জাহাঙ্গীর তখন মুঘল সাম্রাজ্যের মসনদে। ক্ষমতা তাঁর হাতে, কিন্তু দরবারের আসল সুতো ধরে টানছেন অন্যরা। সম্রাজ্ঞী নূর জাহান পর্দার আড়াল থেকে রাজ্য চালান, আর তাঁর ভাই আসিফ জাহ ষড়যন্ত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই দরবারে তখন একটাই ভয়, হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)। সারা হিন্দুস্তানে তাঁর লক্ষ লক্ষ অনুসারী, তাঁর প্রভাব দরবারকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বরদাশত করা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই সিদ্ধান্ত হলো তাঁকে দরবারে তলব করতে হবে।

তলবের খবর পেয়ে অনুসারীরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মুঘল দরবারে সম্রাটকে ‘সিজদা-এ-তাজিমি’ করার রীতি ছিল। কিন্তু মুজাদ্দেদে আলফে সানি তো তা করবেন না, এর ফল কী হবে? জাহাঙ্গীরের ছেলে শাহজাহান ছিলেন হজরতের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি প্রিয় পীরকে বিপদ থেকে বাঁচাতে আলেমদের কাছ থেকে ফতোয়া জোগাড় করলেন। তারা ফতোয়া দিলো, নিরুপায় হলে সিজদা জায়েজ হতে পারে।

সেই ফতোয়া হজরতের কাছে পাঠালেন, ভাবলেন এতে হয়তো কাজ হবে। হজরত সেই ফতোয়া পড়লেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “প্রাণ বাঁচানোর জন্য এটা একটা কৌশল হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা যাবে না, এটাই আমার সিদ্ধান্ত।”

হজরত একাই দরবারে রওনা হলেন, সঙ্গে কাউকে নিলেন না। দরবারিরা পথেই ঘিরে ধরলো “অন্তত মাথাটুকু একটু নিচু করুন, ওটুকুই যথেষ্ট।” তিনি নীরবে এড়িয়ে গেলেন। তখন চক্রান্তকারীরা আরেক হীন ফন্দি আঁটলো। তাঁকে ইচ্ছে করে এমন একটি ছোটো দরজা দিয়ে ঢোকানোর ব্যবস্থা হলো, যাতে মাথা না নোয়ালে ঢোকাই না যায়।

হজরত দরজার সামনে এসে থামলেন। এক মুহূর্ত দেখলেন। তারপর আগে পা ঢুকিয়ে দিলেন, মাথা পেছনে হেলিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকলেন। দরবারে পা রাখতেই উচ্চস্বরে বললেন, আসসালামু আলাইকুম।

জাহাঙ্গীর সোজা জিজ্ঞেস করলেন, সিজদা করলেন না কেন?
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম।
কিন্তু এটা রাজকীয় আদেশ।
হজরত সরাসরি চোখে চোখ রেখে বললেন, আপনার আদেশের চেয়ে আল্লাহর আদেশ অনেক বড়ো।

দরবারে সেদিন সবাই যেন পাথর হয়ে গেল। জাহাঙ্গীর রাগে কাঁপছেন। প্রহরীদের হুকুম দিলেন জোর করে ঘাড় নোয়াতে। প্রহরীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করল। সেই ঘাড় নোয়ানোর ছিল না, নোয়ালোও না।

এরপর অভিযোগ তোলা হলো, তাঁর লেখা একটি চিঠিতে নাকি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর শানে বেয়াদবি করা হয়েছে। হজরত শান্তভাবে জবাব দিলেন, সেই চিঠি ছিল আমার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিবরণ, শুধু আমার মুর্শিদের জন্য লেখা। তারপর একটি সহজ উদাহরণ দিলেন, সম্রাট যদি দরবারের শেষ সারির কোনো খাদেমকে ডাক দেন, তাহলে সামনে আসতে গেলে তো তাকে বড়ো বড়ো উজির-আমিরদের সামনে দিয়েই আসতে হবে। তার মানে কি সে উজিরদের চেয়ে বড়ো হয়ে গেল? এই সহজ যুক্তিতে সম্রাট নিজেও সন্তুষ্ট হলেন।

তারপর হজরত বললেন, আমি তো হজরত আলী (রা.)-কেও হজরত সিদ্দিক আকবর (রা.)-এর সমকক্ষ মনে করি না, সেখানে নিজেকে তাঁর চেয়ে বড়ো দাবি করার প্রশ্নই আসে না। এই একটি বাক্যে তিনি সত্য প্রকাশ করলেন এবং একই সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশও উন্মোচন করলেন। কারণ ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে যারা ছিল, তারাই হজরত আলী (রা.)-কে সবার উপরে রাখত।

কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা থামেনি। তারা সম্রাটকে ফুঁসলালো, হজরত মুক্ত থাকলে বিদ্রোহের আশঙ্কা আছে। জাহাঙ্গীর তাঁকে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি করার নির্দেশ দিলেন। পাহারায় রাখা হলো অমুসলিম প্রহরী, পাছে মুসলিম হলে তাঁর প্রভাবে পড়ে যায়।

কিন্তু কারাগারের দেয়াল কি আর আলো ঠেকাতে পারে? দুই বছরে সেই কারাগারই হয়ে উঠলো তাবলিগের নতুন কেন্দ্র। অপরাধীরা বদলে গেল, অমুসলিম প্রহরীরা ইসলাম গ্রহণ করলেন। যারা ভেবেছিল বন্দিত্বে তিনি ভেঙে পড়বেন, তারা দেখলো উল্টো ছবি।

বাইরে ততদিনে আগুন জ্বলছে। বড়ো বড়ো সেনাপতি আর প্রভাবশালী অনুসারীরা বিদ্রোহের কথা ভাবছেন। শাহজাহান মরিয়া হয়ে উঠেছেন। জাহাঙ্গীর বুঝলেন, এবার না ছাড়লে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। মুক্তির ফরমান জারি হলো।

হজরত মুক্তির বিনিময়ে কিছু শর্ত দিলেন। সর্বশক্তিমান মুঘল সম্রাট সেই শর্তগুলো মাথা নুইয়ে মেনে নিলেন। আর তখনই ইতিহাস লেখা হলো, রাজ-দরবারে ‘সিজদা-এ-তাজিমি’ চিরতরে নিষিদ্ধ হলো। হিন্দুদের চাপে বন্ধ হয়ে যাওয়া গো-জবাই পুনরায় বৈধ হলো, এমনকি দরবারের সদস্যরা সম্রাটের সামনে গরু জবেহ করে সেই মাংস একসঙ্গে খেলেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদগুলো পুনর্নির্মাণের আদেশ হলো। দরবারের পাশেই নতুন মসজিদ তৈরি হলো, যেখানে জাহাঙ্গীর নিজেও নামাজ পড়তেন। আর গোটা সালতানাতে শরিয়তি আইন পুনরায় চালু হলো।

একজন একা মানুষ, যাঁর হাতে কোনো তলোয়ার ছিল না, শুধু ছিল অটল ঈমান। দুই বছরের কারাবাস আর তিন বছরের রাজকীয় সাহচর্য শেষে সেই ঈমানের কাছে পুরো মুঘল সাম্রাজ্য মাথানত করলো। ইসলামের বিজয় হলো কোনো যুদ্ধ ছাড়াই।