়ের কাজ নয়; কাশফ হলো অর্থ ও মর্ম বোঝার শক্তির কাজ। তাই তুমি কথাটি কানে শুনলেও, তার ভেতরের উদ্দেশ্য কেবল বোঝার মাধ্যমে ধরতে পারো।
আল্লাহ যখন কোনোভাবে তোমাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের মাধ্যমে কিছু বুঝিয়ে দেন, তখন সেই বোঝাপড়াই তোমার কাছে একটি আমানত। সে আমানত তার উপযুক্ত লোকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। তুমি যদি তা না করো, তাহলে তুমি খিয়ানতকারী হবে।
নবীজি আলাইহিস সালাম বলেছেন, المجالس بالأمانة – বৈঠকের কথা আমানত। অর্থাৎ, কোনো বৈঠকে যা ঘটে, তা সবার কাছে বলা যাবে না। শুধু তাকেই বলা যাবে, যাকে আল্লাহ সেই কথা বোঝার যোগ্যতা দিয়েছেন, অথবা যার সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ক আছে।
যদি কেউ তোমাকে কোনো কথা বলে, তুমি তা বুঝতে পারো এবং বুঝতে পারো যে, কথাটি তোমার কাছে আমানত রাখা হয়েছে, তাহলে মনে রাখবে, মুশাহাদার অংশ হলো তুমি যা দেখেছ, শুনেছ, স্বাদ পেয়েছ, ঘ্রাণ নিয়েছ ও স্পর্শ করেছ। আর কাশফের অংশ হলো এসব থেকে তুমি যা বুঝেছ।
সুতরাং, তুমি যা কিছু বুঝেছ, তা আমানত। আর যদি আল্লাহর নির্দেশ তোমার ওপর এই হুকুম দেয় যে, আমানতটি তার যোগ্য লোকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, তাহলে তা পৌঁছে দাও। আমানত ও তার যোগ্য লোকের মধ্যে যথাযথ মিল রক্ষা করো।
কিন্তু যদি তোমার জানা বিষয়টি এমন হয়, যার অজ্ঞতা বহন করা যায় না, তাহলে নিজেকেই সেই জিনিসের মতো করে গড়ে তোলো, যা তুমি দেখেছ ও শুনেছ। এটি আরিফদের জন্য খুব কঠিন অধ্যায়। এখানে আদব, সংযম, সীমার প্রতি খেয়াল এবং সত্য রক্ষা করা দরকার। কারণ এখানে সত্য ও মিথ্যার মাঝে মাত্র একটি পর্দা থাকে। খিয়ানত ও আমানত রক্ষার মাঝেও মাত্র একটি পর্দা থাকে। সীমা রক্ষা সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে পার্থক্য তৈরি করে।
এই বিষয়ের ইলম হলো— যদি কেউ তোমার কাছে এমন কোনো মুশাহাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, যা তোমার চোখে দেখা, কানে শোনা অথবা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পাওয়া আমানত; অথচ প্রশ্নকারী তার যোগ্য নয়; তাহলে বুঝতে হবে, যিনি তোমাকে এই আমানত দিয়েছেন, তিনি সেটি প্রশ্নকারীর কাছে পৌঁছে দিতে চান না।
এ অবস্থায় যদি তুমি প্রশ্নকারীর সম্মানের কারণে উত্তর দিয়ে দাও, তাহলে তুমি খিয়ানত করলে। আর যদি উত্তর না দাও, কিন্তু উত্তরকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দাও, যাতে প্রশ্নকারী অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তুমি আমানত রক্ষা করলে।
তবে প্রশ্নকারী যদি তীক্ষ্ণ বুদ্ধির হয় এবং তুমি যা গোপন করতে চাও, তা বুঝে ফেলে, তাহলে তুমি তার কাছে মিথ্যাবাদী বলে গণ্য হতে পারো। যেমন কিয়ামতের দিন তিনটি মিথ্যার বিষয়ে ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালামের প্রশ্ন উঠবে। তিনি আল্লাহর কাছে লজ্জা অনুভব করবেন যে, শাফাআতের দরজা খুলে তিনি কথা বলবেন। অথচ সেই কথাগুলোতে উদ্দেশ্য ছিল সুন্দর, এবং শব্দের বাহ্যিক দিকেও সত্য ছিল। কিন্তু যাকে বলা হয়েছিল, তার মনে যে অর্থ এসেছিল, সেটি উদ্দেশ্য ছিল না। তাই এ স্থানের সূক্ষ্মতা ভেবে দেখো; এটি কত বিপজ্জনক জায়গা।
আর যদি তুমি বলো, “আমার কাছে এমন সত্য কথা নেই, যা পরোক্ষ ইঙ্গিতের চেয়ে বেশি মিথ্যা হয়ে যায়; অথচ সরাসরি সত্য কথা বলা অধিক উপযুক্ত”—তাহলে সত্যবাদীদের জবাব হলো, যারা ওই বিষয়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তাঁরা প্রশ্নকারীকে বলবেন— তুমি যে বিষয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করেছ, তার জবাবের বহু দিক আছে। তুমি কোন দিকের জবাব জানতে চাও, আমরা জানি না। তুমি দিকগুলো আলাদা করো। তিনি যদি বলেন, “আমার উদ্দেশ্য তো এমন”, তাহলে তাঁকে তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হবে।
কিন্তু যদি প্রশ্নকারী এমন বিষয়ে প্রশ্ন করে, যা আমানতের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে তাকে বলা হবে, এটি এমন আমানত, যা রক্ষার অঙ্গীকার আমাদের ওপর নেওয়া হয়েছে। আল্লাহর হকই বেশি উপযুক্ত যে, তা রক্ষা করা হবে। তাই আমরা এ বিষয়ে ঢিলেমি করব না, যদিও এতে তোমার সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় অথবা তুমি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি হও।
প্রশ্নকারী যেন সেই পর্দাবৃত ইহুদির চেয়েও বেশি অধিকারী না হয়ে যায়, যার প্রতিশ্রুতি পূরণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আরিফ ও মুশাহিদের উচিত সেই দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অবিচল থাকা।
আর যদি এই প্রশ্নকারীর প্রশ্ন এমন দিক থেকে হয়, যার সঙ্গে আমানতের সম্পর্ক নেই, তাহলে তাকে উত্তর দাও। কিন্তু সে যা বহন করতে সক্ষম নয়, তা তাকে দেবে না। কারণ সে বুঝতে না পারলে বিষয়টি তার ওপরই ফিরে এসে বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। তাঁদের “আমানতকে বুঝে নেওয়া” কথার অর্থ এটাই।
হালের মাধ্যমে মুকাশাফা হলো, হালের বাড়তি দিকটি সত্যভাবে বুঝে নেওয়া।
জেনে রাখো, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো সিফাত বা গুণে যুক্ত থাকে, তখন সেই সময় তার হালও সেই সিফাতের মতোই হয়। এ কারণে হাল আসে কেবল পূর্ণ বাক্যের পর। অর্থাৎ, এমন বাক্যের পর, যা নিজে সম্পূর্ণ কথা বোঝায়। যদি হাল ছাড়া বাক্যটি বোঝা না যায়, তাহলে সেটি হাল নয়; বরং মূল উদ্দেশ্যই সেটি।
যেমন তুমি বলো, “আমি জায়েদকে দেখেছি।” এখানে কথা সম্পূর্ণ হয়ে গেল। এরপর তুমি বললে, “সে আরোহী অবস্থায় ছিল।” তখন এটি হাল। কিন্তু যদি তোমার মূল উদ্দেশ্য হয়, জায়েদ আরোহী ছিল, শুধু এটি জানানো, তাহলে বাক্যটি আসলে সেই অর্থেই সম্পূর্ণ হবে। এখানে তুমি আলাদা করে হালের কোনো অতিরিক্ত ফায়দা বোঝাচ্ছ না। তবে মোটের ওপর একটি ফায়দা পাওয়া গেছে— তুমি জায়েদকে দেখেছ এবং সে আরোহী ছিল।
হালের বাড়তি অর্থ বোঝার বিষয়টি হলো, হাল এমন অতিরিক্ত ফায়দা দেয়, যা মূল বাক্যের উদ্দেশ্য না হলেও বোঝার জন্য দরকারি হয়ে ওঠে। এটি আগের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বলা হয়েছে, আমানতকে বোঝার মাধ্যমে সত্যভাবে গ্রহণ করতে হয়।
ধরা যাক, কেউ তোমার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি জায়েদকে দেখেছ?” তুমি বললে, “হ্যাঁ, দেখেছি।” তারপর তুমি এমন একটি হাল যোগ করলে, যা সে জিজ্ঞাসা করেনি। তুমি বললে, “সে ভ্রমণে ছিল।” অথচ প্রশ্নকারীর মনে ছিল, জায়েদ কি দেশে আছে? সে যেন তার সঙ্গে দেখা করতে পারে। তুমি যখন তাকে জানালে যে, জায়েদ ভ্রমণে আছে, তখন এই অতিরিক্ত তথ্য তার জন্য কাজে লাগল। কারণ সে বুঝল, জায়েদের সঙ্গে এখন দেখা করা সম্ভব নয়। জায়েদ দেশে নেই। এটাই হালের বাড়তি ফায়দা।
আল্লাহওয়ালাদের পথেও হালের বাড়তি উপলব্ধি এমনই। এর অর্থ হলো, কোনো নির্দিষ্ট হালে নিজের সত্তাকে দেখতে পাওয়া। তারপর সেই হাল থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাকে কোন বিষয়ের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
যেমন কেউ নিজের সত্তাকে কোনো বিশেষ হালের মধ্যে দেখল— চলন, স্থিরতা, অথবা এমন কোনো সিফাত, যা দর্শকের প্রকৃতির সঙ্গে মানায় বা মানায় না। তখন সে সেই হাল থেকে এমন একটি অতিরিক্ত বিষয় বুঝতে পারে, যা তাকে জ্ঞানের দিকে পৌঁছে দেয়। সেই হাল তাকে নিজের মর্যাদা, অপমান, অথবা সম্মান; যা-ই হোক, তা বুঝিয়ে দেয়। এটিই হলো আল্লাহর দেওয়া হালের বাড়তি উপলব্ধি। এইভাবে তার কাছে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান জন্মায়।
আল্লাহর এক বান্দা বলেছেন, “আমি জানি না, আমার রব আমাকে ভালোবাসেন কি না।”
তাকে বলা হলো, “তুমি এটা কীভাবে জানবে?”
তিনি বললেন, “তিনি আমাকে জানিয়ে দেবেন।”
তাকে বলা হলো, “তাঁর রসুলের পরেও কি তোমার কাছে ওহি আসবে?”
তিনি বললেন, “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ – তোমরা আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।[14]
আমি এখন শরিয়তের অনুসরণের হালে আছি। আর আল্লাহর কথা সত্য। তাই এই হাল আমাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। কারণ, তিনি আমাকে এই সময়ে এমন কাজে নিয়োজিত করেছেন, যা তিনি ভালোবাসেন। তিনি তাঁর প্রিয় নবির অনুসরণের দিকে তাকিয়ে আমাকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। তাই আমি বুঝেছি, যে মহব্বত আমাকে তাঁর অনুসারী বানিয়েছে, তা অনুসরণের কারণেই এসেছে।”
ওয়াজদের মাধ্যমে মুকাশাফা হলো, ইশারার উদ্দেশ্য সত্যভাবে বুঝে নেওয়া। এখানে “ইশারা” বলতে আমি সেই সাধারণ বৈঠকের ইশারা বোঝাচ্ছি না, যেখানে দূরে থাকা কাউকে ডাক দেওয়া হয় এবং শব্দ তার কাছে পৌঁছায় না।
বরং হকের মজলিস দুই ধরনের। প্রথম ধরনের মজলিসে কেবল আল্লাহর সঙ্গে একান্ত নির্জনতা থাকে। সেখানে ইশারা হয় না। কারণ সেখানে তুমি একাই তাঁর সঙ্গে বসো, তাঁর জ্ঞানের সীমা অনুযায়ী।
দ্বিতীয় ধরনের মজলিসে অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। যেমন হক যখন কোনো বান্দার জন্য কোনো রূপে তাজাল্লি করেন, তখন অনেক লোক সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারে। সংখ্যায় কম হোক বা বেশি, এমনকি একজন অতিরিক্ত হলেও। এমন মজলিসে ইশারা হতে পারে।
কিন্তু অন্য মজলিসে লোক যত বাড়ে, সবাই এক অবস্থায় একত্র হতে পারে না। যদি আল্লাহ প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তিকে অন্যদের অবস্থাও দেখিয়ে দেন, তাহলে কেউ তা বহন করবে, কেউ অস্বীকার করবে, আর কেউ বলবে, “এটি ইবলিসের ধোঁকা।”
তাই যখন এই উপস্থিতি ও রূপগত মজলিসে প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তখন সরাসরি স্পষ্টভাবে বলা জরুরি নয়; বরং ইশারাই যথেষ্ট। প্রত্যেক মানুষ সেই ইশারা থেকে নিজের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বুঝে নেয়।
সেখানে আল্লাহর কালাম একটিই থাকে। কিন্তু উপস্থিত ব্যক্তিদের দিকে তাকালে সেই এক কালাম অনেক কথার মতো হয়ে যায়। ফলে প্রত্যেক সহচর সন্তুষ্ট হয়ে যায়। সে মনে করে, বাকি সবার চেয়ে আল্লাহর কালাম বুঝতে সে-ই বেশি বিশেষভাবে ধন্য হয়েছে।
তবে আল্লাহর কিছু বিশেষ বান্দা আছেন। আল্লাহ তাঁদের এমন বুঝ, এমন প্রশস্ততা এবং আমানত রক্ষার শক্তি দান করেছেন যে, তাঁরা এ ধরনের মজলিসে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি ইশারা বুঝতে পারেন। যার দিকেই ইশারা করা হোক, তাঁরা সেই ইশারার অর্থ ধরতে পারেন।
তাঁরা এমন তাজাল্লিতেও আল্লাহকে চিনতে পারেন, যা অন্যদের কাছে অস্বীকারের মতো মনে হয়। আর তাঁরা প্রত্যেক আকিদা ও বিশ্বাসের ভেতরেও তাঁকেই প্রত্যক্ষ করেন। সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনিই এই অনুগ্রহের অধিকারী।[15]
চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মুহাদারা, মুকাশাফা ও মুশাহাদা সুফি সাধনার এক ক্রমবর্ধমান যাত্রা। চিন্তা থেকে উন্মোচন, উন্মোচন থেকে প্রত্যক্ষ দর্শন।
ইমাম কুশাইরি দেখিয়েছেন এই তিনটি স্তরের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য ও সম্পর্ক। দাতা গঞ্জে বখশ নবীজির মিরাজের ঘটনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, এই পথের শেষে থাকে হায়রত। সোহরাওয়ার্দি সংক্ষেপে এই তিনটি স্তরকে তলবিন, মুতাওয়াসসিত ও তামকিনের সাথে যুক্ত করেছেন। আর ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরভাবে দেখিয়েছেন, মুকাশাফা আসলে মুশাহাদার চেয়েও বেশি কিছু দেয়; কারণ এটি কেবল দেখায় না, বরং বুঝিয়েও দেয়।
সবশেষে বলা যায়, মুহাদারা, মুকাশাফা ও মুশাহাদা সুফি সাধনার সেই গভীরতম স্তর, যেখানে বান্দা ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব থেকে দূরে গিয়ে আল্লাহর প্রত্যক্ষ উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যান। এই যাত্রার শেষ মাথায় থাকে না কোনো নিশ্চিত উত্তর, থাকে কেবল এক গভীর বিস্ময়; যা প্রকৃত সাধকের পরিচয়।