সুফি সাধনার পথে শরিয়ত ও হাকিকত দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরিয়ত হলো উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলা, আল্লাহর আদেশ পালন করা। আর হাকিকত হলো রুবুবিয়্যাত প্রত্যক্ষ করা তথা আল্লাহর পরিচালনা ও কর্তৃত্ব সরাসরি অনুভব করা।
এই দুটি একে অপরের শত্রু নয়, বরং দেহ ও রুহের মতো অবিচ্ছেদ্য। যে হাকিকত শরিয়তের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, তা ফলদায়ক নয়; আর যে শরিয়ত হাকিকতের সমর্থন পায় না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম জুনাইদের ভাষায়, যে ব্যক্তি বলে আমলের দায়িত্ব ঝরে পড়ে, তার অবস্থা চোর ও জিনাকারীর চেয়েও নিকৃষ্ট।
বায়েজিদ বোস্তামির সেই ঘটনা— যেখানে তিনি কিবলার দিকে থুথু ফেলা এক ভণ্ড সাধকের কাছ থেকে ফিরে এলেন; এটি দেখায়, শরিয়তের আদব ছাড়া কোনো হাকিকতের দাবিই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ উক্তি— “যে তাসাউফ নিল কিন্তু ফিকহ নিল না, সে যিন্দিক হলো; যে ফিকহ নিল কিন্তু তাসাউফ নিল না, সে ফাসেক হলো”— এই দুটির সমন্বয়ের গুরুত্বই স্পষ্ট করে।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি (রহ.) বলেছেন, শরিয়ত হলো তাঁর ইবাদত করা, আর হাকিকত হলো তাঁকে প্রত্যক্ষ করা। “ইয়্যাকা না’বুদু” শরিয়তের ঘোষণা, আর “ইয়্যাকা নাস্তাঈন” হাকিকতের ঘোষণা। এই দুটি একই আয়াতে মিলিত। তিনি স্পষ্ট করেছেন, শরিয়তও এক দিক থেকে হাকিকত, কারণ তা আল্লাহর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে। আর হাকিকতও এক দিক থেকে শরিয়ত, কারণ মারিফত অর্জনও আদেশেই অপরিহার্য। এই দুই পরিভাষা মূলত একই সত্যের দুই প্রকাশ।
তিনি বলেন, শরিয়ত হলো উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলার নির্দেশ। আর হাকিকত হলো রুবুবিয়্যাত তথা রবের প্রতিপালন ও কর্তৃত্ব প্রত্যক্ষ করা।
যে শরিয়ত হাকিকতের সমর্থন পায় না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আর যে হাকিকত শরিয়তের বাঁধনে আবদ্ধ নয়, তা অর্জিতও নয়, ফলদায়কও নয়।
শরিয়ত এসেছে সৃষ্টিকে দায়িত্বের অধীন করার জন্য। আর হাকিকত হলো আল্লাহর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করা। অর্থাৎ, হাকিকত হলো বান্দা আগে তা প্রত্যক্ষ করবে, তারপর সে বিষয়ে সংবাদ দেবে।[1]
শরিয়ত হলো, তুমি তাঁর ইবাদত করবে; হাকিকত হলো, তুমি তাঁকে প্রত্যক্ষ করবে।
শরিয়ত হলো, তিনি যা আদেশ করেছেন, তা পালন করা; হাকিকত হলো, তিনি যা ফয়সালা করেছেন, যা নির্ধারণ করেছেন, যা গোপন রেখেছেন এবং যা প্রকাশ করেছেন, সবকিছুর মধ্যে তাঁর বিধান প্রত্যক্ষ করা।
আমি উস্তাদ আবু আলী দাক্কাককে বলতে শুনেছি, إِيَّاكَ نَعْبُدُ – “আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি” এটি শরিয়ত রক্ষা করার ঘোষণা। وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ – “আর কেবল আপনার কাছেই সাহায্য চাই” এটি হাকিকত স্বীকার করার ঘোষণা।
জেনে রাখো, শরিয়তও এক দিক থেকে হাকিকত। কারণ শরিয়ত তাঁর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে। আবার হাকিকতও এক দিক থেকে শরিয়ত। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার মারিফতসমূহ অর্জন করাও তাঁর আদেশেই অপরিহার্য হয়েছে।
হৃদয়ে তাওহিদের হাকিকত শরিয়তেরই ফল। আর এই হাকিকত অর্জন ও বাস্তবায়নের নির্দেশও আমাদের দেওয়া হয়েছে। তাই এই দিক থেকে এটিও শরিয়ত।[2]
দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
দাতা গঞ্জে বখশ (রহ.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন তাদের বিরুদ্ধে, যারা হাকিকত পেলে শরিয়ত উঠে যায় বলে দাবি করে। তিনি এটিকে স্পষ্ট কুফর বলেছেন। শরিয়ত ও হাকিকতের সম্পর্ক তিনি দেহ ও রুহের সাথে তুলনা করেছেন। রুহ চলে গেলে দেহ পড়ে যায়, ঠিক তেমনি একটি ছাড়া অন্যটি টিকতে পারে না। তিনি হাকিকতের ইলমকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। জাত, সিফাত ও আফআলের ইলম, এবং শরিয়তের তিন রুকন। কিতাব, সুন্নত ও ইজমা।
তিনি বলেন, মাশায়িখে তরিকতের দুটি পরিভাষা শরিয়ত ও হাকিকত। এর একটি জাহিরি হালকে সহিহ করে, অপরটি বাতেনি হালকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ দুটির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেক মানুষ ভুল করেছে।
একদল আলেমে জাহের আছেন, তাঁরা মনে করেন, এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ মারিফত, খেদমত ও হাকিকতের জন্য শরিয়ত আবশ্যক। প্রত্যেকটি অন্যটির অপরিহার্য সঙ্গী। এদের মধ্যে যেন শরীর ও রুহের সম্পর্ক। একটি অন্যটি ছাড়া চলতে পারে না।
আর একদল বলে, যখন হাকিকতের হাল লাভ হয়, তখন শরিয়ত উঠে যায়। এটি নজিরিয়া, কারামিতা, সুয়াদিয়া ও মুমানিয়ার অবস্থা। তারা শরিয়ত ও হাকিকতকে আলাদা করে ফেলে। তারা মারিফতের দাবি করে, কিন্তু ফরজ আমল আদায় করে না। তাদের কাছে শুধু স্বীকারোক্তির ইঙ্গিতই মুমিন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তাদের বক্তব্য হলো, “যে জিনিসের সঙ্গে জিহ্বা দ্বারা স্বীকার করার কথা, হাকিকত হলো তার অর্থের প্রভাব। যার শরিয়ত প্রয়োজন নেই।”
হজরত আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত সকল আলেম এ কথার হুকুম করেছেন যে, এটি কুফর। সুফি পরিভাষায় মারিফত হলো ইখলাস, নিয়ত ও দৃঢ়তার ব্যাপার।
শরিয়ত তার জন্য এমন একটি দেহের মতো, যার মাধ্যমে বিধান, আওরাদ ও অন্যান্য বিষয় সংরক্ষিত থাকে। শরিয়ত হলো বান্দার কাজের অংশ। আর হাকিকত হলো আল্লাহ তায়ালার হিফাজত ও তাঁর সুরক্ষার অংশ। তাই জানা গেল, হাকিকত ছাড়া শরিয়ত কায়েম থাকতে পারে না। আর শরিয়তের হিফাজত ছাড়া হাকিকতও অর্জিত হতে পারে না।
এর উদাহরণ হলো এমন ব্যক্তি, যে নিজের জোরে দাঁড়িয়ে আছে। যতক্ষণ তার ভেতরে রুহ বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকে। আর যখন তার রুহ তাকে ছেড়ে দেয়, তখন সে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায়। এভাবেই শরিয়ত হাকিকত ছাড়া এবং হাকিকত শরিয়ত ছাড়া টিকে থাকতে পারে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا – যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯।
অতএব যারা আমাদের পথে চেষ্টা করেছে, আমরা নিশ্চয়ই তাদের আমাদের পথ দেখিয়েছি। এখানে শরিয়ত ও রিয়াজতের প্রমাণ হলো তাদের এই হাকিকত। বান্দার হাকিকত হলো আমাদের বিধানগুলোর হিফাজত করা, আর রসুলের হকের হিফাজত করা, যা বান্দার বাহ্যিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আমাদের শরিয়তকে হাকিকতের দ্বারা দৃঢ় করা হয়েছে এবং হাকিকতকে শরিয়তের মাধ্যমে অলংকৃত করা হয়েছে।[3]
হাকিকতের ইলমের রুকনসমূহ:
হাকিকতের ইলম, অর্থাৎ বাতিনকে তিনভাবে ভাগ করা যায়।
১. আল্লাহ তায়ালার জাত, তাঁর ওয়াহদানিয়্যাত তথা একত্ব এবং তিনি যে অসীম, তা প্রত্যক্ষভাবে জানার ইলম।
২. আল্লাহ তায়ালার সিফাত এবং তাঁর আহকাম জানার ইলম।
৩. আল্লাহ তায়ালার আফআল, অর্থাৎ তাকদিরে ইলাহি এবং তার হিকমত জানার ইলম।
ইলমে শরিয়তের রুকনসমূহ:
ইলমে শরিয়ত, অর্থাৎ জাহিরি বিধানেরও তিনটি মূলনীতি রয়েছে।
১. কিতাব, অর্থাৎ কুরআন করিম।
২. রসুলের অনুসরণ, অর্থাৎ সুন্নত।
৩. উম্মতের ইজমা।
দলিল ও প্রমাণ:
আল্লাহ তায়ালার জাত, সিফাত এবং তাঁর আফআল প্রমাণের বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার বাণীই দলিল ও প্রমাণ। তিনি বলেছেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ – জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৯।
তিনি আরও বলেছেন, فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلَاكُمْ – জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহই তোমাদের মাওলা ও কার্যনির্বাহক। সুরা আনফাল, আয়াত: ৪০।
তিনি আরও বলেছেন, أَلَمْ تَرَ إِلَىٰ رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّ – তুমি কি তোমার রবের কুদরতের দিকে তাকাওনি, তিনি কীভাবে ছায়াকে বিস্তৃত করেছেন? সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৫।
তিনি আরও বলেছেন, أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ – তারা কি উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?” সুরা গাশিয়াহ, আয়াত: ১৭।
এ ধরনের অগণিত আয়াত আছে, যেগুলোতে আল্লাহ তায়ালার আফআল তথা কার্যাবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মাধ্যমে তাঁর সিফাতের ইলমি মারিফত অর্জিত হয়।
হুজুর আকরাম ﷺ বলেছেন, مَنْ عَلِمَ أَنَّ اللهَ رَبُّهُ، وَأَنِّي نَبِيُّهُ، حَتَّمَ اللهُ تَعَالَى لِرَحْمَتِهِ، وَذِمَّتِهِ، عَلَى النَّارِ – যে ব্যক্তি জেনে নিল যে, আল্লাহ তার রব এবং আমি তাঁর নবী, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমত ও দায়িত্বের কারণে তার জন্য আগুন হারাম করে দেন।
আল্লাহ তায়ালার জাতের ইলমের শর্তসমূহ:
আল্লাহ তায়ালার জাতের ইলমের শর্ত হলো, প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ও বালেগ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তায়ালা বিদ্যমান, তিনি তাঁর জাতের মধ্যে এক ও অনন্য। তিনি প্রয়োজনমুক্ত। তাঁর কোনো স্থান বা দিক নেই। তাঁর জাতের কোনো সীমা নেই, কোনো পরিমাণ নেই। কোনোকিছুর সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য নেই। তিনি কারও সন্তান নন এবং কেউ তাঁর সন্তান নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টির অন্তরে যে রূপ বা আকৃতি উদয় হয়, তা থেকে পবিত্র। সবকিছুর স্রষ্টা তিনিই। তিনি বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ – কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।
আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ইলমের শর্তসমূহ:
আল্লাহ তায়ালার সিফাতের ইলমের শর্ত হলো, প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ও বালেগ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তায়ালার সব সিফাত তাঁর জাতের সঙ্গেই প্রতিষ্ঠিত। এর অর্থ হলো, নিশ্চিতভাবে তাঁর সিফাত তাঁর জাতের সঙ্গে বিদ্যমান। তাঁর সিফাত তাঁর জাত থেকে পৃথক নয়, আবার সেই সিফাতগুলো তাঁর জাতের সঙ্গেই প্রতিষ্ঠিত, যেমন ইলম, কুদরত, ইরাদা, সমিউন, কালাম, বাক্বা এবং অন্যান্য সিফাত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ – নিশ্চয় তিনি অন্তরসমূহের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। সুরা আনফাল, আয়াত: ৪৩।
وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ – আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” সুরা ইমরান, আয়াত: ২৯।
وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ – তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।
فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ – তিনি যা ইচ্ছা, তাই করেন। সুরা বুরুজ, আয়াত: ১৬।
هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ – তিনিই চিরঞ্জীব। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। সুরা মুমিন, আয়াত: ৬৫।
قَوْلُهُ الْحَقُّ وَلَهُ الْمُلْكُ – তাঁর বাণী সত্য, আর রাজত্ব তাঁরই। সুরা আনআম, আয়াত: ৭৩।
আল্লাহ তায়ালার আফআলের ইলম:
আল্লাহ তায়ালার আফআল সম্পর্কে ইলমের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে যে, প্রত্যেক মুকাল্লাফ ব্যক্তি বিশ্বাস করবে, সব মাখলুক এবং যা কিছু কায়িনাতে আছে, সবই আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তিনিই তার স্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ – আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা করো, তাও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। সুরা সাফফাত, আয়াত: ৯৬।
এ জাহান, তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকা, তার সব গতিবিধি, তার ভেতরে যা কিছু রয়েছে, সবই আল্লাহ তায়ালার তাকদির ও ইরাদার অধীন। সবকিছুর স্রষ্টা ও অস্তিত্বদাতা তিনিই। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ – আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। সুরা যুমার, আয়াত: ৬২।
শরিয়তের বিধানের প্রমাণ:
শরিয়তের বিধান প্রমাণের দলিল হলো, এ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি মুজিজা ও অলৌকিক নিদর্শনের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনেক রসুল প্রেরিত হয়েছেন। আর আমাদের রসুল হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সত্য রসুল। আপনি যে মুজিজা ও গায়বি সংবাদ বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সবই সত্য।
শরিয়তে ইসলামিয়ার পুরো কালাম স্পষ্ট ও সুদৃঢ়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ – এর মধ্যে কিছু আয়াত আছে সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ়। এগুলোই কিতাবের মূল। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭।
আর রসুলুল্লাহ ﷺ-এর রুকন অনুসরণ করাও সুন্নত। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا – রসুল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো। আর যে বিষয় থেকে তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। সুরা হাশর, আয়াত: ৭।
আর তৃতীয় রুকন হলো ইজমায়ে উম্মত। এ বিষয়ে হুজুর আকরাম ﷺ-এর বাণী হলো, لَا تَجْتَمِعُ أُمَّتِي عَلَى الضَّلَالَةِ فَعَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ – আমার উম্মত কখনো গোমরাহির ওপর একত্র হবে না। সুতরাং তোমরা বৃহত্তর জামাতের সঙ্গে থাকো। ইবনে মাজাহ।
এই পদ্ধতিতে হাকিকতের বিধানও প্রমাণিত। এখন যদি সবাই মিলে কোনোকিছুকে কল্যাণকর বলতে চায়, তাহলে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার বিরোধিতা ও অস্বীকারের কোনো অবকাশ নেই।[4]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি গভীরভাবে দেখিয়েছেন, শরিয়ত নিজেই হাকিকতের অংশ, কারণ পুরো শরিয়তই হক। তিনি অপবাদের শাস্তির বিধান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, দুনিয়ার বিচার আর আখিরাতের প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন হতে পারে, তবু দুটোই হকের অংশ। হাকিকত মানে তোমাকে তোমার থেকে সরিয়ে নেওয়া; বোঝা যে আসল কর্মকারী তোমার ভেতরেই আছেন। তিনি সিদ্ধান্তে বলেছেন, শরিয়তের ঝরনাই হাকিকতের ঝরনা; দুটি কখনো বিচ্ছিন্ন নয়।
শরিয়তের পরিচয়:
শরিয়ত হলো কাজের সম্পর্ক নিজের দিকে রেখে উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ মেনে চলা।
إن للشريعة حدًّا ما له عوج عليه أهل مقامات العلى درجوا
শরিয়তের একটি সোজা সীমারেখা আছে, তাতে কোনো বক্রতা নেই; উচ্চ মাকামের অধিকারীরা সেই পথ ধরেই ধাপে ধাপে এগিয়েছেন।
علوا معارج من عقل ومن همم لحضرة دخلوا فيها وما خرجوا
তারা আকল ও উচ্চ হিম্মতের সিঁড়ি বেয়ে এমন এক গন্তব্যে পৌঁছেছেন, যেখানে প্রবেশ করে আর ফিরে আসেননি।
حازوا بأمر عظيم القدر منه وما عليهم في الذي جاؤوا به حرج
তারা মহান মর্যাদার এক আদেশের মাধ্যমে তা লাভ করেছেন; আর তারা যা নিয়ে এসেছেন, তাতে তাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা নেই।
শরিয়ত হলো সেই প্রকাশ্য সুন্নত, যা রসুলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন। আর সুন্নত হলো সেই পথ, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا – আর তারা বৈরাগ্যবাদ উদ্ভাবন করেছিল। সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৭।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, من سن سنة حسنة – যে ব্যক্তি কোনো উত্তম রীতি চালু করে… অর্থাৎ, আমাদের জন্য উত্তম কোনো রীতি চালু করার পথ রাখা হয়েছে। যে ব্যক্তি তা চালু করে এবং যারা সে অনুযায়ী আমল করে, উভয়ের জন্যই সওয়াব নির্ধারিত হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, কোনো বান্দা যদি নিজের বিবেচনায় আল্লাহর ইবাদত করে, অথচ সে বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো শ্রুত দলিল না থাকে, আর সে কোনো ইমামকেও অনুসরণ না করে একা থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে একাই উঠানো হবে। তবে আল্লাহ তাকে কল্যাণের অধিকারী করবেন এবং নেককারদের সঙ্গে যুক্ত করবেন। যেমন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِلَّهِ – নিশ্চয় ইবরাহিম ছিলেন এক উম্মত, আল্লাহর অনুগত। সুরা নাহল, আয়াত: ১২০। এটি ছিল তাঁর প্রতি ওহি আসার আগের অবস্থা।
নবী আলাইহিস সালাম বলেছেন, بعثت لأتمم مكارم الأخلاق – আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য। তাই যে ব্যক্তি মাকারিমুল আখলাক তথা উত্তম চরিত্রের ওপর থাকে, সে আসলে তার রবের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শরিয়তের ওপরই থাকে; যদিও সে নিজে তা জানে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অবস্থাকেই কল্যাণ বলেছেন।
হাকিম ইবন হিজামের হাদিসে এসেছে, তিনি জাহিলি যুগেও ভালো কাজ করতেন; দাসমুক্তি, সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং সম্মানজনক নানা কাজ। তিনি এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, أسلمت على ما أسلفت من خير – তুমি আগের করা কল্যাণের ওপরই ইসলাম গ্রহণ করেছ। অর্থাৎ আল্লাহ সেই কাজগুলোকে কল্যাণ বলেছেন এবং তাকে তার প্রতিদান দিয়েছেন।
সুতরাং যে ব্যক্তি শরিয়তকে এভাবে বোঝে না, সে শরিয়তকে ঠিকভাবে বোঝেনি। মাকারিমুল আখলাক তথা উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাও এভাবেই বুঝতে হবে। এর পরিচয় হলো হীন চরিত্র থেকে মুক্ত থাকা। হীন চরিত্র অবশ্য আপেক্ষিক বিষয়; আর উত্তম চরিত্র সত্তাগত বিষয়।
হীন চরিত্রের কোনো ইলাহি ভিত্তি নেই। তা মূলত নফসের প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। আর উত্তম চরিত্রের ইলাহি ভিত্তি আছে; সেটিই ইলাহি আখলাক। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কোন চরিত্র কোথায় প্রয়োগ করতে হবে। ফলে উত্তম চরিত্রের সঠিক ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে এবং হীন চরিত্রের পোশাক খুলে দেওয়া হয়েছে। এ দৃষ্টিতে জগতে যা কিছু আছে, সবই শরিয়তের পরিসরের ভেতরে।
এরপর জেনে রাখো, শরিয়ত মানুষের প্রয়োজন ও অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এসেছে। আল্লাহ উম্মতের জন্য যে বিধান দিয়েছেন, তা তাদের বোঝার ভাষা ও বাস্তব অবস্থার উপযোগী করেই দিয়েছেন। এর কিছু বিধান এসেছে উম্মতের কোনো প্রশ্ন ছাড়াই। আবার কিছু বিধান এসেছে তাদের প্রশ্নের পর। এ কারণেই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, اتركوني ما تركتكم – আমি যতক্ষণ তোমাদের ছেড়ে রাখি, তোমরাও আমাকে ছেড়ে রাখো। কারণ শরিয়তের অনেক বিধান উম্মতের প্রশ্নের কারণে নাজিল হয়েছে। তারা প্রশ্ন না করলে সে-সব বিধান নাজিল হতো না।
দুনিয়া ও আখিরাতের বিধান নাজিল হওয়া এবং বিধান স্থির হওয়ার কারণগুলো আলেমদের কাছে জানা আছে। যেমন বলা হয়, “বৃষ্টির কারণ হলো বাতাস।” এর অর্থ এই নয় যে, বাতাস নিজে বৃষ্টি সৃষ্টি করেছে; বরং বাতাসের পর বৃষ্টি এসেছে।
শরিয়ত হাকিকতেরই অংশ; বরং শরিয়ত নিজেও হাকিকত। তবে তাকে শরিয়ত বলা হয়। কারণ পুরো শরিয়তই হক। আর যে বিচারক শরিয়ত দিয়ে বিচার করেন, তিনি হকের ভিত্তিতে সওয়াবের অধিকারী। কারণ তিনি সেই বিধানই দেন, যা দিয়ে তাকে বিচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন যার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হলো সে বাস্তবে বাতিলের ওপর থাকুক, আর যার পক্ষে রায় দেওয়া হলো সে বাস্তবে হকের ওপর থাকুক; বিচারকের রায় কি আল্লাহর কাছে বাস্তব অবস্থার মতোই গণ্য হবে? অর্থাৎ বিষয়টি আল্লাহর কাছে যেমন, রায়ের ক্ষেত্রেও কি তেমনই? এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, বিচারক যে রায় দেন, আল্লাহর কাছেও বিষয়টি সেই রায়ের মতোই গণ্য হয়। আর কেউ বলেন, আল্লাহর কাছে বিষয়টি বাস্তবে যেমন, তেমনই থাকে।
এই বিষয়ে গভীরভাবে তাকালে অনেক দলিলের পথ ধরে এগোতে হয়। কারণ আল্লাহ সচ্চরিত্র নারীদের ওপর অপবাদ দেওয়ার শাস্তি নির্ধারণ করেছেন তাদের জন্য, যারা চারজন সাক্ষী আনতে পারে না; যদিও তারা নিজেদের কথায় সত্যবাদী হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَلَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ – তারা কেন তার পক্ষে চারজন সাক্ষী আনল না? সুরা নুর, আয়াত: ১৩।
অতএব বিধানে যেমন স্থির হয়েছে— فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ – যখন তারা সাক্ষী আনেনি, তখন আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যাবাদী। সুরা নুর, আয়াত: ১৩।
এখন প্রশ্ন হলো, “তারাই”—এই ইশারায় কি শুধু ওই বিশেষ ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে, নাকি এ বিষয়ে বিধানের সাধারণ রূপ উদ্দেশ্য? আমরা দেখি, অপবাদদাতা তার অভিযোগে সত্যবাদী ছিল। কিন্তু যেহেতু সে চারজন সাক্ষী আনেনি, তাই সাক্ষীরা যদি একই ঘটনার বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যও দিত, তবু তাদের সাক্ষ্যের কারণে শাস্তি অপবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর কার্যকর হতো এবং তাকে হত্যা করা হতো। অন্যদিকে, সেই মিথ্যা সাক্ষীদের জন্য আখিরাতে পূর্ণ শাস্তি থাকত। দুনিয়ায় তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিধান কার্যকর হয়ে যেত, আর আখিরাতে সেই মিথ্যা সাক্ষী ও মিথ্যা অপবাদদাতা শাস্তির অধিকারী হতো।
তাই দুনিয়ায় হকের বিধান প্রকাশ পায় এই কথায়— শুধু সাক্ষীদের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। এ কারণেই রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّكُمْ تَخْتَصِمُونَ إِلَيَّ وَلَعَلَّ أَحَدَكُمْ يَكُونُ أَلْحَنَ بِحُجَّتِهِ مِنَ الْآخَرِ فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ أَخِيهِ فَلَا يَأْخُذْهُ فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ – আমি তো একজন মানুষ। তোমরা আমার কাছে বিবাদ নিয়ে আসো। হতে পারে, তোমাদের কেউ নিজের যুক্তি অন্যের চেয়ে বেশি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তখন আমি যদি তার ভাইয়ের কোনো অধিকার তার পক্ষে রায় দিয়ে দিই, সে যেন তা গ্রহণ না করে। কারণ আমি তার জন্য আগুনের একটি অংশই কেটে দিচ্ছি।[5]
অর্থাৎ, তিনি তার ভাইয়ের অধিকারকে তার জন্য রায় দিয়ে দিলেন এবং বিধানের দিক থেকে সেটিকে তার অধিকার বানালেন; অথচ আখিরাতে সে এর জন্য শাস্তি পাবে। যেমন কেউ গিবত বা চোগলখোরি করলেও শাস্তি পায়, যদিও গিবত ও চোগলখোরির বিষয়টি বাস্তবে সত্য হয়।
শরিয়ত যখন বৈধ কাজ ও তার ওপর বিধান প্রয়োগের নাম, তখন বান্দা হিসেবে শরিয়ত-নির্ধারিত কাজের সামনে আত্মসমর্পণ করা তার কর্তব্য। কারণ এটাই তার উবুদিয়্যাত তথা বান্দার স্বরূপ। বিধানের সামনে সে নিজ মাথা তুলে দাঁড়াবে না। তার নিজের কোনো গতি নেই; সে শুধু শরিয়তের বিধান অনুযায়ীই চলবে। আর শরিয়তের বিধানও তার ওপর কার্যকর হবে সেই অনুযায়ী, যা শরিয়ত দেখেছে।
এ কারণেই শরিয়তের আনুগত্যকে উবুদিয়্যাত মেনে চলা বলা হয়েছে। কারণ বান্দা চিরকাল বিধানের অধীন। আর কাজের সম্পর্ক তোমার দিকে বলা হয়েছে এ জন্য যে, তুমি যদি মনিবের চাওয়ার কাজ না করো, তবে তোমার পাকড়াও হবে না; পাকড়াও হবে শুধু তখনই, যখন শরিয়ত তোমার ওপর তার দাবি স্থাপন করবে। যার আকল নেই, তার ওপর থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে।
শরিয়তের ইলম সম্পর্কে এতটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।
হাকিকতের পরিচয়:
হাকিকত হলো তোমার ভেতর থেকে তোমাকে সরিয়ে নেওয়া। অথবা বলা যায়, তোমাকে তোমারই থেকে সরিয়ে নেওয়া। আর তোমার যে গুণে তুমি গুণান্বিত, সেটি হলো, আসল কর্মকারী তোমার ভেতরেই আছে, তুমি নও।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا – এমন কোনো প্রাণী নেই, যার কপালের চুল তিনি ধরে রাখেননি। সুরা হুদ, আয়াত: ৫৬।
إن الحقيقة تعطي واحدًا أبدًا والعقل بالفكر ينفي الواحد الأحدا
হাকিকত সবসময় একক সত্তাকেই প্রকাশ করে; আর চিন্তায় ডুবে থাকা আকল সেই এক ও অদ্বিতীয় সত্তাকেই অস্বীকার করে বসে।
فالذات ليس لها ثان فيشفعها والكون يطلب من آثاره العددًا
সেই জাতের দ্বিতীয় কেউ নেই যে তাকে জোড়া বানাবে; আর সৃষ্টিজগৎ তার নিদর্শনের মধ্য থেকেই সংখ্যার দাবি তোলে।
والكل ليس سوى عين محققة لا أهل فيها ولا أبًا ولا ولدًا
সবকিছু আসলে সেই এক প্রতিষ্ঠিত হাকিকতেরই প্রকাশ; সেখানে আলাদা পরিবার নেই, পিতা নেই, সন্তানও নেই।
আল্লাহ তোমাকে এবং আমাদের রুহ দিয়ে সহায়তা করুন। জেনে রাখো, হাকিকত হলো অস্তিত্বের প্রকৃত অবস্থা—তার ভেতরে যে ভিন্নতা, মিল ও পারস্পরিক মুখোমুখি অবস্থান আছে, সবকছিু-সহ। তুমি যদি হাকিকতকে এভাবে না বোঝো, তবে তুমি কিছুই বুঝলে না।
শরিয়ত হলো হাকিকতেরই প্রকাশরূপ। শরিয়ত হক, আর প্রতিটি হকের একটি হাকিকত আছে। তাই আমরা শরিয়তকে তার অস্তিত্বগত প্রকাশের দিক থেকে দেখি, আর তার হাকিকতকে দেখি সেই স্তরে, যেখানে তা মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির স্তরে অবতীর্ণ হয়। বিষয়টির গভীরে তাকালে আমরা তার অন্তরের অবস্থান দেখি। সেটি ভেতরে যেমন, বাহিরেও তেমনই; অন্য কিছু নয়।
তাই যখন পর্দা সরে যায়, তখন আর দর্শকের ওপর বিষয়টি অস্পষ্ট থাকে না। এ কারণেই সাহাবিদের একজন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিলেন, “আমি সত্য মুমিন।”
এ কথায় তিনি ইমানের হাকিকত দাবি করলেন। আর ইমান হলো অন্তরের গুণ। তার স্থান হলো হৃদয়। হৃদয়ের ভেতরে সত্যায়ন থাকলে তার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পায়। যদি সেই সত্যায়নের প্রভাব থাকে, তবে তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পাওয়া অপরিহার্য নয়। যেমন লজ্জাস্থানের অবস্থাও তা-ই। লজ্জাস্থান কোনো কথাকে সত্যও প্রমাণ করতে পারে, মিথ্যাও প্রমাণ করতে পারে। তাই সত্যতা লজ্জাস্থানের দিকেও সম্পর্কিত হয়, অথচ সেটি বাহ্যিক অঙ্গ। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ইমানের হাকিকত কী?”
সে বলল, “আমি যেন আমার রবের আরশকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।”
সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণীকে সত্য প্রমাণ করল, إِنَّ عَرْشَ رَبِّهِ بَرَزَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ – কিয়ামতের দিন তার রবের আরশ প্রকাশিত হবে।
তাই সে ভবিষ্যতের এমন একটি দৃশ্যকে নিজের কল্পনায় প্রত্যক্ষ অবস্থার মতো করে নিল। সে বলল, “আমি যেন তার দিকে তাকিয়ে আছি।” অর্থাৎ আমার কাছে বিষয়টি এমন হয়ে গেছে, যেন আমি তাকে চোখের সামনে দেখছি। যখন সে বিষয়টিকে মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির স্তরে নামিয়ে আনল এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অস্তিত্বের মতো করে দেখল, তখন আমরা বুঝতে পারলাম— হাকিকত সবসময় হককেই দাবি করে; হকের বিপরীত কিছু দাবি করে না।
তাই এমন কোনো হাকিকত নেই, যা শরিয়তের বিরোধী। কারণ শরিয়ত নিজেও হাকিকতের অন্তর্ভুক্ত। হাকিকত, উদাহরণ ও সাদৃশ্য সবই এর মধ্যে আছে। শরিয়ত কখনো কোনো কিছু নাকচ করে, আবার কখনো প্রমাণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ – তাঁর মতো কিছুই নেই। সুরা শুরা, আয়াত: ১১। আবার বলেছেন, وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ – আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুরা, আয়াত: ১১।
এ কথা বলাও হাকিকতের কথাই। তাই শরিয়তই হাকিকত, আর হাকিকতই শরিয়ত। শরিয়ত যদি উলুহিয়্যাত তথা আল্লাহর একত্বের দিকটি দেয়, তবে সে-ই আবার বিভিন্ন সম্পর্কের দিকটিও দেয়। শরিয়ত একত্ব ছাড়া অন্যকিছু প্রমাণ করেনি; তবে সেই একত্ব হলো বহু সম্পর্কের অধিকারী একত্ব, শুধু একক সংখ্যার একত্ব নয়।
কারণ একের একত্ব নিজে নিজেই প্রকাশিত। কিন্তু বহু প্রকাশের মধ্যে একত্ব— এটি এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষ ধরতে পারে না। তাই হাকিকত আসলে সেই বহু প্রকাশের ভেতরে একত্বের হাকিকত; সবাই তা বুঝতে পারে না।
মানুষ যখন দেখল, তারা শরিয়তের ওপর আমল করছে; সাধারণভাবেও, বিশেষভাবেও; আর তারা মনে করল, হাকিকত শুধু কিছু বিশেষ মানুষই জানে, তখন তারা শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যে আলাদা রেখা টেনে দিল। শরিয়তের প্রকাশিত বিধানকে তারা শরিয়ত বলল, আর তার ভেতরের যে অর্থ প্রকাশ পেল, তাকে হাকিকত বলল।
কিন্তু যেহেতু আসল শরিয়তদাতা হক তায়ালাই; আর হককে কখনো জাহের তথা প্রকাশ্য বলা হয়, আবার বাতিন তথা অন্তর্লীনও বলা হয়; তাই এই দুই নামের জন্যও একটি হাকিকত আছে।
হাকিকত হলো, বান্দার গুণের পর্দার আড়াল থেকে হকের গুণ প্রকাশ পাওয়া। যখন দৃষ্টির চোখ থেকে অজ্ঞতার পর্দা সরে যায়, তখন দেখা যায় বান্দার গুণই তাদের মতে হকের গুণ। আর আমাদের মতে, বান্দার গুণ হকের সত্তাগত প্রকাশ নয়; বরং হকের গুণের প্রকাশক্ষেত্র।
সুতরাং জাহেরও হক, বাতিনও হক। বাতিন থেকেই জাহিরের উদ্ভব। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আসলে নফসের চাওয়ার অনুসারী ও অনুগত। নফস হলো বাতিন; আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো জাহের। বিধান জাহিরে প্রকাশ পায়, কিন্তু বাতিনের ওপর তার সরাসরি বিধান নেই।
তাই বাঁকাভাব ও সোজাভাব যার মধ্যে হাঁটার গতি আছে, তার দিকে সম্পর্কিত হয়; যে তাকে হাঁটিয়েছে, তার দিকে নয়। আর সৃষ্টির মধ্যে যিনি চলমান, তিনি আসলে হক। তিনিই বলেছেন, মানুষ সিরাতে মুস্তাকিম তথা সোজা পথে আছে।
সুতরাং বাঁকাও কখনো হাকিকতের দিক থেকে সোজা হতে পারে। যেমন ধনুকের বাঁক তার চাওয়া সোজাভাবেরই অংশ। জগতে যা কিছু আছে, সবই সোজা। কারণ যার কপালের চুল ধরে রাখা হয়েছে, সে-ই তাঁর সঙ্গে চলমান; আর সে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর আছে।
সুতরাং অস্তিত্বে প্রতিটি গতি ও প্রতিটি স্থিরতা ইলাহি। কারণ তা হকের হাত থেকে, হকের মাধ্যমেই প্রকাশিত। আর হক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর আছেন।
রসুলগণ আল্লাহ সম্পর্কে কেবল সেই কথাই বলেন, যা তিনি তাঁদের শিখিয়েছেন। তাঁরা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন। এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো ওজর নেই। কারণ সৃষ্টিকে হক সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া রসুলগণের রহমতেরই অংশ। যখন হক তায়ালা নিজেই তাঁর রসুলের মুখে এ কথা উচ্চারণ করালেন, তখন আমরা বুঝলাম— এটি তাঁরই রহমত, যেহেতু তিনি আমাদের এভাবে পরিচয় করিয়েছেন।
তাই রসুলের বক্তব্যে আমরা যে পরিচয় পেলাম, সেটির প্রতি আমাদের ইমান রাখা জরুরি। কারণ সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا – তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনেই সুসংবাদ রয়েছে। সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪।
এই সুসংবাদ আল্লাহর কালামের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ – আল্লাহর বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই। সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪।
হাকিকতের আরেক দিক হলো হকই অস্তিত্বের আসল সত্তা; আর যাকে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত বলা হয়, তা আসলে গুণধারী সত্তাগুলোর গুণ হিসেবে প্রকাশিত। তারপর তিনি জানিয়েছেন, বান্দার গুণ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আসল সত্তার দিক থেকেও তিনিই সেগুলোর প্রকৃত সত্তা।
তাই বলা হয়, “আমি তার শ্রবণ হয়ে যাই।” অর্থাৎ শ্রবণকে সেই অস্তিত্বশীল শ্রোতার দিকে সম্পর্কিত করা হলো এবং তার সঙ্গে যুক্ত করা হলো। অথচ অস্তিত্বে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তাই তিনিই শ্রোতা, তিনিই শ্রবণ।
এভাবেই অন্য সব শক্তি ও উপলব্ধির ব্যাপারেও কথা বলা যায়। সেগুলো তাঁরই প্রকৃত সত্তা ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং শরিয়তের ঝরনাই হাকিকতের ঝরনা। তাই ভালোভাবে বুঝে নাও। আল্লাহই সত্য বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।
আবদুল কাদির ঈসা (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
আবদুল কাদির ঈসা (রহ.) জিবরাইলের হাদিস অনুসরণ করে দ্বীনকে তিন রুকনে ভাগ করেছেন। ইসলাম (শরিয়ত), ইমান (আকিদা) ও ইহসান (হাকিকত)। নামাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বাহ্যিক নড়াচড়া দেহ আর খুশু রুহ। তিনি ইমাম মালিক ও আহমদ যাররুকের উক্তি উদ্ধৃত করে স্পষ্ট করেছেন, ফিকহ ছাড়া তাসাউফ যিন্দিকি, আর তাসাউফ ছাড়া ফিকহ ফাসেকি। শরিয়ত ভিত্তি, তরিকত মাধ্যম, হাকিকত ফল।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জিবরাইলে দিনকে তিনটি রুকনে ভাগ করার কথা এসেছে। রসুল ﷺ উমর (রা.)-কে বলেছিলেন, فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ – তিনি জিবরিল। তিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন, তোমাদেরকে তোমাদের দিন শিক্ষা দিতে।[6]
১. ইসলামের রুকন: এটি হলো আমলি দিক। এর অন্তর্ভুক্ত হলো ইবাদত, লেনদেন, ইবাদতসংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেহের বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। আলেমগণ একে শরিয়ত নামে অভিহিত করেছেন। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে সম্মানিত ফকিহগণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২. ইমানের রুকন: এটি হলো অন্তরের আকিদাগত দিক। এর অন্তর্ভুক্ত হলো আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রসুলদের প্রতি, আখিরাত দিবসের প্রতি এবং কাজা ও কদরের প্রতি ইমান। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে তাওহিদের আলেমগণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. ইহসানের রুকন: এটি হলো অন্তরের রুহানি দিক। এর অর্থ হলো তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এমনভাবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি তো তোমাকে দেখছেন। এ থেকে স্বাদ, অন্তর্গত অনুভূতি, ইমানি মাকামসমূহ, মাকামের স্তরবিন্যাস এবং হিম্মতের জ্ঞানসমূহ জন্ম নেয়। আলেমগণ একে হাকিকত নামে অভিহিত করেছেন। আর এ বিষয়ের অধ্যয়ন বিশেষভাবে সুফি-সাধকদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্ট করার জন্য নামাজকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়।
মানুষের নামাজের বাহ্যিক নড়াচড়া, প্রকাশ্য আমল, রুকন ও শর্তসমূহ রক্ষা করা, এবং নামাজ সম্পর্কে ফকিহগণ যে-সব বিধান আলোচনা করেছেন, এসবই শরিয়তের দিককে প্রকাশ করে। আর এটিই নামাজের দেহ। অন্যদিকে নামাজের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার সামনে অন্তরের উপস্থিতি হাকিকতের দিককে প্রকাশ করে। আর এটিই নামাজের রুহ।
তাই নামাজের বাহ্যিক আমলগুলো তার দেহ, আর খুশু তথা বিনয় ও একাগ্রতা তার রুহ। রুহহীন দেহেরই বা কী মূল্য? যেমন রুহের জন্য দেহ প্রয়োজন, যাতে সে প্রকাশ পায় ও টিকে থাকে, তেমনি দেহেরও প্রয়োজন এমন এক রুহ, যার মাধ্যমে সে সত্যিকার অর্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ – তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো। সুরা বাকারা, আয়াত: ১১০।
তাই বলা হয়নি, “তোমরা নামাজ সৃষ্টি করো।” কারণ নামাজ কায়েম হয় দেহ ও রুহ, উভয়ের সমন্বয়ে। এ আলোচনা থেকে শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যকার গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন রুহ ও দেহ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। পূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার মধ্যে শরিয়ত ও হাকিকত একত্র হয়। মানুষের প্রতি সুফিদের দিকনির্দেশনাও মূলত এই সমন্বয়ের দিকেই। আর এ কারণেই রসুল ﷺ এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিদের আদর্শ অনুসরণ করা অপরিহার্য।
এই উচ্চ মাকাম ও পূর্ণ ইমান অর্জনের জন্য তরিকতের সুলুক তথা আধ্যাত্মিক পথচলা অপরিহার্য। তরিকত হলো নফসের সঙ্গে মুজাহাদা তথা আত্মসংগ্রাম, তার অপূর্ণ গুণগুলোকে পূর্ণ গুণাবলির দিকে উন্নীত করা এবং মুরশিদদের সাহচর্যে পূর্ণতার মাকামসমূহে ক্রমে অগ্রসর হওয়া। তাই তরিকতই সেই সেতু, যা মানুষকে শরিয়ত থেকে হাকিকতের দিকে পৌঁছে দেয়।
সাইয়িদ (রহ.) তাঁর ‘তা‘রিফাত’ গ্রন্থে তরিকতের সংজ্ঞায় বলেছেন—
الطريقة هي السيرة المختصة بالسالكين إلى الله تعالى، من قطع المنازل والترقي في المقامات
তরিকত হলো আল্লাহ তায়ালার পথে চলা সালিকদের জন্য নির্দিষ্ট পথ, অর্থাৎ মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করা এবং মাকামসমূহে ক্রমে উন্নীত হওয়া।[7]
সুতরাং শরিয়ত হলো ভিত্তি, তরিকত হলো মাধ্যম, আর হাকিকত হলো ফল।
এই তিনটি বিষয় পরস্পর পরিপূর্ণ, সুসংগত ও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যে ব্যক্তি প্রথমটি আঁকড়ে ধরে, সে দ্বিতীয়টির পথে চলে; এরপর তৃতীয়টিতে পৌঁছে যায়। এগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, কোনো পরস্পরবিরুদ্ধতা নেই। এ কারণেই সুফিগণ তাঁদের প্রসিদ্ধ নীতিমালায় বলেন, كل حقيقة خالفت الشريعة فهي زندقة – যে হাকিকত শরিয়তের বিরোধী হয়, তা যিন্দিকা তথা ধর্মচ্যুতি।
হাকিকত আবার শরিয়তের বিরোধী হবে কীভাবে? অথচ হাকিকত তো শরিয়ত বাস্তবায়নের ফল হিসেবেই জন্ম নেয়। সুফিদের ইমাম আহমদ যাররুক (রহ.) বলেন—
لا تصوف إلا بفقه، إذ لا تعرف أحكام الله الظاهرة إلا منه. ولا فقه إلا بتصوف، إذ لا عمل إلا بصدق وتوجه لله تعالى. ولا هما إلا بإيمان، إذ لا يصح واحد منهما دونه. فلزم الجميع لتلازمها في الحكم، كتلازم الأجسام للأرواح، ولا وجود لها إلا فيها، كما لا حياة لها إلا بها، فافهم
ফিকহ ছাড়া তাসাউফ হয় না; কারণ আল্লাহর প্রকাশ্য বিধান ফিকহ ছাড়া জানা যায় না। আবার তাসাউফ ছাড়া ফিকহও পূর্ণ হয় না; কারণ সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহ তায়ালার দিকে অভিমুখী হওয়া ছাড়া কোনো আমল প্রকৃত আমল হয় না। আর ইমান ছাড়া তাসাউফ ও ফিকহ কোনোটিই হয় না; কারণ ইমান ছাড়া এ দুটির কোনো একটিও শুদ্ধ হয় না। তাই সবগুলোই আবশ্যক। কেননা বিধানের দিক থেকে এগুলো পরস্পর অবিচ্ছেদ্য; যেমন দেহ ও রুহ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। দেহের অস্তিত্ব রুহের সঙ্গে যুক্ত, আর দেহের জীবনও রুহের মাধ্যমেই। অতএব বুঝে নাও।[8]
ইমাম মালিক রহ. বলেন—
من تصوف ولم يتفقه فقد تزندق، ومن تفقه ولم يتصوف فقد تفسق، ومن جمع بينهما فقد تحقق
যে ব্যক্তি তাসাউফ গ্রহণ করল, কিন্তু ফিকহ অর্জন করল না, সে যিন্দিক হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি ফিকহ অর্জন করল, কিন্তু তাসাউফ গ্রহণ করল না, সে ফাসেক হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি দুটিকে একত্র করল, সে হাকিকতে পৌঁছে গেল।[9]
প্রথম ব্যক্তি যিন্দিক হয়েছে, কারণ সে শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু হাকিকতের দিকে তাকিয়েছে। ফলে সে জবর তথা বাধ্যতাবাদের কথা বলেছে এবং দাবি করেছে, মানুষের কোনো কাজেই তার নিজের কোনো ইখতিয়ার নেই। সে যেন ওই কবির কথার বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—
ألقاه في اليم مكتوفاً وقال له إياك إياك أن تبتل بالماء
সে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সমুদ্রে ফেলে দিল, তারপর বলল, সাবধান, সাবধান, পানিতে যেন ভিজে না যাও।
এভাবে সে শরিয়তের বিধান ও তার ওপর আমল করাকে অকার্যকর করে দিল; শরিয়তের হিকমত এবং তার প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেও বাতিল করে দিল।
আর দ্বিতীয় ব্যক্তি ফাসেক হয়েছে, কারণ তার অন্তরে তাকওয়ার নুর প্রবেশ করেনি, ইখলাসের রহস্য জাগ্রত হয়নি, মুরাকাবা তথা অন্তরের পাহারার উপদেশদাতা চেতনা এবং মুহাসাবা তথা আত্মপর্যালোচনার পদ্ধতি তার ভেতরে জায়গা করে নেয়নি। এগুলো থাকলে সে গুনাহ থেকে আড়ালে থাকতে পারত এবং সুন্নতের আদবসমূহ আঁকড়ে ধরতে পারত।
আর তৃতীয় ব্যক্তি হাকিকতে পৌঁছেছে, কারণ সে দিনের সব রুকন একত্র করেছে, ইমান, ইসলাম ও ইহসান। এগুলোই জিবরিল (আ.)-এর হাদিসে একত্রে এসেছে।
যেমন বাহ্যিক আলেমগণ শরিয়তের সীমারেখা সংরক্ষণ করেছেন, তেমনি তাসাউফের আলেমগণ তার আদব ও রুহ সংরক্ষণ করেছেন। বাহ্যিক আলেমদের জন্য যেমন দলিল নির্ণয়, সীমারেখা ও শাখাগত বিধান বের করা, এবং যে বিষয়ে সরাসরি নস আসেনি, সেখানে বিশ্লেষণ, তাহরিম ও তাহরিম নয় এমন বিধান নির্ধারণের জন্য ইজতিহাদ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; তেমনি আরিফগণের জন্যও মুরিদদের তরবিয়ত এবং সালিকদের আত্মশুদ্ধির জন্য আদব ও পদ্ধতি উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে।
নিশ্চয় সালফে সালেহিন এবং সত্যনিষ্ঠ সুফিগণ প্রকৃত উবুদিয়্যাত তথা আল্লাহর দাসত্ব এবং সহিহ ইসলামের বাস্তবতা অর্জন করেছিলেন। কারণ তাঁরা শরিয়ত, তরিকত ও হাকিকতকে একত্র করেছিলেন। ফলে তাঁরা আলোকিত, হাকিকতপ্রাপ্ত মানুষ ছিলেন, যারা মানুষকে সরল পথে পরিচালিত করতেন।
কারণ যে দ্বিনের হাকিকত থেকে তার মূল শিকড় শুকিয়ে যায়, তার ডালপালা শুকিয়ে যায় এবং তার ফল নষ্ট হয়ে যায়।[10]
হাকিকত ও শরিয়তের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্পর্কে সতর্কীকরণ:
কিছু মানুষ মিথ্যা ও নিফাকের আশ্রয় নিয়ে তাসাউফের দাবি করেছে। তারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে বলেছে, “দিনের আসল উদ্দেশ্য হলো শুধু হাকিকত।” এরপর তারা শরিয়তের বিধান অকার্যকর করেছে, নিজেদের ওপর থেকে শরিয়তের দায়িত্ব ফেলে দিয়েছে, হারাম কাজকে বৈধ করে নিয়েছে এবং বলেছে, “মূল বিষয় তো অন্তরের সংশোধন।” তারা আরও বলে, “আমরা বাতিনের মানুষ, আর এরা জাহিরের মানুষ।”
এরা পথভ্রষ্ট ও যিন্দিক। এদের নিয়ে হাসাহাসি করা যায়। এদের কাজকর্ম ও অবস্থা সত্যনিষ্ঠ, মুখলিস সুফি সাধকদের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
সুফি ইমামগণ তাঁদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, তাঁদের সঙ্গ থেকে বারণ করেছেন এবং তাঁদের গোপন ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি প্রকাশ করে দিয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে বললেন, “চলো, আমরা ওই ব্যক্তির কাছে যাই, যে নিজের ব্যাপারে বেলায়তের খ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছে।”
লোকটি জুহদের জন্য বিখ্যাত ছিল। আমরা তার কাছে গেলাম। যখন সে ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে ঢুকল, তখন সে কিবলার দিকে থুথু ফেলল। বায়েজিদ সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলেন। তাকে সালামও দিলেন না। তিনি বললেন, “এই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদবসমূহের একটি আদবের ব্যাপারেও আমানতদার নয়। তাহলে যে দাবি সে করছে, তাতে কীভাবে তাকে আমানতদার মনে করা যায়?”
তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা যদি এমন কোনো ব্যক্তিকে দেখো, যাকে কারামত দেওয়া হয়েছে, এমনকি সে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তবু তার দ্বারা ধোঁকায় পড়ো না; যতক্ষণ না দেখো, আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে, শরিয়তের সীমারেখা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এবং শরিয়তের আদব পালনের ক্ষেত্রে সে কেমন।”[11]
আর শায়খ আহমদ যাররুক (রহ.) তাঁর কাওয়াইদে বলেছেন, “যে শায়খ সুন্নতের আলোকে প্রকাশিত নয়, তার অনুসারীদের জন্য তার অবস্থা যাচাই করা সম্ভব নয়। যদিও সে নিজের ভেতরে সত্য হতে পারে এবং তার হাতে হাজার হাজার কারামত প্রকাশ পায়।[12]
সাহল ইবনু আবদুল্লাহ তুস্তারি (রহ.) বলেছেন, “তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গ থেকে সতর্ক থাকো। গাফেল স্বেচ্ছাচারী শাসক, তোষামোদকারী কারি এবং মূর্খ সুফি।”[13]
সাইয়িদ আহমদ রিফায়ি (রহ.) বলেছেন, “তোমরা সে কথা বলো না, যা কিছু সুফিরা বলে থাকে যে, আমরা বাতিনের মানুষ, আর তারা জাহিরের মানুষ। এই দিন এমন এক সমন্বিত দিন, যার বাতিন জাহিরের মূল, আর জাহের তার বাতিনের পাত্র। জাহের না থাকলে বাতিন থাকত না। আর বাতিন না থাকলে জাহেরও থাকত না এবং সহিহ হতো না। দেহ ছাড়া অন্তর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বরং দেহ না থাকলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। আর অন্তর হলো দেহের নুর। এই জ্ঞান, যাকে তাদের কেউ কেউ বাতিনের জ্ঞান বলে, মূলত অন্তরের সংশোধন। প্রথম কাজ হলো রুকনসমূহ পালন করা এবং অন্তর দিয়ে সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করা। যদি তোমার অন্তর বিশুদ্ধ হয়, নিয়ত ও অন্তরের পবিত্রতা সুন্দর হয়, অথচ তুমি চুরি করো, জেনা করো, সুদ খাও, মদ পান করো, মিথ্যা বলো, অহংকার করো এবং অসংলগ্ন কথা বলো, তাহলে তোমার নিয়ত ও অন্তরের পবিত্রতা দিয়ে কী লাভ? আর যদি তুমি আল্লাহর ইবাদত করো, নিজের ভ্রান্ত ধারণা অনুযায়ী সংযম অবলম্বন করো, নীরব থাকো, সদকা দাও, বিনয়ী হও; কিন্তু তোমার অন্তরের ভেতর থাকে অহংকার, রিয়া তথা লোকদেখানো মনোভাব ও ফাসাদ, তাহলে তোমার আমলেরই বা কী লাভ?”[14]
শায়খ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) সেই ব্যক্তির ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন, যে মনে করে সালিক কোনো অবস্থায় পৌঁছে গেলে তার ওপর থেকে শরিয়তের দায়িত্বসমূহ উঠে যায়। যেমন তিনি তাঁর মুরিদের প্রতি অসিয়ত করে বলেছেন, “ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়া যিন্দিকি, আর নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া গুনাহ। কোনো অবস্থাতেই কারও ওপর থেকে ফরজ দায়িত্ব ঝরে পড়ে না।”[15]
সুফিদের শায়খ ইমাম জুনাইদ (রহ.) বলেছেন, “আমাদের এই মাজহাব কিতাব ও সুন্নতের মূলনীতির সঙ্গে বাঁধা।”[16]
তিনি আরও বলেছেন, “সব পথ মানুষের জন্য বন্ধ। কেবল তার পথ খোলা, যে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁর সুন্নত মেনে চলে এবং তাঁর পথ আঁকড়ে ধরে। কারণ সব কল্যাণের পথ তার জন্যই উন্মুক্ত।”[17]
তাঁর সামনে এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করা হলো। লোকটি মারিফত বিষয়ে পরিচিত ছিল। বলা হলো, “আল্লাহর মারিফতপ্রাপ্ত লোকেরা নেক কাজের নড়াচড়া ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের দরজায় পৌঁছে যায়।” তখন জুনাইদ (রহ.) বললেন, “এ কথা এমন এক সম্প্রদায়ের কথা, যারা নেক আমলের দায়িত্ব ঝরিয়ে দেওয়ার কথা বলে। আর আমার কাছে এটি গুরুতর বিষয়। যে ব্যক্তি চুরি করে, জিনা করে, তার অবস্থাও ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যে এমন কথা বলে। কারণ আল্লাহর আরিফগণ আমলগুলো আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকেই গ্রহণ করেছেন এবং সেগুলোতেই তাঁর দিকে ফিরে গেছেন। আমি যদি হাজার বছর বেঁচে থাকি, তবু আমার সাধ্য অনুযায়ী নেক আমলের একটি কণাও কমাব না।”
তিনি আরও বলেছেন, “আমরা তাসাউফ কথার ফুলঝুরি ও তর্ক-বিতর্ক থেকে গ্রহণ করিনি; বরং ক্ষুধা, দুনিয়া ত্যাগ, পরিচিত ও প্রিয় জিনিসগুলো থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে গ্রহণ করেছি।”
ইবরাহিম ইবনু মুহাম্মদ নসর আবাজি (রহ.) বলেছেন, “তাসাউফের মূল হলো কিতাব ও সুন্নত আঁকড়ে থাকা, প্রবৃত্তি ও বিদআত ত্যাগ করা, এবং মাশায়িখদের মর্যাদা রক্ষা করা, সৃষ্টির ওজরগুলো বিবেচনায় রাখা, সঙ্গীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা, তাদের খেদমত করা, সুন্দর আখলাক অবলম্বন করা, আওরাদ নিয়মিত আদায় করা, রুখসত ও দূরবর্তী ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে ছাড় নেওয়া থেকে বিরত থাকা। এ পথে কেউ শুরুতেই দুর্নীতিগ্রস্ত না হলে পথভ্রষ্ট হয় না; কারণ শুরুটা নষ্ট হলে শেষের ফলেও তার প্রভাব পড়ে।”[18]
চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শরিয়ত ও হাকিকত কখনো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অপরটির অস্তিত্বের শর্ত। যে হাকিকত শরিয়তের বিরোধী, তা যিন্দিকি; আর যে শরিয়তে হাকিকতের ছোঁয়া নেই, তা প্রাণহীন।
কুশাইরি দেখিয়েছেন এই দুই পরিভাষার ভাষাগত ও মূলগত একতা। দাতা গঞ্জে বখশ কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে যারা হাকিকতের নামে শরিয়ত পরিত্যাগ করে। ইবনে আরাবি সবচেয়ে গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন, শরিয়ত নিজেই হাকিকতের প্রকাশ। আর আবদুল কাদির ঈসা ব্যবহারিক উদাহরণ দিয়ে এই সম্পর্ককে দেহ ও রুহের মতো অবিচ্ছেদ্য বলে প্রমাণ করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, শরিয়ত ও হাকিকত সুফি সাধনার সেই দুই স্তম্ভ, যাদের একত্রিত হওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। বায়েজিদ বোস্তামি যেমন বলেছেন, যে শরিয়তের আদবে অমনোযোগী, তার হাকিকতের দাবিও অবিশ্বাসযোগ্য। শরিয়ত ছাড়া হাকিকত পথহারা, আর হাকিকত ছাড়া শরিয়ত প্রাণহীন।