সুফি সাধনার পথে নফস সম্ভবত সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। কেউ বলেন নফস মানে রুহ, কেউ বলেন মন্দের সমষ্টি, কেউ বলেন দেহ ও রুহের মাঝামাঝি এক বরজখি সত্তা। এই বহু অর্থের কারণেই নফস নিয়ে সুফি চিন্তায় এত বিস্তৃত আলোচনা।

তবে সব দৃষ্টিভঙ্গির একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু আছে। নফস আল্লাহর পথে প্রধান অন্তরায়। ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বীকারোক্তি “নফস মন্দের দিকেই আদেশ দেয়”, হাদিসে “সবচেয়ে বড় জিহাদ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ” বলা একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

কিন্তু নফসকে শুধু শত্রু হিসেবে দেখলেই হয় না। যে নিজের নফসকে চিনল, সে রবকে চিনল— এই গভীর সত্যও সামনে থাকে। আর ইনসানে কামেল তো দেহ, রুহ ও নফসের সমন্বিত পরিপূর্ণ মানুষ। ইমাম কুশাইরি, ইমাম সোহরাওয়ার্দি, ইবনে আরাবি, দাতা গঞ্জে বখশ এবং আবু তালেব মক্কি (রহ.) নফসের এই জটিল বাস্তবতা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উন্মোচন করেছেন।

ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইমাম কুশাইরি নফসকে গায়েবের সূক্ষ্ম অনুগ্রহে অন্তরকে সজীব করার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তিনি আধ্যাত্মিক উন্নতির তিনটি স্তর নির্ধারণ করেছেন। ওয়াক্ত পথের শুরুতে, আহওয়াল মাঝামাঝিতে, আর আনফাস পূর্ণতায়। মারিফত ও তাওহিদের ইশারা ছাড়া যে নফস শুধু অসহায়ত্বের বিছানায় আসে, তাকে তিনি মৃত বলেছেন। প্রেমিকের নফস থাকা আবশ্যক; না থাকলে সে বিলীন হয়ে যেত।

তিনি বলেন, নফস হলো গায়েবের সূক্ষ্ম অনুগ্রহে অন্তরকে সজীব ও প্রশান্ত করে তোলা।

আনফাস তথা শ্বাসসমূহের অধিকারী ব্যক্তি আধ্যাত্মিক হালের অধিকারী ব্যক্তির চেয়ে আরও সূক্ষ্ম ও নির্মল।

তাই ওয়াক্তের অধিকারী হলো পথের শুরুর মানুষ। আনফাসের অধিকারী হলো পূর্ণতায় পৌঁছা মানুষ। আর আহওয়ালের অধিকারী এ দুই স্তরের মাঝামাঝি।

সুতরাং আহওয়াল হলো মাঝের স্তর, আর আনফাস হলো আধ্যাত্মিক উন্নতির শেষ সীমা।

আওকাত তথা আধ্যাত্মিক সময় হলো অন্তরওয়ালাদের জন্য। আহওয়াল হলো রুহের সাধকদের জন্য। আর আনফাস হলো গভীর গোপন রহস্যের অধিকারীদের জন্য।

তাঁরা বলেছেন, ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিজের প্রতিটি শ্বাসের হিসাব রাখা।

তাঁরা আরও বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা অন্তর সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মারিফতের খনি বানিয়েছেন। তিনি আসরার তথা অন্তরের গোপন রহস্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে লালন করেছেন এবং তাওহিদের আসন বানিয়েছেন।

তাই যে নফস মারিফতের দিশা ও তাওহিদের ইশারা ছাড়া, শুধু অসহায় নিরুপায় অবস্থার বিছানায় আসে, সে নফস মৃত। আর তার অধিকারীকে সে নফস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

আমি উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আরিফের জন্য কোনো শ্বাস অবহেলায় ছেড়ে দেওয়া হয় না; কারণ তার সঙ্গে কোনো ছাড় চলে না। আর মুহিব তথা প্রেমিকের জন্য নফস থাকা আবশ্যক; কারণ তার যদি শ্বাস না থাকত, তাহলে তা ছেড়ে দেওয়ার শক্তি না থাকায় সে বিলীন হয়ে যেত।”[1]

শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইমাম সোহরাওয়ার্দি নফস, ওয়াক্ত ও হালের মাঝে সুস্পষ্ট স্তরবিন্যাস করেছেন। শুরুর সাধকের কাছে ওয়াক্ত আসে কিন্তু টেকে না, মাঝামাঝি সাধকের হাল তার ওপর প্রবল থাকে, আর পূর্ণতাপ্রাপ্ত সাধকের আধ্যাত্মিক অনুভব তার শ্বাসের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এই স্থায়িত্বই নফস; যেখানে হাল পালাক্রমে আসে-যায় না, বরং অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করে।

তিনি বলেন, নফস হলো পথের শেষ স্তরে পৌঁছে যাওয়া মানুষের জন্য; ওয়াক্ত হলো পথের শুরুর মানুষের জন্য; আর হাল হলো মাঝামাঝি স্তরের মানুষের জন্য।

এর মাধ্যমে যেন তাঁরা ইশারা করেছেন— শুরুর স্তরের মানুষের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো একটি আধ্যাত্মিক আগমন আসে, কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। মাঝামাঝি স্তরের মানুষ হলো হালের অধিকারী; তার হালই সাধারণত তার ওপর প্রবল থাকে। আর শেষ স্তরে পৌঁছে যাওয়া মানুষ হলো নফসের অধিকারী; সে হালের ভেতর স্থিরতা লাভ করেছে।

তাই তার ওপর হাল কখনো গায়েব, কখনো হুজুর; এভাবে পালাবদল করে আসে না। বরং তার অন্তরের আধ্যাত্মিক অনুভবগুলো তার শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সেগুলো স্থায়ীভাবে তার মধ্যে অবস্থান করে; পালাক্রমে আসে-যায় না।

এসবই তাদের নিজ নিজ অধিকারীদের আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা। এসব অবস্থা থেকে তাদের জন্য রয়েছে জওক তথা স্বাদগ্রহণ এবং শরব তথা গভীর পান। আল্লাহ তাদের বরকতে আমাদের উপকৃত করুন। আমিন।[2]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইবনে আরাবি নফসকে বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। ইলাহি রুহের ফুঁক ও সুগঠিত দেহের মাঝামাঝি এক সত্তা। সুফি পরিভাষায় নফস সাধারণত বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণের নাম। কিন্তু সেই গুণকেও যদি আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা যায়, তবে তা নিন্দনীয় থাকে না। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো কাজ যখন শুধু জাগতিক কারণে হয়, হকের দিকটি মনে না এসে, তখনই তা ত্রুটিপূর্ণ। গাফেল ও অজ্ঞের পার্থক্যও তিনি স্পষ্ট করেছেন। গাফেলকে স্মরণ করালে সে মনে করে, জাহেলকে করালেও নয়।

তিনি বলেন, নফস শব্দে ফা অক্ষরে সুকুন। সুফিদের পরিভাষায় এটি সাধারণত বান্দার এমন গুণকে বোঝায়, যা কোনো কারণ দ্বারা প্রভাবিত ও ত্রুটিযুক্ত। প্রচলিত অর্থে নফস বলতে এটিই বেশি বোঝানো হয়।

النفس من عالم البرازخ فكل سر منها يبين
নফস বরজখ তথা দুই জগতের মাঝামাঝি স্তরের অন্তর্ভুক্ত; তাই তার ভেতর থেকে প্রতিটি রহস্য প্রকাশ পায়।

مقامها في العلوم شامخ وكل صعب بها يهون
জ্ঞানজগতে তার অবস্থান অনেক উঁচু; তার মাধ্যমে কঠিন বিষয়ও সহজ হয়ে যায়।

وروحها في العماء راسخ يمده روحه الأمين
তার রুহ অদৃশ্য গভীরতার জগতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত; আর রুহুল আমিন তাকে শক্তি জোগায়।

منفوخها بالنكاح ناسخ سره في الورى دفين
তার মধ্যে যে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে, তা নিকাহের ধারায় প্রজন্মে প্রজন্মে চলে আসে; তার রহস্য সৃষ্টিজগতের ভেতর লুকানো।

سامي العلى مجدها وباذخ سبحاته ما بها يكون
তার মর্যাদা উচ্চ, তার গৌরব মহিমান্বিত; তার ভেতর যা ঘটে, তা তার তাজাল্লির দীপ্তির অধীন।

জেনে রাখুন, সুফিদের ভাষায় নফস বলতে সাধারণত বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণ বোঝানো হয়। তাই এই অধ্যায়ে আমরা নফস নিয়ে মূলত এই অর্থেই কথা বলব।

তবে সুফিরা কখনো কখনো নফস বলতে মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম সত্তাকেও বোঝান। ইন-শা-আল্লাহ, এই অধ্যায়ে সে অর্থের দিকেও ইঙ্গিত আসবে। তবে এখানে সেটিকে এমন দিক থেকে আলোচনা করা হবে, যেখানে এই সূক্ষ্ম সত্তাই ত্রুটিপূর্ণ গুণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জেনে রাখুন, সুফিদের পরিভাষায় নফস এই দুই অর্থেই বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি নফসে কুল্লিয়া তথা সামগ্রিক নফসও বরজখের অন্তর্ভুক্ত।

কারণ বরজখ বলতে এমন কিছুকে বোঝায়, যার দুইটি দিক থাকে। সে দুই বিষয়ের মাঝখানে অবস্থান করে। আর প্রকৃত অস্তিত্ব তো একমাত্র আল্লাহরই। আল্লাহ ছাড়া নিজে নিজে অস্তিত্বশীল আর কেউ নেই।

আল্লাহ জিনিসগুলোকে কারণের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। কোনো ফল তার কারণ ছাড়া প্রকাশ পায় না। তাই প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসের দুইটি দিক থাকে। এক দিক তার কারণের দিকে, আরেক দিক আল্লাহর দিকে। এই হিসেবে প্রত্যেক সৃষ্ট জিনিসই তার কারণ ও আল্লাহর মাঝখানে এক ধরনের বরজখ।

সৃষ্ট সত্তাগুলোর মধ্যে প্রথম বরজখ হলো নফসে কুল্লিয়া। কারণ তা আকল তথা প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা থেকে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রকাশকারী ও অস্তিত্বদাতা হলেন আল্লাহ। তাই নফসে কুল্লিয়ার এক দিক তার কারণের দিকে, আরেক দিক আল্লাহর দিকে। এ কারণে সেটিই প্রথম প্রকাশিত বরজখ।

এ কথা বুঝলে মানুষের নফসের বিষয়টিও সহজ হবে। মানুষের দেহ যখন ঠিকভাবে গঠিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন আল্লাহ তাতে তাঁর পক্ষ থেকে রুহ ফুঁকে দেন। তখন একদিকে থাকে ইলাহি রুহের ফুঁক, আরেকদিকে থাকে সুগঠিত দেহ। এই দুইয়ের মাঝখানে মানুষের নফস প্রকাশ পায়।

এ কারণেই দেহের মেজাজ ও স্বভাব নফসের ওপর প্রভাব ফেলে। নফসগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। কারণ ইলাহি ফুঁকের দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই; পার্থক্য হয় গ্রহণক্ষমতার ভিন্নতার কারণে।

তাই নফসের এক দিক প্রকৃতির দিকে, আরেক দিক ইলাহি রুহের দিকে। এই কারণেই আমরা নফসকে বরজখের জগতের অন্তর্ভুক্ত বলেছি।

এখন বান্দার ত্রুটিপূর্ণ গুণের কথাও একইভাবে বোঝা যায়। এই গুণগুলো সুফিদের কাছে ও অধিকাংশ আলেমের কাছে নফসের দিক থেকে নিন্দনীয়। কিন্তু যখন এগুলোকে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা হয়; অর্থাৎ যেহেতু সবশেষে এগুলোও আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর কর্মের অধীন, তখন সে দিক থেকে এগুলো নিন্দনীয় থাকে না।

তাই এই গুণগুলো প্রশংসা ও নিন্দার মাঝখানে থাকা এক ধরনের বরজখ। প্রশংসা আসে আল্লাহর দিকে সম্পর্কের কারণে; আর নিন্দা আসে কারণের দিক থেকে। অর্থাৎ বান্দার নফসের দিক থেকে।

সুতরাং বান্দার নফসের কোনো গুণ প্রকাশ পাওয়ার সময় যদি সেই গুণে আল্লাহর সম্পর্ক দেখা না যায়, তাহলে সেই গুণ ত্রুটিপূর্ণ। এ কারণেই তাকে নফসি গুণ বলা হয়। অর্থাৎ সেখানে বান্দা নিজের নফস ছাড়া আর কিছু দেখেনি।

কিছু লোক আবার সেই গুণের মধ্যেও হককে প্রত্যক্ষ করে। তখন তাদের কাছে সেই গুণের ভেতরেও হকের সম্পর্ক প্রকাশ পায়।

কিন্তু কোনো গুণ যদি শুধু জাগতিক কোনো কারণের প্রভাবে প্রকাশ পায়, আর তা দেখার সময় আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক মনে না আসে; এমনকি এই ভাবনাও না আসে যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকেও সম্পর্কিত, তাহলে সেই গুণ জাগতিক কারণের দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হবে।

যে জাগতিক কারণ এই বান্দাকে সেই গুণ ধারণে উদ্বুদ্ধ করে; যেমন কেউ দুনিয়ার কোনো স্বার্থ পেতে চায়; সে উদ্দেশ্যই তাকে কথায় বা কাজে চালিত করে। সেখানে হকের দিকটি তার মনে উপস্থিত থাকে না। তাই এ ধরনের কাজ সম্পর্কে বলা হবে, এটি ত্রুটিযুক্ত কাজ; অর্থাৎ আল্লাহর জন্য সেখানে তার প্রত্যক্ষ কোনো অংশ নেই।

আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا – তোমরা দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থ কামনা করছ। সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৭।

অর্থাৎ বদরের বন্দিদের ক্ষেত্রে এই সম্বোধন করা হয়েছিল। এখানে দুনিয়ার স্বার্থ বলতে সাধারণভাবে দুনিয়ার সাময়িক ভোগ-লাভ বোঝানো হয়েছে।

আল্লাহ আরও বলেছেন, وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ – আর আল্লাহ আখেরাত চান। সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৭।

সুতরাং কাছের লাভ বা নিকটবর্তী স্বার্থ হলো সেই প্রকাশ্য কারণ, যা সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে; তারা এর বাইরে আর কিছু দেখে না। আর আখেরাতের বিষয়টি তাদের থেকে আড়ালে থাকে। গাফলতিদের কাছেও তা আড়ালে থাকে; কারণ সেটি ইমানের দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ হওয়ার বিষয়।

কখনো মানুষ নিজের গাফলতির কারণে এক সময় মুমিন পরিচয় থেকে অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। তখন তার গাফলতি তাকে এমন আরেক বিষয়ে প্রত্যক্ষ করায়, যা তার এই অসচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি সে সেই অবস্থাতেই ইমানসহ মৃত্যুবরণ করে, তবে তার গাফলতি থাকা সত্ত্বেও সে ইমানদার হিসেবেই মারা যায়।

কারণ যে গাফেল, তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে স্মরণ করে। কিন্তু জাহেল এমন নয়; তাকে স্মরণ করালেও সে স্মরণ করে না। তাই এ বিষয়টি বুঝে নাও। আল্লাহ হক কথা বলেন এবং তিনিই পথ দেখান।[3]

দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

দাতা গঞ্জে বখশের আলোচনা সবচেয়ে বিস্তৃত। তিনি স্পষ্ট করেছেন, নফস শব্দের বহু অর্থ আছে। রুহ, রক্তসম্পর্কিত সত্তা, মন্দের সমষ্টি; কিন্তু তরিকতের মানুষের কাছে নফস মূলত সব মন্দ ও অকল্যাণের সমষ্টিগত নাম। নফস ও রুহ উভয়ই অন্তরে সূক্ষ্মভাবে বিরাজ করে। নফস শয়তানের লতিফা, রুহ ফেরেশতার লতিফা। “যে নিজের নফসকে চিনল, সে রবকে চিনল” এই হাদিস ব্যাখ্যা করে তিনি দেখিয়েছেন, নফসের লাঞ্ছনা ও অক্ষমতা চেনা মানেই রবের মহিমা ও শক্তি চেনা। মানুষকে তিনি দেহ, রুহ ও নফসের সমন্বিত বাস্তবতা বলেছেন। ইনসানে কামেলের তিনটি দিক— নফসের দিক, রুহের দিক ও মূল সত্তার দিক। মুজাহাদার মাধ্যমে নফসের জাহেরি দোষ দূর হয়, আর তার বদৌলতে বাতেনি পরিচ্ছন্নতা জন্মায়।

তিনি বলেন, স্পষ্টভাবে জেনে রাখুন, নফস শব্দের বহু অর্থ আছে। সুফিগণ ও হাকিকতের অধিকারীরা বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের অভ্যাস ও প্রচলিত ব্যবহারের কারণে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে এই শব্দ ব্যবহার করেন। ফলে তাদের বক্তব্যে অনেক সময় পার্থক্য দেখা যায়।

যেমন: এক দল নফস বলতে রুহকে বোঝায়। আরেক দল বলে, নফস রুহের নিকটবর্তী এক সত্তা। অন্য দল বলে, নফস রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু তরিকতের হাকিকতবিদদের কাছে নফস শব্দের প্রচলিত অর্থ এগুলো নয়। বরং তরিকতের মানুষ এ বিষয়ে একমত যে, হাকিকতে নফস হলো তামাম মন্দ ও অকল্যাণের সমষ্টিগত নাম, যা খারাপ কাজ ও অন্যায় কর্মের দিকে নিয়ে যায়।

তবে কোনো কোনো দল নফসকে কেবল খারাপ স্বভাবের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করেছে। তাদের মতে নফস তখনই নফস, যখন তা মন্দ স্বভাব নিয়ে প্রকাশ পায়। যেমন হিংসা, অহংকার ইত্যাদি। আরেক দল বলে, নফস কেবল খারাপ স্বভাবের নাম নয়; বরং মন্দ স্বভাব, নিন্দনীয় জীবনযাপন, ইচ্ছা-বাসনা ও অকল্যাণকর অবস্থা সবই নফসের প্রকাশ।

নফসের অবস্থা:

নফসের অবস্থা দুই ভাগে বিভক্ত। একটি স্বভাবজাত ও জন্মগত, আরেকটি অর্জিত ও অভ্যাসগত।

তাকাব্বুর, হিংসা, কৃপণতা, ক্রোধ এবং এগুলোর মতো আরও যত মন্দ ও ঘৃণিত স্বভাব আছে— এসবই মানুষের জন্য মন্দ নফসের অবস্থাসমূহ। এগুলোর বিরুদ্ধে রিয়াজত করা জরুরি। এর মাধ্যমেই এসব মন্দ স্বভাব দূর করা যায়।

যেমন তাওবার মাধ্যমে গুনাহ দূর হয়, তেমনই মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে নফসের জাহেরি দোষগুলো দূর হয়। আর এভাবেই নফসের বাতেনি দোষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

রিয়াজত ও মুজাহাদা হলো নফসের জাহেরি আচরণের বিরোধিতা করা, আর নফসকে নিজের স্বভাবের বিপরীতে দাঁড় করানো। যতদিন প্রয়োজন হয়, তা করতে হবে। কারণ জাহেরি দোষ রিয়াজত ও মুজাহাদার মাধ্যমে পবিত্র ও পরিষ্কার করা যায়। আর জাহেরি দোষ দূর হয়ে গেলে তার বদৌলতে বাতেনি পরিচ্ছন্নতাও জন্ম নেয়।

নফস ও রুহ উভয়ই অন্তরের ভেতরে অতি সূক্ষ্মভাবে অবস্থান করে। তবে নফস শয়তানের লতিফা, আর রুহ ফেরেশতার লতিফা। একটিতে কল্যাণ আছে, আরেকটিতে মন্দ আছে। যেমন আকল ও অজ্ঞতা, দৃষ্টি ও অন্ধত্ব, রাত ও দিন।

আল্লাহ তায়ালা এভাবেই পরস্পর বিপরীত গুণসমূহ মানুষের অন্তরে গচ্ছিত রেখেছেন, যাতে নফসের বিরোধিতা করে সব মন্দ স্বভাব থেকে মুক্তি অর্জন করা যায়। এর জন্য নফসের সম্মতি ছাড়াই তাকে তার খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে রাখা জরুরি। আর নফসের সঙ্গে বিরোধিতা করাতেই তার মুক্তি আছে।

কারণ হক তায়ালা তাকে মন্দ কাজের নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে—

وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ

আর যে ব্যক্তি নিজের নফসকে প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা। সুরা নাজি‘আত, আয়াত: ৪০–৪১।

আরও ইরশাদ হয়েছে—

أَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَىٰ أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ

যখনই কোনো রসুল তোমাদের কাছে এমন কিছু নিয়ে এসেছেন, যা তোমাদের নফস পছন্দ করেনি, তখন তোমরা অহংকার করেছ। সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৭।

হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেন—

وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي

আমি নিজের নফসকে পবিত্র বলছি না। নিশ্চয় নফস তো বারবার মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়; তবে আমার রব যার প্রতি দয়া করেন, সে ছাড়া। সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

إِذَا أَرَادَ اللهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا بَصَّرَهُ بِعُيُوبِ نَفْسِهِ

আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে তার নফসের দোষগুলো দেখিয়ে দেন।

আর হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা দাউদ আলাইহিস সালামকে বলেছেন—

يَا دَاوُدُ عَادِ نَفْسَكَ فَإِنَّ وُدِّي فِي مُعَادَاتِهَا

হে দাউদ, নিজের নফসকে শত্রু মনে করো; কারণ আমার মহব্বত আছে তার বিরোধিতার মধ্যে।

এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো, সবই নফসের গুণাবলি। লেখকের উদ্দেশ্য হলো— নফস মূলত ওই সত্তা, যার মাধ্যমে মানুষ একের পর এক গুণ গ্রহণ করে। তাই নফস নিজে ওই গুণগুলোর মতো নয় এবং নফসের পরিচয় এতটুকুতেই শেষ হয়ে যায় না যে, তাকে শুধু গুণের সমষ্টি বলা হবে।

বরং নফসের স্বরূপকে তার নিজ বাস্তবতায় চিনতে হবে। মানুষের গুণাবলি ও মানুষের বাস্তব পরিচয় সম্পর্কে যারা গভীরভাবে কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়— জিনিস যেমন হয়, তাকে তেমনভাবেই জানা উচিত; কোনোকিছুকে তার সত্য স্বরূপের চেয়ে বেশি বা কম বলা ঠিক নয়।

সুতরাং নফস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ যে ব্যক্তি নিজের নফসকে চিনতে পারল, সে নিজের পরিচয় লাভ করল। আর যে নিজেকে চিনল, সে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বুঝতে পারল। নিজেকে নিজের হকসহ জানা; এটাই আসলে হকের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক জানা। এ বিষয়টি বুঝাতেই আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে—

وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ

যে নিজের নফসকে মূর্খ ও হীন করে ফেলেছে, সে ছাড়া আর কে ইবরাহিমের মিল্লাত থেকে বিমুখ হয়? সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩০।

অর্থাৎ নিজের নফসকে না চেনা তরিকতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা। একজন বুজুর্গ বলেছেন—

من جهل نفسه فهو بالغير أجهل

যে নিজের নফস সম্পর্কে অজ্ঞ, সে অন্য সবকিছুর ব্যাপারে আরও বেশি অজ্ঞ।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ

যে নিজের নফসকে চিনল, সে নিজের রবকে চিনল।

এর অর্থ হলো, যে নিজের নফসকে ‘বাকা’র অধীন ও ‘ফানা’র পথে চলমান হিসেবে চিনল, সে বুঝল— তার রব বাকি, অবিনশ্বর এবং ফানার ঊর্ধ্বে। আরেক ব্যাখ্যা হলো, যে নিজের নফসকে লাঞ্ছিত, অক্ষম ও দুর্বল হিসেবে চিনল, সে বুঝল— তার রব মহিমান্বিত, শক্তিমান ও দয়াময়। আরও বলা হয়, যে নিজের নফসকে বন্দেগির স্বরূপে চিনল, সে নিজের রবকে রবুবিয়্যাতের স্বরূপে চিনল। আবার যে নিজের নফসকে চিনল, সে অন্য সবকিছু থেকেও বেশি নিজের অজ্ঞতা বুঝতে পারল। কারণ নফসকে চেনা মানে, নফসের সীমা ও নিজের অক্ষমতাকে জানা।

মানুষের পরিচয়:

এই মতবিরোধের কারণেই এক দল বলে, মানুষ শুধু রুহের নাম। রুহ চিরস্থায়ী, জীবিত এবং রবের সঙ্গে যুক্ত। তাই মানুষের মূল পরিচয় রুহের দিকেই ফিরে যায়। শরীর তো জুলমত, ভার ও নশ্বরতার স্থান; এটি রুহের বাহন মাত্র।

কিন্তু এ বক্তব্য দুর্বল। কারণ রুহ যখন দেহ থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন ওই দেহকে আর মানুষ বলা হয় না, বরং মৃতদেহ বলা হয়। এটি দেখায় যে, শুধু দেহ মানুষ নয়।

আবার যদি বলা হয়, মানুষ কেবল রুহ; তাহলেও সমস্যা থাকে। কারণ রুহ যখন দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখনই তাকে এই দুনিয়ায় মানুষের পরিচয়ে চেনা যায়। রুহ শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেলে তার প্রকাশ বদলে যায়। তাই মানুষকে শুধু রুহ বলা যায় না।

সঠিক কথা হলো, মানুষ দেহ ও রুহের সমন্বিত বাস্তবতা। দেহ ছাড়া রুহের দুনিয়াবি প্রকাশ পূর্ণ হয় না, আর রুহ ছাড়া দেহ শুধু নির্জীব কাঠামো। সুতরাং মানুষ নামটি এই দুইয়ের মিলিত অবস্থার ওপর প্রয়োগ হয়।

এক দল বলে, দেহ ও রুহ যতক্ষণ একত্র থাকে, তখনই তাদের সমষ্টির নাম মানুষ। আর যখন এ দুটির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তখন মানুষ মৃতদেহে পরিণত হয়। যেমন কোনো সরাইখানায় দুজন পথিক একত্র হলো, তারপর একজন আগে চলে গেল; এতে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا

মানুষের ওপর কি কালের এমন এক সময় অতিবাহিত হয়নি, যখন সে উল্লেখযোগ্য কোনো বস্তুই ছিল না? সুরা দাহর, আয়াত: ১।

এটি হজরত আদম আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। যখন তাঁর দেহের মাটির কাঠামো প্রস্তুত ছিল, তখনও তাতে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়নি।

আরেক দল বলে, মানুষ এমন এক দেহের নাম, যার মধ্যে জান আছে। কারণ দেহ মানুষের ভিত্তি ও অবস্থানস্থল; বাকি গুণাবলি তার সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে এ কথাও দুর্বল। কারণ যদি কোনো অঙ্গ কেটে ফেলা হয়, তখন শুধু ওই কাটা অঙ্গকে মানুষ বলা যায় না। তেমনি আদম আলাইহিস সালামের দেহে রুহ প্রবেশের আগে তাকেও প্রকৃত অর্থে মানুষ বলা হয়নি।

এগুলোর মধ্যে সঠিক কথা হলো— মানুষ কোনো একক বস্তু নয়, যাকে শুধু একটি দিক দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায়। মানুষ দেহ, রুহ, নফস, আকল, হৃদয়, গুণাবলি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং প্রকাশিত অবস্থার সমন্বিত বাস্তবতা। এ সব মিলেই তাকে মানুষ বলা হয়।

এর কারণ হলো, ফানা ও বাকা, গতি ও স্থিরতা এবং প্রয়োজনীয় সব অবস্থার যোগফল মানুষের মধ্যে একত্র থাকে। মালাকদের ক্ষেত্রে এমন সমষ্টিগত নাম ব্যবহৃত হয় না; কারণ তারা মিশ্র ও যৌগিক সত্তা নয়। আর জিনদেরও এভাবে বলা হয় না।

একইভাবে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বের শুধু একটি অংশকে মানুষ বলা যায় না। যেমন তার হাত বা পা আলাদা হয়ে গেলে সেটাকে মানুষ বলা হয় না। তাই আল্লাহ তায়ালা মূলত আদমের সন্তানকে সম্মানিত করেছেন এবং তাদের মানুষ নাম দিয়েছেন। কারণ তাদের মধ্যে বিভিন্ন জগতের বহু অর্থ ও গুণ একত্র হয়েছে।

কুরআনে এসেছে—

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ

আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাকে শুক্রবিন্দু করে এক নিরাপদ স্থানে রেখেছি। তারপর সেই শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি। তারপর জমাট রক্তকে গোশতের টুকরায় রূপ দিয়েছি। এরপর সেই গোশতের টুকরা থেকে হাড় সৃষ্টি করেছি। তারপর হাড়গুলোকে গোশত দিয়ে আবৃত করেছি। এরপর তাকে আরেক নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলেছি। অতএব বরকতময় আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২–১৪।

তাই মানুষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তার সব অংশের সমষ্টির কারণে। বিশেষ দেহ, বিশেষ স্বভাব, মেজাজ ও উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি সৃষ্টিকে মানুষ বলা হয়েছে। যেমন কোনো গোত্র, জাতি বা দলের নাম এমন এক গোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ হয়, যারা নির্দিষ্ট গুণাবলির অধিকারী। কারণ সেই নামের কারণে তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই পরিচয় থেকে আলাদা হয় না।

প্রত্যেক বাতেনি অবস্থা কোনো নির্দিষ্ট জাহেরি রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সাজানো থাকে। এ কারণেই আদমি বা মানুষ নামটি সেই নির্দিষ্ট রূপ, নির্দিষ্ট গঠন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জোড়াগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এটি মানুষ নামের প্রকৃত অবস্থা ও বাস্তব পরিচয়। এর পূর্ণ হাকিকত সামনে আলোচনা করা হবে।

ইনসানে কামেল:

স্পষ্টভাবে জেনে রাখুন, হাকিকতের অনুসন্ধানীদের মতে ইনসানে কামেল হলো সেই সত্তা, যার তিনটি দিক আছে।

প্রথম দিক তার নফসের সঙ্গে সম্পর্কিত। নফস তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহে শরীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

দ্বিতীয় দিক রুহের সঙ্গে সম্পর্কিত। রুহের মাধ্যমে নফসের খাওয়াইস তথা বিশেষ গুণাবলি ও হাকিকতসমূহ প্রকাশ পায়।

তৃতীয় দিক তার আসল সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ আসলে দুই জগতের মাঝখানে অবস্থানকারী এক জামি‘ তথা সমন্বয়কারী সত্তা। তার মধ্যে উভয় জগতের চিহ্ন বিদ্যমান।

নিচের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক হলো— সে মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন থেকে গঠিত। আর উপরের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক হলো— তার মধ্যে জান্নাত, ফেরেশতা ও রুহানি সত্তার নিদর্শন রয়েছে। মানুষ এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সমন্বিত বাস্তবতা।

মানুষের মধ্যে জিনদের লতিফাগুলোরও অংশ আছে, কারণ তার ভেতরে রুহ আছে। আর রুহের ভেতরে নুরও আছে। মানুষের ভেতরে ফেরেশতাদের মাকামও আছে; সেটি নফসের মাকাম। আরও আছে শয়তানের মাকাম; সেটি দেহের মাকাম।

এই দুই জগতের মানুষ পূর্ণ নুর ও পরিপূর্ণ মহব্বতের অধিকারী। তাই জান্নাত তার দুনিয়ার মাকামের মতো, আর দুনিয়া তার শরীরের মাকামের মতো। সেই রকম রুহের মারিফত হলো আরাম, আর জাহের হলো হিজাব ও জুলমত। জান্নাতে যখন মৃত্যু আনা হবে এবং দুনিয়ার মানুষ নাজাত পাবে, তখন সে নিজের দুনিয়াবি অবস্থান ও ইলাহি হাকিকতের দিক থেকে গাইর ও পরিবর্তনশীল কিছু নয়; বরং দৃঢ় ও স্থায়ী হয়ে যাবে। আর তখন তার জন্য হাকিকত, অস্তিত্ব এবং রুহের মূল স্বরূপের মারিফত লাভ হবে।

যে ব্যক্তি দুনিয়াকে আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেয়, তাকে দুনিয়া থেকেও উত্তম জিনিস দেওয়া হয়। তার দেহের জাহের জান্নাতে থাকবে, আর তার রুহের নুর ফেরেশতাদের মর্যাদার ভাণ্ডার থেকে উজ্জ্বল হবে।

এ কথা বলা হয়েছে যে, মুমিনের রুহের জন্য জান্নাত হলো সেই রূপ, যেমন মুমিনের দেহের জন্য দুনিয়া। আর রুহ হলো সেই সত্তা, যা জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। কারণ দুনিয়ায় রুহের কাজ হলো মুমিন ও আরিফের তত্ত্বাবধান করা। আর আকলের কাজ হলো বেদিন ও জাহেল মানুষদের খাহেশের সহায়তা করা। আরিফের আকলের জন্য হেদায়েত, সঠিকতা ও কল্যাণ আছে। কিন্তু নফস ও খাহেশের সঙ্গে মিশ্রিত হলে আকলের সঙ্গে ভুল, বিপথগামিতা এবং অন্যায় যুক্ত হয়।

তাই সত্যপথের সন্ধানীদের জন্য জরুরি হলো নফসের বিরোধিতার পথ আঁকড়ে থাকা, যাতে আকল নফসের বিরোধিতায় রুহকে সাহায্য করে। কারণ রুহের মাকাম ইলাহি। আল্লাহই সঠিক বিষয় ভালো জানেন।

নফসের হাকিকত সম্পর্কে মাশায়িখের বক্তব্য:

হজরত জুননুন মিসরি (রহ.) বলেন—

أَشَدُّ الْعَذَابِ رُؤْيَةُ النَّفْسِ وَتَدْبِيرُهَا

সবচেয়ে কঠিন আজাব হলো নিজের নফসকে দেখা এবং তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা।

কারণ নফসের ব্যবস্থাপনায় হক তায়ালার বিরোধিতা আছে। আর হক তায়ালার বিরোধিতাই আজাবের কারণ।

হজরত বায়েজিদ বস্তামি (রহ.) বলেন—

النفس صفة لا تسكن إلا بالباطل

নফস এমন এক গুণ, যা বাতিল ছাড়া শান্ত হয় না।

আরিফ সেই ব্যক্তি, যে কখনো মাখলুকের কাছ থেকে শান্তি পায় না।

হজরত মুহাম্মদ ইবনু আলি (রহ.) বলেন—

تريد أن تعرف الحق مع بقاء نفسك فيك ونفسك لا تعرف نفسها فكيف تعرف غيرها

তুমি চাও, নিজের নফসকে বহাল রেখেই হককে চিনবে। অথচ তোমার নফস নিজেকেই চেনে না; তাহলে সে অন্যকে কীভাবে চিনবে?

এর অর্থ হলো, নফস নিজের বাকা তথা স্থায়িত্বের অবস্থায় নিজেই পর্দাবৃত ও আড়ালগ্রস্ত। আর যখন তুমি নিজেই নিজের কাছ থেকে আড়ালগ্রস্ত, তখন হক তায়ালাকে কীভাবে চিনবে?

হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন—

أساس الكفر قيامك على مراد نفسك

কুফরের ভিত্তি হলো নিজের নফসের কামনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা।

কারণ নফসের কামনা ও খাহেশের ওপর স্থির থাকা বন্দার জন্য কুফরের ভিত্তি। কেননা ইসলাম মানে আনুগত্য; আর নফসের সঙ্গে আনুগত্যের কোনো মিল নেই। তাই নফসের খাহেশের বিরোধিতা করা এবং তাকে ভেঙে দেওয়া জরুরি। একে প্রশ্রয় দিলে তা মানুষকে ধীরে ধীরে হালাকত তথা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

হজরত ইবরাহিম দাসুকি (রহ.) বলেন—

النفس مانعة بلا خائنة مانعة من الرضا وأفضل الأعمال خلافها

নফস বাধাদানকারী, বরং বিশ্বাসঘাতক; সে রেজা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বাধা দেয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো তার বিরোধিতা করা।

কারণ নফস আমানতের ব্যাপারে খিয়ানতকারী। আর রেজা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বাধাদানকারী। তাই মাশায়িখের কথায় এর ভেতরে যেসব গভীর তাৎপর্য আছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসছে।

এখন আমি নিজের আলোচনার দিকে ফিরছি। হজরত কামিল (রহ.)-এর মাজহাবের প্রমাণ ও তার নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে মুজাহাদা, রিয়াজত এবং হাকিকতের আলোচনা করছি। তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই।

নফসের মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي اللهِ

মুজাহিদ সে-ই, যে আল্লাহর পথে নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ করে।

আর তিনি ﷺ আরও বলেছেন—

رَجَعْنَا مِنَ الْجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الْجِهَادِ الْأَكْبَرِ قِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْجِهَادُ الْأَكْبَرُ قَالَ الْأَرْضَى مُجَاهَدَةُ النَّفْسِ

আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে এলাম। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল, বড় জিহাদ কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নফসের সঙ্গে মুজাহাদা করা।

রসুলুল্লাহ ﷺ নফসের মুজাহাদাকে জিহাদে আসগার তথা ছোট জিহাদের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। কারণ এতে রুহের কষ্ট ও মেহনত বেশি। তাই এই পথে পরিপূর্ণভাবে অবতীর্ণ হওয়া জরুরি। আর মুজাহাদা নফসকে নফসে মুতমাইন্নার কাছে নিয়ে যায়।

হে প্রিয়, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন। জেনে রাখো, নফসের মুজাহাদার পদ্ধতি কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে গ্রহণ করতে হবে। তা সুন্নতের সঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত এবং রহমত ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত। সব পথের মধ্যে নফসের পরিশুদ্ধির মূল পথ হলো— অল্প খাবার খাওয়া, অল্প ঘুমানো, অল্প কথা বলা এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমানো। সাধারণভাবে প্রত্যেক মাশায়িখের ক্ষেত্রে এগুলোই প্রচলিত। এ বিষয়ে মাশায়িখের বহু প্রতীক, ইশারা ও ব্যাখ্যা আছে।

হজরত ইবনু আবদুল্লাহ তুস্তারি (রহ.) বিশেষভাবে অল্প খাওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ মুজাহাদার ক্ষেত্রে তাঁর সিলসিলায় ক্ষুধা এবং অল্প খাবারকে প্রধান ভিত্তি ধরা হয়েছে।

শোনা যায়, হজরত আবু বকর শিবলি (রহ.)-এর নিয়ম ছিল প্রতিদিন একটি মাত্র খেজুর খেতেন। কিন্তু শেষ বয়সে দীর্ঘ রোগে আক্রান্ত হলে সব চিকিৎসক একমত হয়ে তাঁকে বেশি খাবার খেতে বলেন। তখন তিনি মাশায়িখের খাদিমকে ডেকে পাঠান। খাদিম এসে জানায় হজরত শিবলি (রহ.) মাশায়িখের একজন খাদিমের খাদ্যের ওপর নির্ভর করছিলেন। অথচ আল্লাহর পথে সত্যসন্ধানীদের জন্য মুজাহাদায় এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

হজরত ইবনু আরবি (রহ.) দুনিয়াবি জীবনের তুলনা করেছেন আখেরাতের জীবনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আখেরাতের জীবন চিরস্থায়ী; আর দুনিয়ার জীবন তার তুলনায় অতি সামান্য। তাই তিনি বলেন, দুনিয়ায় অল্প খাবার খাওয়া এবং কম ভোগ করা মুজাহাদার কাজ। কারণ বান্দা যখন দুনিয়ায় অল্প খেয়ে ইবাদত করে, তখন আখেরাতে সে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাবে কোনো কষ্ট ও মেহনত ছাড়াই।

এ কারণেই তিনি বলেন, মৌলিকভাবে বড় মুজাহাদা হলো— নিজেকে আল্লাহর পথে ব্যস্ত রাখা এবং দুনিয়ার আরাম-আয়েশ কমিয়ে দেওয়া। المشاهدة موازنة المجاهدات – মুশাহাদা মুজাহাদার সমপরিমাণ হয়।

এ ছাড়া অন্যান্য মাশায়িখও বলেছেন, হকের কাছে পৌঁছানোর জন্য মূলত কোনো আলাদা উপায় নেই; যা কিছু অর্জিত হয়, তা আল্লাহর ফজলেই অর্জিত হয়। ফজলের তুলনায় বান্দার কর্মের আসল মূল্য কতটুকু? একজন মানুষ কীভাবে নিজের নফসের মুজাহাদা ও তা ভেঙে দেওয়াকে হাকিকতের কাছে পৌঁছার মূল্য বানাতে পারে?

এর কারণ হলো, মুজাহাদার মাধ্যমে রুহ বান্দার দিকে মনোযোগী হয়। আর মুশাহাদার আহওয়াল হক তায়ালার দিক থেকে প্রকাশ পায়। এ অবস্থায় বান্দার কর্মগুলো যেন বাহ্যিক কারণ মাত্র; আসল দান আল্লাহর ফজল থেকেই আসে।

এই মাসআলায় যারা ভিন্নমত করেছেন, হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) তাঁদের বিরুদ্ধে দলিল পেশ করে বলেন—

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখিয়ে দিই। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯। এর অর্থ হলো— যে মুজাহাদা করে, সে মুশাহাদা লাভ করে।

হে প্রিয়, শরিয়তের আহকাম মেনে চলা এবং আল্লাহর নাজিল করা বিধানকে প্রতিষ্ঠিত রাখাই মুজাহাদার মূল ভিত্তি। মুজাহাদা যদি শরিয়তের আনুগত্য না হয়, তবে তা সব হুকুমকে বাতিল করে দেয়। কারণ দুনিয়া ও আখেরাতের সব বিধানই শরিয়তের অধীন। শরিয়ত যে বিষয়কে আনুগত্য বলেছে, সেটিই প্রকৃত আনুগত্য; আর শরিয়ত যে কাজকে গুনাহ বলেছে, সেটিই গুনাহ।

সুতরাং মুরিদের জন্য জরুরি হলো মাশায়িখের নির্দেশিত বিধানগুলো মেনে চলা, খাওয়া কমানো, ঘুম কমানো এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমানো। এসবের দ্বারা নফসের জাহেরি দোষগুলো দূর হয়। কারণ নফসের বহু ক্ষতিকর অর্থ আকল ও ধারণার স্তরে প্রবেশ করে, তারপর কাজের ভেতর প্রকাশ পায়। এই কারণেই এগুলোর তাফসিল ও ব্যাখ্যা সামনে আসবে।

এ বিষয়ে বোঝার মতো মূল কথা হলো যদি মুজাহাদা শরিয়তের নিয়মের ভেতর থাকে, তাহলে তা হকের পথে সহায়ক হয়। কিন্তু মুজাহাদা যদি শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। কেউ যদি নিজের ইচ্ছামতো ক্ষুধা, জাগরণ, নির্জনতা বা কষ্টকে দীন মনে করে, অথচ শরিয়তের সীমা না মানে, তাহলে সে নফসের আরেক ফাঁদে পড়ে যায়।

যেমন কেউ যদি মাটির নিচে গর্ত করে বসে থাকে, নিজের হাত-পা বেঁধে রাখে, বা এমন কষ্ট নেয় যা শরিয়ত অনুমোদন করে না, তবে তা মুজাহাদা নয়। আবার কেউ যদি এমনভাবে খাওয়া কমায়, যাতে শরীর দুর্বল হয়ে ইবাদতের শক্তি হারিয়ে ফেলে, তাও সঠিক নয়। মুজাহাদার উদ্দেশ্য শরীর ধ্বংস করা নয়; বরং নফসকে শরিয়তের অধীন করা।

একইভাবে কেউ যদি নিজের ওপর এমন কষ্ট চাপায়, যার ফলে জ্ঞান, আমল ও ইবাদতে ক্ষতি হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহর পথে চলার জন্য শরীরও আমানত। শরীরকে এমনভাবে দুর্বল করা যাবে না, যাতে ফরজ, ওয়াজিব বা জরুরি দায়িত্ব পালনে বাধা আসে।

সুতরাং মুজাহাদার সঠিক পথ হলো হালাল খাওয়া, কিন্তু কম খাওয়া; ঘুমানো, কিন্তু গাফলতের ঘুম নয়; কথা বলা, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী; মানুষের সঙ্গে থাকা, কিন্তু নফসের খাহেশে নয়। এই ভারসাম্যই শরিয়তসম্মত রিয়াজত।

এ পথে আল্লাহর নেক বান্দারা নিজেরা দীর্ঘ মুজাহাদা করেছেন। তাঁরা শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেননি। বরং শরিয়তের ভেতর থেকেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন। তাঁদের মুজাহাদা ছিল নফসকে ভাঙার জন্য, শরিয়ত ভাঙার জন্য নয়।

সুতরাং যে ব্যক্তি হকের পথে সত্যিকারের মুজাহাদা করতে চায়, তার জন্য জরুরি হলো— মাশায়িখের সোহবত গ্রহণ করা, তাদের নির্দেশ মানা, শরিয়তের বিধান আঁকড়ে ধরা এবং নিজের নফসকে সন্দেহের চোখে দেখা। কারণ নফস অনেক সময় ইবাদতের রূপ ধরে মানুষকে ধোঁকা দেয়। বাহ্যিক কষ্ট দেখিয়ে সে ভেতরে অহংকার, আত্মপ্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্বের বোধ জন্মায়।

তাই মুজাহাদা তখনই ফলদায়ক হয়, যখন তা বিনয়, ইখলাস, শরিয়তের আনুগত্য এবং আল্লাহর ফজলের ওপর নির্ভরতার সঙ্গে হয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

طه مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى

ত্ব-হা। আমি আপনার ওপর কুরআন এ জন্য নাজিল করিনি যে, আপনি কষ্টে পড়ে যাবেন। সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১–২।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিগণের সামনে কিছু আলোচনা চলছিল। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, গত রাতে আমার কাছে আমার রবের পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক এসেছিলেন। তিনি বললেন, হে রসুলুল্লাহ ﷺ, আপনার উম্মতকে সুসংবাদ দিন—

خذ منهم فإنه لا عيش إلا عيش الآخرة

তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করুন; কারণ প্রকৃত জীবন তো আখেরাতের জীবনই।

দুনিয়া ধোঁকার জীবন। হজরত হাইয়ান ইবনু খারিজা (রহ.) বর্ণনা করেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) আমাকে বললেন, তুমি রিয়াজত কীভাবে করছ? অতঃপর বললেন—

ابتدئ بنفسك فجاهدها وابدأ بنفسك فإنك إن قتلت قتلك الله فإذا قتلك مرائياً قتلك مرائياً وإن قتلك صابراً محتسباً قتلك صابراً محتسباً

আগে নিজের নফস থেকে শুরু করো। তার সঙ্গে মুজাহাদা করো। নিজের নফস দিয়েই শুরু করো। কারণ তুমি যদি তাকে হত্যা করো, আল্লাহ তোমাকে হত্যা করবেন। যদি তুমি তাকে রিয়া ও লোকদেখানোর অবস্থায় হত্যা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রিয়াকার অবস্থায় হত্যা করবেন। আর যদি তুমি তাকে সবর ও সাওয়াবের আশায় হত্যা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে সবরকারী ও সাওয়াবপ্রত্যাশী অবস্থায় হত্যা করবেন।

তাই হক তায়ালার অর্থসমূহের বয়ানে আমাদের নির্ভরতা নিজের দুর্বল রায় বা মতের ওপর নয়; বরং হিদায়েতপ্রাপ্তদের তাসনিফ, সালাফের পথ এবং শরিয়তসম্মত ইশারার ওপর।

আমাদের আলোচনা তাওহিদের ভিত্তি এবং তার রচনাপদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ধরনের বিষয় ইবারত ও ভাষার বাঁধনে পুরোপুরি বলা যায় না। যেমন ইলাহি হাদরতের কাছে পৌঁছা তাঁর তাওফিক ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি সেই হাদরতের বক্তব্যও তাঁর তাওফিক ছাড়া সম্ভব নয়। (হাদরত বলতে আল্লাহর  প্রকৃত অবস্থা)

যে ব্যক্তি হকের কাছে পৌঁছা ছাড়া হকের দাবি করে, সে ভুলের ওপর থাকে। কারণ যেখানে সৃষ্টির রূপ এবং সৃষ্টিকারীর প্রমাণ আছে, সেখানে মারিফতের পথের দলিল হলো— নফস, তার মুজাহাদা, তার আমল এবং তার মুশাহাদা।

আহলে তরিকতের একটি দলিল হলো— কোনো দলিলই অন্তরকে হকের বিপরীত বিষয় থেকে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ করতে পারে না।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا. وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَآتَاهُمْ تَقْوَاهُمْ

যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথ দেখাই। আর যারা হিদায়েত গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের হিদায়েত আরও বাড়িয়ে দেন এবং তাদের তাকওয়া দান করেন। সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯; সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৭।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, لَمْ يَنْجُ أَحَدُكُمْ بِعَمَلِهِ – তোমাদের কেউই নিজের আমলের মাধ্যমে নাজাত পাবে না।

তখন জিজ্ঞেস করা হলো, قِيلَ وَلَا أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ বলা হলো, হে আল্লাহর রসুল, আপনিও না? তিনি ﷺ বললেন,

قَالَ وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللهُ بِرَحْمَتِهِ – আমিও না; তবে আল্লাহ যদি আমাকে তাঁর রহমতে ঢেকে নেন।

তাই মুজাহাদা হলো বান্দার কাজ। এটি আছে এবং প্রতিষ্ঠিত। তবে আসল নাজাত হলো আল্লাহর দয়া ও ফজলের কারণে। কারণ বান্দার নাজাত ইলাহি মাশিয়্যাত তথা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত, শুধু মুজাহাদার সঙ্গে নয়। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا

আল্লাহ যাকে হিদায়েত দিতে চান, তার বুক ইসলাম গ্রহণের জন্য খুলে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহ করতে চান, তার বুক সংকীর্ণ ও কঠিন করে দেন। সুরা আনআম, আয়াত: ১২৫।

আরও ইরশাদ হয়েছে—

تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ

আপনি যাকে চান, রাজত্ব দান করেন; আর যার কাছ থেকে চান, রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৬। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার প্রমাণে এমন আয়াত কুরআনে বহু জায়গায় এসেছে।

যদি বান্দার পৌঁছে যাওয়া শুধু নিজের মুজাহাদা ও চেষ্টার ওপর নির্ভর করত, তাহলে শয়তান ও দুনিয়াত্যাগী খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীরাই আল্লাহর নৈকট্যের সবচেয়ে যোগ্য হতো। কারণ তারা আদম আলাইহিস সালামের চেয়েও বেশি কষ্ট ও মেহনত করেছে। কিন্তু তাদের সেই কষ্ট গ্রহণযোগ্য হয়নি; বরং তারা আল্লাহর ফজল ও হিদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

সুতরাং নফসের হাকিকতে পৌঁছার মূল ভিত্তি হলো শরিয়ত ও মুজাহাদা। আর এই কথাও সত্য যে, যে যত বেশি মুজাহাদা করে, সে তত বেশি সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু যে হকের দয়া ও ইনায়াতের বেশি অধিকারী, সে-ই হকের সবচেয়ে কাছে।

কোনো ব্যক্তি যদি সারাজীবন আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, অথচ হকের দয়া থেকে দূরে থাকে, আর অন্য কেউ মদের দোকানে পাপের মধ্যে পড়ে থেকেও হকের দয়ার নিকটবর্তী হয়, তবে তার নাজাতের সম্ভাবনা বেশি। কারণ সবকিছুর মূল হলো ইমান। আর ইমানের চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু নেই।

তবে ভুল বোঝা যাবে না— এ কথা হুকুম নয়, বরং হাল ও দয়ার রহস্যের কথা। জাহেরি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, আনুগত্যে বেশি থাকা ব্যক্তি বেশি সম্মানিত; আর গুনাহে পড়ে থাকা ব্যক্তি কম মর্যাদার। কিন্তু ইলাহি মাশিয়্যাতের ভেতরের রহস্যকে বাহ্যিক আমল দিয়ে পুরোপুরি মাপা যায় না।

হজরত সিররি সাকতি (রহ.) বলেন, আল্লাহর পথে চলার পদ্ধতি হলো নফসের বিরোধিতা। কারণ এক দল বলে, পথ হলো طلب وجد অর্থাৎ অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায়। আরেক দল বলে, وجد طلب অর্থাৎ আগে দান আসে, তারপর অনুসন্ধান জন্ম নেয়। যে পায়, সে খোঁজে; আর যে খোঁজে, সে পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।

এর একটি কারণ হলো— এক ব্যক্তি মুজাহাদা করে, তারপর মুশাহাদা লাভ করে। আরেক ব্যক্তি মুশাহাদা লাভ করে, তারপর মুজাহাদা করে।

এর হাকিকত হলো, মুশাহাদার পরে মুজাহাদা করা ইলাহি তাওফিকের রহস্য। কারণ সেখানে আল্লাহর ফজল আগে আসে, তারপর বান্দার চেষ্টা। তাই কখনো সন্ধান ছাড়াই প্রাপ্তি ঘটে। আর কখনো প্রাপ্তির জন্য সন্ধান করতে হয়।

যখন মুশাহাদা ছাড়া শুধু মুজাহাদা থাকে, তখনও মুজাহাদার সুফল অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু সেটি এখনো জামালে ইলাহির নুর দ্বারা সরাসরি উদ্ভাসিত হয়নি। আর যখন মুশাহাদার নুর আগে আসে, তখন মুজাহাদা হিদায়েতের আলোয় পরিচালিত হয়।

কিন্তু এখানে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পথ ধরে রাখা জরুরি। তাদের মত হলো বান্দার মুজাহাদাকে স্বতন্ত্র কার্যকারণ হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না। সব নবী, কিতাব, শরিয়ত ও আহকাম তাওফিকের অধীন। তাই জাহেরি আমল প্রয়োজনীয় হলেও প্রকৃত হিদায়েত আল্লাহর দান।

এই কারণেই হিদায়েতের বিষয়টিকে আল্লাহর মারিফতের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা উত্তম। কারণ হিদায়েত হলো হকের দিকে যাওয়ার দরজা, আর মুশাহাদা হলো সেই হকের বাস্তব উপলব্ধি।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَىٰ وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ

আর যদি আমি তাদের কাছে ফেরেশতা নামিয়ে দিতাম, মৃতরা তাদের সঙ্গে কথা বলত, এবং সব বস্তু তাদের সামনে একত্র করে দিতাম, তবুও তারা ইমান আনত না; যদি না আল্লাহ চাইতেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। সুরা আনআম, আয়াত: ১১১।

কারণ ইমান আল্লাহর দান। শুধু দলিল দেখা বা নিদর্শন দেখা ইমানের জন্য যথেষ্ট নয়, যদি আল্লাহর মাশিয়্যাত না থাকে।

আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন—

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

নিশ্চয় যারা কুফর করেছে, আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, তাদের জন্য দুটোই সমান; তারা ইমান আনবে না। সুরা বাকারা, আয়াত: ৬।

কারণ কাফিরদের জন্য দলিল, নিদর্শন, ভয় প্রদর্শন ও কিয়ামতের সতর্কবাণী বারবার আসে; তবুও তারা তখন পর্যন্ত ইমান পায় না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের জন্য ইমানের দরজা খুলে দেন।

ইমানের তাওফিক আলাদা বিষয়। তাই কুরআনের দলিল, শরিয়তের বিধান ও হকের দিকে পৌঁছানোর নিয়মগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। এ কারণে নবীগণ ইসলামি শরিয়তের প্রচার, কিতাব নাজিল এবং আহকামের তাবলিগের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।

এ কারণেই হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলামের শুরুতেই এমনভাবে ইমান কবুল করেন, যা সবার কাছে আশ্চর্যের বিষয় ছিল। কিন্তু হজরত সিদ্দিক (রা.)-এর ভেতরে শুরু থেকেই ইলাহি ফজলের আলো পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তাঁর কাছে যুক্তি-তর্কের দীর্ঘ পথের প্রয়োজন হয়নি। ইমান, ইয়াকিন, তাসলিম ও তাওফিক তাঁর অন্তরে সরাসরি উদ্ভাসিত হয়েছিল।

এখানে মূল কথা হলো, তালিব ও মাতলুবের সম্পর্ক দুই রকম। কখনো তালিব অনুসন্ধান করতে করতে মাতলুবের দিকে যায়। আবার কখনো মাতলুব নিজেই তালিবকে টেনে নেয়। তখন তালিবের খোঁজও থাকে, কিন্তু আসল কার্যকারণ হয় হকের আকর্ষণ। এ কারণেই বলা হয়, যে খোঁজে সে পায়; আবার যে পায়, সে-ও খুঁজতে থাকে। পাওয়া এবং খোঁজা দুটিই আল্লাহর দানের ভেতর।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

مَنِ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ – যার দুই দিন একই রকম যায়, সে ক্ষতিগ্রস্ত।

অর্থাৎ সত্যসন্ধানীর আজকের দিন গতকালের চেয়ে উত্তম হওয়া উচিত। কারণ হকের পথে স্থির হয়ে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। প্রতিদিনই মুজাহাদা, মারিফত, ইয়াকিন ও আমলে উন্নতি থাকা দরকার।

আরও ইরশাদ হয়েছে—

اسْتَقِيمُوا وَلَنْ تُحْصُوا – তোমরা সোজা পথে অটল থাকো; কিন্তু তোমরা তা পূর্ণভাবে গণনা ও আয়ত্ত করতে পারবে না। এখানে রসুলুল্লাহ ﷺ মুজাহাদার মাধ্যমে সবব প্রমাণ করেছেন; আবার কাশফ, ইরাদা ও মারিফতের মাধ্যমে সববের সীমাও দেখিয়েছেন। আহলে ইয়াকিন সববের মাধ্যমে হকের দিকে চলে, কিন্তু সববকে স্বাধীন কার্যকারী মনে করে না।

যে ব্যক্তি শুধু মুজাহাদা ও কঠোর সাধনাকে সবকিছু মনে করে, সে পথে ভুল করে। কারণ মুজাহাদা যদি হকের ফজল ও মহব্বতের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা শুকনো পরিশ্রমে পরিণত হয়। আবার যে ব্যক্তি মুজাহাদা ছেড়ে শুধু ফজলের দাবি করে, সেও ভুল করে। কারণ ফজলের দরজা খুলে গেলে বান্দার ভেতরে আনুগত্য, ইখলাস, আমল ও বিনয় বৃদ্ধি পায়।

সুতরাং সত্য পথ হলো মুজাহাদা করতে হবে, কিন্তু তার ওপর ভরসা করা যাবে না; আমল করতে হবে, কিন্তু আমলকে নাজাতের দাম মনে করা যাবে না; তাওফিক চাইতে হবে, কিন্তু অলসতা করা যাবে না। বান্দার কাজ হলো দরজায় দাঁড়ানো, আর দরজা খুলে দেওয়া আল্লাহর কাজ।

এ কারণেই মুজাহাদা, মহব্বত, তাওফিক ও মুশাহাদা সব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। মুজাহাদা মহব্বতের বাহ্যিক প্রকাশ, আর মুশাহাদা হকের দানের ফল। তাওফিক ছাড়া মুজাহাদা শুকনো, আর মুজাহাদা ছাড়া তাওফিকের দাবি অপূর্ণ।

হজরত সাহল তুস্তারি (রহ.)-এর বক্তব্যেও এই সত্য প্রমাণিত হয়। মানুষ নিজের শক্তিতে হকের কাছে পৌঁছে না; বরং আল্লাহর দয়ায় পৌঁছে। তবে যে সত্যিই আল্লাহর দয়ার যোগ্য হতে চায়, তাকে নফসের বিরোধিতা, শরিয়তের আনুগত্য এবং ইখলাসের পথে অবিচল থাকতে হয়।

মুজাহাদার প্রয়োজন এ কারণেই— মানুষ যেন নিজের স্বভাবগত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসে এবং নিজের ভেতরে থাকা কাটা-ছেঁড়া ও বাধাগুলো দূর করে। যারা এ পথে চলে না, তাদের অবস্থা এমন যে, তারা কোনো দুর্লভ ও মূল্যবান বস্তু না দেখেই শুধু তার বিবরণ শুনে বা নাম জেনে বসে থাকে। এতে তাদের সামনে আমল ও আহওয়ালের হাকিকত স্পষ্ট হয় না।

জাহেরি দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আহলে তরিকতের কাছে রিয়াজত ও মুজাহাদাই আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু হাকিকত হলো, মুজাহাদার মূল্য তার নিজের জন্য নয়; বরং তা মুশাহাদার দিকে পথ খুলে দেওয়ার জন্য। তাই মুজাহাদাকে উদ্দেশ্য বানানো যাবে না, আবার একে অস্বীকারও করা যাবে না।

যার ভেতরে মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে আমলের জাগরণ আসে, তার জন্য জরুরি— সে যেন এ অবস্থাকে আল্লাহর ইশারা মনে করে এবং শরিয়তের সীমা পর্যন্ত নিজের আমলকে যাচাই করে। নিজের কাজের ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে না; বরং সবসময় নিজের হাল পরীক্ষা করবে। কোনো ইলাহি তাওফিক তাকে কোথায় দাঁড় করিয়েছে এবং সে কোন আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, এ কথা ভালোভাবে দেখবে।

এরপর তার কাছে স্পষ্ট হবে যে, হক তায়ালার কাছে পৌঁছার পথ নিজের ইচ্ছায় নয়; বরং হক তায়ালার ফজল, জ্ঞান ও উপস্থিতির নুরে হয়। আর এও বুঝবে যে, সবকিছুর ভেতরে আল্লাহর রহস্য প্রবাহিত। আগুনের দহন, পানির শীতলতা, মদের মাতাল করা— সবই সেই কার্যকারণ ব্যবস্থার প্রকাশ, যা আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন।

মানুষের কাজ হলো নিজের নফসের অন্ধকার ও মন্দ অবস্থাকে মুজাহাদার মাধ্যমে পরিষ্কার করা, যাতে হকের নুর তার ভেতরে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন আয়না ময়লা হলে মুখ দেখা যায় না; পরিষ্কার হলে মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। তেমনি নফস মলিন থাকলে হকের তাজাল্লি প্রকাশ পায় না। নফস পরিষ্কার হলে সেই নুরের প্রতিফলন দেখা যায়।

মুজাহাদা তাই আবশ্যক। কারণ নফস এক অদ্ভুত বিষয়। যতক্ষণ তা নিজের মন্দ স্বভাবের সঙ্গে থাকে, ততক্ষণ তা সত্যকে আড়াল করে রাখে। যখন সে নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নফসকে তার খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনে এবং আল্লাহর হুকুমে তাকে বেঁধে রাখে, তখন ধীরে ধীরে নফসের পর্দা সরে যায়।

لان النفس كلب باغ وجلد
والكلب لا يطهر إلا بالدباغ

কারণ নফস বিদ্রোহী ও কামড়ানো কুকুরের মতো;

আর কুকুরের চামড়া প্রক্রিয়াজাত না করলে পবিত্র হয় না।

হজরত হাসান ইবনু মানসুর (রহ.) একদিন হাসান আলভির কক্ষে অবস্থান করছিলেন। হজরত ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) যখন কুফা থেকে নফসকে শুদ্ধ করে তাঁর কাছে এলেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, হে ইবরাহিম, তুমি তরিকতের পথে কী কাজ করেছ? তুমি কোন স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছ?
ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) নিজের কাহিনি বললেন— আমি এ পথে দীর্ঘ মুজাহাদা করেছি। তখন হজরত হাসান ইবনু মানসুর (রহ.) বললেন, ضيعت عمرك في عمران باطنك فأين الفناء في التوحيد – তুমি নিজের বাতেন গড়তেই জীবন ব্যয় করেছ; তাহলে তাওহিদের ভেতর ফানা কোথায় রইল?

এর অর্থ হলো, তুমি চাও হকের মুতালাআ তথা হককে দেখার পথে পৌঁছাতে; অথচ নিজের বাতেনকে সাজানো-গোছানো ও পরিপাটি রাখার চেষ্টায় লেগে আছ। যখন সব চেষ্টা বাতেনি অবস্থার রং-রূপ তৈরি করতেই ব্যয় হয়, তখন জাহেরি অবস্থাগুলোর রংকে একটি রঙের ওপর স্থির রাখার মতো হয়ে যায়। দীর্ঘ মেহনতের পরও সেখানে হকের পূর্ণ প্রভাব প্রকাশ পায় না।

নফসের কুষ্ঠরোগীর উদাহরণ:

শায়খ আবুল হাসান নুরি (রহ.) বলেন, আমি একবার নফসকে এমন এক ভয়ংকর ও কুৎসিত রূপে দেখলাম যে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। তখন আমি তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলাম। এরপর সে আমার সামনে একটি গাছ হয়ে গেল। তারপর আমি তাকে পাকড়াও করতে চাইলাম। তখন সে আমাকে বলল, হে আবুল হাসান, এভাবে কষ্ট করে লাভ নেই; তুমি আমাকে ধরতে পারবে না।

নফসে ইলাহি বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ:

হজরত মুহাম্মদ ইবনু সুলায়মান সুসি (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি বললেন, আমার শুরু অবস্থায় যখন আমি নফসকে আয়ত্তে আনতে চাইতাম, তখন তার গোপন খেয়ানত ও ধোঁকা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম। সে সময় আমার হাল ছিল— আমি নফসের দিক থেকে এক রকম অচেতন ছিলাম।

একদিন আমার এক ছেলের জেদ বা অশোভন আচরণের কারণে আমার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হলো। তখন হক তায়ালা আমাকে থামিয়ে দিলেন, যেন বিষয়টির ভেতর দিয়ে আমাকে নফসের সূক্ষ্ম চাল বুঝিয়ে দেন।

তখন আমি বুঝলাম, নফসের ভেতরে এমন এক অভ্যাস আছে— মানুষকে কখনো কষ্ট দিয়ে, কখনো আরাম দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেয়। সে সময় আমার নফস আমাকে বলল, তুমি আমাকে না মেরে এবং কষ্ট না দিয়ে ধ্বংস করতে চাইছ; এটাই তার ধোঁকা। নফস বলল, আমার হাকিকত এমনই: যে-সব বস্তু তোমাকে কষ্ট দেয়, সেগুলোকেই আমি তোমার কাছে আরাম মনে করিয়ে দিই; আর যেগুলো তোমাকে আরাম দেয়, সেগুলোকেই আমি কষ্টের কারণ বানিয়ে দিই।

কাঁচের রূপে নফসের প্রকাশ:

হজরত শায়খ আবুল আব্বাস মুহতাদি (রহ.) বলেন, একদিন আমি ঘরে ছিলাম। হঠাৎ রঙিন কাঁচের একটি টুকরো এসে পড়ল। আমি ভাবলাম, কাঁচের এই টুকরো কোথা থেকে এলো? তখন অদৃশ্য থেকে বলা হলো, এটি তোমার নফসেরই এক রূপ, যা তোমার সামনে প্রকাশিত হয়েছে।

বিভিন্ন রূপে নফসের প্রকাশ:

হজরত শায়খ ইবরাহিম কারমানি (রহ.) বলেন, হক তায়ালা আপনাকে মর্যাদা ও তরিকতের স্থায়িত্ব দান করুন। তিনি নিজের শুরু অবস্থার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। বলেন, আমি নফসকে কখনো সাপের রূপে দেখেছি, কখনো বানরের রূপে। আবার এক বুজুর্গ বর্ণনা করেন, আমি নফসকে গাধার রূপে দেখেছি। কোনো কোনো মাশায়িখ বলেছেন, আমি নফসকে কুকুরের মতো দেখেছি। তারা সবাই নফসের খারাপ স্বভাব, ক্ষতি ডেকে আনা, খারাপের দিকে টেনে নেওয়া এবং ভেতরের দোষ-ত্রুটির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

কারণ যে নিজের অস্তিত্ব থেকে ফানা হয়ে গেছে, সে নিজের পবিত্র জাহেরকে অপবিত্র জিনিসের ওপর ভর করে আছে বলে কল্পনাও করতে পারে না। এ কারণেই যখন ভেতরের পবিত্রতা এবং বাহিরের নোংরামি, নুরানি অবস্থা এবং ইলাহি দানের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়, তখন মানুষ ধাঁধায় পড়ে যায়। তারপর যখন সে পর্দা সরে যেতে দেখে, তখন তার কাছে স্পষ্ট হয়— ওই সব রূপ মূলত সব দোষ থেকে পবিত্র ছিল না।

এসব উদাহরণ ও কাহিনির উদ্দেশ্য হলো— নফস নিজ সত্তায় আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো বস্তু নয়। নফসের কোনো নির্দিষ্ট বিশেষ গুণ বা স্থায়ী রূপ নেই, যার কারণে তাকে এক নির্দিষ্ট আকারে আবদ্ধ করা যায়। রসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইরশাদের মর্মও এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করে, أَعْدَى عَدُوِّكَ نَفْسُكَ الَّتِي بَيْنَ جَنْبَيْكَ, رُوِيَ أَنَّهُ قَالَ

বর্ণিত আছে, রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার নফস, যা তোমার দুই পাঁজরের মাঝখানে রয়েছে।

তাই নফসের মারিফত কখনো তার জাহেরি রূপের মাধ্যমে লাভ করা যায়। কারণ নফস নিজে কোনো পূর্ণ ও স্থায়ী সত্তা নয়। তাই সালিকের জন্য জরুরি হলো— যখন তার সঠিক পরিচয় জানা হয়ে যায়, তখন আর নিজের ভেতরে তার অস্তিত্বের দিকে আলাদা করে দৃষ্টি না দেওয়া।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

لِأَنَّ النَّفْسَ كَلْبٌ نَبَّاحٌ وَإِمْسَاكُ الْكَلْبِ بَعْدَ الرِّيَاضَةِ مُبَاحٌ

কারণ নফস ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মতো। তবে রিয়াজতের পর কুকুরকে ধরে রাখা মুবাহ।

অতএব নফসের মুজাহাদা তার গুণাবলিকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত করে। কিন্তু তার নিজ সত্তাকে বিলুপ্ত করে না। এ বিষয়ে মাশায়িখের বহু বক্তব্য আছে। ভয় হলো আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই আপাতত এই পরিমাণেই যথেষ্ট করছি। এরপর এখন আমি শরিয়তের আলোচনা শুরু করছি। তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই।

হাওয়া তথা প্রবৃত্তির হাকিকত এবং তার নিন্দা সম্পর্কে আলোচনা

হে প্রিয়, আল্লাহ তোমাকে তাঁর মারিফত দান করুন। জেনে রাখো, এক দল মানুষের মতে নফসের ভেতরে একটি গুণ আছে; সেটিই খাহেশ তথা কামনা। আর আরেক দলের মতে, খাহেশের প্রকাশই হাওয়ার নাম।

যেমন রুহের জন্য আকল আছে, আর রুহের জুহুর তথা প্রকাশই আকলি শক্তি নামে পরিচিত; তেমনিভাবে নফসের জন্য হাওয়া আছে, আর হাওয়ার প্রকাশই খাহেশ নামে পরিচিত।

সুতরাং নফসের দৃষ্টান্ত হলো দেহের মতো। আর হাওয়ার দৃষ্টান্ত হলো আকলের বিপরীত এক শক্তির মতো। অর্থাৎ বান্দার জন্য দুটি শক্তি রয়েছে। একটি আকলের দিক থেকে, আরেকটি হাওয়ার দিক থেকে।

যে ব্যক্তি আকলের শক্তিকে গ্রহণ করে, তার কাছে ইমান, হাল ও অন্তরের শক্তি প্রকাশ পায়; আর যে ব্যক্তি হাওয়ার শক্তিকে গ্রহণ করে, সে গোমরাহি, বিভ্রান্তি ও নফসের দাবির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তাই আসল কথা হলো— নফসকে চেনা জরুরি, কিন্তু নফসকে অনুসরণ করা হারাম। আর হাওয়াকে চেনা জরুরি, কিন্তু হাওয়ার দাস হওয়া ধ্বংসের পথ। শরিয়তের কাজ হলো আকলকে নুর দেওয়া, রুহকে জাগিয়ে রাখা এবং নফস ও হাওয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

হাওয়া গোমরাহকারী বস্তু। আকলবানদের জন্য এটি পরীক্ষা ও অবস্থানের জায়গা, আর আওলিয়াদের জন্য এটি এড়িয়ে চলার ক্ষেত্র। বান্দাকে এর বিরোধিতা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর অনুসরণ থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

لان مورد ركوبها هلك ومن خالفها ملك

কারণ যে তার সওয়ারিতে চড়ে বসে, সে ধ্বংস হয়; আর যে তার বিরোধিতা করে, সে মালিক হয়ে যায়।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—

وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ

আর যে ব্যক্তি নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নফসকে হাওয়া থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয় জান্নাতই তার ঠিকানা। সুরা নাজি‘আত, আয়াত: ৪০–৪১।

রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي اتِّبَاعُ الْهَوَىٰ وَطُولُ الْأَمَلِ

আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি খাহেশের অনুসরণ এবং দীর্ঘ আশা।

হজরত ইবনু আব্বাস (রা.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন—

أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلٰهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا

আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে নিজের খাহেশকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? আপনি কি তার ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন? সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৩।

অর্থাৎ সে এমন ব্যক্তি, যে আল্লাহর নাফরমানির কোনো খাহেশ সামনে এলেই সেটিকে নিজের খোদা বানিয়ে নেয়। সে তখন আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে নিজের খাহেশের আনুগত্যে লিপ্ত হয়।

নফসানি খাহেশের প্রকার:

সব নফসানি খাহেশ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো খুশির খাহেশ, যা দুনিয়ার স্বাদ, আরাম, ভোগ ও আরামপ্রিয়তার দিকে মানুষকে টেনে নেয়। এর ফলে নফস দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবে যায় এবং হকের পথ থেকে দূরে সরে যায়।

দ্বিতীয়টি হলো নেতৃত্ব, মর্যাদা, প্রাধান্য, প্রশংসা ও মানুষের ওপর কর্তৃত্বের খাহেশ। এটি প্রথমটির চেয়েও সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক। কারণ ভোগের খাহেশ অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারে, কিন্তু মর্যাদার খাহেশ অনেক সময় দ্বিন, ইবাদত, জ্ঞান বা সেবার রূপ ধরে আসে। তাই সালিকের জন্য জরুরি যে, প্রতিটি খাহেশকে শরিয়তের দাঁড়িপাল্লায় মাপা এবং নফসের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি রাখা।

কিন্তু অধিকাংশ মানুষের ভেতরে মর্যাদা, সম্মান ও নেতৃত্বের খাহেশ এত প্রবল হয়ে বসে যে, এর জন্য তাদের ভেতরে নানা ধরনের খাহেশের প্যাঁচ তৈরি হয়। নফসের এই খাহেশগুলো মানুষের জন্য ফিতনা। এগুলো মানুষকে বিপদে ফেলে। আমরা আল্লাহর কাছে হাওয়ার অনুসরণ থেকে আশ্রয় চাই।

যার ভেতরে নফসানি খাহেশ বেশি, সে অনেক দূরে থাকে। আর হকের কাছ থেকে দূরে থাকা, গোমরাহদের সঙ্গে একই পথের সঙ্গী হওয়া। যে মানুষের খাহেশ যত বেশি, তার দূরত্বও তত বেশি। আর হক তায়ালার যার যত কাছে, তার ভেতরে খাহেশ তত কম থাকে।

এক রাহিবের নফসের কাহিনি:

হজরত ইবরাহিম খাওয়াস (রহ.) বলেন, একবার আমি সফরে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল এক রাহিব। সে বহু বছর ধরে এক গির্জায় জুহদ ও রাহবানিয়্যতে মগ্ন ছিল। আমি অদৃশ্য থেকে আদেশ পেলাম, তুমি তার রাহবানিয়্যতের শর্ত পরীক্ষা করো।

আমি তাকে ওই গির্জা থেকে বের করে নিলাম। সে আমার সঙ্গে চলতে লাগল। কিছু সময় যাওয়ার পর ক্ষুধা তাকে কষ্ট দিতে লাগল। সে ক্ষুধার কথা বলল। আমি বললাম, হে ইবরাহিম, এখন আমি কোথায় গিয়ে তোমার জন্য কিছু আনব? এখানে তো বহু বছরের পথেও রাহবানিয়্যতের কোনো উপকরণ পাওয়া যায় না। বরং এটি এমন এক মরুভূমি, যেখানে পথিকেরা অনাহারে মারা যায়। অথচ তুমি এমন এক পথের যাত্রী, যেখানে সাধারণ মানুষের হাল বোঝা যায় না।

কিছুক্ষণ পর সে বলল, আমার এই কথাগুলো আল্লাহ তায়ালা জানেন। তিনি কাদির। চাইলে মরুভূমিতেই ক্ষুধার্ত মানুষকে রিজিক দিতে পারেন।

তারপর রবের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হলো, হে ইবরাহিম, ক্ষুধার্ত হয়ে থাকা ব্যক্তিকেও যখন তুমি সঠিক পথ দেখাও, তখন তার জন্য তা হেদায়েত হয়। এরপর আবার আমাকে বলা হলো, হে ইবরাহিম, তুমি কি মানুষের চাহিদা দেখে আগে নিজের চাহিদা ভুলে যাও? নাকি নিজের চাহিদার কারণে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে দেরি করো?

কারণ প্রতিদিনের ক্ষুধা মানুষের নফসানি খাহেশকে তার সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে রাখে, যেন সে সবসময় নিজের দিকেই ফিরে যায়। কিন্তু হকের পথের আদব হলো নিজের প্রয়োজনকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা এবং বান্দাদের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা রাখা।

ফেরেশতারা বান্দার অন্তর এবং বাতেনের ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত নাজিল হতে পারে না, যতক্ষণ তার স্বভাব, অন্ধকার ও খাহেশ ভেতরে প্রবল থাকে। বান্দার ভেতরে যখন খাহেশ, স্বভাবের অন্ধকার ও নফসের টান প্রবল থাকে, তখন শয়তানের আঘাত প্রবল হয়। সে অন্তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে নিজের অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে। এটি এমন অবস্থা, যাকে আল্লাহর ভাষায় বলা হয়েছে, وَعِبَادِي أَظْلَمَ – আমার বান্দারাই বেশি জুলুমকারী।

অর্থাৎ, মানুষ নিজের নফসের কারণে নিজের ওপরই জুলুম করে। তাই আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে শেষ পর্যন্ত অবকাশ দিয়েছেন এবং তার দ্বারা বান্দাদের পরীক্ষা প্রকাশ করেছেন। তবে আল্লাহ তাঁর খাস বান্দাদের ব্যাপারে শয়তানের ক্ষমতা নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ – নিশ্চয় আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই। সুরা হিজর, আয়াত: ৪২।

মূলত শয়তানও বান্দার নফসের হাকিকত থেকে পৃথক নয়। এ কারণেই রসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

وَمَا مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ غَلَبَهُ شَيْطَانُهُ إِلَّا عُمَرَ فَإِنَّهُ غَلَبَ شَيْطَانَهُ

প্রত্যেক মানুষের ওপর তার শয়তান প্রভাব বিস্তার করে; তবে উমর ব্যতিক্রম, কারণ উমর নিজের শয়তানকে পরাভূত করেছেন।

এই হাদিসে শয়তান বলতে নফসের ক্ষতিকর গোপন প্রবণতাকেও বোঝানো হয়েছে। তাই মানুষের ভেতরে যত স্বভাবগত অন্ধকার ও নফসানি খাহেশ থাকে, শয়তানের প্রভাবও তত শক্তিশালী হয়।

রসুলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন—

الْهَوَى وَالشَّهْوَةُ مَعْجُونَةٌ بِطِينَةِ ابْنِ آدَمَ

হাওয়া ও শাহওয়া আদম সন্তানের মাটির সঙ্গে মিশ্রিত।

অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টিগত গঠনের ভেতরেই খাহেশ ও প্রবৃত্তির উপাদান আছে। তাই এগুলোকে অস্বীকার করে নয়; বরং শরিয়ত, মুজাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছেন—

দীর্ঘ সময় খাহেশ ত্যাগ করলে একসময় খাহেশই মানুষকে ত্যাগ করে যায়।

হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহ. বলেন—

الوصل قال ترك ارتكاب الهوى

হকের সঙ্গে মিলনের পথ হলো হাওয়ার অনুসরণ ছেড়ে দেওয়া।

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হকের কাছে পৌঁছাতে চায়, তার জন্য প্রথম শর্ত হলো নিজের খাহেশকে সিদ্ধান্তের আসন থেকে নামিয়ে দেওয়া। কারণ হাওয়া যতক্ষণ অন্তরে শাসন করে, ততক্ষণ রুহের নুর পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় না।

যে ব্যক্তি হক তায়ালার মিলন চায়, তার জন্য জরুরি হলো— সে নিজের খাহেশের বিরোধিতা করবে। কারণ বান্দা কোনো ইবাদতের মাধ্যমে ততটা নৈকট্য লাভ করে না, যতটা লাভ করে হাওয়ার বিরোধিতার মাধ্যমে। হাওয়ার বিরোধিতা করা অত্যন্ত বড় কাজ। কারণ আদমির জন্য নিজের ভেতরের খাস কামনা ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে কঠিন। তাই তার জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হলো নিজের খাহেশের বিরোধিতা করা।

খাহেশের ওপর পা রাখা:

হজরত জুননুন মিসরি (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে নামাজে দুলছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই অবস্থা কীভাবে হলো? সে বলল, আমি নিজের নফসের ওপর পা রেখে হাওয়ায় চলে যাচ্ছি।

হজরত মুহাম্মদ ইবনু আলি (রহ.) বলেন, আমাকে সেই মানুষ বিস্মিত করে, যে ক্ষতিকর খাহেশের জন্য ঘর বানায় এবং তার জিয়ারত করে। অথচ সে নিজের নফসকে নিজের পায়ের নিচে রাখে না, যাতে হক তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং তাঁর দিদার লাভ করতে পারে।

নফসানি খাহেশ:

নফসের সবচেয়ে বড় সিফাত হলো শাহওয়া তথা প্রবল কামনা। শাহওয়া থেকেই মানুষের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা ধরনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব প্রভাবের কারণে তাকে কষ্ট দেওয়া হয়। কারণ প্রতিটি অঙ্গের শাহওয়া আলাদা।

চোখের শাহওয়া হলো দেখা। কানের শাহওয়া হলো শোনা। নাকের শাহওয়া হলো ঘ্রাণ নেওয়া। মুখের শাহওয়া হলো কথা বলা। পেটের শাহওয়া হলো খাওয়া। যৌনাঙ্গের শাহওয়া হলো কামনা পূরণ। পায়ের শাহওয়া হলো চলা। হাতের শাহওয়া হলো ধরা। এভাবেই প্রত্যেক অঙ্গের নিজস্ব শাহওয়া আছে।

তাই সালিকের জন্য জরুরি— সে প্রত্যেক অঙ্গের খেয়াল রাখবে এবং রাতদিন তার হেফাজত করবে। যতক্ষণ না সে নিজের খাহেশকে দমন করে, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হক তায়ালার আদেশের অধীন করে, ততক্ষণ সে হাওয়ার প্রভাব থেকে নিরাপদ নয়।

অনেক সময় বান্দা সাধারণ অঙ্গকে তো পবিত্র রাখে, কিন্তু বাতেনি খাহেশের কারণে বারবার দূরে সরে যায়। কারণ যে শাহওয়া চোখে ছড়িয়ে পড়ে, তা মানুষকে হারামের দিকে টানে। আর যে শাহওয়া কান, জিহ্বা, হাত-পা বা পেটের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও বান্দাকে নিজের আনুগত্যে ব্যস্ত করে ফেলে।

তাই বান্দার উচিত, নফসকে আনুগত্যের পথে কঠোরভাবে বেঁধে রাখা এবং প্রত্যেক অঙ্গকে শরিয়তের সীমার মধ্যে রাখা। কারণ যে অঙ্গ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, সেটি নুরের পথ খুলে দেয়; আর যে অঙ্গ খাহেশের পেছনে চলে, সেটি বারবার দূরে সরে যায়। তাই তার সাধনার পদ্ধতি হলো একেবারে অবিরত ও পূর্ণভাবে তাকে রিয়াজতের অধীন রাখা।

মাকামে গাইরত:

হজরত আবুল আব্বাস নুরি (রহ.) বলেন, আমি একদিন জামে মসজিদে ছিলাম। সুন্নত অনুযায়ী আসা ব্যবহার করছিলাম। মনে মনে বললাম, আমার ওপর আবুল আব্বাস নুরির তাসররুফ এবং তার সব কথা বেদাতের দিক থেকে আসে। হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনলাম, হে আবুল আব্বাস, আমরা তোমার রাজ্যে তাসররুফ করছি। তুমি আমাদের কোনো অঙ্গকে আমাদের স্মরণ থেকে বেশি মনে করো না। আমি নিজের ইজ্জতের কসম করে বলছি, যদি তুমি তোমার জাহেরি কোনো অঙ্গকে শাহওয়ার কাজে লাগাও, তাহলে আমি তোমার অন্তরকে শাহওয়ার দিকে ফিরিয়ে দেব।

এ কথার মর্ম এমন—

تبتغي الاحسان دع احسانك
اترك بخشي الله ريحانك

তুমি ইহসান খুঁজছ; আগে নিজের ইহসান-দাবি ছেড়ে দাও।
আল্লাহর ভয়েই তোমার সব সুগন্ধি ও আরাম ছেড়ে দাও।

বান্দার জন্য জরুরি— সে নিজের শরীরের কোনো অংশকে স্বাধীনভাবে খরচ না করে। বরং প্রতিটি অঙ্গকে ইলাহি হুকুম, শরিয়তের আদব এবং হকের স্মরণের অধীন রাখবে। কারণ নিজের তাসররুফ ও ইচ্ছার মাধ্যমে অঙ্গে অঙ্গে পরিবর্তন ও খারাপি জন্ম নেয়।

হাকিকতে যখন তাসলিম তথা নিজেকে সোপর্দ করার অবস্থা অর্জিত হয়, তখন বান্দা আল্লাহর হেফাজত ও ইসমতে প্রবেশ করে। আর বান্দার হেফাজত, রক্ষাব্যবস্থা ও গুনাহ থেকে বাঁচার বিষয় আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হয়ে যায়। কারণ আল্লাহর হেফাজতের তুলনায় নিজের হেফাজত দুর্বল ও অস্থায়ী।

لان نفي الذباب بالمكنسة أيسر
من نفيه بالمذبّة

কারণ মশা-মাছি ঝাড়ু দিয়ে সরানো হাতপাখা দিয়ে সরানোর চেয়ে সহজ।

অতএব আল্লাহর হেফাজত সব অনিষ্ট থেকে বাঁচায়। আর নিজের আকল ও ব্যবস্থাপনার ওপর ভরসা করে দূরে সরাতে চাইলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। আর এই সিফাতেও বান্দা আল্লাহর শরিক নয়। এর ইঙ্গিত হলো— বান্দা নিজের রাজ্যে কোনো তাসররুফ করতে পারে না, যতক্ষণ না ইলাহি ইসমত ও তাকদির তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করে।

বরং ইলাহি হাকিকত এমন যে, বান্দার সব দান, সব ক্ষমতা এবং সব উপায় শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়। বান্দা নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে চেষ্টা করে, সেটিও আসলে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরের অধীন।

বান্দা অনেক সময় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের মাধ্যমে ইলাহি তাকদিরকে বদলাতে চায়, অথবা তাকদিরের বিপরীতে নিজের জন্য অন্য কোনো পথ বানাতে চায়। অথচ দুই অবস্থাতেই বিষয়টি একভ। চেষ্টার দ্বারা তাকদির বদলানো যায় না, আর তাকদির ছাড়া কোনো কাজও সংঘটিত হয় না।[5]

আবু তালেব মক্কি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

আবু তালেব মক্কি নফসের চারটি মূল সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। দুর্বলতা, কৃপণতা, লালসা ও অজ্ঞতা। এগুলো থেকেই জন্ম নেয় রাগ, ভয়, লোভ ও মূর্খতা। তিনি নফসের চিকিৎসাকে রোগীর চিকিৎসার মতো বলেছেন। আগে ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে রাখা, তারপর ধীরে ধীরে সুস্থ করা। এক বুজুর্গের ছাগলের মাথার ঘটনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বিশ বছরের পুরোনো নফসের চাহিদাকেও চেনা ও দমন করা সম্ভব।

নফসের শুরু ও পরীক্ষা:

ক্ষতি শুরু হয় বিরোধিতা থেকে, আর বিরোধিতা শুরু হয় নফস থেকে। নফস মানুষের স্বভাবের মধ্যেই রাখা হয়েছে। তাই আল্লাহ নফসকে পরীক্ষা করেন— সে কি নিজের রবের দিকে ফিরে আসে এবং নিজের শক্তি-সামর্থ্যকে আনুগত্যে প্রকাশ করে, না কি অবাধ্যতায় প্রকাশ করে।

আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি এভাবে বলেছেন, وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ – তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২। অর্থাৎ তোমরা তাঁর দরবারে আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের অবস্থায় উপস্থিত হও। তাই তোমরা এ দোয়া করো, رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ – হে আমাদের রব, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং আমাদের মুসলমান অবস্থায় মৃত্যু দিন। সুরা আরাফ, আয়াত: ১২৬।

আল্লাহ তায়ালা যেমন বলেছেন, وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا – মানুষ বড় তাড়াহুড়াপ্রবণ। সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১১।

আর এক জায়গায় ইঙ্গিত করে বলেছেন, خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ – মানুষকে তাড়াহুড়াপ্রবণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭।

এরপর তিনি সতর্ক করে বলেছেন, سَأُرِيكُمْ آيَاتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ – আমি তোমাদের আমার নিদর্শন দেখাব; তাই তোমরা আমার কাছে তাড়াহুড়া কোরো না। সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭।

অর্থাৎ মানুষ স্বভাবগতভাবে তাড়াহুড়া করে। কিন্তু আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন— নিজের নফসের তাড়নায় চলবে না; বরং ধৈর্য ধরবে, আনুগত্য করবে এবং আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করবে।

অন্য জায়গায় বলেছেন, أَتَى أَمْرُ اللهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوهُ – আল্লাহর হুকুম এসে গেছে; তাই তা নিয়ে তাড়াহুড়া কোরো না। সুরা নাহল, আয়াত: ১।

আল্লাহ তায়ালা এখানে নফসের স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। নফস তাড়াহুড়াপ্রবণ, তাই আল্লাহ তাকে তাড়াহুড়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

কিন্তু এরপর আল্লাহ নফসকে তার তাড়াহুড়ার স্বভাব থেকে একেবারে বঞ্চিত করেননি। বরং নফস যখন নিজের ইচ্ছা থেকে বের হয়ে আল্লাহর হুকুমের সামনে শান্ত হয়, এবং তাড়াহুড়ার পর্দা তার সামনে থেকে সরে যায়, তখন তার তাড়াহুড়াও জায়েজ ও উপকারী কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

এর কারণ হলো, নফস যদি নিজের প্রবৃত্তির চাপে তাড়াহুড়া করে, তাহলে তা ভুলের কারণ হয়। কিন্তু যদি সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ইহসানের আশায় দ্রুত এগিয়ে যায়, আর মহান চরিত্র অর্জনের জন্য তৎপর হয়, তাহলে এই তাড়াহুড়া ভালো। তখন তা আজমায়িশ ও পরীক্ষার কারণ হয় না।

কারণ পরীক্ষার আসল কারণ হলো নফসের স্বভাবের বিরোধিতা করা। নফসের গুণাবলির মধ্যেও পার্থক্য আছে। যখন কোনো গুণের মধ্যে স্বাভাবিক সীমা ও ভারসাম্য থাকে, তখন তা কল্যাণের কারণ হয়। কিন্তু সেই গুণই যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা অস্থিরতা ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যেমন চোখ দেখার কারণ, জিহ্বা কথা বলার কারণ, কান শোনার কারণ। এগুলো সবই আল্লাহর নেয়ামত। কিন্তু এগুলো যদি ভুল পথে ব্যবহৃত হয়, তখন নফসের চাহিদা জেগে ওঠে। সেই চাহিদা থেকে গুনাহের কারণ তৈরি হয়। আর গুনাহ হলো এমন আগুন, যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াতে শাস্তি পায়, অথবা আল্লাহ চাইলে দুনিয়ার সেই আগুন বন্ধ করে তাকে তাওফিক দেন; আর আখিরাতে ক্ষমা করে দেন।

আরিফের গুনাহ থেকে ঘৃণা এবং ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা:

কখনো কোনো আরিফ বান্দার সামনে দুনিয়ার আগুনের চেয়েও ভয়ংকর এক আগুন প্রকাশ পায়। যেমন কাউকে বলা হয়, “তুমি আগুনে প্রবেশ করো।” এ কথা তার জন্য সহজ হতে পারে। কিন্তু যদি তাকে বলা হয়, “তোমার ব্যক্তিত্বে নফসের কোনো গুণ প্রকাশ করো” তখন তা তার কাছে আগুনে প্রবেশ করার চেয়েও কঠিন মনে হয়।

সেই আরিফের এই ঘৃণার কারণ বুঝিয়ে বলা হয়েছে; কারণ তার ব্যক্তিত্বে মহান আল্লাহর বিরোধিতা ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায়। অথচ জাহান্নামের আগুনে আল্লাহর কুদরত ও প্রতিশোধের প্রকাশ দেখা যায়। আরিফ যেন বলছে, “হে আমার রব, আপনার নাফরমানি আমার কাছে আগুনে জ্বলবার চেয়েও কঠিন।”

একজন আহলে ইয়াকিন ব্যক্তির একটি কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলতেন, “আমার কাছে নামাজ আদায় করা জান্নাতে প্রবেশ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।” যখন জিজ্ঞেস করা হলো, এর কারণ কী, তখন তিনি উত্তর দিলেন, “কারণ নামাজ ও ইবাদতে থাকে আমার রবের সন্তুষ্টি। আর জান্নাতে যাওয়ার মধ্যে থাকে আমার নিজের ইচ্ছা ও আনন্দ। আমার কাছে নিজের আনন্দের চেয়ে আমার রবের সন্তুষ্টি অনেক বেশি প্রিয়।”

হজরত সাইয়্যিদুনা ওয়াহিব ইবনে ওয়ারদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তাঁকে বলা হলো, “আপনি কি জানেন, যখন আপনি কোনো কাজের আসল উদ্দেশ্য জেনে ফেলেন, তখন জানেন সেটি কোথা থেকে আসে?”

তিনি বললেন, “আপনি কি আপনার মাকে দেখেননি? তিনি কি আপনাকে বলেননি যে, যদি আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তাহলে আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দেবেন?”

তিনি বললেন, “তাহলে আপনি কী বলেছিলেন?”

তিনি বললেন, “আমি তাঁকে বলেছিলাম, যে কাজ আমি করি না, তার কারণে আল্লাহ কেন আমাকে মাফ করবেন?”

তখন তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”

তিনি বললেন, “আমি চাই না, আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় দাঁড়াই যে, আমার মা আমার জন্য মাগফিরাত চাইছেন, অথচ আমি নিজে সেই মাগফিরাতের উপযুক্ত কাজ করছি না।”

নফসের আসল গুণ:

নফসের সব দোষ মূলত দুই জিনিস থেকে জন্ম নেয়: রাগলোভ। কঠোরতা ও ঝগড়াটে স্বভাব রাগ থেকে আসে। আর লোভ জন্ম নেয় লালসা থেকে। এই দুই প্রবণতা মানুষের নফসের মধ্যেই থাকে।

মানুষ রেগে গেলে তার ভেতরে এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়। মনে হয় বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা ওপরে উঠছে। শরীর হালকা লাগে, মেজাজ গরম হয়ে যায়, কথা কঠোর হয়, আচরণেও তেজ দেখা দেয়।

লোভের অবস্থা এর বিপরীত। মানুষ যখন কোনো জিনিস পেতে চায়, তখন তার মন সেই জিনিসের দিকে ঝুঁকে যায়। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি তখন তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে নিজের শক্তি ও চেষ্টা সেই জিনিস পাওয়ার পেছনে ব্যয় করতে চায়।

যদি সেই জিনিস পাওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে, তাহলে মানুষ সরাসরি তা পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যদি মাঝখানে কোনো বাধা আসে, তখন সেই বাধা সরানোর জন্য তার ভেতরে রাগ জন্ম নেয়।

তাই ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, লোভ জন্ম নেয় কোনোকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। আর রাগ জন্ম নেয় সেই আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা এলে। অর্থাৎ মানুষ কোনোকিছু পেতে চাইলে লোভ কাজ করে। আর সেই চাওয়ার পথে বাধা এলে রাগ প্রকাশ পায়।

নফসকে শুদ্ধ করতে হলে তাই আগে এই দুই দিক বুঝতে হবে। কোন জিনিসের প্রতি লোভ জাগছে, আর কোন বাধার কারণে রাগ উঠছে।

মাকামে ফিকর:

দুনিয়ার মোহ পাপের কারণ। আর আল্লাহর আনুগত্য আখিরাত গড়ার কারণ। তাই বলা হয়েছে, দুনিয়াকে ভালোবাসা সব গুনাহের মূল, আর আল্লাহভীতি ও দুনিয়াবিমুখতা সব নেক কাজের মূল।[6]

একটু ভাবুন। হজরত আদম আলাইহিস সালাম একটি পরীক্ষার কারণে জান্নাত থেকে বের হয়ে দুনিয়ায় এসেছিলেন। আর আমরা এত গুনাহ করার পরও জান্নাতে যেতে চাই! অথচ গুনাহের ভারে আমাদের অবস্থা এমন যে, জান্নাতের দিকে তাকানোর শক্তিও যেন থাকে না।

এক বর্ণনায় আছে, সব নবীর নেতা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইমান পোশাকহীন। তার পোশাক তাকওয়া, তার সৌন্দর্য লজ্জা, আর তার ফল ইলম।[7]

এ কারণেই বলা হয়েছে, জান্নাত পবিত্র জায়গা। সেখানে পবিত্র মানুষ ছাড়া কেউ থাকবে না। তাই যখন তোমরা পাপ থেকে পবিত্র হবে, তখনই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ يَقُولُونَ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ – পবিত্র অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের রুহ কবজ করে, তারা তাদের বলে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। সুরা নাহল, আয়াত: ৩২।

আল্লাহ আরও বলেছেন, وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ – জান্নাতের প্রহরীরা তাদের বলবে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা পবিত্র হয়েছ। তাই চিরদিন থাকার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করো। সুরা যুমার, আয়াত: ৭৩।

কারণ আল্লাহ বলেছেন, وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ – আর আদন জান্নাতে রয়েছে পবিত্র বাসস্থান। সুরা তাওবা, আয়াত: ৭২। যেহেতু গুনাহ অপবিত্র, তাই আল্লাহ বলেছেন, وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ – তিনি তাদের জন্য অপবিত্র জিনিস হারাম করেন। সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭।

তোমরা যখন পাপ থেকে পবিত্র হবে, তখন জান্নাতও তোমাদের জন্য পবিত্র হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বিষয়টি এভাবে বলেছেন, الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ – অপবিত্র নারীরা অপবিত্র পুরুষদের জন্য, আর অপবিত্র পুরুষরাও অপবিত্র নারীদের জন্য। পবিত্র নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য, আর পবিত্র পুরুষরাও পবিত্র নারদের জন্য। সুরা নুর, আয়াত: ২৬।

নফসের চিকিৎসার উদাহরণ:

কোনো কোনো আলেম বলেছেন, নফসের চিকিৎসা রোগীর চিকিৎসার মতো। যেমন কোনো রোগী অসুস্থ হলে আগে তাকে ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে রাখা হয়। এরপর তাকে ওষুধ দেওয়া হয়, যেন সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।

ধরুন, কেউ বেশি খাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার চিকিৎসা হলো— আগে কিছু সময় তাকে খাবার থেকে বিরত রাখা হবে। এরপর তার শরীরের উপযোগী ওষুধ দেওয়া হবে। এভাবে তার প্রয়োজন পূরণ হবে এবং সে নিরাপদে সুস্থতার দিকে ফিরবে।

নফসের চিকিৎসাও এমন। যখন নফস গুনাহের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন প্রথম কাজ হলো তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখা। এরপর আনুগত্য, নেক আমল ও আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে তাকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলা।

মানুষ রেশম পোকার মতো:

হেকিমরা মানুষকে রেশম পোকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ রেশম পোকা নিজের মুখের লালা দিয়ে নিজের চারপাশে সুতা বুনতে থাকে। বুনতে বুনতে এক সময় সে নিজেই সেই সুতার ভেতর আটকে যায়। তখন আর বের হওয়ার পথ পায় না। শেষে সেই খোলসই তার মৃত্যুর কারণ হয়।

মানুষের অবস্থাও অনেক সময় এমন হয়। সে নিজের সম্পদ, পরিবার, সন্তান ও দুনিয়ার জিনিসপত্র নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, ধীরে ধীরে এগুলোই তাকে ঘিরে ফেলে। এক সময় সে এগুলোতে বন্দি হয়ে যায়।

কখনো কখনো মানুষ নিজের সম্পদ আর পরিবারের কারণে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। অথচ এই সম্পদ ও পরিবার তার জন্য পরীক্ষা। এগুলোর হিসাবও তাকে দিতে হবে।

তাই যার ভাগ্যে ভালো লেখা আছে, সে নিজের সম্পদ, পরিবার ও দুনিয়ার উপকরণকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করে। আর যে গাফেল হয়ে যায়, সে এগুলোর ভালোবাসায় আটকে পড়ে।

সে বুঝতেই পারে না— যে জিনিসগুলোকে সে নিজের নিরাপত্তা ও সুখের কারণ ভাবছে, সেগুলোই একদিন তার জন্য হিসাব, কষ্ট ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অথবা নিজের উপার্জন অন্যদের খাওয়াতে খাওয়াতে সে নিজেই গরিব হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্যদের জন্য জীবন কাটাবে, আর নিজের হিসাবের বোঝা অন্যদের মাঝে পড়ে থাকবে।

নফসের চিকিৎসার ঘটনা:

হজরত সাইয়্যিদুনা আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর একটি ভ্রমণের কথা লিখেছেন। তিনি বলেন—

আমাদের এক বুজুর্গ ভ্রমণে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে নফসের চিকিৎসা নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে। আমরা একদিন এক ছাগলের মাথা কিনলাম। তিনি সেটি হাতে নিয়ে চলছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি সেটি একটি জায়গায় রেখে দিলেন। এরপর আবার তুলে নিলেন। আবার কিছুদূর যাওয়ার পর রেখে দিলেন।

এভাবে তিনি বারবার সেটি হাতে নিচ্ছিলেন, আবার রেখে দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, “আপনি কেন এমন করছেন? আমরা তো সবাই মিলে এটি খাবো। আপনি একাই এভাবে কষ্ট করছেন কেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমাদের না খাওয়ালে তোমরা খাবে না।” আমি বললাম, “আমরা খাব, আপনি না দিলে অন্যভাবে খেয়ে নেব।”

এরপর তিনি সেটি রেখে চলে গেলেন। আমরা তা ছাড়া অন্য খাবার খেলাম।

এর কিছুক্ষণ পর আরেক লোক এসে বলল, “তোমরা যে ছাগলের মাথা ফেলে এসেছ, তার আসল ঘটনা কী জানো? গত রাতে এক ব্যক্তি সেটি রেখে গিয়েছিল। সে খুব গরিব ছিল, অভাবী ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে বলেছিল— এই মাথাটি আমার নফসের জন্য চাই না। আমি এটিকে কুরবত তথা আল্লাহর কাছাকাছি হওয়ার নিয়তে নিয়েছি। তাই আমি এটি তোমাদের জন্য কিনেছি।”

এই কথা শুনে সেই বুজুর্গ মাথাটি টুকরা টুকরা করে কুকুরদের খাওয়ালেন। তারপর কিছুদিন পর সেই বুজুর্গের সঙ্গে আবার দেখা হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি সেদিন ছাগলের মাথাটি রেখে দিয়েছিলেন কেন? ঘটনাটি কী ছিল?”

তিনি বললেন, “বিশ বছর ধরে আমার নফস ছাগলের মাথা খাওয়ার ইচ্ছা করছিল। কিন্তু যখন তোমরা সেটি খেতে চাইলে, তখন আমার নফসের সেই খাওয়ার বাসনা রোগে পরিণত হয়ে গেল। আমি আগেই বুঝে ফেলেছিলাম, এটা নফসের চাহিদা। তাই আমি তাকে খাবার দিলাম না। কিছু খারাপি আছে ভেবে নয়; বরং নফসের চাহিদার কারণে আমি তা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।”

আল্লাহ তায়ালা আপনাদের প্রতি রহম করুন। এখন দেখুন, এই বুজুর্গ কীভাবে নফসের চিকিৎসায় কোমলতা ও সূক্ষ্মতা বুঝেছিলেন।

অর্থাৎ, তিনি দুজনকে দেখলেন দুজনের চেহারা এক, কিন্তু পোশাকে ভিন্নতা। তাঁরা নিজেদের তাকওয়া ও নফসকে ক্ষতিকর খাবার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা দেখে অবাক হলেন। অথচ ওই ছাগলের মাথার মধ্যে নফসের জন্য যে অংশ ছিল, সেটি তাকওয়ার কারণেই বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বিষয়টি গভীরভাবে দেখলেন এবং বুঝলেন— এ ঘটনাটি আল্লাহ তাঁকে দেখিয়েছেন। বাকি যারা ছাগলের মাথা খেয়েছিল, তাদের বেলায় বিষয়টি ছিল আলাদা। কারণ তাদের খাওয়ার মধ্যে নফসকে দমন করার উদ্দেশ্য ছিল এবং সেই সঙ্গে দুনিয়া থেকে শেষবারের মতো কিছু নেওয়ার ভাবও ছিল।

নফসের স্বভাবগত ও অর্জিত চারটি গুণ:

নফসের স্বভাবগত ও অর্জিত গুণ চারটি।

নফসের কামনা-বাসনার মূল কারণ, এবং নফসের যে-সব বিষয় আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো এই চার গুণ থেকেই জন্ম নেয়—

১. দুর্বলতা
২. কৃপণতা
৩. লালসা
৪. অজ্ঞতা

দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয় ভীরুতা। কৃপণতা থেকে জন্ম নেয় কষ্টকর সংকীর্ণতা। লালসা থেকে জন্ম নেয় কঠিন চাহিদা ও আসক্তি। আর অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় বুদ্ধির দুর্বলতা ও মূর্খতা

পরীক্ষায় ফেলে দেওয়া চারটি গুণ:

নফসের এই চার গুণের কারণেই মানুষ পরীক্ষা ও বিপদে পড়ে।

১. প্রথম গুণ হলো রুবুবিয়্যাতের দাবি। অর্থাৎ মানুষ নিজের ভেতরে বড়ত্ব, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভাব পোষণ করে।

২. দ্বিতীয় গুণ হলো শয়তানি চরিত্রের প্রভাব। এখান থেকে ধোঁকা, কৌশল, হিংসা ও খারাপ গুণ প্রকাশ পায়।

৩. তৃতীয় গুণ হলো প্রাকৃতিক প্রয়োজনের প্রতি অতিরিক্ত টান। এর কারণে মানুষ খাওয়া, পান করা, ভোগ-বিলাস ও দুনিয়ার চাহিদার পেছনে ছুটে।

৪. চতুর্থ গুণ হলো দুর্বল গুণগুলোর একেকটি থেকে আলাদা আলাদা চাহিদা তৈরি হওয়া। যেমন ভয় থেকে আত্মরক্ষা ও পালানোর প্রবণতা জন্ম নেয়।

হজরত সাইয়্যিদুনা শায়খ আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর কিতাবে বলেছেন, এ কথা বোঝা জরুরি যে, “নফস” বলতে আসলে কী বোঝানো হয়।

আমরা সাধারণত নফস বলতে বুঝি— মানুষের ভেতরের এমন এক শক্তি, যা নড়াচড়া করে, ইচ্ছা করে, চায়, ভয় পায়, লোভ করে এবং নিজের দিকে টানে। এটি দেহের ভেতর আছে, কিন্তু চোখে দেখা যায় না।

প্রশ্ন হলো— নফস কীভাবে নড়াচড়া করতে পারে? জবাব হলো মালিক আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাকে শক্তি দেন। তিনি চাইলে নফসকে স্থিরও রাখতে পারেন। আবার চাইলে নফসকে এমন শক্তি দিতে পারেন, যার মাধ্যমে সে দেহের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং মানুষের কাজ-কর্মে প্রভাব ফেলে।

নফসানি পরীক্ষার সঙ্গে মুজাহাদার সম্পর্ক:

মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরি ইখলাসে পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে আগের চার গুণের সঙ্গে লেগে থাকা বিষয়গুলো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। যখন কোনো ভালো গুণ দৃঢ় হয়ে যায়, তখন তার মাধ্যমে মানুষ ওই চার গুণের পরীক্ষার ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়। এ কারণেই আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে একজন গুনাহগার মুমিনকে ক্ষমা করে দেওয়ার আনন্দ, অনেক সময় হাজার মানুষের সঙ্গে লেনদেনের ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার চেয়েও বেশি হয়।

কারণ সে এমন কাজ করে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যের দাবি পূরণ হয়। সে তখন এক বান্দাকে ক্ষমা করে, যখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করার সুযোগ দেন। এভাবে সে আল্লাহর গুণের ছায়ায় দাঁড়ায়।

এ কথা কীভাবে বোঝা যায়? যেভাবে কেউ আল্লাহর জন্য কাউকে অপছন্দ করতে পারে, আবার আল্লাহর জন্যই তাকে ভালোও বাসতে পারে। কারণ সে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে তাকায় না; বরং রবের দিকে তাকায়। তাই আল্লাহর জন্য যে অপছন্দ, সেটিও ইবাদত; আর আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসা, সেটিও ইবাদত।

যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদের সঙ্গে দয়া, ক্ষমা ও কোমল আচরণ করে, সে আসলে আল্লাহর রহমত ও রুবুবিয়্যতের গুণের ছায়ায় দাঁড়ায়। এ জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্রতা ও অপবিত্রতার প্রসঙ্গে বলেছেন, “পবিত্র থাকলে সে পবিত্র। আর অপবিত্র হলে অপবিত্র।” অর্থাৎ মানুষের বাহ্যিক অবস্থার মতো ভেতরের অবস্থারও প্রভাব আছে।[8]

তবে সব বান্দাই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا ۝ لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا

আসমান ও জমিনে যারা আছে, সবাই রহমানের সামনে বান্দা হয়ে উপস্থিত হবে। তিনি তাদের সবাইকে ঘিরে রেখেছেন এবং একজন একজন করে গণনা করে রেখেছেন। সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৩–৯৪।

নফস শয়তানের মতো আল্লাহর কুরব তথা নৈকট্যের কাছাকাছি থাকে; কিন্তু নিজের কামনা-বাসনা ও স্বার্থের কারণে আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে। তাই আল্লাহর বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন—

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

আর রহমানের বান্দারা জমিনে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে। সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩।

কোরআন করিমে বান্দাদের “রহমানের বান্দা” বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের নফস রবের দিকে ফিরে আসে, শান্ত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে রাজি থাকে। এরা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞান ও হিকমতের অধিকারী। আল্লাহ তাঁর ইলম তাঁদের থেকে গোপন রাখেননি; বরং তাঁদের জন্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।

আবদালে উন্নীত হওয়া:

মানুষ তখনই আবদালের মরতবায় পৌঁছতে পারে, যখন তার মধ্যে কিছু বিশেষ গুণ একসঙ্গে জমা হয়। সেগুলো হলো— রুবুবিয়্যতের গুণাবলি, উত্তম চরিত্র, শয়তানি স্বভাবের বিপরীত গুণ, সুষম মেজাজ এবং জোড়া জোড়া সৃষ্টির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। এসব জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং আবদালদের একজন হয়ে ওঠে।

নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদার পদ্ধতি:

হজরত সাইয়্যিদুনা শায়খ আবু তালিব মাক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নফসের চিকিৎসার একটি পদ্ধতি হলো: বান্দা নিজের নফসের জন্য একজন মালিকের মতো হবে। যখন নফস তাকে নিজের জন্য কিছু বানাতে বা পেতে বলে, তখন সে নফসকে বুঝিয়ে বলবে এবং সরাসরি তার দাবি মেনে নেবে না।

যদি তুমি নফসের জন্য কিছু করতে চাও, তাড়াহুড়া করবে না। আগে ভালোভাবে চিন্তা করবে। সহজ সুযোগ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে নফসের চাহিদা পূরণ করবে না।

যেমন তুমি যদি কোনো জিনিস পেতে চাও এবং সহজেই তা পাওয়ার সুযোগ থাকে, তবু সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। যদি তা তোমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তুমি তা পাবে। আর যদি তা তোমার জন্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে নিরাপদ থাকবে।

নফসকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর জন্য তাকে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তুমি যদি নফসকে তার চাহিদা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারো, তাহলে আগে সেই চাহিদার কারণগুলো বন্ধ করো। নফসের পেছনে চলার উপকরণগুলো কমিয়ে দাও।

সবচেয়ে আগে দরকার সাহস ও দৃঢ়তা। নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু ইচ্ছা করলেই হবে না; শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

যে চিন্তা অন্তরে আসে, সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে দৌড়াবে না। আগে থামবে, ভাববে, বিচার করবে। যদি বুঝতে পারো, চিন্তাটি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিয়ে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে তা কাজে পরিণত করবে।

আর যদি মনে হয়, এই চিন্তা তোমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে দূরে নিয়ে যাবে, তাহলে সেটিকে মনে জায়গা দেবে না। বরং সেই চিন্তাকে অন্য চিন্তায় বদলে দেবে, যেন তা তোমার ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে।[9]

পাঁচজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে নফস সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। নফস এমন এক সত্তা, যাকে না চিনলে আল্লাহকেও চেনা যায় না, আবার যাকে অনুসরণ করলে ধ্বংস অনিবার্য। কুশাইরি দেখিয়েছেন নফস আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি স্তর। সোহরাওয়ার্দি দেখিয়েছেন নফস পূর্ণতায় কীভাবে শ্বাসের সাথে স্থায়ী হয়ে যায়। ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন নফস বরজখের জগতের এক রহস্যময় সত্তা। দাতা গঞ্জে বখশ সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে নফসের চিকিৎসা, পরিচয় ও ইনসানে কামেলের সাথে তার সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। আর আবু তালেব মক্কি দেওয়া জীবন্ত উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, নফসের চাহিদাকে চেনাই মুজাহাদার প্রথম ধাপ। সবশেষে বলা যায়, নফস সুফি সাধনার সেই কেন্দ্রবিন্দু, যাকে না জেনে পথ চলা অন্ধকারে চলার মতো, আর যাকে জেনে মুজাহাদা করা মানে আল্লাহর দিকেযথাযতভাবে যাত্রা শুরু করা।