শাহিদ একটি গভীর পরিভাষা। এর আক্ষরিক অর্থ সাক্ষী বা উপস্থিত; কিন্তু সুফি পরিভাষায় এটি বোঝায় সেই বিষয়, যা অন্তরে সদা হাজির থাকে এবং যার স্মরণ অন্তরের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বিস্তার করে। অন্তরে যদি জ্ঞানের আধিক্য প্রবল হয়, সে হলো শাহিদুল ইলম। আধ্যাত্মিক আবেগ প্রবল হলে শাহিদুল ওয়াজদ। হাল বা আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হলে শাহিদুল হাল। আর পরম সত্যের স্মরণ প্রবল হলে শাহিদুল হাক। সাধারণ চোখের দেখা আর শুহুদের মধ্যে পার্থক্য আছে, শুহুদে বিশ্বাসের সাক্ষ্য প্রকাশ পায়, সাধারণ দেখায় তা হয় না।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি সহজ ভাষায় শাহিদের সংজ্ঞা দিয়েছেন, অন্তরে যা সদা হাজির থাকে এবং যার স্মরণ প্রবল থাকে, তাই শাহিদ। জ্ঞান প্রবল হলে জ্ঞানের শাহিদ, ওয়াজদ প্রবল হলে ওয়াজদের শাহিদ। ভালোবাসাও প্রিয়জনকে শাহিদ বানিয়ে দেয়। তিনি শিবলির উদাহরণ এবং নবীজির মিরাজের ঘটনা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, পরম সৌন্দর্য দেখেও যিনি আল্লাহর দর্শন থেকে বিচ্যুত হননি, সেটিই তাঁর ফানার সাক্ষ্য।
তিনি বলেন, সুফি সাধকগণের কথাবার্তা ও আলোচনায় প্রায়শই এই কথাটি উঠে আসে: অমুক ব্যক্তি শাহিদুল ইলম অর্থাৎ জ্ঞানের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত, অমুক ব্যক্তি শাহিদুল ওজদ অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত, এবং অমুক ব্যক্তি শাহিদুল হাল অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অবস্থার শাহিদ দ্বারা পরিচালিত।
তারা শাহিদ পরিভাষাটি দ্বারা এমন কিছু বুঝিয়ে থাকেন, যা মানুষের অন্তরে সদা হাজির থাকে। আর এটি এমন বিষয়, যার স্মরণ মানুষের অন্তরের ওপর প্রবল হয়ে থাকে; যার ফলে সে বিষয়টিকে যেন নিজের চোখে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারে, যদিও তা মূলত তার কাছ থেকে অদৃশ্য থাকে। সুতরাং, কোনো অধিকারীর অন্তরে যার স্মরণ পুরোপুরি কর্তৃত্ব বিস্তার করে, তা-ই হলো তার শাহিদ।
এরপর অন্তরে যদি জ্ঞানের আধিক্য প্রবল হয়, তবে তাকে জ্ঞানের শাহিদ বলা হয়। আর যদি অন্তরে আধ্যাত্মিক আবেগের আধিক্য প্রবল হয়, তবে বলা হয় যে, সে ওয়াজদের শাহিদ দ্বারা পরিচালিত।
মূলত শাহিদ শব্দের অর্থ হলো হাজির বা উপস্থিত। অতএব, যা কিছু আপনার অন্তরে উপস্থিত থাকে, তা-ই আপনার শাহিদ।
হজরত শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে যখন মুশাহাদা অর্থাৎ সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, “আমাদের পক্ষে পরম সত্যের সরাসরি মুশাহাদা করা কীভাবে সম্ভব! আমাদের জন্য তো রয়েছে শাহিদুল হাক।”
এখানে শাহিদুল হাক বলে তিনি সেই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা তাঁর অন্তরের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে আছে এবং পরম সত্যের স্মরণ হিসেবে যা তাঁর অন্তরে সর্বদা প্রবল ও উপস্থিত থাকে।
একইভাবে কোনো ব্যক্তির অন্তরে যদি কোনো সৃষ্টির প্রতি গভীর আসক্তি তৈরি হয়, তবে বলা হয় যে সেটিই তার শাহিদ। এর অর্থ হলো, সেই সৃষ্টিটি তার অন্তরে সদা উপস্থিত থাকে; কারণ ভালোবাসা প্রিয়জনের সার্বক্ষণিক স্মরণকে অনিবার্য করে তোলে এবং অন্তরের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
আবার কোনো কোনো সুফি-সাধক এই শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে কিছুটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, শাহিদ শব্দটি মূলত শাহাদাত অর্থাৎ প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেওয়া থেকে এসেছে। বিষয়টি এমন যে, কোনো ব্যক্তি যখন সৌন্দর্যের গুণে গুণান্বিত কোনো ব্যক্তির দিকে তাকায়, তখন তার ভেতরের মানবীয় সত্তা যদি তার থেকে দূর হয়ে যায়, সেই ব্যক্তির প্রত্যক্ষ দর্শন তাকে নিজের হাল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করে না, এবং তার সাহচর্য তার ওপর কোনোভাবেই প্রভাব ফেলে না। অতএব, এটি তার নিজের ফানা তথা আত্মবিলুপ্তির পক্ষে একটি সাক্ষী। আর যার ওপর এর প্রভাব পড়ে, তা তার নফসের স্থায়িত্ব এবং মানবিক অভ্যাসের ওপর বহাল থাকার পক্ষে সাক্ষী। সুতরাং, এটি হয় তার পক্ষে সাক্ষী, না হয় তার বিরুদ্ধে সাক্ষী।
আর এই অর্থেরই প্রতিফলন ঘটেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীতে—
رأيتُ ربِّي ليلةَ المعراجِ في أحسنِ صورةٍ
আমি মিরাজের রাতে আমার রবকে সবচেয়ে সুন্দর রূপে দেখেছি।
অর্থাৎ, সেই রাতে আমি যে পরম সুন্দর রূপটি দেখেছি, তা আমাকে আল্লাহ তায়ালা’র দর্শন থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং আমি সেই রূপের মাঝেই রূপকারকে এবং সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টাকে অবলোকন করেছি। আর এখানে দর্শন বলতে জ্ঞানগত উপলব্ধির কথা বোঝানো হয়েছে, চাক্ষুষ দৃষ্টি দিয়ে ধরা-ছোঁয়া নয়।[1]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি শাহিদকে অনেক গভীরে নিয়ে গেছেন। তাঁর মতে শাহিদ হলো শুহুদের সময় নফসে মাশহুদের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠা; এটি সাধারণ চোখে দেখার চেয়ে আলাদা, কারণ শুহুদের আগে মাশহুদ সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিটি মুশাহাদা এক ধরনের দেখা, কিন্তু প্রতিটি দেখাই মুশাহাদা নয়। কামেল আরিফগণ ছাড়া হককে সরাসরি চোখে দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রত্যেকেই তাঁর শুহুদ লাভ করে।
তিনি বলেন, এটি একটি ইসম ফায়েল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য)। সুতরাং অন্তরে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তার যে প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা-ই হলো শাহিদের প্রকৃত সত্তা এবং এর মাধ্যমেই মুশাহিদ তথা দর্শনকারীর পরম আনন্দ অর্জিত হয়।
مُشَاهَدَةُ الحَقِّ مِنْ عِلْمِنَا تَحْصِيْلُ شَاهِدِهَا فِي القُلُوْبْ
আমাদের জ্ঞান অনুসারে হকের মুশাহাদা তথা পরম সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন হলো অন্তরে তাঁর শাহিদ তথা সাক্ষ্যের উপস্থিতি লাভ করা।
فَيُدْرِكُهَا بِعُيُوْنِ الحِجَى مُوَفَّقَةً خَلْفَ سِتْرِ الغُيُوْبْ
অতঃপর মানুষ বুদ্ধিমত্তার চোখ দিয়ে তা উপলব্ধি করে, যা গুয়ূব তথা অদৃশ্যের পর্দার আড়ালে সুবিন্যস্ত থাকে।
ويطلعه بدر [ما] تمّ عُلاً على شمسه في مَهَبِّ الجُنُوبْ
আর এক পূর্ণচন্দ্র তাকে উঁচুতে তুলে নেয়, যেন দক্ষিণ হাওয়া বয়ে যাওয়ার জায়গায় সে তার সূর্যের মুখোমুখি হতে পারে।
যেহেতু শাহিদ হলো শুহুদ তথা আধ্যাত্মিক দর্শনের সময় নফসের মধ্যে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠা, তাই এটি সাধারণ চোখে দেখার চেয়ে আলাদা ফল দেয়। কারণ, চোখে দেখার আগে সেই জিনিসটি সম্পর্কে কোনো পূর্বজ্ঞান থাকে না; কিন্তু শুহুদ তথা আধ্যাত্মিক দর্শনের আগে মাশহুদ তথা দৃশ্যমান সত্তা সম্পর্কে জানা জরুরি, যাকে ‘আকাইদ’ (বিশ্বাস) বলা হয়।
এই কারণেই আধ্যাত্মিক দর্শনের ক্ষেত্রে তা স্বীকার বা অস্বীকার করার সুযোগ থাকে, কিন্তু চোখে দেখার বেলায় শুধু মেনে নেওয়াই থাকে, সেখানে অস্বীকার করার কিছু থাকে না। একে ‘শাহিদ’ বা সাক্ষী বলা হয় এই কারণে যে, মানুষ যা দেখে তা মূলত তার নিজের বিশ্বাসের সত্যতারই সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং, প্রতিটি মুশাহাদা তথা আধ্যাত্মিক দর্শনই এক ধরনের দেখা, কিন্তু প্রতিটি দেখাই মুশাহাদা নয়; যদিও বেশিরভাগ মানুষ তা জানে না।
তাই কামেল বা পূর্ণাঙ্গ আরিফগণ ছাড়া অন্য কেউ হক তথা পরম সত্যকে সরাসরি চোখে দেখতে পায় না; অথচ প্রত্যেকেই তাঁর শুহুদ লাভ করে; আর সাধারণ চোখে দেখা থেকে কোনো শাহিদ তৈরি হয় না। শাহিদের প্রমাণে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
أَفَمَن كَانَ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِّنْهُ
তারা কি এমন ব্যক্তিদের সমান হতে পারে, যারা কায়েম আছে তাদের রবের পক্ষ হতে প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর এবং যার কাছে তাঁর প্রেরিত একজন সাক্ষী আয়াত শোনায়। সুরা হূদ, আয়াত: ১৭
এই আয়াতের বেশ কয়েকটি গভীর অর্থ রয়েছে, যার প্রতিটিই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এর ফলে বান্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কাশফ তথা আধ্যাত্মিক উন্মোচন লাভ করে, যার মাধ্যমে সে জানতে পারে আল্লাহ তার মাধ্যমে বা তার কাছ থেকে কী চান। আর এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো গোপন খবর দেওয়া এবং কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা জানিয়ে দেওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। এটিই হলো সিদ্দীক (আবু বকর রা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণীর অর্থ: “আমি এমন কোনো জিনিস দেখিনি, যার আগে আল্লাহকে দেখিনি।”
এরপর, সেই বিষয়টির কোনো বাস্তব রূপ প্রকাশ পায় না আল্লাহর কোনো একটি বিশেষ নামের প্রভাব ছাড়া। তখন সেই নামটি বান্দার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ও উপস্থিত হয় এবং বান্দা তার শুহুদ লাভ করে। তারপর সে তার নিজের ভেতর অথবা বাইরের জগতে সেই নামের প্রভাব ও অস্তিত্ব প্রকাশ পেতে দেখে, যা তাকে আগেই ঐশ্বরিক বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। তখন সেই নামটিকে ‘শাহিদ’ বলা হয়, কারণ বান্দা তার জানা সেই প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত বিষয়টির শুহুদ লাভ করেছে।
আর এই মাকাম তথা আধ্যাত্মিক স্তর কেবল কামেল বা পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের জন্যই সম্ভব। তাঁরাই হলেন শুহুদ-এর অধিকারী, যাঁরা খবরের মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান লাভ করার পর প্রতিটি প্রভাবে আল্লাহর শুহুদ লাভ করেন।
আমরা যে বললাম, “এগুলো আল্লাহর উদ্দেশ্য”, এর অর্থ আল্লাহর ওপর কোনো হুকুম চালানো নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিশ্চিত সত্য বিষয়। কারণ, আল্লাহর বাণী থেকে উচ্চারিত প্রতিটি আয়াতই (তা কুরআন হোক, নাজিলকৃত কোনো কিতাব হোক, সহিফা হোক বা কোনো ঐশ্বরিক খবর হোক) সেই শব্দের ভাষা ও ব্যাকরণ অনুযায়ী যতগুলো অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব, তার সবগুলোর জন্যই তা একটি আয়াত বা নিদর্শন। আর যিনি এটি নাজিল করেছেন, সেই শব্দটির সম্ভাব্য সব অর্থই তাঁর উদ্দেশ্যে থাকে। কেননা, যিনি এটি নাজিল করেছেন তিনি এর সব অর্থই জানেন এবং তিনি এটাও জানেন যে, তাঁর বান্দাদের বোঝার ক্ষমতা একেক জনের একেক রকম। আর তিনি তাঁর বাণীর মাধ্যমে বান্দাকে ততটুকুরই দায়িত্ব দেন, যতটুকু তারা বুঝতে পারে।
সুতরাং, যে ব্যক্তি কোনো আয়াত থেকে যে সঠিক অর্থটি বুঝতে পারে, সেই অর্থ লাভকারীর জন্য আয়াতটির সেই অর্থটিই আল্লাহর উদ্দেশ্য। আল্লাহর বাণী ছাড়া অন্য কারও কথার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। কারণ মানুষের কথার শব্দে একাধিক অর্থ প্রকাশের সুযোগ থাকলেও বক্তা হয়তো তা উদ্দেশ্য করেননি; যেহেতু আমরা জানি মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং শব্দের সব অর্থ তার মাথায় নাও থাকতে পারে।
তবে বক্তা যদি সেই ‘আহলুল্লাহ’ (আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা) হন যাঁরা বিশ্বাস করেন যে, “মহাবিশ্বে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রকৃত বক্তা নেই” এবং যাঁরা সরাসরি আল্লাহর বাণী শোনার স্তরে পৌঁছেছেন, তখন তাদের মুখের কথার সব অর্থই আল্লাহর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কারণ মূল বক্তা স্বয়ং আল্লাহ, আর যাঁর মুখ দিয়ে কথাটি বের হচ্ছে তিনি কেবল একজন অনুবাদক বা মাধ্যম মাত্র। যেমন নামাজে বান্দার মুখ দিয়ে বলানো হয়, “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ – আল্লাহ তার প্রশংসা শোনেন যে তাঁর প্রশংসা করে।” এখানে মূল বক্তা আল্লাহ, আর বান্দা কেবল মাধ্যম।
এই কারণেই, যে কোনো মুফাসসির কুরআনের এমন ব্যাখ্যা করেন, যা সেই শব্দের অর্থের আওতাভুক্ত, তাকেই সঠিক মুফাসসির বলা চলে। আর যে ব্যক্তি নিজের মনগড়া মতামত দিয়ে ব্যাখ্যা করবে, সে কুফরি করল; যেমনটি তিরমিজির হাদিসে এসেছে। মনগড়া বা ‘নিজের রায়’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা তখনই বোঝায়, যখন শব্দের এমন কোনো অর্থ করা হয়, যা সেই ভাষার মানুষ জানে না বা সেই অর্থে শব্দটির ব্যবহারই নেই।
এখানে রসুলুল্লাহ (দ.)-এর ‘সে কুফরি করল’ বলার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে; তিনি বলেননি যে, ‘সে ভুল করল’। কারণ কুফর শব্দের অর্থ হলো ‘ঢেকে ফেলা’। আর আহলুল্লাহদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বক্তা দেখেন না, তারা যখন এই ব্যাখ্যাটিকে নিজের মনগড়া মতামতের দিকে সম্পর্কিত করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহর একটি সত্য অর্থকে তাঁর কিছু বান্দার কাছ থেকে আড়াল বা ঢেকে ফেলেন; যদিও অর্থটি নিজের মধ্যে সত্য ছিল, কিন্তু তা মুফাসসিরের নিজস্ব মতের সাথে জুড়ে দেওয়ার কারণে আড়াল হয়ে গেছে। কারণ, সেই ভাষার মানুষেরা সেই শব্দের এমন অর্থ তৈরিতে একমত হয়নি বা রূপক হিসেবেও তা ব্যবহার করেনি। এই শর্তটি থাকা আবশ্যক, আর আল্লাহই হলেন মূল বক্তা এবং তিনিই শব্দ ও অর্থের প্রকৃত মালিক।
আর সঠিক হওয়াটি একটি বাস্তব সত্য যখন তা হক তথা পরম সত্যের সাথে সম্পর্কিত হয়। এই কারণেই রসুল আলাইহিস সালাম বলেছেন, সে কুফরি করল এবং তিনি বলেননি যে, সে ভুল করল। আর আল্লাহ যা চান তা ঢেকে রাখার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে, কিন্তু আল্লাহর দিকে ভুলের সম্পর্ক জুড়ে দেওয়া অসম্ভব। কারণ প্রতিটি জ্ঞাত বিষয়ের ওপর তাঁর জ্ঞান সম্পূর্ণ পরিব্যাপ্ত হওয়ার ফলে তা কোনো ভুল গ্রহণ করে না। সুফিদের নিকট শাহিদ তথা আধ্যাত্মিক সাক্ষ্যের পরিচিতির জন্য এই পরিমাণ আলোচনাই যথেষ্ট। আর আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ দেখান।[2]
দুই মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে শাহিদের একটি পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে একটি সহজ শব্দ, কিন্তু ভেতরে আধ্যাত্মিক সাধনার গভীরতম রহস্য। কুশাইরি ভিত্তি নির্মাণ করেছেন সহজ সংজ্ঞায়, অন্তরে যা প্রবল উপস্থিত, তাই শাহিদ। ইবনে আরাবি সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, সাধারণ দেখা আর শুহুদের পার্থক্য কোথায় এবং কামেল ব্যক্তির শুহুদ কীভাবে প্রতিটি সৃষ্টিতে স্রষ্টাকে দেখার অভিজ্ঞতা দেয়। সবশেষে বলা যায়, শাহিদ সুফি সাধনার সেই বিন্দু যেখানে জ্ঞান, বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা একত্রিত হয়। অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি যত প্রবল হয়, শাহিদ তত গভীর হয়; আর এটাই সুফি সাধনার লক্ষ্য।