আজমিরে এসে থামল খাজা গরিব নাওয়াজ (রহ.)-এঁর কাফেলা । শহরে ঢুকে একটি পিপল গাছের ছায়ায় তিনি আস্তানা গাড়লেন। কিন্তু জায়গাটি ছিল রাজা পৃথ্বীরাজের উটগুলো বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান।
কিছুক্ষণ পরেই রাখালরা এসে রুক্ষ গলায় বলল, উঠুন এখান থেকে! এটা রাজার জায়গা। হুজুর শান্তভাবে বললেন, “ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি। তোমাদের উট এখানেই বসবে।” এই বলে তিনি উঠে আনা সাগর হ্রদের তীরে গিয়ে বসলেন।
কিছুক্ষণ পরেই রাখালরা আঁতকে উঠল। উটগুলো মাটিতে বসতেই পাথর হয়ে গেছে যেন, আর উঠছে না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তারা রাজার কাছে ছুটল। সব শুনে পৃথ্বীরাজ বুঝল এর পেছনে সেই দরবেশের হাত। নিরুপায় হয়ে বলল, যাও, তাঁর কাছে ক্ষমা চাও।
রাখালরা হুজুরের কাছে ক্ষমা চাইতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন, যাও, তোমাদের উট উঠে দাঁড়িয়েছে। সত্যিই উটগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। এই খবর শুনে পৃথ্বীরাজ ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল। তবু মাথা নত করল না। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে হুজুরের খাদেমদের হ্রদ থেকে পানি নিতে বাধা দেওয়ার নির্দেশ দিল।
একদিন হুজুরের এক খাদেম অজুর পানি আনতে হ্রদে গেলেন। গিয়ে দেখলেন রাজার সৈন্যরা পাহারায়। কলসি ভরতে গেলেই সৈন্যরা বাধা দিয়ে বলল, এই হ্রদের পানি তোমাদের জন্য নয়।
খাদেম বললেন, পানি তো পশুপাখির জন্যও বন্ধ করা হয় না, আমরা তো মানুষ!
সৈন্যরা হাসতে হাসতে বলল, তোমরা পশুদের চেয়েও অধম।
খাদেম ফিরে এসে হুজুরকে সব বললেন। হুজুর বললেন, যাও, বলো একবারের মতো শুধু এক কলসি পানি নিতে দিক। সৈন্যরা ঠাট্টা করে বলল, আজকের মতো নাও, এরপর আর আসবে না।
খাদেম কলসি ডুবালেন , আর তখনই ঘটল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিশাল আনা সাগর হ্রদের সমস্ত পানি সেই ছোট্ট কলসির মধ্যে ঢুকে গেল। বিশাল হ্রদ মুহূর্তেই পানিশূন্য। ভয়ে সৈন্যরা চিৎকার করতে করতে পালিয়ে গেল।
সারা আজমিরে খবর ছড়িয়ে পড়ল। পৃথ্বীরাজ ক্রোধে ফেটে পড়ল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে টের পাচ্ছিল, সে সাধারণ কোনো শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে না।
কিছুক্ষণ পরেই শহরের গণ্যমান্য মানুষেরা হুজুরের দরবারে এসে কান্নাভেজা গলায় বললেন, হুজুর, হ্রদ শুকিয়ে গেলে শহরের মানুষ তৃষ্ণায় মারা যাবে। দয়া করুন।
হুজুর তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা ছিল সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য একটি সামান্য ঝলক। নইলে আমাদের ধর্ম একটি কুকুরকেও তৃষ্ণায় ছটফট করতে দেখতে পারে না। এরপর খাদেমকে নির্দেশ দিলেন কলসির পানি হ্রদে ঢেলে দিতে। কলসির পানি পড়তেই হ্রদ আবার কানায় কানায় ভরে উঠল।
এত কিছু দেখেও পৃথ্বীরাজের বুকের পাথর সরল না। সে এবার ষড়যন্ত্রের নতুন জাল বুনতে বসল।
মন্দিরে গিয়ে প্রধান ব্রাহ্মণের দরজায় হাজির হলো। সব ঘটনা খুলে বলে সাহায্য চাইলো। ব্রাহ্মণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এই দরবেশ অনেক বড়ো বুজুর্গ। তাঁকে ঠেকাতে জাদু ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সে সবাইকে একটি বিশেষ মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বলল, এটি পড়তে থাকো, এর প্রভাবে হয়তো এই দরবেশ এখানে আর টিকতে পারবেন না।
কাফেররা মন্ত্র পড়তে পড়তে এগিয়ে চলল। হুজুরের এক মুরিদ তা টের পেয়ে ছুটে গিয়ে খবর দিলেন। হুজুর শান্ত মুখে বললেন, ভয় নেই। তাদের জাদু আমাদের গায়ে লাগবে না। বরং দেখো, জাদুকর নিজেই সঠিক পথে চলে আসবে। এই বলে তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন।
কাফেররা কাছে আসতেই হঠাৎ তাদের কথা বন্ধ হয়ে গেল, পা আর এগোতে চাইলো না। যে যেখানে ছিল সেখানেই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। হুজুর নামাজ শেষ করে ফিরে তাকালেন। তাঁর নুরানি চেহারার দিকে চোখ পড়তেই সেই দলের নেতা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলো এবং সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করে নিল। বাকি কাফেররা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু সে উল্টো রেগে লাঠি তুলে তাদের মারতে মারতে তাড়িয়ে দিলো।
হুজুর মমতার দৃষ্টিতে নতুন মুসলমানটির দিকে তাকালেন। নিজ হাতে এক পেয়ালা পানি তাকে পান করালেন। সেই পানি গলা দিয়ে নামতেই যেন তার ভেতরটা আলোয় ভরে গেল। সে হুজুরের কদম মুবারকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল, হুজুরের রূপ ও গুণ দেখে আমি বিভোর হয়ে গেছি। হুজুর মৃদু হেসে বললেন, আজ থেকে তোমার নাম ‘শাদি’।
‘শাদি’র ইসলাম গ্রহণের খবর পৃথ্বীরাজের কাছে পৌঁছতেই সে আরও বেশি রেগে গেল। এবার সে সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র বের করল। আজমিরের কাছেই ‘জয়পাল’ নামে এক ভয়ংকর জাদুকর বাস করত। সারা হিন্দুস্তানে জাদুবিদ্যায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। তার প্রায় দেড় হাজার শিষ্য ছিল, যাদের সাতশো জন ছিল পাকা জাদুকর, বাকিরা ছিল ধূর্ত কৌশলী।
রাজার মুখে সব শুনে জয়পাল দেরি না করে তার পুরো বাহিনী নিয়ে রওনা দিলো। তার চলার ভঙ্গিই ছিল অদ্ভুত, একটি হরিণের চামড়ায় ফুঁ দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে দিল এবং নিজে তার ওপর সওয়ার হয়ে উট, ঘোড়া ও হাতির বিশাল লস্কর নিয়ে এগিয়ে চলল। এই বিচিত্র দৃশ্য দেখে সারা শহরে শোরগোল পড়ে গেল।
হজরত গরিব নাওয়াজ (রহ.) খবর পেয়ে শান্তভাবে অজু করলেন। তারপর নিজের চারপাশে একটি বৃত্ত টেনে দিয়ে সাথিদের বললেন, “হিম্মত রাখো, ঘাবড়িও না।”
জয়পালের দল কাছে এসে হুঙ্কার দিল, আপনারা এখান থেকে চলে যান, নইলে জাদুর জোরে বের করে দেব।
হুজুর কথা না বাড়িয়ে তাঁর কারামতের বলে আবার আনা সাগরের সমস্ত পানি একটি ছোট্ট লোটায় ভরে নিলেন। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে জয়পাল হতবাক। তারপর হ্রদের সব মাছ ও জলজ প্রাণী মরতে শুরু করল। জয়পাল চেঁচিয়ে উঠল, এ কেমন ফকির, যে এতগুলো প্রাণীর জীবন নিচ্ছে!
হুজুর শান্তভাবে বললেন, যদি শক্তি থাকে তো এসো, এই লোটাটি তুলে হ্রদে পানি ঢেলে দাও।
জয়পাল এগিয়ে এলো। শত চেষ্টা করলো, কিন্তু লোটাটি এক ইঞ্চিও নড়াতে পারলো না। চরম লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। হুজুর নিজেই লোটাটি তুলে পানি হ্রদে ঢেলে দিলেন। মুহূর্তেই হ্রদ আবার ভরে উঠল।
কিন্তু জয়পাল হার মানল না। সে জাদু শুরু করল। চারদিক থেকে হাজার হাজার সাপ ফণা তুলে ছুটে আসতে লাগল। কিন্তু হুজুরের আঁকা বৃত্তের কাছে পৌঁছাতেই সাপগুলো মাথা নুইয়ে দিতে লাগল। হুজুর সাথিদের বললেন, এগুলো তুলে পাহাড়ে ফেলে দাও। সাথিরা তাই করলেন। আর যেখানেই সাপ পড়ছিল, সেখানেই মুহূর্তে একটি চারাগাছ গজিয়ে বিশাল ছায়াদার বৃক্ষে পরিণত হচ্ছিল।
এরপর কাফেররা চারদিক থেকে আগুনের বৃষ্টি বর্ষণ করল। কিন্তু সুরক্ষা বৃত্তের ভেতরে একটি ফুলকিও ঢুকতে পারল না। উল্টো তাদের প্রতিটি জাদু তাদের নিজেদের ওপরেই ফিরে গেল।
সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে জয়পাল শেষ চেষ্টা করল। সে হরিণের চামড়ায় সওয়ার হয়ে আকাশে উড়ে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। আর হুঙ্কার দিল, এবার আকাশ থেকে এমন বিপদ বর্ষণ করব যা সারাজীবন মনে থাকবে!
হুজুর মৃদু হেসে বললেন, জমিনেই তুমি কিছু করতে পারলে না, আর এখন আসমানে ওড়ার শখ করছ! তারপর নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে বললেন, যাও, ওকে মেরে মেরে নিচে নামিয়ে আনো!
অমনি জুতোটি উড়ে গেল। আকাশে গিয়ে জয়পালের মাথায় ও মুখে সজোরে আঘাত করতে করতে তাকে মাটিতে নামিয়ে আনল। মাটিতে পড়তেই জয়পাল চরম লজ্জায় হুজুরের কদমে লুটিয়ে পড়ল।
হুজুর এবারও এক পেয়ালা পানি তাকে পান করালেন। সেই পানি পেটে যেতেই তার বুক থেকে কুফর ও শিরকের সমস্ত অন্ধকার ধুয়ে গেল। সে কায়মনোবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করল। হুজুর ভালোবেসে তার নাম রাখলেন ‘আব্দুল্লাহ’।
‘শাদি’ এবং ‘আব্দুল্লাহ’ দুজনকেই হারিয়ে পৃথ্বীরাজ এবার সত্যিকারের দিশেহারা হয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবল, যে কোনো উপায়ে হুজুরের খাদেমদের ক্ষতি করবে। কিন্তু যখনই এই কুচিন্তা মাথায় আসত, সে হঠাৎ অন্ধ হয়ে যেত। আবার যখনই তওবা করত, দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেত।
এত কারামত সামনে দেখেও তার হৃদয়ের অন্ধকারের পর্দা সরল না। আল্লাহর নুর তার দরজায় বারবার এসে কড়া নাড়ল, কিন্তু সে দরজা খুলল না। সে রইল সে-ই অহংকারী, অবাধ্য এবং হেদায়েতের আলো থেকে বহু দূরে।