আল্লাহর নৈকট্যের পথে চলতে চলতে সাধকের হৃদয়ে আলোর কিছু ঝলক হঠাৎ এসে পড়ে। তিন রকমের আলো, তিন রকমের স্থায়িত্ব। সুফিরা এদের নাম দিয়েছেন লাওয়ায়িহ, লাওয়ামি‘ ও তাওয়ালি‘।

লাওয়ায়িহ হলো বিদ্যুতের ঝলকের মতো। আসে, আর তখনই মিলিয়ে যায়। কবির ভাষায়, যে দেখা করতে এসেও যেন দেখা করল না, দরজায় দাঁড়িয়েই বিদায় নিয়ে নিল। লাওয়ামি‘ একটু বেশি স্থায়ী। দুই-তিন মুহূর্ত থাকে, কিন্তু পূর্ণ তৃপ্তি দেয় না। আর তাওয়ালি‘ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, সবচেয়ে গভীর। মারিফতের নুরে অন্তর পুরোপুরি আলোকিত হয়ে ওঠে।

এই তিনটি আসলে একই আলোর তিন স্তর। তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও গভীরতার পার্থক্য মাত্র। একজন সালিক যখন এই পথে চলতে শুরু করেন, প্রথমে তিনি এই ঝলকগুলোর মুখোমুখি হন, ধীরে ধীরে এগুলোই তার অন্তরে মারিফতের সূর্য উদিত করে।

ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

তিনটি শব্দই কাছাকাছি অর্থের— এই কথা থেকেই কুশাইরি শুরু করেন। তবে পার্থক্য আছে স্থায়িত্বে। লাওয়ায়িহ ঝলকের মতো নিভে যায়; লাওয়ামি‘ কিছুক্ষণ থাকে কিন্তু তৃপ্তি দেয় না; তাওয়ালি‘ সময়ের দিক থেকে দীর্ঘ, প্রভাবে শক্তিশালী। তবে তিনটিই এখনো স্থায়ী মাকামের দৃঢ়তা পায়নি। কখনো আলো চলে গেলে কোনো চিহ্নই থাকে না, আবার কখনো চলে গেলেও তার ছায়া অন্তরে থেকে যায়। এই দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই কুশাইরির আলোচনায় উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, ইমাম উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এই তিনটি শব্দ অর্থের দিক থেকে কাছাকাছি। এগুলোর মধ্যে খুব বড় পার্থক্য নেই। এগুলো মূলত সেই সালিকদের অবস্থা, যারা অন্তরের পথে তরক্কির শুরুতে থাকে। এখনো তাদের অন্তরে মারিফতের সূর্য পুরোপুরি উদিত হয়নি। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রতি মুহূর্তে তাদের অন্তরে রিজিক পৌঁছে দেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَلَهُمْ رِزْقُهُمْ فِيهَا بُكْرَةً وَعَشِيًّا – সেখানে সকাল-সন্ধ্যা তাদের জন্য রিজিক থাকবে।[1]

যখন নফসের চাওয়া-পাওয়ার মেঘ তাদের অন্তরের আকাশ ঢেকে দেয়, তখন হঠাৎ কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচনের কিছু ঝলক তাদের সামনে প্রকাশ পায়। এরপর কুরব তথা আল্লাহর নৈকট্যের আলোক-ঝলকও তাদের অন্তরে জ্বলে ওঠে। তারা তখন সিতর তথা আড়ালের অবস্থায় থাকে; কিন্তু সেই আড়ালের ভেতরেই হঠাৎ প্রকাশিত আলোক-ঝলকের অপেক্ষা করে। যেন কবির ভাষায়—

يا أيها البرق الذي يلمع من أي أكناف السما تطلع

হে ঝলমলে বিদ্যুৎ, তুমি আকাশের কোন প্রান্ত থেকে উদিত হও?

সুতরাং প্রথমে আসে লাওয়ায়িহ, তারপর লাওয়ামি‘, তারপর তাওয়ালি‘

লাওয়ায়িহ হলো বিদ্যুতের ঝলকের মতো। দেখা দিয়েই তা আড়াল হয়ে যায়। যেমন কবি বলেছেন—

افترقنا حولا فلما التقينا كان تسليمة علي وداعا

আমরা এক বছর বিচ্ছিন্ন ছিলাম। এরপর যখন দেখা হলো, তার সালামটাই যেন আমার কাছে বিদায়ের মতো হয়ে গেল।

আরও বলা হয়েছে—

يا ذا الذي زار وما زارا كأنه مقتبس نارا

হে সেই ব্যক্তি, যে দেখা করতে এলো, অথচ যেন দেখা করলই না; মনে হলো, সে শুধু আগুনের একটি শিখা নিতে এসেছিল।

مُتَرَيِّبًا بِبَابِ الدَّارِ مُسْتَعْجِلًا مَا ضَرَّهُ لَوْ دَخَلَ الدَّارَا

সে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে; দ্বিধাগ্রস্ত, তাড়াহুড়ায় অস্থির। অথচ ঘরে ঢুকলেই বা তার কী ক্ষতি হতো?[2]

আর লাওয়ামি‘ হলো লাওয়িহের চেয়ে বেশি স্পষ্ট আলোক-প্রকাশ। এটি লাওয়িহের মতো হঠাৎ এসে সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায় না। কখনো দুই-তিন মুহূর্ত পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে স্থায়ী হলেও তা পূর্ণ তৃপ্তি দেয় না। এ কারণে কবিরা বলেছেন—

والْعَيْنُ بَاكِيَةٌ لَمْ تَشْبَعِ النَّظَرَا

চোখ তখনও কাঁদছে; কারণ সে দেখেছে, কিন্তু দেখে তৃপ্ত হতে পারেনি।

অথবা তারা বলেছেন—
لَمْ نَدْرِ مَا وَجْهُ النَّعِيمِ إِلَّا سَرَقْتَ قَبْلَ رِيِّهَا بِبَرِيقِ
আমরা এখনো নেয়ামতের মুখ ঠিকমতো চিনতেই পারিনি; তার সৌন্দর্যের ঝলক পূর্ণ তৃপ্তির আগেই তুমি ছিনিয়ে নিলে।

যখন লাওয়ামি‘ ঝলমল করে ওঠে, তখন তা অন্তরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। নিজের সৌন্দর্যে তাকে মোহিত করে। কিন্তু দিনের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই রাতের সৈন্যরা এসে তাকে ঢেকে ফেলে। ফলে সালিকের অবস্থা তখন শান্তি ও বেদনার মাঝামাঝি হয়ে যায়। কারণ সে একদিকে কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচনের স্বাদ পায়, আর অন্যদিকে সিতর তথা আড়ালের অবস্থাও থেকে যায়। তাই কবিরা বলেছেন—

فَاللَّيْلُ يَشْمَلُنَا بِفَاضِلِ بُرْدِهِ وَالصُّبْحُ يَلْحَفُنَا رِدَاءَ مُذَهَّبَا
রাত তার প্রশস্ত চাদরে আমাদের ঢেকে রাখে; আর ভোর আমাদের সোনালি পোশাক পরিয়ে দেয়।

আর তাওয়ালি‘ হলো আরও দীর্ঘস্থায়ী আলোক-উদ্ভাস। এটি সময়ের দিক থেকে বেশি স্থায়ী, প্রভাবের দিক থেকে বেশি শক্তিশালী, অবস্থানের দিক থেকে বেশি দৃঢ়। অন্ধকার দূর করতে এটি বেশি কার্যকর, আর সংশয় মুছে দিতে আরও বেশি সহায়ক। তবে এটিও এখনো প্রথম আলোক-প্রকাশের বিপদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। এটি এখনো সরাসরি মুখোমুখি অবস্থার উচ্চতায় পৌঁছায়নি; স্থায়ী মাকামের দৃঢ়তাও লাভ করেনি। এরপর এর অর্জনের সময়, তা ধরে রাখার অবস্থা এবং মিলিয়ে যাওয়ার ধরন— সবই ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনা দীর্ঘ।

এই তিন অর্থ— লাওয়ায়িহ, লাওয়ামি‘ ও তাওয়ালি‘ বিভিন্ন অবস্থায় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

কখনো এমন হয়, আলো মিলিয়ে গেলে তার কোনো চিহ্নও আর থাকে না। যেমন দিনের আলো ফুটে উঠলে রাত যেন ছিলই না।

আবার কখনো আলো চলে গেলেও তার প্রভাব থেকে যায়। দৃশ্য হারিয়ে যায়, আলো অস্ত যায়, কিন্তু তার ছাপ অন্তরে রয়ে যায়। ফলে প্রবল অস্থিরতার পর এক ধরনের সোহবতের প্রশান্তি আসে। তখন সালিক নিজের অস্তিত্বের সময়ে পাওয়া সেই আলোর ছায়াতেই বেঁচে থাকে। তার কাছে আবার পৌঁছানোর সুসংবাদ ফিরে আসার অপেক্ষাকে সহজ করে দেয়। আর সে নিজের বর্তমান অবস্থায় যা পেয়েছে, তা নিয়েই জীবন ধারণ করে।[3]

দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

দাতা গঞ্জে বখশ তিনটি অবস্থাকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে গেঁথেছেন। লাওয়ায়িহ মানে মুরাদকে সাব্যস্ত করা, আবার সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেওয়া; এক ঝলকের ইশারা, যা মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। লাওয়ামি‘ মানে প্রবল প্রকাশ যার প্রভাব কিছুক্ষণ থেকে যায়। আর তাওয়ালি‘ মানে মারিফতের আলোয় অন্তর পুরোপুরি আলোকিত হওয়া, অন্ধকার ও সংশয় দূর হয়ে যাওয়া। তাঁর এই তিন সংজ্ঞা যেন একই সিঁড়ির তিন ধাপ। ক্ষণস্থায়ী থেকে স্থায়ী, ম্লান থেকে উজ্জ্বল।

লাওয়ায়িহ: মুরাদকে সাব্যস্ত করা, আবার মুরাদকেই নাকচ করে দেওয়া। অর্থাৎ, সালিকের অন্তরে এক ঝলক আলোক-প্রকাশ আসে। সে যেন কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের ইশারা পায়। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গেই সেই প্রকাশ আড়াল হয়ে যায়। তাই একদিক থেকে মুরাদ প্রমাণিত হয়, আবার অন্যদিক থেকে তা নাকচও হয়ে যায়।

লাওয়ামি‘: অন্তরের ওপর প্রবলভাবে প্রকাশ পাওয়া এবং তার উপকারিতা কিছুটা বাকি থাকা। অর্থাৎ, এটি লাওয়িহের চেয়ে বেশি স্পষ্ট ও স্থায়ী। আলো চলে গেলেও তার প্রভাব অন্তরে কিছুক্ষণ থেকে যায়।

তাওয়ালি‘: মারিফতের আলো দ্বারা অন্তর আলোকিত হয়ে ওঠা। অর্থাৎ, এটি আরও স্থায়ী ও গভীর আলোক-উদ্ভাস। এর মাধ্যমে অন্তর মারিফতের নুরে উজ্জ্বল হয়, অন্ধকার ও সংশয় অনেকটা দূর হয়ে যায়।[4]

ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দির ভাষ্য:

সোহরাওয়ার্দি এই আলোচনায় সবচেয়ে কম শব্দ ব্যয় করেছেন, কিন্তু কথাটি গভীর। তিনি বলেন, এমন আরও বহু শব্দ আছে— তাওয়ারিক, বাওয়াদি, ওয়াকি‘— যেগুলো সবই কাছাকাছি অর্থ বহন করে। এসব নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের প্রয়োজন নেই, কারণ শেষ পর্যন্ত সবকিছু একই মূল সত্যে গিয়ে মেশে। এই সব নাম আসলে হালের সূচনা ও প্রাথমিক প্রকাশের নাম মাত্র। যখন হাল পরিপূর্ণতা পায়, সুদৃঢ় হয়ে যায়, তখন এই সব নাম ও অর্থ সেই একটি হালের মধ্যেই একীভূত হয়ে যায়।

তিনি বলেন, তাওয়ারিক, বাওয়াদি, বাওয়াদাহ, ওয়াকি‘, কাদিহ, তাওয়ালি‘, লাওয়ামি‘ ও লাওয়াইহ এসব শব্দ অর্থের দিক থেকে পরস্পরের কাছাকাছি। কেউ চাইলে এগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব আলোচনা একটি মূল অর্থের দিকেই ফিরে আসে। শুধু ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হয়। তাই এ বিষয়ে অতিরিক্ত দীর্ঘ আলোচনার তেমন কোনো লাভ নেই।

মূল উদ্দেশ্য হলো, এই সব নাম হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থার সূচনা ও তার প্রাথমিক প্রকাশগুলোর নাম। আর যখন হাল সত্য হয়ে যায়, পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এই সব নাম এবং এগুলোর সব অর্থ সেই হালের মধ্যেই এসে একত্র হয়ে যায়।[5]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইবনে আরাবি তিনটি বিষয়কেই আলাদা আলাদা গভীরতায় ব্যাখ্যা করেছেন। তাওয়ালি‘ হলো তাওহিদের সেই নুর, যা আরিফদের অন্তরে উদিত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের আলোকে ম্লান করে দেয়। তিনি এখানে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন তাদের, যারা আল্লাহর জাত নিয়ে নিজের বুদ্ধি দিয়ে তর্ক করতে যান। লাওয়াইহ হলো অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে দেখা; বাহ্যিক চোখ দিয়ে নয়। আর লাওয়ামি‘ জওকের চেয়েও উচ্চ, দুই মুহূর্ত স্থায়ী হয়, এবং এটি কেবল ইলাহি ইলম দ্বারাই দূর হতে পারে।

তাওয়ালি:

لا تنظرن إلى طوالع نوره فطوالع التوحيد ما لا تبصر

তাঁর নুরের তাওয়ালি‘র দিকে তাকাতে যেয়ো না; কারণ তাওহিদের তাওয়ালি‘ এমন এক আলো, যা চোখে ধরা পড়ে না।

لو أبصرتها كان شركك ثابتا فيه المحنك ذو الحجا يتحير

যদি তুমি তা চোখে দেখতে, তবে তোমার শিরকের প্রমাণই স্থির হয়ে যেত। এ রহস্যে অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান মানুষও বিস্ময়ে থেমে যায়।

إن المحجب للأمور هو الذي بمجيئه يلقى فلا يتأثر

যিনি সব বিষয়কে আড়ালে রাখেন, তিনিই এমন; তাঁর আগমন ঘটে, কিন্তু তিনি কোনো পরিবর্তন বা প্রভাবের অধীন হন না।

ويحبه نظر الإله فعينه فيه يراه وعينه لا تبصر

আল্লাহর দৃষ্টি তাকে ভালোবাসে। তাই তার চোখ তাঁকে তাঁর মধ্যেই দেখে; অথচ তার বাহ্যিক চোখ কিছুই দেখতে পায় না।

الطمس رفع الحكم ليس ذهابه فهي الوجود وما سواها مظهر

তমস মানে কোনো জিনিস বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়; বরং তার কার্যকারিতা উঠে যাওয়া। প্রকৃত অস্তিত্ব কেবল সেই এক সত্তার; তিনি ছাড়া সবকিছু তাঁর প্রকাশমাত্র।

সুফিদের পরিভাষায় তাওয়ালি‘ বলা হয় তাওহিদের সেই নুরগুলোকে, যা আরিফদের অন্তরে উদিত হয়। এই নুর যখন ওঠে, তখন অন্য সব নুর তার সামনে ম্লান হয়ে যায়। এখানে অন্য নুর বলতে শুধু বুদ্ধি ও যুক্তির দলিল বোঝানো হয়নি; বরং নবুয়তি কাশফ থেকে পাওয়া দলিলের নুরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

কারণ বান্দার কাছে আল্লাহ যে তাওহিদ চান, এবং যে তাওহিদকে সামনে রাখা সবচেয়ে জরুরি, তা হলো এই বিশ্বাস— ইলাহ হওয়ার মর্যাদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। এই বিষয়ের ওপর স্পষ্ট দলিল প্রতিষ্ঠিত আছে।

কিন্তু কিছু যুক্তিবাদী মানুষ নিজেদের বুদ্ধির অতিরিক্ত অনুসরণে আল্লাহর জাত নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে। অথচ শরিয়ত আল্লাহর জাত নিয়ে চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। কারণ বুদ্ধি এখানে যত এগোতে চায়, ততই সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে মানুষ মনে করে, সে প্রমাণ দাঁড় করাচ্ছে, অথচ বাস্তবে সে নিজের ওপর জুলুম করছে।

সে তখন নিজের ধারণা অনুযায়ী বলে, আল্লাহর জাত এমন হতে পারে না, তেমন হতে পারে না। আবার সৃষ্ট জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত যে-সব অর্থ আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে, সেগুলোও সে নাকচ করতে থাকে। এভাবে সে নিজের দলিলের আলো দিয়ে আল্লাহকে বুঝতে চায়। কিন্তু সেই বোঝা পূর্ণ নয়; বরং তার চিন্তা আল্লাহর অসীম সত্তাকে নিজের সীমিত বুদ্ধির ভেতর বন্দি করে ফেলে।

এরপর তারা আল্লাহর সিফাত নিয়ে কথা বলতে যায়। সেখানে তাদের যুক্তির পথ ভিন্ন হয়ে যায়। একেকজনের দলিলের আলো একেক দিকে ছড়ায়। তারপর তারা আল্লাহর আফআল বা কর্ম নিয়ে আলোচনা করে। সেখানেও তাদের মতভেদ দেখা দেয়। কারণ তাদের চিন্তার আলো এক নয়; বরং প্রত্যেকের বুদ্ধিগত পথ আলাদা।

এই কিতাবের উদ্দেশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক তর্ক-বিতর্কের দলিল সাজানো নয়। এর মূল আলোচনা হলো— ইলাহি কাশফ থেকে যা প্রকাশ পায়। তাই তাদের গ্রন্থে যে-সব বিশদ যুক্তিতর্ক আছে, আমরা এখানে সেগুলো খুলে বলছি না।

এরপর তারা সেমাইয়্যাতের দিকে যায়; অর্থাৎ যে-সব বিষয় সরাসরি ওহি ও শরিয়তের সূত্রে জানা যায়। বাহ্যিক শরিয়তি হুকুমের ক্ষেত্রে এটাই আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি। আর ইলাহি কাশফ আসে তখন, যখন বান্দা তাকওয়ার সঙ্গে আমল করে। তখন আল্লাহ তাজাল্লির মাধ্যমে এমন জ্ঞান দান করেন, যা সাধারণ বুদ্ধি নিজের চিন্তা দিয়ে ধরতে পারে না।

শরিয়তে এমন কিছু বিষয় এসেছে, যেগুলো কেবল বুদ্ধি দিয়ে ধরতে গেলে মানুষ অস্বীকারে পড়ে যেতে পারে, অথবা সেগুলোকে অসম্ভব মনে করতে পারে। কিন্তু মুমিনের বুদ্ধি সেগুলোকে অস্বীকার করে না; বরং আদবের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং প্রয়োজন হলে সঠিক ব্যাখ্যার পথে যায়। যে মুমিন আত্মসমর্পণ করে, সে এ জায়গায় নিরাপদ থাকে।

এরপর কাশফের নুর প্রকাশ পায়। তখন বোঝা যায়, যে জাত সম্পর্কে চিন্তা করা নিষিদ্ধ, তার বিষয়ে কেবল নাকচের ভাষায় কথা বলাই পূর্ণ সত্য নয়। কাশফের অধিকারী তখন সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সেই সব বিষয় প্রত্যক্ষ করে, যেগুলো শরিয়তে এসেছে। যেমন ইয়ামিন, হাত, চোখ, তাঁর দিকে সম্বন্ধিত চোখ, পা ও মুখ।

এরপর তার ভেতরে আনন্দ, বিস্ময়, হাসি এবং এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তনের ঢেউ আসে। সে এগুলো প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে। কারণ আল্লাহর মুমিন বান্দারা এবং আহলে শুহুদ আল্লাহকে এমনভাবে ইবাদত করে, যেভাবে কাশফ ও সাক্ষ্য তাদের সামনে সত্যকে খুলে দেয়। আর শুধু চিন্তাবিদদের লোকেরা যাঁকে ইবাদত করে, তিনি হলেন সেই সত্তা; যাঁকে চিন্তাবিদেরা নিজেদের চিন্তার মাধ্যমে ইবাদত করে।

তারা আল্লাহর জাত সম্পর্কে চিন্তা করেছে। ফলে তারা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের অবাধ্য হয়েছে। তারা আল্লাহর জাত নিয়ে কথা বলা এবং তাঁর একমাত্র ইলাহ হওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে করতে এমন স্তরে চলে গেছে, যার কোনো প্রয়োজন তাদের ছিল না।

এ কাজ তাদের আগেও আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত লোকদের মধ্যে কেউ কেউ করেছে। যেমন আবু হামিদ গাজালি ও অন্যরা। এটি অনেক পুরোনো পথ। যদিও গাজালি রহমতুল্লাহি আলাইহি এ পথকে নিজের জন্য একটি আচ্ছাদন বানিয়েছিলেন, তবু তিনি নিজের পূর্ববর্তী মতের বিপরীত কিছু জায়গায় সতর্কও করেছেন। মোটকথা, এ পথটি আদবের দিক থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থার অন্তর্ভুক্ত।

যে ব্যক্তি নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিকে নিজের ওপর বিচারক বানায়, তারপর আল্লাহর জাত নিয়ে চিন্তার ময়দানে সেই বুদ্ধিকেই কর্তৃত্ব দেয়, আর ধারণা করে যে, তার চিন্তার মধ্যে তার রবের পক্ষ থেকে কোনো নুর আছে; সে আসলে নিজের যুক্তির আলো দিয়ে আহলে শুহুদ ও কাশফের চোখের নুরকে মুছে ফেলতে চায়।

অথচ রসুল, নবী, কিতাব বা সুন্নাহর মাধ্যমে এ বিষয়ে যা এসেছে; সযদি চিন্তাশীল ব্যক্তি সত্যিকারের মুমিন হয়, নিজের ইমানে সৎ হয় এবং রসুলের হক সম্পর্কে সেই বর্ণনাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, তবু শেষ পর্যন্ত সে তার চিন্তার নুর থেকে ফিরতে পারে না। কারণ তার ভরসা থাকে নিজের বুদ্ধির ওপর। সে নিজের ভেতরে এক রব বানিয়ে নিয়েছে, যাকে সে নিজের দৃষ্টির মতো করে ইবাদত করে। তাই আমরা তার বুদ্ধির ইবাদত করি।

তারপর ব্যাখ্যার বিষয়টি এমনভাবে স্থানান্তরিত হয় যে, দেহগত সাদৃশ্য থেকে বাঁচাতে গিয়ে সে অর্থগত সাদৃশ্যে পড়ে যায়। অথচ অর্থগুলোও তো সৃষ্টি। ফলে সে এক সৃষ্ট অর্থ থেকে আরেক সৃষ্ট অর্থেই সরে যায়।

মুমিনদের কাছে এবং যারা বিষয়টি যেমন আছে তেমনি প্রত্যক্ষ করেন, তাদের কাছে এটি যুগের এক বিরাট বিপদ। আর এর মূল কারণ হলো আল্লাহর অবাধ্যতা। কারণ, রসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর জাত নিয়ে চিন্তা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি তো প্রবৃত্তি থেকে কথা বলেন না। অথচ এই ব্যক্তি তা মানেনি। আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের আহলে শুহুদ ও আহলে ওজুদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

হে মুমিন, যদি তুমি আহলে শুহুদের অন্তর্ভুক্ত না হও, তবে তোমার কর্তব্য হলো— বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা। আল্লাহর ইলমের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এতে বাড়াবাড়ি না করা।

কিন্তু এই চিন্তাশীল ব্যক্তির সামনে যদি রসুলের বাইরে অন্য কোনো উৎস থেকে এ ধরনের কোনো জ্ঞান আসে, তখন সে তাকে কাফের, যিন্দিক ও জাহিল বলে। অথচ একই অর্থ যখন রসুলের কাছ থেকে এসেছে, তখন সে সেটায় ইমান এনেছে। তাহলে এই পর্দার চেয়ে বড় পর্দা আর কী হতে পারে?

তুমি যদি তাকে বলো— “এ বিষয়টি এমনই।” সে বলে, “এ তো কুফর।”
তখন তুমি বলো— “সহিহ হাদিসে নবী আলাইহিস সালাম থেকে এমনটি এসেছে।”
এরপর সে চুপ হয়ে যায়। তারপর বলে, “যেহেতু নবী ﷺ থেকে এসেছে, তাই এর একটি ব্যাখ্যা আছে। আমরা সেই ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি দেখব।”

কিন্তু এই গ্রহণও সে করত না, যদি না সেই ব্যাখ্যার সুযোগ থাকত, যার দিকে সে ফিরে যেতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে সুস্পষ্ট সত্য থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

আমাদের শায়খরা তাওয়ালি‘ দ্বারা বুঝিয়েছেন— শুহুদের নুরের এমন তাওয়ালি‘, যা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের নুরকে মুছে দেয়। ফলে বুদ্ধির নাকচ করা বিষয় যখন কাশফের মাধ্যমে আমাদের সামনে নিজের মূল অবস্থায় ফিরে আসে, তখন সেই চিন্তাজাত নুর আমাদের বুদ্ধিতে আর কোনো চিহ্ন রেখে যায় না, কোনো প্রভাব রাখে না, এবং আমাদের ওপর তার কোনো কর্তৃত্বও থাকে না।

এই হলো তাওয়ালি‘র অর্থ।[6]

লাওয়াইহ:

لوائح الحق ما تبدو لأسرار من السمو ومن حال إلى حال

হকের লাওয়াইহ হলো সেই বিষয়, যা অন্তরের গোপন রহস্যগুলোর সামনে প্রকাশ পায়। তা আসে সুমু তথা উচ্চতা থেকে, এবং এক হাল থেকে আরেক হালের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে প্রকাশিত হয়।

وقد تكون بما يبدو لناظره من غير جارحة بالعلم والخال

কখনো তা দর্শকের সামনে এমনভাবে প্রকাশিত হয়, যা বাহ্যিক অঙ্গ-চোখের মাধ্যমে নয়; বরং ইলম ও হালের মাধ্যমে উপলব্ধ হয়।

من الثبوت التي تعطيك شاهدها دليلها أنها في الآن كالآن

এর স্থিরতার মধ্যেই এমন সাক্ষ্য আছে, যা নিজেই তোমাকে তার প্রমাণ দেয়। তার দলিল হলো, সে এই বর্তমান মুহূর্তে বর্তমানের মতোই উপস্থিত থাকে।

জেনে রাখো, সুফিদের কাছে লাওয়াইহ বলা হয় সেই গোপন রহস্যগুলোকে, যা সুমু তথা আধ্যাত্মিক উচ্চতার দিক থেকে প্রকাশ পায়— এক হাল থেকে আরেক হালের দিকে।

আর আমাদের কাছে লাওয়াইহ হলো এমন কিছু, যা চোখের সামনে প্রকাশ পায়; তবে তা বাহ্যিক অঙ্গ-চোখের সীমায় আবদ্ধ নয়। বরং তা জাতি নুরসমূহ এবং ওয়াজহি তাসবিহাতের দিক থেকে প্রকাশিত হয়। এখানে প্রকাশটি হয় ইসবাত তথা সাব্যস্ত করার দিক দিয়ে; সালব তথা নাকচ করার দিক দিয়ে নয়।

আর আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের নুর থেকে যা প্রকাশ পায়, যখন তার প্রভাব দেখা যায়, তখন সেই নামগুলোর নুর সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ হয়।

আর সুমু তথা উচ্চতার অর্থ হলো, এক হাল থেকে আরেক হালে ওঠা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সালিক যে হাল থেকে সরে গেছে, আবার সেই হালেই ফিরে যাবে। বরং সে যে হালে আছে, সেখান থেকে তার ওপরের স্তরের দিকে এগিয়ে যাবে।

এখানে উদ্দেশ্য হলো, ইলাহি ওয়ারিদাত তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত অন্তর্গত অবস্থা এবং আল্লাহর মারিফতের মানজিলসমূহ। এগুলোকেই কারামত বলা হয়। কারণ আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থাগুলো কখনো বারবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু কোনো হাল তার অধিকারীকে বহন করে না, যদি না সেই হাল তার আল্লাহ-সম্পর্কিত ইলম বাড়িয়ে দেয়। আর সেই অতিরিক্ত ইলমই হলো প্রকৃত অলংকার।

যদি কোনো হাল তোমাকে আল্লাহ-সম্পর্কিত ইলমের বৃদ্ধির দিকে না তোলে, তাহলে হালটি সত্য হলেও তুমি তার সৌন্দর্যে অলংকৃত নও। তুমি বাকা অবস্থায় থাকো বা ফানা অবস্থায়; সচেতন থাকো বা সুকর অবস্থায়; জম‘ অবস্থায় থাকো বা তফরিকা অবস্থায়; গায়ব অবস্থায় থাকো বা হাজির অবস্থায়; এসব আহওয়াল সুপরিচিত।

এ বিষয়ে আল্লাহ তাঁর নবী ﷺ-কে বলতে আদেশ করেছেন, وقل رب زدني علما – বলুন, হে আমার রব, আমার ইলম বাড়িয়ে দিন।[7]

এই আহওয়াল শুধু মানুষের জন্য নির্দিষ্ট নয়। দুনিয়ার আবাসের সঙ্গেও এগুলো সীমাবদ্ধ নয়। বরং এগুলো দুনিয়া ও আখেরাতে স্থায়ীভাবে থাকে এবং প্রত্যেক মাখলুকের জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে।

সুতরাং লাওয়াইহ যেন কাশফের প্রাথমিক সূচনার মতো। এ কারণে তা স্থায়ীও হতে পারে, আবার দ্রুত বিলীনও হতে পারে। তবে তার একটি বদল বা বিনিময় থাকা আবশ্যক। যার মধ্যে এমন ইলমের বৃদ্ধি প্রকাশ পায়, যার দ্বারা আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বাড়ে, তার জন্যই তা অর্থবহ হয়।

আমরা বলেছি, লাওয়াইহের ক্ষেত্রে অলংকারের শর্ত হলো, উপলব্ধি বাহ্যিক চোখ দিয়ে হবে না; বরং বাসিরত তথা অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে হবে। আর তা এমন হালে হবে, যেখানে দৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট দিকের সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি বাহ্যিক অঙ্গ-চোখের বাস্তবতার সঙ্গেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি নফসে নাতিকা তথা বোধশীল আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকৃত দৃষ্টির মাধ্যমে ঘটে।

এরপর এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়। তা হলো হক নিজেই তার দৃষ্টি হয়ে যান। তখন সে নিজের রবকে হকের মাধ্যমেই দেখে। তাই হকই তার জন্য সাক্ষী হন। আর তার রবের পক্ষ থেকেই প্রমাণ থাকে যে, তার দেখা বাহ্যিক অঙ্গ-চোখের সীমায় আবদ্ধ নয়।

এই মাকাম রসুলুল্লাহ ﷺ থেকে সহিহভাবে প্রমাণিত। তাঁকে যখন তাঁর স্তরযুক্ত দেহগত চোখ দিয়ে রবকে দেখার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন প্রশ্নকারী বলেছিল, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? প্রশ্নকারী বাহ্যিক অঙ্গ-চোখের দৃষ্টি বোঝাতে চেয়েছিল। তখন তিনি বললেন, نور أنى أراه – তিনি নুর; আমি কীভাবে তাঁকে দেখব? অর্থাৎ এই উপলব্ধির নুর সেই ইলাহি নুরের সামনে দুর্বল হয়ে যায়, যদিও দৃষ্টির জন্যও ইলাহি নুরকে কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরা সম্ভব নয়।

কারণ ইলাহি নুরের উদাহরণ আগে কুরআনে প্রদীপের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তবে যদি তুমি নিজের মধ্যে ওই সব শর্ত পূর্ণভাবে একত্র করতে পারো, তাহলে কুরআনে উল্লেখিত বিশেষ গুণাবলির ভিত্তিতে চোখের দৃষ্টিও তাকে গ্রহণ করতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ – চোখসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না।[8]

এই আয়াতের অর্থ দুইভাবে বোঝা যায়। প্রথম অর্থ হলো আল্লাহ একক সত্তা। সাধারণ চোখ তাঁকে ধরতে পারে না। কারণ চোখ কোনো জিনিসকে ধরতে গেলে সাধারণত কোনো রূপ, সীমা বা তুলনার পথ ধরে। কিন্তু আল্লাহকে এভাবে ধরা যায় না। তাঁকে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করেন তাঁরা, যাদের অন্তরের দৃষ্টি আছে; শুধু বাহ্যিক চোখ নয়।

দ্বিতীয় অর্থ হলো যে চোখ শরীরের অঙ্গ হিসেবে নির্দিষ্ট সীমায় বাঁধা, সেই চোখ তাঁকে ধরতে পারে না। কিন্তু দৃষ্টি যদি এই অঙ্গ-চোখের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সে ওই নুরকে উপলব্ধি করে, যার উদাহরণ প্রদীপের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আর সেই নুর সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ – তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই।[9]

সুতরাং আল্লাহ কোনো তুলনা গ্রহণ করেন না— এর অর্থ এই নয় যে, তাঁর কোনো সিফাত নেই। বরং যার কোনো সিফাত আছে, তার সিফাত যার মধ্যে প্রকাশ পায়, তার অবস্থান অনুযায়ী ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

যেমন: ইলম, শ্রবণ, দৃষ্টি, ক্ষমতা, ইচ্ছা, কথা বলা; এসব সিফাত আল্লাহর জন্যও বলা হয়, আবার মাখলুকের জন্যও বলা হয়। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে এসব সিফাতের সম্পর্ক আর মাখলুকের সঙ্গে এসব সিফাতের সম্পর্ক এক রকম নয়।

এমনকি মাখলুকের মধ্যেও পার্থক্য আছে। মানুষের সঙ্গে কোনো সিফাতের সম্পর্ক যেমন, ফেরেশতার সঙ্গে তার সম্পর্ক তেমন নয়। অথচ মানুষ ও ফেরেশতা দুজনই মাখলুক। তাই বিষয়টি বুঝে নাও।

এগুলোই সেই লাওয়াইহ, যা দৃষ্টির সামনে নববী জাতি মাশাহিদ হিসেবে প্রকাশ পায়। এগুলো সালবি, অর্থাৎ না-সূচক অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু না-সূচক বর্ণনা চোখে দেখা জিনিস নয়। এটা বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়। আর যা শুধু বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়, তা লাওয়াইহের অন্তর্ভুক্ত নয়।

আর আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের নুর থেকে যা প্রকাশ পায়, তার প্রভাব দেখা গেলে তুমি সেই প্রভাবের মাধ্যমে ওই নামগুলোর নুর সম্পর্কে জানতে পারো। অর্থাৎ, নামগুলোর নুর তাদের প্রভাবের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ইলাহি নামের একটি রুহ আছে, একটি প্রভাব আছে এবং একটি রূপ আছে। চোখ নাম থেকে কেবল তার প্রভাবটুকুই পায়। আর সেই প্রভাবই তার দৃশ্যমান রূপ। যেমন, তুমি জায়েদের দেহের রূপ দেখো। তখন বলা যায়, তুমি জায়েদকে দেখেছ। এ কথা কোনো তাবিল ছাড়া বলা ঠিক। অথচ জায়েদের মধ্যে একটি অদৃশ্য পরিচালনাকারী রুহও আছে, আর তার একটি দেহগত রূপও আছে।

ঠিক এভাবেই ইলাহি নামগুলোর প্রভাবই হলো সেই নামগুলোর রূপ। যে ব্যক্তি সেই প্রভাব দেখে, সে এই অর্থে সত্য বলেছে যে, সে নামগুলোকে দেখেছে। কিন্তু লাওয়াইহের কাজ হলো, সে যেন দেখা প্রভাবের সঙ্গে সেই নামের সম্পর্ক মিলিয়ে দেয়, যে নাম ওই প্রভাবের রুহ।

বিষয়টি এমন: তুমি একজন মানুষকে দেখলে, কিন্তু জানলে না যে সে-ই তোমার কাঙ্ক্ষিত জায়েদ। আরেকজন তাকে দেখে, কারণ সে তাকে চেনে; তাই সে জানে, সে জায়েদকে দেখেছে। এই দ্বিতীয় ব্যক্তি আরিফ। সে-ই লাওয়াইহের অধিকারী। আর প্রথম ব্যক্তি লাওয়াইহের অধিকারী নয়। কারণ তার কাছে ওই রূপের সঙ্গে নামের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়নি। এটাই দুই ব্যক্তির পার্থক্য। একজন দেখে, কিন্তু কী দেখেছে তা জানে না। আরেকজন দেখে এবং যা দেখেছে তা চিনেও নেয়। তাই তারা দুজন এক নয়।

লাওয়াইহ সম্পর্কে কেউ যদি সংক্ষেপে জানতে চায়, তাহলে এতটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন, আর তিনিই পথ দেখান।[10]

লাওয়ামি:

لَمَعَتْ أَنْوَارُ تَوْحِيدِي عِنْدَ تَغْرِيدِي بِتَجْرِيدِي

আমার তাওহিদের নুর ঝলমল করে উঠল, যখন আমি তাজরিদ তথা সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে একনিষ্ঠতার সুর তুললাম।

كُلَّمَا أَبْدَتْ لَوَامِعُهَا أَذِنَتْ فِينَا بِتَحْدِيدِي

যখনই তার লাওয়ামি‘ নিজের ঝলক প্রকাশ করল, তখনই আমাদের মধ্যে আমার সীমা নির্ধারণের অনুমতি দিল।

كُلُّ مَحْدُودٍ يَؤُولُ إِلَى حَالِ تَرْكِيبٍ وَتَبْدِيدِ

প্রত্যেক সীমাবদ্ধ জিনিস শেষ পর্যন্ত গঠন ও বিচ্ছুরণের অবস্থায় ফিরে যায়।

فَضْلُهُ مِنْ جِنْسِهِ عَلَمٌ ظَاهِرٌ بِنَقْصِ تَوْحِيدِي

তার শ্রেষ্ঠত্ব তার নিজস্ব ধরন থেকেই স্পষ্ট নিদর্শন হয়ে ওঠে; আর আমার তাওহিদের অপূর্ণতাও তাতে প্রকাশ পায়।

লাওয়ামি‘ জওক তথা আধ্যাত্মিক স্বাদের চেয়েও ঊর্ধ্বে। কারণ লাওয়ামি‘ শুরু অবস্থার ওপর আরও কিছু বাড়িয়ে দেয়। আর শরব তথা পান করার অবস্থা জওক পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারে, আবার নাও পৌঁছাতে পারে।

তাজাল্লির নুর যখন দুই মুহূর্ত বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত স্থির থাকে, তখন তাকে লাওয়ামি‘ বলা হয়। তবে এটি জাতি তাজাল্লিতে ঘটে না; বরং মুনাসাবাত তথা সম্পর্ক ও উপযোগিতার তাজাল্লিতে ঘটে। সেই মুনাসাবাতের তাজাল্লি যতক্ষণ স্থায়ী হয়, লাওয়ামি‘ও ততক্ষণ স্থায়ী থাকে।

আর মুনাসাবাতের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। কারণ ইলাহি বিষয়গুলো তাকে স্থায়ী থাকতে দেয় না। নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সত্তাগুলোও দ্রুত বিলীন হয়ে যায়। তাই লাওয়ামি‘ দুই মুহূর্ত বা তার কাছাকাছি সময়ের জন্যই থাকে।

কারণ প্রথম মুহূর্ত হলো তার প্রকাশের সময়। আর দ্বিতীয় মুহূর্ত হলো সে যে আলো দিয়েছে, তা থেকে উপকার নেওয়ার সময়। তখন অন্তর তার অর্থের কাছে বিস্ময়ে থমকে যায়। কারণ সে তাজাল্লির সঙ্গে নতুন পরিচিত; আগে সে তাজাল্লি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।

তাই এই লাওয়ামি‘ কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে রাখা হয়, যেন বিস্ময় ও আটকে থাকার ভাব কেটে যায়। তারপর সে এই লাওয়ামি‘ যা নিয়ে এসেছে, তা গ্রহণ করে। অর্থাৎ তার ধারাবাহিক আগমনগুলোর অপেক্ষা করে।

যখন গ্রহণের অবস্থা তৈরি হয়, তখন তার হুকুম কার্যকর হয়ে যায়। এরপর তার মতো আরেকটি অবস্থা আসে, অথবা তার বিপরীত কিছু আসে। আর যার ওপর লাওয়ামি‘ আসে, সে সবসময় দ্রুত হুসনের জগৎ তথা সৌন্দর্যপূর্ণ ইমানি প্রশান্ত অবস্থায় ফিরে যায়।

এই লাওয়ামি‘কে শুধু ইলাহি ইলমই দূর করতে পারে। এগুলোর সঙ্গে সৃষ্টিজগতের ইলমের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এগুলো খাঁটি ইলাহি দান; এটাই এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

সুতরাং, মানুষ যদি নিজের হালের মধ্যে কোনো ইলম পায়, কিন্তু তা লাওয়ামি‘ না হয়, তাহলে বুঝবে—তাজাল্লির ধরন অনেক, আর তার হুকুমও নানা রকম। আল্লাহই সত্য কথা বলেন, আর তিনিই পথ দেখান।[11]

এই চার মনীষীর কথা মিলিয়ে পড়লে একটা ছবি স্পষ্ট হয়— লাওয়ায়িহ, লাওয়ামি‘ ও তাওয়ালি‘ আসলে একই আলোর যাত্রাপথ। প্রথমে আসে ক্ষণিকের ঝলক, যা ধরা দেয়ার আগেই হারিয়ে যায়। তারপর সেই ঝলক একটু থেমে থাকে, প্রভাব ফেলে যায়। আর শেষে আসে সেই দীর্ঘস্থায়ী আলো, যা অন্তরের অন্ধকার পুরোপুরি ঘুচিয়ে দেয়।

কুশাইরি ও দাতা গঞ্জে বখশ এই তিনটি স্তরের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন প্রায় একই কাঠামোয়। সোহরাওয়ার্দি দেখিয়েছেন, নামের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবকিছু এক মূল সত্যের দিকেই ফিরে যায়। আর ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন, তাওয়ালি‘র নুর কীভাবে বুদ্ধির অহংকারকে ভেঙে দেয়, আর লাওয়াইহ কীভাবে শেখায়— দেখা আর চেনা এক কথা নয়।

সবশেষে এই সত্যটাই থেকে যায়— এই আলোর ঝলকগুলো নিজে লক্ষ্য নয়, এরা পথের চিহ্ন মাত্র। প্রকৃত সাধক এই ঝলকে থমকে না থেকে এগিয়ে যান সেই স্থায়ী আলোর দিকে, যেখানে আর কোনো রাত নামে না।