১. যে কিছু অর্জন করেছে, সে সেবার মাধ্যমেই অর্জন করেছে। তাই মুরিদের জন্য অপরিহার্য হলো পীরের নির্দেশ থেকে বিন্দুমাত্রও অতিক্রম না করা। নামাজ, তাসবিহ এবং অন্যান্য আমল সম্পর্কে পীর যা নির্দেশ দেন, তা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং যথাযথভাবে পালন করা, যাতে সে কোনো উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে। কারণ, পীরই মুরিদকে গড়ে তোলেন; পীর যা কিছু বলেন, তা মুরিদের পরিপূর্ণতার জন্যই বলেন।”

২. আরিফগণ মহান মর্যাদার অধিকারী এবং তারা আল্লাহর ভালোবাসায় নিমগ্ন। যখন কোনো ব্যক্তি রাতে অজু অবস্থায় থাকে (অজু করে ঘুমায়), তখন নির্দেশ দেওয়া হয় যে, ফেরেশতারা তার সঙ্গে থাকুক। তারা সকাল পর্যন্ত আল্লাহর কাছে এ দোয়া করতে থাকে, “হে আল্লাহ, এই বান্দাকে ক্ষমা করে দিন, কারণ সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছে।”

৩. ‘আরিফ’ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যিনি আল্লাহ তায়ালার পরিচয় লাভ করেছেন, তাঁর সাথে অন্তরের গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং সর্বদা তাঁর স্মরণ ও ভালোবাসায় নিমগ্ন থাকেন।

৪. যে সমগ্র জগতের আধ্যাত্মিক জ্ঞান রাখে, নিজের বুদ্ধি থেকে অসংখ্য অর্থ উদ্ভাবন ও বর্ণনা করতে পারে, প্রেমের সূক্ষ্মতম রহস্যের উত্তর দিতে সক্ষম হয় এবং সর্বদা এমন এক সমুদ্রের মাঝে সাঁতার কাটতে থাকে, যাতে সে আল্লাহর রহস্য ও নুরের মুক্তা আহরণ করে তা প্রজ্ঞাবান জহুরীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে, সে-ই আরিফ।

৫. নামাজ মুমিনের মেরাজ, যেমন হাদিস শরীফে এসেছে, ‘আস-সালাতু মি‘রাজুল মু’মিনীন।’ এরপর তিনি বলেন, নামাজ এক গোপন কথা, যা বান্দা তার প্রভুর সাথে বলে। হাদিসে এসেছে, ‘আল-মুসাল্লি ইউনাজি রাব্বাহু।’ অর্থাৎ, নামাজ আদায়কারী তার প্রভুর সাথে গোপনে কথা বলে। নামাজ বান্দাদের জন্য আল্লাহর এক আমানত। সুতরাং, বান্দাদের উচিত এই আমানতের হক এমনভাবে আদায় করা, যাতে এতে কোনো প্রকার খিয়ানত না হয়।”

৬. নামাজ হলো দ্বীনের মূল স্তম্ভ। যখন এই স্তম্ভ অটল থাকে, তখন পুরো দ্বীনও অটল থাকে।

৭. যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে আহার করায়, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার এবং জাহান্নামের মাঝে সাতটি পর্দা স্থাপন করে দেবেন।

৮. যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খায়, সে যেন নিজের পরিবারকেই ধ্বংস করে ফেলে; তার জীবন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়।

৯. ভালোবাসায় সত্যবাদী সেই ব্যক্তি, যার উপর ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রাধান্য পায় যে, তার মাথায় যদি লক্ষ লক্ষ তরবারির আঘাতও করা হয়, তবুও সে তা অনুভব করে না।

১০. আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্বে সত্যবাদী সে ব্যক্তি, যার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, তবুও সে কোনো অভিযোগ করে না।

১১. অকারণে কোনো মুসলমান ভাইকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে বড়ো গুনাহ আর নেই। এতে আল্লাহ ও তাঁর রসুল উভয়ই অসন্তুষ্ট হন।

১২. গুনাহ তোমার যতটা ক্ষতি করতে পারে, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয় যখন তুমি কোনো মুসলমান ভাইকে অপমান ও লাঞ্ছিত করো।

১৩. যখন কেউ আল্লাহ তায়ালার নাম শুনে বা তাঁর কালাম (কুরআন) শ্রবণ করে, আর তার অন্তর নম্র না হয়, আল্লাহভীতি বৃদ্ধি না পায় এবং ইমান মজবুত না হয়, তবে তা বড়ো গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

১৪. পাঁচটি জিনিসের দিকে তাকানোও ইবাদত। ১. মা-বাবার চেহারার দিকে তাকানো। হাদিসে এসেছে, যে সন্তান ভালোবাসার সঙ্গে তার পিতা-মাতার মুখের দিকে তাকায়, তার আমলনামায় একটি হজের সওয়াব লেখা হয়। ২. কুরআন শরিফের দিকে তাকানো। আল্লাহর কালামের প্রতি দৃষ্টি দেওয়াও ইবাদত। ৩. কোনো আলেম বা বুজুর্গের চেহারার দিকে সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকানো। ৪. খানায়ে কাবার দরজার জিয়ারত করা এবং কাবা শরিফ দেখা। ৫. নিজ মুরশিদের চেহারার দিকে তাকানো এবং তাঁর খিদমতে নিয়োজিত থাকা।

১৫. আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তাই একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে কোনো প্রকার অবহেলা না করা। তখন সে যা কামনা করবে, তাই লাভ করতে সক্ষম হবে।

১৬. সুরা ফাতিহা সব ধরনের ব্যথা ও রোগের জন্য শিফা (আরোগ্য)। যে রোগ কোনো চিকিৎসায় ভালো হয় না, সে ব্যক্তি যদি ফজরের সুন্নত ও ফরজের মাঝে ‘বিসমিল্লাহ’সহ ৪১ বার সুরা ফাতিহা পাঠ করে এবং দম করে, তবে তা দূর হয়ে যায়।

১৭. রাতকে তিন ভাগে বিভক্ত করো। প্রথম অংশ নামাজে ব্যয় করো। দ্বিতীয় অংশ তাহাজ্জুদে কাটাও। যা চার রাকাতে (চার সালামে) আদায় করবে এবং যতটুকু কুরআন মুখস্থ আছে তা পড়বে। এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। পুনরায় উঠে নতুন অজু করে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকবে।

১৮. যে আল্লাহকে চিনে ফেলেছে, অথচ সৃষ্টি থেকে দূরে সরে যায় না, তবে বুঝে নাও, তার মধ্যে কোনো নিয়ামত নেই।

১৯. আরিফ সে ব্যক্তি, যে তার অন্তরের সবকিছু বের করে দেয়, যাতে তা আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছুর প্রতি আসক্তি না থাকে। তখন আল্লাহ তায়ালা তার কাছ থেকে কোনোকিছুই গোপন রাখেন না এবং সে উভয় জগত থেকেই নির্লিপ্ত হয়ে যায়।

২০. আরিফ দুনিয়ার শত্রু এবং প্রভুর বন্ধু। সে দুনিয়া থেকে বিমুখ থাকে এবং অতিরিক্ত ভালোবাসা বা হিংসা-বিদ্বেষের মধ্যে জড়ায় না।

২১. আমি আমার পীর হজরত খাজা উসমান হারুনি (রহ.)-এঁর নিকট থেকে শুনেছি, যদি কারো মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, তবে বুঝবে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ভালোবাসেন। তা হলো— সাখাওয়াত (দানশীলতা), শফকত (মমতা) এবং তাওয়াজু (নম্রতা)। দানশীলতা হবে নদীর মতো, মমতা হবে সূর্যের মতো, আর নম্রতা হবে মাটির মতো।

২২. নেককারদের সঙ্গ, নেক কাজের চেয়েও উত্তম; আর খারাপ লোকদের সঙ্গ, খারাপ কাজের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর।

২৩. দুনিয়ায় সর্বোত্তম তিন ব্যক্তি হলো, সে আলেম, যিনি নিজের জ্ঞান অনুযায়ী কথা বলেন। সে ব্যক্তি, যার মধ্যে লোভ নেই। সে আরিফ, যিনি সর্বদা তাঁর প্রভুর প্রশংসা ও গুণগান করেন।

২৪. ভালোবাসায় সত্যবাদী সে ব্যক্তি, যে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। প্রকৃত প্রেমিক সে, যে আল্লাহর বাণীর নির্দেশ অনুসরণ করে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সত্যনিষ্ঠ থাকে।

২৫. সত্যিকারের আরিফ সে ব্যক্তি, যার নিজের কোনোকিছুর মালিকানা নেই এবং সে নিজেও কারো মালিকানাধীন নয়।

২৬. আরিফদের তাওয়াক্কুল হলো, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর নির্ভর করে না এবং কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ দেয় না।

২৭. তাওবায়ে নসুহার মধ্যে তিনটি বিষয় রয়েছে। রোজার জন্য কম খাওয়া, ইবাদতের জন্য কম ঘুমানো, দোয়ার জন্য কম কথা বলা। প্রথমটি থেকে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি থেকে আল্লাহর ভালোবাসা জন্ম নেয়।

২৮. আরিফগণ সূর্যের ন্যায়, যারা পৃথিবীতে আলো ছড়ায় এবং তাদের নুর দ্বারা সমগ্র জগৎ আলোকিত হয়।

২৯. আরিফ সূর্যের মতো, যার আলোতে কোনো কিছুই বঞ্চিত থাকে না।

৩০. একবার খাজা গরিব নাওয়াজকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘মুরিদ কখন স্থিরচিত্ত হয়?’ তিনি বললেন, “যখন তাঁর  আমলনামায় কোনো গুনাহ লিখার জন্য ফেরেশতা এক বছর ধরে অপেক্ষা করে গুনাহ লিখতে না পারে।”

৩১. আহলে মহব্বতের লক্ষণ হলো আল্লাহর আদেশে পূর্ণতা-সহ অনুগত থাকা এবং সবসময় ভয় পেতে থাকা যেন নিজের কর্ম দ্বারা তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে না যায়।

৩২. অশুভর লক্ষণ হলো গুনাহ করা এবং মনে করা যে, তুমি তবু গ্রহণযোগ্য থাকবে।

৩৩. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় গুণাবলি হলো দুঃখী ও কষ্টপ্রাপ্তদের আহাজারি শোনা, দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণ করা, ক্ষুধার্তদের খাদ্য প্রদান করা।[42]