সুফি সাধনার পথে নাফাস বা শ্বাস শুধু ফুসফুসের ক্রিয়া নয়; এটি আধ্যাত্মিক জীবনের গভীরতম পরিমাপক। প্রতিটি শ্বাস হয় মারিফত ও তাওহিদের নির্দেশনা নিয়ে আসে, নয়তো গাফলতের বিছানায় মৃত হয়ে অতিবাহিত হয়। আনফাসের অধিকারী হলেন সর্বোচ্চ স্তরের সাধক, যাঁর আধ্যাত্মিক অনুভব শ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যাঁর ওপর গাইবাত ও হুজুরের পালাবদল আর ঘটে না। ওয়াক্ত হলো শুরুর মানুষের জন্য, হাল মাঝামাঝি স্তরের জন্য, আর আনফাস পূর্ণতার জন্য। ইবনে আরাবি এই নাফাসকে মহাজাগতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন; আল্লাহর নাফাস থেকেই সমস্ত সৃষ্টির উৎপত্তি, আর মানুষের শ্বাস থেকে বর্ণের উৎপত্তি।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি নাফাসকে গায়েবি লতিফ অনুগ্রহের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি লাভ বলেছেন। ওয়াক্ত প্রারম্ভিক, হাল মধ্যবর্তী, আর আনফাস চূড়ান্ত স্তর। আরিফের নাফাস সম্পূর্ণ শান্ত থাকতে পারে না, কারণ তার স্তরে কোনো শিথিলতা নেই। আর প্রেমিকের জন্য নাফাস অপরিহার্য; না হলে সে বিলুপ্ত হয়ে যেত। সর্বোত্তম ইবাদত হলো প্রতিটি শ্বাস আল্লাহর স্মরণে গণনা করা।
তিনি বলেন, নাফাস হলো গায়েবি লতিফ তথা অদৃশ্যের সূক্ষ্ম অনুগ্রহসমূহের মাধ্যমে অন্তরসমূহের প্রশান্তি লাভ করা, আর আনফাস তথা আধ্যাত্মিক শ্বাস-প্রশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তি আত্মিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী ব্যক্তির চেয়েও সূক্ষ্মতর। বিষয়টি এমন যেন ওয়াক্ত তথা আধ্যাত্মিক সময়ের অধিকারী ব্যক্তি হলেন প্রারম্ভিক স্তরের সাধক, আনফাসের অধিকারী ব্যক্তি হলেন চূড়ান্ত স্তরের সাধক এবং আহওয়ালের অধিকারী ব্যক্তি হলেন এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী সাধক।
সুতরাং আহওয়াল হলো আধ্যাত্মিক মাধ্যম বা অন্তর্বর্তী সোপানসমূহ এবং আনফাস হলো আত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায়।
অতএব আধ্যাত্মিক সময়সমূহ হলো কলবসমূহের অধিকারীদের জন্য, আহওয়াল হলো আরওয়াহ তথা রুহসমূহের অধিকারীদের জন্য এবং আনফাস হলো অন্তরের পরম গোপন রহস্যের অধিকারীদের জন্য।
আর সুফি মনীষীগণ বলেছেন, “সর্বোত্তম ইবাদত হলো আল্লাহ তায়ালা এর স্মরণে নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস গণনা করা তথা সদা সচেতন থাকা।”
তারা আরও বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং সেগুলোকে মারেফতের খনি বানিয়েছেন, আর তার অন্তরালে পরম গোপন অন্তস্তল সৃষ্টি করে তাকে তাওহিদের প্রধান কেন্দ্র করেছেন। সুতরাং চরম অবহেলা ও উদাসীনতার বিছানায় যে শ্বাস মারেফাতের কোনো প্রকার নির্দেশনা এবং তাওহিদের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছাড়া অতিবাহিত হয়, তা মূলত মৃত এবং তার অধিকারীকে এই শ্বাসের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”
আমি হজরত উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আরেফ তথা প্রকৃত আল্লাহ-সচেতন ব্যক্তির নাফাস বা শ্বাস সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শান্ত থাকে না, কারণ তার আধ্যাত্মিক স্তরে কোনো প্রকার শিথিলতা বা ছাড় চলে না। পক্ষান্তরে মুহিব্ তথা ঐশ্বরিক প্রেমিকের জন্য নাফাস বা প্রেমের দীর্ঘশ্বাস অপরিহার্য; কেননা তার যদি এই নাফাসটুকু না থাকত, তবে সে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেত, যেহেতু তা বর্জন করার সামর্থ্য তার নেই।”[1]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি নাফাসকে মহাজাগতিক রহস্যের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। তাঁর মতে মহাবিশ্বের প্রতিটি শ্বাস আল্লাহর নাফাস থেকেই নির্গত; সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর বাণীসমূহ, আর সেই বাণী তাঁর নাফাসের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের আটাশটি উচ্চারণস্থান আটাশটি চন্দ্রনিবাসের অনুরূপ। শ্বাস থেকে বর্ণ, বর্ণ থেকে শব্দ; ঠিক তেমনি আদি কুহেলিকা থেকে সৃষ্টিজগতের উৎপত্তি। হরফে হাবি, ওয়াও, ইয়া; এই তিন স্তর ফেরেশতাজগত, মানবিক বার্তা ও মূল উৎসের প্রতীক। নবীজির হাদিস, “ইয়েমেনের দিক থেকে রহমানের নাফাস পাচ্ছি” এই বৃহত্তর সত্যেরই ইঙ্গিত। ইনসানে কামেল হলো সেই বরজখ, যিনি হক ও খলকের মাঝে মধ্যবর্তী সেতু। আল্লাহর রহমত নাফাস রহমানির মাধ্যমে সৃষ্টিকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছে।
نَفَسُ الأَكْوَانِ مِن نَفَسِهِ وَهُوَ وَحْيُ الحَقِّ فِي جَرَسِهِ
মহাবিশ্বের প্রতিটি শ্বাস মূলত তাঁরই নাফাস হতে নির্গত এবং তা সৃষ্টির ঘণ্টার ধ্বনিতে সত্যের ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ।
وَكَلَامُ الحَقِّ شَاهِدُهُ أَثَرٌ فِي الكَوْنِ مِن نَفَسِهِ
আর হকের বাণীই এর ওপর সাক্ষী, যা মহাবিশ্বের বুকে তাঁরই নাফাসের এক দৃশ্যমান প্রভাব।
إِنَّ مُوسَى قَبْلُ أَبْصَرَهُ فِي اشْتِعَالِ النَّارِ فِي قَبَسِهِ
নিশ্চয় ইতিপূর্বে হজরত মুসা তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যখন তিনি জ্বলন্ত আগুনের স্ফুলিঙ্গ অবলোকন করেছিলেন।
مَعْدِنُ الرَّاحَاتِ فِيهِ فَمَنْ نَاظِرٌ فِيهِ وَفِي حَرَسِهِ
এর মাঝেই নিহিত রয়েছে সমস্ত প্রশান্তির খনি, সুতরাং যে ব্যক্তি এর প্রতি এবং এর সুরক্ষার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে—
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের অনিষ্ট থেকে নিজের সুরক্ষার বিষয়টি তথা আল্লাহ কর্তৃক তাকে নিরাপদ রাখার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে অবগত হওয়ার পূর্বে (যা ‘সুরা আল-মায়েদা’-এর ৬৭ নম্বর আয়াতের আল্লাহর এই বাণী: وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ – আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করবেন) যখন কোনো স্থানে যাত্রাবিরতি করতেন, তখন বলতেন, “আজ রাতে আমাদের কে পাহারা দেবে?” অথচ তিনি মনেপ্রাণে জানতেন যে, আল্লাহ ‘সুরা হুদ’-এর ৫৭ নম্বর আয়াত অনুযায়ী সবকিছুর ওপর পরম সংরক্ষক। عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ – নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর পরম রক্ষক।
এবং তিনি যখন বিরোধীদের পক্ষ থেকে তীব্র দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, إنَّ نَفَسَ الرَّحْمَنِ يَأْتِينِي مِنْ قِبَلِ الْيَمَنِ – নিশ্চয়ই আমি ইয়েমেনের দিক থেকে রহমানের নাফাস তথা পরম করুণাময়ের স্বস্তিদায়ক সাহায্য পাচ্ছি।
আর এই নাফাস তথা ঐশ্বরিক সাহায্য ছিল আনসার তথা মদিনার আনসার সাহাবিগণ। জেনে রাখুন, বিদ্যমান বস্তুসমূহ বা সৃষ্টিজগৎ হলো আল্লাহ তায়ালার এমন বাণীসমূহ যা কখনো শেষ হয় না। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসা আলাইহিস সালামের অস্তিত্বের ও সৃষ্টির রহস্যের ব্যাপারে অবগতি দান করে ‘সুরা আন-নিসা’-এর ১৭১ নম্বর আয়াতে বলেছেন যে, وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ – এবং তিনি তাঁর সেই বাণী, যা তিনি মরিয়মের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।
আর তিনিই হলেন হজরত ইসা আলাইহিস সালাম। এই কারণেই আমরা বলেছি যে, শ্রবণযোগ্য তথা শরয়ি প্রমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিদ্যমান বস্তু বা সৃষ্টিজগৎ হলো আল্লাহ তায়ালার কালাম তথা অসীম বাণীসমূহ; কারণ কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন কিংবা বিশেষ ঐশ্বরিক পরিচিতি সম্পর্কে আমরা যা দাবি করি, সে ব্যাপারে জগতের প্রত্যেকে আমাদের সত্যবাদী বলে স্বীকার করবে না। আর সাধারণ পরিভাষায় সুপরিচিত শব্দ বা বাণীসমূহ মূলত নাফাস তথা ফুসফুস থেকে নির্গত শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস থেকেই তৈরি হয়, যা মাখরাজ তথা নির্দিষ্ট উচ্চারণ স্থানসমূহে বাধা পেয়ে খণ্ডিত আকারে প্রকাশ পায়। ফলে সেই খণ্ডিত উচ্চারণের স্থানে সুনির্দিষ্ট অনুপাতে হরফ বা বর্ণসমূহের মূল রূপ প্রকাশ পায় এবং তা থেকেই শব্দ বা কালামের সৃষ্টি হয়।
এই অধ্যায়ে আমরা যা উপস্থাপন করছি সেদিকে গভীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আপনাকে সতর্ক করছি। জেনে রাখুন যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর আরশের ওপর কেবল ‘আর-রহমান’ নামের মাধ্যমেই ইস্তিওয়া তথা অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিজগৎকে অবগতি দান করেছেন যে, তিনি সৃষ্টির অস্তিত্বদানের মাধ্যমে মূলত সৃষ্টিজীবের প্রতি রহমত বর্ষণ করতে চেয়েছেন এবং এই বিশেষ বিবরণে তিনি অন্য কোনো নামের উল্লেখ করেননি। তিনি জড়জগৎ বা দৃশ্যমান জগতের সবচেয়ে বিশাল, পরিব্যাপ্ত ও মহান সৃষ্টি তথা আরশের ওপর ইস্তিওয়া বা অধিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন; কারণ দুঃখ-কষ্ট বা বেদনার মূল প্রকাশ কেবল তরকিব তথা বিভিন্ন উপাদানের জটিল মিশ্রণ বা শারীরিক কাঠামোর মধ্যেই ঘটতে পারে। পক্ষান্তরে বাসাইত তথা সরল, অবিমিশ্র ও অবিভাজ্য সত্তা স্বয়ং নিজের মধ্যে এমন কোনো গুণের স্থায়িত্ব গ্রহণ করে না, বরং তা স্ব নিজেই মূল অর্থের প্রকাশ এবং তা জগতের প্রতি রহমতের ব্যাপকতার প্রমাণ দেয়। আর যদি কখনো সাময়িকভাবে কোনো বালা-মুসিবত বা বিপদের আগমন ঘটে, তবে তাও মূলত এক প্রকার রহমত বা দয়া; যেমনটি আমরা তিক্ত ওষুধ সেবনের উদাহরণে উল্লেখ করেছি যে, ওষুধ সেবনের আসল উদ্দেশ্য রোগীকে কষ্ট দেওয়া বা যাতনা দেওয়া নয়; বরং তা ব্যবহারের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এর শেষ পরিণতিতে যে আরাম ও পরম সুস্থতা লাভ হয় তা অর্জন করা।
অতঃপর এর পরে জেনে রাখুন যে, পরম সত্য আল্লাহ নিজেকে ‘আজ-জাহির’ তথা প্রকাশ্য এবং ‘আল-বাতিন’ তথা অপ্রকাশ্য নামে অভিহিত করেছেন। সুতরাং জাহির বা প্রকাশ্য রূপটি হলো সে-সব সুরত বা অবয়বের জন্য যেগুলোতে তিনি রূপান্তর বা আত্মপ্রকাশ ঘটান, আর বাতিন বা অপ্রকাশ্য রূপটি হলো সেই গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থের জন্য, যা সেই অবয়বসমূহের রূপান্তর ও বহিঃপ্রকাশকে গ্রহণ করে। অতএব তিনি তাঁর বাতিন বা অপ্রকাশ্য গুণের কারণে হলেন অদৃশ্য এবং তাঁর জাহির বা প্রকাশ্য গুণের কারণে হলেন দৃশ্যমান, যা ‘সুরা আর-রাদ’-এর ৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ – তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাত।
আর আমি আপনাকে পূর্বেই অবগতি দিয়েছি যে, এই জগৎ হলো সত্যের অবয়বে নির্মিত একটি ঐশ্বরিক অনুলিপি বা প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই আমরা বলেছি যে, সমস্ত বস্তু সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান হলো মূলত তাঁর নিজের সত্তা সম্পর্কিত জ্ঞান; ফলে আমরা সুরত বা অবয়বের মাধ্যমে তাঁর হুকুম বা বিধানের স্বরূপ নির্দেশ করেছি এবং এভাবেই ঐশ্বরিক আসমা তথা নামসমূহ অবতীর্ণ হয়েছে। আর সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, خَلَقَ اللهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ – নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আদমকে তাঁর নিজস্ব সুরতে সৃষ্টি করেছেন।”
আর তিনিই হলেন ইনসানে কামিল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব, যিনি এই মহাবিশ্বের অতীত ও বর্তমানের সমস্ত হাকিকত তথা পরম সত্যের এক সংক্ষিপ্ত ও প্রকাশ্য রূপ। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নাফাস তথা ফুসফুসের শ্বাসকে অন্তর থেকে নির্গত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এমন এক উদ্দেশ্যে যা তিনি অবগতি দিয়েছেন এবং আমরাও তা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং যখন কোনো নাফাস গ্রহণকারী বা শ্বাসপ্রশ্বাসকারী ব্যক্তি কথা বলার ইচ্ছা করে, তখন তা নির্দিষ্ট মাখরাজ তথা উচ্চারণ স্থানসমূহ খুঁজে পায়। আর যদি সে কথা বলার ইচ্ছা নাও করে, তবে সেই নাফাস বা শ্বাস কেবল ‘হরফে হাবি’ তথা শূন্যে পতনশীল বা প্রসারিত হরফ হিসেবে নির্গত হয়, যা আমাদের নিকট সাধারণ হরফ বা বর্ণের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এই হরফটি তিনটি স্তরে স্বীয় সত্তাগতভাবে পতিত বা প্রসারিত হয়, যাকে আলিফ দ্বারা প্রকাশ করা হয় এবং ক্বারি বা কুরআন পাঠকদের নিকট এটি ‘আল-হারফুল হাবি’ নামে পরিচিত।
অতঃপর এই নাফাস বা শ্বাস যখন তার পতনের সময় ঊর্ধ্বজগতের রুহসমূহের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন তার থেকে ‘ওয়াও ইল্লত’ তথা ব্যাখ্যামূলক ওয়াও বর্ণের সৃষ্টি হয়, যা হরফকে পেশ দেওয়ার কারণে নাফাসকারী বা শ্বাস গ্রহণকারীর বাতাস প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ঘটে এবং এটি পেশের হরকতের পূর্ণতার রূপ। আর যখন এই শ্বাস তার প্রবাহকালে নিচের দিকের প্রাকৃতিক বা জড় উপাদানসমূহের পাশ দিয়ে অতিবাহিত হয়, তখন তার থেকে ‘ইয়া ইল্লত’ বর্ণের সৃষ্টি হয়, যা হরফকে যের দেওয়ার কারণে শ্বাস গ্রহণকারীর বাতাস প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ঘটে; কারণ নিচের দিকে ঝুঁকে পড়া হলো নিম্নজগতের বৈশিষ্ট্য। আর এই নাফাসের প্রবাহে এই তিনটি স্তর ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছু নেই, সুতরাং তা ভালো করে জেনে রাখুন। অতঃপর পূর্বের বর্ণে পেশ যুক্ত ওয়াও-এর মাধ্যমে ফেরেশতা বা মালাকূতি বার্তার সৃষ্টি হয়েছে এবং পূর্বের বর্ণে যের যুক্ত ইয়া-এর মাধ্যমে মানবীয় বা বাশারি বার্তার সৃষ্টি হয়েছে, আর আলিফ ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মূল উৎসস্বরূপ, যা সমস্ত আসবাব তথা কারণসমূহের প্রধান কারণ।
আর আল্লাহ তায়ালা যখন নিজের সত্তা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি জাহির ও বাতিন এবং তাঁর কালাম ও বাণীসমূহ রয়েছে, তখন তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘আর-রহমান’ তথা পরম করুণাময় নামের অধীনে তাঁর একটি নাফাস বা শ্বাস রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি আরশের ওপর ইস্তিওয়া বা অধিষ্ঠিত হয়েছেন। আর এই বিষয়ে ‘সুরা আল-ফুরকান’-এর ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:, فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا – সুতরাং তাঁর সম্পর্কে কোনো অবগত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করুন।
আর তিনি হলেন আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে কোনো আরিফ তথা তত্ত্বজ্ঞানী, তিনি কোনো নবী হতে পারেন কিংবা অন্য কেউ হতে পারেন যাদের আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে ইচ্ছা করেন। কারণ তিনি ‘সুরা আল-বাকারাহ’র ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ – তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত তথা প্রজ্ঞা দান করেন।
এখানে বিষয়টিকে সাধারণ বা অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি; সুতরাং এটি এমন এক পরিচিতির মধ্যে অনির্দিষ্ট বিষয়, যা স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, কারণ সমস্ত বিষয়সমূহ তাঁর নিকট সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত। তাঁর শানে কোনো সংক্ষিপ্ততা কিংবা অস্পষ্টতা অবান্তর। যদিও জগতবাসীর জন্য বিষয়টি সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট হতে পারে এবং এর বাইরেও আরও অনেক কিছু থাকতে পারে। অতঃপর যখন আমরা জানতে পারলাম যে, তাঁর একটি নাফাস তথা শ্বাস রয়েছে, এবং তিনি ‘আল-বাতিন’ তথা অপ্রকাশ্য, এবং তাঁর কালাম তথা বাণী রয়েছে এবং সমস্ত বিদ্যমান বস্তুসমূহ বা সৃষ্টিজগৎ হলো তাঁরই কালিমাত তথা বাণীসমূহ, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ আমাদের এই বিষয়ে কেবল এই জন্যই অবগতি দান করেছেন, যাতে আমরা বিষয়ের হাকিকত তথা প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারি যে, আমরা তাঁরই সুরত বা প্রতিচ্ছবিতে সৃষ্ট। অতএব, আমরা উলুহিয়াত তথা খোদার প্রতি আরোপিত সমস্ত বিষয়কে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করি, যা রসুলদের পবিত্র জবানিতে এবং অবতীর্ণ কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে।
আর তিনি মানুষের মধ্যে বাকশক্তিকে পূর্ণাঙ্গরূপে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের নাফাস তথা শ্বাসের জন্য আটাশটি মাকতা তথা উচ্চারণ স্থান নির্ধারণ করেছেন, যার প্রতিটি মাকতা থেকে একটি সুনির্দিষ্ট হরফ বা বর্ণ প্রকাশ পায়, যা অন্য বর্ণটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মাকতা বা উচ্চারণ স্থানই এদের পৃথক করে দেয়, যদিও এগুলো মূল নাফাস বা শ্বাস ছাড়া অন্য কিছু নয়। সুতরাং, নাফাস বা শ্বাসের দিক থেকে এর সত্তা এক ও অভিন্ন। কিন্তু মাকতা বা উচ্চারণ স্থানের দিক থেকে তা বহু ও বিবিধ। আর তিনি এর সংখ্যা আটাশটি নির্ধারণ করেছেন, কারণ এই বিশ্বজগৎ আটাশটি মানাজিল তথা চন্দ্রনিবাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার বুরুজসমূহ তথা রাশিসমূহের মধ্যে গ্রহসমূহ বিচরণ করে এবং গোলাকার আসমানে বা ফলকে এগুলো হলো গ্রহদের নির্ধারিত স্থান; ঠিক যেমন মানুষের নাফাস বা শ্বাসের মখরাজ তথা উচ্চারণ স্থানসমূহ যা বিশ্বজগৎ এবং তার জন্য কল্যাণকর সবকিছু সৃষ্টির মাধ্যমস্বরূপ। আর এই মাকতা বা উচ্চারণ স্থানসমূহ— যা হরফসমূহের অইয়ান তথা মূল সত্তাকে প্রকাশ করেছে, তা প্রতিটি জগতের অস্তিত্ব দান করেছে।
অঁতপর তিনি এই মাকতা বা উচ্চারণ স্থানগুলোকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন: একটি অংশ যা অন্য প্রান্ত থেকে দূরবর্তী। এর মধ্যে একটি দূরবর্তী অংশকে বলা হয় হুরুফে হলকি তথা কণ্ঠনালীর বর্ণসমূহ এবং এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। আর দ্বিতীয় দূরবর্তী অংশটি হলো হুরুফুশ শাফাতাইন তথা ওষ্ঠ্যবর্ণসমূহ এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অংশটি হলো হুরুফে ওসত তথা মধ্যবর্তী বর্ণসমূহ। নিশ্চয়ই ঐশ্বরিক হাজরাত তথা আল্লাহর দরবার তিনটি স্তরে বিন্যস্ত: বাতিন তথা অপ্রকাশ্য, জাহির তথা প্রকাশ্য এবং ওয়াস্ত তথা মধ্যবর্তী স্তর। আর এই মধ্যবর্তী স্তরটিই জাহিরকে বাতিন থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন করে, যা মূলত বরজখ তথা অন্তর্বর্তী পর্দা। এর একটি দিক বাতিনের দিকে এবং অন্য দিকটি জাহিরের দিকে উন্মুখ থাকে, বরং এটি স্বয়ং সেই প্রকাশেরই মূল রূপ, কারণ তা বিভাজনযোগ্য নয়।
আর এটিই হলো ইনসানে কামিল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব, যাকে হক তথা পরম সত্য আল্লাহ নিজের ও সৃষ্টিজগতের মাঝে বরজখ বা অন্তর্বর্তী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে তিনি ঐশ্বরিক আসমা তথা নামসমূহের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘হক’ তথা খোদার জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হন, আবার ইমকান তথা সম্ভাব্যতার হাকিকতে প্রকাশিত হয়ে ‘খলক’ তথা সৃষ্টির রূপে প্রতিভাত হন। আর আল্লাহ একে তিনটি মারতাবা তথা স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। আকল তথা বুদ্ধি এবং হিসস তথা ইন্দ্রিয়ানুভূতি, যা দুটি প্রান্তস্বরূপ, এবং খেয়াল তথা কল্পনা, যা অর্থ এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্যবর্তী বরজখ বা অন্তরাল।
অতঃপর আল্লাহ যখন আমাদের এই পরিচয় দিলেন যে, তিনি বাতিন ও জাহির, এবং তাঁর নাফাস, কালিমা ও কালিমাত তথা বাণীসমূহ রয়েছে, তখন আমরা লক্ষ করলাম যে, এর মধ্য থেকে যা কিছু প্রকাশ পেয়েছে এবং যা কিছু তাঁর সত্তার দিকে সম্বন্ধযুক্ত নয়, তা হলো নাফাস এবং তা থেকে যা কিছু সৃষ্টি হয়। তখন আমরা বললাম, নাফাসের মূল সত্তা বা আইন হলো ‘আমা’ তথা আদি কুহেলিকা। কেননা, যার শ্বাস নির্গত হয় তার নাফাস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যা সাধারণ বিবরণে বাতাসের স্থলাভিষিক্ত হয়, কিন্তু তা মূলত বাষ্পের স্থলাভিষিক্ত হয়। সুতরাং, নাফাসের হাকিকত বা প্রকৃত রূপ যেখানেই থাকুক না কেন তা এমনই, আর তা থেকেই আমার উৎপত্তি ঘটেছে; ঠিক যেমন মৌলিক উপাদান বা আরকানের আর্দ্রতার বাষ্প থেকে কুহেলিকা বা মেঘের সৃষ্টি হয়, যা উচ্চে আরোহণ করে এবং প্রথমে মেঘের রূপ ধারণ করে, অতঃপর তা ঘনীভূত হয় এবং হাওয়া বা বাতাস তাকে বহন করে ও প্রবহমান বায়ু তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। সুতরাং তা হুবহু বাতাস নয়, বরং তা মূলত বাষ্পেরই রূপ।
আর এই কারণেই সেই আদি কুহেলিকার বৈশিষ্ট্যে বর্ণিত হয়েছে— যার মধ্যে সৃষ্টির পূর্বে আমাদের রব ছিলেন; যে এটি এমন এক কুহেলিকা যার ওপরেও কোনো বাতাস নেই এবং যার নিচেও কোনো হাওয়া নেই। অতঃপর তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর জন্য ‘ফওক’ তথা ঊর্ধ্বতা রয়েছে, যা তাতে হকের অবস্থানকে নির্দেশ করে, এবং ‘তাহত’ তথা নিম্নতা রয়েছে যা সৃষ্টিজগতের অবস্থানকে নির্দেশ করে। ফলে সেখানে হকের নাফাস বা শ্বাস ছাড়া অন্যকিছুর অস্তিত্ব ছিল না এবং তার মধ্যেই হাওয়ার উৎপত্তি হয়। আর তখন মৃদু মন্দ থেকে শুরু করে তীব্র ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে, যা মূলত হুরুফে শাদিদাহ তথা কঠোর বর্ণসমূহ এবং রখওয়াহ তথা কোমল বর্ণসমূহের প্রতীক। আর এই নাফাস বা শ্বাস থেকেই মেঘের গর্জনের আওয়াজ প্রকাশিত হয়েছে, যা হুরুফে মাজহুরা তথা উচ্চৈঃস্বরা বর্ণের মতো, এবং মৃদু সমীরণ প্রবাহিত হয়েছে, যা হুরুফে মাহমুসাহ তথা ফিসফিসানি বর্ণের মতো। আর আসমানসমূহে তি বাক তথা স্তরে স্তরে বিন্যস্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে যা মানুষের কথা বলার সময় নির্গত নাফাস থেকে উৎপন্ন হুরুফে মুতবাকা তথা আবৃত বর্ণসমূহের মতো, যখন সে কোনো উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে। আর ঐশ্বরিক বিষয়ের ক্ষেত্রে যখন আমরা কোনোকিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করি, তখন তাঁর বাণী হলো—
إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
কোনোকিছুকে যখন আমরা ইচ্ছা করি, তখন আমাদের কথা কেবল এইটুকুই হয় যে, আমরা বলি ‘হও’, ব্যস, তা হয়ে যায়। সুরা আন-নাহল, আয়াত ৪০।
সুতরাং ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে হুরুফে মুতবাকা তথা আবৃত বর্ণসমূহ হলো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সাত আসমানের অস্তিত্বের প্রতীক এবং এই বিশ্বজগতের প্রতিটি বিদ্যমান বস্তু বা সৃষ্টি এই ইনতিবাক তথা স্তরীভূত নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এই খোদায়ি নাফাসের মধ্যে সৃষ্টির সূচনা বা অস্তিত্বের উন্মোচন ঘটেছে ‘কওন’ তথা মহাজাগতিক অস্তিত্বের মাধ্যমে, যখন তিনি ছিলেন এবং তাঁর সাথে অন্য কোনোকিছুর অস্তিত্ব ছিল না; আর শ্বাস গ্রহণকারীর মধ্যে একে হুরুফে মুনফাতিহা তথা উন্মুক্ত বর্ণসমূহের হাকিকত বা রূপ দেওয়া হয়েছে।
অতঃপর তিনি যখন বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন এবং আদি কুহেলিকার বুকে তার সুরতকে উন্মোচিত করলেন; যা এমন এক নাফাস যার মাধ্যমে জগতের সমস্ত স্তরসমূহ ও অইয়ান তথা মূল সত্তাসমূহ সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি তার মনজিলসমূহকে পৃথক করে দিয়েছেন, তখন তিনি তা থেকে জড়জগৎ বা বস্তুজগৎ সৃষ্টি করলেন, যা হুরুফে মুনসাফিলা তথা নিম্নগামী বর্ণসমূহের মতো। কারণ তা প্রকৃতির দিক থেকে নিম্নমুখী এবং তা প্রকৃতির অন্ধকারময় মহাবিশ্বের শেষ সীমানা; এবং তিনি তা থেকে আলমে আরওয়াহ তথা রুহজগৎ সৃষ্টি করেছেন, যা শ্বাস গ্রহণকারীর নাফাসের মধ্যে হুরুফে মুসতালিয়াহ তথা ঊর্ধ্বমুখী বর্ণসমূহের প্রতীক। জেনে রাখুন, এই সবকিছুই হলো মহাবিশ্বের কালিমাত তথা বাণীসমূহ; মানুষের ক্ষেত্রে এর একক রূপকে হরফ বা বর্ণ বলা হয় এবং এর যৌগিক রূপকে কালিমা বা শব্দ বলা হয়। অনুরূপভাবে বিদ্যমান বস্তুসমূহের অইয়ান তথা মূল সত্তাগুলো এককভাবে হরফ এবং তাদের পারস্পরিক মিশ্রণের দিক থেকে কালিমাত তথা বাণীসমূহ।
আর তিনি সৃষ্টির প্রতি রহমতের দিক থেকে ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে অস্তিত্বদানের প্রধান কারণ নিহিত রেখেছেন, যেন তাদের আদমের তথা অনস্তিত্বের মন্দ দশা থেকে অস্তিত্বের কল্যাণের দিকে বের করে আনা যায়; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি ‘হরফে হাবি’ তথা প্রসারিত বর্ণের মাধ্যমে ঘটেছে। অতঃপর তিনি মালাইকা তথা ফেরেশতাকুল এবং মানুষের মধ্য থেকে রসুল প্রেরণের মাধ্যমে তাদের জন্য এমন এক অস্তিত্বের কথা স্পষ্ট করেছেন, যা সৌভাগ্য বয়ে আনে, যা মূলত রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছে; আর মানুষের নাফাসের ক্ষেত্রে এটি ‘হুরুফে লিন’ তথা কোমল বর্ণসমূহের রূপ পরিগ্রহ করেছে।
অতঃপর তিনি এই নাফাস বা শ্বাসের ভেতর ধ্বনি সৃষ্টি করেছেন যখন তা ওহির মাধ্যমে বাতিন তথা অপ্রকাশ্য রূপ থেকে জাহির তথা প্রকাশ্য রূপের দিকে নির্গত হয়, যাকে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসৃণ পাথরের ওপর লোহার শিকল টানার আওয়াজের সাথে তুলনা করেছেন; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি ‘হুরুফে সফির’ তথা শিস-ধ্বনির বর্ণসমূহের প্রতীক। অতঃপর সেই ঐশ্বরিক নাফাস মহাবিশ্বের স্থায়ী মূল সত্তাগুলোর ওপর প্রসারিত হয়েছিল, যখন তাদের কোনো বাহ্যিক অস্তিত্ব ছিল না; আর মানুষের কালাম তথা বাকশক্তির মধ্যে এটি ‘হুরুফে তাফাশশি’ তথা বিকীর্ণ বর্ণসমূহের মতো।
অতঃপর সৃষ্টির দাবি ও নিয়ন্ত্রণের কারণে মহাবিশ্ব সেই ঐশ্বরিক নাফাসের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, যেখানে তারা সেই সত্তাকে সংখ্যাধিক্য ও বহুত্বে রূপান্তর করেছিল, যা মূলত একক সত্তা; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে এটি হলো ‘হরফে মুসতাতিল’ তথা দীর্ঘায়িত বর্ণ এবং তা কেবল ‘দোয়াদ’ বর্ণটি, কারণ এর উচ্চারণ দীর্ঘ হয়ে ‘লাম’ বর্ণের মাখরাজ তথা উচ্চারণ স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
অতঃপর এই ঐশ্বরিক নাফাস শরিয়তসমূহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সরল পথ নির্ধারণ করেছে এবং এই নির্দিষ্ট সরলতার বাইরে চলে যাওয়াকে তাহরিফ তথা বিকৃতি বলা হয়, আর এই প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী হলো, يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ – তারা তা বোঝার পর বিকৃত করে। সুরা বাকারাহ, আয়াত: ৭৫।
অথচ সমস্ত বিষয় তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ – এবং সমস্ত বিষয় তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। সুরা হুদ, আয়াত: ১২৩।
তিনি বলেন, বিষয়সমূহ বহু বা পুঞ্জীভূত হলেও নাফাস বা শ্বাস তাকে একত্রিত করে; আর মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষেত্রে এই তাহরিফ বা বিচ্যুতিকে ‘হরফে মুনহারিফ’ তথা বিচ্যুত বর্ণ বলা হয়, যা অধিকাংশ বর্ণের সাথে মিশ্রিত হয়ে যায় এবং তা হলো ‘লাম’ বর্ণটি, আর এই অনন্য মর্যাদা অন্য কোনো বর্ণের নেই; আর এটি শরিয়তের এমন কিছু বিধানের মতো যার মধ্যে সমস্ত ঐশ্বরিক বিধানসমূহ একত্রিত হয়।
অতঃপর ঐশ্বরিক নাফাসের মধ্যে সাদৃশ্যপূর্ণ সুরতসমূহ প্রকাশ পেয়েছিল, যার ফলে বাহ্যিক কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে তাতে পুনরাবৃত্তির ভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল; অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, সেখানে কোনো পুনরাবৃত্তি নেই। আর মানুষের বর্ণমালার জগতে এটি ‘হরফে মুকাররার’ তথা দ্বিত্ব বা পুনরাবৃত্তিসম্পন্ন বর্ণ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে এবং তা হলো ‘রা’ বর্ণটি।
সুতরাং নাফাস বা শ্বাস যখন সুবাস বহন করে, তখন জানা যায় যে, তার নির্গমন ঘটে ঘ্রাণেন্দ্রিয় বা নাকের মাধ্যমে; আর মানুষের উচ্চারিত বর্ণমালার ক্ষেত্রে একে ‘হুরুফে গুন্নাহ’ তথা নাসিক্য বর্ণ বলা হয়, কারণ এগুলো নাসিকাগহ্বর থেকে উচ্চারিত হয়। আর এভাবেই হরফ বা বর্ণসমূহের স্তরসমূহ পূর্ণাঙ্গরূপে সমাপ্ত হলো এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।[2]
শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম সোহরাওয়ার্দি তিন স্তরের বিন্যাস একই রেখেছেন, কিন্তু নাফাসের বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট করেছেন। মুনতাহি সাধক নাফাসের অধিকারী; তিনি স্বীয় হালে সুপ্রতিষ্ঠিত, তাঁর ওপর গাইবাত ও হুজুরের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন আর ঘটে না। তাঁর মাওয়াজিদ শ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত এবং স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এই তিন স্তর থেকে সাধকের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট জওক ও শুরব।
তিনি বলেন, আর বলা হয়ে থাকে, নাফাস হলো মুনতাহি তথা চূড়ান্ত স্তরের সাধকের জন্য, ওয়াক্ত তথা আধ্যাত্মিক সময় হলো মুবতাদি তথা প্রারম্ভিক স্তরের সাধকের জন্য এবং হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা হলো মুতাওয়াসসিত তথা মধ্যবর্তী স্তরের সাধকের জন্য। সুতরাং এটি যেন তাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত যে, মুবতাদি সাধকের অন্তরে আল্লাহ তায়ালা এর পক্ষ থেকে এমন এক তারেক তথা আধ্যাত্মিক অনুভূতির আগমন ঘটে যা স্থায়ী হয় না। আর মুতাওয়াসসিত সাধক হলেন এমন এক হালের অধিকারী, যার ওপর তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থাটি সদা প্রবল থাকে। পক্ষান্তরে মুনতাহি সাধক হলেন এমন এক নাফাসের অধিকারী, যিনি স্বীয় হালে সম্পূর্ণ মুতামাক্কিন তথা সুপ্রতিষ্ঠিত; তাঁর ওপর গাইবাত তথা আত্মবিস্মৃতি ও হুজুর তথা ঐশ্বরিক উপস্থিতির পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে না, বরং তাঁর মাওয়াজিদ তথা আধ্যাত্মিক ভাবোচ্ছ্বাসসমূহ তাঁর আনফাস তথা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে এবং তা তাঁর মাঝে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে, কোনো পালাবদল ছাড়াই।
আর এই সবকটিই হলো তাদের নিজ নিজ অধিকারীদের আধ্যাত্মিক অবস্থাসমূহ, এবং এই স্তরগুলো থেকে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট জওক তথা আত্মিক আস্বাদন ও শুরব তথা পরম পরিতৃপ্তি রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁদের বরকতের মাধ্যমে কল্যাণ ও উপকার দান করুন, আমিন।[3]
তিন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে নাফাসের একটি বহুমাত্রিক চিত্র ফুটে ওঠে। কুশাইরি নাফাসকে আধ্যাত্মিক স্তরের মাপকাঠি হিসেবে দেখিয়েছেন; প্রতিটি শ্বাস হিসাবযোগ্য, অবহেলায় অতিবাহিত শ্বাস মৃত। সোহরাওয়ার্দি দেখিয়েছেন নাফাসের অধিকারী কীভাবে হাল ও গাইবাতের পালাবদলের ঊর্ধ্বে উঠে স্থায়ী আধ্যাত্মিক অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হন। আর ইবনে আরাবি নাফাসকে সবচেয়ে গভীরে নিয়ে দেখিয়েছেন— মানুষের শ্বাস ও বর্ণের সাথে আল্লাহর নাফাস রহমানি ও সৃষ্টির উৎপত্তির অপূর্ব সাদৃশ্য। সবশেষে বলা যায়, নাফাস শেখায় প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতিটি শ্বাস হলো আল্লাহর দিকে যাত্রার একেকটি সুযোগ।