<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>Sufigraphy</title>
	<atom:link href="https://sufigraphy.com/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://sufigraphy.com/</link>
	<description></description>
	<lastBuildDate>Sat, 11 Jul 2026 12:24:41 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.9.4</generator>

<image>
	<url>https://sufigraphy.com/wp-content/uploads/2026/01/Sufigraphy-logo-150x150.png</url>
	<title>Sufigraphy</title>
	<link>https://sufigraphy.com/</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>সির</title>
		<link>https://sufigraphy.com/sirr/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/sirr/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 11 Jul 2026 11:32:05 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3957</guid>

					<description><![CDATA[<p>সির হলো সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে গভীর স্তর। অন্তরের মধ্যে রুহ যেমন গচ্ছিত, রুহের মধ্যে সির তেমনি গচ্ছিত। কিন্তু সির রুহের চেয়েও সূক্ষ্ম, আরও উচ্চতর। সুফিরা বলেছেন, সাধকদের অন্তরই রহস্যের কবরস্থান। এমনকি জামার বোতামও যদি গোপন রহস্য জেনে ফেলে, তবে সেটিও খুলে ফেলে দিতে হবে। এই গোপনীয়তা কেবল সংরক্ষণের জন্য নয়; কারণ সিরের প্রকৃত স্বরূপ ভাষায় [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/sirr/">সির</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সির হলো সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে গভীর স্তর। অন্তরের মধ্যে রুহ যেমন গচ্ছিত, রুহের মধ্যে সির তেমনি গচ্ছিত। কিন্তু সির রুহের চেয়েও সূক্ষ্ম, আরও উচ্চতর। সুফিরা বলেছেন, সাধকদের অন্তরই রহস্যের কবরস্থান। এমনকি জামার বোতামও যদি গোপন রহস্য জেনে ফেলে, তবে সেটিও খুলে ফেলে দিতে হবে। এই গোপনীয়তা কেবল সংরক্ষণের জন্য নয়; কারণ সিরের প্রকৃত স্বরূপ ভাষায় প্রকাশযোগ্যও নয়।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সির তিনটি স্তরে বিন্যস্ত। জ্ঞানের সির, হালের সির ও হাকিকতের সির। এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক, কিন্তু প্রতিটির বিধান আলাদা। জ্ঞানের সির সবচেয়ে পূর্ণ, কারণ তা আল্লাহ নিজেই। হালের সির শক্তিশালী কিন্তু বিভ্রমের সম্ভাবনা রাখে। আর হাকিকতের সির সেই বিভ্রমকেও অতিক্রম করে।</p>
<p><strong>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</strong></p>
<p>ইমাম কুশাইরি সির-এর মূলগত সংজ্ঞা দিয়েছেন, অন্তরে স্থাপিত এক সূক্ষ্ম লতিফা, যা মুশাহাদার কেন্দ্র। রুহ মহব্বতের কেন্দ্র, হৃদয় মারিফতের কেন্দ্র, আর সির মুশাহাদার কেন্দ্র। ‘সিরের সির’ এমন গভীরতম রহস্য যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার আধ্যাত্মিক সম্পর্কও সির; এই সম্পর্ক এতটাই গোপন যে, কোনো কল্পনাশক্তিও তার পর্দা উন্মোচন করতে পারেনি।</p>
<p>তিনি বলেন, সির হলো মানুষের অন্তরে স্থাপিত এক সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক লতিফা; যেমন দেহের মধ্যে রুহ অবস্থান করে। সুফিদের মতে, সির হলো মুশাহাদা তথা আল্লাহর নৈকট্য ও আধ্যাত্মিক সত্য প্রত্যক্ষ করার কেন্দ্র। রুহ যেমন মহব্বতের কেন্দ্র এবং হৃদয় যেমন মা‘রিফত লাভের কেন্দ্র, তেমনি সির হলো মুশাহাদার কেন্দ্র।</p>
<p>সুফিরা বলেন, السِّرُّ: ما لك عليه إشراف، وسِرُّ السِّرِّ: ما لا اطِّلاع عليه لغير الحق سبحانه</p>
<p>সির হলো অন্তরের সেই গোপন অবস্থা, যার কিছুটা উপলব্ধি মানুষের নিজের থাকে। আর ‘সিরের সির’ হলো এমন গভীরতম রহস্য, যা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে প্রকাশিত নয়।</p>
<p>সুফি পরিভাষায় সির রুহের চেয়েও সূক্ষ্ম ও উচ্চতর; আর রুহ হৃদয়ের চেয়ে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<p>সুফিরা আরও বলেন, الأسرارُ مُعتَّقةٌ عن رِقِّ الأغيار؛ من الآثار والأطلال</p>
<p>আধ্যাত্মিক সির তথা রহস্যসমূহ গায়রুল্লাহর সব বন্ধন থেকে মুক্ত। সৃষ্টিজগতের প্রভাব, চিহ্ন ও স্মৃতির কোনো দাসত্বই তার ওপর থাকে না।</p>
<p>‘সির’ শব্দটি এমন গোপন আধ্যাত্মিক সম্পর্ককেও বোঝায়, যা বিভিন্ন হালের মধ্যে বান্দা ও মহান আল্লাহর মাঝে সংরক্ষিত থাকে।</p>
<p>এই অর্থেই সুফিদের একটি উক্তি হলো, أسرارُنا بِكرٌ لم يفتضَّها وَهمُ واهم</p>
<p>আমাদের আধ্যাত্মিক রহস্যসমূহ এমন অক্ষত ও অনাবিষ্কৃত যে, কোনো কল্পনাশক্তিও তার পর্দা উন্মোচন করতে পারেনি।</p>
<p>সুফিরা আরও বলেন, صدورُ الأحرارِ قبورُ الأسرار</p>
<p>আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সাধকদের অন্তরই রহস্যের কবরস্থান; তারা গোপন আধ্যাত্মিক বিষয় প্রকাশ করেন না।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<p>তারা আরও বলেন, لو عرف زِرِّي سِرِّي لطرحتُه &#8211; আমার জামার বোতামও যদি আমার গোপন রহস্য জেনে ফেলত, তবে আমি সেটিও খুলে ফেলে দিতাম। অর্থাৎ, আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার আধ্যাত্মিক রহস্য এতটাই গোপন রাখা উচিত যে, নিকটতম কোনোকিছুকেও তার সাক্ষী হতে দেওয়া যায় না।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">ইবনে আরাবি সিরকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করেছেন। জ্ঞানের সির হলো একই সত্তায় বিপরীত বিধানের সমাবেশ। যেমন আল্লাহ একই সাথে জাহির ও বাতিন। হালের সির হলো সেই অবস্থা, যেখানে হক বান্দার শ্রবণ ও দৃষ্টি হয়ে ওঠেন। ইসা (আ.)-্এঁর পাখিতে ফুঁ দেওয়া এর উদাহরণ। হাকিকতের সির হলো এই উপলব্ধি যে, জ্ঞান আল্লাহর সত্তা থেকে আলাদা নয়।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সাহল ইবনে আবদুল্লাহর বরাতে তিনি দেখিয়েছেন— রুবুবিয়াতের সির প্রকাশ পেলে রুবুবিয়াতের ধারণাই বিলুপ্ত হয়, জ্ঞানের সির প্রকাশে নবুয়ত বিলুপ্ত হয়, নবুয়তের সির প্রকাশে শরিয়তের বিধান বিলুপ্ত হয়। সবশেষে যে এই সব সিরের স্বরূপ জেনেছে অথচ কোনোকিছুর বাস্তবতা তার কাছে বিলুপ্ত হয়নি; সেই ব্যক্তি সর্বাধিক শক্তিমান।</p>
<p>السِّرُّ تَثْبِيتُ المَرَاتِبِ فَافْتَكِرْ فَهُوَ الدَّلِيلُ عَلَى ثُبُوتِ الوَاحِدِ<br />
সির হলো অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরকে তার যথাযথ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত রাখা,</p>
<p>তাই গভীরভাবে চিন্তা করো; কারণ এই স্তরগুলোর প্রতিষ্ঠাই একক সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ।</p>
<p>بِالفَرْدِ صَحَّ وُجُودُنَا فِي عَيْنِنَا فِي غَائِبٍ إِنْ كَانَ أَوْ فِي شَاهِدِ<br />
সেই একক সত্তার কারণেই আমাদের নিজ সত্তায় অস্তিত্ব সত্য ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,</p>
<p>সে অস্তিত্ব অদৃশ্য জগতে হোক কিংবা দৃশ্যমান জগতে।</p>
<p>إِنَّ الإِشَارَةَ بِالحَقِيقَةِ تَثْبُتُ وَهِيَ الدَّلِيلُ عَلَى انْتِفَاءِ الوَاحِدِ<br />
হাকিকতের প্রতি ইশারা তখনই যথার্থ হয়, যখন সংখ্যাগত ও সীমাবদ্ধ ‘এক’-এর ধারণা দূর হয়ে যায়;</p>
<p>আর এই ইশারাই সেই সীমাবদ্ধ একত্বের বিলুপ্তির প্রমাণ।</p>
<p>وَالحَالُ يَطْلُبُهُ المُرَادُ بِكَوْنِهِ فِيهِ بِحُكْمٍ لَا يَكُونُ بِزَائِدِ<br />
হাল যাঁকে উদ্দেশ্য করে, তাঁর অস্তিত্বের মধ্যেই নিজের দাবি প্রকাশ করে,</p>
<p>এমন এক বিধানে, যা তাঁর সত্তার ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কোনো বিষয় নয়।</p>
<p>وَالعَالِمُ التَّحْرِيرُ إِنْ قَامَتْ بِهِ صِفَةُ العُلُومِ فَحُكْمُهُ كَالفَاقِدِ<br />
যে জ্ঞানী প্রকৃত মুক্ত উপলব্ধি অর্জন করেনি, তার মধ্যে বহু জ্ঞানের গুণ থাকলেও তার অবস্থা জ্ঞানহীন ব্যক্তির মতো।</p>
<p>জেনে রাখো, সুফিদের মতে সিরের তিনটি স্তর রয়েছে: জ্ঞানের সির, হালের সির এবং হাকিকতের সির।</p>
<p>জ্ঞানের সির হলো আল্লাহকে তাঁর অন্য কোনো নামের মাধ্যমে নয়, সরাসরি আল্লাহ হিসেবে জানেন; এমন আল্লাহওয়ালা আরিফদের উপলব্ধ হাকিকত।</p>
<p>আল্লাহ-সম্পর্কিত জ্ঞানের গোপন রহস্য হলো, একই সত্তার মধ্যে বিপরীত বিধানগুলোর সমাবেশ। অর্থাৎ, কোনো একটি গুণ যে দৃষ্টিকোণ থেকে সেই সত্তার প্রতি সম্বন্ধযুক্ত হয়, তার বিপরীত গুণও একই সত্তার প্রতি অন্য একটি বিধানের দিক থেকে সম্বন্ধযুক্ত হতে পারে।</p>
<p>এ এমন এক সির, যা কেবল সেই ব্যক্তিই জানতে পারে, যে নিজের মধ্যে তা প্রত্যক্ষ করেছে এবং সেই অবস্থায় নিজে গুণান্বিত হয়েছে। তখন সে নিজের একই সত্তার ওপর একটি বিধান আরোপ করে; আবার সেই বিধানের বিপরীত দিক থেকে একই সত্তার ওপর তার বিপরীত বিধানও আরোপ করে। এটি ভিন্ন কোনো নাম, নতুন কোনো পরিচয় কিংবা আলাদা কোনো সম্বন্ধের কারণে নয়; বরং একই সত্তার মধ্যে বিপরীত বিধানগুলোর প্রকাশের কারণে।</p>
<p>এ কারণেই আল্লাহ একে ‘জ্ঞানের সির’ করেছেন। কারণ যা কোনো নিদর্শন ও প্রমাণের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাকেই জ্ঞান বলা হয়। ‘ইলম’ শব্দটিও ‘আলামত’ শব্দ থেকে উদ্ভূত।</p>
<p>এই জন্যই সৃষ্টিবস্তুসমূহের জ্ঞানকে আল্লাহর প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করা হয়। কারণ তিনি নিজেকে জানেন, আর নিজেকে জানার মাধ্যমেই সমগ্র জগতকে জানেন। ফলে তাঁর জ্ঞান জগতের অস্তিত্বের দলিল ও নিদর্শন। একইভাবে আমরা আল্লাহকে জানার ক্ষেত্রে এই জগতকেই তাঁর পরিচয়ের নিদর্শন হিসেবে পাই।</p>
<p>এ কথাই নবী ﷺ-এর এই বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে, مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ عَرَفَ رَبَّهُ &#8211; যে নিজের নফসকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে। অতএব আল্লাহ তোমাকেই তোমার নিজের জন্য একটি প্রমাণ ও নিদর্শন বানিয়েছেন। তুমি তাঁরই মাধ্যমে তাঁকে জেনেছ। যেমন তাঁর সত্তা তোমার কাছে তোমার অস্তিত্বের প্রমাণ হয়েছে, তেমনি তিনি তোমাকে জানলেন এবং অস্তিত্ব দান করলেন। এটি জ্ঞানের এমন এক সূক্ষ্ম সির, যা আল্লাহর আরিফগণ ছাড়া আর কেউ জানে না।</p>
<p>আল্লাহ যখন বান্দার শ্রবণ, দৃষ্টি ও জ্ঞান হয়ে ওঠেন, তখন তিনি নিজেই বান্দাকে নিজের পরিচয়ের দলিল ও নিদর্শন বানান। আর এটাই হালের সির। এ কারণেই ইসা আলাইহিস সালাম মাটির তৈরি পাখির আকৃতিতে ফুঁ দিলে তা পাখি হয়ে যেত। আবার ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ায় পাখিগুলো তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর কাছে এসে পড়েছিল।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বলেন, بِإِذْنِي &#8211; আমার অনুমতিক্রমে। সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ১১০।</p>
<p>এখানে কার্যকর হয়েছে ‘ফুঁ দেওয়া’; তাই এটি হালের সির।</p>
<p>আবার তিনি বলেন, فَيَكُونُ &#8211; তখন তা হয়ে যায়।</p>
<p>এখানে কার্যকর হয়েছে আল্লাহর হুকুম; তাই এটি জ্ঞানের সির। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই জানেন, আর এখানে সেই ব্যক্তি হলেন ইসা আলাইহিস সালাম।</p>
<p>জ্ঞানের সির হালের সিরের চেয়েও পূর্ণতর। কারণ জ্ঞানের সির হলো আল্লাহ নিজে। ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে এই সির প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি যখন মৃত পাখিগুলোকে ডাকতে চাইলেন, তখন ফুঁ দেওয়ার কোনো উল্লেখ করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ &#8211; আমি যখন কোনোকিছুর ইচ্ছা করি, তখন তাকে শুধু বলি, ‘হও’; আর তা হয়ে যায়। সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৪০।</p>
<p>হালের সির কেবল সৃষ্টির গুণ হতে পারে; তা হকের গুণ নয়। আর জ্ঞানের সির অধিক পূর্ণ ও অধিক সুদৃঢ়। কারণ হাল জ্ঞানের সামগ্রিক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং জ্ঞানের অধীন। হাল জ্ঞানের চেয়ে পূর্ণতর হলে হক অবশ্যই অধিক অপূর্ণতার দিকে ঝুঁকতেন, আর পূর্ণতার গুণ পরিত্যাগ করতেন। এটি অসম্ভব। সুতরাং মর্যাদা কেবল জ্ঞানের সিরেরই।</p>
<p>হাকিকতের সির হলো এই উপলব্ধি যে, জ্ঞান আল্লাহর সত্তার ওপর অতিরিক্ত কোনো বিষয় নয়। তিনি বস্তুসমূহকে নিজের সত্তার মাধ্যমেই জানেন; নিজের সত্তা থেকে পৃথক বা তার ওপর আরোপিত কোনো গুণের মাধ্যমে নয়।</p>
<p>হাকিকতের সির আমাদের জানায় যে, ‘আইন’ তথা সত্তা এবং তার ওপর আরোপিত বিধান এক বিষয় নয়। হালের সির এই পার্থক্য মুছে দেয়। কারণ হালের অধিকারী বলেন, ‘আমি আল্লাহ, পবিত্র আমি!’ অথবা বলেন, ‘আমি আমার প্রিয়তম, আর আমার প্রিয়তমই আমি।’</p>
<p>জ্ঞানের সির আবার জ্ঞান ও জ্ঞানীর মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করে। তুমি জানো যে, হক তোমার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত ও পা হয়ে ওঠেন; তবু প্রত্যেকটির কার্যকারিতা ও সীমা আলাদা। আর তুমি তাঁরই সত্তা নও।</p>
<p>হালের সিরে হক তোমার শ্রবণ হয়ে মহাবিশ্বের প্রতিটি শ্রবণযোগ্য বিষয় শুনে থাকেন। একইভাবে তিনি তোমার অন্যান্য শক্তি ও ইন্দ্রিয়ও হয়ে ওঠেন।</p>
<p>হাকিকতের সিরে তুমি জানতে পারো, সব অস্তিত্বশীল সত্তা আল্লাহ নন এবং হালও বাস্তবে স্বতন্ত্র কোনো প্রভাব সৃষ্টি করে না। কারণ হাকিকত স্থির ও অপরিবর্তনীয়। কারণ যদি মূল কারণ স্থির থাকে, আর সেই কারণই হলো ‘আইন’; তবে তার প্রভাবও স্থির থাকবে।</p>
<p>হাকিকত এমন এক দৃষ্টিতে হালকে দেখে, যে দৃষ্টিতে হালের প্রকাশ ঘটে না। আবার হাল এমন এক দৃষ্টিতে জ্ঞানকে দেখে, যে দৃষ্টিতে জ্ঞান প্রকাশ পায় না। আর জ্ঞান এমন এক দৃষ্টিতে হালকে দেখে, যে দৃষ্টিতে হাল প্রকাশ পায়।</p>
<p>সুতরাং হালের দৃষ্টি কখনো জ্ঞানের দৃষ্টি ও হাকিকতের দৃষ্টির স্তরে পৌঁছাতে পারে না। এ কারণেই হাল স্থায়িত্বের গুণে গুণান্বিত নয়। জ্ঞান হালকে অপসারিত করে এবং হাকিকত তাকে বিলুপ্ত করে দেয়।</p>
<p>এই জন্য হালসমূহকে অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কোনোটিরই গুণে নির্দিষ্ট করা যায় না। এগুলো এমন সব অস্তিত্বশীল বিষয়ের গুণ, যেগুলো নিজেরা অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বের গুণে গুণান্বিত নয়।</p>
<p>হালেই আলিমের মধ্যে বিভ্রম দেখা দেয়; আর জ্ঞান ও হাকিকতের মাধ্যমে সেই বিভ্রম দূর হয়। এভাবে তুমি জ্ঞানের সির, হালের সির ও হাকিকতের সিরের পার্থক্য এবং প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র বিধান জানতে পারলে।</p>
<p>সুফিদের পরিভাষায় সিরের অর্থ এটাই। জগতে কোনো বিষয় প্রতিষ্ঠিত হলে এবং তার বিধান প্রকাশিত হলে, সেই বিধান যার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে পূর্ববর্তী স্থিতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে জগতের প্রতিটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের ক্ষেত্রেই এই নীতি কার্যকর হয়।</p>
<p>এই সাদৃশ্যের ভিত্তিতেই জগতের সব কার্যকারণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।</p>
<p>রুবুবিয়াতের সির হয়তো ‘মারবুব’ তথা প্রতিপালিত সত্তা, অথবা এমন কোনো সম্বন্ধ ও গুণ, যা কারও সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বা তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এগুলোকে এমন স্বতন্ত্র গুণ মনে করা যাবে না, যার কারণে কোনো সত্তা নিজে থেকেই রব হয়ে যায়।</p>
<p>সাহল ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, للرُّبُوبِيَّةِ سِرٌّ لَوْ ظَهَرَ لَبَطَلَتِ الرُّبُوبِيَّةُ &#8211; রুবুবিয়াতের এমন এক সির রয়েছে, তা প্রকাশিত হলে রুবুবিয়াতের বাহ্যিক ধারণাই বিলুপ্ত হয়ে যেত।</p>
<p>তিনি আরও বলেন, إِنَّ لِلرُّبُوبِيَّةِ سِرًّا &#8211; নিশ্চয়ই রুবুবিয়াতের একটি সির রয়েছে, তা প্রকাশিত হলে জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে যেত। জ্ঞানেরও এমন একটি সির রয়েছে, যা প্রকাশিত হলে নবুয়ত বিলুপ্ত হয়ে যেত। আর নবুয়তেরও এমন একটি সির রয়েছে, যা প্রকাশিত হলে শরিয়তের বিধানসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যেত।</p>
<p>হকের সির প্রকাশিত হলে বিশেষত্বের ধারণা বিলুপ্ত হয়ে যায়। নবুয়ত যেহেতু একটি বিশেষ মর্যাদা, তাই এই বিশেষত্ব বিলুপ্ত হলে নবুয়তও বিলুপ্ত হয়ে যায়।</p>
<p>একইভাবে জ্ঞানের বিধানও বিলুপ্ত হয়— এই দিক থেকে যে, জ্ঞান সত্তার একটি সিফাত। তবে জ্ঞানই জ্ঞানীকে ‘আলিম’ হওয়ার বিধান দিয়েছে। আর এটিই হাল। ফলে জ্ঞানের বিধান বিলুপ্ত হলেও আলিম বিলুপ্ত হন না।</p>
<p>নবুয়তের সির হলো উচ্চ মর্যাদার স্তরবিন্যাস দূর হয়ে যাওয়া। কারণ সেই স্তরের ঊর্ধ্বে আর কোনো স্তর নেই। নবীদের মি‘রাজ ও আধ্যাত্মিক আরোহণ এই স্তরগুলোর মধ্যেই সংঘটিত হয়।</p>
<p>সুতরাং, নবুয়তের সির হলো কোনো বিষয় বাস্তবে যেমন, ঠিক তেমনভাবেই তার সংবাদ দেওয়া। আর কোনো বিষয় বাস্তবে যেমন, তা পরিবর্তন গ্রহণ করে না। যখন তা পরিবর্তন গ্রহণ করে না, তখন হুকুমের কার্যকারিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কারণ হুকুম মানুষের সামনে নির্বাচন করার সুযোগ প্রতিষ্ঠা করে; অথচ নির্বাচন পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।</p>
<p>অতএব পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিলুপ্ত হলে নির্বাচনও বিলুপ্ত হয়। নির্বাচন বিলুপ্ত হলে হুকুমও বিলুপ্ত হয়। আর হুকুম বিলুপ্ত হলে নবুয়তের প্রচলিত অর্থও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটিই নবুয়তের সির।</p>
<p>যার কাছে এসব বিষয়ের সির প্রকাশিত হয়েছে, যে এগুলোর প্রকৃত স্বরূপ জেনেছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে হকের বিধান উপলব্ধি করেছে; অথচ তার কাছে কোনোকিছুর বাস্তবতা বিলুপ্ত হয়নি। সে আল্লাহপ্রদত্ত তামকিনে শক্তিমানদের মধ্যেও সর্বাধিক শক্তিমান।</p>
<p>সে প্রভুর মাকামে থেকেও বান্দা এবং বান্দার রূপে থেকেও প্রভু।<a href="#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে সির সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে দেখলে শুধু গোপনীয়তা, কিন্তু ভেতরে আধ্যাত্মিক সাধনার গভীরতম রহস্য। কুশাইরি ভিত্তি নির্মাণ করেছেন সহজ সংজ্ঞায়। সির মুশাহাদার কেন্দ্র, রুহের চেয়ে সূক্ষ্মতর। তিনি দেখিয়েছেন, বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কের গোপনীয়তাই সির। এই গোপনীয়তা রক্ষা করাই সাধকের সর্বোচ্চ আদব। ইবনে আরাবি সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনটি স্তরের সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছেন। জ্ঞানের সির সবচেয়ে পূর্ণ, কারণ তা আল্লাহর নিজের গুণ। হালের সির শক্তিশালী, কিন্তু বিভ্রম আনতে পারে। আর হাকিকতের সির সেই বিভ্রমকেও অতিক্রম করে স্থির সত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। সবশেষে বলা যায়, সির সুফি সাধনার সেই চূড়া, যেখানে পৌঁছানো মানে প্রভুর মাকামে থেকেও বান্দা হওয়া, আর বান্দার রূপে থেকেও প্রভুর পরিচয় বহন করা। এই অবস্থাই সাধকের সর্বোচ্চ পূর্ণতা।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/sirr/">সির</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/sirr/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>রুহ</title>
		<link>https://sufigraphy.com/ruh/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/ruh/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 09 Jul 2026 18:48:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3954</guid>

					<description><![CDATA[<p>রুহ সুফি সাধনার সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়গুলোর একটি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, “রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত।” এবং এটুকুই যথেষ্ট মনে করে আর ব্যাখ্যা করেননি। অথচ এই রহস্যময় সত্তাকে ঘিরে যুগে যুগে মানুষ প্রশ্ন করেছে, বিতর্ক করেছে, ভুল পথে গেছে। রুহ কি জীবন নিজেই, নাকি জীবনের কারণ? এটি কি ক্ষণস্থায়ী গুণ, নাকি স্বতন্ত্র সূক্ষ্ম সত্তা? এটি কি [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/ruh/">রুহ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="0">রুহ</span> <span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="4">সুফি সাধনার </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="16">সবচেয়ে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="24">রহস্যময় </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="33">বিষয়গুলোর </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="44">একটি। আল্লাহ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="57">নিজেই বলেছেন, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="71">“রুহ আমার </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="81">রবের </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="86">নির্দেশ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="94">ঘটিত।” এবং </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="105">এটুকুই যথেষ্ট </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="119">মনে করে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="127">আর </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="130">ব্যাখ্যা </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="139">করেননি। অথচ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="151">এই </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="154">রহস্যময় </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="163">সত্তাকে ঘিরে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="176">যুগে যুগে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="186">মানুষ প্রশ্ন </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="199">করেছে, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="206">বিতর্ক </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="213">করেছে, ভুল </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="224">পথে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="228">গেছে।</span></p>
<div class="_chunkWrapper_6ta1u_30">
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal"><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="0">রুহ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="4">কি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="7">জীবন নিজেই, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="19">নাকি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="24">জীবনের কারণ? </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="37">এটি কি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="44">ক্ষণস্থায়ী গুণ, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="61">নাকি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="66">স্বতন্ত্র সূক্ষ্ম </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="84">সত্তা? এটি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="95">কি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="98">চিরন্তন, নাকি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="112">সৃষ্ট? এই </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="122">প্রশ্নগুলোর উত্তরে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="141">আহলে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="146">সুন্নতের </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="155">মুহাক্কিক </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="165">ওলামাদের </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="174">মধ্যেও মতভেদ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="187">রয়েছে। তবে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="199">সব </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="202">মনীষীই একমত যে, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="215">রুহ অনাদি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="225">নয়, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="230">সৃষ্ট। আর </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="240">এই সত্য </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="248">থেকে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="253">বিচ্যুত </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="261">হওয়া— যেমন </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="273">হিন্দু, নাসারা </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="288">ও </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="290">জন্মান্তরবাদীরা করেছে; </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="313">সবচেয়ে বড় </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="325">ভুলের মধ্যে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="337">পড়ে।</span></p>
</div>
<div class="_chunkWrapper_6ta1u_30">
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal"><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="0">রুহকে</span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="5"> চেনার </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="12">এই </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="15">যাত্রা শুধু </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="27">ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="49">সীমাবদ্ধ নয়। </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="63">নিজেকে চেনার </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="76">মধ্যেই রবকে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="88">চেনার পথ </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="97">লুকিয়ে আছে। আর </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="113">রুহের চার </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="123">স্তর জিসমানি, </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="138">রওয়ানি, সুলতানি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="155">ও কুদসি </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="164">পার হয়ে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="173">সাধক আল্লাহর </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="186">নুরের সাক্ষাত </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="200">পর্যন্ত পৌঁছাতে </span><span class="_animating_6ta1u_10" data-newtext-seq="216">পারেন।</span></p>
</div>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি রুহ সম্পর্কে মতভেদ উল্লেখ করে সুপ্রতিষ্ঠিত মত দিয়েছেন— রুহ স্বয়ং জীবন নয়, বরং দেহে গচ্ছিত এক সূক্ষ্ম সত্তা, যার উপস্থিতিতে আল্লাহ দেহে জীবন বজায় রাখেন। মানুষ রুহ ও শরীরের সমন্বিত রূপ। হাশরে পুনরুত্থান এই সামগ্রিক সত্তারই হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা রুহসমূহ সম্পূর্ণ সৃষ্ট; যে রুহকে চিরন্তন দাবি করে, সে বিরাট ভুলে আছে।</p>
<p>তিনি বলেন, আহলে সুন্নতের মুহাক্কিক ওলামাদের নিকট রুহের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।</p>
<p>একাংশের মতে, রুহ হলো স্বয়ং জীবন। তবে এর বিপরীতে সুফি গবেষকদের সিদ্ধান্ত হলো, জীবন মূলত একটি সাময়িক গুণ বা আরজ, যা দুই সময়কাল পর্যন্ত স্থায়ী হয় না; আর মুহাক্কিকদের নিকট এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত।</p>
<p>আবার অনেকের মতে, রুহ মূলত মানবদেহের অবয়বে গচ্ছিত আইয়ান তথা এক সুনির্দিষ্ট সূক্ষ্ম সত্তা। যতক্ষণ রুহ শরীরে অবস্থান করে, ততক্ষণ আল্লাহ তায়ালা তাঁর স্বাভাবিক নিয়মে দেহে জীবন বজায় রাখেন।</p>
<p>অতএব, মানুষ জীবনের কারণেই জীবিত থাকে, আর রুহ গচ্ছিত থাকে শরীরের ভেতরে। ঘুমন্ত অবস্থায় রুহের এক প্রকার তারাক্কি ঘটে এবং শরীর থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তা আবার শরীরে ফিরে আসে।</p>
<p>নিশ্চয় মানুষ রুহ ও শরীরের এক সমন্বিত রূপ; কারণ আল্লাহ তায়ালা এই সামগ্রিক কাঠামোর একটি অংশকে অন্য অংশের অনুগত করে দিয়েছেন। তাই হাশরের ময়দানে পুনরুত্থান এই সামগ্রিক সত্তারই হবে এবং সওয়াব কিংবা আজাবও এই সামগ্রিক সত্তাই ভোগ করবে।</p>
<p>রুহসমূহ সম্পূর্ণ মাখলুক বা সৃষ্ট সত্তা। সুতরাং কেউ যদি রুহকে চিরন্তন দাবি করে, তবে সে এক বিরাট ভুলের মধ্যে রয়েছে।</p>
<p>এই বিষয়ে ইমাম সিরাজ তাঁর ‘আল-লুমাহ’ কিতাবের ৫৫৫ পৃষ্ঠায় স্পষ্ট করেছেন যে, সঠিক সিদ্ধান্ত হলো রুহ সৃষ্টিজগতেরই অংশ এবং এটি আল্লাহর একটি বিশেষ নির্দেশ মাত্র, যার সাথে মহান আল্লাহর সৃষ্টির সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোনো সংযোগ বা অনুপাত নেই।</p>
<p>সমস্ত আখবার এই স্পষ্ট প্রমাণই দেয় যে, রুহসমূহ হলো অই্যানে লতিফা তথা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সত্তাবিশেষ।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">ইবনে আরাবি রুহকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। রুহুল ইয়া ও রুহুল আমর। রুহুল ইয়া হলো সেই রুহ যা আল্লাহ আদমে ফুঁকে দিয়েছেন এবং নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন সম্মানের জন্য। রুহুল আমর হলো “রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত” এই আয়াতের রুহ। তিনি দেখিয়েছেন, অলিরা ফেরেশতাদের দেখতে পেলেও জ্ঞান সঞ্চারের মুহূর্তে দেখতে পান না। এই পার্থক্যেই নবী ও অলির মধ্যে ভেদ। আল্লাহ নবুয়তের দরজা বন্ধ করেছেন, কিন্তু অলিদের অন্তরে বিধানের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান পৌঁছানোর পথ বন্ধ করেননি। প্রদীপের সলতের উপমায় তিনি বুঝিয়েছেন— প্রস্তুত অন্তরে যেভাবে ঊর্ধ্বের আলো প্রতিফলিত হয়, তেমনি যোগ্য অন্তরে ইলাহি জ্ঞান অবতীর্ণ হয়। নবুয়ত চেষ্টা দিয়ে অর্জনযোগ্য নয়; এটি লাওহে মাহফুজেই নির্ধারিত।</p>
<p>الروحُ روحانِ روحُ الياءِ والأمرِ وَالْحُكْمُ يَثْبُتُ بَيْنَ النَّهْيِ وَالأَمْرِ</p>
<p>রুহ মূলত দুই প্রকার, রুহুল ইয়া এবং রুহুল আমর; আর এদের বিধান আদেশ ও নিষেধের মাঝেই সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে।</p>
<p>وَمَا سِوَاهُ فَأَخْبَارٌ مُنَبِّئَةٌ أَنَّ الْكَوَائِنَ بَيْنَ السِّرِّ وَالْجَهْرِ</p>
<p>এ ছাড়া অন্য যা কিছু তা কেবল খবর বা তথ্য, যা জানায় যে সমস্ত সৃষ্টিজগৎ প্রকাশ ও গোপনীয়তার মাঝে রয়েছে।</p>
<p>وَعَالَمُ الْبَرْزَخِ الأَعْلَى يُخَلِّصُهُ عِنَايَةٌ حَالُهُ مِنْ قَبْضَةِ الأَسْرِ</p>
<p>আর উচ্চতর বরজখ জগতের বিশেষ দয়া বা অনুগ্রহ সাধকের অবস্থাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেয়।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ‘সুরা আশ-শুরা’র ৫২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا &#8211; আর এভাবেই আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রুহ ওহি করেছি।</p>
<p>‘সুরা গাফির’র ১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ &#8211; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহ অবতীর্ণ করেন।</p>
<p>‘সুরা আশ-শুয়ারা’র ১৯৩ ও ১৯৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন,نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ &#8211; তা নিয়ে আপনার অন্তরে রুহুল আমিন অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। এখানে মূলত সতর্ক করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে আল্লাহর এই বাণীতেও রয়েছে, يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ لِيُنْذِرَ &#8211; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহ অবতীর্ণ করেন যেন তিনি সতর্ক করতে পারেন।</p>
<p>‘সুরা আন-নাহল’র ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, يُنَزِّلُ الْمَلَائِكَةَ بِالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ أَنْ أَنْذِرُوا &#8211; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহসহ ফেরেশতাদের অবতীর্ণ করেন এই মর্মে যে, তোমরা সতর্ক করো।</p>
<p>সুতরাং এই সবকিছুই মূলত মানুষকে জানানোর উদ্দেশ্যে এসেছে। তবে এর মধ্যে এক ধরনের শাসন বা ধমকের ভাব রয়েছে, কারণ এখানে জানানোর বিষয়টি ‘ইনজাল’ তথা অবতরণ শব্দের মাধ্যমে বলা হয়েছে। তাই এটি শাসনের মাধ্যমে জানানো, যেহেতু রসুল হলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। আর আগে থেকে না জানিয়ে তো সুসংবাদ দেওয়া যায় না।</p>
<p>অতএব, আত্মিক অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে শাসন ও ভয়ের দিকটিই প্রধান থাকে; কারণ মানুষের নফসের মধ্যে এমন এক প্রশান্তি তৈরি হয়, যা রসুল প্রেরণের মূল কারণকে জরুরি করে তোলে। যেন রসুলগণ তাদের জানিয়ে দেন যে, তারা এই দুনিয়া থেকে আখিরাতের দিকে ফিরে যাবে এবং নিজেদের নফসের দিক থেকে আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।</p>
<p>আর আমাদের ‘রুহুল ইয়া’ বলার কারণ হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী, وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي &#8211; এবং আমি তার মধ্যে আমার রুহ হতে ফুঁকে দিয়েছি। সুরা আল-হিজর, আয়াত: ২৯।</p>
<p>এখানে ইয়া হরফ দিয়ে নিজের দিকে রুহকে সম্বন্ধ করা মূলত তাশরিফ তথা বিশেষ সম্মান দেওয়ার মাকামকে নির্দেশ করে। এর অর্থ হলো, তোমার উৎস অত্যন্ত সম্মানিত, তাই তুমি তোমার মূল উৎস অনুযায়ীই কাজ করো, হীন ও নিকৃষ্টদের মতো আচরণ করো না।</p>
<p>আর ‘রুহুল আমর’ বলতে আল্লাহর এই বাণীকে বোঝায়, وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ &#8211; এবং তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।</p>
<p>অর্থাৎ, রুহ কোথা থেকে এসেছে? তখন তাকে বলা হলো, قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي &#8211; বলুন, রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত। সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮৫।</p>
<p>সুতরাং, কেউ কেউ যেমনটি মনে করেছেন যে, এটি রুহের মাহিয়াত তথা তার আসল সত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। কারণ তারা রুহ কী বা কেমন তা জিজ্ঞেস করেনি, যদিও এই শব্দের গঠনে সেই অর্থ প্রকাশের একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমরা এখানে যে অর্থটি গ্রহণ করেছি, তার সপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো উত্তরের এই অংশটি যেখানে বলা হয়েছে ‘আমার রবের নির্দেশ ঘটিত’ এবং সেখানে রুহের কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।</p>
<p>অতএব, গায়েবি জ্ঞানসমূহ এই রুহানি শক্তির মাধ্যমেই বান্দাদের অন্তরে অবতীর্ণ হয়। সুতরাং, যে ব্যক্তি এদের চেনে, সে আদবের সাথে তাদের গ্রহণ করে এবং আদবের সাথেই তাদের থেকে জ্ঞান লাভ করে। আর যে ব্যক্তি এদের চেনে না, সে গায়েবি বার্তা পেলেও কার কাছ থেকে তা আসছে তা জানতে পারে না; যেমনটি গণক, জ্যোতিষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তি, মনের খেয়ালি ভাবনার অনুসারী এবং সাধারণ ইলহামপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।</p>
<p>তারা নিজেদের অন্তরে সেই জ্ঞানটি পেয়ে যান, কিন্তু কে তা নিয়ে এসেছে তা জানে না। তবে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁদের অন্তরে রুহের অবতরণ প্রত্যক্ষ করেন, যদিও তাঁরা অবতীর্ণ হওয়া ফেরেশতাকে দেখতে পান না; অবশ্য যার ওপর তা অবতীর্ণ হচ্ছে তিনি যদি কোনো নবী বা রসুল হন তবে ভিন্ন কথা।</p>
<p>সুতরাং অলিরা ফেরেশতাদের দেখতে পেলেও নিজের ওপর জ্ঞান ঢেলে দেওয়ার মুহূর্তে তাদের দেখতে পান না; অথবা তাঁরা এই জ্ঞান সঞ্চারের প্রক্রিয়াটি অনুভব করেন এবং কোনো চাক্ষুষ দর্শন ছাড়াই বুঝতে পারেন যে, এটি ফেরেশতার পক্ষ থেকেই এসেছে।</p>
<p>একই সাথে ফেরেশতাকে দেখা এবং তাঁর কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করা— এই দুইয়ের সমন্বয় কেবল একজন নবী বা রসুলের ক্ষেত্রেই হতে পারে। সুফি সাধকদের মতে, এই বিন্দুর মাধ্যমেই অলি এবং নবীর মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়; এখানে নবী বলতে মূলত অবতীর্ণ শরিয়তের অধিকারী নবীকে বোঝানো হয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ আইনি বিধান বা শরিয়তের হুকুম নাজিল হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন, তবে তাঁর অলিদের অন্তরে সেই বিধানের অন্তর্নিহিত জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার পথ বন্ধ করেননি। তিনি অলিদের জন্য সেই জ্ঞানের আধ্যাত্মিক অবতরণ চালু রেখেছেন, যেন তাঁরা আল্লাহর দিকে ডাকার ক্ষেত্রে পূর্ণ দূরদর্শিতার অধিকারী হতে পারেন; ঠিক যেমনটি রসুলের অনুসারীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল। আর এই কারণেই আল্লাহ সুরা ইউসুফের ১০৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, বলুন, এটিই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে ডাকছি পূর্ণ দূরদর্শিতার সাথে, আমি নিজে এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা।</p>
<p>তাই অলিদের নিকট এটি এমন এক অর্জন, যার মধ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এই কারণেই ইমাম কুশাইরি (রহ.) আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রশংসা করে বলেছেন, “সাধারণ ওলামাদের জ্ঞান সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, যাতে সংশয় থেকে যায়? কারণ সুফি-সাধক ছাড়া অন্য আলেমরা উপশাখা কিংবা মূলনীতি কোনো ক্ষেত্রেই এমন অকাট্য দূরদর্শিতার ওপর থাকেন না।”</p>
<p>উপশাখার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা না থাকার কারণ হলো সেখানে ব্যাখ্যার নানা সম্ভাবনা থাকে। আর মূলনীতির ক্ষেত্রে কারণ হলো, যে কোনো গবেষক যখন কোনো প্রমাণের ওপর দৃষ্টিপাত করেন, তখন তাঁর নিজের মনের বা অন্য কারও সংশয় ও খুঁত সেই প্রমাণের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে; ফলে এই ত্রুটি বা খুঁতের কারণে তিনি নিজের প্রমাণের ওপরই সন্দেহ পোষণ করতে পারেন, অথচ এর আগে হয়তো তিনি সেটিকে অকাট্য মনে করতেন।</p>
<p>কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দূরদর্শিতাপ্রাপ্ত সাধকদের অর্জিত জ্ঞানে এমন অবস্থা ঘটে না। আর এই জ্ঞানই হলো ‘হক্কুল ইয়াকিন’, যার অর্থ হলো অন্তরে এমন এক দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে ওঠা যা কোনো কিছুই তার স্থান থেকে নাড়াতে পারে না। অন্তরে ঢেলে দেওয়া রুহের জ্ঞান বোঝার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।</p>
<p>আর অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেওয়ার এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক আস্বাদনের ওপর নির্ভরশীল, যা একটি বিশেষ আত্মিক অবস্থা। তবে আমি আপনাকে জানিয়ে রাখছি যে, এই বিশেষ সম্পর্কের কারণে যার অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হচ্ছে তার অন্তরের মধ্যে সেই জ্ঞান গ্রহণের একটি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা বা প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। এই প্রস্তুতি না থাকলে জ্ঞান গ্রহণ করা সম্ভব হতো না। অবশ্য এই প্রস্তুতি কেবল গ্রহণ করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বিশেষ খোদায়ি অনুগ্রহ।</p>
<p>হ্যাঁ, মানুষের আত্মা কখনো কখনো এমন এক পথে চলে, যা তাকে সেই বিশেষ দরজার দিকে নিয়ে যায়, যা খুলে দিলে এই বিশেষ জ্ঞান বা অন্যান্য আধ্যাত্মিক বিষয় অর্জিত হয়। যখন তারা এই দরজায় পৌঁছায়, তখন সেখানে অপেক্ষা করে দেখার জন্য যে, তাদের ক্ষেত্রে দরজাটি কীভাবে খোলা হচ্ছে। অতঃপর যখন দরজা খোলা হয়, তখন খোদায়ি নির্দেশটি একক রূপেই নির্গত হয়, কিন্তু দরজার ওপাশে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী তা গ্রহণ করে। এই যোগ্যতার পেছনে তাদের নিজস্ব কোনো হাত থাকে না, বরং আল্লাহ নিজেই প্রত্যেককে আলাদা আলাদা যোগ্যতা দান করেছেন। আর এই মাকামেই বিভিন্ন দল, অনুসারী ও অ-অনুসারী, নবীদের থেকে রসুলগণ এবং রসুলদের থেকে অনুসারীগণ— যাদের পরিভাষায় অলি বলা হয়; পরস্পর পৃথক হয়ে যান।</p>
<p>তাই যার প্রকৃত জ্ঞান নেই সে মনে করে বসে যে, এই দরজার দিকে তাদের পথ চলাই বুঝি দরজা খোলার পর যা অর্জিত হয়েছে তা নিজের চেষ্টায় কামাই করার কারণ। আসলে যদি তাই হতো, তবে সবাই সমান ফল পেত, অথচ সবাই তো সমান নয়। সুতরাং, এটি কেবলই সেই যোগ্যতার কারণে ঘটে যা নিজের চেষ্টায় অর্জন করা যায় না।</p>
<p>এই কারণেই দার্শনিক বা চিন্তাবিদদের মধ্যে যারা নবুয়তকে চেষ্টা বা সাধনার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য বলেছেন, তারা চরম ভুল করেছেন। নবুয়তকে সাধনা লব্ধ কেবল তারাই বলতে পারে যারা মনে করে যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে না, বরং এটি মানুষের বুদ্ধি এবং ঊর্ধ্বজগতের রুহানি শক্তির এক বিশেষ প্রবাহ মাত্র, যা এমন কিছু আত্মার ওপর পড়ে যা বাহ্যিক আবিলতা মুক্ত এবং প্রকৃতির বস্তুগত কারণ থেকে মুক্ত।</p>
<p>ফলে তাদের মতে, সেই আত্মায় বিশ্বজগতের সমস্ত প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে; যেহেতু তাদের আত্মার এই পরিচ্ছন্নতা সাধনার মাধ্যমে অর্জিত, তাই সেই পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে যা কিছু পাওয়া যায় তাও নাকি চেষ্টা লব্ধ। কিন্তু এটি একটি মস্ত বড় ভুল। অবশ্য আত্মার পরিচ্ছন্নতা অর্জন বা তাতে মহাবিশ্বের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠার বিষয়টি সেই আত্মার ক্ষেত্রে সত্য, যার এই আধ্যাত্মিক অবলোকনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।</p>
<p>তবে একই রকম পরিচ্ছন্ন আত্মার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অন্য কাউকে বাদ দিয়ে কেবল এই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিটিই কেন রসুল, নবী বা শরিয়তের প্রবর্তক হলেন; সেটি সম্পূর্ণ একটি খোদায়ি নির্বাচন, যা আল্লাহ তাঁর নিজের ইচ্ছায় সেই আত্মায় খোদাই করে দেন; বিশ্বজগতের কোনো প্রতিচ্ছবি তা করে না। কেননা, আমরা যা কিছু উল্লেখ করেছি তার মূল উৎস হলো লাওহে মাহফুজ। সেখানেই খোদাই করা আছে রসুলের সুরত ও তাঁর রেসালাত, নবীর সুরত ও তাঁর নবুয়ত এবং অলির সুরত ও তাঁর বেলায়েত। অতএব, কারও আত্মা পরিচ্ছন্ন হলেই এবং তাতে লাওহে মাহফুজের বিষয়াবলি ভেসে উঠলেই যে তাকে রসুল হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।</p>
<p>আর যার রসুল হওয়ার কথা, তাঁর আত্মাতেই রেসালাতের বিষয়টি খোদাই হয়ে যায় এবং তাঁর নিকট সমস্ত বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এটি মানুষের মনগড়া ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা মনে করে কেবল আত্মার পরিচ্ছন্নতা অর্জনের মাধ্যমেই বুঝি নবুয়ত বা বেলায়েত লাভ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, লওহে মাহফুজেই সমস্ত আধ্যাত্মিক স্তর এবং উচ্চ ও নিম্ন স্তরের অধিকারীদের অবস্থান খোদাই হয়ে আছে।</p>
<p>আর অন্তরে ঐশ্বরিক জ্ঞান বা বার্তা গ্রহণের যোগ্যতার নিয়ম হলো— তা এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সম্পর্কের মাধ্যমে ঘটে, যা মূলত অন্তরে তৈরি হওয়া একটি খোদা-প্রদত্ত রশি বা সংযোগ। এই প্রস্তুতির মাধ্যমে অন্তর যখন সত্যের দরবারের সাথে যুক্ত হয়, তখন আধ্যাত্মিক পথ ধরে অন্তরে জ্ঞান অবতীর্ণ হতে শুরু করে। এর ফলে অদৃশ্য জগতের আলোয় মানুষের অন্তর পুরোপুরি আলোকিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন এটি আল্লাহ সম্পর্কিত এমন জ্ঞান হয়, যার সাথে এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কোনো সম্পর্ক নেই; যেমন আল্লাহর এই জ্ঞান, যে তিনি সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন, যা সুরা আল ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। কিংবা সমস্ত লৌকিক বৈশিষ্ট্য থেকে তাঁর পবিত্রতা ও দূরত্বের জ্ঞান, যা সুরা আশ-শুরার ১১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই।</p>
<p>এই মানসিক প্রস্তুতি, জ্ঞানের অবতরণ এবং অবিচ্ছিন্ন আত্মিক সংযোগের একটি চমৎকার উদাহরণ হলো প্রদীপের সলতে। কোনো সলতেতে যদি সামান্য আগুন বা তাপ অবশিষ্ট থাকে, তবে তা থেকে এক ধরনের ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া নিজের স্বভাবজাত নিয়মেই ওপরের দিকে উঠতে চায় এবং ওপরের শূন্যতার সাথে একটি অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করে। এখন ওপরে যদি একটি জ্বলন্ত প্রদীপ থাকে আর ধোঁয়া বের হওয়া সলতেটিকে ঠিক তার নিচে সোজাসুজি রাখা হয়, তবে সেই ধোঁয়া খুব দ্রুত ওপরের জ্বলন্ত প্রদীপের সাথে মিশে যায়। এর ফলে নিচের সলতের মাথায় আগুন ধরে ওঠে এবং সেখানেও ওপরের আলোকময় প্রদীপের হুবহু একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, যা থেকে আলো নিচে ছড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>এখন যদি কেউ ভালো করে লক্ষ করে যে ওপরের মূল প্রদীপ থেকে কি কোনো আলো কমে গেছে, কিংবা মূল প্রদীপের কোনো অংশ কি নিচের সলতেতে চলে এসেছে? তবে দেখা যাবে যে নিচের সলতেতে হুবহু প্রদীপের রূপ ফুটে ওঠা সত্ত্বেও মূল প্রদীপের কোনো কমতি হয়নি, আবার তা থেকে ভেঙেও কিছু নিচে আসেনি।</p>
<p>যে ব্যক্তি এই রূপকের ভেতরের রহস্যটি বুঝতে পারবে, সে হাদিসের এই বাণীর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারবে, যেখানে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে তাঁর নিজস্ব প্রতিচ্ছবি বা সুরতে সৃষ্টি করেছেন। সে আরও জানতে পারবে যে, অন্তরের প্রস্তুতি যখন খোদার দরবারের মুখোমুখি হয়, তাদের আধ্যাত্মিক সম্পর্কটি সঠিক রূপ নেয় এবং সাধকের বিশেষ একাগ্রতা তার সাথে যুক্ত হয়, তখন সেই প্রস্তুতি অনুসারেই অন্তরে জ্ঞান অবতীর্ণ হয়।</p>
<p>সলতের আকার বড় বা ছোট হওয়ার ওপর যেমন তার ভেতরের আলোর আয়তন নির্ভর করে, তেমনি অন্তরের ধারণক্ষমতার ওপর জ্ঞানের গভীরতা নির্ভর করে। প্রদীপের আলো কতটা উজ্জ্বল হবে তা নির্ভর করে সলতের পরিচ্ছন্নতা এবং তার তেলের বিশুদ্ধতার ওপর। আর সেই আলো কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা নির্ভর করে তেলের পরিমাণের ওপর, কারণ তেলই আলোকে টিকিয়ে রাখার মূল উপাদান বা রসদ জোগায়।</p>
<p>অতএব, আমরা এই উপমায় যা কিছু বললাম তা যদি আপনি বুঝতে পারেন, তবে আপনি এমন এক গভীর জ্ঞান লাভ করলেন যা কেবল আল্লাহ-সচেতন ওলামাগণই জানেন। এর মাধ্যমে আপনার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, অন্তরে রুহের মাধ্যমে কীভাবে গায়েবি জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হয়, কোন ধরনের অন্তর তা গ্রহণ করতে পারে এবং সেই অন্তরের গুণাবলি কেমন হয়ে থাকে।</p>
<p>আপনি আরও জানতে পারবেন যে, নিম্নস্তরের সৃষ্টি বা বান্দার একাগ্রতা ও আকুলতা কীভাবে উচ্চতর বা খোদার দরবারে প্রভাব ফেলে; ঠিক যেমনটি ঘটে যখন কোনো বান্দা আল্লাহকে ডাকে এবং আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। আর আল্লাহই চিরন্তন সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2>দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দাতা গঞ্জে বখশ সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে রুহের প্রকৃতি ও বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, রুহ একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ; তাই তাকে দেখা সম্ভব, যেমন শহিদদের রুহ সবুজ পাখির রূপে থাকে। রুহকে অনাদি দাবি করা হিন্দু, নাসারা, বাতেনি ও জন্মান্তরবাদী দলগুলোর ভ্রান্তি। তিনি যুক্তি দিয়ে এটি খণ্ডন করেছেন। আবু বকর ওয়াসিতির বরাতে রুহের দশটি মাকামও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাপাচারীদের রুহ থেকে শুরু করে দরবেশদের ফানার রুহ পর্যন্ত। তাঁর নিজের বাণী— “আমার জীবন সব অবস্থায় হক তায়ালার সাথে, আমাদের অস্তিত্ব তাঁরই সৃষ্টি, তাঁর জাত বা সিফাতের অংশ নয়” রুহ সম্পর্কে সঠিক আকিদার সারসংক্ষেপ।</p>
<p>এটি স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, রুহের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা আবশ্যক। তবে এর প্রকৃত স্বরূপ ও রহস্য উন্মোচনে মানুষের বুদ্ধি একেবারেই অক্ষম ও অসহায়। মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক আলেম ও বুদ্ধিজীবী নিজ নিজ বোধ ও অনুমানের ভিত্তিতে এই বিষয়ে কিছু না কিছু বলেছেন। এমনকি কাফের ও নাস্তিকরাও এই বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছে।</p>
<p>কুরাইশ কাফেররা ইহুদিদের প্ররোচনায় নজর বিন হারিসকে পাঠিয়েছিল, যেন সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রুহের অবস্থা এবং এর প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তখন আল্লাহ তায়ালা রুহের অনাদিত্ব বা চিরন্তন হওয়ার দাবিকে নাকচ করে দিয়ে সুনিশ্চিত করে বললেন, وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي &#8211; হে মাহবুব, তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলে দিন যে, রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত।” সুরা বনি ইসরাইল: ৮৫।</p>
<p>নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী হলো, الأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ &#8211; রুহসমূহ সমবেত এক সৈন্যদল; তাদের মধ্যে যাদের পারস্পরিক আত্মিক মিল ঘটে তারা একতাবদ্ধ হয়, আর যাদের মধ্যে মিল ঘটে না তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।” বুখারি শরিফ।</p>
<p>রুহসমূহ যেহেতু একটি সুবিন্যস্ত সৈন্যদল, তাই যে ব্যক্তি এর হাকিকত খোঁজার পেছনে অতিরিক্ত চেষ্টা করে সে মূলত নিজের সময় নষ্ট করে, আর যে এর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সে ভুলের মধ্যে রয়েছে। এই ধরনের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে, তবে সেগুলোতে রুহের মূল উপাদান বা সত্তা নিয়ে অযথা বিতর্ক করা হয়নি; বরং তা কোনো বাহ্যিক গুণাগুণের ব্যাখ্যা ছাড়াই রুহের অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ দেয়। এই কারণে একদল সুফি ও আলেম বলেন যে, الروح هو الحیوة التی یحیی بہ الجسد &#8211; রুহ হলো স্বয়ং জীবন, যার কারণে এই দেহ বেঁচে থাকে।</p>
<p>ধর্মতত্ত্ববিদদের একটি দলের মতও এটিই। এই অর্থে রুহ হলো একটি সাময়িক গুণ বা আরজ, যার ফলে আল্লাহর আদেশে যে-কোনো জীবন্ত প্রাণ সচল থাকে এবং দেহের অঙ্গসংস্থান ও নড়াচড়ার সমস্ত প্রক্রিয়া এর সাথেই যুক্ত থাকে। এটি অন্যান্য সাধারণ গুণের মতোই, যা মানুষকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করে। আবার অন্য আরেকটি দল বলে যে, هو غیر الحیوة ولا یوجد الحیوة الا معھا کما لا يوجد</p>
<p>الروح الامع البنيه وان لا يوجد احدهما دون الآخر كالألم والعلم بها لانهما شيئان لا يفترقان.</p>
<p>রুহ জীবন ছাড়া আলাদা একটি বিষয়, তবে জীবন রুহ ছাড়া পাওয়া যায় না। আবার রুহও দেহ ছাড়া পাওয়া যায় না। এদের একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব প্রকাশ পায় না; যেমন কষ্ট এবং কষ্টের অনুভূতি, কারণ এ দুটি আলাদা বিষয় হলেও একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।</p>
<p>অধিকাংশ সুফি মাশায়েখ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অভিমত হলো রুহ পুরোপুরি দৃশ্যমান কোনো বস্তুও নয়, আবার কেবল কোনো গুণও নয়। আল্লাহ তায়ালা যতক্ষণ রুহকে মানুষের দেহে রাখেন, ততক্ষণ নিয়ম অনুযায়ী সেটি দেহে জীবন বজায় রাখেন। জীবন হলো মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য এবং সে এটির মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। আর এই রুহ মানুষের শরীরে একটি আমানত বা সাময়িক বিষয় মাত্র। এমন হওয়া সম্ভব যে, রুহ মানুষ থেকে আলাদা হয়ে যাবে অথচ সে জীবনের সাথে বেঁচে থাকবে; ঠিক যেভাবে ঘুমের ঘোরে রুহ চলে গেলেও মানুষ জীবনের সাথে বেঁচে থাকে। আবার এটাও সম্ভব যে, শরীর থেকে রুহ বের হয়ে যাওয়ার পরও তার মধ্যে বুদ্ধি ও জ্ঞান বাকি থাকবে। কারণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, শহিদদের রুহ সবুজ পাখিরূপে থাকে। আর এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, রুহ একটি বাস্তব সত্তা। তা ছাড়া তিনি আরও এরশাদ করেছেন, الأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ &#8211; রুহসমূহ সারিবদ্ধ সৈন্যদলের মতো।</p>
<p>স্বাভাবিকভাবেই সৈন্যদল স্থায়ী হয়, অথচ কোনো অস্থায়ী গুণ নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না এবং তা নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিতও হতে পারে না।</p>
<p>আসল কথা হলো, রুহ একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ, যা আল্লাহ তায়ালার আদেশে আসে। নবী করিম আলাইহিস সালাম ফরমান, মেরাজের রাতে আমি হজরত আদম সফিউল্লাহ, ইউসুফ সিদ্দিক, মুসা কলিমুল্লাহ, হারুন হালিমুল্লাহ, ঈসা রুহুল্লাহ এবং হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিমুস সালামদের আসমানে দেখেছি। নিঃসন্দেহে তা ছিল তাঁদের আরওয়াহে মুকাদ্দাসা। রুহ যদি কোনো আরাজি তথা ক্ষণস্থায়ী গুণ হতো, তবে তা নিজে নিজে টিকে থাকত না এবং অস্তিত্ব থাকা অবস্থায় তাকে দেখাও যেত না। রুহ বা আত্মা যদি কোনো ‘আরাজি’ (পরনির্ভরশীল বা ক্ষণস্থায়ী গুণ) হতো, তবে সেই ‘আরেজ’ (গুণটির) টিকে থাকার জন্য তো একটা নির্দিষ্ট বডি, আধার বা জায়গার দরকার হতো। আর সেই জায়গাটি হতো তার জওহর। আমরা জানি, জওহর বা মূল উপাদানগুলো সাধারণত যৌগিক ও স্থূল হয়ে থাকে। এ থেকে বোঝা গেল যে, রুহের একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ রয়েছে। আর যেহেতু এর একটি দেহ আছে, তাই একে দেখাও সম্ভব; তা মনের চোখ দিয়েই হোক, সবুজ পাখির রূপেই হোক কিংবা সারিবদ্ধ সৈন্যদলের আকৃতিতেই হোক, যারা যাতায়াত করে। এই বিষয়ে অনেক হাদিস প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। সুরা বনি ইসরাইলের ৮৫ নম্বর আয়াতে হক তায়ালা এরশাদ করেছেন, قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي &#8211; হে মাহবুব, আপনি বলে দিন, রুহ আমার রবের নির্দেশেই রয়েছে।</p>
<p>এখন বেদ্বীনদের একটি মতভেদের বিবরণ বাকি আছে। তারা মনে করে রুহ হলো কদিম তথা অনাদি এবং তারা এর উপাসনা করে। তারা রুহকে সবকিছুর কর্তা এবং চালিকাশক্তি মনে করে। তারা রুহসমূহকে মাধ্যম বা হাতিয়ার মনে করে এবং একে চিরন্তন ব্যবস্থাপক বা এক দেহ থেকে অন্য দেহে আবর্তিত হওয়া বিষয় বলে গণ্য করে। সহজ কথায়, তারা জন্মান্তরবাদ ও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। এই লোকেরা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে পরিমাণ সংশয় বা সন্দেহ ছড়িয়েছে, তা আর কেউ ছড়ায়নি। নসারা তথা খ্রিষ্টানদের ধর্মও এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে, যদিও তাদের মুখের কথা বা বাহ্যিক বক্তব্য এর উল্টো। তা ছাড়া সব হিন্দু এবং তিব্বত, চিন ও মাচীনের লোকেরাও এই একই মত পোষণ করে। শিয়া, কেরামতিয়া এবং বাতেনি দলও এই মতেরই অনুসারী। এই বর্জিত ও বাতিল দলগুলোও এমন সব ফাসেদ তথা ভ্রান্ত চিন্তাভাবনা লালন করে এবং প্রতিটি দলই নিজের মতকে সবার আগে রাখে ও এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখায়। আমরা তাদের এত সব দাবির মধ্য থেকে কেবল কদম তথা অনাদিত্ব শব্দটি নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই যে, এটা দিয়ে আসলে তোমরা কী বোঝাতে চাচ্ছ? কোনো মুহাদ্দাস তথা সৃষ্ট বস্তু কি নিজের অস্তিত্বের দিক থেকে আগের, নাকি তা সবসময়ই কদিম তথা অনাদি?</p>
<p>তারা যদি বলে যে, আমাদের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টি বা মুহাদ্দাস অস্তিত্বের দিক থেকে অগ্রবর্তী, তবে তো মূল বিষয়ের অমিলটাই দূর হয়ে যায়; কারণ আমরাও রুহকে মুহাদ্দাস অর্থাৎ সৃষ্ট বলেই বিশ্বাস করি। অথবা এর অর্থ যদি এই হয় যে, মানুষের দেহের আগে রুহের অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে, তবে তা ঠিক আছে। কারণ সাইয়্যেদুল আলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, إِنَّ اللهَ تَعَالَى خَلَقَ الأَرْوَاحَ قَبْلَ الأَجْسَادِ بِمِائَتَيْ أَلْفِ عَامٍ &#8211; নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা শরীরের সৃষ্টির দুই লক্ষ বছর আগে রুহসমূহ সৃষ্টি করেছেন।</p>
<p>যেহেতু রুহ সৃষ্টি হওয়াটাই সত্য, তাই স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টির সাথে যা কিছু থাকে তাও সৃষ্টিই হয়ে থাকে এবং উভয়-ই এক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সময় একটিকে অপরটির সাথে মিলিয়েছেন এবং এই মিলনের মাধ্যমে তিনি নিজের কুদরতে জীবন তৈরি করেছেন। এর অর্থ হলো, সৃষ্টির দিক থেকে রুহ একটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং শরীর আরেকটি ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ তায়ালা যখন কাউকে জীবন দিতে চান, তখন রুহকে শরীরের সাথে মিলে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং এর মাধ্যমেই জীবন লাভ হয়। তবে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে রুহের চলে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ যখন এক শরীরের জন্য দুই ধরনের জীবন থাকা সম্ভব নয়, তখন একটি রুহের জন্য দুটি আলাদা শরীর বা অস্তিত্ব থাকাও অসম্ভব। যদি এই বিষয়ে স্পষ্ট হাদিস না থাকত এবং হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বাণীতে সত্য প্রকাশ না করতেন, তবে বুদ্ধির বিচারে জীবন ছাড়া রুহের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং তা কেবল একটি বৈশিষ্ট্য বা গুণ হতো, কোনো বাস্তব সত্তা হতো না।</p>
<p>এই নাস্তিক বা মুলহিদরা যদি বলে যে, কদম অর্থাৎ অনাদিত্ব বলতে চিরন্তন ও স্থায়ী হওয়া বোঝায়, তবে আমরা তাদের কাছে জানতে চাই— এটি কি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত, নাকি অন্য কোনোকিছুর মাধ্যমে টিকে আছে? তারা যদি বলে এটি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, তবে আমরা জিজ্ঞেস করব, আল্লাহ তায়ালা কি এটি সম্পর্কে জানেন নাকি জানেন না? তারা যদি বলে আল্লাহ তায়ালা এটি সম্পর্কে জানেন না, তবে তো আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় আরেকজন অনাদি সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ হয়ে যায়। আর বুদ্ধির বিচারে এটি সম্পূর্ণ অসম্ভব; কারণ অনাদি সত্তা কখনো সীমাবদ্ধ হতে পারে না; অথচ এক সত্তার অস্তিত্ব অন্য সত্তার বিপরীত হয়ে দাঁড়ায় এবং এটি অসম্ভব। আর তারা যদি বলে যে আল্লাহ তায়ালা এটি সম্পর্কে জানেন, তবে আমরা জবাবে বলব, আল্লাহ তো কদিম, অর্থাৎ অনাদি এবং সৃষ্টি হলো নতুন বা নশ্বর। আর এটি অসম্ভব ও ত্রুটিপূর্ণ যে, কোনো সৃষ্টির সাথে অনাদি সত্তার মিশ্রণ, একাত্মতা বা প্রবেশ ঘটবে, অথবা সৃষ্টি অনাদি সত্তার জায়গায় আর অনাদি সত্তা সৃষ্টির জায়গায় চলে আসবে। যখন একটিকে অপরটির সাথে মেলানো হবে, তখন তো দুটি মিলে এক হয়ে যাবে। অথচ সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষেত্রে এভাবে আলাদা হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাদের প্রকৃতি ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই অবান্তর কথাবার্তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ও পবিত্র।</p>
<p>আর তারা যদি বলে যে, এটি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং অন্য কিছুর মাধ্যমে টিকে আছে, তবে বিষয়টি দুই অবস্থার বাইরে হতে পারে না। হয় তা কোনো বৈশিষ্ট্য হবে, না হয় ক্ষণস্থায়ী গুণ হবে। যদি তারা একে ক্ষণস্থায়ী গুণ বলে, তবে স্বাভাবিকভাবেই একে কোনো আধারে বা জায়গায় থাকতে হবে, অথবা কোনো আধার ছাড়াই থাকতে হবে। যদি তারা বলে, এটি কোনো আধারে বা জায়গায় আছে, তবে সেই আধারটিও সেটির মতোই নশ্বর হবে এবং অনাদি নামটি প্রত্যেকের ক্ষেত্র থেকেই বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি বলে কোনো আধার ছাড়াই আছে, তবে তাও অসম্ভব; কারণ ক্ষণস্থায়ী গুণ তো নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না, তাহলে আধার ছাড়া সেটির অস্তিত্ব কীভাবে কল্পনা করা যায়? আর তারা যদি বলে যে, এই বৈশিষ্ট্যটি অনাদি। যেমনটা হুলুল ও তানাসুখ তথা অবতারবাদ ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীরা বলে থাকে এবং তারা এই বৈশিষ্ট্যকে আল্লাহ তায়ালার গুণ বলে মনে করে, তবে তাও অসম্ভব। কারণ আল্লাহ তায়ালার অনাদি গুণ কোনো মাখলুকের গুণ হয়ে যাবে, এটা হতেই পারে না।</p>
<p>আর যদি এটা মেনে নেওয়া সম্ভব হতো যে, আল্লাহর জীবন কোনো মাখলুকের জীবন হয়ে যাবে, তবে এটাও সম্ভব হতো যে, আল্লাহর কুদরত মাখলুকের ক্ষমতা হয়ে যাবে। এভাবে গুণটি তার আধারের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। সুতরাং, এটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে যে, একটি অনাদি গুণের জন্য কোনো সৃষ্টিশীল বা নশ্বর আধার থাকবে? স্বাভাবিকভাবেই অনাদি সত্তার সাথে নশ্বর সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যা-ই হোক, এই বিষয়ে নাস্তিকদের সব কথাই বাতিল ও ভিত্তিহীন।</p>
<p>আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী রুহ হলো মাখলুক। যে ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে বলবে, সে স্পষ্ট হঠকারিতা করছে এবং সে সৃষ্টি ও অনাদির মধ্যকার পার্থক্যটাই বোঝে না। কোনো অলির জন্য এটি কোনোভাবেই সংগত নয় যে, তিনি বেলায়েত লাভের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব গুণাবলির অংশীদার হবেন। আল্লাহ তায়ালা নিজের অনুগ্রহ ও দয়ায় আমাদের বিদআত, পথভ্রষ্টতা এবং শয়তানের কুপ্ররোচনা থেকে রক্ষা করে সুস্থ বুদ্ধি দান করেছেন, যার মাধ্যমে আমরা চিন্তা-ভাবনা ও সঠিক যুক্তি অনুধাবন করতে পারি। আল্লাহর প্রশংসায় বলতে হয়, তিনি আমাদের ইমানের মতো নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন, যার মাধ্যমে আমরা তাঁকে চিনতে পারি।</p>
<p>সেই প্রশংসার কী-ই বা মূল্য আছে যা নিজের শেষ সীমানায় পৌঁছায় না? কারণ আল্লাহর অসীম নেয়ামতের তুলনায় আমাদের এই সীমিত প্রশংসা তো খুবই সামান্য, যা কবুল হওয়ার অযোগ্য। আহলে জওয়াহের তথা বাহ্যিক দৃষ্টিসম্পন্ন আলেমরা যখন আরবাবে উসুল তথা মূল তত্ত্বজ্ঞানীদের কাছ থেকে এই ধরনের গভীর কথাবার্তা শুনল, তখন তারা ধারণা করতে শুরু করল যে, হয়তো সব সুফিদের বিশ্বাসই এমন। এই কারণে তারা সেই সব নেককার বুজুর্গদের প্রকাশ্য ত্রুটি বা ক্ষতি দেখতে লাগল এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হলো। তারা আল্লাহর বেলায়েতের সূক্ষ্ম রহস্য এবং খোদায়ি বাণীর জ্যোতি প্রকাশ হওয়া থেকে আড়ালে রয়ে গেল। এই কারণেই এই মহান বুজুর্গদের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করা তাঁদেরকে গ্রহণ করার মতোই, আর তাঁদেরকে গ্রহণ করা তাঁদের প্রত্যাখ্যান করার মতোই হয়ে থাকে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।</p>
<p><strong>রুহের ব্যাপারে মাশায়েখদের বাণী</strong></p>
<p>এক বুজুর্গ বলেন, الروح في الجسد كالنار في الحطب فالنار مخلوقة والفحم مصنوعة</p>
<p>শরীরে রুহের অবস্থান হলো কাঠে আগুনের মতো; আগুন যেমন সৃষ্টি, কয়লাও তেমনি উৎপাদিত বস্তু।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা-র সত্তা ও গুণাবলি ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে অনাদি মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল। হজরত আবু বকর ওয়াসিতি রহমতুল্লাহি আলাইহি রুহের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, الارواح على عشر مقامات &#8211; রুহসমূহ দশটি মাকাম তথা স্তরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।</p>
<p>১. পাপাচারীদের রুহ অন্ধকারে বন্দি থাকে এবং তারা ভালো করেই জানে যে, তাদের সাথে কী আচরণ করা হবে।</p>
<p>২. নেককার ও পরহেজগার মানুষদের রুহ ভালো কাজের ওসিলায় আকাশের নিচে সুখে থাকে এবং আল্লাহর আনুগত্যে আনন্দিত হয়ে তাঁর শক্তিতেই পথ চলে।</p>
<p>৩. মুহসিনিন তথা সৎকর্মশীলদের রুহ আলোর প্রদীপের মতো আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। ভালোবাসা হলো তাদের খাদ্য এবং আল্লাহর দয়া ও নৈকট্য হলো তাদের পানীয়।</p>
<p>৪. মুরিদিনদের রুহের ঠিকানা হলো চতুর্থ আসমানে। সেখানে তারা পরম সত্যের স্বাদ পায় এবং নিজেদের ভালো কাজের ছায়ায় ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করে।</p>
<p>৫. আহলে ওয়াফা তথা বিশ্বস্ত বান্দাদের রুহ পবিত্রতার পর্দা ও মাকামে ইস্তফায় পরম শান্তিতে থাকে।</p>
<p>৬. শহিদদের রুহ সবুজ পাখির রূপ ধারণ করে জান্নাত ও তার বাগানের মধ্যে বসবাস করে; তারা যখন যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারে।</p>
<p>৭. মুশতাকিন তথা আল্লাহর প্রেমের ব্যাকুল মানুষদের রুহ আদবের বিছানায় খোদার গুণাবলির নুরের পর্দার আড়ালে অবস্থান করে।</p>
<p>৮. আরেফদের শরীরের রুহসমূহ পবিত্রতার বিছানায় সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর বাণী শোনে এবং তারা দুনিয়া ও জান্নাতে নিজেদের থাকার জায়গা দেখে।</p>
<p>৯. প্রেমিক ও বন্ধুদের শরীরের রুহসমূহ আল্লাহর সৌন্দর্যের দর্শন এবং কাশফের মাকামে ডুবে থাকে। এ ছাড়া তারা অন্য কোনোকিছুর খবর রাখে না এবং এটি ছাড়া অন্য কিছুতে তারা শান্তি ও আরাম পায় না।</p>
<p>১০. দরবেশদের শরীরের রুহসমূহ ফানার মাকামে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং নিজেদের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে আধ্যাত্মিক অবস্থায় বদলে যায়।</p>
<p>তরিকতের পথপ্রদর্শকরা বর্ণনা করেন যে, মাশায়েখগণ প্রতিটি রুহকে তাদের আলাদা আলাদা আকৃতিতে দেখেছেন এবং এভাবে দেখা জায়েজ। আমরা আগেই বলেছি যে, রুহ হলো জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ, তাই এদের দেখা সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা যখন চান এবং যেভাবে চান, তাঁর কোনো বান্দাকে তা দেখিয়ে দেন।</p>
<p>হুজুর সাইয়্যেদুনা দাতা গঞ্জ বখশ রহমতুল্লাহি আলাইহি ফরমান, “আমার জীবন সব অবস্থায় হক তায়ালার সাথেই রয়েছে এবং তাঁর মাধ্যমেই টিকে আছে। আমাদের বাঁচিয়ে রাখা হক তায়ালারই কাজ। আমাদের অস্তিত্ব এবং আমাদের জীবন সবই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর জাত তথা সত্তা বা সিফাত তথা গুণাবলি থেকে তৈরি কোনো অংশ নয়।”</p>
<p>হুলুলিয়া তথা অবতারবাদে বিশ্বাসীদের কথা সম্পূর্ণ বাতিল এবং তা এক বিরাট পথভ্রষ্টতা। তাদের প্রথম ভুল কথাটি হলো তারা রুহকে কদিম তথা অনাদি বলে। যদিও তাদের বিভিন্ন দলের মুখের কথা আলাদা, কিন্তু সবগুলোর মূল অর্থ একই। তাদের একটি দল রুহকে নফস ও হিয়ুলা বলে, আরেকটি দল একে নুর ও জুলমত তথা আলো ও অন্ধকার বলে। আর এই সুফি তরিকার নিন্দা করার জন্য বা একে ভুল প্রমাণ করার জন্য একদল লোক একে ফানা ও বাকা বলে, আবার কেউ একে জমআ ও তফরিকা বলে থাকে। এই ধরনের নানা ফালতু কথা তারা বানিয়ে নিয়েছে এবং নিজেদের এই কুফরির জন্য বাহবা পেতে চায়।</p>
<p>সুফিয়ায়ে কেরাম এমন পথভ্রষ্ট দলগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও অসন্তুষ্ট। কারণ বেলায়েতের প্রমাণ এবং আল্লাহর ভালোবাসার আসল রূপ আল্লাহকে চেনা বা মারফাত ছাড়া কখনোই সঠিক হতে পারে না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কদিম তথা অনাদি সত্তাকে মুহাদ্দাস তথা সৃষ্ট বস্তু থেকে আলাদা করে চিনতে না পারবে, ততক্ষণ এই বিষয়ে সে যা-ই বলবে, তা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই হবে না। বুদ্ধিমানরা মূর্খদের কথার দিকে কান দেয় না।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2>গাউসে পাকের ভাষ্য – দেহে রুহের অবস্থান:</h2>
<p>গাউসে পাক রুহকে চারটি স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন। রুহে জিসমানি, রুহে রওয়ানি, রুহে সুলতানি ও রুহে কুদসি। প্রতিটি রুহের একটি নির্দিষ্ট দোকান আছে— যথাক্রমে বক্ষ, কলব, ফুয়াদ ও সির। প্রতিটির সম্পদ ভিন্ন— শরিয়ত, তরিকত, মারফত ও হাকিকত। আর প্রতিটির লাভ ভিন্ন— জান্নাত থেকে শুরু করে আল্লাহর নুরের সাক্ষাত পর্যন্ত। সবচেয়ে উচ্চ স্তর রুহে কুদসিতে গোপন রহস্যের জবানে তাওহিদের জিকির চলে।</p>
<p>‍তিনি বলেন, রুহে জিসমানির দোকান হলো শরীরের বক্ষ এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এর সম্পদ হলো শরিয়ত এবং এর ব্যবসা হলো আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বাহ্যিক হুকুমের ওপর শিরক ও রিয়া তথা লোকদেখানো ভাব থেকে মুক্ত হয়ে আমল করা, যেমনটি হক তায়ালার বাণী রয়েছে, وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا &#8211; আর কেউ যেন নিজের রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।</p>
<p>নিশ্চয় আল্লাহ এক এবং তিনি এককেই পছন্দ করেন। অর্থাৎ, আমলগুলো লোকদেখানো ভাব, কৃত্রিমতা এবং দুনিয়াবি লোভ-লালসা থেকে পবিত্র হতে হবে। কারণ বেলায়েত, মুকাশাফা এবং আলমে মুলক তথা দৃশ্যমান জগতে জমিন থেকে আকাশ পর্যন্ত সবকিছু দেখা এবং এই ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ করা— এগুলো আসলে রাহবানিয়ত তথা কঠোর শারীরিক সাধনার স্তর মাত্র। যেমন পানির ওপর দিয়ে হাঁটা, বাতাসে ওড়া, নিমেষেই দূরদূরান্তে পৌঁছে যাওয়া, দূর থেকে শুনতে পাওয়া এবং শরীরের ভেতরের গোপন রহস্য জেনে নেওয়া।</p>
<p>আখেরাতে এর লাভ হলো জান্নাত, হুর, প্রাসাদ ও গিলমান, শরাবান তহুরা এবং জান্নাতে আউলার অন্যান্য নেয়ামত লাভ করা, যাকে জান্নাতুল মাওয়া বলা হয়।</p>
<p><strong>‘</strong>রুহে রওয়ানি’র দোকান হলো কলব তথা অন্তর। এর সম্পদ হলো তরিকতের জ্ঞান এবং এর ব্যবসা হলো বারোটি মূল নামের মধ্যে প্রথম চারটি নাম হরফ ও আওয়াজ ছাড়া জিকির করা। হক তায়ালার বাণী রয়েছে, قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ أَيًّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى</p>
<p>হে মাহবুব, আপনি বলে দিন, তোমরা আল্লাহ নামে আহ্বান করো বা রহমান নামে আহ্বান করো, তোমরা যে নামেই আহ্বান করো না কেন, সব সুন্দর নাম তো তাঁরই।</p>
<p>وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا &#8211; আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব সুন্দর নাম, সুতরাং তোমরা তাঁকে সে-সব নামেই ডাকো।</p>
<p>এটি এই দিকে ইঙ্গিত করে যে, এই নামগুলো কলবি জিকির, অর্থাৎ বাতেনি জ্ঞানের স্থান এবং আল্লাহ তায়ালার মারেফাত হলো তাওহিদের নামসমূহ যেমন আল্লাহ, জাত-এ-আল্লাহ, লিল্লাহ, লাহু এবং হু-এর জিকিরেরই চূড়ান্ত ফলাফল। হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন—</p>
<p>أَنَّ لِلَّهِ تَعَالَى تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ &#8211; নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি সেগুলো গণনা করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।</p>
<p>তিনি আরও এরশাদ করেছেন, الدَّرْسُ حَرْفٌ وَالتَّكْرَارُ أَلْفٌ &#8211; পাঠ হলো একটি হরফ এবং তার পুনরাবৃত্তি হলো হাজার বার।</p>
<p>এই হাদিসে গণনা করা বলতে আল্লাহর প্রকাশ পাওয়া গুণাবলিতে গুণান্বিত হওয়া এবং আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। এই বারোটি নাম হলো তাওহিদের কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র বারোটি হরফ অনুযায়ী আল্লাহ তাবারকা ওয়া তায়ালার বারোটি মূল নাম। আল্লাহ তায়ালা কলেমা তাওহিদের বারোটি হরফের প্রত্যেকটি হরফের জন্য অন্তরের বিভিন্ন অবস্থা অনুযায়ী একটি করে নাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। প্রতিটি জগতের জন্য তিনটি করে নাম রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রেমিকদের অন্তরকে দৃঢ়তা দান করেন।</p>
<p>যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইমানদারদের এই সুদৃঢ় বাক্যের বরকতে পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে অবিচল রাখেন।</p>
<p>তিনি তাদের ওপর প্রশান্তিময় ভালোবাসা নাজিল করেন এবং তাওহিদের বৃক্ষকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন, যার শিকড় কেবল সাত জমিনেই নয়; বরং পাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং তার শাখা-প্রশাখা আসমানে আরশেরও ওপরে রয়েছে। হক তায়ালা এরশাদ করেছেন, كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ &#8211; পবিত্র বৃক্ষ তাওহিদের মতো, যার শিকড় মাটিতে সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে রয়েছে।</p>
<p>আর ‘রুহে সাইরানি’র লাভ হলো কলবের জীবন, যার মাধ্যমে একজন তালেব আলমে মালাকুত তথা আধ্যাত্মিক জগৎ অবলোকন করে। যেমন—জান্নাত ও জান্নাতিদের অবস্থা, জান্নাতের নুর ও ফেরেশতাদের অবলোকন করা। এ ছাড়া হরফ ও আওয়াজ ছাড়াই বাতেনি নামসমূহ প্রত্যক্ষ করে সে নিজের বাতেনি জবানে গোপন কথাবার্তা বলে থাকে। আখেরাতে রুহে সাইরানির ঠিকানা হলো দ্বিতীয় জান্নাত, যার নাম জান্নাতুন নাঈম।</p>
<p>‘রুহে সুলতানি’র দোকান হলো ফুয়াদ। এর সম্পদ হলো মারফাত এবং এর ব্যবসা হলো অন্তরের জবান দিয়ে মাঝখানের চারটি নামের স্থায়ী জিকির করা, যেমনটি হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন,</p>
<p>الْعِلْمُ عِلْمَانِ فَعِلْمٌ بِاللِّسَانِ فَذَلِكَ حُجَّةُ اللَّهِ عَلَى خَلْقِهِ وَعِلْمٌ بِالْجَنَانِ وَذَلِكَ الْعِلْمُ النَّافِعُ لِأَنَّ أَكْثَرَ الْمَنَافِعِ الْعِلْمُ فِي هَذِهِ الدَّائِرَةِ</p>
<p>জ্ঞান দুই প্রকার। এক প্রকার জ্ঞান হলো জবানের বা মুখের জ্ঞান, যা সৃষ্টিজীবের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণস্বরূপ। আর অন্যটি হলো অন্তরের জ্ঞান, আর এটিই হলো উপকারী জ্ঞান; কারণ এই স্তরের জ্ঞানের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উপকার রয়েছে।</p>
<p>এর অর্থ হলো, জ্ঞান দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো সেই জ্ঞান যার সম্পর্ক মুখের জবানের সাথে, যা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে মাখলুকের ওপর প্রমাণস্বরূপ। আর দ্বিতীয় জ্ঞানটি হলো সেই জ্ঞান, যার সম্পর্ক অন্তরের সাথে এবং সেটিই হলো আসল উপকারী জ্ঞান। এই পরিধি তথা মারফাতের পরিধিতে এই জ্ঞান সীমাহীন ফায়দাজনক।</p>
<p>হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, أَنَّ لِلْقُرْآنِ ظَهْرًا وَبَطْنًا &#8211; নিশ্চয় কুরআনের একটি জাহের তথা বাহ্যিক রূপ এবং একটি বাতেন তথা অভ্যন্তরীণ রূপ রয়েছে।</p>
<p>أَنَّ اللهَ أَنْزَلَ الْقُرْآنَ عَلَىٰ عَشْرَةِ أَبْطُنٍ فَكُلُّ مَا هُوَ أَبْطَنُ فَهُوَ أَنْفَعُ وَأَرْسَخُ لِأَنَّهُ مُخُّ</p>
<p>নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক কুরআন মাজিদকে দশটি বাতেন তথা অভ্যন্তরীণ স্তরে নাজিল করেছেন। অতএব, এর প্রতিটি স্তর অত্যন্ত উপকারী ও সুদৃঢ়, কারণ তা কুরআনের আসল মগজ।</p>
<p>আর এই বারোটি নাম সেই বারোটি ঝরনার মতো, যেগুলো হজরত মুসা আলাইহিস সালামের লাঠির আঘাতে প্রবাহিত হয়েছিল। সুরা আল-বাকারাহ’র ৬০ নম্বর আয়াতে হক তায়ালা এরশাদ করেছেন,</p>
<p>وَإِذِ اسْتَسْقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ ۖ فَانْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ</p>
<p>আর যখন মুসা নিজের সম্প্রদায়ের জন্য পানির প্রার্থনা করলেন, তখন আমি বললাম, আপনার লাঠি দিয়ে এই পাথরে আঘাত করুন। অমনি সেই পাথর থেকে বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হলো এবং প্রতিটি দল নিজেদের পানি পানের ঘাট চিনে নিল।</p>
<p>অতএব, জাহেরি জ্ঞানের উদাহরণ হলো সাময়িক বৃষ্টির মতো এবং বাতেনি জ্ঞান হলো আসল ঝরনার মতো। এই কারণেই এটি প্রথমটি অর্থাৎ জাহেরি জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি উপকারী। সুরা ইয়াসিনের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وَآيَةٌ لَهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَاهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ &#8211; আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো মৃত জমিন, যাকে আমি পুনরুজ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপাদন করেছি, যা থেকে তারা আহার করে।</p>
<p>আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এই বাহ্যিক দিগন্তের জমিন থেকে এমন শস্য উৎপাদন করেছেন যা নফসানি জীব তথা প্রাণীকুলের জন্য শক্তিদায়ক, আর অন্তরের জমিন থেকে সেই শস্য উৎপন্ন করেছেন যা রুহানি আত্মাসমূহের জন্য শক্তিদায়ক। হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, مَنْ أَخْلَصَ لِلَّهِ تَعَالَى أَرْبَعِينَ صَبَاحًا ظَهَرَتْ يَنَابِيعُ الْحِكْمَةِ مِنْ قَلْبِهِ عَلَىٰ لِسَانِهِ &#8211; যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাঁটি অন্তরে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে, তার অন্তর থেকে প্রজ্ঞার ঝরনাধারা তার জবানে জারি হয়ে যায়।</p>
<p>এই রুহে সুলতানির লাভ হলো খোদার সৌন্দর্যের প্রতিবিম্ব অবলোকন করা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَىٰ &#8211; অন্তর তা অস্বীকার করেনি যা সে দেখেছে।</p>
<p>হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ -মুমিন হলো মুমিনের আয়না।</p>
<p>এখানে প্রথম মুমিন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুমিন বান্দার কলব বা অন্তর, আর দ্বিতীয় মুমিন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ &#8211; আল্লাহই মুমিন এবং মুহাইমিন।</p>
<p>এই স্তরের অর্থাৎ রুহে সুলতানির ঠিকানা হলো তৃতীয় জান্নাত, যার নাম জান্নাতুল ফেরদাউস।</p>
<p>‘রুহে কুদসি’র দোকান হলো সির তথা গোপন রহস্যের কেন্দ্রে। এরশাদে বারি তায়ালা রয়েছে, الْإِنْسَانُ سِرِّي وَأَنَا سِرُّهُ &#8211; মানুষ আমার গোপন রহস্য এবং আমি মানুষের গোপন রহস্য।</p>
<p>এর সম্পদ হলো হাকিকতের জ্ঞান এবং সেটিই হলো তাওহিদের জ্ঞান। এর ব্যবসা হলো কোনো আওয়াজ ছাড়া, সির বা গোপন রহস্যের জবান দিয়ে শেষ চারটি তওহিদের নামের স্থায়ী জিকির। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وَإِنْ تَجْهَرْ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَىٰ &#8211; আর আপনি যদি উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন, তবে তিনি তো গোপন ও অতি গোপন রহস্যও জানেন।</p>
<p>সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ছাড়া কেউ এই কথা জানে না। আর এর লাভ হলো তিফলে মাআনি তথা আত্মিক শিশুর প্রকাশ এবং সির বা গোপন রহস্যের চোখ দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নুরের চেহারার জলাল ও জামাল অবলোকন করা ও সাক্ষাত লাভ করা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ &#8211; সেদিন অনেক চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।</p>
<p>অর্থাৎ কোনো মাধ্যম, অবস্থা এবং কোনো তুলনা ছাড়াই তারা আল্লাহকে দেখবে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ &#8211; তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।</p>
<p>মানুষ যখন নিজের আসল উদ্দেশ্যকে পেয়ে যায়, তখন বুদ্ধি গুলিয়ে যায়, অন্তর স্তব্ধ হয়ে পড়ে, জবান বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্য কাউকে এই দর্শনের কথা জানানোর মতো কোনো ক্ষমতাই আর তাদের থাকে না। কারণ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা সব ধরনের উপমা বা তুলনা থেকে পবিত্র।</p>
<p>অতএব, যখন এমন খবর আলেমদের কাছে পৌঁছাবে, তখন তাঁদের উচিত এই কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া, জ্ঞানের মাকাম বা স্তরগুলো বোঝা, এর সত্যতা যাচাই করা এবং ইল্লিয়্যিনের উচ্চ মাকামের দিকে নিজেদের লক্ষ্য রাখা। ইলমে লাদুন্নি এবং আল্লাহর একত্ববাদের মারফাত অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা উচিত এবং সামনে যে আলোচনাগুলো আসছে, সেগুলোর ওপর কোনো আপত্তি বা সেগুলোকে অস্বীকার না করা।<a href="#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে রুহ সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার গভীরতম স্তর পর্যন্ত। কুশাইরি মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন— রুহ সৃষ্ট, দেহ ও রুহের সমন্বয়েই মানুষ। ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন রুহুল আমরের মাধ্যমে কীভাবে ইলাহি জ্ঞান অবতীর্ণ হয় এবং নবী ও অলির পার্থক্য কোথায়। দাতা গঞ্জে বখশ ভ্রান্ত মতবাদগুলো খণ্ডন করে রুহের সূক্ষ্ম দেহ হওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন এবং রুহের দশ মাকামের মানচিত্র এঁকেছেন। আর গাউসে পাক রুহকে চার স্তরে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন, শরিয়ত থেকে হাকিকত পর্যন্ত সাধনার প্রতিটি স্তরে রুহেরও একটি নির্দিষ্ট মাকাম রয়েছে।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সবশেষে বলা যায়, রুহের রহস্য সম্পূর্ণ জানার ক্ষমতা মানুষের নেই, আল্লাহ নিজেই তা স্পষ্ট করেননি। কিন্তু রুহকে চেনার, সম্মান করার এবং তার যোগ্য করে তোলার পথই সুফি সাধনার মূল লক্ষ্য। রুহে কুদসির সাক্ষাত লাভ মানেই আল্লাহর নুরের দিদার; আর এটাই প্রতিটি সাধকের চূড়ান্ত গন্তব্য।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/ruh/">রুহ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/ruh/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>নাফাস</title>
		<link>https://sufigraphy.com/nafas/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/nafas/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 07 Jul 2026 10:02:20 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3951</guid>

					<description><![CDATA[<p>সুফি সাধনার পথে নাফাস বা শ্বাস শুধু ফুসফুসের ক্রিয়া নয়; এটি আধ্যাত্মিক জীবনের গভীরতম পরিমাপক। প্রতিটি শ্বাস হয় মারিফত ও তাওহিদের নির্দেশনা নিয়ে আসে, নয়তো গাফলতের বিছানায় মৃত হয়ে অতিবাহিত হয়। আনফাসের অধিকারী হলেন সর্বোচ্চ স্তরের সাধক, যাঁর আধ্যাত্মিক অনুভব শ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যাঁর ওপর গাইবাত ও হুজুরের পালাবদল আর ঘটে না। ওয়াক্ত হলো শুরুর [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/nafas/">নাফাস</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সুফি সাধনার পথে নাফাস বা শ্বাস শুধু ফুসফুসের ক্রিয়া নয়; এটি আধ্যাত্মিক জীবনের গভীরতম পরিমাপক। প্রতিটি শ্বাস হয় মারিফত ও তাওহিদের নির্দেশনা নিয়ে আসে, নয়তো গাফলতের বিছানায় মৃত হয়ে অতিবাহিত হয়। আনফাসের অধিকারী হলেন সর্বোচ্চ স্তরের সাধক, যাঁর আধ্যাত্মিক অনুভব শ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যাঁর ওপর গাইবাত ও হুজুরের পালাবদল আর ঘটে না। ওয়াক্ত হলো শুরুর মানুষের জন্য, হাল মাঝামাঝি স্তরের জন্য, আর আনফাস পূর্ণতার জন্য। ইবনে আরাবি এই নাফাসকে মহাজাগতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন; আল্লাহর নাফাস থেকেই সমস্ত সৃষ্টির উৎপত্তি, আর মানুষের শ্বাস থেকে বর্ণের উৎপত্তি।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি নাফাসকে গায়েবি লতিফ অনুগ্রহের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি লাভ বলেছেন। ওয়াক্ত প্রারম্ভিক, হাল মধ্যবর্তী, আর আনফাস চূড়ান্ত স্তর। আরিফের নাফাস সম্পূর্ণ শান্ত থাকতে পারে না, কারণ তার স্তরে কোনো শিথিলতা নেই। আর প্রেমিকের জন্য নাফাস অপরিহার্য; না হলে সে বিলুপ্ত হয়ে যেত। সর্বোত্তম ইবাদত হলো প্রতিটি শ্বাস আল্লাহর স্মরণে গণনা করা।</p>
<p>তিনি বলেন, নাফাস হলো গায়েবি লতিফ তথা অদৃশ্যের সূক্ষ্ম অনুগ্রহসমূহের মাধ্যমে অন্তরসমূহের প্রশান্তি লাভ করা, আর আনফাস তথা আধ্যাত্মিক শ্বাস-প্রশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তি আত্মিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী ব্যক্তির চেয়েও সূক্ষ্মতর। বিষয়টি এমন যেন ওয়াক্ত তথা আধ্যাত্মিক সময়ের অধিকারী ব্যক্তি হলেন প্রারম্ভিক স্তরের সাধক, আনফাসের অধিকারী ব্যক্তি হলেন চূড়ান্ত স্তরের সাধক এবং আহওয়ালের অধিকারী ব্যক্তি হলেন এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী সাধক।</p>
<p>সুতরাং আহওয়াল হলো আধ্যাত্মিক মাধ্যম বা অন্তর্বর্তী সোপানসমূহ এবং আনফাস হলো আত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায়।</p>
<p>অতএব আধ্যাত্মিক সময়সমূহ হলো কলবসমূহের অধিকারীদের জন্য, আহওয়াল হলো আরওয়াহ তথা রুহসমূহের অধিকারীদের জন্য এবং আনফাস হলো অন্তরের পরম গোপন রহস্যের অধিকারীদের জন্য।</p>
<p>আর সুফি মনীষীগণ বলেছেন, “সর্বোত্তম ইবাদত হলো আল্লাহ তায়ালা এর স্মরণে নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস গণনা করা তথা সদা সচেতন থাকা।”</p>
<p>তারা আরও বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলোকে মারেফতের খনি বানিয়েছেন, আর তার অন্তরালে পরম গোপন অন্তস্তল সৃষ্টি করে তাকে তাওহিদের প্রধান কেন্দ্র করেছেন। সুতরাং চরম অবহেলা ও উদাসীনতার বিছানায় যে শ্বাস মারেফাতের কোনো প্রকার নির্দেশনা এবং তাওহিদের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছাড়া অতিবাহিত হয়, তা মূলত মৃত এবং তার অধিকারীকে এই শ্বাসের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”</p>
<p>আমি হজরত উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আরেফ তথা প্রকৃত আল্লাহ-সচেতন ব্যক্তির নাফাস বা শ্বাস সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শান্ত থাকে না, কারণ তার আধ্যাত্মিক স্তরে কোনো প্রকার শিথিলতা বা ছাড় চলে না। পক্ষান্তরে মুহিব্ তথা ঐশ্বরিক প্রেমিকের জন্য নাফাস বা প্রেমের দীর্ঘশ্বাস অপরিহার্য; কেননা তার যদি এই নাফাসটুকু না থাকত, তবে সে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেত, যেহেতু তা বর্জন করার সামর্থ্য তার নেই।”<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">ইবনে আরাবি নাফাসকে মহাজাগতিক রহস্যের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। তাঁর মতে মহাবিশ্বের প্রতিটি শ্বাস আল্লাহর নাফাস থেকেই নির্গত; সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর বাণীসমূহ, আর সেই বাণী তাঁর নাফাসের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের আটাশটি উচ্চারণস্থান আটাশটি চন্দ্রনিবাসের অনুরূপ। শ্বাস থেকে বর্ণ, বর্ণ থেকে শব্দ; ঠিক তেমনি আদি কুহেলিকা থেকে সৃষ্টিজগতের উৎপত্তি। হরফে হাবি, ওয়াও, ইয়া; এই তিন স্তর ফেরেশতাজগত, মানবিক বার্তা ও মূল উৎসের প্রতীক। নবীজির হাদিস, “ইয়েমেনের দিক থেকে রহমানের নাফাস পাচ্ছি” এই বৃহত্তর সত্যেরই ইঙ্গিত। ইনসানে কামেল হলো সেই বরজখ, যিনি হক ও খলকের মাঝে মধ্যবর্তী সেতু। আল্লাহর রহমত নাফাস রহমানির মাধ্যমে সৃষ্টিকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছে।</p>
<p>نَفَسُ الأَكْوَانِ مِن نَفَسِهِ وَهُوَ وَحْيُ الحَقِّ فِي جَرَسِهِ</p>
<p>মহাবিশ্বের প্রতিটি শ্বাস মূলত তাঁরই নাফাস হতে নির্গত এবং তা সৃষ্টির ঘণ্টার ধ্বনিতে সত্যের ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ।</p>
<p>وَكَلَامُ الحَقِّ شَاهِدُهُ أَثَرٌ فِي الكَوْنِ مِن نَفَسِهِ</p>
<p>আর হকের বাণীই এর ওপর সাক্ষী, যা মহাবিশ্বের বুকে তাঁরই নাফাসের এক দৃশ্যমান প্রভাব।</p>
<p>إِنَّ مُوسَى قَبْلُ أَبْصَرَهُ فِي اشْتِعَالِ النَّارِ فِي قَبَسِهِ</p>
<p>নিশ্চয় ইতিপূর্বে হজরত মুসা তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যখন তিনি জ্বলন্ত আগুনের স্ফুলিঙ্গ অবলোকন করেছিলেন।</p>
<p>مَعْدِنُ الرَّاحَاتِ فِيهِ فَمَنْ نَاظِرٌ فِيهِ وَفِي حَرَسِهِ</p>
<p>এর মাঝেই নিহিত রয়েছে সমস্ত প্রশান্তির খনি, সুতরাং যে ব্যক্তি এর প্রতি এবং এর সুরক্ষার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে—</p>
<p>রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের অনিষ্ট থেকে নিজের সুরক্ষার বিষয়টি তথা আল্লাহ কর্তৃক তাকে নিরাপদ রাখার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে অবগত হওয়ার পূর্বে (যা ‘সুরা আল-মায়েদা’-এর ৬৭ নম্বর আয়াতের আল্লাহর এই বাণী: <strong>وَاللَّهُ</strong> <strong>يَعْصِمُكَ</strong> <strong>مِنَ</strong> <strong>النَّاسِ</strong> &#8211; আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করবেন) যখন কোনো স্থানে যাত্রাবিরতি করতেন, তখন বলতেন, “আজ রাতে আমাদের কে পাহারা দেবে?” অথচ তিনি মনেপ্রাণে জানতেন যে, আল্লাহ ‘সুরা হুদ’-এর ৫৭ নম্বর আয়াত অনুযায়ী সবকিছুর ওপর পরম সংরক্ষক। <strong>عَلَى</strong> <strong>كُلِّ</strong> <strong>شَيْءٍ</strong> <strong>حَفِيظٌ</strong> &#8211; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর পরম রক্ষক।</p>
<p>এবং তিনি যখন বিরোধীদের পক্ষ থেকে তীব্র দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, <strong>إنَّ</strong> <strong>نَفَسَ</strong> <strong>الرَّحْمَنِ</strong> <strong>يَأْتِينِي</strong> <strong>مِنْ</strong> <strong>قِبَلِ</strong> <strong>الْيَمَنِ</strong> &#8211; নিশ্চয়ই আমি ইয়েমেনের দিক থেকে রহমানের নাফাস তথা পরম করুণাময়ের স্বস্তিদায়ক সাহায্য পাচ্ছি।</p>
<p>আর এই নাফাস তথা ঐশ্বরিক সাহায্য ছিল আনসার তথা মদিনার আনসার সাহাবিগণ। জেনে রাখুন, বিদ্যমান বস্তুসমূহ বা সৃষ্টিজগৎ হলো আল্লাহ তায়ালার এমন বাণীসমূহ যা কখনো শেষ হয় না। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসা আলাইহিস সালামের অস্তিত্বের ও সৃষ্টির রহস্যের ব্যাপারে অবগতি দান করে ‘সুরা আন-নিসা’-এর ১৭১ নম্বর আয়াতে বলেছেন যে, <strong>وَكَلِمَتُهُ</strong> <strong>أَلْقَاهَا</strong> <strong>إِلَى</strong> <strong>مَرْيَمَ</strong> &#8211; এবং তিনি তাঁর সেই বাণী, যা তিনি মরিয়মের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।</p>
<p>আর তিনিই হলেন হজরত ইসা আলাইহিস সালাম। এই কারণেই আমরা বলেছি যে, শ্রবণযোগ্য তথা শরয়ি প্রমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিদ্যমান বস্তু বা সৃষ্টিজগৎ হলো আল্লাহ তায়ালার কালাম তথা অসীম বাণীসমূহ; কারণ কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন কিংবা বিশেষ ঐশ্বরিক পরিচিতি সম্পর্কে আমরা যা দাবি করি, সে ব্যাপারে জগতের প্রত্যেকে আমাদের সত্যবাদী বলে স্বীকার করবে না। আর সাধারণ পরিভাষায় সুপরিচিত শব্দ বা বাণীসমূহ মূলত নাফাস তথা ফুসফুস থেকে নির্গত শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস থেকেই তৈরি হয়, যা মাখরাজ তথা নির্দিষ্ট উচ্চারণ স্থানসমূহে বাধা পেয়ে খণ্ডিত আকারে প্রকাশ পায়। ফলে সেই খণ্ডিত উচ্চারণের স্থানে সুনির্দিষ্ট অনুপাতে হরফ বা বর্ণসমূহের মূল রূপ প্রকাশ পায় এবং তা থেকেই শব্দ বা কালামের সৃষ্টি হয়।</p>
<p>এই অধ্যায়ে আমরা যা উপস্থাপন করছি সেদিকে গভীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আপনাকে সতর্ক করছি।  জেনে রাখুন যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর আরশের ওপর কেবল ‘আর-রহমান’ নামের মাধ্যমেই ইস্তিওয়া তথা অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিজগৎকে অবগতি দান করেছেন যে, তিনি সৃষ্টির অস্তিত্বদানের মাধ্যমে মূলত সৃষ্টিজীবের প্রতি রহমত বর্ষণ করতে চেয়েছেন এবং এই বিশেষ বিবরণে তিনি অন্য কোনো নামের উল্লেখ করেননি। তিনি জড়জগৎ বা দৃশ্যমান জগতের সবচেয়ে বিশাল, পরিব্যাপ্ত ও মহান সৃষ্টি তথা আরশের ওপর ইস্তিওয়া বা অধিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন; কারণ দুঃখ-কষ্ট বা বেদনার মূল প্রকাশ কেবল তরকিব তথা বিভিন্ন উপাদানের জটিল মিশ্রণ বা শারীরিক কাঠামোর মধ্যেই ঘটতে পারে। পক্ষান্তরে বাসাইত তথা সরল, অবিমিশ্র ও অবিভাজ্য সত্তা স্বয়ং নিজের মধ্যে এমন কোনো গুণের স্থায়িত্ব গ্রহণ করে না, বরং তা স্ব নিজেই মূল অর্থের প্রকাশ এবং তা জগতের প্রতি রহমতের ব্যাপকতার প্রমাণ দেয়। আর যদি কখনো সাময়িকভাবে কোনো বালা-মুসিবত বা বিপদের আগমন ঘটে, তবে তাও মূলত এক প্রকার রহমত বা দয়া; যেমনটি আমরা তিক্ত ওষুধ সেবনের উদাহরণে উল্লেখ করেছি যে, ওষুধ সেবনের আসল উদ্দেশ্য রোগীকে কষ্ট দেওয়া বা যাতনা দেওয়া নয়; বরং তা ব্যবহারের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এর শেষ পরিণতিতে যে আরাম ও পরম সুস্থতা লাভ হয় তা অর্জন করা।</p>
<p>অতঃপর এর পরে জেনে রাখুন যে, পরম সত্য আল্লাহ নিজেকে ‘আজ-জাহির’ তথা প্রকাশ্য এবং ‘আল-বাতিন’ তথা অপ্রকাশ্য নামে অভিহিত করেছেন। সুতরাং জাহির বা প্রকাশ্য রূপটি হলো সে-সব সুরত বা অবয়বের জন্য যেগুলোতে তিনি রূপান্তর বা আত্মপ্রকাশ ঘটান, আর বাতিন বা অপ্রকাশ্য রূপটি হলো সেই গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থের জন্য, যা সেই অবয়বসমূহের রূপান্তর ও বহিঃপ্রকাশকে গ্রহণ করে। অতএব তিনি তাঁর বাতিন বা অপ্রকাশ্য গুণের কারণে হলেন অদৃশ্য এবং তাঁর জাহির বা প্রকাশ্য গুণের কারণে হলেন দৃশ্যমান, যা ‘সুরা আর-রাদ’-এর ৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। <strong>عَالِمُ</strong> <strong>الْغَيْبِ</strong> <strong>وَالشَّهَادَةِ</strong> &#8211; তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাত।</p>
<p>আর আমি আপনাকে পূর্বেই অবগতি দিয়েছি যে, এই জগৎ হলো সত্যের অবয়বে নির্মিত একটি ঐশ্বরিক অনুলিপি বা প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই আমরা বলেছি যে, সমস্ত বস্তু সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান হলো মূলত তাঁর নিজের সত্তা সম্পর্কিত জ্ঞান; ফলে আমরা সুরত বা অবয়বের মাধ্যমে তাঁর হুকুম বা বিধানের স্বরূপ নির্দেশ করেছি এবং এভাবেই ঐশ্বরিক আসমা তথা নামসমূহ অবতীর্ণ হয়েছে। আর সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, <strong>خَلَقَ</strong> <strong>اللهُ</strong> <strong>آدَمَ</strong> <strong>عَلَى</strong> <strong>صُورَتِهِ</strong> &#8211; নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আদমকে তাঁর নিজস্ব সুরতে সৃষ্টি করেছেন।”</p>
<p>আর তিনিই হলেন ইনসানে কামিল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব, যিনি এই মহাবিশ্বের অতীত ও বর্তমানের সমস্ত হাকিকত তথা পরম সত্যের এক সংক্ষিপ্ত ও প্রকাশ্য রূপ। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নাফাস তথা ফুসফুসের শ্বাসকে অন্তর থেকে নির্গত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এমন এক উদ্দেশ্যে যা তিনি অবগতি দিয়েছেন এবং আমরাও তা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং যখন কোনো নাফাস গ্রহণকারী বা শ্বাসপ্রশ্বাসকারী ব্যক্তি কথা বলার ইচ্ছা করে, তখন তা নির্দিষ্ট মাখরাজ তথা উচ্চারণ স্থানসমূহ খুঁজে পায়। আর যদি সে কথা বলার ইচ্ছা নাও করে, তবে সেই নাফাস বা শ্বাস কেবল ‘হরফে হাবি’ তথা শূন্যে পতনশীল বা প্রসারিত হরফ হিসেবে নির্গত হয়, যা আমাদের নিকট সাধারণ হরফ বা বর্ণের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এই হরফটি তিনটি স্তরে স্বীয় সত্তাগতভাবে পতিত বা প্রসারিত হয়, যাকে আলিফ দ্বারা প্রকাশ করা হয় এবং ক্বারি বা কুরআন পাঠকদের নিকট এটি ‘আল-হারফুল হাবি’ নামে পরিচিত।</p>
<p>অতঃপর এই নাফাস বা শ্বাস যখন তার পতনের সময় ঊর্ধ্বজগতের রুহসমূহের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন তার থেকে ‘ওয়াও ইল্লত’ তথা ব্যাখ্যামূলক ওয়াও বর্ণের সৃষ্টি হয়, যা হরফকে পেশ দেওয়ার কারণে নাফাসকারী বা শ্বাস গ্রহণকারীর বাতাস প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ঘটে এবং এটি পেশের হরকতের পূর্ণতার রূপ। আর যখন এই শ্বাস তার প্রবাহকালে নিচের দিকের প্রাকৃতিক বা জড় উপাদানসমূহের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন তার থেকে ‘ইয়া ইল্লত’ বর্ণের সৃষ্টি হয়, যা হরফকে যের দেওয়ার কারণে শ্বাস গ্রহণকারীর বাতাস প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ঘটে; কারণ নিচের দিকে ঝুঁকে পড়া হলো নিম্নজগতের বৈশিষ্ট্য। আর এই নাফাসের প্রবাহে এই তিনটি স্তর ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছু নেই, সুতরাং তা ভালো করে জেনে রাখুন। অতঃপর পূর্বের বর্ণে পেশ যুক্ত ওয়াও-এর মাধ্যমে ফেরেশতা বা মালাকূতি বার্তার সৃষ্টি হয়েছে এবং পূর্বের বর্ণে যের যুক্ত ইয়া-এর মাধ্যমে মানবীয় বা বাশারি বার্তার সৃষ্টি হয়েছে, আর আলিফ ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মূল উৎসস্বরূপ, যা সমস্ত আসবাব তথা কারণসমূহের প্রধান কারণ।</p>
<p>আর আল্লাহ তায়ালা যখন নিজের সত্তা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি জাহির ও বাতিন এবং তাঁর কালাম ও বাণীসমূহ রয়েছে, তখন তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘আর-রহমান’ তথা পরম করুণাময় নামের অধীনে তাঁর একটি নাফাস বা শ্বাস রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি আরশের ওপর ইস্তিওয়া বা অধিষ্ঠিত হয়েছেন। আর এই বিষয়ে ‘সুরা আল-ফুরকান’-এর ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:, <strong>فَاسْأَلْ</strong> <strong>بِهِ</strong> <strong>خَبِيرًا</strong> &#8211; সুতরাং তাঁর সম্পর্কে কোনো অবগত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করুন।</p>
<p>আর তিনি হলেন আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে কোনো আরিফ তথা তত্ত্বজ্ঞানী, তিনি কোনো নবী হতে পারেন কিংবা অন্য কেউ হতে পারেন যাদের আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে ইচ্ছা করেন। কারণ তিনি ‘সুরা আল-বাকারাহ’র ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ &#8211; তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত তথা প্রজ্ঞা দান করেন।</p>
<p>এখানে বিষয়টিকে সাধারণ বা অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি; সুতরাং এটি এমন এক পরিচিতির মধ্যে অনির্দিষ্ট বিষয়, যা স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, কারণ সমস্ত বিষয়সমূহ তাঁর নিকট সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত। তাঁর শানে কোনো সংক্ষিপ্ততা কিংবা অস্পষ্টতা অবান্তর। যদিও জগতবাসীর জন্য বিষয়টি সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট হতে পারে এবং এর বাইরেও আরও অনেক কিছু থাকতে পারে। অতঃপর যখন আমরা জানতে পারলাম যে, তাঁর একটি নাফাস তথা শ্বাস রয়েছে, এবং তিনি ‘আল-বাতিন’ তথা অপ্রকাশ্য, এবং তাঁর কালাম তথা বাণী রয়েছে এবং সমস্ত বিদ্যমান বস্তুসমূহ বা সৃষ্টিজগৎ হলো তাঁরই কালিমাত তথা বাণীসমূহ, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ আমাদের এই বিষয়ে কেবল এই জন্যই অবগতি দান করেছেন, যাতে আমরা বিষয়ের হাকিকত তথা প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারি যে, আমরা তাঁরই সুরত বা প্রতিচ্ছবিতে সৃষ্ট। অতএব, আমরা উলুহিয়াত তথা খোদার প্রতি আরোপিত সমস্ত বিষয়কে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করি, যা রসুলদের পবিত্র জবানিতে এবং অবতীর্ণ কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে।</p>
<p>আর তিনি মানুষের মধ্যে বাকশক্তিকে পূর্ণাঙ্গরূপে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের নাফাস তথা শ্বাসের জন্য আটাশটি মাকতা তথা উচ্চারণ স্থান নির্ধারণ করেছেন, যার প্রতিটি মাকতা থেকে একটি সুনির্দিষ্ট হরফ বা বর্ণ প্রকাশ পায়, যা অন্য বর্ণটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মাকতা বা উচ্চারণ স্থানই এদের পৃথক করে দেয়, যদিও এগুলো মূল নাফাস বা শ্বাস ছাড়া অন্য কিছু নয়। সুতরাং, নাফাস বা শ্বাসের দিক থেকে এর সত্তা এক ও অভিন্ন। কিন্তু মাকতা বা উচ্চারণ স্থানের দিক থেকে তা বহু ও বিবিধ। আর তিনি এর সংখ্যা আটাশটি নির্ধারণ করেছেন, কারণ এই বিশ্বজগৎ আটাশটি মানাজিল তথা চন্দ্রনিবাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার বুরুজসমূহ তথা রাশিসমূহের মধ্যে গ্রহসমূহ বিচরণ করে এবং গোলাকার আসমানে বা ফলকে এগুলো হলো গ্রহদের নির্ধারিত স্থান; ঠিক যেমন মানুষের নাফাস বা শ্বাসের মখরাজ তথা উচ্চারণ স্থানসমূহ যা বিশ্বজগৎ এবং তার জন্য কল্যাণকর সবকিছু সৃষ্টির মাধ্যমস্বরূপ। আর এই মাকতা বা উচ্চারণ স্থানসমূহ— যা হরফসমূহের অইয়ান তথা মূল সত্তাকে প্রকাশ করেছে, তা প্রতিটি জগতের অস্তিত্ব দান করেছে।</p>
<p>অঁতপর তিনি এই মাকতা বা উচ্চারণ স্থানগুলোকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন: একটি অংশ যা অন্য প্রান্ত থেকে দূরবর্তী। এর মধ্যে একটি দূরবর্তী অংশকে বলা হয় হুরুফে হলকি তথা কণ্ঠনালীর বর্ণসমূহ এবং এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। আর দ্বিতীয় দূরবর্তী অংশটি হলো হুরুফুশ শাফাতাইন তথা ওষ্ঠ্যবর্ণসমূহ এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অংশটি হলো হুরুফে ওসত তথা মধ্যবর্তী বর্ণসমূহ। নিশ্চয়ই ঐশ্বরিক হাজরাত তথা আল্লাহর দরবার তিনটি স্তরে বিন্যস্ত: বাতিন তথা অপ্রকাশ্য, জাহির তথা প্রকাশ্য এবং ওয়াস্ত তথা মধ্যবর্তী স্তর। আর এই মধ্যবর্তী স্তরটিই জাহিরকে বাতিন থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন করে, যা মূলত বরজখ তথা অন্তর্বর্তী পর্দা। এর একটি দিক বাতিনের দিকে এবং অন্য দিকটি জাহিরের দিকে উন্মুখ থাকে, বরং এটি স্বয়ং সেই প্রকাশেরই মূল রূপ, কারণ তা বিভাজনযোগ্য নয়।</p>
<p>আর এটিই হলো ইনসানে কামিল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব, যাকে হক তথা পরম সত্য আল্লাহ নিজের ও সৃষ্টিজগতের মাঝে বরজখ বা অন্তর্বর্তী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে তিনি ঐশ্বরিক আসমা তথা নামসমূহের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘হক’ তথা খোদার জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হন, আবার ইমকান তথা সম্ভাব্যতার হাকিকতে প্রকাশিত হয়ে ‘খলক’ তথা সৃষ্টির রূপে প্রতিভাত হন। আর আল্লাহ একে তিনটি মারতাবা তথা স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। আকল তথা বুদ্ধি এবং হিসস তথা ইন্দ্রিয়ানুভূতি, যা দুটি প্রান্তস্বরূপ, এবং খেয়াল তথা কল্পনা, যা অর্থ এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্যবর্তী বরজখ বা অন্তরাল।</p>
<p>অতঃপর আল্লাহ যখন আমাদের এই পরিচয় দিলেন যে, তিনি বাতিন ও জাহির, এবং তাঁর নাফাস, কালিমা ও কালিমাত তথা বাণীসমূহ রয়েছে, তখন আমরা লক্ষ করলাম যে, এর মধ্য থেকে যা কিছু প্রকাশ পেয়েছে এবং যা কিছু তাঁর সত্তার দিকে সম্বন্ধযুক্ত নয়, তা হলো নাফাস এবং তা থেকে যা কিছু সৃষ্টি হয়। তখন আমরা বললাম, নাফাসের মূল সত্তা বা আইন হলো ‘আমা’ তথা আদি কুহেলিকা। কেননা, যার শ্বাস নির্গত হয় তার নাফাস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যা সাধারণ বিবরণে বাতাসের স্থলাভিষিক্ত হয়, কিন্তু তা মূলত বাষ্পের স্থলাভিষিক্ত হয়। সুতরাং, নাফাসের হাকিকত বা প্রকৃত রূপ যেখানেই থাকুক না কেন তা এমনই, আর তা থেকেই আমার উৎপত্তি ঘটেছে; ঠিক যেমন মৌলিক উপাদান বা আরকানের আর্দ্রতার বাষ্প থেকে কুহেলিকা বা মেঘের সৃষ্টি হয়, যা উচ্চে আরোহণ করে এবং প্রথমে মেঘের রূপ ধারণ করে, অতঃপর তা ঘনীভূত হয় এবং হাওয়া বা বাতাস তাকে বহন করে ও প্রবহমান বায়ু তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। সুতরাং তা হুবহু বাতাস নয়, বরং তা মূলত বাষ্পেরই রূপ।</p>
<p>আর এই কারণেই সেই আদি কুহেলিকার বৈশিষ্ট্যে বর্ণিত হয়েছে— যার মধ্যে সৃষ্টির পূর্বে আমাদের রব ছিলেন; যে এটি এমন এক কুহেলিকা যার ওপরেও কোনো বাতাস নেই এবং যার নিচেও কোনো হাওয়া নেই। অতঃপর তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর জন্য ‘ফওক’ তথা ঊর্ধ্বতা রয়েছে, যা তাতে হকের অবস্থানকে নির্দেশ করে, এবং ‘তাহত’ তথা নিম্নতা রয়েছে যা সৃষ্টিজগতের অবস্থানকে নির্দেশ করে। ফলে সেখানে হকের নাফাস বা শ্বাস ছাড়া অন্যকিছুর অস্তিত্ব ছিল না এবং তার মধ্যেই হাওয়ার উৎপত্তি হয়। আর তখন মৃদু মন্দ থেকে শুরু করে তীব্র ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে, যা মূলত হুরুফে শাদিদাহ তথা কঠোর বর্ণসমূহ এবং রখওয়াহ তথা কোমল বর্ণসমূহের প্রতীক। আর এই নাফাস বা শ্বাস থেকেই মেঘের গর্জনের আওয়াজ প্রকাশিত হয়েছে, যা হুরুফে মাজহুরা তথা উচ্চৈঃস্বরা বর্ণের মতো, এবং মৃদু সমীরণ প্রবাহিত হয়েছে, যা হুরুফে মাহমুসাহ তথা ফিসফিসানি বর্ণের মতো। আর আসমানসমূহে তি বাক তথা স্তরে স্তরে বিন্যস্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে যা মানুষের কথা বলার সময় নির্গত নাফাস থেকে উৎপন্ন হুরুফে মুতবাকা তথা আবৃত বর্ণসমূহের মতো, যখন সে কোনো উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে। আর ঐশ্বরিক বিষয়ের ক্ষেত্রে যখন আমরা কোনোকিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করি, তখন তাঁর বাণী হলো—</p>
<p>إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ</p>
<p>কোনোকিছুকে যখন আমরা ইচ্ছা করি, তখন আমাদের কথা কেবল এইটুকুই হয় যে, আমরা বলি ‘হও’, ব্যস, তা হয়ে যায়। সুরা আন-নাহল, আয়াত ৪০।</p>
<p>সুতরাং ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে হুরুফে মুতবাকা তথা আবৃত বর্ণসমূহ হলো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সাত আসমানের অস্তিত্বের প্রতীক এবং এই বিশ্বজগতের প্রতিটি বিদ্যমান বস্তু বা সৃষ্টি এই ইনতিবাক তথা স্তরীভূত নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এই খোদায়ি নাফাসের মধ্যে সৃষ্টির সূচনা বা অস্তিত্বের উন্মোচন ঘটেছে ‘কওন’ তথা মহাজাগতিক অস্তিত্বের মাধ্যমে, যখন তিনি ছিলেন এবং তাঁর সাথে অন্য কোনোকিছুর অস্তিত্ব ছিল না; আর শ্বাস গ্রহণকারীর মধ্যে একে হুরুফে মুনফাতিহা তথা উন্মুক্ত বর্ণসমূহের হাকিকত বা রূপ দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>অতঃপর তিনি যখন বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন এবং আদি কুহেলিকার বুকে তার সুরতকে উন্মোচিত করলেন; যা এমন এক নাফাস যার মাধ্যমে জগতের সমস্ত স্তরসমূহ ও অইয়ান তথা মূল সত্তাসমূহ সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি তার মনজিলসমূহকে পৃথক করে দিয়েছেন, তখন তিনি তা থেকে জড়জগৎ বা বস্তুজগৎ সৃষ্টি করলেন, যা হুরুফে মুনসাফিলা তথা নিম্নগামী বর্ণসমূহের মতো। কারণ তা প্রকৃতির দিক থেকে নিম্নমুখী এবং তা প্রকৃতির অন্ধকারময় মহাবিশ্বের শেষ সীমানা; এবং তিনি তা থেকে আলমে আরওয়াহ তথা রুহজগৎ সৃষ্টি করেছেন, যা শ্বাস গ্রহণকারীর নাফাসের মধ্যে হুরুফে মুসতালিয়াহ তথা ঊর্ধ্বমুখী বর্ণসমূহের প্রতীক। জেনে রাখুন, এই সবকিছুই হলো মহাবিশ্বের কালিমাত তথা বাণীসমূহ; মানুষের ক্ষেত্রে এর একক রূপকে হরফ বা বর্ণ বলা হয় এবং এর যৌগিক রূপকে কালিমা বা শব্দ বলা হয়। অনুরূপভাবে বিদ্যমান বস্তুসমূহের অইয়ান তথা মূল সত্তাগুলো এককভাবে হরফ এবং তাদের পারস্পরিক মিশ্রণের দিক থেকে কালিমাত তথা বাণীসমূহ।</p>
<p>আর তিনি সৃষ্টির প্রতি রহমতের দিক থেকে ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে অস্তিত্বদানের প্রধান কারণ নিহিত রেখেছেন, যেন তাদের আদমের তথা অনস্তিত্বের মন্দ দশা থেকে অস্তিত্বের কল্যাণের দিকে বের করে আনা যায়; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি ‘হরফে হাবি’ তথা প্রসারিত বর্ণের মাধ্যমে ঘটেছে। অতঃপর তিনি মালাইকা তথা ফেরেশতাকুল এবং মানুষের মধ্য থেকে রসুল প্রেরণের মাধ্যমে তাদের জন্য এমন এক অস্তিত্বের কথা স্পষ্ট করেছেন, যা সৌভাগ্য বয়ে আনে, যা মূলত রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছে; আর মানুষের নাফাসের ক্ষেত্রে এটি ‘হুরুফে লিন’ তথা কোমল বর্ণসমূহের রূপ পরিগ্রহ করেছে।</p>
<p>অতঃপর তিনি এই নাফাস বা শ্বাসের ভেতর ধ্বনি সৃষ্টি করেছেন যখন তা ওহির মাধ্যমে বাতিন তথা অপ্রকাশ্য রূপ থেকে জাহির তথা প্রকাশ্য রূপের দিকে নির্গত হয়, যাকে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসৃণ পাথরের ওপর লোহার শিকল টানার আওয়াজের সাথে তুলনা করেছেন; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি ‘হুরুফে সফির’ তথা শিস-ধ্বনির বর্ণসমূহের প্রতীক। অতঃপর সেই ঐশ্বরিক নাফাস মহাবিশ্বের স্থায়ী মূল সত্তাগুলোর ওপর প্রসারিত হয়েছিল, যখন তাদের কোনো বাহ্যিক অস্তিত্ব ছিল না; আর মানুষের কালাম তথা বাকশক্তির মধ্যে এটি ‘হুরুফে তাফাশশি’ তথা বিকীর্ণ বর্ণসমূহের মতো।</p>
<p>অতঃপর সৃষ্টির দাবি ও নিয়ন্ত্রণের কারণে মহাবিশ্ব সেই ঐশ্বরিক নাফাসের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, যেখানে তারা সেই সত্তাকে সংখ্যাধিক্য ও বহুত্বে রূপান্তর করেছিল, যা মূলত একক সত্তা; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি হলো ‘হরফে মুসতাতিল’ তথা দীর্ঘায়িত বর্ণ এবং তা কেবল ‘দোয়াদ’ বর্ণটি, কারণ এর উচ্চারণ দীর্ঘ হয়ে ‘লাম’ বর্ণের মাখরাজ তথা উচ্চারণ স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।</p>
<p>অতঃপর এই ঐশ্বরিক নাফাস শরিয়তসমূহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সরল পথ নির্ধারণ করেছে এবং এই নির্দিষ্ট সরলতার বাইরে চলে যাওয়াকে তাহরিফ তথা বিকৃতি বলা হয়, আর এই প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী হলো, يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ &#8211; তারা তা বোঝার পর বিকৃত করে। সুরা বাকারাহ, আয়াত: ৭৫।</p>
<p>অথচ সমস্ত বিষয় তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ &#8211; এবং সমস্ত বিষয় তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। সুরা হুদ, আয়াত: ১২৩।</p>
<p>তিনি বলেন, বিষয়সমূহ বহু বা পুঞ্জীভূত হলেও নাফাস বা শ্বাস তাকে একত্রিত করে; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষেত্রে এই তাহরিফ বা বিচ্যুতিকে ‘হরফে মুনহারিফ’ তথা বিচ্যুত বর্ণ বলা হয়, যা অধিকাংশ বর্ণের সাথে মিশ্রিত হয়ে যায় এবং তা হলো ‘লাম’ বর্ণটি, আর এই অনন্য মর্যাদা অন্য কোনো বর্ণের নেই; আর এটি শরিয়তের এমন কিছু বিধানের মতো যার মধ্যে সমস্ত ঐশ্বরিক বিধানসমূহ একত্রিত হয়।</p>
<p>অতঃপর ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে সাদৃশ্যপূর্ণ সুরতসমূহ প্রকাশ পেয়েছিল, যার ফলে বাহ্যিক কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে তাতে পুনরাবৃত্তির ভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল; অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, সেখানে কোনো পুনরাবৃত্তি নেই। আর মানুষের বর্ণমালার জগতে এটি ‘হরফে মুকাররার’ তথা দ্বিত্ব বা পুনরাবৃত্তিসম্পন্ন বর্ণ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে এবং তা হলো ‘রা’ বর্ণটি।</p>
<p>সুতরাং নাফাস বা শ্বাস যখন সুবাস বহন করে, তখন জানা যায় যে, তার নির্গমন ঘটে ঘ্রাণেন্দ্রিয় বা নাকের মাধ্যমে; আর মানুষের উচ্চারিত বর্ণমালার ক্ষেত্রে একে ‘হুরুফে গুন্নাহ’ তথা নাসিক্য বর্ণ বলা হয়, কারণ এগুলো নাসিকাগহ্বর থেকে উচ্চারিত হয়। আর এভাবেই হরফ বা বর্ণসমূহের স্তরসমূহ পূর্ণাঙ্গরূপে সমাপ্ত হলো এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2>শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম সোহরাওয়ার্দি তিন স্তরের বিন্যাস একই রেখেছেন, কিন্তু নাফাসের বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট করেছেন। মুনতাহি সাধক নাফাসের অধিকারী; তিনি স্বীয় হালে সুপ্রতিষ্ঠিত, তাঁর ওপর গাইবাত ও হুজুরের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন আর ঘটে না। তাঁর মাওয়াজিদ শ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত এবং স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এই তিন স্তর থেকে সাধকের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট জওক ও শুরব।</p>
<p>তিনি বলেন, আর বলা হয়ে থাকে, নাফাস হলো মুনতাহি তথা চূড়ান্ত স্তরের সাধকের জন্য, ওয়াক্ত তথা আধ্যাত্মিক সময় হলো মুবতাদি তথা প্রারম্ভিক স্তরের সাধকের জন্য এবং হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা হলো মুতাওয়াসসিত তথা মধ্যবর্তী স্তরের সাধকের জন্য। সুতরাং এটি যেন তাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত যে, মুবতাদি সাধকের অন্তরে আল্লাহ তায়ালা এর পক্ষ থেকে এমন এক তারেক তথা আধ্যাত্মিক অনুভূতির আগমন ঘটে যা স্থায়ী হয় না। আর মুতাওয়াসসিত সাধক হলেন এমন এক হালের অধিকারী, যার ওপর তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থাটি সদা প্রবল থাকে। পক্ষান্তরে মুনতাহি সাধক হলেন এমন এক নাফাসের অধিকারী, যিনি স্বীয় হালে সম্পূর্ণ মুতামাক্কিন তথা সুপ্রতিষ্ঠিত; তাঁর ওপর গাইবাত তথা আত্মবিস্মৃতি ও হুজুর তথা ঐশ্বরিক উপস্থিতির পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে না, বরং তাঁর মাওয়াজিদ তথা আধ্যাত্মিক ভাবোচ্ছ্বাসসমূহ তাঁর আনফাস তথা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে এবং তা তাঁর মাঝে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে, কোনো পালাবদল ছাড়াই।</p>
<p>আর এই সবকটিই হলো তাদের নিজ নিজ অধিকারীদের আধ্যাত্মিক অবস্থাসমূহ, এবং এই স্তরগুলো থেকে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট জওক তথা আত্মিক আস্বাদন ও শুরব তথা পরম পরিতৃপ্তি রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁদের বরকতের মাধ্যমে কল্যাণ ও উপকার দান করুন, আমিন।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">তিন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে নাফাসের একটি বহুমাত্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। কুশাইরি নাফাসকে আধ্যাত্মিক স্তরের মাপকাঠি হিসেবে দেখিয়েছেন; প্রতিটি শ্বাস হিসাবযোগ্য, অবহেলায় অতিবাহিত শ্বাস মৃত। সোহরাওয়ার্দি দেখিয়েছেন নাফাসের অধিকারী কীভাবে হাল ও গাইবাতের পালাবদলের ঊর্ধ্বে উঠে স্থায়ী আধ্যাত্মিক অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হন। আর ইবনে আরাবি নাফাসকে সবচেয়ে গভীরে নিয়ে দেখিয়েছেন— মানুষের শ্বাস ও বর্ণের সাথে আল্লাহর নাফাস রহমানি ও সৃষ্টির উৎপত্তির অপূর্ব সাদৃশ্য। সবশেষে বলা যায়, নাফাস শেখায় প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতিটি শ্বাস হলো আল্লাহর দিকে যাত্রার একেকটি সুযোগ।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/nafas/">নাফাস</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/nafas/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>শাহিদ</title>
		<link>https://sufigraphy.com/shahid/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/shahid/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 06 Jul 2026 06:02:39 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3943</guid>

					<description><![CDATA[<p>শাহিদ একটি গভীর পরিভাষা। এর আক্ষরিক অর্থ সাক্ষী বা উপস্থিত; কিন্তু সুফি পরিভাষায় এটি বোঝায় সেই বিষয়, যা অন্তরে সদা হাজির থাকে এবং যার স্মরণ অন্তরের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বিস্তার করে। অন্তরে যদি জ্ঞানের আধিক্য প্রবল হয়, সে হলো শাহিদুল ইলম। আধ্যাত্মিক আবেগ প্রবল হলে শাহিদুল ওয়াজদ। হাল বা আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হলে শাহিদুল হাল। আর [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/shahid/">শাহিদ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">শাহিদ একটি গভীর পরিভাষা। এর আক্ষরিক অর্থ সাক্ষী বা উপস্থিত; কিন্তু সুফি পরিভাষায় এটি বোঝায় সেই বিষয়, যা অন্তরে সদা হাজির থাকে এবং যার স্মরণ অন্তরের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বিস্তার করে। অন্তরে যদি জ্ঞানের আধিক্য প্রবল হয়, সে হলো শাহিদুল ইলম। আধ্যাত্মিক আবেগ প্রবল হলে শাহিদুল ওয়াজদ। হাল বা আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হলে শাহিদুল হাল। আর পরম সত্যের স্মরণ প্রবল হলে শাহিদুল হাক। সাধারণ চোখের দেখা আর শুহুদের মধ্যে পার্থক্য আছে, শুহুদে বিশ্বাসের সাক্ষ্য প্রকাশ পায়, সাধারণ দেখায় তা হয় না।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি সহজ ভাষায় শাহিদের সংজ্ঞা দিয়েছেন, অন্তরে যা সদা হাজির থাকে এবং যার স্মরণ প্রবল থাকে, তাই শাহিদ। জ্ঞান প্রবল হলে জ্ঞানের শাহিদ, ওয়াজদ প্রবল হলে ওয়াজদের শাহিদ। ভালোবাসাও প্রিয়জনকে শাহিদ বানিয়ে দেয়। তিনি শিবলির উদাহরণ এবং নবীজির মিরাজের ঘটনা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, পরম সৌন্দর্য দেখেও যিনি আল্লাহর দর্শন থেকে বিচ্যুত হননি, সেটিই তাঁর ফানার সাক্ষ্য।</p>
<p>তিনি বলেন, সুফি সাধকগণের কথাবার্তা ও আলোচনায় প্রায়শই এই কথাটি উঠে আসে: অমুক ব্যক্তি শাহিদুল ইলম অর্থাৎ জ্ঞানের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত, অমুক ব্যক্তি শাহিদুল ওজদ অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত, এবং অমুক ব্যক্তি শাহিদুল হাল অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অবস্থার শাহিদ দ্বারা পরিচালিত।</p>
<p>তারা শাহিদ পরিভাষাটি দ্বারা এমন কিছু বুঝিয়ে থাকেন, যা মানুষের অন্তরে সদা হাজির থাকে। আর এটি এমন বিষয়, যার স্মরণ মানুষের অন্তরের ওপর প্রবল হয়ে থাকে; যার ফলে সে বিষয়টিকে যেন নিজের চোখে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারে, যদিও তা মূলত তার কাছ থেকে অদৃশ্য থাকে। সুতরাং, কোনো অধিকারীর অন্তরে যার স্মরণ পুরোপুরি কর্তৃত্ব বিস্তার করে, তা-ই হলো তার শাহিদ।</p>
<p>এরপর অন্তরে যদি জ্ঞানের আধিক্য প্রবল হয়, তবে তাকে জ্ঞানের শাহিদ বলা হয়। আর যদি অন্তরে আধ্যাত্মিক আবেগের আধিক্য প্রবল হয়, তবে বলা হয় যে, সে ওয়াজদের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত।</p>
<p>মূলত শাহিদ শব্দের অর্থ হলো হাজির বা উপস্থিত। অতএব, যা কিছু আপনার অন্তরে উপস্থিত থাকে, তা-ই আপনার শাহিদ।</p>
<p>হজরত শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে যখন মুশাহাদা অর্থাৎ সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, “আমাদের পক্ষে পরম সত্যের সরাসরি মুশাহাদা করা কীভাবে সম্ভব! আমাদের জন্য তো রয়েছে শাহিদুল হাক।”</p>
<p>এখানে শাহিদুল হাক বলে তিনি সেই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা তাঁর অন্তরের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে আছে এবং পরম সত্যের স্মরণ হিসেবে যা তাঁর অন্তরে সর্বদা প্রবল ও উপস্থিত থাকে।</p>
<p>একইভাবে কোনো ব্যক্তির অন্তরে যদি কোনো সৃষ্টির প্রতি গভীর আসক্তি তৈরি হয়, তবে বলা হয় যে সেটিই তার শাহিদ। এর অর্থ হলো, সেই সৃষ্টিটি তার অন্তরে সদা উপস্থিত থাকে; কারণ ভালোবাসা প্রিয়জনের সার্বক্ষণিক স্মরণকে অনিবার্য করে তোলে এবং অন্তরের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।</p>
<p>আবার কোনো কোনো সুফি-সাধক এই শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে কিছুটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, শাহিদ শব্দটি মূলত শাহাদাত অর্থাৎ প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেওয়া থেকে এসেছে। বিষয়টি এমন যে, কোনো ব্যক্তি যখন সৌন্দর্যের গুণে গুণান্বিত কোনো ব্যক্তির দিকে তাকায়, তখন তার ভেতরের মানবীয় সত্তা যদি তার থেকে দূর হয়ে যায়, সেই ব্যক্তির প্রত্যক্ষ দর্শন তাকে নিজের হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করে না, এবং তার সাহচর্য তার ওপর কোনোভাবেই প্রভাব ফেলে না। অতএব, এটি তার নিজের ফানা তথা আত্মবিলুপ্তির পক্ষে একটি সাক্ষী। আর যার ওপর এর প্রভাব পড়ে, তা তার নফসের স্থায়িত্ব এবং মানবিক অভ্যাসের ওপর বহাল থাকার পক্ষে সাক্ষী। সুতরাং, এটি হয় তার পক্ষে সাক্ষী, না হয় তার বিরুদ্ধে সাক্ষী।</p>
<p>আর এই অর্থেরই প্রতিফলন ঘটেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীতে—</p>
<p>رأيتُ ربِّي ليلةَ المعراجِ في أحسنِ صورةٍ</p>
<p>আমি মিরাজের রাতে আমার রবকে সবচেয়ে সুন্দর রূপে দেখেছি।</p>
<p>অর্থাৎ, সেই রাতে আমি যে পরম সুন্দর রূপটি দেখেছি, তা আমাকে আল্লাহ তায়ালা’র দর্শন থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং আমি সেই রূপের মাঝেই রূপকারকে এবং সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টাকে অবলোকন করেছি। আর এখানে দর্শন বলতে জ্ঞানগত উপলব্ধির কথা বোঝানো হয়েছে, চাক্ষুষ দৃষ্টি দিয়ে ধরা-ছোঁয়া নয়।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">ইবনে আরাবি শাহিদকে অনেক গভীরে নিয়ে গেছেন। তাঁর মতে শাহিদ হলো শুহুদের সময় নফসে মাশহুদের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠা; এটি সাধারণ চোখে দেখার চেয়ে আলাদা, কারণ শুহুদের আগে মাশহুদ সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিটি মুশাহাদা এক ধরনের দেখা, কিন্তু প্রতিটি দেখাই মুশাহাদা নয়। কামেল আরিফগণ ছাড়া হককে সরাসরি চোখে দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রত্যেকেই তাঁর শুহুদ লাভ করে।</p>
<p>তিনি বলেন, এটি একটি ইসম ফায়েল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য)। সুতরাং অন্তরে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তার যে প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা-ই হলো শাহিদের প্রকৃত সত্তা এবং এর মাধ্যমেই মুশাহিদ তথা দর্শনকারীর পরম আনন্দ অর্জিত হয়।</p>
<p>مُشَاهَدَةُ الحَقِّ مِنْ عِلْمِنَا تَحْصِيْلُ شَاهِدِهَا فِي القُلُوْبْ</p>
<p>আমাদের জ্ঞান অনুসারে হকের মুশাহাদা তথা পরম সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন হলো অন্তরে তাঁর শাহিদ তথা সাক্ষ্যের উপস্থিতি লাভ করা।</p>
<p>فَيُدْرِكُهَا بِعُيُوْنِ الحِجَى مُوَفَّقَةً خَلْفَ سِتْرِ الغُيُوْبْ</p>
<p>অতঃপর মানুষ বুদ্ধিমত্তার চোখ দিয়ে তা উপলব্ধি করে, যা গুয়ূব তথা অদৃশ্যের পর্দার আড়ালে সুবিন্যস্ত থাকে।</p>
<p>ويطلعه بدر [ما] تمّ عُلاً على شمسه في مَهَبِّ الجُنُوبْ</p>
<p>আর এক পূর্ণচন্দ্র তাকে উঁচুতে তুলে নেয়, যেন দক্ষিণ হাওয়া বয়ে যাওয়ার জায়গায় সে তার সূর্যের মুখোমুখি হতে পারে।</p>
<p>যেহেতু শাহিদ হলো শুহুদ তথা আধ্যাত্মিক দর্শনের সময় নফসের মধ্যে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠা, তাই এটি সাধারণ চোখে দেখার চেয়ে আলাদা ফল দেয়। কারণ, চোখে দেখার আগে সেই জিনিসটি সম্পর্কে কোনো পূর্বজ্ঞান থাকে না; কিন্তু শুহুদ তথা আধ্যাত্মিক দর্শনের আগে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তা সম্পর্কে জানা জরুরি, যাকে ‘আকাইদ’ (বিশ্বাস) বলা হয়।</p>
<p>এই কারণেই আধ্যাত্মিক দর্শনের ক্ষেত্রে তা স্বীকার বা অস্বীকার করার সুযোগ থাকে, কিন্তু চোখে দেখার বেলায় শুধু মেনে নেওয়াই থাকে, সেখানে অস্বীকার করার কিছু থাকে না। একে ‘শাহিদ’ বা সাক্ষী বলা হয় এই কারণে যে, মানুষ যা দেখে তা মূলত তার নিজের বিশ্বাসের সত্যতারই সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং, প্রতিটি মুশাহাদা তথা আধ্যাত্মিক দর্শনই এক ধরনের দেখা, কিন্তু প্রতিটি দেখাই মুশাহাদা নয়; যদিও বেশিরভাগ মানুষ তা জানে না।</p>
<p>তাই কামেল বা পূর্ণাঙ্গ আরিফগণ ছাড়া অন্য কেউ হক তথা পরম সত্যকে সরাসরি চোখে দেখতে পায় না; অথচ প্রত্যেকেই তাঁর শুহুদ লাভ করে; আর সাধারণ চোখে দেখা থেকে কোনো শাহিদ তৈরি হয় না। শাহিদের প্রমাণে আল্লাহ তায়ালা বলেন—</p>
<p>أَفَمَن كَانَ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِّنْهُ</p>
<p>তারা কি এমন ব্যক্তিদের সমান হতে পারে, যারা কায়েম আছে তাদের রবের পক্ষ হতে প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর এবং যার কাছে তাঁর প্রেরিত একজন সাক্ষী আয়াত শোনায়। সুরা হূদ, আয়াত: ১৭</p>
<p>এই আয়াতের বেশ কয়েকটি গভীর অর্থ রয়েছে, যার প্রতিটিই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এর ফলে বান্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন লাভ করে, যার মাধ্যমে সে জানতে পারে আল্লাহ তার মাধ্যমে বা তার কাছ থেকে কী চান। আর এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো গোপন খবর দেওয়া এবং কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা জানিয়ে দেওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। এটিই হলো সিদ্দীক (আবু বকর রা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণীর অর্থ: “আমি এমন কোনো জিনিস দেখিনি, যার আগে আল্লাহকে দেখিনি।”</p>
<p>এরপর, সেই বিষয়টির কোনো বাস্তব রূপ প্রকাশ পায় না আল্লাহর কোনো একটি বিশেষ নামের প্রভাব ছাড়া। তখন সেই নামটি বান্দার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ও উপস্থিত হয় এবং বান্দা তার শুহুদ লাভ করে। তারপর সে তার নিজের ভেতর অথবা বাইরের জগতে সেই নামের প্রভাব ও অস্তিত্ব প্রকাশ পেতে দেখে, যা তাকে আগেই ঐশ্বরিক বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। তখন সেই নামটিকে ‘শাহিদ’ বলা হয়, কারণ বান্দা তার জানা সেই প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত বিষয়টির শুহুদ লাভ করেছে।</p>
<p>আর এই মাকাম তথা আধ্যাত্মিক স্তর কেবল কামেল বা পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের জন্যই সম্ভব। তাঁরাই হলেন শুহুদ-এর অধিকারী, যাঁরা খবরের মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান লাভ করার পর প্রতিটি প্রভাবে আল্লাহর শুহুদ লাভ করেন।</p>
<p>আমরা যে বললাম, “এগুলো আল্লাহর উদ্দেশ্য”, এর অর্থ আল্লাহর ওপর কোনো হুকুম চালানো নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিশ্চিত সত্য বিষয়। কারণ, আল্লাহর বাণী থেকে উচ্চারিত প্রতিটি আয়াতই (তা কুরআন হোক, নাজিলকৃত কোনো কিতাব হোক, সহিফা হোক বা কোনো ঐশ্বরিক খবর হোক) সেই শব্দের ভাষা ও ব্যাকরণ অনুযায়ী যতগুলো অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব, তার সবগুলোর জন্যই তা একটি আয়াত বা নিদর্শন। আর যিনি এটি নাজিল করেছেন, সেই শব্দটির সম্ভাব্য সব অর্থই তাঁর উদ্দেশ্যে থাকে। কেননা, যিনি এটি নাজিল করেছেন তিনি এর সব অর্থই জানেন এবং তিনি এটাও জানেন যে, তাঁর বান্দাদের বোঝার ক্ষমতা একেক জনের একেক রকম। আর তিনি তাঁর বাণীর মাধ্যমে বান্দাকে ততটুকুরই দায়িত্ব দেন, যতটুকু তারা বুঝতে পারে।</p>
<p>সুতরাং, যে ব্যক্তি কোনো আয়াত থেকে যে সঠিক অর্থটি বুঝতে পারে, সেই অর্থ লাভকারীর জন্য আয়াতটির সেই অর্থটিই আল্লাহর উদ্দেশ্য। আল্লাহর বাণী ছাড়া অন্য কারও কথার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। কারণ মানুষের কথার শব্দে একাধিক অর্থ প্রকাশের সুযোগ থাকলেও বক্তা হয়তো তা উদ্দেশ্য করেননি; যেহেতু আমরা জানি মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং শব্দের সব অর্থ তার মাথায় নাও থাকতে পারে।</p>
<p>তবে বক্তা যদি সেই ‘আহলুল্লাহ’ (আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা) হন যাঁরা বিশ্বাস করেন যে, “মহাবিশ্বে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রকৃত বক্তা নেই” এবং যাঁরা সরাসরি আল্লাহর বাণী শোনার স্তরে পৌঁছেছেন, তখন তাদের মুখের কথার সব অর্থই আল্লাহর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কারণ মূল বক্তা স্বয়ং আল্লাহ, আর যাঁর মুখ দিয়ে কথাটি বের হচ্ছে তিনি কেবল একজন অনুবাদক বা মাধ্যম মাত্র। যেমন নামাজে বান্দার মুখ দিয়ে বলানো হয়, “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ &#8211; আল্লাহ তার প্রশংসা শোনেন যে তাঁর প্রশংসা করে।” এখানে মূল বক্তা আল্লাহ, আর বান্দা কেবল মাধ্যম।</p>
<p>এই কারণেই, যে কোনো মুফাসসির কুরআনের এমন ব্যাখ্যা করেন, যা সেই শব্দের অর্থের আওতাভুক্ত, তাকেই সঠিক মুফাসসির বলা চলে। আর যে ব্যক্তি নিজের মনগড়া মতামত দিয়ে ব্যাখ্যা করবে, সে কুফরি করল; যেমনটি তিরমিজির হাদিসে এসেছে। মনগড়া বা ‘নিজের রায়’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা তখনই বোঝায়, যখন শব্দের এমন কোনো অর্থ করা হয়, যা সেই ভাষার মানুষ জানে না বা সেই অর্থে শব্দটির ব্যবহারই নেই।</p>
<p>এখানে রসুলুল্লাহ (দ.)-এর ‘সে কুফরি করল’ বলার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে; তিনি বলেননি যে, ‘সে ভুল করল’। কারণ কুফর শব্দের অর্থ হলো ‘ঢেকে ফেলা’। আর আহলুল্লাহদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বক্তা দেখেন না, তারা যখন এই ব্যাখ্যাটিকে নিজের মনগড়া মতামতের দিকে সম্পর্কিত করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহর একটি সত্য অর্থকে তাঁর কিছু বান্দার কাছ থেকে আড়াল বা ঢেকে ফেলেন; যদিও অর্থটি নিজের মধ্যে সত্য ছিল, কিন্তু তা মুফাসসিরের নিজস্ব মতের সাথে জুড়ে দেওয়ার কারণে আড়াল হয়ে গেছে। কারণ, সেই ভাষার মানুষেরা সেই শব্দের এমন অর্থ তৈরিতে একমত হয়নি বা রূপক হিসেবেও তা ব্যবহার করেনি। এই শর্তটি থাকা আবশ্যক, আর আল্লাহই হলেন মূল বক্তা এবং তিনিই শব্দ ও অর্থের প্রকৃত মালিক।</p>
<p>আর সঠিক হওয়াটি একটি বাস্তব সত্য যখন তা হক তথা পরম সত্যের সাথে সম্পর্কিত হয়। এই কারণেই রসুল আলাইহিস সালাম বলেছেন, সে কুফরি করল এবং তিনি বলেননি যে, সে ভুল করল। আর আল্লাহ যা চান তা ঢেকে রাখার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে, কিন্তু আল্লাহর দিকে ভুলের সম্পর্ক জুড়ে দেওয়া অসম্ভব। কারণ প্রতিটি জ্ঞাত বিষয়ের ওপর তাঁর জ্ঞান সম্পূর্ণ পরিব্যাপ্ত হওয়ার ফলে তা কোনো ভুল গ্রহণ করে না। সুফিদের নিকট শাহিদ তথা আধ্যাত্মিক সাক্ষ্যের পরিচিতির জন্য এই পরিমাণ আলোচনাই যথেষ্ট। আর আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ দেখান।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে শাহিদের একটি পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে একটি সহজ শব্দ, কিন্তু ভেতরে আধ্যাত্মিক সাধনার গভীরতম রহস্য। কুশাইরি ভিত্তি নির্মাণ করেছেন সহজ সংজ্ঞায়, অন্তরে যা প্রবল উপস্থিত, তাই শাহিদ। ইবনে আরাবি সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, সাধারণ দেখা আর শুহুদের পার্থক্য কোথায় এবং কামেল ব্যক্তির শুহুদ কীভাবে প্রতিটি সৃষ্টিতে স্রষ্টাকে দেখার অভিজ্ঞতা দেয়। সবশেষে বলা যায়, শাহিদ সুফি সাধনার সেই বিন্দু যেখানে জ্ঞান, বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা একত্রিত হয়। অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি যত প্রবল হয়, শাহিদ তত গভীর হয়; আর এটাই সুফি সাধনার লক্ষ্য।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/shahid/">শাহিদ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/shahid/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ওয়ারিদ</title>
		<link>https://sufigraphy.com/warid/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/warid/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 05 Jul 2026 13:49:18 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3940</guid>

					<description><![CDATA[<p>সুফি সাধনার পথে অন্তরে যে আধ্যাত্মিক ভাব অবতীর্ণ হয়, তাকে বলা হয় ওয়ারিদ। বান্দার নিজের কোনো কৃত্রিম চেষ্টা ছাড়াই এটি আসে। কখনো আনন্দ হয়ে, কখনো বিষাদ হয়ে, কখনো কবজ হয়ে, কখনো বাসত হয়ে। ওয়ারিদ খাওয়াতিরের চেয়ে ব্যাপক। কারণ খাওয়াতির কেবল নির্দিষ্ট চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু ওয়ারিদ পুরো আত্মিক অবস্থাকে আলোড়িত করতে পারে। ওয়ারিদ আসে আল্লাহর [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/warid/">ওয়ারিদ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সুফি সাধনার পথে অন্তরে যে আধ্যাত্মিক ভাব অবতীর্ণ হয়, তাকে বলা হয় ওয়ারিদ। বান্দার নিজের কোনো কৃত্রিম চেষ্টা ছাড়াই এটি আসে। কখনো আনন্দ হয়ে, কখনো বিষাদ হয়ে, কখনো কবজ হয়ে, কখনো বাসত হয়ে। ওয়ারিদ খাওয়াতিরের চেয়ে ব্যাপক। কারণ খাওয়াতির কেবল নির্দিষ্ট চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু ওয়ারিদ পুরো আত্মিক অবস্থাকে আলোড়িত করতে পারে। ওয়ারিদ আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলো থেকে, বা ইলাহি নামসমূহের পক্ষ থেকে। ওয়ারিদ আসে, বার্তা পৌঁছে দেয়, তারপর চলে যায়; এটাই তার স্বভাব। এই বিদায়ের মধ্যে আছে পরের ওয়ারিদের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত রাখার গভীর হিকমত।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরির ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি ওয়ারিদের সহজ কিন্তু মূল সংজ্ঞা দিয়েছেন। বান্দার নিজের কোনো কৃত্রিম চেষ্টা ছাড়াই অন্তরে যে প্রশংসনীয় ও সৎ চিন্তা অবতীর্ণ হয়, তাই ওয়ারিদ। তিনি দেখিয়েছেন ওয়ারিদ খাওয়াতিরের চেয়ে ব্যাপক, কারণ এটি শুধু চিন্তা নয়, পুরো আত্মিক অবস্থাকে স্পর্শ করতে পারে। ওয়ারিদ আল-হক বা ইলমের আলো থেকে আসতে পারে এবং আনন্দ, বিষাদ, কবজ, বাসত প্রভৃতি নানা রূপে অবতীর্ণ হয়।</p>
<p>তিনি বলেন, সুফি সাধকগণের কথাবার্তা ও আলোচনায় ওয়ারিদাত তথা অন্তরে অবতীর্ণ ভাবসমূহের কথা প্রায়ই উঠে আসে।</p>
<p>বান্দার নিজের কোনো কৃত্রিম চেষ্টা ছাড়াই অন্তরে যে-সকল প্রশংসনীয় ও সৎ চিন্তা অবতীর্ণ হয়, তা-ই ওয়ারিদ। সুফি পরিভাষায় অন্তরের এই সৎ চিন্তাগুলোকে খাওয়াতির বলা হয়।</p>
<p>আবার মানুষের অন্তরে জাগ্রত এমন কিছু ভাব বা অবস্থাও রয়েছে যা ঠিক সাধারণ চিন্তার পর্যায়ভুক্ত নয়, সেগুলোকেও ওয়ারিদ হিসেবেই গণ্য করা হয়।</p>
<p>অতঃপর, এই ওয়ারিদ কখনো আল-হাক তথা পরম সত্যের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়, আবার কখনো তা ইলম তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলো থেকে আসে।</p>
<p>এই গভীরতার কারণে ওয়ারিদাত তথা অন্তরে অবতীর্ণ ভাবসমূহ খাওয়াতির তথা সাধারণ চিন্তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও সার্বজনীন। কারণ খাওয়াতির কেবল নির্দিষ্ট কোনো সম্বোধন কিংবা কেবল চিন্তার অর্থের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে ওয়ারিদাত মানুষের পুরো আত্মিক অবস্থাকে আলোড়িত করতে পারে। যেমন কখনো তা আনন্দের ওয়ারিদ হয়ে আসে, কখনো বিষাদের ওয়ারিদ হয়ে আসে, কখনো কবজ তথা অন্তরের সংকোচনের ওয়ারিদ হয়ে আসে, আবার কখনো বাসত তথা অন্তরের প্রসারণের ওয়ারিদ হয়ে আসে। এভাবে আরও নানাবিধ গভীর ও সূক্ষ্ম আত্মিক ভাবের রূপে তা অবতীর্ণ হতে পারে।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">ইবনে আরাবি ওয়ারিদকে অনেক গভীরে নিয়ে গেছেন। তাঁর মতে ওয়ারিদ প্রতিটি ইলাহি নামের পক্ষ থেকে অন্তরে জাগ্রত হয়। ওয়ারিদ দুই ধরনের। কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে আগত, আর সরাসরি চিরন্তন ওয়ারিদ। প্রতিটি ওয়ারিদ কোনো না কোনো উপকার নিয়েই আসে। আনন্দ বা কষ্ট ওয়ারিদের প্রকৃত প্রভাব নয়, জ্ঞান অর্জনই তার আসল ফল। ওয়ারিদ বার্তা পৌঁছে দিয়ে চলে যায়। এতে পরের ওয়ারিদের জন্য অন্তর খালি থাকে। নিশ্বাসই হলো নতুন সৃষ্ট ওয়ারিদের বাহক, আর ইলাহি নামসমূহের ভিন্নতার কারণেই ওয়ারিদের রূপ ভিন্ন হয়। কোনো ওয়ারিদ জ্ঞান নিয়ে আসে, কোনোটি কর্ম নিয়ে, কোনোটি হাল নিয়ে। আর সাহউ ও সুকরের ওয়ারিদ সবচেয়ে শক্তিশালী। যে ওয়ারিদ নতুন সৃষ্টি নয়, সেটি আল্লাহ ও বান্দার মাঝের সব পর্দা সরে যাওয়ার নাম। খুব কম অলির ভাগ্যে এটি ঘটে।</p>
<p>تَعَشَّقْتُ بِالصَّادِرِ الوَارِدِ تَعَشُّقَ شَفْعِي بِالوَاحِدِ</p>
<p>অবতীর্ণ ওয়ারিদের প্রেমে আমি এমনভাবে মগ্ন হয়েছি, যেভাবে জোড় সংখ্যা মগ্ন হয় এক-এর প্রেমে।</p>
<p>وَأَسْمَاؤُهُ كُلُّهَا وَارِدٌ سِرَاعاً لِتَخْفَى عَلَى الرَّاصِدِ</p>
<p>আর তাঁর প্রতিটি নামই অতি দ্রুত ধাবমান ওয়ারিদ, যেন তা পর্যবেক্ষণকারীর দৃষ্টির আড়ালে থাকে।</p>
<p>وَتُعْطِي بِآثَارِهَا هِمَّةً إِلَى كُلِّ قَلْبٍ لَهَا قَاصِدِ</p>
<p>এবং এগুলো নিজের প্রভাবের মাধ্যমে সেই প্রতিটি অন্তরে উচ্চসংকল্প এনে দেয়, যা তাকে পাওয়ার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।</p>
<p>সুফি সাধকগণের মতে এবং আমাদের কাছে ওয়ারিদ হলো তা-ই, যা প্রতিটি ইলাহি নামের পক্ষ থেকে মানুষের অন্তরে জাগ্রত বা অবতীর্ণ হয়। তাই ওয়ারিদ নিয়ে আলোচনা করার সময় তার বর্তমান আগমনী অবস্থার দিকেই নজর দিতে হবে, অতীতে তা কীভাবে এসেছিল সেভাবে নয়।</p>
<p>কেননা কখনো তা সাহব তথা আত্মসচেতনতা, কখনো সুকর তথা আধ্যাত্মিক মত্ততা, কখনো কবজ তথা অন্তরের সংকোচন, কখনো বাসত তথা অন্তরের প্রসারণ, কখনো হাইবাত তথা আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য, আবার কখনো উনস তথা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি সহ এমন অগণিত অবস্থার মাধ্যমে আসতে পারে; যার প্রতিটিই মূলত একেকটি ওয়ারিদাত। তবে সুফিরা পরিভাষাগতভাবে কেবল আমাদের উল্লেখ করা প্রশংসনীয় খাওয়াতির তথা অন্তরের সৎ চিন্তাসমূহকেই ওয়ারিদ নামে অভিহিত করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।</p>
<p>অতএব হে আমার ভাই, জেনে রাখুন যে, ওয়ারিদ তার নিজস্ব রূপের দিক থেকে নতুন সৃষ্টি কিংবা অনাদিত্বের কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা নিজের অনাদিত্ব সত্ত্বেও নিজেকে আগমন করার গুণে ভূষিত করেছেন, আর অবতীর্ণ হওয়াও তো এক ধরনের আগমনই।</p>
<p>আগমনের ক্ষেত্রে এই ওয়ারিদের নানাবিধ অবস্থা হতে পারে; কখনো তা হুজুম তথা আকস্মিক আধ্যাত্মিক আক্রমণ এবং বাওয়াদিহ তথা অন্তরে জেগে ওঠা অতর্কিত ভাবের মতো আচমকা অবতীর্ণ হতে পারে। আবার কখনো তা এভাবে আচমকা না এসে, যার ওপর ওয়ারিদ অবতীর্ণ হচ্ছে তার অনুভূতির মাধ্যমেও প্রকাশ পেতে পারে; যা এমন কিছু লক্ষণ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, যা অন্তরের আধারের যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের আগমনকে নির্দেশ করে।</p>
<p>মনে রাখবেন, প্রতিটি ইলাহি ওয়ারিদ কোনো না কোনো আধ্যাত্মিক উপকার নিয়েই অবতীর্ণ হয়। তা জাগতিক হোক কিংবা অজাগতিক হোক; এমন কোনো ইলাহি ওয়ারিদ নেই যা উপকারহীন। আর প্রতিটি ওয়ারিদের মধ্যকার সার্বজনীন উপকারিতাটি হলো— এর অবতীর্ণ হওয়ার ফলে বান্দার অন্তরে যে জ্ঞান অর্জিত হয়। এর জন্য এমন কোনো বিষয় শর্ত নয়, যা তাকে আনন্দিত করবে কিংবা ব্যথিত করবে; কারণ আনন্দ বা কষ্ট দেওয়া তো ওয়ারিদের প্রকৃত প্রভাব নয়, বরং ওয়ারিদের প্রভাব তো তা-ই, যা জ্ঞান হিসেবে অর্জিত হয় এবং এর সাথে যুক্ত অন্যান্য বিষয়সমূহ। এটি মূলত যা অবতীর্ণ হচ্ছে তার গুণের ওপর নির্ভর করে, তার নিজস্ব সত্তার ওপর নয়। যেমন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা মানুষের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করার জন্য আগমন করবেন। তখন কোনো মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে সৌভাগের দিকে, আবার কারও ভাগ্য নির্ধারিত হবে দুর্ভাগের দিকে। যদিও আল্লাহর আগমন এবং তাঁর বিচার একটাই, কিন্তু মানুষের অবস্থা ভেদে এর প্রয়োগ ও ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হয়।</p>
<p>ওয়ারিদের আগমন দুইভাবে হতে পারে। প্রথমত, তা কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে আসতে পারে; তখন যে ব্যক্তি এটি লাভ করছেন তার সাপেক্ষে তা হলো ওয়ারিদ অর্থাৎ আগত ভাব, আর যে উৎস থেকে তা আসছে তার সাপেক্ষে তা হলো সাদির অর্থাৎ উৎসগত ভাব। দ্বিতীয়ত, তা যদি কোনো উৎস থেকে নির্গত না হয়ে সরাসরি আসে, তবে তা হবে একটি অনাদি বা চিরন্তন ওয়ারিদ। আসলে, অবতীর্ণ হওয়া বা প্রকাশ পাওয়া হলো একটি আত্মিক সম্পর্ক মাত্র, যা বান্দার অন্তরে ওয়ারিদ আসার মুহূর্তে তৈরি হয়। সুতরাং প্রথম প্রকারটি একই সাথে সাদির ও ওয়ারিদ, কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারটি কেবলই ওয়ারিদ।</p>
<p>মনে রাখা প্রয়োজন, আল্লাহর ইলাহি নামসমূহ ছাড়া অন্য কোনো অনাদি বিষয় অন্তরে অবতীর্ণ হয় না। এখন এই নামগুলো যদি সরাসরি তাদের মূল সত্তার দিক থেকে অন্তরে প্রকাশ পায়, তবে অবতীর্ণ হওয়ার ধরনে কোনো তফাত থাকে না। কিন্তু নামগুলো যখন তাদের নিজ নিজ প্রভাব বা কর্মের দিক থেকে প্রকাশ পায়, তখন সেই প্রভাবের ভিন্নতার কারণে ওয়ারিদের রূপও বদলে যায়। কারণ প্রতিটি নামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আলাদা, যদিও সব নামই মূলত এক আল্লাহকেই নির্দেশ করে।</p>
<p>ওয়ারিদ অনাদি হোক কিংবা নতুন সৃষ্টি হোক; তা অন্তরে যা কিছু নিয়ে আসে, তা অবশ্যই নতুন রূপেই আসে। আর সেটিই মূলত বান্দার কাছে স্থায়ী বা অবশিষ্ট থাকে। এরপর ওয়ারিদ বিদায় নেয় এবং তার বিদায় নেওয়াটাই স্বাভাবিক নিয়ম। এর মূল কারণ হলো ওয়ারিদের মর্যাদা রক্ষা করা; কেননা এর পরপরই অন্য আরেকটি ওয়ারিদ সেই অন্তরে অবতীর্ণ হবে। তখন বান্দার জন্য নতুন ওয়ারিদটিকে গ্রহণ করা এবং আগের ভাবটি থেকে মন সরিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। এতে প্রথম ওয়ারিদের প্রতি অবহেলা বা অসম্মান প্রকাশ পেতে পারে। এই কারণেই প্রথম ওয়ারিদটি নিজের বার্তা বা দান অর্পণ করার পরেই বিদায় নেয়। পরবর্তীতে যখন দ্বিতীয় ওয়ারিদটি আসে, তখন সে মানুষের অন্তরকে সম্পূর্ণ খালি পায় এবং অন্তরও তাকে সাদরে স্বাগত জানায়। সেখানে এমন কোনো চিন্তা বা খেয়াল অবশিষ্ট থাকে না, যা নতুন ওয়ারিদকে বাধা দেবে বা দূরে সরিয়ে রাখবে। ফলে প্রতিটি ওয়ারিদই নিজের পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে বিদায় নেয় এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর দরবারে সেই বান্দার আধ্যাত্মিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। আর এই প্রশংসাই বান্দার জন্য প্রকৃত সৌভাগ্য বয়ে আনে।</p>
<p>প্রকৃতপক্ষে, ওয়ারিদাতসমূহ যদি নতুন সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে তা নিশ্বাসসমূহেরই বিভিন্ন রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এই নিশ্বাসের মাধ্যমে যে-সকল আত্মিক অবস্থা ও বিধান অবতীর্ণ হয়, সুফি সাধকগণ সেগুলোকে ওয়ারিদাত নামে চেনেন। কারণ এই নিশ্বাসই হলো ওয়ারিদাতসমূহের বাহ্যিক রূপের বাহক। অতএব, নতুন সৃষ্ট ওয়ারিদাতসমূহ কোনো স্বাধীন বা আলাদা সত্তা নয়; বরং তা নিশ্বাসেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ। ইলাহি নামসমূহের প্রভাবের ভিন্নতার কারণেই এই রূপগুলোও আলাদা দেখায়।</p>
<p>সুতরাং, নিশ্বাসের ক্ষেত্রে এই রূপের সম্পর্কটি ঠিক জওহর তথা মূল উপাদানের অনুগামী হওয়া আরদ তথা আকস্মিক গুণের মতো। কারণ জওহর-ই স্থান দখল করে, আরদ নিজে একা স্থান নিতে পারে না। ঠিক একইভাবে, নিশ্বাসই হলো আসল ওয়ারিদ, তার রূপটি নয়।</p>
<p>আর এই রূপের ভেতরের আধ্যাত্মিক উপকারিতা হলো রসুলের কাছে আসা রিসালাত তথা ঐশী বার্তার মতো। অতএব, কোনো ওয়ারিদ আসে জ্ঞান নিয়ে, কোনোটি আসে কর্ম নিয়ে, কোনোটি আবার এই দুই শক্তিকেই একসাথে মিলিয়ে আনে। কোনো ওয়ারিদ আসে হাল তথা উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থা নিয়ে, কোনোটি আসে জ্ঞান ও অবস্থা নিয়ে, কোনোটি আসে কর্ম ও অবস্থা নিয়ে, আর কোনো কোনো ওয়ারিদ জ্ঞান, কর্ম ও অবস্থা এই তিনটিকেই একসাথে নিয়ে অবতীর্ণ হয়। যেমন সাহউ তথা আত্মসচেতনতা এবং সুকর তথা আধ্যাত্মিক মত্ততার ওয়ারিদ; যা সমস্ত ওয়ারিদাতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী।</p>
<p>আর ওয়ারিদ যদি নতুন সৃষ্টি না হয়, তবে তাকে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর বান্দার মাঝখানের সমস্ত মাধ্যম বা পর্দা দূর হয়ে যাওয়া বলে গণ্য করা হয়। এটি এমন এক তাজাল্লি, যা প্রতিটি সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত বিশেষ আধ্যাত্মিক দিকের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর মাধ্যমে বান্দা কী লাভ করে এবং তা বান্দাকে কী দান করে, তা জাগতিক ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আল্লাহর অলিদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকেরই এমন মহাসৌভাগ্য অর্জিত হয় এবং সমস্ত ওয়ারিদাতসমূহের মধ্যে এর কোনো তুলনা নেই। আর আল্লাহ তায়ালা সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল পথ প্রদর্শন করেন।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে ওয়ারিদের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। কুশাইরি মূলগত সংজ্ঞা ও স্তর নির্ধারণ করেছেন সহজ ভাষায়। ইবনে আরাবি সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ওয়ারিদের গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন— উৎস, প্রভাব, আগমনের ধরন এবং সর্বোচ্চ ওয়ারিদের স্বরূপ পর্যন্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ওয়ারিদ আসে এবং যায়, এটাই তার স্বভাব। সাধকের কাজ হলো প্রতিটি ওয়ারিদকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা, তার বার্তা অন্তরে ধারণ করা এবং পরের ওয়ারিদের জন্য অন্তরকে পরিষ্কার রাখা। যে ব্যক্তি এই আদব রক্ষা করতে পারেন, তাঁর আধ্যাত্মিক অগ্রগতি আল্লাহর দরবারে প্রশংসিত হয়। আর এটাই প্রকৃত সৌভাগ্য।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/warid/">ওয়ারিদ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/warid/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন</title>
		<link>https://sufigraphy.com/ilmul-aynul-haqqqul-yakin/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/ilmul-aynul-haqqqul-yakin/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 04 Jul 2026 10:20:57 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3937</guid>

					<description><![CDATA[<p>নিশ্চিত জ্ঞানের তিনটি স্তর ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন সুফি সাধনার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই তিনটি কেবল তিনটি আলাদা শব্দ নয়; বরং তিনটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্তর। কাবাঘরের উদাহরণ এই পার্থক্যকে সহজ করে দেয়। কাবার অস্তিত্ব জানা ইলমুল ইয়াকিন। চোখে দেখা আইনুল ইয়াকিন। আর আল্লাহর সাথে সেই ঘরের সম্পর্কের গভীর রহস্য বোঝা হাক্কুল [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/ilmul-aynul-haqqqul-yakin/">ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">নিশ্চিত জ্ঞানের তিনটি স্তর ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন সুফি সাধনার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই তিনটি কেবল তিনটি আলাদা শব্দ নয়; বরং তিনটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্তর। কাবাঘরের উদাহরণ এই পার্থক্যকে সহজ করে দেয়। কাবার অস্তিত্ব জানা ইলমুল ইয়াকিন। চোখে দেখা আইনুল ইয়াকিন। আর আল্লাহর সাথে সেই ঘরের সম্পর্কের গভীর রহস্য বোঝা হাক্কুল ইয়াকিন। প্রথমটি দলিলের পথে, দ্বিতীয়টি প্রত্যক্ষতার পথে, তৃতীয়টি আল্লাহর সরাসরি জানিয়ে দেওয়ার পথে আসে।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্টভাবে এই তিন স্তর নির্ধারণ করেছেন। ইলমুল ইয়াকিন দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে অর্জিত নিশ্চিত জ্ঞান; আকল ও বিবেকবান মানুষের জন্য। আইনুল ইয়াকিন স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্তরে আসা উপলব্ধি; ইলমের মানুষের জন্য। হাক্কুল ইয়াকিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সরাসরি দেখার স্বরূপ; মারিফতের মানুষের জন্য। ইয়াকিন শব্দটি আল্লাহর সিফাত হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়েও তিনি সতর্ক করেছেন।</p>
<p>তিনি বলেন, এগুলো সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল ইলমের ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষা।</p>
<p>ইয়াকিন এমন ইলম, যার অধিকারীর অন্তরে কোনো সন্দেহ প্রবেশ করে না। সাধারণ প্রচলিত অর্থে ইয়াকিন এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়। তবে আল্লাহ সুবহানাহুর সিফাত হিসেবে এ শব্দ ব্যবহার করা হয় না, কারণ এ বিষয়ে শরিয়ত থেকে কোনো নির্দিষ্ট অনুমতি পাওয়া যায়নি।</p>
<p>ইলমুল ইয়াকিন মূলত ইয়াকিনই। তেমনি আইনুল ইয়াকিনও ইয়াকিনেরই একটি রূপ। আর হাক্কুল ইয়াকিনও ইয়াকিনেরই আরেক রূপ।</p>
<p>সুফিদের পরিভাষা অনুযায়ী ইলমুল ইয়াকিন সেই নিশ্চিত জ্ঞান, যা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে অর্জিত হয়। আইনুল ইয়াকিন হলো সেই নিশ্চিত জ্ঞান, যা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্তরে আসে। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো সেই নিশ্চিত জ্ঞান, যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সরাসরি দেখার স্বরূপ ধারণ করে।</p>
<p>তাই ইলমুল ইয়াকিন হলো আকল ও বিবেকের অধিকারীদের জন্য। আইনুল ইয়াকিন হলো ইলমের অধিকারীদের জন্য। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো মারিফতের অধিকারীদের জন্য।</p>
<p>এই বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। তবে এর আসল ব্যাখ্যা আমরা আগে যা বলেছি, তার দিকেই ফিরে যায়। তাই সতর্কতা ও ইঙ্গিত হিসেবে এই পরিমাণ আলোচনাতেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকলাম।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>দাতা গঞ্জে বখশ গভীরভাবে দেখিয়েছেন, শুধু সঠিক বর্ণনা জানা ইয়াকিনের পূর্ণতা নয়; গায়েব যখন মুশাহাদার মতো নিশ্চিত হয়, তখনই উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো যায়। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইলমুল ইয়াকিন মাকামের সাথে যুক্ত কারণ জ্ঞান স্থায়ী, আর হাল পরিবর্তনশীল। তরিকতের দৃষ্টিতে তিনটি স্তরকে তিনি তিনটি ভিন্ন পর্যায়ে রেখেছেন। শরিয়তের আহকামের সাথে, মুশাহাদার সাথে এবং কাশফ ও আহওয়ালের সাথে। হাক্কুল ইয়াকিন সেই অবস্থা, যেখানে বান্দা মৃত্যুর আগেই নফসকে বিলীন করে রাখে।</p>
<p>তিনি বলেন, জেনে রাখা উচিত, ইলমুল ইয়াকিনের মূল সম্পর্ক এমন জ্ঞানের সঙ্গে, যা জানা ও বোঝার স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে শুধু কোনো বিষয়ের সঠিক বর্ণনা জানা মানেই ইয়াকিনের পূর্ণতা নয়। যখন সেই জ্ঞান অন্তরে এমনভাবে স্থির হয়ে যায় যে, গায়েবের বিষয়ও তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তা মুশাহাদার মতো নিশ্চিত রূপ লাভ করে, তখন তা ইয়াকিনের উচ্চতর স্তরে পৌঁছে।</p>
<p>কারণ, কিয়ামতের দিন যখন মুসলমান আল্লাহ তায়ালার দিদারে ধন্য হবে, তখন সে তাঁকে সেই সিফাতের মাধ্যমেই দেখবে, যে সিফাতের মাধ্যমে আজ সে তাঁকে জানে। যদি দেখা তার জানা পরিচয়ের বিপরীত হয়, তবে সেই দেখা তার জন্য সঠিক পরিচয়ের দেখা হবে না। আর যদি জানা সঠিক হয়, তবে দেখাও সেই সঠিক জ্ঞানের দিক থেকেই হবে।</p>
<p>অতএব, ইলমুল ইয়াকিন হলো ইয়াকিনের জ্ঞানগত দিক। আইনুল ইয়াকিন হলো সেই জ্ঞানের প্রত্যক্ষতা ও মুশাহাদার দিক। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো সেই অবস্থার সত্যতা, যেখানে জ্ঞান, দেখা ও বাস্তবতা একত্রে স্থির হয়ে যায়।</p>
<p>যাঁরা ইয়াকিন সম্পর্কে বলেন, তাদের কথায় বাহ্যিকভাবে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য এক। কারণ তারা একই সত্যকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে প্রকাশ করেছেন। তাই ইলমুল ইয়াকিন হলো মাকাম বা স্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত, আর হাল হলো পরিবর্তনশীল অবস্থা। ইলম মাকামের সঙ্গে যুক্ত, কারণ জ্ঞান স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু হাল পরিবর্তিত হয়।</p>
<p>এ কারণে তরিকতের বুজুর্গদের কাছে ইলমুল ইয়াকিন শরিয়তের আহকাম ও আমরের সঙ্গে সম্পর্কিত; আইনুল ইয়াকিন হলো মুরাদ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত; আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো কাশফ ও আহওয়ালের গভীর অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।</p>
<p>সুতরাং ইলমুল ইয়াকিন হলো জ্ঞানীদের স্তর। আইনুল ইয়াকিন হলো আরেফদের মাকাম। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো এমন অবস্থার নাম, যেখানে বান্দা মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখে; এমনকি মৃত্যুর আগেই সে নিজের নফসকে বিলীন করে রাখে।</p>
<p>আরও বলা যায়, ইলমুল ইয়াকিন হলো মুজাহাদার স্তর। আইনুল ইয়াকিন হলো দিদারের সময়। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো মুশাহাদার মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্তর-প্রশান্তির অবস্থান। আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2>ইমাম শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দির ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম সোহরাওয়ার্দি তিনটি স্তরকে তিনটি পথের সাথে যুক্ত করেছেন। চিন্তা ও দলিলের পথ, কাশফ ও ইলাহি দানের পথ, এবং বিচ্ছেদের রং থেকে মুক্ত হয়ে মিলনের রং প্রকাশিত হওয়ার পথ। জুনাইদ বাগদাদির বরাতে তিনি বলেছেন, হাক্কুল ইয়াকিন মানে গায়েবকে প্রত্যক্ষ দেখার মতো দেখা। আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এঁর উদাহরণ এর প্রমাণ। সবচেয়ে অভিনব তথ্য— হাক্কুল ইয়াকিনের পূর্ণতম সত্যতা কেবল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত।</p>
<p>তিনি বলেন, ইলমুল ইয়াকিন হলো সেই নিশ্চিত জ্ঞান, যা চিন্তা-গবেষণা ও দলিল-প্রমাণের পথ দিয়ে অর্জিত হয়।</p>
<p>আইনুল ইয়াকিন হলো সেই নিশ্চিত উপলব্ধি, যা কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন এবং নাওয়াল তথা ইলাহি দান-প্রাপ্তির পথ দিয়ে অর্জিত হয়।</p>
<p>হাক্কুল ইয়াকিন হলো বিচ্ছেদের রং থেকে সত্যিকারভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া, মিলনের রং প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে।</p>
<p>ফারিস বলেছেন, ইলমুল ইয়াকিন হলো এমন ইলম, যাতে কোনো অস্থিরতা নেই। আর আইনুল ইয়াকিন হলো সেই ইলম, যার ভেতরে আল্লাহ তাঁর গোপন রহস্যসমূহ আমানত রেখেছেন।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<p>জ্ঞান যখন নিশ্চিততার গুণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তা সন্দেহমিশ্রিত জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। আর যখন সেই জ্ঞানের সঙ্গে ইয়াকিন যুক্ত হয়, তখন তা সন্দেহমুক্ত জ্ঞান হয়ে যায়। হাক্কুল ইয়াকিন হলো সেই সত্য, যার দিকে ইলমুল ইয়াকিন ও আইনুল ইয়াকিন ইঙ্গিত করে।</p>
<p>জুনায়েদ (রহ.) বলেছেন, হাক্কুল ইয়াকিন হলো বান্দা এই সত্য দ্বারা সত্যায়িত হয়ে যাওয়া। এর অর্থ হলো, সে গায়েবকে এমনভাবে প্রত্যক্ষ করে, যেমন চোখের সামনে উপস্থিত বিষয়কে দেখা হয়। সে গায়েবের ওপরও প্রত্যক্ষ দেখার মতো হুকুম করে এবং সত্যতার ভিত্তিতে গায়েব সম্পর্কে সংবাদ দেয়। যেমন হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সংবাদ দিয়েছিলেন, যখন রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বলেছিলেন, ماذا أبقيتَ لعيالك؟ &#8211; তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?</p>
<p>তিনি বলেছিলেন, الله ورسوله &#8211; আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে।</p>
<p>কেউ কেউ বলেছেন, ইলমুল ইয়াকিন হলো মারিফাতের হাল। আইনুল ইয়াকিন হলো জম‘-এর হাল। আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো তাওহিদের ভাষায় জম‘-এরও জম‘।</p>
<p>আরও বলা হয়েছে, ইয়াকিনের চারটি স্তর আছে। নাম-চিহ্ন, ইলম, আইন ও হক। নাম সাধারণ মানুষের জন্য। চিহ্নও সাধারণ মানুষের জন্য। ইলমুল ইয়াকিন অলিদের জন্য। আইনুল ইয়াকিন খাস অলিদের জন্য। হাক্কুল ইয়াকিন নবিগণের জন্য। আর হাক্কুল ইয়াকিনের পূর্ণতম সত্যতা আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত।<a href="#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইবনে আরাবি কাবাঘরের জীবন্ত উদাহরণ দিয়ে তিন স্তরের পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। তিনি দার্শনিক দৃষ্টিতে প্রমাণ করেছেন, তিনটি আলাদা শব্দ মানে তিনটি আলাদা অর্থ; একই জিনিসকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করা যায় না, তাই ভিন্নতা অবশ্যই আছে। হাক্কুল ইয়াকিন সেই স্তর যেখানে ইলম ও আইন উভয় দিক একত্রিত হয়। ইলাহি জাতের ব্যাপারে হাক্কুল ইয়াকিন ছাড়া কিছু অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু সেই বিষয়ে নীরব থাকাই ওয়াজিব।</p>
<p>ইলমুল ইয়াকিন হলো আল্লাহ বান্দাকে এমন অকাট্য দলিল দান করেন, যাতে কোনো সন্দেহ প্রবেশ করতে পারে না এবং কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে না।</p>
<p>আইনুল ইয়াকিন হলো মুশাহাদা ও কাশফের মাধ্যমে বান্দা যে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি লাভ করে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু দলিলের স্তরে থাকে না; অন্তর যেন তা সরাসরি দেখে ও অনুভব করে।</p>
<p>আর হাক্কুল ইয়াকিন হলো আল্লাহ বান্দার অন্তরে এমন ইলম প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে তিনি বান্দাকে সেই প্রত্যক্ষ সত্যে পৌঁছাতে চান।</p>
<p>علمُ اليقينِ بعينه وبحقّه تبدو دلائلُه على الأكوان<br />
ইলমুল ইয়াকিন, তার আইন ও হকসহ তার প্রমাণসমূহ সৃষ্টিজগতের ওপর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।</p>
<p>لولا وجودُ العينِ في ملكوته ما قام توحيدٌ على برهان<br />
যদি তার মালাকুতের জগতে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির অস্তিত্ব না থাকত, তবে তাওহিদও কোনো প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতো না।</p>
<p>فانظر إلى حقّ اليقين وعينه في عالم الأرواح والأبدان<br />
তুমি তাই হাক্কুল ইয়াকিন ও আইনুল ইয়াকিনের দিকে তাকাও; রুহের জগতে এবং দেহের জগতে।</p>
<p>تجدِ الذي عنه تكونُ سرَّه في كلّ ما يبدو من الأعيان<br />
তাহলে তুমি দেখতে পাবে, তার রহস্য যার মাধ্যমে গঠিত হয়, তা প্রতিটি প্রকাশমান সত্তার মধ্যেই প্রকাশ পায়।</p>
<p>জেনে রাখো, আমরা এমন এক নিশ্চিত ইলম লাভ করেছি, যাতে কোনো সন্দেহ প্রবেশ করে না। এই জগতে একটি ঘর আছে, যাকে কাবা বলা হয়। সেটি মক্কা নামে একটি শহরে অবস্থিত। এ বিষয়ে কোনো অজ্ঞ মানুষও সন্দেহ করতে পারে না। তার অন্তরে এ নিয়ে কোনো সংশয় জন্মায় না, আর এর দলিলেও কোনো অস্পষ্টতা আসে না। ফলে এ জ্ঞান আমাদের কাছে স্থির ও নিশ্চিত হয়ে গেছে।</p>
<p>এখন এই নিশ্চিত জ্ঞানের সঙ্গে আরেকটি স্থির সত্য যোগ করো। আল্লাহরও একটি ঘর আছে, যাকে কাবা বলা হয়। কারণ সেই ঘরকে মক্কা বলা হয়। মানুষ প্রতি বছর সেখানে হজ করতে যায় এবং তার চারপাশে তাওয়াফ করে। এরপর যখন কেউ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চোখে এই ঘর দেখে এবং সেখানে পৌঁছে যায়, তখন তার নফসে সেই ঘরের বাস্তব রূপ, অবস্থা ও আকৃতি প্রত্যক্ষ দেখার মাধ্যমে স্থির হয়ে যায়। তখন এ দেখাই হয় আইনুল ইয়াকিন। এর আগে সে ঘরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল ইলমুল ইয়াকিন। এরপর যখন সে সেই ঘরকে স্বচক্ষে দেখে, তখন তার নফসে এমন এক উপলব্ধি জন্ম নেয়, যা দেখার আগে ছিল না।</p>
<p>এরপর যখন আল্লাহ কোনো বান্দার বাসিরত অন্তরচক্ষু খুলে দেন, যাতে সে বুঝতে পারে— এই ঘরকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সে ঘর অন্য সব ঘরের মতো নয়; বরং বিশেষভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নির্ধারিত। তখন সে বুঝতে পারে, এই সম্পৃক্ততার কারণ ও রহস্য কী। কিন্তু এ জ্ঞান সে নিজের চিন্তা ও সাধনার মাধ্যমে পায় না; আল্লাহর জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই পায়। ফলে এ বিষয়ে তার জ্ঞান হয়ে যায় হাক্কুল ইয়াকিন তথা এমন সত্য, যা তার কাছে স্থির থাকে, কখনো সরে যায় না।</p>
<p>সুতরাং প্রতিটি হকের জন্য এক ধরনের স্থিরতা আছে; কিন্তু প্রতিটি ইলম ও প্রতিটি আইন সেই স্থিরতার অধিকারী নয়। তাই এই সম্পৃক্ততা সঠিক ও প্রমাণিত হলো।</p>
<p>যদি ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন তিনটিই একই বিষয় হতো, তাহলে এভাবে পৃথকভাবে সম্পৃক্ত করা সঠিক হতো না। কারণ একই জিনিসকে নিজের সঙ্গেই সম্পৃক্ত করা যায় না। সম্পৃক্ততা হয় দুই ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে। একটি হয় সম্পৃক্তকারী, আরেকটি হয় যার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। আর সম্পৃক্ততার জন্য ভিন্নতা প্রয়োজন, যাতে তার অস্তিত্ব সঠিক হয়।</p>
<p>যারা ইয়াকিন ও ইলমের মধ্যে পার্থক্য করেনি এবং বলেছে, ইলমই ইয়াকিন। তাদের এ বিষয়ে একটি যুক্তি খুঁজতে হয়েছে; কারণ আল্লাহর কিতাবে ‘ইলম’ শব্দকে ‘ইয়াকিন’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেছে, অর্থ এক, যদিও শব্দ দুটি ভিন্ন। এক শব্দ আরেক শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু অর্থের দিক থেকে উভয় একই।</p>
<p>কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি এমন নয়। ‘ইলম’ শব্দের অর্থ এক, আর ‘ইয়াকিন’ শব্দের অর্থ আরেক। তাই ইলমকে ইয়াকিনের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এতে সম্পৃক্ততা শব্দের মধ্যে সঠিক হয়েছে, অর্থের মধ্যে নয়। এ ধরনের বাক্য আসে মানুষের বুঝের সীমাবদ্ধতার কারণে। মানুষ অনেক সময় শব্দ কোনো অর্থের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, তা ঠিকমতো বুঝতে পারে না। যদি সে জানত, ‘ইলম’ শব্দের অর্থ ‘ইয়াকিন’ শব্দের অর্থ নয়, তাহলে বুঝে যেত— ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিনের অর্থ আলাদা।</p>
<p>এরপর জেনে রাখো, এই আলোচনায় আসল চাওয়া হলো ইয়াকিন। এ কারণেই এই তিনটি বিষয়কে ইয়াকিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং ইয়াকিনকেই এর কেন্দ্র করা হয়েছে।</p>
<p>যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আল্লাহর মধ্যে ও আল্লাহর সঙ্গে স্থিরতা লাভ করে, তার এই স্থিরতার অবশ্যই কিছু আলামত থাকে। এই আলামত ইয়াকিনের সঙ্গে যুক্ত, কারণ তা তার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এই আলামত প্রত্যক্ষভাবে দেখা জরুরি; আলামতকে চিনে নিতে হবে এবং তা ইয়াকিনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তাও বুঝতে হবে। এটাই আইনুল ইয়াকিন।</p>
<p>আর এতে অবশ্যই এমন এক হিকমত থাকতে হবে, যা এ প্রত্যক্ষ দেখার মধ্যে কার্যকর। এ ইলমে ইলম কেবল সেই বিষয়ে কার্যকর হবে, যেখানে তার কাজ করার অধিকার আছে। আর চোখও কেবল সেই বিষয়ে তাকাবে, যেখানে তার দেখা প্রয়োজন। এটাই হলো হাক্কুল ইয়াকিন, যা ইলম ও আইন উভয়ের দিককে একত্র করে।</p>
<p>ইয়াকিন হলো এমন সব সত্য, যা স্থির হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আর সরে যায় না। সৃষ্টা ও সৃষ্টির যে স্তরেই তা হোক। তাই ইয়াকিনের ইলমও আছে, আইনও আছে, হকও আছে।</p>
<p>আর যে সত্য নিজের বিধানকে আবশ্যক করে, তা শুধু ইলাহি জাত। এই জাতের ব্যাপারে হাক্কুল ইয়াকিন ছাড়া আর কিছু অস্বীকার করা যায় না। আর এই হাক্কুল ইয়াকিনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে আমাদের ওপর নীরব থাকা ওয়াজিব; এতে আলোচনা করা ছেড়ে দিতে হয়। কারণ তুমি জানো না, এরপর কোন ইলম ইয়াকিনের সঙ্গে যুক্ত হবে, কোন সাক্ষ্য ও প্রত্যক্ষতা ইয়াকিনের সঙ্গে যুক্ত হবে। তাই আইনকে ইয়াকিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় না।</p>
<p>পুরো জগতের ওপর আল্লাহর হুকুম রয়েছে। এ জগতে আলোচনা ছেড়ে দেওয়াই হক; তাই সেটিই তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করো। এরপর ইয়াকিনের সঙ্গে কেবল সেই জিনিসই যুক্ত হবে, যা তাকে গ্রহণ করে। যদি এমন কোনো আলামত থাকে, যা ইলমের দিকে ইঙ্গিত করে, তবে তা ইলমের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর যদি না থাকে, তবে তা তার সঙ্গে যুক্ত হবে না। যদি এমন কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকে, যা আইনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত, তবে তা আইনের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর যদি না থাকে, তবে তা তার সঙ্গে যুক্ত হবে না।</p>
<p>এমনকি একই বিষয়ের মধ্যে যদি কারও ওপর কোনো হুকুম ওয়াজিব হয়, সেটি সৃষ্টির কারও ওপর হোক, অথবা নিজ নফসের ওপরই হোক; যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী, كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ &#8211; তোমাদের রব নিজের ওপর রহমত আবশ্যক করে নিয়েছেন। সুরা আল-আনআম, আয়াত: ৫৪।</p>
<p>এখানে ‘হক’ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হয়েছে। তাই আমরা বলি, হাক্কুল ইয়াকিন এই দিক বিবেচনায়। যদিও আমাদের আগের আলোচনায় এ রকম দৃষ্টান্ত ছিল না।</p>
<p>সুতরাং এই বিষয়ে আমরা তোমাকে প্রত্যেক নিশ্চিত মানুষের জন্য পূর্ণ ও সামগ্রিক নির্দেশনা দিয়ে দিলাম। এইটুকু দৃষ্টি যথেষ্ট; এই পরিমাণ ব্যাখ্যাই যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন, আর তিনিই পথ দেখান।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে স্পষ্ট হয়, ইলমুল ইয়াকিন থেকে হাক্কুল ইয়াকিন পর্যন্ত যাত্রা আসলে জানা থেকে দেখা, দেখা থেকে বিলীন হওয়ার যাত্রা। <a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a>কুশাইরি ভিত্তি নির্মাণ করেছেন সহজ সংজ্ঞায়। দাতা গঞ্জে বখশ দেখিয়েছেন স্থায়ী মাকাম ও পরিবর্তনশীল হালের মধ্যে এই তিন স্তর কীভাবে অবস্থান করে। সোহরাওয়ার্দি স্তরভেদ করে দেখিয়েছেন কোন স্তর কার জন্য। আর ইবনে আরাবি দার্শনিক গভীরতায় প্রমাণ করেছেন, তিনটি আলাদা বাস্তবতা। সবশেষে বলা যায়, ইয়াকিনের এই তিন স্তর সুফি সাধনার সেই পথ, যেখানে বুদ্ধির দলিল থেকে শুরু করে আল্লাহর সরাসরি জ্ঞানদানে পৌঁছানো হয়। জানা, দেখা ও সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া— এই তিনের সমন্বয়েই পূর্ণ হয় আধ্যাত্মিক সাধনার লক্ষ্য।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/ilmul-aynul-haqqqul-yakin/">ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/ilmul-aynul-haqqqul-yakin/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>খাওয়াতির</title>
		<link>https://sufigraphy.com/khawatir/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/khawatir/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 02 Jul 2026 06:53:54 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3932</guid>

					<description><![CDATA[<p>মানুষের অন্তর কখনো শূন্য থাকে না; সেখানে নানা ভাব, ইঙ্গিত, ডাক ও প্রেরণা এসে উপস্থিত হয়। সুফি পরিভাষায় এই আগমনগুলোকেই বলা হয় খাওয়াতির। কিন্তু সব খাতির এক উৎসের নয়, আর সব খাতির অনুসরণযোগ্যও নয়। কোনোটি ফেরেশতার পক্ষ থেকে এসে কল্যাণের দিকে ডাকে, কোনোটি নফসের পক্ষ থেকে কামনা ও অহংকারের দিকে টানে, কোনোটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হয়ে [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/khawatir/">খাওয়াতির</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মানুষের অন্তর কখনো শূন্য থাকে না; সেখানে নানা ভাব, ইঙ্গিত, ডাক ও প্রেরণা এসে উপস্থিত হয়। সুফি পরিভাষায় এই আগমনগুলোকেই বলা হয় খাওয়াতির। কিন্তু সব খাতির এক উৎসের নয়, আর সব খাতির অনুসরণযোগ্যও নয়। কোনোটি ফেরেশতার পক্ষ থেকে এসে কল্যাণের দিকে ডাকে, কোনোটি নফসের পক্ষ থেকে কামনা ও অহংকারের দিকে টানে, কোনোটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হয়ে পাপের পথ খুলে দেয়, আবার কোনোটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য খাতির হিসেবে অন্তরে নিক্ষিপ্ত হয়। তাই আধ্যাত্মিক পথের বড় কাজ শুধু ভাব পাওয়া নয়; বরং ভাবের উৎস, প্রকৃতি ও পরিণতি চিনতে শেখা। ইমাম কুশাইরি এই বিষয়ে শরিয়তের মাপকাঠি, ইলম, হালাল খাদ্য ও মুজাহাদার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ইবনে আরাবি খাওয়াতিরকে আরও গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় দেখিয়েছেন। এগুলো অন্তরে আগত ইলাহি সম্বোধন, যা স্থায়ী নয়, বরং বার্তার মতো আসে, স্পর্শ করে, প্রভাব ফেলে এবং চলে যায়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো অন্তরের আগমনগুলোকে বুঝে মুরাকাবা, সতর্কতা ও সত্য গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করা।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি খাওয়াতিরকে মূলত অন্তরে আগত ভাব, সম্বোধন ও অন্তর-কথা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর আলোচনায় প্রধান গুরুত্ব পেয়েছে উৎস নির্ণয়: ফেরেশতার পক্ষ থেকে এলে তা ইলহাম, নফসের পক্ষ থেকে এলে হাওয়াজিস, শয়তানের পক্ষ থেকে এলে ওয়াসওয়াসা, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে এলে সত্য খাতির। তিনি দেখিয়েছেন, খাতির যাচাইয়ের প্রধান মানদণ্ড হলো ইলম ও প্রকাশ্য শরিয়তের সাক্ষ্য। নফস বারবার নিজের চাহিদার দিকে ফেরে, আর শয়তান এক ভুল থেকে আরেক ভুলে নিয়ে যায়। হালাল খাদ্য, মুজাহাদা ও অন্তরের সতর্কতা ছাড়া এই পার্থক্য স্পষ্ট হয় না।</p>
<p>তিনি বলেন, খাওয়াতির হলো এমন সব ভাব, সম্বোধন বা অন্তর-কথা, যা মানুষের মনে এসে উপস্থিত হয়। কখনো তা ফেরেশতার পক্ষ থেকে আসে, কখনো শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। কখনো তা নফসের নিজের কথাবার্তা হয়, আবার কখনো তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকেও আসে।</p>
<p>যদি তা ফেরেশতার পক্ষ থেকে আসে, তবে সেটি ইলহাম। যদি নফসের পক্ষ থেকে আসে, তবে তাকে হাওয়াজিস বলা হয়। যদি শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, তবে সেটি ওয়াসওয়াসা। আর যদি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসে এবং তিনি তা অন্তরে নিক্ষেপ করেন, তবে সেটি সত্য খাতির।</p>
<p>যদি খাতির ফেরেশতার পক্ষ থেকে আসে, তবে তার সত্যতা বোঝা যায় ইলমের সঙ্গে মিল থাকার মাধ্যমে। এ কারণেই সুফিরা বলেছেন, যে খাতিরের পক্ষে প্রকাশ্য শরিয়তের কোনো সাক্ষ্য নেই, তা বাতিল।</p>
<p>যদি খাতির শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, তবে অধিকাংশ সময় তা গুনাহের দিকে ডাকে।</p>
<p>যদি তা নফসের পক্ষ থেকে আসে, তবে অধিকাংশ সময় তা কামনার অনুসরণ, অহংকার অনুভব করা, অথবা নফসের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের কোনো একটির দিকে ডাকে।</p>
<p>মাশায়েখগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, যার খাদ্য হারাম থেকে আসে, সে ইলহাম ও ওয়াসওয়াসার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।</p>
<p>আমি উস্তাদ আবু আলি আদ-দাক্কাককে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, যার খাদ্যের শক্তি ও উৎস জানা-শোনা ও পরিষ্কার, সে ইলহাম ও ওয়াসওয়াসার মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয় না। আর যে ব্যক্তি সত্য মুজাহাদার মাধ্যমে নিজের নফসের হাওয়াজিসকে নীরব করে দেয়, তার অন্তরের বয়ান তার মুজাহাদা ও সাধনার হুকুম অনুযায়ী কথা বলতে শুরু করে।</p>
<p>মাশায়েখগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, নফস সত্য বলে না, আর অন্তর মিথ্যা বলে না।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<p>কোনো কোনো মাশায়েখ বলেছেন, তোমার নফস কখনো সত্য বলে না, আর তোমার অন্তর কখনো মিথ্যা বলে না। তুমি যদি প্রাণপণ চেষ্টা করো, যাতে তোমার রুহ তোমাকে সম্বোধন করে, তবু তা তোমাকে সম্বোধন করবে না।</p>
<p>জুনায়দ নফসের হাওয়াজিস ও শয়তানের ওয়াসওয়াসার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তিনি বলেছেন, নফস যখন কোনোকিছুর মাধ্যমে তোমাকে নিজের দিকে ডাকবে, তখন তুমি যদি বারবার তাকে ফিরিয়েও দাও, তবু কিছু সময় পর আবার সে ফিরে আসবে। সে এভাবেই বারবার ডাকতে থাকবে, যতক্ষণ না নিজের চাওয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং উদ্দেশ্য হাসিল করে। তবে সত্য মুজাহাদার স্থায়ী শক্তি থাকলে নফসের এই ডাক স্থায়ীভাবে থেমে যেতে পারে। অন্যথায় সে ফিরে ফিরে আসে।</p>
<p>কিন্তু শয়তানের ব্যাপার হলো, সে যখন কোনো ভুলের দিকে ডাকে, আর তুমি তার বিরোধিতা করো, তখন সে সেই ভুল ছেড়ে আরেক ভুলের দিকে ওয়াসওয়াসা দেয়। কারণ, তার কাছে সব ধরনের বিরোধিতা সমান। তার উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে যে-কোনো ভুলের দিকে ডেকে নেওয়া। নির্দিষ্ট কোনো একটি ভুলের মধ্যেই তাকে আটকে রাখার কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য তার নেই।</p>
<p>আরও বলা হয়েছে, প্রত্যেক খাতিরই ফেরেশতার পক্ষ থেকে আসে। কখনো তার সঙ্গী তার সঙ্গে একমত হয়, কখনো আবার তার বিরোধিতা করে। কিন্তু যে খাতির আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে আসে, সেখানে বান্দার পক্ষ থেকে কোনো বিরোধিতা ঘটে না।</p>
<p>শায়েখগণ দ্বিতীয় খাতির নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদি কোনো খাতির আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে আসে, এরপর আবার দ্বিতীয়বার আসে, তাহলে দ্বিতীয়টি কি প্রথমটির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে?</p>
<p>জুনায়দ বলেছেন, প্রথম খাতিরই বেশি শক্তিশালী। কারণ, তা যখন স্থায়ী হয়ে থাকে, তখন তার অধিকারী নিজেকে চিন্তা-ভাবনা ও পর্যবেক্ষণের দিকে ফিরিয়ে নেয়। আর এটি ইলমের শর্ত অনুযায়ী। সুতরাং প্রথম খাতিরকে ছেড়ে দিলে দ্বিতীয়টি দুর্বল হয়ে যায়।</p>
<p>ইবনে আতা বলেছেন, দ্বিতীয় খাতিরই বেশি শক্তিশালী। কারণ, প্রথম খাতিরের কারণে তার শক্তি আরও বেড়ে যায়।</p>
<p>আবু আবদুল্লাহ ইবনে খাফিফ মুতাআখখিরিনদের মধ্য থেকে বলেছেন, দুটিই সমান। কারণ, উভয়টিই আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে আসে। তাই একটির ওপর আরেকটির কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই। প্রথম খাতির দ্বিতীয় খাতির থাকা অবস্থায় অবশিষ্ট থাকে না। কারণ, আছার বা প্রভাবের ওপর স্থায়ী থাকা বৈধ নয়।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইবনে আরাবি খাওয়াতিরকে শুধু অন্তরের ভাব হিসেবে দেখেন না; তিনি একে বার্তাবাহী ইলাহি সম্বোধন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, খাতির স্থায়ী নয়; এটি অন্তরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে, অর্থ পৌঁছে দেয়, তারপর চলে যায়। শরিয়তের আলোকে খাওয়াতির পাঁচ পথ দিয়ে অন্তরে আসে: ফরজ, মানদুব, নিষিদ্ধ, মাকরুহ ও মুবাহ। ফেরেশতা সাধারণত কল্যাণের পথে আহ্বান করে, শয়তান নিষিদ্ধ ও অপছন্দনীয় পথে টানে, আর নফস বৈধ চাহিদার ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকে। তাঁর আলোচনায় মুরাকাবা, বাসিরত, ইলাহি সম্বোধন ও জরুরি ইলম বিশেষ গুরুত্ব পায়।</p>
<p><strong>খাওয়াতির এবং অন্তরে আগত ভাবসমূহের পরিচয়</strong><strong>:</strong></p>
<p>অন্তরের গভীর স্তরে যে সম্বোধন আসে, তা স্থায়ীভাবে থাকে না। এটি এমন এক ধরনের অন্তরে আগত ভাব, যার ওপর মানুষের নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু যখন সেই ভাব স্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা নফসের কথায় পরিণত হয়। আর এই আগমনকারী ভাবগুলোকেই খাওয়াতির বলা হয়।</p>
<p>إذا كان واردُنا خاطراً<br />
يمرُّ بنا ثم لا يرجعُ</p>
<p>আমাদের কাছে যে ওয়ারিদ আসে, যদি তা খাতির হয়,<br />
তবে তা আমাদের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে যায়, তারপর আর ফিরে আসে না।</p>
<p>فما في الوجود سوى خاطرٍ<br />
وما فيه ردٌّ ولا مدفعُ</p>
<p>অস্তিত্বে খাতির ছাড়া আর কিছু নেই;<br />
একে ফিরিয়ে দেওয়ারও উপায় নেই, ঠেকানোরও উপায় নেই।</p>
<p>تجدُّد أعيانُنا كلما<br />
تجدَّد أعراضُنا فاسمعوا</p>
<p>আমাদের অবস্থা ও গুণাবলি যখন নতুন হয়,<br />
তখন আমাদের সত্তাগত প্রকাশও নতুন হয়ে ওঠে; তাই শোনো—</p>
<p>فما ثمَّ عينٌ سوى واحدٍ<br />
وآخرُ في إثره يتبعُ</p>
<p>সেখানে মূল সত্তা একটিই;<br />
আর অন্য সব তার পেছনে পেছনে আসে।</p>
<p>জেনে রাখো, আল্লাহ যখন বান্দার অন্তরে কোনো বার্তা পাঠান, তখন সেই বার্তাবাহী আগমনগুলোকেই খাওয়াতির বলা হয়। এগুলো বান্দার অন্তরে স্থায়ীভাবে থাকে না। শুধু অন্তর অতিক্রম করার মুহূর্তটুকুই এদের অবস্থানকাল। এগুলো আসে, অন্তরকে স্পর্শ করে, নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেয়, তারপর চলে যায়।</p>
<p>আল্লাহ এগুলোকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রত্যেক খাতির নিজেই একটি বার্তার রূপ। অর্থাৎ, খাতির আলাদা আর তার বার্তা আলাদা— এমন নয়; বরং খাতির নিজেই বার্তা। যখন তা অন্তরের উপলব্ধিতে ধরা পড়ে, তখন অন্তর তার অর্থ বুঝে নেয়। এরপর মানুষ সেই বার্তার দাবি অনুযায়ী আমলও করতে পারে, আবার না-ও করতে পারে।</p>
<p>আল্লাহ নিজের ও বান্দার অন্তরের মাঝখানে পাঁচটি পথ রেখেছেন। এই পাঁচ পথ দিয়েই খাওয়াতির অন্তরে প্রবেশ করে। শরিয়ত আসার পরই এই পথগুলোর পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে। যদি শরিয়ত না থাকত, তাহলে এই পথগুলোরও কোনো নির্দিষ্ট নাম ও বিধান থাকত না।</p>
<p>এই পাঁচ পথ হলো—<br />
১. ওয়াজিব বা ফরজ,<br />
২. মানদুব বা পছন্দনীয় আমল,<br />
৩. হাজর বা নিষিদ্ধ বিষয়,<br />
৪. কারাহা বা অপছন্দনীয় বিষয়,<br />
৫. ইবাহা বা বৈধ বিষয়।</p>
<p>আল্লাহ অন্তরের সঙ্গে একজন নিয়োজিত ফেরেশতা রেখেছেন, যে আল্লাহর আদেশে অন্তরকে রক্ষা করে। আল্লাহ তার জন্য ওয়াজিব ও মানদুবের পথ নির্দিষ্ট করেছেন। অর্থাৎ, ফেরেশতার দিক থেকে যে খাতির আসে, তা সাধারণত ফরজ ও নেক আমলের দিকে ডাকে।</p>
<p>এর বিপরীতে আল্লাহ বান্দার পাশে একটি শয়তান রেখেছেন। তবে সে আল্লাহর নৈকট্যের দিক থেকে নয়; বরং বান্দার মানবিক দুর্বলতার পাশে অবস্থান করে। কারণ আল্লাহ মানুষের প্রতি বিশেষ দয়া ও যত্ন করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, কোন কাজ করলে বা কোন কাজ ছেড়ে দিলে বান্দা সৌভাগ্যের দিকে পৌঁছবে।</p>
<p>নিষিদ্ধ বিষয় এবং অপছন্দনীয় বিষয়ের পথে শয়তানের প্রবেশাধিকার রাখা হয়েছে। অর্থাৎ শয়তান সাধারণত এই দুই পথ দিয়ে অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। কখনো নিষিদ্ধ কাজের দিকে ডাকে, কখনো অপছন্দনীয় কাজের দিকে টানে।</p>
<p>কিন্তু ইবাহা বা বৈধ বিষয়ের পথে আল্লাহ শয়তানের জন্য কোনো বিশেষ স্থান রাখেননি। এই পথটি নফসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আল্লাহ নফসের শক্তিগুলোকে এই বৈধ বিষয়ের পথে সক্রিয় করেছেন। তাই খাওয়া, পান করা, বিশ্রাম নেওয়া, সাধারণ চাহিদা পূরণ করা— এসব বৈধ বিষয়ে নফসের ভূমিকা থাকে। তবে আল্লাহ নফসকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন সে নিজেকে শয়তানের পথে সঁপে না দেয়।</p>
<p>আল্লাহ মানব-নফসের মধ্যে গ্রহণ করার ক্ষমতা রেখেছেন। ফলে যে-ই তার কাছে আসে, সে কোনো না কোনোভাবে তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শরিয়ত আসার আগে, আদম আলাইহিস সালামের সময় থেকে শুরু করে শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠার পূর্বপর্যন্ত; এইভাবে ফেরেশতা, শয়তান ও বিধানগত পথের আলোচনা ছিল না। বরং তখন অবস্থা ছিল এমন, যেমন কোনো বান্দার ওপর শরিয়তি বিধান প্রযোজ্য না থাকায় বান্দা আল্লাহর ইচ্ছা ও মশিয়ত অনুযায়ী যে প্রেরণা পেত, সে অনুযায়ী চলতে থাকতো; নির্দিষ্ট বিধানের বাধ্যবাধকতা তখন ছিল না।</p>
<p>এরপর আল্লাহ নফসের মধ্যে একটি সতর্ক পর্যবেক্ষণশক্তি সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে বুঝতে পারে—কোন দিক থেকে কী আসছে। আল্লাহ তাকে ইলহাম করেছেন যে, তার ও আল্লাহর মাঝখানে কিছু বার্তাবাহী আগমন আছে। এগুলো বিভিন্ন পথ দিয়ে তার কাছে আসে; কিন্তু এগুলোর নিজের কোনো স্থায়ী আসন নেই। না পথে, না নফসের ভেতরে। এগুলো শুধু বার্তা নিয়ে আসে, বার্তা পৌঁছে দেয়, তারপর চলে যায়।</p>
<p>এই খাওয়াতিরকে এমনভাবে বুঝতে হবে: যখন তুমি এগুলোকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির মাধ্যমে চিনতে পারবে, তখন বুঝবে এগুলো আসলে আল্লাহ তোমার কাছে যে অর্থ পাঠিয়েছেন, তারই রূপ। তাই এগুলোকে অবহেলা করো না, আবার এগুলোকে স্থায়ী সঙ্গীও মনে করো না। এগুলো তোমার অন্তরের আঙিনা দিয়ে অতিক্রম করে; সেখানে রাতযাপন করে না, স্থায়ীভাবে থাকে না।</p>
<p>হক তায়ালা যেন এই সফরকারী বার্তাবাহীদের সম্পর্কে বলেন, হে সফরকারীরা, আমি এই প্রেরিত বার্তার মধ্যে দুটি অবস্থা রেখেছি। একটির নাম গাফলত, আরেকটির নাম সজাগতা। যদি তোমরা তাকে সজাগতার গুণে পাও, তবে সেটিই কাম্য উদ্দেশ্য। আর যদি তাকে গাফলতের গুণে পাও, তবে তার দরজায় কড়া নাড়ো, সে জেগে উঠবে। যদি সে না জাগে, তাহলে তোমরা তাকে হারাবে না; কারণ আমি তাকে ধারালো দৃষ্টি দিয়েছি। সে সেই দৃষ্টির মাধ্যমে তোমাদের রূপ চিনবে, তারপর তোমাদের ব্যাপারে যে হুকুম আছে, তা পালন করবে। আর যদি সে তোমাদের জন্য না জাগে, তাহলে তাকে ছেড়ে দাও এবং আমার দিকে ফিরে এসো।</p>
<p>আল্লাহ এই নিয়োজিত ফেরেশতাকে হিফাজত তথা সংরক্ষণ, সর্বদা সঙ্গ দেওয়া, নফসে ধারণ করার শক্তি, দেখার শক্তি এবং রূপ গঠনের শক্তি দিয়েছেন। ফলে খাওয়াতির যখন আসে, তখন সে এগুলোর রূপ তৈরি করে। বান্দার কাছে তখন খাতিরগুলো যেন তাদের নিজের রূপেই দেখা দেয়, অথচ আসলে তা খাতিরের নিজস্ব রূপ নয়। আল্লাহ এই উদাহরণগুলোকে দ্বিতীয় স্তরে রেখেছেন; মূল স্তরের ওপর নয়। মূল স্তর হলো প্রথম স্তর। সেখানে নফস প্রথম খাতিরের দাবি অনুযায়ী কাজ করে; তাই সে ভুল করে না, মিথ্যাও বলে না।</p>
<p>কিন্তু প্রথম খাতিরের রূপে যে দ্বিতীয় স্তরের বিষয় আসে, তা কখনো সত্য হতে পারে, কখনো ভুলও হতে পারে। এটা নির্ভর করে দেখার শক্তি, রূপ ধরে রাখার শক্তি এবং রূপের অংশগুলো সংরক্ষণ করার ক্ষমতার ওপর। প্রথম দৃষ্টি, প্রথম নড়াচড়া এবং প্রথম শ্রবণ— সবই এ রকম। প্রথম যা আসে, তা ইলাহি ও সত্য। যদি পরে ভুল ঘটে, তবে ভুল প্রথম আগমনে নয়; বরং দ্বিতীয় স্তরে তৈরি হওয়া রূপে ঘটে।</p>
<p>প্রথম স্তরের বিষয়গুলোর সবচেয়ে বেশি মুরাকাবা তথা সতর্ক পর্যবেক্ষণ জাহেরের মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আমরা এটি দেখেছি। আল্লাহর খাস বান্দাদের মধ্যেও এটি আছে। তাঁদের ক্ষেত্রে এটি ইসমত তথা সুরক্ষা, ভুল ও মিথ্যা থেকে হিফাজত। আর জাহেরের মানুষের ক্ষেত্রে এটি মুরাকাবা, ইলম ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধির শক্তি।</p>
<p>এই প্রথম খাতিরকে তাঁদের কাছে হাইজিস, নাকরুল খাতির এবং প্রথম কারণ বলা হয়। এই প্রথম কারণই হলো সেই বার্তা, যা এসব সম্মানিত, সৎ সফরকারী দূতেরা অন্তরের জন্য নির্ধারিত পথ দিয়ে নিয়ে আসে। অন্তর তা গ্রহণ করে, তা ফেরেশতার পক্ষ থেকে হোক, শয়তানের পক্ষ থেকে হোক, কিংবা নফসের পক্ষ থেকে হোক।</p>
<p>যে আগে এই বার্তা গ্রহণ করে, অন্তর তার কাছ থেকেই তা নেয়। যদি ফেরেশতা তা গ্রহণ করে, তাহলে ফেরেশতা সেই অর্থই গ্রহণ করে, যার মধ্যে বান্দার সৌভাগ্যের কাজ আছে। এরপর সে গোপনে অন্তরে ইঙ্গিত করে বলে, এমন এমন কাজ করো। তখন শয়তান তাকে বলে, এখনই করো না; আরেক সময়ের জন্য রেখে দাও। তার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন সেই কাজ থেকে বঞ্চিত হয় এবং তার সৌভাগ্যের দিকে পৌঁছার কারণটি হাতছাড়া করে।</p>
<p>মানুষ নিজের মধ্যে কখনো এই দ্বিধা অনুভব করে— ভালো কাজ করবে, না ছেড়ে দেবে; মন্দ কাজ করবে, না ছেড়ে দেবে। ইবাহা তথা বৈধ বিষয়ের পথেও এ রকম হয়। বৈধ কাজ করবে কি করবে না— এ দ্বিধা মূলত নফস ও শয়তানের মধ্যে ঘটে; ফেরেশতা ও শয়তানের মধ্যে নয়। কারণ ফেরেশতার লাম্মা এবং শয়তানের বিপরীত লাম্মা- এ দুটি চার ধরনের বিধানের পথে ঘটে। কিন্তু মুবাহ তথা বৈধ বিষয়ে শয়তানের বিশেষ কোনো লাম্মা নেই। এ ক্ষেত্রে শয়তানের জন্য কোনো ঝগড়ার জায়গাও নেই। মুবাহ কাজটি নফসের জন্যই নির্ধারিত; কারণ নফসকে উপকার অর্জন ও ক্ষতি দূর করার স্বভাব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।</p>
<p>তবে সব অবস্থায় আগে নিষেধ আসে; ফেরেশতার লাম্মাতেও, শয়তানের লাম্মাতেও। যদি বিষয়টি মন্দ হয়, তাহলে সেই মন্দের ক্ষেত্রে আদেশদাতা হলো শয়তান; তাই তার অগ্রগতি আছে। আর যদি বিষয়টি ভালো হয়, তাহলে সেই ভালো কাজের আদেশদাতা হলো ফেরেশতা; তাই তার অগ্রগতি আছে। সুতরাং নিষেধ কোনো আদেশের পরেই আসে, আগে নয়। এই উপস্থিত জগতে নিয়ম এর বিপরীত হয় না।</p>
<p>মানুষের মধ্যে এর মূল দৃষ্টান্ত আদম আলাইহিস সালাম থেকে এসেছে। তাঁকে প্রথমে জান্নাতে বসবাসের আদেশ দেওয়া হয়েছিল এবং যেখানে ইচ্ছা সেখান থেকে খেতে বলা হয়েছিল। এরপর তাঁকে একটি নির্দিষ্ট গাছের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল।</p>
<p>حَيْثُ شِئْتُمَا &#8211; তোমরা দুজন যেখানে ইচ্ছা খাও। সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৫।</p>
<p>এই আয়াতে গাছের কাছে যাওয়ার বিষয়ে যে নিষেধ এসেছে, তা জোরপূর্বক বাধা নয়। সেখানে খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং যে গাছের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল, সেই গাছের কাছাকাছি যাওয়া থেকে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল।</p>
<p>حَيْثُ شِئْتُمَا &#8211; তোমরা দুজন যেখানে ইচ্ছা খাও। অর্থাৎ, তাঁরা সেই গাছের কাছাকাছি না যাওয়া পর্যন্ত, সেখান থেকে খাননি। তাই তাঁকে ধরা হয়েছে কাছে যাওয়ার কারণে, খাওয়ার কারণে নয়। পরে ইলাহি জিজ্ঞাসাবাদের পরও সেই গাছের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল; যে তার ফল খাবে, সে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।</p>
<p>وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى &#8211; আর এমন রাজত্ব, যা কখনো ক্ষয় হয় না। সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২০।</p>
<p>আদমের বংশধররা তাঁর মধ্যেই ছিল। এরপর যা ঘটার ছিল, তা ঘটল। তারপর তাঁকে খিলাফতের জন্য নামিয়ে দেওয়া হলো এবং হাওয়া আলাইহাস সালামকে বংশবিস্তারের জন্য নামানো হলো; কারণ তিনি ছিলেন জন্ম ও সৃষ্টির ক্ষেত্র। এরপর বংশধর বেরিয়ে এলো। আল্লাহ যখন আদম ও তাঁর বংশধরদের ওপর তাওবা কবুল করলেন এবং সবাইকে সৌভাগ্যবান করলেন, তখন তাদের জন্য যে ঘরেই থাকুক না কেন, নিয়ামত রইল।</p>
<p>তারপর দুনিয়ায় যে শাস্তি ও কষ্ট এলো, তা তাদের নিয়েই জীবন চলার অংশ হলো— দুনিয়ায়ও, আখিরাতেও। দুনিয়ার কথা হলো, মানুষের খাওয়া-দাওয়ায় কষ্ট থাকবেই। নবজাতক যখন জন্ম নেয়, মায়ের গর্ভ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় সে যে কষ্ট অনুভব করে, তার কারণে চিৎকার করে কাঁদে।</p>
<p>মায়ের গর্ভ থেকে বের হওয়ার সময় বাতাস তার শরীরে লাগে। এতে সে ব্যথা অনুভব করে এবং কাঁদে। যদি সে মারা যায়, তবে সে বিপদের অংশ পেয়েই মারা যায়। আর যদি বেঁচে থাকে, তবে দুনিয়ার জীবনে নানা রকম কষ্ট তার সঙ্গী হয়। প্রাণীও এ থেকে আলাদা নয়। তাকে যখন দোজখে নেওয়া হবে, তখন প্রশ্নের কষ্ট থেকে সে মুক্ত থাকবে না। আর যখন তাকে পুনরুত্থিত করা হবে, তখন নিজের জন্য বা অন্যের জন্য ভয়ের কষ্ট থেকেও সে মুক্ত থাকবে না। তবে যখন সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন এসব কষ্ট তার কাছ থেকে উঠে যাবে। অর্থাৎ ব্যথা-কষ্টের বিধান শেষ হয়ে যাবে, আর স্থায়ী নিয়ামত তার সঙ্গী হবে। আর যদি সে জাহান্নামে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহ যতদিন চান, ব্যথা-কষ্ট তার সঙ্গী থাকবে।</p>
<p>সুতরাং তার ভেতর আল্লাহর মশিয়ত যখন কার্যকর হবে, তখন যে কষ্ট তাকে দেওয়া হয়েছিল, সে কষ্টের বদলে আল্লাহর সেই বিশেষ যত্নের মাধ্যমে তাকে নিয়ামত দেওয়া হবে, যা তাকে ঘিরে রেখেছিল। সে তো আদম আলাইহিস সালামের ঔরসে ছিল। তাই আদমের তাওবা কবুল হওয়ার পর, সে-ও ব্যথা ও স্বাদ উভয়ের অংশ লাভ করল; যেমন তার পিতা আদমও এর অংশ লাভ করেছিলেন। অতএব সে তার পিতার তাওবারও একটি অংশ পেল।</p>
<p>তবে আল্লাহ যাকে চান, তার ক্ষেত্রে ইনতিকাম তথা প্রতিফল ও শাস্তির নামগুলো কার্যকর থাকে; এই নামধারী মানুষ ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে। কারণ আল্লাহর রহমত এই মানব-সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর গজবের আগেই রয়েছে। আর মানুষ ছাড়া অন্য সৃষ্টির বিষয়টি আলাদা।</p>
<p>فَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ &#8211; আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৬।</p>
<p>কারণ আল্লাহর রহমত আগে থেকেই ব্যাপক। মানুষ ছাড়া অন্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই ব্যাপক ও পূর্ববর্তী রহমত দুই দিক থেকে তাদের আচ্ছন্ন করে। কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্য কারও জন্য এই রহমতের বিধান নেই। কারণ মানুষের প্রতি আল্লাহর যত্ন অন্য সব সৃষ্টির প্রতি যত্নের চেয়ে বেশি।</p>
<p>এরপর আমরা খাওয়াতির পরিচয় বিষয়ে আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে আসি। আমরা বলি, যখন তোমাকে খাওয়াতিরের প্রকৃত পরিচয় জানানো হলো, তখন বুঝে নাও, নফসের মধ্যে তার প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন হয়। এর কারণ হলো, তার পথে যে বাধা দেয়, সে-ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। আমরা যাদের কথা উল্লেখ করেছি, তাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো খাতিরের পথে বাধা না দেয়, তাহলে সেটি অবশ্যই সাবাত বা স্থিরতার খাতির হবে। আর এটিই রাব্বানি খাতির।</p>
<p>আমল ও ত্যাগের খাওয়াতির কখনো ফেরেশতার পক্ষ থেকে হয়, কখনো শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, কখনো নফসের পক্ষ থেকেও হয়। এর বাইরে আর কোনো খাতির নেই।</p>
<p>قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا</p>
<p>বলুন, সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাহলে এই লোকদের কী হলো যে, তারা প্রায় কোনো কথাই বুঝতে পারে না? সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৭৮।</p>
<p>আরও একটি খাতির আছে, যা সরাসরি আগে থেকেই আসে। সেটি কখনো আমলের জন্য হয়, কখনো কোনো কাজ ছাড়ার জন্য হয়; ফেরেশতার হাতেও আসার আগে, শয়তানের হাতেও আসার আগে।</p>
<p>فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا &#8211; তিনি তাকে তার পাপের প্রবণতা ইলহাম করেছেন। সুরা আশ-শামস, আয়াত: ৮।</p>
<p>وَتَقْوَاهَا &#8211; এবং তার তাকওয়ার প্রবণতাও। সুরা আশ-শামস, আয়াত: ৮।</p>
<p>যে ব্যক্তি নিজের খাওয়াতিরের পথগুলোর ওপর সতর্ক নজর রাখে, সে সফল হয়। কারণ সে জানে, কোন দিক থেকে কোন খাতির এলো। আর যারা এসব পথের পাশে বসে থাকে, প্রত্যেকের জন্যই একেকটি পর্যবেক্ষণস্থল আছে। যে ব্যক্তি এসব পথ সম্পর্কে গাফেল থাকে, খাতিরকে অনুভব করে না এবং খাতির তার ভেতরে নিজের দাবি নিয়ে পৌঁছে যায়; যেমন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তখন সে খাতিরের দাবি অনুযায়ী কাজ করে, অথচ কাজটির প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। যদি কাজটি ভালো হয়, তবে তা কাকতালীয়ভাবে ভালো হয়। আর যদি মন্দ হয়, তবে সেটিও কাকতালীয়ভাবে মন্দ হয়।</p>
<p>কারণ যে প্রথম খাতির ইলমসহ আসে, তার পরে অন্যান্য খাওয়াতির আসে। কিন্তু যার হাতে ওই খাতির এসেছে, সে তা অনুভব করেনি। তার সে বিষয়ে ইলমও নেই, প্রত্যক্ষ দেখাও নেই। তাই তার হুকুমও তার দৃষ্টি থেকে আড়াল থাকে। যখন এই আমলি খাওয়াতিরগুলো গাফলতের সময় এবং জাগ্রত নজরদারি না থাকার অবস্থায় আসে, তখন সে এগুলোর দাবি অনুযায়ী কাজ করে। ফলে তার ভালো-মন্দ কেবল কাকতালীয় হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>আমি ইবনুল হাজ্জারি আল-মুহতাসিবকে ফাস শহরে দেখেছি। তিনি শরিয়তের আলেম ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহ তাকে হুকুমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার তাওফিক দিয়েছিলেন। আমি তাঁর সঠিকতার একটি বিষয় জানি। তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত তারাবির সব নামাজে ইমামের পেছনে ইহরামের তাকবির ধরতেন। তাঁর অন্তর্গত অনুভবে তাঁর হুকুমগুলো চলত সরাসরি ইলহামের ওপর। তিনি বলতেন, আমার বিষয়টি দেখে আমি আশ্চর্য হই! আমি শরিয়তের বিধান শেখার কাজে ব্যস্ত হইনি, অথচ আমার সব হুকুম শরিয়তের বিধানের সঙ্গে মিলে যায়। শরিয়তের কোনো আলেম এমন কোনো হুকুমে আমার বিরুদ্ধে আপত্তি করতে পারেননি, যেখানে আমাকে একক মুজতাহিদ বলা যায়।</p>
<p>এ মানুষটিকে আমি সাধারণ মানুষের মধ্যেই দেখেছি। তিনি পথের লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না; বরং দুনিয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন, অন্য সাধারণ মানুষের মতোই। কিন্তু তাঁর বাতেন ছিল আলোকিত, যদিও তিনি নিজে তা অনুভব করতেন না।</p>
<p>সব খাওয়াতিরই ইলাহি সম্বোধন, আর সবই তাজাল্লি। এ কারণেই আল্লাহ সেগুলোকে এমন সব রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আল-আমা তথা অদৃশ্য গভীর স্তরে প্রকাশিত হয়। আর আল-আমার সেই স্তরই হলো নফসে ইলাহি।</p>
<p>যে ব্যক্তি এই রূপগুলো দেখে, কিন্তু আল্লাহ তাকে আমাদের উল্লেখ করা ইলম দান করেন না, সে কল্পনা করে— খাওয়াতির আসলে সেই রূপেই ইলাহি তাজাল্লি, যা সে দেখছে। অথচ বিষয়টি এর চেয়ে গভীর।</p>
<p>আর খাওয়াতির নামকরণের কারণও এটাই। এগুলো স্থায়ীভাবে থাকে না। যেমন মানুষ কোনো অক্ষর উচ্চারণ করার পর, সেই অক্ষরের রূপ বাইরের অস্তিত্বে স্থায়ী হয়ে থাকে না। জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণের সময়টুকুই তার স্থায়িত্ব। তারপর তা বিলীন হয়ে যায়। তবে শ্রোতার বুঝে একটি রূপ থেকে যায়। ফলে সে মনে করে, খাতিরও বুঝি স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে।</p>
<p>যেমন আল্লাহর বাণীতে ذو النون তথা ইউনুস আলাইহিস সালাম কল্পনা করেছিলেন—</p>
<p>أَلَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ &#8211; সে ভেবেছিল, আমি তার ওপর সংকীর্ণতা আনব না। সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭।</p>
<p>অর্থাৎ যেন এখনো তাঁর কানে সেই শোনা কথা রয়ে গেছে। অথচ আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। যা স্থায়ী থাকে, তা সেই শোনা- কথার আসল রূপ নয়; বরং কথার যে রূপ নফসে স্থির হয়ে যায়, বুঝ সেই রূপ থেকেই গ্রহণ করে। আল্লাহর পথের মানুষের মধ্যেও অল্প লোকই এই দুই রূপের পার্থক্য করতে পারে।</p>
<p>যেহেতু খাওয়াতির ইলাহি সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত, তাই আল্লাহর মানুষদের মধ্যে যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, তারা মানুষকে বাসিরত তথা অন্তর্দৃষ্টির ওপর ডাকেন। কারণ আল্লাহর দিকে দাওয়াত কেবল বাসিরতের ওপরই হতে পারে। আর বাসিরত কেবল ইলাহি পরিচয়ের মাধ্যমেই হয়। ইলাহি পরিচয়ও কেবল ইলাহি কালাম বা সম্বোধনের মাধ্যমেই হয়, অন্য কিছুর মাধ্যমে নয়; যাতে সব জটিলতা দূর হয়ে যায়।</p>
<p>যদি সৃষ্টিজগৎ كن শব্দ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করত, তাহলে আল্লাহর বাণীতে يكن এত দ্রুত ঘটত না।</p>
<p>كُنْ فَيَكُونُ &#8211; হও, সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়।</p>
<p>এখানে يكن হলো আল্লাহর আদেশের তাৎক্ষণিক জবাব। যে ব্যক্তি বাসিরতের ওপর আছে, তার ক্ষেত্রেই এমন হয়; কারণ বিষয়টি সম্বোধনের মাধ্যমে ঘটে। যদি এটি সম্বোধন না হতো, তাহলে এই বিধান প্রযোজ্য হতো না।</p>
<p>কিন্তু মুরাকাবা বা সতর্ক পর্যবেক্ষণে থাকা আলোকিত আলেম-নফসগুলো কোথায়? তারা তো বিষয়টিকে তার প্রকৃত রূপে চেনে। এই বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানীর লক্ষ্য হলো, সে যেন নিজের নফসে আগত খাতিরকে সত্যিকার সম্বোধন হিসেবে চিনতে পারে। আর যেন বুঝতে পারে, এ সম্বোধনকে আল্লাহ এই ব্যক্তির ভেতরে জরুরি ইলমের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন, অন্য কারও মাধ্যমে নয়।</p>
<p>সঠিক কাশফের অধিকারী জানে, আল্লাহ কোনোকিছুর বিষয়ে মানুষের মধ্যে জরুরি ইলম সৃষ্টি করেন না, যতক্ষণ না তিনি তাকে সেই বিষয়ের সম্বোধন শুনিয়ে দেন। তখন সে বুঝতে পারে, হক তায়ালা এই সম্বোধনের মাধ্যমে কী চেয়েছেন। এটাই জরুরি ইলম।</p>
<p>তবে এই সূক্ষ্ম বিষয়টি অনুভব করতে পারে কেবল গভীর অনুভবের অধিকারীরা; আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ইলাহি রহস্যের ধারকগণ। আল্লাহই সত্য বলেন, আর তিনিই পথ দেখান।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>খাওয়াতিরের আলোচনা মানুষকে অন্তরের জগৎ সম্পর্কে গভীর সতর্কতা শেখায়। বাহ্যিক কাজের আগে অন্তরে একটি সূক্ষ্ম আগমন ঘটে; কখনো তা কল্যাণের দরজা খুলে দেয়, কখনো বিপদের দিকে টানে। তাই আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির পথে শুধু আমল নয়, আমলের আগে অন্তরে যে ডাক আসে, সেটিকেও চিনতে হয়। ইমাম কুশাইরি এই চিন্তার জন্য পরিষ্কার শরিয়তি মাপকাঠি দিয়েছেন: যে খাতির ইলম ও প্রকাশ্য শরিয়তের সঙ্গে মেলে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হালাল খাদ্য, মুজাহাদা ও নফস দমনের ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ অপবিত্র জীবন অন্তরের বিচারশক্তি দুর্বল করে। ইবনে আরাবি এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করে দেখিয়েছেন যে, খাওয়াতির বার্তার মতো আসে এবং মানুষের অন্তরে প্রভাব ফেলে; কিন্তু তাকে স্থায়ী সত্য ভেবে বসা ভুল। এর প্রকৃতি বুঝতে প্রয়োজন মুরাকাবা, বাসিরত ও ইলাহি পরিচয়ের আলো। ফলে দুই মনীষীর বক্তব্য মিলিয়ে মূল শিক্ষা হলো- অন্তরের প্রতিটি আগমন অনুসরণযোগ্য নয়; বরং তা যাচাই, পর্যবেক্ষণ ও শরিয়তের আলোতে গ্রহণ বা বর্জন করতে হয়।</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/khawatir/">খাওয়াতির</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/khawatir/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>নফস</title>
		<link>https://sufigraphy.com/nafs/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/nafs/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 01 Jul 2026 11:20:21 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3896</guid>

					<description><![CDATA[<p>সুফি সাধনার পথে নফস সম্ভবত সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। কেউ বলেন নফস মানে রুহ, কেউ বলেন মন্দের সমষ্টি, কেউ বলেন দেহ ও রুহের মাঝামাঝি এক বরজখি সত্তা। এই বহু অর্থের কারণেই নফস নিয়ে সুফি চিন্তায় এত বিস্তৃত আলোচনা। তবে সব দৃষ্টিভঙ্গির একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু আছে। নফস আল্লাহর পথে প্রধান অন্তরায়। ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বীকারোক্তি [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/nafs/">নফস</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সুফি সাধনার পথে নফস সম্ভবত সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। কেউ বলেন নফস মানে রুহ, কেউ বলেন মন্দের সমষ্টি, কেউ বলেন দেহ ও রুহের মাঝামাঝি এক বরজখি সত্তা। এই বহু অর্থের কারণেই নফস নিয়ে সুফি চিন্তায় এত বিস্তৃত আলোচনা।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">তবে সব দৃষ্টিভঙ্গির একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু আছে। নফস আল্লাহর পথে প্রধান অন্তরায়। ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বীকারোক্তি “নফস মন্দের দিকেই আদেশ দেয়”, হাদিসে “সবচেয়ে বড় জিহাদ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ” বলা একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">কিন্তু নফসকে শুধু শত্রু হিসেবে দেখলেই হয় না। যে নিজের নফসকে চিনল, সে রবকে চিনল— এই গভীর সত্যও সামনে থাকে। আর ইনসানে কামেল তো দেহ, রুহ ও নফসের সমন্বিত পরিপূর্ণ মানুষ। ইমাম কুশাইরি, ইবনে আরাবি, দাতা গঞ্জে বখশ এবং আবু তালেব মক্কি (রহ.) নফসের এই জটিল বাস্তবতা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উন্মোচন করেছেন।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>অভিধানে কোনোকিছুর নফস বলতে তার অস্তিত্বকে বোঝায়। আর সুফি সাধকদের পরিমণ্ডলে নফস শব্দটির সাধারণ প্রয়োগ দ্বারা কেবল তার অস্তিত্ব কিংবা নির্ধারিত দেহ-অবয়বকে বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং তারা নফস বলতে বান্দার সে-সব গুণাবলিকে বুঝিয়েছেন যা ত্রুটিযুক্ত এবং তার যে-সব চরিত্র ও কর্ম নিন্দনীয়।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>অতঃপর বান্দার এই ত্রুটিযুক্ত গুণাবলি দুই প্রকারের হয়ে থাকে। একটি হলো যা বান্দা নিজে অর্জন করে; যেমন তার অবাধ্যতা ও শরিয়তবিরোধী লঙ্ঘনসমূহ। দ্বিতীয়টি হলো তার নিকৃষ্ট চরিত্র বা স্বভাব, যা স্বীয় সত্তার দিক থেকেই নিন্দনীয়। সুতরাং বান্দা যখন তার প্রতিকার করে এবং তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে, তখন মুজাহাদা তথা আত্মিক সাধনার মাধ্যমে স্বাভাবিক অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় সেই মন্দ স্বভাবগুলো তার থেকে দূর হয়ে যায়।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>অতএব নফসের বিধানসমূহের প্রথম প্রকারটি হলো সে-সব বিষয়, যা হারাম হিসেবে কিংবা মাকরুহ হিসেবে নিষেধ করা হয়েছে। আর নফসের দুই প্রকারের মধ্যে দ্বিতীয় প্রকারটি হলো নিকৃষ্ট ও হীন চরিত্রসমূহ।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>সংক্ষেপে এটিই তার সংজ্ঞা। অতঃপর এর বিস্তারিত বিবরণ হলো অহংকার, ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, অসদাচরণ, সহনশীলতার অভাব এবং এই জাতীয় অন্যান্য নিন্দনীয় চরিত্রসমূহ।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>আর নফসের স্বভাব বা বিধানের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও জটিল বিষয় হলো তার এই ভ্রম বা ধারণা হওয়া যে, নিজের কোনোকিছু বুঝি ভালো বা সুন্দর, অথবা তার কোনো বিশেষ মর্যাদা বা সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা রয়েছে; আর এই সূক্ষ্ম অহমিকার কারণেই একে শিরকে খফি তথা গোপন অংশীবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>আর নফস বর্জন এবং তাকে দমন করার মাধ্যমে চরিত্রের সংশোধন করা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাত্রি জাগরণ এবং এই জাতীয় অন্যান্য মুজাহাদা তথা কঠোর সাধনার কষ্ট সহ্য করার চেয়েও অধিক পূর্ণাঙ্গ, যা মানুষের শারীরিক শক্তিকে হ্রাস করে; যদিও এগুলোও নফস বর্জনেরই অন্তর্ভুক্ত।</p>
<p><a href="#_ftn1" name="_ftnref1"></a></p>
<p>আর এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, নফস হলো এই অবয়বে গচ্ছিত এমন এক লতিফা তথা সূক্ষ্ম সত্তা, যা ত্রুটিযুক্ত স্বভাব বা চরিত্রের আধার, ঠিক যেমন রুহ হলো এই অবয়বে গচ্ছিত এমন এক লতিফা যা প্রশংসনীয় চরিত্রসমূহের; আর এই সমগ্র সমষ্টিটি।</p>
<p>আর বাহ্যিক রূপ বা অবয়বের দিক থেকে নফস ও রুহ আজসামে লতিফা তথা সূক্ষ্ম দেহসমূহের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা ঠিক তেমনই, যেমনটি সূক্ষ্মতার বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মালাইকা তথা ফেরেশতাকুল এবং শায়াতিন তথা শয়তানকুলের অস্তিত্ব। আর যেমনটি এটি বলা সঠিক যে, দৃষ্টি হলো দর্শনের আধার, কান হলো শ্রবণের আধার, নাক হলো ঘ্রাণের আধার এবং মুখ হলো আস্বাদনের আধার; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শ্রবণকারী, দর্শনকারী, ঘ্রাণগ্রহণকারী এবং আস্বাদনকারী হলো সেই সমগ্র সমষ্টিটিই, যাকে মানুষ বলা হয়। ঠিক তেমন প্রশংসনীয় গুণাবলির আধার হলো কলব তথা অন্তর অথবা রুহ, এবং নিন্দনীয় গুণাবলির আধার হলো নফস; আর নফস হলো এই সমগ্র সমষ্টিরই একটি অংশ এবং কলবও এই সমগ্র সমষ্টিরই একটি অংশ, আর যাবতীয় বিধান ও নামকরণ এই সমগ্র সমষ্টির প্রতিই আবর্তিত হয়। <a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a><a href="#_ftn2" name="_ftnref2"></a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইবনে আরাবি নফসকে বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। ইলাহি রুহের ফুঁক ও সুগঠিত দেহের মাঝামাঝি এক সত্তা। সুফি পরিভাষায় নফস সাধারণত বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণের নাম। কিন্তু সেই গুণকেও যদি আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা যায়, তবে তা নিন্দনীয় থাকে না। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো কাজ যখন শুধু জাগতিক কারণে হয়, হকের দিকটি মনে না এসে, তখনই তা ত্রুটিপূর্ণ। গাফেল ও অজ্ঞের পার্থক্যও তিনি স্পষ্ট করেছেন। গাফেলকে স্মরণ করালে সে মনে করে, জাহেলকে করালেও নয়।</p>
<p>তিনি বলেন, নফস শব্দে ফা অক্ষরে সুকুন। সুফিদের পরিভাষায় এটি সাধারণত বান্দার এমন গুণকে বোঝায়, যা কোনো কারণ দ্বারা প্রভাবিত ও ত্রুটিযুক্ত। প্রচলিত অর্থে নফস বলতে এটিই বেশি বোঝানো হয়।</p>
<p>النفس من عالم البرازخ فكل سر منها يبين<br />
নফস বরজখ তথা দুই জগতের মাঝামাঝি স্তরের অন্তর্ভুক্ত; তাই তার ভেতর থেকে প্রতিটি রহস্য প্রকাশ পায়।</p>
<p>مقامها في العلوم شامخ وكل صعب بها يهون<br />
জ্ঞানজগতে তার অবস্থান অনেক উঁচু; তার মাধ্যমে কঠিন বিষয়ও সহজ হয়ে যায়।</p>
<p>وروحها في العماء راسخ يمده روحه الأمين<br />
তার রুহ অদৃশ্য গভীরতার জগতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত; আর রুহুল আমিন তাকে শক্তি জোগায়।</p>
<p>منفوخها بالنكاح ناسخ سره في الورى دفين<br />
তার মধ্যে যে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে, তা নিকাহের ধারায় প্রজন্মে প্রজন্মে চলে আসে; তার রহস্য সৃষ্টিজগতের ভেতর লুকানো।</p>
<p>سامي العلى مجدها وباذخ سبحاته ما بها يكون<br />
তার মর্যাদা উচ্চ, তার গৌরব মহিমান্বিত; তার ভেতর যা ঘটে, তা তার তাজাল্লির দীপ্তির অধীন।</p>
<p>জেনে রাখুন, সুফিদের ভাষায় <strong>নফস</strong> বলতে সাধারণত বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণ বোঝানো হয়। তাই এই অধ্যায়ে আমরা নফস নিয়ে মূলত এই অর্থেই কথা বলব।</p>
<p>তবে সুফিরা কখনো কখনো <strong>নফস</strong> বলতে মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম সত্তাকেও বোঝান। ইন-শা-আল্লাহ, এই অধ্যায়ে সে অর্থের দিকেও ইঙ্গিত আসবে। তবে এখানে সেটিকে এমন দিক থেকে আলোচনা করা হবে, যেখানে এই সূক্ষ্ম সত্তাই ত্রুটিপূর্ণ গুণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>জেনে রাখুন, সুফিদের পরিভাষায় <strong>নফস</strong> এই দুই অর্থেই বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি <strong>নফসে কুল্লিয়া</strong> তথা সামগ্রিক নফসও বরজখের অন্তর্ভুক্ত।</p>
<p>কারণ বরজখ বলতে এমন কিছুকে বোঝায়, যার দুইটি দিক থাকে। সে দুই বিষয়ের মাঝখানে অবস্থান করে। আর প্রকৃত অস্তিত্ব তো একমাত্র আল্লাহরই। আল্লাহ ছাড়া নিজে নিজে অস্তিত্বশীল আর কেউ নেই।</p>
<p>আল্লাহ জিনিসগুলোকে কারণের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। কোনো ফল তার কারণ ছাড়া প্রকাশ পায় না। তাই প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসের দুইটি দিক থাকে। এক দিক তার কারণের দিকে, আরেক দিক আল্লাহর দিকে। এই হিসেবে প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসই তার কারণ ও আল্লাহর মাঝখানে এক ধরনের বরজখ।</p>
<p>সৃষ্ট সত্তাগুলোর মধ্যে প্রথম বরজখ হলো <strong>নফসে কুল্লিয়া</strong>। কারণ তা আকল তথা প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা থেকে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রকাশকারী ও অস্তিত্বদাতা হলেন আল্লাহ। তাই নফসে কুল্লিয়ার এক দিক তার কারণের দিকে, আরেক দিক আল্লাহর দিকে। এ কারণে সেটিই প্রথম প্রকাশিত বরজখ।</p>
<p>এ কথা বুঝলে মানুষের নফসের বিষয়টিও সহজ হবে। মানুষের দেহ যখন ঠিকভাবে গঠিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন আল্লাহ তাতে তাঁর পক্ষ থেকে রুহ ফুঁকে দেন। তখন একদিকে থাকে ইলাহি রুহের ফুঁক, আরেকদিকে থাকে সুগঠিত দেহ। এই দুইয়ের মাঝখানে মানুষের নফস প্রকাশ পায়।</p>
<p>এ কারণেই দেহের মেজাজ ও স্বভাব নফসের ওপর প্রভাব ফেলে। নফসগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। কারণ ইলাহি ফুঁকের দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই; পার্থক্য হয় গ্রহণক্ষমতার ভিন্নতার কারণে।</p>
<p>তাই নফসের এক দিক প্রকৃতির দিকে, আরেক দিক ইলাহি রুহের দিকে। এই কারণেই আমরা নফসকে বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত বলেছি।</p>
<p>এখন বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণের কথাও একইভাবে বোঝা যায়। এই গুণগুলো সুফিদের কাছে ও অধিকাংশ আলেমের কাছে নফসের দিক থেকে নিন্দনীয়। কিন্তু যখন এগুলোকে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা হয়; অর্থাৎ যেহেতু সবশেষে এগুলোও আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর কর্মের অধীন, তখন সে দিক থেকে এগুলো নিন্দনীয় থাকে না।</p>
<p>তাই এই গুণগুলো প্রশংসা ও নিন্দার মাঝখানে থাকা এক ধরনের বরজখ। প্রশংসা আসে আল্লাহর দিকে সম্পর্কের কারণে; আর নিন্দা আসে কারণের দিক থেকে। অর্থাৎ বান্দার নফসের দিক থেকে।</p>
<p>সুতরাং বান্দার নফসের কোনো গুণ প্রকাশ পাওয়ার সময় যদি সেই গুণে আল্লাহর সম্পর্ক দেখা না যায়, তাহলে সেই গুণ ত্রুটিপূর্ণ। এ কারণেই তাকে <strong>নফসি গুণ</strong> বলা হয়। অর্থাৎ সেখানে বান্দা নিজের নফস ছাড়া আর কিছু দেখেনি।</p>
<p>কিছু লোক আবার সেই গুণের মধ্যেও হককে প্রত্যক্ষ করে। তখন তাদের কাছে সেই গুণের ভেতরেও হকের সম্পর্ক প্রকাশ পায়।</p>
<p>কিন্তু কোনো গুণ যদি শুধু জাগতিক কোনো কারণের প্রভাবে প্রকাশ পায়, আর তা দেখার সময় আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক মনে না আসে; এমনকি এই ভাবনাও না আসে যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকেও সম্পর্কিত, তাহলে সেই গুণ জাগতিক কারণের দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হবে।</p>
<p>যে জাগতিক কারণ এই বান্দাকে সেই গুণ ধারণে উদ্বুদ্ধ করে; যেমন কেউ দুনিয়ার কোনো স্বার্থ পেতে চায়; সে উদ্দেশ্যই তাকে কথায় বা কাজে চালিত করে। সেখানে হকের দিকটি তার মনে উপস্থিত থাকে না। তাই এ ধরনের কাজ সম্পর্কে বলা হবে, এটি ত্রুটিযুক্ত কাজ; অর্থাৎ আল্লাহর জন্য সেখানে তার প্রত্যক্ষ কোনো অংশ নেই।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا &#8211; তোমরা দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থ কামনা করছ। সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৭।</p>
<p>অর্থাৎ বদরের বন্দিদের ক্ষেত্রে এই সম্বোধন করা হয়েছিল। এখানে দুনিয়ার স্বার্থ বলতে সাধারণভাবে দুনিয়ার সাময়িক ভোগ-লাভ বোঝানো হয়েছে।</p>
<p>আল্লাহ আরও বলেছেন, وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ &#8211; আর আল্লাহ আখেরাত চান। সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৭।</p>
<p>সুতরাং কাছের লাভ বা নিকটবর্তী স্বার্থ হলো সেই প্রকাশ্য কারণ, যা সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে; তারা এর বাইরে আর কিছু দেখে না। আর আখেরাতের বিষয়টি তাদের থেকে আড়ালে থাকে। গাফলতিদের কাছেও তা আড়ালে থাকে; কারণ সেটি ইমানের দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ হওয়ার বিষয়।</p>
<p>কখনো মানুষ নিজের গাফলতির কারণে এক সময় মুমিন পরিচয় থেকে অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। তখন তার গাফলতি তাকে এমন আরেক বিষয়ে প্রত্যক্ষ করায়, যা তার এই অসচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি সে সেই অবস্থাতেই ইমানসহ মৃত্যুবরণ করে, তবে তার গাফলতি থাকা সত্ত্বেও সে ইমানদার হিসেবেই মারা যায়।</p>
<p>কারণ যে গাফেল, তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে স্মরণ করে। কিন্তু জাহেল এমন নয়; তাকে স্মরণ করালেও সে স্মরণ করে না। তাই এ বিষয়টি বুঝে নাও। আল্লাহ হক কথা বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2>দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দাতা গঞ্জে বখশের আলোচনা সবচেয়ে বিস্তৃত। তিনি স্পষ্ট করেছেন, নফস শব্দের বহু অর্থ আছে। রুহ, রক্তসম্পর্কিত সত্তা, মন্দের সমষ্টি; কিন্তু তরিকতের মানুষের কাছে নফস মূলত সব মন্দ ও অকল্যাণের সমষ্টিগত নাম। নফস ও রুহ উভয়ই অন্তরে সূক্ষ্মভাবে বিরাজ করে। নফস শয়তানের লতিফা, রুহ ফেরেশতার লতিফা। “যে নিজের নফসকে চিনল, সে রবকে চিনল” এই হাদিস ব্যাখ্যা করে তিনি দেখিয়েছেন, নফসের লাঞ্ছনা ও অক্ষমতা চেনা মানেই রবের মহিমা ও শক্তি চেনা। মানুষকে তিনি দেহ, রুহ ও নফসের সমন্বিত বাস্তবতা বলেছেন। ইনসানে কামেলের তিনটি দিক— নফসের দিক, রুহের দিক ও মূল সত্তার দিক। মুজাহাদার মাধ্যমে নফসের জাহেরি দোষ দূর হয়, আর তার বদৌলতে বাতেনি পরিচ্ছন্নতা জন্মায়।</p>
<p>তিনি বলেন, স্পষ্টভাবে জেনে রাখুন, নফস শব্দের বহু অর্থ আছে। সুফিগণ ও হাকিকতের অধিকারীরা বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের অভ্যাস ও প্রচলিত ব্যবহারের কারণে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে এই শব্দ ব্যবহার করেন। ফলে তাদের বক্তব্যে অনেক সময় পার্থক্য দেখা যায়।</p>
<p>যেমন: এক দল নফস বলতে রুহকে বোঝায়। আরেক দল বলে, নফস রুহের নিকটবর্তী এক সত্তা। অন্য দল বলে, নফস রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু তরিকতের হাকিকতবিদদের কাছে নফস শব্দের প্রচলিত অর্থ এগুলো নয়। বরং তরিকতের মানুষ এ বিষয়ে একমত যে, হাকিকতে নফস হলো তামাম মন্দ ও অকল্যাণের সমষ্টিগত নাম, যা খারাপ কাজ ও অন্যায় কর্মের দিকে নিয়ে যায়।</p>
<p>তবে কোনো কোনো দল নফসকে কেবল খারাপ স্বভাবের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করেছে। তাদের মতে নফস তখনই নফস, যখন তা মন্দ স্বভাব নিয়ে প্রকাশ পায়। যেমন হিংসা, অহংকার ইত্যাদি। আরেক দল বলে, নফস কেবল খারাপ স্বভাবের নাম নয়; বরং মন্দ স্বভাব, নিন্দনীয় জীবনযাপন, ইচ্ছা-বাসনা ও অকল্যাণকর অবস্থা সবই নফসের প্রকাশ।</p>
<p><strong>নফসের অবস্থা</strong><strong>:</strong></p>
<p>নফসের অবস্থা দুই ভাগে বিভক্ত। একটি স্বভাবজাত ও জন্মগত, আরেকটি অর্জিত ও অভ্যাসগত।</p>
<p>তাকাব্বুর, হিংসা, কৃপণতা, ক্রোধ এবং এগুলোর মতো আরও যত মন্দ ও ঘৃণিত স্বভাব আছে— এসবই মানুষের জন্য মন্দ নফসের অবস্থাসমূহ। এগুলোর বিরুদ্ধে রিয়াজত করা জরুরি। এর মাধ্যমেই এসব মন্দ স্বভাব দূর করা যায়।</p>
<p>যেমন তাওবার মাধ্যমে গুনাহ দূর হয়, তেমনই মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে নফসের জাহেরি দোষগুলো দূর হয়। আর এভাবেই নফসের বাতেনি দোষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়।</p>
<p>রিয়াজত ও মুজাহাদা হলো নফসের জাহেরি আচরণের বিরোধিতা করা, আর নফসকে নিজের স্বভাবের বিপরীতে দাঁড় করানো। যতদিন প্রয়োজন হয়, তা করতে হবে। কারণ জাহেরি দোষ রিয়াজত ও মুজাহাদার মাধ্যমে পবিত্র ও পরিষ্কার করা যায়। আর জাহেরি দোষ দূর হয়ে গেলে তার বদৌলতে বাতেনি পরিচ্ছন্নতাও জন্ম নেয়।</p>
<p>নফস ও রুহ উভয়ই অন্তরের ভেতরে অতি সূক্ষ্মভাবে অবস্থান করে। তবে নফস শয়তানের লতিফা, আর রুহ ফেরেশতার লতিফা। একটিতে কল্যাণ আছে, আরেকটিতে মন্দ আছে। যেমন আকল ও অজ্ঞতা, দৃষ্টি ও অন্ধত্ব, রাত ও দিন।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা এভাবেই পরস্পর বিপরীত গুণসমূহ মানুষের অন্তরে গচ্ছিত রেখেছেন, যাতে নফসের বিরোধিতা করে সব মন্দ স্বভাব থেকে মুক্তি অর্জন করা যায়। এর জন্য নফসের সম্মতি ছাড়াই তাকে তার খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে রাখা জরুরি। আর নফসের সঙ্গে বিরোধিতা করাতেই তার মুক্তি আছে।</p>
<p>কারণ হক তায়ালা তাকে মন্দ কাজের নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে—</p>
<p>وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ</p>
<p>আর যে ব্যক্তি নিজের নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা। সুরা নাজি‘আত, আয়াত: ৪০–৪১।</p>
<p>আরও ইরশাদ হয়েছে—</p>
<p>أَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَىٰ أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ</p>
<p>যখনই কোনো রসুল তোমাদের কাছে এমন কিছু নিয়ে এসেছেন, যা তোমাদের নফস পছন্দ করেনি, তখন তোমরা অহংকার করেছ। সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৭।</p>
<p>হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেন—</p>
<p>وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي</p>
<p>আমি নিজের নফসকে পবিত্র বলছি না। নিশ্চয় নফস তো বারবার মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়; তবে আমার রব যার প্রতি দয়া করেন, সে ছাড়া। সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>إِذَا أَرَادَ اللهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا بَصَّرَهُ بِعُيُوبِ نَفْسِهِ</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে তার নফসের দোষগুলো দেখিয়ে দেন।</p>
<p>আর হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা দাউদ আলাইহিস সালামকে বলেছেন—</p>
<p>يَا دَاوُدُ عَادِ نَفْسَكَ فَإِنَّ وُدِّي فِي مُعَادَاتِهَا</p>
<p>হে দাউদ, নিজের নফসকে শত্রু মনে করো; কারণ আমার মহব্বত আছে তার বিরোধিতার মধ্যে।</p>
<p>এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো, সবই নফসের গুণাবলি। লেখকের উদ্দেশ্য হলো— নফস মূলত ওই সত্তা, যার মাধ্যমে মানুষ একের পর এক গুণ গ্রহণ করে। তাই নফস নিজে ওই গুণগুলোর মতো নয় এবং নফসের পরিচয় এতটুকুতেই শেষ হয়ে যায় না যে, তাকে শুধু গুণের সমষ্টি বলা হবে।</p>
<p>বরং নফসের স্বরূপকে তার নিজ বাস্তবতায় চিনতে হবে। মানুষের গুণাবলি ও মানুষের বাস্তব পরিচয় সম্পর্কে যারা গভীরভাবে কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়— জিনিস যেমন হয়, তাকে তেমনভাবেই জানা উচিত; কোনোকিছুকে তার সত্য স্বরূপের চেয়ে বেশি বা কম বলা ঠিক নয়।</p>
<p>সুতরাং নফস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ যে ব্যক্তি নিজের নফসকে চিনতে পারল, সে নিজের পরিচয় লাভ করল। আর যে নিজেকে চিনল, সে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বুঝতে পারল। নিজেকে নিজের হকসহ জানা; এটাই আসলে হকের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক জানা। এ বিষয়টি বুঝাতেই আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে—</p>
<p>وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ</p>
<p>যে নিজের নফসকে মূর্খ ও হীন করে ফেলেছে, সে ছাড়া আর কে ইবরাহিমের মিল্লাত থেকে বিমুখ হয়? সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩০।</p>
<p>অর্থাৎ নিজের নফসকে না চেনা তরিকতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা। একজন বুজুর্গ বলেছেন—</p>
<p>من جهل نفسه فهو بالغير أجهل</p>
<p>যে নিজের নফস সম্পর্কে অজ্ঞ, সে অন্য সবকিছুর ব্যাপারে আরও বেশি অজ্ঞ।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ</p>
<p>যে নিজের নফসকে চিনল, সে নিজের রবকে চিনল।</p>
<p>এর অর্থ হলো, যে নিজের নফসকে ‘বাকা’র অধীন ও ‘ফানা’র পথে চলমান হিসেবে চিনল, সে বুঝল— তার রব বাকি, অবিনশ্বর এবং ফানার ঊর্ধ্বে। আরেক ব্যাখ্যা হলো, যে নিজের নফসকে লাঞ্ছিত, অক্ষম ও দুর্বল হিসেবে চিনল, সে বুঝল— তার রব মহিমান্বিত, শক্তিমান ও দয়াময়। আরও বলা হয়, যে নিজের নফসকে বন্দেগির স্বরূপে চিনল, সে নিজের রবকে রবুবিয়্যাতের স্বরূপে চিনল। আবার যে নিজের নফসকে চিনল, সে অন্য সবকিছু থেকেও বেশি নিজের অজ্ঞতা বুঝতে পারল। কারণ নফসকে চেনা মানে, নফসের সীমা ও নিজের অক্ষমতাকে জানা।</p>
<p><strong>মানুষের পরিচয়</strong><strong>:</strong></p>
<p>এই মতবিরোধের কারণেই এক দল বলে, মানুষ শুধু রুহের নাম। রুহ চিরস্থায়ী, জীবিত এবং রবের সঙ্গে যুক্ত। তাই মানুষের মূল পরিচয় রুহের দিকেই ফিরে যায়। শরীর তো জুলমত, ভার ও নশ্বরতার স্থান; এটি রুহের বাহন মাত্র।</p>
<p>কিন্তু এ বক্তব্য দুর্বল। কারণ রুহ যখন দেহ থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন ওই দেহকে আর মানুষ বলা হয় না, বরং মৃতদেহ বলা হয়। এটি দেখায় যে, শুধু দেহ মানুষ নয়।</p>
<p>আবার যদি বলা হয়, মানুষ কেবল রুহ; তাহলেও সমস্যা থাকে। কারণ রুহ যখন দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখনই তাকে এই দুনিয়ায় মানুষের পরিচয়ে চেনা যায়। রুহ শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেলে তার প্রকাশ বদলে যায়। তাই মানুষকে শুধু রুহ বলা যায় না।</p>
<p>সঠিক কথা হলো, মানুষ দেহ ও রুহের সমন্বিত বাস্তবতা। দেহ ছাড়া রুহের দুনিয়াবি প্রকাশ পূর্ণ হয় না, আর রুহ ছাড়া দেহ শুধু নির্জীব কাঠামো। সুতরাং মানুষ নামটি এই দুইয়ের মিলিত অবস্থার ওপর প্রয়োগ হয়।</p>
<p>এক দল বলে, দেহ ও রুহ যতক্ষণ একত্র থাকে, তখনই তাদের সমষ্টির নাম মানুষ। আর যখন এ দুটির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তখন মানুষ মৃতদেহে পরিণত হয়। যেমন কোনো সরাইখানায় দুজন পথিক একত্র হলো, তারপর একজন আগে চলে গেল; এতে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا</p>
<p>মানুষের ওপর কি কালের এমন এক সময় অতিবাহিত হয়নি, যখন সে উল্লেখযোগ্য কোনো বস্তুই ছিল না? সুরা দাহর, আয়াত: ১।</p>
<p>এটি হজরত আদম আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। যখন তাঁর দেহের মাটির কাঠামো প্রস্তুত ছিল, তখনও তাতে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়নি।</p>
<p>আরেক দল বলে, মানুষ এমন এক দেহের নাম, যার মধ্যে জান আছে। কারণ দেহ মানুষের ভিত্তি ও অবস্থানস্থল; বাকি গুণাবলি তার সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে এ কথাও দুর্বল। কারণ যদি কোনো অঙ্গ কেটে ফেলা হয়, তখন শুধু ওই কাটা অঙ্গকে মানুষ বলা যায় না। তেমনি আদম আলাইহিস সালামের দেহে রুহ প্রবেশের আগে তাকেও প্রকৃত অর্থে মানুষ বলা হয়নি।</p>
<p>এগুলোর মধ্যে সঠিক কথা হলো— মানুষ কোনো একক বস্তু নয়, যাকে শুধু একটি দিক দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায়। মানুষ দেহ, রুহ, নফস, আকল, হৃদয়, গুণাবলি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং প্রকাশিত অবস্থার সমন্বিত বাস্তবতা। এ সব মিলেই তাকে মানুষ বলা হয়।</p>
<p>এর কারণ হলো, ফানা ও বাকা, গতি ও স্থিরতা এবং প্রয়োজনীয় সব অবস্থার যোগফল মানুষের মধ্যে একত্র থাকে। মালাকদের ক্ষেত্রে এমন সমষ্টিগত নাম ব্যবহৃত হয় না; কারণ তারা মিশ্র ও যৌগিক সত্তা নয়। আর জিনদেরও এভাবে বলা হয় না।</p>
<p>একইভাবে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বের শুধু একটি অংশকে মানুষ বলা যায় না। যেমন তার হাত বা পা আলাদা হয়ে গেলে সেটাকে মানুষ বলা হয় না। তাই আল্লাহ তায়ালা মূলত আদমের সন্তানকে সম্মানিত করেছেন এবং তাদের মানুষ নাম দিয়েছেন। কারণ তাদের মধ্যে বিভিন্ন জগতের বহু অর্থ ও গুণ একত্র হয়েছে।</p>
<p>কুরআনে এসেছে—</p>
<p>وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ</p>
<p>আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাকে শুক্রবিন্দু করে এক নিরাপদ স্থানে রেখেছি। তারপর সেই শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি। তারপর জমাট রক্তকে গোশতের টুকরায় রূপ দিয়েছি। এরপর সেই গোশতের টুকরা থেকে হাড় সৃষ্টি করেছি। তারপর হাড়গুলোকে গোশত দিয়ে আবৃত করেছি। এরপর তাকে আরেক নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলেছি। অতএব বরকতময় আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২–১৪।</p>
<p>তাই মানুষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তার সব অংশের সমষ্টির কারণে। বিশেষ দেহ, বিশেষ স্বভাব, মেজাজ ও উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি সৃষ্টিকে মানুষ বলা হয়েছে। যেমন কোনো গোত্র, জাতি বা দলের নাম এমন এক গোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ হয়, যারা নির্দিষ্ট গুণাবলির অধিকারী। কারণ সেই নামের কারণে তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই পরিচয় থেকে আলাদা হয় না।</p>
<p>প্রত্যেক বাতেনি অবস্থা কোনো নির্দিষ্ট জাহেরি রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সাজানো থাকে। এ কারণেই আদমি বা মানুষ নামটি সেই নির্দিষ্ট রূপ, নির্দিষ্ট গঠন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জোড়াগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এটি মানুষ নামের প্রকৃত অবস্থা ও বাস্তব পরিচয়। এর পূর্ণ হাকিকত সামনে আলোচনা করা হবে।</p>
<p><strong>ইনসানে কামেল:</strong></p>
<p>স্পষ্টভাবে জেনে রাখুন, হাকিকতের অনুসন্ধানীদের মতে ইনসানে কামেল হলো সেই সত্তা, যার তিনটি দিক আছে।</p>
<p>প্রথম দিক তার নফসের সঙ্গে সম্পর্কিত। নফস তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহে শরীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।</p>
<p>দ্বিতীয় দিক রুহের সঙ্গে সম্পর্কিত। রুহের মাধ্যমে নফসের খাওয়াইস তথা বিশেষ গুণাবলি ও হাকিকতসমূহ প্রকাশ পায়।</p>
<p>তৃতীয় দিক তার আসল সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ আসলে দুই জগতের মাঝখানে অবস্থানকারী এক জামি‘ তথা সমন্বয়কারী সত্তা। তার মধ্যে উভয় জগতের চিহ্ন বিদ্যমান।</p>
<p>নিচের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক হলো— সে মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন থেকে গঠিত। আর উপরের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক হলো— তার মধ্যে জান্নাত, ফেরেশতা ও রুহানি সত্তার নিদর্শন রয়েছে। মানুষ এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সমন্বিত বাস্তবতা।</p>
<p>মানুষের মধ্যে জিনদের লতিফাগুলোরও অংশ আছে, কারণ তার ভেতরে রুহ আছে। আর রুহের ভেতরে নুরও আছে। মানুষের ভেতরে ফেরেশতাদের মাকামও আছে; সেটি নফসের মাকাম। আরও আছে শয়তানের মাকাম; সেটি দেহের মাকাম।</p>
<p>এই দুই জগতের মানুষ পূর্ণ নুর ও পরিপূর্ণ মহব্বতের অধিকারী। তাই জান্নাত তার দুনিয়ার মাকামের মতো, আর দুনিয়া তার শরীরের মাকামের মতো। সেই রকম রুহের মারিফত হলো আরাম, আর জাহের হলো হিজাব ও জুলমত। জান্নাতে যখন মৃত্যু আনা হবে এবং দুনিয়ার মানুষ নাজাত পাবে, তখন সে নিজের দুনিয়াবি অবস্থান ও ইলাহি হাকিকতের দিক থেকে গাইর ও পরিবর্তনশীল কিছু নয়; বরং দৃঢ় ও স্থায়ী হয়ে যাবে। আর তখন তার জন্য হাকিকত, অস্তিত্ব এবং রুহের মূল স্বরূপের মারিফত লাভ হবে।</p>
<p>যে ব্যক্তি দুনিয়াকে আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেয়, তাকে দুনিয়া থেকেও উত্তম জিনিস দেওয়া হয়। তার দেহের জাহের জান্নাতে থাকবে, আর তার রুহের নুর ফেরেশতাদের মর্যাদার ভাণ্ডার থেকে উজ্জ্বল হবে।</p>
<p>এ কথা বলা হয়েছে যে, মুমিনের রুহের জন্য জান্নাত হলো সেই রূপ, যেমন মুমিনের দেহের জন্য দুনিয়া। আর রুহ হলো সেই সত্তা, যা জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। কারণ দুনিয়ায় রুহের কাজ হলো মুমিন ও আরিফের তত্ত্বাবধান করা। আর আকলের কাজ হলো বেদিন ও জাহেল মানুষদের খাহেশের সহায়তা করা। আরিফের আকলের জন্য হেদায়েত, সঠিকতা ও কল্যাণ আছে। কিন্তু নফস ও খাহেশের সঙ্গে মিশ্রিত হলে আকলের সঙ্গে ভুল, বিপথগামিতা এবং অন্যায় যুক্ত হয়।</p>
<p>তাই সত্যপথের সন্ধানীদের জন্য জরুরি হলো নফসের বিরোধিতার পথ আঁকড়ে থাকা, যাতে আকল নফসের বিরোধিতায় রুহকে সাহায্য করে। কারণ রুহের মাকাম ইলাহি। আল্লাহই সঠিক বিষয় ভালো জানেন।</p>
<p><strong>নফসের হাকিকত সম্পর্কে মাশায়িখের বক্তব্য</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত জুননুন মিসরি (রহ.) বলেন—</p>
<p>أَشَدُّ الْعَذَابِ رُؤْيَةُ النَّفْسِ وَتَدْبِيرُهَا</p>
<p>সবচেয়ে কঠিন আজাব হলো নিজের নফসকে দেখা এবং তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা।</p>
<p>কারণ নফসের ব্যবস্থাপনায় হক তায়ালার বিরোধিতা আছে। আর হক তায়ালার বিরোধিতাই আজাবের কারণ।</p>
<p>হজরত বায়েজিদ বস্তামি (রহ.) বলেন—</p>
<p>النفس صفة لا تسكن إلا بالباطل</p>
<p>নফস এমন এক গুণ, যা বাতিল ছাড়া শান্ত হয় না।</p>
<p>আরিফ সেই ব্যক্তি, যে কখনো মাখলুকের কাছ থেকে শান্তি পায় না।</p>
<p>হজরত মুহাম্মদ ইবনু আলি (রহ.) বলেন—</p>
<p>تريد أن تعرف الحق مع بقاء نفسك فيك ونفسك لا تعرف نفسها فكيف تعرف غيرها</p>
<p>তুমি চাও, নিজের নফসকে বহাল রেখেই হককে চিনবে। অথচ তোমার নফস নিজেকেই চেনে না; তাহলে সে অন্যকে কীভাবে চিনবে?</p>
<p>এর অর্থ হলো, নফস নিজের বাকা তথা স্থায়িত্বের অবস্থায় নিজেই পর্দাবৃত ও আড়ালগ্রস্ত। আর যখন তুমি নিজেই নিজের কাছ থেকে আড়ালগ্রস্ত, তখন হক তায়ালাকে কীভাবে চিনবে?</p>
<p>হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন—</p>
<p>أساس الكفر قيامك على مراد نفسك</p>
<p>কুফরের ভিত্তি হলো নিজের নফসের কামনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা।</p>
<p>কারণ নফসের কামনা ও খাহেশের ওপর স্থির থাকা বন্দার জন্য কুফরের ভিত্তি। কেননা ইসলাম মানে আনুগত্য; আর নফসের সঙ্গে আনুগত্যের কোনো মিল নেই। তাই নফসের খাহেশের বিরোধিতা করা এবং তাকে ভেঙে দেওয়া জরুরি। একে প্রশ্রয় দিলে তা মানুষকে ধীরে ধীরে হালাকত তথা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।</p>
<p>হজরত ইবরাহিম দাসুকি (রহ.) বলেন—</p>
<p>النفس مانعة بلا خائنة مانعة من الرضا وأفضل الأعمال خلافها</p>
<p>নফস বাধাদানকারী, বরং বিশ্বাসঘাতক; সে রেজা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বাধা দেয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো তার বিরোধিতা করা।</p>
<p>কারণ নফস আমানতের ব্যাপারে খিয়ানতকারী। আর রেজা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বাধাদানকারী। তাই মাশায়িখের কথায় এর ভেতরে যেসব গভীর তাৎপর্য আছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসছে।</p>
<p>এখন আমি নিজের আলোচনার দিকে ফিরছি। হজরত কামিল (রহ.)-এর মাজহাবের প্রমাণ ও তার নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে মুজাহাদা, রিয়াজত এবং হাকিকতের আলোচনা করছি। তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই।</p>
<p><strong>নফসের মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা</strong></p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا</p>
<p>যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي اللهِ</p>
<p>মুজাহিদ সে-ই, যে আল্লাহর পথে নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ করে।</p>
<p>আর তিনি ﷺ আরও বলেছেন—</p>
<p>رَجَعْنَا مِنَ الْجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الْجِهَادِ الْأَكْبَرِ قِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْجِهَادُ الْأَكْبَرُ قَالَ الْأَرْضَى مُجَاهَدَةُ النَّفْسِ</p>
<p>আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে এলাম। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল, বড় জিহাদ কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নফসের সঙ্গে মুজাহাদা করা।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ নফসের মুজাহাদাকে জিহাদে আসগার তথা ছোট জিহাদের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। কারণ এতে রুহের কষ্ট ও মেহনত বেশি। তাই এই পথে পরিপূর্ণভাবে অবতীর্ণ হওয়া জরুরি। আর মুজাহাদা নফসকে নফসে মুতমাইন্নার কাছে নিয়ে যায়।</p>
<p>হে প্রিয়, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন। জেনে রাখো, নফসের মুজাহাদার পদ্ধতি কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে গ্রহণ করতে হবে। তা সুন্নতের সঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত এবং রহমত ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত। সব পথের মধ্যে নফসের পরিশুদ্ধির মূল পথ হলো— অল্প খাবার খাওয়া, অল্প ঘুমানো, অল্প কথা বলা এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমানো। সাধারণভাবে প্রত্যেক মাশায়িখের ক্ষেত্রে এগুলোই প্রচলিত। এ বিষয়ে মাশায়িখের বহু প্রতীক, ইশারা ও ব্যাখ্যা আছে।</p>
<p>হজরত ইবনু আবদুল্লাহ তুস্তারি (রহ.) বিশেষভাবে অল্প খাওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ মুজাহাদার ক্ষেত্রে তাঁর সিলসিলায় ক্ষুধা এবং অল্প খাবারকে প্রধান ভিত্তি ধরা হয়েছে।</p>
<p>শোনা যায়, হজরত আবু বকর শিবলি (রহ.)-এর নিয়ম ছিল প্রতিদিন একটি মাত্র খেজুর খেতেন। কিন্তু শেষ বয়সে দীর্ঘ রোগে আক্রান্ত হলে সব চিকিৎসক একমত হয়ে তাঁকে বেশি খাবার খেতে বলেন। তখন তিনি মাশায়িখের খাদিমকে ডেকে পাঠান। খাদিম এসে জানায় হজরত শিবলি (রহ.) মাশায়িখের একজন খাদিমের খাদ্যের ওপর নির্ভর করছিলেন। অথচ আল্লাহর পথে সত্যসন্ধানীদের জন্য মুজাহাদায় এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।</p>
<p>হজরত ইবনু আরবি (রহ.) দুনিয়াবি জীবনের তুলনা করেছেন আখেরাতের জীবনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আখেরাতের জীবন চিরস্থায়ী; আর দুনিয়ার জীবন তার তুলনায় অতি সামান্য। তাই তিনি বলেন, দুনিয়ায় অল্প খাবার খাওয়া এবং কম ভোগ করা মুজাহাদার কাজ। কারণ বান্দা যখন দুনিয়ায় অল্প খেয়ে ইবাদত করে, তখন আখেরাতে সে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাবে কোনো কষ্ট ও মেহনত ছাড়াই।</p>
<p>এ কারণেই তিনি বলেন, মৌলিকভাবে বড় মুজাহাদা হলো— নিজেকে আল্লাহর পথে ব্যস্ত রাখা এবং দুনিয়ার আরাম-আয়েশ কমিয়ে দেওয়া। المشاهدة موازنة المجاهدات &#8211; মুশাহাদা মুজাহাদার সমপরিমাণ হয়।</p>
<p>এ ছাড়া অন্যান্য মাশায়িখও বলেছেন, হকের কাছে পৌঁছানোর জন্য মূলত কোনো আলাদা উপায় নেই; যা কিছু অর্জিত হয়, তা আল্লাহর ফজলেই অর্জিত হয়। ফজলের তুলনায় বান্দার কর্মের আসল মূল্য কতটুকু? একজন মানুষ কীভাবে নিজের নফসের মুজাহাদা ও তা ভেঙে দেওয়াকে হাকিকতের কাছে পৌঁছার মূল্য বানাতে পারে?</p>
<p>এর কারণ হলো, মুজাহাদার মাধ্যমে রুহ বান্দার দিকে মনোযোগী হয়। আর মুশাহাদার আহওয়াল হক তায়ালার দিক থেকে প্রকাশ পায়। এ অবস্থায় বান্দার কর্মগুলো যেন বাহ্যিক কারণ মাত্র; আসল দান আল্লাহর ফজল থেকেই আসে।</p>
<p>এই মাসআলায় যারা ভিন্নমত করেছেন, হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) তাঁদের বিরুদ্ধে দলিল পেশ করে বলেন—</p>
<p>وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا</p>
<p>যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯। এর অর্থ হলো— যে মুজাহাদা করে, সে মুশাহাদা লাভ করে।</p>
<p>হে প্রিয়, শরিয়তের আহকাম মেনে চলা এবং আল্লাহর নাজিল করা বিধানকে প্রতিষ্ঠিত রাখাই মুজাহাদার মূল ভিত্তি। মুজাহাদা যদি শরিয়তের আনুগত্য না হয়, তবে তা সব হুকুমকে বাতিল করে দেয়। কারণ দুনিয়া ও আখেরাতের সব বিধানই শরিয়তের অধীন। শরিয়ত যে বিষয়কে আনুগত্য বলেছে, সেটিই প্রকৃত আনুগত্য; আর শরিয়ত যে কাজকে গুনাহ বলেছে, সেটিই গুনাহ।</p>
<p>সুতরাং মুরিদের জন্য জরুরি হলো মাশায়িখের নির্দেশিত বিধানগুলো মেনে চলা, খাওয়া কমানো, ঘুম কমানো এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমানো। এসবের দ্বারা নফসের জাহেরি দোষগুলো দূর হয়। কারণ নফসের বহু ক্ষতিকর অর্থ আকল ও ধারণার স্তরে প্রবেশ করে, তারপর কাজের ভেতর প্রকাশ পায়। এই কারণেই এগুলোর তাফসিল ও ব্যাখ্যা সামনে আসবে।</p>
<p>এ বিষয়ে বোঝার মতো মূল কথা হলো যদি মুজাহাদা শরিয়তের নিয়মের ভেতর থাকে, তাহলে তা হকের পথে সহায়ক হয়। কিন্তু মুজাহাদা যদি শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। কেউ যদি নিজের ইচ্ছামতো ক্ষুধা, জাগরণ, নির্জনতা বা কষ্টকে দীন মনে করে, অথচ শরিয়তের সীমা না মানে, তাহলে সে নফসের আরেক ফাঁদে পড়ে যায়।</p>
<p>যেমন কেউ যদি মাটির নিচে গর্ত করে বসে থাকে, নিজের হাত-পা বেঁধে রাখে, বা এমন কষ্ট নেয় যা শরিয়ত অনুমোদন করে না, তবে তা মুজাহাদা নয়। আবার কেউ যদি এমনভাবে খাওয়া কমায়, যাতে শরীর দুর্বল হয়ে ইবাদতের শক্তি হারিয়ে ফেলে, তাও সঠিক নয়। মুজাহাদার উদ্দেশ্য শরীর ধ্বংস করা নয়; বরং নফসকে শরিয়তের অধীন করা।</p>
<p>একইভাবে কেউ যদি নিজের ওপর এমন কষ্ট চাপায়, যার ফলে জ্ঞান, আমল ও ইবাদতে ক্ষতি হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহর পথে চলার জন্য শরীরও আমানত। শরীরকে এমনভাবে দুর্বল করা যাবে না, যাতে ফরজ, ওয়াজিব বা জরুরি দায়িত্ব পালনে বাধা আসে।</p>
<p>সুতরাং মুজাহাদার সঠিক পথ হলো হালাল খাওয়া, কিন্তু কম খাওয়া; ঘুমানো, কিন্তু গাফলতের ঘুম নয়; কথা বলা, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী; মানুষের সঙ্গে থাকা, কিন্তু নফসের খাহেশে নয়। এই ভারসাম্যই শরিয়তসম্মত রিয়াজত।</p>
<p>এ পথে আল্লাহর নেক বান্দারা নিজেরা দীর্ঘ মুজাহাদা করেছেন। তাঁরা শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেননি। বরং শরিয়তের ভেতর থেকেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন। তাঁদের মুজাহাদা ছিল নফসকে ভাঙার জন্য, শরিয়ত ভাঙার জন্য নয়।</p>
<p>সুতরাং যে ব্যক্তি হকের পথে সত্যিকারের মুজাহাদা করতে চায়, তার জন্য জরুরি হলো— মাশায়িখের সোহবত গ্রহণ করা, তাদের নির্দেশ মানা, শরিয়তের বিধান আঁকড়ে ধরা এবং নিজের নফসকে সন্দেহের চোখে দেখা। কারণ নফস অনেক সময় ইবাদতের রূপ ধরে মানুষকে ধোঁকা দেয়। বাহ্যিক কষ্ট দেখিয়ে সে ভেতরে অহংকার, আত্মপ্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্বের বোধ জন্মায়।</p>
<p>তাই মুজাহাদা তখনই ফলদায়ক হয়, যখন তা বিনয়, ইখলাস, শরিয়তের আনুগত্য এবং আল্লাহর ফজলের ওপর নির্ভরতার সঙ্গে হয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>طه مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى</p>
<p>ত্ব-হা। আমি আপনার ওপর কুরআন এ জন্য নাজিল করিনি যে, আপনি কষ্টে পড়ে যাবেন। সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১–২।</p>
<p>হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিগণের সামনে কিছু আলোচনা চলছিল। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, গত রাতে আমার কাছে আমার রবের পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক এসেছিলেন। তিনি বললেন, হে রসুলুল্লাহ ﷺ, আপনার উম্মতকে সুসংবাদ দিন—</p>
<p>خذ منهم فإنه لا عيش إلا عيش الآخرة</p>
<p>তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করুন; কারণ প্রকৃত জীবন তো আখেরাতের জীবনই।</p>
<p>দুনিয়া ধোঁকার জীবন। হজরত হাইয়ান ইবনু খারিজা (রহ.) বর্ণনা করেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) আমাকে বললেন, তুমি রিয়াজত কীভাবে করছ? অতঃপর বললেন—</p>
<p>ابتدئ بنفسك فجاهدها وابدأ بنفسك فإنك إن قتلت قتلك الله فإذا قتلك مرائياً قتلك مرائياً وإن قتلك صابراً محتسباً قتلك صابراً محتسباً</p>
<p>আগে নিজের নফস থেকে শুরু করো। তার সঙ্গে মুজাহাদা করো। নিজের নফস দিয়েই শুরু করো। কারণ তুমি যদি তাকে হত্যা করো, আল্লাহ তোমাকে হত্যা করবেন। যদি তুমি তাকে রিয়া ও লোকদেখানোর অবস্থায় হত্যা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রিয়াকার অবস্থায় হত্যা করবেন। আর যদি তুমি তাকে সবর ও সাওয়াবের আশায় হত্যা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে সবরকারী ও সাওয়াবপ্রত্যাশী অবস্থায় হত্যা করবেন।</p>
<p>তাই হক তায়ালার অর্থসমূহের বয়ানে আমাদের নির্ভরতা নিজের দুর্বল রায় বা মতের ওপর নয়; বরং হিদায়েতপ্রাপ্তদের তাসনিফ, সালাফের পথ এবং শরিয়তসম্মত ইশারার ওপর।</p>
<p>আমাদের আলোচনা তাওহিদের ভিত্তি এবং তার রচনাপদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ধরনের বিষয় ইবারত ও ভাষার বাঁধনে পুরোপুরি বলা যায় না। যেমন ইলাহি হাদরতের কাছে পৌঁছা তাঁর তাওফিক ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি সেই হাদরতের বক্তব্যও তাঁর তাওফিক ছাড়া সম্ভব নয়। (হাদরত বলতে আল্লাহর  প্রকৃত অবস্থা)</p>
<p>যে ব্যক্তি হকের কাছে পৌঁছা ছাড়া হকের দাবি করে, সে ভুলের ওপর থাকে। কারণ যেখানে সৃষ্টির রূপ এবং সৃষ্টিকারীর প্রমাণ আছে, সেখানে মারিফতের পথের দলিল হলো— নফস, তার মুজাহাদা, তার আমল এবং তার মুশাহাদা।</p>
<p>আহলে তরিকতের একটি দলিল হলো— কোনো দলিলই অন্তরকে হকের বিপরীত বিষয় থেকে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ করতে পারে না।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا. وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ</p>
<p>যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথ দেখাই। আর যারা হিদায়েত গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের হিদায়েত আরও বাড়িয়ে দেন এবং তাদের তাকওয়া দান করেন। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯; সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৭।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, لَمْ يَنْجُ أَحَدُكُمْ بِعَمَلِهِ &#8211; তোমাদের কেউই নিজের আমলের মাধ্যমে নাজাত পাবে না।</p>
<p>তখন জিজ্ঞেস করা হলো, قِيلَ وَلَا أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ বলা হলো, হে আল্লাহর রসুল, আপনিও না? তিনি ﷺ বললেন,</p>
<p>قَالَ وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللهُ بِرَحْمَتِهِ &#8211; আমিও না; তবে আল্লাহ যদি আমাকে তাঁর রহমতে ঢেকে নেন।</p>
<p>তাই মুজাহাদা হলো বান্দার কাজ। এটি আছে এবং প্রতিষ্ঠিত। তবে আসল নাজাত হলো আল্লাহর দয়া ও ফজলের কারণে। কারণ বান্দার নাজাত ইলাহি মাশিয়্যাত তথা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত, শুধু মুজাহাদার সঙ্গে নয়। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—</p>
<p>فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا</p>
<p>আল্লাহ যাকে হিদায়েত দিতে চান, তার বুক ইসলাম গ্রহণের জন্য খুলে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহ করতে চান, তার বুক সংকীর্ণ ও কঠিন করে দেন। সুরা আনআম, আয়াত: ১২৫।</p>
<p>আরও ইরশাদ হয়েছে—</p>
<p>تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ</p>
<p>আপনি যাকে চান, রাজত্ব দান করেন; আর যার কাছ থেকে চান, রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৬। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার প্রমাণে এমন আয়াত কুরআনে বহু জায়গায় এসেছে।</p>
<p>যদি বান্দার পৌঁছে যাওয়া শুধু নিজের মুজাহাদা ও চেষ্টার ওপর নির্ভর করত, তাহলে শয়তান ও দুনিয়াত্যাগী খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীরাই আল্লাহর নৈকট্যের সবচেয়ে যোগ্য হতো। কারণ তারা আদম আলাইহিস সালামের চেয়েও বেশি কষ্ট ও মেহনত করেছে। কিন্তু তাদের সেই কষ্ট গ্রহণযোগ্য হয়নি; বরং তারা আল্লাহর ফজল ও হিদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।</p>
<p>সুতরাং নফসের হাকিকতে পৌঁছার মূল ভিত্তি হলো শরিয়ত ও মুজাহাদা। আর এই কথাও সত্য যে, যে যত বেশি মুজাহাদা করে, সে তত বেশি সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু যে হকের দয়া ও ইনায়াতের বেশি অধিকারী, সে-ই হকের সবচেয়ে কাছে।</p>
<p>কোনো ব্যক্তি যদি সারাজীবন আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, অথচ হকের দয়া থেকে দূরে থাকে, আর অন্য কেউ মদের দোকানে পাপের মধ্যে পড়ে থেকেও হকের দয়ার নিকটবর্তী হয়, তবে তার নাজাতের সম্ভাবনা বেশি। কারণ সবকিছুর মূল হলো ইমান। আর ইমানের চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু নেই।</p>
<p>তবে ভুল বোঝা যাবে না— এ কথা হুকুম নয়, বরং হাল ও দয়ার রহস্যের কথা। জাহেরি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, আনুগত্যে বেশি থাকা ব্যক্তি বেশি সম্মানিত; আর গুনাহে পড়ে থাকা ব্যক্তি কম মর্যাদার। কিন্তু ইলাহি মাশিয়্যাতের ভেতরের রহস্যকে বাহ্যিক আমল দিয়ে পুরোপুরি মাপা যায় না।</p>
<p>হজরত সিররি সাকতি (রহ.) বলেন, আল্লাহর পথে চলার পদ্ধতি হলো নফসের বিরোধিতা। কারণ এক দল বলে, পথ হলো طلب وجد অর্থাৎ অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায়। আরেক দল বলে, وجد طلب অর্থাৎ আগে দান আসে, তারপর অনুসন্ধান জন্ম নেয়। যে পায়, সে খোঁজে; আর যে খোঁজে, সে পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।</p>
<p>এর একটি কারণ হলো— এক ব্যক্তি মুজাহাদা করে, তারপর মুশাহাদা লাভ করে। আরেক ব্যক্তি মুশাহাদা লাভ করে, তারপর মুজাহাদা করে।</p>
<p>এর হাকিকত হলো, মুশাহাদার পরে মুজাহাদা করা ইলাহি তাওফিকের রহস্য। কারণ সেখানে আল্লাহর ফজল আগে আসে, তারপর বান্দার চেষ্টা। তাই কখনো সন্ধান ছাড়াই প্রাপ্তি ঘটে। আর কখনো প্রাপ্তির জন্য সন্ধান করতে হয়।</p>
<p>যখন মুশাহাদা ছাড়া শুধু মুজাহাদা থাকে, তখনও মুজাহাদার সুফল অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু সেটি এখনো জামালে ইলাহির নুর দ্বারা সরাসরি উদ্ভাসিত হয়নি। আর যখন মুশাহাদার নুর আগে আসে, তখন মুজাহাদা হিদায়েতের আলোয় পরিচালিত হয়।</p>
<p>কিন্তু এখানে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পথ ধরে রাখা জরুরি। তাদের মত হলো বান্দার মুজাহাদাকে স্বতন্ত্র কার্যকারণ হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না। সব নবী, কিতাব, শরিয়ত ও আহকাম তাওফিকের অধীন। তাই জাহেরি আমল প্রয়োজনীয় হলেও প্রকৃত হিদায়েত আল্লাহর দান।</p>
<p>এই কারণেই হিদায়েতের বিষয়টিকে আল্লাহর মারিফতের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা উত্তম। কারণ হিদায়েত হলো হকের দিকে যাওয়ার দরজা, আর মুশাহাদা হলো সেই হকের বাস্তব উপলব্ধি।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَىٰ وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ</p>
<p>আর যদি আমি তাদের কাছে ফেরেশতা নামিয়ে দিতাম, মৃতরা তাদের সঙ্গে কথা বলত, এবং সব বস্তু তাদের সামনে একত্র করে দিতাম, তবুও তারা ইমান আনত না; যদি না আল্লাহ চাইতেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। সুরা আনআম, আয়াত: ১১১।</p>
<p>কারণ ইমান আল্লাহর দান। শুধু দলিল দেখা বা নিদর্শন দেখা ইমানের জন্য যথেষ্ট নয়, যদি আল্লাহর মাশিয়্যাত না থাকে।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ</p>
<p>নিশ্চয় যারা কুফর করেছে, আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, তাদের জন্য দুটোই সমান; তারা ইমান আনবে না। সুরা বাকারা, আয়াত: ৬।</p>
<p>কারণ কাফিরদের জন্য দলিল, নিদর্শন, ভয় প্রদর্শন ও কিয়ামতের সতর্কবাণী বারবার আসে; তবুও তারা তখন পর্যন্ত ইমান পায় না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের জন্য ইমানের দরজা খুলে দেন।</p>
<p>ইমানের তাওফিক আলাদা বিষয়। তাই কুরআনের দলিল, শরিয়তের বিধান ও হকের দিকে পৌঁছানোর নিয়মগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। এ কারণে নবীগণ ইসলামি শরিয়তের প্রচার, কিতাব নাজিল এবং আহকামের তাবলিগের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।</p>
<p>এ কারণেই হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলামের শুরুতেই এমনভাবে ইমান কবুল করেন, যা সবার কাছে আশ্চর্যের বিষয় ছিল। কিন্তু হজরত সিদ্দিক (রা.)-এর ভেতরে শুরু থেকেই ইলাহি ফজলের আলো পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তাঁর কাছে যুক্তি-তর্কের দীর্ঘ পথের প্রয়োজন হয়নি। ইমান, ইয়াকিন, তাসলিম ও তাওফিক তাঁর অন্তরে সরাসরি উদ্ভাসিত হয়েছিল।</p>
<p>এখানে মূল কথা হলো, তালিব ও মাতলুবের সম্পর্ক দুই রকম। কখনো তালিব অনুসন্ধান করতে করতে মাতলুবের দিকে যায়। আবার কখনো মাতলুব নিজেই তালিবকে টেনে নেয়। তখন তালিবের খোঁজও থাকে, কিন্তু আসল কার্যকারণ হয় হকের আকর্ষণ। এ কারণেই বলা হয়, যে খোঁজে সে পায়; আবার যে পায়, সে-ও খুঁজতে থাকে। পাওয়া এবং খোঁজা দুটিই আল্লাহর দানের ভেতর।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>مَنِ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ &#8211; যার দুই দিন একই রকম যায়, সে ক্ষতিগ্রস্ত।</p>
<p>অর্থাৎ সত্যসন্ধানীর আজকের দিন গতকালের চেয়ে উত্তম হওয়া উচিত। কারণ হকের পথে স্থির হয়ে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। প্রতিদিনই মুজাহাদা, মারিফত, ইয়াকিন ও আমলে উন্নতি থাকা দরকার।</p>
<p>আরও ইরশাদ হয়েছে—</p>
<p>اسْتَقِيمُوا وَلَنْ تُحْصُوا &#8211; তোমরা সোজা পথে অটল থাকো; কিন্তু তোমরা তা পূর্ণভাবে গণনা ও আয়ত্ত করতে পারবে না। এখানে রসুলুল্লাহ ﷺ মুজাহাদার মাধ্যমে সবব প্রমাণ করেছেন; আবার কাশফ, ইরাদা ও মারিফতের মাধ্যমে সববের সীমাও দেখিয়েছেন। আহলে ইয়াকিন সববের মাধ্যমে হকের দিকে চলে, কিন্তু সববকে স্বাধীন কার্যকারী মনে করে না।</p>
<p>যে ব্যক্তি শুধু মুজাহাদা ও কঠোর সাধনাকে সবকিছু মনে করে, সে পথে ভুল করে। কারণ মুজাহাদা যদি হকের ফজল ও মহব্বতের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা শুকনো পরিশ্রমে পরিণত হয়। আবার যে ব্যক্তি মুজাহাদা ছেড়ে শুধু ফজলের দাবি করে, সেও ভুল করে। কারণ ফজলের দরজা খুলে গেলে বান্দার ভেতরে আনুগত্য, ইখলাস, আমল ও বিনয় বৃদ্ধি পায়।</p>
<p>সুতরাং সত্য পথ হলো মুজাহাদা করতে হবে, কিন্তু তার ওপর ভরসা করা যাবে না; আমল করতে হবে, কিন্তু আমলকে নাজাতের দাম মনে করা যাবে না; তাওফিক চাইতে হবে, কিন্তু অলসতা করা যাবে না। বান্দার কাজ হলো দরজায় দাঁড়ানো, আর দরজা খুলে দেওয়া আল্লাহর কাজ।</p>
<p>এ কারণেই মুজাহাদা, মহব্বত, তাওফিক ও মুশাহাদা সব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। মুজাহাদা মহব্বতের বাহ্যিক প্রকাশ, আর মুশাহাদা হকের দানের ফল। তাওফিক ছাড়া মুজাহাদা শুকনো, আর মুজাহাদা ছাড়া তাওফিকের দাবি অপূর্ণ।</p>
<p>হজরত সাহল তুস্তারি (রহ.)-এর বক্তব্যেও এই সত্য প্রমাণিত হয়। মানুষ নিজের শক্তিতে হকের কাছে পৌঁছে না; বরং আল্লাহর দয়ায় পৌঁছে। তবে যে সত্যিই আল্লাহর দয়ার যোগ্য হতে চায়, তাকে নফসের বিরোধিতা, শরিয়তের আনুগত্য এবং ইখলাসের পথে অবিচল থাকতে হয়।</p>
<p>মুজাহাদার প্রয়োজন এ কারণেই— মানুষ যেন নিজের স্বভাবগত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসে এবং নিজের ভেতরে থাকা কাটা-ছেঁড়া ও বাধাগুলো দূর করে। যারা এ পথে চলে না, তাদের অবস্থা এমন যে, তারা কোনো দুর্লভ ও মূল্যবান বস্তু না দেখেই শুধু তার বিবরণ শুনে বা নাম জেনে বসে থাকে। এতে তাদের সামনে আমল ও আহওয়ালের হাকিকত স্পষ্ট হয় না।</p>
<p>জাহেরি দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আহলে তরিকতের কাছে রিয়াজত ও মুজাহাদাই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু হাকিকত হলো, মুজাহাদার মূল্য তার নিজের জন্য নয়; বরং তা মুশাহাদার দিকে পথ খুলে দেওয়ার জন্য। তাই মুজাহাদাকে উদ্দেশ্য বানানো যাবে না, আবার একে অস্বীকারও করা যাবে না।</p>
<p>যার ভেতরে মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে আমলের জাগরণ আসে, তার জন্য জরুরি— সে যেন এ অবস্থাকে আল্লাহর ইশারা মনে করে এবং শরিয়তের সীমা পর্যন্ত নিজের আমলকে যাচাই করে। নিজের কাজের ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে না; বরং সবসময় নিজের হাল পরীক্ষা করবে। কোনো ইলাহি তাওফিক তাকে কোথায় দাঁড় করিয়েছে এবং সে কোন আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, এ কথা ভালোভাবে দেখবে।</p>
<p>এরপর তার কাছে স্পষ্ট হবে যে, হক তায়ালার কাছে পৌঁছার পথ নিজের ইচ্ছায় নয়; বরং হক তায়ালার ফজল, জ্ঞান ও উপস্থিতির নুরে হয়। আর এও বুঝবে যে, সবকিছুর ভেতরে আল্লাহর রহস্য প্রবাহিত। আগুনের দহন, পানির শীতলতা, মদের মাতাল করা— সবই সেই কার্যকারণ ব্যবস্থার প্রকাশ, যা আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন।</p>
<p>মানুষের কাজ হলো নিজের নফসের অন্ধকার ও মন্দ অবস্থাকে মুজাহাদার মাধ্যমে পরিষ্কার করা, যাতে হকের নুর তার ভেতরে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন আয়না ময়লা হলে মুখ দেখা যায় না; পরিষ্কার হলে মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। তেমনি নফস মলিন থাকলে হকের তাজাল্লি প্রকাশ পায় না। নফস পরিষ্কার হলে সেই নুরের প্রতিফলন দেখা যায়।</p>
<p>মুজাহাদা তাই আবশ্যক। কারণ নফস এক অদ্ভুত বিষয়। যতক্ষণ তা নিজের মন্দ স্বভাবের সঙ্গে থাকে, ততক্ষণ তা সত্যকে আড়াল করে রাখে। যখন সে নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নফসকে তার খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনে এবং আল্লাহর হুকুমে তাকে বেঁধে রাখে, তখন ধীরে ধীরে নফসের পর্দা সরে যায়।</p>
<p>لان النفس كلب باغ وجلد<br />
والكلب لا يطهر إلا بالدباغ</p>
<p>কারণ নফস বিদ্রোহী ও কামড়ানো কুকুরের মতো;</p>
<p>আর কুকুরের চামড়া প্রক্রিয়াজাত না করলে পবিত্র হয় না।</p>
<p>হজরত হাসান ইবনু মানসুর (রহ.) একদিন হাসান আলভির কক্ষে অবস্থান করছিলেন। হজরত ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) যখন কুফা থেকে নফসকে শুদ্ধ করে তাঁর কাছে এলেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, হে ইবরাহিম, তুমি তরিকতের পথে কী কাজ করেছ? তুমি কোন স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছ?<br />
ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) নিজের কাহিনি বললেন— আমি এ পথে দীর্ঘ মুজাহাদা করেছি। তখন হজরত হাসান ইবনু মানসুর (রহ.) বললেন, ضيعت عمرك في عمران باطنك فأين الفناء في التوحيد &#8211; তুমি নিজের বাতেন গড়তেই জীবন ব্যয় করেছ; তাহলে তাওহিদের ভেতর ফানা কোথায় রইল?</p>
<p>এর অর্থ হলো, তুমি চাও হকের মুতালাআ তথা হককে দেখার পথে পৌঁছাতে; অথচ নিজের বাতেনকে সাজানো-গোছানো ও পরিপাটি রাখার চেষ্টায় লেগে আছ। যখন সব চেষ্টা বাতেনি অবস্থার রং-রূপ তৈরি করতেই ব্যয় হয়, তখন জাহেরি অবস্থাগুলোর রংকে একটি রঙের ওপর স্থির রাখার মতো হয়ে যায়। দীর্ঘ মেহনতের পরও সেখানে হকের পূর্ণ প্রভাব প্রকাশ পায় না।</p>
<p><strong>নফসের কুষ্ঠরোগীর উদাহরণ</strong><strong>:</strong></p>
<p>শায়খ আবুল হাসান নুরি (রহ.) বলেন, আমি একবার নফসকে এমন এক ভয়ংকর ও কুৎসিত রূপে দেখলাম যে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। তখন আমি তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলাম। এরপর সে আমার সামনে একটি গাছ হয়ে গেল। তারপর আমি তাকে পাকড়াও করতে চাইলাম। তখন সে আমাকে বলল, হে আবুল হাসান, এভাবে কষ্ট করে লাভ নেই; তুমি আমাকে ধরতে পারবে না।</p>
<p><strong>নফসে ইলাহি বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত মুহাম্মদ ইবনু সুলায়মান সুসি (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি বললেন, আমার শুরু অবস্থায় যখন আমি নফসকে আয়ত্তে আনতে চাইতাম, তখন তার গোপন খেয়ানত ও ধোঁকা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম। সে সময় আমার হাল ছিল— আমি নফসের দিক থেকে এক রকম অচেতন ছিলাম।</p>
<p>একদিন আমার এক ছেলের জেদ বা অশোভন আচরণের কারণে আমার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হলো। তখন হক তায়ালা আমাকে থামিয়ে দিলেন, যেন বিষয়টির ভেতর দিয়ে আমাকে নফসের সূক্ষ্ম চাল বুঝিয়ে দেন।</p>
<p>তখন আমি বুঝলাম, নফসের ভেতরে এমন এক অভ্যাস আছে— মানুষকে কখনো কষ্ট দিয়ে, কখনো আরাম দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেয়। সে সময় আমার নফস আমাকে বলল, তুমি আমাকে না মেরে এবং কষ্ট না দিয়ে ধ্বংস করতে চাইছ; এটাই তার ধোঁকা। নফস বলল, আমার হাকিকত এমনই: যে-সব বস্তু তোমাকে কষ্ট দেয়, সেগুলোকেই আমি তোমার কাছে আরাম মনে করিয়ে দিই; আর যেগুলো তোমাকে আরাম দেয়, সেগুলোকেই আমি কষ্টের কারণ বানিয়ে দিই।</p>
<p><strong>কাঁচের রূপে নফসের প্রকাশ</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত শায়খ আবুল আব্বাস মুহতাদি (রহ.) বলেন, একদিন আমি ঘরে ছিলাম। হঠাৎ রঙিন কাঁচের একটি টুকরো এসে পড়ল। আমি ভাবলাম, কাঁচের এই টুকরো কোথা থেকে এলো? তখন অদৃশ্য থেকে বলা হলো, এটি তোমার নফসেরই এক রূপ, যা তোমার সামনে প্রকাশিত হয়েছে।</p>
<p><strong>বিভিন্ন রূপে নফসের প্রকাশ</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত শায়খ ইবরাহিম কারমানি (রহ.) বলেন, হক তায়ালা আপনাকে মর্যাদা ও তরিকতের স্থায়িত্ব দান করুন। তিনি নিজের শুরু অবস্থার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। বলেন, আমি নফসকে কখনো সাপের রূপে দেখেছি, কখনো বানরের রূপে। আবার এক বুজুর্গ বর্ণনা করেন, আমি নফসকে গাধার রূপে দেখেছি। কোনো কোনো মাশায়িখ বলেছেন, আমি নফসকে কুকুরের মতো দেখেছি। তারা সবাই নফসের খারাপ স্বভাব, ক্ষতি ডেকে আনা, খারাপের দিকে টেনে নেওয়া এবং ভেতরের দোষ-ত্রুটির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।</p>
<p>কারণ যে নিজের অস্তিত্ব থেকে ফানা হয়ে গেছে, সে নিজের পবিত্র জাহেরকে অপবিত্র জিনিসের ওপর ভর করে আছে বলে কল্পনাও করতে পারে না। এ কারণেই যখন ভেতরের পবিত্রতা এবং বাহিরের নোংরামি, নুরানি অবস্থা এবং ইলাহি দানের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়, তখন মানুষ ধাঁধায় পড়ে যায়। তারপর যখন সে পর্দা সরে যেতে দেখে, তখন তার কাছে স্পষ্ট হয়— ওই সব রূপ মূলত সব দোষ থেকে পবিত্র ছিল না।</p>
<p>এসব উদাহরণ ও কাহিনির উদ্দেশ্য হলো— নফস নিজ সত্তায় আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো বস্তু নয়। নফসের কোনো নির্দিষ্ট বিশেষ গুণ বা স্থায়ী রূপ নেই, যার কারণে তাকে এক নির্দিষ্ট আকারে আবদ্ধ করা যায়। রসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইরশাদের মর্মও এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করে, أَعْدَى عَدُوِّكَ نَفْسُكَ الَّتِي بَيْنَ جَنْبَيْكَ, رُوِيَ أَنَّهُ قَالَ</p>
<p>বর্ণিত আছে, রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার নফস, যা তোমার দুই পাঁজরের মাঝখানে রয়েছে।</p>
<p>তাই নফসের মারিফত কখনো তার জাহেরি রূপের মাধ্যমে লাভ করা যায়। কারণ নফস নিজে কোনো পূর্ণ ও স্থায়ী সত্তা নয়। তাই সালিকের জন্য জরুরি হলো— যখন তার সঠিক পরিচয় জানা হয়ে যায়, তখন আর নিজের ভেতরে তার অস্তিত্বের দিকে আলাদা করে দৃষ্টি না দেওয়া।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>لِأَنَّ النَّفْسَ كَلْبٌ نَبَّاحٌ وَإِمْسَاكُ الْكَلْبِ بَعْدَ الرِّيَاضَةِ مُبَاحٌ</p>
<p>কারণ নফস ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মতো। তবে রিয়াজতের পর কুকুরকে ধরে রাখা মুবাহ।</p>
<p>অতএব নফসের মুজাহাদা তার গুণাবলিকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত করে। কিন্তু তার নিজ সত্তাকে বিলুপ্ত করে না। এ বিষয়ে মাশায়িখের বহু বক্তব্য আছে। ভয় হলো আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই আপাতত এই পরিমাণেই যথেষ্ট করছি। এরপর এখন আমি শরিয়তের আলোচনা শুরু করছি। তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই।</p>
<p><strong>হাওয়া তথা প্রবৃত্তির হাকিকত এবং তার নিন্দা সম্পর্কে আলোচনা</strong></p>
<p>হে প্রিয়, আল্লাহ তোমাকে তাঁর মারিফত দান করুন। জেনে রাখো, এক দল মানুষের মতে নফসের ভেতরে একটি গুণ আছে; সেটিই খাহেশ তথা কামনা। আর আরেক দলের মতে, খাহেশের প্রকাশই হাওয়ার নাম।</p>
<p>যেমন রুহের জন্য আকল আছে, আর রুহের জুহুর তথা প্রকাশই আকলি শক্তি নামে পরিচিত; তেমনিভাবে নফসের জন্য হাওয়া আছে, আর হাওয়ার প্রকাশই খাহেশ নামে পরিচিত।</p>
<p>সুতরাং নফসের দৃষ্টান্ত হলো দেহের মতো। আর হাওয়ার দৃষ্টান্ত হলো আকলের বিপরীত এক শক্তির মতো। অর্থাৎ বান্দার জন্য দুটি শক্তি রয়েছে। একটি আকলের দিক থেকে, আরেকটি হাওয়ার দিক থেকে।</p>
<p>যে ব্যক্তি আকলের শক্তিকে গ্রহণ করে, তার কাছে ইমান, হাল ও অন্তরের শক্তি প্রকাশ পায়; আর যে ব্যক্তি হাওয়ার শক্তিকে গ্রহণ করে, সে গোমরাহি, বিভ্রান্তি ও নফসের দাবির দিকে ঝুঁকে পড়ে।</p>
<p>তাই আসল কথা হলো— নফসকে চেনা জরুরি, কিন্তু নফসকে অনুসরণ করা হারাম। আর হাওয়াকে চেনা জরুরি, কিন্তু হাওয়ার দাস হওয়া ধ্বংসের পথ। শরিয়তের কাজ হলো আকলকে নুর দেওয়া, রুহকে জাগিয়ে রাখা এবং নফস ও হাওয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।</p>
<p>হাওয়া গোমরাহকারী বস্তু। আকলবানদের জন্য এটি পরীক্ষা ও অবস্থানের জায়গা, আর আওলিয়াদের জন্য এটি এড়িয়ে চলার ক্ষেত্র। বান্দাকে এর বিরোধিতা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর অনুসরণ থেকে বিরত রাখা হয়েছে।</p>
<p>لان مورد ركوبها هلك ومن خالفها ملك</p>
<p>কারণ যে তার সওয়ারিতে চড়ে বসে, সে ধ্বংস হয়; আর যে তার বিরোধিতা করে, সে মালিক হয়ে যায়।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ</p>
<p>আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নফসকে হাওয়া থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয় জান্নাতই তার ঠিকানা। সুরা নাজি‘আত, আয়াত: ৪০–৪১।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي اتِّبَاعُ الْهَوَىٰ وَطُولُ الْأَمَلِ</p>
<p>আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি খাহেশের অনুসরণ এবং দীর্ঘ আশা।</p>
<p>হজরত ইবনু আব্বাস (রা.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন—</p>
<p>أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلٰهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا</p>
<p>আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে নিজের খাহেশকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? আপনি কি তার ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন? সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৩।</p>
<p>অর্থাৎ সে এমন ব্যক্তি, যে আল্লাহর নাফরমানির কোনো খাহেশ সামনে এলেই সেটিকে নিজের খোদা বানিয়ে নেয়। সে তখন আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে নিজের খাহেশের আনুগত্যে লিপ্ত হয়।</p>
<p><strong>নফসানি খাহেশের </strong><strong>প্রকার:</strong></p>
<p>সব নফসানি খাহেশ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো খুশির খাহেশ, যা দুনিয়ার স্বাদ, আরাম, ভোগ ও আরামপ্রিয়তার দিকে মানুষকে টেনে নেয়। এর ফলে নফস দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবে যায় এবং হকের পথ থেকে দূরে সরে যায়।</p>
<p>দ্বিতীয়টি হলো নেতৃত্ব, মর্যাদা, প্রাধান্য, প্রশংসা ও মানুষের ওপর কর্তৃত্বের খাহেশ। এটি প্রথমটির চেয়েও সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক। কারণ ভোগের খাহেশ অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে, কিন্তু মর্যাদার খাহেশ অনেক সময় দ্বিন, ইবাদত, জ্ঞান বা সেবার রূপ ধরে আসে। তাই সালিকের জন্য জরুরি যে, প্রতিটি খাহেশকে শরিয়তের দাঁড়িপাল্লায় মাপা এবং নফসের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি রাখা।</p>
<p>কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ভেতরে মর্যাদা, সম্মান ও নেতৃত্বের খাহেশ এত প্রবল হয়ে বসে যে, এর জন্য তাদের ভেতরে নানা ধরনের খাহেশের প্যাঁচ তৈরি হয়। নফসের এই খাহেশগুলো মানুষের জন্য ফিতনা। এগুলো মানুষকে বিপদে ফেলে। আমরা আল্লাহর কাছে হাওয়ার অনুসরণ থেকে আশ্রয় চাই।</p>
<p>যার ভেতরে নফসানি খাহেশ বেশি, সে অনেক দূরে থাকে। আর হকের কাছ থেকে দূরে থাকা, গোমরাহদের সঙ্গে একই পথের সঙ্গী হওয়া। যে মানুষের খাহেশ যত বেশি, তার দূরত্বও তত বেশি। আর হক তায়ালার যার যত কাছে, তার ভেতরে খাহেশ তত কম থাকে।</p>
<p><strong>এক রাহিবের নফসের কাহিনি</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) বলেন, একবার আমি সফরে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল এক রাহিব। সে বহু বছর ধরে এক গির্জায় জুহদ ও রাহবানিয়্যতে মগ্ন ছিল। আমি অদৃশ্য থেকে আদেশ পেলাম, তুমি তার রাহবানিয়্যতের শর্ত পরীক্ষা করো।</p>
<p>আমি তাকে ওই গির্জা থেকে বের করে নিলাম। সে আমার সঙ্গে চলতে লাগল। কিছু সময় যাওয়ার পর ক্ষুধা তাকে কষ্ট দিতে লাগল। সে ক্ষুধার কথা বলল। আমি বললাম, হে ইবরাহিম, এখন আমি কোথায় গিয়ে তোমার জন্য কিছু আনব? এখানে তো বহু বছরের পথেও রাহবানিয়্যতের কোনো উপকরণ পাওয়া যায় না। বরং এটি এমন এক মরুভূমি, যেখানে পথিকেরা অনাহারে মারা যায়। অথচ তুমি এমন এক পথের যাত্রী, যেখানে সাধারণ মানুষের হাল বোঝা যায় না।</p>
<p>কিছুক্ষণ পর সে বলল, আমার এই কথাগুলো আল্লাহ তায়ালা জানেন। তিনি কাদির। চাইলে মরুভূমিতেই ক্ষুধার্ত মানুষকে রিজিক দিতে পারেন।</p>
<p>তারপর রবের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হলো, হে ইবরাহিম, ক্ষুধার্ত হয়ে থাকা ব্যক্তিকেও যখন তুমি সঠিক পথ দেখাও, তখন তার জন্য তা হেদায়েত হয়। এরপর আবার আমাকে বলা হলো, হে ইবরাহিম, তুমি কি মানুষের চাহিদা দেখে আগে নিজের চাহিদা ভুলে যাও? নাকি নিজের চাহিদার কারণে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে দেরি করো?</p>
<p>কারণ প্রতিদিনের ক্ষুধা মানুষের নফসানি খাহেশকে তার সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে রাখে, যেন সে সবসময় নিজের দিকেই ফিরে যায়। কিন্তু হকের পথের আদব হলো নিজের প্রয়োজনকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা এবং বান্দাদের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা রাখা।</p>
<p>ফেরেশতারা বান্দার অন্তর এবং বাতেনের ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত নাজিল হতে পারে না, যতক্ষণ তার স্বভাব, অন্ধকার ও খাহেশ ভেতরে প্রবল থাকে। বান্দার ভেতরে যখন খাহেশ, স্বভাবের অন্ধকার ও নফসের টান প্রবল থাকে, তখন শয়তানের আঘাত প্রবল হয়। সে অন্তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে নিজের অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে। এটি এমন অবস্থা, যাকে আল্লাহর ভাষায় বলা হয়েছে, وَعِبَادِي أَظْلَمَ &#8211; আমার বান্দারাই বেশি জুলুমকারী।</p>
<p>অর্থাৎ, মানুষ নিজের নফসের কারণে নিজের ওপরই জুলুম করে। তাই আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে শেষ পর্যন্ত অবকাশ দিয়েছেন এবং তার দ্বারা বান্দাদের পরীক্ষা প্রকাশ করেছেন। তবে আল্লাহ তাঁর খাস বান্দাদের ব্যাপারে শয়তানের ক্ষমতা নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ &#8211; নিশ্চয় আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই। সুরা হিজর, আয়াত: ৪২।</p>
<p>মূলত শয়তানও বান্দার নফসের হাকিকত থেকে পৃথক নয়। এ কারণেই রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>وَمَا مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ غَلَبَهُ شَيْطَانُهُ إِلَّا عُمَرَ فَإِنَّهُ غَلَبَ شَيْطَانَهُ</p>
<p>প্রত্যেক মানুষের ওপর তার শয়তান প্রভাব বিস্তার করে; তবে উমর ব্যতিক্রম, কারণ উমর নিজের শয়তানকে পরাভূত করেছেন।</p>
<p>এই হাদিসে শয়তান বলতে নফসের ক্ষতিকর গোপন প্রবণতাকেও বোঝানো হয়েছে। তাই মানুষের ভেতরে যত স্বভাবগত অন্ধকার ও নফসানি খাহেশ থাকে, শয়তানের প্রভাবও তত শক্তিশালী হয়।</p>
<p>রসুলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন—</p>
<p>الْهَوَى وَالشَّهْوَةُ مَعْجُونَةٌ بِطِينَةِ ابْنِ آدَمَ</p>
<p>হাওয়া ও শাহওয়া আদম সন্তানের মাটির সঙ্গে মিশ্রিত।</p>
<p>অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টিগত গঠনের ভেতরেই খাহেশ ও প্রবৃত্তির উপাদান আছে। তাই এগুলোকে অস্বীকার করে নয়; বরং শরিয়ত, মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।</p>
<p>হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছেন—</p>
<p>দীর্ঘ সময় খাহেশ ত্যাগ করলে একসময় খাহেশই মানুষকে ত্যাগ করে যায়।</p>
<p>হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেন—</p>
<p>الوصل قال ترك ارتكاب الهوى</p>
<p>হকের সঙ্গে মিলনের পথ হলো হাওয়ার অনুসরণ ছেড়ে দেওয়া।</p>
<p>অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হকের কাছে পৌঁছাতে চায়, তার জন্য প্রথম শর্ত হলো নিজের খাহেশকে সিদ্ধান্তের আসন থেকে নামিয়ে দেওয়া। কারণ হাওয়া যতক্ষণ অন্তরে শাসন করে, ততক্ষণ রুহের নুর পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় না।</p>
<p>যে ব্যক্তি হক তায়ালার মিলন চায়, তার জন্য জরুরি হলো— সে নিজের খাহেশের বিরোধিতা করবে। কারণ বান্দা কোনো ইবাদতের মাধ্যমে ততটা নৈকট্য লাভ করে না, যতটা লাভ করে হাওয়ার বিরোধিতার মাধ্যমে। হাওয়ার বিরোধিতা করা অত্যন্ত বড় কাজ। কারণ আদমির জন্য নিজের ভেতরের খাস কামনা ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে কঠিন। তাই তার জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হলো নিজের খাহেশের বিরোধিতা করা।</p>
<p><strong>খাহেশের ওপর পা রাখা</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত জুননুন মিসরি (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে নামাজে দুলছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই অবস্থা কীভাবে হলো? সে বলল, আমি নিজের নফসের ওপর পা রেখে হাওয়ায় চলে যাচ্ছি।</p>
<p>হজরত মুহাম্মদ ইবনু আলি (রহ.) বলেন, আমাকে সেই মানুষ বিস্মিত করে, যে ক্ষতিকর খাহেশের জন্য ঘর বানায় এবং তার জিয়ারত করে। অথচ সে নিজের নফসকে নিজের পায়ের নিচে রাখে না, যাতে হক তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং তাঁর দিদার লাভ করতে পারে।</p>
<p><strong>নফসানি খাহেশ</strong><strong>:</strong></p>
<p>নফসের সবচেয়ে বড় সিফাত হলো শাহওয়া তথা প্রবল কামনা। শাহওয়া থেকেই মানুষের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা ধরনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব প্রভাবের কারণে তাকে কষ্ট দেওয়া হয়। কারণ প্রতিটি অঙ্গের শাহওয়া আলাদা।</p>
<p>চোখের শাহওয়া হলো দেখা। কানের শাহওয়া হলো শোনা। নাকের শাহওয়া হলো ঘ্রাণ নেওয়া। মুখের শাহওয়া হলো কথা বলা। পেটের শাহওয়া হলো খাওয়া। যৌনাঙ্গের শাহওয়া হলো কামনা পূরণ। পায়ের শাহওয়া হলো চলা। হাতের শাহওয়া হলো ধরা। এভাবেই প্রত্যেক অঙ্গের নিজস্ব শাহওয়া আছে।</p>
<p>তাই সালিকের জন্য জরুরি— সে প্রত্যেক অঙ্গের খেয়াল রাখবে এবং রাতদিন তার হেফাজত করবে। যতক্ষণ না সে নিজের খাহেশকে দমন করে, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হক তায়ালার আদেশের অধীন করে, ততক্ষণ সে হাওয়ার প্রভাব থেকে নিরাপদ নয়।</p>
<p>অনেক সময় বান্দা সাধারণ অঙ্গকে তো পবিত্র রাখে, কিন্তু বাতেনি খাহেশের কারণে বারবার দূরে সরে যায়। কারণ যে শাহওয়া চোখে ছড়িয়ে পড়ে, তা মানুষকে হারামের দিকে টানে। আর যে শাহওয়া কান, জিহ্বা, হাত-পা বা পেটের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও বান্দাকে নিজের আনুগত্যে ব্যস্ত করে ফেলে।</p>
<p>তাই বান্দার উচিত, নফসকে আনুগত্যের পথে কঠোরভাবে বেঁধে রাখা এবং প্রত্যেক অঙ্গকে শরিয়তের সীমার মধ্যে রাখা। কারণ যে অঙ্গ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, সেটি নুরের পথ খুলে দেয়; আর যে অঙ্গ খাহেশের পেছনে চলে, সেটি বারবার দূরে সরে যায়। তাই তার সাধনার পদ্ধতি হলো একেবারে অবিরত ও পূর্ণভাবে তাকে রিয়াজতের অধীন রাখা।</p>
<p><strong>মাকামে গাইরত</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত আবুল আব্বাস নুরি (রহ.) বলেন, আমি একদিন জামে মসজিদে ছিলাম। সুন্নত অনুযায়ী আসা ব্যবহার করছিলাম। মনে মনে বললাম, আমার ওপর আবুল আব্বাস নুরির তাসররুফ এবং তার সব কথা বেদাতের দিক থেকে আসে। হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনলাম, হে আবুল আব্বাস, আমরা তোমার রাজ্যে তাসররুফ করছি। তুমি আমাদের কোনো অঙ্গকে আমাদের স্মরণ থেকে বেশি মনে করো না। আমি নিজের ইজ্জতের কসম করে বলছি, যদি তুমি তোমার জাহেরি কোনো অঙ্গকে শাহওয়ার কাজে লাগাও, তাহলে আমি তোমার অন্তরকে শাহওয়ার দিকে ফিরিয়ে দেব।</p>
<p>এ কথার মর্ম এমন—</p>
<p>تبتغي الاحسان دع احسانك<br />
اترك بخشي الله ريحانك</p>
<p>তুমি ইহসান খুঁজছ; আগে নিজের ইহসান-দাবি ছেড়ে দাও।<br />
আল্লাহর ভয়েই তোমার সব সুগন্ধি ও আরাম ছেড়ে দাও।</p>
<p>বান্দার জন্য জরুরি— সে নিজের শরীরের কোনো অংশকে স্বাধীনভাবে খরচ না করে। বরং প্রতিটি অঙ্গকে ইলাহি হুকুম, শরিয়তের আদব এবং হকের স্মরণের অধীন রাখবে। কারণ নিজের তাসররুফ ও ইচ্ছার মাধ্যমে অঙ্গে অঙ্গে পরিবর্তন ও খারাপি জন্ম নেয়।</p>
<p>হাকিকতে যখন তাসলিম তথা নিজেকে সোপর্দ করার অবস্থা অর্জিত হয়, তখন বান্দা আল্লাহর হেফাজত ও ইসমতে প্রবেশ করে। আর বান্দার হেফাজত, রক্ষাব্যবস্থা ও গুনাহ থেকে বাঁচার বিষয় আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হয়ে যায়। কারণ আল্লাহর হেফাজতের তুলনায় নিজের হেফাজত দুর্বল ও অস্থায়ী।</p>
<p>لان نفي الذباب بالمكنسة أيسر<br />
من نفيه بالمذبّة</p>
<p>কারণ মশা-মাছি ঝাড়ু দিয়ে সরানো হাতপাখা দিয়ে সরানোর চেয়ে সহজ।</p>
<p>অতএব আল্লাহর হেফাজত সব অনিষ্ট থেকে বাঁচায়। আর নিজের আকল ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভরসা করে দূরে সরাতে চাইলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। আর এই সিফাতেও বান্দা আল্লাহর শরিক নয়। এর ইঙ্গিত হলো— বান্দা নিজের রাজ্যে কোনো তাসররুফ করতে পারে না, যতক্ষণ না ইলাহি ইসমত ও তাকদির তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করে।</p>
<p>বরং ইলাহি হাকিকত এমন যে, বান্দার সব দান, সব ক্ষমতা এবং সব উপায় শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়। বান্দা নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে চেষ্টা করে, সেটিও আসলে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরের অধীন।</p>
<p>বান্দা অনেক সময় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের মাধ্যমে ইলাহি তাকদিরকে বদলাতে চায়, অথবা তাকদিরের বিপরীতে নিজের জন্য অন্য কোনো পথ বানাতে চায়। অথচ দুই অবস্থাতেই বিষয়টি একভ। চেষ্টার দ্বারা তাকদির বদলানো যায় না, আর তাকদির ছাড়া কোনো কাজও সংঘটিত হয় না।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a></p>
<h2>আবু তালেব মক্কি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>আবু তালেব মক্কি নফসের চারটি মূল সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। দুর্বলতা, কৃপণতা, লালসা ও অজ্ঞতা। এগুলো থেকেই জন্ম নেয় রাগ, ভয়, লোভ ও মূর্খতা। তিনি নফসের চিকিৎসাকে রোগীর চিকিৎসার মতো বলেছেন। আগে ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে রাখা, তারপর ধীরে ধীরে সুস্থ করা। এক বুজুর্গের ছাগলের মাথার ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বিশ বছরের পুরোনো নফসের চাহিদাকেও চেনা ও দমন করা সম্ভব।</p>
<p><strong>নফসের শুরু ও পরীক্ষা</strong><strong>:</strong></p>
<p>ক্ষতি শুরু হয় বিরোধিতা থেকে, আর বিরোধিতা শুরু হয় নফস থেকে। নফস মানুষের স্বভাবের মধ্যেই রাখা হয়েছে। তাই আল্লাহ নফসকে পরীক্ষা করেন— সে কি নিজের রবের দিকে ফিরে আসে এবং নিজের শক্তি-সামর্থ্যকে আনুগত্যে প্রকাশ করে, না কি অবাধ্যতায় প্রকাশ করে।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি এভাবে বলেছেন, وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ &#8211; তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২। অর্থাৎ তোমরা তাঁর দরবারে আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের অবস্থায় উপস্থিত হও। তাই তোমরা এ দোয়া করো, رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ &#8211; হে আমাদের রব, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং আমাদের মুসলমান অবস্থায় মৃত্যু দিন। সুরা আরাফ, আয়াত: ১২৬।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا &#8211; মানুষ বড় তাড়াহুড়াপ্রবণ। সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১১।</p>
<p>আর এক জায়গায় ইঙ্গিত করে বলেছেন, خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ &#8211; মানুষকে তাড়াহুড়াপ্রবণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭।</p>
<p>এরপর তিনি সতর্ক করে বলেছেন, سَأُرِيكُمْ آيَاتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ &#8211; আমি তোমাদের আমার নিদর্শন দেখাব; তাই তোমরা আমার কাছে তাড়াহুড়া কোরো না। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭।</p>
<p>অর্থাৎ মানুষ স্বভাবগতভাবে তাড়াহুড়া করে। কিন্তু আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন— নিজের নফসের তাড়নায় চলবে না; বরং ধৈর্য ধরবে, আনুগত্য করবে এবং আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করবে।</p>
<p>অন্য জায়গায় বলেছেন, أَتَى أَمْرُ اللهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوهُ &#8211; আল্লাহর হুকুম এসে গেছে; তাই তা নিয়ে তাড়াহুড়া কোরো না। সুরা নাহল, আয়াত: ১।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা এখানে নফসের স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। নফস তাড়াহুড়াপ্রবণ, তাই আল্লাহ তাকে তাড়াহুড়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।</p>
<p>কিন্তু এরপর আল্লাহ নফসকে তার তাড়াহুড়ার স্বভাব থেকে একেবারে বঞ্চিত করেননি। বরং নফস যখন নিজের ইচ্ছা থেকে বের হয়ে আল্লাহর হুকুমের সামনে শান্ত হয়, এবং তাড়াহুড়ার পর্দা তার সামনে থেকে সরে যায়, তখন তার তাড়াহুড়াও জায়েজ ও উপকারী কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।</p>
<p>এর কারণ হলো, নফস যদি নিজের প্রবৃত্তির চাপে তাড়াহুড়া করে, তাহলে তা ভুলের কারণ হয়। কিন্তু যদি সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ইহসানের আশায় দ্রুত এগিয়ে যায়, আর মহান চরিত্র অর্জনের জন্য তৎপর হয়, তাহলে এই তাড়াহুড়া ভালো। তখন তা আজমায়িশ ও পরীক্ষার কারণ হয় না।</p>
<p>কারণ পরীক্ষার আসল কারণ হলো নফসের স্বভাবের বিরোধিতা করা। নফসের গুণাবলির মধ্যেও পার্থক্য আছে। যখন কোনো গুণের মধ্যে স্বাভাবিক সীমা ও ভারসাম্য থাকে, তখন তা কল্যাণের কারণ হয়। কিন্তু সেই গুণই যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা অস্থিরতা ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।</p>
<p>যেমন চোখ দেখার কারণ, জিহ্বা কথা বলার কারণ, কান শোনার কারণ। এগুলো সবই আল্লাহর নেয়ামত। কিন্তু এগুলো যদি ভুল পথে ব্যবহৃত হয়, তখন নফসের চাহিদা জেগে ওঠে। সেই চাহিদা থেকে গুনাহের কারণ তৈরি হয়। আর গুনাহ হলো এমন আগুন, যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াতে শাস্তি পায়, অথবা আল্লাহ চাইলে দুনিয়ার সেই আগুন বন্ধ করে তাকে তাওফিক দেন; আর আখিরাতে ক্ষমা করে দেন।</p>
<p><strong>আরিফের গুনাহ থেকে ঘৃণা এবং ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা</strong><strong>:</strong></p>
<p>কখনো কোনো আরিফ বান্দার সামনে দুনিয়ার আগুনের চেয়েও ভয়ংকর এক আগুন প্রকাশ পায়। যেমন কাউকে বলা হয়, “তুমি আগুনে প্রবেশ করো।” এ কথা তার জন্য সহজ হতে পারে। কিন্তু যদি তাকে বলা হয়, “তোমার ব্যক্তিত্বে নফসের কোনো গুণ প্রকাশ করো” তখন তা তার কাছে আগুনে প্রবেশ করার চেয়েও কঠিন মনে হয়।</p>
<p>সেই আরিফের এই ঘৃণার কারণ বুঝিয়ে বলা হয়েছে; কারণ তার ব্যক্তিত্বে মহান আল্লাহর বিরোধিতা ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায়। অথচ জাহান্নামের আগুনে আল্লাহর কুদরত ও প্রতিশোধের প্রকাশ দেখা যায়। আরিফ যেন বলছে, “হে আমার রব, আপনার নাফরমানি আমার কাছে আগুনে জ্বলবার চেয়েও কঠিন।”</p>
<p>একজন আহলে ইয়াকিন ব্যক্তির একটি কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলতেন, “আমার কাছে নামাজ আদায় করা জান্নাতে প্রবেশ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।” যখন জিজ্ঞেস করা হলো, এর কারণ কী, তখন তিনি উত্তর দিলেন, “কারণ নামাজ ও ইবাদতে থাকে আমার রবের সন্তুষ্টি। আর জান্নাতে যাওয়ার মধ্যে থাকে আমার নিজের ইচ্ছা ও আনন্দ। আমার কাছে নিজের আনন্দের চেয়ে আমার রবের সন্তুষ্টি অনেক বেশি প্রিয়।”</p>
<p>হজরত সাইয়্যিদুনা ওয়াহিব ইবনে ওয়ারদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তাঁকে বলা হলো, “আপনি কি জানেন, যখন আপনি কোনো কাজের আসল উদ্দেশ্য জেনে ফেলেন, তখন জানেন সেটি কোথা থেকে আসে?”</p>
<p>তিনি বললেন, “আপনি কি আপনার মাকে দেখেননি? তিনি কি আপনাকে বলেননি যে, যদি আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তাহলে আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দেবেন?”</p>
<p>তিনি বললেন, “তাহলে আপনি কী বলেছিলেন?”</p>
<p>তিনি বললেন, “আমি তাঁকে বলেছিলাম, যে কাজ আমি করি না, তার কারণে আল্লাহ কেন আমাকে মাফ করবেন?”</p>
<p>তখন তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”</p>
<p>তিনি বললেন, “আমি চাই না, আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় দাঁড়াই যে, আমার মা আমার জন্য মাগফিরাত চাইছেন, অথচ আমি নিজে সেই মাগফিরাতের উপযুক্ত কাজ করছি না।”</p>
<p><strong>নফসের আসল গুণ</strong><strong>: </strong></p>
<p>নফসের সব দোষ মূলত দুই জিনিস থেকে জন্ম নেয়: <strong>রাগ</strong> ও <strong>লোভ</strong>। কঠোরতা ও ঝগড়াটে স্বভাব রাগ থেকে আসে। আর লোভ জন্ম নেয় লালসা থেকে। এই দুই প্রবণতা মানুষের নফসের মধ্যেই থাকে।</p>
<p>মানুষ রেগে গেলে তার ভেতরে এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়। মনে হয় বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা ওপরে উঠছে। শরীর হালকা লাগে, মেজাজ গরম হয়ে যায়, কথা কঠোর হয়, আচরণেও তেজ দেখা দেয়।</p>
<p>লোভের অবস্থা এর বিপরীত। মানুষ যখন কোনো জিনিস পেতে চায়, তখন তার মন সেই জিনিসের দিকে ঝুঁকে যায়। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি তখন তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে নিজের শক্তি ও চেষ্টা সেই জিনিস পাওয়ার পেছনে ব্যয় করতে চায়।</p>
<p>যদি সেই জিনিস পাওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে, তাহলে মানুষ সরাসরি তা পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যদি মাঝখানে কোনো বাধা আসে, তখন সেই বাধা সরানোর জন্য তার ভেতরে রাগ জন্ম নেয়।</p>
<p>তাই ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, লোভ জন্ম নেয় কোনোকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। আর রাগ জন্ম নেয় সেই আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা এলে। অর্থাৎ মানুষ কোনোকিছু পেতে চাইলে লোভ কাজ করে। আর সেই চাওয়ার পথে বাধা এলে রাগ প্রকাশ পায়।</p>
<p>নফসকে শুদ্ধ করতে হলে তাই আগে এই দুই দিক বুঝতে হবে। কোন জিনিসের প্রতি লোভ জাগছে, আর কোন বাধার কারণে রাগ উঠছে।</p>
<p><strong>মাকামে ফিকর:</strong></p>
<p>দুনিয়ার মোহ পাপের কারণ। আর আল্লাহর আনুগত্য আখিরাত গড়ার কারণ। তাই বলা হয়েছে, দুনিয়াকে ভালোবাসা সব গুনাহের মূল, আর আল্লাহভীতি ও দুনিয়াবিমুখতা সব নেক কাজের মূল।<a href="#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<p>একটু ভাবুন। হজরত আদম আলাইহিস সালাম একটি পরীক্ষার কারণে জান্নাত থেকে বের হয়ে দুনিয়ায় এসেছিলেন। আর আমরা এত গুনাহ করার পরও জান্নাতে যেতে চাই! অথচ গুনাহের ভারে আমাদের অবস্থা এমন যে, জান্নাতের দিকে তাকানোর শক্তিও যেন থাকে না।</p>
<p>এক বর্ণনায় আছে, সব নবীর নেতা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইমান পোশাকহীন। তার পোশাক তাকওয়া, তার সৌন্দর্য লজ্জা, আর তার ফল ইলম।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<p>এ কারণেই বলা হয়েছে, জান্নাত পবিত্র জায়গা। সেখানে পবিত্র মানুষ ছাড়া কেউ থাকবে না। তাই যখন তোমরা পাপ থেকে পবিত্র হবে, তখনই জান্নাতে প্রবেশ করবে।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ يَقُولُونَ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ &#8211; পবিত্র অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের রুহ কবজ করে, তারা তাদের বলে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। সুরা নাহল, আয়াত: ৩২।</p>
<p>আল্লাহ আরও বলেছেন, وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ &#8211; জান্নাতের প্রহরীরা তাদের বলবে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা পবিত্র হয়েছ। তাই চিরদিন থাকার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করো। সুরা যুমার, আয়াত: ৭৩।</p>
<p>কারণ আল্লাহ বলেছেন, وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ &#8211; আর আদন জান্নাতে রয়েছে পবিত্র বাসস্থান। সুরা তাওবা, আয়াত: ৭২। যেহেতু গুনাহ অপবিত্র, তাই আল্লাহ বলেছেন, وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ &#8211; তিনি তাদের জন্য অপবিত্র জিনিস হারাম করেন। সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭।</p>
<p>তোমরা যখন পাপ থেকে পবিত্র হবে, তখন জান্নাতও তোমাদের জন্য পবিত্র হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বিষয়টি এভাবে বলেছেন, الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ – অপবিত্র নারীরা অপবিত্র পুরুষদের জন্য, আর অপবিত্র পুরুষরাও অপবিত্র নারীদের জন্য। পবিত্র নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য, আর পবিত্র পুরুষরাও পবিত্র নারদের জন্য। সুরা নুর, আয়াত: ২৬।</p>
<p><strong>নফসের চিকিৎসার উদাহরণ</strong><strong>:</strong></p>
<p>কোনো কোনো আলেম বলেছেন, নফসের চিকিৎসা রোগীর চিকিৎসার মতো। যেমন কোনো রোগী অসুস্থ হলে আগে তাকে ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে রাখা হয়। এরপর তাকে ওষুধ দেওয়া হয়, যেন সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।</p>
<p>ধরুন, কেউ বেশি খাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার চিকিৎসা হলো— আগে কিছু সময় তাকে খাবার থেকে বিরত রাখা হবে। এরপর তার শরীরের উপযোগী ওষুধ দেওয়া হবে। এভাবে তার প্রয়োজন পূরণ হবে এবং সে নিরাপদে সুস্থতার দিকে ফিরবে।</p>
<p>নফসের চিকিৎসাও এমন। যখন নফস গুনাহের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন প্রথম কাজ হলো তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখা। এরপর আনুগত্য, নেক আমল ও আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে তাকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলা।</p>
<p><strong>মানুষ রেশম পোকার মতো</strong><strong>:</strong></p>
<p>হেকিমরা মানুষকে রেশম পোকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ রেশম পোকা নিজের মুখের লালা দিয়ে নিজের চারপাশে সুতা বুনতে থাকে। বুনতে বুনতে এক সময় সে নিজেই সেই সুতার ভেতর আটকে যায়। তখন আর বের হওয়ার পথ পায় না। শেষে সেই খোলসই তার মৃত্যুর কারণ হয়।</p>
<p>মানুষের অবস্থাও অনেক সময় এমন হয়। সে নিজের সম্পদ, পরিবার, সন্তান ও দুনিয়ার জিনিসপত্র নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, ধীরে ধীরে এগুলোই তাকে ঘিরে ফেলে। এক সময় সে এগুলোতে বন্দি হয়ে যায়।</p>
<p>কখনো কখনো মানুষ নিজের সম্পদ আর পরিবারের কারণে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। অথচ এই সম্পদ ও পরিবার তার জন্য পরীক্ষা। এগুলোর হিসাবও তাকে দিতে হবে।</p>
<p>তাই যার ভাগ্যে ভালো লেখা আছে, সে নিজের সম্পদ, পরিবার ও দুনিয়ার উপকরণকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করে। আর যে গাফেল হয়ে যায়, সে এগুলোর ভালোবাসায় আটকে পড়ে।</p>
<p>সে বুঝতেই পারে না— যে জিনিসগুলোকে সে নিজের নিরাপত্তা ও সুখের কারণ ভাবছে, সেগুলোই একদিন তার জন্য হিসাব, কষ্ট ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।</p>
<p>অথবা নিজের উপার্জন অন্যদের খাওয়াতে খাওয়াতে সে নিজেই গরিব হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্যদের জন্য জীবন কাটাবে, আর নিজের হিসাবের বোঝা অন্যদের মাঝে পড়ে থাকবে।</p>
<p><strong>নফসের চিকিৎসার ঘটনা</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত সাইয়্যিদুনা আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর একটি ভ্রমণের কথা লিখেছেন। তিনি বলেন—</p>
<p>আমাদের এক বুজুর্গ ভ্রমণে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে নফসের চিকিৎসা নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে। আমরা একদিন এক ছাগলের মাথা কিনলাম। তিনি সেটি হাতে নিয়ে চলছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি সেটি একটি জায়গায় রেখে দিলেন। এরপর আবার তুলে নিলেন। আবার কিছুদূর যাওয়ার পর রেখে দিলেন।</p>
<p>এভাবে তিনি বারবার সেটি হাতে নিচ্ছিলেন, আবার রেখে দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, “আপনি কেন এমন করছেন? আমরা তো সবাই মিলে এটি খাবো। আপনি একাই এভাবে কষ্ট করছেন কেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমাদের না খাওয়ালে তোমরা খাবে না।” আমি বললাম, “আমরা খাব, আপনি না দিলে অন্যভাবে খেয়ে নেব।”</p>
<p>এরপর তিনি সেটি রেখে চলে গেলেন। আমরা তা ছাড়া অন্য খাবার খেলাম।</p>
<p>এর কিছুক্ষণ পর আরেক লোক এসে বলল, “তোমরা যে ছাগলের মাথা ফেলে এসেছ, তার আসল ঘটনা কী জানো? গত রাতে এক ব্যক্তি সেটি রেখে গিয়েছিল। সে খুব গরিব ছিল, অভাবী ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে বলেছিল— এই মাথাটি আমার নফসের জন্য চাই না। আমি এটিকে কুরবত তথা আল্লাহর কাছাকাছি হওয়ার নিয়তে নিয়েছি। তাই আমি এটি তোমাদের জন্য কিনেছি।”</p>
<p>এই কথা শুনে সেই বুজুর্গ মাথাটি টুকরা টুকরা করে কুকুরদের খাওয়ালেন। তারপর কিছুদিন পর সেই বুজুর্গের সঙ্গে আবার দেখা হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি সেদিন ছাগলের মাথাটি রেখে দিয়েছিলেন কেন? ঘটনাটি কী ছিল?”</p>
<p>তিনি বললেন, “বিশ বছর ধরে আমার নফস ছাগলের মাথা খাওয়ার ইচ্ছা করছিল। কিন্তু যখন তোমরা সেটি খেতে চাইলে, তখন আমার নফসের সেই খাওয়ার বাসনা রোগে পরিণত হয়ে গেল। আমি আগেই বুঝে ফেলেছিলাম, এটা নফসের চাহিদা। তাই আমি তাকে খাবার দিলাম না। কিছু খারাপি আছে ভেবে নয়; বরং নফসের চাহিদার কারণে আমি তা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।”</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা আপনাদের প্রতি রহম করুন। এখন দেখুন, এই বুজুর্গ কীভাবে নফসের চিকিৎসায় কোমলতা ও সূক্ষ্মতা বুঝেছিলেন।</p>
<p>অর্থাৎ, তিনি দুজনকে দেখলেন দুজনের চেহারা এক, কিন্তু পোশাকে ভিন্নতা। তাঁরা নিজেদের তাকওয়া ও নফসকে ক্ষতিকর খাবার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা দেখে অবাক হলেন। অথচ ওই ছাগলের মাথার মধ্যে নফসের জন্য যে অংশ ছিল, সেটি তাকওয়ার কারণেই বাদ দেওয়া হয়েছিল।</p>
<p>তিনি বিষয়টি গভীরভাবে দেখলেন এবং বুঝলেন— এ ঘটনাটি আল্লাহ তাঁকে দেখিয়েছেন। বাকি যারা ছাগলের মাথা খেয়েছিল, তাদের বেলায় বিষয়টি ছিল আলাদা। কারণ তাদের খাওয়ার মধ্যে নফসকে দমন করার উদ্দেশ্য ছিল এবং সেই সঙ্গে দুনিয়া থেকে শেষবারের মতো কিছু নেওয়ার ভাবও ছিল।</p>
<p><strong>নফসের স্বভাবগত ও অর্জিত চার</strong><strong>টি গুণ:</strong></p>
<p>নফসের স্বভাবগত ও অর্জিত গুণ চারটি।</p>
<p>নফসের কামনা-বাসনার মূল কারণ, এবং নফসের যে-সব বিষয় আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো এই চার গুণ থেকেই জন্ম নেয়—</p>
<p>১. <strong>দুর্বলতা</strong><br />
২. <strong>কৃপণতা</strong><br />
৩. <strong>লালসা</strong><br />
৪. <strong>অজ্ঞতা</strong></p>
<p>দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয় <strong>ভীরুতা</strong>। কৃপণতা থেকে জন্ম নেয় <strong>কষ্টকর সংকীর্ণতা</strong>। লালসা থেকে জন্ম নেয় <strong>কঠিন চাহিদা ও আসক্তি</strong>। আর অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় <strong>বুদ্ধির দুর্বলতা ও মূর্খতা</strong>।</p>
<p><strong>পরীক্ষায় ফেলে দেওয়া চার</strong><strong>টি গুণ:</strong></p>
<p>নফসের এই চার গুণের কারণেই মানুষ পরীক্ষা ও বিপদে পড়ে।</p>
<p>১. প্রথম গুণ হলো <strong>রুবুবিয়্যাতের দাবি</strong>। অর্থাৎ মানুষ নিজের ভেতরে বড়ত্ব, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভাব পোষণ করে।</p>
<p>২. দ্বিতীয় গুণ হলো <strong>শয়তানি চরিত্রের প্রভাব</strong>। এখান থেকে ধোঁকা, কৌশল, হিংসা ও খারাপ গুণ প্রকাশ পায়।</p>
<p>৩. তৃতীয় গুণ হলো <strong>প্রাকৃতিক প্রয়োজনের প্রতি অতিরিক্ত টান</strong>। এর কারণে মানুষ খাওয়া, পান করা, ভোগ-বিলাস ও দুনিয়ার চাহিদার পেছনে ছুটে।</p>
<p>৪. চতুর্থ গুণ হলো <strong>দুর্বল গুণগুলোর একেকটি থেকে আলাদা আলাদা চাহিদা তৈরি হওয়া</strong>। যেমন ভয় থেকে আত্মরক্ষা ও পালানোর প্রবণতা জন্ম নেয়।</p>
<p>হজরত সাইয়্যিদুনা শায়খ আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর কিতাবে বলেছেন, এ কথা বোঝা জরুরি যে, “নফস” বলতে আসলে কী বোঝানো হয়।</p>
<p>আমরা সাধারণত নফস বলতে বুঝি— মানুষের ভেতরের এমন এক শক্তি, যা নড়াচড়া করে, ইচ্ছা করে, চায়, ভয় পায়, লোভ করে এবং নিজের দিকে টানে। এটি দেহের ভেতর আছে, কিন্তু চোখে দেখা যায় না।</p>
<p>প্রশ্ন হলো— নফস কীভাবে নড়াচড়া করতে পারে? জবাব হলো মালিক আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাকে শক্তি দেন। তিনি চাইলে নফসকে স্থিরও রাখতে পারেন। আবার চাইলে নফসকে এমন শক্তি দিতে পারেন, যার মাধ্যমে সে দেহের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং মানুষের কাজ-কর্মে প্রভাব ফেলে।</p>
<p><strong>নফসানি পরীক্ষার সঙ্গে মুজাহাদার সম্পর্ক</strong><strong>:</strong></p>
<p>মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরি ইখলাসে পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে আগের চার গুণের সঙ্গে লেগে থাকা বিষয়গুলো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। যখন কোনো ভালো গুণ দৃঢ় হয়ে যায়, তখন তার মাধ্যমে মানুষ ওই চার গুণের পরীক্ষার ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়। এ কারণেই আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে একজন গুনাহগার মুমিনকে ক্ষমা করে দেওয়ার আনন্দ, অনেক সময় হাজার মানুষের সঙ্গে লেনদেনের ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার চেয়েও বেশি হয়।</p>
<p>কারণ সে এমন কাজ করে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যের দাবি পূরণ হয়। সে তখন এক বান্দাকে ক্ষমা করে, যখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করার সুযোগ দেন। এভাবে সে আল্লাহর গুণের ছায়ায় দাঁড়ায়।</p>
<p>এ কথা কীভাবে বোঝা যায়? যেভাবে কেউ আল্লাহর জন্য কাউকে অপছন্দ করতে পারে, আবার আল্লাহর জন্যই তাকে ভালোও বাসতে পারে। কারণ সে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে তাকায় না; বরং রবের দিকে তাকায়। তাই আল্লাহর জন্য যে অপছন্দ, সেটিও ইবাদত; আর আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসা, সেটিও ইবাদত।</p>
<p>যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদের সঙ্গে দয়া, ক্ষমা ও কোমল আচরণ করে, সে আসলে আল্লাহর রহমত ও রুবুবিয়্যতের গুণের ছায়ায় দাঁড়ায়। এ জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্রতা ও অপবিত্রতার প্রসঙ্গে বলেছেন, “পবিত্র থাকলে সে পবিত্র। আর অপবিত্র হলে অপবিত্র।” অর্থাৎ মানুষের বাহ্যিক অবস্থার মতো ভেতরের অবস্থারও প্রভাব আছে।<a href="#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a></p>
<p>তবে সব বান্দাই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—</p>
<p>إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا ۝ لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا</p>
<p>আসমান ও জমিনে যারা আছে, সবাই রহমানের সামনে বান্দা হয়ে উপস্থিত হবে। তিনি তাদের সবাইকে ঘিরে রেখেছেন এবং একজন একজন করে গণনা করে রেখেছেন। সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৩–৯৪।</p>
<p>নফস শয়তানের মতো আল্লাহর কুরব তথা নৈকট্যের কাছাকাছি থাকে; কিন্তু নিজের কামনা-বাসনা ও স্বার্থের কারণে আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে। তাই আল্লাহর বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন—</p>
<p>وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا</p>
<p>আর রহমানের বান্দারা জমিনে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে। সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩।</p>
<p>কোরআন করিমে বান্দাদের “রহমানের বান্দা” বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের নফস রবের দিকে ফিরে আসে, শান্ত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে রাজি থাকে। এরা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞান ও হিকমতের অধিকারী। আল্লাহ তাঁর ইলম তাঁদের থেকে গোপন রাখেননি; বরং তাঁদের জন্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।</p>
<p><strong>আবদালে উন্নীত হওয়া:</strong></p>
<p>মানুষ তখনই আবদালের মরতবায় পৌঁছতে পারে, যখন তার মধ্যে কিছু বিশেষ গুণ একসঙ্গে জমা হয়। সেগুলো হলো— রুবুবিয়্যতের গুণাবলি, উত্তম চরিত্র, শয়তানি স্বভাবের বিপরীত গুণ, সুষম মেজাজ এবং জোড়া জোড়া সৃষ্টির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। এসব জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং আবদালদের একজন হয়ে ওঠে।</p>
<p><strong>নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদার পদ্ধতি</strong><strong>:</strong></p>
<p>হজরত সাইয়্যিদুনা শায়খ আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নফসের চিকিৎসার একটি পদ্ধতি হলো: বান্দা নিজের নফসের জন্য একজন মালিকের মতো হবে। যখন নফস তাকে নিজের জন্য কিছু বানাতে বা পেতে বলে, তখন সে নফসকে বুঝিয়ে বলবে এবং সরাসরি তার দাবি মেনে নেবে না।</p>
<p>যদি তুমি নফসের জন্য কিছু করতে চাও, তাড়াহুড়া করবে না। আগে ভালোভাবে চিন্তা করবে। সহজ সুযোগ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে নফসের চাহিদা পূরণ করবে না।</p>
<p>যেমন তুমি যদি কোনো জিনিস পেতে চাও এবং সহজেই তা পাওয়ার সুযোগ থাকে, তবু সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। যদি তা তোমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তুমি তা পাবে। আর যদি তা তোমার জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে নিরাপদ থাকবে।</p>
<p>নফসকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর জন্য তাকে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তুমি যদি নফসকে তার চাহিদা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারো, তাহলে আগে সেই চাহিদার কারণগুলো বন্ধ করো। নফসের পেছনে চলার উপকরণগুলো কমিয়ে দাও।</p>
<p>সবচেয়ে আগে দরকার সাহস ও দৃঢ়তা। নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু ইচ্ছা করলেই হবে না; শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।</p>
<p>যে চিন্তা অন্তরে আসে, সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে দৌড়াবে না। আগে থামবে, ভাববে, বিচার করবে। যদি বুঝতে পারো, চিন্তাটি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিয়ে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে তা কাজে পরিণত করবে।</p>
<p>আর যদি মনে হয়, এই চিন্তা তোমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে দূরে নিয়ে যাবে, তাহলে সেটিকে মনে জায়গা দেবে না। বরং সেই চিন্তাকে অন্য চিন্তায় বদলে দেবে, যেন তা তোমার ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে।<a href="#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">পাঁচজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে নফস সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। নফস এমন এক সত্তা, যাকে না চিনলে আল্লাহকেও চেনা যায় না, আবার যাকে অনুসরণ করলে ধ্বংস অনিবার্য। কুশাইরি দেখিয়েছেন নফস আধ্যাত্মিক যাত্রার বাধা। ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন নফস বরজখের জগতের এক রহস্যময় সত্তা। দাতা গঞ্জে বখশ সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে নফসের চিকিৎসা, পরিচয় ও ইনসানে কামেলের সাথে তার সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। আর আবু তালেব মক্কি দেওয়া জীবন্ত উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, নফসের চাহিদাকে চেনাই মুজাহাদার প্রথম ধাপ। সবশেষে বলা যায়, নফস সুফি সাধনার সেই কেন্দ্রবিন্দু, যাকে না জেনে পথ চলা অন্ধকারে চলার মতো, আর যাকে জেনে মুজাহাদা করা মানে আল্লাহর দিকেযথাযতভাবে যাত্রা শুরু করা।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/nafs/">নফস</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/nafs/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>শরিয়ত ও হাকিকত</title>
		<link>https://sufigraphy.com/shariyat-and-haqiqat/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/shariyat-and-haqiqat/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 29 Jun 2026 10:51:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3893</guid>

					<description><![CDATA[<p>সুফি সাধনার পথে শরিয়ত ও হাকিকত দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরিয়ত হলো উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলা, আল্লাহর আদেশ পালন করা। আর হাকিকত হলো রুবুবিয়্যাত প্রত্যক্ষ করা তথা আল্লাহর পরিচালনা ও কর্তৃত্ব সরাসরি অনুভব করা। এই দুটি একে অপরের শত্রু নয়, বরং দেহ ও রুহের মতো অবিচ্ছেদ্য। যে হাকিকত শরিয়তের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, তা ফলদায়ক [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/shariyat-and-haqiqat/">শরিয়ত ও হাকিকত</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সুফি সাধনার পথে শরিয়ত ও হাকিকত দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরিয়ত হলো উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলা, আল্লাহর আদেশ পালন করা। আর হাকিকত হলো রুবুবিয়্যাত প্রত্যক্ষ করা তথা আল্লাহর পরিচালনা ও কর্তৃত্ব সরাসরি অনুভব করা।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">এই দুটি একে অপরের শত্রু নয়, বরং দেহ ও রুহের মতো অবিচ্ছেদ্য। যে হাকিকত শরিয়তের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, তা ফলদায়ক নয়; আর যে শরিয়ত হাকিকতের সমর্থন পায় না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম জুনাইদের ভাষায়, যে ব্যক্তি বলে আমলের দায়িত্ব ঝরে পড়ে, তার অবস্থা চোর ও জিনাকারীর চেয়েও নিকৃষ্ট।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">বায়েজিদ বোস্তামির সেই ঘটনা— যেখানে তিনি কিবলার দিকে থুথু ফেলা এক ভণ্ড সাধকের কাছ থেকে ফিরে এলেন; এটি দেখায়, শরিয়তের আদব ছাড়া কোনো হাকিকতের দাবিই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ উক্তি— “যে তাসাউফ নিল কিন্তু ফিকহ নিল না, সে যিন্দিক হলো; যে ফিকহ নিল কিন্তু তাসাউফ নিল না, সে ফাসেক হলো”— এই দুটির সমন্বয়ের গুরুত্বই স্পষ্ট করে।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি (রহ.) বলেছেন, শরিয়ত হলো তাঁর ইবাদত করা, আর হাকিকত হলো তাঁকে প্রত্যক্ষ করা। “ইয়্যাকা না&#8217;বুদু” শরিয়তের ঘোষণা, আর “ইয়্যাকা নাস্তাঈন” হাকিকতের ঘোষণা। এই দুটি একই আয়াতে মিলিত। তিনি স্পষ্ট করেছেন, শরিয়তও এক দিক থেকে হাকিকত, কারণ তা আল্লাহর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে। আর হাকিকতও এক দিক থেকে শরিয়ত, কারণ মারিফত অর্জনও আদেশেই অপরিহার্য। এই দুই পরিভাষা মূলত একই সত্যের দুই প্রকাশ।</p>
<p>তিনি বলেন, শরিয়ত হলো উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলার নির্দেশ। আর হাকিকত হলো রুবুবিয়্যাত তথা রবের প্রতিপালন ও কর্তৃত্ব প্রত্যক্ষ করা।</p>
<p>যে শরিয়ত হাকিকতের সমর্থন পায় না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আর যে হাকিকত শরিয়তের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, তা অর্জিতও নয়, ফলদায়কও নয়।</p>
<p>শরিয়ত এসেছে সৃষ্টিকে দায়িত্বের অধীন করার জন্য। আর হাকিকত হলো আল্লাহর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করা। অর্থাৎ, হাকিকত হলো বান্দা আগে তা প্রত্যক্ষ করবে, তারপর সে বিষয়ে সংবাদ দেবে।<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<p>শরিয়ত হলো, তুমি তাঁর ইবাদত করবে; হাকিকত হলো, তুমি তাঁকে প্রত্যক্ষ করবে।</p>
<p>শরিয়ত হলো, তিনি যা আদেশ করেছেন, তা পালন করা; হাকিকত হলো, তিনি যা ফয়সালা করেছেন, যা নির্ধারণ করেছেন, যা গোপন রেখেছেন এবং যা প্রকাশ করেছেন, সবকিছুর মধ্যে তাঁর বিধান প্রত্যক্ষ করা।</p>
<p>আমি উস্তাদ আবু আলী দাক্কাককে বলতে শুনেছি, إِيَّاكَ نَعْبُدُ – “আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি” এটি শরিয়ত রক্ষা করার ঘোষণা।  وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ &#8211; “আর কেবল আপনার কাছেই সাহায্য চাই” এটি হাকিকত স্বীকার করার ঘোষণা।</p>
<p>জেনে রাখো, শরিয়তও এক দিক থেকে হাকিকত। কারণ শরিয়ত তাঁর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে। আবার হাকিকতও এক দিক থেকে শরিয়ত। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার মারিফতসমূহ অর্জন করাও তাঁর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে।</p>
<p>হৃদয়ে তাওহিদের হাকিকত শরিয়তেরই ফল। আর এই হাকিকত অর্জন ও বাস্তবায়নের নির্দেশও আমাদের দেওয়া হয়েছে। তাই এই দিক থেকে এটিও শরিয়ত।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2>দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>দাতা গঞ্জে বখশ (রহ.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন তাদের বিরুদ্ধে, যারা হাকিকত পেলে শরিয়ত উঠে যায় বলে দাবি করে। তিনি এটিকে স্পষ্ট কুফর বলেছেন। শরিয়ত ও হাকিকতের সম্পর্ক তিনি দেহ ও রুহের সাথে তুলনা করেছেন। রুহ চলে গেলে দেহ পড়ে যায়, ঠিক তেমনি একটি ছাড়া অন্যটি টিকতে পারে না। তিনি হাকিকতের ইলমকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। জাত, সিফাত ও আফআলের ইলম, এবং শরিয়তের তিন রুকন। কিতাব, সুন্নত ও ইজমা।</p>
<p>তিনি বলেন, মাশায়িখে তরিকতের দুটি পরিভাষা শরিয়ত ও হাকিকত। এর একটি জাহিরি হালকে সহিহ করে, অপরটি বাতেনি হালকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ দুটির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেক মানুষ ভুল করেছে।</p>
<p>একদল আলেমে জাহের আছেন, তাঁরা মনে করেন, এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ মারিফত, খেদমত ও হাকিকতের জন্য শরিয়ত আবশ্যক। প্রত্যেকটি অন্যটির অপরিহার্য সঙ্গী। এদের মধ্যে যেন শরীর ও রুহের সম্পর্ক। একটি অন্যটি ছাড়া চলতে পারে না।</p>
<p>আর একদল বলে, যখন হাকিকতের হাল লাভ হয়, তখন শরিয়ত উঠে যায়। এটি নজিরিয়া, কারামিতা, সুয়াদিয়া ও মুমানিয়ার অবস্থা। তারা শরিয়ত ও হাকিকতকে আলাদা করে ফেলে। তারা মারিফতের দাবি করে, কিন্তু ফরজ আমল আদায় করে না। তাদের কাছে শুধু স্বীকারোক্তির ইঙ্গিতই মুমিন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।</p>
<p>তাদের বক্তব্য হলো, “যে জিনিসের সঙ্গে জিহ্বা দ্বারা স্বীকার করার কথা, হাকিকত হলো তার অর্থের প্রভাব। যার শরিয়ত প্রয়োজন নেই।”</p>
<p>হজরত আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত সকল আলেম এ কথার হুকুম করেছেন যে, এটি কুফর। সুফি পরিভাষায় মারিফত হলো ইখলাস, নিয়ত ও দৃঢ়তার ব্যাপার।</p>
<p>শরিয়ত তার জন্য এমন একটি দেহের মতো, যার মাধ্যমে বিধান, আওরাদ ও অন্যান্য বিষয় সংরক্ষিত থাকে। শরিয়ত হলো বান্দার কাজের অংশ। আর হাকিকত হলো আল্লাহ তায়ালার হিফাজত ও তাঁর সুরক্ষার অংশ। তাই জানা গেল, হাকিকত ছাড়া শরিয়ত কায়েম থাকতে পারে না। আর শরিয়তের হিফাজত ছাড়া হাকিকতও অর্জিত হতে পারে না।</p>
<p>এর উদাহরণ হলো এমন ব্যক্তি, যে নিজের জোরে দাঁড়িয়ে আছে। যতক্ষণ তার ভেতরে রুহ বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকে। আর যখন তার রুহ তাকে ছেড়ে দেয়, তখন সে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায়। এভাবেই শরিয়ত হাকিকত ছাড়া এবং হাকিকত শরিয়ত ছাড়া টিকে থাকতে পারে না।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا &#8211; যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯।</p>
<p>অতএব যারা আমাদের পথে চেষ্টা করেছে, আমরা নিশ্চয়ই তাদের আমাদের পথ দেখিয়েছি। এখানে শরিয়ত ও রিয়াজতের প্রমাণ হলো তাদের এই হাকিকত। বান্দার হাকিকত হলো আমাদের বিধানগুলোর হিফাজত করা, আর রসুলের হকের হিফাজত করা, যা বান্দার বাহ্যিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আমাদের শরিয়তকে হাকিকতের দ্বারা দৃঢ় করা হয়েছে এবং হাকিকতকে শরিয়তের মাধ্যমে অলংকৃত করা হয়েছে।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h3>হাকিকতের ইলমের রুকনসমূহ:</h3>
<p>হাকিকতের ইলম, অর্থাৎ বাতিনকে তিনভাবে ভাগ করা যায়।</p>
<p>১. আল্লাহ তায়ালার জাত, তাঁর ওয়াহদানিয়্যাত তথা একত্ব এবং তিনি যে অসীম, তা প্রত্যক্ষভাবে জানার ইলম।</p>
<p>২. আল্লাহ তায়ালার সিফাত এবং তাঁর আহকাম জানার ইলম।</p>
<p>৩. আল্লাহ তায়ালার আফআল, অর্থাৎ তাকদিরে ইলাহি এবং তার হিকমত জানার ইলম।</p>
<h3>ইলমে শরিয়তের রুকনসমূহ:</h3>
<p>ইলমে শরিয়ত, অর্থাৎ জাহিরি বিধানেরও তিনটি মূলনীতি রয়েছে।</p>
<p>১. কিতাব, অর্থাৎ কুরআন করিম।</p>
<p>২. রসুলের অনুসরণ, অর্থাৎ সুন্নত।</p>
<p>৩. উম্মতের ইজমা।</p>
<h3><strong>দলিল ও প্রমাণ:</strong></h3>
<p>আল্লাহ তায়ালার জাত, সিফাত এবং তাঁর আফআল প্রমাণের বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার বাণীই দলিল ও প্রমাণ। তিনি বলেছেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ &#8211; জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৯।</p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلَاكُمْ &#8211; জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহই তোমাদের মাওলা ও কার্যনির্বাহক। সুরা আনফাল, আয়াত: ৪০।</p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, أَلَمْ تَرَ إِلَىٰ رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّ &#8211; তুমি কি তোমার রবের কুদরতের দিকে তাকাওনি, তিনি কীভাবে ছায়াকে বিস্তৃত করেছেন? সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৫।</p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ &#8211; তারা কি উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?” সুরা গাশিয়াহ, আয়াত: ১৭।</p>
<p>এ ধরনের অগণিত আয়াত আছে, যেগুলোতে আল্লাহ তায়ালার আফআল তথা কার্যাবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মাধ্যমে তাঁর সিফাতের ইলমি মারিফত অর্জিত হয়।</p>
<p>হুজুর আকরাম ﷺ বলেছেন, مَنْ عَلِمَ أَنَّ اللهَ رَبُّهُ، وَأَنِّي نَبِيُّهُ، حَتَّمَ اللهُ تَعَالَى لِرَحْمَتِهِ، وَذِمَّتِهِ، عَلَى النَّارِ &#8211; যে ব্যক্তি জেনে নিল যে, আল্লাহ তার রব এবং আমি তাঁর নবী, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমত ও দায়িত্বের কারণে তার জন্য আগুন হারাম করে দেন।</p>
<h3><strong>আল্লাহ তায়ালার জাতের ইলমের শর্তসমূহ</strong><strong>:</strong></h3>
<p>আল্লাহ তায়ালার জাতের ইলমের শর্ত হলো, প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ও বালেগ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তায়ালা বিদ্যমান, তিনি তাঁর জাতের মধ্যে এক ও অনন্য। তিনি প্রয়োজনমুক্ত। তাঁর কোনো স্থান বা দিক নেই। তাঁর জাতের কোনো সীমা নেই, কোনো পরিমাণ নেই। কোনোকিছুর সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি কারও সন্তান নন এবং কেউ তাঁর সন্তান নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টির অন্তরে যে রূপ বা আকৃতি উদয় হয়, তা থেকে পবিত্র। সবকিছুর স্রষ্টা তিনিই। তিনি বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ &#8211; কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।</p>
<h3><strong>আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ইলমের শর্তসমূহ</strong><strong>:</strong></h3>
<p>আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ইলমের শর্ত হলো, প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ও বালেগ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তায়ালার সব সিফাত তাঁর জাতের সঙ্গেই প্রতিষ্ঠিত। এর অর্থ হলো, নিশ্চিতভাবে তাঁর সিফাত তাঁর জাতের সঙ্গে বিদ্যমান। তাঁর সিফাত তাঁর জাত থেকে পৃথক নয়, আবার সেই সিফাতগুলো তাঁর জাতের সঙ্গেই প্রতিষ্ঠিত, যেমন ইলম, কুদরত, ইরাদা, সমিউন, কালাম, বাক্বা এবং অন্যান্য সিফাত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ &#8211; নিশ্চয় তিনি অন্তরসমূহের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। সুরা আনফাল, আয়াত: ৪৩।</p>
<p>وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ &#8211; আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” সুরা ইমরান, আয়াত: ২৯।</p>
<p>وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ &#8211; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।</p>
<p>فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ &#8211; তিনি যা ইচ্ছা, তাই করেন। সুরা বুরুজ, আয়াত: ১৬।</p>
<p>هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ &#8211; তিনিই চিরঞ্জীব। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। সুরা মুমিন, আয়াত: ৬৫।</p>
<p>قَوْلُهُ الْحَقُّ وَلَهُ الْمُلْكُ &#8211; তাঁর বাণী সত্য, আর রাজত্ব তাঁরই। সুরা আনআম, আয়াত: ৭৩।</p>
<h3><strong>আল্লাহ তায়ালার আফআলের ইলম</strong><strong>:</strong></h3>
<p>আল্লাহ তায়ালার আফআল সম্পর্কে ইলমের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে যে, প্রত্যেক মুকাল্লাফ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে, সব মাখলুক এবং যা কিছু কায়িনাতে আছে, সবই আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তিনিই তার স্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ &#8211; আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা করো, তাও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। সুরা সাফফাত, আয়াত: ৯৬।</p>
<p>এ জাহান, তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকা, তার সব গতিবিধি, তার ভেতরে যা কিছু রয়েছে, সবই আল্লাহ তায়ালার তাকদির ও ইরাদার অধীন। সবকিছুর স্রষ্টা ও অস্তিত্বদাতা তিনিই। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ &#8211; আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। সুরা যুমার, আয়াত: ৬২।</p>
<h3><strong>শরিয়তের বিধানের প্রমাণ</strong><strong>:</strong></h3>
<p>শরিয়তের বিধান প্রমাণের দলিল হলো, এ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি মুজিজা ও অলৌকিক নিদর্শনের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনেক রসুল প্রেরিত হয়েছেন। আর আমাদের রসুল হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সত্য রসুল। আপনি যে মুজিজা ও গায়বি সংবাদ বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সবই সত্য।</p>
<p>শরিয়তে ইসলামিয়ার পুরো কালাম স্পষ্ট ও সুদৃঢ়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ &#8211; এর মধ্যে কিছু আয়াত আছে সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ়। এগুলোই কিতাবের মূল। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭।</p>
<p>আর রসুলুল্লাহ ﷺ-এর রুকন অনুসরণ করাও সুন্নত। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا &#8211; রসুল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো। আর যে বিষয় থেকে তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। সুরা হাশর, আয়াত: ৭।</p>
<p>আর তৃতীয় রুকন হলো ইজমায়ে উম্মত। এ বিষয়ে হুজুর আকরাম ﷺ-এর বাণী হলো, لَا تَجْتَمِعُ أُمَّتِي عَلَى الضَّلَالَةِ فَعَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ &#8211; আমার উম্মত কখনো গোমরাহির ওপর একত্র হবে না। সুতরাং তোমরা বৃহত্তর জামাতের সঙ্গে থাকো। ইবনে মাজাহ।</p>
<p>এই পদ্ধতিতে হাকিকতের বিধানও প্রমাণিত। এখন যদি সবাই মিলে কোনোকিছুকে কল্যাণকর বলতে চায়, তাহলে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার বিরোধিতা ও অস্বীকারের কোনো অবকাশ নেই।<a href="#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইবনে আরাবি গভীরভাবে দেখিয়েছেন, শরিয়ত নিজেই হাকিকতের অংশ, কারণ পুরো শরিয়তই হক। তিনি অপবাদের শাস্তির বিধান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, দুনিয়ার বিচার আর আখিরাতের প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন হতে পারে, তবু দুটোই হকের অংশ। হাকিকত মানে তোমাকে তোমার থেকে সরিয়ে নেওয়া; বোঝা যে আসল কর্মকারী তোমার ভেতরেই আছেন। তিনি সিদ্ধান্তে বলেছেন, শরিয়তের ঝরনাই হাকিকতের ঝরনা; দুটি কখনো বিচ্ছিন্ন নয়।</p>
<h3>শরিয়তের পরিচয়:</h3>
<p>শরিয়ত হলো কাজের সম্পর্ক নিজের দিকে রেখে উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলা।</p>
<p>إن للشريعة حدًّا ما له عوج عليه أهل مقامات العلى درجوا<br />
শরিয়তের একটি সোজা সীমারেখা আছে, তাতে কোনো বক্রতা নেই; উচ্চ মাকামের অধিকারীরা সেই পথ ধরেই ধাপে ধাপে এগিয়েছেন।</p>
<p>علوا معارج من عقل ومن همم لحضرة دخلوا فيها وما خرجوا<br />
তারা আকল ও উচ্চ হিম্মতের সিঁড়ি বেয়ে এমন এক গন্তব্যে পৌঁছেছেন, যেখানে প্রবেশ করে আর ফিরে আসেননি।</p>
<p>حازوا بأمر عظيم القدر منه وما عليهم في الذي جاؤوا به حرج<br />
তারা মহান মর্যাদার এক আদেশের মাধ্যমে তা লাভ করেছেন; আর তারা যা নিয়ে এসেছেন, তাতে তাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা নেই।</p>
<p>শরিয়ত হলো সেই প্রকাশ্য সুন্নত, যা রসুলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন। আর সুন্নত হলো সেই পথ, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا &#8211; আর তারা বৈরাগ্যবাদ উদ্ভাবন করেছিল। সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৭।</p>
<p>রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من سن سنة حسنة &#8211; যে ব্যক্তি কোনো উত্তম রীতি চালু করে&#8230; অর্থাৎ, আমাদের জন্য উত্তম কোনো রীতি চালু করার পথ রাখা হয়েছে। যে ব্যক্তি তা চালু করে এবং যারা সে অনুযায়ী আমল করে, উভয়ের জন্যই সওয়াব নির্ধারিত হয়েছে।</p>
<p>তিনি আরও জানিয়েছেন, কোনো বান্দা যদি নিজের বিবেচনায় আল্লাহর ইবাদত করে, অথচ সে বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো শ্রুত দলিল না থাকে, আর সে কোনো ইমামকেও অনুসরণ না করে একা থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে একাই উঠানো হবে। তবে আল্লাহ তাকে কল্যাণের অধিকারী করবেন এবং নেককারদের সঙ্গে যুক্ত করবেন। যেমন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِلَّهِ &#8211; নিশ্চয় ইবরাহিম ছিলেন এক উম্মত, আল্লাহর অনুগত। সুরা নাহল, আয়াত: ১২০। এটি ছিল তাঁর প্রতি ওহি আসার আগের অবস্থা।</p>
<p>নবী আলাইহিস সালাম বলেছেন, بعثت لأتمم مكارم الأخلاق &#8211; আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য। তাই যে ব্যক্তি মাকারিমুল আখলাক তথা উত্তম চরিত্রের ওপর থাকে, সে আসলে তার রবের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শরিয়তের ওপরই থাকে; যদিও সে নিজে তা জানে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অবস্থাকেই কল্যাণ বলেছেন।</p>
<p>হাকিম ইবন হিজামের হাদিসে এসেছে, তিনি জাহিলি যুগেও ভালো কাজ করতেন; দাসমুক্তি, সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং সম্মানজনক নানা কাজ। তিনি এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, أسلمت على ما أسلفت من خير &#8211; তুমি আগের করা কল্যাণের ওপরই ইসলাম গ্রহণ করেছ। অর্থাৎ আল্লাহ সেই কাজগুলোকে কল্যাণ বলেছেন এবং তাকে তার প্রতিদান দিয়েছেন।</p>
<p>সুতরাং যে ব্যক্তি শরিয়তকে এভাবে বোঝে না, সে শরিয়তকে ঠিকভাবে বোঝেনি। মাকারিমুল আখলাক তথা উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাও এভাবেই বুঝতে হবে। এর পরিচয় হলো হীন চরিত্র থেকে মুক্ত থাকা। হীন চরিত্র অবশ্য আপেক্ষিক বিষয়; আর উত্তম চরিত্র সত্তাগত বিষয়।</p>
<p>হীন চরিত্রের কোনো ইলাহি ভিত্তি নেই। তা মূলত নফসের প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। আর উত্তম চরিত্রের ইলাহি ভিত্তি আছে; সেটিই ইলাহি আখলাক। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কোন চরিত্র কোথায় প্রয়োগ করতে হবে। ফলে উত্তম চরিত্রের সঠিক ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে এবং হীন চরিত্রের পোশাক খুলে দেওয়া হয়েছে। এ দৃষ্টিতে জগতে যা কিছু আছে, সবই শরিয়তের পরিসরের ভেতরে।</p>
<p>এরপর জেনে রাখো, শরিয়ত মানুষের প্রয়োজন ও অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এসেছে। আল্লাহ উম্মতের জন্য যে বিধান দিয়েছেন, তা তাদের বোঝার ভাষা ও বাস্তব অবস্থার উপযোগী করেই দিয়েছেন। এর কিছু বিধান এসেছে উম্মতের কোনো প্রশ্ন ছাড়াই। আবার কিছু বিধান এসেছে তাদের প্রশ্নের পর। এ কারণেই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, اتركوني ما تركتكم &#8211; আমি যতক্ষণ তোমাদের ছেড়ে রাখি, তোমরাও আমাকে ছেড়ে রাখো। কারণ শরিয়তের অনেক বিধান উম্মতের প্রশ্নের কারণে নাজিল হয়েছে। তারা প্রশ্ন না করলে সে-সব বিধান নাজিল হতো না।</p>
<p>দুনিয়া ও আখিরাতের বিধান নাজিল হওয়া এবং বিধান স্থির হওয়ার কারণগুলো আলেমদের কাছে জানা আছে। যেমন বলা হয়, “বৃষ্টির কারণ হলো বাতাস।” এর অর্থ এই নয় যে, বাতাস নিজে বৃষ্টি সৃষ্টি করেছে; বরং বাতাসের পর বৃষ্টি এসেছে।</p>
<p>শরিয়ত হাকিকতেরই অংশ; বরং শরিয়ত নিজেও হাকিকত। তবে তাকে শরিয়ত বলা হয়। কারণ পুরো শরিয়তই হক। আর যে বিচারক শরিয়ত দিয়ে বিচার করেন, তিনি হকের ভিত্তিতে সওয়াবের অধিকারী। কারণ তিনি সেই বিধানই দেন, যা দিয়ে তাকে বিচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।</p>
<p>এখন যার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হলো সে বাস্তবে বাতিলের ওপর থাকুক, আর যার পক্ষে রায় দেওয়া হলো সে বাস্তবে হকের ওপর থাকুক; বিচারকের রায় কি আল্লাহর কাছে বাস্তব অবস্থার মতোই গণ্য হবে? অর্থাৎ বিষয়টি আল্লাহর কাছে যেমন, রায়ের ক্ষেত্রেও কি তেমনই? এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, বিচারক যে রায় দেন, আল্লাহর কাছেও বিষয়টি সেই রায়ের মতোই গণ্য হয়। আর কেউ বলেন, আল্লাহর কাছে বিষয়টি বাস্তবে যেমন, তেমনই থাকে।</p>
<p>এই বিষয়ে গভীরভাবে তাকালে অনেক দলিলের পথ ধরে এগোতে হয়। কারণ আল্লাহ সচ্চরিত্র নারীদের ওপর অপবাদ দেওয়ার শাস্তি নির্ধারণ করেছেন তাদের জন্য, যারা চারজন সাক্ষী আনতে পারে না; যদিও তারা নিজেদের কথায় সত্যবাদী হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَلَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ &#8211; তারা কেন তার পক্ষে চারজন সাক্ষী আনল না? সুরা নুর, আয়াত: ১৩।</p>
<p>অতএব বিধানে যেমন স্থির হয়েছে— فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ &#8211; যখন তারা সাক্ষী আনেনি, তখন আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যাবাদী। সুরা নুর, আয়াত: ১৩।</p>
<p>এখন প্রশ্ন হলো, “তারাই”—এই ইশারায় কি শুধু ওই বিশেষ ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে, নাকি এ বিষয়ে বিধানের সাধারণ রূপ উদ্দেশ্য? আমরা দেখি, অপবাদদাতা তার অভিযোগে সত্যবাদী ছিল। কিন্তু যেহেতু সে চারজন সাক্ষী আনেনি, তাই সাক্ষীরা যদি একই ঘটনার বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যও দিত, তবু তাদের সাক্ষ্যের কারণে শাস্তি অপবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর কার্যকর হতো এবং তাকে হত্যা করা হতো। অন্যদিকে, সেই মিথ্যা সাক্ষীদের জন্য আখিরাতে পূর্ণ শাস্তি থাকত। দুনিয়ায় তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিধান কার্যকর হয়ে যেত, আর আখিরাতে সেই মিথ্যা সাক্ষী ও মিথ্যা অপবাদদাতা শাস্তির অধিকারী হতো।</p>
<p>তাই দুনিয়ায় হকের বিধান প্রকাশ পায় এই কথায়— শুধু সাক্ষীদের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। এ কারণেই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّكُمْ تَخْتَصِمُونَ إِلَيَّ وَلَعَلَّ أَحَدَكُمْ يَكُونُ أَلْحَنَ بِحُجَّتِهِ مِنَ الْآخَرِ فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ أَخِيهِ فَلَا يَأْخُذْهُ فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ &#8211; আমি তো একজন মানুষ। তোমরা আমার কাছে বিবাদ নিয়ে আসো। হতে পারে, তোমাদের কেউ নিজের যুক্তি অন্যের চেয়ে বেশি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তখন আমি যদি তার ভাইয়ের কোনো অধিকার তার পক্ষে রায় দিয়ে দিই, সে যেন তা গ্রহণ না করে। কারণ আমি তার জন্য আগুনের একটি অংশই কেটে দিচ্ছি।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a></p>
<p>অর্থাৎ, তিনি তার ভাইয়ের অধিকারকে তার জন্য রায় দিয়ে দিলেন এবং বিধানের দিক থেকে সেটিকে তার অধিকার বানালেন; অথচ আখিরাতে সে এর জন্য শাস্তি পাবে। যেমন কেউ গিবত বা চোগলখোরি করলেও শাস্তি পায়, যদিও গিবত ও চোগলখোরির বিষয়টি বাস্তবে সত্য হয়।</p>
<p>শরিয়ত যখন বৈধ কাজ ও তার ওপর বিধান প্রয়োগের নাম, তখন বান্দা হিসেবে শরিয়ত-নির্ধারিত কাজের সামনে আত্মসমর্পণ করা তার কর্তব্য। কারণ এটাই তার উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ। বিধানের সামনে সে নিজ মাথা তুলে দাঁড়াবে না। তার নিজের কোনো গতি নেই; সে শুধু শরিয়তের বিধান অনুযায়ীই চলবে। আর শরিয়তের বিধানও তার ওপর কার্যকর হবে সেই অনুযায়ী, যা শরিয়ত দেখেছে।</p>
<p>এ কারণেই শরিয়তের আনুগত্যকে উবুদিয়্যাত মেনে চলা বলা হয়েছে। কারণ বান্দা চিরকাল বিধানের অধীন। আর কাজের সম্পর্ক তোমার দিকে বলা হয়েছে এ জন্য যে, তুমি যদি মনিবের চাওয়ার কাজ না করো, তবে তোমার পাকড়াও হবে না; পাকড়াও হবে শুধু তখনই, যখন শরিয়ত তোমার ওপর তার দাবি স্থাপন করবে। যার আকল নেই, তার ওপর থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে।</p>
<p>শরিয়তের ইলম সম্পর্কে এতটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।</p>
<h3><strong>হাকিকতের পরিচয়</strong><strong>:</strong></h3>
<p>হাকিকত হলো তোমার ভেতর থেকে তোমাকে সরিয়ে নেওয়া। অথবা বলা যায়, তোমাকে তোমারই থেকে সরিয়ে নেওয়া। আর তোমার যে গুণে তুমি গুণান্বিত, সেটি হলো, আসল কর্মকারী তোমার ভেতরেই আছে, তুমি নও।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا &#8211; এমন কোনো প্রাণী নেই, যার কপালের চুল তিনি ধরে রাখেননি। সুরা হুদ, আয়াত: ৫৬।</p>
<p>إن الحقيقة تعطي واحدًا أبدًا والعقل بالفكر ينفي الواحد الأحدا<br />
হাকিকত সবসময় একক সত্তাকেই প্রকাশ করে; আর চিন্তায় ডুবে থাকা আকল সেই এক ও অদ্বিতীয় সত্তাকেই অস্বীকার করে বসে।</p>
<p>فالذات ليس لها ثان فيشفعها والكون يطلب من آثاره العددًا<br />
সেই জাতের দ্বিতীয় কেউ নেই যে তাকে জোড়া বানাবে; আর সৃষ্টিজগৎ তার নিদর্শনের মধ্য থেকেই সংখ্যার দাবি তোলে।</p>
<p>والكل ليس سوى عين محققة لا أهل فيها ولا أبًا ولا ولدًا<br />
সবকিছু আসলে সেই এক প্রতিষ্ঠিত হাকিকতেরই প্রকাশ; সেখানে আলাদা পরিবার নেই, পিতা নেই, সন্তানও নেই।</p>
<p>আল্লাহ তোমাকে এবং আমাদের রুহ দিয়ে সহায়তা করুন। জেনে রাখো, হাকিকত হলো অস্তিত্বের প্রকৃত অবস্থা—তার ভেতরে যে ভিন্নতা, মিল ও পারস্পরিক মুখোমুখি অবস্থান আছে, সবকছিু-সহ। তুমি যদি হাকিকতকে এভাবে না বোঝো, তবে তুমি কিছুই বুঝলে না।</p>
<p>শরিয়ত হলো হাকিকতেরই প্রকাশরূপ। শরিয়ত হক, আর প্রতিটি হকের একটি হাকিকত আছে। তাই আমরা শরিয়তকে তার অস্তিত্বগত প্রকাশের দিক থেকে দেখি, আর তার হাকিকতকে দেখি সেই স্তরে, যেখানে তা মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির স্তরে অবতীর্ণ হয়। বিষয়টির গভীরে তাকালে আমরা তার অন্তরের অবস্থান দেখি। সেটি ভেতরে যেমন, বাহিরেও তেমনই; অন্য কিছু নয়।</p>
<p>তাই যখন পর্দা সরে যায়, তখন আর দর্শকের ওপর বিষয়টি অস্পষ্ট থাকে না। এ কারণেই সাহাবিদের একজন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিলেন, “আমি সত্য মুমিন।”</p>
<p>এ কথায় তিনি ইমানের হাকিকত দাবি করলেন। আর ইমান হলো অন্তরের গুণ। তার স্থান হলো হৃদয়। হৃদয়ের ভেতরে সত্যায়ন থাকলে তার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পায়। যদি সেই সত্যায়নের প্রভাব থাকে, তবে তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পাওয়া অপরিহার্য নয়। যেমন লজ্জাস্থানের অবস্থাও তা-ই। লজ্জাস্থান কোনো কথাকে সত্যও প্রমাণ করতে পারে, মিথ্যাও প্রমাণ করতে পারে। তাই সত্যতা লজ্জাস্থানের দিকেও সম্পর্কিত হয়, অথচ সেটি বাহ্যিক অঙ্গ। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ইমানের হাকিকত কী?”</p>
<p>সে বলল, “আমি যেন আমার রবের আরশকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।”</p>
<p>সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণীকে সত্য প্রমাণ করল, إِنَّ عَرْشَ رَبِّهِ بَرَزَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ &#8211; কিয়ামতের দিন তার রবের আরশ প্রকাশিত হবে।</p>
<p>তাই সে ভবিষ্যতের এমন একটি দৃশ্যকে নিজের কল্পনায় প্রত্যক্ষ অবস্থার মতো করে নিল। সে বলল, “আমি যেন তার দিকে তাকিয়ে আছি।” অর্থাৎ আমার কাছে বিষয়টি এমন হয়ে গেছে, যেন আমি তাকে চোখের সামনে দেখছি। যখন সে বিষয়টিকে মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির স্তরে নামিয়ে আনল এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অস্তিত্বের মতো করে দেখল, তখন আমরা বুঝতে পারলাম— হাকিকত সবসময় হককেই দাবি করে; হকের বিপরীত কিছু দাবি করে না।</p>
<p>তাই এমন কোনো হাকিকত নেই, যা শরিয়তের বিরোধী। কারণ শরিয়ত নিজেও হাকিকতের অন্তর্ভুক্ত। হাকিকত, উদাহরণ ও সাদৃশ্য সবই এর মধ্যে আছে। শরিয়ত কখনো কোনো কিছু নাকচ করে, আবার কখনো প্রমাণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ &#8211; তাঁর মতো কিছুই নেই। সুরা শুরা, আয়াত: ১১। আবার বলেছেন, وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ &#8211; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।</p>
<p>এ কথা বলাও হাকিকতের কথাই। তাই শরিয়তই হাকিকত, আর হাকিকতই শরিয়ত। শরিয়ত যদি উলুহিয়্যাত তথা আল্লাহর একত্বের দিকটি দেয়, তবে সে-ই আবার বিভিন্ন সম্পর্কের দিকটিও দেয়। শরিয়ত একত্ব ছাড়া অন্যকিছু প্রমাণ করেনি; তবে সেই একত্ব হলো বহু সম্পর্কের অধিকারী একত্ব, শুধু একক সংখ্যার একত্ব নয়।</p>
<p>কারণ একের একত্ব নিজে নিজেই প্রকাশিত। কিন্তু বহু প্রকাশের মধ্যে একত্ব— এটি এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষ ধরতে পারে না। তাই হাকিকত আসলে সেই বহু প্রকাশের ভেতরে একত্বের হাকিকত; সবাই তা বুঝতে পারে না।</p>
<p>মানুষ যখন দেখল, তারা শরিয়তের ওপর আমল করছে; সাধারণভাবেও, বিশেষভাবেও; আর তারা মনে করল, হাকিকত শুধু কিছু বিশেষ মানুষই জানে, তখন তারা শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যে আলাদা রেখা টেনে দিল। শরিয়তের প্রকাশিত বিধানকে তারা শরিয়ত বলল, আর তার ভেতরের যে অর্থ প্রকাশ পেল, তাকে হাকিকত বলল।</p>
<p>কিন্তু যেহেতু আসল শরিয়তদাতা হক তায়ালাই; আর হককে কখনো জাহের তথা প্রকাশ্য বলা হয়, আবার বাতিন তথা অন্তর্লীনও বলা হয়; তাই এই দুই নামের জন্যও একটি হাকিকত আছে।</p>
<p>হাকিকত হলো, বান্দার গুণের পর্দার আড়াল থেকে হকের গুণ প্রকাশ পাওয়া। যখন দৃষ্টির চোখ থেকে অজ্ঞতার পর্দা সরে যায়, তখন দেখা যায় বান্দার গুণই তাদের মতে হকের গুণ। আর আমাদের মতে, বান্দার গুণ হকের সত্তাগত প্রকাশ নয়; বরং হকের গুণের প্রকাশক্ষেত্র।</p>
<p>সুতরাং জাহেরও হক, বাতিনও হক। বাতিন থেকেই জাহিরের উদ্ভব। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আসলে নফসের চাওয়ার অনুসারী ও অনুগত। নফস হলো বাতিন; আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো জাহের। বিধান জাহিরে প্রকাশ পায়, কিন্তু বাতিনের ওপর তার সরাসরি বিধান নেই।</p>
<p>তাই বাঁকাভাব ও সোজাভাব যার মধ্যে হাঁটার গতি আছে, তার দিকে সম্পর্কিত হয়; যে তাকে হাঁটিয়েছে, তার দিকে নয়। আর সৃষ্টির মধ্যে যিনি চলমান, তিনি আসলে হক। তিনিই বলেছেন, মানুষ সিরাতে মুস্তাকিম তথা সোজা পথে আছে।</p>
<p>সুতরাং বাঁকাও কখনো হাকিকতের দিক থেকে সোজা হতে পারে। যেমন ধনুকের বাঁক তার চাওয়া সোজাভাবেরই অংশ। জগতে যা কিছু আছে, সবই সোজা। কারণ যার কপালের চুল ধরে রাখা হয়েছে, সে-ই তাঁর সঙ্গে চলমান; আর সে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর আছে।</p>
<p>সুতরাং অস্তিত্বে প্রতিটি গতি ও প্রতিটি স্থিরতা ইলাহি। কারণ তা হকের হাত থেকে, হকের মাধ্যমেই প্রকাশিত। আর হক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর আছেন।</p>
<p>রসুলগণ আল্লাহ সম্পর্কে কেবল সেই কথাই বলেন, যা তিনি তাঁদের শিখিয়েছেন। তাঁরা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন। এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো ওজর নেই। কারণ সৃষ্টিকে হক সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া রসুলগণের রহমতেরই অংশ। যখন হক তায়ালা নিজেই তাঁর রসুলের মুখে এ কথা উচ্চারণ করালেন, তখন আমরা বুঝলাম— এটি তাঁরই রহমত, যেহেতু তিনি আমাদের এভাবে পরিচয় করিয়েছেন।</p>
<p>তাই রসুলের বক্তব্যে আমরা যে পরিচয় পেলাম, সেটির প্রতি আমাদের ইমান রাখা জরুরি। কারণ সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا &#8211; তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনেই সুসংবাদ রয়েছে। সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪।</p>
<p>এই সুসংবাদ আল্লাহর কালামের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ &#8211; আল্লাহর বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই। সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪।</p>
<p>হাকিকতের আরেক দিক হলো হকই অস্তিত্বের আসল সত্তা; আর যাকে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত বলা হয়, তা আসলে গুণধারী সত্তাগুলোর গুণ হিসেবে প্রকাশিত। তারপর তিনি জানিয়েছেন, বান্দার গুণ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আসল সত্তার দিক থেকেও তিনিই সেগুলোর প্রকৃত সত্তা।</p>
<p>তাই বলা হয়, “আমি তার শ্রবণ হয়ে যাই।” অর্থাৎ শ্রবণকে সেই অস্তিত্বশীল শ্রোতার দিকে সম্পর্কিত করা হলো এবং তার সঙ্গে যুক্ত করা হলো। অথচ অস্তিত্বে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তাই তিনিই শ্রোতা, তিনিই শ্রবণ।</p>
<p>এভাবেই অন্য সব শক্তি ও উপলব্ধির ব্যাপারেও কথা বলা যায়। সেগুলো তাঁরই প্রকৃত সত্তা ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং শরিয়তের ঝরনাই হাকিকতের ঝরনা। তাই ভালোভাবে বুঝে নাও। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।</p>
<h2>আবদুল কাদির ঈসা (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>আবদুল কাদির ঈসা (রহ.) জিবরাইলের হাদিস অনুসরণ করে দ্বীনকে তিন রুকনে ভাগ করেছেন। ইসলাম (শরিয়ত), ইমান (আকিদা) ও ইহসান (হাকিকত)। নামাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বাহ্যিক নড়াচড়া দেহ আর খুশু রুহ। তিনি ইমাম মালিক ও আহমদ যাররুকের উক্তি উদ্ধৃত করে স্পষ্ট করেছেন, ফিকহ ছাড়া তাসাউফ যিন্দিকি, আর তাসাউফ ছাড়া ফিকহ ফাসেকি। শরিয়ত ভিত্তি, তরিকত মাধ্যম, হাকিকত ফল।</p>
<p>উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জিবরাইলে দিনকে তিনটি রুকনে ভাগ করার কথা এসেছে। রসুল ﷺ উমর (রা.)-কে বলেছিলেন, فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ &#8211; তিনি জিবরিল। তিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন, তোমাদেরকে তোমাদের দিন শিক্ষা দিতে।<a href="#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<p>১. ইসলামের রুকন: এটি হলো আমলি দিক। এর অন্তর্ভুক্ত হলো ইবাদত, লেনদেন, ইবাদতসংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেহের বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। আলেমগণ একে শরিয়ত নামে অভিহিত করেছেন। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে সম্মানিত ফকিহগণের সঙ্গে সম্পর্কিত।</p>
<p>২. ইমানের রুকন: এটি হলো অন্তরের আকিদাগত দিক। এর অন্তর্ভুক্ত হলো আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রসুলদের প্রতি, আখিরাত দিবসের প্রতি এবং কাজা ও কদরের প্রতি ইমান। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে তাওহিদের আলেমগণের সঙ্গে সম্পর্কিত।</p>
<p>৩. ইহসানের রুকন: এটি হলো অন্তরের রুহানি দিক। এর অর্থ হলো তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এমনভাবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি তো তোমাকে দেখছেন। এ থেকে স্বাদ, অন্তর্গত অনুভূতি, ইমানি মাকামসমূহ, মাকামের স্তরবিন্যাস এবং হিম্মতের জ্ঞানসমূহ জন্ম নেয়। আলেমগণ একে হাকিকত নামে অভিহিত করেছেন। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে সুফি-সাধকদের সঙ্গে সম্পর্কিত।</p>
<p>শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্ট করার জন্য নামাজকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়।</p>
<p>মানুষের নামাজের বাহ্যিক নড়াচড়া, প্রকাশ্য আমল, রুকন ও শর্তসমূহ রক্ষা করা, এবং নামাজ সম্পর্কে ফকিহগণ যে-সব বিধান আলোচনা করেছেন, এসবই শরিয়তের দিককে প্রকাশ করে। আর এটিই নামাজের দেহ। অন্যদিকে নামাজের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার সামনে অন্তরের উপস্থিতি হাকিকতের দিককে প্রকাশ করে। আর এটিই নামাজের রুহ।</p>
<p>তাই নামাজের বাহ্যিক আমলগুলো তার দেহ, আর খুশু তথা বিনয় ও একাগ্রতা তার রুহ। রুহহীন দেহেরই বা কী মূল্য? যেমন রুহের জন্য দেহ প্রয়োজন, যাতে সে প্রকাশ পায় ও টিকে থাকে, তেমনি দেহেরও প্রয়োজন এমন এক রুহ, যার মাধ্যমে সে সত্যিকার অর্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ &#8211; তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো। সুরা বাকারা, আয়াত: ১১০।</p>
<p>তাই বলা হয়নি, “তোমরা নামাজ সৃষ্টি করো।” কারণ নামাজ কায়েম হয় দেহ ও রুহ, উভয়ের সমন্বয়ে। এ আলোচনা থেকে শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যকার গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন রুহ ও দেহ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। পূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার মধ্যে শরিয়ত ও হাকিকত একত্র হয়। মানুষের প্রতি সুফিদের দিকনির্দেশনাও মূলত এই সমন্বয়ের দিকেই। আর এ কারণেই রসুল ﷺ এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিদের আদর্শ অনুসরণ করা অপরিহার্য।</p>
<p>এই উচ্চ মাকাম ও পূর্ণ ইমান অর্জনের জন্য তরিকতের সুলুক তথা আধ্যাত্মিক পথচলা অপরিহার্য। তরিকত হলো নফসের সঙ্গে মুজাহাদা তথা আত্মসংগ্রাম, তার অপূর্ণ গুণগুলোকে পূর্ণ গুণাবলির দিকে উন্নীত করা এবং মুরশিদদের সাহচর্যে পূর্ণতার মাকামসমূহে ক্রমে অগ্রসর হওয়া। তাই তরিকতই সেই সেতু, যা মানুষকে শরিয়ত থেকে হাকিকতের দিকে পৌঁছে দেয়।</p>
<p>সাইয়িদ (রহ.) তাঁর ‘তা‘রিফাত’ গ্রন্থে তরিকতের সংজ্ঞায় বলেছেন—</p>
<p>الطريقة هي السيرة المختصة بالسالكين إلى الله تعالى، من قطع المنازل والترقي في المقامات</p>
<p>তরিকত হলো আল্লাহ তায়ালার পথে চলা সালিকদের জন্য নির্দিষ্ট পথ, অর্থাৎ মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করা এবং মাকামসমূহে ক্রমে উন্নীত হওয়া।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<p>সুতরাং শরিয়ত হলো ভিত্তি, তরিকত হলো মাধ্যম, আর হাকিকত হলো ফল।</p>
<p>এই তিনটি বিষয় পরস্পর পরিপূর্ণ, সুসংগত ও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যে ব্যক্তি প্রথমটি আঁকড়ে ধরে, সে দ্বিতীয়টির পথে চলে; এরপর তৃতীয়টিতে পৌঁছে যায়। এগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, কোনো পরস্পরবিরুদ্ধতা নেই। এ কারণেই সুফিগণ তাঁদের প্রসিদ্ধ নীতিমালায় বলেন, كل حقيقة خالفت الشريعة فهي زندقة &#8211; যে হাকিকত শরিয়তের বিরোধী হয়, তা যিন্দিকা তথা ধর্মচ্যুতি।</p>
<p>হাকিকত আবার শরিয়তের বিরোধী হবে কীভাবে? অথচ হাকিকত তো শরিয়ত বাস্তবায়নের ফল হিসেবেই জন্ম নেয়। সুফিদের ইমাম আহমদ যাররুক (রহ.) বলেন—</p>
<p>لا تصوف إلا بفقه، إذ لا تعرف أحكام الله الظاهرة إلا منه. ولا فقه إلا بتصوف، إذ لا عمل إلا بصدق وتوجه لله تعالى. ولا هما إلا بإيمان، إذ لا يصح واحد منهما دونه. فلزم الجميع لتلازمها في الحكم، كتلازم الأجسام للأرواح، ولا وجود لها إلا فيها، كما لا حياة لها إلا بها، فافهم</p>
<p>ফিকহ ছাড়া তাসাউফ হয় না; কারণ আল্লাহর প্রকাশ্য বিধান ফিকহ ছাড়া জানা যায় না। আবার তাসাউফ ছাড়া ফিকহও পূর্ণ হয় না; কারণ সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহ তায়ালার দিকে অভিমুখী হওয়া ছাড়া কোনো আমল প্রকৃত আমল হয় না। আর ইমান ছাড়া তাসাউফ ও ফিকহ কোনোটিই হয় না; কারণ ইমান ছাড়া এ দুটির কোনো একটিও শুদ্ধ হয় না। তাই সবগুলোই আবশ্যক। কেননা বিধানের দিক থেকে এগুলো পরস্পর অবিচ্ছেদ্য; যেমন দেহ ও রুহ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। দেহের অস্তিত্ব রুহের সঙ্গে যুক্ত, আর দেহের জীবনও রুহের মাধ্যমেই। অতএব বুঝে নাও।<a href="#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a></p>
<p>ইমাম মালিক রহ. বলেন—</p>
<p>من تصوف ولم يتفقه فقد تزندق، ومن تفقه ولم يتصوف فقد تفسق، ومن جمع بينهما فقد تحقق</p>
<p>যে ব্যক্তি তাসাউফ গ্রহণ করল, কিন্তু ফিকহ অর্জন করল না, সে যিন্দিক হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি ফিকহ অর্জন করল, কিন্তু তাসাউফ গ্রহণ করল না, সে ফাসেক হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি দুটিকে একত্র করল, সে হাকিকতে পৌঁছে গেল।<a href="#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<p>প্রথম ব্যক্তি যিন্দিক হয়েছে, কারণ সে শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু হাকিকতের দিকে তাকিয়েছে। ফলে সে জবর তথা বাধ্যতাবাদের কথা বলেছে এবং দাবি করেছে, মানুষের কোনো কাজেই তার নিজের কোনো ইখতিয়ার নেই। সে যেন ওই কবির কথার বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—</p>
<p>ألقاه في اليم مكتوفاً وقال له إياك إياك أن تبتل بالماء<br />
সে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সমুদ্রে ফেলে দিল, তারপর বলল, সাবধান, সাবধান, পানিতে যেন ভিজে না যাও।</p>
<p>এভাবে সে শরিয়তের বিধান ও তার ওপর আমল করাকে অকার্যকর করে দিল; শরিয়তের হিকমত এবং তার প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেও বাতিল করে দিল।</p>
<p>আর দ্বিতীয় ব্যক্তি ফাসেক হয়েছে, কারণ তার অন্তরে তাকওয়ার নুর প্রবেশ করেনি, ইখলাসের রহস্য জাগ্রত হয়নি, মুরাকাবা তথা অন্তরের পাহারার উপদেশদাতা চেতনা এবং মুহাসাবা তথা আত্মপর্যালোচনার পদ্ধতি তার ভেতরে জায়গা করে নেয়নি। এগুলো থাকলে সে গুনাহ থেকে আড়ালে থাকতে পারত এবং সুন্নতের আদবসমূহ আঁকড়ে ধরতে পারত।</p>
<p>আর তৃতীয় ব্যক্তি হাকিকতে পৌঁছেছে, কারণ সে দিনের সব রুকন একত্র করেছে, ইমান, ইসলাম ও ইহসান। এগুলোই জিবরিল (আ.)-এর হাদিসে একত্রে এসেছে।</p>
<p>যেমন বাহ্যিক আলেমগণ শরিয়তের সীমারেখা সংরক্ষণ করেছেন, তেমনি তাসাউফের আলেমগণ তার আদব ও রুহ সংরক্ষণ করেছেন। বাহ্যিক আলেমদের জন্য যেমন দলিল নির্ণয়, সীমারেখা ও শাখাগত বিধান বের করা, এবং যে বিষয়ে সরাসরি নস আসেনি, সেখানে বিশ্লেষণ, তাহরিম ও তাহরিম নয় এমন বিধান নির্ধারণের জন্য ইজতিহাদ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; তেমনি আরিফগণের জন্যও মুরিদদের তরবিয়ত এবং সালিকদের আত্মশুদ্ধির জন্য আদব ও পদ্ধতি উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে।</p>
<p>নিশ্চয় সালফে সালেহিন এবং সত্যনিষ্ঠ সুফিগণ প্রকৃত উবুদিয়্যাত তথা আল্লাহর দাসত্ব এবং সহিহ ইসলামের বাস্তবতা অর্জন করেছিলেন। কারণ তাঁরা শরিয়ত, তরিকত ও হাকিকতকে একত্র করেছিলেন। ফলে তাঁরা আলোকিত, হাকিকতপ্রাপ্ত মানুষ ছিলেন, যারা মানুষকে সরল পথে পরিচালিত করতেন।</p>
<p>কারণ যে দ্বিনের হাকিকত থেকে তার মূল শিকড় শুকিয়ে যায়, তার ডালপালা শুকিয়ে যায় এবং তার ফল নষ্ট হয়ে যায়।<a href="#_ftn10" name="_ftnref10">[10]</a></p>
<h3>হাকিকত ও শরিয়তের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্পর্কে সতর্কীকরণ:</h3>
<p>কিছু মানুষ মিথ্যা ও নিফাকের আশ্রয় নিয়ে তাসাউফের দাবি করেছে। তারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে বলেছে, “দিনের আসল উদ্দেশ্য হলো শুধু হাকিকত।” এরপর তারা শরিয়তের বিধান অকার্যকর করেছে, নিজেদের ওপর থেকে শরিয়তের দায়িত্ব ফেলে দিয়েছে, হারাম কাজকে বৈধ করে নিয়েছে এবং বলেছে, “মূল বিষয় তো অন্তরের সংশোধন।” তারা আরও বলে, “আমরা বাতিনের মানুষ, আর এরা জাহিরের মানুষ।”</p>
<p>এরা পথভ্রষ্ট ও যিন্দিক। এদের নিয়ে হাসাহাসি করা যায়। এদের কাজকর্ম ও অবস্থা সত্যনিষ্ঠ, মুখলিস সুফি সাধকদের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।</p>
<p>সুফি ইমামগণ তাঁদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, তাঁদের সঙ্গ থেকে বারণ করেছেন এবং তাঁদের গোপন ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি প্রকাশ করে দিয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে বললেন, “চলো, আমরা ওই ব্যক্তির কাছে যাই, যে নিজের ব্যাপারে বেলায়তের খ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছে।”</p>
<p>লোকটি জুহদের জন্য বিখ্যাত ছিল। আমরা তার কাছে গেলাম। যখন সে ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে ঢুকল, তখন সে কিবলার দিকে থুথু ফেলল। বায়েজিদ সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলেন। তাকে সালামও দিলেন না। তিনি বললেন, “এই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদবসমূহের একটি আদবের ব্যাপারেও আমানতদার নয়। তাহলে যে দাবি সে করছে, তাতে কীভাবে তাকে আমানতদার মনে করা যায়?”</p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা যদি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখো, যাকে কারামত দেওয়া হয়েছে, এমনকি সে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তবু তার দ্বারা ধোঁকায় পড়ো না; যতক্ষণ না দেখো, আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে, শরিয়তের সীমারেখা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এবং শরিয়তের আদব পালনের ক্ষেত্রে সে কেমন।”<a href="#_ftn11" name="_ftnref11">[11]</a></p>
<p>আর শায়খ আহমদ যাররুক (রহ.) তাঁর কাওয়াইদে বলেছেন, “যে শায়খ সুন্নতের আলোকে প্রকাশিত নয়, তার অনুসারীদের জন্য তার অবস্থা যাচাই করা সম্ভব নয়। যদিও সে নিজের ভেতরে সত্য হতে পারে এবং তার হাতে হাজার হাজার কারামত প্রকাশ পায়।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12">[12]</a></p>
<p>সাহল ইবনু আবদুল্লাহ তুস্তারি (রহ.) বলেছেন, “তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গ থেকে সতর্ক থাকো। গাফেল স্বেচ্ছাচারী শাসক, তোষামোদকারী কারি এবং মূর্খ সুফি।”<a href="#_ftn13" name="_ftnref13">[13]</a></p>
<p>সাইয়িদ আহমদ রিফায়ি (রহ.) বলেছেন, “তোমরা সে কথা বলো না, যা কিছু সুফিরা বলে থাকে যে, আমরা বাতিনের মানুষ, আর তারা জাহিরের মানুষ। এই দিন এমন এক সমন্বিত দিন, যার বাতিন জাহিরের মূল, আর জাহের তার বাতিনের পাত্র। জাহের না থাকলে বাতিন থাকত না। আর বাতিন না থাকলে জাহেরও থাকত না এবং সহিহ হতো না। দেহ ছাড়া অন্তর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বরং দেহ না থাকলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। আর অন্তর হলো দেহের নুর। এই জ্ঞান, যাকে তাদের কেউ কেউ বাতিনের জ্ঞান বলে, মূলত অন্তরের সংশোধন। প্রথম কাজ হলো রুকনসমূহ পালন করা এবং অন্তর দিয়ে সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করা। যদি তোমার অন্তর বিশুদ্ধ হয়, নিয়ত ও অন্তরের পবিত্রতা সুন্দর হয়, অথচ তুমি চুরি করো, জেনা করো, সুদ খাও, মদ পান করো, মিথ্যা বলো, অহংকার করো এবং অসংলগ্ন কথা বলো, তাহলে তোমার নিয়ত ও অন্তরের পবিত্রতা দিয়ে কী লাভ? আর যদি তুমি আল্লাহর ইবাদত করো, নিজের ভ্রান্ত ধারণা অনুযায়ী সংযম অবলম্বন করো, নীরব থাকো, সদকা দাও, বিনয়ী হও; কিন্তু তোমার অন্তরের ভেতর থাকে অহংকার, রিয়া তথা লোকদেখানো মনোভাব ও ফাসাদ, তাহলে তোমার আমলেরই বা কী লাভ?”<a href="#_ftn14" name="_ftnref14">[14]</a></p>
<p>শায়খ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) সেই ব্যক্তির ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন, যে মনে করে সালিক কোনো অবস্থায় পৌঁছে গেলে তার ওপর থেকে শরিয়তের দায়িত্বসমূহ উঠে যায়। যেমন তিনি তাঁর মুরিদের প্রতি অসিয়ত করে বলেছেন, “ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়া যিন্দিকি, আর নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া গুনাহ। কোনো অবস্থাতেই কারও ওপর থেকে ফরজ দায়িত্ব ঝরে পড়ে না।”<a href="#_ftn15" name="_ftnref15">[15]</a></p>
<p>সুফিদের শায়খ ইমাম জুনাইদ (রহ.) বলেছেন, “আমাদের এই মাজহাব কিতাব ও সুন্নতের মূলনীতির সঙ্গে বাঁধা।”<a href="#_ftn16" name="_ftnref16">[16]</a></p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, “সব পথ মানুষের জন্য বন্ধ। কেবল তার পথ খোলা, যে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁর সুন্নত মেনে চলে এবং তাঁর পথ আঁকড়ে ধরে। কারণ সব কল্যাণের পথ তার জন্যই উন্মুক্ত।”<a href="#_ftn17" name="_ftnref17">[17]</a></p>
<p>তাঁর সামনে এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করা হলো। লোকটি মারিফত বিষয়ে পরিচিত ছিল। বলা হলো, “আল্লাহর মারিফতপ্রাপ্ত লোকেরা নেক কাজের নড়াচড়া ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের দরজায় পৌঁছে যায়।” তখন জুনাইদ (রহ.) বললেন, “এ কথা এমন এক সম্প্রদায়ের কথা, যারা নেক আমলের দায়িত্ব ঝরিয়ে দেওয়ার কথা বলে। আর আমার কাছে এটি গুরুতর বিষয়। যে ব্যক্তি চুরি করে, জিনা করে, তার অবস্থাও ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যে এমন কথা বলে। কারণ আল্লাহর আরিফগণ আমলগুলো আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকেই গ্রহণ করেছেন এবং সেগুলোতেই তাঁর দিকে ফিরে গেছেন। আমি যদি হাজার বছর বেঁচে থাকি, তবু আমার সাধ্য অনুযায়ী নেক আমলের একটি কণাও কমাব না।”</p>
<p>তিনি আরও বলেছেন, “আমরা তাসাউফ কথার ফুলঝুরি ও তর্ক-বিতর্ক থেকে গ্রহণ করিনি; বরং ক্ষুধা, দুনিয়া ত্যাগ, পরিচিত ও প্রিয় জিনিসগুলো থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে গ্রহণ করেছি।”</p>
<p>ইবরাহিম ইবনু মুহাম্মদ নসর আবাজি (রহ.) বলেছেন, “তাসাউফের মূল হলো কিতাব ও সুন্নত আঁকড়ে থাকা, প্রবৃত্তি ও বিদআত ত্যাগ করা, এবং মাশায়িখদের মর্যাদা রক্ষা করা, সৃষ্টির ওজরগুলো বিবেচনায় রাখা, সঙ্গীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা, তাদের খেদমত করা, সুন্দর আখলাক অবলম্বন করা, আওরাদ নিয়মিত আদায় করা, রুখসত ও দূরবর্তী ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে ছাড় নেওয়া থেকে বিরত থাকা। এ পথে কেউ শুরুতেই দুর্নীতিগ্রস্ত না হলে পথভ্রষ্ট হয় না; কারণ শুরুটা নষ্ট হলে শেষের ফলেও তার প্রভাব পড়ে।”<a href="#_ftn18" name="_ftnref18">[18]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শরিয়ত ও হাকিকত কখনো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অপরটির অস্তিত্বের শর্ত। যে হাকিকত শরিয়তের বিরোধী, তা যিন্দিকি; আর যে শরিয়তে হাকিকতের ছোঁয়া নেই, তা প্রাণহীন।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">কুশাইরি দেখিয়েছেন এই দুই পরিভাষার ভাষাগত ও মূলগত একতা। দাতা গঞ্জে বখশ কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা হাকিকতের নামে শরিয়ত পরিত্যাগ করে। ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন, শরিয়ত নিজেই হাকিকতের প্রকাশ। আর আবদুল কাদির ঈসা ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে এই সম্পর্ককে দেহ ও রুহের মতো অবিচ্ছেদ্য বলে প্রমাণ করেছেন।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সবশেষে বলা যায়, শরিয়ত ও হাকিকত সুফি সাধনার সেই দুই স্তম্ভ, যাদের একত্রিত হওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। বায়েজিদ বোস্তামি যেমন বলেছেন, যে শরিয়তের আদবে অমনোযোগী, তার হাকিকতের দাবিও অবিশ্বাসযোগ্য। শরিয়ত ছাড়া হাকিকত পথহারা, আর হাকিকত ছাড়া শরিয়ত প্রাণহীন।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/shariyat-and-haqiqat/">শরিয়ত ও হাকিকত</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/shariyat-and-haqiqat/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>আল-কুরব ওয়াল-বু‘দ</title>
		<link>https://sufigraphy.com/qurb-and-buad/</link>
					<comments>https://sufigraphy.com/qurb-and-buad/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 28 Jun 2026 08:45:23 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[সুফি দর্শন]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?p=3851</guid>

					<description><![CDATA[<p>সুফি সাধনার পথে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দুটি বিপরীত অবস্থা কুরব ও বু&#8217;দ। কুরব মানে নৈকট্য; আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর কাছাকাছি থাকা। আর বু&#8217;দ মানে দূরত্ব; আল্লাহর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া। নবীজির হাদিসে এসেছে, বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, আর তখন তিনি তার [&#8230;]</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/qurb-and-buad/">আল-কুরব ওয়াল-বু‘দ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">সুফি সাধনার পথে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দুটি বিপরীত অবস্থা কুরব ও বু&#8217;দ। কুরব মানে নৈকট্য; আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর কাছাকাছি থাকা। আর বু&#8217;দ মানে দূরত্ব; আল্লাহর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">নবীজির হাদিসে এসেছে, বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, আর তখন তিনি তার শ্রবণ ও দৃষ্টি হয়ে যান। সেই শিষ্যের ঘটনা; যে পাখি জবাই না করেই ফিরে এসেছিল, কারণ কোথাও আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নেই; এইসবই কুরবের গভীরতম শিক্ষা দেয়।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">তবে নৈকট্যের অনুভূতিতে আত্মতৃপ্ত হওয়াও এক ধরনের পর্দা। কারণ প্রকৃত নৈকট্য মানুষকে বিস্ময় ও আত্মবিলোপের দিকে নিয়ে যায়, আত্মতুষ্টির দিকে নয়।</p>
<h2>ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইমাম কুশাইরি বলেছেন, কুরবের প্রথম স্তর হলো আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করা, আর বু&#8217;দ হলো তাঁর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে কলুষিত করা। তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহর কুরব ইলম ও কুদরতের দিক থেকে সবার জন্য সাধারণ, কিন্তু উনস তথা অন্তরঙ্গতার দিক থেকে কেবল আওলিয়াদের জন্য নির্দিষ্ট। সেই শিষ্যের ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত নৈকট্য মানে সর্বক্ষণ আল্লাহর মুরাকাবার সচেতনতা। তিনি আরও বলেছেন, নৈকট্যকে দেখতে থাকাও একটি পর্দা, কারণ তাতে নিজের অস্তিত্বের বোধ থেকে যায়।</p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">তিনি বলেন, কুরব তথা নৈকট্যের প্রথম স্তর হলো, আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা এবং সবসময় তাঁর ইবাদতে নিজেকে গুণান্বিত রাখা। আর বু‘দ তথা দূরত্ব হলো, আল্লাহর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে কলুষিত করা এবং তাঁর আনুগত্য থেকে দূরে সরে থাকা।</p>
<p>সুতরাং দূরত্বের প্রথম স্তর হলো, তাওফিক থেকে দূরে থাকা। এরপর তাহকিক তথা বাস্তব উপলব্ধি থেকে দূরে থাকা। বরং প্রকৃতপক্ষে তাওফিক থেকে দূরে থাকাই আসল দূরত্ব। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেছেন—</p>
<p>ما تقرّبَ إليَّ المتقرِّبون بمثل أداءِ ما افترضتُ عليهم، ولا يزالُ العبدُ يتقرّبُ إليَّ بالنوافلِ حتى يحبَّني وأحبَّه، فإذا أحببتُه&#8230; كنتُ له سمعًا وبصرًا، فبي يسمعُ، وبي يبصرُ&#8230; الخبر</p>
<p>আমার নৈকট্য লাভকারীরা আমার ফরজ করা বিষয়গুলো আদায় করার মতো আর কোনোকিছুর মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে সে আমাকে ভালোবাসে এবং আমিও তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ ও দৃষ্টির সহায়ক হয়ে যাই; ফলে সে আমার মাধ্যমেই শোনে এবং আমার মাধ্যমেই দেখে&#8230;<a href="#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<p>সুতরাং বান্দার কুরব প্রথমে হয় তার ইমান ও সত্যায়নের মাধ্যমে। এরপর হয় তার ইহসান ও তাহকিকের মাধ্যমে। আর আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি কুরব হলো— দুনিয়ায় তিনি বান্দাকে যে ইরফান তথা আল্লাহ-সম্পর্কিত গভীর পরিচয় দান করেন; আখিরাতে তিনি তাকে যে মুশাহাদা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন; এ-ছাড়াও এ দুই অবস্থার মাঝখানে তিনি বান্দাকে যে নানা ধরনের অনুগ্রহ ও উপকার দ্বারা ঘিরে রাখেন।</p>
<p>বান্দা যতক্ষণ না সৃষ্টির আসক্তি থেকে দূরে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব হয় না। এটি অন্তরের গুণাবলির বিষয়; বাহ্যিক অবস্থা, দেহগত অবস্থান বা জাগতিক অস্তিত্বের নিয়মের বিষয় নয়। অর্থাৎ এখানে দেহ দিয়ে কাছে থাকার কথা নয়; কারণ আল্লাহর ক্ষেত্রে দেহগত নৈকট্য অসম্ভব।<a href="#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<p>আল্লাহ সুবহানাহুর কুরব, ইলম ও কুদরতের দিক থেকে সবার জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য। আর লুতফ ও নুসরত তথা অনুগ্রহ ও সাহায্যের দিক থেকে তা মুমিনদের জন্য বিশেষ। এরপর উনস তথা আপন করে নেওয়া ও অন্তরঙ্গতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তা আওলিয়াদের জন্য নির্দিষ্ট।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে বলেছেন— وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ &#8211; আমি তার গলার রগের চেয়েও তার অধিক নিকটে।<a href="#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a> وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ &#8211; আমি তোমাদের চেয়ে তার অধিক নিকটে, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।<a href="#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a> وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ &#8211; তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।<a href="#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a> مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ &#8211; তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ এমন হয় না, যেখানে তিনি তাদের চতুর্থজন নন।<a href="#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<p>যে ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নৈকট্যের সত্য উপলব্ধি লাভ করে, তার জন্য সর্বক্ষণ আল্লাহর মুরাকাবা তথা আল্লাহ তাকে দেখছেন, এ সচেতনতা ধরে রাখা অপরিহার্য হয়ে যায়। কারণ আগে তার ওপর তাকওয়ার মুরাকাবা ছিল; এরপর তার ওপর হিফাজত ও ওয়াফা তথা আত্মরক্ষা ও অঙ্গীকার রক্ষার মুরাকাবা আসে; তারপর আসে হায়া তথা আল্লাহর সামনে লজ্জাশীল থাকার মুরাকাবা।</p>
<p>সুফিরা দীর্ঘ বাহারের কবিতায় বলেছেন—</p>
<p>كأنَّ رقيبًا منك يرعى خواطري وآخر يرعى ناظري ولساني<br />
মনে হয়, তোমার পক্ষ থেকে একজন প্রহরী আমার অন্তরের ভাবনাগুলো পাহারা দিচ্ছে; আর আরেকজন পাহারা দিচ্ছে আমার দৃষ্টি ও জিহ্বাকে।</p>
<p>فما رمقت عيناي بعدك منظرًا بسوءك إلا قلت قد رمقاني<br />
তোমার নৈকট্য লাভের পর আমার দুই চোখ যখনই তোমার অপছন্দের কোনো দৃশ্যের দিকে তাকাতে চেয়েছে, আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছি, তারা তো আমাকে দেখছে।</p>
<p>ولا بذرت من في دونك لفظة بغيرك إلا قلت قد سمعاني<br />
তোমাকে ছাড়া অন্য কারও বিষয়ে আমার মুখ থেকে যখনই কোনো কথা বের হতে চেয়েছে, আমি বলেছি, তারা তো আমার কথা শুনছে।</p>
<p>ولا أخطرت في السر بعدك خطرة لغيرك إلا عرّجا بعناني<br />
তোমাকে পাওয়ার পর অন্তরের গভীরে যখনই তোমাকে ছাড়া অন্য কারও কথা মনে এসেছে, তারা সঙ্গে সঙ্গে আমার লাগাম ধরে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।</p>
<p>وإخوان صدق قد سمعت حديثهم وأمسكت عنهم ناظري ولساني<br />
আমার কিছু সত্যনিষ্ঠ ভাই আছে, আমি তাদের কথা শুনেছি; কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমার চোখ ও জিহ্বাকে সংযত রেখেছি।</p>
<p>وما الزهد أسلاني عنهم غير أنني وجدتك مشهودي بكل مكان<br />
দুনিয়াবিমুখতা আমাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; এর কারণ হলো, আমি প্রত্যেক স্থানে তোমাকেই আমার সামনে প্রত্যক্ষ পেয়েছি।<a href="#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<p>শুনো, কোনো এক মাশায়িখ তাঁর শিষ্যদের মধ্য থেকে একজনকে বিশেষ মনোযোগ ও স্নেহের জন্য বেছে নিয়েছেন।<a href="#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a> তাঁর এই বিশেষ মনোযোগ দেখে অন্য শিষ্যরা আপত্তি তুলল। তখন তিনি বিষয়টি বোঝানোর জন্য তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা এমন জায়গায় গিয়ে এগুলো জবাই করো, যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না।</p>
<p>তখন প্রত্যেকে আলাদা হয়ে নির্জন জায়গায় গেল এবং পাখি জবাই করল। কিন্তু ওই শিষ্য পাখিটিকে জবাই না করেই সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। শায়খ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এমন করল কেন। সে বলল, আপনি আমাকে এমন জায়গায় পাখিটি জবাই করতে বলেছেন, যেখানে কেউ তা দেখবে না। অথচ এমন কোনো জায়গা নেই, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দেখেন না।</p>
<p>তখন শায়খ বললেন, এ কারণেই আমি তাকে তোমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিই। তোমাদের ওপর সৃষ্টির কথা ও দৃষ্টি বেশি প্রবল; আর সে আল্লাহর ব্যাপারে গাফেল নয়।</p>
<p>তাদের কারও একটি কবিতা হলো—</p>
<p>إذا شئت أن ترضى وأرضى وتملكي زمام قيادي في الهوى وعناني<br />
তুমি যদি চাও যে, তুমি সন্তুষ্ট থাকবে, আমিও সন্তুষ্ট থাকব, আর প্রেমের পথে আমার নেতৃত্ব ও লাগাম তোমার হাতে থাকবে,</p>
<p>ألا فانظري الدنيا بعيني وأسمعي بأذني فيها وأنطقي بلساني<br />
তাহলে দুনিয়াকে আমার চোখ দিয়ে দেখো, আমার কান দিয়ে শোনো এবং আমার জিহ্বা দিয়ে কথা বলো।<a href="#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<p>নৈকট্যকে দেখতে থাকা অবস্থাটিও নৈকট্যের পথে পর্দা। কারণ যে ব্যক্তি নিজের জন্য কোনো মর্যাদা বা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখতে পায়, সে মকর তথা সূক্ষ্ম পরীক্ষামূলক আড়ালে পতিত। এ কারণেই তারা বলেছেন, أوحشك الله من قربه &#8211; আল্লাহ তোমাকে তাঁর নৈকট্য থেকে ওয়াহশত দান করুন।</p>
<p>অর্থাৎ, তুমি যে নিজের পক্ষ থেকে তাঁর নৈকট্য দেখতে পাচ্ছ, আল্লাহ তোমাকে সেই দেখা থেকে মুক্ত করুন। কারণ তাঁর নৈকট্যের অনুভব নিয়ে আত্মতৃপ্ত হওয়া এখনো পৃথকত্বের চিহ্ন। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু প্রত্যেক ধরনের উনস তথা অন্তরঙ্গ অনুভূতিরও ঊর্ধ্বে। হাকিকতের অবস্থান মানুষকে বিস্ময়-বিহ্বলতা ও আত্মবিলোপের দিকে নিয়ে যায়।</p>
<p>এই অর্থের কাছাকাছি বর্ণনায় তারা বলেছেন—</p>
<p>محنتي فيك أنني ما أبالي بمحنـتي<br />
তোমার ব্যাপারে আমার পরীক্ষা এই যে, আমি নিজের পরীক্ষার কোনো পরোয়া করি না।</p>
<p>قربكم مثل بعدكم فمتى وقت راحتي<br />
তোমাদের নৈকট্যও তোমাদের দূরত্বের মতো; তাহলে আমার স্বস্তির সময় কবে আসবে?<a href="#_ftn10" name="_ftnref10">[10]</a></p>
<p>উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায়ই এই কবিতা আবৃত্তি করতেন—</p>
<p>وزادكم هجر وجنبكم قلى وقربكم بعد وسلمكم حرب<br />
তোমাদের দূরে থাকা বিচ্ছেদ বাড়ায়, তোমাদের পাশে থাকাও বিরাগ; তোমাদের নৈকট্য দূরত্ব, আর তোমাদের শান্তিও যুদ্ধের মতো।</p>
<p>শিবলি এই পঙ্‌ক্তিটি বেশি আবৃত্তি করতেন। পঙ্‌ক্তিটি আব্বাস ইবনুল আহনাফের; তাঁর দিওয়ান, পৃষ্ঠা: ১৯-এ এটি একটি কাসিদার অংশ হিসেবে এসেছে। সেখানে এর পরের পঙ্‌ক্তি হলো—</p>
<p>وأنتم بحمد الله فيكم فظاظة فكل ذنوبي في جوانبكم صعب<br />
আল্লাহর প্রশংসা, তোমাদের মধ্যে কঠোরতা আছে; তাই তোমাদের পাশে আমার প্রতিটি অপরাধই গুরুতর হয়ে ওঠে।</p>
<p>আবুল হুসাইন নুরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আবু হামজার কিছু সঙ্গীকে দেখলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি আবু হামজার সঙ্গী, যিনি সাক্ষাতের সময় নৈকট্যের দিকে ইশারা করেন? তখন তাকে বলা হলো, আবুল হুসাইন নুরি আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, নৈকট্যের নৈকট্যেই তো আমরা দূরত্বের পর দূরত্বে আছি।<a href="#_ftn11" name="_ftnref11">[11]</a></p>
<p>আর সত্তাগত নৈকট্যের কথা হলো, আল্লাহ তায়ালা, যিনি মালিক, তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে। কারণ তিনি সীমা, প্রান্ত, শেষ, পরিমাণ, সৃষ্টির সংযোগ এবং কোনো পূর্বঘটিত বিষয় তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধারণা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। এসব স্থূল দেহগত ধারণা, মিলন ও বিচ্ছেদের সম্ভাবনা নিজের সঙ্গে নিয়ে আসে।</p>
<p>তাই আল্লাহর নৈকট্য তাঁর সত্তার ক্ষেত্রে অসম্ভব। এটি হবে সত্তার ঘনিষ্ঠতা ধরনের ধারণা। তবে তাঁর নিয়ামতের ক্ষেত্রে নৈকট্য ওয়াজিব তথা নিশ্চিত; কারণ সেটি ইলম ও রুয়্যত তথা জ্ঞান ও প্রত্যক্ষ অবগতির নৈকট্য। আর তাঁর গুণের ক্ষেত্রে নৈকট্য জায়েজ; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, তাকে এ গুণ দ্বারা বিশেষ মর্যাদা দেন। আর তাঁর কর্মের ক্ষেত্রে নৈকট্য হলো লুতফ তথা অনুগ্রহের নৈকট্য।</p>
<p>একটি নুসখার প্রান্তটীকায় ‘আয-যাত’ শব্দটি এভাবে সংশোধন করেছেন আল্লামা মুহাম্মদ আল-মুবারক। অন্য সব নুসখায় “আয-যাওয়াত” বহুবচনে এসেছে। সে পাঠ অনুযায়ী অর্থ দাঁড়ায়, সৃষ্ট বস্তুগুলোর সত্তাগুলোর নৈকট্য তাঁর সেই সত্তার প্রতি, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কাছে থাকার গুণে বর্ণিত হয় না। আল্লাহই অধিক জানেন।<a href="#_ftn12" name="_ftnref12">[12]</a></p>
<h2>ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:</h2>
<p>ইবনে আরাবি কুরবকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। চিন্তার মাধ্যমে, ইলমের মাধ্যমে এবং আমলের মাধ্যমে নৈকট্য। তিনি দেখিয়েছেন, আরিফদের কাছে নৈকট্য মানে আল্লাহর তাজাল্লি প্রত্যক্ষ করা, এর বাইরে আর কিছু নয়। বায়েজিদ বোস্তামির ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহর কাছে যেতে হয় নিজের অসহায়ত্ব ও মুখাপেক্ষিতা নিয়ে, কারণ এসব গুণ আল্লাহর নেই। বু&#8217;দ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটি মূলত বিচ্ছেদের অবস্থা; যখন প্রতিটি সত্তা নিজের স্বতন্ত্রতার কারণে অন্যটি থেকে আলাদা হয়ে যায়।</p>
<h3>কুরব:</h3>
<p>কুরব হলো আল্লাহর আনুগত্যের কাজে প্রতিষ্ঠিত থাকা। কিন্তু অনেকে কেবল নিজেদের আনুগত্যের ইপর নির্ভর করে থাকে এবং এটার মাধ্যমেই তারা আল্লাহকে পেতে চায়।</p>
<p>কাবা কাওসাইন বা দুই ধনুকের দূরত্ব বলতে বৃত্তের দুই ধনুক বোঝানো হয়। বৃত্ত যখন কোনো রেখা দিয়ে কাটা হয়, অথবা তার চেয়েও নিকটতর কোনো রেখা দিয়ে ভাগ করা হয়, তখন এ রূপ প্রকাশ পায়।</p>
<p>إذا تقطعت بخط أكرة فبدا قوسان ذلك قرب الحق فاعتبروا<br />
যখন বৃত্ত একটি রেখায় কাটা পড়ে এবং দুটি ধনুক প্রকাশিত হয়, তখন সেখান থেকেই আল্লাহর নৈকট্যের ইঙ্গিত গ্রহণ করো।</p>
<p>إلى الحقيقة أدنى منهما فإذا ما جزته لاح ما يقضي به النظر<br />
হাকিকতের দিক থেকে এর চেয়েও নিকটতর স্তর আছে। তুমি যখন তা অতিক্রম করবে, তখন চিন্তা ও বিবেচনার দাবিকৃত সত্য উন্মোচিত হবে।</p>
<p>إن المعارج للأرواح نسبتها خلاف نسبة ما يسري به البصر<br />
রুহগুলোরও আরোহনের পথ আছে; তবে তার সম্পর্ক চোখে দেখা চলাচলের সম্পর্কের মতো নয়।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ &#8211; আমি তার গলার শিরার চেয়েও তার বেশি কাছে। সুরা কাফ, আয়াত: ১৬। এখানে আল্লাহ নিজেকে বান্দার কাছে বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বান্দার ক্ষেত্রে যে নৈকট্য কাম্য, তা হলো বান্দা এমন গুণে গুণান্বিত হওয়া, যার কারণে তাকে আল্লাহর কাছে বলা যায়। অর্থাৎ বান্দা আল্লাহর নৈকট্যের গুণ ধারণ করবে, যেমন আল্লাহ নিজেকে বান্দার কাছে বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আর বলেছেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ &#8211; তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪।</p>
<p>মানুষ চায়, তারা যেন সবসময় আল্লাহর সঙ্গে থাকে, আল্লাহ যে তাজাল্লির যে রূপেই প্রকাশিত হোন না কেন। অথচ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রূপে সদা তাজাল্লি প্রকাশ করেই চলেছেন। তাই বান্দা তাঁর সঙ্গে আছে; কারণ তাজাল্লি সর্বদা ঘটছে।</p>
<p>বান্দা যেমন নিজের আনিয়্যাহ তথা আপন-সত্তা থেকে কখনো খালি হয় না, তেমনি আল্লাহও সবসময় তার সঙ্গে আছেন। কারণ বান্দার আনিয়্যাহই সেই রূপ, যেখানে আল্লাহর তাজাল্লি প্রকাশ পায়। এ কারণেই আরিফগণ নৈকট্যের সাক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হন না। তাঁরা নিজেদের মধ্যেও এবং নিজেদের বাইরে অন্য সব রূপেও আল্লাহর তাজাল্লি প্রত্যক্ষ করেন। তাঁদের কাছে নৈকট্য মানে আল্লাহর তাজাল্লি দেখা; এর বাইরে আর কিছু নয়।</p>
<p>আর আনুগত্যের মাধ্যমে যে নৈকট্য অর্জিত হয়, তার ফল হলো বান্দা দুর্দশা থেকে সৌভাগ্যের দিকে ওঠে, অন্ধকার থেকে নুরের দিকে আসে। এই নৈকট্য বান্দাকে তার সব উদ্দেশ্যের সৌভাগ্য এনে দেয়। তবে এর পূর্ণতা জান্নাত ছাড়া আর কোথাও সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না।</p>
<p>দুনিয়ায় অবশ্য বান্দাকে নিজের কিছু ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছাড়তেই হয়। তাই নৈকট্য দুই রকম। সাধারণ নৈকট্য ও বিশেষ নৈকট্য। সাধারণ নৈকট্য হলো, যার মাধ্যমে মানুষ সুখী হওয়ার পথ পায়। আর আরিফদের নৈকট্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। সেই নৈকট্যে সুখ আছে, বরং সুখেরও অতিরিক্ত বেশি কিছু আছে। কারণ ইলাহি নামসমূহ ও সগেুলোর বিধানের কারণেই সৃষ্টিজগতে নৈকট্য ও বু‘দের অবস্থা প্রকাশ পায়।</p>
<p>প্রত্যেক বান্দার অবস্থা এমন যে, প্রত্যেক সময় তাকে কোনো না কোনো ইলাহি নামের নৈকট্যে থাকতে হয় এবং অন্য কোনো নামের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে হয়। কারণ একই সময়ে সব নামের বিধান একসঙ্গে তার ওপর কার্যকর হয় না।</p>
<p>যে সময়ে কোনো কার্যকর ইলাহি নামের বিধান বান্দাকে দুর্দশা থেকে মুক্তি ও সৌভাগ্যের অধিকারী করে দেয়, সে সময়ে সেই নামের নৈকট্যই সুফিদের দৃষ্টিতে কাঙ্ক্ষিত নৈকট্য। অর্থাৎ, যে নৈকট্য বান্দাকে সৌভাগ্য দেয়, সেটিই তাঁদের পরিভাষায় নৈকট্য। আর যদি কোনো নামের সম্পর্ক বান্দাকে এই ফল না দেয়, তাহলে সুফিদের পরিভাষায় সেটি নৈকট্য নয়; যদিও অন্য দিক থেকে, শুধু তার ওপর যে বিধান কার্যকর হয়েছে সেই হিসেবে, তাকে এক ধরনের নৈকট্য বলা যেতে পারে।</p>
<p>এই বিষয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন:</p>
<p>مَا تَقَرَّبَ الْمُتَقَرِّبُونَ بِأَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ أَدَاءِ مَا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِمْ، وَلَا يَزَالُ الْعَبْدُ يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ لَهُ سَمْعًا وَبَصَرًا وَيَدًا وَمُؤَيِّدًا</p>
<p>“আমার বান্দারা আমার নৈকট্য লাভের জন্য এমন কোনো আমল নিয়ে আসে না, যা আমার কাছে তাদের ওপর ফরজ করা আমল আদায়ের চেয়ে বেশি প্রিয়। আর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ, তার দৃষ্টি, তার হাত এবং তার সহায় হয়ে যাই।” সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২।</p>
<p>আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সহিহ হাদিসে কুদসিতে আরও বলেছেন:</p>
<p>مَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَمَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا، وَمَنْ أَتَانِي يَسْعَى أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً</p>
<p>“যে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে দুই বাহুর দূরত্ব পরিমাণ এগিয়ে যাই। আর যে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাই।”<a href="#_ftn13" name="_ftnref13">[13]</a></p>
<p>আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আরও বলেছেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ &#8211; আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দিন) নিশ্চয় আমি কাছেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬।</p>
<p>মৃত ব্যক্তির বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ &#8211; আমি তোমাদের চেয়েও তার বেশি কাছে; কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৮৫।</p>
<p>আমাদের মতে এর অর্থ হলো, তোমরা দেখছ, কিন্তু কী দেখছ তা জানো না। তাই তোমাদের দেখা যেন না দেখার মতো।</p>
<p>অতঃপর জেনে রাখো, আল্লাহর নৈকট্য তিনভাবে হয়। প্রথমত, চিন্তা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে আল্লাহর মারিফত অর্জনের নৈকট্য। মানুষ সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করে, তারপর সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায় কিংবা ভুল করে। সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করার পর তার ইজতিহাদ শেষ হয়। কিন্তু মুজতাহিদ কখনো এমন বিষয়কেও দলিল মনে করতে পারে, যা আসলে দলিল নয়। তখন আল্লাহ তাকে সঠিক দলিলধারীদের মতোই প্রতিদান দেন। কারণ সে আল্লাহর বাণী থেকে যা বুঝেছে, তা অনুযায়ী কাজ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ &#8211; আর যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে, যার পক্ষে তার কাছে কোনো দলিল নেই।” সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১১৭।</p>
<p>কিছু আলিমের মত হলো, শাখাগত ও মূলগত উভয় বিষয়ে ইজতিহাদের অবকাশ আছে। মুজতাহিদ যদি ভুল করে, তবু তার জন্য একটি সওয়াব আছে। আর যদি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তবে তার জন্য দুটি সওয়াব আছে।</p>
<p>দ্বিতীয় প্রকার হলো ইলমের মাধ্যমে নৈকট্য। আর তৃতীয় প্রকার হলো আমলের মাধ্যমে নৈকট্য। আমলের মাধ্যমে নৈকট্য আবার দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ হলো ফরজ আদায়ের মাধ্যমে নৈকট্য। দ্বিতীয় ভাগ হলো প্রকাশ্য ও গোপন আমলে নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য।</p>
<p>ইলমের নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তর হলো তাওহিদের ইলম। কারণ আল্লাহর উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। যদি এই ইলম সরাসরি মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি থেকে আসে, চিন্তা-ভাবনা ও যুক্তি-অনুসন্ধান থেকে না আসে, তবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের কথা আল্লাহ তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেছেন, شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ &#8211; আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; ফেরেশতারা এবং ইলমের অধিকারীরাও সাক্ষ্য দিয়েছে।” সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮।</p>
<p>কারণ এই সাক্ষ্য যদি মুশাহাদা থেকে না আসে, তাহলে তা আসল সাক্ষ্য নয়। মুশাহাদার মধ্যে সন্দেহ প্রবেশ করে না, সংশয়ও ঢোকে না। আর যদি কেউ আল্লাহর একত্বকে সেই দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে, যা তাকে চিন্তা-অনুসন্ধান দিয়েছে, তবে সে এই উল্লিখিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ চিন্তাশীল মানুষ যতই চিন্তা করুক, কোনো না কোনো সময়ে তার দলিল ও প্রমাণের ভেতর সন্দেহ ঢুকতে পারে। আবার তার ভেতরে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।</p>
<p>তাই চিন্তা-ভিত্তিক ইলমের মানুষ কখনো মুশাহাদার মানুষের শক্তি লাভ করে না। এই শ্রেণির মানুষের ব্যাপারে যদি আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামে প্রবেশের ফয়সালা করেন, তবে সেই দলিলই তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবে; তবে তা হবে শাফায়াতকারীদের শাফায়াতের পর।</p>
<p>আর আমলের মাধ্যমে নৈকট্য দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি প্রকাশ্য আমলের ইলম, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়টি গোপন আমলের ইলম, যা নফসের সঙ্গে সম্পর্কিত।</p>
<p>জেনে রাখো, গোপন আমলের সবচেয়ে বড়টি হলো আল্লাহর প্রতি ইমান আনা এবং রসুলের কাছ থেকে যা এসেছে তা অস্বীকার না করা। ইমানের আমল সব কাজ ও সব বর্জনকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই কোনো মুমিন প্রকাশ্য বা গোপন কোনো গুনাহে লিপ্ত হলে, তার মধ্যেও আল্লাহর দিকে একটি নৈকট্য থাকে। তা এই দিক থেকে যে, তার ইমান তাকে জানিয়ে দেয়, এটি গুনাহ। সুতরাং কোনো মুমিনের মন্দ আমল একেবারে নিখাদ মন্দ থাকে না; বরং তার সঙ্গে কোনো না কোনো নেক আমল মিশে থাকে।</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা এমন মানুষের ব্যাপারে বলেছেন, عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ &#8211; আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। সুরা তাওবা, আয়াত: ১০২।</p>
<p>এখানে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, তা এই নয় যে, তারা তাওবা করেছে। বরং এর অর্থ হলো, তারা ক্ষমা ও ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনার দিকে ফিরে এসেছে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে “আশা করা যায়” বলা সব আলিমের মতে ‘অবধারিত হওয়া’র অর্থ দেয়।</p>
<p>ফরজ ইমান সঠিকভাবে গৃহীত হওয়ার জন্য শর্ত হলো সব ফরজ ইমান গ্রহণ করা। এরপর বান্দা ফরজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। যার মধ্যে এ অবস্থা পূর্ণ হলো, সে হকের শ্রবণ হয়ে গেল, হকের দৃষ্টি হয়ে গেল। হক তার ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছার সঙ্গে এক করে দিলেন; আর বান্দা জানল যে তার ইচ্ছাই আল্লাহর ইচ্ছা এবং তার সংঘটনও আল্লাহর পক্ষ থেকেই। কিন্তু শুধু ইলম থাকলেই কেউ এই মাকামের অধিকারী হয় না। এই মাকামের মানদণ্ড হলো ফরজ আদায়; আর ফরজ আদায়ই আল্লাহর নৈকট্যের সবচেয়ে প্রিয় পথ।</p>
<p>নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্যের বিষয়েও বান্দা আল্লাহর মুখমণ্ডলের দিকে থাকে। আর আল্লাহর ভালোবাসা তাকে এ মর্যাদা দেয় যে হক তার শ্রবণ ও দৃষ্টি হয়ে যান। ফরজের নৈকট্য থেকে নফলের নৈকট্যের পার্থক্য এখানেই।</p>
<p>ভালোবাসারও পৃথক পৃথক স্তর আছে। প্রেমিকের মধ্যে যেমন ভালোবাসার বিভিন্ন মর্যাদা আছে— প্রেমিক, প্রিয় এবং সবচেয়ে প্রিয়; আল্লাহ নিজেকেও “আহাব্ব” তথা অধিক প্রিয় বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি তার কাছে আমার নির্ধারিত ফরজ আদায়ের চেয়ে বেশি প্রিয় কোনোকিছুর মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করাকে দেখি না।” আর নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, “আমি তাকে ভালোবাসি।” এটি আলাদা মর্যাদা। ইমান তার ওপর ফরজ করা হয়েছে; তাই মুমিনের জন্য ভালোবাসা আছে, আবার অধিক ভালোবাসাও আছে।</p>
<p>অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলও এক ধরনের নৈকট্য। এ ধরনের আমলের ফল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লাভ করবেই। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার আমলের ফল পাবে; সে যে ঘরেই থাকুক, যে শ্রেণিরই হোক, সে ওই আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্য করুক বা না করুক।</p>
<p>কারণ আমল নিজেই তার ফল দাবি করে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে যে কাজ ঘটে, তার একটি অধিকার আছে; নিয়তেরও একটি অধিকার আছে, আর নিয়ত নফসের অধিকার। এমনকি কোনো মানুষ যদি ডান হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে আল্লাহর জিকির করতে থাকে এবং সেই ছুরি দিয়ে কোনো মানুষের অঙ্গ কেটে ফেলে, তবে যে জিকির জিহ্বা ও নফসের ওপর চলেছে এবং সে বিষয়ে তার যে নিয়ত ছিল, তার কারণে অঙ্গের জন্য জিকিরের সওয়াব থাকবে; কিন্তু আগের কথার সঙ্গে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। বাহ্যিক শরিয়তের বিধান তার কসমের কারণে দাবিদারের অধিকার বাতিল করে দিয়েছে। দুনিয়ার প্রকাশ্য বিচারে একটি অঙ্গের কাজের প্রভাব যদি এত শক্তিশালী হয়, তাহলে আখিরাতে সেই অঙ্গ যখন নিজের রবের জিকির করেছে, তখন তার অর্জিত ফল কেমন হবে— একবার ভাবো।</p>
<p>কারণ অঙ্গ নিজে জানে না, এ বিষয়ে নফস কী নিয়ত করেছে। তার অংশ তো শুধু আল্লাহর জিকির উচ্চারণ করা। সে জানে না, এই জিকির নফসের জন্য বিপদ হয়ে ফিরবে কি না। সে এটাও জানে না, এটি শরিয়তসম্মত ছিল, না শরিয়তসম্মত ছিল না।</p>
<p>এ কারণেই যখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও চামড়া, তাদের পরিচালনাকারী নফসের বিরুদ্ধে নিজেদের দ্বারা সংঘটিত আমলের সাক্ষ্য দেবে, তখন তারা এ সাক্ষ্য দেবে না যে, কাজটি গুনাহ ছিল নাকি আনুগত্য ছিল। তারা শুধু সাক্ষ্য দেবে, তারা কী কাজ করেছে। আর সেই কাজের প্রকৃত বিধান আল্লাহই জানেন।</p>
<p>এ কারণেই কিয়ামতের দিন তারা সাক্ষ্য দেবে— تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ &#8211; তাদের জিহ্বা, তাদের হাত এবং তাদের পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে; তারা যা করত সে সম্পর্কে। সুরা নুর, আয়াত: ২৪।</p>
<p>কিন্তু তারা এ সাক্ষ্য দেবে না যে, কাজটি আনুগত্য ছিল নাকি গুনাহ ছিল। কারণ তাদের মর্যাদা সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার নয়। সুতরাং মানুষ তার দেহের দিক থেকে পুরোপুরি সৌভাগ্যবান; আর নফসের দিক থেকে, যদি সে মুমিন হয়, তবে সে মিশ্র অবস্থার অধিকারী; তার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটোই থাকে।</p>
<p>আর আল্লাহ বান্দার কাছে থাকার দিক থেকে দুই ধরনের নৈকট্য আছে। একটি হলো রহমত, মমতা, ক্ষমা, ছাড়, মাগফিরত ও ইহসানের নৈকট্য। আরেকটি নৈকট্য এমন, যার পর্দা পুরোপুরি উন্মোচন করা সম্ভব নয়; তবে তার দিকে ইশারা করা যায়। আমরা বলি, আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কাছে তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তখন হয় তিনি কোনো মাদ্দা তথা বস্তুগত রূপে প্রকাশিত হন, নয়তো বস্তুর রূপ ছাড়া প্রকাশিত হন।</p>
<p>যদি আল্লাহ কোনো দৃশ্যমান রূপে তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তাহলে সেই রূপের মাধ্যমেই তাঁর নৈকট্য প্রকাশ পায়। তখন মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ দর্শন এবং রুয়াত তথা দেখার অবস্থায় সেই নৈকট্য অনুভূত হয়।</p>
<p>আর যদি তিনি বস্তুর রূপ ছাড়া তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তাহলে নৈকট্য হয় মর্যাদা ও স্তরের নৈকট্য। যেমন বাদশাহর সঙ্গে মন্ত্রীর, বিচারকের, গভর্নরের বা হিসবার দায়িত্বশীলের নৈকট্য। এটি স্তরভেদে ভিন্ন ভিন্ন নৈকট্য। কখনো নিম্নপদের লোক বাদশাহর পাশে, তাঁর বামদিকে, এমন কোনো আদেশের জন্য বসে, যা তার পদমর্যাদায় কার্যকর হবে। আর উচ্চপদের কেউ সেই একই মজলিসে আসনের দিক থেকে আরও দূরে থাকে। কিন্তু আসনে কাছে থাকা প্রমাণ করে না যে, সে দূরে থাকা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। কারণ বস্তুগত অবস্থার বিধান আর আত্মিক মর্যাদার বিধান এক নয়।</p>
<p>এ কথা বুঝলে তুমি আল্লাহর নৈকট্যের ইলমের কাছে পৌঁছে গেলে। কারণ দুই সত্তার মধ্যে নৈকট্যের ধারণা এক দিক থেকে পরস্পর-সম্পর্কিত। যে তোমার কাছে, তুমিও তার কাছে; এই অর্থে তোমার ওপরও নৈকট্যের গুণ আরোপিত হয়। কিন্তু প্রকৃত অবস্থায় আল্লাহ থেকে দূরে থাকার কোনো পথই নেই। দূরত্ব কেবল আপেক্ষিক বিষয়; ইলাহি নামগুলোর বিধানে তা প্রকাশ পায়।</p>
<p>যে সময় কোনো ব্যক্তির ওপর একটি ইলাহি নামের বিধান কার্যকর থাকে, সেই সময়ই সে সেই নামের নৈকট্যে থাকে এবং অন্য নামের বিধান থেকে দূরে থাকে। আর যে ইলাহি নামের বিধান ওই সময়ে তার ওপর কার্যকর নয়, সে নাম তার থেকে দূরে। কিন্তু তুমি যার কবজায় আছো, তার থেকে তুমি কীভাবে দূরে হবে, অথবা তিনি তোমার থেকে কীভাবে দূরে হবেন?</p>
<p>আল্লাহ তায়ালা কি আদম (আ.)-এঁর জন্য তাঁর কুদরতি ডান হাত খুলে দেননি? আর তাঁর উভয় হাতই বরকতময় ডান হাত। তিনি তা প্রসারিত করলেন, তখন তাতে আদম ও তাঁর সন্তানসন্ততি ছিল। তাহলে যে হকের ডান হাতে আছে, তার দুর্ভাগ্য কি স্থায়ী হতে পারে? না, আল্লাহর কসম, পারে না। আর অন্য কবজায় ছিল সমগ্র জগত।</p>
<p>এখন দেখো, আদমকে হকের ডান হাতে নির্বাচন করার মধ্যে কী রহস্য আছে। যদিও আদম জানতেন, তাঁর রবের উভয় হাতই বরকতময় ডান হাত। এর অর্থ তাই, যা আমরা উল্লেখ করেছি।</p>
<p>যদি আদমের জন্য তাজাল্লি বস্তুগত রূপে না ঘটত, তাহলে দুই হাতকে ধরা ও প্রসারিত করার গুণে বর্ণনা করা হতো না। নৈকট্যের পরিচয় সম্পর্কে আমরা তোমাকে সতর্ক করেছি, যেন তুমি নিজের ভেতর আল্লাহর সঙ্গে তা প্রত্যক্ষ করতে পারো— যদি তুমি এই দুনিয়াতেই তাজাল্লির অধিকারী হও।</p>
<p>আর যখন তাজাল্লি বস্তুগত রূপে ঘটে, তখন সীমা-পরিমাণ অবশ্যই আসে। তাই আসে বিঘত, হাত, দুই বাহুর দূরত্ব, হেঁটে আসা ও দ্রুত এগিয়ে আসার ভাষা— এ-সব অবস্থার দাবি অনুযায়ী। কারণ বস্তুগত রূপে নৈকট্য অবস্থার অধীন। ফলে দুই নিকটবর্তী সত্তার মধ্যে বস্তুগত নৈকট্য অবস্থার পরিমাণ অনুযায়ী হয়। এতে জানা যায়, সেই নৈকট্যের রূপটি আসলে অবস্থারই প্রকাশ; সে অবস্থাগুলোর ভাষ্যকার।</p>
<p>আর আল্লাহর নৈকট্য যদি রূপ ধারণের দিক থেকে হয়, তাহলে তা শুধু খলিফাদের জন্য বিশেষ; তারা রসুল হোন বা রসুল না হোন। কারণ রিসালত ইলাহি কোনো স্বভাবগত গুণ নয়; বরং তা প্রেরক ও প্রেরিত ব্যক্তির মধ্যকার একটি সম্পর্ক। উদ্দেশ্য হলো, প্রেরিত ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে সেই বার্তা পৌঁছে দেবে, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো দরকার। তাই রসুল বিশেষভাবে তাবলিগের ক্ষেত্রে খলিফা ও প্রতিনিধি। আর খিলাফতের পূর্ণতা এবং প্রতিনিধিত্ব কেবল বিধান পরিচালনার ক্ষেত্রে। এর দাবি আসে ইলাহি নামসমূহের হাকিকত থেকে। কখনো কাহর তথা প্রবল দমন, ইর‘আদ তথা ভীতিপ্রদ কম্পন, ইহরাক তথা দহন, পাকড়াও, রহমত, ক্ষমা, ছাড়, হিসাব, প্রতিদান, প্রতিশোধ ও শাস্তির মাধ্যমে। ইলাহি বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো শাস্তি, যখন তা হিসাব ছাড়াই আসে, কিংবা যথাযথ অধিকার আদায়ে কোনো ছাড় ছাড়াই আসে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ &#8211; তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় না। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩।</p>
<p>আর পাকড়াও ও ছাড়ের কথা এসেছে হিসাবের পর। প্রশ্ন ও হিসাবের কথা এসেছে আল্লাহর এই বাণীতে, وَهُمْ يُسْأَلُونَ &#8211; আর তাদের প্রশ্ন করা হবে। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩। আর আল্লাহর বাণী, فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ &#8211; পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ একমাত্র আল্লাহরই। সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৯।</p>
<p>সুতরাং রূপগত নৈকট্য দুই ভাগে বিভক্ত। এক ধরনের খিলাফত হলো ইলাহি ঘোষণাপত্র ও অনুমোদনের মাধ্যমে। আরেক ধরনের খিলাফত হলো কোনো প্রকাশ্য অনুমোদন ছাড়া শুধু ইলাহি পরিচয়ের কার্যকারিতার মাধ্যমে। কিন্তু আদবের ভাষায় এ দ্বিতীয় ধরনের নৈকট্যকে খিলাফত বলা হয় না। বাস্তবতার বিচারে এটি খিলাফতও নয় এবং খলিফাও নয়। ঐ খিলাফতের ভেতরেও খলিফাদের মধ্যে স্তরভেদ আছে। আর প্রকৃত খিলাফত ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে খিলাফতের পরিচয় শুধু অর্থগত নৈকট্যে পূর্ণতা পায়।</p>
<p>কারণ যে ব্যক্তি ইলাহি পরিচয় ও অনুমোদনের ভিত্তিতে খলিফা, বাহ্যিকভাবে সে প্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকে, কিন্তু জগতে তার বিধান কার্যকর হয়। সে অন্য কারও আদেশে নয়; বরং যেন নিজেই নিজের ওপর শাসনকারী। কিন্তু যে ব্যক্তি জগতে নিজের বিধান নিজের মাধ্যমেই কার্যকর করে, কোনো ইলাহি আদেশ, অনুমোদন বা ঘোষণাপত্র ছাড়া, সে বাহ্যিক রূপে তাদের চেয়েও বেশি কাছে, যাদের খিলাফত ইলাহি আদেশ, পরিচয় ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। তবে সে সেই কাঙ্ক্ষিত সৌভাগ্যের বেশি কাছে, যার দিকে সে ব্যক্তি পৌঁছায়নি, যার খিলাফতের সঙ্গে ইলাহি আদেশ যুক্ত হয়নি।</p>
<p>আল্লাহর মারিফতের ক্ষেত্রে নৈকট্য সম্পর্কে এটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।</p>
<h3>বু‘দ:</h3>
<p>জেনে রাখো, বু‘দ হলো বিরোধিতার ওপর অটল থাকা। আর তোমার থেকে যা দূরে, তার ক্ষেত্রেও বু‘দ শব্দ ব্যবহার করা হয়।</p>
<p>البعد مسلك ذئب ونسر وشفع ووتر<br />
বু‘দ হলো নেকড়ে, শকুন, জোড়া ও বিজোড়ের পথ।</p>
<p>لما رأيت إماما يقول للقوم سيروا<br />
যখন আমি এক ইমামকে দেখলাম, তিনি লোকদের বলছেন, “চলো।”</p>
<p>صفوكم في صلاة لها السهلا والمدعر<br />
তোমরা নামাজে নিজেদের সারি সোজা করো; এ সারিতে আছে সমতল পথও, কঠিন পথও।</p>
<p>علمت أن وجودي له البقا والسفر<br />
তখন বুঝলাম, আমার অস্তিত্বের জন্য আছে স্থায়িত্বও, আছে সফরও।</p>
<p>জেনে রাখো, অবস্থার ভিন্নতার কারণে বু‘দের অর্থও ভিন্ন হয়। অবস্থার লক্ষণ ও ইঙ্গিত দেখে বুঝতে হবে, কোন বু‘দ উদ্দেশ্য। আর যে-সব অবস্থা ও আলোচনা আমরা আগে উল্লেখ করেছি, সব মিলিয়ে মূল কথা হলো— যদি বু‘দ বান্দার এমন কোনো গুণ না হয়, যা তার ঠিক বিপরীত গুণকে মুছে দেয়, তাহলে এই অধ্যায়ের সারকথা এটিই, যার দিকে এই পথের সাধকগণ ইঙ্গিত করেছেন।</p>
<p>আমাদের মতে বু‘দের বিধান হলো, মানুষ যে বিষয়কে বু‘দ মনে করে, কখনো তা এর বিপরীতও হতে পারে; যদিও আমরা তা স্বীকার করলাম যে, তারা যা বু‘দ মনে করেছে, তা সত্যিই বু‘দ। তবে আমরা এখানে এমন কিছু সূক্ষ্ম বিষয় বাড়িয়েছি, যা সাধারণত লোকদের চোখ এড়িয়ে যায়। তারা যে বিষয়গুলোকে বু‘দের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছে, আমরা সেগুলোও উল্লেখ করব।</p>
<p>কুরব ও বু‘দের সম্পর্ক হলো মিলন ও বিচ্ছেদের সম্পর্ক। যেখানে মিলন ঘটে, সেখানে বিচ্ছেদের অবস্থা থাকে না; আর যেখানে বিচ্ছেদ ঘটে, সেখানে মিলনের অবস্থা থাকে না। সুতরাং দুটি বিষয় যখন কোনো এক অবস্থায় মিলিত হয়, সেটিই নৈকট্যের চূড়ান্ত সীমা। কারণ যে জায়গায় তারা মিলেছে, সেখানে প্রত্যেকটি সত্তা অন্যটির সঙ্গী হয়ে ওঠে।</p>
<p>আর যখন প্রত্যেকটি সত্তা নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যটি থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন বিচ্ছেদ ঘটে। এই বিচ্ছেদই বু‘দ। কারণ তখন একটি সত্তা অন্যটির সঙ্গে মিলিত থাকে না; বরং নিজ নিজ স্বরূপে আলাদা থাকে। বস্তুর সীমারেখায় এই আলাদা হয়ে থাকার রূপ প্রকাশ পায়। আর যখন বু‘দ ঘটে, তখন বিধানও ভিন্ন হয়ে যায়।</p>
<p>কখনো বু‘দ হয় আপেক্ষিক; যেমন স্থান, সময়, একক, পরিমাণ, সৃষ্টিজগৎ ও রঙের ভিন্নতা। কারণ এসব বিষয়ের নিজস্ব স্বভাবই ভিন্নতা দাবি করে। সুতরাং যখন দুটি বিষয়কে এমনভাবে ধরা হয় যে, একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই, এবং সব দিক থেকে তারা একে অন্যের থেকে আলাদা, তখন সেটিই বু‘দের চরম সীমা।</p>
<p>তবে জগৎ আল্লাহ থেকে দূরে নয়। কারণ জগৎ আল্লাহ থেকেই আছে; আবার আল্লাহ নিজের সত্তার দিক থেকে এমন সত্তা, যিনি সবকিছুকে একত্র করেন। এ কথাই আল্লাহ তায়ালার বাণীতে আছে, اللَّهُ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ &#8211; আল্লাহ সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭। আর আল্লাহ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুই ছিল না।</p>
<p>এরপর বু‘দের আরেক স্তরে নেমে দেখো। আমরা বলি, বান্দা কখনো নিজের মনিব থেকে এত দূরে নয় যে, তার কোনো প্রভুই নেই। কারণ যার কোনো প্রভু নেই, সে বান্দাই থাকে না। উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ কোনো নৈকট্যের অবস্থা নয়। বরং বান্দা এই জ্ঞানের মাধ্যমে তার মনিবের কাছে আসে যে, সে তাঁর বান্দা; আর তার মনিবও জানেন, এ ব্যক্তি তাঁরই বান্দা। এই উবুদিয়্যাতই তার আসল পরিচয়। তাই উবুদিয়্যাত তাকে মনিব থেকে বু‘দের দাবি করে; আবার মনিব সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে মনিবের নৈকট্যের দাবি করে।</p>
<p>আল্লাহ বায়েজিদ বোস্তামিকে বলেছিলেন, যখন তিনি কুরব বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং বুঝতে পারছিলেন না, কী দিয়ে আল্লাহর কাছে যাবেন। তখন গোপনে তাঁকে বলা হলো, يا أبا يزيد تقرب إلي بما ليس لي الذلة والافتقار &#8211; হে আবু ইয়াজিদ, এমন জিনিস দিয়ে আমার কাছে এসো, যা আমার নেই; আর তা হলো অসহায়  অবস্থা ও মুখাপেক্ষিতা।”</p>
<p>আল্লাহ সুবহানাহু নিজের ব্যাপারে জিল্লত তথা অসহায় অবস্থা এবং ইফতিকার তথা মুখাপেক্ষিতাকে নাকচ করেছেন। আর যে গুণ আল্লাহ নিজের থেকে নাকচ করেছেন, সেটি তাঁর থেকে বু‘দের গুণ। সুতরাং, যার মধ্যে এই গুণ প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সেই গুণে গুণান্বিত হয়, যা বু‘দের দাবি করে। অর্থাৎ এই গুণের দিক থেকে সে বু‘দের অবস্থায় থাকে।</p>
<p>আরেক সময় বায়েজিদ তাঁর রবকে বললেন, “আমি কীভাবে আপনার কাছে যাব?” তখন হক তাঁকে বললেন, اترك نفسك وتعال  &#8211; তোমার নফসকে ছেড়ে দাও, তারপর এসো।</p>
<p>অর্থাৎ, যখন তুমি নিজের নফসকে ছেড়ে দেবে, তখন নিজের বান্দাত্বের বিধানও ছেড়ে দিলে। কারণ বান্দাত্বই তো প্রভুত্ব থেকে দূরে থাকার মূল চিহ্ন। বান্দা মনিব থেকে দূরে— তার জিল্লত ও মুখাপেক্ষিতার দিক থেকে। তাই আল্লাহ তাঁর কাছে চাইলেন বান্দাত্বের মাধ্যমে নৈকট্য। আবার আল্লাহর আখলাকে গুণান্বিত হওয়ার পথে তাঁর কাছে চাইলেন নফসকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে নৈকট্য। এবং আল্লাহর আখলাকে গুণান্বিত হওয়াই এক ধরনের মিলন।</p>
<p>সুতরাং বস্তু-রূপ ছাড়া তাজাল্লি হলে সেখানে বু‘দের তাজাল্লি ঘটে। আর বস্তু-রূপে তাজাল্লি হলে কুরবের তাজাল্লি ঘটে। ইলাহি নামসমূহ থেকে বু‘দ বলতে বোঝায়— প্রত্যেক নামের বিধান একই সময়ে বান্দার ওপর কার্যকর না থাকা।</p>
<p>জেনে রাখো, ইলাহি নামসমূহের বিধান যখন বান্দার মধ্যে ইলাহি আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ পায়, তখন সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্বের নৈকট্যে থাকে; সরাসরি হাকিকতের নৈকট্যে নয়। আর যখন সেই নামগুলোর কিছু বিধান ইলাহি আদেশের বাইরে প্রকাশ পায়, তখন সে সেই বু‘দের মধ্যে পড়ে, যেখান থেকে আশ্রয় চাইতে হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وأعوذ بك منك &#8211; আমি আপনার থেকেই আপনার আশ্রয় চাই।</p>
<p>এ আশ্রয় চাওয়ার কারণ হলো, সৃষ্টির হাকিকত তার সৃষ্ট অবস্থায় কখনো আল্লাহর স্রষ্টা হওয়ার গুণে, আল্লাহর কিবরিয়া তথা মহত্ত্বে এবং আল্লাহর জাবারুত তথা পরাক্রমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এগুলো হকের গুণ। যদি এ গুণগুলো বান্দার মধ্যে দাঁড়িয়ে যায়, তবে হক তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তাই বান্দা তখন আল্লাহর আশ্রয় চায় এমন জিনিস থেকে, যার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয়যোগ্য বিষয় নেই। কারণ হকের কিবরিয়া ও জাবারুত নিজের গুণ থেকেই আনন্দিত হয় বান্দার তাওবায়, বান্দার ফিরে আসায়, বান্দার ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও অসুস্থতার বর্ণনায়। সুতরাং এই আশ্রয় চাওয়ায় ফল আছে।</p>
<p>এর আরেক উদাহরণ হলো সেই কথাটি, যেখানে একই সত্তাকে আশ্রয়দাতা ও আশ্রয়প্রার্থী দুয়ের সঙ্গেই যুক্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি আল্লাহ। তাই বলা হয়: “আমি আপনার থেকেই আপনার আশ্রয় চাই।” সৃষ্ট সত্তা যখন আল্লাহকে মহিমান্বিত করে, তখন সে যে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, এটি সেই অবস্থার প্রকাশ।</p>
<p>আর বিরোধিতার বু‘দ হলো, বান্দা তার সৌভাগ্য থেকে দূরে সরে যায় এবং সেই ইলাহি নামসমূহ থেকেও দূরে যায়, যেগুলোর বিধান আনুগত্যে মিল ও সম্মতির দাবি করে। তবে বিরোধিতার মধ্যেও, দায়িত্বের দিক থেকে সৃষ্টিজগত যে ইলাহি নামসমূহের অধীন, সেগুলোর কিছু নৈকট্য থাকে। কারণ সেগুলো ক্ষমা ও পাকড়াওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুতরাং যে গুনাহ করে, সে পাকড়াওয়ের বিধানের কাছে থাকে। কারণ বিরোধিতা রহমত দাবি করে এবং শাস্তির সম্মুখীন করে; আর আল্লাহ তাঁর রীতিতে এভাবেই ব্যবস্থা করেছেন।</p>
<p>তাই বিরোধিতার বু‘দে এমন কিছু থাকে না, যা বান্দার সৌভাগ্য থেকে দূরত্ব ছাড়া আর কিছু প্রমাণ করে; হয় তার প্রাপ্যের কিছু কমে যায়, নয়তো অপরাধের কারণে তাকে পাকড়াও করা হয়।</p>
<p>আর আনুগত্যের মাধ্যমে যে বু‘দের কথা আগে বলা হয়েছে, সেটি হলো বায়েজিদের সেই কথার অর্থ: “তোমার নফসকে ছেড়ে দাও এবং এসো।” যে নিজের নফসকে ছেড়ে দেয়, সে তা থেকে দূরে চলে যায়। এই অধ্যায়ে আমরা তোমাকে এ কথার অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছি। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।<a href="#_ftn14" name="_ftnref14">[14]</a></p>
<p class="font-claude-response-body break-words whitespace-normal">দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে দেখা যায়, কুরব ও বু&#8217;দ আসলে একই সম্পর্কের দুই মুখ। একটি মিলনের, অন্যটি বিচ্ছেদের। কুশাইরি দেখিয়েছেন কুরবের স্তরভেদ এবং কীভাবে নৈকট্যের অনুভূতিও কখনো পর্দা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইবনে আরাবি আরও গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন, প্রকৃত কুরব হলো নিজের অস্তিত্বকে ভুলে আল্লাহর তাজাল্লিতে বিলীন হওয়া, আর বু&#8217;দ হলো নিজের স্বতন্ত্র সত্তায় আটকে থাকা। সবশেষে বলা যায়, কুরব ও বু&#8217;দ শেখায়— প্রকৃত নৈকট্য কোনো দূরত্ব মাপার বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের এক অবস্থা, যেখানে বান্দা নিজেকে ভুলে গিয়ে কেবল আল্লাহকেই দেখতে পান। এটাই সুফি সাধনার সেই গভীর সত্য, যেখানে নৈকট্য আর বিলীন হওয়া একই বিন্দুতে মিলিত হয়।</p>
<p><a href="#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/qurb-and-buad/">আল-কুরব ওয়াল-বু‘দ</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://sufigraphy.com/qurb-and-buad/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
