শায়খুল আকবর হজরত মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি (রহ.)’র সাথে ওয়াহদাতুল ওজুদ তত্ত্ব এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তাঁর নাম নিলেই ওয়াহদাতুল ওজুদের কথা স্মরণ হয়, আবার ওয়াহদাতুল ওজুদের কথা এলেই মাথায় তাঁর নাম অঙ্কিত হয়ে যায়। যদিও বা তিনি কোথাও ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেনি। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারী এবং গবেষকরা তাঁর এই দর্শনের নাম দেন ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’। তাঁর এই দর্শন তাঁর বিভিন্ন লেখায় এসেছে। প্রসঙ্গত তাঁর একটি কবিতা এখানে উল্লেখ করা যায়।
انظر إلى الحقِّ من مدلول أسماء
وكونِه عينُ كُلّي عينُ أجزائي
হকের দিকে তাকাও তাঁর নামের অর্থ থেকে,
তিনি প্রতিটি সামগ্রিক সত্তার হাকিকত, প্রতিটি অংশের হাকিকত।
إن كان ينصفني من كان يعرف ما
يبدو إليه إعراضي وإنحائي
যে আমাকে চেনে সে ইনসাফ করবে, সে দেখবে
আমি কোথায় মুখ ফেরাই, কোন পথে ঝুঁকি।
أسماء ربي لا يُحصى لها عددٌ
ولا يُحاط بها كمثلِ أسمائي
আমার রবের নামের কোনো গণনা নেই,
তা আঁকড়ে ধরা যায় না, ঠিক আমার নামের মতো।
إن قلتُ قلتُ به أو قال قال بنا
تداخل الأمر كالمرئيّ والرائي
যদি বলি, তাঁর দ্বারাই বলি; যদি তিনি বলেন, আমাদের দ্বারাই বলেন,
বিষয়টা জড়িয়ে যায় যেমন দর্শক আর দৃশ্য।
العينُ واحدةٌ والحكمُ مُختلفٌ
فانظر به منك في تلويح إيمائي
সত্তা একটাই, বিধান ভিন্ন ভিন্ন,
তোমার ভেতর থেকেই দেখো, আমার ইশারার আভাসে।
النورُ ليس له لونٌ يميزه
وبالزجاجِ له الألوان كالماء
আলোর নিজের কোনো রং নেই যা তাকে আলাদা করে,
কিন্তু কাচের মধ্য দিয়ে সে রঙিন হয়, পানির মতো।
الماءُ ليس له شكلٌ يُقيده
إلا الوعاءُ في تقييده دائي
পানির নিজের কোনো আকার নেই যা তাকে বাঁধে,
কেবল পাত্রই তাকে আকার দেয়, এটাই আমার রোগ।
الداءُ داءٌ دفينٌ لا علاجَ له
كيف العلاجُ ودائي عينُ أدوائي
রোগটা লুকানো, কোনো চিকিৎসা নেই,
চিকিৎসা কীভাবে হবে যখন আমার রোগই আমার ওষুধ?
أرومُ بُرْءاً لداءٍ لا يزايلني
هيهاتِ كيفَ يُدَاوى الداءُ بالداء
আমি এমন এক ব্যথার আরোগ্য চাই, যা ছাড়ে না
আহা, রোগ দিয়ে কি রোগের চিকিৎসা হয়?
أقولُ باللامِ لا بالباء إنَّ لنا
شخصاً ينازعني في القولِ بالباء
আমি বলি ‘লাম’ যোগে, ‘বা’ যোগে নয়;
নিশ্চয়ই আমার মাঝে এমন এক সত্তা আছে,
যে ‘বা’ যোগে বলার বিষয়ে আমার সাথে বিবাদ করে।
ওয়াহদাতুল ওজুদের মূল বক্তব্য:
শায়খুল আকবর মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবির মতে সমগ্র অস্তিত্ব একটি একক হাকিকত; এতে দ্বৈততা বা বহুত্ব নেই। এই অস্তিত্বগত হাকিকতের দুটি দিক আছে। হকের দিক ও খলকের দিক। এটি একই সাথে এক ও বহু, পুরাতন ও নতুন, প্রকাশ্য ও গোপন, প্রথম ও শেষ।
হক ও খলকের মধ্যে পার্থক্য হলো একটি যৌক্তিক পার্থক্য, যা বুদ্ধি বলে, সুফি অভিজ্ঞতা নয়। যেমন কোনো পদার্থ ও তার গুণাবলির মধ্যে পার্থক্য। বাস্তবে এরা একটাই হাকিকত। ইবনে আরাবির মতে আল্লাহই অস্তিত্বের প্রথম উৎস। সুতরাং, যার অস্তিত্ব আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া, সে মূল বিচারে অস্তিত্বহীন।
ইবনে আরাবি রংধনুর উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝান। ফুতুহাতে মাক্কিয়্যায় তিনি বলেন—
وجود الحق ما هو بالمرور فيتصف بالتناهي وعدم التناهي، فإنه عين الوجود، والموجود هو الذي يوصف بالمرور عليه… ولا يعلم ما هي المحدثات إلا من يعلم ما هو قوس قزح، واختلاف ألوانه كاختلاف صور المحدثات. ثم أنت تعلم أنه ما ثم متلون ولا لون، مع شهودك ذلك. كذلك شهودك صور المحدثات في وجود الحق الذي هو الوجود
হকের অস্তিত্ব এমন নয় যে তা অতিক্রম করে, ফলে সসীম বা অসীম বলে বর্ণিত হয়; মূলত তিনিই অস্তিত্বের হাকিকত… রংধনু কী, তা না জানলে সৃষ্টিজগত কী তাও জানা যাবে না। তুমি জানো সেখানে কোনো রঙিন বস্তু নেই, কোনো রংও নেই, অথচ তুমি তা দেখছো। হকের অস্তিত্বে সৃষ্টির রূপ দেখাও ঠিক তেমনি।
তিনি আরও বলেন—
أمّا وجود الخلق فمجرّد ظل لصاحب الظل وصورة المرآة بالنسبة لصاحب المرآة فالخلق شبح
সৃষ্টির অস্তিত্ব নিছক ছায়ার মালিকের ছায়া এবং আয়নার মালিকের কাছে আয়নার প্রতিবিম্ব; সৃষ্টি একটি ছায়া মাত্র। যেমন বলা হয়েছে—
فما نظرت عيني إلى غير وجهه ولا سمعت أذني خلاف كلامه
আমার চোখ তাঁর সত্তা ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি, আমার কান তাঁর কথা ছাড়া অন্য কিছু শোনেনি।
ফুতুহাতে মাক্কিয়্যাহ’র ৬ষ্ঠ খণ্ডে এর বিশদ ব্যাখ্যা এসেছে এভাবে—
“প্রতিটি জিনিসের সত্তা বা হাকিকত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ اِلَّا وَجْهَهٗ ۗ لَهُ الْحُكْمُ وَاِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ – আল্লাহর সত্তা (ওয়াজহ) ব্যতীত প্রতিটি জিনিসই নশ্বর। বিধান কেবল তাঁরই এবং তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। (সুরা আল-কাসাস: ৮৮)
এর সহজ অর্থ হলো, তোমাদের এই ফিরে আসা মূলত তোমাদের ভেতরের ‘দ্বৈততা’ (অগিয়ার) কাটিয়ে কেবল আমার দিকেই ফিরে আসা। তখন অস্তিত্বের জগতে আমি ছাড়া আর কারো কোনো শাসন বা কর্তৃত্ব থাকবে না। বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য আমরা ‘ইনসান’ তথা মানুষ সত্তার উদাহরণ দিতে পারি। একজন মানুষ বলতে তার জীবন, তার অনুভূতি (হিস), তার কাজ করার শক্তি (কুওয়াত) এবং হাত-পায়ের বিভিন্ন নড়াচড়ার একটি সমষ্টিকে বোঝায়। এই নামটির সাথে যা কিছু জড়িত, তার সবটুকুই মানুষ। শরীরের এই আলাদা আলাদা অঙ্গগুলো কেবল অন্য কোনো উদ্দেশ্যে প্রকাশ পায়নি; বরং এগুলো মানুষের সত্তার সাথেই জড়িত। ঠিক একইভাবে মহাবিশ্বের প্রতিটি রূপ বা আকৃতি মূলত পরম সত্য বা ‘হক’-এর বিধানের দিকেই ফিরে যায়। আল্লাহ নিজেই প্রতিটি জিনিসের আসল সত্তা বা ‘আইন’, তাই চূড়ান্ত বিচারে হুকুম কেবল তাঁরই।
তিনিই প্রতিটি বিষয়ের প্রকৃত বিচারক এবং প্রতিটি জিনিসের ওপর তাঁর এই শাসন হলো একটি ‘সত্তাগত বিধান’ (হুকমান জাতিয়ান)। আল্লাহ নিজেকে বিভিন্ন নামে (আসমা) নামাঙ্কিত করেছেন এবং সেই নামগুলো দিয়েই তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন। এই ঐশ্বরিক বিধানগুলো সৃষ্টির প্রতিটি অণুর মাঝে পার্থক্য তৈরি করে দেয়। এটি অনেকটা মানুষের শরীর ও রুহকে আলাদা করার মতো; যদিও এই দুইয়ের মিলনেই একজন পূর্ণাঙ্গ ‘মানুষ’ তৈরি হয়। যেভাবে মানুষের হাতের কথা বললে কেউ শুধু হাতকেই মানুষ বলে না, বরং হাতটি মানুষের একটি অঙ্গ হিসেবে পরিচিত হয়; তেমনি জগতের প্রতিটি সৃষ্টিও পরম সত্যের বা ‘হক’-এর একেকটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পুরো অস্তিত্বই আসলে ‘হক’ বা সত্য, কিন্তু আমরা মাঝেমধ্যে একে ‘মাখলুক’ বা সৃষ্ট বস্তু হিসেবে বর্ণনা করি। আসলে প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর আদেশের অধীন। তাই আল্লাহ সম্পর্কে বলা হয় إِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ – নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (সুরা আলে-ইমরান: ৯৭)
সৃষ্টির প্রতিটি কণা তার অস্তিত্বের জন্য আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আমরা জগতের সবকিছুর ওপর বিনাশ বা ধ্বংসের বিধান জারি করেছি, কিন্তু কেবল আল্লাহর সত্তাকেই এই বিনাশ থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাঁর আপন সত্তার (আইন হুব্বিয়্যাত) মাধ্যমেই সবকিছুর ওপর হুকুমদাতা। তিনি নিজের সত্তাকে ‘নাফাস’ বা নিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং নিজেকে ‘আর-রহমান’ (পরম করুণাময়) নামের সাথে যুক্ত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদের জানাতে চেয়েছেন যে, এই মহাবিশ্বে তাঁর দয়া ও করুণা সবকিছুর ওপর ছেয়ে আছে। প্রতিটি মানুষের ও সৃষ্টির শেষ গন্তব্য কেবল তাঁরই দিকে। ‘আর-রহমান’ থেকে কেবল রহমতপ্রাপ্ত আত্মাই প্রকাশিত হয়।
এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করো; ‘নাফাস’ বা আধ্যাত্মিক নিশ্বাস হলো প্রথম সেই গোপন বিষয় যা তাঁর নিজের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। এটি হলো আল্লাহর সেই ‘আর-রহমান’ নামের প্রভাবের মতো, যা আজ আরশের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি সৃষ্টির প্রথম সেই স্বচ্ছ ও নুরানি পর্দা (হিজাব), যা অন্য সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এই নুরানি নিশ্বাস না থাকলে মহাবিশ্বের এই ‘শূন্যস্থান’ (খালা) থাকত না। অতঃপর তিনি এই অস্পষ্টতা বা আচ্ছন্নতার (অমা) মাঝে জগতের যাবতীয় রূপ তৈরি করেছেন। যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ – আল্লাহর সত্তা ব্যতীত প্রতিটি জিনিসই নশ্বর। (সুরা আল-কাসাস: ৮৮)
এর মানে হলো, প্রতিটি বস্তু তার বাইরের আকৃতির দিক থেকে ধ্বংসশীল হলেও তার হাকিকত বা আসল সত্তার দিক থেকে সে অবিনশ্বর। জগতের প্রতিটি রূপ বাহ্যিকভাবে বিলীন হলেও আল্লাহর জ্ঞানে তার আসল পরিচয় বা ‘তথ্য’ কখনো মুছে যায় না। যেমন মানুষের শরীর যদি ধ্বংসও হয়ে যায়, তবুও ‘মানুষ’ হিসেবে তার যে হাকিকত বা বৈশিষ্ট্য, তা আল্লাহর জ্ঞানে সবসময় স্থির থাকে। মানুষের হাকিকত হলো যে, সে একটি ‘বাকশক্তি সম্পন্ন প্রাণী’ (হাইওয়ানুন নাতিক)। তার দেহ থাকুক বা না থাকুক, আল্লাহর জ্ঞানে তার এই তথ্যটি (মালুম) সবসময় বিদ্যমান থাকে।
সৃষ্টিজগতের এই রূপগুলো সামগ্রিকভাবে একটি বিশাল গোলকের মতো। সেখান থেকেই বর্গাকার বা ত্রিভুজাকারের মতো বিভিন্ন জ্যামিতিক রূপ বা আকৃতি তৈরি হয়। অস্তিত্বের এই বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই। আরশের চারপাশ পরিবেষ্টনকারী ফেরেশতারা যখন তাসবিহ পাঠ করেন, তখন তাদের সেই বিচরণ বা সন্তরণ আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মাঝেই থাকে। এমনকি আরশের স্তম্ভগুলো যারা বহন করছেন, সেই ফেরেশতারাও মূলত পরম সত্যের গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থ ও রূপেরই বাহক।
বস্তুসমূহের অবয়ব বা আকৃতি হলো অক্ষরের মতো যা মূল অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে এর অর্থ কেবল তখনই বোঝা সম্ভব যখন এর বাহ্যিক রূপটি দৃশ্যমান হয়। অক্ষর নিজে কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না যতক্ষণ না তা কোনো শব্দের রূপ নেয়। একইভাবে এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে একক সত্তা (আল-ওয়াহিদ) ছাড়া আর কিছুই নেই। এই স্তরেই শক্তিশালী ফেরেশতাকুল (আল-মালাইকা আল-মুহাইমিনা), বুদ্ধি (আকল), আত্মা (নাফস) এবং প্রকৃতির (তবিআত) বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রকৃতি মূলত পরম সত্যের (হক) সাথেই সম্পর্কিত। ‘নাফাস’ বা আধ্যাত্মিক নিশ্বাস যা সারা বিশ্বে বহমান, তার মাধ্যমেই প্রতিটি ছবির মাঝে সত্যের জ্যোতি বা ‘তাজাল্লি’ প্রকাশিত হয়।”[1]
ফুতুহাতে মাক্কিয়্যাহতে বিষয়টি এভাবে নানান জায়গায় নানান উপমায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, সুফিদের বিরাট অংশ এই মতেরই সমর্থক। আবার অনেকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টাও করেছেন। মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.) এই মতের পরিপূরক হিসেবে ‘ওয়াহদাতুশ শুহুদ’ দর্শন হাজির করেছেন।
ওয়াহদাতুল ওজুদ নিয়ে আলেমদের মতপার্থক্য ও বিশদ ব্যাখ্যা:
শাজিলি তরিকার অন্যতম রাহবার, সিরিয়ার প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার, মুহাদ্দিস এবং আধ্যাত্মিক শায়খ আব্দুল কাদির ইসা (রহ.) এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তার লেখা বিখ্যাত ‘হাকায়িকু আনিত তাসাউফ’ গ্রন্থে। তিনি বলেন, “ওয়াহদাতুল ওজুদের দাবিদার আরেফ ও মুহাক্কিকদের অবস্থান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ দ্রুত তাদের কুফর ও গোমরাহির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং তাদের কথাকে শরিয়তবিরোধী অর্থে বুঝে নেন। আর কেউ কেউ তাদের উপর আক্রমণ না করে বিষয়টি মূল উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে দেন। কারণ, এই আরেফরা এই বিষয়ের বিস্তারিত গবেষণামূলক আলোচনা করেননি। তারা শুধু নিজেদের জন্য এবং তাদের শিষ্যদের জন্যই কথা বলেছেন, যারা নিজেরাই এই একত্বের সাক্ষী হয়েছেন, অন্যদের জন্য নয়। তাই আহলুত তাসলিম তথা জ্ঞানী আলেমদের মনকে প্রশান্ত করার জন্য বিষয়টি স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।
যে-সব আলেম এই বিষয়ের গভীরে পৌঁছেছেন এবং এর সঠিক অর্থ বুঝেছেন, তাদের মধ্যে সাইয়্যেদ মুস্তফা কামাল শরিফ অন্যতম। তিনি বলেন—
الوجود واحد، وهو صفة ذاتية للحق سبحانه وتعالى، والموجود هو الممكن، وهو العالَمُ فصح تعدده باعتبار حقائقه. وقيامُه إنما هو بذلك الوجود الواجب لذاته، فإذا زال الوجود كما هو، فالموجود غير الوجود، فلا يصح أن يقال الوجود اثنان: وجود قديم ووجود حادث، إلا أن يراد بالوجود الثاني الموجود من إطلاق المصدر على المفعول
অস্তিত্ব একটাই, এবং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিজস্ব গুণ। আর যা কিছু ‘আছে’ বলে গণ্য হয়, তা হলো মুমকিন (সম্ভাব্য সত্তা), অর্থাৎ এই বিশ্বজগৎ। এর বহুত্ব ও বৈচিত্র্য তার নিজ নিজ বাস্তবতার বিচারে সত্য। তবে এই জগতের টিকে থাকা নির্ভর করে সেই ওয়াজিবুল ওজুদের (যাঁর অস্তিত্ব অপরিহার্য) অস্তিত্বের উপর। এখন যদি সেই অস্তিত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যা থাকে সেটা ‘অস্তিত্ব’ নয়; বরং ‘বিদ্যমান বস্তু’। আর এই দুটো এক জিনিস নয়।
তাই এটা বলা ঠিক নয় যে, অস্তিত্ব দুই প্রকার। একটা পুরাতন/অনাদি আর একটা নতুন/হাদেস। যদি না দ্বিতীয় ‘অস্তিত্ব’ বলতে আসলে ‘বিদ্যমান বস্তু’ বোঝানো হয়। এটা আরবি ব্যাকরণের একটা বিশেষ প্রয়োগ, যেখানে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য দিয়ে কর্মবাচককে বোঝানো হয়।
মূল কথা অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহরই; জগৎ ‘আছে’ ঠিকই, কিন্তু তার থাকাটা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন—
الجسنُ لا يرى أي الموجود، والروحُ لا تشهد إلا الوجود، وإذا شهدت الموجود فلا تشهده إلا الوجود
অর্থাৎ, ইন্দ্রিয় শুধু অস্তিত্বকেই দেখে, অন্য কিছু নয়। আর রুহ শুধু অস্তিত্বকেই সাক্ষ্য দেয়। আর যখন তুমি সৃষ্টিকে প্রত্যক্ষ করো, তখনও শুধু অস্তিত্বকেই দেখো।
আর যে কেউ এই কথা বলে ما رأيت شيئاً إلا ورأيت الله قبله – আমি কিছু দেখিনি, তার আগে শুধু আল্লাহকে দেখেছি। সে এই দর্শন দিয়ে চোখের দর্শন নয়; অন্তরের দর্শন বোঝাতে চেয়েছে। কারণ, চোখের দর্শনের বৈশিষ্ট্য আলাদা আর অন্তরের দর্শনের বৈশিষ্ট্য আলাদা। তাই বলা হয়েছে أشهد أن لا إله إلا الله، ولم يرد أن يقال: أرى – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ‘আমি দেখছি’ বলা ঠিক নয়। (রিসালাতু ওয়াহদাতিল ওজুদ লিল আল্লামাহ মুস্তফা কামাল শরিফ, পৃ. ২৭-২৮।)
এভাবেই ন্যায়পরায়ণ আলেমরা শরিয়তের সাথে থাকেন, বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করেন, কোনো মুমিনকে দ্রুত কাফের বলেন না এবং প্রতিটি বিষয়কে তার বিশেষজ্ঞদের কাছে ফিরিয়ে দেন।
যেহেতু ওয়াহদাতুল ওজুদের মাসয়ালা অনেক আলেমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং অনেকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তাই আমরা শরিয়তের খেদমতে এবং সবার বোঝার সুবিধার্থে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে চাই। আমরা বলি, অস্তিত্ব দুই প্রকার। একটি হলো প্রাচীন ও অনাদি অস্তিত্ব, এটি ওয়াজিব ও হক। তিনি হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ
অর্থাৎ, এটি এজন্য যে, আল্লাহই হলেন সত্য। (সুরা হজ্জ: ২২)
আর দ্বিতীয় হলো সম্ভাব্য ও আকস্মিক অস্তিত্ব, এটি তাঁর ছাড়া অন্য সব সৃষ্টির অস্তিত্ব। আর ওয়াহদাতুল ওজুদের কথা হচ্ছে ‘অস্তিত্ব একটিই’। এর দুটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ সঠিক, আরেকটি অর্থ কুফর। তাই ওয়াহদাতুল ওজুদের দাবিদাররা দুই দলে বিভক্ত।
১ম দল: তারা বলেন এর অর্থ হলো হক ও সৃষ্টির মিলন এবং এই অস্তিত্বে হক ছাড়া আর কিছু নেই। তিনিই সব, তিনিই সবকিছুর সমষ্টি, তিনিই প্রতিটি বস্তুর হুবহু সত্তা এবং প্রতিটি বস্তু তাঁর দিকেই ইঙ্গিত করে। এই কথা হলো কুফর, জিন্দিকি এবং ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মূর্তিপূজকদের বাতিল মতবাদ থেকেও বড়ো গোমরাহি ও নাস্তিকতা।
বড়ো সুফিরা এই মতের প্রবক্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তাকে কাফের বলেছেন এবং মানুষকে তার সঙ্গ দেওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহর আরেফ আবু বকর মুহাম্মদ বানানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন—
فاحذر يا أخي كلَّ الحذر من الجلوس مع من يقول: ما ثَمَّ إلا الله، ويسترسل مع الهوى، فإن ذلك هو الزندقة المحضة، إذ صح قدمه في الشريعة، ورسخ في الحقيقة، وتَقَوَّى بقوله: ما ثَمَّ إلا الله، لـم يكـن قصدهُ من هـذه العبارة إسقـاطَ الشـرائعِ وإهمـال التكاليف، حاش لله أن يكون هذا قصده
অর্থাৎ, হে আমার ভাই, যে ব্যক্তি বলে ‘আল্লাহ ছাড়া কিছু নেই’ এবং নিজের প্রবৃত্তির সাথে আপোষ করে, তার সাথে বসা থেকে সম্পূর্ণ সতর্ক থাকো। কারণ, এটি হলো বিশুদ্ধ জিন্দিকি। তবে যখন কোনো মুহাক্কিক আরেফ শরিয়তে পোক্ত হন, হাকিকতে গভীরভাবে প্রোথিত হন, এবং ‘আল্লাহ ছাড়া কিছু নেই’ বলে শক্তিশালী হন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য এই ইবারত দিয়ে শরিয়ত বাতিল করা এবং তাকলিফ উপেক্ষা করা নয়। আল্লাহ না করুন, তাঁর উদ্দেশ্য কখনো তা নয়। (মাদারিজুস সুলুক ইলা মালিকিল মুলুক লিল আরিফিল কবির মুহাম্মদ বানানি আল মুতাওয়াফফা ১২৮৪ হিজরি।)
২য় দল: তারা বলেন যা উল্লেখ করা হয়েছে তা বাতিল ও কুফর। বরং তারা ওয়াহদাতুল ওজুদ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, অস্তিত্ব একটিই, আর তা হলো প্রাচীন ও অনাদি হকের অস্তিত্ব। এটি সন্দেহ ও বহুত্ব থেকে মুক্ত। আর তারা সৃষ্টির আকস্মিক অস্তিত্বকে বোঝাননি। কারণ, সৃষ্টির অস্তিত্ব মূলত একটি কাল্পনিক ও মাজাজি অস্তিত্ব, এবং তার মূল হলো অনস্তিত্ব। যা না উপকার করে, না ক্ষতি করে। সৃষ্টি প্রতি মুহূর্তে ধ্বংসের দিকে ধাবিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
অর্থাৎ, তাঁর সত্তা ছাড়া প্রতিটি বস্তুই ধ্বংসশীল। (সুরা কাসাস: ৮৮)
সৃষ্টি নিজে নিজে টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে না, নিজের দিক থেকে সে শূন্য। কেবল আল্লাহর ‘কাইয়্যুমিয়্যাত’ অর্থাৎ তাঁর সবকিছু ধরে রাখার গুণ সৃষ্টিকে টিকিয়ে রেখেছে।
এই দলের লোকেরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত।
১ম ভাগ: যারা এই বোঝাপড়াটি বিশ্বাস ও প্রমাণের মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন, তারপর যওক ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। তখন তাওহিদের সমুদ্রে ডুবে যান, নিজের থেকে ফানা হয়ে যান এবং অন্যের সাক্ষ্য থেকেও ফানা হয়ে যান। এটি আল্লাহর শরিয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটিই সত্য কথা।
২য় ভাগ: যারা মনে করেন এটি শুধু মৌখিক বিদ্যা। তারা এর ইবারত পাঠে মত্ত হন, এর ইশারাগুলোর বাহ্যিক অর্থ ধরে রাখেন, কিন্তু তাদের সাক্ষ্যদান থেকে হকের সাক্ষ্য দূরে সরে যায়।
ফলে শরিয়ত তাদের চোখে তুচ্ছ মনে হয় এবং তারা শরিয়তের বাহ্যিক দিক নিয়ে কথা বলেন। আর বাস্তবতা হলো এটি আহলুল গাফলাহ তথা গাফেলদের জন্য, আহলুল ইরফানের জন্য নয়। এবং আমার জীবনের কসম, এটি হলো মিথ্যা ও প্রতারণার হুবহু চেহারা।
আর এই যুগে সুফিদের জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো এমন সব শব্দ ও ইবারত থেকে দূরে থাকা, যাতে বিভ্রান্তি বা সন্দেহ রয়েছে, যাতে মানুষ সে সম্পর্কে খারাপ ধারণা না করে, অথবা তার কথাকে তার উদ্দেশ্যের বিপরীত অর্থে না বোঝে। কারণ, অনেক জিন্দিক ও সুফিদের উপর মিথ্যারোপকারী এই ধরনের দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ও বিভ্রান্তিকর ইবারত ব্যবহার করে, যাতে তারা মানুষের মনে ফাসেদ আকিদা ঢুকিয়ে দিতে পারে, হারামকে বৈধ করতে পারে এবং নোংরা ও অশ্লীলতায় পৌঁছাতে পারে। এতে হক বাতিলের সাথে মিশে যায় এবং সত্যিকারের মুমিন ফাসেক বিপথগামীর অপরাধের শিকার হয়।
তাই সুফিদের উচিত হলো নিজেদের ভেতরে ও বাহিরে শরিয়তকে আঁকড়ে ধরা এবং তাদের শিষ্যদের কথায় ও কাজে সর্বদা শরিয়ত মেনে চলার উপদেশ দেওয়া। যে ব্যক্তি শরিয়তকে আঁকড়ে ধরবে সে মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে, আর যে তা থেকে বিচ্যুত হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের দলে পড়বে।
সুফিদের বিখ্যাত আলেমদের কথায় যেখানে অস্পষ্টতা বা সন্দেহ আছে তা দুটি কারণে।
১. কারণ তারা পারিভাষিক শব্দ, রমজ ও ইশারা ব্যবহার করেছেন যা অন্যরা বুঝতে পারে না, এবং এ বিষয়ে আমরা তাবিলের আলোচনায় ইশারা করেছি।
২. কারণ তারা গলবা ও শতাহাতের অবস্থায় এই কথা বলেছেন এবং তাদের মর্যাদায় যারা পৌঁছাননি তাদের জন্য মানুষের সামনে এই ধরনের কথা নকল করা ও এতে গর্ব করা বৈধ নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বিখ্যাত আলেমদের থেকে এই উদ্ধৃতিগুলো এবং সুফিদের সম্পর্কে তাদের মতামত নিজেরাই পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় যে, সুফিরা হুলুল ও ইত্তিহাদের কথা এবং ওয়াহদাতুল ওজুদের যে অর্থ তাদের দিকে আরোপ করা হয়, তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এবং তাদের কথা শরিয়তসম্মত একটি সঠিক অর্থ বহন করে। তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সঠিক আকিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা এই ইরফানি মাজহাবগুলোতে কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরেছেন। এবং তারা সত্যিকার অর্থেই সালেহ সালাফের মানুষ। রাদিআল্লাহু আনহুম। যারা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়েতকে আঁকড়ে ধরেছেন এবং পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করেছেন, তারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন এবং উভয় জগতের সৌভাগ্য লাভ করেছেন।
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا
অর্থাৎ, আর যে আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করে, তারা সে-সব মানুষের সাথে থাকবে, যাদের উপর আল্লাহ নিয়ামত দিয়েছেন। তারা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও সালেহিনগণ। আর এরা কতই না উত্তম সঙ্গী। (সুরা নিসা: ৬৯)[2]