সুফি সাধনার পথে অন্তরে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা সাধক নিজে চায় না, ডাকে না, কিন্তু হঠাৎই এসে পড়ে। এই অভিজ্ঞতাকে সুফিরা নাম দিয়েছেন বাওয়াদি ও হুজুম।

বাওয়াদি হলো অদৃশ্য জগৎ থেকে অন্তরে আকস্মিক আপতিত এক আধ্যাত্মিক ভাব; যা কখনো আনন্দ দেয়, কখনো বেদনা। আর হুজুম হলো সময়ের নিজস্ব প্রবাহে, কোনো কৃত্রিম প্রচেষ্টা ছাড়াই অন্তরে এসে পড়া এক প্রবল আধ্যাত্মিক প্রভাব।

বায়েজিদ বোস্তামির বিখ্যাত উক্তি, “আমি দীর্ঘ সময় হেসেছি, কেঁদেছি, আর আজ হাসিও না, কাঁদিও না” কথাটিই দেখায়, বাওয়াদির হুকুমের অধীনে থাকা এক অবস্থা, আর তার ঊর্ধ্বে ওঠা আরেক অবস্থা।

ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইমাম কুশাইরি সংক্ষেপে এই দুটি অবস্থার সংজ্ঞা দিয়েছেন। বাওয়াদি হলো অদৃশ্য জগৎ থেকে প্রথম মুহূর্তেই অন্তরে আকস্মিকভাবে আপতিত আনন্দ বা বেদনার ভাব। হুজুম হলো বান্দার কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই সময়ের শক্তিতে অন্তরে আপতিত প্রবল প্রভাব। কেউ এই ভাবের দ্বারা পরিবর্তিত হন, কেউ এর ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তাঁরাই সময়ের অধিপতি, যাঁদের কাছে কালের বিপর্যয় পৌঁছাতে পারে না।

তিনি বলেন, আল-বাওয়াদি তথা আচমকা আপতিত আধ্যাত্মিক অনুভূতি হলো এমন কিছু, যা প্রথম মুহূর্তেই অদৃশ্য জগৎ থেকে আকস্মিকভাবে অন্তরে প্রকাশ পায়; এটি হয় আনন্দের উদ্রেক করে, না হয় বেদনার সৃষ্টি করে।

আল-হুজুম তথা অন্তরে প্রবল আধ্যাত্মিক প্রভাব হলো এমন এক বিষয়, যা তোমার নিজের কোনো রকম কৃত্রিমতা ছাড়াই সময়ের নিজস্ব শক্তিতে অন্তরে আপতিত হয়।

এই অনুভূতিগুলোর প্রকারভেদ অন্তরে আপতিত আধ্যাত্মিক ভাবের শক্তি ও দুর্বলতার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধকদের মধ্যে কেউ এমন আছেন যাকে প্রাথমিক আধ্যাত্মিক অনুভূতি বদলে দেয় এবং হাওয়াজিম তথা প্রবল আধ্যাত্মিক আক্রমণ তাঁকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আবার কেউ এমনও আছেন যিনি নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা ও শক্তির দিক থেকে তাঁর ওপর আকস্মিক আপতিত যে-কোনো অবস্থার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। মূলত তাঁরাই হলেন সাদাতুল ওয়াক্ত তথা সময়ের অধিপতি সাধক; যেমনটি কবিতায় বলা হয়েছে—

لَا تَهْتَدِي نُوَبُ الزَّمَانِ إِلَيْهِمُ وَلَهُمْ عَلَى الْخَطْبِ الْجَلِيلِ لِجَامُ

কালের বিপর্যয়সমূহ তাঁদের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজে পায় না; বরং যে-কোনো মহাবিপদের লাগাম থাকে তাঁদেরই হাতে।”[1]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন, হুজুম বান্দাকে হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য অনুশোচনা এনে দেয়। এই অনুশোচনাই আল্লাহর মহান অনুগ্রহ, যা হারানো সময়কে সংশোধন করে। বায়েজিদের হাসা-কান্নার উক্তি দিয়ে তিনি দেখান, বাওয়াদির হুকুম থেকে মহত্ত্বের অবস্থায় উন্নীত হওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, প্রকৃত সাধক শায়খের প্রশ্নে চিন্তা করে উত্তর দেয় না, বরং অন্তরে প্রথম যা উদয় হয় তাই প্রকাশ করে।

তিনি বলেন, আল-হুজুম তথা অন্তরে প্রবল আধ্যাত্মিক প্রভাব হলো এমন এক বিষয়, যা তোমার নিজের কোনো রকম কৃত্রিমতা ছাড়াই সময়ের প্রবহমানতায় অন্তরে এসে হাজির হয়। আর আল-বাওয়াদি তথা আচমকা আপতিত আধ্যাত্মিক অনুভূতি হলো এমন কিছু, যা প্রথম মুহূর্তেই অদৃশ্য জগৎ থেকে আকস্মিকভাবে অন্তরে প্রকাশ পায়; এটি হয় আনন্দের উদ্রেক করে, না হয় বেদনার সৃষ্টি করে।

نُورُ البَوَادِهِ فَجْأَتُ الغُيُوبِ عَلَى قَلْبٍ تَقَلَّبَ فِي ظَلْمَائِهِ زَمَنَا

অদৃশ্য জগৎ থেকে আল-বাওয়াদির নুর হঠাৎ এমন এক হৃদয়ে এসে পড়ে, যা দীর্ঘকাল ধরে নিজের অন্ধকারের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

وَوَارِدَاتُ هُجُومِ الكَشْفِ تُورِثُهَا حَالاً فَتُلْحِقُهُ بِحَالَةِ الزَّمِنَى

আর কাশফের প্রবল ভাবসমূহ অন্তরে এমন এক হালের জন্ম দেয়, যা তৎক্ষণাৎ তাকে এক অসাড় ও আত্মহারা অবস্থায় উপনীত করে।

لو أنها وردت لروح نشأتنا ما دبرت روحنا نفساً ولا بدنا

যদি তা আমাদের রুহের ওপর অবতীর্ণ হতো, তবে আমাদের রুহ কোনো নফস বা দেহের পরিচালনা করত না।

জেনে রাখুন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের এবং আপনাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ শক্তি দ্বারা সাহায্য করুন। নিশ্চয়ই আল-বাওয়াদি, আল-হুজুম, আস-সাহউ তথা আধ্যাত্মিক সচেতনতা, আস-সুকর তথা আধ্যাত্মিক মত্ততা, আয-যাওক তথা আধ্যাত্মিক আস্বাদন, আশ-শুরুব তথা আধ্যাত্মিক পান এবং এই জাতীয় অন্যান্য বিষয়গুলো হলো মূলত ওয়ারিদাতুল গায়িব তথা অদৃশ্য জগৎ থেকে আধ্যাত্মিক ভাবের আগমন, যা অন্তরের ওপর অবতীর্ণ হয়। ফলে এগুলো যার মধ্যে প্রকাশ পায়, তার ভেতর বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অবস্থার সৃষ্টি করে এবং সুফিগণ সেই অবস্থাকে ‘ওয়ারিদ’ নামে অভিহিত করেন। এই আধ্যাত্মিক ভাবগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে বান্দার নিজস্ব কোনো চেষ্টা বা আমল কাজ করে না; যদিও এই ভাবগুলো কেবল এমন অন্তরেই অবতীর্ণ হয়, যা তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।

সুতরাং, যখন কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই হঠাৎ অন্তরে কোনো আধ্যাত্মিক ভাব অবতীর্ণ হয়, তখন তা বান্দাকে তার ওয়াকত তথা আধ্যাত্মিক সময় হাতছাড়া হওয়ার জন্য এক গভীর অনুশোচনা এনে দেয়। কেননা, এটি তাকে সতর্ক করে দেয় যে, ব্যক্তি তার সেই সময়ের হুকুম বা দায়িত্ব সম্পর্কে গাফেল ছিল এবং নিজের সময়ের ভাবের সাথে সঠিক আদব রক্ষা করেনি। হক তায়ালা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও যত্নের কারণে তাকে সচেতন করতে চাইলেন; তাই তিনি এই আধ্যাত্মিক ভাবকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রসুল বা বার্তাবাহক হিসেবে পাঠালেন, যা তার সামনে তার সময় হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উন্মোচন করে এবং তাকে জানিয়ে দেয় যে, সে আল্লাহর সাথে আদব রক্ষায় ত্রুটি করেছে।

এর ফলে এই অনুশোচনা তার মনে অতীতে হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য গভীর খেদ তৈরি করে এবং এই অনুশোচনাই তার হারিয়ে যাওয়া সময়ের ফজিলতকে এমনভাবে সংশোধন করে দেয়, যেন তার কোনো কিছুই হাতছাড়া হয়নি। আর এটি আল্লাহ তায়ালার এক মহান অনুকম্পা, যার ফলে তার সেই সময়টি অনুশোচনার সৌন্দর্য দ্বারা সুশোভিত হয়ে ওঠে; ঠিক যেমনটি তার সাথে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত থাকার এবং সময় হাতছাড়া না হওয়ার আদবের সৌন্দর্য দ্বারা সুশোভিত হতো। আর এটাই হলো আল-হুজুমের উপকারিতা, যা অতীতে হারিয়ে যাওয়া সময়কে সংশোধন করে দেয়। আর এ বিষয়ে আমাদের কবিতা হলো—

بَادِرْ لِجَبْرِ الَّذِي قَدْ فَاتَ مِنْ عُمُرِكْ وَلَتَتَّخِذْ زَادَكَ الرَّحْمَنَ فِي سَفَرِكْ

তোমার জীবন থেকে যা হারিয়ে গেছে তা সংশোধনের জন্য সচেষ্ট হও, আর তোমার সফরে দয়াময় আল্লাহকেই পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করো।

আর আল-বাওয়াদি হলো ওয়াকতের হুকুম অনুযায়ী অদৃশ্য জগৎ থেকে অন্তরে হঠাৎ আপতিত এক ঐশী আলোড়ন। সুফিদের পরিভাষায় এই আল-বাওয়াদি অন্তরে হয় আনন্দের উদ্রেক করে, না হয় বেদনার সৃষ্টি করে। আর হাওয়াজিম তথা প্রবল আধ্যাত্মিক আক্রমণ মানুষকে হাসায় এবং কাঁদায়। আর এ কারণেই হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) বলেছিলেন, ضَحِكْتُ زَمَانًا وَبَكَيْتُ زَمَانًا – আমি একটি দীর্ঘ সময় হেসেছি এবং একটি দীর্ঘ সময় কেঁদেছি।

এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি আল-বাওয়াদির হুকুমের অধীনে ছিলেন। এরপর তিনি বলেন, “আর আজ আমি হাসিও না, কাঁদিও না।” এর মাধ্যমে তাঁর আল-বাওয়াদির প্রভাবের অবস্থা থেকে হালুল আজমা তথা মহত্ত্বের আধ্যাত্মিক অবস্থায় উন্নীত হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। আর আল-বাওয়াদি কেবল তারই ঘটে, যে কোনো গুণে গুণান্বিত হয়; যার কোনো সুনির্দিষ্ট গুণ বা বৈচিত্র্য নেই, তার কোনো আকস্মিক আধ্যাত্মিক অনুভূতিও নেই। তবে যেহেতু আল-বাওয়াদি পরম সত্তার দরবার থেকে আসে, তাই এটি কখন আসবে তা জানা যায় না। যখনই এটি অবতীর্ণ হয়, কেবল হঠাৎ আকস্মিকভাবেই অবতীর্ণ হয়; অতঃপর তা যা নিয়ে এসেছিল তা অর্পণ করে বিদায় নেয়।

পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষ যে আকস্মিক অনুভূতি বা উপস্থিত বুদ্ধির কথা জানে, তা আনন্দ বা বেদনার সাথে সুনির্দিষ্টভাবে আবদ্ধ নয়। তাই সুফি সমাজ যে পরিভাষার ওপর একমত হয়েছেন, সাধারণ মানুষের জানা বিষয়টি হুবহু তা নয়; কারণ সুফিগণ কেবল সেটাকেই আকস্মিক অনুভূতি হিসেবে নামকরণ করেছেন, যা আনন্দ বা বেদনার উদ্রেক ঘটায়। আর যদি তা আনন্দ বা বেদনার উদ্রেক না করে, তবে সে ক্ষেত্রে সুফিদের অবস্থা সাধারণ মানুষের অবস্থার মতোই হয়ে থাকে। তবে আধ্যাত্মিক পথের পথিকগণ জানেন যে, আল-বাওয়াদি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তার প্রভাব বিন্দুমাত্র ভুল করে না এবং তা যা কিছু নিয়ে আসে তার সবটুকুই একদম নিখুঁতভাবে প্রকাশ পায়।

এই কারণেই আধ্যাত্মিক শায়খগণ যখন তাঁদের শিষ্যদের আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান গ্রহণের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তাঁরা শিষ্যকে উত্তর নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার অবকাশ দেন না; যাতে তাদের উত্তরটি কোনো চিন্তার ফল না হয়। বরং তাঁরা বলেন, “তোমাকে যা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, প্রশ্নের ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার মনে যা উদয় হবে, তা ছাড়া অন্য কোনো উত্তর দেবে না। তুমি তোমার অন্তরের দিকে তাকাও যে, প্রশ্নের আগমনে তাতে কী ঢেলে দেওয়া হয়েছে, এবং প্রথম দেখায় যা মনে আসে তা-ই প্রকাশ করো।” যদি কোনো শিষ্য তা না করে, তবে তার উত্তর গ্রহণ করা হয় না; এমনকি সে যদি চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে সঠিক উত্তরও দিয়ে থাকে, তবুও তা গ্রহণযোগ্য নয়।

কেননা আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে কারও অন্তরের প্রতিই গাফেল নন; বরং তিনি তার ওপর সদা জাগ্রত পরিদর্শক। তিনি প্রতিটি শ্বাসে বান্দাকে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দান করেন। অতএব, যাঁরা অন্তরের অধিকারী এবং নিজের রবের সন্তুষ্টির জন্য সর্বদা অন্তরকে পাহারা দেন, তাঁরা প্রতিটি শ্বাসে আধ্যাত্মিক ভাবের আগমনের মাধ্যমেই উত্তর দিয়ে থাকেন। অতঃপর তাঁরা সেই ভাবের দাবি অনুযায়ী আমল করেন, যদি তা তাঁদের সৌভাগ্যের জন্য নির্ধারিত শরিয়তের মাপকাঠির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আর যদি তা সৌভাগ্যের পথের অনুকূলে না হয়, তবে এই ভাবটি গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে; তাঁরা এটিকে হক তায়ালার পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা ও পরিচিতি হিসেবে গ্রহণ করেন, যা তাঁদের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ সত্তায় কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। সুফিদের পরিভাষায় আল-বাওয়াদি এবং আল-হুজুমের অর্থ আমরা স্পষ্ট করলাম। আর আল্লাহ তায়ালাই সত্য বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।[2]

দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে দেখা যায়, বাওয়াদি ও হুজুম মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বার্তা, যা বান্দাকে সচেতন করে, তার গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত দেয়। কুশাইরি যেখানে এই দুটি অবস্থার মৌলিক সংজ্ঞা স্পষ্ট করেছেন, ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন কীভাবে এই আকস্মিক ভাব বান্দার জীবনে গভীর সংশোধনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। উভয়েই একমত যে, এই অভিজ্ঞতা বান্দার নিজের চেষ্টার ফল নয়; এটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সবশেষে বলা যায়, বাওয়াদি ও হুজুম শেখায়— সাধকের কাজ এই আকস্মিক ভাবকে ডেকে আনা নয়; বরং তার জন্য অন্তরকে প্রস্তুত রাখা এবং তা এলে সঠিক আদবের সাথে গ্রহণ করা। যিনি এই আকস্মিক ঢেউয়ের মধ্যেও স্থির থাকতে পারেন, তিনিই প্রকৃত সময়ের অধিপতি।