সুফি সাধনার জগতে ‘হাল’ একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থার নাম। মানুষের হৃদয়ে এটি হঠাৎ করেই নেমে আসে, কোনো চেষ্টা বা পরিশ্রম ছাড়াই। কখনো আনন্দের ঢেউ, কখনো গভীর বিষাদ, কখনো তীব্র ভয় বা আকুলতা; সবই হালের রূপভেদ। ইমাম কুশাইরি, দাতা গঞ্জে বখশ ও ইবনে আরাবির মতো আধ্যাত্মিক সাধকরা এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, মাকাম মানুষ নিজের সাধনায় অর্জন করে, কিন্তু হাল আসে সরাসরি আল্লাহর দরবার থেকে। এটি তাঁর বিশেষ দান।

ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

সুফি সাধকদের মতে হাল হলো এমন একটি অর্থ যা মানুষের কোনো কৃত্রিম প্রচেষ্টা বা অর্জন বা উপার্জনের চেষ্টা ছাড়াই আচমকা হৃদয়ে অবতীর্ণ হয়; তা হতে পারে কোনো আনন্দ বা দুঃখ কিংবা কোনো কঠিন বা আকস্মিক বিষয় চেপে বসা (যার প্রসঙ্গে হজরত হুজাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, “যখনই আল্লাহর রসুলের ওপর কোনো কঠিন বা উদ্বেগজনক বিষয় চেপে বসত, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন), অথবা মনের প্রসারণ বা সংকোচন, তীব্র আকুলতা বা অস্থিরতা, কিংবা কোনো ভয় বা তীব্র অভাববোধ।

অতএব, আহওয়াল তথা হালসমূহ হলো উপহার, আর মাকামাত তথা অবস্থান হলো মানুষের অর্জন। আহওয়াল আসে পরম দাতার অনুগ্রহ থেকে, আর মাকামাত অর্জিত হয় কঠোর সাধনা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

যিনি মাকামের অধিকারী তিনি তাঁর মাকামে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকেন, পক্ষান্তরে হালের অধিকারী ব্যক্তি তাঁর হাল থেকে আরও উচ্চাবস্থায় উন্নীত হন।

হজরত জুননুন মিসরি (রহ.)-কে আরিফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন كَانَ هَا هُنَا فَذَهَبَ – তিনি এইমাত্র এখানে ছিলেন, পরক্ষণেই চলে গেলেন।

মাশায়েখগণ বলেছেন الأَحْوَالُ كَالبُرُوقِ، فَإِنْ بَقِيَ.. فَحَدِيثُ نَفْسٍ – আহওয়াল হলো ক্ষণস্থায়ী বিজলীর মতো। যদি তা স্থায়ী হয়, তবে বুঝতে হবে সেটা মনের খেয়াল বা অবাস্তব কল্পনা।

এবং তাঁরা বলেছেন الأَحْوَالُ كَاسْمِهَا – ‘আহওয়াল’ তার নিজের নামের মতোই। এগুলো অন্তরে অবতীর্ণ হয়; অর্থাৎ যখনই অন্তরে আসে তখনই আবার দূর হয়ে যায়। তারপর সুফিগণ এই বিষয়ের স্পষ্টীকরণের উদ্দেশ্যে এই কবিতাটি পাঠ করেন—

لَوْ لَمْ تَحُلْ مَا سُمِّيَتْ حَالاً — وَكُلُّ مَا حَالَ فَقَدْ زَالاً

اُنْظُرْ إِلَى الْفَيْءِ إِذَا مَا انْتَهَى — يَأْخُذُ فِي النَّقْصِ إِذَا طَالاً

যদি অবস্থা পরিবর্তিত না হতো, তবে তাকে ‘হাল’ (ক্ষণস্থায়ী আত্মিক অবস্থা) নামে নামকরণই করা হতো না। আর যা কিছুই পরিবর্তিত হয়, তা-ই মূলত বিলীন হয়ে যায়।

তুমি ‘ফায়’ তথা দুপুরের পর ঢলে পড়া ছায়ার দিকে তাকাও; তা যখন তার শেষ সীমায় পৌঁছায় এবং যখন তা দীর্ঘতম রূপ নেয়, তখন থেকেই মূলত তা আবার কমতে শুরু করে।

একদল শায়খ ‘আহওয়াল’ এর স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তারা বলেছেন, এই অবস্থা যদি স্থায়ী না হয় এবং একাদিক ক্রমে না আসে, তবে সেগুলো কেবল ‘লাওয়াইহ’ তথা ক্ষণস্থায়ী আলোকচ্ছটা এবং ‘বাওয়াদিহ’ তথা হঠাৎ অন্তরে উদিত ভাব। এর অধিকারী ব্যক্তি তখনও প্রকৃত ‘আহওয়াল’-এর স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। পক্ষান্তরে, সেই বৈশিষ্ট্য বা গুণটি যখন স্থায়ী রূপ নেয়, কেবল তখনই তাকে ‘হাল’ নামে অভিহিত করা হয়। এখানে ‘লাওয়াইহ এবং বাওয়াদিহ’ বলতে বোঝায় তার সামনে এর অর্থ ও সূচনা প্রকাশ পেয়েছে; কিন্তু তা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যা আল-লাখমি লিখিত ‘ফাওয়াইদুর রিসালাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। আর প্রথম দুটি চরণের ক্ষেত্রে ‘ইয়াতিমাতুদ দাহর’ গ্রন্থে ‘আল-খালিউ’র প্রতি নিসবত বা সম্পর্কযুক্ত করার ব্যাপারে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে।

আবু উসমান আল-হিরি বলছেন منذُ أربعينَ سنةً ما أقامني اللهُ في حالٍ فكرهتُه – চল্লিশ বছর ধরে আল্লাহ আমাকে যে হাল বা অবস্থাতেই রেখেছেন, আমি তা অপছন্দ করিনি। এর মাধ্যমে তিনি ‘রেজা’ তথা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টির স্থায়িত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছেন; আর ‘রেজা’ হলো বিভিন্ন হালেরই একটি অংশ।

এই বিষয়ে সঠিক বক্তব্য হলো, যারা আহওয়ালের স্থায়িত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তাদের কথা যথার্থ। কারণ, আধ্যাত্মিক এই ভাব বা অর্থটি কখনো কোনো ব্যক্তির জন্য নিয়মিত আধ্যাত্মিক অংশ বা স্বভাব হয়ে যায় এবং সেটার ভেতরেই তার আত্মিক প্রতিপালন ঘটে। তবে এই ‘হাল’-এর অধিকারীর এমন কিছু ‘আহওয়াল’ বা অবস্থারও মুখোমুখি হতে হয়, যা আচমকা আসে এবং স্থায়ী হয় না। এগুলো তার সেই স্থায়ী স্বভাবসুলভ অবস্থার ওপর আপতিত হয়। এরপর এই আচমকা আসা অবস্থাগুলোও যদি তার জন্য পূর্ববর্তী অবস্থাগুলোর মতো স্থায়ী রূপ লাভ করে, তখন সে এগুলোর চেয়েও উচ্চতর ও সূক্ষ্মতর অন্য এক অবস্থায় উন্নীত হয়। এভাবে সে সর্বদা আত্মিক উন্নতির বুজুর্গিতে আসীন থাকে। এখানে ‘শির্ব’ মানে ভাগ্য ও অংশ। এর মূল অর্থ হলো যখন বিভিন্ন ‘আহওয়াল’ বা আধ্যাত্মিক অবস্থা একই ধরনের হয়ে ধারাবাহিকভাবে আসতে থাকে, তখন তা একটি ‘মাকাম’ বা স্থায়ী স্তরে পরিণত হয়।

আমি উস্তাদ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ)-কে রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই বাণীর অর্থ প্রসঙ্গে বলতে শুনেছি, যেখানে তিনি বলেছেন إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي، حَتَّى أَসْتَغْفِرَ اللهَ فِي اليَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةً – নিশ্চয় আমার অন্তরের ওপর একটি আবরণ বা মেঘের মতো ভাবের সৃষ্টি হয়, যার কারণে আমি দিনে সত্তর বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। উস্তাদ বলেন, নিশ্চয় রসুলুল্লাহ (ﷺ) সর্বদা তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতি ও ঊর্ধ্বগমনের মধ্যে থাকতেন। ফলে তিনি যখন কোনো একটি অবস্থা থেকে পূর্বের চেয়ে আরও উচ্চতর কোনো অবস্থায় উন্নীত হতেন, তখন হয়তো আগের অবস্থার প্রতি তাঁর সামান্য একটু খেয়াল বা দৃষ্টি থেকে যেত। (এই হাদিসটি ইমাম মুসলিম (২৭০২) এবং ইমাম নাসায়ি তাঁর ‘আস-সুনানুল কুবরা’ (১০২০৩) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।)

যে উচ্চতর অবস্থায় তিনি উন্নীত হয়েছেন, তার তুলনায় পূর্বের অর্জিত অবস্থাকে তিনি এক প্রকার ত্রুটি বা ঘাটতি হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা বা ‘আহওয়াল’ সর্বদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেত।

পবিত্র সত্তা আল্লাহর অনন্ত অনুগ্রহ ও অনুগ্রহের কোনো শেষ নেই। আর আল্লাহর প্রকৃত মর্যাদা ও হাকিকত অনুযায়ী তাঁর পর্যন্ত পৌঁছানো তো সৃষ্টির পক্ষে অবাস্তব ও অসম্ভব। তাই বান্দা সর্বদা তার আধ্যাত্মিক অবস্থার ঊর্ধ্বগমন ও উন্নতির মাঝেই অবস্থান করে।

সুতরাং, পৌঁছানোর এমন কোনো স্তর নেই, যার ঊর্ধ্বে আল্লাহর কুদরতে আরও কোনো স্তর নেই, যেখানে তিনি বান্দাকে পৌঁছে দিতে পারেন। আর এই অর্থ বা প্রসঙ্গের ওপর ভিত্তি করেই মনীষীদের এই বিখ্যাত উক্তিটি বলা হয়ে থাকেحسناتُ الأبرارِ سيئاتُ المقرَّبينَ – সাধারণ পুণ্যবানদের ভালো কাজগুলো আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের নিকট গুনাহ বা ত্রুটিস্বরূপ।

এই বিষয়টি সম্পর্কেই জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি ‘তাবিল’ ছন্দে রচিত এই কবিতাটি আবৃত্তি করেন—

طَوَارِقُ أَنْوَارٍ تَلُوحُ إِذَا بَدَتْ … فَتُظْهِرُ كِتْمَاناً وَتُخْبِرُ عَنْ جَمْعِ

অর্থাৎ, হঠাৎ অন্তরে উদিত হওয়া নুরের ঝলকানিগুলো যখন প্রকাশ পায়, তখন তা চমকাতে থাকে। ফলে তা মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা গোপন বিষয়কে ফুটিয়ে তোলে এবং আধ্যাত্মিক মহাসমাবেশের সংবাদ দেয়।

এখানে মূল বক্তব্য হলো মাকাম বা আধ্যাত্মিক স্তরসমূহের সূচনা ঘটে এমন কিছু আকস্মিক নুরের ঝলকানির মাধ্যমে, যা প্রথম দিকে চমকাতে থাকে, এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো তা যখন শক্তিশালী হয়ে প্রকাশ পায় তখন তা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও পরম সত্যের প্রকাশ ঘটায় এবং হৃদয়ের গোপন রহস্যকে আবৃত করে।[1]

দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

হাল হলো নির্দিষ্ট মুহূর্তে বা সময়ে আপতিত একটি বিশেষ অবস্থা, যা সেই সময়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও সুশোভিত করে। যেভাবে আত্মার সংযোগে দেহ অবধারিতভাবে সুশোভিত হয়, ঠিক তেমনি হাল-এরও একটি সময়ের আবশ্যকতা বা আধারের প্রয়োজন পড়ে। কেননা সময়ের পবিত্রতা ও সার্থকতা এই হালের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় এবং সময়ের প্রকৃত স্থায়িত্ব ও গতিশীলতাও হালের আলোকেই ঘটে থাকে। অতএব, যখন কোনো ব্যক্তি ‘সাহেবে ওয়াক্ত’ (সময়ের হাকিকত অনুধাবনকারী) ও হালের অধিকারী হন, তখন তার অবস্থা থেকে সমস্ত অস্থিরতা বা পরিবর্তন দূর হয়ে যায় এবং তিনি নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা তথা আহওয়ালের মধ্যে সুদৃঢ় ও মজবুত হয়ে যান। কারণ, হাল ছাড়া সময়ের অবসান বা জওয়াল হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর যখন কোনো ব্যক্তি এই হালের সাথে একাত্ম হয়ে যান, তখন তার জীবনের সমস্ত মুহূর্ত বা আহওয়ালই একেকটি ‘ওয়াক্ত’ বা মূল্যবান আধ্যাত্মিক ক্ষণে পরিণত হয়, যার জন্য সময়ের অবতরণ ঘটেছিল। যেহেতু আধ্যাত্মিক স্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত বা ‘মুতামাক্কিন’ ব্যক্তির জন্য গাফেলতি বা অসচেতনতা প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়, সেহেতু গাফেলতি বা অসচেতনতায় নিমজ্জিত ব্যক্তির ওপর এখন হাল নাজিল হয় এবং ওয়াক্ত বা সময়ের দিক থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত বা ‘মুতামাক্কিন’ হন। এই কারণে ‘সাহেবে ওয়াক্ত’ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গাফেলতি বা অসচেতনতা প্রকাশ পাওয়া তো সম্ভব, কিন্তু ‘সাহেবে হাল’ ব্যক্তির পক্ষে গাফেলতি বা অসচেতন হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

তরিকতের মাশায়েখগণ বলেন الحال سكوت اللسان فى فنون البيان – হালের অধিকারী ব্যক্তির জিহ্বা নিজের হালের বর্ণনা করা থেকে নীরব থাকে এবং এই নীরবতাই তার হালের সত্যতা ও বাস্তবতার প্রমাণ বহন করে।

এক বুজুর্গ বলেন السوال عن الحال محال – হাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা অবাস্তব বা অসম্ভব। এর কারণ হলো, হালের স্বরূপ ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। হাল যেখানে প্রকাশ পায়, সেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে বা ফানা হয়ে যায়।

উস্তাদ আবু আলী কারি (রহ) বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতে খুশি এবং দুঃখ মানুষের ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে থাকে, কিন্তু হালের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। কারণ হাল হলো এমন একটি বিশেষ আত্মিক অবস্থা, যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর আপতিত হয়, আর যখন এর উদয় ঘটে তখন হৃদয়ের অন্য সব অনুভূতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন হজরত ইয়াকুব (আ) এর অবস্থা ছিল ‘সাহেবে ওয়াক্ত’ বা সময়ের অধীন। এক সময়ে বিরহের তীব্রতায় তাঁর চোখের দৃষ্টি চলে গিয়েছিল, আবার অন্য এক সময়ে মিলনের সান্নিধ্যে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছিল। কখনো ক্রন্দন ও আহাজারির কারণে তিনি এতটা দুর্বল ও জীর্ণ হয়ে পড়েছিলেন যে, শরীরের পশমের মতো ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিলেন, আবার কখনো মিলনের মুহূর্তে সুস্থ ও সবল হয়ে উঠতেন। কখনো তিনি অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়তেন, আবার কখনো আনন্দ ও খুশিতে উদ্বেলিত হতেন। পক্ষান্তরে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন ‘সাহেবে হাল’। তিনি না বিরহের কারণে বিষাদগ্রস্ত হতেন, না মিলনের আনন্দে মগ্ন হতেন। চাঁদ, তারা এবং সূর্য তাঁর এই হালের স্তরে পৌঁছাতে কোনো সাহায্য করেনি; বরং তিনি নিজে প্রতিটি সৃষ্টিকে অবলোকন করা থেকে মুক্ত বা ফারেগ ছিলেন। তিনি যা কিছু দেখতেন, তার মাঝেই কেবল মহান আল্লাহর নুরের প্রকাশ দেখতে পেতেন। এই কারণেই তিনি বলেছিলেন لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ যা কিছু অস্তমিত হয়ে যায়, আমি তা পছন্দ করি না।

‘সাহেবে ওয়াক্ত’-এর জন্য কখনো সারা জাহান দোজখ বা যন্ত্রণাময় হয়ে যায়, যখন মোশাহেদা বা আধ্যাত্মিক প্রত্যক্ষীকরণ থেকে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন হৃদয় থেকে প্রিয়তমের গোপন হয়ে যাওয়াটা গভীর একাগ্রতা ভাঙার ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনো তার হৃদয় আনন্দ ও খুশিতে এতটাই উদ্বেলিত হয় যে, তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সারা জাহান তার কাছে অজ্ঞতার মতো বা মূল্যহীন মনে হয়। নেয়ামতরাজির মধ্যে সে প্রতি মুহূর্তে পরম সত্য বা হকের মোশাহেদা করতে থাকে, আর সেই নেয়ামত তখন তার জন্য অনন্য উপহার ও সুসংবাদ হয়ে যায়। অতঃপর, ‘সাহেবে হাল’ বা হালের অধিকারীর জন্য পর্দা বা হিজাব হোক, কাশফ বা আধ্যাত্মিক উন্মোচন হোক, নেয়ামত হোক কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই হোক, সবকিছুই সমান থাকে। কারণ সে প্রতিটি মাকাম বা আধ্যাত্মিক স্তরেই ‘সাহেবে হাল’ বা হালের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে।

অতএব, ‘হাল’ হলো মুরাদ বা আল্লাহর অন্বেষিত বান্দার সিফাত বা বৈশিষ্ট্য, আর ‘ওয়াক্ত’ হলো মুরিদ বা আল্লাহর পথের অভিযাত্রীর স্তর। কেউ মূলত ‘ওয়াক্ত’-এর স্বস্তির মধ্যে থাকে, আবার কেউ ‘হাল’-এর আনন্দের মাধ্যমে খোদার সন্তুষ্টির মধ্যে থাকে। এই দুটি মঞ্জিল বা আধ্যাত্মিক স্তরের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য এটাই।[2]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

হাল হলো দয়াময় রহমান তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও নজর দিয়ে যা দান করেন, এটা কোনো উপার্জন বা চাওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় না। ভেতরের গুণ বা অবস্থার পরিবর্তনই এর প্রমাণ, সুতরাং তুমি স্থির থাকো, কারণ হাল যে-কোনো সময় বদলে যায়। আর ভুলেও বলো না যে, হাল চিরস্থায়ী, যদিও একদল লোক তোমার বলা এই মতেরই পক্ষাবলম্বন করেছেন। আবু উক্বাল হলেন একজন ইমাম, নেতা ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব, হালের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের অবস্থায় এক আশ্চর্য বিষয় ঘটেছিল। শত শত পূর্ণিমার সময়কাল পর্যন্ত তাঁর এই অবস্থা একটানা জারি ছিল, যার দিনগুলোতে আধ্যাত্মিকতার কোনো পর্দা বা অন্তরাল নেমে আসেনি। হজরত মুসা (আ)-এর জন্য নির্ধারিত সময়সীমাকেও তাঁর এই অবস্থানকাল ছাড়িয়ে গিয়েছিল, কিতাবসমূহে বিষয়টি এভাবেই এসেছে।

সুফি সম্প্রদায়ের নিকট ‘হাল’ হলো এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থা যা কোনো রকম কৃত্রিম চেষ্টা বা নিজের পক্ষ থেকে টেনে আনা ছাড়াই হঠাৎ হৃদয়ে অবতীর্ণ হয় এবং তা আধ্যাত্মিক ব্যক্তির ভেতরের গুণাবলিকে বদলে দেয়। এর স্থায়িত্বের ব্যাপারে মাশায়েখদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এর স্থায়িত্বের পক্ষে মত দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ এর স্থায়িত্বকে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, এটি সৃষ্টি হওয়ার মুহূর্তটুকুর বাইরে আর স্থায়ী হয় না, ঠিক যেভাবে ইলমে কালামের পণ্ডিতদের নিকট ‘আরাজ’ (ক্ষণস্থায়ী গুণাবলি) স্থায়ী হয় না। তবে এর পরপরই একই ধরনের অনুভূতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, যার কারণে মানুষের মনে বিভ্রম তৈরি হয় যে, এটি বোধহয় স্থায়ী; অথচ বিষয়টি আদতে তেমন নয়। আর এটাই যথার্থ কথা। তবে এই রূপান্তরের মাঝখানে অন্য কোনো ভিন্ন অনুভূতি প্রবেশ করে না, যা তাকে এই অবস্থা থেকে বের করে দেবে। আবার কিছু বুজুর্গ একে ‘হুলুল’ (অন্তপ্রবেশ) শব্দ থেকে গ্রহণ করেছেন এবং একে একটি চিরস্থায়ী ও অবিচল গুণ হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁদের মতে এটি চলে গেলে তাকে আর হাল বলা যাবে না এবং এটি মূলত হালের স্থায়িত্ববাদীদের বক্তব্য। তাদেরই একজন বলেছেন ما أقامني الله منذ أربعين سنة في أمر فكرهته – চল্লিশ বছর ধরে আল্লাহ আমাকে যে অবস্থাতেই রেখেছেন, আমি তা অপছন্দ করিনি।

এ প্রসঙ্গে ইমাম (নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ নেই) বলেছেন, এর মাধ্যমে তিনি ‘রেজা’র (সন্তুষ্টি) স্থায়িত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা হালেরই একটি অংশ। ইমামের এই ব্যাখ্যাটি যুক্তিসঙ্গত হলেও আল্লাহর গভীর আধ্যাত্মিক পথের বিবেচনায় তা কিছুটা দূরবর্তী মনে হয়। বরং এই বুজুর্গের কথার প্রকৃত সাধারণ অর্থ যেভাবে বলা উচিত তা হলো— তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর এমনভাবে কাটিয়েছেন যে, আল্লাহ তাঁর জাহের (প্রকাশ্য) এবং বাতেন (অভ্যন্তরীণ) জীবনে শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কোনো অবস্থা তৈরি হতে দেননি; বরং তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত-বন্দেগি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল। আর আমি নিজে এমন একজন অত্যন্ত সত্যবাদী সাহেবে হাল ব্যক্তির দেখা পেয়েছি, যিনি আমার জন্য আবু ইয়াজিদ আল-বিস্তামি (রহ)-এর স্তরে পৌঁছানো সম্ভবপর করে তুলেছিল। বরং তাঁর কাজের মধ্যে তাঁর একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অধিকার সৃষ্টি হয়েছিল। এক ব্যক্তি আমাকে একদিন বললেন, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে আমার মনে শরিয়ত-পরিপন্থি কোনো মন্দ চিন্তার উদয় ঘটেনি। এই ধরনের মহান ব্যক্তিদের কথা মূলত ঐশী সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহারস্বরূপ, যা কোনো উপার্জনের বিষয় নয়।

জেনে রাখুন, হাল হলো সৃষ্টির ওপর মহান আল্লাহর কর্ম ও তাঁর মনোযোগের একটি ঐশী বৈশিষ্ট্য। আর যদি তা বাহ্যিক চোখ দিয়ে নাও বোঝা যায়, তবুও পরম সত্য আল্লাহ নিজের সম্পর্কে নিজেই বলেছেন كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ – তিনি প্রতিদিন কোনো না কোনো মহিমান্বিত কাজে নিয়োজিত আছেন।

আর এটি সময়ের ক্ষুদ্রতম একক, যা কোনো বণ্টন বা ভাগ গ্রহণ করে না। পরম একক মহান আল্লাহ অস্তিত্বের জগতের প্রতিটি স্তরে এই শর্তে অবস্থান করছেন যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি অংশ আল্লাহর এই প্রতিটি কর্ম বা ক্ষণের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তিনি সৃষ্টিজগতে যা কিছু ঘটান, তা প্রতিটি সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে টিকিয়ে রাখেন। আর সৃষ্টিজীবের এই আধ্যাত্মিক স্পন্দন এবং অসম্ভব বিষয়গুলোর অস্তিত্ব মূলত আল্লাহর ইচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল। কারণ তিনিই এই অন্তহীন ধারা সর্বদা সৃষ্টি করে চলেছেন। সুতরাং, দুই সময়ের ব্যবধানে হালের স্থায়িত্বের কোনো অবকাশ নেই, কারণ যদি পরম সত্য আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে নতুন সৃষ্টি না করতেন, তবে কারোর পক্ষেই এই আধ্যাত্মিক সজীবতা ধরে রাখা সম্ভব হতো না এবং এই তত্ত্বটি আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার জন্য সম্পূর্ণ অসম্ভব বা অবাস্তব একটি বিষয়। আর এটি মূলত সেইসব পণ্ডিতদের মতের মতোই, যাঁরা মনে করেন ‘আরাজ’ (ক্ষণস্থায়ী গুণাবলি) দুই সময়ের ব্যবধানে টিকে থাকে না। আর সৃষ্টিজীবের ওপর আপতিত এই আধ্যাত্মিক স্পন্দন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হতে থাকে, যা দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বত্র চলমান। আর এটাই হলো হালের মূল ভিত্তি, যা পরিশেষে ঐশী রহস্যের দিকেই ফিরে যায়। অতএব, যখন আল্লাহ কোনো বান্দার হৃদয়ে হাল অবতীর্ণ করেন, তখন তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা আধারের প্রয়োজন পড়ে না, কারণ এটি হুলুল (কোনো আধারে প্রবেশ করা) নয়; বরং এটি হৃদয়ে আল্লাহর বিশেষ নুরের অবতরণ মাত্র। আর যখন এর প্রকাশ ঘটে, তখন তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক পরম সত্যে রূপ নেয়। তবে এর বাস্তবতা দ্বিতীয় কোনো সময়ে আর সেভাবে অবশিষ্ট থাকে না, কারণ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্বের অবস্থাটি বিলুপ্ত হওয়া আবশ্যক। অস্তিত্বশীল কোনোকিছু নিজের চেষ্টায় একা একা টিকে থাকতে পারে না, কারণ পরম সত্তার সক্রিয় কর্ম ছাড়া শূন্যতা থেকে কোনোকিছুর সৃষ্টি বা স্থায়িত্ব লাভ করা অসম্ভব। আর পরম সত্যের এই উপস্থিতির জন্য সময়ের স্থায়িত্ব কোনো পূর্বশর্ত নয়; বরং তা অবাস্তব বিষয়ের মতোই একটি নিয়ামক মাত্র। দ্বিতীয় কোনো সময়ে পূর্বের সেই হালের অস্তিত্ব না থাকাটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কারণ কোনো উপাদানই তার স্থায়িত্বের জন্য নিজের ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং প্রতি মুহূর্তে সে তার প্রতিপালকের মুখাপেক্ষী থাকে। আর এভাবেই একের পর এক আধ্যাত্মিক অনুভূতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, যার কারণে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মানুষের মনে বিভ্রম তৈরি হয় যে, এই অবস্থাটি বোধহয় স্থায়ী, অথচ মূল নিয়মের দিক থেকে বিষয়টি আদতে তেমন নয়।

আর যখন পরম সত্য আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ তিনি প্রতিদিন নতুন কোনো মহিমান্বিত কাজে নিয়োজিত আছেন। তখন সৃষ্টির প্রতিটি স্পন্দনই আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী এবং পরম সত্য আল্লাহ নিজেকে বিভিন্ন রূপে ও অবস্থায় প্রকাশ করে আমাদের তা চিনিয়েছেন। সুতরাং, প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর ইচ্ছার একেকটি প্রতিচ্ছবি। আর এখান থেকেই আমরা বলতে পারি যে, পরম সত্য আল্লাহ স্বয়ং নিজের সৃষ্টির এই ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। আধ্যাত্মিক জগতের এই অবস্থা ও সৃষ্টির ধারাবাহিকতা কখনো শেষ হবার নয় এবং তা সৃষ্টির শুরু থেকে আখিরাত পর্যন্ত অবিনশ্বর। জগতের এই অস্তিত্ব মহান আল্লাহর চিরায়ত ইচ্ছার সাথে এবং তাঁর সৃষ্টির হুকুমের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যা কখনোই তাঁর নজর থেকে দূরে সরে যায় না। আর আল্লাহর সৃষ্টির এই অমোঘ আদেশ ও তাঁর ইচ্ছার বাণী কখনোই রদ হওয়ার নয়। সৃষ্টি এবং সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রকৃত বিষয় বা হুকুম ঠিক এমনই।

সুফিগণ অনেক সময় হাল বলতে আল্লাহর বান্দার মাঝে পরম সত্যের গুণের প্রকাশ এবং জগতের বুকে তার আধ্যাত্মিক প্রভাবের অস্তিত্বকে বুঝিয়ে থাকেন। আর তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আল্লাহর নামে গুণান্বিত হওয়া বা ‘তাখাল্লুক্ব বিল আসমা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা মূলত বর্তমান যুগের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা নিজেদের হালের মাধ্যমে আশা করে থাকেন। আমরা এই স্তরটিকে সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে ব্যাখ্যা করি না, তবে আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, কোনো বান্দা যখন এই আধ্যাত্মিক স্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত হন, তখন যদি মহান আল্লাহ চান, তবে তার মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা সাধারণ নিয়মের বাইরে। কিন্তু একজন প্রকৃত আদব বা শিষ্টাচারসম্পন্ন বান্দার জন্য উচিত হলো নিজের এই উচ্চ অবস্থাকে প্রকাশ না করা। বরং আল্লাহর ইবাদতের মাঝে নিজেকে পুরোপুরি বিলীন করে রাখা এবং নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে গোপন রাখা। আর এভাবেই বান্দা তার দাসত্বের প্রকৃত সার্থকতা ফুটিয়ে তোলে এবং আল্লাহর দরবারে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে।

এমনভাবে যে, তাঁকে যখন চরম দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়, তখনও আমাদের নিকট তাঁর সেই অবস্থা দেখার কারণে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত হয়। আর এই স্তরের অলি বা আল্লাহর বন্ধুগণ সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতস্বরূপ। আল্লাহর অলিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নবী করিম (ﷺ)-এর বাণী ঠিক এমনই, যেখানে তিনি বলেছেন إِنَّهُمُ الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ – নিশ্চয়ই তাঁরা এমন লোক, যাঁদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।

এটি মূলত তাঁদের সেই অবস্থার কথা বলা হয়েছে যখন তাঁরা বালা-মুসিবত ও পরীক্ষার মুখোমুখি হন এবং বাহ্যিক দুঃখ-কষ্ট থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর দিক থেকে নিজেদের দৃষ্টি ফেরান না। সুতরাং, কেউ যদি অলিদের মাঝে এই গুণের দেখা পায়, তবে সে যেন নিশ্চিতভাবে জেনে নেয় যে, আল্লাহ তাঁদেরকে নিজের জন্য বিশেষভাবে বেছে নিয়েছেন, যা অন্য কেউ নিজের চেষ্টায় অর্জন করতে পারে না। আল্লাহর অলি তথা হালের অধিকারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, তাঁকে দেখলেই আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত হয় এবং তিনিই মূলত তাঁর উচ্চ আধ্যাত্মিক সংকল্প বা ‘হিম্মত’ দ্বারা সৃষ্টিজগতের ওপর প্রভাব বিস্তার ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার সামর্থ্য রাখেন। আর এই গুণাবলির প্রতিটিই পরম সত্য আল্লাহর প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, এই মহান ব্যক্তিরাই হলেন তাঁরা, যাঁদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। আর এই কথাটি কেবল তারাই অস্বীকার করতে পারে যাদের এই গভীর বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো সঠিক জ্ঞান নেই। শরিয়তের প্রণেতা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যও ঠিক তা-ই, যা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। আর এর বিপরীত যে বক্তব্যটি রয়েছে, অর্থাৎ উচ্চ আধ্যাত্মিক সংকল্প বা হিম্মতের মাধ্যমে জগতের ওপর প্রভাব বিস্তার করার কোনো মূল্য আল্লাহর নিকট নেই এবং এটি কোনো বেলায়তের লক্ষণ নয়; তা মূলত একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। নবী করিম (ﷺ)-কে যখন আল্লাহর অলিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি এই উত্তরটিই দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেনالَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ – যাঁদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।

এটি তখনই ঘটে যখন চারপাশ থেকে কঠিন বিপদ-আপদ এসে তাঁদের পিষ্ট করে ফেলে এবং বড়ো বড়ো মুসিবত তাঁদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। এমতাবস্থায়ও তাঁরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর দিকে বিন্দুমাত্র ঝুঁকে পড়েন না; বরং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকেন। সাধারণ মানুষ যখন তাঁদের এমন অসীম ধৈর্য, পরম সন্তুষ্টি এবং সৃষ্টিজীবের কাছে কোনো প্রকার অভাব-অভিযোগ বা নালিশ না করার এই অনুপম দৃশ্য অবলোকন করে, তখন সাধারণ মানুষ আল্লাহর অপার করুণার কথা স্মরণ করে এবং বুঝতে পারে যে, আল্লাহ নিজেই তাঁদের প্রতি বিশেষ নজর ও দয়া দান করেছেন। আর যাঁরা এই আধ্যাত্মিক প্রভাব বা নিদর্শনের অধিকারী, তাঁরা মূলত আল্লাহর অলি বা বন্ধু হওয়ার যোগ্য। এই আধ্যাত্মিক প্রভাব বা সৃষ্টির ওপর তাঁদের এই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিষয়টি আমাদের জানা কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ডের আলোকেই ঘটে থাকে। আর এটি কেবল তারাই বুঝতে পারে যারা মানুষের আত্মার গভীর সংকল্প ও শক্তির হাকিকত সম্পর্কে অবগত এবং সৃষ্টিজগতের ওপর সেই আত্মার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করতে পারে। যারা নির্জনতা ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীরতা পরিমাপ করতে পেরেছে এবং নিজেদের সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আল্লাহর বিশেষ তাওফিক বা অনুগ্রহ লাভ করেছে, তারা দেখতে পায় যে, এই সুফি সাধকগণ বাহ্যিকভাবে সাধারণ জীবনযাপন করলেও নিজেদের সুদৃঢ় আত্মিক শক্তির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের ওপর এক প্রকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। একইভাবে, আমাদের এই দৃশ্যমান জগতে মহান আল্লাহর পবিত্র নামসমূহের বিশেষ গুণের কারণেও এমন কিছু অলৌকিক প্রভাব বা নিদর্শনের প্রকাশ ঘটে থাকে। তবে কেউ যদি এই বাহ্যিক নিদর্শন বা প্রভাবগুলো দেখে মনে করে যে, ওই ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক বা অংশীদার হয়ে গেছে, তবে তার এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। কারণ সৃষ্টিজগতের বুকে এমন প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা মূলত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অলিদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া অন্য কোনোভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়।[3]

সবশেষে বলা যায়, হাল হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার হৃদয়ে পাঠানো এক অমূল্য উপহার, যা কোনো চেষ্টায় পাওয়া যায় না। এই অবস্থা ক্ষণস্থায়ী হলেও বারবার আসতে থাকলে একসময় স্থায়ী মাকামে রূপ নেয়। যিনি প্রকৃত সাহেবে হাল, তিনি সুখে-দুঃখে, বিপদে-আনন্দে সবসময় আল্লাহর দিকেই মুখ করে থাকেন। ইবনে আরাবির কথায়, কুরআনের ভাষ্যে আল্লাহ প্রতিটি মুহূর্তে নতুনভাবে সৃষ্টি করে চলেছেন, তাই হালও প্রতিনিয়ত নতুন রূপে আসে। এই সত্য যে যত গভীরভাবে অনুভব করতে পারে, সে তত বেশি আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছায়।

Sonnet 4.6