সুফি সাধনার পথে দুটি গভীর অবস্থার নাম তাল্ওয়িন ও তামকিন। তাল্ওয়িন মানে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনশীলতা। সাধক যখন এক হাল থেকে অন্য হালে, এক গুণ থেকে অন্য গুণে অবিরাম স্থানান্তরিত হন। আর তামকিন মানে স্থিরতা। সাধক যখন গন্তব্যে পৌঁছে যান এবং পরম সত্যের সাথে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। হজরত মুসার চেহারা আবৃত করার প্রয়োজন আর নবীজির মিরাজ থেকে অপরিবর্তিত ফিরে আসা— এই দুটি ঘটনাই তাল্ওয়িন ও তামকিনের জীবন্ত উদাহরণ। ইমাম কুশাইরি, ইমাম সোহরাওয়ার্দি এবং ইবনে আরাবি (রহ.) এই দুটি অবস্থার গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি বলেছেন, তাল্ওয়িন হাল-অধিকারীদের বৈশিষ্ট্য, আর তামকিন হাকিকত-অধিকারীদের। মুসার চেহারা আবৃত করার প্রয়োজন আর নবীজির অপরিবর্তিত ফিরে আসা দিয়ে তিনি এই পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি দুটি মতই তুলে ধরেছেন— তামকিন স্থায়ী হতে পারে কি না তা নিয়ে সুফিদের মতভেদ আছে। তবে সবচেয়ে উত্তম মত হলো, বান্দা মূল হালে সুপ্রতিষ্ঠিত থেকেও প্রতিনিয়ত উচ্চতর স্তরে আরোহণ করতে পারেন।
তিনি বলেন, তাল্ওয়িন হলো আধ্যাত্মিক হাল তথা অবস্থার মালিকদের বৈশিষ্ট্য, আর তামকিন হলো হাকিকত তথা পরম সত্যের অধিকারীদের বৈশিষ্ট্য।
বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত আধ্যাত্মিক পথের পথিক থাকে, ততক্ষণ সে তাল্ওয়িনের অধিকারী হয়; কেননা সে এক হাল থেকে অন্য হালে উন্নীত হয়, এক গুণ থেকে অন্য গুণে স্থানান্তরিত হয়, এক মঞ্জিল থেকে বের হয়ে অন্য মঞ্জিলে উপনীত হয়। অতঃপর যখন সে গন্তব্যে পৌঁছে যায়, তখন সে তামকিন তথা স্থিরতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে আরিফগণ কবিতা আবৃত্তি করেছেন—
مَا زِلْتُ أُنْزَلُ فِي وِدَادِكَ مَنْزِلاً تَتَحَيَّرُ الأَلْبَابُ دُونَ نُزُولِهِ
আপনার ভালোবাসায় আমি অবিরত এমন এক মঞ্জিলে অবতীর্ণ হচ্ছি, যার সমক্ষে মানুষের বুদ্ধি-বিবেক থমকে দাঁড়ায়।[1]
তাল্ওয়িনের অধিকারী ব্যক্তি সর্বদা আধ্যাত্মিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে থাকে, আর তামকিনের অধিকারী ব্যক্তি প্রথমে গন্তব্যে পৌঁছে, অতঃপর পরম সত্তার সাথে সম্পর্কিত হয়।
এর অর্থ হলো, তিনি পরম সত্যের হালের সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন; তার অন্তরের ওপর নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা এমনভাবে প্রবল হয়েছে যে, তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনোকিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না।[2]
আর তিনি যে পরম সত্তার সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন তার লক্ষণ হলো, তিনি সম্পূর্ণরূপে নিজের অস্তিত্ব ও আমিত্ব থেকে বিলীন হয়ে গেছেন।
‘ইহকামুদ দালালাহ’ কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী এর অর্থ হলো, পরম সত্যের আধিপত্য ও প্রভাবের কারণে তার নফস নিস্তেজ হয়ে পড়েছে এবং অন্য কিছু অন্বেষণ করা থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
সুফি মাশায়েখগণ বলেছেন—
انتَهَى سَفَرُ الطَّالِبِينَ إِلَى الظَّفَرِ بِنُفُوسِهِمْ ، فَإِذَا ظَفِرُوا بِنُفُوسِهِمْ . . فَقَدْ وَصَلُوا
আধ্যাত্মিক জ্ঞান অন্বেষণকারীদের সফরের সমাপ্তি ঘটে তাদের নিজেদের নফসের ওপর বিজয় লাভের মাধ্যমে। অতএব, যখন তারা নিজেদের নফসের ওপর বিজয় লাভ করে, তখন তারা মূলত গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
নফসের ওপর বিজয় লাভ করার অর্থ হলো, নফসকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তার মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে অবগত হওয়া। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর মহত্ব, জালাল তথা মহিমা এবং তাদের ওপর আল্লাহর যে হক রয়েছে তা জানতে পেরেছেন।[3]
উস্তাদ ইমাম আবু আলি দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন—
يُرِيدُ بِهِ : انْخِنَاسَ أَحْكامِ البَشَرِيَّةِ ، وَاسْتِيلاءَ سُلْطَانِ الحَقِيقَةِ ، فَإِذَا دَامَ لِلْعَبْدِ هَذِهِ الحَالَةُ. فَهُوَ صَاحِبُ تَمْكِينٍ
এর দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন— মানবিক দুর্বলতা বা স্বভাবজাত গুণাবলির প্রভাব দূর হয়ে যাওয়া এবং পরম সত্যের রাজত্বের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বান্দার জন্য যখন এই অবস্থাটি স্থায়ী রূপ নেয়, তখনই সে তামকিনের অধিকারী হয়।
শায়খ আবু আলি আদ-দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলতেন—
كانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلامُ صَاحِبَ تَلْوِينٍ , فَرَجَعَ مِنْ سَمَاعِ الكَلامِ وَاحْتَاجَ إِلَى سَتْرِ وَجْهِهِ ; لِأَنَّهُ أُثِّرَ
হজরত মুসা আলাইহিস সালাম তাল্ওয়িনের অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি যখন আল্লাহর কালাম শ্রবণ করে ফিরে এলেন, তখন তার চেহারা মোবারক আবৃত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল; কারণ তার ওপর সেই নুরের হালের প্রভাব পড়েছিল।[4]
আর আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তামকিনের অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি যেভাবে গিয়েছিলেন, সেভাবেই ফিরে এসেছিলেন; কারণ সেই রাতে তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তাঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।
এ বিষয়ে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনি দ্বারা দলিল পেশ করা হতো; যে নারীরা হঠাৎ হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে প্রত্যক্ষ করেছিল, তাঁর দর্শনের আকস্মিক হালের কারণে তারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল। অথচ আজিজের স্ত্রী ইউসুফ-এর পরীক্ষায় তাদের চেয়ে অনেক বেশি পূর্ণতা লাভ করা সত্ত্বেও সেদিন তাঁর একটি পশমও পরিবর্তিত তথা আলোড়িত হয়নি; কারণ, ইউসুফ-এর বিষয়ে তিনি তামকিন তথা স্থিরতার অধিকারী ছিলেন।
উস্তাদ ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “জেনে রাখো, বান্দার মধ্যে পরিবর্তন তথা তাল্ওয়িন দুটি কারণে আসে। হয়তো আকস্মিক আধ্যাত্মিক অনুভূতির তথা ওয়ারিদের প্রবলতার কারণে, অথবা তা গ্রহণকারীর দুর্বলতার কারণে। আর বান্দার মাঝে স্থিরতা তথা সুকুন দুটি কারণে আসে। হয়তো তার নিজস্ব শক্তির কারণে, অথবা আকস্মিক আধ্যাত্মিক অনুভূতির দুর্বলতার কারণে।”
উস্তাদ আবু আলি-কে আরো বলতে শুনেছি, তামকিন স্থায়ী হওয়া জায়েজ কি না, সে বিষয়ে সুফিদের মূলনীতি দুই ধারায় বিন্যস্ত হয়।
প্রথমত: এর কোনো সুযোগ নেই; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
لَوْ بَقِيتُمْ عَلَى مَا كُنْتُمْ عَلَيْهِ عِنْدِي . . لَصَافَحَتْكُمُ المَلَائِكَةُ
তোমরা আমার কাছে যে অবস্থায় থাকো, যদি সর্বদা সেই অবস্থাতেই বহাল থাকতে, তবে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত।[5]
এবং যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
لِي وَقْتٌ لَا يَسَعُنِي فِيهِ غَيْرُ رَبِّ عَزَّ وَجَلَّ
আল্লাহর সাথে আমার এমন একটি বিশেষ ওয়াক্ত আসে, যখন আমার রব আজ্জা ওয়া জাল্লা ছাড়া আর কারও কোনো স্থান থাকে না।
এখানে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ দিয়েছেন। ইমাম তিরমিজি ‘আশ-শামাইল’ কিতাবের ৩৪২ নম্বরে আমাদের সাইয়িদিনা আলি কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু-এর হাদিস থেকে এর সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নিজ ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন তাঁর সময়কে তিন ভাগে ভাগ করতেন। এক ভাগ আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য, এক ভাগ পরিবারের জন্য এবং এক ভাগ নিজের জন্য।
দ্বিতীয়টি হলো: হালের স্থায়িত্ব হওয়া সহিহ বা সম্ভব; কারণ হাকিকতের অধিকারীগণ আকস্মিক আধ্যাত্মিক ঘটনার তথা তাওয়ারিকের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছেন। আর হাদিসে যে এসেছে, لَصَافَحَتْكُمُ المَلَائِكَةُ – ফেরেশতারা তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত।
এখানে তিনি বিষয়টিকে কোনো অসম্ভব বিষয়ের ওপর ঝুলিয়ে রাখেননি। আর ফেরেশতাদের মুসাফাহা করা তো সেই মর্যাদার চেয়ে অনেক নিচের বিষয়, যা প্রারম্ভিক স্তরের হাকিকতের অধিকারীদের জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বাণী থেকে প্রমাণিত। إِنَّ المَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا لِطَالِبِ العِلْمِ رِضاً بِمَا يَصْنَعُ
নিশ্চয় ফেরেশতারা দ্বীনি জ্ঞান অন্বেষণকারীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের ডানা বিছিয়ে দেয়।[6]
আর তিনি যে বলেছিলেন, لِي وَقْتٌ – আমার একটি বিশেষ ওয়াক্ত আসে। তা মূলত শ্রোতার বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী বলেছিলেন। অথচ তিনি তাঁর সমস্ত হালে তথা অবস্থাতেই হাকিকত তথা পরম সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
সবচেয়ে উত্তম হলো এটি বলা যে, বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত তারাক্কি তথা আধ্যাত্মিক উন্নতির মধ্যে থাকে, ততক্ষণ সে তাল্ওয়িনের অধিকারী হয়; যার গুণাগুণ বর্ণনায় আধ্যাত্মিক হালের বৃদ্ধি কিংবা হ্রাস হওয়া প্রযোজ্য বা সহিহ হয়। অতঃপর যখন সে মানবিক দুর্বলতা বা স্বভাবজাত গুণাবলির প্রভাব দূর হওয়ার মাধ্যমে হক তথা পরম সত্যের কাছে পৌঁছে যায়, তখন হক সুবহানাহু তায়ালা তাকে এমনভাবে তামকিন তথা স্থিরতা দান করেন, যেন তিনি তাকে পুনরায় নফসের ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকে ফিরিয়ে না নেন। সুতরাং সে তার যোগ্যতা ও আধ্যাত্মিক স্তরের অবস্থান অনুযায়ী নিজের হালে তামকিনপ্রাপ্ত তথা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর হক সুবহানাহু তায়ালা তাকে প্রতিটি নিঃশ্বাসে যা কিছু অনুগ্রহ দান করেন, তাঁর সেই কুদরতের কোনো সীমা নেই। তাই সে আধ্যাত্মিক প্রবৃদ্ধি ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মুতালাওয়িন তথা পরিবর্তনশীল, বরং মুলাওয়িন তথা রূপান্তরিত; কিন্তু তার মূল হালে সে মুমাক্কিন তথা সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে সে সর্বদা পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে আরও উচ্চতর অবস্থায় স্থিরতা লাভ করে, অতঃপর সেখান থেকে তার চেয়েও ঊর্ধ্বের স্তরে আরোহণ করে। কেননা প্রতি শ্রেণিতে হক সুবহানাহু তায়ালা’র কুদরতের কোনো শেষ বা চূড়ান্ত সীমা নেই।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের শাহিদ তথা আধ্যাত্মিক প্রত্যক্ষণের প্রভাব থেকে অভিভূত হয়ে পড়েছে এবং সম্পূর্ণরূপে নিজের বাহ্যিক অনুভূতি থেকে অবলুপ্ত হয়েছে, তার মানবিকতার জন্য অবশ্যম্ভাবীভাবে একটি সীমা রয়েছে। অতএব, যখন সে তার সমগ্র অস্তিত্ব, নফস ও অনুভূতি থেকে এবং একইভাবে সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়, অতঃপর তার এই গাইবাত তথা অনুপস্থিতি স্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা হলো মাহ্উ তথা সম্পূর্ণ বিলোপ। তখন সেখানে কোনো তামকিনও থাকে না, তাল্ওয়িনও থাকে না; কোনো মাকাম তথা আধ্যাত্মিক অবস্থানও থাকে না, হাল তথা অবস্থাও থাকে না। এবং সে যতক্ষণ এই বৈশিষ্ট্যে মগ্ন থাকে, ততক্ষণ তার জন্য কোনো তাশরিফ তথা সম্মান প্রদর্শনও থাকে না এবং তাকলিফ তথা শরিয়তের দায়িত্ব অর্পণও থাকে না। তবে হ্যাঁ, যদি তাকে তার নিজের কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই তার ওপর যা কিছু জারি হয় তার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়; তখন সে সৃষ্টির ধারণা বা দৃষ্টিতে নিজে পরিচালনাকারী বলে মনে হলেও, হাকিকত তথা প্রকৃত সত্যের বিচারে সে স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক পরিচালিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظاً وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ اليَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ
তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত; আর আমি তাদেরকে ডান পাশে ও বাম পাশে উলটপালট করি।[7] আল্লাহর সাহায্যেই তাওফিক তথা সফলতা লাভ হয়।[8]
ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম সোহরাওয়ার্দি বলেছেন, তাল্ওয়িন অন্তরওয়ালাদের বৈশিষ্ট্য, কারণ তারা গুণাবলির পর্দার অন্তরালে থাকে। আর তামকিনের অধিকারীরা সেই পর্দা ছিন্ন করে সরাসরি পরম সত্তার নুর স্পর্শ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তামকিনের অধিকারীর মধ্যেও কিছু পরিবর্তন থাকতে পারে; কিন্তু তা নফসের পর্যায়ে, হাকিকতের উন্মোচনে নয়।
তাল্ওয়িন হলো আরবাবুল কুলুব তথা অন্তরওয়ালাদের বৈশিষ্ট্য; কারণ তারা অন্তরের হিজাব তথা পর্দার অন্তরালে রয়েছে। আর অন্তরের মুক্তি ঘটে সিফাত তথা গুণাবলির দিকে, এবং গুণাবলির প্রকাশ বিভিন্ন দিক ও মাত্রার নানান ধরনের কারণে একাধিক হয়ে থাকে। ফলে গুণাবলির নানান ধরন অনুযায়ী আরবাবুল কুলুব তথা অন্তরওয়ালাদের মাঝে বিভিন্ন প্রকার তাল্ওয়িন তথা আধ্যাত্মিক রূপান্তর প্রকাশ পায়। আর অন্তর এবং অন্তরওয়ালাদের পক্ষে সিফাত তথা গুণাবলির জগত অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
পক্ষান্তরে তামকিনের অধিকারীগণ হালের অশুভ দিকসমূহ থেকে বের হয়ে এসেছেন এবং তারা অন্তরের হিজাব তথা পর্দাসমূহ ছিন্ন করেছেন। আর তাদের রুহসমূহ জাত তথা পরম সত্তার নুরের ঔজ্জ্বল্য সরাসরি স্পর্শ লাভ করেছে, ফলে তাল্ওয়িন দূর হয়ে গেছে; কারণ জাত তথা পরম সত্তার মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই। যেহেতু তাঁর পবিত্র জাত নতুন কোনো ঘটনা ঘটা বা পরিবর্তনের অনুপ্রবেশ থেকে বহু ঊর্ধ্বে। অতঃপর যখন তারা নৈকট্যের মাকাম তথা স্থানসমূহে একনিষ্ঠ হলেন এবং জাত তথা পরম সত্তার তাজাল্লির অংশসমূহ থেকে মহাসৌভাগ্য লাভ করলেন, তখন তাদের থেকে তাল্ওয়িন চিরতরে দূর হয়ে গেল।
সুতরাং তখন তাল্ওয়িন তাদের নফসের মধ্যে হয়ে থাকে। কারণ নফস তার পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতার কারণে অন্তরের স্থলাভিষিক্ত বা অন্তরের স্তরে উন্নীত। আর নফসের মধ্যে ঘটে যাওয়া তাল্ওয়িন তার অধিকারীকে তামকিনের হাল তথা অবস্থা থেকে বের করে দেয় না। কেননা নফসের মধ্যে তাল্ওয়িনের প্রবাহ মূলত মানবিকতার চিহ্নের অবশিষ্টাংশের কারণে হয়ে থাকে, আর তামকিনে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা হলো হাকিকতের প্রকৃত সত্যের উন্মোচন।
আর তামকিন দ্বারা এটি বোঝানো উদ্দেশ্য নয় যে, বান্দার কোনো পরিবর্তন হবে না; কেননা সে একজন মানুষ। বরং এর দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো— হাকিকতের যে বিষয়সমূহ তার সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তা তার থেকে কখনো আড়াল হয় না এবং তা হ্রাস পায় না; বরং বৃদ্ধি পায়।
পক্ষান্তরে তাল্ওয়িনের অধিকারীর ক্ষেত্রে তার নফসের সিফাত তথা গুণাবলি প্রকাশ পাওয়ার সময় এই অনুভূতির কিছু অংশ হ্রাস পেতে পারে এবং কিছু হালে তার থেকে হাকিকত অনুপস্থিত বা আড়াল হয়ে যেতে পারে। আর তার অবিচলতা থাকে ইমানের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর, এবং তার তাল্ওয়িন ঘটে হালের অতিরিক্ত বা আনুষাঙ্গিক বিষয়সমূহের মধ্যে।[9]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীর ও স্বতন্ত্র মত দিয়েছেন। তিনি তাল্ওয়িনকে ত্রুটি নয়, বরং পূর্ণতার লক্ষণ বলেছেন। কারণ এই পরিবর্তনশীলতা স্বয়ং আল্লাহর গুণ। “প্রতিদিন তিনি নতুন শানে প্রকাশ পান।” তিনি গিরগিটির রঙ বদলানোর উপমা দিয়ে দেখিয়েছেন, প্রকৃত তামকিন হলো অবিরাম পরিবর্তনের মাঝেও আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে স্থির থাকা।
إن التلون من حال إلى حال دليل صدق على العالي من الحالي
নিশ্চয় এক হাল থেকে অন্য হালে রূপান্তরিত হওয়া হলো গুণাবলি দ্বারা অলংকৃত উচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তির সত্যতার প্রমাণ।
فمن تحقق بالأنفاس يعرفه بالحال فيه كمثل الحال في الحال
সুতরাং যে ব্যক্তি প্রতিটি শ্বাসের রহস্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে তা অবগত হয়, তার মধ্যকার হালটি বর্তমান সময়ের হালের মতোই।
فالفعلُ ماضٍ وآتٍ ثم بينهما فعلٌ يُسمّى بفعل الآن والحالِ
ক্রিয়া মূলত অতীত ও ভবিষ্যৎ; আর এই দুইয়ের মাঝে এমন এক ক্রিয়া রয়েছে, যাকে বর্তমান সময় বা হাল বলা হয়।
فالحالُ زائلةٌ والحالُ دائمة وهو الصحيحُ الذي قد قيل في الحالِ
হাল বা আত্মিক অবস্থা কখনো কেটে যায়, আবার কখনো তা স্থায়ী হয়; হাল সম্পর্কে যত কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সঠিক।
জেনে রাখুন, সুফি সাধকদের অধিকাংশের মতে তাল্ওয়িন তথা আধ্যাত্মিক পরিবর্তনশীলতা একটি অপূর্ণাঙ্গ স্তর। এটি হলো আল্লাহর বান্দার নিজের বিভিন্ন আত্মিক অবস্থার মধ্যে বারবার বদলে যাওয়া। এ বিষয়ে তাঁরা একটি কবিতা আবৃত্তি করেছেন—
كلَّ يومٍ تتلوَّن غيرُ هذا بك أجملْ
প্রতিদিনই আপনার রূপ বা অবস্থা বদলে যাচ্ছে, অথচ এই পরিবর্তন ছাড়া স্থির থাকাই আপনার জন্য বেশি সুন্দর।
এমনকি তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, ইস্তেকামাত তথা সত্যে অবিচল থাকার মাধ্যমে এই আধ্যাত্মিক অস্থিরতা দূর হয়ে যাওয়াই হলো হাকিকত তথা প্রকৃত সত্যের লক্ষণ। তিনি যদি অবিচলতার প্রকাশ কথাটি বাড়তি যোগ না করতেন, তবে তিনি একটি চমৎকার ও সুনিশ্চিত তত্ত্বের দিকেই ইঙ্গিত করতেন। কিন্তু এই শব্দটি বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে তিনি পুরো বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন এবং সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনিও তাল্ওয়িনকে ত্রুটি বা অপূর্ণতা মনে করা দলটির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।[10]
অন্যদিকে আরেকটি দল বলেছে, তাল্ওয়িন তথা এই পরিবর্তনশীলতা আসলে সাধকের এমন এক অনন্য গুণ, যা প্রমাণ করে, সে একজন সত্যনিষ্ঠ, সুপ্রতিষ্ঠিত, কামিল তথা পূর্ণাঙ্গ ও খোদাভীতিসম্পন্ন মানুষ। এই মতটিই আমার কাছে সবচেয়ে সঠিক মনে হয়, এটিই আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমি এই মতেরই সমর্থন করি। আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের এই হালে একজন সাধক কতটা তামকিন তথা স্থিরতা বজায় রাখতে পারছেন, তার ওপরই তাঁর আধ্যাত্মিক পূর্ণতা নির্ভর করে। এই গভীর সত্যের কারণেই আমরা প্রকৃত স্থিরতার দেখা পাই এবং বলি— অনবরত পরিবর্তনের ভেতরেও নিজের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য ও বিশ্বাসে স্থির থাকাই হলো আসল স্থিরতা। তাই যার ভেতর এই স্থিরতা আসেনি, তার অবস্থা এমনভাবে বদলায় না। আল্লাহর কিতাবে এর প্রমাণ রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—প্রতিদিন তিনি নতুন নতুন শান তথা মহিমায় প্রকাশ পান। পবিত্র কুরআনে এই শান শব্দটিকে অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে এই দলটি তাল্ওয়িন নিয়ে এমন কিছু বাড়তি কথা বলেছে, যা না বললেই ভালো হতো; কারণ এই শর্ত জুড়ে দেওয়ার কোনো বিশেষ উপকার নেই। তাদের সেই কথাটি হলো— এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মূলত কাদির তথা সর্বশক্তিমান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রকাশ ঘটে, যার ফলে বান্দা নিজের চেয়ে আলাদা এক পরম সত্তার রহস্য বুঝতে পারে। আসলে এই বাড়তি কথাটি পুরোপুরি আমাদের মতের পক্ষেই যায়। কারণ এই পরিবর্তনশীলতা মূলত একটি ইলাহি নাত তথা খোদারই বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। আর খোদার প্রতিটি গুণই হলো পরম পূর্ণতা; কারণ আল্লাহর পবিত্র দরবারে কোনো ধরনের খুঁত বা অপূর্ণতার কল্পনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক জগতের সমস্ত স্তর ও অবস্থা কেবল তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা খোদার গুণের সাথে মিশে যায়। কারণ প্রকৃত পূর্ণতা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। আমাদের এই মতের সপক্ষে মহান আল্লাহর বাণী হলো—
يَسْأَلُهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلَّ يَوْهو فِي شَأْنٍ
আসমান ও জমিনের সবাই তাঁর কাছেই প্রার্থনা করে। প্রতিদিন তিনি নতুন নতুন শান তথা মহিমায় প্রকাশমান।[11]
আর তাল্ওয়িন মূলত এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। তাই আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে সাধারণ সুফি-সাধকদের মতবাদও অনায়াসে মিশে যায়। কারণ আমাদের মতটি অনেক বেশি গভীর, উদার ও ব্যাপক। তবে আমাদের এই সুউচ্চ দৃষ্টিভঙ্গি কখনো তাঁদের সেই সংকীর্ণ মতামতের নিচে ঢাকা পড়ে না।
জেনে রাখুন, যিনি এই তত্ত্বটি বুঝতে পেরেছেন যে, আল্লাহর অসীম কুদরত এই মহাবিশ্বে কোনো সৃষ্টিরই হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটায় না, তিনি এটিও স্পষ্ট বোঝেন যে, সৃষ্টির পরতে পরতে এই তাল্ওয়িন তথা পরিবর্তনশীলতাই হলো চিরন্তন সত্য। কারণ এটি খোদার অসীম ক্ষমতারই এক জীবন্ত প্রমাণ। তাই যে মানুষটি নিজের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, নিজের ভেতরে কিংবা অন্য কারও মাঝে আল-হক তথা পরম সত্যের এই বৈচিত্র্যময় প্রভাব অনুভব করতে পারে না, আল্লাহর প্রতি তার কোনো মারিফাত তথা আধ্যাত্মিক পরিচয় গড়ে ওঠেনি এবং সে এই উচ্চ স্তরের সাধকই নয়। বরং সে আল্লাহ সম্পর্কে, নিজের নফস তথা অন্তরাত্মা সম্পর্কে এবং প্রকৃত জ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ জাহেল তথা অজ্ঞ রয়ে গেছে। এমন মানুষের তো নিজের ভাগ্য দেখে কেঁদে বুক ভাসানো উচিত, কারণ সে তার অমূল্য জীবনটাকে কেবল নষ্টই করেছে।
আর এই অজ্ঞতা তাদের মাঝে কেবল তাশাবুহ তথা বাহ্যিক মিল বা সদৃশতার কারণে তৈরি হয়। কারণ ভেতরের আসল পার্থক্যটি এত সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে থাকে যে, তা সহজে ধরা পড়ে না। অন্তত মানুষের এতটুকু তো বোঝা উচিত যে, আধ্যাত্মিক জগতে এমন অনেক কিছু ঘটছে যা তার সাধারণ অনুভূতিতে ধরা পড়ছে না। সে যেন অন্তত এটা উপলব্ধি করতে পারে যে, তার নফসের ভেতরে প্রতিনিয়ত এক পরিবর্তন চলছে। সে হয়তো স্পষ্ট জানে না তার ভেতর ঠিক কী বদল হচ্ছে কিংবা ওপর থেকে কী আধ্যাত্মিক আলো তার ওপর নেমে আসছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهاً – এবং তাদেরকে একই রকম দেখতে বা সদৃশ ফল দেওয়া হবে।[12]
এর মানে হলো, জান্নাতের একটি ফল দেখতে অন্যটির মতোই হবে, যার কারণে মানুষ মনে করতে পারে যে, পরের জিনিসটি হুবহু আগেরটির মতোই। অথচ আসলে তা নয়; বরং জিনিস দুটি কেবল দেখতে এক রকম হলেও স্বাদে-গুণে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এমন দুটি প্রায় এক রকম বিষয়ের ভেতরের সূক্ষ্ম তফাতটুকু সাধারণ চোখে ধরা অত্যন্ত কঠিন। এটি কেবল সেই সাধকই বুঝতে পারেন, যিনি স্বয়ং আল-হক তথা পরম সত্যকে চিনেছেন, অথবা যিনি প্রকৃতির বুকে গিরগিটির রঙ বদলানো গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন। জীবজগতের মধ্যে গিরগিটির চেয়ে বড় কোনো উদাহরণ আর নেই, যা আল্লাহর এই গুণের অবিকল প্রমাণ দেয় যে, প্রতিদিন তিনি এক একটি নতুন শান তথা মহিমায় প্রকাশ পান। কারণ এই বাস্তব জগতে এমন কোনো সিফাত তথা গুণ বা আত্মিক অবস্থা নেই, যা পরপর দুটি মুহূর্ত একইভাবে টিকে থাকে, এবং এমন কোনো সুরত তথা রূপ নেই যা হুবহু দুইবার দেখা যায়। আর আসল ইলম তথা জ্ঞান তো এই শুরুর পরিবর্তন এবং শেষের রূপান্তরের সাথে সবসময় জড়িয়ে থাকে। তাই তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই গোপন। অতএব, সৃষ্টির এত রূপ আর বহুত্বের মাঝেও মূলত খোদার হুবিয়্যাত তথা পরম সত্তার একত্বই ফুটে ওঠে।
যিনি বহুত্বের মাঝে একত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন, তিনি এই সিফাত তথা গুণসমূহকে বিভিন্ন দিক বা প্রকাশের নিসবত তথা সম্পর্ক এবং ইজাফাত তথা সম্বন্ধ হিসেবে গণ্য করেন; আর এটিই হলো আহলুল নজর তথা তত্ত্ববিদদের মাজহাব।
পক্ষান্তরে সুফি সাধকদের দলটি হুবিয়্যাত তথা পরম সত্তা এবং একত্বকে স্বীকার করেছে। তারা এমন এক দিক বা দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করেছে যার কারণে তিনি প্রথম হওয়া মূলত যা, হুবহু তা-ই তাঁর শেষ, প্রকাশ্য ও গোপন হওয়া। আবু সাইদ আল-খাররাজ এটি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ পরম সত্যের জন্য কেবল তা-ই সাব্যস্ত করেছেন যার ওপর তিনি স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত আছেন। আর এই মহাবিশ্বে এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের মাঝে পরম সত্য যা ধারণ করে আছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই সুপ্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে সৃষ্টির সবকিছু একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।
এক-কে এক দিয়ে গুণ করা হলে তা বাড়ে না বা দ্বিগুণ হয় না, বরং তা হুবহু সেই একই থাকে যা গুণ করা হয়েছিল। একইভাবে, একের সাথে যা কিছু গুণ করা হয়, কিংবা একের মধ্যে যা কিছু গুণ করা হয়, তা একটি হোক বা বহু হোক; তা মোটেও বৃদ্ধি পায় না, বরং তা হুবহু সেই গুণ করা বস্তুটির মতোই থাকে। পুরো বিষয়টি ঠিক এইরকমই।
অতএব তাল্ওয়িন হলো এক-কে বহুত্বের সাথে গুণ করা। ফলে সেখানে সেই বহুত্বের রূপ ছাড়া অন্য কিছুই প্রকাশ পায় না, যার সাথে এক-কে গুণ করা হয়েছে কিংবা যা একের সাথে গুণ হয়েছে। আর পরম সত্য যে এক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এক বস্তুর সাথে অন্য বস্তুর গুণ করার অর্থ হলো তার দিকে সম্পর্কিত করা। আমরা এক পরম সত্তা তথা আইন থেকেই বহু সৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছি। যিনি আমাদের অস্তিত্ব দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন এবং আমরা অস্তিত্ব লাভের মাধ্যমে তাঁর সাথে সম্পর্কিত হয়েছি। সুতরাং, যে ব্যক্তি নিজেকে সৃষ্টি এবং বিদ্যমান হিসেবে চেনে, সে পরম সত্যকে স্রষ্টা এবং অস্তিত্বদানকারী হিসেবে চেনে।
অতএব আপনি যখন জগতের আহদিয়াত তথা একত্বের দিকে তাকাবেন, তখন আপনি যেন এক-কে এক দিয়ে গুণ করলেন। আর যখন আপনি জগতের দিকে তাকাবেন, তখন আপনি এক-কে বহুর সাথে গুণ করলেন। আর এই জগত হলো তাঁর আসমা কথা নামসমূহের প্রভাব। এই প্রভাব হলো— যেমনটি আমরা আগে আলোচনা করেছি, লাওয়াইহ তথা আধ্যাত্মিক আলোকচ্ছটা নামেরই একটি প্রতিচ্ছবি।
সুতরাং পরম সত্যের একত্বকে কেবল তাঁর নামসমূহের সুরত তথা রূপের মধ্যেই গুণ করা হয়েছে, যা তাঁর থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাই গুণের পরেও স্বয়ং তিনি ছাড়া অন্য কিছুই বের হয়ে আসেনি, যদিও নামসমূহ অনেক।
এইভাবেই নামসমূহের বিষয়ে ইলাহি খবর তথা ঐশ্বরিক বাণী এসেছে, যার সংখ্যা নিরানব্বই কিংবা তার চেয়েও বেশি। যার কিছু জানা যায় এবং কিছু জানা যায় না। অথচ মূল সত্তা এক, আর রঙসমূহ হলো বিভিন্ন মর্তবা তথা স্তর, এবং তাল্ওয়িন হলো তার দিকেই একটি নিসবত তথা সম্পর্ক।
এখন আপনি যদি বলেন, “তিনি এক।” তবে আপনি সত্য বলেছেন। আর যদি বলেন, “তারা বহু।” তবুও আপনি সত্য বলেছেন; কারণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থের কারণে আল্লাহর নামসমূহ অনেক। আর আল্লাহই একমাত্র হাদি তথা পথপ্রদর্শক।[13]
তিন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে দেখা যায়, তাল্ওয়িন ও তামকিন আসলে সাধনার দুই পরিপূরক দিক। একটি গতি, অন্যটি স্থিতি। কুশাইরি দেখিয়েছেন এই দুই অবস্থার মৌলিক পার্থক্য ও মতভেদ। সোহরাওয়ার্দি স্পষ্ট করেছেন, তামকিনপ্রাপ্ত সাধকের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন থাকে, কিন্তু তা হাকিকতের উন্মোচনকে স্পর্শ করে না। আর ইবনে আরাবি সবচেয়ে অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখিয়েছেন, তাল্ওয়িন নিজেই আল্লাহর এক বিশেষ গুণের প্রতিফলন। সবশেষে বলা যায়, তাল্ওয়িন ও তামকিন শেখায়— পরিবর্তন আর স্থিরতা পরস্পরবিরোধী নয়। প্রকৃত সাধক সেই, যিনি অবিরাম পরিবর্তনের মাঝেও নিজের আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে অটল থাকতে পারেন। এটাই সুফি সাধনার চূড়ান্ত পরিণতির এক গভীর দিক।