সুফি সাধনার পথে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দুটি বিপরীত অবস্থা কুরব ও বু’দ। কুরব মানে নৈকট্য; আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর কাছাকাছি থাকা। আর বু’দ মানে দূরত্ব; আল্লাহর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া।
নবীজির হাদিসে এসেছে, বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, আর তখন তিনি তার শ্রবণ ও দৃষ্টি হয়ে যান। সেই শিষ্যের ঘটনা; যে পাখি জবাই না করেই ফিরে এসেছিল, কারণ কোথাও আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নেই; এইসবই কুরবের গভীরতম শিক্ষা দেয়।
তবে নৈকট্যের অনুভূতিতে আত্মতৃপ্ত হওয়াও এক ধরনের পর্দা। কারণ প্রকৃত নৈকট্য মানুষকে বিস্ময় ও আত্মবিলোপের দিকে নিয়ে যায়, আত্মতুষ্টির দিকে নয়।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি বলেছেন, কুরবের প্রথম স্তর হলো আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করা, আর বু’দ হলো তাঁর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে কলুষিত করা। তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহর কুরব ইলম ও কুদরতের দিক থেকে সবার জন্য সাধারণ, কিন্তু উনস তথা অন্তরঙ্গতার দিক থেকে কেবল আওলিয়াদের জন্য নির্দিষ্ট। সেই শিষ্যের ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত নৈকট্য মানে সর্বক্ষণ আল্লাহর মুরাকাবার সচেতনতা। তিনি আরও বলেছেন, নৈকট্যকে দেখতে থাকাও একটি পর্দা, কারণ তাতে নিজের অস্তিত্বের বোধ থেকে যায়।
তিনি বলেন, কুরব তথা নৈকট্যের প্রথম স্তর হলো, আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা এবং সবসময় তাঁর ইবাদতে নিজেকে গুণান্বিত রাখা। আর বু‘দ তথা দূরত্ব হলো, আল্লাহর বিরোধিতার মাধ্যমে নিজেকে কলুষিত করা এবং তাঁর আনুগত্য থেকে দূরে সরে থাকা।
সুতরাং দূরত্বের প্রথম স্তর হলো, তাওফিক থেকে দূরে থাকা। এরপর তাহকিক তথা বাস্তব উপলব্ধি থেকে দূরে থাকা। বরং প্রকৃতপক্ষে তাওফিক থেকে দূরে থাকাই আসল দূরত্ব। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেছেন—
ما تقرّبَ إليَّ المتقرِّبون بمثل أداءِ ما افترضتُ عليهم، ولا يزالُ العبدُ يتقرّبُ إليَّ بالنوافلِ حتى يحبَّني وأحبَّه، فإذا أحببتُه… كنتُ له سمعًا وبصرًا، فبي يسمعُ، وبي يبصرُ… الخبر
আমার নৈকট্য লাভকারীরা আমার ফরজ করা বিষয়গুলো আদায় করার মতো আর কোনোকিছুর মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে সে আমাকে ভালোবাসে এবং আমিও তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ ও দৃষ্টির সহায়ক হয়ে যাই; ফলে সে আমার মাধ্যমেই শোনে এবং আমার মাধ্যমেই দেখে…[1]
সুতরাং বান্দার কুরব প্রথমে হয় তার ইমান ও সত্যায়নের মাধ্যমে। এরপর হয় তার ইহসান ও তাহকিকের মাধ্যমে। আর আল্লাহ সুবহানাহুর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি কুরব হলো— দুনিয়ায় তিনি বান্দাকে যে ইরফান তথা আল্লাহ-সম্পর্কিত গভীর পরিচয় দান করেন; আখিরাতে তিনি তাকে যে মুশাহাদা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন; এ-ছাড়াও এ দুই অবস্থার মাঝখানে তিনি বান্দাকে যে নানা ধরনের অনুগ্রহ ও উপকার দ্বারা ঘিরে রাখেন।
বান্দা যতক্ষণ না সৃষ্টির আসক্তি থেকে দূরে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব হয় না। এটি অন্তরের গুণাবলির বিষয়; বাহ্যিক অবস্থা, দেহগত অবস্থান বা জাগতিক অস্তিত্বের নিয়মের বিষয় নয়। অর্থাৎ এখানে দেহ দিয়ে কাছে থাকার কথা নয়; কারণ আল্লাহর ক্ষেত্রে দেহগত নৈকট্য অসম্ভব।[2]
আল্লাহ সুবহানাহুর কুরব, ইলম ও কুদরতের দিক থেকে সবার জন্য সাধারণভাবে প্রযোজ্য। আর লুতফ ও নুসরত তথা অনুগ্রহ ও সাহায্যের দিক থেকে তা মুমিনদের জন্য বিশেষ। এরপর উনস তথা আপন করে নেওয়া ও অন্তরঙ্গতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তা আওলিয়াদের জন্য নির্দিষ্ট।
আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে বলেছেন— وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ – আমি তার গলার রগের চেয়েও তার অধিক নিকটে।[3] وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ – আমি তোমাদের চেয়ে তার অধিক নিকটে, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।[4] وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ – তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।[5] مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ – তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ এমন হয় না, যেখানে তিনি তাদের চতুর্থজন নন।[6]
যে ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নৈকট্যের সত্য উপলব্ধি লাভ করে, তার জন্য সর্বক্ষণ আল্লাহর মুরাকাবা তথা আল্লাহ তাকে দেখছেন, এ সচেতনতা ধরে রাখা অপরিহার্য হয়ে যায়। কারণ আগে তার ওপর তাকওয়ার মুরাকাবা ছিল; এরপর তার ওপর হিফাজত ও ওয়াফা তথা আত্মরক্ষা ও অঙ্গীকার রক্ষার মুরাকাবা আসে; তারপর আসে হায়া তথা আল্লাহর সামনে লজ্জাশীল থাকার মুরাকাবা।
সুফিরা দীর্ঘ বাহারের কবিতায় বলেছেন—
كأنَّ رقيبًا منك يرعى خواطري وآخر يرعى ناظري ولساني
মনে হয়, তোমার পক্ষ থেকে একজন প্রহরী আমার অন্তরের ভাবনাগুলো পাহারা দিচ্ছে; আর আরেকজন পাহারা দিচ্ছে আমার দৃষ্টি ও জিহ্বাকে।
فما رمقت عيناي بعدك منظرًا بسوءك إلا قلت قد رمقاني
তোমার নৈকট্য লাভের পর আমার দুই চোখ যখনই তোমার অপছন্দের কোনো দৃশ্যের দিকে তাকাতে চেয়েছে, আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছি, তারা তো আমাকে দেখছে।
ولا بذرت من في دونك لفظة بغيرك إلا قلت قد سمعاني
তোমাকে ছাড়া অন্য কারও বিষয়ে আমার মুখ থেকে যখনই কোনো কথা বের হতে চেয়েছে, আমি বলেছি, তারা তো আমার কথা শুনছে।
ولا أخطرت في السر بعدك خطرة لغيرك إلا عرّجا بعناني
তোমাকে পাওয়ার পর অন্তরের গভীরে যখনই তোমাকে ছাড়া অন্য কারও কথা মনে এসেছে, তারা সঙ্গে সঙ্গে আমার লাগাম ধরে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
وإخوان صدق قد سمعت حديثهم وأمسكت عنهم ناظري ولساني
আমার কিছু সত্যনিষ্ঠ ভাই আছে, আমি তাদের কথা শুনেছি; কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমার চোখ ও জিহ্বাকে সংযত রেখেছি।
وما الزهد أسلاني عنهم غير أنني وجدتك مشهودي بكل مكان
দুনিয়াবিমুখতা আমাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; এর কারণ হলো, আমি প্রত্যেক স্থানে তোমাকেই আমার সামনে প্রত্যক্ষ পেয়েছি।[7]
শুনো, কোনো এক মাশায়িখ তাঁর শিষ্যদের মধ্য থেকে একজনকে বিশেষ মনোযোগ ও স্নেহের জন্য বেছে নিয়েছেন।[8] তাঁর এই বিশেষ মনোযোগ দেখে অন্য শিষ্যরা আপত্তি তুলল। তখন তিনি বিষয়টি বোঝানোর জন্য তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা এমন জায়গায় গিয়ে এগুলো জবাই করো, যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না।
তখন প্রত্যেকে আলাদা হয়ে নির্জন জায়গায় গেল এবং পাখি জবাই করল। কিন্তু ওই শিষ্য পাখিটিকে জবাই না করেই সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। শায়খ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এমন করল কেন। সে বলল, আপনি আমাকে এমন জায়গায় পাখিটি জবাই করতে বলেছেন, যেখানে কেউ তা দেখবে না। অথচ এমন কোনো জায়গা নেই, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দেখেন না।
তখন শায়খ বললেন, এ কারণেই আমি তাকে তোমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিই। তোমাদের ওপর সৃষ্টির কথা ও দৃষ্টি বেশি প্রবল; আর সে আল্লাহর ব্যাপারে গাফেল নয়।
তাদের কারও একটি কবিতা হলো—
إذا شئت أن ترضى وأرضى وتملكي زمام قيادي في الهوى وعناني
তুমি যদি চাও যে, তুমি সন্তুষ্ট থাকবে, আমিও সন্তুষ্ট থাকব, আর প্রেমের পথে আমার নেতৃত্ব ও লাগাম তোমার হাতে থাকবে,
ألا فانظري الدنيا بعيني وأسمعي بأذني فيها وأنطقي بلساني
তাহলে দুনিয়াকে আমার চোখ দিয়ে দেখো, আমার কান দিয়ে শোনো এবং আমার জিহ্বা দিয়ে কথা বলো।[9]
নৈকট্যকে দেখতে থাকা অবস্থাটিও নৈকট্যের পথে পর্দা। কারণ যে ব্যক্তি নিজের জন্য কোনো মর্যাদা বা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখতে পায়, সে মকর তথা সূক্ষ্ম পরীক্ষামূলক আড়ালে পতিত। এ কারণেই তারা বলেছেন, أوحشك الله من قربه – আল্লাহ তোমাকে তাঁর নৈকট্য থেকে ওয়াহশত দান করুন।
অর্থাৎ, তুমি যে নিজের পক্ষ থেকে তাঁর নৈকট্য দেখতে পাচ্ছ, আল্লাহ তোমাকে সেই দেখা থেকে মুক্ত করুন। কারণ তাঁর নৈকট্যের অনুভব নিয়ে আত্মতৃপ্ত হওয়া এখনো পৃথকত্বের চিহ্ন। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু প্রত্যেক ধরনের উনস তথা অন্তরঙ্গ অনুভূতিরও ঊর্ধ্বে। হাকিকতের অবস্থান মানুষকে বিস্ময়-বিহ্বলতা ও আত্মবিলোপের দিকে নিয়ে যায়।
এই অর্থের কাছাকাছি বর্ণনায় তারা বলেছেন—
محنتي فيك أنني ما أبالي بمحنـتي
তোমার ব্যাপারে আমার পরীক্ষা এই যে, আমি নিজের পরীক্ষার কোনো পরোয়া করি না।
قربكم مثل بعدكم فمتى وقت راحتي
তোমাদের নৈকট্যও তোমাদের দূরত্বের মতো; তাহলে আমার স্বস্তির সময় কবে আসবে?[10]
উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায়ই এই কবিতা আবৃত্তি করতেন—
وزادكم هجر وجنبكم قلى وقربكم بعد وسلمكم حرب
তোমাদের দূরে থাকা বিচ্ছেদ বাড়ায়, তোমাদের পাশে থাকাও বিরাগ; তোমাদের নৈকট্য দূরত্ব, আর তোমাদের শান্তিও যুদ্ধের মতো।
শিবলি এই পঙ্ক্তিটি বেশি আবৃত্তি করতেন। পঙ্ক্তিটি আব্বাস ইবনুল আহনাফের; তাঁর দিওয়ান, পৃষ্ঠা: ১৯-এ এটি একটি কাসিদার অংশ হিসেবে এসেছে। সেখানে এর পরের পঙ্ক্তি হলো—
وأنتم بحمد الله فيكم فظاظة فكل ذنوبي في جوانبكم صعب
আল্লাহর প্রশংসা, তোমাদের মধ্যে কঠোরতা আছে; তাই তোমাদের পাশে আমার প্রতিটি অপরাধই গুরুতর হয়ে ওঠে।
আবুল হুসাইন নুরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আবু হামজার কিছু সঙ্গীকে দেখলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি আবু হামজার সঙ্গী, যিনি সাক্ষাতের সময় নৈকট্যের দিকে ইশারা করেন? তখন তাকে বলা হলো, আবুল হুসাইন নুরি আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, নৈকট্যের নৈকট্যেই তো আমরা দূরত্বের পর দূরত্বে আছি।[11]
আর সত্তাগত নৈকট্যের কথা হলো, আল্লাহ তায়ালা, যিনি মালিক, তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে। কারণ তিনি সীমা, প্রান্ত, শেষ, পরিমাণ, সৃষ্টির সংযোগ এবং কোনো পূর্বঘটিত বিষয় তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধারণা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। এসব স্থূল দেহগত ধারণা, মিলন ও বিচ্ছেদের সম্ভাবনা নিজের সঙ্গে নিয়ে আসে।
তাই আল্লাহর নৈকট্য তাঁর সত্তার ক্ষেত্রে অসম্ভব। এটি হবে সত্তার ঘনিষ্ঠতা ধরনের ধারণা। তবে তাঁর নিয়ামতের ক্ষেত্রে নৈকট্য ওয়াজিব তথা নিশ্চিত; কারণ সেটি ইলম ও রুয়্যত তথা জ্ঞান ও প্রত্যক্ষ অবগতির নৈকট্য। আর তাঁর গুণের ক্ষেত্রে নৈকট্য জায়েজ; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, তাকে এ গুণ দ্বারা বিশেষ মর্যাদা দেন। আর তাঁর কর্মের ক্ষেত্রে নৈকট্য হলো লুতফ তথা অনুগ্রহের নৈকট্য।
একটি নুসখার প্রান্তটীকায় ‘আয-যাত’ শব্দটি এভাবে সংশোধন করেছেন আল্লামা মুহাম্মদ আল-মুবারক। অন্য সব নুসখায় “আয-যাওয়াত” বহুবচনে এসেছে। সে পাঠ অনুযায়ী অর্থ দাঁড়ায়, সৃষ্ট বস্তুগুলোর সত্তাগুলোর নৈকট্য তাঁর সেই সত্তার প্রতি, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কাছে থাকার গুণে বর্ণিত হয় না। আল্লাহই অধিক জানেন।[12]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি কুরবকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। চিন্তার মাধ্যমে, ইলমের মাধ্যমে এবং আমলের মাধ্যমে নৈকট্য। তিনি দেখিয়েছেন, আরিফদের কাছে নৈকট্য মানে আল্লাহর তাজাল্লি প্রত্যক্ষ করা, এর বাইরে আর কিছু নয়। বায়েজিদ বোস্তামির ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহর কাছে যেতে হয় নিজের অসহায়ত্ব ও মুখাপেক্ষিতা নিয়ে, কারণ এসব গুণ আল্লাহর নেই। বু’দ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটি মূলত বিচ্ছেদের অবস্থা; যখন প্রতিটি সত্তা নিজের স্বতন্ত্রতার কারণে অন্যটি থেকে আলাদা হয়ে যায়।
কুরব:
কুরব হলো আল্লাহর আনুগত্যের কাজে প্রতিষ্ঠিত থাকা। কিন্তু অনেকে কেবল নিজেদের আনুগত্যের ইপর নির্ভর করে থাকে এবং এটার মাধ্যমেই তারা আল্লাহকে পেতে চায়।
কাবা কাওসাইন বা দুই ধনুকের দূরত্ব বলতে বৃত্তের দুই ধনুক বোঝানো হয়। বৃত্ত যখন কোনো রেখা দিয়ে কাটা হয়, অথবা তার চেয়েও নিকটতর কোনো রেখা দিয়ে ভাগ করা হয়, তখন এ রূপ প্রকাশ পায়।
إذا تقطعت بخط أكرة فبدا قوسان ذلك قرب الحق فاعتبروا
যখন বৃত্ত একটি রেখায় কাটা পড়ে এবং দুটি ধনুক প্রকাশিত হয়, তখন সেখান থেকেই আল্লাহর নৈকট্যের ইঙ্গিত গ্রহণ করো।
إلى الحقيقة أدنى منهما فإذا ما جزته لاح ما يقضي به النظر
হাকিকতের দিক থেকে এর চেয়েও নিকটতর স্তর আছে। তুমি যখন তা অতিক্রম করবে, তখন চিন্তা ও বিবেচনার দাবিকৃত সত্য উন্মোচিত হবে।
إن المعارج للأرواح نسبتها خلاف نسبة ما يسري به البصر
রুহগুলোরও আরোহনের পথ আছে; তবে তার সম্পর্ক চোখে দেখা চলাচলের সম্পর্কের মতো নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ – আমি তার গলার শিরার চেয়েও তার বেশি কাছে। সুরা কাফ, আয়াত: ১৬। এখানে আল্লাহ নিজেকে বান্দার কাছে বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বান্দার ক্ষেত্রে যে নৈকট্য কাম্য, তা হলো বান্দা এমন গুণে গুণান্বিত হওয়া, যার কারণে তাকে আল্লাহর কাছে বলা যায়। অর্থাৎ বান্দা আল্লাহর নৈকট্যের গুণ ধারণ করবে, যেমন আল্লাহ নিজেকে বান্দার কাছে বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আর বলেছেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ – তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪।
মানুষ চায়, তারা যেন সবসময় আল্লাহর সঙ্গে থাকে, আল্লাহ যে তাজাল্লির যে রূপেই প্রকাশিত হোন না কেন। অথচ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রূপে সদা তাজাল্লি প্রকাশ করেই চলেছেন। তাই বান্দা তাঁর সঙ্গে আছে; কারণ তাজাল্লি সর্বদা ঘটছে।
বান্দা যেমন নিজের আনিয়্যাহ তথা আপন-সত্তা থেকে কখনো খালি হয় না, তেমনি আল্লাহও সবসময় তার সঙ্গে আছেন। কারণ বান্দার আনিয়্যাহই সেই রূপ, যেখানে আল্লাহর তাজাল্লি প্রকাশ পায়। এ কারণেই আরিফগণ নৈকট্যের সাক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হন না। তাঁরা নিজেদের মধ্যেও এবং নিজেদের বাইরে অন্য সব রূপেও আল্লাহর তাজাল্লি প্রত্যক্ষ করেন। তাঁদের কাছে নৈকট্য মানে আল্লাহর তাজাল্লি দেখা; এর বাইরে আর কিছু নয়।
আর আনুগত্যের মাধ্যমে যে নৈকট্য অর্জিত হয়, তার ফল হলো বান্দা দুর্দশা থেকে সৌভাগ্যের দিকে ওঠে, অন্ধকার থেকে নুরের দিকে আসে। এই নৈকট্য বান্দাকে তার সব উদ্দেশ্যের সৌভাগ্য এনে দেয়। তবে এর পূর্ণতা জান্নাত ছাড়া আর কোথাও সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না।
দুনিয়ায় অবশ্য বান্দাকে নিজের কিছু ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছাড়তেই হয়। তাই নৈকট্য দুই রকম। সাধারণ নৈকট্য ও বিশেষ নৈকট্য। সাধারণ নৈকট্য হলো, যার মাধ্যমে মানুষ সুখী হওয়ার পথ পায়। আর আরিফদের নৈকট্যের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। সেই নৈকট্যে সুখ আছে, বরং সুখেরও অতিরিক্ত বেশি কিছু আছে। কারণ ইলাহি নামসমূহ ও সগেুলোর বিধানের কারণেই সৃষ্টিজগতে নৈকট্য ও বু‘দের অবস্থা প্রকাশ পায়।
প্রত্যেক বান্দার অবস্থা এমন যে, প্রত্যেক সময় তাকে কোনো না কোনো ইলাহি নামের নৈকট্যে থাকতে হয় এবং অন্য কোনো নামের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে হয়। কারণ একই সময়ে সব নামের বিধান একসঙ্গে তার ওপর কার্যকর হয় না।
যে সময়ে কোনো কার্যকর ইলাহি নামের বিধান বান্দাকে দুর্দশা থেকে মুক্তি ও সৌভাগ্যের অধিকারী করে দেয়, সে সময়ে সেই নামের নৈকট্যই সুফিদের দৃষ্টিতে কাঙ্ক্ষিত নৈকট্য। অর্থাৎ, যে নৈকট্য বান্দাকে সৌভাগ্য দেয়, সেটিই তাঁদের পরিভাষায় নৈকট্য। আর যদি কোনো নামের সম্পর্ক বান্দাকে এই ফল না দেয়, তাহলে সুফিদের পরিভাষায় সেটি নৈকট্য নয়; যদিও অন্য দিক থেকে, শুধু তার ওপর যে বিধান কার্যকর হয়েছে সেই হিসেবে, তাকে এক ধরনের নৈকট্য বলা যেতে পারে।
এই বিষয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন:
مَا تَقَرَّبَ الْمُتَقَرِّبُونَ بِأَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ أَدَاءِ مَا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِمْ، وَلَا يَزَالُ الْعَبْدُ يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ لَهُ سَمْعًا وَبَصَرًا وَيَدًا وَمُؤَيِّدًا
“আমার বান্দারা আমার নৈকট্য লাভের জন্য এমন কোনো আমল নিয়ে আসে না, যা আমার কাছে তাদের ওপর ফরজ করা আমল আদায়ের চেয়ে বেশি প্রিয়। আর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণ, তার দৃষ্টি, তার হাত এবং তার সহায় হয়ে যাই।” সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সহিহ হাদিসে কুদসিতে আরও বলেছেন:
مَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَمَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا، وَمَنْ أَتَانِي يَسْعَى أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
“যে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে দুই বাহুর দূরত্ব পরিমাণ এগিয়ে যাই। আর যে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাই।”[13]
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আরও বলেছেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ – আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দিন) নিশ্চয় আমি কাছেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬।
মৃত ব্যক্তির বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَا تُبْصِرُونَ – আমি তোমাদের চেয়েও তার বেশি কাছে; কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না। সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৮৫।
আমাদের মতে এর অর্থ হলো, তোমরা দেখছ, কিন্তু কী দেখছ তা জানো না। তাই তোমাদের দেখা যেন না দেখার মতো।
অতঃপর জেনে রাখো, আল্লাহর নৈকট্য তিনভাবে হয়। প্রথমত, চিন্তা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে আল্লাহর মারিফত অর্জনের নৈকট্য। মানুষ সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করে, তারপর সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায় কিংবা ভুল করে। সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করার পর তার ইজতিহাদ শেষ হয়। কিন্তু মুজতাহিদ কখনো এমন বিষয়কেও দলিল মনে করতে পারে, যা আসলে দলিল নয়। তখন আল্লাহ তাকে সঠিক দলিলধারীদের মতোই প্রতিদান দেন। কারণ সে আল্লাহর বাণী থেকে যা বুঝেছে, তা অনুযায়ী কাজ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ – আর যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে, যার পক্ষে তার কাছে কোনো দলিল নেই।” সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১১৭।
কিছু আলিমের মত হলো, শাখাগত ও মূলগত উভয় বিষয়ে ইজতিহাদের অবকাশ আছে। মুজতাহিদ যদি ভুল করে, তবু তার জন্য একটি সওয়াব আছে। আর যদি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তবে তার জন্য দুটি সওয়াব আছে।
দ্বিতীয় প্রকার হলো ইলমের মাধ্যমে নৈকট্য। আর তৃতীয় প্রকার হলো আমলের মাধ্যমে নৈকট্য। আমলের মাধ্যমে নৈকট্য আবার দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ হলো ফরজ আদায়ের মাধ্যমে নৈকট্য। দ্বিতীয় ভাগ হলো প্রকাশ্য ও গোপন আমলে নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য।
ইলমের নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তর হলো তাওহিদের ইলম। কারণ আল্লাহর উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। যদি এই ইলম সরাসরি মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি থেকে আসে, চিন্তা-ভাবনা ও যুক্তি-অনুসন্ধান থেকে না আসে, তবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের কথা আল্লাহ তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেছেন, شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ – আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; ফেরেশতারা এবং ইলমের অধিকারীরাও সাক্ষ্য দিয়েছে।” সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮।
কারণ এই সাক্ষ্য যদি মুশাহাদা থেকে না আসে, তাহলে তা আসল সাক্ষ্য নয়। মুশাহাদার মধ্যে সন্দেহ প্রবেশ করে না, সংশয়ও ঢোকে না। আর যদি কেউ আল্লাহর একত্বকে সেই দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে, যা তাকে চিন্তা-অনুসন্ধান দিয়েছে, তবে সে এই উল্লিখিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ চিন্তাশীল মানুষ যতই চিন্তা করুক, কোনো না কোনো সময়ে তার দলিল ও প্রমাণের ভেতর সন্দেহ ঢুকতে পারে। আবার তার ভেতরে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।
তাই চিন্তা-ভিত্তিক ইলমের মানুষ কখনো মুশাহাদার মানুষের শক্তি লাভ করে না। এই শ্রেণির মানুষের ব্যাপারে যদি আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামে প্রবেশের ফয়সালা করেন, তবে সেই দলিলই তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবে; তবে তা হবে শাফায়াতকারীদের শাফায়াতের পর।
আর আমলের মাধ্যমে নৈকট্য দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি প্রকাশ্য আমলের ইলম, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়টি গোপন আমলের ইলম, যা নফসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জেনে রাখো, গোপন আমলের সবচেয়ে বড়টি হলো আল্লাহর প্রতি ইমান আনা এবং রসুলের কাছ থেকে যা এসেছে তা অস্বীকার না করা। ইমানের আমল সব কাজ ও সব বর্জনকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই কোনো মুমিন প্রকাশ্য বা গোপন কোনো গুনাহে লিপ্ত হলে, তার মধ্যেও আল্লাহর দিকে একটি নৈকট্য থাকে। তা এই দিক থেকে যে, তার ইমান তাকে জানিয়ে দেয়, এটি গুনাহ। সুতরাং কোনো মুমিনের মন্দ আমল একেবারে নিখাদ মন্দ থাকে না; বরং তার সঙ্গে কোনো না কোনো নেক আমল মিশে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা এমন মানুষের ব্যাপারে বলেছেন, عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ – আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। সুরা তাওবা, আয়াত: ১০২।
এখানে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, তা এই নয় যে, তারা তাওবা করেছে। বরং এর অর্থ হলো, তারা ক্ষমা ও ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনার দিকে ফিরে এসেছে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে “আশা করা যায়” বলা সব আলিমের মতে ‘অবধারিত হওয়া’র অর্থ দেয়।
ফরজ ইমান সঠিকভাবে গৃহীত হওয়ার জন্য শর্ত হলো সব ফরজ ইমান গ্রহণ করা। এরপর বান্দা ফরজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। যার মধ্যে এ অবস্থা পূর্ণ হলো, সে হকের শ্রবণ হয়ে গেল, হকের দৃষ্টি হয়ে গেল। হক তার ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছার সঙ্গে এক করে দিলেন; আর বান্দা জানল যে তার ইচ্ছাই আল্লাহর ইচ্ছা এবং তার সংঘটনও আল্লাহর পক্ষ থেকেই। কিন্তু শুধু ইলম থাকলেই কেউ এই মাকামের অধিকারী হয় না। এই মাকামের মানদণ্ড হলো ফরজ আদায়; আর ফরজ আদায়ই আল্লাহর নৈকট্যের সবচেয়ে প্রিয় পথ।
নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্যের বিষয়েও বান্দা আল্লাহর মুখমণ্ডলের দিকে থাকে। আর আল্লাহর ভালোবাসা তাকে এ মর্যাদা দেয় যে হক তার শ্রবণ ও দৃষ্টি হয়ে যান। ফরজের নৈকট্য থেকে নফলের নৈকট্যের পার্থক্য এখানেই।
ভালোবাসারও পৃথক পৃথক স্তর আছে। প্রেমিকের মধ্যে যেমন ভালোবাসার বিভিন্ন মর্যাদা আছে— প্রেমিক, প্রিয় এবং সবচেয়ে প্রিয়; আল্লাহ নিজেকেও “আহাব্ব” তথা অধিক প্রিয় বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি তার কাছে আমার নির্ধারিত ফরজ আদায়ের চেয়ে বেশি প্রিয় কোনোকিছুর মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করাকে দেখি না।” আর নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, “আমি তাকে ভালোবাসি।” এটি আলাদা মর্যাদা। ইমান তার ওপর ফরজ করা হয়েছে; তাই মুমিনের জন্য ভালোবাসা আছে, আবার অধিক ভালোবাসাও আছে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলও এক ধরনের নৈকট্য। এ ধরনের আমলের ফল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লাভ করবেই। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার আমলের ফল পাবে; সে যে ঘরেই থাকুক, যে শ্রেণিরই হোক, সে ওই আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্য করুক বা না করুক।
কারণ আমল নিজেই তার ফল দাবি করে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে যে কাজ ঘটে, তার একটি অধিকার আছে; নিয়তেরও একটি অধিকার আছে, আর নিয়ত নফসের অধিকার। এমনকি কোনো মানুষ যদি ডান হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে আল্লাহর জিকির করতে থাকে এবং সেই ছুরি দিয়ে কোনো মানুষের অঙ্গ কেটে ফেলে, তবে যে জিকির জিহ্বা ও নফসের ওপর চলেছে এবং সে বিষয়ে তার যে নিয়ত ছিল, তার কারণে অঙ্গের জন্য জিকিরের সওয়াব থাকবে; কিন্তু আগের কথার সঙ্গে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। বাহ্যিক শরিয়তের বিধান তার কসমের কারণে দাবিদারের অধিকার বাতিল করে দিয়েছে। দুনিয়ার প্রকাশ্য বিচারে একটি অঙ্গের কাজের প্রভাব যদি এত শক্তিশালী হয়, তাহলে আখিরাতে সেই অঙ্গ যখন নিজের রবের জিকির করেছে, তখন তার অর্জিত ফল কেমন হবে— একবার ভাবো।
কারণ অঙ্গ নিজে জানে না, এ বিষয়ে নফস কী নিয়ত করেছে। তার অংশ তো শুধু আল্লাহর জিকির উচ্চারণ করা। সে জানে না, এই জিকির নফসের জন্য বিপদ হয়ে ফিরবে কি না। সে এটাও জানে না, এটি শরিয়তসম্মত ছিল, না শরিয়তসম্মত ছিল না।
এ কারণেই যখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও চামড়া, তাদের পরিচালনাকারী নফসের বিরুদ্ধে নিজেদের দ্বারা সংঘটিত আমলের সাক্ষ্য দেবে, তখন তারা এ সাক্ষ্য দেবে না যে, কাজটি গুনাহ ছিল নাকি আনুগত্য ছিল। তারা শুধু সাক্ষ্য দেবে, তারা কী কাজ করেছে। আর সেই কাজের প্রকৃত বিধান আল্লাহই জানেন।
এ কারণেই কিয়ামতের দিন তারা সাক্ষ্য দেবে— تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ – তাদের জিহ্বা, তাদের হাত এবং তাদের পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে; তারা যা করত সে সম্পর্কে। সুরা নুর, আয়াত: ২৪।
কিন্তু তারা এ সাক্ষ্য দেবে না যে, কাজটি আনুগত্য ছিল নাকি গুনাহ ছিল। কারণ তাদের মর্যাদা সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার নয়। সুতরাং মানুষ তার দেহের দিক থেকে পুরোপুরি সৌভাগ্যবান; আর নফসের দিক থেকে, যদি সে মুমিন হয়, তবে সে মিশ্র অবস্থার অধিকারী; তার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটোই থাকে।
আর আল্লাহ বান্দার কাছে থাকার দিক থেকে দুই ধরনের নৈকট্য আছে। একটি হলো রহমত, মমতা, ক্ষমা, ছাড়, মাগফিরত ও ইহসানের নৈকট্য। আরেকটি নৈকট্য এমন, যার পর্দা পুরোপুরি উন্মোচন করা সম্ভব নয়; তবে তার দিকে ইশারা করা যায়। আমরা বলি, আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কাছে তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তখন হয় তিনি কোনো মাদ্দা তথা বস্তুগত রূপে প্রকাশিত হন, নয়তো বস্তুর রূপ ছাড়া প্রকাশিত হন।
যদি আল্লাহ কোনো দৃশ্যমান রূপে তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তাহলে সেই রূপের মাধ্যমেই তাঁর নৈকট্য প্রকাশ পায়। তখন মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ দর্শন এবং রুয়াত তথা দেখার অবস্থায় সেই নৈকট্য অনুভূত হয়।
আর যদি তিনি বস্তুর রূপ ছাড়া তাজাল্লি প্রকাশ করেন, তাহলে নৈকট্য হয় মর্যাদা ও স্তরের নৈকট্য। যেমন বাদশাহর সঙ্গে মন্ত্রীর, বিচারকের, গভর্নরের বা হিসবার দায়িত্বশীলের নৈকট্য। এটি স্তরভেদে ভিন্ন ভিন্ন নৈকট্য। কখনো নিম্নপদের লোক বাদশাহর পাশে, তাঁর বামদিকে, এমন কোনো আদেশের জন্য বসে, যা তার পদমর্যাদায় কার্যকর হবে। আর উচ্চপদের কেউ সেই একই মজলিসে আসনের দিক থেকে আরও দূরে থাকে। কিন্তু আসনে কাছে থাকা প্রমাণ করে না যে, সে দূরে থাকা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। কারণ বস্তুগত অবস্থার বিধান আর আত্মিক মর্যাদার বিধান এক নয়।
এ কথা বুঝলে তুমি আল্লাহর নৈকট্যের ইলমের কাছে পৌঁছে গেলে। কারণ দুই সত্তার মধ্যে নৈকট্যের ধারণা এক দিক থেকে পরস্পর-সম্পর্কিত। যে তোমার কাছে, তুমিও তার কাছে; এই অর্থে তোমার ওপরও নৈকট্যের গুণ আরোপিত হয়। কিন্তু প্রকৃত অবস্থায় আল্লাহ থেকে দূরে থাকার কোনো পথই নেই। দূরত্ব কেবল আপেক্ষিক বিষয়; ইলাহি নামগুলোর বিধানে তা প্রকাশ পায়।
যে সময় কোনো ব্যক্তির ওপর একটি ইলাহি নামের বিধান কার্যকর থাকে, সেই সময়ই সে সেই নামের নৈকট্যে থাকে এবং অন্য নামের বিধান থেকে দূরে থাকে। আর যে ইলাহি নামের বিধান ওই সময়ে তার ওপর কার্যকর নয়, সে নাম তার থেকে দূরে। কিন্তু তুমি যার কবজায় আছো, তার থেকে তুমি কীভাবে দূরে হবে, অথবা তিনি তোমার থেকে কীভাবে দূরে হবেন?
আল্লাহ তায়ালা কি আদম (আ.)-এঁর জন্য তাঁর কুদরতি ডান হাত খুলে দেননি? আর তাঁর উভয় হাতই বরকতময় ডান হাত। তিনি তা প্রসারিত করলেন, তখন তাতে আদম ও তাঁর সন্তানসন্ততি ছিল। তাহলে যে হকের ডান হাতে আছে, তার দুর্ভাগ্য কি স্থায়ী হতে পারে? না, আল্লাহর কসম, পারে না। আর অন্য কবজায় ছিল সমগ্র জগত।
এখন দেখো, আদমকে হকের ডান হাতে নির্বাচন করার মধ্যে কী রহস্য আছে। যদিও আদম জানতেন, তাঁর রবের উভয় হাতই বরকতময় ডান হাত। এর অর্থ তাই, যা আমরা উল্লেখ করেছি।
যদি আদমের জন্য তাজাল্লি বস্তুগত রূপে না ঘটত, তাহলে দুই হাতকে ধরা ও প্রসারিত করার গুণে বর্ণনা করা হতো না। নৈকট্যের পরিচয় সম্পর্কে আমরা তোমাকে সতর্ক করেছি, যেন তুমি নিজের ভেতর আল্লাহর সঙ্গে তা প্রত্যক্ষ করতে পারো— যদি তুমি এই দুনিয়াতেই তাজাল্লির অধিকারী হও।
আর যখন তাজাল্লি বস্তুগত রূপে ঘটে, তখন সীমা-পরিমাণ অবশ্যই আসে। তাই আসে বিঘত, হাত, দুই বাহুর দূরত্ব, হেঁটে আসা ও দ্রুত এগিয়ে আসার ভাষা— এ-সব অবস্থার দাবি অনুযায়ী। কারণ বস্তুগত রূপে নৈকট্য অবস্থার অধীন। ফলে দুই নিকটবর্তী সত্তার মধ্যে বস্তুগত নৈকট্য অবস্থার পরিমাণ অনুযায়ী হয়। এতে জানা যায়, সেই নৈকট্যের রূপটি আসলে অবস্থারই প্রকাশ; সে অবস্থাগুলোর ভাষ্যকার।
আর আল্লাহর নৈকট্য যদি রূপ ধারণের দিক থেকে হয়, তাহলে তা শুধু খলিফাদের জন্য বিশেষ; তারা রসুল হোন বা রসুল না হোন। কারণ রিসালত ইলাহি কোনো স্বভাবগত গুণ নয়; বরং তা প্রেরক ও প্রেরিত ব্যক্তির মধ্যকার একটি সম্পর্ক। উদ্দেশ্য হলো, প্রেরিত ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে সেই বার্তা পৌঁছে দেবে, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো দরকার। তাই রসুল বিশেষভাবে তাবলিগের ক্ষেত্রে খলিফা ও প্রতিনিধি। আর খিলাফতের পূর্ণতা এবং প্রতিনিধিত্ব কেবল বিধান পরিচালনার ক্ষেত্রে। এর দাবি আসে ইলাহি নামসমূহের হাকিকত থেকে। কখনো কাহর তথা প্রবল দমন, ইর‘আদ তথা ভীতিপ্রদ কম্পন, ইহরাক তথা দহন, পাকড়াও, রহমত, ক্ষমা, ছাড়, হিসাব, প্রতিদান, প্রতিশোধ ও শাস্তির মাধ্যমে। ইলাহি বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো শাস্তি, যখন তা হিসাব ছাড়াই আসে, কিংবা যথাযথ অধিকার আদায়ে কোনো ছাড় ছাড়াই আসে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ – তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় না। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩।
আর পাকড়াও ও ছাড়ের কথা এসেছে হিসাবের পর। প্রশ্ন ও হিসাবের কথা এসেছে আল্লাহর এই বাণীতে, وَهُمْ يُسْأَلُونَ – আর তাদের প্রশ্ন করা হবে। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩। আর আল্লাহর বাণী, فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ – পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ একমাত্র আল্লাহরই। সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৯।
সুতরাং রূপগত নৈকট্য দুই ভাগে বিভক্ত। এক ধরনের খিলাফত হলো ইলাহি ঘোষণাপত্র ও অনুমোদনের মাধ্যমে। আরেক ধরনের খিলাফত হলো কোনো প্রকাশ্য অনুমোদন ছাড়া শুধু ইলাহি পরিচয়ের কার্যকারিতার মাধ্যমে। কিন্তু আদবের ভাষায় এ দ্বিতীয় ধরনের নৈকট্যকে খিলাফত বলা হয় না। বাস্তবতার বিচারে এটি খিলাফতও নয় এবং খলিফাও নয়। ঐ খিলাফতের ভেতরেও খলিফাদের মধ্যে স্তরভেদ আছে। আর প্রকৃত খিলাফত ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে খিলাফতের পরিচয় শুধু অর্থগত নৈকট্যে পূর্ণতা পায়।
কারণ যে ব্যক্তি ইলাহি পরিচয় ও অনুমোদনের ভিত্তিতে খলিফা, বাহ্যিকভাবে সে প্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকে, কিন্তু জগতে তার বিধান কার্যকর হয়। সে অন্য কারও আদেশে নয়; বরং যেন নিজেই নিজের ওপর শাসনকারী। কিন্তু যে ব্যক্তি জগতে নিজের বিধান নিজের মাধ্যমেই কার্যকর করে, কোনো ইলাহি আদেশ, অনুমোদন বা ঘোষণাপত্র ছাড়া, সে বাহ্যিক রূপে তাদের চেয়েও বেশি কাছে, যাদের খিলাফত ইলাহি আদেশ, পরিচয় ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। তবে সে সেই কাঙ্ক্ষিত সৌভাগ্যের বেশি কাছে, যার দিকে সে ব্যক্তি পৌঁছায়নি, যার খিলাফতের সঙ্গে ইলাহি আদেশ যুক্ত হয়নি।
আল্লাহর মারিফতের ক্ষেত্রে নৈকট্য সম্পর্কে এটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।
বু‘দ:
জেনে রাখো, বু‘দ হলো বিরোধিতার ওপর অটল থাকা। আর তোমার থেকে যা দূরে, তার ক্ষেত্রেও বু‘দ শব্দ ব্যবহার করা হয়।
البعد مسلك ذئب ونسر وشفع ووتر
বু‘দ হলো নেকড়ে, শকুন, জোড়া ও বিজোড়ের পথ।
لما رأيت إماما يقول للقوم سيروا
যখন আমি এক ইমামকে দেখলাম, তিনি লোকদের বলছেন, “চলো।”
صفوكم في صلاة لها السهلا والمدعر
তোমরা নামাজে নিজেদের সারি সোজা করো; এ সারিতে আছে সমতল পথও, কঠিন পথও।
علمت أن وجودي له البقا والسفر
তখন বুঝলাম, আমার অস্তিত্বের জন্য আছে স্থায়িত্বও, আছে সফরও।
জেনে রাখো, অবস্থার ভিন্নতার কারণে বু‘দের অর্থও ভিন্ন হয়। অবস্থার লক্ষণ ও ইঙ্গিত দেখে বুঝতে হবে, কোন বু‘দ উদ্দেশ্য। আর যে-সব অবস্থা ও আলোচনা আমরা আগে উল্লেখ করেছি, সব মিলিয়ে মূল কথা হলো— যদি বু‘দ বান্দার এমন কোনো গুণ না হয়, যা তার ঠিক বিপরীত গুণকে মুছে দেয়, তাহলে এই অধ্যায়ের সারকথা এটিই, যার দিকে এই পথের সাধকগণ ইঙ্গিত করেছেন।
আমাদের মতে বু‘দের বিধান হলো, মানুষ যে বিষয়কে বু‘দ মনে করে, কখনো তা এর বিপরীতও হতে পারে; যদিও আমরা তা স্বীকার করলাম যে, তারা যা বু‘দ মনে করেছে, তা সত্যিই বু‘দ। তবে আমরা এখানে এমন কিছু সূক্ষ্ম বিষয় বাড়িয়েছি, যা সাধারণত লোকদের চোখ এড়িয়ে যায়। তারা যে বিষয়গুলোকে বু‘দের পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছে, আমরা সেগুলোও উল্লেখ করব।
কুরব ও বু‘দের সম্পর্ক হলো মিলন ও বিচ্ছেদের সম্পর্ক। যেখানে মিলন ঘটে, সেখানে বিচ্ছেদের অবস্থা থাকে না; আর যেখানে বিচ্ছেদ ঘটে, সেখানে মিলনের অবস্থা থাকে না। সুতরাং দুটি বিষয় যখন কোনো এক অবস্থায় মিলিত হয়, সেটিই নৈকট্যের চূড়ান্ত সীমা। কারণ যে জায়গায় তারা মিলেছে, সেখানে প্রত্যেকটি সত্তা অন্যটির সঙ্গী হয়ে ওঠে।
আর যখন প্রত্যেকটি সত্তা নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যটি থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন বিচ্ছেদ ঘটে। এই বিচ্ছেদই বু‘দ। কারণ তখন একটি সত্তা অন্যটির সঙ্গে মিলিত থাকে না; বরং নিজ নিজ স্বরূপে আলাদা থাকে। বস্তুর সীমারেখায় এই আলাদা হয়ে থাকার রূপ প্রকাশ পায়। আর যখন বু‘দ ঘটে, তখন বিধানও ভিন্ন হয়ে যায়।
কখনো বু‘দ হয় আপেক্ষিক; যেমন স্থান, সময়, একক, পরিমাণ, সৃষ্টিজগৎ ও রঙের ভিন্নতা। কারণ এসব বিষয়ের নিজস্ব স্বভাবই ভিন্নতা দাবি করে। সুতরাং যখন দুটি বিষয়কে এমনভাবে ধরা হয় যে, একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই, এবং সব দিক থেকে তারা একে অন্যের থেকে আলাদা, তখন সেটিই বু‘দের চরম সীমা।
তবে জগৎ আল্লাহ থেকে দূরে নয়। কারণ জগৎ আল্লাহ থেকেই আছে; আবার আল্লাহ নিজের সত্তার দিক থেকে এমন সত্তা, যিনি সবকিছুকে একত্র করেন। এ কথাই আল্লাহ তায়ালার বাণীতে আছে, اللَّهُ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ – আল্লাহ সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭। আর আল্লাহ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুই ছিল না।
এরপর বু‘দের আরেক স্তরে নেমে দেখো। আমরা বলি, বান্দা কখনো নিজের মনিব থেকে এত দূরে নয় যে, তার কোনো প্রভুই নেই। কারণ যার কোনো প্রভু নেই, সে বান্দাই থাকে না। উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ কোনো নৈকট্যের অবস্থা নয়। বরং বান্দা এই জ্ঞানের মাধ্যমে তার মনিবের কাছে আসে যে, সে তাঁর বান্দা; আর তার মনিবও জানেন, এ ব্যক্তি তাঁরই বান্দা। এই উবুদিয়্যাতই তার আসল পরিচয়। তাই উবুদিয়্যাত তাকে মনিব থেকে বু‘দের দাবি করে; আবার মনিব সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে মনিবের নৈকট্যের দাবি করে।
আল্লাহ বায়েজিদ বোস্তামিকে বলেছিলেন, যখন তিনি কুরব বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং বুঝতে পারছিলেন না, কী দিয়ে আল্লাহর কাছে যাবেন। তখন গোপনে তাঁকে বলা হলো, يا أبا يزيد تقرب إلي بما ليس لي الذلة والافتقار – হে আবু ইয়াজিদ, এমন জিনিস দিয়ে আমার কাছে এসো, যা আমার নেই; আর তা হলো অসহায় অবস্থা ও মুখাপেক্ষিতা।”
আল্লাহ সুবহানাহু নিজের ব্যাপারে জিল্লত তথা অসহায় অবস্থা এবং ইফতিকার তথা মুখাপেক্ষিতাকে নাকচ করেছেন। আর যে গুণ আল্লাহ নিজের থেকে নাকচ করেছেন, সেটি তাঁর থেকে বু‘দের গুণ। সুতরাং, যার মধ্যে এই গুণ প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সেই গুণে গুণান্বিত হয়, যা বু‘দের দাবি করে। অর্থাৎ এই গুণের দিক থেকে সে বু‘দের অবস্থায় থাকে।
আরেক সময় বায়েজিদ তাঁর রবকে বললেন, “আমি কীভাবে আপনার কাছে যাব?” তখন হক তাঁকে বললেন, اترك نفسك وتعال – তোমার নফসকে ছেড়ে দাও, তারপর এসো।
অর্থাৎ, যখন তুমি নিজের নফসকে ছেড়ে দেবে, তখন নিজের বান্দাত্বের বিধানও ছেড়ে দিলে। কারণ বান্দাত্বই তো প্রভুত্ব থেকে দূরে থাকার মূল চিহ্ন। বান্দা মনিব থেকে দূরে— তার জিল্লত ও মুখাপেক্ষিতার দিক থেকে। তাই আল্লাহ তাঁর কাছে চাইলেন বান্দাত্বের মাধ্যমে নৈকট্য। আবার আল্লাহর আখলাকে গুণান্বিত হওয়ার পথে তাঁর কাছে চাইলেন নফসকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে নৈকট্য। এবং আল্লাহর আখলাকে গুণান্বিত হওয়াই এক ধরনের মিলন।
সুতরাং বস্তু-রূপ ছাড়া তাজাল্লি হলে সেখানে বু‘দের তাজাল্লি ঘটে। আর বস্তু-রূপে তাজাল্লি হলে কুরবের তাজাল্লি ঘটে। ইলাহি নামসমূহ থেকে বু‘দ বলতে বোঝায়— প্রত্যেক নামের বিধান একই সময়ে বান্দার ওপর কার্যকর না থাকা।
জেনে রাখো, ইলাহি নামসমূহের বিধান যখন বান্দার মধ্যে ইলাহি আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ পায়, তখন সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্বের নৈকট্যে থাকে; সরাসরি হাকিকতের নৈকট্যে নয়। আর যখন সেই নামগুলোর কিছু বিধান ইলাহি আদেশের বাইরে প্রকাশ পায়, তখন সে সেই বু‘দের মধ্যে পড়ে, যেখান থেকে আশ্রয় চাইতে হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وأعوذ بك منك – আমি আপনার থেকেই আপনার আশ্রয় চাই।
এ আশ্রয় চাওয়ার কারণ হলো, সৃষ্টির হাকিকত তার সৃষ্ট অবস্থায় কখনো আল্লাহর স্রষ্টা হওয়ার গুণে, আল্লাহর কিবরিয়া তথা মহত্ত্বে এবং আল্লাহর জাবারুত তথা পরাক্রমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এগুলো হকের গুণ। যদি এ গুণগুলো বান্দার মধ্যে দাঁড়িয়ে যায়, তবে হক তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তাই বান্দা তখন আল্লাহর আশ্রয় চায় এমন জিনিস থেকে, যার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয়যোগ্য বিষয় নেই। কারণ হকের কিবরিয়া ও জাবারুত নিজের গুণ থেকেই আনন্দিত হয় বান্দার তাওবায়, বান্দার ফিরে আসায়, বান্দার ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও অসুস্থতার বর্ণনায়। সুতরাং এই আশ্রয় চাওয়ায় ফল আছে।
এর আরেক উদাহরণ হলো সেই কথাটি, যেখানে একই সত্তাকে আশ্রয়দাতা ও আশ্রয়প্রার্থী দুয়ের সঙ্গেই যুক্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি আল্লাহ। তাই বলা হয়: “আমি আপনার থেকেই আপনার আশ্রয় চাই।” সৃষ্ট সত্তা যখন আল্লাহকে মহিমান্বিত করে, তখন সে যে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, এটি সেই অবস্থার প্রকাশ।
আর বিরোধিতার বু‘দ হলো, বান্দা তার সৌভাগ্য থেকে দূরে সরে যায় এবং সেই ইলাহি নামসমূহ থেকেও দূরে যায়, যেগুলোর বিধান আনুগত্যে মিল ও সম্মতির দাবি করে। তবে বিরোধিতার মধ্যেও, দায়িত্বের দিক থেকে সৃষ্টিজগত যে ইলাহি নামসমূহের অধীন, সেগুলোর কিছু নৈকট্য থাকে। কারণ সেগুলো ক্ষমা ও পাকড়াওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুতরাং যে গুনাহ করে, সে পাকড়াওয়ের বিধানের কাছে থাকে। কারণ বিরোধিতা রহমত দাবি করে এবং শাস্তির সম্মুখীন করে; আর আল্লাহ তাঁর রীতিতে এভাবেই ব্যবস্থা করেছেন।
তাই বিরোধিতার বু‘দে এমন কিছু থাকে না, যা বান্দার সৌভাগ্য থেকে দূরত্ব ছাড়া আর কিছু প্রমাণ করে; হয় তার প্রাপ্যের কিছু কমে যায়, নয়তো অপরাধের কারণে তাকে পাকড়াও করা হয়।
আর আনুগত্যের মাধ্যমে যে বু‘দের কথা আগে বলা হয়েছে, সেটি হলো বায়েজিদের সেই কথার অর্থ: “তোমার নফসকে ছেড়ে দাও এবং এসো।” যে নিজের নফসকে ছেড়ে দেয়, সে তা থেকে দূরে চলে যায়। এই অধ্যায়ে আমরা তোমাকে এ কথার অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছি। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।[14]
দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে দেখা যায়, কুরব ও বু’দ আসলে একই সম্পর্কের দুই মুখ। একটি মিলনের, অন্যটি বিচ্ছেদের। কুশাইরি দেখিয়েছেন কুরবের স্তরভেদ এবং কীভাবে নৈকট্যের অনুভূতিও কখনো পর্দা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইবনে আরাবি আরও গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন, প্রকৃত কুরব হলো নিজের অস্তিত্বকে ভুলে আল্লাহর তাজাল্লিতে বিলীন হওয়া, আর বু’দ হলো নিজের স্বতন্ত্র সত্তায় আটকে থাকা। সবশেষে বলা যায়, কুরব ও বু’দ শেখায়— প্রকৃত নৈকট্য কোনো দূরত্ব মাপার বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের এক অবস্থা, যেখানে বান্দা নিজেকে ভুলে গিয়ে কেবল আল্লাহকেই দেখতে পান। এটাই সুফি সাধনার সেই গভীর সত্য, যেখানে নৈকট্য আর বিলীন হওয়া একই বিন্দুতে মিলিত হয়।