আধ্যাত্মিক জগতে ‘কাবজ’ ও‘বাস্ত’ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর অনুভূতির নাম, যা ছাড়া তাসাউফের পথের সঠিক বোঝাপড়া সম্ভব নয়। কাবজ হলো অন্তরের সেই সংকোচন বা সংকীর্ণতা, যা বান্দার হৃদয়কে ভেতর থেকে চেপে ধরে এবং তাকে আল্লাহর প্রতাপ ও মহিমার সামনে নতজানু করে দেয়। আর বাস্ত হলো সেই আধ্যাত্মিক প্রশস্ততা বা আনন্দের ঢেউ, যা হঠাৎ করে অন্তরকে হালকা ও উদার করে তোলে এবং বান্দাকে আল্লাহর অপার দয়া ও মেহেরবানির স্বাদ আস্বাদন করায়। এই দুটি অবস্থাই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং বান্দার নিজের হাতে এর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, “তিনিই সংকুচিত করেন এবং তিনিই প্রসারিত করেন।” হজরত আবদুল কাদের জিলানি, ইমাম কুশাইরি, দাতা গঞ্জে বখশ ও ইবনে আরাবির মতো আধ্যাত্মিক সাধকরা এই দুটি অবস্থার নানান দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন এবং এর সাথে খওফ ও রেজার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তাঁদের গভীর আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, এই দুটি অবস্থা আসলে একে অপরের পরিপূরক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্যতম প্রধান পথ।

ইমাম হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

যে জিনিসটি রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কোনো অলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার নাম হলো কাবজ তথা আধ্যাত্মিক সংকোচন। আর তাকদির বা ভাগ্যের সাথে পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁতভাবে অবিচল থাকার নাম হলো বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণ। কারণ, কজা ও কদর তথা ভাগ্য ও ঐশ্বরিক ফয়সালায় যদি আগে থেকেই তেমন কোনো নির্দেশ না থাকে, তবে আল্লাহর অলিকে সেই জিনিসের হেফাজত বা সুরক্ষার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয় না। সুতরাং, আল্লাহর অলির জন্য অপরিহার্য হলো তিনি যেন তাকদিরের সমস্ত বিষয়ে একমত ও সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাকদিরের তিক্ত ও মিষ্ট উভয় পরিস্থিতিতেই কোনো ধরনের বিরোধ বা আপত্তি না করেন। আত্মিক অবস্থাসমূহ তো সীমিত, তাই সেগুলোর সীমানা রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরের কোনো সীমা নেই, যার হেফাজত বা সুরক্ষা মানুষের দ্বারা করা যায়।

যখন বান্দা কদর তথা ভাগ্য এবং ফেল তথা আল্লাহর কর্মের মাকাম তথা স্তরে পৌঁছায়, তখন জুহদ তথা জাগতিক বৈরাগ্যের অবস্থায় যে-সকল আনন্দ ও স্বাদ বর্জন করার নির্দেশ তাকে দেওয়া হয়েছিল, এখন সেইসব আনন্দ ও স্বাদই তাকে গ্রহণ করতে বলা হয়। কারণ বান্দা যখন বাহ্যিক ও পার্থিব আনন্দ থেকে এমনভাবে দূরে সরে যায় যে, তার অন্তরে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব বাকি থাকে না, তখন সে বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণের মাকামে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। আর তখন তাকে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সেইসব জিনিস ও আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা তার কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।

তবে তার জন্য এই জিনিসগুলো লাভ করা এজন্য জরুরি নয় যে, এর মাধ্যমে তার কারামত তথা অলৌকিক ক্ষমতা ও মাকাম জাহির হবে; বরং এজন্য জরুরি যে, যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয় এবং তার প্রতি আল্লাহর ফজল তথা অনুগ্রহ ও এহসান তথা দয়া সুনিশ্চিতভাবে প্রকাশ পায়। আর কাবজ তথা আধ্যাত্মিক সংকোচনের পর বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণের লক্ষণগুলোর মধ্যে একটি হলো বান্দাকে বিভিন্ন নেয়ামত ও স্বাদ দান করার তাওফিক দেওয়া। আর এই স্তরে বান্দার কাজ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা রক্ষা করা। নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা ও স্তরসমূহ হেফাজত করা এবং যে-কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ও লৌকিকতার কষ্ট থেকে মুক্ত থাকা।

যদি কোনো ব্যক্তি এই আপত্তি তোলে যে, এই বক্তব্যটি ইসলামের শরিয়তের পরিপন্থী এবং এটি আল্লাহ তায়ালার সেই বাণীর বিরোধী যেখানে বলা হয়েছে, “তোমার মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো।”[1] এই আপত্তির উত্তর হলো— আপনার ধারণা বা কথাটি এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্যের দিকে মোটেও ইঙ্গিত করে না এবং এর দ্বারা এমন কোনো অর্থও প্রকাশ পায় না। প্রকৃত সত্য তো এই যে, আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং যখন কোনো বান্দাকে নিজের অলি তথা বন্ধু বানিয়ে নেন এবং সে আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাঁর সেই অলির কোনো ক্ষতি হতে দেন না এবং তার দীনের মধ্যে কোনো ধরনের ত্রুটি বা বিপর্যয় তৈরি হতে দেন না। বরং আল্লাহ তাকে এই জাতীয় সমস্ত বিষয় থেকে সুরক্ষিত রাখেন, তার হেফাজত করেন এবং শরিয়তের নির্ধারিত সীমারেখা বজায় রাখার জন্য তাকে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক করে দেন এবং তার আচরণ ও চরিত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। এর ফলে বান্দা ইসমত তথা নিষ্পাপতা লাভ করে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিমতা বা লৌকিকতা ছাড়াই শরিয়তের সমস্ত সীমারেখা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। আর আল্লাহ করিমি তথা পরম দয়াময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দার খুব কাছাকাছি হয়ে যান, যেমনটি আল্লাহ তায়ালার বাণী রয়েছে, “আমি হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম থেকে মন্দকে ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। নিঃসন্দেহে সে আমাদের খাঁটি বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।”[2] আরেক জায়গায় ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা আমার খাঁটি বান্দা, শয়তান তাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।”[3] আরেকটি মাকাম তথা স্তরে রয়েছে, “সাবধান, যারা আল্লাহর অলি, তারা আল্লাহর দরবারে অসহায় তথা মিসকিন, কিন্তু তারা আল্লাহর রহমতের কোলে প্রতিপালিত হয়, তারাই এর দ্বারা উদ্দেশ্য এবং আল্লাহ নিজেই নিজের নৈকট্য, দয়া ও অনুগ্রহের কোলে তাদের লালন-পালন করেন।” এজন্য শয়তানের প্রবেশাধিকার তাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না এবং শরিয়তে যে বিষয়গুলো নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য, তারা সেগুলোর দিকে পথ খুঁজে পায় না। এর উদাহরণ হলো যেমন কোনো ব্যক্তি শুধু আল্লাহর নৈকট্যের মাকাম লাভ করার জন্য খাবার ও পানীয় বর্জন করে।

তোমরা অত্যন্ত ভয়ানক একটি কথা বলে ফেলেছ এবং এটিকে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করে দিয়েছ। এমন অপদার্থ, কৃপণ ও সংকীর্ণমনা মানুষ এবং এমন বিকৃত চিন্তার অধিকারীরা তো জ্ঞানহীন। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এবং আমাদের ভাইদের নিজের সুপ্রশস্ত রহমত ও পরিপূর্ণ কুদরতের মাধ্যমে এমন সমস্ত মন্দ কাজ থেকে সুরক্ষিত রাখেন এবং নিজের রহমতের পর্দায় আমাদের অবাধ্যতা ও পাপসমূহ ঢেকে রাখেন, আমাদের তা থেকে দূরে সরিয়ে দেন এবং নিজের শাশ্বত নেয়ামত ও চিরস্থায়ী মর্যাদাসমূহের মাধ্যমে তাঁর দয়ায় আমাদের প্রতিপালন করেন। আমিন![4]

ইমাম কুশাইরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

এই দুটি হলো এমন উচ্চতর আধ্যাত্মিক হালত বা অবস্থা, যা কোনো বান্দা খওফ বা ভয় এবং রেজা বা আশার সাধারণ স্তর অতিক্রম করে আরও উঁচুতে আরোহণ করার পর অর্জিত হয়। সুতরাং, আরিফ বা তত্ত্বজ্ঞানীদের উচ্চতর মাকামে কাবজ বা সংকোচনের অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন আধ্যাত্মিক পথের প্রাথমিক স্তরের সাধকদের ক্ষেত্রে খওফ বা ভয়ের অবস্থান; পক্ষান্তরে তত্ত্বজ্ঞানীদের সুউচ্চ স্তরে বাস্ত বা প্রসারণের অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন প্রাথমিক সাধকদের ক্ষেত্রে রেজা বা আশার অবস্থান। ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদি কাবজ এবং বাস্তের অর্থ মূলত খওফ এবং রেজার আলোকেই বর্ণনা করেছেন।

কাবজ ও খওফের মাঝে এবং বাস্ত ও রেজার মাঝে গাঠনিক পার্থক্যের অন্যতম প্রধান দিক হলো— নিশ্চয়ই খওফ বা ভয় সর্বদা ভবিষ্যৎকালের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। অর্থাৎ, সাধক মূলত ভবিষ্যতে তার কোনো প্রিয় বস্তু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় করে, অথবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করে। আর ঠিক একইভাবে রেজা বা আশার বিষয়টিও সর্বদা ভবিষ্যৎ কালের সাথে যুক্ত। কারণ তা মূলত ভবিষ্যতে কোনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করার আশা করার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়। অথবা ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো বিপদ-আপদ দূর হওয়া এবং কষ্টদায়ক বিষয় থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকার ব্যাকুলতার নাম।

কাবজ বা সংকোচনের প্রকৃত হাকিকত হলো এর মূল অভ্যন্তরীণ অর্থ ও আধ্যাত্মিক প্রভাব বর্তমান সময়ের মাঝেই সরাসরি আপতিত ও বলবৎ হয়, আর ঠিক একইভাবে বাস্ত বা প্রসারণের হাকিকতও বর্তমানের সাথেই সম্পৃক্ত। সুতরাং, খওফ এবং রেজার স্তরে অবস্থানকারী সাধকের অন্তর তার এই উভয় হালতে সর্বদা তার ভবিষ্যৎ বা পরিণতির চিন্তার সাথে নিবিড়ভাবে ঝুলে থাকে। আর কাবজ ও বাস্তের সুউচ্চ মাকামে অবস্থানকারী আরিফ বা সাধকের বর্তমান সময়টি মূলত তার ওপর তৎক্ষণাৎ অবতীর্ণ এমন এক ঐশী নুর বা ওয়ারেদের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা বর্তমান মুহূর্তেই তার সমগ্র অস্তিত্বের ওপর প্রবলভাবে বিজয় লাভ করে।

অতঃপর আধ্যাত্মিক জগতের সাধকদের বিচিত্র হালত বা অবস্থার তারতম্যের ওপর ভিত্তি করেই মূলত কাবজ এবং বাস্তের ক্ষেত্রে তাঁদের গুণগত বৈশিষ্ট্যের নানাবিধ তারতম্য ঘটে থাকে। ফলে কখনো এমন কোনো শক্তিশালী ঐশী ওয়ারেদ বা তত্ত্ব অন্তরে অবতীর্ণ হয়, যা অন্তরের মাঝে এক গভীর কাবজ বা সংকোচনের সৃষ্টি করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সাধকের অন্তরে তখন অন্যান্য জাগতিক বা বাহ্যিক বিষয়সমূহ ধারণ করার মতো কিছুটা অবকাশ বা জায়গা অবশিষ্ট থাকে। কারণ সেই কাবজটি তখন তার সমগ্র অস্তিত্বকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে না। আবার সাধকদের মাঝে এমন উচ্চ স্তরের মাকবুজ বা সংকুচিত ব্যক্তিও থাকেন, যার অন্তরে তখন স্বীয় রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সেই সুনির্দিষ্ট নুরানি ওয়ারেদ ছাড়া অন্য কোনোকিছু প্রবেশ করার বিন্দুমাত্র অবকাশ বা সুযোগ থাকে না। কারণ সেই মুহূর্তে সে স্বীয় অন্তরে অবতীর্ণ ঐশী নুরের তীব্রতায় নিজের সমগ্র সত্তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠিক যেভাবে তাঁদের মধ্য থেকে কোনো কোনো উচ্চাঙ্গের সুফি-সাধক নিজের গভীর হালতের তীব্রতায় স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন, “আমি এক রুদ্ধ প্রাচীর সদৃশ।” অর্থাৎ, আমার ভেতরে এখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টির প্রবেশ করার মতো সামান্য খালি জায়গা বা অবকাশ অবশিষ্ট নেই। এ প্রসঙ্গে মহান সুফি-সাধক সাহল বিন আব্দুল্লাহ আত-তুস্তারি’র কথাটি প্রণিধানযোগ্য। যেখানে তিনি বলেছেন, “তোমরা এই মুহূর্তে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন কোরো না; কারণ তোমরা আমার এই বর্তমান হালতে আমার কথা দ্বারা বিন্দুমাত্র উপকৃত হতে পারবে না।”

অনুরূপভাবে বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের অধিকারী ব্যক্তির অবস্থাও এমন হয়। কখনো কখনো তার এই বাস্ত বা প্রসারণ সৃষ্টিগত স্বভাবকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, ফলে সে অধিকাংশ বিষয় দেখেও কোনো প্রকার অস্বস্তি বা একাকিত্ব বোধ করে না। আর সে এমন প্রসারিত হৃদয়ের অধিকারী হয় যে, বাহ্যিক কোনো অবস্থাই তার আধ্যাত্মিক স্তরে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

আমি উস্তাদ আবু আলি দাক্কাক (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, একদা সুফিদের কেউ কেউ আবু বকর আল-কাহতাবি (রহ.)-এর নিকট গেলেন। আল-কাহতাবি (রহ.)-এর এমন এক পুত্র ছিল, যে যুবকদের মতো খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত থাকত। আগন্তুক ব্যক্তি যখন ওই পুত্রের কাছে আসলেন এবং তাকে তার সমবয়সীদের সাথে এমন অনর্থক কাজে ব্যস্ত দেখলেন, তখন আল-কাহতাবি (রহ.)-এর প্রতি তার অন্তরে দয়া ও সমবেদনা জাগল। তিনি অত্যন্ত আফসোস করে বললেন, “হায় আফসোস, এই শায়খ কতই না অসহায়, যিনি এই যুবকের কারণে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন!”

পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি যখন স্বয়ং আল-কাহতাবি (রহ.)-এর মজলিসে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি শায়খকে এমন এক অবস্থায় দেখতে পেলেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল চারপাশের এই আমোদ-প্রমোদ ও খেলাধুলার কোনো খবরই তার কাছে নেই। শায়খের এমন অবিচলতা দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং বললেন, “আমি উৎসর্গিত হই তাঁর প্রতি, যাঁকে এই সুউচ্চ পাহাড়ের মতো অবিচলতা থেকে বিন্দুমাত্র নাড়ানো বা প্রভাবিত করা যায় না!”

তখন আল-কাহতাবি (রহ.) বললেন, “নিশ্চয়ই আমরা সৃষ্টির সূচনালগ্ন তথা আজাল থেকেই সমস্ত জিনিসের দাসত্ব ও বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছি।” শায়খ মূলত তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিখ্যাত সুফি-সাধক সাহল আত-তুস্তারি (রহ.)-এর একটি উক্তি বা মতবাদের দিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন।

আর মনের ভেতর কাবজ তথা আধ্যাত্মিক সংকোচন তৈরি হওয়ার ন্যূনতম কারণগুলোর একটি হলো— হঠাৎ করে অন্তরে এমন একটি ভাব বা ওয়ারিদ আপতিত হওয়া, যা কোনো তিরস্কারের ইঙ্গিত বহন করে, অথবা তা এমন কোনো ইশারা বা সংকেত প্রকাশ করে, যার কারণে অন্তরে এক প্রকার শাসন বা আদবের অনুভূতি তৈরি হয়। যার ফলে অবধারিতভাবেই অন্তরে কাবজ বা সংকোচনের সৃষ্টি হয়।

আবার কখনো কখনো অন্তরে আপতিত কতিপয় ভাবের কারণ এমনও হতে পারে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ নৈকট্যের ইঙ্গিত দেয় কিংবা কোনো বিশেষ অনুগ্রহের আগমন বার্তা ও সাদর সম্ভাষণ প্রকাশ করে, যার ফলে অন্তরে বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণের সৃষ্টি হয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রত্যেক ব্যক্তির কাবজ বা সংকোচন ঘটে তার লাভকৃত বাস্ত বা প্রসারণের পরিমাপ অনুযায়ী, আর তার বাস্ত বা প্রসারণ ঘটে তার কাবজ বা সংকোচনের গভীরতা অনুযায়ী।

তবে কখনো কখনো এমন কাবজ বা সংকোচনেরও সম্মুখীন হতে হয় যা এর অধিকারীর কাছে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও জটিল মনে হয়। সে তার অন্তরে এক প্রকার তীব্র সংকোচন অনুভব করে ঠিকই, কিন্তু এর প্রকৃত কারণ বা উৎস কী এবং কেন এই কাবজের সৃষ্টি হলো, তা সে বুঝতে পারে না। এমতাবস্থায় কাবজের অধিকারীর জন্য করণীয় হলো— সম্পূর্ণরূপে তাসলিম তথা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি আত্মসমর্পণ করে ধৈর্যধারণ করা, যতক্ষণ না এই কঠিন সময়টি কেটে যায়। কারণ, সে যদি নিজের থেকে কৃত্রিম উপায়ে এই অবস্থাকে দূর করার চেষ্টা করে, তবে নিজের ইচ্ছাধীন পদক্ষেপের কারণে তার ওপর আপতিত এই সংকটকাল আরও দীর্ঘায়িত হবে। এমনকি তার এই জবরদস্তিমূলক চেষ্টা বা অসন্তোষকে আধ্যাত্মিক জগতের এক প্রকার বেয়াদবি বা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। আল্লামা ইবনে আব্বাস তাঁর ‘ইহকামুদ দালালাহ’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৩৭ পৃষ্ঠায় ইঙ্গিত করেছেন যে, মুরিদ যদি এই নিয়মে সবর না করে নিজের মনগড়া চেষ্টা চালায়, তবে সুফিদের পরিভাষায় তাকে বেয়াদব হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আর বান্দা যদি এই অবস্থায় আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজেকে সঁপে দেয় এবং আত্মসমর্পণ করে, তবে খুব শীঘ্রই এই কাবজ বা সংকোচন দূর হয়ে যাবে। কারণ মহান ও পবিত্র আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ইরশাদ করেছেন, “আর আল্লাহই সংকুচিত করেন এবং প্রসারিত করেন।”[5]

আর কখনো কখনো বান্দার অন্তরে হঠাৎ করেই বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণ আপতিত হয় এবং এর অধিকারী ব্যক্তি আকস্মিকভাবে এমন এক অবস্থার মুখোমুখি হয়, যার কোনো দৃশ্যমান কারণ সে খুঁজে পায় না, যা তাকে আন্দোলিত ও বিচলিত করে তোলে। এমতাবস্থায় তার করণীয় হলো স্থিরতা অবলম্বন করা এবং আদব রক্ষা করার প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি রাখা। কারণ এই অবস্থায় তার জন্য এক বিরাট বিপদ ও গোপন পরীক্ষার আশঙ্কা রয়েছে, তাই আধ্যাত্মিক প্রসারণের অধিকারীর উচিত আল্লাহর সেই গোপন কৌশল বা পরীক্ষা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকা।

যেমন তাদের কেউ কেউ বলেছেন, “আমার জন্য বাস্ত তথা প্রসারণের একটি দরেজা উন্মুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে একটি সামান্য পদস্খলন বা ত্রুটির কারণে আমাকে আমার মাকাম তথা আধ্যাত্মিক স্তর থেকে মাহরুম করা হয়।”

আর এই কারণেই সুফি মনীষীগণ বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর বিছানায় বা মাকামে স্থির থাকো এবং অতিরিক্ত মাত্রার ইনবিসাত তথা ধৃষ্টতা ও অতি-প্রফুল্লতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো।”

প্রকৃত গবেষক ও সুফি তত্ত্বজ্ঞানীগণ কাবজ এবং বাস্ত, এই উভয় অবস্থাকেই এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, এই দুই অবস্থার ঊর্ধ্বে রয়েছে বান্দার ইশতিহলাক তথা আল্লাহর সত্তায় নিজেকে বিলীন করে দেওয়া এবং হাকিকত তথা পরম সত্যের মাঝে প্রবিষ্ট হওয়া। যা এই দুই অবস্থার চেয়েও অনেক উচ্চতর বিষয়। বিখ্যাত সুফি গ্রন্থ ‘তাহজিবুল আসরার’-এর ৫৮৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাধকের আধ্যাত্মিক যাত্রায় প্রথমে কাবজ, এরপর বাস্তের অবস্থান, আর এরপরেই আসে তামকিন তথা পরম স্থিতি বা সুদৃঢ় অবস্থানের মূল ক্ষেত্র। সেই উচ্চতর স্তরের তুলনায় কাবজ ও বাস্ত এক প্রকার ‘ফকর’ তথা আধ্যাত্মিক দৈন্যতা এবং ‘জুর’ তথা ক্ষতির শামিল।

আমি শায়খ আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি হুসাইন বিন ইয়াহইয়া (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি জাফর বিন মুহাম্মদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি হজরত জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, “খওফ তথা ভয় আমাকে সংকুচিত তথা কাবজ করে এবং রেজা তথা আশা আমাকে প্রসারিত তথা বাস্ত করে। আর হাকিকত তথা পরম সত্য আমাকে একত্রিত করে এবং আল-হক তথা স্বয়ং আল্লাহ আমাকে পৃথক করেন। যখন আল্লাহ ভয়ের মাধ্যমে আমাকে সংকুচিত করেন, তখন তিনি আমার অস্তিত্বকে আমার কাছ থেকে ফানা তথা বিলীন করে দেন। আর যখন তিনি আশার মাধ্যমে আমাকে প্রসারিত করেন, তখন তিনি আমাকে আমার অস্তিত্বের কাছেই ফিরিয়ে দেন। যখন তিনি হাকিকত তথা পরম সত্যের মাধ্যমে আমাকে একত্রিত করেন, তখন তিনি আমাকে তাঁর দরবারে হাজির করেন। আর যখন তিনি সত্যের প্রকাশের মাধ্যমে আমাকে পৃথক করেন, তখন তিনি আমাকে আমার ছাড়া অন্য সবকিছুর অবলোকন করান এবং আমার সত্তাকে আমার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দেন। সুতরাং আল্লাহই আমার এই পুরো অবস্থার মাঝে এমন এক চালিকাশক্তি, যিনি আমার কোনো নড়াচড়া ছাড়াই আমাকে পরিচালিত করেন। তিনি আমার এমন এক নিঃসঙ্গতা দূরকারী, যিনি আমাকে একাকী হতে দেন না, আবার তিনিই আমার এমন এক আপনজন, যিনি আমাকে আত্মহারা করে রাখেন। আমি আমার উপস্থিতির মাঝেই আমার অস্তিত্বের আসল স্বাদ আস্বাদন করি। অতএব আল্লাহ তাঁর দয়ায় আমাকে আমার নিজের থেকে ফানা তথা বিলীন করে দিয়ে আনন্দিত করুন, অথবা আমার এই ফানা বা বিলীন হওয়াকে আমার কাছ থেকে আড়াল করে রেখে আমাকে প্রশান্তি দান করুন।” আর এই পুরো অবস্থাটি মূলত ফানা তথা আত্মবিলুপ্তির মাকামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বান্দার নিজের কোনো স্বাদ বা মগ্নতা বাকি থাকে না।[6]

দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

স্পষ্ট থাকা উচিত যে, কাবজ ও বাস্ত হলো আধ্যাত্মিক অবস্থার এমন দুটি রূপ, যা বান্দার নিজস্ব শক্তি ও ক্ষমতার বাইরে। বান্দা না এই অবস্থাগুলোর আগমনের ওপর কোনো ক্ষমতা রাখে, আর না তা দূর করার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আর আল্লাহই (অবস্থা) সংকুচিত করেন এবং প্রসারিত করেন।” সুতরাং, কাবজ ও বাস্ত সম্পূর্ণভাবে আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণ তথা ইখতিয়ারের মধ্যে নিহিত।

কাবজ হলো সেই অবস্থার নাম, যা হিজাব তথা পর্দার মতো অন্তরের ওপর ছেয়ে যায় এবং বাস্ত হলো সেই গুণ বা ক্যাইফিয়তের নাম যা অন্তর থেকে হিজাব বা পর্দা সরিয়ে দেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দুটি অবস্থার কোনোটির ওপরই বান্দার নিজস্ব কোনো ইখতিয়ার বা নিয়ন্ত্রণ নেই। আরিফ তথা তত্ত্বজ্ঞানীদের হালত বা আধ্যাত্মিক অবস্থার মাঝে কাবজের অবস্থান হলো ঠিক তেমন, যেমনটি মুরিদ বা প্রাথমিক স্তরের সাধকদের অবয়বে খওফ তথা ভয়ের অবস্থান। আর আহলে মারেফাত তথা মারেফাত অর্জনকারীদের হালতের মাঝে বাস্তের অবস্থান হলো ঠিক তেমন, যেমনটি মুরিদদের মাঝে রেজা তথা আশা-আকাঙ্ক্ষার অবস্থান। এই দলটির গবেষক সুফি মনীষীগণ এই সংজ্ঞার আলোকেই এর মর্মার্থ বর্ণনা করে থাকেন।

মাশায়েখে তরিকত তথা আধ্যাত্মিক পথের পথপ্রদর্শকগণের একটি দল বলেন যে, কাবজের মাকাম বা স্তর বাস্তের স্তরের চেয়ে অনেক বেশি সুউচ্চ ও মহান। এর সপক্ষে তারা যুক্তি দেখান যে, পবিত্র কুরআন মাজিদে কাবজের কথা বাস্তের আগে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, কাবজের মাঝে এক প্রকার গলন, চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া এবং আল্লাহর কাহহারি তথা প্রতাপশালী গুণের প্রকাশ থাকে। পক্ষান্তরে বাস্তের মাঝে থাকে নওয়াজিশ তথা অনুগ্রহ ও মেহেরবানির প্রকাশ। আর অনিবার্যভাবেই মানবীয় বশরিয়ত বা প্রবৃত্তির নিকৃষ্ট স্বভাবগুলোকে দমন করা এবং নফস বা আত্মাকে পরাভূত করা, আল্লাহর পক্ষ থেকে কেবল লালন-পালন ও দয়া পাওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম। কারণ, নফসের প্রাবল্য মানুষের জন্য একটি মস্ত বড়ো হিজাব বা পর্দা।

আবার সুফিদের আরেকটি দল বলেন যে, বাস্তের মাকামটি কাবজের মাকামের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। এর সপক্ষে তারা যুক্তি দেন যে, পবিত্র কুরআন মাজিদে কাবজের উল্লেখ আগে আসা মূলত বাস্তের শ্রেষ্ঠত্বেরই একটি প্রমাণ। কারণ আরবদের এটি একটি প্রথাগত নিয়ম যে, তারা তুলনামূলক কম মর্যাদাপূর্ণ বা সাধারণ জিনিসটিকে আগে বর্ণনা করে এবং যেটি অধিকতর ফজিলত বা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, সেটিকে পরে নিয়ে আসে। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী রয়েছেفَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ وَمِنْهُم مُّقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ – “অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কেউ আল্লাহর হুকুমে নেক কাজে অগ্রগামী।”[7] এখানে যেমন গুণ বিচারে অগ্রগামী দলকে সবার শেষে আনা হয়েছে, বাস্তের বিষয়টিও ঠিক তেমনই।

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ – “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে তাদের পছন্দ করেন।”[8]

এবং তিনি আরও ইরশাদ করেছেনيَا مَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ – “হে মরিয়ম, তুমি তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও এবং সেজদা করো ও রুকুকারীদের সাথে রুকু করো।”[9]

মাশায়েখে তরিকত তথা আধ্যাত্মিক পথের পথপ্রদর্শকগণ বলেন যে, বাস্তের মধ্যে বান্দা যে সুরুর তথা আনন্দ লাভ করে তা আসলে এক ধরনের তাকলিফ বা কৃত্রিমতার বহিঃপ্রকাশ। আর কাবজের মধ্যে বান্দা যে কাঠিন্য বা সংকীর্ণতা অনুভব করে, তাও কৃত্রিমতাপূর্ণ। কিন্তু আরিফ তথা তত্ত্বজ্ঞানীদের যে সুরুর, তা কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই সরাসরি মারেফাত বা আধ্যাত্মিক সংযোগ থেকে অর্জিত হয়। যেখানে বান্দা নিজের কৃত্রিম চেষ্টা এবং ফশল তথা আত্মবিচ্ছিন্নতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। অতএব, আধ্যাত্মিক জগতের এই উচ্চতর স্তরে ‘ওকুফ’ তথা পরম স্থিরতা লাভ করা, ‘ফিরাক’ তথা পৃথকীকরণ বা সাধারণ স্তরের স্তরান্তরের চেয়ে অনেক গুণ উত্তম।

আমার শায়খ ও মুরশিদ বলতেন যে, কাবজ ও বাস্ত মূলত একই অর্থ বহন করে। কারণ এই দুটি অবস্থাই মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার ওপর আপতিত হয় এবং এই আধ্যাত্মিক ভাবসমূহ যখন বান্দার অন্তরের গোপন গহীনে প্রভাব বিস্তার করে, তখন কোনো কোনো সময় বান্দার বাতিন তথা অভ্যন্তরীণ সত্তা সুরুর বা আনন্দে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে এবং তার নফস বা কুপ্রবৃত্তি সম্পূর্ণরূপে পরাভূত ও শান্ত হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো এর বিপরীত রূপও দেখা যায়। যেখানে নফস প্রবল ও উৎফুল্ল হয়ে ওঠে আর বাতিন বা অন্তর তীব্র সংকীর্ণতা অনুভব করে। সুতরাং, একটি সুনির্দিষ্ট মাকামে যেখানে নফসের জন্য আধ্যাত্মিক প্রশান্তি বা প্রশস্ততা থাকে, অপর মাকামে ঠিক তার উল্টো চিত্র হিসেবে বাতিন বা অন্তরের জন্য আধ্যাত্মিক প্রশস্ততার সৃষ্টি হয়। অতএব, এই গভীর আধ্যাত্মিক নিগূঢ় তত্ত্বের বাইরে গিয়ে যে ব্যক্তি কেবল নিজের মতো করে কাবজ ও বাস্তের বাহ্যিক ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, সে মূলত নিজের মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে।

বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন যে,قَبْضُ الْقُلُوْبِ فِيْ بَسْطِ النُّفُوْسِ وَبَسْطُ الْقُلُوْبِ فِيْ قَبْضِ النُّفُوْسِ – “নফসের বা কুপ্রবৃত্তির অতি-প্রফুল্লতা ও প্রশস্ততার মাঝেই অন্তরের কাবজ বা সংকোচন লুকিয়ে থাকে, আর নফসের দমনের মাঝেই অন্তরের বাস্ত তথা আধ্যাত্মিক প্রসারণ প্রকাশ পায়।” অতএব, যে অন্তরের কুপ্রবৃত্তি সম্পূর্ণরূপে অবদমিত থাকে, তার কাবজ বা সংকোচনও যে-কোনো ধরনের ত্রুটি ও ফাটল থেকে মুক্ত থাকে। তার বাতিন বা অভ্যন্তরীণ সত্তা সর্বদা জওয়াল তথা আধ্যাত্মিক পতন বা অবক্ষয় থেকে সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত থাকে। এর গূঢ় কারণ হলো— মহব্বত বা ভালোবাসার রাজ্যে প্রিয়তম বা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে শাসন করাটা মূলত এক প্রকার অসীম খোদাভীতি ও ঐশ্বরিক আত্মমর্যাদার প্রতীক। আর আধ্যাত্মিক প্রসারণ বা বাস্তের মাঝে যে হালকা তিরস্কার বা ‘মুআতাবাত’ অনুভূত হয়, তা মূলত প্রিয়তমের পক্ষ থেকে গভীর মনোযোগের একটি বড়ো নিদর্শন।

যেমন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম সারা জীবন কেবল রোনাজারি ও ক্রন্দন করতেন এবং হজরত ইসা আলাইহিস সালাম সর্বদা মৃদু হাসতেন। কারণ হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কাবজ বা সংকোচনের মাকামে রাখা হয়েছিল, আর হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে রাখা হয়েছিল বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের মাকামে। তারা দুজন যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন হজরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম বলতেন, “হে ইসা, আপনি কি আল্লাহর ‘কাতিয়্যত’ তথা তাৎক্ষণিক বিচার বা বিচ্ছেদ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করছেন, যার কারণে সর্বদা হাসছেন?” জবাবে হজরত ইসা আলাইহিস সালাম বলতেন, “হে ইয়াহইয়া, আপনি কি আল্লাহ তায়ালার অসীম রহমত ও দয়া থেকে নিরাশ হয়ে গেছেন, যার কারণে সর্বদা কাঁদছেন? কারণ আপনার এই অবিরত ক্রন্দন যেমন আল্লাহর আজলি বা শাশ্বত হুকুমকে পরিবর্তন করতে পারবে না, ঠিক তেমনি আমার এই হাস্যোজ্জ্বলতাও আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত কাজাকে পাল্টে দেবে না।” অতএব, আধ্যাত্মিকতার এই সুউচ্চ পর্যায়ে না কোনো কাবজ থাকে আর না কোনো বাস্ত থাকে, না কোনো তামস তথা আধ্যাত্মিক বিলুপ্তি, না কোনো উনস তথা ঐশ্বরিক নৈকট্যের প্রশান্তি, না কোনো আত্মবিলোপ, না কোনো আধ্যাত্মিক সচেতনতা, না কোনো লাহাতি তথা সংযোগ, না কোনো মাহাতি তথা সম্পূর্ণ বিনাশ, না কোনো আজজ তথা অক্ষমতা এবং না কোনো জাহল তথা অজ্ঞতা থাকে। এর কোনোটিই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ছাড়া আর কোথাও থেকে ঘটে না। অর্থাৎ, না কোনো কাবজ থাকে আর না কোনো বাস্ত থাকে, না কোনো থামা বা থমকে যাওয়া থাকে, না কোনো মহব্বত তথা ভালোবাসা প্রকাশ করা থাকে, না কোনো মিটে যাওয়া বা বিলীন হওয়া থাকে, না কোনো আধ্যাত্মিক সজ্ঞানতা থাকে, না কোনো পরম সত্য থাকে, না কোনো বিনাশ থাকে, না কোনো অক্ষমতা থাকে আর না কোনো অজ্ঞতা থাকে; এর সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।[10]

ইমাম হজরত শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

এই দুটি হলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থা; আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন وَاللَّهُ يَقْبِضُ وَيَبْسُطُ  – “আর আল্লাহই সংকুচিত করেন এবং প্রসারিত করেন।”

এই দুটি অবস্থা সম্পর্কে শায়খগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং তারা ইশারা বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে কাবজ ও বাস্তের আলামত তথা লক্ষণসমূহ ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে আমি তাদের এই আলোচনার মাঝে এর হাকিকত তথা প্রকৃত রহস্যের কোনো উন্মোচন দেখতে পাইনি; কারণ তারা কেবল ইশারার মাধ্যমেই ক্ষান্ত হয়েছেন, আর এই ইশারাটুকুই আহল তথা আধ্যাত্মিক পথের যোগ্য অধিকারীদের সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

কিন্তু আমি এই দুই অবস্থা সম্পর্কে আলোচনাকে আরও একটু প্রসারিত ও পরিপূর্ণ করতে পছন্দ করছি; যাতে করে এই বিষয়ের কোনো সত্যান্বেষী পাঠক উপকৃত হতে পারেন এবং তিনি এই বিষয়ের একটি বিস্তারিত বক্তব্য লাভ করতে ভালোবাসেন।

আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই কাবজ ও বাস্তের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মৌসুম বা সময় এবং একটি অবধারিত বা নির্ধারিত ওয়াক্ত বা মুহূর্ত রয়েছে; যা সেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে কখনো ঘটে না এবং সেই সময়ের পরেও তা প্রকাশ পায় না।

আর এই দুটির ওয়াক্ত তথা সময় এবং মৌসুম হলো মূলত মহব্বতে খাসা তথা বিশেষ ঐশ্বরিক ভালোবাসার প্রাথমিক অবস্থাগুলোর মাঝে, তার শেষ সীমায় বা চূড়ান্ত মাকামে নয়। আর তা মহব্বতে আম্মা তথা সাধারণ মুমিনদের ভালোবাসার মাকামেরও আগের বিষয়। যা ইমানের হুকুম বা বিধান দ্বারা সুদৃঢ় থাকে। কারণ, সেই স্তরের সাধারণ মুমিনদের তো কোনো কাবজ থাকে না, আর না কোনো বাস্ত থাকে, বরং তাদের যা থাকে তা হলো কেবল খওফ তথা সাধারণ ভয় এবং রেজা তথা সাধারণ আশা।

আর কখনো কখনো একজন সাধারণ মানুষ নিজের মাঝে কাবজের একটি সাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থা এবং বাস্তের মতো একটি অবস্থার মুখোমুখি হয় এবং সে সেটাকে প্রকৃত কাবজ ও বাস্ত মনে করে বসে; অথচ বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং তার ওপর যে অবস্থাটি আপতিত হয় তা হলো মূলত জাগতিক দুশ্চিন্তা, যাকে সে ভুলবশত কাবজ মনে করে নেয়। অথবা তা হলো এক প্রকার মানসিক উত্তেজনা ও স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক চিত্তবিনোদনের প্রফুল্লতা, যাকে সে ভুল করে বাস্ত ভেবে বসে। আর এই জাগতিক দুশ্চিন্তা ও মানসিক প্রফুল্লতা মূলত নফসের বা প্রবৃত্তির নিজস্ব ক্ষেত্র এবং তার মূল জওহর বা সারবত্তা থেকেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। আর এটি ততক্ষণ পর্যন্ত ঘটতেই থাকে, যতক্ষণ নফসের মাঝে আম্মারা তথা মন্দ কাজের নির্দেশদাতা প্রবৃত্তির কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্য বা অবশিষ্টাংশ বাকি থাকে।

যার কারণে নফসের বা প্রবৃত্তির মাঝে এক প্রকার স্পন্দন বা আলোড়ন এবং জাগতিক দুশ্চিন্তার উদ্রেক ঘটে। আর এই দুশ্চিন্তা ও মানসিক উত্তেজনা মূলত নফসের তীব্র ক্ষোভ ও তার দহন থেকেই সৃষ্টি হয়। আবার নফসের এই মানসিক প্রফুল্লতা মূলত মানুষের ভেতরের স্বভাবজাত সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ফেঁপে ওঠার কারণে প্রকাশ পায়।

অতঃপর বান্দা যখন মহব্বতে আম্মা তথা সাধারণ মুমিনদের ভালোবাসার হালত বা অবস্থা থেকে আরও উন্নত হয়ে মহব্বতে খাস্সা তথা বিশেষ ঐশ্বরিক ভালোবাসার প্রাথমিক স্তরগুলোর দিকে অগ্রসর হয়, তখন সে এক সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক হালত বা ‘সাহেবে হাল’-এ পরিণত হয় এবং সে এক পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয়। তার নফসে লাউওয়ামা তথা অনুতপ্ত আত্মা জাগ্রত হয় এবং সেই স্তরে তার ওপর পর্যায়ক্রমে কাবজ ও বাস্তের আগমন ঘটতে থাকে। এর মূল কারণ হলো— বান্দা যখন ইমানের সাধারণ স্তর বা রুতবা থেকে আরও উন্নীত হয়ে নিশ্চিত বিশ্বাসের উচ্চতর মাকাম বা ‘রুতবাতুল ইয়াকিন’-এ পৌঁছায় এবং মহব্বতে খাস্সার স্তরে প্রবেশ করে। তখন স্বয়ং আল্লাহ পাক তার অন্তরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা কখনো ভয়ের দ্বারা তাকে সংকুচিত তথা কাবজ করেন এবং কখনো আশার দ্বারা তাকে প্রসারিত তথা বাস্ত করেন।

এই প্রসঙ্গে আল-ওয়াসিতি (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তোমার নিজের আমল বা আমিত্বের সবকিছু থেকে সংকুচিত তথা কাবজ করে নেন এবং তিনি তোমাকে তাঁর নিজের মেহেরবানির দ্বারা প্রসারিত তথা বাস্ত করেন।” এই উক্তিটি ইমাম আস-সুলামী তাঁর ‘তাফসির’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন।

আন-নুরি (রহ.) এই বিষয়ে বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তাঁর নিজের সত্তার মহব্বতের দ্বারা সংকুচিত তথা কাবজ করেন এবং তিনি তাঁর নিজের দয়া ও অনুগ্রহের দ্বারা তোমাকে প্রসারিত তথা বাস্ত করেন।” এই বক্তব্যটিও ইমাম আস-সুলামী তাঁর ‘তাফসির’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৭৪ পৃষ্ঠায় নিয়ে এসেছেন।

আর জেনে রাখো, নিশ্চয় কাবজের এই উপস্থিতি মূলত নফস বা কুপ্রবৃত্তির মন্দ বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকাশ পাওয়া এবং অন্তরের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করার কারণে ঘটে থাকে। আর বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের প্রকাশ ঘটে অন্তরের পবিত্র গুণাবলি প্রকাশ পাওয়া এবং নফসের ওপর তার বিজয়ী হওয়ার কারণে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার মাঝে নফসে লাউওয়ামা বা অনুতপ্ত আত্মার অবস্থান পরাভূত বা কখনো বিজয়ী অবস্থায় বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই নফসের হুকুম বা অবস্থা পরিবর্তনের আলোকেই কাবজ ও বাস্তের পর্যায়ক্রমিক আবর্তন ঘটতে থাকে।

আর যে ব্যক্তি ‘সাহেবে কলব’ তথা পবিত্র অন্তরের অধিকারী, সে মূলত এক প্রকার ‘হিজাবে নুরানি’ তথা আলোকময় পর্দার নিচে অবস্থান করে। কারণ, তার অন্তরের অস্তিত্ব তখনও বাকি থাকে। আর যে ব্যক্তি ‘সাহেবে নফস’ তথা প্রবৃত্তির অনুসারী, সে মূলত ‘হিজাবে জুলমানি’ তথা অন্ধকারের পর্দার নিচে নিমজ্জিত থাকে; কারণ তার মাঝে নফসের অস্তিত্বের প্রবলতা থাকে। অতঃপর বান্দা যখন তার অন্তরের এই আধ্যাত্মিক স্তর থেকে আরও অনেক ঊর্ধ্বে আরোহণ করে এবং নিজের ভেতরের সমস্ত হিজাব বা পর্দা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে যায়, তখন কোনো সুনির্দিষ্ট হালত বা আধ্যাত্মিক অবস্থা আর তাকে সীমাবদ্ধ বা বন্দি করে রাখতে পারে না। আর এমতাবস্থায় সে কাবজ ও বাস্তের যে-কোনো ধরনের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যায়। সুতরাং, সেই উচ্চতর মাকামে বান্দা আর কোনো কাবজ অনুভব করে না এবং কোনো বাস্তের মুখোমুখিও হয় না। যতক্ষণ না সে এই নশ্বর জগতের বাহ্যিক অস্তিত্ব এবং তার সমস্ত নুরানি বা আলোকময় অবয়ব থেকে সম্পূর্ণরূপে ফানা তথা বিলীন হয়ে যায়।

সে ব্যক্তি কেবল অন্তরের স্তর বা মাকামে অবস্থান করে এবং নফস বা প্রবৃত্তি ও অন্তরের হিজাব বা পর্দা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে পরম সত্যের অনুসন্ধান লাভ করে।

অতঃপর বান্দা যখন ফানা তথা আধ্যাত্মিক বিলুপ্তি থেকে পুনরায় বাকা তথা ঐশ্বরিক স্থায়িত্বের জগতে ফিরে আসে, তখন সে এমন এক নুরানি বা আলোকময় অস্তিত্ব লাভ করে, যা মূলত অন্তরেরই একটি পরিচ্ছন্ন রূপ। ফলে সেই সময়েও তার ওপর পুনরায় কাবজ ও বাস্তের আবর্তন ঘটতে থাকে এবং যতক্ষণ সে ফানা ও বাকার এই দোলাচলের মাঝে খলাস তথা মুক্তি না পায়, ততক্ষণ এই অবস্থা চলতে থাকে। আর যখন সে এই স্তর অতিক্রম করে চূড়ান্ত স্থায়িত্ব লাভ করে, তখন তার আর কোনো কাবজ থাকে না এবং কোনো বাস্তও থাকে না।

এই প্রসঙ্গে সুফি মনীষী ফারিস (রহ.) বলেছেন, “প্রথমে কাবজ, অতঃপর বাস্ত, আর এরপরেই আসে এমন এক সুদৃঢ় অবস্থান যেখানে না কোনো কাবজ থাকে আর না কোনো বাস্ত থাকে।” বিখ্যাত সুফি স-ধক আল-খারকুশি তাঁর ‘তাহজিবুল আসরার’ গ্রন্থের ৩৮৩ পৃষ্ঠায় এই উক্তিটি বর্ণনা করেছেন। আর এর গূঢ় কারণ হলো— কাবজ ও বাস্তের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত সাধারণ অস্তিত্ব বা ওজুদের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে; সুতরাং বান্দা যখন ফানা ও বাকার উচ্চতর মাকামে উন্নীত হয়, তখন আর এই কাবজ ও বাস্তের কোনো অস্তিত্বই বাকি থাকে না।

অতঃপর বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের ক্ষেত্রে অতি-প্রফুল্লতা বা ইশরাতের কারণে কখনো কখনো বান্দা এক প্রকার শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে; আর তা মূলত এই কারণে ঘটে থাকে যে, যখন অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ ভাব বা ওয়ারিদ আপতিত হয়, তখন মুরিদ বা সাধকের অন্তর আনন্দ, উল্লাস ও সুসংবাদে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় নফস বা প্রবৃত্তি গোপনে কান পেতে সেই আধ্যাত্মিক আনন্দের কিয়দাংশ বা নিজের অংশটুকু চুরি করে নেয়; যার ফলে নফস তার স্বভাবজাত অবাধ্যতা ও প্রফুল্লতার কারণে সীমালঙ্ঘন করে বসে এবং বাস্তের এই মাকাম বা স্তরে অতিরিক্ত মাত্রায় নিশাত বা ধৃষ্টতা প্রকাশ করে। ফলে নফসের এই ধৃষ্টতার সমপরিমাণ শাস্তি বা জাজা হিসেবে তার ওপর পুনরায় তীব্র কাবজ বা সংকোচন চেপে বসে।

আর প্রকৃতপক্ষে যে-কোনো কাবজ বা সংকোচনের গভীর অনুসন্ধান বা ফিতশ করলে দেখা যায়, তা মূলত নফসের বা কুপ্রবৃত্তির কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট নড়াচড়া বা অসদাচরণের কারণেই প্রকাশ পেয়ে থাকে। আর নফস যদি সম্পূর্ণরূপে আদব বা শরিয়তের শাসনে সুশৃঙ্খল হয়ে যায় এবং কোনো প্রকার অবাধ্যতা ও কখনো কখনো পাপাচারে লিপ্ত না হয়, তবে কাবজের অধিকারী ব্যক্তি সর্বদা তার অন্তরে এক প্রকার আধ্যাত্মিক রুহ বা প্রশান্তি এবং উনস তথা ঐশ্বরিক নৈকট্যের স্বাদ লাভ করতে থাকে। আর এমতাবস্থায় সে এক সুষম ভারসাম্য বা ই’তিদাল রক্ষা করতে সমর্থ হয়, যা মূলত কাবজের কঠিন দরজাকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়। আর এই পুরো অবস্থাটি মূলত আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন, “যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য আফসোস না করো এবং তিনি তোমাদের যা দান করেছেন তার জন্য অতি আনন্দে অহংকারী না হও।”[11]

সুতরাং, অন্তরের গোপন গহীনে এবং রুহ বা আত্মার ওপর আপতিত এই আধ্যাত্মিক আনন্দ বা ফাওয়ারিদুল ফরাহ যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে, ততক্ষণ তা কোনোভাবেই আড়াল বা দূর হয়ে যায় না।

আর এই আধ্যাত্মিক আনন্দের সূক্ষ্ম ভাব তখন আর কাবজের দাবিদার থাকে না, বিশেষ করে যখন এই আনন্দের ভাবটি সরাসরি আল্লাহ তায়ালার দরবারে আশ্রয় বা আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করে। আর বান্দা যদি এই আনন্দের মুহূর্তে আল্লাহর দিকে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে না দেয় বা আশ্রয় না নেয়, তবে নফস বা প্রবৃত্তি সেই আনন্দের মাঝ থেকে নিজের অংশটুকু লুফে নেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। যার ফলে সাধক সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় যা তাকে পূর্বে দেওয়া হয়েছিল। আর এটিই হলো অন্যতম সূক্ষ্ম গুনাহ, যা অবধারিতভাবে তীব্র কাবজের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবং নফসের বা কুপ্রবৃত্তির এই ধরনের বিভিন্ন সূক্ষ্ম চালচলন ও তার বৈশিষ্ট্যসমূহের মাঝেই মূলত কাবজ বা সংকোচনের বহুবিধ কারণ সুপ্ত থাকে।

অতঃপর খওফ তথা সাধারণ ভয় এবং রেজা তথা সাধারণ আশা থেকে কোনো অবস্থাতেই আধ্যাত্মিক পথের পথিক তথা সাহেবে কাবজ ও সাহেবে বাস্ত মাহরুম বা মুক্ত থাকেন না; কারণ এই ভয় ও আশা মূলত ইমানের অপরিহার্য শর্ত বা রুকন, যা কোনোভাবেই বিলুপ্ত হতে পারে না। আর আরিফ বা তত্ত্বজ্ঞানীদের উচ্চতর স্তরে যখন উনস তথা ঐশ্বরিক নৈকট্যের প্রশান্তি এবং হাইবাত তথা গভীর সম্ভ্রম ও খোদাভীতি প্রকাশ পায়, তখন প্রাথমিক স্তরের সাধারণ কাবজ ও বাস্তের অবসান ঘটে। কারণ নিশ্চিত বিশ্বাসের প্রাবল্যের কারণে তখন অন্তরের সেই সাধারণ অনুভূতি বা কাবজ-বাস্তের অংশটি সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। আর বান্দা যখন ফানা তথা আধ্যাত্মিক বিলুপ্তি ও বাকা তথা ঐশ্বরিক স্থায়িত্বের মাকামে আরোহণ করে এবং তার নৈকট্য পূর্ণতা পায়, তখন সে কলবের সমস্ত হিজাব ও সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি লাভ করে।

আর বাতিন বা অভ্যন্তরীণ সত্তার ওপর আপতিত এই কাবজ ও বাস্তের অবস্থা সুফিদের কতিপয় দলের কাছে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও জটিল মনে হয় এবং এর সঠিক পথ বা কারণ তারা সহজে অনুধাবন করতে পারে না। আর এই কাবজ ও বাস্তের প্রকৃত রহস্য কেবল সেই ব্যক্তিই সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন, যিনি ‘ইলমুল হাল’ তথা আধ্যাত্মিক অবস্থার জ্ঞানে পরিপক্বতা লাভ করেছেন এবং যিনি নিজের মাকাম বা স্তরের জ্ঞানে সুদৃঢ়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা ও মাকামের জ্ঞানে পরিপক্ব নন, তার কাছে এই কাবজ ও বাস্তের আসল কারণ কখনোই স্পষ্ট হয় না। আর এই কারণেই অনেক সময় সাধারণ স্তরের সাধক নফসের জাগতিক দুশ্চিন্তা বা ‘হাম’কে ভুলবশত আধ্যাত্মিক কাবজ মনে করে বসেন এবং নফসের সাধারণ মানসিক প্রফুল্লতা বা ‘নিশাত’কে প্রকৃত বাস্ত ভেবে বিভ্রান্ত হন। আর এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কেবল সেই ব্যক্তিই সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন, যার অন্তর আল্লাহর স্মরণে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আর যে ব্যক্তির মাঝে এই প্রকৃত কাবজ ও বাস্তের আধ্যাত্মিক উপস্থিতি থাকে না এবং সে এর উচ্চতর স্তরে উন্নীত হতে পারে না, তার নফসে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত আত্মাও জাগ্রত হয় না। ফলে তার ভেতরের জওহর বা মূল স্বভাব থেকে এমন কোনো ঐশ্বরিক আগুন বা আলো উৎপন্ন হয় না, যা নফসের অবাধ্যতাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে এবং তার ওপর কাবজকে অবধারিত করে তুলবে, যতক্ষণ না তার নফসের সেই অবাধ্য প্রবৃত্তি বা ‘আহওয়াতুল হাওয়া’ থেকে বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের কোনো আলামত প্রকাশ পায়। আর বান্দা যখন এই সমস্ত স্তর সফলভাবে অতিক্রম করে, তখন তার নফস সম্পূর্ণরূপে মুতমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মায় রূপান্তরিত হয় এবং তার পর্যায়ক্রমিক কাবজ ও বাস্তের পুরো বিষয়টি তখন অন্তরের মূল স্বভাব ও তার পবিত্র গুণাবলির আলোকেই পরিচালিত হতে থাকে।

তার অন্তরের জন্য তখন কোনো কাবজ থাকে না এবং কোনো বাস্তও থাকে না; কারণ সেই অন্তর তখন রুহ বা আত্মার জ্যোতিরশ্মি তথা ‘শুয়াউ নূরি’র দ্বারা সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে, যা কুরব তথা আল্লাহর নৈকট্যের পরম শান্তিতে স্থির বা সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। অতএব, সেখানে আর কোনো কাবজ ও বাস্তের অবকাশ থাকে না।[12]

ইবনে আরাবি (রহ.)-এঁর ভাষ্য:

ইবনে আরাবি (রহ.) স্বভাবতই কবিতার মাধ্যমে তাঁর আলোচনা শুরু করেছেন।

للْقَبْضِ أَسْبَابٌ وَلَكِنَّهَا … تَعْلَمُ أَوْقَاتاً وَقَدْ تُجْهَلُ

কাবজের জন্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, তবে তা কখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে জানা যায়, আবার কখনো তা সম্পূর্ণ অজানা থেকে যায়।

فَكُلُّ مَا تَعْلَمُ أَسْبَابَهُ … فَحُكْمُهُ السَّبَبُ الأَوَّلُ

সুতরাং, যে সমস্ত বিষয়ের কারণ তোমার জানা থাকে, তার হুকুম বা প্রভাব মূলত সেই প্রথম কারণটির দিকেই ধাবিত হয়।

وَكُلُّ مَا تَجْهَلُ أَسْبَابَهُ … فَلاَ تَقُلْ أَدْنَى وَلاَ أَفْضَلُ

আর যে সমস্ত বিষয়ের কারণ সম্পর্কে তুমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ, সে বিষয়ে তুমি সাধারণ বা উত্তম কোনো মন্তব্যই করতে পারো না।

فَأَفْضَلُ الْقَبْضِ إِلَيْهِ الَّذِي … يَعْرِفُهُ الأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ

অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া সবচেয়ে উত্তম কাবজ হলো সেটিই, যা আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চতর আদর্শ ব্যক্তিগণ পর্যায়ক্রমে চিনে থাকেন।

كَقَبْضِهِ الظِّلَّ إِلَيْهِ وَذَا … عَلَيْهِ أَهْلُ اللهِ قَدْ عَوَّلُوا

যেমন মহান আল্লাহ কর্তৃক নিজের দিকে ছায়াকে সংকুচিত করে নেওয়া, আর এই গভীর তত্ত্বের ওপরই আল্লাহর খাস বান্দাগণ তথা আহলেুল্লাহ সর্বদা পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা রেখেছেন।

জেনে রাখো, নিশ্চয় সুফিরা কাবজ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, এটি মূলত বর্তমান মুহূর্তে মানুষের ওপর আপতিত খওফ বা ভয়েরই একটি পরিচ্ছন্ন রূপ। কারণ, অতীত এবং ভবিষ্যতের বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত ভয় ও সতর্কতার নাম হলো খওফ, আর বর্তমান মুহূর্তে অন্তরে সরাসরি যে ভয় ও সংকীর্ণতা অর্জিত হয়, সুফিদের পরিভাষায় তাকেই কাবজ বলা হয়। আর তাদের কেউ কেউ কাবজের এই ফলাফল বা প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করতে গিয়ে বলেছেন, অন্তরের ওপর আপতিত কাবজ মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার শাসন বা ‘এতাব’ করার সংকেত বহন করে। অথবা তা কোনো অবাধ্যতার কারণে অবধারিতভাবে এক প্রকার আদব বা শাস্তি আদায়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। আবার তাদের কতিপয় মনীষী বলেছেন, কাবজ হলো এমন এক আধ্যাত্মিক হালত, যা সরাসরি খওফ তথা গভীর ভয়ের গভীরতা থেকেই উৎপন্ন হয় এবং যখন এই ভয় অন্তরে জেঁকে বসে, তখন বান্দা নিজের বুকের ভেতর এক তীব্র সংকীর্ণতা অনুভব করে। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সাহায্য করুন, আপনি স্পষ্ট জেনে রাখুন যে, নিশ্চয়ই জনাবুল ইলাহি তথা আল্লাহর মহান দরবার থেকে বান্দার ওপর যে কাবজ অবতীর্ণ হয়, তা কখনো এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টির গুণ বা বৈশিষ্ট্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না এবং তা কোনোভাবেই সৃষ্টির গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। আর এই কারণেই স্বয়ং আল্লাহ পাক পবিত্র হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ করেছেন, “আমার বান্দার অন্তরই আমাকে ধারণ করতে পারে।” অতঃপর যখন পরম সত্য বা আল্লাহ তায়ালা সেই অন্তরে বিশেষ নুরের তাজাল্লি বা প্রকাশ ঘটান, তখন বান্দার সেই বিশ্বাস বা আকিদার সুরতটি এমন এক অবস্থায় রূপ নেয়, যেন সে সম্পূর্ণরূপে সংকুচিত বা কাবজ হয়ে গেছে। আর এই অবস্থাটিই মূলত আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর সাধারণ ইবাদতকারী বান্দাদের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের অনন্য নিদর্শন। আর যদি বিষয়টি এমন না হতো, তবে তিনি কখনোই একমাত্র উপাস্য বা মাবুদ হিসেবে সাব্যস্ত হতেন না। আর তিনিই হলেন এই পুরো মহাবিশ্বের একমাত্র ইলাহ, যার এই অসীম প্রশস্ততা ও বিস্তৃতির সাথে দুনিয়ার কোনোকিছুরই কোনো তুলনা চলে না এবং প্রতিটি সৃষ্টিরই তাঁর অসীম কুদরত ও আশ্রয়ের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অতঃপর, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা বা অংশই স্ব-স্ব অবস্থান থেকে আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্বে নিমগ্ন রয়েছে এবং পরম সত্য বা আল্লাহর এই তাজাল্লি প্রতিটি সৃষ্টির যোগ্যতা অনুসারেই তার ওপর প্রকাশ পেয়ে থাকে। আর এই বিষয়টি ধারণ করার জন্য প্রতিটি সৃষ্টিই যেন তার দুই হাত বাড়িয়ে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “এমন কোনো কিছু নেই যা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না।”[13]

সুতরাং, সৃষ্টির এই জিকির বা তাসবিহ যদি কেবল তাদের নিজেদের সাধারণ চিন্তা বা ধারণার আলোকেই হতো, তবে অবধারিতভাবেই তাদের এই তাসবিহ বা প্রশংসা করার বিষয়টি এক সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ত এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা সৃষ্টি তা সহজে উপলব্ধি করতে সমর্থ হতো না। আর এই কারণেই আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন, “কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বা পবিত্রতা ঘোষণা করা বুঝতে পারো না।” অতএব, মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিসই যে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছে, তা মূলত এক পরম সত্য; যা অন্য কারোর বোঝার ওপর নির্ভর করে না। আর যখন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি এই রহস্যের গভীরতা পরিমাপ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তায়ালা মানুষের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণাকে এক প্রকার সীমাবদ্ধ বা ‘মহসুরু’ হিসেবে গণ্য করেন। আর এই কারণেই তিনি এই পবিত্র আয়াতের শেষাংশে নিজের গুণবাচক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে নিজেকে অত্যন্ত সহনশীল বা ‘হালিম’ এবং পরম ক্ষমাশীল বা ‘গফুর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং, পরম সত্য বা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি বান্দার এই অক্ষমতাকে নিজের দয়ায় সর্বদা ঢেকে রাখেন এবং বান্দার অন্তর যাতে জ্ঞান বা মারেফতের আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তিনি এই আয়াতের শেষে ক্ষমার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। আর স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর কতিপয় খাস বান্দাকে সামগ্রিকভাবে এই বিশেষ ইলম বা মারেফাত দান করেছেন এবং তিনি ইরশাদ করেছেন, “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।”[14]

কারণ, মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিসই মূলত এক একটি স্পষ্ট দলিল বা নিদর্শন, যা পরম সত্যের অস্তিত্বকে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে; আর দুনিয়ার কোনো বস্তুই স্বয়ং নিজের সত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বা একক হতে পারে না। আর এই গভীর রহস্যের কারণেই মূলত আল্লাহর খাস বান্দাগণ সর্বদা সমস্ত হিজাব বা জাগতিক পর্দা থেকে নিজেদের বাতিন বা অন্তরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রেখেছেন; আর এই কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাদের এই সুউচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদার কথা অন্য সবার কাছে স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেছেন, “এমন কোনোকিছু নেই যা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না।” অর্থাৎ, সৃষ্টির এই তাসবিহ মূলত আল্লাহরই অসীম কুদরতের এক বড়ো মহিমা। তাই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা এবং তার গুণাবলি পাঠ করার সময় অত্যন্ত সতর্ক থেকো। তোমার রব নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন এবং বিশ্বজগত যা বলে, তার মাঝে পার্থক্য করো। নিজের মনগড়া কোনোকিছু দিয়ে তার ওপর যুক্তি খাড়া করো না।

তাতেই বিশ্বাস রাখো, যা আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনের ধারক-বাহকদের উক্তি থেকে হুবহু বর্ণিত হয়েছে। আর প্রকৃত রহস্যের সেই সুউচ্চ কাবজ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজের সত্তা সম্বন্ধে সংবাদ দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন, “আমি কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে এতটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব করি না, যতটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমি আমার মুমিন বান্দার জান কবজ করার সময় করি। কারণ সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার কষ্ট পাওয়াকে অপছন্দ করি।”[15] আর এই হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ নিজের জন্য ‘অপছন্দ করা’ বা কারাহাত শব্দটিকে গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং বান্দার আধ্যাত্মিক কাবজের যে হালত, তা মূলত পরম সত্য বা আল্লাহর এই রহস্যের মুখোমুখি হওয়ার কারণেই ঘটে থাকে।

আর এই হাদিস থেকে মূলত দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়, যা অবধারিতভাবে মানুষের কাবজের কারণ হয়। তার একটি হলো এক প্রকার তরদ্দুদ তথা দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং অপরটি হলো আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত কারাহাত তথা অপছন্দনীয়তা। কিন্তু জনাবুল ইলাহি তথা আল্লাহর মহান দরবার তো এই সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। কারণ সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের গণ্ডিতে যে তরদ্দুদ বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, তা মূলত ইলম বা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটে থাকে, যা আল্লাহর শানে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। আর আল্লাহর এই অসীম প্রশস্ততা ও বিস্তৃতির কারণেই মূলত বিধান দাতা মহান আল্লাহ এই বিষয়টি বান্দার সামনে স্পষ্ট করার জন্য কোনো প্রকার উদাহরণ দিতে সমর্থ হননি। কেবল এইটুকুই ব্যক্ত করেছেন যে, এটি হলো আল্লাহর এমন এক মহান গুণ, যা সমস্ত সৃষ্টিজগৎকে সম্পূর্ণরূপে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আর আল্লাহর এই সমস্ত পবিত্র নামসমূহ এতই অসীম যে, তা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে আল্লাহর খাস বান্দাগণ তথা আহলুল্লাহর কাছে তাদের স্ব-স্ব অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে এর কতিপয় মূল রহস্য সুপরিচিত। সুতরাং, যে ব্যক্তি আল্লাহর এই বিশেষ নুর দ্বারা নিজের চোখকে আলোকিত করেছে, সে স্পষ্ট দেখতে পায় যে, সৃষ্টির ওপর আপতিত প্রতিটি ভাব বা ওয়ারিদ এবং প্রতিটি খবরই মূলত আল্লাহর সেই পরম কুদরতেরই এক একটি তাজাল্লি। আর আধ্যাত্মিক জগতের এই সুউচ্চ মাকামে যার কাবজ অর্জিত হয়, তা মূলত কোনো ধরনের জাগতিক সন্দেহ বা সংশয় ছাড়াই সরাসরি ঐশ্বরিক প্রেম থেকেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। আর এই মাকাম বা স্তরেই মূলত সাধকের অন্তরে এক অনন্য স্বাদ বা জওক প্রকাশ পায়, যা তার কাবজকে এক স্বর্গীয় প্রেমে রূপান্তরিত করে।

আর খওফ তথা সাধারণ ভয়ের মাকাম থেকে যে কাবজটি অর্জিত হয়, সুফিদের কতিপয় মনীষী তার স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এটি মূলত নফস বা কুপ্রবৃত্তির সাথে সম্পৃক্ত এক প্রকার তীব্র অনুভূতি, যা সাধকের অন্তর নিজের সত্তার ওপর বা অন্যের ওপর ভয় পাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর যদি সাধক নিজের নফসের অবাধ্যতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যায় এবং তার অন্তরে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের ভয়ের মতো এক পবিত্র খোদাভীতি জাগ্রত হয়, যা মূলত কেয়ামতের কঠিন দিন বা হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে সৃষ্টি হয় এবং যা সাধারণ মানুষকে তীব্রভাবে ব্যাকুল ও ব্যথিত করে তোলে, তবে সেই সুউচ্চ স্তরের ভয়কে আর সাধারণ কাবজ বলা যায় না। বরং সেটি হলো এমন এক পবিত্র কাবজ, যার কারণ সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত বা মাজহুল থাকে। সুতরাং যখন এই অজ্ঞাত কাবজের তাজাল্লি কোনো আরিফ বা তত্ত্বজ্ঞানীর অন্তরে এসে অবতীর্ণ হয় এবং তার ভেতর স্থিরতা লাভ করে, তখন সাধক স্বীয় স্থান থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়ে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান হাকিকত বা সত্যের সন্ধান লাভ করে। আর সুফিদের উচ্চতর স্তর বা মাকামাতুল মুস্তাসহাবা’র মাঝে এটিই হলো প্রথম স্থায়ী কদম বা পদক্ষেপ, যা সাধককে সরাসরি জান্নাতের উচ্চ মাকামে পৌঁছে দেয় এবং দুনিয়ার কোনো অবস্থাই তাকে আর সেই স্তর থেকে নিচে নামাতে পারে না। আর এই কারণেই আল্লাহর কতিপয় পবিত্র নামের হুকুম বা প্রভাব এই নশ্বর পৃথিবীতে যেমন কার্যকর থাকে, ঠিক তেমনি পরকালেও তার প্রভাব অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী হিসেবে বিদ্যমান থাকবে। আর এখান থেকেই স্পষ্ট জানা যায় যে, আল্লাহর এই সমস্ত পবিত্র নামের একেকটি সুনির্দিষ্ট মূল বা আইন রয়েছে, যার কারণে প্রতিটি নামের হুকুম বা প্রভাব সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে। সুতরাং, সাধকের অস্তিত্ব যদি পুরোপুরি ফানা বা বিলীন হয়ে যায়, তবুও আল্লাহর এই সমস্ত নাম ও সিফাতের হুকুম বা বিধিমালা স্বীয় সত্তায় চিরকাল বাকি থাকে। আর যদি এই আসমা বা গুণাবলির কোনো ফানা বা বিনাশ থাকত, তবে অবধারিতভাবেই তার হুকুম বা প্রভাবও চিরতরে লোপ পেয়ে যেত। কিন্তু পরম সত্য বা আল্লাহর এই সমস্ত আসমা মূলত স্বয়ং তাঁর পবিত্র জাত বা সত্তার সাথেই সম্পৃক্ত এবং এর কোনো বিনাশ বা ফানা নেই। এই কারণেই সৃষ্টির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও আল্লাহর এই সমস্ত নামের হুকুম ও তার প্রভাব বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। সুতরাং, আমরা যখন বলি যে, কোনো নামের হুকুম দূর বা জওয়াল হয়ে গেছে, তার অর্থ এই নয় যে, স্বয়ং নামটিই মিটে গেছে; বরং তার অর্থ হলো বান্দার ওপর থেকে তার বাহ্যিক হুকুমের আবর্তনটি শেষ হয়ে গেছে এবং তা পুনরায় নিজের আসল রূপ বা হকের দিকেই ধাবিত হয়েছে।

এবার আসা যাক বাস্তের পরিচিতি এবং তার নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন প্রসঙ্গে।

البَسْطُ حَالٌ وَلَكِنْ لَيْسَ يَدْرِيْهِ … إِلاَّ الإِلَهُ الَّذِيْ أَقَامَنَا فِيْهِ

বাস্ত হলো এমন এক সুউচ্চ আধ্যাত্মিক হালত বা অবস্থা, যা কেউ সম্যক জানে না, একমাত্র সেই ইলাহ বা আল্লাহ ছাড়া, যিনি আমাদের এই অবস্থার মাঝে সুপ্রতিষ্ঠিত রেখেছেন।

له التحكم في الأكوان أجمعها … به الوجود الذي تبدو معانيه

সমগ্র মহাবিশ্বের ওপর তাঁরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তাঁরই মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেছে এই জগৎ, যার নিগূঢ় অর্থসমূহ সর্বদা প্রকাশ পেয়ে থাকে।

وليس يحجبه عنا سوى قدر … وهو الذي عن عيون الخلق يخفيه

এবং কোনো সুনির্দিষ্ট তকদির বা পরিমাপ ছাড়া অন্য কোনোকিছু আমাদের থেকে তাঁকে আড়াল করতে পারে না, আর তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টির চোখ থেকে একে গোপন রাখেন।

البغي حكم له إن كنت ذا نظر … جاء الكتاب به لو كنت تذريه

তুমি যদি অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী হও তবে বুঝতে পারবে যে, অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘন করাও তাঁরই এক প্রকার হুকুম বা বিচার, যদি তুমি তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে, তবে দেখতে পেতে যে, কিতাব বা কুরআন এই সত্যটিই নিয়ে এসেছে।

في عالم الخلق هذا الحكم ليس له … في عالم الأمر هذا في تجليه

সৃষ্টির এই বাহ্যিক জগতে এই হুকুমের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না, বরং নির্দেশ বা আমরের জগতেই মূলত এই হুকুমের প্রকৃত তাজাল্লি বা আলোকরশ্মি প্রকাশ পেয়ে থাকে।

জেনে রাখুন, (আল্লাহ আপনাকে তৌফিক দান করুন) নিশ্চয় সুফিদের এই দলটির মতে বাস্ত হলো বর্তমান মুহূর্তে মানুষের ওপর আপতিত রেজা বা আশারই একটি পরিচ্ছন্ন রূপ। কারণ, বর্তমান মুহূর্তে অন্তরে যে ঐশ্বরিক প্রশস্ততা অর্জিত হয়, সুফিদের পরিভাষায় তাকেই বাস্ত বলা হয় এবং তা মূলত এমন এক শক্তিশালী ওয়ারিদ বা ভাব, যা মানুষের ভেতর পর্যায়ক্রমে জেঁকে বসে এবং তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। আর বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণের হাকিকত বা প্রকৃত রূপ এই যে, তা কোনো সুনির্দিষ্ট বস্তু বা গণ্ডির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা এতই প্রশস্ত যে, দুনিয়ার কোনোকিছুই তার চেয়ে উন্নত বা রফিউদ দরোজাত হতে পারে না। ফলে তা প্রতিটি স্তরের সাধকের যোগ্যতা অনুসারেই তার ওপর অবতীর্ণ হয়। আর এই কারণেই স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজের রব্বানি দরবার থেকে এই বাস্তের উচ্চতর মর্যাদা প্রকাশ করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “এবং তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ তথা করজে হাসানা প্রদান করো।”[16] এবং এই অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মহান ও বড়ো বিষয় হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন, “কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে করজে হাসানা দেবে?”[17]

আর এই অনন্য বাস্তের কারণেই মূলত আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে নিজেকে অসীম সমৃদ্ধ এবং সৃষ্টিকে অভাবী হিসেবে উল্লেখ করে ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ হলেন অভাবমুক্ত ও ধনী, আর তোমরা হলে দরিদ্র বা মুখাপেক্ষী।”[18] আর এই অসীম প্রশস্ততার বিষয়টি সত্য প্রমাণ করার জন্যই মূলত আল্লাহ পাকের এই বাণী অবতীর্ণ হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, “আর আল্লাহ যদি তাঁর বান্দাদের জন্য রিজিক বা জীবনোপকরণ প্রচুর পরিমাণে বাড়িয়ে তথা বাস্ত করে দিতেন, তবে তারা অবধারিতভাবে পৃথিবীতে অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ সৃষ্টি করত।”[19] এবং মহান আল্লাহর দরবার থেকে বান্দার ওপর আপতিত এই রহস্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, “এবং তিনি নিজের রহমত বা দয়াকে চারদিকে ছড়িয়ে দেন, আর তিনিই হলেন পরম অভিভাবক ও অত্যন্ত প্রশংসিত।”[20]

আর যদি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এই পবিত্র বাস্তের আগমন না ঘটত, তবে দুনিয়ার কোনো মানুষের পক্ষেই আল্লাহর এই সমস্ত পবিত্র নামসমূহের গুণাবলি নিজের মাঝে ধারণ করা বা আখলাক লাভ করা সম্ভব হতো না। সুফিদের পরিভাষায় আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে মহান সংজ্ঞা এই যে, বাস্ত মূলত সরাসরি জানাবুল ইলাহি তথা আল্লাহর মহান দরবার থেকেই বান্দার অন্তরে অবতীর্ণ হয়। যেমন পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আপনার রব অত্যন্ত প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী।”[21] অতঃপর যখন মানুষের অন্তরে এই বাস্তের প্রকৃত আলো এসে পতিত হয়, তখন মানুষের বিশ্বাসের সুরতটি এমন অনন্য অবস্থায় রূপ নেয়, যেন সে সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে নিজের ভালোবাসায় পরিবেষ্টন করে নিয়েছে। আর এই কারণেই স্বয়ং আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, “হে মানুষ, তোমরাই তো আল্লাহর দরবারে ফকির বা মুখাপেক্ষী।”[22] সুতরাং বান্দা যখন এই মারেফতের আলো লাভ করে, তখন তার অন্তর থেকে সমস্ত জাগতিক লোভ-লালসা ও দুনিয়ার প্রতি উদগ্রীব হওয়ার যে ব্যাধি, তা চিরতরে দূর হয়ে যায় এবং তার অন্তর কেবল আল্লাহর মহব্বতেই নিমগ্ন থাকে; ফলে তখন আল্লাহ তায়ালা সেই অন্তরের জন্য এক বিশেষ দাওয়াই বা আরোগ্য নির্ধারণ করে দেন, যা তাকে সর্বদা সুস্থ রাখে। আর এই পুরো অবস্থাটি মূলত আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন, “এবং আল্লাহ হলেন পরম ধনী ও অত্যন্ত প্রশংসিত।”[23]

অতএব পরম করুণাময় আল্লাহর এই রহমত যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দুনিয়ার কোনো হিজাব বা পর্দা আর সাধকের অন্তরের মারেফতকে আড়াল করতে পারে না। আর মানুষের ওপর আপতিত এই পরম রহমতই মূলত তাকে সমস্ত অন্যায় ও পাপের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে সরাসরি আল্লাহর নৈকট্যের সুউচ্চ ময়দানে আরোহণ করায়; এবং যখন এই ঐশ্বরিক রহমত কোনো আরিফ বা তত্ত্বজ্ঞানীদের অন্তরে এসে অবতীর্ণ হয়, তখন তার স্বভাবজাত চরিত্র অত্যন্ত মাধুর্যপূর্ণ ও সুন্দর হয়ে ওঠে এবং সে আল্লাহর দরবারে এক মাকবুল বান্দায় পরিণত হয়। আর এই সুউচ্চ স্তরের সাধক সর্বদা মানুষের সাথে অত্যন্ত উত্তম আচরণ বা মাকারেমুল আখলাক প্রদর্শন করে থাকেন এবং তিনি সর্বদা আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি গভীর দয়া ও মেহেরবানি প্রকাশ করেন; ফলে তার এই অনন্য ইবাদত সরাসরি আল্লাহর দরবারে এক বিশেষ কুরবত বা নৈকট্য হিসেবে কবুল হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে তার ওপর আল্লাহর অসীম মাগফিরাত ও দয়া অবতীর্ণ হতে থাকে। সুতরাং, বান্দার ওপর আপতিত এই বাস্ত বা আধ্যাত্মিক প্রসারণ মূলত কেবল কাবজের বিপরীত কোনো সাধারণ অবস্থা নয়; বরং এটি হলো সরাসরি পরম সত্য বা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর অবতীর্ণ এক বিশেষ নুর, যা বান্দার অন্তরকে সর্বদা সজীব ও প্রফুল্ল রাখে। অতঃপর, মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে যে পরম ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন, তা এই বাণীর আলোকেই স্পষ্ট প্রতিভাত হয়, যেখানে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমার রহমত বা দয়া আমার গজবের ওপর সর্বদা প্রাধান্য লাভ করেছে।”

অতএব পরম সত্য বা আল্লাহর এই অনন্ত দয়া সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে সর্বদা পরিবেষ্টন করে রেখেছে এবং দুনিয়ার প্রতিটি কণা বা অস্তিত্বই তাঁর এই অসীম নিয়ামতের ওপর সর্বদা পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা বজায় রেখেছে, যার কারণে এই নশ্বর জগতের সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে সর্বদা এক ঐশ্বরিক আলোর আবহ তৈরি হয়ে থাকে।

আর স্পষ্ট জেনে রাখুন, নিশ্চয়ই বান্দার ওপর আপতিত এই আধ্যাত্মিক প্রসারণ বা বাস্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম আদব বা চরিত্র হলো এই যে, সাধক যেন কোনো অবস্থাতেই নিজের সীমা লঙ্ঘন না করে এবং সর্বদা আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখে, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন, “অতএব আল্লাহ তায়ালা কতই না পবিত্র ও সর্বোত্তম স্রষ্টা।”[24]

কারণ, সৃষ্টির প্রতিটি উত্তম ও সুন্দর অবয়ব মূলত আল্লাহ তায়ালারই অনন্য সৃষ্টিশৈলীর এক একটি বড়ো নিদর্শন, যা প্রতিটি মানুষের চিন্তাশক্তিকে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে। আর দুনিয়ার কোনো বস্তুই স্বয়ং নিজের ক্ষমতায় সুন্দর বা নিখুঁত হতে পারে না। আর এই গভীর রহস্যের কারণেই মূলত আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কতিপয় মূর্তি-পূজারী বা মূর্তির ইবাদতকারীদের কঠোর সমালোচনা করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, এই বিশেষণের মাধ্যমে তিনি মূর্তিপূজকদের খণ্ডন করে বলেছেন أَفَمَنْ يَخْلُقُ كَمَنْ لَا يَخْلُقُ – যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি তার মতো, যে কিছুই সৃষ্টি করে না?[25]

আল্লাহ এখানে অন্যদের কাছ থেকে সৃষ্টির ক্ষমতাকে অস্বীকার করেছেন। যদি সব ধরনের সৃষ্টিকে অস্বীকার করা না হতো, তবে ফেরাউনের মতো যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা করত, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অকাট্য যুক্তি প্রতিষ্ঠিত হতো না। তা ছাড়া, তারা তো ‘আহসানুল খাালিকিন’ বা উত্তম স্রষ্টা হওয়ার সেই উচ্চতর গুণের অধিকারী ছিল না, কারণ তাদের মধ্যে সেই পর্যায়ের কোনো বিশেষ গুণ বা কর্মদক্ষতা ছিল না।

সৃষ্টিজগতে ইহসান বা সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গতা অর্জনের অর্থ হলো, বান্দা এমনভাবে ইবাদত করবে, যেন সে আল্লাহকে দেখছে। যেহেতু আল্লাহ এই বিশেষণে (সৃষ্টি) একক এবং তিনি সৃষ্টিকে নিজের দিকেই সম্বন্ধ করেছেন, তাই তিনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এটি মহান আল্লাহর এই বাণীর অর্থ— فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ – পবিত্র মহান আল্লাহ, যিনি উত্তম স্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা ‘আহসানুল খালিকিন’ (উত্তম স্রষ্টা) শব্দটির মাধ্যমে এই আধিক্য ও বরকতের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন। এ-ছাড়া তিনি বলেন أَفَرَأَيْتُمْ مَا تُمْنُونَ أَأَنْتُمْ تَخْلُقُونَهُ أَمْ نَحْنُ الْخَالِقُونَ – তোমরা যে শুক্রবিন্দু প্রকাশ করো, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা কি তা সৃষ্টি করো, নাকি আমিই স্রষ্টা?[26]

আল্লাহ এখানে বলেননি যে, তোমরা তা সৃষ্টি করো না; বরং তিনি বলেছেন যে, তোমরা তাকে সৃষ্টি করছ না; বরং আল্লাহই এর প্রকৃত স্রষ্টা। আর ‘আল-মুসাওয়ির’ তথা আকৃতিদানকারী হিসেবে তিনি যে কোনো অবয়ব বা আকৃতি প্রদান করতে সক্ষম। আল্লাহ বলেন فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ – তিনি যে আকৃতিতে ইচ্ছা তোমাকে গঠন করেছেন।[27]

তিনি ‘আল-মুসাওয়ির’ হিসেবে সৃষ্টির সব রহস্য জানেন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের রহস্যগুলো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করেছেন। কেউ মনে করে কার্যকারণ বা আসবাব (মাধ্যম) নিজে থেকেই ফল দেয়, আবার কেউ জানে যে আল্লাহই সবকিছুর মূল কারণ এবং আসবাবগুলো তার কাছে কোনো প্রভাব রাখে না। জ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে ভিন্ন। তারা জানেন যে, সব সত্য ও বাস্তবতা অপরিবর্তনীয়। তারা এসব বিষয়কে তাদের নির্ধারিত নিয়মে পরিচালনা করেন। যারা সত্যের জ্ঞান অর্জন করেছে, তারা সবকিছুর মূলে আল্লাহকে দেখতে পায়। তাদের কাছে আল্লাহর বিধানের কোনো পরিবর্তন নেই। মহান আল্লাহ বলেন فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَبْدِيلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلًا – তুমি আল্লাহর নিয়মে কখনো কোনো পরিবর্তন ও রূপান্তর পাবে না।[28]

যারা সত্যের জ্ঞান অর্জন করেছে, তারা জানে যে, আল্লাহ সবকিছুর প্রকাশক। যদি এই প্রকাশ না থাকতো, তবে কোনো কিছু অস্তিত্ব লাভ করতো না। জ্ঞানী ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানেন যে, সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর কবজায়। যখন আল্লাহর ভয়ে আওয়াজ স্তিমিত হয়ে যায়, তখন কী অবস্থা হয়? তখন বিনয় ও লজ্জার কারণে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয়, যা সম্মানের ভীতি থেকে আসে। মহান আল্লাহ বলেন وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا – পরম করুণাময়ের ভয়ে আওয়াজ স্তিমিত হয়ে যাবে, তখন তুমি মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কিছুই শুনবে না।[29]

হে আমার প্রিয় বন্ধু, জেনে রেখো, সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর হাতের মুঠোয়। আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে বলেছেন যে, তাঁর উভয় হাতই মুবারক। আদম (আ.) ডান হাত পছন্দ করেছেন। যদিও আল্লাহর উভয় হাতই বরকতময়, তবুও মানুষ সৃষ্টির পূর্ণতা এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার মর্যাদা লাভের আশায় শক্তিশালী অবস্থান তথা ডান হাতকে বেছে নিয়েছে। যখন কোনো মানুষ নিজেকে আল্লাহর কুদরতি হাতের মুঠোয় দেখতে পায়, তখন সে বুঝতে পারে, সে কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় ফিরে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ – সব বিষয় তাঁরই দিকে ফিরে যাবে।[30] আরও বলেন وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ – তোমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাবে। মানুষ যখন জানে যে, সে নির্ধারিত উৎস থেকে এসেছে, তখনই সে নিজেকে চেনে। সুতরাং সে জানে যে, তার প্রত্যাবর্তন সেই মূল সত্তার দিকে, যার কাছে তার নিজের কোনো অস্তিত্ব নেই; ঠিক যেমন আল্লাহকে দেখার সময় তার নিজের অস্তিত্ব থাকে না। আরিফ তথা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত জ্ঞানী ব্যক্তিদের চূড়ান্ত অবস্থা হলো, তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে, আল্লাহর সামনে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি এমন এক মাকাম বা অবস্থান, যা কেবল আরিফদের জন্যই নির্দিষ্ট। তারা সবসময় আল্লাহর কবজায় বা নিয়ন্ত্রণে থাকেন, তারা তাদের প্রশস্ততা বা বাস্ত এর অবস্থাতেও সেই নিয়ন্ত্রণ অনুভব করেন। কোনো আরিফের পক্ষেই এটি হওয়া সম্ভব নয় যে, তিনি কাবজ বা নিয়ন্ত্রণের অবস্থায় নেই বা বাস্ত-এর বাইরে আছেন; আবার বাস্ত-এর অবস্থায় থাকা অবস্থায় কাবজ-এর বাইরে থাকা সম্ভব নয়। আরিফ তিনিই, যিনি এই দুই বিপরীত অবস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারেন। কারণ এই দুই বিপরীত অবস্থার সমন্বয় সাধনই হলো প্রকৃত সত্য। আবু সাঈদ আল-খাররাজকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি আল্লাহকে কীভাবে চিনলেন?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি দুই বিপরীত অবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে তাঁকে চিনেছি। কারণ আমি নিজেই দুই বিপরীত অবস্থার সাক্ষী।’ তিনি আরও জেনেছিলেন যে, আল্লাহ তাঁরই আকৃতিতে এবং তাঁর শ্রবণশক্তির মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ – তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই গোপন।[31]

তিনি এই আয়াতের মাধ্যমেই বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। এরপর তিনি বিশ্বজগৎ বা আলমের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, এটি একটি বৃহৎ সত্তার আকৃতিতে বিদ্যমান এবং এই জগতই দুই বিপরীত অবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। তিনি এতে নড়াচড়া ও স্থিরতা, সংযোগ ও বিচ্ছেদ দেখতে পেয়েছেন। তিনি আরও দেখতে পেয়েছেন যে, এই জগত আল্লাহর আকৃতিতে গঠিত। সুতরাং, দেখুন, এই কথাটি কত বিস্ময়কর! এ কারণেই জুন-নুন আল-মিসরি তাঁর মাসায়েল বা মাসআলাগুলোর মধ্যে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে, বড়োকে ছোটোর মধ্যে প্রবেশ করানো এবং ছোটোকে বড়োর মধ্যে প্রবেশ করানো সম্ভব, যদিও আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সংকীর্ণ বা প্রশস্ত মনে হতে পারে। আমরা এই কিতাবের ‘মারেফাতুল খিয়াল’ বা কল্পনাশক্তিবিষয়ক অধ্যায়ে এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আলেমদের বাস্ত বা প্রশস্ততা আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, বরং এটি স্বয়ং আল-হাক্ক বা পরম সত্যের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, তারা শেষ পর্যন্ত তাঁর দিকেই ফিরে যায়।

فَلَمْ يَكُنِ الْبَسْطُ إِلَّا لَهُ * فَهُمْ أَهْلُ مَحْوٍ وَإِنْ أَثْبَتُوا

অর্থাৎ, সব প্রশস্ততা কেবল তাঁরই জন্য; বান্দার উপর যে আধ্যাত্মিক বিস্তার আসে, তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দান, বান্দার নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই। তাই প্রকৃত আরিফরা বাহ্যত টিকে থাকলেও (ইসবাত), ভেতরে ভেতরে তারা আত্মবিলুপ্তির মধ্যেই থাকেন।[32]

সবশেষে বলা যায়, কাবজ ও বাস্ত আধ্যাত্মিক পথের দুটি অনিবার্য এবং অপরিহার্য সঙ্গী, যা ছাড়া সাধকের আত্মিক যাত্রা পূর্ণ হয় না। কাবজের সংকীর্ণতায় বান্দা আল্লাহর প্রতাপ ও শক্তি সরাসরি অনুভব করে এবং নিজের অহংকার ও আমিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। আর বাস্তের প্রশস্ততায় সে আল্লাহর অপার দয়া ও রহমতের মধ্যে ডুবে যায় এবং অন্তর থেকে এক অনির্বচনীয় আনন্দ ও প্রশান্তি লাভ করে। এই দুটি অবস্থা পর্যায়ক্রমে আসতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সাধককে উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরের দিকে নিয়ে যায়। তবে সাধককে সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়; বাস্তের আনন্দে যেন নফস বা কুপ্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে, আর কাবজের কষ্টে যেন অধৈর্য হয়ে আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে না যায়। চূড়ান্ত মাকামে পৌঁছে গেলে এই দুটির কোনোটিই আর থাকে না; সাধক তখন এমন এক পরম স্থিরতা ও তামকিনে পৌঁছান, যেখানে কেবল আল্লাহর অস্তিত্বই বাকি থাকে এবং বান্দার নিজের কোনো সত্তা আর অনুভূত হয় না। এই গভীর সত্য যে যত বেশি অনুধাবন করতে পারে, সে তত বেশি আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছায়।