সুফি সাধকদের মতে ‘ওয়াক্ত’ হলো এমন একটি নতুন অবস্থা, যা সাধকের অন্তরে এসে স্থির হয়ে যায়। যেমন বলা হয়, ‘আপনি কখন আসবেন?’ এখানে ‘কখন’ মানে যে মুহূর্তটি এখনো আসেনি। আর ‘অমুক মাসের শুরুতে’ মানে সেই নির্দিষ্ট মুহূর্ত, যা আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে। এই নির্দিষ্ট মুহূর্তকেই ‘ওয়াক্ত’ বলা হয়।
উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক (রহ.) বলতেন, ‘ওয়াক্ত হলো সেই ‘এখন’, যে মুহূর্তে তুমি আছ। দুনিয়ায় থাকলে তোমার ওয়াক্ত হলো দুনিয়া, আখিরাতে থাকলে আখিরাত। খুশিতে থাকলে ওয়াক্ত হলো খুশি, আর দুঃখে থাকলে দুঃখ।’
এর মানে হলো মানুষ সবসময় বর্তমান মুহূর্তেই বাঁচে। কিছু বুজুর্গ তাই বলেছেন, ‘ওয়াক্ত হলো সেই সময়, যা অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে।’
সুফিরা বলেন, ‘সুফি হলেন নিজের ওয়াক্তের সন্তান।’ মানে হলো, তিনি এই মুহূর্তে যে ইবাদতে আছেন, সেটাতেই পুরোপুরি ডুবে আছেন। আর বলা হয়, ফকির অতীতের জন্য আফসোস করেন না, ভবিষ্যতের চিন্তায়ও অস্থির হন না। কারণ, এই দুটোই বর্তমানের মূল্যবান মুহূর্ত নষ্ট করে।
কখনো কখনো ‘ওয়াক্ত’ বলতে সেই আধ্যাত্মিক অবস্থাকেও বোঝায়, যা সাধকের দিকে এসে তাঁকে ঘিরে ধরে। তখন বলা হয়, ‘অমুক ব্যক্তি তার ওয়াক্তের অনুসারী।’ মানে হলো, তিনি নিজের ইচ্ছায় চলেন না, আল্লাহ তায়ালা যেদিকে নিয়ে যান সেদিকেই যান। শরিয়তের পথ থেকে সরে যাওয়া তাঁর স্বভাব নয়, কারণ শরিয়ত ছেড়ে দেওয়া মানে দ্বীনের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
সুফিরা আরও বলেন, ‘ওয়াক্ত হলো তলোয়ারের মতো।’ আল্লাহ তায়ালা যা জারি করেন তা অবধারিতভাবে কার্যকর হয়। তলোয়ার যেমন সামনে যা পায় কেটে দেয়, ওয়াক্তও তেমনি সবকিছু কেটে এগিয়ে চলে। এই কথা বোঝাতে বলা হয়, ‘ওয়াক্ত তলোয়ারের মতো, সামনে যা পায় কেটে দেয়। গরম হলে আগুন বের হয়, ঠান্ডায়ও দুই দিক থেকে কাটে।’ যে ওয়াক্তকে কাজে লাগায়, ওয়াক্ত তার পক্ষে থাকে। আর যে উপেক্ষা করে, ওয়াক্ত তার বিপক্ষে চলে যায়।
উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক (রহ.) বলতেন—
وقت ریتی کی طرح ہوتا ہے جو تمہارے گھنے کا سبب تو بنتا ہے مگر فنا نہیں کرتا।
‘ওয়াক্ত বালির মতো। হাতে নিলে কিছুটা ঝরে যায়, কিন্তু সব শেষ করে দেয় না।’ তিনি এই কথার গভীরতা বোঝাতে একটি শের পড়তেন—
ہر جاری دن میرا کچھ حصہ لے جاتا ہے اور دل میں حسرت پیدا کر کے چلا جاتا ہے۔
‘প্রতিদিন আমার ভেতর থেকে কিছু নিয়ে যায়, আর বুকে একটা হাহাকার রেখে চলে যায়।’
তিনি আরও পড়তেন—
اہل دوزخ کی طرح جب ان کی کھالیں پک جائیں گی تو ان کی بدبختی کی بنا پر انہیں نئی کھالیں دے دی جائیں گی۔
‘জাহান্নামিদের চামড়া যখন পুড়ে যাবে, তাদের বদবখতির (মন্দ ভাগ্য) কারণে নতুন চামড়া দেওয়া হবে।’
এই শেরটিও একই কথা বলে—
جو شخص مر تو گیا لیکن پھرا سے راحت مل گئی تو وہ مردہ نہیں کہلائے گا، دراصل مردہ وہ کہلاتا ہے جو زندہ ہوتے ہوئے مردہ بن چکا ہو۔
‘যে মরে গেল সে শান্তি পেল। কিন্তু আসল মৃত সে, যে বেঁচে থেকেও দুনিয়ার মোহ থেকে মরে গেছে।’
সবশেষে বলা যায়, যিনি সত্যিকারের জ্ঞানী, তিনি বোঝেন যে ওয়াক্তের দাবি মেনে চলতে হলে শরিয়তের পথে অবিচল থাকতে হবে। আর যার অন্তরে আল্লাহর সত্যিকারের মহব্বত আছে, হাকিকতের বিধান তার ওপর এমনিই গালিব হয়ে যায়। অর্থাৎ, আল্লাহর প্রেম ও ইমানের সত্য তার অন্তর ও আচরণের ওপর এত শক্তিশালী প্রভাব ফেলে যে, নফস তথা খারাপ প্রবৃত্তি বা দুনিয়াবি টান দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সত্যের প্রভাব তার জীবনে প্রধান হয়ে যায়।[1]
ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর মতে, ওয়াক্ত এমন একটি অবস্থা, যা মানুষের ওপর সবকিছুর চেয়ে বেশি চেপে বসে। এটি ঠিক তলোয়ারের মতো, সামনে যা পায় কেটে দেয়।
যখন ওয়াক্ত আসে, মানুষের নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা আর কাজ করে না। সে তখন ওয়াক্তের অনুগত হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিটি মুহূর্ত সেই ওয়াক্তেই ডুবে যায়। ওয়াক্ত যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই যেতে হয়। নিজের আর কোনো এখতিয়ার থাকে না।
এ কারণেই বলা হয় অমুক ব্যক্তি ওয়াক্তের কাছে হার মেনে গেছে। মানে হলো, সে ওয়াক্তের দিকে ধাবিত হয়ে তার হুকুম মেনে নিয়েছে এবং সম্পূর্ণভাবে তার অধীন হয়ে গেছে।
আরবিতে এই অর্থেই বলা হয় —
فلان بحكم الوقت يعني مأخوذ عما منه بما لحق
অর্থাৎ, অমুক ব্যক্তি পুরোপুরি ওয়াক্তের হুকুমে চলে গেছে। যা তার কাছ থেকে নেওয়ার ছিল তা নেওয়া হয়েছে, আর যা তার সাথে যুক্ত হওয়ার ছিল তা যুক্ত হয়ে গেছে।[2]
মূল কথা: ‘ওয়াক্ত’ মানে শুধু সময় নয়;এটি সেই বিশেষ মুহূর্ত, যা সাধকের অন্তরে এসে থিতু হয়। সুফিরা বলেন, মানুষ আসলে বর্তমানেই বাঁচে। অতীতের আফসোস আর ভবিষ্যতের চিন্তা শুধু এই মুহূর্তকে নষ্ট করে। তাই সুফি হলেন নিজের ওয়াক্তের সন্তান। তিনি এই মুহূর্তে যে ইবাদতে আছেন, তাতেই পুরোপুরি ডুবে থাকেন। ওয়াক্ত তলোয়ারের মতো, যে কাজে লাগায় তার পক্ষে, যে উপেক্ষা করে তার বিপক্ষে। আর যার অন্তরে আল্লাহর সত্যিকারের মহব্বত আছে, হাকিকতের আলো তার ওপর এমনিই নেমে আসে।