রুহ সুফি সাধনার সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়গুলোর একটি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, “রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত।” এবং এটুকুই যথেষ্ট মনে করে আর ব্যাখ্যা করেননি। অথচ এই রহস্যময় সত্তাকে ঘিরে যুগে যুগে মানুষ প্রশ্ন করেছে, বিতর্ক করেছে, ভুল পথে গেছে।
রুহ কি জীবন নিজেই, নাকি জীবনের কারণ? এটি কি ক্ষণস্থায়ী গুণ, নাকি স্বতন্ত্র সূক্ষ্ম সত্তা? এটি কি চিরন্তন, নাকি সৃষ্ট? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আহলে সুন্নতের মুহাক্কিক ওলামাদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। তবে সব মনীষীই একমত যে, রুহ অনাদি নয়, সৃষ্ট। আর এই সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া— যেমন হিন্দু, নাসারা ও জন্মান্তরবাদীরা করেছে; সবচেয়ে বড় ভুলের মধ্যে পড়ে।
রুহকে চেনার এই যাত্রা শুধু ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেকে চেনার মধ্যেই রবকে চেনার পথ লুকিয়ে আছে। আর রুহের চার স্তর জিসমানি, রওয়ানি, সুলতানি ও কুদসি পার হয়ে সাধক আল্লাহর নুরের সাক্ষাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন।
ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইমাম কুশাইরি রুহ সম্পর্কে মতভেদ উল্লেখ করে সুপ্রতিষ্ঠিত মত দিয়েছেন— রুহ স্বয়ং জীবন নয়, বরং দেহে গচ্ছিত এক সূক্ষ্ম সত্তা, যার উপস্থিতিতে আল্লাহ দেহে জীবন বজায় রাখেন। মানুষ রুহ ও শরীরের সমন্বিত রূপ। হাশরে পুনরুত্থান এই সামগ্রিক সত্তারই হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা রুহসমূহ সম্পূর্ণ সৃষ্ট; যে রুহকে চিরন্তন দাবি করে, সে বিরাট ভুলে আছে।
তিনি বলেন, আহলে সুন্নতের মুহাক্কিক ওলামাদের নিকট রুহের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
একাংশের মতে, রুহ হলো স্বয়ং জীবন। তবে এর বিপরীতে সুফি গবেষকদের সিদ্ধান্ত হলো, জীবন মূলত একটি সাময়িক গুণ বা আরজ, যা দুই সময়কাল পর্যন্ত স্থায়ী হয় না; আর মুহাক্কিকদের নিকট এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত।
আবার অনেকের মতে, রুহ মূলত মানবদেহের অবয়বে গচ্ছিত আইয়ান তথা এক সুনির্দিষ্ট সূক্ষ্ম সত্তা। যতক্ষণ রুহ শরীরে অবস্থান করে, ততক্ষণ আল্লাহ তায়ালা তাঁর স্বাভাবিক নিয়মে দেহে জীবন বজায় রাখেন।
অতএব, মানুষ জীবনের কারণেই জীবিত থাকে, আর রুহ গচ্ছিত থাকে শরীরের ভেতরে। ঘুমন্ত অবস্থায় রুহের এক প্রকার তারাক্কি ঘটে এবং শরীর থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তা আবার শরীরে ফিরে আসে।
নিশ্চয় মানুষ রুহ ও শরীরের এক সমন্বিত রূপ; কারণ আল্লাহ তায়ালা এই সামগ্রিক কাঠামোর একটি অংশকে অন্য অংশের অনুগত করে দিয়েছেন। তাই হাশরের ময়দানে পুনরুত্থান এই সামগ্রিক সত্তারই হবে এবং সওয়াব কিংবা আজাবও এই সামগ্রিক সত্তাই ভোগ করবে।
রুহসমূহ সম্পূর্ণ মাখলুক বা সৃষ্ট সত্তা। সুতরাং কেউ যদি রুহকে চিরন্তন দাবি করে, তবে সে এক বিরাট ভুলের মধ্যে রয়েছে।
এই বিষয়ে ইমাম সিরাজ তাঁর ‘আল-লুমাহ’ কিতাবের ৫৫৫ পৃষ্ঠায় স্পষ্ট করেছেন যে, সঠিক সিদ্ধান্ত হলো রুহ সৃষ্টিজগতেরই অংশ এবং এটি আল্লাহর একটি বিশেষ নির্দেশ মাত্র, যার সাথে মহান আল্লাহর সৃষ্টির সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোনো সংযোগ বা অনুপাত নেই।
সমস্ত আখবার এই স্পষ্ট প্রমাণই দেয় যে, রুহসমূহ হলো অই্যানে লতিফা তথা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সত্তাবিশেষ।[1]
ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
ইবনে আরাবি রুহকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। রুহুল ইয়া ও রুহুল আমর। রুহুল ইয়া হলো সেই রুহ যা আল্লাহ আদমে ফুঁকে দিয়েছেন এবং নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন সম্মানের জন্য। রুহুল আমর হলো “রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত” এই আয়াতের রুহ। তিনি দেখিয়েছেন, অলিরা ফেরেশতাদের দেখতে পেলেও জ্ঞান সঞ্চারের মুহূর্তে দেখতে পান না। এই পার্থক্যেই নবী ও অলির মধ্যে ভেদ। আল্লাহ নবুয়তের দরজা বন্ধ করেছেন, কিন্তু অলিদের অন্তরে বিধানের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান পৌঁছানোর পথ বন্ধ করেননি। প্রদীপের সলতের উপমায় তিনি বুঝিয়েছেন— প্রস্তুত অন্তরে যেভাবে ঊর্ধ্বের আলো প্রতিফলিত হয়, তেমনি যোগ্য অন্তরে ইলাহি জ্ঞান অবতীর্ণ হয়। নবুয়ত চেষ্টা দিয়ে অর্জনযোগ্য নয়; এটি লাওহে মাহফুজেই নির্ধারিত।
الروحُ روحانِ روحُ الياءِ والأمرِ وَالْحُكْمُ يَثْبُتُ بَيْنَ النَّهْيِ وَالأَمْرِ
রুহ মূলত দুই প্রকার, রুহুল ইয়া এবং রুহুল আমর; আর এদের বিধান আদেশ ও নিষেধের মাঝেই সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে।
وَمَا سِوَاهُ فَأَخْبَارٌ مُنَبِّئَةٌ أَنَّ الْكَوَائِنَ بَيْنَ السِّرِّ وَالْجَهْرِ
এ ছাড়া অন্য যা কিছু তা কেবল খবর বা তথ্য, যা জানায় যে সমস্ত সৃষ্টিজগৎ প্রকাশ ও গোপনীয়তার মাঝে রয়েছে।
وَعَالَمُ الْبَرْزَخِ الأَعْلَى يُخَلِّصُهُ عِنَايَةٌ حَالُهُ مِنْ قَبْضَةِ الأَسْرِ
আর উচ্চতর বরজখ জগতের বিশেষ দয়া বা অনুগ্রহ সাধকের অবস্থাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেয়।
আল্লাহ তায়ালা ‘সুরা আশ-শুরা’র ৫২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا – আর এভাবেই আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রুহ ওহি করেছি।
‘সুরা গাফির’র ১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ – তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহ অবতীর্ণ করেন।
‘সুরা আশ-শুয়ারা’র ১৯৩ ও ১৯৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন,نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ – তা নিয়ে আপনার অন্তরে রুহুল আমিন অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। এখানে মূলত সতর্ক করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে আল্লাহর এই বাণীতেও রয়েছে, يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ لِيُنْذِرَ – তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহ অবতীর্ণ করেন যেন তিনি সতর্ক করতে পারেন।
‘সুরা আন-নাহল’র ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, يُنَزِّلُ الْمَلَائِكَةَ بِالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ أَنْ أَنْذِرُوا – তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ থেকে রুহসহ ফেরেশতাদের অবতীর্ণ করেন এই মর্মে যে, তোমরা সতর্ক করো।
সুতরাং এই সবকিছুই মূলত মানুষকে জানানোর উদ্দেশ্যে এসেছে। তবে এর মধ্যে এক ধরনের শাসন বা ধমকের ভাব রয়েছে, কারণ এখানে জানানোর বিষয়টি ‘ইনজাল’ তথা অবতরণ শব্দের মাধ্যমে বলা হয়েছে। তাই এটি শাসনের মাধ্যমে জানানো, যেহেতু রসুল হলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। আর আগে থেকে না জানিয়ে তো সুসংবাদ দেওয়া যায় না।
অতএব, আত্মিক অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে শাসন ও ভয়ের দিকটিই প্রধান থাকে; কারণ মানুষের নফসের মধ্যে এমন এক প্রশান্তি তৈরি হয়, যা রসুল প্রেরণের মূল কারণকে জরুরি করে তোলে। যেন রসুলগণ তাদের জানিয়ে দেন যে, তারা এই দুনিয়া থেকে আখিরাতের দিকে ফিরে যাবে এবং নিজেদের নফসের দিক থেকে আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।
আর আমাদের ‘রুহুল ইয়া’ বলার কারণ হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী, وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي – এবং আমি তার মধ্যে আমার রুহ হতে ফুঁকে দিয়েছি। সুরা আল-হিজর, আয়াত: ২৯।
এখানে ইয়া হরফ দিয়ে নিজের দিকে রুহকে সম্বন্ধ করা মূলত তাশরিফ তথা বিশেষ সম্মান দেওয়ার মাকামকে নির্দেশ করে। এর অর্থ হলো, তোমার উৎস অত্যন্ত সম্মানিত, তাই তুমি তোমার মূল উৎস অনুযায়ীই কাজ করো, হীন ও নিকৃষ্টদের মতো আচরণ করো না।
আর ‘রুহুল আমর’ বলতে আল্লাহর এই বাণীকে বোঝায়, وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ – এবং তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।
অর্থাৎ, রুহ কোথা থেকে এসেছে? তখন তাকে বলা হলো, قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي – বলুন, রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত। সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮৫।
সুতরাং, কেউ কেউ যেমনটি মনে করেছেন যে, এটি রুহের মাহিয়াত তথা তার আসল সত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। কারণ তারা রুহ কী বা কেমন তা জিজ্ঞেস করেনি, যদিও এই শব্দের গঠনে সেই অর্থ প্রকাশের একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমরা এখানে যে অর্থটি গ্রহণ করেছি, তার সপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো উত্তরের এই অংশটি যেখানে বলা হয়েছে ‘আমার রবের নির্দেশ ঘটিত’ এবং সেখানে রুহের কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অতএব, গায়েবি জ্ঞানসমূহ এই রুহানি শক্তির মাধ্যমেই বান্দাদের অন্তরে অবতীর্ণ হয়। সুতরাং, যে ব্যক্তি এদের চেনে, সে আদবের সাথে তাদের গ্রহণ করে এবং আদবের সাথেই তাদের থেকে জ্ঞান লাভ করে। আর যে ব্যক্তি এদের চেনে না, সে গায়েবি বার্তা পেলেও কার কাছ থেকে তা আসছে তা জানতে পারে না; যেমনটি গণক, জ্যোতিষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তি, মনের খেয়ালি ভাবনার অনুসারী এবং সাধারণ ইলহামপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
তারা নিজেদের অন্তরে সেই জ্ঞানটি পেয়ে যান, কিন্তু কে তা নিয়ে এসেছে তা জানে না। তবে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁদের অন্তরে রুহের অবতরণ প্রত্যক্ষ করেন, যদিও তাঁরা অবতীর্ণ হওয়া ফেরেশতাকে দেখতে পান না; অবশ্য যার ওপর তা অবতীর্ণ হচ্ছে তিনি যদি কোনো নবী বা রসুল হন তবে ভিন্ন কথা।
সুতরাং অলিরা ফেরেশতাদের দেখতে পেলেও নিজের ওপর জ্ঞান ঢেলে দেওয়ার মুহূর্তে তাদের দেখতে পান না; অথবা তাঁরা এই জ্ঞান সঞ্চারের প্রক্রিয়াটি অনুভব করেন এবং কোনো চাক্ষুষ দর্শন ছাড়াই বুঝতে পারেন যে, এটি ফেরেশতার পক্ষ থেকেই এসেছে।
একই সাথে ফেরেশতাকে দেখা এবং তাঁর কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করা— এই দুইয়ের সমন্বয় কেবল একজন নবী বা রসুলের ক্ষেত্রেই হতে পারে। সুফি সাধকদের মতে, এই বিন্দুর মাধ্যমেই অলি এবং নবীর মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়; এখানে নবী বলতে মূলত অবতীর্ণ শরিয়তের অধিকারী নবীকে বোঝানো হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ আইনি বিধান বা শরিয়তের হুকুম নাজিল হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন, তবে তাঁর অলিদের অন্তরে সেই বিধানের অন্তর্নিহিত জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার পথ বন্ধ করেননি। তিনি অলিদের জন্য সেই জ্ঞানের আধ্যাত্মিক অবতরণ চালু রেখেছেন, যেন তাঁরা আল্লাহর দিকে ডাকার ক্ষেত্রে পূর্ণ দূরদর্শিতার অধিকারী হতে পারেন; ঠিক যেমনটি রসুলের অনুসারীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল। আর এই কারণেই আল্লাহ সুরা ইউসুফের ১০৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, বলুন, এটিই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে ডাকছি পূর্ণ দূরদর্শিতার সাথে, আমি নিজে এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা।
তাই অলিদের নিকট এটি এমন এক অর্জন, যার মধ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এই কারণেই ইমাম কুশাইরি (রহ.) আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রশংসা করে বলেছেন, “সাধারণ ওলামাদের জ্ঞান সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, যাতে সংশয় থেকে যায়? কারণ সুফি-সাধক ছাড়া অন্য আলেমরা উপশাখা কিংবা মূলনীতি কোনো ক্ষেত্রেই এমন অকাট্য দূরদর্শিতার ওপর থাকেন না।”
উপশাখার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা না থাকার কারণ হলো সেখানে ব্যাখ্যার নানা সম্ভাবনা থাকে। আর মূলনীতির ক্ষেত্রে কারণ হলো, যে কোনো গবেষক যখন কোনো প্রমাণের ওপর দৃষ্টিপাত করেন, তখন তাঁর নিজের মনের বা অন্য কারও সংশয় ও খুঁত সেই প্রমাণের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে; ফলে এই ত্রুটি বা খুঁতের কারণে তিনি নিজের প্রমাণের ওপরই সন্দেহ পোষণ করতে পারেন, অথচ এর আগে হয়তো তিনি সেটিকে অকাট্য মনে করতেন।
কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দূরদর্শিতাপ্রাপ্ত সাধকদের অর্জিত জ্ঞানে এমন অবস্থা ঘটে না। আর এই জ্ঞানই হলো ‘হক্কুল ইয়াকিন’, যার অর্থ হলো অন্তরে এমন এক দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে ওঠা যা কোনো কিছুই তার স্থান থেকে নাড়াতে পারে না। অন্তরে ঢেলে দেওয়া রুহের জ্ঞান বোঝার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।
আর অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেওয়ার এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক আস্বাদনের ওপর নির্ভরশীল, যা একটি বিশেষ আত্মিক অবস্থা। তবে আমি আপনাকে জানিয়ে রাখছি যে, এই বিশেষ সম্পর্কের কারণে যার অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হচ্ছে তার অন্তরের মধ্যে সেই জ্ঞান গ্রহণের একটি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা বা প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। এই প্রস্তুতি না থাকলে জ্ঞান গ্রহণ করা সম্ভব হতো না। অবশ্য এই প্রস্তুতি কেবল গ্রহণ করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বিশেষ খোদায়ি অনুগ্রহ।
হ্যাঁ, মানুষের আত্মা কখনো কখনো এমন এক পথে চলে, যা তাকে সেই বিশেষ দরজার দিকে নিয়ে যায়, যা খুলে দিলে এই বিশেষ জ্ঞান বা অন্যান্য আধ্যাত্মিক বিষয় অর্জিত হয়। যখন তারা এই দরজায় পৌঁছায়, তখন সেখানে অপেক্ষা করে দেখার জন্য যে, তাদের ক্ষেত্রে দরজাটি কীভাবে খোলা হচ্ছে। অতঃপর যখন দরজা খোলা হয়, তখন খোদায়ি নির্দেশটি একক রূপেই নির্গত হয়, কিন্তু দরজার ওপাশে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী তা গ্রহণ করে। এই যোগ্যতার পেছনে তাদের নিজস্ব কোনো হাত থাকে না, বরং আল্লাহ নিজেই প্রত্যেককে আলাদা আলাদা যোগ্যতা দান করেছেন। আর এই মাকামেই বিভিন্ন দল, অনুসারী ও অ-অনুসারী, নবীদের থেকে রসুলগণ এবং রসুলদের থেকে অনুসারীগণ— যাদের পরিভাষায় অলি বলা হয়; পরস্পর পৃথক হয়ে যান।
তাই যার প্রকৃত জ্ঞান নেই সে মনে করে বসে যে, এই দরজার দিকে তাদের পথ চলাই বুঝি দরজা খোলার পর যা অর্জিত হয়েছে তা নিজের চেষ্টায় কামাই করার কারণ। আসলে যদি তাই হতো, তবে সবাই সমান ফল পেত, অথচ সবাই তো সমান নয়। সুতরাং, এটি কেবলই সেই যোগ্যতার কারণে ঘটে যা নিজের চেষ্টায় অর্জন করা যায় না।
এই কারণেই দার্শনিক বা চিন্তাবিদদের মধ্যে যারা নবুয়তকে চেষ্টা বা সাধনার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য বলেছেন, তারা চরম ভুল করেছেন। নবুয়তকে সাধনা লব্ধ কেবল তারাই বলতে পারে যারা মনে করে যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে না, বরং এটি মানুষের বুদ্ধি এবং ঊর্ধ্বজগতের রুহানি শক্তির এক বিশেষ প্রবাহ মাত্র, যা এমন কিছু আত্মার ওপর পড়ে যা বাহ্যিক আবিলতা মুক্ত এবং প্রকৃতির বস্তুগত কারণ থেকে মুক্ত।
ফলে তাদের মতে, সেই আত্মায় বিশ্বজগতের সমস্ত প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে; যেহেতু তাদের আত্মার এই পরিচ্ছন্নতা সাধনার মাধ্যমে অর্জিত, তাই সেই পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে যা কিছু পাওয়া যায় তাও নাকি চেষ্টা লব্ধ। কিন্তু এটি একটি মস্ত বড় ভুল। অবশ্য আত্মার পরিচ্ছন্নতা অর্জন বা তাতে মহাবিশ্বের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠার বিষয়টি সেই আত্মার ক্ষেত্রে সত্য, যার এই আধ্যাত্মিক অবলোকনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
তবে একই রকম পরিচ্ছন্ন আত্মার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অন্য কাউকে বাদ দিয়ে কেবল এই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিটিই কেন রসুল, নবী বা শরিয়তের প্রবর্তক হলেন; সেটি সম্পূর্ণ একটি খোদায়ি নির্বাচন, যা আল্লাহ তাঁর নিজের ইচ্ছায় সেই আত্মায় খোদাই করে দেন; বিশ্বজগতের কোনো প্রতিচ্ছবি তা করে না। কেননা, আমরা যা কিছু উল্লেখ করেছি তার মূল উৎস হলো লাওহে মাহফুজ। সেখানেই খোদাই করা আছে রসুলের সুরত ও তাঁর রেসালাত, নবীর সুরত ও তাঁর নবুয়ত এবং অলির সুরত ও তাঁর বেলায়েত। অতএব, কারও আত্মা পরিচ্ছন্ন হলেই এবং তাতে লাওহে মাহফুজের বিষয়াবলি ভেসে উঠলেই যে তাকে রসুল হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
আর যার রসুল হওয়ার কথা, তাঁর আত্মাতেই রেসালাতের বিষয়টি খোদাই হয়ে যায় এবং তাঁর নিকট সমস্ত বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এটি মানুষের মনগড়া ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা মনে করে কেবল আত্মার পরিচ্ছন্নতা অর্জনের মাধ্যমেই বুঝি নবুয়ত বা বেলায়েত লাভ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, লওহে মাহফুজেই সমস্ত আধ্যাত্মিক স্তর এবং উচ্চ ও নিম্ন স্তরের অধিকারীদের অবস্থান খোদাই হয়ে আছে।
আর অন্তরে ঐশ্বরিক জ্ঞান বা বার্তা গ্রহণের যোগ্যতার নিয়ম হলো— তা এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সম্পর্কের মাধ্যমে ঘটে, যা মূলত অন্তরে তৈরি হওয়া একটি খোদা-প্রদত্ত রশি বা সংযোগ। এই প্রস্তুতির মাধ্যমে অন্তর যখন সত্যের দরবারের সাথে যুক্ত হয়, তখন আধ্যাত্মিক পথ ধরে অন্তরে জ্ঞান অবতীর্ণ হতে শুরু করে। এর ফলে অদৃশ্য জগতের আলোয় মানুষের অন্তর পুরোপুরি আলোকিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন এটি আল্লাহ সম্পর্কিত এমন জ্ঞান হয়, যার সাথে এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কোনো সম্পর্ক নেই; যেমন আল্লাহর এই জ্ঞান, যে তিনি সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন, যা সুরা আল ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। কিংবা সমস্ত লৌকিক বৈশিষ্ট্য থেকে তাঁর পবিত্রতা ও দূরত্বের জ্ঞান, যা সুরা আশ-শুরার ১১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই।
এই মানসিক প্রস্তুতি, জ্ঞানের অবতরণ এবং অবিচ্ছিন্ন আত্মিক সংযোগের একটি চমৎকার উদাহরণ হলো প্রদীপের সলতে। কোনো সলতেতে যদি সামান্য আগুন বা তাপ অবশিষ্ট থাকে, তবে তা থেকে এক ধরনের ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া নিজের স্বভাবজাত নিয়মেই ওপরের দিকে উঠতে চায় এবং ওপরের শূন্যতার সাথে একটি অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করে। এখন ওপরে যদি একটি জ্বলন্ত প্রদীপ থাকে আর ধোঁয়া বের হওয়া সলতেটিকে ঠিক তার নিচে সোজাসুজি রাখা হয়, তবে সেই ধোঁয়া খুব দ্রুত ওপরের জ্বলন্ত প্রদীপের সাথে মিশে যায়। এর ফলে নিচের সলতের মাথায় আগুন ধরে ওঠে এবং সেখানেও ওপরের আলোকময় প্রদীপের হুবহু একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, যা থেকে আলো নিচে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন যদি কেউ ভালো করে লক্ষ করে যে ওপরের মূল প্রদীপ থেকে কি কোনো আলো কমে গেছে, কিংবা মূল প্রদীপের কোনো অংশ কি নিচের সলতেতে চলে এসেছে? তবে দেখা যাবে যে নিচের সলতেতে হুবহু প্রদীপের রূপ ফুটে ওঠা সত্ত্বেও মূল প্রদীপের কোনো কমতি হয়নি, আবার তা থেকে ভেঙেও কিছু নিচে আসেনি।
যে ব্যক্তি এই রূপকের ভেতরের রহস্যটি বুঝতে পারবে, সে হাদিসের এই বাণীর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারবে, যেখানে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে তাঁর নিজস্ব প্রতিচ্ছবি বা সুরতে সৃষ্টি করেছেন। সে আরও জানতে পারবে যে, অন্তরের প্রস্তুতি যখন খোদার দরবারের মুখোমুখি হয়, তাদের আধ্যাত্মিক সম্পর্কটি সঠিক রূপ নেয় এবং সাধকের বিশেষ একাগ্রতা তার সাথে যুক্ত হয়, তখন সেই প্রস্তুতি অনুসারেই অন্তরে জ্ঞান অবতীর্ণ হয়।
সলতের আকার বড় বা ছোট হওয়ার ওপর যেমন তার ভেতরের আলোর আয়তন নির্ভর করে, তেমনি অন্তরের ধারণক্ষমতার ওপর জ্ঞানের গভীরতা নির্ভর করে। প্রদীপের আলো কতটা উজ্জ্বল হবে তা নির্ভর করে সলতের পরিচ্ছন্নতা এবং তার তেলের বিশুদ্ধতার ওপর। আর সেই আলো কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা নির্ভর করে তেলের পরিমাণের ওপর, কারণ তেলই আলোকে টিকিয়ে রাখার মূল উপাদান বা রসদ জোগায়।
অতএব, আমরা এই উপমায় যা কিছু বললাম তা যদি আপনি বুঝতে পারেন, তবে আপনি এমন এক গভীর জ্ঞান লাভ করলেন যা কেবল আল্লাহ-সচেতন ওলামাগণই জানেন। এর মাধ্যমে আপনার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, অন্তরে রুহের মাধ্যমে কীভাবে গায়েবি জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হয়, কোন ধরনের অন্তর তা গ্রহণ করতে পারে এবং সেই অন্তরের গুণাবলি কেমন হয়ে থাকে।
আপনি আরও জানতে পারবেন যে, নিম্নস্তরের সৃষ্টি বা বান্দার একাগ্রতা ও আকুলতা কীভাবে উচ্চতর বা খোদার দরবারে প্রভাব ফেলে; ঠিক যেমনটি ঘটে যখন কোনো বান্দা আল্লাহকে ডাকে এবং আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। আর আল্লাহই চিরন্তন সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।[2]
দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:
দাতা গঞ্জে বখশ সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে রুহের প্রকৃতি ও বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, রুহ একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ; তাই তাকে দেখা সম্ভব, যেমন শহিদদের রুহ সবুজ পাখির রূপে থাকে। রুহকে অনাদি দাবি করা হিন্দু, নাসারা, বাতেনি ও জন্মান্তরবাদী দলগুলোর ভ্রান্তি। তিনি যুক্তি দিয়ে এটি খণ্ডন করেছেন। আবু বকর ওয়াসিতির বরাতে রুহের দশটি মাকামও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাপাচারীদের রুহ থেকে শুরু করে দরবেশদের ফানার রুহ পর্যন্ত। তাঁর নিজের বাণী— “আমার জীবন সব অবস্থায় হক তায়ালার সাথে, আমাদের অস্তিত্ব তাঁরই সৃষ্টি, তাঁর জাত বা সিফাতের অংশ নয়” রুহ সম্পর্কে সঠিক আকিদার সারসংক্ষেপ।
এটি স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, রুহের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা আবশ্যক। তবে এর প্রকৃত স্বরূপ ও রহস্য উন্মোচনে মানুষের বুদ্ধি একেবারেই অক্ষম ও অসহায়। মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক আলেম ও বুদ্ধিজীবী নিজ নিজ বোধ ও অনুমানের ভিত্তিতে এই বিষয়ে কিছু না কিছু বলেছেন। এমনকি কাফের ও নাস্তিকরাও এই বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছে।
কুরাইশ কাফেররা ইহুদিদের প্ররোচনায় নজর বিন হারিসকে পাঠিয়েছিল, যেন সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রুহের অবস্থা এবং এর প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তখন আল্লাহ তায়ালা রুহের অনাদিত্ব বা চিরন্তন হওয়ার দাবিকে নাকচ করে দিয়ে সুনিশ্চিত করে বললেন, وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي – হে মাহবুব, তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলে দিন যে, রুহ আমার রবের নির্দেশ ঘটিত।” সুরা বনি ইসরাইল: ৮৫।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী হলো, الأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ – রুহসমূহ সমবেত এক সৈন্যদল; তাদের মধ্যে যাদের পারস্পরিক আত্মিক মিল ঘটে তারা একতাবদ্ধ হয়, আর যাদের মধ্যে মিল ঘটে না তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।” বুখারি শরিফ।
রুহসমূহ যেহেতু একটি সুবিন্যস্ত সৈন্যদল, তাই যে ব্যক্তি এর হাকিকত খোঁজার পেছনে অতিরিক্ত চেষ্টা করে সে মূলত নিজের সময় নষ্ট করে, আর যে এর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সে ভুলের মধ্যে রয়েছে। এই ধরনের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে, তবে সেগুলোতে রুহের মূল উপাদান বা সত্তা নিয়ে অযথা বিতর্ক করা হয়নি; বরং তা কোনো বাহ্যিক গুণাগুণের ব্যাখ্যা ছাড়াই রুহের অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ দেয়। এই কারণে একদল সুফি ও আলেম বলেন যে, الروح هو الحیوة التی یحیی بہ الجسد – রুহ হলো স্বয়ং জীবন, যার কারণে এই দেহ বেঁচে থাকে।
ধর্মতত্ত্ববিদদের একটি দলের মতও এটিই। এই অর্থে রুহ হলো একটি সাময়িক গুণ বা আরজ, যার ফলে আল্লাহর আদেশে যে-কোনো জীবন্ত প্রাণ সচল থাকে এবং দেহের অঙ্গসংস্থান ও নড়াচড়ার সমস্ত প্রক্রিয়া এর সাথেই যুক্ত থাকে। এটি অন্যান্য সাধারণ গুণের মতোই, যা মানুষকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করে। আবার অন্য আরেকটি দল বলে যে, هو غیر الحیوة ولا یوجد الحیوة الا معھا کما لا يوجد
الروح الامع البنيه وان لا يوجد احدهما دون الآخر كالألم والعلم بها لانهما شيئان لا يفترقان.
রুহ জীবন ছাড়া আলাদা একটি বিষয়, তবে জীবন রুহ ছাড়া পাওয়া যায় না। আবার রুহও দেহ ছাড়া পাওয়া যায় না। এদের একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব প্রকাশ পায় না; যেমন কষ্ট এবং কষ্টের অনুভূতি, কারণ এ দুটি আলাদা বিষয় হলেও একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
অধিকাংশ সুফি মাশায়েখ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অভিমত হলো রুহ পুরোপুরি দৃশ্যমান কোনো বস্তুও নয়, আবার কেবল কোনো গুণও নয়। আল্লাহ তায়ালা যতক্ষণ রুহকে মানুষের দেহে রাখেন, ততক্ষণ নিয়ম অনুযায়ী সেটি দেহে জীবন বজায় রাখেন। জীবন হলো মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য এবং সে এটির মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। আর এই রুহ মানুষের শরীরে একটি আমানত বা সাময়িক বিষয় মাত্র। এমন হওয়া সম্ভব যে, রুহ মানুষ থেকে আলাদা হয়ে যাবে অথচ সে জীবনের সাথে বেঁচে থাকবে; ঠিক যেভাবে ঘুমের ঘোরে রুহ চলে গেলেও মানুষ জীবনের সাথে বেঁচে থাকে। আবার এটাও সম্ভব যে, শরীর থেকে রুহ বের হয়ে যাওয়ার পরও তার মধ্যে বুদ্ধি ও জ্ঞান বাকি থাকবে। কারণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, শহিদদের রুহ সবুজ পাখিরূপে থাকে। আর এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, রুহ একটি বাস্তব সত্তা। তা ছাড়া তিনি আরও এরশাদ করেছেন, الأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ – রুহসমূহ সারিবদ্ধ সৈন্যদলের মতো।
স্বাভাবিকভাবেই সৈন্যদল স্থায়ী হয়, অথচ কোনো অস্থায়ী গুণ নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না এবং তা নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিতও হতে পারে না।
আসল কথা হলো, রুহ একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ, যা আল্লাহ তায়ালার আদেশে আসে। নবী করিম আলাইহিস সালাম ফরমান, মেরাজের রাতে আমি হজরত আদম সফিউল্লাহ, ইউসুফ সিদ্দিক, মুসা কলিমুল্লাহ, হারুন হালিমুল্লাহ, ঈসা রুহুল্লাহ এবং হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিমুস সালামদের আসমানে দেখেছি। নিঃসন্দেহে তা ছিল তাঁদের আরওয়াহে মুকাদ্দাসা। রুহ যদি কোনো আরাজি তথা ক্ষণস্থায়ী গুণ হতো, তবে তা নিজে নিজে টিকে থাকত না এবং অস্তিত্ব থাকা অবস্থায় তাকে দেখাও যেত না। রুহ বা আত্মা যদি কোনো ‘আরাজি’ (পরনির্ভরশীল বা ক্ষণস্থায়ী গুণ) হতো, তবে সেই ‘আরেজ’ (গুণটির) টিকে থাকার জন্য তো একটা নির্দিষ্ট বডি, আধার বা জায়গার দরকার হতো। আর সেই জায়গাটি হতো তার জওহর। আমরা জানি, জওহর বা মূল উপাদানগুলো সাধারণত যৌগিক ও স্থূল হয়ে থাকে। এ থেকে বোঝা গেল যে, রুহের একটি জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ রয়েছে। আর যেহেতু এর একটি দেহ আছে, তাই একে দেখাও সম্ভব; তা মনের চোখ দিয়েই হোক, সবুজ পাখির রূপেই হোক কিংবা সারিবদ্ধ সৈন্যদলের আকৃতিতেই হোক, যারা যাতায়াত করে। এই বিষয়ে অনেক হাদিস প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। সুরা বনি ইসরাইলের ৮৫ নম্বর আয়াতে হক তায়ালা এরশাদ করেছেন, قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي – হে মাহবুব, আপনি বলে দিন, রুহ আমার রবের নির্দেশেই রয়েছে।
এখন বেদ্বীনদের একটি মতভেদের বিবরণ বাকি আছে। তারা মনে করে রুহ হলো কদিম তথা অনাদি এবং তারা এর উপাসনা করে। তারা রুহকে সবকিছুর কর্তা এবং চালিকাশক্তি মনে করে। তারা রুহসমূহকে মাধ্যম বা হাতিয়ার মনে করে এবং একে চিরন্তন ব্যবস্থাপক বা এক দেহ থেকে অন্য দেহে আবর্তিত হওয়া বিষয় বলে গণ্য করে। সহজ কথায়, তারা জন্মান্তরবাদ ও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। এই লোকেরা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে পরিমাণ সংশয় বা সন্দেহ ছড়িয়েছে, তা আর কেউ ছড়ায়নি। নসারা তথা খ্রিষ্টানদের ধর্মও এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে, যদিও তাদের মুখের কথা বা বাহ্যিক বক্তব্য এর উল্টো। তা ছাড়া সব হিন্দু এবং তিব্বত, চিন ও মাচীনের লোকেরাও এই একই মত পোষণ করে। শিয়া, কেরামতিয়া এবং বাতেনি দলও এই মতেরই অনুসারী। এই বর্জিত ও বাতিল দলগুলোও এমন সব ফাসেদ তথা ভ্রান্ত চিন্তাভাবনা লালন করে এবং প্রতিটি দলই নিজের মতকে সবার আগে রাখে ও এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখায়। আমরা তাদের এত সব দাবির মধ্য থেকে কেবল কদম তথা অনাদিত্ব শব্দটি নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই যে, এটা দিয়ে আসলে তোমরা কী বোঝাতে চাচ্ছ? কোনো মুহাদ্দাস তথা সৃষ্ট বস্তু কি নিজের অস্তিত্বের দিক থেকে আগের, নাকি তা সবসময়ই কদিম তথা অনাদি?
তারা যদি বলে যে, আমাদের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টি বা মুহাদ্দাস অস্তিত্বের দিক থেকে অগ্রবর্তী, তবে তো মূল বিষয়ের অমিলটাই দূর হয়ে যায়; কারণ আমরাও রুহকে মুহাদ্দাস অর্থাৎ সৃষ্ট বলেই বিশ্বাস করি। অথবা এর অর্থ যদি এই হয় যে, মানুষের দেহের আগে রুহের অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে, তবে তা ঠিক আছে। কারণ সাইয়্যেদুল আলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, إِنَّ اللهَ تَعَالَى خَلَقَ الأَرْوَاحَ قَبْلَ الأَجْسَادِ بِمِائَتَيْ أَلْفِ عَامٍ – নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা শরীরের সৃষ্টির দুই লক্ষ বছর আগে রুহসমূহ সৃষ্টি করেছেন।
যেহেতু রুহ সৃষ্টি হওয়াটাই সত্য, তাই স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টির সাথে যা কিছু থাকে তাও সৃষ্টিই হয়ে থাকে এবং উভয়-ই এক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সময় একটিকে অপরটির সাথে মিলিয়েছেন এবং এই মিলনের মাধ্যমে তিনি নিজের কুদরতে জীবন তৈরি করেছেন। এর অর্থ হলো, সৃষ্টির দিক থেকে রুহ একটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং শরীর আরেকটি ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ তায়ালা যখন কাউকে জীবন দিতে চান, তখন রুহকে শরীরের সাথে মিলে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং এর মাধ্যমেই জীবন লাভ হয়। তবে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে রুহের চলে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ যখন এক শরীরের জন্য দুই ধরনের জীবন থাকা সম্ভব নয়, তখন একটি রুহের জন্য দুটি আলাদা শরীর বা অস্তিত্ব থাকাও অসম্ভব। যদি এই বিষয়ে স্পষ্ট হাদিস না থাকত এবং হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বাণীতে সত্য প্রকাশ না করতেন, তবে বুদ্ধির বিচারে জীবন ছাড়া রুহের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং তা কেবল একটি বৈশিষ্ট্য বা গুণ হতো, কোনো বাস্তব সত্তা হতো না।
এই নাস্তিক বা মুলহিদরা যদি বলে যে, কদম অর্থাৎ অনাদিত্ব বলতে চিরন্তন ও স্থায়ী হওয়া বোঝায়, তবে আমরা তাদের কাছে জানতে চাই— এটি কি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত, নাকি অন্য কোনোকিছুর মাধ্যমে টিকে আছে? তারা যদি বলে এটি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, তবে আমরা জিজ্ঞেস করব, আল্লাহ তায়ালা কি এটি সম্পর্কে জানেন নাকি জানেন না? তারা যদি বলে আল্লাহ তায়ালা এটি সম্পর্কে জানেন না, তবে তো আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় আরেকজন অনাদি সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ হয়ে যায়। আর বুদ্ধির বিচারে এটি সম্পূর্ণ অসম্ভব; কারণ অনাদি সত্তা কখনো সীমাবদ্ধ হতে পারে না; অথচ এক সত্তার অস্তিত্ব অন্য সত্তার বিপরীত হয়ে দাঁড়ায় এবং এটি অসম্ভব। আর তারা যদি বলে যে আল্লাহ তায়ালা এটি সম্পর্কে জানেন, তবে আমরা জবাবে বলব, আল্লাহ তো কদিম, অর্থাৎ অনাদি এবং সৃষ্টি হলো নতুন বা নশ্বর। আর এটি অসম্ভব ও ত্রুটিপূর্ণ যে, কোনো সৃষ্টির সাথে অনাদি সত্তার মিশ্রণ, একাত্মতা বা প্রবেশ ঘটবে, অথবা সৃষ্টি অনাদি সত্তার জায়গায় আর অনাদি সত্তা সৃষ্টির জায়গায় চলে আসবে। যখন একটিকে অপরটির সাথে মেলানো হবে, তখন তো দুটি মিলে এক হয়ে যাবে। অথচ সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষেত্রে এভাবে আলাদা হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাদের প্রকৃতি ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই অবান্তর কথাবার্তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ও পবিত্র।
আর তারা যদি বলে যে, এটি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং অন্য কিছুর মাধ্যমে টিকে আছে, তবে বিষয়টি দুই অবস্থার বাইরে হতে পারে না। হয় তা কোনো বৈশিষ্ট্য হবে, না হয় ক্ষণস্থায়ী গুণ হবে। যদি তারা একে ক্ষণস্থায়ী গুণ বলে, তবে স্বাভাবিকভাবেই একে কোনো আধারে বা জায়গায় থাকতে হবে, অথবা কোনো আধার ছাড়াই থাকতে হবে। যদি তারা বলে, এটি কোনো আধারে বা জায়গায় আছে, তবে সেই আধারটিও সেটির মতোই নশ্বর হবে এবং অনাদি নামটি প্রত্যেকের ক্ষেত্র থেকেই বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি বলে কোনো আধার ছাড়াই আছে, তবে তাও অসম্ভব; কারণ ক্ষণস্থায়ী গুণ তো নিজে নিজে টিকে থাকতে পারে না, তাহলে আধার ছাড়া সেটির অস্তিত্ব কীভাবে কল্পনা করা যায়? আর তারা যদি বলে যে, এই বৈশিষ্ট্যটি অনাদি। যেমনটা হুলুল ও তানাসুখ তথা অবতারবাদ ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীরা বলে থাকে এবং তারা এই বৈশিষ্ট্যকে আল্লাহ তায়ালার গুণ বলে মনে করে, তবে তাও অসম্ভব। কারণ আল্লাহ তায়ালার অনাদি গুণ কোনো মাখলুকের গুণ হয়ে যাবে, এটা হতেই পারে না।
আর যদি এটা মেনে নেওয়া সম্ভব হতো যে, আল্লাহর জীবন কোনো মাখলুকের জীবন হয়ে যাবে, তবে এটাও সম্ভব হতো যে, আল্লাহর কুদরত মাখলুকের ক্ষমতা হয়ে যাবে। এভাবে গুণটি তার আধারের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। সুতরাং, এটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে যে, একটি অনাদি গুণের জন্য কোনো সৃষ্টিশীল বা নশ্বর আধার থাকবে? স্বাভাবিকভাবেই অনাদি সত্তার সাথে নশ্বর সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যা-ই হোক, এই বিষয়ে নাস্তিকদের সব কথাই বাতিল ও ভিত্তিহীন।
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী রুহ হলো মাখলুক। যে ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে বলবে, সে স্পষ্ট হঠকারিতা করছে এবং সে সৃষ্টি ও অনাদির মধ্যকার পার্থক্যটাই বোঝে না। কোনো অলির জন্য এটি কোনোভাবেই সংগত নয় যে, তিনি বেলায়েত লাভের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব গুণাবলির অংশীদার হবেন। আল্লাহ তায়ালা নিজের অনুগ্রহ ও দয়ায় আমাদের বিদআত, পথভ্রষ্টতা এবং শয়তানের কুপ্ররোচনা থেকে রক্ষা করে সুস্থ বুদ্ধি দান করেছেন, যার মাধ্যমে আমরা চিন্তা-ভাবনা ও সঠিক যুক্তি অনুধাবন করতে পারি। আল্লাহর প্রশংসায় বলতে হয়, তিনি আমাদের ইমানের মতো নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন, যার মাধ্যমে আমরা তাঁকে চিনতে পারি।
সেই প্রশংসার কী-ই বা মূল্য আছে যা নিজের শেষ সীমানায় পৌঁছায় না? কারণ আল্লাহর অসীম নেয়ামতের তুলনায় আমাদের এই সীমিত প্রশংসা তো খুবই সামান্য, যা কবুল হওয়ার অযোগ্য। আহলে জওয়াহের তথা বাহ্যিক দৃষ্টিসম্পন্ন আলেমরা যখন আরবাবে উসুল তথা মূল তত্ত্বজ্ঞানীদের কাছ থেকে এই ধরনের গভীর কথাবার্তা শুনল, তখন তারা ধারণা করতে শুরু করল যে, হয়তো সব সুফিদের বিশ্বাসই এমন। এই কারণে তারা সেই সব নেককার বুজুর্গদের প্রকাশ্য ত্রুটি বা ক্ষতি দেখতে লাগল এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হলো। তারা আল্লাহর বেলায়েতের সূক্ষ্ম রহস্য এবং খোদায়ি বাণীর জ্যোতি প্রকাশ হওয়া থেকে আড়ালে রয়ে গেল। এই কারণেই এই মহান বুজুর্গদের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করা তাঁদেরকে গ্রহণ করার মতোই, আর তাঁদেরকে গ্রহণ করা তাঁদের প্রত্যাখ্যান করার মতোই হয়ে থাকে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
রুহের ব্যাপারে মাশায়েখদের বাণী
এক বুজুর্গ বলেন, الروح في الجسد كالنار في الحطب فالنار مخلوقة والفحم مصنوعة
শরীরে রুহের অবস্থান হলো কাঠে আগুনের মতো; আগুন যেমন সৃষ্টি, কয়লাও তেমনি উৎপাদিত বস্তু।
আল্লাহ তায়ালা-র সত্তা ও গুণাবলি ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে অনাদি মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল। হজরত আবু বকর ওয়াসিতি রহমতুল্লাহি আলাইহি রুহের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, الارواح على عشر مقامات – রুহসমূহ দশটি মাকাম তথা স্তরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
১. পাপাচারীদের রুহ অন্ধকারে বন্দি থাকে এবং তারা ভালো করেই জানে যে, তাদের সাথে কী আচরণ করা হবে।
২. নেককার ও পরহেজগার মানুষদের রুহ ভালো কাজের ওসিলায় আকাশের নিচে সুখে থাকে এবং আল্লাহর আনুগত্যে আনন্দিত হয়ে তাঁর শক্তিতেই পথ চলে।
৩. মুহসিনিন তথা সৎকর্মশীলদের রুহ আলোর প্রদীপের মতো আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। ভালোবাসা হলো তাদের খাদ্য এবং আল্লাহর দয়া ও নৈকট্য হলো তাদের পানীয়।
৪. মুরিদিনদের রুহের ঠিকানা হলো চতুর্থ আসমানে। সেখানে তারা পরম সত্যের স্বাদ পায় এবং নিজেদের ভালো কাজের ছায়ায় ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করে।
৫. আহলে ওয়াফা তথা বিশ্বস্ত বান্দাদের রুহ পবিত্রতার পর্দা ও মাকামে ইস্তফায় পরম শান্তিতে থাকে।
৬. শহিদদের রুহ সবুজ পাখির রূপ ধারণ করে জান্নাত ও তার বাগানের মধ্যে বসবাস করে; তারা যখন যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারে।
৭. মুশতাকিন তথা আল্লাহর প্রেমের ব্যাকুল মানুষদের রুহ আদবের বিছানায় খোদার গুণাবলির নুরের পর্দার আড়ালে অবস্থান করে।
৮. আরেফদের শরীরের রুহসমূহ পবিত্রতার বিছানায় সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর বাণী শোনে এবং তারা দুনিয়া ও জান্নাতে নিজেদের থাকার জায়গা দেখে।
৯. প্রেমিক ও বন্ধুদের শরীরের রুহসমূহ আল্লাহর সৌন্দর্যের দর্শন এবং কাশফের মাকামে ডুবে থাকে। এ ছাড়া তারা অন্য কোনোকিছুর খবর রাখে না এবং এটি ছাড়া অন্য কিছুতে তারা শান্তি ও আরাম পায় না।
১০. দরবেশদের শরীরের রুহসমূহ ফানার মাকামে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং নিজেদের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে আধ্যাত্মিক অবস্থায় বদলে যায়।
তরিকতের পথপ্রদর্শকরা বর্ণনা করেন যে, মাশায়েখগণ প্রতিটি রুহকে তাদের আলাদা আলাদা আকৃতিতে দেখেছেন এবং এভাবে দেখা জায়েজ। আমরা আগেই বলেছি যে, রুহ হলো জিসমে লতিফ তথা সূক্ষ্ম দেহ, তাই এদের দেখা সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা যখন চান এবং যেভাবে চান, তাঁর কোনো বান্দাকে তা দেখিয়ে দেন।
হুজুর সাইয়্যেদুনা দাতা গঞ্জ বখশ রহমতুল্লাহি আলাইহি ফরমান, “আমার জীবন সব অবস্থায় হক তায়ালার সাথেই রয়েছে এবং তাঁর মাধ্যমেই টিকে আছে। আমাদের বাঁচিয়ে রাখা হক তায়ালারই কাজ। আমাদের অস্তিত্ব এবং আমাদের জীবন সবই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর জাত তথা সত্তা বা সিফাত তথা গুণাবলি থেকে তৈরি কোনো অংশ নয়।”
হুলুলিয়া তথা অবতারবাদে বিশ্বাসীদের কথা সম্পূর্ণ বাতিল এবং তা এক বিরাট পথভ্রষ্টতা। তাদের প্রথম ভুল কথাটি হলো তারা রুহকে কদিম তথা অনাদি বলে। যদিও তাদের বিভিন্ন দলের মুখের কথা আলাদা, কিন্তু সবগুলোর মূল অর্থ একই। তাদের একটি দল রুহকে নফস ও হিয়ুলা বলে, আরেকটি দল একে নুর ও জুলমত তথা আলো ও অন্ধকার বলে। আর এই সুফি তরিকার নিন্দা করার জন্য বা একে ভুল প্রমাণ করার জন্য একদল লোক একে ফানা ও বাকা বলে, আবার কেউ একে জমআ ও তফরিকা বলে থাকে। এই ধরনের নানা ফালতু কথা তারা বানিয়ে নিয়েছে এবং নিজেদের এই কুফরির জন্য বাহবা পেতে চায়।
সুফিয়ায়ে কেরাম এমন পথভ্রষ্ট দলগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও অসন্তুষ্ট। কারণ বেলায়েতের প্রমাণ এবং আল্লাহর ভালোবাসার আসল রূপ আল্লাহকে চেনা বা মারফাত ছাড়া কখনোই সঠিক হতে পারে না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কদিম তথা অনাদি সত্তাকে মুহাদ্দাস তথা সৃষ্ট বস্তু থেকে আলাদা করে চিনতে না পারবে, ততক্ষণ এই বিষয়ে সে যা-ই বলবে, তা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই হবে না। বুদ্ধিমানরা মূর্খদের কথার দিকে কান দেয় না।[3]
গাউসে পাকের ভাষ্য – দেহে রুহের অবস্থান:
গাউসে পাক রুহকে চারটি স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন। রুহে জিসমানি, রুহে রওয়ানি, রুহে সুলতানি ও রুহে কুদসি। প্রতিটি রুহের একটি নির্দিষ্ট দোকান আছে— যথাক্রমে বক্ষ, কলব, ফুয়াদ ও সির। প্রতিটির সম্পদ ভিন্ন— শরিয়ত, তরিকত, মারফত ও হাকিকত। আর প্রতিটির লাভ ভিন্ন— জান্নাত থেকে শুরু করে আল্লাহর নুরের সাক্ষাত পর্যন্ত। সবচেয়ে উচ্চ স্তর রুহে কুদসিতে গোপন রহস্যের জবানে তাওহিদের জিকির চলে।
তিনি বলেন, রুহে জিসমানির দোকান হলো শরীরের বক্ষ এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এর সম্পদ হলো শরিয়ত এবং এর ব্যবসা হলো আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বাহ্যিক হুকুমের ওপর শিরক ও রিয়া তথা লোকদেখানো ভাব থেকে মুক্ত হয়ে আমল করা, যেমনটি হক তায়ালার বাণী রয়েছে, وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا – আর কেউ যেন নিজের রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।
নিশ্চয় আল্লাহ এক এবং তিনি এককেই পছন্দ করেন। অর্থাৎ, আমলগুলো লোকদেখানো ভাব, কৃত্রিমতা এবং দুনিয়াবি লোভ-লালসা থেকে পবিত্র হতে হবে। কারণ বেলায়েত, মুকাশাফা এবং আলমে মুলক তথা দৃশ্যমান জগতে জমিন থেকে আকাশ পর্যন্ত সবকিছু দেখা এবং এই ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ করা— এগুলো আসলে রাহবানিয়ত তথা কঠোর শারীরিক সাধনার স্তর মাত্র। যেমন পানির ওপর দিয়ে হাঁটা, বাতাসে ওড়া, নিমেষেই দূরদূরান্তে পৌঁছে যাওয়া, দূর থেকে শুনতে পাওয়া এবং শরীরের ভেতরের গোপন রহস্য জেনে নেওয়া।
আখেরাতে এর লাভ হলো জান্নাত, হুর, প্রাসাদ ও গিলমান, শরাবান তহুরা এবং জান্নাতে আউলার অন্যান্য নেয়ামত লাভ করা, যাকে জান্নাতুল মাওয়া বলা হয়।
‘রুহে রওয়ানি’র দোকান হলো কলব তথা অন্তর। এর সম্পদ হলো তরিকতের জ্ঞান এবং এর ব্যবসা হলো বারোটি মূল নামের মধ্যে প্রথম চারটি নাম হরফ ও আওয়াজ ছাড়া জিকির করা। হক তায়ালার বাণী রয়েছে, قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ أَيًّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
হে মাহবুব, আপনি বলে দিন, তোমরা আল্লাহ নামে আহ্বান করো বা রহমান নামে আহ্বান করো, তোমরা যে নামেই আহ্বান করো না কেন, সব সুন্দর নাম তো তাঁরই।
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا – আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব সুন্দর নাম, সুতরাং তোমরা তাঁকে সে-সব নামেই ডাকো।
এটি এই দিকে ইঙ্গিত করে যে, এই নামগুলো কলবি জিকির, অর্থাৎ বাতেনি জ্ঞানের স্থান এবং আল্লাহ তায়ালার মারেফাত হলো তাওহিদের নামসমূহ যেমন আল্লাহ, জাত-এ-আল্লাহ, লিল্লাহ, লাহু এবং হু-এর জিকিরেরই চূড়ান্ত ফলাফল। হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন—
أَنَّ لِلَّهِ تَعَالَى تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ – নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি সেগুলো গণনা করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তিনি আরও এরশাদ করেছেন, الدَّرْسُ حَرْفٌ وَالتَّكْرَارُ أَلْفٌ – পাঠ হলো একটি হরফ এবং তার পুনরাবৃত্তি হলো হাজার বার।
এই হাদিসে গণনা করা বলতে আল্লাহর প্রকাশ পাওয়া গুণাবলিতে গুণান্বিত হওয়া এবং আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। এই বারোটি নাম হলো তাওহিদের কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র বারোটি হরফ অনুযায়ী আল্লাহ তাবারকা ওয়া তায়ালার বারোটি মূল নাম। আল্লাহ তায়ালা কলেমা তাওহিদের বারোটি হরফের প্রত্যেকটি হরফের জন্য অন্তরের বিভিন্ন অবস্থা অনুযায়ী একটি করে নাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। প্রতিটি জগতের জন্য তিনটি করে নাম রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রেমিকদের অন্তরকে দৃঢ়তা দান করেন।
যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
আল্লাহ তায়ালা ইমানদারদের এই সুদৃঢ় বাক্যের বরকতে পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে অবিচল রাখেন।
তিনি তাদের ওপর প্রশান্তিময় ভালোবাসা নাজিল করেন এবং তাওহিদের বৃক্ষকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন, যার শিকড় কেবল সাত জমিনেই নয়; বরং পাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং তার শাখা-প্রশাখা আসমানে আরশেরও ওপরে রয়েছে। হক তায়ালা এরশাদ করেছেন, كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ – পবিত্র বৃক্ষ তাওহিদের মতো, যার শিকড় মাটিতে সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে রয়েছে।
আর ‘রুহে সাইরানি’র লাভ হলো কলবের জীবন, যার মাধ্যমে একজন তালেব আলমে মালাকুত তথা আধ্যাত্মিক জগৎ অবলোকন করে। যেমন—জান্নাত ও জান্নাতিদের অবস্থা, জান্নাতের নুর ও ফেরেশতাদের অবলোকন করা। এ ছাড়া হরফ ও আওয়াজ ছাড়াই বাতেনি নামসমূহ প্রত্যক্ষ করে সে নিজের বাতেনি জবানে গোপন কথাবার্তা বলে থাকে। আখেরাতে রুহে সাইরানির ঠিকানা হলো দ্বিতীয় জান্নাত, যার নাম জান্নাতুন নাঈম।
‘রুহে সুলতানি’র দোকান হলো ফুয়াদ। এর সম্পদ হলো মারফাত এবং এর ব্যবসা হলো অন্তরের জবান দিয়ে মাঝখানের চারটি নামের স্থায়ী জিকির করা, যেমনটি হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন,
الْعِلْمُ عِلْمَانِ فَعِلْمٌ بِاللِّسَانِ فَذَلِكَ حُجَّةُ اللَّهِ عَلَى خَلْقِهِ وَعِلْمٌ بِالْجَنَانِ وَذَلِكَ الْعِلْمُ النَّافِعُ لِأَنَّ أَكْثَرَ الْمَنَافِعِ الْعِلْمُ فِي هَذِهِ الدَّائِرَةِ
জ্ঞান দুই প্রকার। এক প্রকার জ্ঞান হলো জবানের বা মুখের জ্ঞান, যা সৃষ্টিজীবের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণস্বরূপ। আর অন্যটি হলো অন্তরের জ্ঞান, আর এটিই হলো উপকারী জ্ঞান; কারণ এই স্তরের জ্ঞানের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উপকার রয়েছে।
এর অর্থ হলো, জ্ঞান দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো সেই জ্ঞান যার সম্পর্ক মুখের জবানের সাথে, যা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে মাখলুকের ওপর প্রমাণস্বরূপ। আর দ্বিতীয় জ্ঞানটি হলো সেই জ্ঞান, যার সম্পর্ক অন্তরের সাথে এবং সেটিই হলো আসল উপকারী জ্ঞান। এই পরিধি তথা মারফাতের পরিধিতে এই জ্ঞান সীমাহীন ফায়দাজনক।
হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, أَنَّ لِلْقُرْآنِ ظَهْرًا وَبَطْنًا – নিশ্চয় কুরআনের একটি জাহের তথা বাহ্যিক রূপ এবং একটি বাতেন তথা অভ্যন্তরীণ রূপ রয়েছে।
أَنَّ اللهَ أَنْزَلَ الْقُرْآنَ عَلَىٰ عَشْرَةِ أَبْطُنٍ فَكُلُّ مَا هُوَ أَبْطَنُ فَهُوَ أَنْفَعُ وَأَرْسَخُ لِأَنَّهُ مُخُّ
নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক কুরআন মাজিদকে দশটি বাতেন তথা অভ্যন্তরীণ স্তরে নাজিল করেছেন। অতএব, এর প্রতিটি স্তর অত্যন্ত উপকারী ও সুদৃঢ়, কারণ তা কুরআনের আসল মগজ।
আর এই বারোটি নাম সেই বারোটি ঝরনার মতো, যেগুলো হজরত মুসা আলাইহিস সালামের লাঠির আঘাতে প্রবাহিত হয়েছিল। সুরা আল-বাকারাহ’র ৬০ নম্বর আয়াতে হক তায়ালা এরশাদ করেছেন,
وَإِذِ اسْتَسْقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ ۖ فَانْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ
আর যখন মুসা নিজের সম্প্রদায়ের জন্য পানির প্রার্থনা করলেন, তখন আমি বললাম, আপনার লাঠি দিয়ে এই পাথরে আঘাত করুন। অমনি সেই পাথর থেকে বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হলো এবং প্রতিটি দল নিজেদের পানি পানের ঘাট চিনে নিল।
অতএব, জাহেরি জ্ঞানের উদাহরণ হলো সাময়িক বৃষ্টির মতো এবং বাতেনি জ্ঞান হলো আসল ঝরনার মতো। এই কারণেই এটি প্রথমটি অর্থাৎ জাহেরি জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি উপকারী। সুরা ইয়াসিনের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وَآيَةٌ لَهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَاهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ – আর তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো মৃত জমিন, যাকে আমি পুনরুজ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপাদন করেছি, যা থেকে তারা আহার করে।
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এই বাহ্যিক দিগন্তের জমিন থেকে এমন শস্য উৎপাদন করেছেন যা নফসানি জীব তথা প্রাণীকুলের জন্য শক্তিদায়ক, আর অন্তরের জমিন থেকে সেই শস্য উৎপন্ন করেছেন যা রুহানি আত্মাসমূহের জন্য শক্তিদায়ক। হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, مَنْ أَخْلَصَ لِلَّهِ تَعَالَى أَرْبَعِينَ صَبَاحًا ظَهَرَتْ يَنَابِيعُ الْحِكْمَةِ مِنْ قَلْبِهِ عَلَىٰ لِسَانِهِ – যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাঁটি অন্তরে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে, তার অন্তর থেকে প্রজ্ঞার ঝরনাধারা তার জবানে জারি হয়ে যায়।
এই রুহে সুলতানির লাভ হলো খোদার সৌন্দর্যের প্রতিবিম্ব অবলোকন করা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَىٰ – অন্তর তা অস্বীকার করেনি যা সে দেখেছে।
হুজুর আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এরশাদ করেছেন, الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ -মুমিন হলো মুমিনের আয়না।
এখানে প্রথম মুমিন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুমিন বান্দার কলব বা অন্তর, আর দ্বিতীয় মুমিন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ – আল্লাহই মুমিন এবং মুহাইমিন।
এই স্তরের অর্থাৎ রুহে সুলতানির ঠিকানা হলো তৃতীয় জান্নাত, যার নাম জান্নাতুল ফেরদাউস।
‘রুহে কুদসি’র দোকান হলো সির তথা গোপন রহস্যের কেন্দ্রে। এরশাদে বারি তায়ালা রয়েছে, الْإِنْسَانُ سِرِّي وَأَنَا سِرُّهُ – মানুষ আমার গোপন রহস্য এবং আমি মানুষের গোপন রহস্য।
এর সম্পদ হলো হাকিকতের জ্ঞান এবং সেটিই হলো তাওহিদের জ্ঞান। এর ব্যবসা হলো কোনো আওয়াজ ছাড়া, সির বা গোপন রহস্যের জবান দিয়ে শেষ চারটি তওহিদের নামের স্থায়ী জিকির। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وَإِنْ تَجْهَرْ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَىٰ – আর আপনি যদি উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন, তবে তিনি তো গোপন ও অতি গোপন রহস্যও জানেন।
সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ছাড়া কেউ এই কথা জানে না। আর এর লাভ হলো তিফলে মাআনি তথা আত্মিক শিশুর প্রকাশ এবং সির বা গোপন রহস্যের চোখ দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নুরের চেহারার জলাল ও জামাল অবলোকন করা ও সাক্ষাত লাভ করা। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ – সেদিন অনেক চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
অর্থাৎ কোনো মাধ্যম, অবস্থা এবং কোনো তুলনা ছাড়াই তারা আল্লাহকে দেখবে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ – তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
মানুষ যখন নিজের আসল উদ্দেশ্যকে পেয়ে যায়, তখন বুদ্ধি গুলিয়ে যায়, অন্তর স্তব্ধ হয়ে পড়ে, জবান বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্য কাউকে এই দর্শনের কথা জানানোর মতো কোনো ক্ষমতাই আর তাদের থাকে না। কারণ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা সব ধরনের উপমা বা তুলনা থেকে পবিত্র।
অতএব, যখন এমন খবর আলেমদের কাছে পৌঁছাবে, তখন তাঁদের উচিত এই কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া, জ্ঞানের মাকাম বা স্তরগুলো বোঝা, এর সত্যতা যাচাই করা এবং ইল্লিয়্যিনের উচ্চ মাকামের দিকে নিজেদের লক্ষ্য রাখা। ইলমে লাদুন্নি এবং আল্লাহর একত্ববাদের মারফাত অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা উচিত এবং সামনে যে আলোচনাগুলো আসছে, সেগুলোর ওপর কোনো আপত্তি বা সেগুলোকে অস্বীকার না করা।[4]
চারজন মনীষীর আলোচনা একসাথে পড়লে রুহ সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার গভীরতম স্তর পর্যন্ত। কুশাইরি মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন— রুহ সৃষ্ট, দেহ ও রুহের সমন্বয়েই মানুষ। ইবনে আরাবি দেখিয়েছেন রুহুল আমরের মাধ্যমে কীভাবে ইলাহি জ্ঞান অবতীর্ণ হয় এবং নবী ও অলির পার্থক্য কোথায়। দাতা গঞ্জে বখশ ভ্রান্ত মতবাদগুলো খণ্ডন করে রুহের সূক্ষ্ম দেহ হওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন এবং রুহের দশ মাকামের মানচিত্র এঁকেছেন। আর গাউসে পাক রুহকে চার স্তরে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন, শরিয়ত থেকে হাকিকত পর্যন্ত সাধনার প্রতিটি স্তরে রুহেরও একটি নির্দিষ্ট মাকাম রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, রুহের রহস্য সম্পূর্ণ জানার ক্ষমতা মানুষের নেই, আল্লাহ নিজেই তা স্পষ্ট করেননি। কিন্তু রুহকে চেনার, সম্মান করার এবং তার যোগ্য করে তোলার পথই সুফি সাধনার মূল লক্ষ্য। রুহে কুদসির সাক্ষাত লাভ মানেই আল্লাহর নুরের দিদার; আর এটাই প্রতিটি সাধকের চূড়ান্ত গন্তব্য।